সাইকোগিরি part 03 by Nova
---- এই বাড়ির হক্কলেরে নিয়া হইছে আমার আর খালাম্মার জ্বালা।সব পাগল এই বাড়িতেই বসবাস।কার মতি-গতি কহন ভালো থাকে আর কহন খারাপ।তা তিন বছর কাম কইরাও বুঝলাম না।খালাম্মার দুই পোলা হইলো দুই পাগল।একটার তো কথা নাই, বার্তা নাই হুট কইরা রাইগা আইটেম বোম হইয়া যায়।আরেকটায় উল্টা-পাল্টা কাম করে। রেদোয়ান ভাইরে কাইল রাইতে দেখলাম নিচে শুইয়া সোফায় পা দিয়া উল্টা হইয়া টিভি দেখতাছে।নয়তো কহনো উল্টা গেঞ্জি পইরা সারা বাড়ি ঘুরবো।কোন তাল নাই।
কিছু সময় থেমে শ্বাস নিলো রুবিনা।একদমে অনেক কথা বলে ফেলেছে সে।হাতের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।প্লেটগুলোতে সাবান মাখিয়ে ধূতে ধুতে আবার শুরু করলো সে।
রুবিনাঃ আর রিজুয়ান ভাইয়ের কথা কি কমু?হেরে তো হের বাপ,মা সুইদ্দা ডরায়।বড় পোলারে দেখলে বাপের বিপি লো হইয়া যায়।তখন আমারেই আবর দৌড়াইয়া ঔষধ দিতে হয়।বড় পোলায় বাড়ি থাকলে খালুজানের পেছনে বিপির ঔষধ নিয়া লগে লগে থাকতে হয়।আর ঐ দাদী বুড়ির কথা কি কমু।সারাদিন গরুর মতো পান চাবাইতেই থাকে।আর পিক হালানের বাটি নিয়া তার আগে পেছনে আমার ঘুরতে হয়।আরে বুড়ি তোর বয়স হইছে।তুই ল্যাংড়া মানুষ।সবসময় হুইল চেয়ার নিয়া চলোছ।এহন বেশি বেশি কইরা আল্লাহ খোদার নাম নিবি।তা না কইরা গরুর জাবর কাটার লাহানি সারাদিন পান চাবাইবো।বড় নাতিরে দেখলে হুইল চেয়ার টাইনা উল্টা দিকে দৌড় দিবো।বুঝি না বাবা, এগুলারে খালাম্মা সামলায় কেমনে?আমি হইলে তো কবে লাথি মাইরা এই সংসার হালায় থুইয়া যাইতাম গা।এডির লগে মানুষ থাকতে পারে।
থালাবাসন মাজতে মাজতে নিজের মনে বিরবির করে কথাগুলো বলছিলো রুবিনা।রুবিনা শেইখ বাড়ির কাজের মেয়ে।অনেক পরিশ্রমী বলে মিসেস তুলি শেইখ ওকে ভীষণ পছন্দ করে। রুবিনা শেইখ বাড়ির সবার ওপর চরম বিরক্ত।মাঝে মাঝে ওর মন চায় সব ফেলে পালিয়ে যেতে।কিন্তু মিসেস তুলি শেইখের মুখের দিকে তাকিয়ে তা পারে না। মানুষটা রুবিনাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে।তার মনে দুঃখ দিয়ে রুবিনার যেতে মন সায় দেয় না।
তুলিঃ কি রে কি বিরবির করছিস?তখন থেকে দেখছি প্লেট মাজছিস আর নিজের মনে কত কি বলে যাচ্ছিস।কাকে বকছিস এতো?
রুবিনাঃ কারে বকমু আবার?নিজের জীবনের ওপর রাগ উঠতাছে।আপনে যদি আমারে না রাখতেন জোর কইরা।তাইলে আমি কহনো এই বাড়িতে কাম করতাম না। সব আজব পাবলিক।মাঝে মাঝে মনে হয় ভিনগ্রহ থিকা সব আইছে।আপনে এগুলিরে সামলান কেমনে খালাম্মা? আমার তো মাথা গরম হইয়া যায়।
তুলিঃ সবই সংসারের মায়ারে রুবিনা।মায়া জিনিসটা যে বড্ড খারাপ। যখন ওরা ছোট ছিলো তখনই সংসার ফেলে যেতে পারি নি।আর এখন তো বুড়োই হয়ে গেছি।সবকিছু আমার সাজানো,গোছানো সংসার।ছেলে দুটো বড় হয়ে গেছে। বাঁচবো আর কতদিন? এখন দুই ছেলের বউ দেখে মরলেও আমার শান্তি হবে।
রুবিনাঃ খালাম্মা ভুলেও আপনে মরনের কথা কইবেন না।আমার অনেক খারাপ লাগে।শুধুমাত্র আপনের লিগা আমি এই বাড়িতে আছি।আপনে যদি আবার মরণের কথা কন তাইলে আমি আর কামে আসমু না।
তুলিঃ তাহলে তো আমার মরার বন্দোবস্ত আরো তাড়াতাড়ি হবে।শরীর দুদিনও ভালো থাকে না। ছেলে দুটোর চিন্তায় চিন্তায় আমি শেষ। একটায় তাও নিজের লাইফ গুছিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু আরেকটা টো টো কোম্পানির ম্যানেজার হয়ে আমার শান্তি নষ্ট করছে।আমার এখন একটায় ইচ্ছা দুই ছেলেটার জন্য যেনো ভালো দুটো মেয়ে পাই।যাতে ওদের ঝাড়ি মেরে ঠিক করতে পারে।আমি আর পারবো না বাপু।
রুবিনাঃ আপনে কোন চিন্তা কইরেন না খালাম্মা। দেখবেন আল্লাহ তাদের ঠিক করার লিগা তাদের থিকা দুই ডবল ডেঞ্জারাস মাইয়া পাঠাইবো।তবে তারা শুধু ভাইগো ঝাটা মাইরা ভালো করবো না।সাথে রাগ,গোস্বা, উল্টা-পাল্টা কামের কথাও মাথা থিকা সরায় ফেলবো।
তুলিঃ তাই যেনো হয় রে রুবিনা।দোয়া করিস আমার দুই গাধার জন্য।
বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাজে লেগে পরলেন তুলি শেইখ। ইদানীং নিজের জীবনটার ওপর ভীষণ রাগ লাগে তার।বারবার মনে হয় ছেলে দুটোকে সে মানুষের মতো মানুষ করতে পারেন নি।অবশ্য এক্ষেত্রে বেশি দোষ তার স্বামী সাজিদ শেইখের।ছেলেদের শাসন তো করেননি সাথে তার স্ত্রীকেও করতে দেয়নি।যার ফলাফল এখন ভোগ করছেন।
🎭🎭🎭
পাখিরা তাদের নীড়ে ফেরা শুরু করেছে। দক্ষীণা হাওয়া বইছে মৃদুমন্দ তালে।নদীর পাড়ের কাশফুলগুলো বাতাসের তালে তালে দুলছে।আকাশে খন্ড খন্ড শুভ্র মেঘের ছড়াছড়ি। পরিবেশটা উপভোগ করার মতো।এমন দিনে ঘরে বসে থাকতে কার বা মন চায়?? ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে নিজেকে সঁপে দিতে প্রকৃতির মাঝে।
কিন্তু এখন ইচ্ছে করলেও তা করতে পারবে না অনামী।কারণ ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে সে পড়াচ্ছে।বেসরকারি এক কিন্ডারগার্ডেনে চাকরী করে সে।পড়াশোনা শেষ কয়েক মাস হলো।ভালো কোন চাকরী পাচ্ছে না।তাই বসে না থেকে এই চাকরীটা করছে।পাশাপাশি অন্য চাকরীও খুঁজছে। অন্যমনস্ক হয়ে শরতের আকাশ দেখছিলো সে।জানালা দিয়ে তাকালে আকাশ দেখা যায়।সেদিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। এক বাচ্চা মেয়ের কথায় হুশ ফিরে।
---- ম্যাম,তুমি কি ভাবছো? অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করছি তুমি কি জানি মনোযোগ দিয়ে ভাবছো?
অনামী মিষ্টি হেসে বাচ্চাটার দিকে তাকালো। মা হারা ছোট রিমি।জন্মের সময় মা-কে হারিয়েছে সে।বাবা এখনো আরেকটা বিয়ে করে নিয়েছে।নানা-নানির সাথে থাকে রিমি।তার বাবা মাসে দু-এক বার এসে দেখে যায়।মেয়ের খরচ দেয়।এতেই সে দায়মুক্ত হয়ে গেছে।আর কোন কিছু করার প্রয়োজন মনে করে না।রিমির গায়ের রংটা কালো হলেও চেহারাটা ভারী মায়াবী।এই মেয়েটার প্রতি আলাদা টান খুঁজে পায় অনামী।
রিমিঃ ম্যাম কথা বলছো না কেন?তোমার আম্মু কি বকা দিয়েছে?আম্মুরা কখনো কারণ ছাড়া বকে না। আমার তো আম্মুই নেই। তাই আমায় কেউ বকে না।
অনামী এক গাল হেসে রিমিকে নিজের কাছে টেনে নিলো।তারপর খুশিমনে দুই গালে চুমু খেলো।চুলগুলো এলোমেলো করে হালকা করে দুই গাল টেনে দিলো।তারপর মুচকি হেসে বললো।
অনামীঃ আমার আম্মু বকা দেয়নি মা-মণি।এমনি মন খারাপ। কিছু ভালো লাগছে না।
রিমিঃ তাহলে আমাদের ছুটি দিয়ে দেও।তুমি বাসায় চলে যাও।এখানে থাকলে হয়তো অনেক মন খারাপ হয়ে যাবে।
অনামীঃ আর কিছু সময় বাকি আছে। তাই সমস্যা হবে না। তোমাকে এতকিছু ভাবতে হবে না পাকা বুড়ি।আমার সবদিকে তোমার নজর রাখতে হবে।
রিমির নাক টেনে দিয়ে কথাগুলো বললো অনামী।রিমি খিলখিল করে হেসে উঠলো। বাচ্চাটার চেহারার থেকে শতগুণ বেশি সুন্দর ওর মন কাড়া হাসি। অনেক ভালো লাগে অনামীর সেটা। বেশ কিছু সময় বাচ্চাদের পড়িয়ে ছুটি দিয়ে দিলো।
রাস্তায় রিমির হাত ধরে হাঁটছে অনামী।পাশাপাশি দালানে থাকে তারা।ওরা দুজন যেভাবে হাঁটছে দূর থেকে কেউ দেখলে মা-মেয়ে ছাড়া অন্য কিছু বলবে না। অনামী এক হাতে শক্ত করে রিমিকে ধরে রেখেছে। আরেক হাতে রিমির ব্যাগ।রিমি নাচতে নাচতে অনামীর হাত ধরে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় মোবাইলে একটা ম্যাসেজ এলো।ম্যাসেজের শব্দে মোবাইল বের করলো সাইড ব্যাগ থেকে।
"সাবধানে বাসায় যেও বেবিডল।গিয়ে আমাকে জানানোর প্রয়োজন নেই। আমি তোমার খবর পেয়ে যাবো।আজ রাতে কোথাও বের হয়ো না।দূর আকাশে মেঘ জমেছে। ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। আর যদি আমার কথা না শুনে আমার অবাধ্য হয়ে বের হও ।তাহলে আমার সাথে তোমার অবশ্যই দেখা হবে বেবিডল ।আর দেখা হলে সেটা তোমার জন্য ভালো হবে না। বাচ্চা মেয়েটা কে???তোমার বয়ফ্রেন্ডের মেয়ে নাকি?এমনটা যদি হয় তাহলে ওর থেকে দূরে থেকো।নয়তো ওর কোন এক্সিডেন্ট হয়ে গেলে আমি দায়ী নই।তার সম্পূর্ণ দায়ভার শুধু তোমার।বাচ্চাটার কথা আপাতত চিন্তা করো না বেবিডল।আমি খোঁজ খবর না নিয়ে ওর কোন ক্ষতি করবো না। "
ম্যাসেজটা পরে অনেকটা ভয় ও রাগ হলো অনামীর।সেদিনের পর থেকে অনেকটা ভয়ে ভয়ে চলে সে।যদিও বাচ্চাটা তার কোন সম্পর্কের নয়।শুধু পছন্দ করে বলে, অনেক আদর করে।তারপরেও মনের ভেতর চাপা ভয় উঁকি ঝুঁকি মারছে। প্রতিদিন হাজারটা ম্যাসেজ আসে এই আননোন নাম্বারটা থেকে।কল করলেই বন্ধ বলে।নানাভাবে তাকে হুমকির ওপর রেখেছে। নিজের জীবনের ওপর এখন বিরক্ত লাগছে অনামীর।
রিমিঃ ম্যাম,চলো বাসায় যাবে না। দেখো দূর আকাশে কালো মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হতে পারে।
একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে, ৯ বছরের রিমির দিকে তাকিয়ে রইলো অনামী।তার মনের গহীন কোণেও যে কালো মেঘ জমেছে। কবে যে সত্যি সত্যি ঝড় উঠে যায়।
রিমিঃ এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।নাকি বাসায় যাবে?
অনামীঃ হ্যাঁ,মা-মণি চলো।
অনামী এক চিলতে মিথ্যে হাসি দিয়ে হাঁটতে লাগলো বাসার উদ্দেশ্য।সাদা শুভ্র মেঘগুলোকে ছাড়িয়ে, দূর আকাশের এক কোণে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। হিমেল ঠান্ডা বাতাস বইতেও শুরু করছে।আজ বৃষ্টি হবে এমনটা বলাই যায়।কিন্তু ঝড় আসবে কিনা তাতে সিউর নয় অনামী।তবে এটা সে নিশ্চিত বলতে পারে।তার জীবন এলোমেলো করে দিতে কোন ঝড় আসছে।যার কালো মেঘ তার মনের আকাশে অনেক আগেই দেখা দিয়েছে। যার আভাস সে এখন পাচ্ছে।
#চলবে
