প্রথম পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
পৃ - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল
আমি খুব ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালাম। আমার মাথার কাছে একটি চতুষ্কোণ স্ক্রিন, সেখানে হালকা নীল রংয়ের আলো, এই আলোটি আমার পরিচিত, কিন্তু কোথায় দেখেছি এখন কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কিছু একটা ঘটছে এবং আমি জানি ব্যাপারটা ঘটবে কিন্তু সেটি কী আমার মনে পড়ছে না। আমি সেটি মনে করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে আবার গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়লাম। এক সময় আবার আমার চেতনা ফিরে আসতে থাকে এবং আধো ঘুম আর আধো জাগরণের মাঝামাঝি একটি তরল অবস্থায় আমি ঘুরপাক খেতে থাকি। আমি একরকম জোর করে চোখ খুলে তাকালাম, চতুষ্কোণ স্ক্রিনটিতে একটি নীল গ্রহের ছবি ফুটে উঠেছে। আমি এই গ্রহটিকে চিনি, এর নাম পৃথিবী, ছায়াপথের একটি সাদামাটা নক্ষত্রকে ঘিরে যে গ্রহগুলি ঘুরছে এটি তার তৃতীয় গ্রহ। এই গ্রহে প্রাণের বিকাশ হয়েছিল এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই গ্রহ থেকে এসেছে। আমরা একটি মহাকাশযানে করে এখন আবার এই গ্রহটিতে ফিরে যাচ্ছি।
আমি নীল গ্রহটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ শীত অনুভব করলাম। নিজের অজান্তে দুই হাত বুকের কাছে টেনে আনতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম আমার সারা দেহে কোনো অনুভূতি নেই। আমার মনে পড়ল মহাকাশযানের দীর্ঘ যাত্রার প্রস্তুতি নেয়ার জন্যে আমাকে এবং আমার মতো আরো দশ সহস্র মহাচারীকে শীতল ঘরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। পৃথিবীর কাছে পৌঁছানোর পর আমাদের জাগিয়ে দেবার কথা। আমরা নিশ্চয়ই গন্তব্য স্থলে পৌঁছে গেছি, তাই আমাদের জাগিয়ে তোলা শুরু হয়েছে।
আমি নিজের ভিতরে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করলাম, ধরমর করে উঠে বসার একটা অমানুষিক ইচ্ছাকে প্রাণপনে নিবৃত্ত করে আমি ক্যাপসুলের ভিতরে। চুপচাপ শুয়ে রইলাম। আমার চারপাশে খুব ধীরে ধীরে এক ধরনের আরামদায়ক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, আমি আমার শরীরে আবার শক্তি ফিরে পেতে শুরু করেছি। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত এই শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুরোপুরি সজীব করার আগে আমাকে এই ক্যাপসুল থেকে বের হতে দেয়া হবে না জেনেও আমি কিছুতেই ভিতরে চুপচাপ শুয়ে থাকতে পারছিলাম না।
শুয়ে থাকতে থাকতে যখন আমি ধৈর্যের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছেছি ঠিক তখন ক্যাপসুলের ঢাকনাটি সরে গেল। আমি সাথে সাথে ক্যাপসুল থেকে বের হয়ে এলাম। নিও পলিমারের সূক্ষ্ম একটা আবরণে শরীরকে ঢেকে আমি নগ্ন পদে শীতল মেঝেতে হেঁটে কেন্দ্রীয় ভল্টের বাইরে এসে দাড়ালাম। গোলাকার দরজার কাছে ভাবলেশহীন সুখে একজন মানুষ দাঁড়িয়েছিল, আমাকে দেখে জোর করে মুখে একটা হাসি টেনে এনে বলল, কিহা, শীতল ঘর থেকে তোমার জাগরণ শুভ হোক।
আমি মানুষটার দিকে তাকালাম, এরকম যান্ত্রিক গলায় যে এধরনের একটা। অর্থহীন কথা বলতে পারে সে নিশ্চয়ই মানুষ নয়, সে নিশ্চয়ই একজন রবোট। সে যদি মানুষ নাও হয় তবু তার কথার উত্তরে আমার কিছু একটা বলা উচিৎ কিন্তু আমার অর্থহীন সম্ভাষণ পাল্টা-সম্ভাষণ করার ইচ্ছে করল না। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা কী পৃথিবীর কাছাকাছি চলে এসেছি?
মানুষটা শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, পৃথিবী?
হ্যাঁ, পৃথিবী।
আমি জানি না।
তুমি কি রবোট?
মানুষটির চোখে এক ধরনের ক্রোধের ছায়া এসে পড়ল। আমার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমি রবোট না মানুষ সেটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। আমাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেটি করতে পারছি কী না তাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
আমি নিজের ভিতরে এক ধরনের কৌতুক অনুভব করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তোমাকে কী দায়িত্ব দেয়া হয়েছে?
আজকে শীতল ঘর থেকে যারা বের হবে তাদের সবার বায়ো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা। কমিশনের সামনে হাজির করা।
কিসের কমিশন?
সেটা তুমি সময় হলেই দেখবে।
আমি আবার মানুষটার দিকে তাকালাম, এটি নিশ্চয়ই একটি রবোট, মানুষ হলে যে প্রায় এক শতাব্দী শীতল ঘরে ঘুমিয়ে থেকে জেগে উঠেছে তার সাথে এরকম রুক্ষ গলায় কথা বলত না। আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, চল। তাহলে, আমাকে নিয়ে যাও, যেখানে তোমার নেবার কথা।
মানুষটি বলল, এস।
আমি তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকি। মানুষটি হেঁটে যেতে যেতে অন্যমনস্ক ভাবে তার ঘাড়ে একবার হাত বুলায়। এটি তাহলে রবোট নয়, মানুষ রবোটকে কখনো। তাদের শরীর চুলকাতে হয় না।
বায়ো নিয়ন্ত্রণ ব্যাপারটি যত জটিল হবে ভেবেছিলাম সেটা মোটেও তত জটিল হল না। চতুষ্কোণ একটা দরজার মতো জায়গা দিয়ে আমাকে নগ্ন দেহে হেঁটে যেতে হল, যন্ত্রটি আমার শরীরকে নানা ভাবে স্ক্যান করে আমার সম্পর্কে সম্ভাব্য সবরকম জৈবিক তথ্য মহাকাশযানের মূল তথ্যকেন্দ্রে লিপিবদ্ধ করে ফেলল। পুরো তথ্য বিশ্লেষণ করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল এবং প্রায় সাথে সাথেই আমার শরীর কয়েক ধরনের প্রতিষেধক দিয়ে পাশের ঘরে পাঠিয়ে দেয়া হল। এখানে আমার মস্তিষ্ককে স্ক্যান করা হল, মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা পরিমাপ করার এই যন্ত্রটি সত্যিই কাজ করে কী না সে ব্যাপারটা আমার বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে। আমার পরিচিত একজন অসাধারণ প্রতিভাবান গণিতবিদ, ব্যক্তিগত জীবনে যে একটু খাপছাড়া ধরনের প্রতিবার এই মস্তিষ্ক স্ক্যান যন্ত্রের সামনে গবেট হিসাবে প্রমাণিত হয়ে এসেছে। এই যন্ত্রটি অবশ্যি আমার সম্পর্কে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করেছে বলে মনে হল, কারণ যন্ত্রটির পিছনে যে কমবয়সী সুন্দরী মেয়ে কিংবা রবোটটি বসে রয়েছে সে রিপোর্টটি দেখে চমকে উঠে আমার দিকে তাকাল। আমি তার চোখে একধরনের অবিশ্বাসের ছায়া দেখতে পেলাম। আমার চেহারা খুব সাধারণ, মানুষ নিশ্চয়ই অসাধারণ বুদ্ধিমান মানুষকে অসাধারণ সুদর্শন হিসেবে আবিষ্কার করতে চায়।
বায়ো নিয়ন্ত্রণ ঘর থেকে বের হয়ে আমি একটা ছোট হলঘরে হাজির হলাম। সেখানে আরামদায়ক চেয়ারে জনা বিশেক নানাবয়সের মানুষ গা এলিয়ে বসে আছে। আমি ঘরে ঢুকতেই সবাই ঘুরে আমার দিকে তাকাল এবং মধ্যবয়সী একজন মানুষ সহজ গলায় বলল, এই হচ্ছে কিহ। এখন আমরা কাজ শুরু করে দিতে পারি।
আমি সবাইকে লক্ষ করতে করতে একটা খালি চেয়ারে বসে পড়লাম। চেয়ারগুলি দেখতে যত আরামদায়ক বসতে সেরকম নয়, ইচ্ছে করেই নিশ্চয় এভাবে তৈরি করা হয়েছে। মনে হয় আমাদের জরুরি কোনো তথ্য দেয়া হবে, তাই বেশি আরামে ঠেলে দিতে চায় না, একটু তটস্থ রাখতে চায়। মধ্যবয়সী মানুষটি হেঁটে হেঁটে ঘরের মাঝখানে যেতে যেতে বলল, প্রতিদিন শীতল ঘর থেকে যে সব মানুষকে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে তাদের মাঝে যাদের বুদ্ধিমত্তা নিনীষ স্কেলে ছয় এর বেশি তাদেরকে এই ঘরে আনা হয়। মস্তিষ্ক স্ক্যান করার পদ্ধতিটি এখনো পুরোপুরি আয়ত্তে আনা হয় নি। মাঝে মাঝে ভুল করে বুদ্ধিমান মানুষের বুদ্ধিমত্তা নিনীষ স্কেলে ধরা পড়ে না। কিন্তু উল্টোটা কখনো হয় নি। যাদের বুদ্ধিমত্তা নিনীষ স্কেলে ছয়ের বেশি ধরা পড়েছে তারা কখনো নির্বোধ প্রমাণিত হয় নি। কাজেই এই ঘরে তোমরা যারা আছ তারা সবাই নিশ্চিতভাবে অত্যন্ত বুদ্ধিমান–আমার কাজ সে কারণে খুব সহজ।
সামনের দিকে বসে থাকা একজন তরল গলায় বলল, তোমার কাজটা কী?
আমার কাজ তোমাদেরকে তোমাদের পরবর্তী দায়িত্বের জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। তোমরা সবাই শীতলঘরে ঘুমিয়েছিলে এবং তোমাদের বলা হয়েছিল পৃথিবী নামক গ্রহটার কাছে পৌঁছানোর পর তোমাদের জাগিয়ে তোলা হবে। পৃথিবী এখনো অর্ধশতাব্দী বৎসর দূরে, তোমাদের এখনই জাগিয়ে তোলা হয়েছে, তার পিছনে নিশ্চয়ই একটা কারণ রয়েছে। কারণটা কী?
আমার পাশে বসে থাক ঝকঝকে চেহারার একটা মেয়ে বলল, আমাদের সেটা অনুমান করতে হবে?
না। মধ্যবয়স্ক মানুষটি মাথা নেড়ে বলল, সেটা তোমাদের অনুমান করতে হবে। এটি গোপন কিছু নয়, কিন্তু তুমি যেহেতু প্রশ্ন করেছ আমার একটু ব্যক্তিগত কৌতূহল হচ্ছে। তুমি কি কিছু অনুমান করছ?
মেয়েটি মাথা নাড়ল। বলল, হ্যাঁ।
আমরা কি সেটা শুনতে পারি?
অবশ্যি পার। আমার ধারণা সত্যিকার কারণটি যেন আমরা জানতে না পারি সেজন্যে তুমি আমাদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এখন মিথ্যে একটা কারণের কথা বলবে।
মেয়েটার কথা শুনে আমরা সবাই উচ্চঃস্বরে হেসে উঠলাম, মধ্য বয়স্ক মানুষটি হাসল সবচেয়ে জোরে। সে হাসতে হাসতেই বলল, এই মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণের পুরো ব্যাপারটি এত জটিল যে তোমার ধারণা সত্যি হবার পুরোপুরি সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমি তোমাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি, আমি তোমাদের যদি মিথ্যে একটা কারণের কথাও বলি সেটা সত্যি জেনেই বলব। মানুষকে যখন বিভ্রান্ত করার প্রয়োজন হয় তখন রবোটকে ব্যবহার করা হয়। আমি রবোট নই, জলজ্যান্ত মানুষ।
সামনের দিকে বসে থাকা একজন মানুষ বলল, ঠিক আছে, এখন তাহলে কারণটা শোনা যাক।
মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখ একটু গম্ভীর হয়ে আসে। সে কীভাবে কথাটা বলবে সম্ভবত সেটা মনে মনে একটু গুছিয়ে নিয়ে বলল, এই মহাকাশযানটি প্রায় এক শতাব্দী আগে যখন পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল তখন পরিকল্পনা করা হয়েছিল পৃথিবীর কাছাকাছি এসে আমাদের সবাইকে জাগিয়ে তোলা হবে। সে ভাবেই এই অভিযান শুরু হয়েছিল। বেশির ভাগ মহাকাশচারী শীতল ঘরে ঘুমিয়েছিল অল্প কিছু ক্রু পালা করে মহাকাশযানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছিল। তোমরা নিশ্চয়ই জান মহামতি গ্রাউল যখন এই মহাকাশযানটি তৈরি করেছিলেন তখন সেটিকে সৃষ্ট জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এটি মহকাশ পারাপার করতে পারে।
আমরা মাথা নাড়লাম, মহাকাশচারী হিসেবে এই মহাকাশযানে পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার জন্যে আমরা যারা স্বেচ্ছায় নাম লিখিয়েছিলাম তাদেরকে নানাভাবে এই তথ্যগুলি অনেকবার দেয়া হয়েছে। এই মহাকাশযানের পরিকল্পনা করেছিলেন গ্রাউল নামের একজন মানুষ, তাকে সবসময় মহামতি গ্রাউল বলা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে মহামতি গ্রাউল বিকলাঙ্গ, তার চোখ কান অন্যকোন ইন্দ্রিয় নেই, তিনি সরাসরি সংবেদন জাতীয় যন্ত্র দিয়ে বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি কোথায় থাকেন সেটি কেউ জানে না। তিনি কি বেঁচে আছেন না মারা গেছেন সেটিও কেউ জানে না। মহামতি গ্রাউল নিয়ে যে পরিমাণ রহস্যের জন্ম দেওয়া হয়েছে যে আমার মনে হয় পুরো ব্যাপারটি কাল্পনিক। গ্রাউল নামে কোনো মানুষ কখনো ছিল না। এটি কিছু প্রতিভাবান বিজ্ঞানী এবং কিছু শক্তিশালী কম্পিউটার জাতীয় যন্ত্রের একধরনের সুষম উপস্থাপন।
মধ্যবয়স্ক মানুষটি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এই অভিযানের প্রথম অংশটুকু ঠিক পরিকল্পনা মাফিক কেটেছে। কিন্তু যখন আমরা পৃথিবীর কাছাকাছি পৌঁছাতে শুরু করেছি হঠাৎ করে অবস্থার পরিবর্তন হল। পৃথিবী থেকে আমাদের কাছে কিছু সংবাদ পৌঁছাত শুরু করল।
আমার পাশে বসে থাকা ঝকঝকে চেহারার মেয়েটি বলল, কী ধরনের সংবাদ?
অত্যন্ত নিরীহ ধরনের সংবাদ। পৃথিবীর ফসল তোলা হচ্ছে। পানি সরবরাহ করার জন্যে মেরু অঞ্চলের বরফ গলানো হচ্ছে। আয়োনোস্ফিয়ারে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। নূতন ধরনের আন্তঃগ্যালাক্টিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হচ্ছে এই ধরনের সংবাদ। আপাত দৃষ্টিতে এই সংবাদগুলির মাঝে এতটুকু বৈচিত্র নেই। কিন্তু মহাকাশযানের তথ্য বিশ্লেষণের যে সমস্ত উপায় রয়েছে সেগুলির মাঝে এই
তথ্যগুলি সরবরাহ করে একটি অত্যন্ত বিচিত্র জিনিস আবিষ্কার করা হয়েছে।
মধ্যবয়স্ক মানুষটি ইচ্ছে করে এক মুহূর্তের জন্যে থামল এবং বেশ কয়েকজন এক সাথে জিজ্ঞেস করল, কী জিনিস?
দেখা গেছে সমস্ত পৃথিবী একটা ভয়াবহ গোলযোগের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর মানুষেরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। একে অন্যকে কীভাবে ধ্বংস করবে সেটাই হচ্ছে সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য।
পিছনের দিকে বসে থাকা বুড়ো মতো একজন মানুষ বলল, আমি তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না–নিরীহ কিছু সংবাদ থেকে সেটা কেমন করে বোঝা সম্ভব?
আমার পাশে বসে থাকা মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল, সম্ভব হতে পারে। যদি দেখা যায় একটি ঘটনা ঘটছে অন্য আরেকটি ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে আর সেই ঘটনাগুলি একটি আরেকটাকে সাহায্য না করে ক্ষতি করছে–
মধ্য বয়স্ক মানুষটি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। যেমন ধরা যাক ফসল কাটার ব্যাপারটি। ঠিক ফসল কাটার সময় যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় আর সেই দুর্যোগটি যদি হয় ইচ্ছাকৃত–তাহলে আমাদের সন্দেহ করার কারণ রয়েছে। এমনিতে আমাদের কাছে সেই তথ্যগুলি অর্থহীন কিন্তু যদি সেগুলি বিশ্লেষণ করা যায় তখন সেগুলি হঠাৎ করে খুব অর্থবহ হয়ে ওঠে।
আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মধ্যবয়স্ক মানুষটির দিকে তাকিয়েছিলাম। হঠাৎ করে আমার মনে হল আমি একটু একটু বুঝতে পারছি সে কী বলতে চাইছে। একটু ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত গলা উচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এই মহাকাশযান যারা নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের ধারণা আমরা এই পৃথিবীতে বাস করার অনুপযুক্ত?
মধ্যবয়স্ক মানুষটি আমার প্রশ্ন শুনে খুব অবাক হয়ে গেল, কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কী ধারণা পৃথিবীতে মানুষেরা যেরকম হানাহানি করেছ আমাদের এই মহাকাশযানে ঠিক সেরকম হানাহানি শুরু করতে হবে, যেন আমরা যখন পৃথিবীতে পৌঁছাব তখন কী করতে হবে আমাদেরকে বলে দিতে হবে না?
মধ্যবয়স্ক মানুষটি আমতা আমতা করে বলল, তুমি কথাগুলি বলেছ খুব রুঢ় ভাবে কিন্তু কথাটি সত্যি। আমি একটু অন্যভাবে বলতে যাচ্ছিলাম।
আমার পাশে যে মেয়েটি বসেছিল সে আমার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়েছিল, এবারে মধ্যবয়স্ক মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কীভাবে বলতে যাচ্ছিলে?
আমি বলতে চাইছিলাম যে আমরা যে গ্রহ থেকে এসেছি সেই গ্রহে একটা নূতন ধরনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যে কারণেই হোক আমাদের গ্রহে একজন মানুষ অন্য মানুষকে অনেক বেশি বিশ্বাস করে, আমরা একে অন্যের উপরে অনেক বেশি নির্ভরশীল। আমরা যখন পৃথিবীতে পৌঁছাব পৃথিবীর সমাজ ব্যবস্থায় নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারব না। অপরিচিত অবস্থার সাথে যুদ্ধ করে আমাদের সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত হয়ে যাবে–
আমি মধ্যবয়স্ক মানুষটির দিকে তাকিয়ে নিজের ভিতরে এক ধরনের ক্রোধ অনুভব করতে থাকি। এই মানুষটি যে কথাগুলি বলছে সেগুলি অর্থহীন কথা, কখনো কাউকে বিভ্রান্ত করতে হলে এই ধরনের কথা বলতে হয়। কেন সে আমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইছে? আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, সে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, আমরা যে সমাজ-ব্যবস্থা থেকে এসেছি সেখানে কোনো নেতৃত্ব নেই। আমাদের কার কী দায়িত্ব নিখুতভাবে ব্যাখ্যা করা আছে–সবাই নিজের দায়িত্ব পালন করে যাই এবং পুরো সমাজ ব্যবস্থা এগিয়ে যায়। এই মুহূর্তে যে পৃথিবী আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে সেখানে সমাজ-ব্যবস্থা অন্যরকম। সেখানে সমস্যার জন্ম হলে একজনকে নেতৃত্ব নিয়ে তার সমাধান করতে হয়। আমাদের পৃথিবীতে যাবার আগে সেটা শিখতে হবে।
আমি শীতল গলায় বললাম, সেটা আমরা কীভাবে শিখব?
মধ্যবয়স্ক মানুষটিকে কেমন যেন অসহায় দেখায়, সে একধরনের ক্লান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, খুব সহজে। এই মহাকাশযানের যে নিয়ন্ত্রণটুকু ছিল সেটা সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
কী বললে?
হ্যাঁ। এই বিশাল মহাকাশযান, এর দশ হাজার অধিবাসী প্রায় আঠাইশটি ভিন্ন ভিন্ন স্তর, বায়ুমণ্ডল পরিশোধণের ব্যবস্থা, কৃত্রিম মহাকর্ষ বল, জৈবিক বিভাগ, শক্তি সঞ্চয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা সবকিছু এখন আলাদা আলাদাভাবে কাজ করছে। কিন্তু এর যে সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণটুকু ছিল সেটা প্রায় দশ বছর আগে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এই মহাকাশযানটি, এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে মহাকাশের ভেতর দিয়ে বিশাল একটা উপগ্রহের মতো ছুটে যাচ্ছে। আমাদের এখন এর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। দশ হাজার মানুষের জন্যে সেটি প্রায় এক শতাব্দীর কাজ। আমাদের এত সময় নেই। আমাদের সেটা অর্ধ শতাব্দীর মাঝে শেষ করতে হবে। সেটি করার একটি মাত্র উপায়
মধ্যবয়স্ক মানুষটি হঠাৎ করে চুপ করে গেল, সে আশা করছিল আমরা কিছু বলব, কিন্তু আমরা কেউ কিছু বললাম না। মানুষটি কয়েকমুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, আমাদের সেটি করার একমাত্র উপায় হচ্ছে নিজেদের মাঝে এক ধরনের নেতৃত্ব সৃষ্টি করে কাজ শুরু করা। সেজন্যে শীতল ঘর থেকে সবাইকে জাগিয়ে তোলা শুরু হয়েছে।
আমি অনেক কষ্ট করে এতক্ষন নিজেকে শান্ত করে রেখেছিলাম এবারে আর পারলাম না। উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ক্রোধকে গোপন করার এতটুকু চেষ্টা না করে বললাম, তুমি কে আমি জানি না। কেন তুমি এখানে এসেছ তাও আমি জানি না কিন্তু আমার কাছে থেকে শুনে রাখ, আমি তোমার একটা কথাও বিশ্বাস করি না। তুমি কার নির্দেশে এইসব বলছ আমি জানি না, আমার জানার এতটুকু ইচ্ছেও নেই। আমি শীতল ঘরে ফিরে যাচ্ছি, পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগে তুমি যদি আবার আমাকে জাগিয়ে তোলো আমি পরিস্কার ভাবে বলে দিচ্ছি সেটা তোমার জন্যে ভাল হবে না।
মধ্যবয়স্ক মানুষটি হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল, সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না যে কেউ এভাবে তার সাথে কথা বলতে পারে। বার কয়েক চেষ্টা করে সে আবার কিছু একটা বলতে শুরু করল কিন্তু আমার আর শোনার ইচ্ছে হল না, লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম।
বাইরে দাঁড়িয়ে আমি কয়েকবার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলাম। শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ানো গেলে নাকী রাগ কমে আসে। এত তাড়াতাড়ি এভাবে রেগে গেলাম কেন কে জানে। মানুষটি মিথ্যে কথা বলছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু তার জন্যে সে নিশ্চয়ই দায়ী নয়। আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বাইরে তাকালাম, যতদূর চোখ যায় একটা ধু ধু প্রান্তরের মতো, এর পুরোটা মানুষের তৈরী এখনো আমার বিশ্বাস হয় না।
আমি সামনে নেমে যাচ্ছিলাম ঠিক তখন পিছন থেকে একজন আমাকে ডাকল, কিহা!
আমি ঘুরে তাকালাম, আমার পাশে বসে থাকা ঝকঝকে চেহারার মেয়েটি আমার দিকে ছুটে আসছে। কাছে এস আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, আমার নাম লেন। তুমি সত্যি শীতল ঘরে ঘুমাতে যাচ্ছ?
আমি মেয়েটা দিকে তাকালাম, কী চমৎকার চেহারা মেয়েটির, যে জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ার মেয়েটার চেহারা ডিজাইন করেছে তার রুচিবোধের তুলনা হয় না।
আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি সত্যিই শীতল ঘরে ঘুমাতে যাচ্ছি।
তুমি ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে চাও না?
না।
কেন?
কারণ আমি জানি এই মহাকাশযান বিশাল একটা প্রজেক্ট। যে কোনো মূল্যে এটাকে সমাপ্ত করা হবে–আমি সাহায্য করি আর নাই করি। এই মুহূর্তে পুরো ব্যাপারটির মাঝে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র রয়েছে। বড় ধরনের নোংরামি। আমার নোংরামি ভাল লাগেনা। আমার ধারণা ছিল কয়েক হাজার বছর আগে জিনেটিক ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের ভেতর থেকে সব নোংরামো সরিয়ে নিয়েছে।
লেন খিলখিল করে হেসে ফেলল, বলল, তুমি একেবারে ছেলেমানুষ! তুমি সত্যিই বিশ্বাস কর জিনেটিক ইঞ্জিনিয়াররা ভাল মানুষ তৈরি করছে?
আমি লেনের দিকে তাকিয়ে বললাম, তারা যে ভাল চেহারার মানুষ তৈরি করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই!
চেহারা তৈরি করা সহজ! আমি আমার জিনেটিক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখেছি। তাদের হিসেব অনুযায়ী আমি খুব উন্নত ধরনের মানুষ। কিন্তু তুমি শুনলে অবাক হয়ে যাবে আমার মাঝে মাঝে কী জঘন্য ধরনের কাজ করার ইচ্ছে করে!
যেরকম?
মেয়েটি মাথা নাড়ল, সেগুলি তোমাকে বলা যাবে না! তুমি শুনলে আমাকে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেবে।
অন্যায় কাজ করার ইচ্ছে করা আর অন্যায় করা এক জিনিস নয়। ফ্যান্টাসি গ্রহণযোগ্য জিনিস।
লেন হাত নেড়ে বলল, সেটা নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করতে পারব, এখন কাজের কথা বলা যাক। তুমি সত্যিই শীতল ঘরে যেতে চাইছ?
তুমি দ্বিতীয়বার প্রশ্নটা করলে। ব্যাপার কী?
আমি তোমার সাথে একমত যে আমাদের সাহায্য ছাড়াই এই মহাকাশযান পৃথিবীতে পৌঁছে যাবে। যারা এটা নিয়ন্ত্রণ করছে এটা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু এই যে নেতৃত্বের ব্যাপারটা–
আমি অবাক হয়ে লেনের দিকে তাকালাম, নেতৃত্বের কোনো ব্যাপারটা?
লেন মনে হল একটু লজ্জা পেয়ে গেল। একটু ইতস্তত করে বলল, এই যে নেতৃত্বের কথা বলছে সেটা নিয়ে আমার খুব কৌতূহল। আমার খুব জানার ইচ্ছে যে মানুষ যদি খুব উচ্চাকাক্ষী হয় তাহলে সত্যিই কি স্বার্থপর হয়ে যায়? নিজের সিদ্ধান্ত সেটা ভাল হোক আর খারাপ হোক অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়? অন্যেরাও
সেটা মুখ বুজে মেনে নেয়?
আমি মাথা নাড়ালাম, নিশ্চয়ই তাই হয় লেন।
এখানেও কি তাই হচ্ছে?
আমার মনে হয় হচ্ছে। গত দশ বছর থেকে এখানে মানুষকে শীতল ঘর থেকে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। তাদেরকে বলা হচ্ছে নেতৃত্ব দিতে। কাজেই আমি নিশ্চিত এই মহাকাশযানটা এখন ছোট ছোট অংশে ভাগ হয়ে গেছে। প্রত্যেকটা অংশে একজন করে নেতা রয়েছে। তারা সবাই আরো বড় অংশের নেতৃত্বের জন্যে যুদ্ধ করছে।
যুদ্ধ?
হ্যাঁ। হয়তো সত্যিকার অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ নয়। কৌশল দিয়ে যুদ্ধ। ছল চাতুরী দিয়ে যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধ নিশ্চয়ই হচ্ছে।
লেনের চোখ চকচক করতে থাকে। সে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, আমি ব্যাপারটা দেখতে চাই।
আমার মনে হয় ব্যাপারটা কুৎসিত। প্রাচীন কালে মানুষের নেতৃত্বের প্রয়োজন। ছিল। মানুষ যত উন্নত হয়েছে নেতৃত্বের প্রয়োজন তত কমে এসেছে। এখন আসলে নেতৃত্বের কোনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু এই মহাকাশযানে তো নেতৃত্বের প্রয়োজন তৈরি করা হয়েছে।
এটা কৃত্রিম। আমার ধারণা কেউ একজন আমাদের নিয়ে একটা পরীক্ষা করছে। ভয়ংকর একটা পরীক্ষা।
লেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি দেখতে চাই পরীক্ষা কেমন ভাবে করা হয়। কেমন জানি একটা কৌতূহল। হয়তো দূষিত কৌতূহল, কিন্তু কৌতূহল।
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, কৌতূহল কখনো দূষিত হয় না লেন। কৌতূহল অনাবশ্যক হতে পারে, কিন্তু দূষিত নয়।
লেন আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমার কোনো কৌতূহল নেই?
আমি মাথা নাড়লাম, না। নেই। আমি শীতল ঘরে গিয়ে আবার ঘুমিয়ে যেতে চাই। শান্ত নিরুপদ্রব ঘুম। আমি জেগে উঠতে চাই পৃথিবীতে। আমার জীবনীশক্তি আমি এই মহাকাশযানে অপচয় করতে চাই না। আমি সেটা পৃথিবীর জন্যে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।
লেন কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি প্রথমবার লক্ষ করলাম তার চোখ দুটি আশ্চর্য রকম নীল–ঠিক পৃথিবীর মতো।
মহাকাশযানের এই অংশটুকু আমার কেমন জানি চেনা-চেনা মনে হল। মাঝে মাঝে হঠাৎ করে কোনো অচেনা জায়গাকে চেনা-চেনা মনে হয় এর কারণ কী কে জানে। বিশাল এই মহাকাশযানটি আক্ষরিক অর্থে একটি বিরাট উপগ্রহের মতো, এর অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি ভগ্নাংশ আমি দেখেছি, আমার স্মৃতি ভাল নয় যেটুকু দেখেছি সেটুকুও ভাল মনে নেই, কাজেই আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে এই জায়গাটি আমি আসলে আগে কখনো দেখি নি।
জায়গাটি আমি কি দেখেছি না দেখিনি যখন এই অর্থহীন ভাবনাটি আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ঠিক তখন আমি অনুভব করলাম আমার কজিতে বাঁধা ছোট কমিউনিকেশান্স মডিউলটাতে কেউ একজন আমার তথ্যগুলি যাচাই করে দেখছে। আমার মৌখিক অনুমতি ছাড়া সেটি করার কথা নয়, কাজটি ঘোরতর অন্যায়। আমি হাত দিয়ে স্পর্শ করে কমিউনিকেশান্স মডিউলটি বন্ধ করতে গিয়ে থেমে গেলাম। এই মহাকাশযানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে থাকলে সবচেয়ে প্রথমে এই কাজটি করার কথা–অন্য মানুষকে যাচাই করে দেখা। কেউ একজন আমাকে যাচাই করে দেখছে। সেটি বন্ধ করে দিলে তার কৌতূহল বা সন্দেহ বেড়ে যাবে যার ফল আমার জন্যে ভাল নাও হতে পারে। আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে কৌতূহলী চোখে চারিদিকে তাকাতে থাকি। আমার সামনে বেশ কিছু চতুষ্কোণ পাথর সাজানো আছে, ডানদিকে একটা দালানের মতো উঠে গেছে। পেছনে বড় করিডোর। বাম দিকে বেশ খানিকটা উন্মুক্ত জায়গা। আশে পাশে কোথাও কোনো মানুষ রবোট বা অন্যকোন ধরনের যানবাহন নেই। যেই আমাকে যাচাই করে দেখছে সে কাজটি করছে গোপনে। আমি মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, মানুষ কী বিচিত্র একটি প্রজাতি, কত সহজে তাদেরকে সাময়িকভাবে কলুষিত করে দেয়া যায়। আমি যখন যোগাযোগ মডিউলে কথা বলব না কী পুরো ব্যাপারটা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাব ঠিক করতে পারছিলাম না, তখন দেখতে পেলাম চতুষ্কোণে পাথরের আড়াল থেকে দুজন মানুষ দ্রুত পায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। মানুষ দুজনের হাতে কালচে বিদঘুটে জিনিসগুলি যে কোনো ধরনের অস্ত্র সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
মানুষ দুজন আমার দুপাশে দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে আমার দুই হাত ধরে ফেলল। আমি ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম তাদের গায়ে যন্ত্রের মতো জোর–সম্ভবত তারা মানুষ নয়, রবোট। আমি নিজেকে যেটুকু সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললাম, আমাকে ছেড়ে দাও।
নিনীষ স্কেলে যার বুদ্ধিমত্তা আটের উপরে তাকে আমরা এমনি ছেড়ে দেব? আমাদের দেখে কি এত বড় নির্বোধ মনে হয়?
আমি মানুষগুলির চেহারা খুব ভাল করে দেখি নি, কিন্তু যেটুকু দেখেছি তাদের বেশ নিবোধই মনে হচ্ছিল যদিও সেটা এখন জোর গলায় বলার সাহস হল না। মানুষ দুজন আমাকে টেনে-হিচড়ে নিয়ে যেতে থাকে, আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে-করতে বললাম, আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? কী করবে আমাকে দিয়ে?
বিক্রি করব।
বিক্রি করবে? কার কাছে?
যে ভাল দাম দেবে।
আমি মানুষ দুজনকে মুখের দিকে তাকালাম, তারা সত্যি কথা বলছে নাকি আমার সাথে রসিকতা করছে বোঝার চেষ্টা করলাম, ভাবলেশহীন মুখে কোনো ধরনের অনুভূতি নেই, সম্ভবত সত্যি কথাই বলছে। এই মহাকাশযানে এর মাঝে বুদ্ধিমান মানুষ কোননাবেচা শুরু হয়ে গেছে আমার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে তোমরা কিসের বিনিময়ে বিক্রি করবে?
মানুষ দুজনই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। একজন বলল, সত্যি তুমি জান না?
না। আমি আজকেই শীতল ঘর থেকে বের হয়েছি। নিনীষ স্কেলে আট-এর মানুষ এখন বারো পয়েন্টে বিক্রি হচ্ছে। ছয় পয়েন্টে এক স্তর উপরে উঠা যায়। প্রতি স্তরে রয়েছে–
লোকটি তার কথা শেষ করার আগেই আমার কানের কাছে দিয়ে শিসের মতো শব্দ করে কী একটা ছুটে গেল, পর মুহূর্তে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হল। মানুষ দুজন আমাকে নিয়ে সাথে সাথে বড় একটা পাথরের পাশে হুঁমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। আমি পাথরের আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখলাম। দেখতে পেলাম মানুষ দুজন তাদের অস্ত্র উপরে তুলে প্রচণ্ড কর্কশ শব্দে গুলি করতে শুরু করেছে। তীব্র আলোর ঝলকানিতে চারিদিকে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, বিস্ফোরণের শব্দ ধোয়া এবং ধুলোবালিতে চারিদিকে অন্ধকার হয়ে আসে। আমি এরকম পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়ি নি এবং এরকম পরিস্থিতিতে কী করতে হয় সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। প্রচণ্ড আতংকে হতচকিত হয়ে উঠে দৌড়ানোর একটা অদম্য ইচ্ছাকে অনেক চেষ্টা করে চেপে রেখে আমি মাথা নিচু করে শুয়ে রইলাম।
আমার কানের কাছে একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হল এবং আমি মাথা তুলে দেখতে পেলাম আমার পাশে উবু হয়ে শুয়ে থাকা একজন মানুষের শরীরের অর্ধেক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে উড়ে গেছে এবং শরীরের ছিন্ন-ভিন্ন অংশ থেকে কিছু পোড়া তার, ধাতব যন্ত্রপাতি আর ঝলসে যাওয়া পলিমার বের হয়ে আছে এবং সেখান থেকে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। আমি যাদেরকে মানুষ ভেবেছিলাম সেগুলি নিচু স্তরের রবোট ছাড়া আর কিছু নয়। রবোটটি সেই অবস্থাতে তার অস্ত্র দিয়ে কর্কশ শব্দ করে গুলি করে যেতে থাকে।
কিছুক্ষণের মাঝে বেশ কয়েকজন এসে আমাদের ঘিরে ফেলল, দেখে তাদের মানুষ মনে হলেও খণ্ডযুদ্ধে উড়ে যাওয়া অংশ থেকে ধাতব যন্ত্রপাতি বের হয়ে রয়েছে বলে সেগুলি যে রবোট সে সম্পর্কে আমার কোনো সন্দেহ রইল না। দুজন নিচু হয়ে আমাকে টেনে তুলে নিল, তৃতীয়টি তার হাতের অস্ত্র দিয়ে পড়ে থাকা বাকি রবোটটিকে প্রায় পুরোপুরি ভাস্মীভূত করে ফেলল। আমি নিশ্চিতভাবে জানি এরা দেখতে মানুষের মতো হলেও কেউই আসলে মানুষ নয় এবং একজন আরেকজনকে যেরকম সহজে ধ্বংস করে ফেলছে সেটি সত্যিকার অর্থে নৃশংসতা নয় কিন্তু তবু আমার সারা শরীর গুলিয়ে আসতে থাকে।
রবোটগুলি হাতের অস্ত্রগুলি তাক করে আমাকে ঘিরে এগিয়ে যেতে থাকে। আমি কষ্ট করে নিজেকে শান্ত করে এনে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
একটি রবোট ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে যান্ত্রিক ভাষায় কিছু শব্দ উচ্চারণ করল, আমি তার কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি মাথা নেড়ে বললাম, তুমি কী বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
রবোর্টটি কোনো কথা না বলে আমার দিকে তার হাতটা বাড়িয়ে দেয়, তার দুই আঙুল থেকে সুচালো দুটি ইলেকট্রন্ড বের হয়ে আসে, আমি কিছু বোঝার আগেই সেগুলি আমার কপাল স্পর্শ করল, আমি ভয়ংকর একটা ইলেকট্রিক শক অনুভব করলাম এবং সাথে সাথে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল।
আমার যখন জ্ঞান ফিরে এল আমি আবিষ্কার করলাম আমি উপুড় হয়ে শীতল একটা পাথরের মেঝেতে শুয়ে আছি। মাথায় চিনচিনে একটা ব্যথা। আমি সাবধানে মাথা তুলে তাকালাম–অন্ধকার একটা ঘর, মনে হল সেখানে আরো কিছু মানুষ আছে। আমি মাথা ঘুরিয়ে তাকানোর চেষ্টা করতেই ঘরের কোণা থেকে একজন মানুষ আমার দিকে এগিয়ে এসে নরম গলায় বলল, তুমি এখনো বেঁচে আছ? আমি ভেবেছিলাম মরে গেছ।
আমি উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বললাম, না, এখনো মরি নি। আমরা কোথায়?
মহাকাশযানের সবচেয়ে বড় দস্যুদলের হাতে বন্দী।
বন্দী?
হ্যাঁ।
কেন?
মানুষটি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল, যদি বুদ্ধিমত্তা নিনীষ স্কেলে ছয়ের বেশি হয় তোমাকে স্থানীয় কোনো নেতার কাছে বিক্রি করে দেবে।
যদি না হয়?
তাহলে কপাল খারাপ। শুনেছি শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে কেটে বিক্রি করে। শক্তিশালী হৃদপিণ্ড নাকি খুব ভাল দামে বিক্রি হচ্ছে। নিনীষ স্কেলে তোমার বুদ্ধিমত্তা কত?
আট।
আট! মানুষটা শিস দেওয়ার মতো একটা শব্দ করে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, এত যদি তোমার বুদ্ধি তাহলে এই গাড়ায় এসে হাজির হলে কেমন করে?
আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম, যন্ত্রপাতি কাউকে বুদ্ধিমান বললেই সে বুদ্ধিমান হয়ে যায় না। আমি বেশির ভাগ ব্যাপারে একেবারে নিবোধ।
সে ব্যাপারে আমর কোনো সন্দেহ নেই! মানুষটা নির্মমভাবে তার গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, আমার বুদ্ধিমত্তা যদি নিনীষ স্কেলে ছয়ও হতো আমি অর্ধেক মহাকাশযান দখল করে ফেলতাম।
আমি মানুষটার চোখের দিকে তাকালাম, সে চোখ সরিয়ে হেঁটে ঘরের অন্যপাশে চলে গেল। একটু পরে শুনতে পেলাম সে গুন গুন করে বিষণ একটা সুরে গান গাইছে–অকারণেই আমার মন খারাপ হয়ে গেল।
আমি দীর্ঘ সময় একা একা ঘরের কোণায় বসে রইলাম। শীতল ঘর থেকে বের হবার পর দীর্ঘ সময় খাবার খেতে হয় না, যদি তা না হতো তাহলে এতক্ষণে আমি নিশ্চয়ই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে যেতাম। কিছু একটা ঘটার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে আমি যখন হাল ছেড়ে দিচ্ছিলাম তখন হঠাৎ দরজা খুলে গেল। রাগী চেহারার কম বয়স্ক একজন মানুষ দুই পাশে দুইজন সশস্ত্র রবোট নিয়ে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের মাঝে কিহা কে?
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আমি। কেন কী হয়েছে?
রাগী চেহারার মানুষটি আমার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল, হাতে কমিউনিকেশান্স রিডারে আমার তথ্যগুলি ভাল করে মিলিয়ে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আমার সাথে চল।
কোথায়?
তোমাকে আমরা মিয়ারার কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
মিয়ারা? সেটা কে?
রাগী চেহারার মানুষটা শুষ্ক স্বরে হেসে উঠে বলল, বলতেই হবে তুমি খুব সৌভাগ্যবান মানুষ যে মিয়ারার নাম শুন নি! দশ বছরের মাঝে এই মেয়ে মানুষটি যদি পুরো মহাকাশযানটা দখল করে না নেয় তাহলে আমার মাথা কেটে সেখানে একটা কপোট্রন বসিয়ে দিও!
আমি কোনো কথা না বলে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে তার কাপড়ের মাঝে হাত ঢুকিয়ে চোখ-ঢাকা একটা হেলমেট বের করে এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এটা মাথায় পরে নাও, তোমাকে কোথায় নিচ্ছি দেখতে দিতে চাই না।
আমি অত্যন্ত খেলো ধরনের হাস্যকর এই হেলমেটটি পরে নিতেই আমার চোখের সামনে সবকছুি পাল্টে গেল, আমি মানুষটি এবং রবোট দুটিকে এখনও দেখতে পাচ্ছিলাম কিন্তু বাকি সব কিছু পাল্টে গিয়ে সেখানে অতিপ্রাকৃত বিচিত্র সব দৃশ্য খেলা করতে থাকে। আমার সামনে বিচিত্র ধরনের রাস্তাঘাট, দেয়াল এবং ধুধু প্রান্তর আসা-যাওয়া করতে থাকে, আমি জানি তার সবই কাল্পনিক এবং এই পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে খারাপ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আমি তাই সাবধানে মানুষটির পিছনে পিছনে হাঁটতে থাকি। দীর্ঘ পথ পায়ে হেটে আমি এক ধরনের গাড়িতে উঠে বসলাম, সেটি খুব নিচু দিয়ে উড়ে গেল এবং সব শেষে বিশাল একটা দালানের সামনে আমাদের নামিয়ে দিল। সেখানে খানিকক্ষণ কথা বার্তা হল যার কিছুই আমি বুঝতে পারলাম না। একসময় গোলাকার একটা দরজা খুলে গেল এবং আমি আরেকজন মানুষের পিছু পিছু হেঁটে এবং ভাসমান আসনে করে একটা ঘরে এসে প্রবেশ করলাম। ঘরটিতে আরো একজন মানুষ বসেছিল, হেলমেটে বসানো চোখের আবরণের কারণে মানুষটিকে অত্যন্ত বিচিত্র দেখাতে থাকে কিন্তু তাকে ভাল করে দেখার জন্যে আমি নিজে থেকে হেলমেটটি খোলার সাহস পাচ্ছিলাম না।
কিহা, তুমি তোমার হাস্যকর হেলমেটটি খুলে ফেলতে পার। আমি একজন মেয়ের গলার আওয়াজ শুনে চমকে উঠি–এই কি তাহলে মিয়ারা? সাবধানে হেলমেটটি খুলতেই চোখের সামনে একটা আলোকোজ্জল ঘর বের হয়ে এল। ঘরটি প্রাচীনকালের একটি অফিসঘরের মতো করে সাজানো এবং বিশাল একটা কালো টেবিলের পিছনে ধাতব রঙের রুপালি চুলের একটি মেয়ে বসে আছে। সুন্দরী বলতে যা বোঝায় এই মেয়েটি তা নয় কিন্তু তার ভেতরে এক ধরনের আদিম সৌন্দৰ্য্য লুকিয়ে আছে। মেয়েটি তার ঝকঝকে ধারালো চোখে আমার। দিকে তাকিয়ে বলল, কিহা, তুমি বসতে পার।
আমি সাবধানে একটা আরামদায়ক চেয়ারে বসতেই আমার শরীরের ভিতর দিয়ে স্বল্প কম্পনের একটি তরঙ্গ আসা যাওয়া করতে থাকে এবং এক ধরণের আরামে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়। মেয়েটি হাসি হাসি মুখে বলল, ব্যাপারটি প্রায় অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্যি তুমি আমাকে চেনো না। আমি মিয়ারা–
আমি মাথা নেড়ে বললাম, তোমার সাথে পরিচিত হয়ে সুখী হলাম মিয়ারা।
মিয়ারা শব্দ করে হেসে বলল, তুমি আসলে সুখী হও নি কিহা। ভদ্রতার জন্যে অবশ্যি এই ধরনের একটি দুটি কথা আমি শুনতে রাজি আছি। তবে এমনিতে আমি স্পষ্ট কথা বলতে এবং শুনতে ভালবাসি।
চমৎকার। আমি গলার স্বর এতটুকু উঁচু না করে বললাম, আমি তোমাকে স্পষ্ট করেই বলে দিই। আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আমি পৃথিবীতে না পৌঁছানো পর্যন্ত শীতলঘরে গিয়ে ঘুমাতে চাই।
মিয়ারার মুখ হঠাৎ কঠিন হয়ে আসে এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি হঠাৎ আমি বুকের ভিতরে ভয়ের এক ধরনের কাঁপুনি অনুভব করি। মিয়ারা জিভ দিয়ে তার রঙ করা টকটকে লাল ঠোটকে ভিজিয়ে বলল, কার কোথায় কতটুকু অধিকার সেটা একেক সময় একেকভাবে ঠিক করা হয়। এখন আমার আওতার মাঝে যারা আছে তাদের জন্যে আমি ঠিক করছি। তোমার বুদ্ধিমত্তা নিনীষ স্কেলে আট–আমার থেকে এক মাত্রা বেশি, কাজেই আমি অহেতুক সময় নষ্ট না করে সোজাসুজি কাজের কথায় চলে আসি। মিয়ারা আমার উপর থেকে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলল, তোমাকে আমি একটি সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দিতে চাই। আমি আশা করছি তুমি স্বেচ্ছায় সেটা সমাধান করবে।
যদি না করি?
মিয়ারা আমার দিকে তাকিয়ে সহৃদয় ভাবে হেসে বলল, অবশ্যি করবে। কারণ যদি না কর তাহলে তোমার খুলি থেকে মস্তিষ্কটি বের করে সেটাকে একটা সাইবার কন্ট্রোলে ব্যবহার করা হবে। কিছুক্ষণ হল সেই কাজে দক্ষ একটা রবোটকে আমি অনেক দাম দিয়ে কিনেছি–তার নাকি এই ধরনের একটা অস্ত্রোপাচার করার জন্যে হাত নিশপিশ করছে!
আমি স্থির দৃষ্টিতে মিয়ারার দিকে তাকালাম, মিয়ারা চোখ ফিরিয়ে না নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে ক্লান্ত গলায় বললাম, কেন তোমরা এসব করছ মিয়ারা?
মিয়ারা কোনো কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি নিচু গলায় বললাম, তুমি নিশ্চয়ই বলবে যে তুমি যদি না কর সেটা অন্য একজন করবে। তুমি যদি একজনকে ক্রীতদাস হিসেবে কিনে না আন তাহলে অন্য কেউ তোমাকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেবে
মিয়ারা আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল–আমি মাথা নেড়ে বললাম, না। তুমি কেন দেখতে পাচ্ছ না যে এটা একটা খেলা। কেউ একজন তোমাদের নিয়ে খেলছে।
মিয়ারা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ। আমি জানি। কিন্তু এই খেলার কোনো দর্শক নেই কিহা। সবাই খেলোয়াড়। তোমাকেও খেলতে হবে। তুমি পাশের ঘরে যাও। তোমাকে বায়ো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কিছু উত্তেজক সিরাম দেয়া হবে, তোমাকে দেখে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে, এখানে ক্লান্তির কোনো সময় নেই কিহা। ক্লান্ত হলেই পিছিয়ে পড়তে হয়–পিছিয়ে পড়লেই শেষ।
আমি মিয়ারার দিকে তাকালাম, তার পাথরের মতো চোখে কোনো রকম ভাবালুতা নেই। পরিবেশ কী দ্রুতই না মানুষকে পাল্টে দিতে পারে!
আমি দরজার সামনে দাড়াতেই দরজাটা খুলে গেল। ভিতরে আবছা অন্ধকার, আমি মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই একজন আমার দিকে ছুটে এল। এলোমেলো চুলের একটি ভয়ার্ত মেয়ে। মেয়েটি কাঁপা গলায় বলল, কি তোমাকেও এনেছে?
আমি আবছা অন্ধকারে মেয়েটিকে ভাল করে দেখার চেষ্টা করতে করতে বললাম, কে?
আমি লেন।
লেন, তুমি? আমার আরো কিছু একটা বলার ইচ্ছে হচ্ছিল কিন্তু কী বলব কিছুতেই ভেবে বের করতে পারলাম না।
চতুর্থ প্রজাতির একটি রবোট আমার এবং লেনের কাছে এসে মাথা নুইয়ে সম্মান প্রদর্শন করে বলল, আমার নাম ত্রিনি। আপনাদের দুজনের দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করার জন্যে আমাকে পাঠানো হয়েছে।
আমি ত্রিনির দিকে এক নজর তাকিয়ে বললাম, আমাকে আর লেনকে এই মাত্র রিটালিন-৪০০ দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের জন্যে আমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকবে না। ঘুম পাবে না–এমন কী বাথরুমেও যেতে হবে না। দৈনন্দিন কাজের বাকি থাকল কী?
ত্রিনি আবার মাথা নুইয়ে বলল, আপনাদের দুজনকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেটা পালন করার জন্যে আপনাদের নানা ধরনের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে–
তোমাদের মূল তথ্যকেন্দ্রে আমাকে নিয়ে গেলেই আমি নেটওয়ার্ক দিয়ে সব তথ্য পেয়ে যাব। তোমাকে আমাদের প্রয়োজন হবে না। তুমি যেতে পার তিনি। একটি রবোট আমার কাছে ঘুর ঘুর করলে আমার ভাল লাগে না।
মহামান্য কিহা, রবোটের সাহচর্য আপনার ভাল লাগে না শুনে আমি দুঃখিত। কিন্তু
তুমি মোটেও দুঃখিত নও তিনি। চতুর্থ প্রজাতি রবোট দুঃখ অনুভব করতে পারে না। তুমি সোজাসুজি সত্যি কথাটি বলে ফেল।
ত্রিনি এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বলল, আমাকে আপনাদের নিরাপত্তার জন্যে রাখা হয়েছে। এখান থেকে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে আপনারা যেন কোনোভাবে নিজেদের বিপদগ্রস্ত না করেন–
লেন শব্দ করে হেসে বলল, তুমি আমাদের চোখে চোখে রাখবে যেন আমরা পালিয়ে না যাই?
আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন মহামান্যা লেন। মহামান্যা মিয়ারার এই আবাসস্থলটি অদৃশ্য লেজার রশ্মি এবং শক্তি-বলয় দিয়ে প্রতিরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এখানে প্রবেশ করতে চাইলে কিংবা বের হতে চাইলে আপনাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
লেন আমার দিকে তাকাল, এখনো সে ব্যাপারটি বুঝতে পারছে না। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ত্রিনির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বলতে চাইছ–তুমি একজন চতুর্থ প্রজাতির রবাট আমাদের মতো দুজন মানুষকে আটকে রাখতে পারবে?
আপনাদের শারীরিক ভাবে আটক রাখাই যথেষ্ট। আপনাদের জীবিত রাখার কোনো নির্দেশ দেয়া হয় নি। কাজটি অত্যন্ত সহজ মহামান্যা লেন। আমি নানা ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে সজ্জিত।
লেনের মুখে এক ধরনের বিতৃষ্ণার ছাপ ফুটে ওঠে। আমি তার কাঁধ স্পর্শ করে বললাম, ছেড়ে দাও লেন। চল আমরা তথ্যকেন্দ্রে যাই।
তথ্যকেন্দ্রটি বিশাল। এই মহাকাশযানে এরকম তথ্যকেন্দ্র কয়টি আছে কে জানে। দেয়ালে সারি সারি মনিটর এবং নানা ধরনের হলোগ্রাফিক স্ক্রিন। তথ্য দেয়ার জন্যে বিচিত্র ধরনের যন্ত্রপাতি। ঘরটি বিশাল হলেও সেখানে মানুষজন খুব বেশি নেই। কয়েকজন নানা বয়সের পুরুষ এবং মহিলা হলোগ্রাফিক স্ক্রিনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমরা যে এই ঘরে প্রবেশ করেছি তারা সেটা লক্ষ করেছে বলে মনে হল না। আমি ফাঁকা একটা মনিটরের সামনে বসতেই মনিটরটির ভেতর থেকে ভরাট গলার স্বরে কে যেন বলল, কি তোমার জন্যে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।
আমি একটু চমকে উঠে বললাম, তুমি কে কথা বলছ?
আমার নাম রী। আমি মহামান্যা মিয়ারার মূল তথ্যকেন্দ্রের পরিচালক।
তুমি একটি প্রোগ্রাম?
আমরা সবাই একটি প্রোগ্রাম।
হেঁয়ালি ছাড়। আমার হেয়ালি ভাল লাগে না।
মনিটরটির ভেতর থেকে ভরাট গলায় হাসির মতো এক ধরনের শব্দ ভেসে এল। আমি নিজের বিরক্তিটুকু গোপন করার কোনো চেষ্টা না করে বললাম, তুমি হাসার ভান করছ? আমি একটি যন্ত্রকে যন্ত্রের মতো দেখতে চাই।
তুমি খুব প্রাচীনপন্থী মানুষ কিহা। যন্ত্র আর মানুষের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। একজন মানুষ হচ্ছে একটি জৈবিক যন্ত্র–
অনেক হয়েছে, তুমি এখন চুপ কর। আমি এখানে কাজ করতে এসেছি।
রী নামক প্রোগ্রামটি এবারে লেনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতে থাকে, হালকা স্বরে বলে, লেন, তুমিও বিশ্বাস কর যে যন্ত্রদের মানুষের মতো ব্যবহার করার অধিকার নেই?
লেন একটা চেয়ারে বসতে বসতে বলল, রী, তুমি একটি কৌশলী প্রোগ্রাম, বাজে কথা বলা তোমার জন্যে খুব সহজ। আমরা আজকেই শীতল ঘর থেকে বের হয়েছি, আমরা বিশ্রাম নেবার সুযোগ পাই নি। রিটালিন–৪০০ নিয়ে আমরা জেগে আছি, তুমি অনুগ্রহ করে আমাদের দার্শনিক কথাবার্তায় টেনে নিও না।
রী তার গলার স্বরে এক ধরনের সমবেদনা ফুটিয়ে বলল, তোমাদের ব্যস্ত হবার কোনো কারণ নেই। মহামান্যা মিয়ারা তোমাদের যে সমস্যা সমাধান করার দায়িত্ব দিয়েছেন সেগুলি আসলে খুব সহজ।
সহজ?
হ্যাঁ। তোমাদের যে ধরনের বুদ্ধিমত্তা রয়েছে তাতে সমস্যাগুলির সামাধান করা কননা ব্যাপারই নয়। বিশেষ করে আমি যখন তোমাদের সাহায্য করার জন্যে রয়েছি।
আমি একটু অবাক হয়ে মনিটরটির দিকে তাকালাম। একজন মানুষের সাথে কথা বলার সময় সোজাসুজি তার চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনের ভাব বোঝা যায় কিন্তু রী নামের এই প্রোগ্রামটির চোখের দিকে তাকানোর কোনো উপায় নেই। অথচ আমি নিশ্চিতভাবে জানি সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, তুমি আমাদের সাহায্য করবে?
অবশ্যি করব। তোমাদের সাহায্য করাই আমার মূল দায়িত্ব।
আমাদেরকে মিয়ারা কী সমস্যা সমাধান করতে দিয়েছে আমি জানি না, কিন্তু আমি মোটামোটিভাবে নিশ্চিত যে সেগুলি এক ধরনের অন্যায় কাজ। তুমি এই অন্যায় কাজে সাহায্য করবে?
রী তার গলার স্বর নিচু করে ষড়যন্ত্রীদের মতো বলল, আমি জানি তোমরা মাত্র শীতলঘর থেকে বের হয়ে এসেছ, মহাকাশযানের কাজকর্ম আজকাল কীভাবে করা হয় এখনো জান না। তোমাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে বলছি কখনোই মাহামান্যা মিয়ারা সম্পর্কে অসৌজন্যমূলক কোনো কথা বলবে না।
লেন কাঁপা গলায় বলল, বললে কী হয়?
জৈব গবেষণার জন্যে আমাদের কিছু মানুষের প্রয়োজন। মহামান্যা মিয়ারা সেখানে নানা ধরনের পরীক্ষা করে থাকেন। মানুষ কত কম অক্সিজেনে কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে এধরনের একটা পরীক্ষার জন্যে তিনি একজন অবাধ্য মানুষকে বেছে নিয়েছিলেন।
লেন কোনো কথা না বলে আমার দিকে তাকাল, আমি কাঁধ ঝাকিয়ে ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার মতো ভঙ্গি করে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের যে সমস্যা সমাধান করতে হবে সেগুলি কী?
রী কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, লেনের সমস্যাটি বলা যেতে পারে সমাধান হয়ে গেছে, সেটা কীভাবে কার্যকর করা হবে সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।
সমস্যাটা কী?
নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যেহেতু সবাইকে জাগিয়ে তোলা শুরু হয়েছে, এই মহাকাশযানে একটা বিশাল খাদ্য-সংকট দেখা দেবে। মহামান্যা মিয়ারার অনুগত মানুষের কীভাবে এই খাদ্য সংকটের সময় বেঁচে থাকবে–সেটা হচ্ছে সমস্যা।
লেন দুর্বল গলায় বলল, তার সমাধানটা কী?
মানুষের দেহই হবে মানুষের খাবার।
লেন চমকে উঠে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে বলল, এটি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ একটি রসিকতা।
রী গম্ভীর গলায় বলল, এটি রসিকতা নয়। এটি একটি বাস্তব সত্য।
লেন কী একটা বলতে যাচ্ছিল আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আর আমার জন্যে কী সমস্যা রাখা হয়েছে?
তোমার সমস্যাটি আরও বিচিত্র। মহামান্যা মিয়ারা তোমাকে একটি নূতন ধরনের অস্ত্র তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছেন।
অস্ত্র?
হ্যাঁ। অস্ত্র।
যে অস্ত্র দিয়ে মানুষকে হত্যা করা হয়?
হ্যাঁ। এই মহাকাশযানে অস্ত্র বলতে গেলে নেই। যখন এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল তখন অস্ত্রের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু এখন এই মহাকাশযানে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস হচ্ছে অস্ত্র।
অস্ত্র? আমি হতচকিতের মতো বললাম, আমাকে অস্ত্র তৈরি করতে হবে? অন্ত্র? . হ্যাঁ। অস্ত্র তৈরি করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই কাজেই এখানে যা আছে তাই ব্যবহার করতে হবে
অস্ত্র? আমি আবার বিড় বিড় করে বললাম, অস্ত্র? যে অস্ত্র দিয়ে মানুষকে হত্যা করা হয়?
রী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, তুমি তোমার দায়িত্বটি খুব সহজ ভাবে নিতে পার নি কিহা।
আমি লেনের দিকে তাকালাম, লেন দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করে বলল, মিয়ারাকে বুঝিয়ে বললে সে নিশ্চয়ই তোমাকে অন্য একটা দায়িত্ব দেবে। নিশ্চয়ই দেবে।
রী ভারি গলায় বলল, তার সম্ভাবনা বলতে গেলে শূন্য। মিয়ারাকে তোমরা এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পার নি। সে অত্যন্ত দৃঢ় চরিত্রের মহিলা। তার মাঝে কোনো অকারণ ভাবালুতা নেই।
আমি চুপ করে রইলাম। রী হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে কিছু যন্ত্রপাতির ছবি ফুটিয়ে তুলে বলল, আমাদের সরবরাহ ঘরে যে সমস্ত জিনিষ আছে সেগুলি এরকম। শক্তিশালী লেজার খুব বেশী নেই তবে ভাল বিস্ফোরক রয়েছে।
আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম। লেনও সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল, রী জিজ্ঞেস করল, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?
আমি কোনো উত্তর দিলাম না, অন্যমনস্কভাবে হেঁটে-হেঁটে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালাম, লেন কাতর মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কোথায় যাচ্ছ কিহা?
আমি জানি না।
তুমি এখন কী করবে?
আমি সেটাও জানি না। আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললাম, কিন্তু আমি তো মানুষকে হত্যা করার জন্যে অস্ত্র তৈরি করতে পারি না। কিছুতেই–
আমার কথা শেষ হবার আগেই আমার সামনে একটা আলোর বিচ্ছুরণ দেখা গেল এবং মুহূর্তে সেটা ত্রিমাত্রিক একটা হলোগ্রাফিক মানুষের রূপ নিয়ে নেয়। মানুষটি ঝড়ের বেগে আমার দিকে ছুটে আসে–আমি তাকে চিনতে পারলাম, মানুষটি মিয়ারা।
মিয়ারা সামনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। তার মুখের রং পাল্টে যেতে থাকে এবং তাকে অতি প্রাকৃতিক ভৌতিক একটা মূর্তির মতো দেখাতে থাকে। সে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তুমি আমার আদেশ অমান্য করার দুঃসাহস দেখিয়েছ?
আমি কোনো কথা না বলে মিয়ারার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার মুখের ভঙ্গি আস্তে আস্তে পাল্টে যেতে থাকে, বিচিত্র এক ধরনের বর্ণ সেখানে খেলা করছে। আমি শান্ত গলায় বললাম, তুমি কী প্রকৃত মিয়ারা নাকি তার একটি প্রতিচ্ছবি?
মিয়ারা স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হিংস্র গলায় বলল, তাতে কিছু আসে যায় না। তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
আমার উত্তর দেবার কিছু নেই। আমি আদেশ দিতে বা শুনতে অভ্যস্ত নই।
তুমি জান তুমি কী করতে যাচ্ছ?
সম্ভবত জানি। অস্ত্র তৈরি কার কিছু মানুষকে হত্যা করা আর সেটা তৈরি না করার জন্যে নিজেকে হত্যা করতে দেয়ার মাঝে বিশেষ পার্থক্য নেই। দুটিই একই ধরনের নিবুদ্ধিতা। আমি এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললাম, ইচ্ছে করলেই আমি অস্ত্র তৈরি করছি বলে তোমাকে ধোকা দিতে পারতাম। আমার বুদ্ধিমত্তা নিনীষ স্কেলে আট, তোমার মতো কয়েকজনকে ধোকা দেয়া আমার জন্যে কঠিন কিছু নয়। কিন্তু আমি দিই নি।
মিয়ারা আমার দিকে হতচকিত হয়ে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, ঠিক আছে তোমাকে শেষ একটি সুযোগ দিচ্ছি। কয়েকঘণ্টার মাঝে আটজন মানুষকে শীতলঘর থেকে জাগানো হচ্ছে। এই মানুষগুলিকে জাগানো হচ্ছে মহাকাশযানের কেন্দ্রীয় তথ্যকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিশেষ আদেশে। এই মানুষগুলির বিশেষ কোনো গুরুত্ব আছে। আমি এই মানুষগুলিকে চাই।
মানুষগুলিকে চাও?
হ্যাঁ। আমি খবরটি পেয়েছি আমার বিশেষ ক্ষমতার জন্যে। সবাই খবরটি জানে না–যদি জানত তাহলে মহাকাশযানের প্রত্যেকটি দল তাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে এই আটজন মানুষকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করত। তুমি যদি পরবর্তী কয়েক ঘন্টার মাঝে মানুষগুলিকে আমার এখানে এনে হাজির করে দিতে পার তোমাকে আমি বেঁচে থাকার আরেকটা সুযোগ দেব।
আমি কোনো কথা না বলে মিয়ারার দিকে তাকিয়ে রইলাম–নিজের ভিতরে হঠাৎ এক ধরনের বিতৃষ্ণা জমে উঠতে থাকে। মিয়ারা আমার দিকে কয়েকমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে যেভাবে হঠাৎ করে হাজির হয়েছিল ঠিক সেভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমি হেঁটে হলোগ্রাফিক মনিটরটির কাছাকাছি এসে হাজির হতেই রী চাপা গলায় বলল, তুমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান একজন মানুষ। আমি এর আগে মহামান্যা মিয়ারাকে কাউকে ক্ষমা করতে দেখি নি।
আমি চেয়ারটায় বসতে বসতে বললাম, সে জন্যে তোমার মন খারাপ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
রী তার গলায় এক ধরনের আহত ভঙ্গি ফুটিয়ে তুলে বলল, তুমি এরকম কথা, কেন বলছ?
তোমার মহামান্যা মিয়ারাকে আমার খবরটি পৌঁছাতে তুমি পিকোসেকেন্ডও দেরি কর নি–তাই বলছি।
রী একটা নিঃশ্বাস ফেলার মতো শব্দ করে বলল, সেটাই আমার দায়িত্ব। আমাকে সেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে।
আমি তোমাকে নূতনভাবে প্রোগ্রাম করে দিই? এখন থেকে তুমি আমার জন্যে কাজ করবে?
রী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, তুমি যদি আমাকে সেভাবে প্রোগ্রাম করতে পার অবশ্যিই আমি তোমার জন্যে কাজ করব!
আমি শব্দ করে হেসে বললাম, যন্ত্রেরা যখন বিশ্বাসঘাতকতা শিখে যায় তখন মনে হয় সভ্যতার ধ্বংস হওয়া শুরু হয়!
রী কী একটা বলতে যাচ্ছিল আমি তাকে বাধা দিয়ে বললাম, কাজ শুরু করা যাক। মহাকাশযানের কেন্দ্রীয় তথ্যকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিশেষ আদেশে যে আটজন মানুষকে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে তাদেরকে আমারও দেখার বিশেষ কৌতূহল হচ্ছে।
রী নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, তোমার কী কী প্রয়োজন?
কয়েকজন শক্তিশালী সশস্ত্র রবোট।
চমৎকার। আমিও তাই ভাবছিলাম। আমাদের কাছে যারা আছে তোমাকে দেখাচ্ছি, তুমি বেছে নাও।
প্রায় সাথে সাথেই হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে ভয়ংকর দর্শন কিছু রবোটের ছবি ফুটে ওঠে। তাদের হাতে কিছু জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা অস্ত্র। আমি লেনকে বললাম, লেন কয়েকটাকে বেছে নাও।
লেন বিকটই দর্শন কয়েকটা রবোটকে বেছে দিল। রী বলল, রবোটগুলির মাঝে কী ধরনের বুদ্ধিমত্তা দেব? এখন সবচেয়ে উচ্চশ্রেণীর বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে ক্লিপিড ৩৩। অত্যন্ত উচ্চ ধরনের বুদ্ধিমত্তা, চমত্তার যুক্তিবিদ্যা, চমত্তার মানবিক আবেগ
আমি কোনো বুদ্ধিমত্তা চাই না। যদি মানবিক আবেগেরই প্রয়োজন হয় তাহলে তো মানুষকেই বেছে নিতাম। আমার প্রয়োজন অত্যন্ত নিম্নশ্রেণীর বুদ্ধিমত্তা, বলা যেতে পারে প্রায় পশুর কাছাকাছি।
কিন্তু রী একটু ইতস্তত করে বলল, শীতলঘর থেকে আটজন মানুষকে ছিনতাই করে আনার জন্যে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার দরকার। শীতলঘরে অন্তত তিনটি প্রতিরক্ষা ব্যুহ রয়েছে। সেখানে নিচু স্তরের একটা রবোট পাঠানো হলে অপ্রয়োজনীয় রক্তারক্তি হবে। মহামান্যা মিয়ারার সুনাম–
তোমার সেটা নিয়ে মাথা ঘামনোর প্রয়োজন নেই। তোমাকে যেটা বলছি সেটা কর।
ঠিক আছে। কী ধরনের গাড়ি দেব? বাই ভার্বাল রয়েছে, নিচু দিয়ে উড়তে পারে। গতিবেগ খুব বেশি নয় কিন্তু প্রচুর ওজন নিতে পারে। আটজন মানুষকে আনতে—
আমার কোনো গাড়িরও প্রয়োজন নেই।
গাড়ির প্রয়োজন নেই? তাহলে মানুষগুলিকে আনবে কেমন করে?
তথ্যকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিশেষ আদেশে মানুষগুলি এখানে পৌঁছে যাবে। তোমাকে যে কাজগুলি করতে হবে সেগুলি এরকম। ঠিক যখন শীতলঘরে আটজন মানুষকে জাগিয়ে তোলা শুরু হবে সেই মুহূর্তে রবোটগুলিকে স্থানীয় সববরাহ কেন্দ্র থেকে ভাইরাস লিটুমিনার সমস্ত প্রতিষেধক ছিনতাই করে আনতে হবে। দশ হাজার মানুষের প্রতিষেধক কয়েক গ্রামের বেশি নয় তাই কোনো গাড়ির প্রয়োজন নেই। প্রতিষেধক ছিনতাই হবার সাথে সাথে মূল স্বাস্থ্য আর নিরাপত্তা কেন্দ্রে একটা খবর পাঠাবে যে মহাকাশযানের কিছু মানুষের সাময়িক অবসন্নতা, টানেল ভিশান এবং দেহের অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা দেখা দিয়েছে। এগুলি হচ্ছে ভাইরাস লিটুমিনা দিয়ে আক্রান্ত হবার লক্ষণ।
আমি কথা শেষ করার আগেই রী উচ্চঃস্বরে হেসে ওঠার শব্দ করে বলল, চমৎকার! চমত্তার বুদ্ধি। যখনই নিরাপত্তাকেন্দ্র খবর পাবে মহাকাশযানে ভাইরাস লিটুমিনার সংক্রমণ হয়েছে তখন শীতলঘর থেকে জাগিয়ে তোলার সাথে সাথে সবাইকে এর প্রতিষেধক দিতে হবে। সেই প্রতিষেধক রয়েছে শুধু আমাদের। কাজেই সবাইকে এখানেই আনতে হবে চমৎকার বুদ্ধি
লেন ইতস্তত করে বলল, কিন্তু আসলে তো মহাকাশযানে ভাইরাস লিটুমিনার সংক্রমণ হয় নি।
কিন্তু সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা দুঃসাধ্য। নিরাপত্তা কেন্দ্র কখনোই সে ঝুকি নেবে না। সেই ঝুকি নেয়ার নিয়ম নেই।
রবোটগুলি যদি প্রতিষেধক ছিনিয়ে আনতে না পারে?
আমি উত্তর দেবার আগেই রী বলল, সেটা কোনো সমস্যা হবে না। মূল সরবরাহ কেন্দ্রে যে সমস্ত জিনিস রয়েছে মহাকাশযানের বর্তমান অবস্থায় তার কোনো গুরুত্ব নেই। জায়গাটা মোটামুটি অরক্ষিত।
চমক্কার! তাহলে তুমি কাজ শুরু করে দাও।
তোমার বুদ্ধি দেখে আমি চমকৃত হয়েছি কিহা। নিনীষ স্কেলে আট–
আমি হাত তুলে বললাম, চাটুকারদের আমি পছন্দ করি না রী। আটজন মানুষ যখন এখানে পৌঁছাবে তুমি আমাদের খবর দিও।
দেব। অবশ্যি দেব।
আমি লেনের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি এখন কী করবে লেন? আমি জায়গাটা একটু ঘুরে দেখতে চাই।
রী বলল, তুমি এখানে বসেই দেখতে পার, আমি মূল হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে—
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, না আমি নিজের চোখে দেখতে চাই।
লেন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চল আমিও যাই তোমার সাথে।
আমি আর লেন যখন হেঁটে যেতে শুরু করেছি তখন লক্ষ করলাম আমাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে ত্রিনি পিছু পিছু হাঁটছে। এই নির্বোধ রবোট সারাক্ষণ কোনো এক ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র আমার দিকে তাক করে রেখেছে ব্যাপারটি চিন্তা। করেই আমার কেমন জানি গা গুলিয়ে উঠতে থাকে। মিয়ারার আস্তানা থেকে আমাদের সরে যেতে হবে। যেভাবেই হোক।
আমরা যখন সপ্তম স্তর থেকে বাইরে মহাকাশের নিকষ কালো অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়েছিলাম ঠিক তখন কমিনিকেশান মডিউলে আমি কথা শুনতে পেলাম। সেটি বলল, মহামান্য কিবা এবং মহামান্য লেন। শীতলঘর থেকে আটজন মানুষকে নিয়ে আসা হয়েছে। মহামান্যা মিয়ারা এসে গেছেন, আপনারা এলেই মানুষগুলির সাথে দেখা করতে যাবেন।
আমি বললাম, আমরা আসছি।
সপ্তম স্তর থেকে নেমে আসতে আমাদের বেশি সময় লাগল না। মহাকাশযানটি একটি বিশাল সিলিন্ডারের মতো। কৃত্রিম মহাকর্ষ তৈরি করার জন্যে নিজের অক্ষে ঘুরছে, ভিতরের স্তর গুলিতে মহাকর্ষ বল কম, আমরা একটু আগেই সেটা অনুভব করেছি।
যোগাযোগ টানেলের সামনে মিয়ারা দাঁড়িয়েছিল। সত্যিকারের মিয়ারা, তার হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি নয়। আমাদের দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এল। আমি তাকে যে স্বল্প সময়ের জন্যে দেখেছি তার মাঝে তাকে একবারও হাসতে দেখি নি। মেয়েটি সত্যিকার অর্থে সুন্দরী নয় কিন্তু হাসিমুখে তাকে হঠাৎ বেশ আকর্ষণীয়া মনে হতে থাকে। মিয়ারা এগিয়ে এসে নরম গলায় বলল, কিহা, তুমি যে ভাবে এই আটজন মানুষকে আমাদের কেন্দ্রে নিয়ে আসছ তার তুলনা হয় না। তোমাকে অভিনন্দন।
আমি কথা না বলে কাঁধ ঝাকালাম। মিয়ারা ঝকঝকে চোখে বলল, মানুষগুলি কে জানার জন্যে আমার আর তর সইছে না। কী মনে হয় তোমার? সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিশেষ আদেশে এদের জাগানো হচ্ছে–নিশ্চয়ই এরা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ।
মিয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিবর্ণ চেহারার একজন মানুষ বলল, হয়তো এদের বুদ্ধিমত্তা নিনীষ স্কেলে দশ!
মিয়ারা শীষ দেয়ার মতো একটি শব্দ করতেই খুট করে গোলাকার একটা দরজা খুলে গেল, ভেতর থেকে এক ধরনের ঠাণ্ডা বাতাস বের হয়ে আসে। প্রায় সাথে সাথেই সেখানে নিবোধ চেহারার একটা রবোটের চেহারা উঁকি দেয়। রবোটটি মাথা নুইয়ে অভিবাদন করার ভঙ্গি করে বলল, আটজন মানুষ এইমাত্র তাদের ক্যাপসুল থেকে বের হয়ে এসেছে।
মিয়ারার পিছু পিছু আমরা ঘরটিতে ঢুকে থমকে দাঁড়ালাম। আমাদের সামনে আটটি ধাতব রংয়ের সিলিণ্ডার, সিলিন্ডারের উপরের ঢাকনা খোলা, ভেতর থেকে সরু সূতার মতো জলীয় বাষ্পের ধারা বের হয়ে আসছে। সিলিন্ডারগুলির সামনে প্রায় জড়াজড়ি করে আটটি নগ্ন শিশু দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে তারা চোখ বড় বড় করে তাকাল, সম্ভবত এরা রবোটের সাহায্যেই বড় হয়েছে, কোনোদিন সত্যিকারের মানুষ দেখে নি। আমাদের দেখে তাদের চোখে মুখে এক ধরনের অবাক বিস্ময় ফুটে ওঠে, যে ধরনের বিস্ময় সম্ভবত শুধুমাত্র শিশুদের মুখেই দেখা যায়।
মিয়ারা কয়েকমুহূর্ত হতচকিতের মতো দাঁড়িয়ে থেকে প্রায় আর্ত চিৎকারের মতো শব্দ করে বলল, হায় ঈশ্বর! এ কী?
বাচ্চাগুলি জড়াজড়ি করে একটু পিছিয়ে গেল, তাদের চোখে মুখে এক ধরনের ভয়ের ছাপ পড়ে, সহজাত প্রবৃত্তি থেকে হঠাৎ করে তারা মনে হয় বুঝতে পেরেছে এখানে তাদের জন্যে কোনো ভালবাসা সঞ্চিত নেই।
(চলবে)
