দ্বিতীয় পর্ব

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে

#পৃ - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল



আমি একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে দেয়ালে বিশাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি। স্ক্রিনে ছোট একটা হলঘরের ছবি। হলঘরের এক কোণায় মিয়ারা বসে আছে, তার সামনে কুচকুচ কালো একটি টেবিল। টেবিলের চারপাশে আরো পাঁচজন মানুষ। মানুষগুলির দুজন পুরুষ, একজন মহিলা এবং অন্য একটি নবম প্রজাতির ট্রিটন রবোট–যাকে মানুষের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। পঞ্চম মানুষটি পুরুষ কী মহিলা বোঝার উপায় নেই। হলঘরে শুধু মিয়ারাই সত্যি সত্যি শারীরিক ভাবে বসে আছে। অন্যেরা সরাসরি উপস্থিত নেই যতদূর সম্ভব নেটওয়ার্কে এসেছে। এই পাঁচজন। মানুষ মহাকাশযানের বিভিন্ন অংশের নেতৃত্ব দখল করেছে।

ট্রিটন রবোটটি নিচু গলায় বলল, আমার ধারণা আমরা এখানে সময় নষ্ট করছি। আমরা একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করি না। কাজেই এখানে বসে আলোচনা করা অর্থহীন। এখানে কেউ সত্যি কথা বলছে না।

মিয়ারা হাসির মতো শব্দ করে বলল, ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে কৌতুককর যে একটি ট্রিটন রবোট নৈতিকতার কথা বলছে।

রবোটটি মিয়ারার দিকে তাকিয়ে বলল, মিয়ারা, তুমি খুব ভাল করে জান আমি নৈতিকতার কথা বলছি না। এই মহাকাশযানে এক ধরনের সংঘাত হচ্ছে, আমরা সেখানে একজন আরেকজনকে ধ্বংস করে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করার চেষ্টা করছি, সেখানে সম্মিলিত শক্তির কথা বলা অর্থহীন।

হলঘরের দ্বিতীয় মহিলাটি নরম গলায় বলল, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের সম্মিলিত শক্তির প্রয়োজন। মূল তথ্যকেন্দ্র এখনো বিশাল শক্তি নিজের কাছে রেখেছে, আমাদের প্রথমে সেটা বের করে আনতে হবে, শুধুমাত্র তাহলেই আমরা তার জন্যে হানাহানি শুরু করতে পারি।

মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি-গোঁফের জংগল এরকম মানুষটি তার গাল ঘষতে ঘষতে বলল, ভালই বলেছ তুমি। সবাই মিলে আক্রমণ করে খানিকটা সম্পদ কেড়ে নিয়ে নিজেরা মারামারি শুরু করি

মিয়ারা এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল, এবারে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, তোমরা জান মূল তথ্যকেন্দ্রের সাথে আমরা এখন বড় ধরনের বোঝাপোড়া করতে পারি। মূল তথ্যকেন্দ্রের বিশেষ আদেশে যে আটজন মানুষকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে আমার কাছে সেই মানুষগুলি রয়েছে।

দেখে বোঝা যায় না পুরুষ না মহিলা সেরকম মানুষটি বলল, আমি জানি তুমি আমাকে সত্যি কথাটি বলবে না, তবু জিজ্ঞেস করছি, এই মানুষগুলির কি বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য রয়েছে?

মিয়ারা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, আমি সেটা বলব না। তবে আমি উচ্চমূল্যে তাদের বিক্রি করতে রাজি আছি।

ঘরের সবাই নড়ে চড়ে বসল এবং তাদের চোখে মুখে হঠাৎ আগ্রহ উত্তেজনা এবং কৌতূহল ফুটে ওঠে। মুখে মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-গোঁফের মানুষটি একটু সামনে ঝুঁকে এসে বলল, আমি কমপক্ষে দুজন মানুষ কিনতে চাই। তুমি কী মূল্য চাও মিয়ারা?

অষ্টম এবং নবম স্তরের এক চতুর্থাংশ জায়গা। মানুষটির চোখে বিস্ময় ফুটে ওঠে, কী বলছ তুমি?

আমার পক্ষে এই ধূর্ত মানুষ এবং মানুষ জাতীয় রবোটগুলির কথাবার্তা শোনা রীতিমত কষ্টকর হয়ে ওঠে। নিচু গলায় মনিটরটিকে বললাম, আমি আর দেখতে চাই না।

সাথে সাথে স্ক্রিনটি অন্ধকার হয়ে আসে। আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইলাম। আমার বুকের ভিতরে গভীর বিষণ্ণতা এসে ভর করতে থাকে।

এরকম সময় আমার মাথায় কে যেন স্পর্শ করে নিচু গলায় ডাকল, কিহা–

আমি চোখ খুলে ঘুরে তাকালাম। লেন বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে আছে, আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে লেন?

তোমার সাথে আমার কথা বলা প্রয়োজন কিহা। খুব জরুরি।

বল।

তুমি তো জান মিয়ারা আমাকে খাদ্য সরবরাহের একটা সমস্যা সামাধান করতে দিয়েছে–

হ্যাঁ জানি।

আমি সেটা নিয়ে কাজ করছিলাম, কোনো মানুষের জন্যে কতটুকু খাবার রয়েছে তার একটা তথ্যভাণ্ডার রয়েছে। আমি শিশুগুলির ফাইল খুলে দেখেছি। মূলতথ্যকেন্দ্র থেকে তাদের জন্যে মাত্র চার দিনের খাবার রাখা হয়েছে।

আমি চমকে উঠে বললাম, কী বলছ তুমি?

হ্যাঁ। এই শিশুগুলিকে শীতল ঘর থেকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে হত্যা করার জন্যে।

সত্যি?

হ্যাঁ।

কেন?

আমি জানি না।

মিয়ারা কী জানে?

আমি বলতে পারবো না।

আমি ইতস্ততঃ করে বললাম, আমার মনে হয় সে জানে।

কেন বলছ সে জানে?

আমি একটু আগে দেখছিলাম, সে মহাকাশযানের অন্য এলাকার মানুষদের সাথে কথা বলছে। সে শিশুগুলিকে বিক্রি করে দিচ্ছে। সে নিশ্চয়ই জানে আর চারদিন পর শিশুগুলির কোনো মূল্য নেই।

লেন আমার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে বলল, কিহা!

কী হয়েছে লেন?

আমি শিশুগুলির সাথে সময় কাটিয়েছি, তাদের নানাভাবে পরীক্ষা করে দেখেছি। এরা একেবারে সাধারণ শিশু–একেবারে সাধারণ। এদের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা নেই, কৃত্রিম অঙ্গপ্রতঙ্গ নেই বিশেষ জিনেটিক কোড নেই। এদের রবোট ফার্মে বড় করা হয়েছে, এরা কথা জানে না কেউ ওদের কথা শেখায় নি। এরা কখনো মানুষ দেখে নি, ওরা কখনো মানুষের ভালবাসা পায় নি, আমি ভেবেছিলাম তাই ওরা বুঝি ভালবাসা বুঝে না। কিন্তু–

কিন্তু কী?

বাচ্চাগুলি ভালবাসা বুঝে। আমি–আমি–লেন কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যায়। তার চোখ দুটিতে হঠাৎ পানি জমে ওঠে। আমি অবাক হয়ে লেনের দিকে তাকিয়ে রইলাম, শেষবার কবে আমি সত্যিকার মানুষকে কাঁদতে দেখেছি মনে করতে পারলাম না।

লেন হঠাৎ এগিয়ে এসে আমাকে দুই হাতে ধরে বলল, কিহা

আমি লেনের দিকে তাকালাম, হাসার চেষ্টা করে বললাম, লেন, এই ঘরে এই মুহূর্তে আমাদের দিকে অসংখ্য যান্ত্রিক চোখ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অসংখ্য সংবেদনশীল কান আমাদের কথা শুনছে। তোমার কিছু বলার প্রয়োজন নেই লেন। আমি জানি তুমি কী বলতে চাইছ।

তুমি জান?

হ্যাঁ, আমি জানি।

সামনের মনিটর থেকে হঠাৎ রীয়ের কথা ভেসে এল, সে বলল, বিস্ময়কর। যখন আমি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাই যে আমি মানুষকে বুঝতে পারি, ঠিক তখন তোমরা এমন একটা কাজ কর যে আমি আবার বিভ্রান্ত হয়ে যাই।

কেন রী, কী হয়েছে?

লেন কথাটি বলার আগে তুমি কেমন করে বুঝতে পারলে সে কী বলবে?

আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম, চেষ্টা কর, তুমিও পারবে।

সে কী শিশুগুলির জীবন বাঁচানোর কথা বলছে? কিন্তু সেটা তো হতে পারে না, সেটা তো অসম্ভব। শুধু যে অসম্ভব তা নয়, এর সাথে আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। আমাদের অস্তিত্ত্বের প্রশ্ন জড়িত আছে। তাহলে কী হতে পারে—

আমি লম্বা পা ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। হ্যাঁ, আমাকে একটা অসম্ভব কাজ করতে হবে। মহাকাশযানের মূল তথ্যকেন্দ্রের বিশেষ ক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করে আটটি অত্যন্ত সাধারণ শিশুর প্রাণ বাঁচাতে হবে। এর সাথে হয়তো আমাদের নিরাপত্তার এবং অস্তিত্ত্বের প্রশ্ন জড়িত আছে কিন্তু আমার কিছু করার নেই।

লম্বা করিডোরের আবছা অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে আমি আবিষ্কার করলাম আমার বুকের ভিতরের গুমোট বিতাটি কেটে গেছে, সেখানে এসে ভর করেছে বিচিত্র এক ধরনের ক্রোধ।

আমি মিয়ারার আস্তানায় করিডোর ধরে হাঁটতে থাকি, আমার পিছু পিছু একটু দূরত্ব রেখে ত্রিনিও হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে আমি পুরো সমস্যাটি চিন্তা করে দেখি–স্বাভাবিক অবস্থায় মাহাকাশযানের মূল তথ্যকেন্দ্রের বিশেষ আদেশ উপেক্ষা করে কিছু একটা করা অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু মহাকাশযানে এখন স্বাভাবিক অবস্থা নেই। সেটাই হচ্ছে আমাদের একমাত্র শক্তি।’

আমাদের সবার জন্যে এখন সবচেয়ে সহজে পালিয়ে যাবার একটি মাত্র উপায়। আমাদের শরীরে যে ট্রাকিওশানটি দিয়ে মহাকাশযানের মূল এবং আনুষাঙ্গিক তথ্যকেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রাখা হয় সেই ট্রাকিওশানটি বের করে সেখানে অন্য একটি ট্রাকিওশান ঢুকিয়ে দেওয়া। সেই ট্রাকিওশানে থাকবে ভিন্ন একজনের পরিচয় যার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এই পরিচয় নিয়ে আমরা শীতল ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে যাব। আগামী শতাব্দী পর্যন্ত কেউ আর আমাদের খুঁজে পাবে না। ব্যাপারটি অনেকটা আত্মহত্যা করার মতো, মহাকাশযানের বিশাল তথ্যকেন্দ্র থেকে নিজেকে অদৃশ্য করে দেয়া। ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে যদি এই মহাকাশযান পৃথিবীতে পৌঁছায়, সবকিছু আবার নূতন করে শুরু হয় তখন হয়তো সত্যিকারের পরিচয় নিয়ে জীবন শুরু করতে পারব। হয়তো পারব না। কিন্তু সেটা নিয়ে এখন ভেবে লাভ নেই।

আমি হাঁটতে হাঁটতে নিচে নেমে এলাম, আটটি শিশুর জন্যে এখানে আলাদা একটা ঘর তৈরি করা হয়েছে। ঘরটিতে উঁকি দিয়ে দেখি লেন ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় হাটু মুড়ে বসে আছে, তাকে ঘিরে আটটি শিশু বসে আছে। শিশুগুলির মুখ আনন্দোজ্জ্বল এবং কিছু একটা নিয়ে সেখানে প্রচণ্ড হৈ-চৈ হচ্ছে। আমাকে দেখে লেন হাসি মুখে বলল, কিহা, দেখ বাচ্চাগুলি কথা শিখে যাচ্ছে!

সত্যি?

হ্যাঁ। আমি এর মাঝে অনেক কিছু শিখিয়েছি। দেখবে?

দেখাও।

লেন তার হাত উঁচু করে বলল, এইটা কী?

বাচ্চাগুলি উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বলল, হাত! হাত!

লেন নিজের চুল স্পর্শ করে বলল, এইটা কী?

চুল! চুল!

লেন নিজের নাক স্পর্শ করে বলল, এইটা কী?

নাক! নাক!

আমরা সবাই মিলে কোথায় যাব?

পৃ! পৃ!

পূ? আমি একটু অবাক হয়ে লেনের দিকে তাকালাম। লেন হেসে ফেলে বলল, একটা শব্দ কঠিন হয়ে গেল সেটাকে কেটে ছেটে সহজ করে ফেলে!

পৃথিবীকে করেছে পৃ। কী বুদ্ধি দেখেছ?

তাই তো দেখছি।

আরো অনেক মজার ব্যাপার আছে–নিজেরা নিজেরা একটা ভাষা তৈরি করে ফেলেছে। কিচির মিচির করে নিজেদের ভিতর কী বলে আমি কিছুই বুঝি না।

মজার ব্যাপার তো।

হ্যাঁ–ছোট বাচ্চার মাঝে এত মজার ব্যাপার লুকানো আছে তুমি দেখলে অবাক হয়ে যাবে। একটু আগে কী হয়েছে শোন

লেন একটু আগে খাবার সময় বাচ্চাগুলি তাদের পানীয় নিয়ে কী দুষ্টুমি করেছে সেটা খুব উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করে। আমি নিজের বিস্ময়টুকু গোপন করে মুখে একাগ্রতার একটা ভাব ফুটিয়ে তুলি। আমি নিজের চোখে না দেখলে কখনোই বিশ্বাস করতে পারতাম না লেনের মতো একটি মেয়ে ছোট শিশুদের নিয়ে এ ধরনের উচ্ছাস দেখাতে পারে।

আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললাম, বাচ্চাগুলিকে বাঁচাতে হবে, যেভাবেই হোক।

চতুর্থ স্তরে নানা ধরনের স্কাউটশিপ রাখা আছে আমি সেগুলি দেখে একটাকে বেছে রাখলাম। এটা তৈরি হয়েছিল মহাকাশযানের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যে, বায়ুশূন্য মহাকাশে যেতে পারে বলে এটি বায়ু নিরোধক, ছোটখাট গোলাগুলি সহজে সহ্য করতে পারবে। নিয়ন্ত্রণটুকু পুরোপুরি যান্ত্রিক আমাকে সেটা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। আমি স্কাউটশিপের কোড নাম্বারটি নিয়ে তথ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ। করলাম। বিশেষ অনুমতি ছাড়া এটি ব্যবহার করার উপায় নেই। আমি পর্যবেক্ষণ করার জন্যে কয়েক মিনিট ব্যবহার করার একটা সাময়িক অনুমতি যোগাড় করে রাখলাম। মিয়ারায় আস্তানা থেকে কয়েক মিনিটের মাঝে কেউ বের হতে পারবে না কাজেই এটা নিরাপত্তার জন্যে কোনো রকম হুমকি নয়।

বাচ্চাগুলিকে নিয়ে পালানোর পরিকল্পনার পরের অংশটুকু জটিল, যার জন্যে আমাদের শরীর থেকে ট্রাকিওশান গুলি আলাদা করতে হবে। একজন মানুষের যাবতীয় তথ্য এই ট্রাকিওশানের মাঝে থাকে–এটি শরীর থেকে বের করা মাত্রই আমরা এই মহাকাশযানের অপ্রয়োজনীয় জঞ্জালে পরিণত হব। কিন্তু সেটা নিয়ে এখন আর চিন্তা করার সময় নেই। ট্রাকিওশানগুলি বের করতে আমাদের কষ্ট হল, চামড়ার নিচে লুকানো থাকে, সেটা কেটে বের করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। ছোট পাতলা একটা চাকতির মতো শক্তিশালী ট্রান্সমিটারগুলি আপাততঃ শরীরের উপরে লাগিয়ে রাখা হল, শেষ মুহূর্তে সেগুলি অন্য কোথাও লাগিয়ে দিয়ে মূল তথ্যকেন্দ্রকে বিভ্রান্ত করা হবে।

নির্দিষ্ট সময়ে আমি স্কাউটশিপের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম, তিনি সারাক্ষণই আমার সাথে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে আমার পিছু পিছু এসেছে। স্কাউটশিপের কাছাকাছি এসে আমি আমার ট্রাকিওশানটি চলমান একটি রবোটের দিকে ছুড়ে দিলাম–পুরো জিনিসটা করতে হল তথ্যকেন্দ্রের চোখকে আড়াল করে, সেটা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। ত্রিনি সাথে সাথে সেই রবোটটির পিছু পিছু হটতে শুরু করেযখন সে বুঝতে পারবে আমি পালিয়ে গেছি তার প্রতিক্রিয়া কী হবে জানার আমার একটু সূক্ষ্ম কৌতূহল হল!

স্কাউটশিপের দরজায় টোকা দিতেই সেটা ঘর ঘর শব্দ করে খুলে গেল। আমি মাথা নিচু করে ভিতরে ঢুকে গেলাম, বাইরে থেকে বোঝা যায় না কিন্তু ভিতরে বেশ প্রশস্ত। আমি কন্ট্রোল প্যানেলে হাত দিতেই সেটি মিষ্টি সুরে কথা বলে উঠল, মহামান্য কিহা, আপনি কয়েক মিনিটের এটা পর্যবেক্ষণ করতে এসেছেনআপনাকে কী আমি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?

অবশ্যি পার। এই স্কাউটশিপের নিয়ন্ত্রণের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু কী?

কন্ট্রোল প্যানেলের ওপরের ভাগে ভারসাম্য রক্ষার মডিউলটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার নিচে রয়েছে স্কাউটশিপের নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রপাতি।

চমৎকার–আমি পকেট থেকে ছোট একটা বিস্ফোরকের টিউব বের করে আনলাম। আমাকে নূতন ধরনের অস্ত্র আবিষ্কার করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বলে এ ধরনের জিনিস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্যে সরবরাহ কেন্দ্র থেকে দিতে আপত্তি করে নি।

মহাকাশযানের কন্ট্রোল প্যানেল অবশ্যি তীক্ষ্ণ স্বরে বিপদ সংকেত বাজাতে বাজাতে আপত্তি জানাতে শুরু করে। কণ্ঠস্বরটি উঁচু গলায় বলল, স্কাউটশিপের মাঝে বিস্ফোরক অত্যন্ত বিপজ্জনক–

সেজন্যেই এনেছি।

তুমি কী করবে বিস্ফোরক দিয়ে?

ভারসাম্য রক্ষার মডিউল এবং স্কাউটশিপের নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি উড়িয়ে দেব।

অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি কাজ করতে যাচ্ছ।

হ্যাঁ। আমার ভাসা ভাসা মনে আছে যদি স্কাউটশিপে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে ভেতরের আরোহীদের জীবন রক্ষার একটি শেষ চেষ্টা করা হয়। তখন স্কাউটশিপের নিয়ন্ত্রণ আরোহীদের হাতে দেয়া হয়। আমার স্কাউটশীপের নিয়ন্ত্রণটুকু দরকার–

কিন্তু তার যথাযথ নিয়ম রয়েছে। তুমি যেটা করতে যাচ্ছ সেটা বিপজ্জনক এবং বেআইনি।

সম্ভবত। আমি কথা না বাড়িয়ে বিস্ফোরকের টিউবটি কন্ট্রোল প্যানেলে বসিয়ে একটু দূরে সরে গেলাম। তিন সেকেন্ডের মাঝে প্রচণ্ড শব্দে একটা বিস্ফোরণে কন্ট্রোল প্যানেলের বড় একটা অংশ উড়ে গেল এবং সাথে সাথে তীব্র স্বরে ভেতরে বিপদ সংকেত বাজতে থাকে, উজ্জল লাল আলো জ্বলতে এবং নিভতে শুরু করে। আমি স্কাউটশিপের ভেতরে এবারে ভিন্ন একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, সেটি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, মহা বিপদ সংকেত। আরোহীদের নিরাপত্তার জন্যে বলছি, স্কাউটশিপের প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি দ্বিতীয় ধাপের নিয়ন্ত্রণ–

আমি গলায় ভয় এবং আতংক ফুটিয়ে বললাম, বাইরের সাথে সমস্ত যোগাযোগ কেটে দাও।

দিচ্ছি।

আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দাও।

দিচ্ছি–

আমি কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে গিয়ে বসে বললাম, নিচু দিয়ে উড়তে শুরু কর। দ্বিতীয় স্তরে থামতে হবে।

কিন্তু–

কোন কথা বলার সময় নেই, তাড়াতাড়ি—

সাথে সাথে স্কাউটশিপের গর্জন করে উড়তে শুরু করে।

দ্বিতীয় স্তরে লেন বাচ্চাগুলিকে নিয়ে প্রস্তুত হয়েছিল। আমি এক মুহূর্তের জন্যে দরজা খুলতেই সে সবাইকে নিয়ে হুঁড়মুড় করে ঢুকে পড়ে। আমি গলা উচিয়ে বললাম, মূল প্রবেশপথ দিয়ে বের হয়ে যাও। তাড়াতাড়ি

কিন্তু–

এর মাঝে কোনো কিন্তু নেই। তোমাকে বুঝিয়ে বলার সময় নেই।

স্কাউটশিপের ভেতরে আর কোনো কথা শোনা গেল না। সেটা নিচু হয়ে ছুটতে শুরু করে এবং দেখতে দেখতে এর বেগ বেড়ে যেতে থাকে।

লেন নিচু গলায় বলল, আমরা এখন কোথায় যাব?

কাছাকাছি কোনো শীতল ঘরে। আমি কিছু নকল ট্রাকিওশান তৈরি করে রেখেছি, এখান থেকে বের হয়ে শরীরে লাগিয়ে নিতে হবে।

লেন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখন স্কাউটশিপটা ঝাকুনী দিয়ে থেমে যায় এবং ভেতরে আমরা সবাই হুঁড়মুড় করে পড়ে গেলাম। ছোট বাচ্চাগুলি ব্যাপারটা এক ধরনের খেলা মনে করে উচ্চৈঃস্বরে হাসতে শুরু করে।

আমি একটু শংকিত হয়ে বললাম, কী হয়েছে? থামছ কেন?

প্রতিরক্ষাকেন্দ্র তোমাদের পরিচয় জানতে চাইছে।

আমি কঠিন গলায় বললাম, তোমাকে আমি বলেছি আমাদের হাতে কোনো সময় নেই। তুমি বের হয়ে যাও।

প্রতিরক্ষাকেন্দ্র তাহলে আমাদের আক্রমণ করবে।

করলে করবে। আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি তুমি এই মুহূর্তে বের হয়ে যাও।

এটি বেআইনি–

আমি তোমাকে এই বেআইনি কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছি।

স্কাউটশিপের বিধ্বস্ত কন্ট্রোল প্যানেলে কিছু আলোর ঝলকানী দেখা গেল, তারপর যেরকম হঠাৎ করে এটি থেমেছিল ঠিক সেরকম করে হঠাৎ এটি ছুটতে শুরু করল।

স্কাউটশিপটি যখন তার গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করে মহাকাশযানের বিশাল করিডোর ধরে নির্দিষ্ট পথে ছুটতে শুরু করেছে তখন লেন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোমার কি মনে হয় কিহা, আমরা কী পালিয়ে যেতে পারব?

নিশ্চয়ই পারব।

প্রতিরক্ষা ব্যুহ থেকে আমাদের পিছু নেবে না?

আমরা আমাদের ট্রাকিওশান ফেলে এসেছি, আমরা কে তারা এখনো জানে। তারা জানার আগেই আমরা শীতল ঘরে ঢুকে যাব।

আমরা কি পারব?

আমি উত্তর দেবার আগেই স্কাউটশিপের কন্ট্রোল প্যানেল থেকে উত্তর ভেসে এল, সেটি বলল, আমার ধারণা পারবেন না।

কেন?

এই মাত্র তিনটি বাই ভার্বাল স্কাউটশিপের কন্ট্রোল লক ইন করেছে। যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরক দিয়ে এটিকে ধ্বংস করে দেবে।

আমি কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে একটি চেয়ারে বসে নিজেকে চেয়ারের সাথে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে নিতে নিতে বললাম, লক ইন করার মাইক্রো-সেকেন্ডের মাঝে আঘাত করা যায়। এখনো যখন করে নি–তার মানে তারা আঘাত করবে না।

কেন করবে না?

সম্ভবত তারা আমাদের পরিচয় জেনে গেছে।

লেন ফ্যাকাসে মুখে বলল, সর্বনাশ! আমরা তাহলে কী করব?

দেখি কী করা যায়। আমি দ্রুত চিন্তা করতে করতে বললাম, তুমি বাচ্চাগুলিকে চেয়ারগুলির মাঝে শক্ত করে বেঁধে দাও, আমার মনে হয় স্কাউটশিপটা নিয়ে কিছু লাফঝাঁপ দিতে হবে।

কী রকম লাফঝাঁপ?

বড় ধরনের। আমি একটা পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ভেঙে মহাকাশে বের হয়ে যাবার কথা ভাবছি।

লেন অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকাল। সে আমার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। আমি দুর্বলভাবে হেসে বললাম, আমাদের স্কাউটশিপ মহাকাশে যেতে পারে, আমাদের পিছু নিয়েছে সাধারণ বাই ভার্বাল সেগুলি মহাকাশে যেতে পারবে না।

কিন্তু আমরা কেমন করে মহাকাশে যাব?

আমি এখনো জানি না।

পর্যবেক্ষন কেন্দ্রের জানালা সবসময় বন্ধ থাকে।

কিন্তু যদি প্রচণ্ড গতিতে সোজাসুজি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের দিকে ছুটে যেতে শুরু করি সম্ভবত একটা জানালা খুলে যাবে। আমরা সেই জানালা দিয়ে বের হয়ে যাব।

কেন জানালা খুলবে?

মহাকাশযানকে রক্ষা করার জন্যে। একটা স্কাউটশিপ প্রচণ্ড গতিতে যেতে পারে, এর গতিশক্তি মেগাজুল পর্যন্ত হতে পারে। মহাকাশযান তার দেয়ালে মেগাজুল শক্তিতে আঘাত করতে দেবে না। সেটি মহাকাশযানের জন্য বিপজ্জনক।

লেন কোনো কথা না বলে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কিন্তু তোমার ধারণা যদি ভুল হয়?

আমি লেনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কন্ট্রোল প্যানেলে ঝুঁকে পড়ে বললাম, স্কাউটশিপ, আমি চাই তুমি ধীরে ধীরে গতিবেগ বাড়িয়ে উপরে ওঠে এস।

মহাকাশযানের ভেতরে আমার গতিবেগ বাড়ানোর উপায় নেই। স্কাউটশিপটি এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, এটি বিপজ্জনক।

ঠিক আছে, তুমি নিয়ন্ত্রণটি আমার হাতে দিয়ে দাও।

তোমার হাতে? তুমি স্কাউটশিপ কখনো নিয়ন্ত্রণ করেছ?

আমি সেটা নিয়ে আলোচনায় যেতে চাই না। আমি কোনো জটিল কাজ করতে যাচ্ছি না। সোজাসুজি মহাকাশযানের দেয়ালে আঘাত করতে যাচ্ছি–

স্কাউটশিপের মূল নিয়ন্ত্রণের জন্যে যে বোম রয়েছে সেটা স্পর্শ করতেই নিয়ন্ত্রণটুকু আমার হাতে চলে এল। আমি শক্তিকেন্দ্রে চাপ দিয়ে স্কাউটশিপের গতিবেগ বাড়াতে শুরু করি, আমার দুই পাশে দিয়ে মহাকাশযানের করিডোর পিছনে ছুটে যেতে শুরু করল। আমি গতিবেগ আরো বাড়ানোর চেষ্টা করতেই যোগাযোগ মডিউলে আমাদের পিছনে লেগে থাকা বাই ভার্বালের আরোহীর গলায় স্বর শুনতে পেলাম, চিৎকার করে কঠোর গলায় বলল, কিহা, আমি জানি তুমি স্কাউটশিপে আছ। এই মুহূর্তে নিচে নেমে আস, না হয় তোমাকে গুলি করব–

আমি কোনো উত্তর না দিয়ে স্কাউটশিপের গতিবেগ আরো বাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকি। কণ্ঠস্বরটি আবার কঠোর গলায় বলল, এই মুহূর্তে নিচে নেমে আস–এই মুহূর্তে–

আমি স্কাউটশিপের নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করার চেষ্টা করতে করতে মহাকাশযানের উপর দিয়ে ছুটে যেতে থাকি, উপরে স্বচ্ছ জানালাগুলি দেখা যাচ্ছে, এর কোনো একটিতে আমার আঘাত করতে হবে, আমি সাহস সঞ্চয় করতে থাকি, একটি স্কাউটশিপ নিয়ে প্রচণ্ড বেগে সোজাসুজি মহাকাশেনের দেয়ালে আঘাত করার মতো সাহস সম্ভবত আমার নেই।

আমি মহাকাশযানের উপরে দিয়ে ছুটে যেতে যেতে নিচে তাকালাম, অনেক নিচে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি–যানবাহন দেখা যাচ্ছে, আমাকে ঘিরে নানা ধরনের আলোর বিচ্ছুরণ হতে থাকে। সম্ভবত অনেকেই আমাকে লক্ষ করছে। আমি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণটুকু ধরে রাখি। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে, আমার নিঃশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে ওঠে, আমি স্কাউটশিপটাকে সোজাসুজি ওপরের দিকে ঘুরিয়ে আনতে শুরু করতেই হঠাৎ ভিতরে একটা নূতন কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। সেটি চাপা গলায় বলল, স্কাউটশিপের আরোহী, আমি একটি গোপন চ্যানেলে তোমার সাথে যোগাযোগ করছি, আমার কথা তুমি ছাড়া আর কেউ শুনছে না। তুমি আমার কথার কোনো উত্তর দেবে না।

কণ্ঠস্বরটি এক মুহূর্ত থেমে থেকে বলল, মাহাকাশযানের দেয়ালে আঘাত করে বের হয়ে যাবার পরিকল্পনাটির সাফল্যের সম্ভাবনা দশমিক দুই তিন। তুমি যদি চাও তোমাকে আমি অন্যভাবে রক্ষা করতে পারি। তার জন্যে স্কাউটশীপের পুরো নিয়ন্ত্রন আমাকে দিতে হবে। আমার কোড নম্বর সাত চার তিন দুই।

আমি অবাক হয়ে বিচিত্র কণ্ঠস্বরটি শুনছিলাম, ব্যাপারটি একটি ষড়যন্ত্র কী না যাচাই করার কোনো উপায় নেই। কণ্ঠস্বরটি আবার বলল, আমি দেখতে পাচ্ছি তোমাকে কয়েকটি বাই-ভার্বাল ধাওয়া করছে, তোমাকে গুলি করার সুযোগ পেয়েও গুলি করছে না, যার অর্থ এই স্কাউটশিপে তোমরা যারা আছ তারা সম্ভবত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের ট্রাকিওশান নেই যার অর্থ তোমরা পালিয়ে যাচ্ছ। মহাকাশযানের প্রচলিত পদ্ধতি থেকে যারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তাদের জন্যে আমার সমবেদনা রয়েছে, সেই জন্যে আমি তোমাদের সাহায্য করতে চাইছি। তুমি যদি আমার সাহায্য গ্রহণ করতে চাও কোড়-নম্বর সাত চার তিন দুইয়ে স্কাউটশিপের নিয়ন্ত্রণটুকু হস্তান্তর কর। আমাদের হাতে সময় খুব কম।

আমি লেনের দিকে তাকালাম, সে ফ্যাকাশে মুখে বসে আছে। তার দুই পাশে বাচ্চাগুলি বসে আছে, তাদের চোখ মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। স্কাউটশিপের পুরো ব্যাপারটুকু তারা অত্যন্ত মজার কোনো খেলা হিসেবে ধরে নিয়েছে। আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে কন্ট্রোল প্যানেলের একপাশে কোড়-নম্বরটি প্রবেশ করিয়ে স্কাউটশিপের নিয়ন্ত্রণটুকু হস্তান্তর করে দিলাম।

সাথে সাথে স্কাউটশিপটা বিদ্যুৎবেগে তার দিক পরিবর্তন করে উল্টোদিকে ছুটতে শুরু করে। খানিকদূর গিয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড গতিতে ঘুরে গিয়ে আবার সোজাসুজি উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। আমি উপরে তাকিয়ে হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম আমাদেরকে কোথাও নেয়া হচ্ছে।

মহাকাশযানটি একটি বিশাল চাকার মতো, এটি তৈরি করা হয়েছে মহাকাশে, দীর্ঘ সময় নিয়ে এর বিভিন্ন অংশ তৈরি করে এনে একটু একটু করে জুড়ে দেয়া হয়েছে। চাকার মতো অংশটির ঠিক মাঝখানে রয়েছে মহাকাশযানের শক্তিশালী ইঞ্জিন। ইঞ্জিনগুলি মহাকাশযানের সাথে ছয়টি রড দিয়ে লাগানো। রডগুলি ফাপা এবং এর ভেতর দিয়ে অনায়াসে কয়েকটা স্কাউটশিপ ঢুকে যেতে পারে। এই মুহূর্তে আমাদের স্কাউটশিপটা এরকম একটি ফাঁপা টিউবের মাঝে দিয়ে ভিতরে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। মহাকাশযানের এই অঞ্চলটি মানুষ বাসের অনুপোযোগী। এখানে বাতাস নেই, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই, মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে রক্ষা পাবার কোনো উপায় নেই। মহাকাশযানে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ বল তৈরি করার জন্যে এটি তার অক্ষের উপর ঘুরছে। সেন্ট্রিফিউগাল বল থেকে তৈরি হয়েছে মাধ্যকর্ষণের অনুভূতি। কেন্দ্রে সেই মাধ্যকর্ষন বলও নেই। এখানে এসে কেউ আশ্রয় নিতে পারে সেটি আমার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখতে পেলাম সত্যি সত্যি সেখানে আশ্রয় নেবার জন্যে আমরা স্কাউটশীপে ছুটে যাচ্ছি।

মহাকাশযানটি বিশাল এবং আমরা দীর্ঘ সময় এই অন্ধকার গহ্বর দিয়ে ছুটে যেতে থাকলাম। আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমরা জানি না আমার কথা বলা নিষেধ বলে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছিলাম না। আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইলাম এবং হঠাৎ মনিটরে একটা অনুজ্জ্বল আলো দেখা গেল। আলোটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে এবং আমি বুঝতে পারলাম সেটি একটি ডকিং স্টেশন। স্কাউটশিপটার গতিবেগ কমে আসে এবং ডকিং স্টেশনের নির্দিষ্ট জায়গায় সেটি নিজেকে শক্ত করে লাগিয়ে নিয়ে স্থির হয়ে দাড়াল। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না, ঠিক তখন আগের কণ্ঠস্বরটি শুনতে পেলাম। সেটি বলল, তোমরা স্কাউটশিপটা থেকে বের হয়ে আসতে পার। এখানে মাধ্যাকর্ষণ নেই, কাজেই তোমাদের ভেসে বের হয়ে আসতে হবে, ব্যাপারটিতে অভ্যস্ত হতে হয়তো একটু সময় নেবে।

আমি কথা বলতে পারব কী না বুঝতে পারছিলাম না, নিঃশব্দে চেয়ার থেকে নিজেকে মুক্ত করতেই ভেসে উপরে উঠে এলাম, তাল সামলে কোনোমতে দরজার কাছাকাছি এসে হ্যান্ডেলটা ধরে রাখলাম। কণ্ঠস্বরটি আবার বলল, তোমরা এখন নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছ, ইচ্ছে করলে কথা বলতে পার।

আমি দরজা খুলতে খুলতে বললাম, আমাদেরকে বাঁচানোর জন্যে ধন্যবাদ। কেন বাঁচিয়েছ জানলে আরো স্বস্তি বোধ করতাম।

কণ্ঠস্বরটি হালকা গলায় বলল, বলতে পার অল্প খানিকটা সমবেদনা এবং অনেকখানি কৌতূহল! তোমাদের স্কাউটশিপে যারা আছে তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারা সেই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ? তুমি নাকি অন্য কেউ?

আমি হেসে বললাম, না আমি নই। তারা আসছে।

আমার কথা শেষ হবার আগেই শিশুগুলি উচ্চঃস্বরে হাসতে হাসতে এবং আনন্দে গড়াগড়ি খেয়ে ভাসতে ভাসতে স্কাউটশিপের দরজা দিয়ে বের হয়ে আসতে থাকে। এক মুহূর্ত পর আমি আবার কণ্ঠস্বরটি শুনতে পেলাম সেটা শিস দেবার মতো শব্দ করে বলল, এরাই তাহলে সেই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ?

আমি মাধ্যকর্ষণহীন অবস্থায় অভ্যস্ত নই। শুধু মনে হতে থাকে যে কোথাও পড়ে যাচ্ছি, কোনোভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে করতে বললাম, হ্যাঁ, এরাই সেই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। কিন্তু তুমি কে?

আমি?

হ্যাঁ তুমি।

আমি সেরকম কেউ নই। একটু পরেই দেখবে। তোমরা ডকিং স্টেশন পার হয়ে ভিতরে চলে এসো।

স্কাউটশিপ থেকে নেমে শিশুগুলি একেকজন একেকদিকে ভেসে চলে যেতে শুরু করে এবং তাদের সবাইকে আবার ধরে আনতে লেন এবং আমার বিশেষ বেগ পেতে হল। শিশুদের সম্পূর্ণ বিনা কারণে আনন্দ পাওয়ার এবং সেই অকারণ আনন্দ অন্যদের মাঝে সঞ্চালিত করে দেয়ার একটা বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। দেখা গেল আমরাও শিশুগুলির পিছনে ছুটতে ছুটতে হাসাহাসি করছি।

পাশের ঘরটি মাঝারি আকারের, মাধ্যকর্ষণহীন যেকোনো জায়গার মতো এখানেও অসংখ্য যন্ত্রপাতি এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘরটিতে অনুজ্জ্বল একটা আলো জ্বলছে এবং ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় একটা পিলারে একজন মানুষ উল্টো করে বাধা। মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় উল্টো সোজা বলে কিছু নেই কিন্তু তবুও দৃশ্যটি দেখে আমরা চমকে উঠলাম। মানুষটি বৃদ্ধ, সত্যি কথা বলতে কী আমি এর আগে কোনো বৃদ্ধ মানুষ দেখি নি। নূতন প্রযুক্তিতে মানুষের চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ পড়ার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এই মানুষটির চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ ভয়াবহ ভাবে এসে স্থান নিয়েছে। তার মাথায় ধবধবে সাদা চুল, মুখে সাদা লম্বা দাড়ি-গোঁফ। তার মুখের চামড়া কুঞ্চিত, চোখ কোটরাগত। সেই কোটরাগত চোখ অঙ্গারে মতো জ্বলছে। মানুষটি আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি লী। সবাই ডাকে বুড়ো-লী। আমি বুড়ো-লীয়ের আস্তানায় তোমাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমি দুঃখিত তোমাদের কাছে আসতে পারছি না। বয়স হয়ে গিয়েছে, শরীরে জোর নেই, নিজেকে তাই পিলারের সাথা বেঁধে রেখেছি আজ প্রায় তিরিশ বছর।

লেন আর্ত শব্দ করে বলল, তিরিশ বছর?

হ্যাঁ। মহাকাশযানে যখন হানাহানি শুরু হল, তোমরা তখন নিশ্চয়ই শীতল ঘরে ঘুমিয়ে, আমাকে কিছু খুনোখুনির দায়িত্ব দিয়েছিল। করতে রাজি হই নি বলে খুব যন্ত্রণা গিয়েছে। পালিয়ে শেষ পর্যন্ত বুড়ো লী হঠাৎ কথা থামিয়ে বলল, তোমাদের কেমন জানি বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। তোমরা বিশ্রাম নিয়ে এসো। দেখতেই পাচ্ছ এটা নিয়মিত মানুষের আস্তানা নয় তোমাদের নিশ্চয়ই কষ্ট হবে। তবে জায়গাটা নিরাপদ। একেবারে শক্তিকেন্দ্রে আস্তানা করেছি তো কারো ধারে কাছে আসার ক্ষমতা নেই। আমার এখানে মানুষজন নেই, কাজ চালানোর মতো কিছু রবোট তৈরি করেছি, তারাই সাহায্য করে।

বুড়ো লী মুখ ঘুরিয়ে ডাকল, কিশি–

ঘরের মাঝে ইতস্তত যেসব যন্ত্রপাতি ঘুরে বেড়াচ্ছিল তাদের মাঝে বড় ধরনের একটি যন্ত্র হঠাৎ যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। দেখতে দেখতে দুপাশে দুটি যান্ত্রিক হাত এবং একটি বিদঘুটে মাথা গজিয়ে ওঠে। পিছনে ছোট একটা জেট ইঞ্জিন চালু হয়ে যায় এবং সেটি ভাসতে ভাসতে বুড়ো-লীয়ের দিকে এগিয়ে আসে।

বুড়ো লী রবোটটির দিকে তাকিয়ে বলল, এখানে অতিথি এসেছে। তুমি তাদের নিয়ে যাও। বিশ্রাম এবং খাবারের ব্যবস্থা কর।

রবোর্টটি কোনো কথা না বলে এগিয়ে যেতে থাকে। আমি এবং লেন কোনোভাবে শিশুগুলিকে ধরে বেঁধে তার পিছু পিছু যেতে থাকি। আসলে বুঝতে পারি নি, আমি সত্যিই অসম্ভব ক্লান্ত।

আমার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখলাম আমি ছোট ঘরটার মাঝামাঝি ভেসে আছি। আমাকে ঘিরে ইতস্ততভাবে আটজন শিশু ঘুমন্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিচে মেঝের কাছাকাছি একটা গ্রিলকে ধরে লেন আধশোয়া হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি নিচু গলায় বললাম, লেন, তুমি ঘুমাও নি?

ঘুমিয়েছিলাম, কিন্তু ঘুম ভেঙে গেল। মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় ভেসে ভেসে ঘুমিয়ে আমার অভ্যাস নেই। তা ছাড়া মনে হয় রিটালিন-৪০০ এখনো শরীরে রয়ে গেছে।

।আমি ঘরের মাঝে থেকে ভেসে ভেসে নিচে আসার চেষ্টা করতে করতে বললাম, আমিও ঘুমুতে পারছি না। কিন্তু বাচ্চাগুলি দেখেছ কী আরামে ঘুমিয়ে গেছে।

লেনের বিষণ্ণ মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে খানিকক্ষণ ঘুমন্ত বাচ্চাগুলির দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাসতে ভাসতে বাচ্চাগুলি যখন একজন আরেকজনের কাছে চলে আসে তখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। আবার ঘুমের মাঝেই একজন আরেকজনকে ছেড়ে দেয়, দুজন দুদিকে ভেসে চলে যায়। লেন ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এই সৃষ্টিগজতে শিশু থেকে সুন্দর কিছু নেই।

তুমি মনে হয় ঠিকই বলেছ। আমি কিন্তু আগে কখনো কোনো শিশুকে ভাল করে লক্ষ করি নি।

আমিও করি নি। একটা তথ্য কেন্দ্রে একবার দেখেছিলাম প্রাচীনকালে নাকি শিশুদের জন্ম হত মেয়েদের গর্ভে, সন্তান জন্ম দিতে হত অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে তারপর মেয়েটিকে সেই শিশুকে বুকের দুধ খাইয়ে বুকে ধরে বড় করতে হতো।

আমি মাথা নেড়ে বললাম, আমিও শুনেছি কথাটা–জন্মের পুরো ব্যাপারটা ছিল অবৈজ্ঞানিক। অনিশ্চয়তা আর বিপদ দিয়ে ভরা

লেন আমাকে বাধা দিয়ে বলল, গত কয়েকদিন এই বাচ্চাগুলিকে দেখে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ব্যাপারটা হয়তো খারাপ ছিল না। বাচ্চাগুলি আমার কাছাকাছি রয়েছে তাতেই তাদের জন্যে আমার বুকে কী ভয়ানক ভালবাসা জন্মে গেছে। একটি মেয়ে যখন বাচ্চাটিকে দীর্ঘ সময় নিজের গর্ভে ধরে রাখবে তখন তার জন্যে কী রকম ভালবাসা হবে তুমি চিন্তা করতে পার?

আমি ব্যাপারটা চিন্তা করে একটু শিউরে উঠে বললাম, আমার নূতন পদ্ধতিটাই পছন্দ–যেখানে শিশুর জন্ম হয় ল্যাবরেটরিতে, জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারদের তত্ত্বাবধানে। নিখুঁত সুস্থ সবল বুদ্ধিমান একটা শিশু পাওয়া যায়।

লেন একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যাই হোক, এসব নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। এখন নিজেদের কথা বলি, আমাদের এখন কী হবে?

আমি মুখে এক ধরনের হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বললাম, মনে আছে তুমি মানুষের নেতৃত্ব নিয়ে মারামারি ব্যাপারটি দেখতে চাইছিলে! এখাননা কী দেখতে চাও?

লেন মাথা নাড়ল, বলল, না। চাই না। যথেষ্ট দেখেছি। কিন্তু এখন কী হবে আমাদের? আমরা কী করব?

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, বুড়ো লীয়ের এই আস্তানাটা নিরাপদ। আমাদের আপাতত এখানেই থাকতে হবে।

লেন চারিদিকে তাকিয়ে বলল, এই ছোট জায়গায়? মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় ভেসে ভেসে? কয়েকদিনের মাঝেই শরীরে মাংশপেশী দুর্বল হয়ে যাবে তখন আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারব না–

মাংশপেশী ঠিক রাখার নিয়মকানুন আছে। তা ছাড়া চেষ্টা করে দেখা যাবে একটা শীতল ক্যাপসুল আনা যায় কিনা, তাহলে এখানেই একটা ছোট শীতল ঘর তৈরি করে ঘুমিয়ে পড়া যায়। পৃথিবীতে পৌঁছে ঘুম থেকে ওঠা যাবে।

সেটা কী করতে পারবে?

বুড়ো লী খুব কাজের মানুষ, দেখলে না আমাদের কী চমৎকার ভাবে উদ্ধার করে নিয়ে এল, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

লেন আমার হাত স্পর্শ করে বলল, আমি আর পারছি না কিহা।

আমার বুকের ভিতরে হঠাৎ লেনের জন্যে এক ধরনের বিচিত্র অনুভূতির জন্ম হয়, তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে এনে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু নরম কোমল ভালবাসার কথা বলতে ইচ্ছে করে, আমি অবশ্যি কিছুই করলাম না। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললাম, তোমাকে আরো শক্ত হতে হবে লেন। আরো অনেক শক্ত হতে হবে।

আমি যখন বুড়ো লীয়ের ঘরে গেলাম তখনো সে ঘরের মাঝামাঝি একটা। পিলার বাঁধা অবস্থায় ঝিমুচ্ছিল। তাকে ঘিরে নানারকম যন্ত্রপাতি জঞ্জাল ভেসে বেড়াচ্ছে। এক কোণােয় একটি ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাফিক স্ক্রিন, সেখানে মহাকাশযানের কিছু খবরাখবর প্রচারিত হচ্ছে। বুড়ো লী সেগুলি দেখছে কিনা ঠিক বোঝা গেল না। আমি কাছাকাছি পৌঁছাতেই সে চোখ খুলে তাকিয়ে বলল, কিছু একটা হবে এখন!

আমি থতমত খেয়ে বললাম, কিসের কী হবে?

জানি না। কিন্তু কিছু একটা হবে। আমি ত্রিশ বছর থেকে শুধু দেখছি–কখন কী হয় সেটা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আছে। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে এখন কিছু একটা হবে।

আমি কিছু বললাম না, কাছাকাছি ধরে রাখার কিছু নেই, একটু পরে পরে ওলটপালট খেয়ে যাচ্ছিলাম, এরকম অবস্থায় কারো সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলা যায় না।

বুড়ো লী আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কিছু খেয়েছ?

আমি মাথা নাড়লাম, না। শীতল ঘর থেকে বের হয়েছি, তাই কয়েকদিন না খেয়েই চলে যাবে।

আমার কাছে সত্যিকারের খাবার নেই। আঙ্গুরের রস দিয়ে তিতির পাখির ঝলসানো রোস্ট আর যবের রুটি যদি চাও তাহলে পাবে না। তবে আমার কাছে কিছু খাবারের ক্যাপসুল আছে, একটা দিয়ে সপ্তাহ দুয়েক চলে যায়। বাথরুমে যেতে হয় না–যা সুবিধে! বুড়ো লী হঠাৎ খিক খিক করে হাসতে থাকে।

আমি কিছু বললাম না। সে পকেট থেকে কয়েকটা খাবারের ক্যাপসুল বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, নাও সাথে রাখ।

আমি ক্যাপসুলগুলি পকেটে রাখতে রাখতে বললাম তোমার এই এলাকাটা কি নিরাপদ?

এই মহাকাশযানে কোনো এলাকা আর নিরাপদ নয়। তবে তুমি যদি জানতে চাইছ কেউ তোমাদের ধরে নিতে আসবে কিনা তাহলে ভয় পাবার কিছু নেই। বুড়ো লীকে কেউ ঘাটায় না।

কেন? তুমি শক্তিকেন্দ্রের কাছে বলে?

ঠিকই ধরেছ। শক্তি কেন্দ্রের চারিদিকে ঘিরে বিস্ফোরক লাগানো আছে আমি শুধু মুখে উচ্চারণ করব সাথে সাথে পুরো শক্তিকেন্দ্র উড়ে যাবে। মহাকাশযান হয়ে যাবে মহাকাশ কবরখানা–হা হা হা হা! বুড়ো লী খুব একটা মজার কথা বলেছে

এরকম ভাব করে হাসতে লাগল।

তুমি কেমন করে এই জায়গাটা দখল করলে?

বুড়ো লী তার মাথায় ঠোকা দিয়ে বলল, মাথা খাটিয়ে। যখন দেখতে পেলাম মহাকাশযানে ভাগ-বাটোয়ারা শুরু হয়ে গেছে তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম কয়দিনের মাঝেই কামড়া-কামড়ি শুরু হয়ে যাবে, এই বেলা নিরাপদ একটা জায়গায় আরাম করে আস্তানা না গেড়ে নিলে আর হবে না।

সবচেয়ে ভাল জায়গাতেই আস্তানা করেছ!

বুড়ো লী খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, না, সবচেয়ে ভাল জায়গাটা আমি পাই নি।

কে পেয়েছে?

কেউ পায় নি। মনে হয় কেউ পাবে না।

সেটা কোনো জায়গা?

বুড়ো লী আমার দিকে তাকিয়ে খিক খিক করে হাসতে শুরু করে, হাসতে হাসতে হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল, আমি শুনেছিলাম তুমি নাকি নিনীষ স্কেলে আট মাত্রার বুদ্ধিমান! সেটা কোনো জায়গা এখনো জান না?

না।

ঠিক আছে তাহলে নিজেই ভেবে ভেবে বের কর।

আমি খানিকক্ষণ বুড়ো লীয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, মূল তথ্যকেন্দ্র?

বুড়ো লী তার ভুরু নাচিয়ে বলল, আমি বলব না।

আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, দেখতেই পাচ্ছ নিনীষ স্কেলে বড় ত্রুটি আছে, আটমাত্রার মানুষের যেটুকু বুদ্ধিমান হবার কথা আমি সেটুকু বুদ্ধিমান নই। তাছাড়া আমি মাত্র অল্প কিছুদিন হল শীতল ঘর থেকে বের হয়েছি, সব কিছু এখনও ভাল করে জানিও না।

জানবে, এই মহাকাশযানে সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিস হচ্ছে তথ্য। আর যদি এক ধাক্কায় পুরো তথ্য জেনে নিতে চাও তাহলে মুক্ত এলাকা থেকে ঘুরে এস।

মুক্ত এলাকা? আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, সেটা কী?

তুমি এখনো মুক্ত এলাকার নাম শোন নি?

না-আমি এসেছি মাত্র অল্প কিছুদিন হল, কেউ আমাকে বলে নি।

ইচ্ছে করেই বলে নি, তুমি যদি দল ছেড়ে মুক্ত এলাকায় চলে যাও সেজন্যে।

মুক্ত এলাকায় কী রয়েছে?

মহাকাশযান নিয়ে যখন কামড়াকামড়ি শুরু হয়েছে, ভাগ-বাটোয়ারা যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছে তখন সবাই মিলে একটা জায়গা ঠিক করেছে যার নাম দেয়া হয়েছে মুক্ত এলাকা। ঠিক করা হয়েছে এই এলাকাটা স্বাধীন। কেউ সেটা নিতে পারবে না।

কিন্তু যার জোর বেশি সে দখল করে নিচ্ছে না কেন?

নিজেদের স্বার্থেই নিচ্ছে না। জায়গাটা থাকায় সবার জন্যে লাভ। শুনেছি রমরমা বাজার। সব কিছু পাওয়া যায়! সুন্দরী মেয়েমানুষ, সুদর্শন পুরুষ মানুষ থেকে শুরু করে পারমাণবিক অস্ত্র, আধুনিক বাই ভার্বাল–কী নেই!

এসব কিনতে পাওয়া যায়?

হ্যাঁ।

কী দিয়ে বেচা-কেনা হয়?

প্রথম প্রথম নাকি শুধু জিনিসপত্র বিনিময় হতো। এক মাত্রার বিস্ফোরক দিয়ে একটা বাই-ভার্বাল নিয়ে গেলে, একটা সুন্দরী মেয়েমানুষ দিয়ে ভাল একটা অস্ত্র। দুইটা চতুর্থ জেনারেশন রবোট দিয়ে একটা পঞ্চম জেনারেশানের রবোটএইরকম। কিছুদিন হল একটা ব্যাংক খুলেছে, এখন ইলেকট্রনিক কারেন্সি ব্যবহার হচ্ছে। ব্যাংকে মূল্যবান কিছু জমা দিলে তুমি কারেন্সি পেয়ে যাবে। সেই কারেন্সি দিয়ে অন্য কিছু কিনবে। এখানে সেটাকে ইউনিট বলে।

আমি হতবাক হয়ে বুড়ো লীয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থে এ ধরনের কথাবার্তা লেখা আছে, যেখানে মানুষের লোভকে ব্যবহার করে এরকম সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠত। তাই বলে এই মহাকাশযানে?

বুড়ো লী খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি ঘুরে আস, জায়গাটা তোমার ভাল লাগবে।

ভাল লাগবে? হ্যাঁ। বিচিত্র জিনিস মানুষের ভাল লাগে।

আমি ছোট ভাসমান গাড়িটি নিচে নামিয়ে আনলাম, কোথায় যেতে হবে কীভাবে যেতে হবে প্রোগ্রাম করা ছিল আমার নিজে থেকে কিছু করতে হয় নি। গাড়িটি নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে আমি দরজা খুলে বাইরে আসতেই হঠাৎ উদ্দাম এক ধরনের সংগীতের শব্দ শুনতে পেলাম। কাছাকাছি কোথাও এক ধরনের আনন্দোৎসব হচ্ছে বলে মনে হয়।

আরো কিছুদূর হেঁটে যেতেই আমি অসংখ্য মানুষকে দেখতে পেলাম, বিশাল এলাকায় ছোট বড় নানা আকারের ঘর, ভেতরে বাইরে উজ্জ্বল আলো, তার মাঝে তারা ব্যস্ত সমস্ত ভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি সদ্য মিয়ারার আস্তানা থেকে পালিয়ে এসেছি, ভেতরে ভেতরে একধরনের ভয় রয়েছে কেউ বুঝি দেখে আমাকে চিনে ফেলবে, কিন্তু সেরকম কিছুই হল না। মানুষের ভিড়ে আমি মিশে গেলাম–কেউ দ্বিতীয়বার আমার দিকে ঘুরে তাকাল না।

মহাকাশযানের এই মুক্তাঞ্চলে নানা ধরনের দোকান-পাট গড়ে উঠেছে। তার একটা বড় অংশ অন্ত্রের দোকান। বিশাল অতিকায় এবং বিচিত্র ধরনের অস্ত্র, বিভিন্ন মানুষজন শক্ত মুখে সেগুলি পরীক্ষা করে দেখছে। দেখে মনে হল মহাকাশযানে অস্ত্র তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। সব অস্ত্রই যে ভয়ংকর তা নয়, কিছু অস্ত্র প্রায় হাস্যকর। একটি অস্ত্র দাবি করেছে ক্রোধকে ব্যবহার করে সেটি দিয়ে গুলি করা যায়। কপালের মাঝে লাগানো একটি নল, মাথায় একধরনের হেলমেট, ক্রোধের অনুভূতিকে অনুভব করে সেটা নলটি থেকে একটা বিস্ফোরক ছুড়ে দেয়!

অস্ত্রের দোকানপাটের কাছেই রয়েছে গাড়ি, ভাসমান যান এবং-বাই ভার্বালের দোকান পাট। আমি একটু অবাক হয়ে দেখলাম যানবাহনের ব্যাপারটাতে একটা নূতন মাত্রা যোগ হয়েছে, সেগুলি এখন শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্যে তৈরি হয় নি। তার মাঝে নানা ধরনের অস্ত্র জুড়ে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় সেগুলিতে এখন অহেতুক সৌন্দর্য্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উজ্জল রং অপ্রয়োজনীয় নক্সা এবং নানাধরণের বিলাস সামগ্রী এগুলিতে গাদাগাদি করে রাখা আছে। এই মহাকাশযানটিতে যে একটি বিচিত্র ধরনের কালচার গড়ে উঠছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যানবাহনের দোকানে মানুষের ভিড় খুব বেশি নয়এগুলি মূল্যবান এবং মনে হয় সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।

এর পাশেই সুন্দরী পুরুষ এবং রমণী বেচাকেনার জায়গা। স্বল্প কাপড় পরে তারা মোহনীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, এবং তাদের ঘিরে মানুষের ভিড়, আমি ভিড় ঠেলে একটু এগিয়ে গেলাম, একজন কমবয়সী সুন্দরী মেয়েকে কেনার জন্যে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ দরদাম করছে, যে কারণেই হোক মূল্য নিয়ে তর্কবিতর্ক হচ্ছে। শুনতে পেলাম মধ্যবয়স্ক মানুষটি গলায় বিস্ময় ঢেলে বলল, কী বললে? দশ হাজার ইউনিট? এন্ড্রোমিডার কসম! এই দামে আমি একটা এটমিক ব্লাস্টার পেয়ে যাব!

মেয়েটির মালিক মুখ বাঁকা করে হেসে বলল, তাহলে এটমিক ব্লাস্টারই কিছু কেন? নিওন বাতি জ্বালিয়ে সেটা কোলে নিয়ে বসে থাকো, সেটার সাথে মিষ্টি মিষ্টি ভালবাসার কথা বলো–

তার কথার ভঙ্গিতে উপস্থিত মানুষেরা হো হো করে হেসে দিল, মধ্যবয়স্ক মানুষটা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, আর আমি এত দাম দিয়ে কিনে নিয়ে যদি দেখি এটা রবোট?

রবোট? মেয়েটার মালিক চোখ কপালে তুলে বলল, এই সুন্দরী মেয়েকে তোমার রবোট মনে হচ্ছে? চোখের দিকে তাকিয়ে দেখ কী দুঃখি চোখ, দেখ চোখের পানি একেবারে খাঁটি অশ্রু–ভাল করে দেখ!

মধ্যবয়স্ক মানুষটি মেয়েটির চোখের পানি সত্যিকারের অশ্রু কি না দেখার জন্যে এগিয়ে গেল এবং আমার হঠাৎ করে কেন জানি ব্যাপারটিকে একটি অসহনীয় ধরনের অমানবিক ব্যাপার বলে মনে হতে থাকে। আমি ভিড় ঠেলে বের হয়ে এলাম। আমার কাছে যদি দশ হাজার ইউনিট থাকত আমি তাহলে মেয়েটিকে কিনে মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু আমার কাছে একটি কপর্দকও নেই, বুড়ো লী বলেছে আমার কোনো অর্থের প্রয়োজনও নেই।

আমি ভিড় ঠেলে বের হয়ে হাঁটতে থাকি, কাছাকাছি অনেকগুলি খাবার জায়গা। সুন্দর টেবিল ঘিরে পুরুষ এবং রমণীরা সুদৃশ্য খাবার খাচ্ছে, বাতাসে খাবার এবং পানীয়ের ঝাঁঝালো গন্ধ। আমি হঠাৎ করে এক ধরনের তীব্র খিদে অনুভব করতে থাকি। শীতল ঘরে ঢোকার আগে আমি শেষবার সত্যিকার অর্থে খেয়েছিলাম, শরীরে নানা ধরনের জৈবিক পদার্থ থাকায় আমি খিদেয় কাতর হচ্ছি না, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে না, কিন্তু খাবারের লোভটি আমাকে তাড়না করতে থাকে। আমি সরে এলাম। কাছেই আলোকজ্জ্বল একটি ঘরের সামনে অনেকগুলি ছোট ছোট টেবিল। সেখানে কিছু পুরুষ এবং মহিলা খুব মনোযোগ দিয়ে একটি মনিটরে কী যেন লিখছে। আমি একটু এগিয়ে গেলাম এবং ঠিক তখন একটা রবোট এগিয়ে এসে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনি কি বুদ্ধিমান? যদি সত্যি বুদ্ধিমান হয়ে থকেন তাহলে আমাদের বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় অংশ নিন। যদি পঞ্চম স্তরে পৌঁছাতে পারেন আপনার পুরস্কার পাঁচ হাজার ইউনিট। ষষ্ঠ স্তরে দশ হাজার ইউনিট। আর যদি সপ্তম স্তরে পৌঁছাতে পারেন–রবোটটি তার গলায় একধরনের হাস্যকর উত্তেজনা ফুটিয়ে বলল, পঞ্চাশ হাজার ইউনিট! এক নয়, দুই নয়, দশ কিংবা বিশ নয়–পঞ্চাশ হাজার ইউনিট!

আমার কাছাকাছি যারা ছিল তাদের অনেকেই নিজেদের বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করার জন্য এগিয়ে গেল। আমার বুড়ো লীয়ের কথা মনে পড়ল, সে আমাকে বলেছিল আমার কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই। আমার যা প্রয়োজন নিজে থেকেই আমার কাছে চলে আসবে। সে হয়তো এর কথাটিই বলেছিল। আমার একটু লজ্জা লাগছিল তবুও সামনে এগিয়ে গেলাম।

মনিটরে নিজের কমিউনিকেশান্স মডিউলটি জুড়ে দেবার সাথে সাথেই সেখানে কিছু প্রশ্ন ভেসে আসে। সাধারণ যুক্তিতর্কের এবং সহজ গাণিতিক সমস্যা। প্রথম তিন চারটি স্তর খুব সহজেই সমাধান হয়ে গেল। পঞ্চম স্তরটি বেশ কঠিন। সমাধান বের করতে আমার বেশ সময় লেগে যায়। ষষ্ঠ স্তরে গিয়ে প্রথমবার আমার সন্দেহ হতে থাকে যে আমি হয়তো সমাধানটি বের করতে পারব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাধানটি বের হয়ে গেল। সপ্তম স্তরের সমস্যাটি মনিটরে এল খুব ধীরে ধীরে এবং আমি সেটিকে নিয়ে মগ্ন হয়ে যাবার আগের মুহূর্তে মনে হল আমাকে কেউ একজন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করছে এবং আমি চোখ তুলে তাকাতেই সোনালি চুলের একটি মেয়ে হঠাৎ করে চোখ সরিয়ে নিল। আমি আবার সমস্যাটির দিকে তাকালাম এবং ঠিক তখন আমার পিছনে দাঁড়ানো একজন মানুষ নিচু গলায় বলল, এন্ড্রোমিড়ার দোহাই! তুমি সপ্তম স্তরে চলে এসেছ!

আমি কোনো কথা না বলে লোকটার দিকে তাকালাম। লোকটার চোখে-মুখে বিস্ময়! সে অবাক হয়ে বলল, নিনীষ স্কেলে তোমার বুদ্ধিমত্তা কত? ছয়ের কম নয়, তাই না?

আমি মনিটরের দিকে তাকালাম এবং হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম আমি মহাকাশযানের লোভী মানুষদের একটা ফাদে পা দিয়ে ফেলেছি। এই মহাকাশযানের এখন সুন্দরী মেয়েমানুষ বা সুদর্শন পুরুষ থেকেও মূল্যবান সামগ্রী হচ্ছে বুদ্ধিমান মানুষ। এই পরীক্ষাকেন্দ্রটি আসলে সেরকম বুদ্ধিমান মানুষদের খুঁজে বের করার একটা ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছু নয়। আমি মনিটরটি টেবিলে রেখে উঠে দাড়ালাম, পিছনে দাঁড়ানো মানুষটি বলল, কী হল সমাধান করবে না?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, না!

কেন?

মনে হয় কঠিন।

চেষ্টা করে দেখ, চেষ্টা না করলে তুমি কেমন করে জানবে? পঞ্চাশ হাজার ইউনিট পেয়ে যেতে পার!

আমি কমিউনিকেশান্স মডিউলে আমার পুরস্কারের দশ হাজার ইউনিট জমা করতে করতে বললাম, এত ইউনিট দিয়ে আমি কী করব?

লোকটা অবাক হয়ে বলল, কী বলছ তুমি! ইউনিট কত কাজে আসে। তুমি আর আমি মিলে একটা এজেন্সি খুলতে পারি। মহাকাশযানের কঠিন সব সমস্যার সমাধান করে দেব। তুমি দেখবে বুদ্ধি খাটানোর অংশ, আমি দেখব অর্থনৈতিক দিক। রাজি আছ?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, না রাজি নই–তারপর লোকটাকে কোনো কথা না বলতে দিয়ে আমি বের হয়ে এলাম। খাবারের জায়গার পাশেই মানুষ বেচা-কেনার দোকান। আমি এখন ইচ্ছে করলে কমবয়সী সেই দুঃখী মেয়েটাকে কিনে ফেলতে পারি। তাকে বলতে পারি তুমি এখন স্বাধীন, তোমার যেখানে ইচ্ছে তুমি চলে যাও। কোন মধ্যবয়স্ক মানুষ চোখে লালসা নিয়ে আর তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে না।

কালো চুলের সুন্দরী মেয়েটাকে ঘিরে যেখানে মানুষের ভিড় ছিল জায়গাটা এখন ফাঁকা। মোটা মতো একজন মানুষ দেয়ালে হেলান দিয়ে চৌকোনা একটা পাত্র থেকে এক ধরনের পানীয় খাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখানে একটা মেয়ে বিক্রি হচ্ছিল, কালো চুলের, দুঃখী মতোন চেহারা

সোমারিয়া! বিক্রি হয়ে গেছে।

বিক্রি হয়ে গেছে?

হ্যাঁ। ভাল দাম পেয়েছে, নয় হাজার ইউনিট। খাঁটি মেয়ে মানুষ ছিল, কোনো ভেজাল নেই।

আমি শুকনো গলায় আবার বললাম, বিক্রি হয়ে গেছে?

হ্যাঁ। তোমার দরকার কোনো মেয়ে মানুষ? আমার হাতে আছে একটা। আশি ভাগ খাঁটি। যকৃত আর কিডনিগুলি কৃত্রিম–এ ছাড়া সব খাটি। রুপালি চুল নীল চোখ। ধবধবে সাদা চামড়া—

আমি হেঁটে বের হয়ে এলাম, হঠাৎ কেন জানি আমার ভিতরে এক ধরনের বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

আমি পুরো এলাকাটি ঘুরে বেড়াতে থাকি। বিচিত্র সব দোকানপাট, বিচিত্র ধরনের মানুষ, তারা তাদের থেকেও বিচিত্র সব কাজকর্ম করছে। ভালবাসা ঘৃণা লোভকে পুঁজি করে এখানে এখানে তাদের ব্যবসা চলছে। আমি খাবারের এলাকাটা হেঁটে এলাম, এখন আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। অস্ত্রশস্ত্রের দোকান রয়েছে। মানুষ যে কী পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে এখানে এলে সেটা বোঝা যায়। ঘুরতে ঘুরতে আমিও একটা জিনিস কিনলাম পাঁচশ ইউনিট দিয়ে। জিনিসটা বিক্রি করছিল একজন বুড়ো মতোন মানুষ। সে সেটার নাম দিয়েছে মন মেশিন। সেটা দিয়ে নাকি একজন মানুষ তার মানসিক শক্তি দিয়ে অন্য মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কেমন করে কাজ করে?

বুড়ো মতন মানুষটি বলল, বলা যাবে না।

কেন?

ব্যবসার কারণে।

আমি হতচকিতের মতো মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, কী দ্রুত এই মহাকাশযানের সব মানুষকে লোভ শিখিয়ে দেয় হয়েছে। আমি মন মেশিনটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কাজ করে তার কী প্রমাণ আছে?

তুমি হেলমেটটা মাথায় পর আমি দেখাচ্ছি, প্রমান করে দিচ্ছি।

আমি হেলমেটটা মাথায় পরতে গিয়ে থেমে গেলাম, হেলমেটে মস্তিষ্কের বিদ্যুৎ প্রবাহের সংকেত ধরার ছোট ছোট মডিউল দেখা যাচ্ছে এবং সেটা কী ভাবে কাজ করে হঠাৎ করে আমি বুঝে গেলাম। আমি হাসি গোপন করে বললাম, এটার নাম মন মেশিন দেয়া ঠিক হয় নি।

বুড়ো মানুষটি ভুরু কুচকে বলল, কেন একথা বলছ?

আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি মস্তিষ্কের বিদ্যুৎ তরঙ্গ থেকে এক ধরনের সংকেত বের করে ট্রান্সমিটারে দিয়ে অন্যত্র পাঠাচ্ছ! মনের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

বুড়ো মানুষটির চোয়াল ঝুলে পড়ল, সে আমতা আমতা করে বলল, তুমি কেমন করে বুঝতে পারলে?

আমি হেলমেটটা দেখিয়ে বললাম, ভিতরে তাকালে যে কেউ বুঝতে পারবে।

না, বুড়ো মানুষটি মাথা নেড়ে বলল, পারবে না। কেউ পারে নি। তুমি কাউকে বলে দিও না, আমি তোমাকে অর্ধেক দামে দিচ্ছি।

আমি অর্ধেক দাম দিয়ে মন মেশিন কিনে নিয়ে বের হয়ে এলাম। দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্রের কাছাকাছি জৈবিক জিনিসপত্রের দোকন। ভেতরে ঢুকে আমার গা গুলিয়ে গেল কিন্তু আমি আবার বের হয়েও আসতে পারলাম না। বিচিত্র একটা কৌতূহল নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখি। মানুষের হৃদপিণ্ড, কিডনি, ফুসফুস এবং যকৃত বিক্রয় হচ্ছে। জীর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাল্টে নেয়ার জন্যে কাছেই অপারেশান থিয়েটার খোলা হয়েছে। মানুষজন দরদাম করে পছন্দসই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেছে নিয়ে সেই অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে যাচ্ছে। এ ধরনের ব্যাপার যে ঘটতে পারে নিজের চোখে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতাম না।

এর কাছাকাছি রয়েছে জীবাণুর দোকান। সম্ভাব্য সবধরনের জীবাণু সেখানে পাওয়া যায়। কিটুনিয়া ভাইরাস নামের এক ধরনের ভাইরাসের ছোট ক্যাপসুল দেখতে পেলাম, সেগুলি এত ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে এটাকে ফেটে যাবার জন্যে প্রোগ্রাম করা যায় তারপর কারো শরীরে ঢুকিয়ে দিলে সেটি তার মস্তিষ্কে এসে নির্দিষ্ট সময়ে ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন সেল ধ্বংস করে দেয়। দুই হাজার ইউনিট করে দাম। কী কাজে লাগবে আমি জানি, না। তবু কেন জানি একটা কিটুনিয়া ভাইরাসের ক্যাপসুল কিনে নিলাম। মহাকাশযানে যেরকম পরিস্থিতি হয়তো কখনো নিজের জন্যে মৃত্যু বেছে নিতে হবে!

বুড়ো লী বলেছিল এখানে এলে আমার ভাল লাগবে, কিন্তু আমার ভাল লাগছে না। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম এই মুক্ত এলাকায় এসে আমি বরং আশ্চর্য ধরনের এক দূষিত বিষণ্ণতায় ভুগতে শুরু করেছি।

আধো অন্ধকারে একটা জটলা থেকে বের হবার সময় হঠাৎ আমার কনুইয়ে কে যেন স্পর্শ করল, আমি সেখানে একটু তীক্ষ্ণ জ্বালা অনুভব করলাম, মুখ ঘুরিয়ে দেখি সোনালি চুলের সেই মেয়েটি, আমার চোখে চোখ পড়তেই সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। আমি কনুইটি লক্ষ করলাম, সেখানে কিছু নেই, মেয়েটি কি আমাকে কিছু বলতে চাইছে? আমাকে কিছু করতে চাইছে?

আমি খানিকটা দুশ্চিন্তা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে তথ্য বিনিময় কেন্দ্রটি আবিষ্কার করলাম। বাইরে বড় বড় করে লেখা, “নামমাত্র মূল্যে মহাকাশযানের সর্বশেষ তথ্য।” বুড়ো লী নিশ্চয়ই এই জায়গাটার কথা বলেছিল, আমি এক নজর দেখে ভেতরে ঢুকে গেলাম এবং সাথে সাথে আমার দিকে একজন মানুষ এগিয়ে এল। মানুষটি সুপুরুষ এবং সে বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন, আমার দিকে ভদ্রতার হাসি হেসে বলল, তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?

আমি এই মহাকাশযানের সর্বশেষ তথ্য জানতে এসেছি।

সুদর্শন মানুষটির মুখে সহৃদয় একটা হাসি ফুটে উঠল, সে নিচু গলায় বলল, খুব বড় একটা তথ্য এসেছে, জানতে চাও?

কী তথ্য?

তুমি সেটা শুনতে চাইলে আমার জানা প্রয়োজন তুমি তার জন্যে কত ইউনিট খরচ করতে চাও।

আমি ইতস্ততঃ করে বললাম, তথ্যের জন্যে যে অর্থ ব্যয় করতে হয় আমি সেটাও জানতাম না। আমার ধারণা ছিল তথ্য জানতে পারা হচ্ছে মানুষের জন্মগত অধিকার।

মানুষটা ষড়যন্ত্রীদের মতো মাথা এগিয়ে এনে বলল, বেঁচে থাকাও মানুষের জন্মগত অধিকার, এই মহাকাশযানে মানুষজন কীভাবে মারা পড়ছে তুমি জান?

আমি ভাল জানতাম না, জানার কোনো কৌতূহলও অনুভব করলাম না। একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, আমার কাছে সাড়ে সাত হাজার ইউনিটের মতো রয়েছে। কী ধরনের তথ্য পাওয়া যাবে?

মানুষটা জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বলল, সাড়ে সাত হাজার ইউনিট অনেক অর্থ হতে পারে–মোটামুটি সুন্দরী একটা মেয়েমানুষ কিনে ফেলা যায় কিন্তু তথ্যের জন্যে এটা খুব বেশি নয়। কিন্তু তোমাকে আমি বড় তথ্যটা এর বিনিময়েই দিয়ে দেব। তার আগে তোমাকে কিছু অঙ্গীকার করতে হবে। তথ্যটা কাউকে বলবে না, যদি বল তোমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এই সব রুটিন ব্যাপার।

বেশ। কী করতে হবে বল।

আমাকে বেশ সময় নিয়ে নানা ধরনের অঙ্গীকার করতে হল সেসব অঙ্গীকারপত্র কমিউনিকেশান্স মডিউল দিয়ে নিশ্চিত করতে হল এবং তখন সুদর্শন মানুষটি আমার হাতে ছোট একটা ক্রিস্টাল ধরিয়ে দিয়ে বলল, নাও এই সব তথ্য এখন তোমার।

আমি ক্রিস্টালটি আমার কমিউনিকেশান্স বক্সে লাগাতে লাগাতে জিজ্ঞেস করলাম, তথ্যটি কীসের উপর?

মানুষটি ঝুকে পড়ে বলল, মিয়ারার আস্তানায় নিনীষ স্কেলে আটমাত্রার একজন মানুষ এসেছিল, নাম কিহা। সে এবং লেন নামে আরো একটি মেয়ে মূল তথ্যকেন্দ্রের জন্যে আলাদা করে রাখা আটজন মানুষকে নিয়ে পালিয়ে গেছে।

আমি হতচকিতের মতো মানুষটির দিকে তাকালাম, মানুষটি আমার দৃষ্টি দেখে ভাবল আমি তার কথা বিশ্বাস করছি না। সে গলায় জোর দিয়ে বলল, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না, সব তথ্য আছে এই ক্রিস্টালে। আমি নিজে দেখেছি।

আমি খানিকক্ষন চেষ্টা করে বললাম, আর কোনো তথ্য আছে?

আর কী চাও তুমি? গত দশ বছরে এরকম তথ্য বের হয় নি। ছয় মাত্রার গোপন খবর এটা। কিহা নামের মানুষটার ছবিও আছে এখানে।

সুদর্শন মানুষটি হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল, মজার ব্যাপার জান–তোমার সাথে কিহার চেহারার অনেক মিল।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। ক্রিস্টালটা দাও আমি দেখাচ্ছি।

থাক, আমি নিজেই দেখে নেব।

লোকটাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমি বের হয়ে এলাম। আমার খবর এখানে আট দশ হাজার ইউনিটে বিক্রি হচ্ছে? কী সর্বনাশা কথা!

ঘর থেকে বের হতেই দেখতে পেলাম সোনালি চুলের সেই মেয়েটি সামনে থেকে সরে গেল। আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললাম, আমার পরিচয় নিশ্চয়ই এখানকার কিছু মানুষ কিংবা রবোটের কাছে গোপন নেই। তারা এখন কী করবে সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।

সোনালি চুলের মেয়েটি যেই হয়ে থাকুক আর তার দলে যত মানুষই থাকুক তারা আমাকে কিছু করল না। আমি আমার ছোট ভাসমানযানে করে উড়ে উড়ে অসংখ্য জটিল গলি ঘুচি দিয়ে বুড়ো লীয়ের আস্তানায় ফিরে এলাম। ভাসমান যানটি দেখতে সাদামাটা হলেও তার মাঝে নানারকম যন্ত্রপাতি রয়েছে, কেউ পিছু নিলে সেটি বুঝতে পারে এবং যেভাবেই হোক তাকে খসিয়ে দেয়। কেউ আমার পিছু নেয়নি, এবং নিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত আসতে পারেনি।

ডকিং স্টেশনে ভাসমান যানটি রেখে আমি ভেসে ভেসে দরজার কাছে পৌঁছালাম। বুড়ো লী ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল, কেমন সময় কেটেছে কিহা?

ভাল।

ভেতরে আস।

আমি ভেতরে আসার আগে নিজেকে ভাল করে পরীক্ষা করতে চাই। আমার মনে হচ্ছে আমার শরীরে কিছু একটা ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে।

বুড়ো লী খানিকক্ষণ চুপ করে রইল তারপর বলল, যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে আমার কিছু করার নেই কিহা। আমি তোমার শরীর থেকে সেটা বের করতে পারব না। আমার যন্ত্রপাতি দশ বৎসরের পুরানো! তুমি ভেতরে এস, তোমার মুখে শুনি কী হয়েছে।

আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। তখনো জানতাম না সেই মুহূর্তে বুড়ো লীয়ের মৃত্যুদণ্ডাদেশ স্বাক্ষরিত হয়ে গেছে।

(চলবে)