চতুর্থ এবং শেষ পর্ব

#টুকুনজিল- মুহম্মদ জাফর ইকবাল



শাস্তি

ব্ল্যাক মার্ডারের সবাই এসে গেছে, কামাল শুধু আসতে পারে নি, কার জন্মদিনে নাকি বেড়াতে গিয়েছে। আমার জন্যে পরোটা আর সবজি কিনে এনেছে পল্টু। খুব তৃপ্তি করে খেলাম আমি, মনে হচ্ছিল বছরখানেক থেকে না খেয়ে আছি! ক্লাসঘরে মিটিং বসেছে। ব্ল্যাক মার্ডারের মিটিং আমি আগে কখনো দেখি নি, তার কায়দাকানুনও জানি না, তাই চুপচাপ বসে আছি। তারিক মনে হয় ব্ল্যাক মার্ডারের দলপতি, উঠে দাঁড়িয়ে মিটিঙের কাজ শুরু করল। গলা কাঁপিয়ে খুব কায়দা করে বলল, কমরেডস ব্ল্যাক মার্ডারের বীর সদস্যরা, সংগ্রামী অভিনন্দন।

যারা বসে ছিল, তার হাত তুলে বলল, অভিনন্দন। আজকে আমরা এসেছি অত্যন্ত জরুরি একটা মিশন নিয়ে। অত্যন্ত, অত্যন্ত জরুরী মিশন বিলু—যে আজকে আমাদের নূতন সদস্য হবে,তার জীবন আজ বিপন্ন। দুর্বৃত্তদের হাতে তার প্রাণ আজ কুক্ষিগত। কে তাকে রক্ষা করবে? 

সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল, ব্ল্যাক মার্ডার। 

কে দুর্বৃত্তদের বিষদাঁত ভেঙে দেবে? 

সবাই উত্তর দিল, ব্ল্যাক মার্ডার। 

আমরা সভার কাজ এক্ষুণি শুরু করছি। কারো কিছু বলার আছে? 

সুব্রত দাঁড়িয়ে বলল, আমি বিলু ওরফে নাজমুল করিমকে আমাদের নূতন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার জন্যে প্রস্তাব করছি।

মাহবুব দাঁড়িয়ে বলল, আমি এই প্রস্তাব সর্বান্তকরণে সমর্থন করছি। 

তারিক গম্ভীর গলায় বলল, কেউ কি এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য রাখতে চায় ? 

দেখা গেল কারো কোনো আপত্তি নেই। 

তারিক বলল, বিলু, রক্ত-শপথ নিতে তোমার কি কোনো আপত্তি আছে?

আমি কথা বলার জন্যে মাত্র মুখ খুলেছি, ঠিক তখন কে যেন লাথি মেরে ক্লাসরুমের দরজা খুলে ফেলল। সবাই আমরা লাফিয়ে উঠলাম, অবাক হয়ে দেখলাম, দরজায় লাল মুখের কয়েকটা বিদেশি দাঁড়িয়ে আছে। দু'জনের হাতে মেশিনগানের মতো একধরনের অস্ত্র, সোজা আমাদের দিকে তাক করে আছে। লাল মুখের বিদেশিটা হলুদ দাঁত বের করে বলল, কুনু গুলমাল নয়। গুলমাল হইলে গুল্লি হইবে।

যার অর্থ কাউকে বুঝিয়ে দিতে হল না, কোনো গোলমাল না, একটু গোলমাল করলেই গুলি করে দেবে।

কেউ কোনো গোলমাল করল না। তারিকের মুখ হ্যাঁ হয়ে গেছে। পল্টুর দিকে তাকানো যায় না, মনে হয় এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে। সুব্রত একবার মুখ খুলছে, আরেকবার মুখ বন্ধ করছে মাছের মতো।

লাল মুখের বিদেশিটা আমাদের মুখের দিকে এক জন এক জন করে তাকাল। নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজছে। আমাকে দেখেও কিন্তু চিনতে পারল না। আমার কাছে যেরকম সব বিদেশিকে দেখতে একরকম মনে হয়, সেরকম তাদেরও নিশ্চয়ই এই বয়সী সব ছেলেদের দেখতে একরকম মনে হয়। বিদেশিগুলো খানিকক্ষণ নিজেদের মাঝে কথা বলল, তারপর আবার আমাদের দিকে তাকাল, হুঙ্কার দিয়ে বলল, বিললু কোথায় ?

তারিক সবার আগে ব্যাপারটা একটু আঁচ করতে পারে, তারপর খুব একটা সাহসের কাজ করে ফেলল। হাত তুলে বলল, বিলু গন হোম। বাড়ি চলে গেছে।

হোয়াট ? এবারে সবাই মাথা নাড়ল, ইয়েস ইয়েস। গন হোম। ঠিক এ সময় লালমুখো বিদেশি দু’জনকে ঠেলে বব কার্লোস এসে ঢুকল। তার পিছনে আরো মানুষ আছে, আমি ভালো কাপড়-পরা কালকের সেই দেশি মানুষটাকেও দেখলাম। বব কার্লোস আমাদের দিকে একনজর দেখেই আমাকে বের করে ফেলল। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ইংরেজিতে বলল, ঐ তো বিললু।

আমার নামটা পর্যন্ত ঠিক করে উচ্চারণ করতে পারে না। বব কার্লোসের কথা শুনে মেশিনগান হাতের বিদেশিটা হঠাৎ ভয়ঙ্কর রেগে উঠল। এক পা এগিয়ে এসে তারিকের চুলের মুঠি ধরে প্রায় ঝটকা মেরে উপরে তুলে ফেলে, হুঙ্কার দিয়ে বলে, ইউ লায়ার। ইউ লিটল স্কাউন্ড্রল।

তারিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। লালমুখে বিদেশিটা হাত তুলে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে প্রচণ্ড জোরে মারল তারিকের মুখে। তারিক একেবারে ছিটকে গিয়ে পড়ল নিচে, আমি দেখলাম ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু উঠতে পারল না।

বিদেশিটা ভয়ঙ্কর মুখ করে এগিয়ে যায় মেশিনগানটা হাতে নিয়ে। গুলি করে দেবে কি না, গুলি করল না, পা তুলে জোরে মারল তারিককে-তারিক ছিটকে গিয়ে পড়ল অন্য পাশে। 

আমার হঠাৎ মনে হল মাথার মাঝে যেন একটা বোমা ফেটে গেল হঠাৎ। প্রচণ্ড রাগে আমি একেবারে অন্ধ হয়ে মনে হল শুওরের বাচ্চার মাথাটা ছিড়ে নিই এক টান দিয়ে। চিৎকার করে বললাম, থাম শুওরের বাচ্চা—

পশুর মতো মানুষটা আমার দিকে তাকাল, বলল, হোয়াট?

শুওরের বাচ্চার ইংরেজি কী হবে? চিন্তা করে পেলাম না, বললাম, ইউ পিগ—

লোকটা মনে হল খুব অবাক হয়ে গেল শুনে। লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এল আমার দিকে। আমি ফিসফিস করে বললাম, টুকুনজিল—

টুকুনজিল বলল, আমি আছি। কোনো ভয় নেই তোমার।

জানে মেরো না কিন্তু!

মারব না ? জানে মারলে মনে হয় ভালো হবে।

হোক। জানে মারবে না।

ঠিক আছে। তুমি যেটা বল।

মেশিনগান হাতে বিদেশিটা আমার কাছে এসে আমার চুলের ঝুঁটি ধরার চেষ্টা করছিল, বব কার্লোস প্রচন্ড ধমক দিল, বিললুকে ধরবে না—

লোকটা থেমে গেল। কিন্তু আমার তো থামলে হবে না। চিৎকার করে বললাম, কত বড় সাহস, তুই আমার বন্ধুর গায়ে হাত দিস! কত বড় সাহস! তোর গায়ের চামড়া যদি আমি খুলে না নিই—

আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম লোকটার উপর, সাথে সাথে পল্টু, মাহবুব, সুব্রত, নান্টু— সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল একসাথে। লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল, দমাদম কিল-ঘুসি-লাথি পড়তে থাকে, পাথরের মতো শরীর লোকটার, কিছু হয় না, কেমন যেন অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। টুকুনজিল এখনো হাত দেয় নি, যখন দেবে তখন আর বাছাধনকে দেখতে হবে না।

গা-ঝাড়া দিয়ে হঠাৎ উঠে দাড়াল লোকটা। হাতের মেশিনগানটা তুলে নিয়ে ট্রিগারটা টেনে দেয় হঠাৎ। ক্যাটক্যাট করে ভয়ঙ্কর শব্দ করে গুলি বের হয়ে আসে, ঝনঝন করে জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ে, ধোয়ায় ঘর অন্ধকার হয়ে যায় এক মুহূর্তে। কাউকে কি মেরে ফেলেছে?

তাকলাম চারদিকে, না, কারো কিছু হয় নি, ভয় পেয়ে সবাই পিছনে সরে গেছে সময়মতো। পিশাচের মতো লোকটা হলুদ দাঁত বের করে ভয়ঙ্কর একটা মুখ করে তাকাল সবার দিকে ।

কার্লোস বলল, কুইক। কুইক। তাড়াতাড়ি। মেশিনগান হাতে লোক দুটি আমার দিকে এগিয়ে এল। আমি একটু অপেক্ষা করি, আরেকটু কাছে আসতেই লাফিয়ে ঘুরে একটা লাথি মেরে দিলাম বদমাইশটাকে ।

টুকুনজিল হাত লাগাল আমার সাথে। লাথি খেয়ে লোকটা ছিটকে উপরে উঠে গেল গুলির মতো। ছাদে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে লোকটা ঘুরতে ঘুরতে সিলিং ফ্যানের মাঝে বেঁধে গেল। সেখান থেকে কী ভাবে জানি আবার ছিটকে উপরে উঠে যায়, ছাদে আবার ভয়ঙ্করভাবে ঠুকে গিয়ে পাঁইপাঁই করে ঘুরতে ঘুরতে নিচে পড়তে থাকে। ক্লাসের পিছনে বেঞ্চটাতে আছাড় খেয়ে পড়ে বদমাইশটা। টুকুনজিল কোনো মায়া দেখায় নি, এত জোরে নিচে আছড়ে পড়ল যে বেঞ্চটা ভেঙে গেল মাঝখানে। লোকটার নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হয়ে আসে, আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না এখনো।

আমি এবার মেশিনগান হাতে দুই নম্বর লোকটার দিকে তাকালাম। সে হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, আমি যখন হ্যাঁচকা টান দিয়ে তার কাছ থেকে মেশিনগানটা কেড়ে নিলাম, সে বাধা দেয়ার সাহসও পেল না। মানুষ যেভাবে পাটখড়ি ভেঙে ফেলে, হাঁটুতে চাপ দিয়ে আমি মেশিনগানটা ভাঙার চেষ্টা করলাম। টুকুনজিল নিশ্চয়ই বুঝতে পারে নি আমি কি করতে চাইছি, প্রথমবার তাই ভাঙতে পারলাম না। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করতেই সেটা মট করে ভেঙে দু’টুকরা হয়ে গেল পাটখড়ির মতো। ঘরে টু শব্দ নেই, সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি লোকটার কলার চেপে ধরার চেষ্টা করলাম, অনেক লম্বা, ভালো করে ধরা গেল না। কিছু আসে-যায় না তাতে, আমি হাত ঘুরিয়ে একটা ঘুসি চালালাম। লোকটা পাঁইপাঁই করে ঘুরতে ঘুরতে ছিটকে উপরে উঠে গেল, ছাদে ঠোকা খেয়ে ধরাম করে নিচে পড়ল কাটা কলাগাছের মতো। এই লোকটা বেশি কিছু করে নি বলে তার শাস্তিও হল কম ।

এবারে আমরা সবাই ছুটে গেলাম তারিকের কাছে। তাকে টেনে সোজা করলাম সাবধানে, মেরেই ফেলেছে নাকি কে জানে! তারিক চোখ পিটপিট করে তাকাল, কপালের কাছে কেটে গেছে খানিকটা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারিক—কেমন আছিস তুই ? কেমন আছিস ?

তারিক জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করল। শুনলাম টুকুনজিল বলছে, ভালোই আছে এখন।

সত্যি ? 

হ্যাঁ, একটা ধমনী ছিঁড়ে গিয়েছিল ভেতরে, ঠিক করে দিয়েছি। 

তুমি ঠিক করে দিয়েছ? তুমি?

হ্যাঁ। চামড়া ফুটো করে শরীরের ভেতর ঢুকে গেলাম— 

শরীরের ভেতর ঢুকে গেলে? 

তারিক ফিসফিস করে বলল, কার সাথে কথা বলছিস তুই ? 

আমি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, বলব তোদের। আগে এদের টাইট করে নিই।

আমি এবারে বব কার্লোসের মুখের দিকে তাকলাম। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম, এবারে তুমি।

বব কার্লোসের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল সাথে সাথে, মাথা নেড়ে বলল, নো, নো, প্লিজ।

আমি দাঁতে দাঁত ঘষে বললাম, তুমি হচ্ছ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী, সাইন্টিস্ট। তুমি এক শ’ এগারো বিলিওন ডলার খরচ করে এসেছ এখানে, তোমার কাছে মানুষের জানের কোনো দাম নেই-

আমার বাংলা কথা বুঝতে পারছে না সে, মাথা ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে সে এদিকে-সেদিকে। আমি হুঙ্কার দিয়ে বললাম, এমন শাস্তি দেব আমি, যে, তুমি জন্মের মতো সিধে হয়ে যাবে। 

পল্টু অনুবাদ করার চেষ্টা করল, স্ট্রেট ফর দা হোল লাইফ। 

আমি কার্লোসের দিকে দিয়ে নির্দেশ করতেই সে মাটি থেকে উপরে উঠতে থাকে, ফুট খানেক উপরে উঠে সে স্থির হয়ে যায়। সত্যি কথা বলতে কি, তাকে দেখাতে থাকে বোকার মতো। কোনো মানুষ যদি শূন্যে ঝুলতে থাকে তার পক্ষে কোনোরকম গাম্ভীর্য দেখানো খুব শক্ত।

ক্লাসঘরের সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে কার্লোসের দিকে। নিজের চোখকে কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, কিন্তু চোখের সামনে দেখে অবিশ্বাস করবে কেমন করে? আমি সবার দিকে তাকালাম, জিজ্ঞেস করলাম, কি শাস্তি দেয়া যায় বল তো ?

তারিক বলল, সারা জীবনের জন্যে ঝুলিয়ে রেখে দে। 

পল্টু মাথা নাড়ল, না, না, ক্লাসের ভেতরে না। বাইরে, বাইরে— 

সুব্রত বলল, চেহারাটা বাঁদরের মতো করে দে। 

নাকটা ঘুরিয়ে দে, নাকের গর্তগুলো উপরে। প্রত্যেক বার নাক ঝাড়ার সময় রুমাল দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখতে হবে—

খারাপ না আইডিয়াটা! হাত আর পাগুলো পালটে দে। যেখানে হাত সেখানে পা, যেখানে পা সেখানে হাত-

বাইরে হঠাৎ অনেক লোকজনের গোলমাল শোনা গেল। গুলির শব্দ শুনে সবাই ছুটে আসছে। আমাদের পালাতে হবে এক্ষুণি, নাহয় ঝামেলা হয়ে যেতে পারে। আমি বব কার্লোসের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি বড় বিজ্ঞানী, কিন্তু তুমি বড় খারাপ মানুষ।

বব কার্লোস অসহায় মুখ করে আমার দিকে তাকাল। আমি ভালো কাপড়-পরা দেশি মানুষটিকে বললাম, কি বলছি বুঝিয়ে দিল।

লোকটা ছুটে কাছে এসে হড়বড় করে বব কার্লোসকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে থাকে। আমি চোখ পাকিয়ে বললাম, বিজ্ঞানী যদি খারাপ হয় সেটা খুব ভয়ঙ্কর, বিজ্ঞানীদের হতে হয় ভালো। কিন্তু তুমি ভালো না, তুমি খারাপ, অনেক খারাপ। তাই তোমার কাছ থেকে সব বিজ্ঞান সরিয়ে নেব আমি। আজ থেকে তুমি আর বিজ্ঞানের একটি কথাও জানবে না-একটি কথাও না--তুমি হবে সাধারণ এক জন মানুষ।

বব কার্লোস ফ্যাকাসে মুখে হাতজোড় করে বলল, নো-নো-নো-- আমি ফিসফিস করে বললাম, টুকুনজিল— 

বল ! 

ব্যাটাকে ঝুলিয়ে রাখতে কোনো কষ্ট হচ্ছে তোমার? 

না। কোনো কষ্ট না। 

বব কার্লোসের মাথাটা খালি করে দিতে পারবে? না পারলে থাক। 

আগে কখনো করি নি। কপাল দিয়ে ঢুকে যার, মস্তিষ্কের যে নিউরোনগুলোতে তথ্য আছে, সেগুলো খালি করে দিতে হবে। মনে হয় পারব।

দেখ চেষ্টা করে। আর যেন ব্যাটা পৃথিবী কোনো ক্ষতি করতে না পারে।

পারবে না।

অনেক মানুষের হৈচৈ শোনা গেল। আমি বললাম, ব্ল্যাক মার্ডার, পালা এখন। 

পালাব কেন? নান্টু গরম হয়ে বলল, পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেব না? 

ধরাতে পারবি না। পুলিশের বাবা ওরা কিনে রেখেছে। সময় থাকতে পালা। না হলে উল্টো ঝামেলায় পড়ে যাবি। আমার কথা শোন।

তাই বলে এত বড় বদমাইশ– 

আর বদমাইশি করতে পারবে না। জীবনেও করতে পারবে না। 

আমি তারিককে তুলে বললাম হাঁটতে পারবি তারিক? 

পারব, যত ব্যথা পেয়েছিলাম এখন আর সেরকম ব্যথা লাগছে না। 

অনেক লোকজন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল, অনেকে লাঠি হাতে এসেছে, কাকে ধরে দু'এক ঘা লাগাবে বুঝতে পারছে না। অনেক ভিড় হৈচৈ, তার মাঝে আমরা বের হয়ে গেলাম, কেউ লক্ষ করল না! কেমন করে লক্ষ করবে? ঘরের মাঝখানে একটা মানুষ শূন্যে ঝুলে আছে, তখন কেউ কি আর অন্যকিছু লক্ষ করতে পারে?

আমরা রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছিলাম, পল্টু বলল, বিলু, তুই কেমন করে এতসব করলি?

বলব, সব বলব। আগে তারিককে বাসায় পৌঁছে দে কেউ-এক জন। আর শোন, আজ স্কুলে যা দেখেছিস ভুলেও কাউকে বলিস না। একেবারে সর্বনাশ হয়ে যাবে কিন্তু। বব কার্লোসের দলবল ভীষণ ভয়ঙ্কর, আমাদের সবাইকে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেবে, তবু কেউ কিছু করতে পারবে না।

সত্যি? 

হ্যাঁ, সত্যি। আজ সবাই বাসায় যা। আমি বলব।

আমি বাসায় ফিরে যেতে যেতে ডাকলাম, টুকুনজিল। 

বল। 

বব কার্লোসের কী অবস্থা হল? 

এখনো ঝুলিয়ে রেখেছি। 

সে কী? কেমন করে? তুমি তো আমার সাথে কথা বলছ! 

হ্যাঁ, তোমার সাথে একটু কথা বলি আবার ওখানে যাই—খুব তাড়াতাড়ি করতে পারি আমি। মাইক্রোসেকেন্ডে দু’বার ঘুরে আসি।

তাই তো, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। কী হচ্ছে এখন? 

অনেক মজা হচ্ছে এখন। হা হা হা।

কি মজা হচ্ছে? 

পুলিশ এসেছে সবাই মিলে পা ধরে টানছে নামানোর জন্য।

নামাতে পারছে না ? 

না। কেমন করে পারবে? একটু তোমার সাথে কথা বলি, আবার ওখানে গিয়ে ধরে রাখি। 

কতক্ষণ ধরে রাখবে? 

বেশিক্ষণ না। খবরের কাগজ থেকে লোক আসছে। তারা আসার আগেই ছেড়ে দেব—বেশি জানাজানি না হওয়াই ভালো, কি বল ?

হ্যাঁ।

খানিকক্ষণ পর টুকুনজিল বলল, ভারি মজা হচ্ছে এখন।

কি মজা ?

প্যান্ট ধরে টানতেই প্যান্টটা খুলে এসেছে। লাল রঙের একটা আন্ডারআয়ার পরে ঝুলে আছে এখন। ভারি মজা হচ্ছে। হা হা হা।

লোকজন কি অবাক হচ্ছে?

ভারি অবাক হচ্ছে। ছেড়ে দেব এখন ?

দাও।

বিদেশিগুলো এখন টানছে। ছেড়ে দিচ্ছি।

দাও।

হা হা হা ।

কি হল?

সবাই মিলে হুড়মুড় করে পড়েছে নিচে। ভারি মজা হল আজকে।

এখন কী হচ্ছে?

বব কর্লোস এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। তাকে এক জন জিজ্ঞেস করছে দুই-এর সাথে দুই যোগ করলে কত হয়, ভেবে বের করতে পারছে না। আবার তাকে সব শিখতে হবে। একেবারে গোড়া থেকে। উচিত শিক্ষা হল। কি বল ?

💚💚💚💚

ফেরা

ছোট খালা আমাকে দেখে সরু চোখে তাকিয়ে বললেন, কোথা থেকে আসা হয়েছে লাটসাহেবের ?

আমি কিছু বললাম না। ছোট খালা চিৎকার করে উঠলেন এবারে, কাল সারা রাত কোথায় ছিলি ?

আমি এবারেও কিছু বললাম না। কী বলব ছোট খালাকে? বব কার্লোসের দল ধরে নিয়ে গিয়েছিল? টুকুনজিল আমাকে বাঁচিয়ে এনেছে? ছোট খালাকে এটা বিশ্বাস করানো থেকে মনে হয় মাথাটা কেটে হাতে নিয়ে নেয়া সোজা! আমি তাই সে চেষ্টা করলাম না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। .

কি হল, কথা বলছিস না কেন?

আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

অনেক শিক্ষা হয়েছে আমার। ভেবেছিলাম বুবুর জন্যে একটা কাজ করব, তোকে মানুষ করে দেব। লাভের মাঝে লাভ হল কি? গ্রামের ছেলে শহরে এসে গুণ্ডা হয়ে গেলি। গুন্ডা! একেবারে পরিষ্কার গুন্ডা। সুযোগ পেলেই রাস্তায় গিয়ে মারপিট করে আসিস। 

ছোট খালা একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলেন, কাল সারা রাত কোথায় ছিলি? কোথায়? মদ-গাঞ্জাও কি খাওয়া শুরু করেছিস এই বয়সে ? সারা রাত যে তোর ছোট খালু হাসপাতাল আর থানায় দৌড়াদৌড়ি করেছে, সেই খবর কি আছে? এখন ড্যাংড্যাং করে লাটসাহেব বাড়ি ফিরে এলেন। বাপের বাড়ির বান্দী পেয়েছিস আমাকে যে তোর জন্যে রান্না করে বসে থাকব সারা রাত।

হঠাৎ টুকুনজিলের কথা শুনতে পেলাম, দেব থামিয়ে? 

কেমন করে ? 

মস্তিষ্কের যে অংশে কথা বলার কন্ট্রোল, সেটা একটু পাল্টে দিলেই হবে। দেব? 

না, থাক। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছোট খালার বকুনি শুনতে থাকি।

ঘন্টাখানেক পর বল্টু আমাকে একটা চিঠি দিয়ে গেল। বাড়ি থেকে এসেছে। চিঠিটা নিশ্চয়ই খুলে পড়ে আবার আঠা দিয়ে লাগানো হয়েছে। আঠাটা এখনো শুকায় নি। আমি সেটা নিয়ে মাথা ঘামালাম না। ভিতরে রাঙাবুবুর একটা চিঠি। রাঙাবুবু লিখেছেঃ

বিলু 

ভেবেছিলাম তোকে লিখব না। কিন্তু না লিখেই থাকি কেমন করে? বাবার খুব শরীর খারাপ, গত এক সপ্তাহ থেকে বিছানায়। তোকে দেখার জন্যে খুব ব্যস্ত হয়েছেন। মাঝরাতে উঠে বসে থাকেন, বলেন, দরজা খোল, বিলু এসেছে।

তুই চলে আয়, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে বাবা আর বাঁচবেন না। বাড়িতে তুই ছাড়া পুরুষমানুষ নাই। মনে হয় এখন তোকে দায়িত্ব নিতে হবে। বাবার পাগলামিটাও খুব বেড়েছে। বড় কষ্ট হয় দেখলে।

রাঙাবুবু।

আমি চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল, সবকিছু অর্থহীন হয়ে গেল। হঠাৎ বাবা মারা যাবেন? তাহলে আমার আর থাকবে কে? বিছানায় মাথাগুজে আমি ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললাম।

টুকুনজিল আমাকে ডাকল, বিলু।

কি?

তোমার কী হয়েছে, বিলু? মন-খারাপ?

হ্যাঁ।

অনেক মন- খারাপ ? 

হ্যাঁ টুকুনজিল, আমার অনেক মন খারাপ। আমার বাবার নাকি অনেক শরীর খারাপ। রাঙাবুবু লিখেছে, বাবা নাকি মরে যাবেন।

আমি আবার ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করলাম। টুকুনজিল বলল, তুমি কেঁদো না বিলু, তুমি যখন অনেক মন খারাপ করে কাঁদতে শুরু কর, তখন তোমার মস্তিষ্কের কম্পনে চতুর্থ মাত্রার অপবর্তন শুরু হয়; সেটা ভালো না। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায় তখন।

আমি চোখ মুছে বললাম, ঠিক আছে, আমি আর কাঁদব না। 

এখন তুমি কী করবে?

আমি বাড়ি যাব। এক্ষুণি। ট্রেন ছাড়বে কখন কে জানে। ট্রেন না থাকলে বাসে যাব। 

তোমাকে আমি তোমার বাবার কাছে নিয়ে যাব ?

পারবে নিতে? পারবে ?

কেন পারব না !

কেমন করে নেবে ?

আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যাব।

সত্যি ? কতক্ষণ লাগরে যেতে ?

দেখতে-দেখতে পৌঁছে যাবে তুমি।

চল তাহলে যাই। চল! চল! এক্ষুণি চল।

যাওয়ার আগে ছোট খালাকে বলে যেতে হবে। রান্নাঘরে কী কাজ করছিলেন, গিয়ে বললাম, ছোট খালা, আমার বাবার খুব অসুখ আমি বাড়ি যাব। 

ছোট খালা অবাক হওয়ার ভান করলেন, বললেন, কি অসুখ?

জানি না।

ঠিক আছে, বাড়ি যেতে চাইলে যাবি। তোর খালু আসুক।

আমি এখনই বাড়ি যাব।

এখন কেমন করে যাবি? ট্রেনের সময় দেখতে হবে না? ছোট খালা আমাকে পুরোপুরি বাতিল করে দিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিলেন। ছোট খালার সাথে আর কথা বলার চেষ্টা করে লাভ নেই। আমি আমার ঘরে এসে একটা কাগজে একটা ছোট চিঠি লিখলাম।

ছোট খালা ও খালুঃ

রাঙাবুবু লিখেছে, বাবার খুব শরীর খারাপ। আমি তাই বাড়ি চলে গেলাম। আমার জন্যে আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না। আমি ঠিকভাবে বাড়ি পৌঁছে যাবো। 

ইতি বিলু।

একটু ভেবে নিচে লিখলাম,

পুনঃ আমি এখন থেকে বাড়ি থেকেই পড়াশোনা করব। আমার জন্যে আপনাদের অনেক ঝামেলা হল।

চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলের উপর রেখে আমি চুপি চুপি ছাদে চলে এলাম।

ভরা-দুপুর এখন রাস্তায় রিকশা যাচ্ছে মানুষজন হাঁটাহাঁটি করছে। পাশের ছাদে এক জন কাপড় নেড়ে দিচ্ছে। কার্নিশে দুটো শালিখ প্রচণ্ড ঝগড়া করছে কী-একটা নিয়ে। আমি তার মাঝে টুকুনজিল কে বললাম, টুকুনজিল।

বল।

চল যাই। কোথায় যেতে হবে তোমাকে বলে দিই।

আমি জানি।

জান ! আমি অবাক হয়ে বললাম, কেমন করে জান ?

তুমি যা জান আমি তাই জানি। আমি তোমার মস্তিষ্কের মাঝে দু'বেলা ঘুরে বেড়াই। হা হা হা।

তুমি আমার বাড়ি গিয়েছ?

হ্যাঁ।

বাবাকে দেখেছ?

হ্যাঁ।

কেমন আছে বাবা ? কেমন আছে?

টুকুনজিল রহস্য করে বলল, চল, গেলেই দেখবে।

বল না, এখন বল।

উহুঁ, তুমি প্রস্তুত ?

হ্যাঁ।

চল আমরা আকাশে উড়ে যাই।

পরমুহূর্তে আমি বাতাসে ভেসে উপরে উঠে গেলাম। আমার সমস্ত শরীর যেন পাখির পালকের মতো হালকা। প্রথম কয়েক মুহূর্ত ভয়ের চোটে আমি প্রায় নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলাম, মনে হতে থাকল এই বুঝি পড়ে গেলাম আকাশ থেকে, হাড়গোড় ভেঙে ছাতু হয়ে গেলাম জন্মের মতো।

কিন্তু আমি পড়ে গেলাম না, বাতাসে ভেসে আরো উপরে উঠে গেলাম। ভেবেছিলাম নিচে থেকে একটা রৈরৈ রব উঠবে, লোকজন চিৎকার করে কেলেঙ্কারি শুরু করে দেবে, কিন্তু কী আশ্চর্য, একটি মানুষও লক্ষ করল না। কেউ যেটা কখনো আশা করে না, সেটা দেখার চেষ্টাও করে না, তাই খোলা আকাশে আমি নির্বিঘ্নে পাখির মতো উড়ে গেলাম।

আমার মিনিটখানেক লাগল ব্যাপারটায় অভ্যস্ত হতে। তখন আমি আস্তে আস্তে একটু একটু হাত-পা লাড়তে শুরু করলাম। পানিতে মানুষ যেরকম করে সাঁতার কাটে অনেকটা সেভাবে। আমার মনে হতে লাগল আমি নীলগাঙে সাঁতার কেটে যাচ্ছি। একটু অভ্যাস হবার পর আমি একটা ডিগবাজি দিলাম বাতাসে, ঘুরপাক খেলাম কয়েকবার, তারপর চিলের মতে দু'হাত মেলে উড়ে যেতে থাকলাম আকাশে।

কী মজা উড়তে, টুকুনজিল!

তাই নাকি?

হ্যাঁ, তুমি তো জান। তুমি তো উড়ে বেড়াও।

হ্যাঁ, আমি নিজে তো উড়তে পারি না, আমার মহাকাশযানে করে আমি উড়ে বেড়াই।

প্লেনের মতন ?

অনেকটা সেরকম, কিন্তু তার থেকে অনেক সাবলীল। প্লেনের আকাশে ওড়ার জন্যে রানওয়ে লাগে, নামার জন্যেও রানওয়ে লাগে। তা ছাড়া যখন যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে যেতে পারে না, একটা জায়গায় দাঁড়িয়েও থাকতে পারে না। আমার মহাকাশযান তা পারে। তা ছাড়া আমি অসম্ভব দ্রুত যেতে পারি। এত দ্রুত যে তুমি চিন্তাও করতে পারবে না।

হ্যাঁ। সে জন্যেই কার্লোস তোমাকে এভাবে ধরতে চেয়েছিল। ধরে বুঝতে চেয়েছিল তুমি কী ভাবে সেটা কর।

হ্যাঁ। কিন্তু জ্ঞানের মাঝে কোনো শর্টকাট নেই। আমি যদি পৃথিবীর মানুষকে তাদের অজানা কিছু বলে দিই, তাহলে সেটা তো আর জ্ঞান হল না, সেটা হল ম্যাজিক। সেই ম্যাজিক পৃথিবীর মানুষ নিয়ন্ত্রণ করবে কেমন করে? অনেকটা হবে তোমাদের গল্পের দৈত্যকে বশ করার মতো। একটু যদি ভুল হয়, তাহলে উল্টো সেই দৈত্য তোমাকে ধ্বংস করে ফলবে।

তা ঠিক।

আমি একটা মেঘের মাঝে ঢুকে যাচ্ছিলাম, ভিজে কুয়াশার মতো মেঘ। মেঘ থেকে বের হতে হতে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা টুকুনজিল, আমি এইভাবে উড়ছি কেমন করে? তুমি ঠিক কী ভাবে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছ?

তোমার ভাষায় বলা যায় আমি তোমাকে ঘাড়ে করে নিয়ে উড়ে যাচ্ছি। কিন্তু যেহেতু আমি খুব ছোট, তাই তোমার শরীরের এক জায়গায় ধরে না রেখে শরীরের তিন হাজার দু শ নয়টি ভিন্ন ভিন্ন বিন্দুতে ধরে নিয়ে যাচ্ছি। আমি খুব দ্রুত যেতে পারি, কাজেই সেটা কোনো সমস্যা নয়। নিচে থেকে তোমাকে উপরে ধরে রেখেছি, তুমি টের পাচ্ছ না, কারন এক-একটা বিন্দুতে আমি এক আউন্স থেকেও কম চাপ দিচ্ছি।

টুকুনজিল একটু থেমে বলল, একটা প্লেন আসছে।

আমি ভয় পেয়ে বললাম, আমাকে ধরতে?

না। যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে। দেখতে চাও?

কোনো ভয় নেই ?

না। অনেক নিচে দিয়ে যাচ্ছে, তোমার নিঃশ্বাস নিতেও কোনো অসুবিধে হবে না। গতিবেগ একটু বেশি, তাই তোমাকে ঘিরে কোনো ধরনের একটা বলয় তৈরি করে দিতে হবে।

পারবে করতে ?

পারব। হ্যাঁ, চল যাই।

আমি হাত দুটি উঁচু করলাম, মানুষ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে যেভাবে। সোজা উপরে উঠে ডান দিকে ঘুরে গেলাম পাখির মতো।

প্লেনটা বেশি বড় না। পাখার দু’পাশে দুটি প্রপেলার প্রচণ্ড শব্দ করে ঘুরছে। প্লেন যে এত শব্দ করে আমি জানতাম না, প্রথমে খালিকক্ষণ কানে হাত দিয়ে থাকতে হল, একটু পর অবশ্যি শব্দটা অভ্যেস হয়ে গেল, হতে পারে টুকুনজিল কিছু একটা করে দিল যেন শব্দটা শুনতে না হয়। টুকুনজিলের অসাধ্য কিছু নেই! আমি প্লেনের পাশে উড়তে উড়তে সাবধানে একটা পাখার উপর দাঁড়ালাম। বাতাসে আমার চুল উড়ছে, মেঘের মাঝে উড়ে যাচ্ছি আমি, কি যে চমৎকার লাগছে তা আর বলার নয়। 

প্লেনের গোল গোল জানালা দিয়ে মানুষজন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, কেউ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না, চোখ বিস্ফারিত, মুখ হাঁ করে খুলে আছে। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লাম, সবাই এত হতবাক হয়ে গেছে যে, কেউ হাত নেড়ে আমাকে উত্তর দিল না। শুধু একটা ছোট বাচ্চা খুশিতে হেসে আমার দিকে হাত নাড়তে শুরু করল। আমি বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে হাসলাম, তারপর আবার হাত নাড়লাম, বাচ্চাটা আরো জোরে হাত নেড়ে লাফাতে শুরু করল।

এবারে বাচ্চাটার দেখাদেখি আরো কয়েকজন হাত নাড়ল আমার দিকে।

টুকুনজিল বলল, চল ফিরে যাই।

চল।

আমি দুই হাত উপরে তুলে একটা ডিগবাজি দিলাম বাতাসে। তারপর দু হাত দু পাশে ছড়িয়ে প্লেনের মতো উড়ে গেলাম ডানদিকে। ঘুরে একবার পিছনে তাকলাম আমি, প্লেনের সব মানুষ এবারে পাগলের মতো হাত নাড়ছে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি শেষবারের মতো হাত নেড়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। অনেক দিন মনে রাখবে সবাই পুরো ব্যাপারটা!

নিচে নামাতে নামাতে টুকুনজিল আমাকে একেবারে মাটির কাছাকাছি নামিয়ে আনল। ধানক্ষেত, নদী, নৌকা, ছোট ছোট বন-জঙ্গল, কী চমৎকার দেখায় উপর থেকে। চাষীরা কাজ করছে মাঠে, বৌ-ঝিরা কলসি নিয়ে পানি আনছে পুকুর থেকে, মাঠে খেলছে বাচ্চারা।

মজার ব্যাপার হল, কেউ আমাকে খেয়াল করে দেখছে না। মানুষেরা মনে হয় দরকার না হলে উপরের দিকে তাকায় না। কেন তাকাবে, যা কিছু দরকার সবই তো নিচে মাটির সাথে আমি এবারে আরো নিচে নেমে এলাম।

মাঠে গোল্লাছুট খেলছে বাচ্চারা, আমি একেবারে নিচে নেমে তাদের মাথার কাছ দিয়ে উড়ে আবার আকাশে উঠে গেলাম। বাচ্চাগুলো একেবারে হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি হাত নাড়লাম, সবাই হাত নাড়ল আমার দিকে। ছোট একটা বাচ্চা শুধু পিছনে পিছনে দুই হাত উপরে তুলে ছুটে আসতে থাকে, আমি উড়ব-আমি উড়ব--

আমার কী মনে হল জানি না, নিচে নেমে এসে বাচ্চাটার দুই হাত ধরে তাকে উপরে নিয়ে আসি। সেও ভাসতে থাকে আমার মতো, তখন সাবধানে ছেড়ে দিই তাকে বাচ্চাটি ভাসতে ভাসতে নিচে নেমে যায়, আমি উড়ে যাই সামনে। টুকুনজিলের অসাধ্য কোনো কাজ নেই!

এবারে সব বাচ্চা হাত তুলে পিছনে পিছনে ছুটতে থাকে, আমি উড়ব-আমি উড়ব-আমি উড়ব!

কিন্তু আমার সময় নেই, দেরি হয়ে যাচ্ছে বাড়ি পৌঁছাতে। হাত নেড়ে নেড়ে বিদায় নিয়ে উড়ে উড়ে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেলাম।

টুকুনজিল বলল, আমরা প্রায় এসে গেছি।

সত্যি ?

হ্যাঁ, চিনতে পারছ না?

আমি নিচে তাকলাম, ঐ তো গাঙ, ঐ তো নীলগাঙের পাশে স্কুলঘর, নীলাঞ্জনা হাই স্কুল। ঐ তো বড়সড়ক। ঐ তো দূরে আমাদের বাড়ি। বাড়ির পিছনে জঙ্গল। ঐ তো জঙ্গলের পিছনে জোড়া নারকেল গাছ। কখনো উপর থেকে দেখি নি, তাই প্রথমে চিনতে পারি নি।

আমি বললাম, টুকুনজিল, বাবাকে দেখতে পাও?

হ্যাঁ।

কোথায় ?

একটা মাদারগাছের সামনে চুপ করে বসে আছেন।

কেউ কি আছে বাবার আশেপাশে ?

না, নেই।

তাহলে আমাকে বাবার কাছে নামাও।

ঠিক আছে।

আমি এবারে শোঁ শোঁ করে নিচে নেমে আসি। স্কুলঘরের পাশে দিয়ে উড়ে নারকেলগাছের পাশে মাদারগাছের কাছাকাছি নেমে হঠাৎ বাবাকে দেখতে পেলাম। গালে হাত দিয়ে মাদারগাছের সামনে উবু হয়ে বসে আছেন। আমি কাছাকাছি আসতেই বাবা হঠাৎ কী মনে করে ঘুরে তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেলেন। আমি উড়ে এসে খুব ধীরে ধীরে বাবার সামনে নামলাম। 

বাবা একটু হেসে বললেন, বিলু, বাবা তুই এসেছিস? আমি যে আকাশে উড়ে এসেছি, সেটা দেখে বাবা একটুও অবাক হলেন না, মনে হল ধরেই নিয়েছেন আমি উড়ে আসব।

আমি বাবার হাত ধরে বললাম, বাবা, তোমার শরীরটা নাকি ভালো না? 

কে বলেছে? 

রাঙাবুবু। 

রাণু। রাণুটা একেবারে বোকা। আমি একটা হাঁচি দিলেই মনে করে অনেক অসুখ।

বাবা মাদারগাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন, যেতে হয় এখন, জনাব। ছেলেটা এসেছে এতদিন পরে, মায়ের কাছে নিয়ে যাই। বড় খুশি হবে।

আমি বাবার হাত ধরে বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম, রাঙাবুবু লিখেছিল তুমি একেবারে বিছানায়, তুমি তো বেশ হাঁটছ, বাবা।

আমি একেবারে বিছানাতেই ছিলাম। মনে হচ্ছিল আর বুঝি বাঁচবই না। এই ঘন্টাখানেক আগে কী হল, হঠাৎ শুনি ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, মনে হল যেন বুকের মাঝে কে জানি চিমটি কাটল। তারপর তুই বিশ্বাস করবি না, হঠাৎ মনে হল শরীরটা অনেক ঝরঝরে হয়ে গেছে। তুই আসবি বলেই মনে হয়।

টুকুনজিল! আমি বুঝে গেলাম বাবা কেমন করে হঠাৎ ভালো হয়ে গেছেন। টুকুনজিল বাবাকে ভালো করে দিয়েছে! নিশ্চয়ই তাই! সে জন্যে আমার সাথে রহস্য করছিল, বাবার কথা বলছিল না! আমি টুকুনজিলকে ডাকলাম কয়েকবার, নেই ধারেকাছে। কে জানে আবার চট করে মঙ্গল গ্রহটা দেখতে গেছে কি না?

বাড়ির উঠানে আসতেই লাবু আমাদের দেখে ফেলল, তারপর চিৎকার করতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। সেকেন্ডের মাঝে বাড়ির ভেতর থেকে সবাই বের হয়ে এল, মা, রাঙাবুবু, বড়বুবু, বড়বুবুর ছোট ছেলেটা—সবাই। মা ছুটে এসে আমাকে একেবারে বুকে চেপে ধরলেন, বললেন, ইস, শরীরটা একেবারে শুকিয়ে গেছে।

রাঙাবুবু বলল, বিলু, তুই এখন কেমন করে এলি? ট্রেন তো আসবে সন্ধ্যেবেলা! 

বাবা বললেন, উড়ে এসেছে। 

রাঙাবুবু চোখ পাকিয়ে বলল, উড়ে এসেছে? 

হ্যাঁ। কী সুন্দর উড়তে শিখেছে বিলু! একেবারে পাখির মতো। দেখলে অবাক হয়ে যাবি।

পাখির মতো ?

হ্যাঁ, একেবারে পাখির মতো উড়তে পারে। বাবা ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বিলু, একটু উড়ে দেখাবি এখন?

মা ধমক দিলেন বাবাকে, চুপ করেন তো আপনি।

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে দুর্বলভাবে হেসে বললেন, দেখলি বিলু, আমার কথা কেউ বিশ্বাস করে না। তুই চলে যাবার পর আমার আর কথা বলার মানুষ নেই।

মা বললেন, বিলু বাবা যা, হাত-পা ধুয়ে আয়, খাবি।

আমি একটা গামছা নিয়ে বের হয়ে গেলাম, কে জানে কলতলায় দুলালকে পেয়ে যাব কি না, আমাকে দেখে কী অবাক হয়ে যাবে! হঠাৎ টুকুনজিলের কথা শুনতে পেলাম, বিলু? তুমি এখান থেকে চলে গিয়েছিলে কেন? এরা সবাই তোমাকে কী অসম্ভব ভালবাসে। তরঙ্গ কম্পন চার দশমিক সাতের মাঝে---

ভালবাসবে না কেন ? আমার মা-বাবা ভাই-বোন--- 

তাহলে তুমি চলে গেলে কেন? 

এই তো ফিরে এসেছি, আর যাব না। 

হ্যাঁ, যেও না। 

টুকুনজিল, আমি একটু আগে তোমাকে ডেকে পাই নি। 

আমার মহাকাশযানটার কিছু জিনিস ঠিক করতে হল। 

ঠিক হয়েছে? 

হ্যাঁ । 

টুকুনজিল, তুমি বাবার শরীর ঠিক করে দিয়েছ, তাই না? 

পুরোপুরি ঠিক করি নি, হৃৎপিণ্ডের একটা ধমনীতে কিছু সমস্যা ছিল, সেটা ঠিক করে দিয়েছি। তুমি কি চাও অন্য সমস্যাগুলোও সরিয়ে দিই?

হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, পারবে তুমি? মাথা-খারাপটা সারিয়ে দিতে পারবে? 

মাথা-খারাপ ? তোমার বাবার মাথা-খারাপ ? 

হ্যাঁ দেখ না, গাছপালা, পশুপাখির সাথে কথা বলেন? 

সেটা কি মাথা-খারাপ? পশুপাখিরা তো খুব নিম্ন বুদ্ধিবৃত্তির প্রাণী, কিন্তু তারাও তো চিন্তা করে, নিজেদের নিম্ন বুদ্ধবৃত্তির চিন্তা। তোমার বাবা সেটা হয়তে অনুভব করতে পারেন। আমি যেরকম করি। এটা একটা ক্ষমতা- 

কচু ক্ষমতা। দরকার নেই এই ক্ষমতার। তুমি বাবাকে ভালো করে দাও। 

ঠিক আছে, যাবার আগে তোমার বাবাকে ভালো করে দেব। 

যাবার আগে ? কোথায় যাবার আগে ? 

আজকে আমার ফিরে যেতে হবে, মনে নেই ? 

তাই তো! টুকুনজিল, তুমি চলে যাবে? 

হ্যাঁ, বিলু।

আমার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।

💜💜💜💜

বিদায়

গভীর রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল, টুকুনজিল আমাকে ডাকছে। আমি উঠে বসি বিছানায়। রাঙাবুবু ঘুমিয়ে আছে বিছানায় ক্লান্ত হয়ে, অন্যপাশে লাবু। সাবধানে বিছানা থেকে নেমে আমি দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে তার নরম জোছনায় চারদিকে কী সুন্দর কোমল একটা ভাব। বারান্দায় জলচৌকিতে আমি চুপচাপ বসে রইলাম। টুকুনজিল ডাকল আমাকে, বিলু-

বল।

আমার কেন জানি যেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে এখানে থেকে যাই।

টুকুনজিল, আমারও তাই ইচ্ছে করছে।

কিন্তু আমার তো যেতে হবে জান। এখানে থেকে যাওয়া তো খুব অযৌক্তিক ব্যাপার। তাই না?

হ্যাঁ।

তবু মনে হচ্ছে থেকে যাই। মনে হচ্ছে তোমাকে নিয়ে আকাশে উড়ে বেড়াই।

আমি চুপ করে রইলাম।

কিন্তু আমার যেতে হবে। যেতে ইচ্ছে করছে না, তবু যেতে হবে। খুব বিচিত্র একটা অনুভূতি খুব বিচিত্র। এর কি কোনো নাম আছে বিলু?

হ্যাঁ, আছে।

কি নাম ?

মন-খারাপ। দুঃখ।

দুঃখ! আমার খুব দুঃখ হচ্ছে, বিলু

আমি কোনো কথা না বলে হঠাৎ হু হু করে কেঁদে উঠলাম।

টুকুনজিল বলল, তুমি কেঁদো না বিলু। কেঁদো না। কেউ কাঁদলে কী করতে হয় আমি জানি না।

আমি শার্টের হাতা দিয়ে আমার চোখ মোছার চেষ্টা করলাম। টুকুনজিল আবার বলল, আমি যখন ফিরে যাব তখন আমার গ্রহের সবাইকে বলব, ছায়াপথে ছোট্ট একটু নক্ষত্র আছে—তার নাম সূর্য। সেই নক্ষত্রে ছোট্ট একটা গ্রহ আছে তার নাম পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে ছোট্ট একটা মানুষ আছে, তার নাম বিলু। সেই বিলুর সাথে আমার ভাব হয়েছিল। সেই বিলু আমাকে খুব আশ্চর্য একটা জিনিস শিখিয়েছে, সেটার নাম ভালবাসা। আমাকে সে এত ভালবেসেছে যে হঠাৎ করে আমার বুকের ভেতরেও সেই আশ্চর্য অনুভূতির জন্ম হয়েছে। আমি একটা আশ্চর্য জিনিস বুকে করে নিয়ে যাচ্ছি বিলু। আমি তোমাকে কোনো দিন ভুলব না।

আমিও ভুলব না, টুকুনজিল।

আবার যখন আসব, আমি তখন তোমাকে খুঁজে বের করব।

কখন আসবে তুমি?

সময় সংকোচনের পঞ্চম পর্যায়ের তৃতীয় তরঙ্গে।

সেটা কবে ?

এক শ’ তিরিশ বছর পরে।

এক শ’ তিরিশ! আমি ততদিনে মরে ভূত হয়ে যাব।

তোমার সন্তানেরা থাকবে। কিংবা তাদের সন্তানেরা। আমি তাদের খুঁজে বের করে তোমার কথা বলব।

ঠিক আছে টুকুনজিল।

আমার যাবার সময় হয়েছে বিলু। যাবার আগে তুমি কি আমার কাছে কিছু জানতে চাও?

কি জানতে চাইব ?

কোনো পরম জ্ঞান ? মহাকর্ষ ও নিউক্লিয়ার বলের সংমিশ্রণ? সর্বশেষ প্রাইম সংখ্যা? আলোর প্রকৃত বেগ? বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের সীমা? কোনো মহাসত্য?

না টুকুনজিল, জানতে চাই না। তুমি তো বলেছ জ্ঞানে কোনো শর্টকাট নেই। 

তাহলে কি তোমাকে বলে যাব কেমন করে সমুদ্রের পানি থেকে সোনা বের করতে হয়? বালু থেকে কেমন করে ইউরেনিয়াম বের করতে হয়? বলব?

না টুকুনজিল। আমি কিছু চাই না। 

কিছু চাও না? 

না, শুধু চাই তুমি যেন ভালো থাক। যেখানে থাক ভালো থেকো। 

বিলু।

বল। 

আমাকে বিদায় দাও, বিলু। 

তুমি কোথায়? 

এই যে আমি, তোমার হাতের উপর বসে আছি। আমার হাতের উপর হালকা নীল আলোর একটা বিন্দু। আমি আলতো ভাবে স্পর্শ করে বললাম, বিদায়।

টুকুনজিলের মহাকাশযান থেকে নীল বিদ্যুৎচ্ছটা ছড়িয়ে পড়ে। আমার হাত থেকে সেটা উপরে উঠে আসে, তারপর আমাকে ঘিরে সেটা ঘুরতে শুরু করে। প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর দ্রুত, দ্রুত থেকে দ্রুততর। ঝিঁঝিঁপোকার মতো একটা শব্দ হয়, তারপর হঠাৎ করে নীরব হয়ে যায় চারদিক।

টুকুনজিল চলে গেছে। বুকের ভেতর কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগতে থাকে আমার।

দরজা খুলে হঠাৎ বাবা বের হয়ে আসেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকালেন, তারপর দু হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙলেন। আমাকে দেখতে পান নি বাবা, হঠাৎ দেখলেন, দেখে চমকে উঠে বললেন, কে ? কে ওটা ?

আমি, বাবা।

বিলু তুই ?

হ্যাঁ বাবা।

বাইরে বসে আছিস কেন?

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তাই।

বাবা এসে আমার পাশে বসলেন। জোরে জোরে কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, কী সুন্দর ফুলের গন্ধ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাবা, তোমার শরীরটা কেমন লাগছে এখন ?

শরীর? কেমন জানি হালকা হালকা লাগছে, মনে হচ্ছে বয়স কুড়ি বছর কমে গেছে হঠাৎ একেবারে অন্যরকম লাগছে। খুব ভালো লাগছে শরীরটা। খুব ভালো। তুই এসেছিস বলেই মনে হয়।

রাতজাগা একটা পাখি হঠাৎ কঁককঁক করে ডেকে উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে। আমি চমকে উঠে বললাম, বাবা, শুনলে ?

হ্যাঁ। ওটা কিছু না। পাখি।

পাখিটা কি বলছে, বাবা ?

বাবা শব্দ করে হাসলেন। বললেন, ধূর বোকা মানুষ কি কখনো পাখির কথা বুঝতে পারে?

আমি শক্ত করে বাবাকে আঁকড়ে ধরে সাবধানে চোখের পানি মুছে নিলাম। টুকুনজিল আমার বাবাকে ভালো করে দিয়ে গেছে।

টুকুনজিল তুমি যেখানেই থাক, ভালো থেকো।

💗💗💗

শেষ কথা

আমি নীলাঞ্জনা হাই স্কুলেই আছি। বেশ ভালোই আছি। সারা দিন স্কুল করে বিকেলে কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে ফুটবল খেলি। তারপর দলবেঁধে বড় দিঘিতে লাফিয়ে পড়ি। হৈচৈ করে সাঁতার কেটে গোসল করি, ডুব-সাঁতার দিয়ে এক জন আরেকজনের পা ধরে টানাটানি করি, ভারি মজা হয় তখন।

ছুটির দিনে আমি আর দুলাল হেঁটে হেঁটে সদরের বড় লাইব্রেরিতে যাই, এই লাইব্রেরিটা অনেক বড় আর কত যে মজার মজার বই! লাইব্রেরিয়ানের সাথে আমার খুব ভালো পরিচয় হয়ে গেছে, আমি তাই একবারে অনেকগুলো করে বই নিতে পারি। বইগুলো বুকে চেপে ধরে আমি আর দুলাল বড় সড়ক ধরে হেঁটে হেঁটে ফিরে আসি। দুপাশে ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বাতাস বয়ে যায়, ধানের শিষ ঢেউয়ের মতো নাচতে থাকে, তখন কী যে ভালো লাগে। আমি আর দুলাল সড়ক ধরে হাটতে হটতে কত রকম গল্প করি, বড় হয়ে কি করব এইসব।

ব্ল্যাক মার্ডারের দলবল একবার আমার কাছে বেড়াতে এসেছিল টুকুনজিলের গল্প শুনতে। স্যার নিয়ে এসেছিলেন, সবাই মিলে কী যে মজা হল তখন। আমি আর দুলাল ব্ল্যাক মার্ডারের দলকে সবকিছু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলাম, কেমন করে জাল দিয়ে মাছ ধরতে হয়, কেমন করে গরুর দুধ দোয়াতে হয়, কেমন করে নৌকা বাইতে হয়, কেমন করে ক্ষেতে মই দিতে হয়। বিকেলে রাঙাবুবু সবাইকে খই ভেজে দিল। দেখে সবাই এত অবাক হয়ে গেল যে বলার নয়। নান্টু তো ফিরে যেতেই চাইছিল না, তারিক বলল, সে তার বাবাকে বলবে নীলাঞ্জনা হাই স্কুলে বদলি হয়ে আসতে চায়। আমাদের বাড়ি থেকে পড়াশোনা করবে।

স্যার আমার সাথে পড়াশোনা নিয়ে অনেক কথা বললেন। আমার বইপত্র, বাড়ির কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। সাথে অনেকগুলো বই এনেছিলেন, গল্পের বই নয়, পড়ার বই, সেগুলো বুঝিয়ে দিলেন। ঘরে বসে নিজে নিজে কেমন করে পড়তে হয় তার উপর বই।

রাতে উঠানে বড় আগুন জ্বলিয়ে সবাই গোল হয়ে বসেছিলাম, আমি তখন টুকুনজিলের গল্প করছি সবাইকে। কেমন করে টুকুনজিলের দেখা পেলাম, কেমন করে না বুঝে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শিশিতে তাকে আটকে রাখলাম, কেমন করে পিঁপড়ারা তাকে ঠিক করে দিল, কেমন করে সোনার আংটি চুরি করে আমি কী বিপদে পড়লাম। তারপর বব কার্লোসের কথা বললাম, তারা বিষাক্ত ওষুধ দিয়ে আমাকে কেমন কষ্ট দিল শুনে রাঙাবুবু আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে থাকে। তারপর যখন টুকুনজিল কী ভাবে ঘর ভেঙে আমাকে উদ্ধার করে আনল সেটা বললাম, সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল। এর পরের অংশটা ব্ল্যাক মার্ডারের দলের সবাই জানে, তবুও আবার বললাম, সবাই যোগ দিল আমার সাথে। নান্টু আর তারিক অভিনয় করে দেখাল কেমন করে ভয়ঙ্কর মারপিট হল মেশিনগান হাতে সেই লোকের সাথে। সেই লোক কী ভাবে আছাড় খেয়ে পড়ল তার অভিনয়টা এত ভালো হল যে সেটা নান্টু আর তারিককে দু’বার করতে হল। সবাই হেসে কুটিকুটি হল তখন। তারপর বব কার্লোসকে ঝুলিয়ে রেখে আমরা কেমন করে পালিয়ে এলাম সেটা বললাম আমি। খালার বাসায় এসে রাঙাবুবুর চিঠি পড়ে আমার কী মন-খারাপ হল, তখন টুকুনজিল কেমন করে আমাকে আকাশে উড়িয়ে আনল সেটা বললাম। টুকুনজিল কেমন করে বিদায় নিল, সেটা বলতে গিয়ে আমার গলা ধরে এল, সবার চোখে পানি এসে গেল তখন।

গল্প শেষ হবার পর অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। অনেকক্ষণ পর স্যার বললেন, বিলু, এত বড় একটা ব্যাপার, কিন্তু তুই যে কী ভালোভাবে এটা সামলেছিস , তার কোনো তুলনা নেই। মহাকাশের সেই প্রাণী পৃথিবী সম্পর্কে কী ভালো একটা ধারণা নিয়ে গেল, বুকে করে কত ভালবাসা নিয়ে ফিরে গেল! আহা!

বাবা শুধু মাথা নেড়ে বললেন, এটা কি কখনো হতে পারে যে কেউ মহাকাশের একটা প্রাণীকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শিশির মাঝে আটকে রাখবে? হতে পারে? বিলুটা যা গুল মারতে পারে। 

নান্টু, তারিক, সুব্রত সবাই একসাথে চিৎকার করে বলল, কী বলছেন চাচা আপনি? আমরা নিজের চোখে দেখেছি!

তারপর অনেক দিন হয়ে গেছে। এখনো মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ কোনো মানুষ আমার খোঁজে আসে। কেউ এদেশের, কেউ বিদেশের। তারা আমার কাছে টুকুনজিলের কথা শুনতে চায়। নানারকম প্রশ্ন করে। ঘুরেফিরে সবাই শুধু একটা জিনিস জানতে চায়, ফিরে যাবার আগে টুকুনজিল কি কোনো প্রমাণ রেখে গেছে? কোনো চিহ্ন? কোনো তথ্য ? কোনো অজানা সত্য? কোনো ভবিষ্যদ্বাণী ?

আমি যখন বলি রেখে যায় নি, তখন সবাই আমার দিকে কেমন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায়। আমি বুঝতে পারি, আমার কথা তারা ঠিক বিশ্বাস করছে না। আমি কিছু মনে করি না। বিশ্বাস না করলে নাই। আমি জানি, টুকুনজিল আছে। কেউ বিশ্বাস করলেও আছে, না করলেও আছে।

রাতে যখন আকাশভরা নক্ষত্র ওঠে, আমি তখন এন্ড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জকে খুঁজে বেড়াই, আমি জানি সেই নক্ষত্রপুঞ্জের কোনো একটি নক্ষত্রের কোনো একটি গ্রহে আছে আমার এক বন্ধু। আমি জানি, যখন তার আকাশ ভরে নক্ষত্র উঁকি দেয়, সেও ছায়াপথের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

তাকিয়ে সে আমার কথা ভাবে।

আমি যেরকম করে তার কথা ভাবি।

সমাপ্ত