তৃতীয় পর্ব


সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে

#সুহানের_স্বপ্ন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল





পাতাল ট্রেনের স্টেশন থেকে বের হয়ে সুহান আধো অন্ধকার রাস্তাটা দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। প্রথম প্রথম ক্যাটাগরি-বি. মানুষদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই এলাকাটাকে তার অত্যন্ত নিরানন্দ মনে হত, ধীরে ধীরে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ইদানীং সারা দিন কাজ করার পর সে ভেতরে ভেতরে তার নিজের জায়গায় ফিরে আসার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই এলাকার মানুষজনের সাথে পরিচয় হয়েছে, কারো কারো সাথে তার আন্তরিক সম্পর্কও হয়েছে। আধো অন্ধকার রাস্তায় ভাঙা কাচ, কাচের বোতল বাচিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।

দাড়াও। বাজখাই গলায় একটা ধমক শুনে সুহান থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার সামনে প্রায় পাহাড়ের মতো উঁচু একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। অবিশ্যি দাঁড়িয়ে আছে কথাটা বলা হয়তো একটু ভুল হবে, বলা উচিত দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে, মানুষটা জড়িত গলায় বলল, আমি কোনো কথা শুনতে চাই না, ঝটপট একটা ইউনিট বের করে দাও দেখি।

সুহান খুব বিরক্ত হল, সত্যি সত্যি একটা ইউনিট দিয়ে দেবে নাকি এই নেশাগ্রস্ত মানুষের নেশার খোরাক না যুগিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে সেটা একবার চিন্তা করল। মানুষটা বিশাল, ইচ্ছে করলে তাকে জাপটে ধরে নতুন আরেকটা সমস্যা করতে পারে তাই সে একটা ইউনিট দিয়ে দেওয়াই ঠিক করল। ইউনিটটা বের করার জন্য সে যখন পকেটে হাত ঢুকিয়েছে ঠিক তখন সে অবাক হয়ে দেখল আরো তিন জন মানুষ তাকে ভিন্ন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে।

এই তিন জন মানুষ নেশাগ্রস্ত মানুষষ্টার মতো টলছে না, তারা কেউ নেশাগ্রস্ত নয়। সুহান হঠাৎ এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করে। ভয় পাওয়া গলায় বলল, তোমরা কারা?

তিন জন মানুষ কোনো উত্তর দিল না, তারা আরো কাছাকাছি এগিয়ে এল এবং তখন সে তাদের হাতে ছোট আগ্নেয়াস্ত্রগুলো দেখতে পেল। এ ধরনের বিপদের মুখোমুখি হলে কী করতে হয় সে গত কয়েক সপ্তাহ থেকে কিরির কাছে শিখছে, সেই বিদ্যেটুকু কাজে। লাগানোর জন্য সে লাফ দিয়ে সামনের মানুষটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল কিন্তু তার আগেই কানের কাছে একজন তাকে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করেছে। মুহূর্তে তার সামনে পুরো জগৎটুকু অন্ধকার হয়ে যেতে থাকে। সে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল তার আগেই একজন তাকে ধরে ফেলল, সুহান জ্ঞান হারানোর আগে এক মুহূর্তের জন্য মানুষটাকে দেখতে পায় এই মানুষটাকে সে আগে কোথায় জানি দেখেছে।

পাহাড়ের মতো মানুষটা ব্যাকুল গলায় আরো একবার বলল, আমার ইউনিট?

কিন্তু সুহান তখন সেটা শুনতে পেল না। অন্য তিন জন মানুষ যে তার অচেতন দেহটাকে নিয়ে কাছাকাছি একটা কালো ট্যাক্সিতে তুলে নিয়েছে সেটাও সে জানতে পারল না।

মিলিনার সরাইখানায় মিলিনা অনেক রাত পর্যন্ত সুহানের জন্য অপেক্ষা করল। সুহান নামের এই ছেলেটার জন্য তার ভেতরে এক ধরনের মমতার জন্ম হয়েছে ছেলেটি ফিরে

আসায় সে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের আশঙ্কা অনুভব করতে থাকে। কিন্তু সে জানে। তার কিছু করার নেই। পুলিশ বা হাসপাতালে ক্যাটাগরি-বি. মানুষের খোঁজ নেওয়া যায় না।

সুহানের জ্ঞান ফিরে এল ছাড়া ছাড়া ভাবে। তার মনে হতে লাগল অসংখ্য মানুষ তার সাথে কথা বলছে, সেই কথাগুলো সে মাঝে মাঝে পরিষ্কার বুঝতে পারে আবার মাঝে মাঝে তার কাছে পুরোপুরি দুর্বোধ্য মনে হয়। কথাগুলো কে বলছে সে বুঝতে পারে না। কখনো কখনো মনে হয় সে নিজেই এই কথা বলছে। যে কথাগুলো তার মাথার মাঝে ঘুরপাক খায় তার মাঝে ক্যাটাগরি-বি., অস্তিত্ব, ভবিষ্যৎ, গোপনীয় রিপোর্ট এ ধরনের বিষয়গুলোই বেশি। জ্বরাক্রান্ত মানুষের মাথার মাঝে কোনো একটা ভাবনা যেরকম ঘুরপাক খেতে থাকে অনেকটা সেরকম, কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি জীবন্ত।

সুহান ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকাতেই তার ওপর একজন ঝুঁকে পড়ল, মানুষটা একজন ডাক্তার। সুহান ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, আমি কোথায়?

তুমি হাসপাতালে। শহরতলি এলাকায় তোমাকে কজন নেশাগ্রস্ত মানুষ আক্রমণ করেছিল।

সুহান বলতে চাইল, না, আমাকে নেশাগ্রস্ত মানুষ আক্রমণ করে নি, যারা আক্রমণ করেছিল তারা প্রফেশনাল, তাদের হাতে অস্ত্র ছিল এবং তাদের একজনকে আমি আগে কোথাও দেখেছি। কিন্তু তার কিছুই বলার ইচ্ছে করল না, সে নিঃশব্দে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার বলল, তোমার মাথায় আঘাত লেগেছিল এবং তোমাকে বাঁচানোর জন্য তোমার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে।

সুহান হতচকিতের মতো ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে? সে একজন ক্যাটাগরি-বি. মানুষ, তাকে বাচানোর জন্য তার মাথায় অস্ত্রোপচার করেছে? কেন?

মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার একটা জটিল বিষয়। ডাক্তার তার ওপর ঝুঁকে পড়ে মৃদুস্থার বলল, প্রথম প্রথম সেজন্য তোমার বিচিত্র কিছু অনুভূতি হবে, তুমি সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না।

সুহান ফিসফিস করে বলল, দুশ্চিন্তা করব না?

না! তোমার কেমন লাগছে, কী হচ্ছে, কী রকম অনুভব করছ সবকিছু আমাদের বলবে। আমরা তোমাকে সাহায্য করব।

ধন্যবাদ। সুহান হঠাৎ এক ধরনের ক্লান্তি অনুভব করে, তার আর কথা বলার ইচ্ছে করে না। সে চোখ বন্ধ করল। ডাক্তার বলল, তোমার এখন বিশ্রাম নেওয়া দরকার। আমি একটা ইনজেকশন দিই, তুমি ঘুমিয়ে যাও।

সুহান গভীর ঘুমে ঢলে পড়ার আগে শুনতে পেল কে যেন তার মস্তিষ্কের মাঝে বলছে, সাবধান। সুহান তুমি সাবধান! তোমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ভয়ংকর ষড়যন্ত্র।

কে তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে, কীসের ষড়যন্ত্র কিছু বোঝার আগেই সুহান গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল।

সুহান তার বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে তাকে ঘিরে বেশ কয়েকজন মানুষ। তাদের সবাই যদিও সাদা পাউন পরে আছে কিন্তু বোঝা যায় সবাই ডাক্তার নয়। কেউ কেউ নিশ্চয়ই নিরাপত্তা বাহিনীর। মধ্যবয়স্ক একজন বলল, তোমার এখন কেমন লাগছে আমাদেরকে বলো।

আমার মাথার মাঝে মনে হয় অনেক মানুষ কথা বলছে।

মানুষগুলো একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল, মনে হল তারা এটা শুনে খুব আশ্বস্ত বোধ করছে। কিন্তু কথায় সেটা প্রকাশ করল না, খুব দুশ্চিন্তার ভঙ্গি করে একজন বলল, মাখার ভেতরে কথা বলছে? কী আশ্চর্য!

আরেকজ্জন একটু এগিয়ে এসে বলল, কী নিয়ে কথা বলে?

সুহান মানুষটার মুখের দিকে তাকাল, কেউ একজন তার মাথায় তাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছে, ভয়ংকর একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তাকে খুব সাবধান থাকতে হবে। সে সাবধানে থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত না হচ্ছে ততক্ষণ সে কিছুই বলবে না। কিন্তু তাকে কথা বলতে হবে তা না হলে তাকে সন্দেহ করবে। কথা বলতে হবে বিশ্বাসযোগ্যভাবে। বিশ্বাসযোগ্যভাবে মিথ্যা কথা বলা সোজা, সেটা হতে হয় সত্যের খুব কাছাকাছি। কাজেই সে সত্যের কাছাকাছি মিথ্যা কথা বলবে। মানুষটা আরেকটু এগিয়ে এসে বলল, কী নিয়ে কথা বলে তোমার সাথে?

সেটা বুঝতে পারি না। সুহান মাথা নাড়ল, বলল, অবিশ্যি বোঝার চেষ্টাও করি না। এমন তো না যে বাইরে থেকে কেউ আমার সাথে কথা বলছে–তাই কথাটা বোঝার দরকার আছে। আমি যে কথাগুলো শুনি সেটা নিশ্চয়ই আমার নিজের মস্তিষ্কের একটা প্রতিক্লিয়া, আমার অবচেতন মনের কথা। এটা শুনেই কী আর না শুনেই কী?

ডাক্তারের পোশাক পরা মানুষটাকে এবারে খানিকটা বিপন্ন মনে হল, আমতা-আমতা করে বলল, হলে তুমি কথাগুলো বোঝার চেষ্টা কর না?

না! সুহান সরল মুখ করে বলল, কেন করব? আমি তো আর পাগল না যে নিজের সাথে নিজে কথা বলব। তাই চেষ্টা করি না শুনতে।

কিন্তু—কিন্তু–মানুষটাকে হঠাৎ কেমন যেন বিপদগ্রস্ত মনে হয়, কিন্তু সেই কথাটা যদি ডাক্তার না জানে সে তা হলে তোমার চিকিৎসা করবে কেমন করে? মানুষটা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল, তাই না ডাক্তার?

ডাক্তার অনিশ্চিতের মতো মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ।

তুমি তা হলে চেষ্টা কর শুনতে। তোমার মস্তিষ্কে কী কথা হচ্ছে সেটা শুনে ডাক্তারকে জানাবে। সাথে সাথে জানাবে। একেবারেই দেরি করবে না।

সুহান মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে? মানুষটার কথা বলার ভঙ্গি, আচার-আচরণটা অত্যন্ত সন্দেহজনক। এদের উদ্দেশ্য কী পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে কিছুতেই তাদেরকে কোনো কিছু জানানো যাবে না। কোনোভাবেই না। সুহান ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমার কী হয়েছে? আমি কেন এরকম মানুষের কথা শুনতে পাই?

ডাক্তার মানুষটা সুহানের চোখ এড়িয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল একটা বিষয়। বিজ্ঞানের এত উন্নতির পরেও মানুষ মস্তিষ্ককে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে নি। তোমার সেই মস্তিষ্কে আঘাত লেগেছ, সেখানে রক্তক্ষরণ হয়েছে, সেখানে একটা চাপের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই চাপটা কমানোর জন্য অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে, অস্ত্রোপচারের সময় মস্তিষ্কের কোনো কোনো অংশে কোনো ধরনের পরিবর্তন হতে পারে, তার জন্য সাময়িক কোনো প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

তা হলে আমি যেটা শুনছি সেটা কোনো সত্যি ব্যাপার নয়—সেটা পুরোপুরি আমার কল্পনা?

না মানে ইয়ে. ডাক্তারকে কেমন যেন বিপন্ন দেখায়। মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল একটা বিষয় সেটা কীভাবে কাজ করে আমরা এখনো ঠিক জানি না। মস্তিষ্ক নিয়ে অনেক বিচিত্র ব্যাপার ঘটে।

সুহান ব্যাপারটি নিয়ে আর কিছু বলল না। সে বুঝে গেছে তার প্রশ্নের সত্যিকার উত্তর আর পাবে না। সে তাই অন্য প্রসঙ্গে এল, বলল, আমাকে কবে যেতে দেবে?

আরো দুই-তিন দিন পর্যবেক্ষণে রেখে আমরা তোমাকে ছেড়ে দেব। আমাকে কি এই কয়েকদিন সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে? না, সারাক্ষণ শুয়ে থাকতে হবে না। তবে তোমার মাথায় কিছু সেন্সর লাগানো আছে, শুয়ে না থাকলে আমরা সেই সেন্সরগুলো লক্ষ করতে পারব না। কাজেই আপাতত তোমার জন্য শুয়ে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সুহানের কেবিন থেকে সবাই বের হয়ে গেলে সুহান তার চোখ বন্ধ করল এবং হঠাৎ করে মনে হল কেউ একজন তাকে বলল, চমৎকার! ভারি চমৎকার।

সুহান অবাক হয়ে লক্ষ করল সে আবার মনে মনে কথা বলতে শুরু করেছে। নিজেকে নিজে বলছে, কে আবার কথা বলছে?

তুমি। তুমি তোমার সাথে কথা বলছ।

আমি কিছু বুঝতে পারছি না। সুহান ছটফট করে বলল, আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি।

না তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ না।

তা হলে?

সুহান তুমি ধৈর্য ধর। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ–তুমি সবকিছু বুঝতে পারবে।

কখন বুঝতে পারব?

সময় হলেই বুঝতে পারবে।

কখন সময় হবে?

তুমি সেটা জানবে। এখন তুমি উত্তেজিত হয়ো না। ব্যস্ত হয়ো না। তোমার ওপর খুব বিপদ। তোমাকে নিয়ে ভয়ংকর ষড়যন্ত্র হচ্ছে, কাজেই তুমি খুব সাবধানে থেকো। তোমার চারপাশে যারা আছে তারা তোমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। তাদের থেকে সাবধান।

সুহান অসহায়ের মতো নিজেকে বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

তার মস্তিষ্কের ভেতরে কেউ একজন বলল, তুমি সব বুঝতে পারবে। একসময় তুমি সবকিছু বুঝতে পারবে। এখন তুমি বিশ্রাম নাও।

আমার মাথার ভেতরে শত শত মানুষ কথা বললে আমি কেমন করে বিশ্রাম নেব?

তোমাকে বিশ্রাম নেওয়া শিখতে হবে। শত মানুষের কথার মাঝে বিশ্রাম নেওয়া শিখতে হবে। আমরা তোমাকে সাহায্য করব।

তোমরা কারা?

আমরা আর তুমি এক। কী বলছ তুমি?

আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

বুঝতে পারবে। একসময় বুঝতে পারবে। তুমি ডাক্তারকে বোলো তোমাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে।

সুহান চোখ খুলে তাকিয়ে বলল, ডাক্তার।

একজন ডাক্তার তার কাছে এগিয়ে আসে। সুহান ক্লান্ত গলায় বলল, আমাকে একটা ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারবে?

কেন?

আমার মাথার মাঝে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।

কেউ কি তোমার সাথে কথা বলছে?

হ্যাঁ।

ডাক্তার চকচকে চোখে তার দিকে এগিয়ে আসে, কী বলছে তোমার মাথার ভেতরে?

বলছে ঘুমের ওষুধ দিয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে।

ও। ডাক্তারের এক ধরনের আশাভঙ্গ হল। সে ওষুধের কেবিনেটের কাছে ফিরে গেল, একটা ছোট সিরিঞ্জ নিয়ে ফিরে এসে সুহানের হাতে সিরিঞ্জটা ঢুকিয়ে দিতেই তার সারা শরীরে একটা আরামদায়ক আলস্য ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সুহানের সারা শরীরে ঘুম নেমে আসতে থাকে।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সুহান দীর্ঘ সময় ধরে বিয়ানা নামের একটা মেয়েকে স্বপ্নে দেখল। কমবয়সী হালকা-পাতল? তেজস্বী একটা মেয়ে, মাথার অবাধ্য চুলকে উজ্জ্বল লাল রঙের একটা স্কার্ফ দিয়ে বেঁধে রেখেছে। মেয়েটার বড় বড় বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, রোদে পোড়া ত্বক। প্রসাধনহীন মুখে এক ধরনের অগোছালো সৌন্দর্য। ছটফটে চঞ্চল এবং খানিকটা বেপরোয়া, হাসিটা খুব সুন্দর কারণ মেয়েটার মুক্তার মতো ঝকঝকে দাঁত। স্বপ্নটি শুরু হল এভাবে, শহরের মাঝামাঝি অতলান্ত সড়ক নামে যে ব্যস্ত ছোট রাস্তাটা আছে সেখানে কিশলয় ক্যাফের ভেতর থেকে বিয়ানা নামে মেয়েটি বের হয়ে বলল, এই যে শোন, তুমি এদিকে তাকাও।

সুহান তাকিয়ে মেয়েটাকে দেখতে পেল। মেয়েটা বলল, আমার নাম রিয়ানা! নামটা তোমার মনে থাকবে তো?

সুহান বলল, কেন থাকবে না? রিয়ানা তো মনে রাখার জন্য এমন কোনো কঠিন নাম নয়।

রিয়ানা হাসল, বলল, । একেবারেই কঠিন নাম নয়। খুব সাধারণ নাম, মনে রাখা খুব সহজ। কিন্তু তুমি তো এখন স্বপ্ন দেখছ। মানুষ যেটা স্বপ্নে দেখে জেগে ওঠার পর সেটা ভুলে যায়। তুমিও যদি ভুলে যাও?

সুহান বলল, স্বপ্নের কথা মনে রাখতে হবে কেন?

মাঝে মাঝে মনে রাখতে হয়। তোমাকে এই স্বপ্নটার কথা মনে রাখতে হবে।

কেন? এই স্বপ্নটা কেন মনে রাখতে হবে?

সেটা আমি তোমাকে এখন বোঝাতে পারব না। বোঝালেও তুমি বুঝবে না।

কেন বুঝব না?

কারণ এটা স্বপ্ন। স্বপ্নে সবকিছু বোঝা যায় না। রিয়ানা নামে মেয়েটা বলল, তোমার খানিকক্ষণ সময় আছে?

তা অাছে।

তা হলে এস আমার সাথে। এই ফুটপাত ধরে হাঁট। চেষ্টা কর সবকিছু মনে রাখতে। প্রথমে একটা ছোট ফুলের দোকান তারপর একটা ক্রিস্টালের দোকান। মনে থাকবে তো?

হ্যাঁ মনে থাকবে।

চমৎকার। রিয়ানা সুহানের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল, তোমার নাম কী?

সুহান।

সুহান! রিয়ানা হাসল এবং হাসির সাথে সাথে তার মুক্তার মতো দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠল।

সুহান বলল, তোমার দাতগুলো খুব সুন্দর।

রিয়ানা হঠাৎ খিলখিল করে হাসতে থাকে। সুহান বলল, তুমি কেন হাসছ?

তোমার কথা শুনে হাসছি।

আমি কি কোনো হাসির কথা বলেছি?

ন। বল নি। আমি হাসছি অন্য কারণে।

কী কারণে?

একটা মেয়ের সাথে তোমার দেখা হয়েছে এক মিনিটও হয় নি, তুমি সেই মেয়েটাকে বলছ তার পঁতগুলো খুব সুন্দর। কেন বলছ জান?

কেন?

কারণ এটা স্বপ্ন। স্বপ্নে মানুষের কোনো ভান থাকে না। যেটা সত্যি সেটা বলে দেয়। সেটা করে ফেলে।

কী আশ্চর্য!

কোন জিনিসটা তোমার আশ্চর্য মনে হচ্ছে সুহান?

এই পুরো ব্যাপারটা। এই স্বপ্নটা এত বাস্তব যে মনে হচ্ছে এটা সত্যি সত্যি ঘটছে।

মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে তখন তার কাছে সেটা সব সময় সত্যি মনে হয়।

কিন্তু এটা অন্যকরম।

রিয়ানা হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে বলল, ঠিক আছে তা হলে তুমি মনে রেখ তোমার এই স্বপ্নটা একটু অন্যকরম। মনে থাকবে?

হ্যাঁ। মনে থাকবে। সুহান রিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলল, রিয়ানা।

বলো।

তোমার চোখগুলোও খুব সুন্দর।

রিয়ানা এবারে আগের মতো খিলখিল করে হেসে উঠল না, কিছুক্ষণ সুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার ভালবাসার কোনো মেয়ে আছে সুহান?

না নেই।

কেন নেই?

আমি ক্যাটাগরি-বি. মানুষ। ক্যাটাগরি-বি. মানুষের খুব দুঃখ। তাদের স্বপ্ন দেখতে নেই। ভালবাসার মেয়ে থাকতে নেই। কারো স্বপ্নকে নষ্ট করতে নেই।

রিয়ানা চোখ বড় বড় করে সুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। সুহান বলল, আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি রিয়ানা?

না সুহান, আজকে নয়। তুমি আমাকে কী প্রশ্ন করবে আমি জানি। আরেকদিন জিজ্ঞেস করো।

কিন্তু এটা তো একটা স্বপ্ন। আরেকদিন তো এই স্বপ্ন আমি দেখব না। সেই স্বপ্নে তুমি থাকবে না।

তুমি যদি চাও তা হলে তুমি আবার এই স্বপ্ন দেখতে পাবে।

সেটা কীভাবে সম্ভব?

সেটা সম্ভব। কারণ এটা অন্যরকম স্বপ্ন।

সত্যি?

সত্যি। রিয়ানা সুন্দর করে হাসল, বলল, এটা হবে তোমার আর আমার স্বপ্ন। তুমি দেখতে চাইলেই এই স্বপ্নটা দেখতে পারবে।

তুমি আমাকে কথা দিচ্ছ?

হ্যাঁ আমি কথা দিচ্ছি। রিয়ানার চোখে-মুখে হঠাৎ এক ধরনের ব্যস্ততার ছাপ ফুটে ওঠে, সে সুহানের হাত ধরে বলল, সুহান আমাদের সময় নেই। তাড়াতাড়ি এস।

কোথায়?

এস আমার সাথে।

সুহান রিয়ানার সাথে হাঁটতে থাকে। একটা পোশাকের দোকান, তার পাশে একটা ভাস্কর্যের দোকান, তারপরে একটা ক্যাফে। বাইরে টেবিল, টেবিলকে ঘিরে ছোট ছোট চেয়ার। সেখানে তরুণ-তরুণীরা বসে কফি খাচ্ছে, নিচু গলায় কথা বলছে, হাসছে। রিয়ানা বলল, ওই ক্যাফেটার নাম ক্যাফে অর্কিড়। নামটা মনে থাকবে?

হ্যাঁ।

এই যে খালি টেবিলটা দেখছ, তুমি এখানে বস সুহান।

সুহান খালি টেবিলের পাশে চেয়ার টেনে বসল। রিয়ানার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি? তুমি বসবে না?

হ্যাঁ বসব। কিন্তু তোমার সাথে না। অন্যখানে।

কেন রিয়ানা? আমার সাথে নয়, কেন?

কারণ আছে সুহান।

কী কারণ?

সেই কারণটি আরেকদিন বলব।

সুহান ব্যাকুল হয়ে বলল, আরেকদিন কেন? আজকে কেন নয়?

ঠিক তখন সুহানের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখল, তার কাছাকাছি একন ডাক্তার এবং দুজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার তার ওপর ঝুঁকে বলল, তুমি স্বপ্ন দেখছিলে?

হ্যাঁ দেখছিলাম। তুমি কেমন করে জান?

তোমার আর.ই.এম. হচ্ছিল। মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে তখন তার আর.ই.এম. হয়।

ও।

ডাক্তার আরো একটু ঝুঁকে পড়ল, বলল, তুমি কী স্বপ্ন দেখছিলে সুহান?

সুহান ডাক্তারের দিকে তাকাল, হঠাৎ করে এই মানুষটার কৌতূহলটাকে তার অত্যন্ত আপত্তিকর মনে হতে থাকে। তার ভেতরে বিচিত্র একটা ক্রোধ জেগে উঠতে থাকে কিন্তু তাকে তার ক্রোধটাকে গোপন রাখতে হবে। ভেতরকার সত্যি কথাটাও তার গোপন রাখতে হবে। ডাক্তার তার কথা শোনার জন্য দাঁড়িয়ে আছে, কিছু একটা তাকে বলতে হবে। সুহান বলল, আমি স্বপ্নে দেখেছি একটা সার্কাস।

সার্কাস?

হ্যাঁ। সার্কাস।

কী হচ্ছে সেই সার্কাসে?

সার্কাসে একটা মানুষ অনেকগুলো সিংহকে নিয়ে খেলছে।

স্বপ্নে কেউ কিছু বলেছে তোমাকে?

হ্যাঁ বলেছে।

কে বলেছে? কী বলেছে? ডাক্তারের চোখ হঠাৎ চকচক করে ওঠে।

সিংহগুলো। সিংহগুলো আমাকে বলেছে।

ডাক্তারের চোখ-মুখের উৎসাহ একটু থিতিয়ে যায়, ইতস্তত করে বলে, সিংহ কি কখনো কথা বলে?

সুহান হাসার ভঙ্গি করল, বলল, স্বপ্নের ব্যাপার! স্বপ্নের কি কোনো মাথামুণ্ডু আছে নাকি? স্বপ্নে সিহুঁ কথা বলে। হাতি ওড়ে।

তা ঠিক।

সুহান বলল, সিংহগুলো কী বলছে শুনতে চাও?

ডাক্তারের উৎসাহ এতক্ষণে অনেক কমে এসেছে, তবুও জিজ্ঞেস করল, কী বলেছে?

বলেছে, আমরা সকালে ক্যাটাগরি-বি. মানুষের কলজে চিবিয়ে চিবিয়ে খাই। দুপুর বেলা খাই তাদের কিডনি।

ডাক্তার এক ধরনের বিতৃষ্ণা নিয়ে সুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। সুহান বলল, সিংহগুলো ডিনারের সময় কী খেতে চায় জান?

ডাক্তার মাথা নাড়ল, বলল, নাহ! শুনে কাজ নেই। তুমি বরং একটু বিশ্রাম নেবার চেষ্টা কর।

সুহান আবার চোখ বুজল। তার মাথার মাঝে আবার অসংখ্য মানুষের কথার শব্দ ভেসে আসে। সে জোর করে তার মাথা থেকে কথাগুলো সরিয়ে দেয়। হঠাৎ করে তখন তার রিয়ানার কথা মনে হল। কী অসম্ভব বাস্তব এই স্বপ্নটুকু। এখনো মনে হচ্ছে স্বপ্ন নয় সত্যি।

কী বিচিত্র এই স্বপ্নটুকু। কী আশ্চর্য!

সুহান রিয়ানার কথা ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে গেল।

০৬.

সুহানকে তিন দিন পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিল। কিন্তু তাকে তার নিজের জায়গায় ফিরে যেতে দিল না–তাকে শহরের ভেতরে একটা ছোট অ্যাপার্টমেনে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। সে একজন তুচ্ছ ক্যাটাগরি-বি. মানুষ, তার জন্য এত আয়োজনের কারণটুকু সে জানতে চেয়েছিল, সঠিক উত্তরটুকু কেউ দিতে পারল না। ভাসা ভাসা ভাবে শুনতে পেল যে তথ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রহরীর এই দায়িত্বটার একটা অন্য ধরনের গুরুত্ব রয়েছে—তাকে সঠিক নিরাপত্তা দেওয়া এখন সরকারের দায়িত্বের মাঝে এসে পড়েছে।

সুহান খুঁটিনাটি নিয়ে মাথা ঘামাল না। সে এখনো দূর্বল। মাথার ভেতরে সব সময়ে মানুষের কোলাহল, তার কী হয়েছে সে এখনো বুঝতে পারে নি। মাঝে মাঝে মনে হয় সে বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছে। শুধু যে মানুষের কথা শুনতে পায় তা নয়, সে আবিষ্কার করেছে সে অন্যরকম একটা মানুষ হয়ে গেছে। ধীরলয়ের সঙ্গীত সে একেবারেই পছন্দ করত না, এখন মাঝে মাঝে সেটা শুনতে তার বেশ ভালো লাগে। হঠাৎ হঠাৎ তার মাঝে খুব বড় পরিবর্তন হয়, সে কিছুক্ষণের জন্য একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায়। একদিন সকালে হঠাৎ করে সে আবিষ্কার করল—সে মধ্যযুগের সকল চিত্রশিল্পীর নাম জানে। কিছুক্ষণ পর সে নামগুলো ভুলে গেল। মাঝখানে একবার তার মনে হল সে মানুষের রোগের চিকিৎসা করতে পারবে—সব রোগের চিকিৎসা সবকিছুই সে জানে। এই অনুভূতিগুলো তার আসে এবং যায় কিন্তু একটা ব্যাপার মোটামূটি পাকাপাকিভাবে ঘটে গেছে। সেটা হচ্ছে তার স্মৃতিশক্তি সেটা অসম্ভব বেড়ে গেছে, কোনো একটা কিছু একবার দেখলেই সে খুঁটিনাটি সবকিছু মনে রাখতে পারে। এটা কেমন করে ঘটেছে সে কিছুতেই ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না।

নিজের ছোট অ্যাপার্টমেন্টে আসার একদিন পর সে ঘর থেকে ঘটতে বের হল। সে এখনো দুর্বল, কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে ক্লান্তি অনুভব করতে থাকে তখন ফুটপাতে একটা ছোট্ট বেঞ্চে বসে সে বিশ্রাম নিতে থাকে। অন্যমনস্কভাবে সামনে তাকিয়ে সে হঠাৎ চমকে ওঠে, এই জায়গাটা সে আগে দেখেছে—বাস্তবে নয় স্বপ্নে, এই রাস্তাটার নাম অতলান্তে সড়ক, ছোট কিন্তু ব্যস্ত একটা রাস্তা আজকে নিজের অজান্তেই সে এদিকে হেঁটে চলে এসেছে। একদিন সে এই রাস্তাটাকেই স্বপ্ন দেখেছিল। সে ডানে এবং বামে তাকাল এবং অবাক হয়ে দেখল সত্যিই সেখানে কিশলয় ক্যাফে নামে একটা ক্যাফে রয়েছে।

মুহূর্তের মাঝে সুহান তার ক্লান্তি ভুলে উঠে দাড়াল। সে এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে ক্যাফেটার দিকে হাঁটতে থাকে। ক্যাফেটার সামনে গিয়ে সে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কী আশ্চর্য! সে সত্যি সত্যি স্বপ্নে এই ক্যাফেটা দেখেছিল।

ঠিক তখন ক্যাফেটার দরজা খুলে গেল, সুহান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল, ভেতর থেকে একটা মেয়ে বের হয়ে এসেছে, মেয়েটি তার মাথার অবাধ্য চুলগুলোকে একটা লাল স্কার্ফ দিয়ে বেঁধে রেখেছে। মেয়েটার গায়ের রঙ রোদে পোড়া তামাটে, চোখগুলো বুদ্ধিদীপ্ত এবং উজ্জ্বল। মেয়েটা ঠোট চেপে মুখ বন্ধ করে রেখেছে কিন্তু সুহান নিশ্চিতভাবে জানে যখন এই মেয়েটা হাসবে তখন দেখা যাবে তার পঁাতগুলো মুক্তার মতো। ঝকঝকে। সুহান চিৎকার করে ডাকতে যাচ্ছিল বিয়ানা, তুমি? কিন্তু ঠিক তখন কেউ একজন তার মাথার ভেতরে ফিসফিস করে বলল, খবরদার সুহান, তুমি আমাকে ডেকো। না। আমাকে চেনার ভান করো না। কিছুতেই না।

কেন নয়? সুহান অবাক হয়ে দেখল একটা কথা উচ্চারণ না করে সে রিয়ানার সাথে কথা বলছে।

তোমার আশপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর লোক কিলবিল করছে।

সত্যি?

সুহান দেখল তার পাশ দিয়ে রিয়া অপরিচিতের মতো হেঁটে চলে গেল। যাবার সময় তার মস্তিষ্কে ফিসফিস করে বলল, তুমি জান কোথায় যেতে হবে?

হ্যাঁ জানি।

এস। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

বেশ।

আমার পিছু পিছু নয় একটু সময় নাও। তারপর এস।

ঠিক আছে রিয়ানা। সুহান অবাক হয়ে দেখল কী অবলীলায় সে একটা শব্দ মুখে উচ্চারণ না করে শুধু চিন্তা করে কথা বলে ফেলছে। কেমন করে সে পারছে।

সুহান মাথা ঘুরিয়ে না তাকিয়েও বুঝতে পারল তার আশপাশে কিছু মানুষ তাকে লক্ষ করছে। নিরাপত্তা বাহিনীর মানুষ। তাকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখছে, সে কী করে সেটা লক্ষ করছে। কিশলয় ক্যাফের সামনে সে থমকে দঁাড়িয়েছে তাই এর ভেতরেই তার ঢোকা উচিত। সুহান ক্যাফেটাতে ঢোকে, ভেতরে বেশ ভিড়। খালি টেবিল নেই। দূরে একটা টেবিল খালি হয়েছে, সে সেখানে গিয়ে বসে। এখানে খানিকক্ষণ সময় কাটাবে সে, স্নায়ুকে শীতল করার জন্য একটা পানীয় খাবে তারপর হেঁটে হেঁটে যাবে ক্যাফে অর্কিডে। ঠিক যেরকম সে স্বপ্নে দেখেছিল।

মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ সুহানকে জিজ্ঞেস করল, আমি তোমার টেবিলে বসতে পারি? ক্যাফেতে খালি টেবিল নেই তাই তার এখানে বসতে চাইছে। সূহান মাথা নাড়ল। মানুষটার ধৈর্য নেই, সে বসেই উচৈঃস্বরে ওয়েট্রেসকে ডাকতে শুরু করে। ওয়েট্রেস এলে দুজনেই পানীয়ের অর্ডার দিল, একজন স্নায়ু শীতল অন্যজন স্নায়ু উত্তেজক পানীয়।

সুহান স্বায়ু শীতল করার পানীয়টা চুমুক দিয়ে চোখের কোনা দিয়ে মানুষটাকে লক্ষ করে। এই দুপুর বেলা সে যে পানীয়টা খাচ্ছে সেটা দুপুরে খাবার কথা নয়। মানুষটা সম্ভবত উত্তেজক পানীয়তে নেশাগ্রস্ত। সুহান একটু শঙ্কিত হয়ে বসে থাকে, একই টেবিলে বসার কারণে মানুষটা যদি হঠাৎ করে তার সাথে কথা বলতে রু করে সেটা একটা অহেতুক বিড়ম্বনা হবে। তার এখন কথা বলার ইচ্ছে করছে না, একটু আগে যে ব্যাপারটা ঘটেছে সেটা সে এখনো পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারে নি। নেশাগ্রস্ত মানুষটা অবিশ্যি কথা বলার উৎসাহ দেখাল না। গভীর মনোযোগ দিয়ে তার পানীয়তে চুমুক দিতে থাকল।

কিশলয় ক্যাফে থেকে বের হয়ে সুহান ডানদিকে হাঁটতে থাকে। প্রথমে একটা ফুলের দোকান, তার পাশে ক্রিস্টালের দোকান। রিয়ানা চাইছে একটু সময় নিতে, তাই সে ক্রিস্টালের দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে ক্রিস্টালগুলো দেখতে থাকে। খানিকটা অন্যমনস্ক ছিল বলে সে লক্ষ করল না, কিশলয় ক্যাফে থেকে উত্তেজক পানীয় নেশাসক্ত মধ্যবয়স্ক মানুষটাকে নিরাপত্তা বাহিনীর মানুষরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষটা ভয়ার্ত গলায় বলছে, কী করেছি আমি? কী করেছি? উত্তেজক পানীয় খাবার জন্য ঘটনাক্রমে সুহানের টেবিলটা বেছে নিয়ে সে যে নিজের ওপর কী ভয়ানক দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছে সে সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।

সুহান ফুটপাত ধরে হেঁটে হেঁটে যায়। ডানদিকে হেঁটে সে পোশাকের দোকানটা পার হল। তার পাশে ভাস্কর্যের দোকান—তার পাশে ক্যাফে অর্কিড। ইতস্তত তরুণ-তরুণীরা বসে আছে, নিচু গলায় কথা বলছে, হাসছে। সুহান সেদিকে হেঁটে যায়, তাকে কোথায় বসতে হবে সে জানে, তার টেবিলটা খালি।

সুহান টেবিলটাতে বসার সময় শুনতে পেল রিয়ানা তার মস্তিষ্কের ভেতর বলছে, আমি তোমার কাছাকাছি আছি, কিন্তু তুমি কোনোভাবেই আমাকে চেনার ভান করবে না।

করব না রিয়ানা।

চমৎকার।

তোমার সাথে সাথে এখানে অসংখ্য নিরাপত্তাকর্মী চলে এসেছে।

সত্যি?

হ্যাঁ। তোমার ডান দিকে যে মোটা মানুষটা বসেছে সে একজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। পিছনে যে দুজন বসেছে তারাও। ভাস্কর্যের দোকানের সামনে যে মহিলা দুজন দাঁড়িয়েছে তারাও। এইমাত্র রাস্তার পাশে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল, সেটাও নিশ্চয়ই নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি। কাজেই সাবধান।

সুহান একটা শব্দও উচ্চারণ না করে বলল, রিয়ানা আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এটা ঘটছে। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এটা সত্যি।

এটা সত্যি। আমি তোমার দুই টেবিল সামনে বসেছি। আমার সাথে আরো দুজন আছে। আমরাও একটা উত্তেজক পানীয় খেতে খেতে তর্ক করছি। পুরোটা একটা অভিনয়। আমরা এসেছি তোমার জন্য। তোমার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করার জন্য।

সুহান চেয়ারে হেলান দিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, সত্যি সত্যি তার টেবিল থেকে দুই টেবিল সামনে রিয়ানা বসে আছে, তার দুই পাশে দুজন সুদর্শন তরুণ।

সুহান তার মস্তিষ্কে ফিসফিস করে রিয়ানাকে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কারা রিয়ানা আমি কেমন করে তোমার সাথে কথা বলছি? স্বপ্নে কেমন করে আমার তোমার সাথে পরিচয় হল?

বলব, তোমাকে আমি সব বলব। কিন্তু তার আগে তুমি একটু সহজ ভঙ্গিতে বস্। কিছু একটা খাবার অর্ডার দাও। খাবার খেতে খেতে একা একা মানুষ যা করে তাই কর, অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে কাগজে কিছু আঁকাআঁকি কর। আঁকাআঁকি করতে করতে সেখানে লিখবে ৩৭ নেপচুন এভিনিউ। তারপর এই কাগজটা এখানে ফেলে যাবে।

কেন রিয়ানা?

নিরাপত্তা বাহিনীকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য। আমরা ৩৭ নেপচুন এভিনিউতে কিছু গোপন লিফলেট, বেআইনি কাগজ ফেলে রাখব। তারা সেগুলো উদ্ধার করবে। তোমাকে তখন আরো বেশি বিশ্বাস করবে।

সুহান চেয়ারে হেলান দিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে দূরে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না রিয়ানা। আমাকে কে বিশ্বাস করবে? কেন বিশ্বাস করবে?

বলছি। রিয়ানা নরম গলায় বলল, সবকিছু বলছি। তার আগে তোমার অন্য একটা প্রশ্নের উত্তর দিই। স্বপ্নে তুমি আমাকে একটা প্রশ্ন করতে চেয়েছিল মনে আছে? আমি বলেছিলাম প্রশ্নটা তুমি এখন করো না, পরে করো। মনে আছে?

সুহান অবাক হয়ে বলল, কী আশ্চর্য! আমি স্বপ্নে কী প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম তুমি সেটা জান?

হ্যাঁ। জানি। কারণ সেই স্বপ্নটা আমি তৈরি করেছিলাম।

কেমন করে তৈরি করেছিলে?

তার আগে তুমি কি তোমার প্রশ্নের উত্তর জানতে চাও না?

হ্যাঁ জানতে চাই।

রিয়ানা নরম গলায় বলল, তুমি প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলে আমি কি সাধারণ মানুষ নাকি ক্যাটাগরি-বি. তাই না?

হ্যাঁ।

তোমার সেই প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য তোমাকে আমরা এখানে এনেছি। রিয়ান নিচু গলায় বলল, আমরা তোমার মতো ক্যাটাগরি-বি. মানুষ। আমরা তোমার মতোই সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছি।

সুহান বলল, আমিও তাই ভেবেছিলাম।

মানুষকে ক্যাটাগরি-বি. হিসেবে ভাগ করে দিয়ে তাদেরকে উপেক্ষা করার ব্যাপারটা আসলে একটা খুব বড় হীন ষড়যন্ত্র। ক্যাটাগরি-বি. মানুষ কোনোভাবেই দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ নয়। মানুষের মাঝে যে স্বাভাবিক বৈচিত্র্য আছে এটা তার ভেতরের একটা অংশ।

আমিও সেটা বিশ্বাস করি।

আমরা সবাই সেটা বিশ্বাস করি। রিয়ানা বলল, সেই বিশ্বাসের পেছনে যুক্তি আছে। বিজ্ঞানীদের একটা টিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেটা গবেষণা করে একটা রিপোর্ট দিতে। তারা অত্যন্ত সুন্দর একটা রিপোর্ট দিয়েছিলেন।

সুহান জানতে চাইল, সেই রিপোর্টটা কোথায়?

তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনে।

সুহানকে ঘিরে অনেক নিরাপত্তাকর্মী বসে আছে, নিশ্চয়ই তাকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করছে, তাই অনেক কষ্ট করে সে তার মুখের বিশ্বয়টুকু গোপন করার চেষ্টা করল। ফিসফিস করে বলল, তোমরা সেই রিপোর্টটা উদ্ধার করার চেষ্টা করছ?

হ্যাঁ।

কিছুদিন আগে একজন মানুষকে তথ্যকেন্দ্রে খুন করা হয়েছিল, আমি তখন সেখানে ছিলাম, সে কি তোমাদের একজন?

হ্যাঁ, সে আমাদের একজন। সে আমাদের তোমার কথা বলেছে।

সুহান অনেক কষ্ট করে মুখের বিময়টুকু গোপন করে রেখে বলল, সে কেমন করে বলল? আমি নিজের চোখে দেখেছি তাকে রিগা গুলি করে মেরেছে—সে বের হতে পারে নি।

সে জানত সে কখনো বের হতে পারবে না। সে জানত তাকে গুলি করে মারা হবে। কিন্তু তবুও তোমার সাথে তার কী কথা হয়েছে আমরা সেটাও জানি।

কেমন করে জান?

আমি এখন তোমার সাথে যেভাবে কথা বলছি, ঠিক সেভাবে তার সাথেও কথা বলছিলাম। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কথা বলছিলাম।

সুহান অনেকক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইল। রিয়ানা বলল, আমরা তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। নিরাপত্তার অনেকগুলো স্তর পার হয়ে গেছি। আর একবার তথ্যকেন্দ্রের ভেতরে যেতে পারলে আমরা বিজ্ঞানীদের দেওয়া সত্যিকার রিপোর্টটা বের করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু ঠিক তখন হঠাৎ করে তুমি এসে হাজির হয়েছ। আমাদের সব পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে গেছে।

কেন? সুহান অবাক হয়ে বলল, আমি কী করেছি?

আমাদের অসম্ভব বড় একটা সৌভাগ্য যে তুমি এরকম বুদ্ধিমান একটা ছেলে, জেনে জেনে এখন পর্যন্ত কোথাও তুমি একটা ছোট ভুলও কর নি। কিন্তু তোমার কারণে আমরা খুব বিপদের ভেতরে আছি। যে কোনো মুহূর্তে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে।

আমি এখনো কিছু বুঝতে পারছি না।

কুলছি তোমাকে। আমাদের হাতে কিন্তু খুব বেশি সময় নেই, আমরা ঝুঁকি নেব না–আমরা কিছুক্ষণের মাঝে উঠে যাব। তুমি আরো কিছু সময় বসে থেকে তারপর ফিরে যেও।

ঠিক আছে। সুহান বলল, এখন বলো আমি কীভাবে তোমাদের বিপদের মাঝে ফেলেছি।

রিয়ানা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, পৃথিবীর ক্যাটাগরি-বি. মানুষরা যখন বুঝতে পারুল তাদের বিরুদ্ধে খুব একটা অন্যায় ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তখন তাদের একটা ছোট দল অত্যন্ত বিচিত্র উপায়ে সংঘবদ্ধ হয়েছে।

সেটা কী রকম?

আমরা প্রত্যেকেই আলাদা। প্রত্যেকটা মানুষের মস্তিষ্ক আলাদা, তাদের ভাবনা-চিন্তা আলাদা। মাঝে মাঝে অনেকে একসাথে বসে চিন্তা-ভাবনা করে পরামর্শ করে কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে করে। আমাদের ভেতরে একজন বড় বিজ্ঞানী আছেন তিনি ঠিক করলেন আমাদের অনেকের মস্তিষ্ক একসাথে জুড়ে দেবেন। তখন আমরা আর আলাদা আলাদা মানুষ থাকব না, আমরা সবাই মিলে একজন মানুষ হয়ে যাব। আমাদের সবার মস্তিষ্ক মিলে একটা মস্তিষ্ক হয়ে যাবে। তাতে কী লাভ হবে বুঝতে পেরেছ?

হ্যাঁ। কাউকে না জানিয়ে নিজেরা যোগাযোগ রাখতে পারব। অত্যন্ত নিরাপদ।

হ্যাঁ। সেটা একটা কারণ। যেমন এই মুহূর্তে কয়েক ডজন নিরাপত্তাকর্মীদের নাকের ডগায় বসে আমরা কথা বলছি। তারা কিছু করতে পারছে না। কিন্তু সেটা বড় কারণ নয়।

বড় কারণটা কী?

বড় কারণটা হচ্ছে অনেক মানুষের মস্তিষ্ক যখন একসাথে কাজ করে তখন সবাই মিলে একটা সমন্বিত মানুষ হয়ে যায়। এই সমন্বিত মানুষটা আসলে একটা অতিমানব। তার বুদ্ধির কাছে কেউ আসতে পারে না। তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিন নিরাপত্তা ভেদ করে সাধারণ কোনো মানুষের যাওয়া অসম্ভব একটা ব্যাপার, কিন্তু আমরা গিয়েছি। তুমি নিজের চোখে দেখেছ। ক্যাটাগরি-বি. মানুষের এই অসম্ভব ক্ষমতার সামনে ষড়যন্ত্রকারীরা অসহায় হয়ে পড়েছিল, কিন্তু তখন বিপদের শুরু হল। তোমাকে দিয়ে–

আমাকে দিয়ে?

হ্যাঁ। আমরা মানুষের মস্তিষ্ককে সমন্বিত করার জন্য ছোট একটা ইন্টেগ্রেটেড সার্কিট তৈরি করেছি। সেটা এমনভাবে কোড় করা আছে যে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ না হলে কাজ করবে না। মস্তিষ্কের ভেতর সেটা বসাতে হয়। সেটা বলানোর খুব দীর্ঘ পদ্ধতি আছে। আমরা মানুষটাকে পুরোপুরি আলাদা রেখে তার সাথে একজন একজন করে সমন্বয় করি। সেজন্য বিশেষ ড্রাগ রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করি। মানুষটা নিজে প্রস্তুত থাকে বলে সেও সহযোগিতা করে। খুব ধীরে ধীরে একজন অভ্যস্ত হয়ে ওঠে আমাদের একজন হয়ে ওঠে।

সুহান ফিসফিস করে বলল, আমার মাথার ভেতরে সেরকম একটা ইন্টেগ্রেটেড সার্কিট বসিয়ে দিয়েছে?

হ্যাঁ তথ্যকেন্দ্র চার চার শূনা তিনে যাকে খুন করেছে তার মস্তিষ্কের ইন্টগ্রেটেড সার্কিটটা এখন তোমার মাথায়। এটা যে কী ভয়ঙ্কর একটা কাজ তুমি জান না।

আমি অনুমান করতে পারি।

না তুমি অনুমান করতে পারবে না। যে প্রক্রিয়াটাতে অভ্যস্ত করার জন্য আমরা কয়েক মাস সময় নিই তোমাকে কয়েক সেকেন্ডের মাঝে সেখানে ঠেলে দেওয়া হল। তোমার পাগল হয়ে যাবার কথা ছিল।

সুহান বলল, হ্যাঁ। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।

তোমার ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং বিপদ হচ্ছে একটা ব্যাপার। আমাদের নিরাপত্তা হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য একটা ব্যাপার। হঠাৎ করে তাদের একজন মানুষ আমাদের সবচেয়ে গোপন

সার্কিটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা তোমার সম্পর্কে কিছুই জানি না, অথচ তোমার মস্তিষ্ক আমাদের মস্তিষ্কের সাথে সমন্বিত, তুমি চিন্তা করতে পার?

হ্যাঁ। সেটা নিশ্চয়ই খুব বিপজ্জনক।

আমাদের এই সমন্বিত সত্তাটা হচ্ছে ক্যাটাগরি-বি. মানুষের একমাত্র আশা। আমরা। পুরো ব্যাপারটাকে নেতৃত্ব দিই, আমরা সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি এই সময় সবাই যদি ধরা পড়ে যেতাম কী ভয়াবহ ব্যাপার হত তুমি চিন্তা করতে পার?

সুহান কিছু না বলে চুপ করে রইল। রিয়ানা বলল, আমাদের খুব সৌভাগ্য আমরা ধরা পড়ি নি—তুমি আমাদের রক্ষা করে। তোমার প্রতি আমাদের সবার কৃতজ্ঞতা।

কৃতজ্ঞতা জানাবার কিছু নেই। আমি যা করছি সেটা নিজের জনা করেছি।

তুমি প্রথমে ছিলে আমাদের সবার সবচেয়ে বড় বিপদ। এখন তুমি হচ্ছ আমাদের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

কীভাবে?

তুমি তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনের নিরাপত্তা প্রহরী। যেখানে ঢোকার জন্য আমাদের কয়েক মাস পরিকল্পনা করতে হয়, দু-একজনকে প্রাণ দিতে হয়, তুমি সেখানে যখন খুশি চুকতে পার এবং সবচেয়ে বড় কথা তুমি এখন আমাদের একজন। তুমি কি আমাদের সাহায্য করবে?

সেই বিষয়টি নিয়ে তোমার কি কোনো সন্দেহ আছে রিয়ানা?

না নেই। তবুও আনুষ্ঠানিকভাবে জানার একটা ব্যাপার আছে। এতক্ষণ যদিও শুধু আমি তোমার সাথে কথা বলছি কিন্তু আসলে সবাই আছে এখানে। আমরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকি, অনেক দূরে থাকি কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক একটা, আমাদের অস্তিত্ব একটা, ক্যাটাগরি বি, মানুষদের রক্ষা করার জন্য আমরা আমাদের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে সমন্বিত অস্তিত্বকে গ্রহণ করেছি। আজ থেকে তুমি আমাদের সমন্বিত অস্তিত্বের একজন। তোমাকে আমরা গভীর ভালবাসা দিয়ে গ্রহণ করছি সুহান।

তোমাদের অনেক ধন্যবাদ।

এখন আর এখানে আমি এবং তুমি নেই। আমরা সবাই এক।

সুহান হঠাৎ প্রথমবার তৃতীয় একজন মানুষের কণ্ঠস্বর নিজের মস্তিষ্কে শুনতে পেল, সুহান, আমি ফিরু। তোমাকে আমাদের মাঝে সত্যিকার অর্থে সমন্বয় করার জন্য আমাদের আরো একটা জিনিস দরকার হবে।

সেটা কী থিরু?

তোমার জিনেটিক কোভিং। সেটা বের করার জন্য আমাদের দরকার তোমার মাথার একটা চুল কিংবা এক ফোটা রক্ত।

আমি সেটা কীভাবে দেব?

তুমি তোমার টেবিলে মাথার একটা চুল ফেলে যেও। সেটাই সহজ। আমরা তুলে নেব।

ঠিক আছে থিরু।

সুহান আবার রিয়ানার কথা শুনতে পেল, আমরা এখন যাচ্ছি সুহান।

ঠিক আছে।

আমরা নিশ্চয়ই একদিন পাশাপাশি বসব—একজন আরেকজনের চোখের দিকে তাকাব, মুখ দিয়ে কথা বলব, কান দিয়ে শুনব, একজন আরেকজনকে স্পর্শ করব।

নিশ্চয়ই করব রিয়ানা। নিশ্চয়ই করব।

০৭.

সুহান খুব ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করে নিরাপত্তা বাহিনীকে ধোকা দেওয়া শুরু করল। প্রথমে সে তার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে জানতে চাইল সে কয়েকজন মানুষের কথা শুনতে পাচ্ছে তার কোনো গুরুত্ব আছে কি না। ডাক্তার জানতে চাইল কথাগুলো কী। সুহান বলল কথাগুলো ব্যক্তিগত কথা অর্থ নেই, মনে হয় কয়েকজনের কথোপকথন। তবে কয়েকবার নেপচুন এভিনিউ কথাটা শুনতে পেয়েছে। ডাক্তার জানতে চাইল কত নম্বর নেপচুন এভিনিউ। সুহান যদিও খুব ভালো করে জানে তার বলার কথা ৩৭ নেপচুন এভিনিউ তারপরও সে ইতস্তত করে বলল তার ভালো করে মনে নেই সেটা ২৭ কিংবা ৩৭ কিংবা অন্য যে কোনো সংখ্যা হতে পারে।

এই তথ্যটা পৌঁছে দেওয়ার পরদিন থেকে সুহানের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেল। নিরাপত্তা বাহিনীর বড় বড় কর্মকর্তারা তার সাথে দেখা করতে এলে তাকে একটা শক্তিশালী ভিডিফোন দিয়ে বলে গেল যে কোনো প্রয়োজনে সে এটা ব্যবহার করতে পারবে। হঠাৎ কবে সে যদি তার মস্তিষ্কের ভেতর কোনো কথা শুনতে পায় এবং সেটা ডাক্তারকে জানাতে হয় সে যেন এটা ব্যবহার করতে কোনো দ্বিধাবোধ না করে।

শক্তিশালী ভিডিফোনটা হাতে নিয়ে তার অনাথাশ্রমের রুরাকের কথা মনে পড়ল। তার খুব ভিডিফোনের শখ ছিল—যদি তাদের কারো কাছে ব্যক্তিগত ভিডিফোন থাকত তা হলে সে এখন তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারত। এখন করতে হলে সেটা করতে হবে। অফিসের মাধ্যমে তার যন্ত্রণা অনেক। হঠাৎ করে সে তার অনাথাশ্রমের বন্ধুদের অভাব অনুভব করতে থাকে। সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল প্রথম সুযোগ পাওয়া মাত্রই সে তাদের সাথে দেখা করতে যাবে।

সুহান দুদিন পর আবার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করল। ঘণ্টা দুয়েক আগে রিয়ানা মস্তিষ্কের ভেতরে খবর দিয়ে গেছে ডাক্তারকে কী বলাতে হবে। অতলান্ত স্ট্রিটে একটা সুপার মার্কেটে সি ফুডের দোকানের সামনে রিহা আর কিলি নামে দুজন থাকবে। সুহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, দুজন মানুষকে ধরিয়ে দেব?

হ্যাঁ। রিয়ানা বলেছিল, আমরা যেভাবে সম্ভব তোমাকে সন্দেহের বাইরে রাখতে চাই। দরকার হলে আমাদের একজন মানুষকে ধরিয়ে দিয়েও।

সুহান জিজ্ঞেস করল, যাদেরকে ধরিয়ে দিচ্ছি তারা জানে?

হ্যাঁ তারা স্বেচ্ছায় ধরা দিতে রাজি হয়েছে।

তাদের কী করবে?

রিয়ানা বলেছিল, আমরা জানি না। যদি ভাগ্য ভালো থাকে বেঁচে থাকবে।

সুহান আর কথা বাড়ায় নি, সে বিশাল একটা পরিকল্পনার অংশ। তাকে যেটা করতে হবে সে সেটা করবে, এ ছাড়া উপায় কী?!!

ভিডিফোনে যোগাযোগ করতেই ডাক্তার উদগ্রীব গলায় বলল, কী হয়েছে সুহান?

আমি কিছুতেই ঘুমাতে পারছি না। আমি কি একটু ঘুমের ওষুধ খেতে পারি?

তার আগে শুনি কেন ঘুমাতে পারছ না। কী হয়েছে?

একজন মানুষ ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছে। আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না।

কী নিয়ে কথা বলছে?

দুজন মানুষের সাথে দেখা করা নিয়ে মানুষটা খুব দুশ্চিন্তা করছে।

মানুষটা কে?

সুহান অধৈর্য গলায় বলল, আমি কেমন করে বলব? আমার মস্তিষ্কে কি আর বাইরের মানুষ কথা বলতে পারে? নিশ্চয়ই আমার অবচেতন মন আমার সাথে কথা বলছে।

ডাক্তার তাড়াতাড়ি বলল, তা ঠিক। তা ঠিক। নিশ্চয়ই তোমার অবচেতন মন।

আমাকে একটা ঘুমের ওষুধ দিন। খেয়ে অবচেতন এবং চেতন মন দুটোকেই কাবু করে ঘুমিয়ে থাকি।

দেব। নিশ্চয়ই দেব। ডাক্তার বলল, তার আগে শুনি তোমার অবচেতন মন কার সাথে দেখা করা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে।

দুজন মানুষ। একজনের নাম রিহা আরেকজন কিলি।

তুমি কি বিহা আর কিলি সম্পর্কে আর কিছু জান?

হ্যাঁ। অনেক কিছু জানি—কিন্তু তার কি কোনো গুরুত্ব আছে? পুরোটা নিশ্চয়ই আমার কল্পনা।

ডাক্তার গম্ভীর গলায় বলল, কিন্তু তবু ডাক্তার হিসেবে আমার শুনে রাখা উচিত।

সুহান গলার স্বরে এক ধরনের বিরক্তি ফুটিয়ে বলল, রিহা আর কিলি নাকি অতলান্ত স্ট্রিটে একটা সুপার মার্কেটে সি ফুডের দোকানে যাচ্ছে।

ও আচ্ছা।

আমি এখন কী করব ডাক্তার।

তুমি বিশ্রাম নাও। তোমার জন্য আমি যে ঘুমের ওষুধ দিয়েছি তার দুটি খেয়ে ঘুমিয়ে যাও।

সুহান দুটি ঘুমের ওষুধ টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে দিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুমানোর জন্য তার কখনোই ঘুমের ওষুধের দরকার হয় না।

সুহান খুব ধীরে ধীরে তার মাথার ইন্টেগ্রেটেড সার্কিট অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে। যে মানুষগুলোর সাথে তাকে সমন্বয় করেছে সে একজন একজন করে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে শিখেছে। একসাথে তাদের সবার সাথে কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে পারে, জটিল কোনো সমস্যার সমাধান বের করতে পারে। তার জন্য সবচেয়ে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হচ্ছে নোর চোখ দিয়ে দেখা। ঠিক কী কারণ জানা নেই, সবার সাথে সে সমান দক্ষতা দিয়ে কাজ করতে পারে না। খিরু নামের তরুটার সাথে তার সবচেয়ে ভালো সমন্বয় হল খুব মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করলে সে থিরুর চোখে দেখতে পায়। প্রথমবার যখন দেখতে পেল তখন থিরু একটা মনিটরের সামনে বসে কাজ করছে। সুহান এক মুহূর্তের জন্য আবছাভাবে মনিটরটা দেখতে পেল এবং হঠাৎ করে সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সুহান ফিসফিস করে বলল, আমি দেখতে পাচ্ছি থিরু।।

থি বলল, চমৎকার। তুমি আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য—-তোমাকে অন্যের চোখে দেখা শিখতে হবে। জুনোর মস্তিষ্কে ভাবতে হবে।

আমি চেষ্টা করব।

যখন তুমি পুরোপুরি অন্য মানুষ হয়ে যেতে পারবে তখন বুঝতে পারবে যে তুমি সমন্বিত মানুষ হতে পেরেছ। সেজনা তোমাকে চেষ্টা করে যেতে হবে।

সুহান তাই চেষ্টা করে যেতে থাকে। নিরাপত্তা বাহিনীর লোকরা তাকে এখন অনেক স্বাধীনতা দিয়েছে। রিহা আর কিলিকে ধরিয়ে দেবার পর তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। সে কবে ভার কাজে ফিরে যেতে পারবে জানতে চেয়েছে, নিরাপত্তা দৃপ্তর থেকে জানিয়েছে খুব শিগগিরই।

সুহান সেজন্য অপেক্ষা করে আছে। তাকে যেদিন কাজে যেতে দেবে সেদিনই তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনে শেষবার হানা দেবার কথা। সুহান তার প্রস্তুতি নিচ্ছে, সম্ভবত তাকেই হানা দিতে হবে—তথ্যকেন্দ্রটা তার চাইতে ভালো করে আর কেউ জানে না। অন্য সবার সাথে সমন্বিত হয়ে থাকবে সে, তাকে কী করতে হবে সবাই বলে দেবে। তথ্যকেন্দ্রের শেষ কোডটা ভেঙে তাকে বিজ্ঞানীদের সেই রিপোর্ট নেটওয়ার্কে দিয়ে দিতে হবে। মুহূর্তের মাঝে পৃথিবীর সবাই জেনে যাবে ক্যাটাগরি-বি. নামের ধারণাটা আসলে একটা বিশাল প্রতারণা, একটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র।

সুহান ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকে। তাকে পুরোপুরি সুস্থ হবার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী অপেক্ষা করছে। ক্যাটাগরি-বি. মানুষের সমন্বিত দলটাও অপেক্ষা করছে সেজন্য।

এর মাঝে একদিন সুহান তার জীবনের সবচেয়ে দুঃসাহসিক কাজটা করল। সে অবিশ্যি একা একা করল না, তাকে সবাই মিলে সাহায্য করল। সে ভোরবেলা ঘর থেকে বের হচ্ছে ঠিক তখন সে তার মস্তিষ্কে একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, সুহান।

কে? রিয়ানা?

হ্যাঁ।

আজকে তুমি আমাদের কাছে আসবে? তোমার সাথে আমাদের সবার দেখা হবে।

সুহান অবাক হয়ে বলল, আজকে?

হ্যাঁ।

কিন্তু সেটি কীভাবে সম্ভব? নিরাপত্তাকর্মীরা আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে।

রিয়ানা শব্দ করে হাসল। বলল, সেটা তুমি আমাদের হাতে ছেড়ে দাও। ঠিক আছে?

সুহান একটু ইতস্তত করে বলল, কিন্তু আমি যে একেবারেই প্রস্তুত নই। যদি একদুই দিন আগে বলতে–

আমরা ইচ্ছে করে তোমাকে এক-দুই দিন আগে বলি নি। আমরা অনেক দিন থেকে প্রস্তুতি নিয়েছি, তোমার প্রস্তুতি নেবার কোনো প্রয়োজন নেই। একটু পরেই তুমি দেখবে।

সুহান বলল, ঠিক আছে।

চমৎকার।

আমি তা হলে কী করব?

প্রত্যেকদিন যা কর ঠিক তাই করবে। ঘর থেকে বের হয়ে লিফটে উঠবে। লিফটে তোমার সাথে একজনের দেখা হবে—চমকে উঠো না তাকে দেখে—ঠিক আছে?

ঠিক আছে।

এখন ঘর থেকে বের হও সুহান।

সুহান ঘর থেকে বের হল। লম্বা করিডোর ধরে হেঁটে সে লিফটের সামনে গিয়ে দাড়ায়। লিফটের বোতাম স্পর্শ করে সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। লিফটটি প্রায় নিঃশব্দে এসে দাড়াল, দরজা খুলতেই সে ভেতরে এসে ঢুকল, একজন মানুষ তাকে পেছন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লিফটটি চলতে শুরু করতেই মানুষটি ঘুরে তার দিকে তাকাল। সুহান ভয়ানক চমকে ওঠে, মানুষটি হুঁবহুঁ তার মতো। মানুষটি তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আমাদের হাতে সময় নেই। এই লিফটা নিচে পৌঁছানোর আগে আমি যেরকম করে সুহান হয়েছি, তোমাকে সেরকমভাবে থিরু হয়ে যেতে হবে!

সুহান ইতস্তত করে বলল, কিন্তু–কিন্তু–

মানুষটি একটি রবারের মাস্ক হাতে নিয়ে তার দিকে এগিয়ে দেয়, এটা মুখে লাগিয়ে নাও! ঠিক তোমার মুখের মাপে তৈরি করা হয়েছে।

আমি আগে কখনো মাস্ক পরি নি–

সুহানের মতো মানুষটি নরম গলায় বলল, আমরা কেউই আগে অনেক কিছু করি নি। এখন করি। করতে হয়।

সুহান মাস্কটি মুখে লাগিয়ে নেয়, চটচটে এক ধরনের আঠালো জিনিস তার মুখের সাথে লেগে যায়। সুহানের মনে হতে থাকে তার নিশ্বাস বুঝি বন্ধ হয়ে আসবে। মানুষটি বলল, তুমি নার্ভাস হয়ো না, এক্ষুনি অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

কথাটি সত্যি, কিছুক্ষণেই সে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মানুষটি নরম গলায় বলল, এখন তোমার জ্যাকেটের সাথে আমার জ্যাকেট পাল্টে নিতে হবে। তোমার জ্যাকেটের পকেটে তোমার কার্ডটা আছে তো?

আছে।

চমৎকার।

মানুষটি জ্যাকেট পাল্টে নিতে নিতে বলল, তোমার যা যা দরকার সব তোমার পকেটে পাবে।

সুহানের হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল। উদ্বিগ্ন মুখে বলল, সকাল সাড়ে দশটার সময় মেডিক্যাল কিটে আমার রক্ত পরীক্ষা করা হয়–

মানুষটি তাকে বাধা দিয়ে বলল, জানি। এজন্য তোমার একটু রক্ত নেব।

সুহান দেখল লোকটা তার পকেট থেকে একটা সিরিঞ্জ বের করেছে। কিছু বোঝার আগেই সুহান তার কনুইয়ের কাছে একটা খোঁচা অনুভব করল। মানুষটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমরা নিচে নেমে গেছি। আমি আগে বের হব। তুমি একটু পরে।

আমি এখন কী করব?।

সেটা নিয়ে চিন্তা করো না। রিয়ানা তোমাকে বলে দেবে। শুধু একটা জিনিস মনে রেখো।

কী?

তুমি এখন সুহান নও। তুমি এখন থিরু।

নিঃশব্দে লিফটের দরজা খুলে গেল। কয়েকজন মানুষ পঁড়িয়ে আছে, তাদের মাঝে কেউ নিশ্চয়ই নিরাপত্তা বাহিনীর মানুষ। সুহান লিফট থেকে বের হয়ে এল। তার বুকের ভেতর সুপও ধকধক করতে থাকে। সুহানের মতো মানুষটি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে ঠিক যেভাবে সুহান হেঁটে যায়। সুহান চোখের কোন দিয়ে লক্ষ করল মানুষটি কফি হাউসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যে কফি হাউসে সুহান যায়। খানিকটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ তাকে অনুসরণ করছে।

সুহান একটা নিশ্বাস ফেলে দুই পা অগ্রসর হতেই সে তার মস্তিষ্কে একটা পরিষ্কার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, সুহান।

বলা রিয়ানা।

আমরা একটা হলুদ রঙের ট্যাক্সিতে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

কোথায়?

ডান দিকে কয়েকশ মিটার সামনে। তুমি এস।

ঠিক আছে।

সুহান রাস্তায় নেমে ডান দিকে হাঁটতে থাকে। মানুষজন যাচ্ছে–আসছে। রাস্তায় বাল, ট্রাম, গাড়ি এবং ট্যাক্সি। সুহান ফুটপাত ধরে এগিয়ে যায়, সামনে রাস্তার পাশে একটা হলুদ রঙের ট্যাক্সি অপেক্ষা করছে, সে কাছে আসতেই তার দরজা খুলে গেল। সুহান রিয়ানার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, ভেতরে ঢুকে যাও, সুহান।

সুহান ভেতরে ঢুকে গেল। পেছনের সিটে রিয়ানা বসে আছে, তার দিকে তাকিয়ে সে মুখ টিপে হাসল, বলল, কেমন আছ সুহান?

ভালো।

ট্যাক্সিটা গর্জন করে ছুটে যেতে শুরু করতেই রিয়ানা বলল, এর ভেতর আমরা নিরাপদ কিন্তু তবু আমরা কোনো ঝুঁকি নেব না।

তার অর্থ আমরা মুখে কথা বলব না?

ঠিক ধরেছ। আগে আমরা নিজেদের আস্তানায় চলে যাই। রিয়ানা ট্যাক্সির ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল, জেরিকো, তুমি আমাদের পিয়ারে নিয়ে যাও।

ড্রাইভার রিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলল, সত্যি?

হ্যাঁ।

রিয়ানা, সেখানে কিন্তু গার্ড বসিয়েছে।

সেজন্যই যেতে চাইছি। জায়গাটা আজ নিরাপদ হবে।

ড্রাইভার ট্যাক্সিটা ঘুরিয়ে সমুদ্রোপকূলের দিকে নিতে থাকে। রিয়ানা সুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার পকেটে কিছু রক্তের প্যাচ পাবে। আঙুলের মাঝে লাগিয়ে নাও। গার্ড যদি জিনেটিক কোডিং করার জন্য তোমার রক্ত নিতে চায় তা হলে থিরুর রক্ত পাবে।

সুহান তার পকেটে স্টিকারের মতো ছোট ছোট প্যাচগুলো খুঁজে পেল। তার আঙুলের ডগায় সেগুলো লাগিয়ে নেয়—দেখে বোঝার উপায় নেই কিন্তু রক্ত পরীক্ষা করার জন্য রক্ত নেওয়া হলে সুহানের রক্তের বদলে থিরুর রক্ত পাবে। সুহান একটু অবাক হয়ে বলল, তোমরা খুঁটিনাটি সবকিছু ভেবে রেখেছ?