চতুর্থ এবং শেষ পর্ব


সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে

#সুহানের_স্বপ্ন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল





হ্যাঁ। যে মানুষটি আজকে সুহান হয়ে তোমার বাসায় থাকবে তাকে দেখে বুঝতে পার নি?

পেরেছি। গলার স্বরটা পর্যন্ত আমার মতো।

হ্যাঁ। রিয়ানা বলল, শুধু রেটিনাটা তোমার মতো করতে পারি নি। তোমাকে তো আগে পাই নি–এই প্রথমবার পেয়েছি। এখন তোমার সব ধরনের প্রোফাইল নিয়ে নেব।

ট্যাক্সির ড্রাইভার নিচু গলায় বলল, সামনে গার্ড, রিয়ানা।

ঘাবড়ানোর কিছু নেই জেরিকো।

রিয়ানা সুহানের দিকে তাকিয়ে আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গি করে একটু হাসল।

স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কঠোর চেহারার একজন ট্যাক্সিটি দাঁড়াতেই রিয়ানা জানালার কাচ নামিয়ে দিয়ে মাথা বের করল। কঠোর চেহারার গার্ডটা ভাবলেশহীন মুখে বলল, কার্ড।

রিয়ানা এবং রিয়ানার দেখাদেখি সুহান তার কার্ডটি বের করে দেয়। কার্ডটি স্ক্যান করে গার্ডটি তীক্ষ্ণ চোখে তাদের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?

পিয়ারে।

কেন?

আমরা সেখানে কাজ করি।

গার্ড রক্ত পরীক্ষা করার ছোট যন্ত্রটা তাদের দিকে এগিয়ে দেয়, রিয়ানা ভেতরে আঙুল প্রবেশ করে গার্ডের সাথে অনেকটা খোশগল্প করার ভঙ্গি করে বলল, আজ অনেক কড়াকড়ি, কিছু হয়েছে নাকি?

গার্ড তার নাক দিয়ে একটা শব্দ করে বলল, সব সময় কিছু না কিছু হচ্ছে।

সুহানের বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটি ধকধক করে শব্দ করছে। গার্ড তার দিকে যন্ত্রটা এগিয়ে দিয়েছে, যদি ঠিক ঠিক রক্ত না নিতে পারে সে এক্ষুনি ধরা পড়ে যাবে। সুহান ফ্যাকাসে মুখে গার্ডের দিকে তাকাল। ঠিক তখন শুনল তার মস্তিষ্কে রিয়ানা কথা বলছে, কোনো ভয় নেই সুহান, তোমার আঙুলটা ঢোকাও।

সুহান কাঁপা হাতে আঙুলটি যন্ত্রের ভেতর প্রবেশ করাল, সূক্ষ্ম একটা খোঁচা অনুভব করল সাথে সাথে। গার্ড ভুরু কুঁচকে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে, ঘুরে একবার সুহানের দিকে তাকাল, তারপর হাত নেড়ে তাদের চলে যেতে বলল। ট্যাক্সিটি চলতে শুরু করা মাত্র সুহান তার বুকের ভেতর আটকে থাকা নিশ্বাসটি বের করে দেয়। রিয়ানা তার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, খুব ভয় পেয়েছিলে। তাই না?

সুহান মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ।

তোমার কোনো ভয় নেই সুহান। তুমি হচ্ছ আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সদস্য আমরা কিছুতেই তোমাকে ধরা পড়তে দেব না।

যদি কিছু একটা গোলমাল হয়ে যেত গার্ডের ওখানে?

সেজন্য আমাদের প্ল্যান বি. রেডি আছে।

সেটি কী?

আমরা রক্তপাত পছন্দ করি না তাই প্ল্যান বি. রক্তপাতহীন পরিকল্পনা। সেটাও যদি গোলমাল হয়ে যায় তখন প্ল্যান সি কাজে লাগাতে হয়। সেখানে খানিকটা রক্তপাত আছে।

সুহান এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে রিয়ানার দিকে তাকিয়ে থাকে।

ট্যাক্সিটা খামার পর দরজা খুলে রিয়ানা এবং রিয়ানার পিছু পিছু সুহান বের হয়ে আসে। একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে দুজন উপরে উঠে যায়। একটা দীর্ঘ করিডোর ধরে দুজন হেঁটে বড় একটা হলঘরে এসে পৌঁছাল। হলঘরের একপাশে খোলা জানালা। সেদিকে আদিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র এবং সমুদ্রের নোনা বাতাস ঘরের ভেতরে লুটোপুটি খাচ্ছে। হলঘরের ভেতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেশ কিছু মানুষ বসে আছে। সুহান এবং রিয়ানাকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়াল।

রিয়ানা অনেকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, আমার প্রিয় কমরেডস—তোমাদের সবার সামনে উপস্থিত করেছি আমাদের সবচেয়ে নতুন সদস্য সুহানকে!

মধ্যবয়স্কা একজন মহিলা রহস্য করে বলল, আগে মাস্ক খুলুক তারপর বিশ্বাস করব। তোমাদের আমি বিশ্বাস করি না!

রিয়ানা হাসতে হাসতে সুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, মাস্কটা খোলো সুহান।

আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে না?

ফিরে যাবার সময় তোমাকে আবার আমরা থিরু বানিয়ে দেব। তোমার সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।

সুহান তার ঘাড়ের কাছে খিমচে ধরে মাস্কটা টেনে খোলার চেষ্টা করতে থাকে। কমবয়সী একজন তরুণ এসে তাকে সাহায্য করল, পাতলা মাস্কটি খুলে এল সহজেই।

উপস্থিত সবাই একটা আনন্দের শব্দ করল। সুহান কী করবে বুঝতে না পেরে সবার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল।

একজন বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এসে সুহানের হাত স্পর্শ করে বলল, এস সুহান, এতদিন আমরা তোমার কথা শুনেছি, আজ চোখে দেখতে পেলাম। বয়স্ক মানুষটি সহৃদয় ভঙ্গিতে হেসে বলল, আমার নাম পিরান। ডক্টর পিরান।

রিয়ানা বলল, ঢক্টর পিরান আমাদের মূল মস্তিষ্ক। আমাদের মস্তিষ্ক সমন্বয়ের পুরো ব্যাপারটি ডক্টর পিরানের পরিকল্পনা।

ডক্টর পিরান বলল, বুঝলে সুহান, এখন সবাই মস্তিষ্ক সমন্বয়ের কথায় একেবারে আবেগে আপ্লুত। প্রথম যখন বলেছিলাম তখন কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না।

কমবয়সী তরুণটি বলল, বিশ্বাস করার কোনো কারণ ছিল? আমার মাথা ফুটো করে সেখানে একটা ইন্টেগ্রেটেড সার্কিট বসানো হবে সেটা মেনে নেওয়া কি এত সোজা?।

রিয়ানা বলল, ঠিক আছে কুরু। তোমাদের ঝগড়াঝাটি-হইচই পরে হবে। সুহান প্রতিদিন সকালে বের হয়ে কফি হাউসে গিয়ে এক মগ কফি খায়। আজ তার জায়গায় কফি খেয়েছে থিরু। সুহানের এখনো কফি খাওয়া হয় নি—তাকে এক কাপ কফি খাওয়ানো যাক।

মধ্যবয়স্কা মহিলাটি বলল, শুধু কফি নয়, কফির সাথে খাওয়ার জন্য চমৎকার কিছু প্যাষ্ট্রি আনিয়ে রেখেছি। এস সবাই।

পেষ্ট্রি এবং কফি খেতে খেতে সবার সাথে হালকা কথাবার্তা হল। সুহানের সবার সাথে পরিচয় হল মস্তিষ্কের সমন্বয় হয়ে আছে বলে তাদের সবার চিন্তাভাবনার সাথে সে জড়িয়ে আছে, এই প্রথমবার তাদেরকে সে দেখছে। খাওয়া শেষ হবার সাথে সাথেই সবাই কাজে লেগে যায়। সুহানের শরীরের মাপ নেওয়া হয়, চোখের আইরিস, রেটিনার ছবি নেওয়া হয়। মস্তিষ্কের স্ক্যান করা হয়, শরীরের ভেতরকার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ত্রিমাত্রিক ছবি নেওয়া হয়। মস্তিস্কের ভেতরে বসানো ইন্টেগ্রেটেড সার্কিটের ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। গলার স্বরে নিখুঁত প্রোফাইল বের করা হয়। সবকিছু যখন শেষ করা হয়েছে তখন অপরাহ্ন হয়ে এসেছে।

রিয়ানা বলল, সুহান, তোমার ফিরে যাবার সময় প্রায় হয়ে এসেছে।

সুহান খোলা জানালা দিয়ে বাইরে আদিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ। আমি প্রস্তুত।

রিয়ানা সুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি ফিরে যাবার আগে সমুদ্রের বালুবেলায় একটু হাঁটতে চাও?

সুহান উজ্জ্বল চোখে বলল, সময় হবে আমাদের?

অবশ্যই হবে। এস।

সুহান সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিয়ানার সাথে সাথে একটা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে সমুদ্রের বালুবেলায় নেমে এল। দুজনে হেঁটে হেঁটে সমুদ্রের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়, সমুদ্রের ঢেউ এসে ছিঁড়ে পড়ছে, সুহান এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু পর বিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আগে কখনো সমুদ্র দেখি নি।

রিয়ানা নরম গলায় বলল, জীবনে প্রথমবার সমুদ্র দেখা অত্যন্ত বড় একটা অভিজ্ঞতা।

আমি একটা অনাথাশ্রমে বড় হয়েছি। তথ্যকেন্দ্রের এই চাকরিটা না পেলে হয়তো অনাথাশ্রমের দেয়ালে কিংবা কোনো একটা ইউরেনিয়াম খনি ছাড়া আর কিছু দেখতামই না।

রিয়ান কোনো কথা না বলে সুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। সুহান নিচু গলায় বলল, অনাথাশ্রমে আমার যেসব বন্ধুবান্ধব আছে তারা কেউ কোনো দিন সেখান থেকে বের হয় নি। পৃথিবীর কোনো সৌন্দর্য দেখে নি। পৃথিবী যে কত সুন্দর তারা জানে না। কারণ তারা ক্যাটাগরি-বি. মানুষ।

রিয়ানা সুহানের কাধ স্পর্শ করে বলল, আমরা তার পরিবর্তন করব সুহান।

সুহান ঘুরে রিয়ানার দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় বলল, কিন্তু কেন পরিবর্তন করে সেটা ঠিক করতে হবে? কেন সেটাই হল না? সুহান হাত দিয়ে সমুদ্রটাকে দেখিয়ে বলল, দেখ এই সমুদ্রষ্টাকে দেখ—কী বিশাল! এই পৃথিবীটা দেখ—কী বিশাল! আর তার মাঝে আমাদের মতো মানুষের কোনো জায়গা নেই—এটা কি হতে পারে?

রিয়ানা একটা নিশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। বলল, না, সুহান এটা হতে পারে না। এটা হবে না।

কিন্তু সেটাই তো হচ্ছে। আইন করে ক্যাটাগরি-বি. মানুষকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে—

কিন্তু আমরা কি সেটা হতে দেব? তথ্যকেন্দ্র থেকে আমরা যখন বিজ্ঞানীদের সেই রিপোর্ট বের করে পৃথিবীর মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেব তখন এক মুহূর্তে পুরো অবস্থাটা পাল্টে যাবে।

সুহান রিয়ানার দিকে তাকাল, আমরা কি পারব রিয়ানা?

রিয়ানা একটু হাসার চেষ্টা করল। বলল, সব এখন তোমার ওপর নির্ভর করছে সুহান।

কিন্তু–কিন্তু—

কিন্তু কী?

আমি যে তথ্যকেন্দ্র, সার্ভার, নেটওয়ার্ক এসব কিছুই জানি না। আমি কি পারব প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে?

পারবে। কারণ আমরা সবাই তোমার মস্তিষ্কের সাথে সমন্বিত হয়ে থাকব। আমরা সবাই তোমাকে সাহায্য করব।

সুহান বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিশ্বাস বের করে দেয়। পারবে সে নিশ্চয়ই পারবে। সে যদি না পারে তা হলে ক্যাটাগরি-বি. মানুষেরা কখনোই মানুষের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না।

রিয়ানা সুহানের হাত স্পর্শ করে বলল, চলো সুহান আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

চলো।

তোমার মাস্কটা পরে নিয়ে তোমাকে আবার থিরু হয়ে যেতে হবে।

সুহান মাথা নাড়ল। বলল, । চলো আবার থিরু হয়ে যাই।

দুজনে বালুবেলা ধরে হাঁটতে থাকে। সমুদ্রের ঢেউ একটু পরপর আছড়ে পড়ছে কিন্তু সুহান সেটি আর গুনছে না, সে হঠাৎ কেমন জানি আনমনা হয়ে ওঠে।

০৮.

শেষ পর্যন্ত ডাক্তার সুহানকে তার কাজে ফিরে যাবার অনুমতি দিল। তার শরীরের রক্ত, ত্বক, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, মস্তিষ্ক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে বলল, তুমি এখন পুরোপুরি সুস্থ সুহান। তুমি এখন তোমার কাজে ফিরে যেতে পার।

কোনো একটি অজ্ঞাত কারণে সুহানের বুকের ভেতর রক্ত ছলাৎ করে ওঠে। সে বলল, আমি কাজে ফিরে যেতে পারব?

হ্যাঁ।

কখন যেতে পারব ডাক্তার?

ইচ্ছে করলে কালকেইআমি তোমার সুস্থ দেহের সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছি।

অনেক ধন্যবাদ ডাক্তার।

তোমার মস্তিষ্কের কাগুলোর খবর কী?

এখনো হয়। তবে আমি সেগুলো নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখে গেছি! মাথার ভেতরে কথা হলে আমি সেগুলো শুনেও শুনি না!

ও আচ্ছা। ও আচ্ছা। ডাক্তার একটু ইতস্তত করে বলল, তবুও তুমি যদি কখনো মনে কর আমাদের জানানো দরকার তা হলে আমাদের জানিও।

অবশ্যই জানাব। সুহান সরল মুখ করে হেসে বলল, তুমি এত বড় ডাক্তার, আমার জীবন বাঁচিয়েছ, তোমাকে যদি না জানাই তা হলে কাকে জানাব?

সুহানের কথায় কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে ডাক্তার মানুষটা খুব সঙ্কুচিত হয়ে গেল।

সুহান বাসায় এসে দীর্ঘ সময় চুপচাপ জানালার কাছে বসে থাকে। সে আগামীকাল কাজে ফিরে যাবে, আগামীকাল হবে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। সে কি পারবে তার ওপর দেওয়া এত বড় দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে? সে কি সেখান থেকে বেঁচে আসতে পারবে? তার চোখের সামনে বারবার একটি দৃশ্য ভেসে আসে, একজন মানুষ শান্তি মুখে কী-বোর্ডের সামনে বসে কাজ করছে, আর রিগা একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে তাকে গুলি করছে—একবার দুইবার অনেকবার। সুহান নিজের অজান্তেই শিউরে ওঠে, জোর করে সে চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করে দেয়।

সুহান উঠে দাঁড়াল, ঘরের ভেতরে কয়েকবার পায়চারি করে সে তার ভিডিফোনটা তুলে নেয়, তার হঠাৎ কোনো একজন আপনজনের সাথে কথা বলার ইচ্ছে করছে। সে ভিডিফোনে ডায়াল করল, তার অনাথাশ্রমের ডিরেক্টর লারার সাথে সে কথা বলবে। ডায়াল করতেই স্ক্রিনে লারার ছবি ভেসে ওঠে, সুহানকে দেখে তার মুখ আনন্দোজ্জ্বল হয়ে ওঠে, প্রায় চিৎকার করে বলে, সুহান! তুমি?

হ্যাঁ লারা, আমি।

এতদিন পরে তোমাকে দেখে কী ভালো লাগছে আমার!

সুহান বলল, আমারও খুব ভালো লাগছে।

তুমি নিশ্চয়ই খুব ভালো করছ সুহান। লারা আনন্দিত গলায় বলল, তোমার নিজের ভিডিফোন হয়েছে।

সুহান ম্লান মুখে বলল, সেটা এমন কিছু নয়। তোমাদের কথা বলো লারা। সবাই কেমন আছ?

সবাই—সবাই–লারা একটু ইতস্তত করে বলল, আছে একরকম।

রুরা কেমন আছে সারা?

ভালোই আছে। একটু চুপচাপ হয়ে গেছে আজকাল।

দিনিয়া? দ্রুমা?

দিনিয়া আগের মতোই আছে। কিন্তু দ্রুমা–

সুহান উদ্বিগ্ন গলায় বলল, কী হয়েছে দ্রুমার?

কিছুদিন আগে তার আবার অ্যাটাক হল, মস্তিষ্কের একটা ধমনি ফেটে গিয়েছিল। দু দিন কোমায় ছিল।

সুহান নিচু গলায় বলল, ও।

তুমি ওসব নিয়ে মাথা ঘামিও না সুহান। নিজের কাজ করে যাও।

করব। সুহান একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, লারা।

বলো।

তুমি রুরাক দিনিয়া কিশি সবাইকে আমার ভালবাসা জানিয়ে দিও।

দেব। নিশ্চয়ই দেব।

তোমার জন্যও অনেক ভালবাসা লারা।

লারা সুন্দর করে হাসল, বলল, তোমার জন্যও সুহান।

ভিডিফোনটা রেখে দিয়ে সুহান আবার নিজের ভেতরে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা অনুভব করে। নিঃসঙ্গতাকে জোর করে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সে যখন তার জানালার সামনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল তখন সে তার মস্তিষ্কের ভেতর রিয়ানার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, সুহান।

বলো রিয়ান।

কালকে আমাদের সেই দিন।

হ্যাঁ।

তোমার ভয় করছে সুহান?

সুহান একটু হাসল, বলল, আমাদের মস্তিষ্ক সমন্বিত, তুমি তো জান রিয়ানা আমার কেমন লাগছে।

হ্যাঁ, জানি। পুরোটুকু জানি না, অনেকখানি জানি ভয়ের কিছু নেই সুহান। আমরা সবাই তোমার সাথে একসাথে আছি।

সুহান কোনো কথা বলল না। রিয়ানা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কাল তোমার সবচেয়ে গভীরভাবে সমন্বয় করতে হবে থিরুর সাথে। থিরু আমাদের সার্ভার, নেটওয়ার্ক, ডাটাবেস আর সিকিউরিটি এক্সপার্ট।

আমি চেষ্টা করব।

আমার মনে হয় এখন থির সাথে তুমি একটা সেশন কর।

ঠিক আছে। সুহান ডাকল, থিরু। থিরু তুমি কোথায়?

এই যে, আমি এখানে। থিরু তার স্বাভাবিক শান্ত গলায় বলল, আমি তোমার চোখ দিয়ে দেখতে চাই সুহান।

আমি চেষ্টা করছি।

সুহান তার সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, কয়েক মুহূর্তের মাঝে থিরুর সাথে সে পুরোপুরি সমন্বিত হয়ে যায়। সুহান দেখতে পায় সে একটি মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। মনিটরে নানা ধরনের সংখ্যা খেলা করছে। তার সামনে কী-বোর্ড, কী-বোর্ডে তার আঙুলগুলো যন্ত্রের মতো ছোটাছুটি করছে। সে থিরুর মতো দেখছে, থিরুর মতো শুনছে, থিরু মতো নিশ্বাস নিচ্ছে। নিজের অজান্তেই সে থিরুর সাথে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে যায়।

পরদিন সুহান তার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হল খুব ভোরে। আগে সে পাতাল ট্রেনে যাতায়াত করেছে, এখন দীর্ঘদিন সে ঘরে বসে আছে, খরচ নেই কিন্তু বেতনের ইউনিটগুলো নিয়মিত তার অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে, বেশ কিছু ইউনিট হয়ে গেছে ভার, ইচ্ছে করলে একটা ট্যাক্সিতে যেতে পারে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সে যখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না ঠিক তখন তার কাছাকাছি একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। খুট করে দরজা খুলে যায় এবং সুহান শুনতে পেল তার মস্তিষ্কে কেউ একজ্জন বলল, উঠে যাও।

সুহান চমকে উঠে বলল, উঠে যাব?

হ্যাঁ।

যদি কেউ দেখে ফেলে?

দেখবে না। কেউ নেই। তোমাকে তথ্যকেন্দ্রে নামিয়ে দিই।

সুহান ট্যাক্সিতে উঠতেই মৃদু গর্জন করে সেটা এগিয়ে যায়।

তথ্যকেন্দ্রের সামনে নামিয়ে দেবার পরও সুহান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। এর আগে কতবার সে এখানে এসেছে, ভেতরে ঢুকেছে। কাজ করেছে কাজ শেষে বের হয়ে এসেছে। আজ সম্পূর্ণ অনা ব্যাপার, সে ভেতরে ঢুকবে কিন্তু সে জানে না সে বের হতে পারবে কি না। সুহান জোর করে মাথা থেকে চিন্তা দূর করে দিল, বের হতে না পারলে নেই, কিন্তু তার ওপরে যে দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে সে সেটা শেষ করবে। সুহান একটা বড় নিশ্বাস ফেলে তার কার্ডটা হাতে তথ্যকেন্দ্রের দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

দরজায় কার্ডটা দেওয়ার সময় হঠাৎ তার হাত কেঁপে উঠল। আজ কি দূরজা খুলবে তার জন্য নিরাপত্তাকর্মীরা কি কোনোভাবে তার মনের কথা জেনে গেছে? কিন্তু না, তারা কেউ জানে না। ঘড়ঘড় শব্দ করে দরজা খুলে গেল, সুহান দেখতে পেল জিনেটিক কোডিং করার জন্য যন্ত্রটা নিয়ে নিরাপত্তা প্রহরীরা দাঁড়িয়ে আছে। সুহান একটু এগিয়ে গিয়ে যন্ত্রের ভেতরে আঙুলটা প্রবেশ করিয়ে দিতেই একটা মৃদু খেচা অনুভব করে, প্রায় সাথে সাথে মনিটরে সুহানের চেহারা ফুটে ওঠে। উপরে একটা সবুজ আলো জ্বলে উঠেছে—

নিরাপত্তা প্রহরী তীক্ষ্ণ চোখে সুহানের দিকে তাকাল, বিড়বিড় করে বলল, অনেক দিন পরে?

সুহান মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। অনেক দিন পর।

অক্সিডেন্ট?

সুহান বলল, , অ্যাক্সিডেন্টের মতোই। সুহান ভেতরে ভেতরে এক ধরনের আতঙ্কবোধ করে, তার গলার স্বরটি কি আজ একটু অন্যরকম শোনাচ্ছে, নিরাপত্তাকর্মীটি কি তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে? না, সেরকম কিছু না, শেষ পর্যন্ত সে হাত নেড়ে তাকে ভেতরে যেতে বলল, বুকের ভেতরে আটকে থাকা একটি নিশ্বাসকে বের করে দিয়ে সুহান ভেতরে ঢুকে গেল।

আর কোনো ভয় নেই। এই তথ্যকেন্দ্রটাকে সুহান হাতের তালুর মতো চেনে। সে একেবারে নিচু পর্যায়ের নিরাপত্তাকর্মী, কাজেই তার সব জায়গায় যাবার অনুমতি নেই। কিন্তু যেখানে যেখানে যাবার অনুমতি আছে সে জায়গাগুলোর কোথায় কোন ত্রুটি আছে সেটি তার মুখস্থ। সেই ত্রুটিগুলো ব্যবহার করে কীভাবে একটার পর আরেকটা নিরাপত্তা ব্যহ ভেদ করে একেবারে সার্ভার রুমে যেতে হয় সেটাও সে জানে। আজকে তাকে সেগুলো ব্যবহার করে একেবারে ভেতরে ঢুকে যেতে হবে। সুহান ঘড়ির দিকে তাকাল, তার হাতে অল্প কিছু সময় আছে। এখন তার নিজের ঘরে গিয়ে তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা তুলে নেবার কথা। সেটা হাতে নিয়ে তার নিচে যাবার কথা। সেখানে তাকে আজকের ডিউটি বুঝিয়ে দেওয়া হবে, তখন তাকে ডিউটিতে যেতে হবে। কিন্তু সে এখন নিচে যেতে চায় না, নিচে গেলেই সবার সাথে দেখা হবে, সবার সাথে তার কথা বলতে হবে, সে এখন কথা বলতে চায় না। সে এখন কারো সাথে দেখা করতে চায় না। ডিউটিতে রিপোর্ট করতে যাবার আগে তার হাতে অল্প কয়েক মিনিট সময় আছে, সে সেই সময়টাই ব্যবহার করতে চায়। এই সময়ের ভেতরেই নিরাপত্তা ব্যুহ ভেদ করে সে ভেতরে ঢুকে যেতে চেষ্টা করবে। এখনই সবচেয়ে ভালো সময়, সবচেয়ে বড় সুযোগ। একটু পর সে সুযোগ আর নাও পেতে পারে।

সুহান তার ঘরে গিয়ে অস্ত্রটা তুলে নেয়, ভাগ্যিস সেখানে এখন রিকি নেই। রিকি থাকলে এখন তার কিছুক্ষণ রিকির সাথে কথা বলতে হত—বিকি তার অ্যাক্সিডেন্টের খোঁজ নিত। কোন হাসপাতালে ছিল, ডাক্তাররা কী বলেছে—সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে

চাইত। রিকি খুব চমৎকার একজন মানুষ, তার সাথে কথা বলতে সুহানের খুব ভালো লাগে কিন্তু এই মুহূর্তে সে কারো সাথে কথা বলতে চায় না।

সুহান অস্ত্রটা কাঁধে ঝুলিয়ে করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে, করিডোরের একেবারে শেষ মাথায় লিফট। লিফটে করে সুহান তিন তালায় উঠে এল। সামনে এক শ মিটার পর্যন্ত নিরাপদ এলাকা, এইটুকু সে যেতে পারবে, এরপর নিষিদ্ধ এলাকা, সেখানে কারো যাবার অনুমতি নেই। কেউ যেন ভুল কৱে চলে না যায় সে জন্য দুটো অদৃশ্য অবলাল আলোর রশ্মি বাম থেকে ডান দিকে গিয়েছে, একটি মেঝে থেকে আধামিটার ওপর দিয়ে অন্যটি দেড় মিটার ওপর দিয়ে। অসতর্ক কেউ এখানে চলে এলে অবলাল রশ্মিটি বাধাপ্রাপ্ত হয়, সাথে সাথে কর্কশ স্বরে এলার্ম বাজতে শুরু করে। সুহান সেটা জানে তাই সে খুব সাবধানে একটা রশির ওপর দিয়ে অন্যটির নিচে দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল, কোনো এলার্ম বাজল না। সুহান তখন দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকে। শ খানেক মিটার দূরে এই তথ্যকেন্দ্রের প্রথম ত্রুটিপূর্ণ লেজার, সুহান এটা আবিষ্কার করেছে। লেজারটি বন্ধ করে দেবার সাথে সাথে নিরাপত্তা সার্কিট অন হয়ে যাবার কথা। কোনো একটি অজ্ঞাত কারণে সেটি অন হয় না এবং অমূল্য দুই মিনিটের সময় পাওয়া যায়, এই দুই মিনিটে যদি মূল করিডোরের ক্যামেরাটি একটু ঘুরিয়ে দেওয়া যায় তা হলে ক্যামেরার দৃষ্টিসীমার বাইরে দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাওয়া যায়।

সুহান লেজারটির কাছে গিয়ে ক্ষিপ্র হাতে সেটা বন্ধ করে প্রায় ছুটতে ছুটতে মূল করিডোরে ফিরে এল, ক্যামেরাটা এখন কাজ করছে না, আগের ছবিটা এখানে ফ্রিজ হয়ে আছে। দুই মিনিট সময়ের ভেতর ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে দিতে হবে, বেশি ঘোরালে ধরা পড়ে যাবে, কম ঘোরালে কাজ করবে না, এর মাঝামাঝি একটা জায়গায় আটকে দিতে হবে। সুহান নিশ্বাস বন্ধ করে ক্যামেরাটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুরিয়ে লেজারটির কাছে ফিরে গেল, এখনো কর্কশ স্বরে এলার্ম বাজতে শুরু করছে না, তার মানে এখনো সে ধরা পড়ে যায় নি। সুহান নিশ্বাস বন্ধ করে লেজারটি আবার চালু করে দিল, কোথাও এবারও এলার্ম বেজে উঠছে না, কাজেই সবকিছু পরিকল্পনা মতো কাজ করছে। চমৎকার!

সুহান ঘড়ির দিকে তাকাল, কাজ শুরু করার পর মাত্র দুই মিনিট পার হয়েছে অথচ তার কাছে মনে হচ্ছে বুঝি কয়েক যুগ কেটে গেছে। সুহান পিঠে ঝুলিয়ে রাখা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রী পরীক্ষা করে এবারে মূল করিডোরের দিকে হাঁটতে থাকে। ক্যামেরাটা একটু অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, সুহান দেয়াল ঘেঁষে ভেতরে ঢুকে গেল, ক্ষিপ্র পায়ে সে ছুটে যায়, সামনে সার্ভার রুম। সুহান সার্ভার রুমের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, দরজায় গোপন সংখ্যা প্রবেশ করিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। সুহান গোপন সংখ্যাটি জানে না, তার এখন সাহায্যের দরকার। তাকে সাহায্য করার জন্য এখন তাদের সমন্বিত সত্তা অপেক্ষা করছে। সুহান বলল, সংখ্যাটি কি বের করা হয়েছে?

হ্যাঁ।

বলো আমাকে।

বলছি। খুব সাবধান—একটি ভুল সংখ্যা প্রবেশ করালেই কিন্তু ধরা পড়ে যাবে।

ঠিক আছে।

প্রথম দুটি হচ্ছে সংখ্যা। তারপর তিনটি অক্ষর তারপর চারটি সংখ্যা। বুঝেছ?

বুঝেছি। তোমরা বলো।

সুহান দরজার নিরাপত্তা প্যানেলে একটি একটি সংখ্যা আর অক্ষর প্রবেশ করাতে থাকে। শেষ সংখ্যাটি প্রবেশ করানোর সাথে সাথে খুট করে দরজাটি খুলে গেল।

চমৎকার! সুহান বিড়বিড় করে বলল, এখন আমার দরকার দশ মিনিট সময়। মাত্র দশ মিনিট।

রিয়ানা চাপা গলায় বলল, । সেই দশ মিনিট সময় তুমি পাবে। তুমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাক। আমরা সবাই তোমার সাথে সমন্বিত হয়ে আছি। তুমি এখানে একা নও।

জানি। সুহান বলল, আমি সেটা জানি।

যাও, তুমি কাজ শুরু করে দাও।

সুহান পিঠ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা খুলে নিচে নামিয়ে রাখল তারপর বড় সার্ভারের সামনে গিয়ে তার দরজাটা খুলে নেয়। কী-বোর্ডটি বের করে নিয়ে আসে, সুইচ স্পর্শ করতেই সেটি অবলাল রশি দিয়ে সার্ভারের সাথে যোগাযোগ করে। সুহান একটা চেয়ারে বসে কী-বোর্ডের ওপর ঝুকে পড়ে। তার হাত হঠাৎ করে জীবন্ত প্রাণীর মতো কী-বোর্ডের ওপর ছুটতে থাকে। ঠিক তিন মিনিট পর সুহান একটা লম্বা নিশ্বাস নিল। সে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের প্রতিবেদনটা খুঁজে পেয়েছে। বিশাল প্রতিবেদন, প্রথমে সব বিজ্ঞানীদের পরিচিতি। দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন একজন বয়স্ক সমাজবিজ্ঞানী, হাসিখুশি মানুষ। এই রিপোর্টটি তৈরি করার অপরাধে তাকে নাকি খুন করে ফেলা হয়েছে। মনিটরে হাসিখুশি। মানুষটিকে দেখে সেটি বিশ্বাস করতে মন চায় না। দলটিতে আরো অনেক বিজ্ঞানী রয়েছেন, সবাই মিলে পুরো ব্যাপারটি বিশ্লেষণ করেছেন, অসংখ্য মানুষকে পরীক্ষা করেছেন, তাদের বুদ্ধিমত্তা আর সৃজনশীলতা পরিমাপ করেছেন। তাদের একজনের সাথে আরেকজনের তুলনা করেছেন। ক্যাটাগরি-বিমানুষের বিশেষ জিনগুলো অন্য মানুষের ওপর প্রতিস্থাপন। করেছেন, তাদের নিয়ে গবেষণা করেছেন। দীর্ঘ গবেষণা শেষে তারা প্রতিবেদনটি তৈরি করে মানুষের ভেতরে বিভাজন করার এই পুরো ব্যাপারটিকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেন। প্রতিবেদনটি দেখার সময় নেই, সুহান তাই দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হতে চায় এখানেই পুরোটা রয়েছে কি না। প্রতিবেদনের শেষ অংশটা সুহানের চোখে পড়ে যায়, কিছু মানুষকে ক্যাটাগরি-বি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে পৃথিবীর সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার এই উদ্যোগটা ষড়যন্ত্রমূলক, অন্যায়, অমানবিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণােদিত। এই মুহূর্তে মানুষের মাঝে ক্যাটাগরি-বি হিসেবে বিভাজন বন্ধ করে যারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে এমন একটি কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন যেন

ভবিষ্যতে কখনো কেউ এরকম হীন ষড়যন্ত্র করার সাহস না পায়।

সুহান প্রতিবেদন থেকে চোখ সরিয়ে এনে নেটওয়ার্কের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করার কাজে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করল। একজন মানুষের পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়, কিন্তু সে একজন মানুষ নয়। সে অনেক মানুষের সমন্বিত একটি অস্তিত্ব। দীর্ঘদিন থেকে চেষ্টা করে সবাই মিলে এর প্রস্তুতি নিয়েছে, সে নিশ্চয়ই নেটওয়ার্কের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে বাইরের পৃথিবীতে বিজ্ঞানীদের এই প্রতিবেদনটি পাঠিয়ে দিতে পারবে। নিশ্চয়ই পারবে।

সুহান দাতে দাঁত চেপে তার কী-বোর্ডের ওপর ঝুঁকে পড়ল। ঝড়ের বেগে তার হাত কী-বোর্ডের ওপর ছোটাছুটি করতে থাকে। অনেকগুলো প্রতিরক্ষা ব্যুহ রয়েছে, একটি ভেদ করেই শুধুমাত্র পরের কূহে যেতে পারে। প্রথম ব্যুহ থেকে পরেরটি কঠিন, তার পরেরটি আরো কঠিন। শেষ বৃহগুলোর সাথে হার্ডওয়্যারের সংযোগ আছে, সেগুলো স্পর্শ করা মাত্রই তীব্র স্বরে এলার্ম বেজে উঠবে, সাথে সাথে শত শত সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী ছুটে আসবে এই সার্ভার ঘরে। এলার্ম বাজার পর থেকে এই ঘরে তাদের আসতে বড়জোর তিন থেকে চার মিনিট সময় নেবে, তার ভেতরে তার শেষ বৃহটা ভেদ করে প্রতিবেদনটি মূল নেটওয়ার্কে পৌঁছে দিতে হবে। সে কি সত্যিই পারবে সেটা করতে? সুহান জোর করে মাথা থেকে চিন্তাটা দূর করে দেয়, এই মুহূর্তে সে শুধু কাজ করে যাবে। সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করবে নিরাপত্তা ব্যুহ ভেদ করার কাজে। একটু একটু করে সে ক্যাটাগরি-বি. মানুষকে পৃথিবীতে মুক্ত মানুষ হিসেবে পৌঁছে দেবার কাজে এগিয়ে যাচ্ছে।

চতুর্থ ব্যূহটি ভেঙে নেটওয়ার্কের কাছাকাছি পৌঁছে যাবার সাথে সাথে সমস্ত তথ্যকেন্দ্র কঁপিয়ে কর্কশ এলার্ম বেজে উঠল, সুহানের সারা শরীর হঠাৎ আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে ওঠে। তার হাতে আর মাত্র কয়েক মিনিট সময়, দেখতে দেখতে নিরাপত্তাকর্মীরা চলে আসবে এর মাঝে সে যদি শেষ ব্যুহটা ভেদ করতে না পারে তা হলে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ আর কখনোই সত্যিকারের মানুষ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

সুহান তার কী-বোর্ডের ওপর ঝুঁকে পড়ল। দ্রুত কিছু সংখ্যা প্রবেশ করিয়ে মনিটরের দিকে তাকায়, সঠিক সংখ্যাগুলো প্রবেশ করাতে পেরেছে কি? সুহান নিশ্বাস বন্ধ করে মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকে, হ্যাঁ, সে সঠিক সংখ্যাগুলো প্রবেশ করেছে, শেষ বৃহটা ভেঙে যাচ্ছে। দুর্বোধ্য সংখ্যা মনিটরের স্ক্রিনটা প্লাবিত করে রেখেছে কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে এই শেষ বৃহটা। সুহান এবারে পায়ের শব্দ শুনতে পেল, নিরাপত্তা বাহিনীর মানুষেরা চলে এসেছে। দরজায় হাত রেখেছে তারা, এখনো ব্যহটা ভেদ হয় নি। আতঙ্কে সুহানের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তা হলে কি সে পারবে না? তার একটু সময় দরকার, বেশি নয়, মাত্র কয়েক মিনিট।

ঠিক তখন তার আগ্নেয়াস্ত্রটির কথা মনে পড়ল। নিচু হয়ে সেটি তুলে নিয়ে দরজার দিকে লক্ষ করে এক পশলা গুলি করল। বাইরে নিরাপত্তাকর্মীদের ভ্রাতঙ্কিত চিৎকার শুনতে পায় সে, এগিয়ে আসতে সাহস করছে না কেউ। আরো কিছুক্ষণ সময় পেয়েছে সে। আবার সে ঝুঁকে পড়ল কী-বোর্ডের ওপর।

খুব ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ব্যূহটি সরে যাচ্ছে। সুহান বিস্ফারিত চোখে দেখতে পায় ধীরে ধীরে নেটওয়ার্কটি উন্মুক্ত হয়ে আসছে তার সামনে। আর অল্প কিছু সময় পেলেই সে বিজ্ঞানীদের প্রতিবেদনটুকু পাঠিয়ে দিতে পারবে বাইরে।

দরজায় আবার সে হুঁটোপুটি শুনতে পায়, নিরাপত্তাকর্মীরা আবার এগিয়ে আসছে তার কাছে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা হাতে নিয়ে সুহান আবার এক পশলা গুলি করার চেষ্টা করল, মাঝপথে হঠাৎ গুলি থেমে যায়, গুলি শেষ হয়ে গেছে। তার কাছে বাড়তি ম্যাগজিন নেই, বিষয়টি বুঝতে বেশি সময় লাগল না, সাথে সাথে নিরাপাকর্মীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল।

চোখের কোনা দিয়ে সুহান দেখতে পেল নিরাপত্তাকর্মীরা এগিয়ে আসছে। সবার সামনে রিগা, তার হাতে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র, যেটা দিয়ে সে এর আগে আরো একজনকে হত্যা

করেছিল।

সুহানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে, কী হবে এখন? ঠিক সেই মুহূর্তে মনিটরে দুর্বোধ্য সংখ্যার প্লাবন বন্ধ হয়ে একটা লেখা ফুটে ওঠে নিরাপত্তা ব্যহ অপসারিত, উন্মুক্ত নেটওয়ার্ক।।

নেটওয়ার্ক উন্মুক্ত হয়েছে, তার আর মাত্র একটি মুহূর্ত সময় দরকার। মাত্র একটি মুহূর্ত। সুহান কাপা হাতে কী-বোর্ডের তিনটা অক্ষর স্পর্শ করল, সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের গোপন প্রতিবেদনটি পৃথিবীর মূল নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে যায়, কয়েক সেকেন্ডের মাঝে সেটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাবে। পৃথিবীর কোনো শক্তি আর সেটি আটকে রাখতে পারবে না।

সুহান মাথা ঘুরিয়ে রিগার দিকে তাকাল, তার মুখে বিচিত্র এক ধরনের হাসি। রিগা উন্মুক্ত মানুষের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে, দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ক্যাটাগরি-বি. জানোয়ার। প্রথম দিনেই তোকে আমার খুন করা উচিত ছিল।

সুহান হাসল, বলল, সেজন্য এখন খুব দেরি হয়ে গেছে।

রিগা হিংস্র গলায় বলল, না। হয় নি। তারপর সে তার ছোট আগ্নেয়াস্ত্রটা তুলে গুলি করল, মস্তিষ্ক চূর্ণ হয়ে গেল সুহানের রক্ত ছিটকে এসে লাগল রিগার চোখে-মুখে। প্রাণহীন দেহটা চেয়ার থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়, উন্মুক্ত রিগা তবু থামে, হিংস্র দানবের মতো গুলি করতে থাকে তার মৃতদেহকে।

নিরাপত্তাকর্মীদের ঠেলে কিরি হঠাৎ ছুটে এল। চিৎকার করে বলল, থাম। খাম রিগা–

কেন? কী হয়েছে?

কিরি এগিয়ে এসে মৃতদেহের পাশে ঝুঁকে পড়ে সেটা পরীক্ষা করে বলল, এটা সুহান।

রিগা চিৎকার করে উঠল, সুহান না?

না। সুহানের মতো দেখতে একটা রবারের মাস্ক পরেছে—খুলে এসেছে এখন।

রিগাকে কেমন জানি বিভ্রান্ত দেখায়। তা হলে ভেতরে ঢুকল কেমন করে?

সুহানের কার্ডটা নিয়ে এসেছে। জিনেটিক কোডিং করার জন্য আঙুলে একটা কৃত্রিম ত্বক তৈরি করেছে, এই দেখ সুহানের রক্ত আছে সেখানে, সুহানের মতো কণ্ঠস্বর করার জন্য ভোকাল কর্ডে একটা ইমপ্লন্ট!

বিগ বড় একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, কী করতে এসেছে এখানে?

কিরি মনিটরে তাকিয়ে বলল, কী একটা ফাইল নেটওয়ার্কে পাঠিয়ে দিয়েছে।

কিসের ফাইল?

কিরি বলল, আমি জানি না। আমি এসব বুঝি না। মনে হয় দশম মাত্রার গোপনীয়।

রিগা হুঙ্কার দিয়ে বলল, বের কর কী ফাইল।

কেমন করে বের করতে হয় আমি জানি না।

রিগা চিৎকার করে বলল, সিস্টেমের লোক কোথায়? এক্ষুনি আসতে বলে। এক্ষুনি।

সেটা বের করার তখন কোনো প্রয়োজন ছিল না, সারা পৃথিবীতে ততক্ষণে বিজ্ঞানীদের গোপন প্রতিবেদনটা পৌঁছে গেছে। ক্যাটাগরি-বি. মানুষের বিরুদ্ধে যে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র করা। হয়েছিল সেটা প্রচারিত হতে শুরু করেছে। পৃথিবীর মানুষ হতবিহ্বল হয়ে মাত্র বুঝতে শুরু করেছে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ কী ভয়ংকর একটি ষড়যন্ত্র করেছিল, কী অমানবিক এবং নিষ্ঠুর সেই ষড়যন্ত্র।

সুহান থরথর করে তার চেয়ারে বসে কাঁপছিল। রিয়ানা তাকে ধরে রেখে বলল, শান্ত হও সুহান। শান্ত হও।

সুহান বলল, কেমন করে শান্ত হব। আমি স্পষ্ট দেখেছি রিগা আমার মাথায় গুলি করল, মস্তিষ্ক চূর্ণ হয়ে গেল আমার।

তোমার নয়, থিরু। তোমার মতো একটা রবারের মুখোশ পরে তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনে গিয়েছে। তুমি এখানে বসে তার সাথে নিজেকে সমন্বিত করেছ। খিরু নিজেকে সুহান ভেবেছে। সুহান হয়ে তথ্যকেন্দ্রে ঢুকে গেছে।

সুহান শূন্য দৃষ্টিতে রিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি সব জানি রিয়ানা, সব জানি কিন্তু তারপরেও বিশ্বাস হয় না। তুমি বিশ্বাস করবে না রিয়ানা কী ভয়ংকর সেই অনুভূতি।

মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কী ভয়ংকর একটি শূন্যতা এসে গ্রাস করে—

কিন্তু সেটি সত্যি নয় সুহান। তুমি বেঁচে আছ—

সুহান রিয়ানার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল, মি আমার নিজের কথা বলছি না রিয়ানা। আমি থিরুর কথা বলছি! মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তার বুকের ভেতর যে ভয়াবহ শূন্যতা ছিল, যে দুঃখ ছিল সেটি তুমি কল্পনা করতে পারবে না। পৃথিবীর কেউ পারবে না।

রিয়ানা মাথা নেড়ে একটা নিশ্বাস ফেলল, নরম গলায় বলল, আমাদের কিছু করার ছিল না সুহান। তোমাদের দুজনের একজনকে আমরা হারাতাম। আমরা ভেবেছিলাম তোমার কথা, থিবু কিছুতেই রাজি হল না, সে বলল নেটওয়ার্কের ভেতরে ঢুকে যাবার বিষয়টি সে অন্য কারো সাথে সমন্বিত করে করতে চায় না, নিজে করতে চায়।

সুহান বলল, এখন বুঝতে পারছি।

তুমি সমন্বিত হয়েছিলে শেষ মুহূর্তে যখন একটু বাড়তি সময় লাগল, তুমি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করে খানিকটা সময় নিলে

আমি জানি। কী ভয়ংকর বাস্তব সেই অনুভূতি—

তোমাদের দুজনের সমন্বয় ছিল অসাধারণ—আমরা তা না হলে কিছুতেই পারতাম। কিছুতেই না–

আমি সব বুঝতে পারছি রিয়ানা কিন্তু তবু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। সুহান মাথা নেড়ে বলল, কিছুতেই না।

সুহান, অমিরা সবাই একসাথে সমন্বিত হয়ে ছিলাম। থিরুর মাঝে আমরা বেঁচে ছিলাম, আমাদের মাঝে থিরু বেঁচে ছিল। থিরু চিরদিনের জন্য আমাদের মাঝে সমন্বিত হয়ে গেছে। আমাদের সবার মাঝে থির একটা অংশ বেঁচে আছে। বেঁচে থাকবে।

সুহান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক এরকম সময় লাল চুলের একটা ছেলে ছুটে এল, চিৎকার করতে করতে বলল, তোমরা এস। তাড়াতাড়ি এস। দেখ ভিডিস্ক্রিনে কী দেখাচ্ছে।

রিয়ানা আর সুহান বের হয়ে এল। বাইরে বিশাল ভিডিস্ক্রিনের সামনে সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে, কালো চুলের একটি মেয়ে উত্তেজিত গলায় কথা বলছে সেখানে, মাত্র কিছুক্ষণ আগে আমাদের সবার হাতে বিজ্ঞানীদের একটি প্রতিবেদন এসে পৌঁছেছে। এটি কেমন করে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে সেটি এখনো রহস্যাবৃত। আমাদের বিশেষজ্ঞরা এই মুহূর্তে সেটি বিশ্লেষণ করছেন, আমরা ইতোমধ্যে এর ভেতরের সতটুকু জেনে গেছি। যে বিষয়টি নিয়ে পৃথিবীর সত্যানুসন্ধানী মানুষেরা কথা বলে আসছিল সেটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে। মানুষের মাঝে কোনো বিভাজন নেই।

কালো চুলের মেয়েটি তার অবাধ্য চুলকে পেছনে সরিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল, পৃথিবীর সকল মানুষ এক। তাদের সবার দেহে একই রক্ত। তাদের মাথার চুল, গায়ের রং, মুখের ভাষা কিংবা ক্রোমোজম ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে কিন্তু তারা একই মানুষ। মানুষে মানুষে কোনো বিভাজন নেই। আগেও ছিল না ভবিষ্যতেও থাকবে না।

মেয়েটি হাতের মাইক্রোফোনটা হাতবদল করে বলল, সারা পৃথিবী থেকে আমাদের কাছে খবর এসে পৌঁছাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা তাদের ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে এসেছে। তারা রাজপথে মিছিল করে তথাকথিত ক্যাটাগরি-বি. ছেলেমেয়েদেরকে এই মুহূর্তে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের পাশাপাশি পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের কাছে খবর এসেছে শহরতলিতে নির্বাসিত তথাকথিত ক্যাটাগরি-বি. মানুষদের আবাসস্থলে হাজার হাজার মানুষ গিয়ে ভিড় করেছে। সেখানে মানুষের একটি অপূর্ব মিলনমেলার সৃষ্টি হয়েছে।

ভিডিস্ক্রিনে সবাই দেখতে পেল হাজার হাজার মানুষ একজন আরেকজনকে আলিঙ্গন করছে। ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত ছোট ছোট দুস্থ শিশু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, নানা বয়সী মানুষ তাদের গভীর মমতায় বুকে চেপে ধরছে। যে মানুষদের এতদিন ক্যাটাগরিবি, মানুষ হিসেবে অবহেলা করে এসেছে, সেই দুঃখী-অসহায় মানুষগুলোকে সাধারণ মানুষ জড়িয়ে ধরেছে গভীর ভালবাসায়।

যে ভালবাসা পৃথিবীর মানুষের সবচেয়ে পুরাতন অনুভূতি, সবচেয়ে অকৃত্রিম অনুভূতি, সবচেয়ে খাঁটি অনুভূতি।

যে অনুভূতি পৃথিবীর মানুষকে মানুষের পরিচিতি দিয়েছে।


সমাপ্ত