দ্বিতীয় পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#সুহানের_স্বপ্ন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
সুহানের স্বপ্ন
০১.
সুহান চিঠিটা হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল, সোনালি রঙের চতুষ্কোণ বড় খাম, খামের ডান পাশে হলোগ্রাফিক সরকারি সিল। সাধারণ মানুষের মতো তার যদি একটা ভিডিফোন থাকত তা হলে নিশ্চয়ই এরকম বড় একটা খামে করে তার কাছে চিঠি পাঠাত না সরাসরি ভিডিফোনে কথা বলত। ভিডিফোন নেই বলে তার কাছে এরকম একটা চিঠি পাঠাতে হয়েছে, নিশ্চয়ই কত জায়গা ঘুরে ঘুরে তার কাছে চিঠিটা এসেছে। রুরাক কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, সে চোখ বড় বড় করে বলল, এটা কী?
সুহান বলল, চিঠি। সরকার থেকে এসেছে।
রুরাক অবাক হয়ে বলল, চিঠিঃ কী আশ্চর্য! তারপর আশ্চর্য হবার ভঙ্গি করার চেষ্টা করতে লাগল।
সুহান রুরাকের দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে জানে রুরা আসলে আশ্চর্য হয় নি, তার অপরিণত মস্তিস্কের আশ্চর্য হবার ক্ষমতা নেই, সে শুধু স্বাভাবিক মানুষের মতো আশ্চর্য হবার, খুশি হবার এবং দুঃখ পাবার ভঙ্গি করে। রুদ্রাক আরেকটু কাছে এসে বলল, চিঠিটা খোলো, দেখি কী আছে ভেতরে।
সুহান বলল, খুলতে হবে না, আমি জানি ভেতরে কী আছে। রুককে এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত দেখায়, সে ঠিক বুঝতে পারছে না সুহান কী বলছে। আমতা-আমতা করে বলল, না খুলেই তুমি জান?
হ্যাঁ। আমি একটা চাকরি পেয়েছি।
চাকরি পেয়েছ? তুমি? রুরাকের মুখে প্রথমে এক ধরনের অবিশ্বাস তারপর হঠাৎ আনন্দের ছাপ পড়ল, সত্যি, তুমি চাকরি পেয়েছ?
হ্যাঁ। চাকরি না দিলে এরকম সরকারি চিঠি আসে না। সুহান একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, আমি কত দিন কত জায়গায় চাকরির জন্য চিঠি লিখেছি—এর আগে কেউ কোনো চিঠির উত্তর দেয় নাই। এই প্রথম চিঠি এসেছে, তার মানে একটা চাকরি।
রুরাককে এবারে সত্যিই উত্তেজিত দেখায়, সে জোরে জোরে কয়েকটা নিশ্বাস ফেলে বলল, আমি সবাইকে গিয়ে বলি?
দাঁড়াও, আগে খামটা খুলে সত্যি সত্যি দেখে নিই!
রুরাক ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইল, খামের ভেতর হালকা নীল রঙের একটা চিঠি, উপরে সরকারি সিল, স্মারক নম্বর, হলোগ্রাফিক চিহ্ন, নিচে গোটা গোটা টাইপে লেখা একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি। রুরাক দুই একটা অক্ষরের বেশি পড়তে পারে না তারপরও সে চিঠির ওপর ঝুঁকে পড়ল। সুহান চিঠিটা পড়ে মাথা নাড়ল, বলল, । আসলেই আমি চাকরি পেয়েছি।
রুরাক বিস্ময়াভিভূতভাবে সুহানের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, তার মানে তোমার একটা ভিডিফোন হবে, গাড়ি হবে?
সুহান হেসে ফেলল। একটা বড় ডাটাবেস অফিসে সিকিউরিটির চাকরি, যে বেতনের কথা লিখেছে সেটা দিয়ে ভালো করে খেতে-পরতে পারবে কিনা সেটাই সন্দেহ! কিন্তু রুরাককে এসব বলে লাভ নেই, তার অপরিণত মস্তিষ্কের জন্য সেটা খুব বেশি হয়ে যাবে,
সে বলল, একদিনে তো হবে না। আস্তে আস্তে হবে।
রুস্রাক উত্তেজিত গলায় বলল, তোমার যখন ভিডিফোন হবে তখন আমাকে সেটা দিয়ে কথা বলতে দেবে?।
সুহান হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, কার সাথে কথা বলবে?
রুরাক বলল, এখন বলব না।
আমি জানি তুমি কার সাথে কথা বলবে।
রাক একটু শঙ্কিত হয়ে বলল, কার সাথে?
নাতালিয়ার সাথে।
রুরাকের চোখে-মুখে প্রথমে অবিশ্বাস এবং হঠাৎ করে এক ধরনের ছেলেমানুষি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, বলল, তুমি ঠিকই বলেছ, আমি আসলে নাতালিয়ার সাথেই কথা বলতে চাই। একটু ইতস্তত করে বলল, তোমার কী মনে হয় সুহান, নাতালিয়া কি আমার সাথে কথা বলবে?
নাতালিয়া টেলিভিশনের একটা সস্তা বিনোদন অনুষ্ঠানের নায়িকা, সে সত্যিকার চরিত্র নয়, এনিমেশন করে তৈরি করা হয়েছে কিন্তু রুরা সেটা কখনো ধরতে পারে না। এই কাল্পনিক কমবয়সী মেয়েটার জন্য তার অনুরাগের কথা অনাথাশ্রমের সবাই জানে। সুহান রুককে আশ্বস্ত করে বলল, বলবে না কেন অবশাই বলবে!
নাতালিয়ার সাথে সে ভিডিফোনে কথা বলছে ব্যাপারটা কল্পনা করে রুকু পরিতৃপ্ত মুখে একটা নিশ্বাস ফেলল। সে কোনো বিষয় নিয়েই বেশি সময় চিন্তা করতে পারে না, এবারেও পারল না। আবার সে আগের বিষয়ে ফিরে এসে বলল, এবার তা হলে আমি সবাইকে গিয়ে বলি যে তোমার চাকরি হয়েছে?
তোমার ইচ্ছে রুরাক!
কিছুক্ষণের মাঝেই অনাথাশ্রমের সবাই জেনে গেল যে সুহান একটা চাকরি পেয়েছে। কী চাকরি, কোথায় চাকরি, কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাল না, সে চাকরি পেয়েছে সেটাই বড় কথা। এই অনাথাশ্রমে যারা থাকে তাদের সবাই জিনেটিক দিক দিয়ে ক্যাটাগরি-বি. গ্রুপের। অনেকেই অপরিণত-বুদ্ধির মানুষ, পৃথিবীর জটিল বিষয়গুলো তারা বুঝতে পারে না, কিন্তু তারপরও এটুকু জানে যে চাকরি পেয়ে এখান থেকে চলে যাওয়া বিষয়টা খুব সৌভাগ্যের ব্যাপার। যারা এই অনাথাশ্রম থেকে বাইরে যেতে পারে। না তাদের জীবনটা খুব দুঃখের জীবন। যারা এখানে থাকে তারা সেই জীবন নিয়ে কথা। বলতে চায় না। তাই একজন একজন করে অনাথাশ্রমের সবাই সুহানের কাছে এল, তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে গেল। যারা খুশি হয়েছে তারা যেরকম তাদের আনন্দটুকু গোপন রাখে নি, ঠিক সেরকম যারা ঈর্ষান্বিত হয়ে আছে তারাও তাদের ঈর্ষাটুকু গোপন রাখল না। সবাই চলে যাবার পর সুহান সরকারের সোনালি রঙের খামটা হাতে নিয়ে বের হয়। অনাথাশ্রমের দেয়ালঘেরা কম্পাউন্ডের এক কোনায় ছোট একটা বাসায় অনাথাশ্রমের ডিরেক্টর লারার বাসা। লারা মধ্যবয়সী হাসিখুশি মহিলা, সুহানকে খুব স্নেহ করে, তাকে খবরটা দেওয়া দরকার।
ঘরের বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে লারা ভিডিফোনে কার সাথে জানি কথা বলছিল, সুহানকে দেখে ভিডিফোনটা ভাঁজ করে সরিয়ে রেখে বলল, কী খবর সুহান?
লারা, আমি একটা চাকরি পেয়েছি।
সত্যি? লারার চোখে-মুখে আনন্দের ছায়া পড়ল, কী চমৎকার!
সুহান কোনো কথা না বলে দাঁড়িয়ে রইল। লারা উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, কী হল সুহান—তুমি খুশি হও নি?
সুহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর ফিসফিস করে বলল, ডাটাবেসের একটা অফিসে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি। বেতন তিন শ বিশ ইউনিট। দুই বছর অবেক্ষণ।
লারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নরম গলায় বলল, সুহান, আমি খুব দুঃখিত যে তুমি তোমার ক্ষমতার উপযুক্ত একটা কাজ পেলে না। আমি জানি তুমি একটা কলেজের শিক্ষক হবার ক্ষমতা রাখ, ইচ্ছে করলে তুমি ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তার হতে পারতে
সুহান মাথা নাড়ল, বলল, না লারা, আমি পারতাম না। আমি জিনেটিক গ্রুপে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ। এই পৃথিবীতে ক্যাটাগরি-বি. মানুষের কোনো জায়গা নেই।
লারা চুপ করে রইল, কারণ কথাটা সত্যি। মানুষের জিনেটিক প্রোফাইল দেখে তাদেরকে জিনেটিক-এ, এবং বি, এই দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে।
এ ক্যাটাগরির মানুষেরা দেশের প্রকৃত নাগরিক। তাদেরকে লেখাপড়ায় সুযোগ দেওয়া হয়, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বিজ্ঞানী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। নির্বাচনের সময় তারা ভোট দিতে পারে, সরকারি চাকরি পেতে পারে, ক্যাটাগরি-বি. গ্রুপের মানুষের কোনো সুযোগ নেই। শোনা যাচ্ছে আইন করে ক্যাটাগরি-বি. গ্রুপের মানুষকে অবমান নামে একটা গোষ্ঠীতে ফেলা হবে, তখন তাদের জীবনের কোনো মূল্য থাকবে না। তাদেরকে বিপজ্জনক কাজের মাঝে ঠেলে দেওয়া হবে, গবেষণার কাজে তাদেরকে ব্যবহার করা যাবে, এমনকি তাদেরকে কেউ খুন করে ফেললেও কোনো বিচার হবুে না।
সুহান বলল, তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ-—আমাকে এই চাকরিটা দেবার পেছনে কোনো একটা কারণ আছে।
কী কারণ?
নিশ্চয়ই এই চাকরিটা মানুষের জন্য খুব বিপজ্জনক তাই এটা আমাকে দিয়েছে। নিশ্চয়ই ছয় মাসের ভেতর আমি মারা পড়ব?
লারা জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল, কেন তুমি আগেই এরকম করে ভাবছ? হয়তো চাকরিটা ভালো। হয়তো যাদের সাথে কাজ করবে তারাও চমৎকার মানুষ—
সুহান লারাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, হতে পারে, কিন্তু আমি কাটাগরি-বি, মানুষ, আমার সাথে চমৎস্কার হওয়ার তো কোনো কারণ নেই।
লারার মুখে বেদনার একটা ছায়া পড়ল। সে নিচু গলায় বলল, এই ক্যাটাগরি-এ, আর ক্যাটাগরি-বি.-এর পুরো ব্যাপারটা হচ্ছে এক ধরনের পাগলামি, আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এটা সত্যিই ঘটে গেছে। তোমার উদাহরণটাই দেখ আমি তো তোমার মতো চমৎকার বুদ্ধিমান মানুষ আগে দেখি নি, অথচ সরকারিভাবে তুমি ক্যাটাগির-বি, মানুষ! রসিকতার তো একটা মাত্রা থাকা দরকার।
সুহান জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ লারা আমার সম্পর্কে এরকম একটা সুন্দর কথা বলার জন্য।
তোমাকে খুশি করার জন্য তো বলি নি। সত্যি জেনেই বলেছি। লারা সুর পাল্টে বলল, এস, ভেতরে এস এক কাপ কফি খাও।
সুহান ম্লান মুখে বলল, সত্যি তুমি কফি খেতে ডাকছ?
লারা অবাক হয়ে বলল, কেন সত্যি ডাকব না?
তুমি জান না ক্যাটাগরি-বি. মানুষকে বাসার ভেতরে আনা তৃতীয় মাত্রার অপরাধ?
লারা স্থির দৃষ্টিতে সুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমাকে এই ক্যাটাগরির বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে হবে সুহান। যখন কেউ তোমাকে নিজের মানুষ বলে গ্রহণ করতে চাইবে তখন তোমাকে সেটা গ্রহণ করতে হবে। মনে রেখ এই ভাগাভাগিটা কৃত্রিম, মানুষের সাথে মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। সরকার এটা করে ফেললেও সত্যিকার অর্থে মানুষ। ভাগাভাগি হয় নি।
সুহান লারার বেদনাহত মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি দুঃখিত লারা, আমি আসলে তোমাকে আঘাত দিয়ে কথা বলতে চাই নি।
আমি জানি সুহান। লারা ঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, আমার মনে হয় তুমি খুব চমৎকার একটা সুযোগ পেয়েছ। যদি তুমি এই চাকরিটা না পেতে তোমাকে হয়তো সামনের বছরেই ইউরিনিয়াম খনিতে যেতে হত। কিংবা কে জানে তোমার এই সুস্থ সবল শরীর দেখে তোমাকে হয়তো মহাকাশ গবেষণার কোনো পরীক্ষায় ঢুকিয়ে দিত।
সেটা এখনো করতে পারে।
তা হয়তো পারে–কিন্তু তারপরও তুমি এই সুযোগটা পেয়েছ। সামনাসামনি কারো প্রশংসা করতে হয় না, কিন্তু তবু করছি। তুমি অসম্ভব বুদ্ধিমান, তুমি উৎসাহী আর পরিশ্রমী। তুমি যত তুচ্ছ কাজ দিয়েই শুরু কর না কেন, তুমি উপরে উঠে আসবে। আমি তোমার সাথে বাজি রেখে এ কথাটা বলতে পারি।
সুহান কোনো কথা বলল না, তার মুখে সূক্ষ্ম একটা হাসি এক মুহূর্তের জন্য উঁকি দিয়ে গেল। লারা ভুরু কুঁচকে বলল, কী হল তুমি ওভাবে হাসছ কেন?
সুহান মাথা নেড়ে বলল, তোমার কথা শুনে। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি বুঝি একজন সত্যিকারের মানুষ।
লারা মাথা ঘুরিয়ে তীব্র স্বরে বলল, সুহান তোমাকে জানতে হবে যে তুমি সত্যিই একজন মানুষ। তুমি ক্যাটাগরি-বি হতে পার, কিন্তু ক্যাটাগরি-বি. মানুষ। অন্য কিছু নও। নিজের ওপরে সেই বিশ্বাসটা রাখতে হবে। বুঝেছ?
সুহান মাথা নাড়ল, বলল, বুঝেছি। আমি দুঃখিত লারা, আমি এরকমভাবে কথা বলছি। আমি আসলেই দুঃখিত।
ব্যস অনেক হয়েছে। এখন আমাকে কফির কৌটাটা নামিয়ে দাও। উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এই কফিটা এসেছে-ভারি চমৎকার খেতে। এর মাঝে দুই ফেঁটা স্নায়ু উত্তেজক নির্যাস দিয়ে দেব, দেখ খাওয়ার সাথে সাথে তোমার মনটা কত ভালো হয়ে যায়।
সুহান মুখে হাসি টেনে বলল, তা হলে দুই ফোটা কেন, বেশি করেই দাও। পারলে পুরো বোতলটাই ঢেলে দাও!
সুহানের কথা বলার ভঙ্গি শুনে লারা হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠল—হাসি খুব চমৎকার একটা ব্যাপার, হঠাৎ করে এই ঘরের ভেতরকার গুমট এবং অবরুদ্ধ যন্ত্রণা ও হতাশাটুকু কেটে সেখানে এক ধরনের স্নিগ্ধ আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।
সুহান একটা পাইন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অনাথাশ্রমের বড় দালানটার দিকে তাকিয়ে রইল। শ্রীহীন নিরানন্দ এই কংক্রিটের দালানটার জন্য সে হঠাৎ এক ধরনের বেদনা অনুভব করে, তার জীবনের বড় একটা অংশ সে এই কংক্রিটের দেওয়ালের ভেতরে কাটিয়ে এসেছে। এখানে আসার আগে সে আরো দুই একটা অনাথাশ্রমে বড় হয়েছে কিন্তু সেগুলোর কথা সে স্পষ্ট মনে কতে পারে না। নিষ্ঠুর ভালবাসাহীন কিছু মানুষের সাথে দীর্ঘ নিরানন্দ দিন, চাপা ভয় এবং আতঙ্ক ছাড়া তার আর কিছু মনে পড়ে না। যে বয়সে শিশুরা মা-বাবার আশ্রয়ে, পরিবারের ভালবাসায় বড় হয় সেই বয়সে সে শিখে গিয়েছিল এই পৃথিবী অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং স্বার্থপর। সে জেনে গিয়েছিল এখানে সে অপাঙক্তেয় এবং অনাকাক্ষিত। তাকে বোঝানো হয়েছিল সে দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ, তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, একটা পশুর জীবনের সাথে তার জীবনের কোনো পার্থক্য নেই, তার থেকে বেশি স্বপ্ন দেখার তার কোনো অধিকার নেই। তবু সে স্বপ্ন দেখেছে, তার চারপাশে তার চাইতেও হতভাগ্য যে মানুষগুলো ছিল সে তাদেরকেও স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছিল। খুব যে আহামরি স্বপ্ন তা নয়, কিন্তু আজকের দিন থেকে আগামী দিনটা যে আরো সুন্দর হবে সেই বিশ্বাসের স্বপ্ন।
সুহান একটা নিশ্বাস ফেলে কুশ্রী কংক্রিটের দালান্টার দিকে এগিয়ে আসে। রাতের অন্ধকারও এই দালানটার দীনতা ঢাকতে পারছে না, কিন্তু তারপরও হঠাৎ করে সুহান এই কদাকার কংক্রিটের দালানটার জন্য এক ধরনের গভীর মমতা অনুভব করে। তার সুদীর্ঘ জীবনের এই আবাসস্থল ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে, সে সম্ভবত আর কখনোই এখানে আসবে না। এই অনাথাশ্রমের মানুষগুলোকে সে আর কখনোই দেখবে না। কিশোর রুদ্রাকের পুরোপুরি অর্থহীন যুক্তিতর্ক তাকে আর শুনতে হবে না। অপরিণত-বুদ্ধি তরুণী দিনিয়ার অর্থহীন হাসির শব্দ শুনে সে আর ঘুম থেকে জেগে উঠবে না। গভীর রাতে কোনো এক দুঃখী মেয়ের ইনিয়েবিনিয়ে কান্নার শব্দ শুনে সে নিদ্রাহীন চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে না। অপ্রকৃতিস্থ দ্রুমার উন্মত্ত ক্রোধকে সংবরণ করার জন্য তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে স্নায়ু শীতল করার ইনজেকশন দিতে হবে না। সুহান এই দালানের ভেতর থেকে কত দিন বাইরে যাবার স্বপ্ন দেখেছে, শেষ পর্যন্ত যখন তার স্বপ্নটা সত্যি হবার সময় এসেছে হঠাৎ করে মনে হচ্ছে এই নিরানন্দ দালানটাই বুঝি তার সত্যিকারের আশ্রয়, এখানকার অপরিণত-বুদ্ধি মানুষগুলোই বুঝি তার সত্যিকারের আপনজন।
সুহান একটা নিশ্বাস ফেলে করিভোর ধরে হাঁটতে থাকে। কাল ভোরে সে তার এই অনাথাশ্রম ছেড়ে চলে যাবে। আনুষ্ঠানিকভাবে সে কারো কাছ থেকে বিদায় নেবে না। ছোট একটা ব্যাগে তার কিছু কাপড়, দুই একটা বই, কিছু তথ্য—ক্রিস্টাল, দৈনন্দিন ব্যবহারের কিছু জিনিসপত্র নিয়ে সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগে সে এখান থেকে বের হয়ে যাবে। ক্যাটাগরি-বি. মানুষ বলে সে এই অনাথাশ্রম থেকে খুব বেশি বের হয় না, শহরের কোথায় কী আছে সে খুব ভালো করে জানে না। কিন্তু সে খুঁজে বের করে নেবে। তার কাছে কিছু ইউনিট আছে, লারা জোর করে তার একাউন্টে আরো এক শ ইউনিট প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ তার থাকা-খাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। লারা বলেছে তার সরকারি চিঠিটা দেখালে তাকে কোনো ইউনিট ছাড়াই ট্রেনে উঠতে দেবে, স্বল্পমূল্যের হোটেলে থাকতে দেবে, এমনকি রেস্টুরেন্টে খেতেও দেবে। সরকারি চিঠিতে যে তারিখ দেওয়া আছে যে করেই হোক তার ভেতরে অবিশ্যি তাকে সেই তথ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে হবে। সুহান নিশ্চয়ই তার ভেতরে পৌঁছে যাবে। সে অনাথাশ্রমে একা একা বড় হয়েছে, বাইরের পৃথিবী নিয়ে তার কোনো অভিজ্ঞতা নেই কিন্তু সে জানে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই সে সবকিছু সামলে নিতে পারবে। সে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ হতে পারে কিন্তু সে জানে সে অনা সবার থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। সেটা কাউকে বোঝানো যাবে না সত্যি, কিন্তু সুযোগ পেলে সুহান সেটা প্রমাণ করে দিতে পারবে। সুহান জানে হয়তো সে জীবনে কখনোই সেই সুযোগ পাবে না, হয়তো কেউ তাকে সে সুযোগটা দেবে না। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না, জীবনটা তার কাছে যেভাবে আসবে সে সেভাবেই গ্রহণ করবে, সেভাবেই চেষ্টা করবে। সে কখনো চেষ্টা করা ছেড়ে দেবে না। কোনো একটা প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে সে পড়েছে সফল হওয়া বড় কথা নয় সফল হওয়ার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে বড় কথা। প্রাচীনকালে মানুষ যখন ধর্মকে বিশ্বাস করে সবকিছু কোনো প্রশ্ন না করে মেনে নিত তখন কি জীবনটা অনারকম ছিল? সুহান বিষয়টা নিয়ে ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। ঠিক এই সময় হঠাৎ সে কান্নার শব্দ শুনতে পেল। কেউ একজন ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদছে।
আহা! এই চার দেওয়ালের মাঝখানে কত দুঃখই না জানি লুকিয়ে আছে।
০২.
অফিসের দরজা বন্ধ। লোকজন তাদের কার্ড ঢুকিয়ে ভেতরে যাচ্ছে এবং আসছে, সুহানের কোনো কার্ড নেই, সে কেমন করে ঢুকবে বুঝতে পারল না। অন্য একজনের পিছু পিছু ঢুকে যাবার চেষ্টা করাটা নিশ্চয়ই একটা বেআইনি কাজ হবে, সে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ এরকম একটা কাজের ঝুঁকি নেওয়া মনে হয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। মোটামুটি সদয় চেহারার একজন মানুষকে দেখে সে এগিয়ে গেল, এই যে একটু শুনুন।
মানুষটা ভুরু কুঁচকে তাকাল এবং মুহূর্তে সদয় মানুষটাকে অত্যন্ত কঠিন চেহারার রূঢ় একজন মানুষ বলে মনে হতে থাকে। সুহান হড়বড় করে বলল, আমার একটু এই অফিসের ভেতরে যাওয়া দৰ্বকার।
দরকার হলে যাও। তোমাকে তো কেউ নিষেধ করছে না।
সুহান ইতস্তত করে বলল, কিন্তু আমার কাছে কোনো কার্ড নেই।
কার্ড নেই? মানুষটার কথা শুনে মনে হল সে যদি বলত আমার মাথা নেই তা হলে সে আরো কম অবাক হত। খানিকক্ষণ ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে বুঝতে না পেরে বলল, কার্ড নেই কেন?
সূহান বিব্রত হয়ে বলল, আমি আসলে কাটাগরি-বি. মানুষ।
ক্যাটাগরি-বি? সুহান লক্ষ করল মানুষটা সাবধানে একটু পিছিয়ে গেছে যেন ক্যাটাগরি-বি. মানুষের এক ধরনের ভয়াবহ ছোঁয়াচে রোগ রয়েছে। তুমি যদি ক্যাটাগরি বি, মানুষ হয়ে থাক তা হলে এখানে ঢোকার চেষ্টা করছ কেন?
সুহান তাড়াতাড়ি পকেট থেকে সরকারের হলোগ্রাম দেওয়া চিঠিটা বের করে বলল, এই যে, সরকার এই চিঠিতে আমাকে এখানে এসে যোগাযোগ করতে বলেছে।
মানুষটা চিঠিটা না ছুঁয়ে মাথাটা এগিয়ে দিয়ে চিঠিটা একনজর দেখে বলল, ও!
আপনি যদি ভেতরে সিকিউরিটির একজনকে বলেন একটু আমাকে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিতে–
ঠিক আছে। বলব। মানুষটা আরেকবার সুহানকে আপাদমস্তক দেখে ভেতরে ঢুকে গেল।
সুহান আবার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে, সে কিছুতেই অসহিষ্ণু হবে না, ধৈর্য ধরে সে অপেক্ষা করবে। সমস্ত পৃথিবী একটা অত্যন্ত কার্যকরী পদ্ধতির মাঝে ঢুকে গেছে, সে দুর্ভাগা তাই সে এর বাইরে। তাই যতবার সে এই পদ্ধতির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে ততবার ধাক্কা খেতে হচ্ছে। অনাথ আশ্রম থেকে এই পর্যন্ত আসতে তার কি কম ঝামেলা হয়েছে? প্রতিটা পদক্ষেপে তার কাউকে না কাউকে কিছু একটা জবাবদিহি করতে হয়েছে। সম্পূর্ণ অকারণে তাকে নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে। সে হাসিমুখে সব সহ্য করবে, কারণ সে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ হয়ে সত্যিকারের মানুষের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে চায়। অকারণেই সুহান তার মুখ শক্ত করে যখন চতুর্থবার বিল্ডিংটার সিঁড়ি দিয়ে নেমে আবার উপরে উঠে এলো তখন হঠাৎ করে একটা দরজা খুলে যায়। হালকা-পাতলা একজন মানুষ বের হয়ে বলল, এখানে কে ক্যাটাগরি-বি.?
সুহান তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায়, আমি।
হালকা-পাতলা মানুষ ভুরু কুঁচকে বলল, কী হয়েছে?
সুহান পকেট থেকে হলোগ্রাম দেওয়া চিঠিটা বের করে আবার পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে শুরু করল, কিন্তু মানুষটা তার আগেই বলল, এস। ভেতরে এস।
ভেতরে চারদিকে খোপ খোপ অফিস এবং তার ভেতরে মানুষ কাজ করছে। হালকাপাতলা মানুষটা তাকে একটা খোপের দিকে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে সোনালি চুলের একজন মহিলা ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। সুহান তাকে চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বলল, আমার কাছে এই চিঠিটা এসেছে, আমাকে বলেছে আপনাদের সাথে যোগাযোগ করতে।।
মহিলাটা সবিস্ময়ে বলল, চিঠি? মহিলার কথা শুনে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকে মাথা ঘুরিয়ে সুহানের দিকে তাকাল। চিঠি একটা প্রাগৈতিহাসিক বিষয়, আজকাল কোনো কাজেই চিঠি ব্যবহার করা হয় না। মহিলাটা বলল, চিঠি কেন? তোমাকে ভিড়িফোনে জানাল না কেন?
আমার ভিডিফোন নেই।
অতান্ত দরিদ্র মানুষ বা হতভাগা ধরনের মানুষের কখনো কখনো ভিডিফোন থাকে না, তাকেও সেরকম একজন ধরে নিয়ে মহিলাটা বলল, কেন? ভিডিফোন নেই কেন?
সুহান বিষয়টাকে আরো জটিল করে না ফেলে সোজাসুজি বলে দিল, আমি আসলে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ।
মহিলাটা এবারে রীতিমতো চমকে উঠে সোজা হয়ে বসে বলল, ক্যাটাগরি-বি.?
হ্যাঁ। তা হলে তুমি এই চিঠি কেমন করে পেয়েছ?
এ প্রশ্নের উত্তর সুহানের জানার কথা নয় কাজেই সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মহিলাটা সরকারি চিঠিটা স্ক্যান করিয়ে নেয়, সুহান দেখতে পায় স্ক্রিনে তার ছবি বের হয়ে এসেছে। মহিলাটা কিছুক্ষণ ছবিটা পরীক্ষা করে তার দিকে ডিএনএ প্রোফাইল বের করার ছোট যন্ত্রটা এগিয়ে দেয়। সুহান টিউবে তার আঙুলটা প্রবেশ করাতেই মৃদু একটা খোঁচা অনুভব করে। তার শরীরের টিস্যু নিয়ে সেটা বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়ে নেয় যে এই চিঠির বাহক আসলেই যাকে উদ্দেশ করে চিঠি পাঠানো হয়েছে সেই একই মানুষ।
মহিলাটা এবারে সুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি এখন এই সাদা বৃত্তের ভেতরে দাড়াও। এখন তোমার ছবি নেওয়া হবে। এগুলো হলোগ্রাফিক ছবি, কাজেই তুমি নড়বে না।
মহিলাটা কথা বলল ধীরে ধীরে বেশ স্পষ্ট করে, ছোট বাচ্চাদের সাথে একজন বড় মানুষ যেভাবে কথা বলে অনেকটা সেভাবে। মহিলাটা ধরে নিয়েছে সে যেহেতু ক্যাটাগরিবি, মানুষ কাজেই সে নির্বোধ এবং স্বল্পবুদ্ধির, তাকে সবকিছু আস্তে আস্তে বুঝিয়ে বলে না দিলে সে বুঝবে না। সুহান ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে এবং শেষ পর্যন্ত মহিলাটা তার হাতে ছোট একটা কার্ড ধরিয়ে দেয়।
সুহান কার্ডটা হাতে নিয়ে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করে, তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে যে, দেশের সত্যিকার নাগরিকের মতো তার একটা পরিচয় আছে। পথেঘাটে যদি কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে তোমার পরিচয় তখন তাকে আমতা-আমতা করে কৈফিয়ত দিতে হবে না। সে ইচ্ছে করলে অন্য দশজনের মতো মিউজিয়ামে যেতে পারবে, লাইব্রেরিতে যেতে পারবে এমনকি বড় কোনো দোকানে গিয়ে কিছু উত্তেজক পানীয় কিনতে পারবে। কার্ডের এক কোনায় বেশ বড় বড় করে ক্যাটাগরি-বি. কথাটা লেখা আছে কিন্তু লেখা থাকলেও এটা সত্যিকারের একটা কার্ড।
মহিলাটা বলল, এই কার্ডটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা সব সময় তোমার কাছে রাখবে। কার্ডটা যদি হারিয়ে যায় সাথে সাথে সেটা নিরাপত্তা দপ্তরে জানাবে। এই কার্ডে তোমার হলোগ্রাফিক ছবি, ডিএনএ প্রোফাইল দেওয়া আছে, কাজেই অন্য কেউ এটা ব্যবহার করতে পারবে না। এই কার্ড সাত শ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, পানিতে ভিজলে নষ্ট হবে না, পিএইচ দুই থেকে বারো পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। মেডিকেল ইমার্জেন্সির সময়…।
মহিলাটা তোতাপাখির মতো মুখস্থ বলে যেতে থাকে, তবে কথাগুলো বলল ধীরে ধীরে বেশ স্পষ্টভাবে যেন সুহানের বুঝতে অসুবিধা না হয়! মহিলাটার কথা শেষ্য হওয়ার পর সুহান তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে আসে। ভেতরে ঢোকার জুনা তার অনেক ঝামেলা করতে হয়েছিল বের হল খুব সহজে। দরজায় কার্ডটা স্পর্শ করানোর সাথে সাথে দরজাটা খুলে যায়, সুহান মাথা উঁচু করে বের হয়ে আসে।
সুহান শহরে ইতস্তত ঘুরে বেড়ায়। মানুষজন বাস্তু হয়ে হাঁটাহাঁটি করছে। রাস্তার দুই পাশে বড় বড় অফিস। মাঝে মাঝে খানিকটা জায়গা ঘিরে ঘিরে সুদৃশ্য দোকানপাট। পাতাল ট্রেন এসে থামছে—ওপরে মনোরেল, টাক্সি এবং বাস। সুহান ইচ্ছে করলে এসব জায়গায় এখন ঢুকতে পারবে কেউ তাকে থামাবে না। সে ছোট একটা খাবার দোকানে ঢুকে অর্ধেক ইউনিট খরচ করে এক বাটি সুপ আর প্রোটিনে মোড়ানো দুই টুকরো রুটি খেয়ে নেয়। একটা যোগাযোগ কেন্দ্রে ঢুকে আধা ইউনিট খরচ করে সে নিজের জন্য একটা ভার্চুয়াল ঠিকানা তৈরি করে নিল। এখন সে যে কোনো মানুষের কাছে এখান থেকে যোগাযোগ করতে পারবে। রাতটা কোথায় কাটাবে সে জানে না, তবে আগামী দুদিনের মাঝে তার তথ্যকেন্দ্রে। গিয়ে উপস্থিত হওয়ার কথা। সুহান সাত-পাঁচ ভেবে এখনই তার কাজে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। পাতাল ট্রেন স্টেশন থেকে বের হয়ে তাকে প্রায় কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হল। জায়গাটা শহরের বাইরে এবং বেশ নির্জন। পাশাপাশি কয়েকটা নিচু দালানের একটা তার তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিন। সে ঠিকানা মিলিয়ে নিশ্চিত হয়ে দরজায় তার কার্ডটা প্রবেশ করাতেই একটা এলার্ম বাজতে থাকে। কিছুক্ষণেই ঘড়ঘড় শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল এবং সুহান দেখল দুজন সশস্ত্র মানুষ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সুহান ভয়ে ভয়ে বলল, আমি একটা সরকারি চিঠি পেয়েছি যেখানে আমাকে বলা হয়েছে–
সশস্ত্র প্রহরী দুজনের একজন তার অস্ত্রটা নাড়িয়ে বলল, এস আমার সাথে।
একজন সুহানের সামনে আরেকজন পেছনে থেকে তাকে নানা করিডোর হটিয়ে একটা ঘরে এনে জির করল। সেখানে রাগী চেহারার একজন মহিলা সুহানের হাত থেকে কার্ডটা নিয়ে তার যোগাযোগ মডিউলে প্রবেশ করিয়ে দিতেই স্ক্রিনে তার ছবি ফুটে ওঠে। রাগী মহিলাটা ছবির সাথে সুহানের চেহারা মিলিয়ে নিয়ে চোখের রেটিনা স্ক্যান করার জন্য যন্ত্রটা তার দিকে এগিয়ে দেয়, সুহান যন্ত্রটাতে তার চোখ লাগিয়ে তাকিয়ে রইল, নিশ্চয়ই অবলাল আলোতে স্ক্যান করিয়েছে কারণ কখন স্ক্যান করা হয়ে গেল সে কিছু বুঝতেই পারল না। রেটিনা স্ক্যান করার পর সুহানের শরীর থেকে এক বিন্দু রক্ত নিয়ে ডিএনএ প্রোফাইল করা হল। হাত এবং পায়ের আঙুলের ছাপ রাখা হল, শরীরের ছবি নেওয়া হল, এক্স-রে করা হল এবং পুরো শরীরের অভ্যন্তরীণ ত্রিমাত্রিক ছবি নেওয়া হল। সব শেষ করে রাগী চেহারার মহিলাটা সুহানের কার্ডটা ফেরত দিয়ে বলল, তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিন-এ তোমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
সুহান বলল, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। একটু ইতস্তত করে যোগ করল, আমি এই প্রথম কোথাও কাজ করতে এসেছি সেজন্য একটু ভয় ভয় করছে।
রাগী চেহারার মহিলাটার মুখের কাঠিন্য হঠাৎ একটু শিথিল হয়ে আসে, সে নরম হয়ে বলল, জীবনে সবকিছুই কখনো না কখনো প্রথমবার শুরু করতে হয়। তোমার ভয় পাবার কিছু নেই সুহান।
আজ এই প্রযুম কেউ সুহানকে তার নাম ধরে সম্বোধন করল এবং সুহান প্রথমবার নিজেকে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে অনুভব করল। সে কৃতজ্ঞ গলায় বলল, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
আমার নাম কিরিনা।
তোমাকে অনেক ধন্যবাদ কিরিনা।
কিরিনা সুহানের হাতে একটা ছোট প্যাকেট দিয়ে বলল, তুমি এখন তিন শ বারো নম্বর ঘরে রিপোর্ট কর। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান রিগা সেখানে আছে। সে তোমাকে তোমার কাজ বুঝিয়ে দেবে।
সুহান আবার কিরিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বের হয়ে আসে। সুহানের এখনো বিশ্বাস হয় না যে সে এখন তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিন-এর একজন নিরাপত্তাকর্মী, সে এখন এখানে স্বাধীনভাবে হেঁটে বেড়াতে পারে। সুহান কিছুক্ষণের মাঝেই আবিষ্কার করল একটা দরজার সামনে আসতেই তার পকেটে রাখা কার্ড থেকে সিগন্যাল পেয়ে করিডোরের দরজাগুলো নিজের থেকে খুলে যাচ্ছে। সুহান হাঁটাহাঁটি করে তিন শ বারো নম্বর ঘরটা খুঁজে বের করে দরজাটা একটু খুলে ভেতরে উঁকি দেয়। বড় একটা টেবিলের এক পাশে মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ বসে নির্মমভাবে তার গাল চুলকাতে চুলকাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের সাথে কথা বলছে। এই মানুষটা নিশ্চয়ই রিগা, সুহানকে দরজা খুলে উঁকি দিতে দেখে বলল, কে?
আমি সুহান। আমি আজকে এখানে কাজে যোগ দিয়েছি।
এস। ভেতরে এস।
সুহান ভেতরে ঢুকল। মানুষটা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ সুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি তো দেখি একটা কচি খোকা, এখানে কাজ করবে কেমন করে?
এটা সত্যিকার অর্থে কোনো প্রয়োজনীয় কথা নয় তাই সুহান কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে যদি এখানে কাজের উপযুক্ত মানুষ না হত তা হলে নিশ্চয়ই। তাকে এখানে কাজ করতে পাঠাত না। মানুষটা আবার নির্মমভাবে তার গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, তোমার নাম কী বলেছ?
সুহান দ্বিতীয়বার তার নাম বলল, সুহান।
আগের কোনো কাজের অভিজ্ঞতা আছে?
না, নেই।
মানুষটা খুব বিরক্ত হবার ভান করে কাছাকাছি রাখা মনিটরে সুহানের প্রোফাইলটা দেখতে শুরু করে। স্ক্রিনে তার ছবি এবং পরিচয় দেখে হঠাৎ সে প্রায় চিৎকার করে উঠল, আরে! তুমি দেখি ক্যাটাগরি-বি.!
সুহান মাথা নাড়ল। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান রিগা খানিকক্ষণ চোখ বড় বড় করে সুহানের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মুখ বিকৃত করে বলল, তুমি এখানে কীভাবে এসেছ?
সুহান দাতে দাঁত চেপে অপমানটুকু সহ্য করে বলল, আমি নিজে থেকে এখানে আসি নি। আমাকে সরকারি দপ্তর থেকে এখানে পাঠানো হয়েছে।
মানুষটা টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, ভুল হয়েছে। নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে। তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিন হাই সিকিউরিটি তথ্যকেন্দ্র, এখানে বানর-শিম্পাঞ্জি দিয়ে কাজ হবে না। আমার সত্যিকারের মানুষ দরকার।
অপমানে সুহানের কানের গোড়া পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল। সে তবুও অনেক কষ্ট করে অপমানটুকু সহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষটা আবার স্ক্রিনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু দেখে বিরক্ত হয়ে মাথা নেড়ে বলল, সত্যিই দেখি তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে। কী আশ্চর্য!
মানুষটা বেশ কিছুক্ষণ সুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি আগে কখনো ক্যাটাগরি-বি. মানুষ দেখি নি।
এটাও কোনো প্রশ্ন নয়, সুহানকে নিশ্চয়ই এর উত্তর দিতে হবে না। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। যে কারণেই হোক, সুহানের চুপ করে থাকার জন্য এই মানুষটা আরো রেগে ওঠে। তার মুখে বিষাক্ত এক ধরনের হাসি ফুটে উঠল, চোখ ছোট ছোট করে বলল, আমি শুনেছি ক্যাটাগরি-বি. মানুষ আসলে পশুর কাছাকাছি। শুধু আইনগত জটিলতার জন্য তাদেরকে মানুষ বলা হয়।
এত বড় একটা কথা সুহানের পক্ষে চুপ করে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, সে মাথা নেড়ে বলল, এটা সত্যি নয়।
মানুষটা সুহানের কথা শুনে রীতিমতো চমকে উঠল, সে কখনো কল্পনা করে নি সুহান এরকম একটা পরিবেশে তার কথার প্রতিবাদ করবে। রিগা এটাকে তার প্রতি ব্যক্তিগত অপমান ধরে নিয়ে চিৎকার করে বলল, তুমি বলতে চাও আমি মিথ্যা কথা বলছি? আমি নিরাপত্তা দপ্তরের প্রধান লেফটেন্যান্ট রিগা তোমার মতো নগণ্য একটা ক্যাটাগরি-বি. মানুষের সাথে মিথ্যা কথা বলব?
সুহান একটু বিপন্ন অনুভব করতে থাকে। রিগার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জিব দিয়ে শুকনো ঠোট ভিজিয়ে বলল, আমি সেটা বলি নি। তবে ক্যাটাগরি-বি. মানুষকে শুধু আইনগত জটিলতার জন্য মানুষ বলা হয় এটা ভুল তথ্য।
আমি নিজে পড়েছি যে তারা বিবর্তনে মানুষ থেকে অনেক পেছনে। তাদের পশু প্রবৃত্তি আছে। এমনকি তাদের শরীরে এখনো পর চিহ্ন আছে।
সুহানের পক্ষে এটাও সহ্য করা সম্ভব হল না, রিগার দিকে তাকিয়ে বলল, পর চিহ্ন বলতে তুমি কী বোঝাচ্ছ?
তাদের বেশিরভাগেরই নাকি এখনো ছোট লেজ আছে।
সুহান নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না যে সত্যিই এখনো এরকম মানুষ আছে যারা মনে করে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ আসলে পণ্ডর কাছাকাছি। সুহান হঠাৎ করে প্রতিবাদ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলুল। এই অমার্জিত এবং ঐ মানুষটার সাথে কথা বলে কী লাভ, সে তো কোনোভাবেই তার সংকীর্ণ চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন করতে পারবে না। সুহান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল এবং তার নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকাটাকে রিমা আবার এক ধরনের বেয়াদবি হিসেবে বিবেচনা করল। রিগা ভয়ানক মুখভঙ্গি করে বলল, আমরা এখনই সেই পরীক্ষা করে ফেলতে পারি।
সুহান একটু অবাক হয়ে তাকাল, কী পরীক্ষা?
তোমার শরীরে পশুর চিহ্ন আছে কি না।
সুহান তখনো ঠিক বুঝতে পারল না রিগা কী বলতে চাইছে। রিগা কঠোর মুখে বলল, তুমি তোমার কাপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে দাড়াও।
সুহানের মনে হল তার মাথার ভেতরে একটা ছোট বিস্ফোরণ ঘটে গেল, সে হিংস্র চোখে রিগার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কখনো একজন মানুষকে এরকম নির্দেশ দিতে পার না।
রিগা টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, পারি। তুমি আমার আদেশে, আমার নির্দেশে তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনে কাজ করবে।
সেটা হবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজ। আমার সম্মান নষ্ট করে তুমি আমাকে কোনো নির্দেশ দিতে পারবে না। আমাদের সংবিধান প্রত্যেকটা মানুষের সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছে।
সত্যিকারের মানুষের। তোমার মতো ক্যাটাগরি-বি. শিম্পাঞ্জির নয়।
সুহন কঠোর মুখে বলল, আমি ক্যাটাগরি-বি. শিম্পাঞ্জি নই। আর্মি ক্যাটাগরি-বি. মানুষ। একজন মানুষের যত অধিকার থাকার কথা তার অনেক কিছু আমাদের নেই। কিন্তু আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারটা এখনো আছে।
রিগা হুঙ্কার দিয়ে বলল, সেই অধিকারটাও থাকবে না। সেজন্য নতুন আইন পাস করা হচ্ছে।
সুহান একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে বলল, যখন সেই আইনটা পাস হবে তখন তুমি বলতে এস। এখন বলো না।
রিগা হঠাৎ চোখ ছোট ছোট করে বলল, তুমি মনে করেছ আমাদের সেই আইনটা পাস করার জন্য অপেক্ষা করতে হবে? তুমি মনে করেছ আমি এখনই তোমাকে উলঙ্গ করতে পারব না?
সুহান পাথরের মতো মুখ করে বলল, না পারবে না।
রিগা হঠাৎ তার ড্রয়ারের তলা থেকে একটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বের করে নিয়ে বলল, পারব না?
সুহান তার শেষ বাক্যটা সংশোধন করে বলল, প্রাণ থাকতে পারবে না।
তুমি জান আমি যদি এই ঘরে তোমাকে গুলি করে হত্যা করে বলি আত্মরক্ষার। জন্য আমার তোমাকে হত্যা করতে হয়েছে তা হলে কেউ আমাকে অবিশ্বাস করবে না?
সুহান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, এই ঘরে আরো একজন মানুষ আছে। একই ঘরে একইসাথে ঠিক তোমার মতো চরিত্রের দুই জন মানুষকে পেয়ে যাবার সম্ভাবনা খুব কম। সে তোমার কথার প্রতিবাদ করতে পারে। সে কাটাগরি-বি, মানুষ নয়, কাজেই সে তোমার মিথ্যে কথা শুনতে বাধা নয়।
তুমি তাই মনে কর? রিগা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা সুহানের দিকে তাক করে ধরে বলল, ঠিক আছে তা হলে সেই পরীক্ষাটাই হয়ে যাক।
সুহান রিগার চোখের দিকে তাকাল এবং হঠাৎ সেখানে নিশ্চিত মৃত্যুকে দেখতে পায়। মানুষটা সত্যিই তাকে খুন করে ফেলবে, এই মানুষটা উন্মাদ। সুহান হঠাৎ অসহায় অনুভব। করে—তার জীবনটা দ্রুত এত অর্থহীনভাবে শেষ হয়ে যাবে সে কখনো কল্পনা করে নি। সে কি কিছু করতে পারবে না? শুধু মানুষের সম্মান পাবার জন্য তাকে এভাবে মারা পড়তে হবে?
সুহান দেখতে পেল রিগা ট্রিগারে আঙুল রেখে বলল, কেউ তোমাকে রক্ষা করতে আসবে না!
সুহান শেষ চেষ্টা করল, শুধু বেঁচে থাকার জন্য সে শেষ চেষ্টা করল, সম্পূর্ণ আন্দাজের ওপর ভরসা করে বলল, আশা করি, আমাকে খুন করার জন্য তোমার কারণটা যেন যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হয়। সারা পৃথিবী থেকে খুঁজে যখন একজন ক্যাটাগরি-বি. মানুষ আনা হয় তার পেছনে একটা কারণ থাকে।
রিগাকে এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত দেখা গেল, সুহান সত্যি কথা বলছে না মিথ্যে কথা বলছে সেটা খুব সহজে রিগা বুঝতে পারবে না। রিগা বলল, তোমাকে সারা পৃথিবী থেকে খুঁজে আনা হয়েছে?
আমার কথা বিশ্বাস না হলে তুমি খোঁজ নিতে পার?
সুহান ভেবেছিল মানুষটা খোঁজ নেবে না, কিন্তু সে আতঙ্কিত হয়ে দেখল রিগা মনিটরে ঝুঁকে পড়েছে। সুহান বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে গেছে, স্বয়ংক্রিয় অন্ত্রের গুলি নাকি মিথ্যে কথা বলে ধরা পড়ার অপমান—কোনটা বেশি যন্ত্রণাদায়ক হবে?
রিগা মনিটরের দিকে আরো ঝুঁকে পড়ল। হঠাৎ করে তার মুখ গম্ভীর হয়ে যায়, সে যখন মাথা ঘুরিয়ে সুহানের দিকে তাকিয়েছে তখন সেখানে এক ধরনের বিচিত্র দৃষ্টি, খানিকটা ভয় এবং অনেকখানি বিস্ময়। রিগা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা ড্রয়ারের ভেতরে রেখে তার। গালটা নির্মমভাবে চুলকাতে থাকে। তারপর সুহানের পাশে দাড়ানো মানুষটাকে বলল, কিরি, তুমি এই ছেলেটাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও।
সুহান প্রথমবার তার পাশে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে তাকাল, সোনালি চুল এবং নীল চোখ। মানুষটা সুদর্শন, চেহারায় এক ধরনের কাঠিন্য রয়েছে কিন্তু কোনো নিষ্ঠুরতা নেই। মানুষটা বলল, ঠিক আছে রিগা।
তুমি তোমার কাজটা এই ছেলেকে বুঝিয়ে দাও। এখন থেকে তোমরা দুই জন। একসাথে থাকবে। বুঝেছ?
হ্যাঁ রিগা। বুঝেছি।
০৩.
কিরি বলল, তুমি আমাকে একটু ছুঁয়ে দাও তো।
সুহান একটু অবাক হয়ে বলল, আমি? তোমাকে ছুঁয়ে দেব?
কিরি বলল, হ্যাঁ।
কেন?
আমার খুব কপাল খারাপ। তুমি ছুঁয়ে দিলে হয়তো আমার কপালটা একটু ভালো হবে।
সুহান মাথা ঘুরিয়ে কিরির দিকে তাকাল, সে তার সাথে ঠাট্টা করছে কি না বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু না, তার চোখে-মুখে ঠাট্রার কোনো চিহ্ন নেই।
সুহান বলল, তোমার কেন ধারণা হল আমি ছুঁয়ে দিলে তোমার কপাল ভালো হবে?
কারণ আমি আমার জীবনে তোমার চাইতে সৌভাগ্যবান কোনো মানুষ দেখি নি।
সুহান অবাক হয়ে বলল, আমার চাইতে সৌভাগ্যবান কোনো মানুষ দেখ নি?
না। কিরি মাথা নেড়ে বলল, তোমার খুন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তোমার লাশ এখন পলিমারের প্যাকেট করে হিমঘরে নেওয়া উচিত ছিল। তার বদলে তুমি এখন হাঁটছু। কিরি তার হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নাও আমাকে ছুঁয়ে দাও।
সুহান কিরির হাতটা ছুঁয়ে বলল, এই যে ছুঁয়েছি। এখন কি তোমার নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে?
কিরি একটু হাসল, বলল, সেটা ভবিষ্যতে দেখা যাবে।
আমি জানতাম না সৌভাগ্য চর্মরোগের মতো ছোঁয়াচে। ছুঁয়ে দিলে ঘটে যায়।
আমিও জানতাম না। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।
সুহানের এই মানুষটাকে বেশ পছন্দ হল। তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনে এই মানুষটার সাথে থাকবে ভেবে হঠাৎ করে তার মনটা ভালো হয়ে যায়। একটু আগে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান রিগার সাথে তার যে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছে সেটা এখনো সে ভুলতে পারছে না।
একটা লিফটে করে দুজনে উপরে উঠে এল। বড় করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিরি বলল, আমি জানতাম না তুমি এত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। সারা পৃথিবী থেকে তোমাকে বেছে আনা হয়েছে।
আমিও জানতাম না।
কিরি অবাক হয়ে বলল, তুমিও জানতে না? তার মানে? তুমি না রিগাকে সেটা বললে?
বাঁচার জন্য বানিয়ে বলেছিলাম।
বানিয়ে বলেছিলে?
সুহান বলল, হ্যাঁ। তুমি আমাকে যতটা সৌভাগ্যবান মনে কর আমি নিজেকে ততটা সৌভাগ্যবান মনে করি না। তাই জান বাঁচানোর জন্য আমাকে মিথ্যে কথা বলতে হয়।
কিন্তু এটা তো মিথ্যা কথা নয়। তোমার সামনেই তো রিগা পরীক্ষা করে দেখল আসলেই তোমাকে সারা পৃথিবী থেকে বেছে আনা হয়েছে।
সুহান একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ, সেটা দেখেই তো এখন আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি। ভেবে পাচ্ছি না কেন আমাকে এনেছে।
কিরি অন্যমনস্কভাবে বলল, ভারি আশ্চর্য!
সুহান বলল, তুমি যদি খুব ভালো করে চিন্তা কর তা হলে দেখবে এটা সেরকম আশ্চর্য নয়।
কেন?
আমার কী মনে হয় জান? সুহান একটু চিন্তা করে বলল, আমার মনে হয় এই তথ্যকেন্দ্রে হয়তো খুব বিপজ্জনক কিছু একটা ঘটার আশঙ্কা আছে। কেউ হয়তো মারা পড়তে পারে। তাই আমাকে এনেছে, বিপজ্জনক কাজে ব্যবহার করবে, মারা যদি যেতেই হয় তা হলে একটা ক্যাটাগরি-বি. মানুষ মারা যাক।
মারার ন্যই যদি আনতে হয় তা হলে তো সারা পৃথিবী খুঁজে আনতে হয় না। কিরি হঠাৎ করে সুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, আমাকে একটা জিনিস বল, তুমি কি খুব প্রতিভাবান?
সুহান একটু ইতস্তত করে বলল, সেটা আমি নিজের সম্পর্কে কেমন করে বলি? আমি তো অনাথাশ্রমে বড় হয়েছি কখনো পড়াশোনা করার সুযোগ পাই নি। নিজে নিজে পড়েছি, ঘরে বসে পরীক্ষাগুলো দিয়েছি।
কেমন হয়েছে পরীক্ষা?
সুহান হাসল, বলল, খুব ভালো। আমি যদি ক্যাটাগরি-বি. মানুষ না হয়ে তোমাদের মতো একজন হতাম তা হলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে যেতাম।
সত্যি? কিরির দুই চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে, তুমি সত্যি বলছ?
হ্যাঁ। আমি সত্যি বলছি।
কী ভয়ংকর অন্যায়। তোমার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার কথা, জ্ঞানী মানুষদের সাথে কথা বলার কথা, তার বদলে তুমি আমার মতো একজন হতভাগার সাথে নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করছ।
সুহান বলল, কিন্তু তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে কিরি। আমার মনে হয় গোমড়ামুখী বুড়ো প্রফেসরদের সাথে জ্ঞানের কথা বলা থেকে তোমার সাথে কাজ করা। অনেক বেশি আনন্দের হবে।
কিরি বলল, সেটা তুমি আমাকে খুশি করার জন্য বলেছ, সেজন্য অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু তোমার বিরুদ্ধে যে অন্যায় করা হয়েছে সেটা তো চলে যাচ্ছে না।
সুহান বলল, ওসব নিয়ে আর কথা না বললাম।
ঠিক আছে তুমি যদি না চাও তা হলে বলব না।
আমাকে তা হলে বলে দাও আমার কী করতে হবে। আমি আগে কখনো কোনো ধরনের কাজ করি নি।
সেটা সমস্যা হবার কথা না। এই তথ্যকেন্দ্রে নিরাপত্তার সকল কাজ করা হয় ইলেকট্রনিক্স ব্যবহার করে। যন্ত্রপাতি, ক্যামেরা, কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক এগুলোই সব কাজ করে। আমাদের রাখা হয়েছে একটা বাড়তি স্তর হিসেবে। যন্ত্রপাতির চোখ এড়িয়ে যেতে পারে এরকম কিছু যদি ঘটে যায় সেগুলো দেখার জন্য।
সেরকম কিছু কি ঘটেছে?
কিরি একটু ইতস্তত করে বলল, আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের জানানো হয় নি কিন্তু আমার মনে হয় ঘটেছে। কয়েকদিন আগে দুর্ঘটনায় দুজন মারা গেছে, কিন্তু আমার মনে হয় সেগুলো দুর্ঘটনা নয়। আমার মনে হয় দুজন মানুষ বাইরে থেকে এই তথ্যকেন্দ্রে ঢুকে গিয়েছিল।
সুহান অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি?
আমার তাই ধারণা। যাই হোক ওসব পরের ব্যাপার, এখন কাজের কথায় আসি।
তুমি কি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করতে পার?
সুহান হাসল, বলল, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? আমি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র কোথায় পাব?
বুলেট প্রুফ জ্যাকেট কখনো চোখে দেখ নি?
না।
শরীরের কোথায় খালি হাতে আঘাত করে একজন মানুষকে বেশ কিছুক্ষণের জন্য অচেতন করে রাখা যায় সেটা সম্পর্কেও তোমার নিশ্চয়ই কোনো ধারণা নেই।
তুমি যদি জিজ্ঞেস কর তা হলে আমি অনুমান করার চেষ্টা করতে পারি।
এর মাঝে অনুমানের কোনো জায়গা নেই।
তা হলে তোমার প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, না।
কিরি কলল, ঠিক আছে তা হলে তোমার ট্রেনিং শুরু হয়ে যাক।
কখন?
এখন থেকেই। তার আগে চল তোমাকে তোমার থাকার জায়গা দেখিয়ে দিই। মাঝে মাঝে তোমাকে এখানে একনাগাড়ে কয়েক দিন থাকতে হতে পারে তখন এখানে ঘুমাতে পারবে।
চমৎকার।
সুহান তথ্যকেন্দ্র থেকে যখন বের হয়েছে তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। তাকে এখন কিছু খেয়ে রাতে ঘুমানোর একটা জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। ছোট একটা রেস্টুরেন্টে কিছু একটা খেয়ে সে ঘুমানোর জন্য একটা সস্তা হোটেল খুঁজতে থাকে। একটু গুছিয়ে নেবার পর তাকে একটা এপার্টমেন্ট বা ঘর খুঁজে নিতে হবে। সুহান আলোকোজ্জ্বল রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশের দালানগুলো দেখতে থাকে। একটা হোটেলকে মোটামুটিভাবে বেশ ভালোই মনে হল। সে একটু ইতস্তুত করে ভেতরে ঢুকে যায়। লবিতে ছোষ্ট যন্ত্রটার মাঝে কার্ডটা প্রবেশ করিয়ে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে রইল, কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট একটা জানালা খুলে একজন মহিলার মাথা উঁকি দেয়, সুহান?
হ্যাঁ, আমি সুহান।
তথ্যকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনের নিরাপত্তাকর্মী?
হ্যাঁ। আমি আজ থেকে সেখানে কাজ করছি।
চমৎকার। মহিলাটা মুখে একেবারে মাপা একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, তোমার জন্য আমি কী করতে পারি?
আজ রাতে থাকার জন্য আমার একটা রুম দরকার।
মনিটরের স্ক্রিনে চোখ রেখে কিছু একটা দেখতে দেখতে বলল, আমাদের কাছে তিন ধরনের রুম আছে–সুলত, সাধারণ আর ডিলাক্স। সুলভ রুমের ভাড়া— হঠাৎ মেয়েটা থেমে গেল। বলল, তুমি কাটাগরি-বি, মানুষ?
সুহান হঠাৎ অসহায় বোধ করে। সে ইতস্তত করে বলল, হ্যাঁ।
ক্যাটাগরি-বি. মানুষ হয়ে তুমি সাধারণ মানুষের হোটেলে কেন এসেছ?
আমি বাইরে থেকে এসেছি। এই শহরে আমার কোনো থাকার জায়গা নেই। আমাকে আজ রাতে কোথাও থাকতে হবে।
মহিলাটার মুখটা হঠাৎ খুব কঠোর হয়ে উঠল, বলল, তুমি পৃথিবীতে কী ঘটছে তার কোনো ঘেঁজ রাখ না?
আমার পক্ষে যেটুকু রাখা সম্ভব সেটা রাখার চেষ্টা করি।
ক্যাটাগরি-বি. মানুষকে আইন করে মানুষের স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে সেটা জান না?
সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আইনটা পাস হয় নি। যতদিন পাল না হচ্ছে আমাদের মৌলিক কিছু অধিকার আছে। মানুষের মৌলিক অধিকার। সুহানের এখনো বিশ্বাস হচ্ছে। না যে একই দিনে দ্বিতীয়বার তাকে একই জিনিস ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে।
মহিলাটা এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে সুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ছেলে, তুমি বিষয়টা বুঝতে পারছ না। আমাদের এই হোটেলটা একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তোমাকে আমরা এখানে রাখতে পারব না। যদি জানাজানি হয়ে যায় তা হলে আমার ব্যবসার ক্ষতি হবে।
সুহান আবিষ্কার করল, সে একেবারে নির্বোধের মতো জিজ্ঞেস করে বসেছে, কেন?
আমাদের রান্নাঘরে যদি তেলাপোকা পাওয়া যায়, বাথরুমে যদি ইঁদুর পাওয়া যায় তা হলে যে কারণে ব্যবসার ক্ষতি হয় সেই একই কারণে। বুঝেছ?
সুহান মাথা নাড়ল, বলল, বুঝেছি। সে স্লট থেকে কার্ডটা বের করে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে বলল, বিষয়টা বুঝিয়ে দেবার জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
সুহান হোটেলের জা খুলে বের হতে যাচ্ছিল তখন মহিলাটা তাকে ডাকল, বলল, শোন।
সুহান কোনো কথা না বলে মাথা ঘুরে দাঁড়াল। মহিলাটা বলল, শহরের বাইরে ক্যাটাগরি-বি. মানুষদের একটা বস্তির মতো এলাকা গড়ে উঠেছে। আমি নিশ্চিত তুমি সেখানে রাত কাটানোর মতো একটা জায়গা পেয়ে যাবে। সাত নম্বর পাতাল রেল দিয়ে যদি শেষ মাথায় নেমে যাও, বাকিটুকু হেঁটে চলে যেতে পারবে।
ধন্যবাদ। সুহান হোটেলের দরজা খুলে বের হয়ে এল।
সুহান দীর্ঘসময় শহরের মাঝে ইতস্তত ঘুরে বেড়ায়। যতদিন অনাথাশ্রমে ছিল ক্যাটাগরি-বি. মানুষের যন্ত্রণাটা সে বুঝতে পারে নি। অনাথাশ্রমের বাইরে এসে হঠাৎ করে সে এর প্রকৃত গুরুত্বটা বুঝতে পারছে। তার ভেতরে এক ধরনের যন্ত্রণা হতে থাকে, এক ধরনের ক্রোধ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। ইচ্ছে হয় কোনো একটা কিছু ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো করে ফেলে, ধ্বংস করে দেয়, গুঁড়িয়ে দেয়।
সুহান অবিশ্যি তার কিছুই করল না, সে সাত নম্বর পাতাল ট্রেনে করে একেবারে শেষ স্টেশনে নেমে যায়। স্টেশন থেকে বের হয়েই সে বুঝতে পারে সে সম্ভবত ঠিক জায়গাতেই এসেছে। আধো অন্ধকারে ঢাকা জরাজীর্ণ শহর। বিধ্বস্ত দালানের উপরে সস্তা নিয়ন আলো, রাস্তার পাশে নেশাসক্ত মানুষ। সুহান অন্যমনস্কভাবে কয়েক পা হেঁটে যায়, একটা ছোট দোকানের বাইরে একজন মানুষ বসে আছে, এক ধরনের নিরাসক্ত দৃষ্টিতে মানুষটা সুহানের দিকে তাকাল। সুহান জিজ্ঞেস করল, এখানে এক রাত থাকার মতো কোনো হোটেল আছে?
মানুষটা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, নতুন এসেছ বুঝি?
হ্যাঁ।
কী কর?
সুহান একটু ইতস্তত করে বলল, নিরাপত্তা প্রহরীর একটা চাকরি পেয়েছি।
সাবধান। তুমি নতুন এসেছ, এখনো কিছু জান না। তোমার গুদাম লুট করে নেবার জন্য এরা যা কিছু করতে পারে। মানুষটা ধরেই নিয়েছে সে কোনো একটা গুদামের দারোয়ান। সে যে আসলে একটা সরকারি তথ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রহরী, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে শুরু করে স্টান্ট বোমা পর্যন্ত ব্যবহার করা শিখছে প্রয়োজনে রাত কাটানোর জন্য তার যে নিজ্বস্ব একটা ঘর রয়েছে, সেই ঘরটাতে পৃথিবীর সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে–—এই বিষয়গুলো মানুষটা চিন্তাও করতে পারবে না। সুহান মানুষটাকে এগুলো জানানোর কোনো চেষ্টা করল না, আবার জিজ্ঞেস করল, আছে কোনো হোটেল?
হোটেল তুমি কোথায় পাবে? মিলিনা একটা সরাইখানার মতো চালায়, তার কাছে একটা ঘর থাকতে পারে। তবে বুড়ির মেজাজ খুব গরম, ব্যবহার খুব খারাপ।
আজকে এখন পর্যন্ত সে যেরকম ব্যবহার পেয়ে এসেছে তার তুলনায় এখানকার যে কোনো ব্যবহারই মনে হয় মধুর মতো মনে হবে! সুহান জিজ্ঞেস করল, মিলিনার সরাইখানাটা কোথায়?
সোজা চলে যাও। ল্যাম্পপোস্টের ওখানে গিয়ে ডানদিকে যাও, আধ কিলোমিটারের মতো গেলে একটা ছোট বাজারের মতো পাবে। সেখানে কাউকে জিজ্ঞেস করলে তোমাকে দেখিয়ে দেবে।
ধন্যবাদ তোমাকে।
মানুষটা সুহানের কথার উত্তর দিল না। ভতাসূচক অর্থহীন কথাগুলোর মনে হয় এর কাছে খুব বেশি গুরুত্ব নেই।
সুহান ল্যাম্পপোস্টের দিকে হাঁটতে থাকে। রাস্তাটা খানাখন্দে ভরা, ফুটপাতটাও সেরকম। আবছা অন্ধকারে সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে, ফুটপাতে ভাঙা বোতল আর এলুমিনিয়াম ক্যান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মাঝে মাঝে দুই একজন মানুষ কথা বলতে বলতে তাকে পাশ কাটিয়ে যায়, মানুষগুলোর কথার মাঝে এক ধরনের আঞ্চলিকতার টান। ল্যাম্পপোস্টের কাছাকাছি গিয়ে সে ডানদিকে হাঁটতে থাকে। দুই পাশে ঘিঞ্জি বাড়িঘর, ভেতরে মানুষের কথাবার্তা, মহিলাদের হাসি আর ছোট বাচ্চাদের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ করে একটা বাসা থেকে একজন মানুষ কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করতে করতে বের হয়ে এল, পেছনে একটা মেয়ের কান্নার শব্দ শোনা যেতে থাকে। নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে বিলাপ করতে করতে মেয়েটা ইনিয়েবিনিয়ে কাঁদছে।
সুহান শেষ পর্যন্ত বাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। জায়গাটা মোটামুটি আলোকিত, অনেকগুলো দোকানপাট, নাইট ক্লাব এবং রেস্টুরেন্ট। একটা বড় হলঘরের ভেতর থেকে গানবাজনা এবং মানুষের হৈ-হুল্লোড় শব্দ ভেসে আসছে। সুহান কাছাকাছি একটা দোকানের ভেতর ঢুকে জিজ্ঞেস করল, মিলিনার সরাইখানাটা কোথায় বলতে পারবে?
দোকানি মানুষটা ব্যস্তভাবে একটা কার্ড বোর্ডের বাক্স থেকে ছোট ছোট শুকনো খাবারের প্যাকেট বের করতে করতে বলল, সামনে ডানদিকে তিনটা দোকান পরে। বাইরে দেখবে বগনভিলা গাছ।
সুহান মানুষটাকে ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে এল। রাস্তায় লোকজনের ভিড় পাশ কাটিয়ে সে কয়েক মিনিটে মিলিনার সরাইখানা পেয়ে যায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা খাবার জায়গা, মানুষ বসে নিচু গলায় কথা বলতে বলতে খাচ্ছে। পেছনে একটা কাউন্টারে মোটাসোটা মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দেখে মনে হয় সে বুঝি এখনই কারো ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। হলঘরের এক পাশে একটা বড় ভিডিস্ক্রিনে একটা সস্তা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান হচ্ছে এবং একন ভাড়ের স্থূল রসিকতার সাথে শব্দ করে একসাথে অনেকে হেসে উঠছে। সুহান টেবিলগুলো পাশ কাটিয়ে কাউন্টারের সামনে দাড়াল, মধ্যবয়স্ক মহিলাটা চোখ পাকিয়ে সুহানের দিকে তাকাল যেন সে একটা বড় অপরাধ করে ফেলেছে। সুহান ইতস্তত করে বলল, রাত কাটানোর জনা আমার একটা ঘর দরকার।
মধ্যবয়স্ক মহিলাটা সুহানের আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বলল, আমি তোমাকে রুম দিই আর তুমি সবকিছু নিয়ে চুরি করে পালাও!।
কথাটা এত অবিশ্বাস্য এবং বিচিত্র যে সুহানের হাসি পেয়ে যায়, সে হাসি আটকে বলল, তোমার ভয় নেই আমি কিছু চুরি করে নিয়ে পালাব না।
তুমি কোথা থেকে এসেছ? কী কর?
সুহান বলল, আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। এক জায়গায় নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ পেয়েছি।
কোনোরকম নেশা-ভাং কর না তো?
না, করি না।
মধ্যবয়স্ক মহিলাটা একটা মোটা খাতা বের করে খালি একটা পৃষ্ঠা বের করে বলল, নাও লিখ।
সুহান নিজের নাম-ঠিকানা রাত কাটানোর উদ্দেশ্য লিখতে খাকে। দেয়ালে ঝোলানো চাবিগুলো থেকে একটা চাবি বের করে নিয়ে বলল, তিন শ আট নম্বর রুম। এক রাতের জন্য দুই ইউনিট।
সুহান তার কার্ডটা বের করল না, এখানে এই কার্ডটা ব্যবহার করার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হল না। সে খুচরো দুটি ইউনিট বের করে টেবিলে রাখে, মুদ্রাগুলো চোখের কাছে নিয়ে পরীক্ষা করে মিলিনা বলল, সাতটার সময় নাস্তা দেওয়া হবে। দশটার মাঝে ঘর খালি করে দেবে।
ঠিক আছে।
তিন তলার তিন শ আট নম্বর ঘরটা ছোট। জানালা খুলতেই অন্য পাশে আরেকটা বড় বিল্ডিঙের পেছনের অংশ দেখা গেল। সেখানে লাগানো উজ্জ্বল নিয়ন আলো জ্বলছে এবং নিতছে, ঘরের ভেতরে সেই আলোর ছটা এসে পড়েছে। সুহান কিছুক্ষণ মন খারাপ করা এই কুশ্রী দৃশাটার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর টেবিলে রাখা ব্যাগ খুলে তার পরিষ্কার কাপড় বের করতে শুরু করে।
গরম এবং ঝালো জীবাণু নিরোধক পানিতে গোসল করে সুহানের নিজেকে খানিকটা সতেজ মনে হয়। সে পরিষ্কার একপ্রস্ত পোশাক পরে রুমে তালা দিয়ে বের হল, নিচে রেস্টুরেন্টে বসে কোনো এক ধরনের উত্তেজক পানীয় খেয়ে একটু সময় কাটিয়ে আসবে।
বড় একটা গ্লাসে সে ঝাঁজালো একটা উষ্ণ পানীয় নিয়ে এসে একটা কাউন্টারে বসে সেটাতে চুমুক দিতে দিতে মানুষগুলোকে দেখে। মানুষগুলো দরিদ্র, তাদের চোখে-মুখে জীবনের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাবার চিহ্ন স্পষ্ট। বেশিরভাগ মানুষ মধ্যবয়স্ক মহিলার সংখ্যা কম। উৎকট পোশাক পরা দু-একজন মহিলা অকারণে হাসাহসি করছে এবং উত্তেজক পানীয়ের কারণে একজন আরেকজনের ওপর টলে পড়ছে। বড় ভিডিস্ক্রিনে পণ্ডে রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো সংক্রান্ত ওষুধের একটা বিজ্ঞাপন হচ্ছে এবং বিজ্ঞাপনটা শেষ হতেই সংবাদ বুলেটিন শুরু হয়ে গেল। সংবাদ বুলেটিনে কী প্রচারিত হচ্ছে সুহানের জানার ইচ্ছে ছিল কিন্তু মানুষের হট্টগোলে সুহান পরিষ্কার শুনতে পেল না। সুহান আবার তার চারপাশের মানুষগুলোকে দেখতে থাকে। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা মিলিনা একজনের সাথে ঝগড়া করছে, দেখে মনে হয় সে তাকে মেরে বসবে? এক কোনায় কমবয়সী একজন তরুণ এবং তরুণী খুব কাছাকাছি মাথা রেখে নিছু গলায় কথা বলছে, মনে হচ্ছে চারপাশে কী হচ্ছে তার কিছুই তারা জানে না। তাদের পাশেই মোটা একজন মানুষ চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে—সম্ভবত নেশাগ্রস্ত। ঘরের মাঝামাঝি একটা হট্টগোলের মতো হল তখন একজন বাজখাই গলায় চিৎকার করে উঠল, চুপ। সবাই চুপ।
রেস্টুরেন্টে নীরবতা নেমে আসে এবং একজন ভিডিস্ক্রিনের ভলিউম বাড়িয়ে দেয়, সেখানে ক্যাটাগরি-বি. মানুষ নিয়ে একটা আলোচনা হচ্ছে। একজন খুব গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষকে কিছু সাংবাদিক ঘিরে রেখেছে, তাদের প্রশ্নের উত্তরে মানুষটা বলল, আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিই নি। এত বড় একটা বিষয়ে আমরা কোনো চিন্তাভাবনা না করে সিদ্ধান্ত নেব না।
একজন সাংবাদিক বলল, আমরা শুনতে পেয়েছি আইনটার ড্রাফট করা হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটা বলল, আমি সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
লাল চুলের একজন মহিলা সাংবাদিক গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, ক্যাটাগরি-বি. মানুষ আসলেই মানুষের সম্মান পাবার যোগ্য কি না সেই বিষয়টা বের করার জন্য বিজ্ঞানীদের একটা টিম দীর্ঘদিন গবেষণা করে একটা রিপোর্ট দিয়েছেন, সেই রিপোর্টে কী ছিল?
গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটা বলল, যথাসময়ে এই রিপোর্টটা প্রকাশ করা হবে।
শোনা যায় বিজ্ঞানীদের কমিটির আহ্বায়ক একটা রহস্যজনক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন?
গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটা শব্দ করে হেসে বলল, এটা একটা গুব। এ ধরনের কিছু ঘটে নি।
বয়স্ক একজন সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল, ক্যাটাগরি-বি. মানুষ সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত মতামত কী?
গুরুত্বপূর্ণ চেহারার মানুষটা বলল, আমরা সবাই জানি পৃথিবীর বিপুল সংখ্যক ক্যাটাগরি-বি. মানুষকে সাধারণ মানুষরা প্রতিপালন করছে। হয় ক্যাটাগরি-বি. মানুষকে কর্মক্ষম করে তোলা প্রয়োজন এবং যদি সেটা সম্ভব না হয় তা হলে তাদের কথা ভুলে গিয়ে শুধু সত্যিকারের মানুষদের নিয়ে পৃথিবীটাকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।
শুয়োরের বাচ্চা হারামখোর— বলে কে একজন ভিডিস্ক্রিনের দিকে একটা বোতল ছুড়ে দেয়, গ্লাস ভাঙার একটা তীক্ষ্ণ শব্দ হয় এবং একসাথে অনেক মানুষ চিৎকার করে গালাগালি করতে থাকে। সবার গলা ছাপিয়ে মিলিনার গলা শোনা গেল, সে বলল, যদি এত সাহস থাকে তা হলে যাও, গিয়ে এই হতভাগা কমিশনারের টুটি চেপে ধর আমার রেষ্টুরেন্টে কোনো মাতলামো চলবে না।
যে বোতলটা ছুড়ে মেরেছিল সে গলা উঁচিয়ে বলল, শুয়োরের বাচ্চা কমিশনারের কথা তোমরা শোন নি? পরিষ্কার বলে দিয়েছে ক্যাটাগরি-বি. মানুষদের কথা ভুলে যেতে হবে। শুনেছ?
শুনেছি।
তা হলে? আমরা খালি ঘরে বসে থাকব? কিছু একটা করব না?
মিলিনা গর্জন করে বলল, করতে হলে বাইরে গিয়ে কর। আমার বেস্টুরেন্টে বোতল ছোড়াছুড়ি করতে পারবে না। অপদার্থ কোথাকার!
মানুষটা গজগজ করতে করতে সুহানের পাশের টেবিল এসে বসে। হিংস্র চোখে চারদিকে তাকায়। সুহান কোনার টেবিলে বসে থাকা তরুণ এবং তরুণীটার দিকে তাকাল, এখনো তারা মাথা দুটি কাছাকাছি রেখে বসে আছে। তারা এখন কথা না বলে অন্যদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে-মুখে বেদনার চিহ্ন। বেদনা এবং আতঙ্ক। আতঙ্ক এবং হতাশা। মানুষের স্বপ্ন দেখার অধিকারটুকু সরিয়ে নেওয়া হলে তাদের জীবনে আর বাকি থাকে কী? শুধুমাত্র ক্যাটাগরি-বি. মানুষ হিসেবে জন্ম নেবার কারণে একজন মানুষ তার জীবন নিয়ে স্বপ্নও দেখতে পারবে না?
০৪.
সপ্তাহখানেকের মাঝে সুহান মোটামুটিভাবে তার কাজগুলো শিখে নেয়। তার দায়িত্বের সবগুলোই যে সে পছন্দ করেছে তা নয়। ডিউটিতে থাকার সময় তাকে একটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়, সে এখনো এই বিষয়টাতে অভ্যস্ত হতে পারে। নি। মানুষকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে খুন করার জন্য মানুষেরাই একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেছে এবং সেটা সে ঘাড়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ব্যাপারটা মাঝে মাঝে তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়।
তবে তার কাজটা খারাপ নয়। এই তথ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য অসংখ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে, শুধু সেগুলোর ওপরে ভরসা না করে কিছু মানুষকেও বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা ইতস্তত এই তথ্যকেন্দ্রে ঘুরে বেড়ায়। সুহান সেরকম একজন মানুষ–যদিও সে পুরো দলের মাঝে একেবারেই নিচের সারিতে। বলা যেতে পারে অন্যদের ফাইফরমাশ খাটাই হচ্ছে তার আসল কাজ, কিন্তু সেটা নিয়ে সুহানের এতটুকু ক্ষোভ নেই। বিল্ডিঙের সব জায়গায় সে যেতে পারে না, তাকে সে অধিকার দেওয়া হয় নি। কিন্তু যেখানে তার যাবার অধিকার আছে সেখানে সে খুব উৎসাহ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। নিরাপত্তা বাহিনীর অন্য সদস্যদের কাছে তার এই বাড়াবাড়ি উৎসাহ এক ধরনের কৌতুকের বিষয়। সুহান সেটা নিয়ে কিছু মনে করে না–প্রথমদিন রিগার সাথে সেই ভয়ংকর সাক্ষাতের পর তার সাথেও সুহানের আর দেখা হয় নি। এখানে তার সময় মোটামুটি খারাপ কাটছে না। এই সপ্তাহের বেতন পাওয়ার পর সে কিছু উপহার কিনে তার অনাথাশ্রমে পাঠিয়েছে। লারার জন্য একটা পারফিউম, কুরাকের জন্য গানের অ্যালবাম, অন্যদের কারো জন্য শুকনো ফল, কারো কারো জন্য চকোলেট আর হালকা পানীয়। উপহারগুলো পৌঁছানোর পর সেখানে কেমন আনন্দের বান ডেকে যাবে সেটা সে এখানে বসেই দেখতে পায়।
থাকার জন্য সে আর কোনো বাসা বা অ্যাপার্টমেন্ট খোঁজ করছে না, মিলিনার সরাইখানাতেই একটা রুম পাকাপাকিভাবে নিয়ে নিয়েছে। মিলিনা যদিও কোনোভাবেই প্রকাশ করে না কিন্তু সুহানের ধারণা এই মধ্যবয়স্ক বদমেজাজি মহিলাটা তাকে পছন্দই করে। স্থানীয় অনেকের সাথে তার পরিচয় হয়েছে, কেউ কেউ বুদ্ধিমান, কেউ কেউ হিংসুটে, কেউ কেউ উদাসী আবার কেউ কেউ ভয়ংকর হতাশাগ্রস্ত। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা নিয়ে সবার ভেতরে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক, কিন্তু সেটা নিয়ে কিছু করা যাবে কি না সে ব্যাপারে কেউ কিছু জানে না। কোনো কিছু অর্জন করতে হলে সংগঠিত হতে হয়, কিন্তু এখানে কেউ সংগঠিত নয়, সংগঠিত হবার মতো তাড়না কারো ভেতরে নেই। তবে পুরোটাই যে হতাশাব্যঞ্জক তা নয়, মনে হয় এর ভেতরেও কোথায় জানি আশার আলোর আছে। পৃথিবীর অনেক মানুষ জিনেটিক কোড দিয়ে মানুষকে বিভাজন করার বিরুদ্ধে। সবাই জানে একদল বিজ্ঞানী এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছিলেন। বিজ্ঞানীদের সেই রিপোর্টটাতে কী আছে তাই সেটা নিয়ে সবার খুব কৌতূহল। এখানে সবার ধারণা বিজ্ঞানীদের প্রকৃত রিপোর্টটা প্রকাশ করা হবে না এবং বিজ্ঞানীদের দলনেতাকে এর মাঝে মেরে ফেলা হয়েছে। আসলে কী হয়েছে কেউ সেটা জানে না। সুহান ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না কিন্তু তার মনে হয় কিছু কিছু মানুষ খুব গোপনে সংগঠিত হচ্ছে তারা খুব বড় একটা কিছু করতে চাইছে। কিন্তু কারা কীভাবে এটা করছে কিংবা আসলেই কেউ এটা করছে কি না সুহান কোনোভাবেই সেটা নিশ্চিত হতে পারছে না। যতদিন সে ধরনের কিছু না হচ্ছে সে কঁাধে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে থাকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনে ঘুরতে থাকবে। যদি কখনো তাদের বিরুদ্ধে আইন পাস করে নেওয়া হয় সে তার কাজ ছেড়ে দিয়ে পৃথিবীর অন্যসব ক্যাটাগরি-বি. মানুষের সাথে চলে যাবে। আবার নতুন করে তাদের জীবন শুরু করবে। নতুন করে তাদের সভ্যতা তৈরি করতে শুরু করবে। তার কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার ক্ষমতা ছিল, সে কি আর ক্যাটাগরি-বি. শিশুদের পড়াতে পারবে না? নিশ্চয়ই পারবে, একটা জীবন সে দেখতে দেখতে কাটিয়ে দেবে।
যতদিন সেটা না হচ্ছে ততদিন সে এই তথ্যকেন্দ্রে ঘুরে বেড়াবে। পুরো তথ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়টাকে সে একটা ধাধা হিসেবে বিবেচনা করছে। কোথায় কোথায় ক্যামেরাগুলো আছে, মোশান ডিটেক্টরগুলো আছে সে পরীক্ষা করে দেখে। কোন সিগন্যালটা থেকে কোন সিগন্যালটা শুরু হয় সে বোঝার চেষ্টা করে। এর মাঝেই সে কিছু কিছু ভুল বের করে ফেলেছে কিন্তু সেটা কিরি ছাড়া আর কাউকে বলে নি। কিরি শুনে হা হা করে হেসে বলেছে, সিস্টেমে ভুল থাকলে থাকুক সেটা যাদের ঠিক করার কথা তারা ঠিক করবে। তুমি কি ভেবেছ আমরা সেটা রিপোর্ট করলে তারা বিশ্বাস করবে? সত্যি সত্যি যদি সিস্টেমে গোলমাল থাকে আর তুমি সেটা বের করে ফেল তা হলে চেপে যাও! ওরা জানতে পারলে তোমার চাকরি চলে যাবে।
সুহান বলল, আমার কেন চাকরি যাবে? আমি কী করেছি?
তুমি ভুলটা বের করেছ। গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ভুল বের করা খুব বড় অপরাধ। বুঝেছ?
সুহান মাথা নাড়ল, বলল, বুঝেছি।
কিন্তু সে যে আসলেই ব্যাপারটা ঠিক ঠিক বুঝতে পারে তা নয়। যারা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তারা কেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে না? প্রথম দিন রিশার সাথে তার যখন দেখা হয়েছিল তখন সে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে এসেছিল কারণ রিগাকে সে বুঝিয়েছিল সে নিজে খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। সারা পৃথিবী থেকে খুঁজে খুঁজে তাকে বের করা হয়েছে–আর কী কাকতালীয় ব্যাপার সেটা সত্যি বের হয়ে গেছে! কীভাবে হল ব্যাপারটা? আসলেই কি সে গুরুত্বপূর্ণ? কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ? কী করা হবে তাকে দিয়ে? একজন ক্যাটাগরি-বি. মানুষ কেমন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়? সুহান কিছু ভেবে পায় না—তখন সে একসময় হাল ছেড়ে দেয়, এই মুহূর্তে তার যেটা দায়িত্ব সেটা নিয়েই মাথা ঘামায়। কাধে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ঝুলিয়ে সে তথকেন্দ্র চার চার শূন্য তিনের করিডোরে করিভোরে ঘুরে বেড়ায়। যেসব জায়গায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা দুর্বল সেসব জায়গায় সে একটু বেশি সময় দেয়। হঠাৎ করে কেউ যদি তথ্যকেন্দ্রে চলে আসে সে তাকে ধরে ফেলতে চায়, ধরে ফেলে প্রমাণ করতে চায় ক্যাটাগরি-বি. মানুষ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মানুষ নয়। তাদেরকে হেলাফেলা করা যায় না।
সুহান প্রকৃত অর্থে কখনো বিশ্বাস করে নি সত্যি সত্যি সে একজন দুবৃত্তকে ধরে ফেলবে, পুরো ব্যাপারটাই ছিল তার একটা কল্পনা। তাই যখন একদিন মাঝরাতে সে দোতলায় নিরাপত্তার অবলাল রশ্মিটাকে অকেজো দেখতে পেল সে খুব দুশ্চিন্তিত হল না, ইলেকট্রনিক্স এবং যন্ত্রপাতি যত নিখুঁতভাবেই তৈরি করা হোক সেগুলো কখনো না কখনো অকেজো হয়ে যায়। এটাও নিশ্চয়ই সেরকম একটা কিছু। কাছাকাছি সার্কিট ব্রেকারের কাছে গিয়ে দেখল সেটাও বন্ধ হয়ে আছে। পরপর দুটো স্বল্প সম্ভাবনার ঘটনা ঘটে যাবার সম্ভাবনা খুবই কম এবং তখন সে দুশ্চিন্তিত হয়ে চারতলায় ছুটে গেল এবং বড় করিডোরে গিয়ে দেখতে পেল টেলিভিশন ক্যামেরাটা ছাদের দিকে মুখ করে রাখা আছে—এই করিডোের দিয়ে গোপনে কোনো মানুষ যেতে চাইলে ক্যামেরাটা এভাবে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সুহান করিডোরের শেষ মাথায় তাকাল এবং আবিষ্কার করল দরজার ফাঁক দিয়ে আলো বের হচ্ছে। এটা তথ্যকেন্দ্রের একটা মূল কক্ষ, বিশেষ প্রয়োজন না হলে কেউ এখানে ঢোকে না। এবং সারাক্ষণই এই ঘরের জালো নেভানো থাকে। কেউ ভেতরে থাকলে এর ভেতরে আলো জ্বলার কথা কিন্তু এর ভেতরে এখন কেউ নেই। সুহান কী করবে ঠিক বুঝতে পারল না, নিরাপত্তা কেন্দ্রে ব্যাপারটা জানানোর আগে সে দরজাটা একটু ধাক্কা দিয়ে আসতে চায়–দরজাটা নিশ্চিতভাবেই বন্ধ থাকার কথা। সুহান নিঃশব্দে দরজাটার কাছে গিয়ে খুব আস্তে দরজাটায় ধাক্কা দিল, কারণ একটু জোরে চাপ পড়লেই এলার্ম বেজে উঠবে। সুহান বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল যখন তার হাতের স্পর্শে খুব ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে গেল। সুহান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না যে এই গভীর রাতে কোনো একজন মানুষ তথ্যকেন্দ্রে ঢুকে পড়েছে। সুহান দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিল, উঁকি দিয়ে বিস্ফারিত চোখে সে তাকিয়ে দেখল, ঘরের মাঝামাঝি একটা চেয়ারে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে একজন মানুষ কাজ করছে। কী-বোর্ডে তার হাত দ্রুত নড়ছে। তাকে দেখে মনে হতে পারে সে এখানেই থাকে এবং এখানেই কাজ করে। সুহান বজ্রাহত মানুষের মতো দরজায় দাঁড়িয়ে রইল, হাতে অস্ত্রটা নিতেও মনে থাকল না। মানুষটা মুখ তুলে সুহানের দিকে তাকাল এবং একেবারে অবিশ্বাস্য ব্যাপার, তাকে দেখে মানুষটা চমকে উঠল না। এমনভাবে তার দিকে তাকাল যেন এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, সুহানের মনে হল মানুষটা যেন খুব পরিচিত। একজনের মতো তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। সুহানের হঠাৎ সাংবিৎ ফিরে এল, সে চোখের পলকে হাতে অস্ত্রটা নিয়ে সেটা মানুষটার মাথার দিকে তাক করে বলল, তুমি কে?
মানুষটা হাসার চেষ্টা করে আবার মনিটরে চোখ নামিয়ে নিয়ে কী-বোর্ডে কাজ করতে থাকে। কী-বোর্ডে কাজ করতে করতে বলল, আমি কে শুনে তুমি কী করবে? তুমি কি আমাকে চিনবে?
তুমি এখানে কেমন করে এসেছ?
মানুষটা চোখ না তুলে কী-বোর্ডে কাজ করতে করতে বলল, একটু ফন্দিফিকির করে এসেছি।
মানুষটা পরিচিত মানুষের মতো কথা বলছে যেন অনেকদিন থেকে তার সাথে পরিচয়। সুহানের এখন রেগে যাওয়া উচিত, কাজেই সে খুব রেগে যাবার ভঙ্গি করে বলল, তুমি কেন এখানে এসেছ? মানুষটা সুহানের দিকে চোখ না তুলে কী-বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দ্রুত কাজ করতে করতে বলল, সেটা তোমাকে বোঝানো খুব সহজ হবে না!
সুহান স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটায় একটা ঝাকুনি দিয়ে বলল, তুমি এখনই এখান থেকে বের হয়ে আস, তা না হলে কিন্তু আমি গুলি করতে বাধা হব।
মানুষটা মাথা নেড়ে ভালো মানুষের মতো বলল, উহুঁ। আমার সেটা বিশ্বাস হয় না। গুলি করার হলে তুমি এতক্ষণে গুলি করে দিতে। আমার ধারণা তুমি আগে কখনো কাউকে গুলি কর নি।
আমি সেই তথ্যটা তোমাকে দিতে বাধ্য নই। তুমি এখনই তোমার দুই হাত উপরে তুলে দাঁড়াও।
মানুষটা সুহানের কথা পুরোপুরি উপেক্ষা করে কাজ করে যেতে থাকে। তাকে দেখে মনে হয় সে মোটামুটিভাবে কারে একটা পর্যায় শেষ করে ফেলেছে। তার মুখে বেশ পরিতৃপ্তির একটা ভাব ফুটে ওঠে, মনিটরে কিছু একটার দিকে তাকিয়ে সে বেশ আনন্দের একটা ভঙ্গি করে মাথা নাড়তে থাকে। সুহান চিৎকার করে বলল, তুমি এখনই হাত তুলে দাড়াও তা না হলে কিন্তু গুলি করে দেব।
মানুষটা আবার কী-বোর্ডে ঝুঁকে বলল, তুমি গুলি করবে না। কারণ তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ সেখান থেকে গুলি কলে পেছনের মূল্যবান সার্ভারের বারোটা বেজে যাবে। তোমার সেই ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না।
সুহান নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না, সত্যি সত্যিই একজন মানুষ মধ্যরাতে একটা গোপন তথ্যকেন্দ্রের ভেতরে এসে এভাবে কাজ করে যাচ্ছে? যার বুকের ভেতর বিন্দুমাত্র ভয় নেই? পুরো ব্যাপারটাকে একটা তামাশা হিসেবে নিয়েছে?
সুহান কী করবে বুঝতে না পেরে ওয়্যারলেস সেটের বোতাম চাপ দিয়ে কিরির সাথে যোগাযোগ করল, কিরি।
কী ব্যাপার সুহান?
পাঁচ তলার মূল সার্ভার রুমে একজন মানুষ।
কিরি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, তুমি ঠাট্টা করছ, তাই না?
না।
মানুষটা কী করছে?
সার্ভারের ইন্টারফেসে কাজ করছে?
তুমি কী করছ?
আমি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা তার দিকে তাক করে রেখেছি।
কিরি নিশ্বাস আটকে রেখে বলল, তুমি তাক করে রাখ, আমি ব্যবস্থা করছি।
সুহান অস্ত্রটা শক্ত করে ধরে রেখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণের মাঝেই এলার্ম বেজে উঠতে থাকে। চারপাশে উজ্জ্বল আলো জ্বলে ওঠে এবং অনেক মানুষের পদক্ষেপ শোনা যায়। কী-বোর্ডে ঝুঁকে থাকা মানুষটাকে প্রথমবার একটু বিচলিত হতে দেখা গেল, একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, সময় তা হলে শেষ। কী বলো?
সুহান কোনো কথা বলল না, মানুষটি আবার তার কী-বোর্ডে ঝুঁকে পড়ে শেষ মুহূর্তের মতো কিছু কাজ করতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই অনেকগুলো সশস্ত্র মানুষ ছুটে আসে, সুহানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তারা ভেতরে ঢুকে যায়, সবার সামনে রয়েছে। বিগা, তার হাতে একটা ছোট আগ্নেয়াস্ত্র। রিগা কোনো রকম দ্বিধা না করে মানুষটার কাছে এগিয়ে যায় এবং একটা কথাও না বলে মানুষটাকে গুলি করল। পরপর অনেকবার।
সুহান এর আগে কখনো কোনো মানুষকে হত্যা করতে দেখে নি, দৃশ্যটা তার কাছে ভয়ংকর অমানবিক এবং পৈশাচিক বলে মনে হল। নিজের অজান্তেই সে চিৎকার করে ছুটে যায় এবং গুলিবিদ্ধ মানুষটাকে ধরে ফেলার চেষ্টা করে। মানুষটার রক্তে তার হাত মাখামাখি হয়ে যায়, সে চিৎকার করে বলতে থাকে, না! না! না!
কে একজন হ্যাচকা টান দিয়ে সুহানকে সরিয়ে নেয়। বেশ কয়েকজন মানুষ গুলিবিদ্ধ মানুষটাকে ঘিরে দাড়ালে তার ওপর ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা পরীক্ষা করতে থাকে। সুহান শুনতে পেল, কেউ একজন বলছে, না। কোনো পরিচয় নেই।
আরেকজন জিজ্ঞেস করল, সার্ভার থেকে কী তথ্য বের করেছে?
জানি না। শেষ মুহূর্তে সবকিছু মুছে দিয়েছে।
কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, মুছে দেবার সময় পেয়েছে?
হ্যাঁ। অনেক সময় পেয়েছে।
আরো আগে গুলি করা উচিত ছিল।
সুহান ফ্যালফ্যাল করে মানুষগুলোর দিকে তাকাল তার ক্লারো আগেই গুলি করা উচিত ছিল? একজন মানুষকে গুলি করা কি এতই সহজ?
সুহানকে কে যেন হাত ধরে টানছে। সুহান মাথা ঘুরিয়ে দেখল কিরি। কিরি বলল, চলে এস সুহান। তোমার এখন আর করার কিছু নেই।
সুহান হতচকিতের মতো কিরির দিকে তাকিয়ে বলল, ম্মানুষটাকে মেরে ফেলল?
কিরি বলল, ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কাজ নেই। চল। এখান থেকে চল। সুহান কিরির পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে, তার তখনো পুরো ব্যাপারটা বিশ্বাস হচ্ছে না। সে যদি এভাবে মানুষটাকে খুঁজে বের না করত তা হলে হয়তো তার এভাবে মারা যেতে হত না। সুহান জোর করে পুরো ব্যাপারটা মাথা থেকে সরিয়ে দিতে চায়, কিন্তু পারে না। ঘুরেফিরে বারবার হত্যা-দৃশ্যটা তার মাথায় আসতে থাকে, মনে হয় এটা দীর্ঘদিন তাকে তাড়না করিয়ে বেড়াবে। করিডোরের মোড়ে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। যারা যাচ্ছে কিংবা আসছে তাদের সবার পরিচিতি পরীক্ষা করে দেখছে। সুহান তার কার্ড দেখিয়ে যখন তার জিনেটিক মাপিঙের জন্য ছোট যন্ত্রটার ভেতরে ভার আঙুল প্রবেশ করিয়েছে তখনই একটা বিপদ সংকেত শুনতে পেল। যন্ত্রের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা হাতের অস্ত্র উদ্যত করে বলল, তুমি কে? এখানে কোথা থেকে এসেছ? তোমার কার্ডের সাথে পরিচয় মিলছে না কেন?
সুহান অবাক হয়ে বলল, পরিচয় মিলছে না?
না। এই দেখ!
সুহান অবাক হয়ে দেখল, সত্যি সত্যি মনিটরে কিছু বিদঘুটে সংখ্যা এবং তথ্যকেন্দ্রে তথ্য নেই বলে একটা লেখা বড় বড় করে ফুটে উঠেছে। সুহান যন্ত্রটা থেকে তার হাত বের করে হঠাৎ করিণটা বুঝতে পারল। বলল, বুঝেছি। আমি গুলিবিদ্ধ মানুষটাকে ধরেছিলাম বলে আমার হাতে তার রক্ত লেগেছে। সেই রক্ত থেকে জিনেটিক কোডিং করে ফেলেছে–আমার টিস্যু দিয়ে নয়।
যন্ত্রের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা বলল, তুমি তোমার আঙুলটা পরিষ্কার করে আবার পরীক্ষা কর।
সলভেন্ট দিয়ে আঙুল পরিষ্কার করে সুহান আবার তার জিনেটিক কোডিং বের করল, এবারে কোডিংটুকু তার কার্ডের তথ্যের সাথে মিলে গেল। উদাত অস্ত্র হাতের মানুষটা তার অস্ত্র নামিয়ে বলল, চমৎকার। এবারে তুমি যেতে পার।
সুহান বলল, ধন্যবাদ।
কিরি আর সুহান হাঁটতে থাকে। কিরি কিছু একটা বলছে, সুহান ঠিক ভালো করে শুনছে। তার মনটা হঠাৎ করে খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। গুলিবিদ্ধ মানুষটার রক্ত থেকে ভুল করে জিনেটিক কোডিং বের করা তথাটা সে একনজর দেখেছে। সেখানে কিছু বিদঘুটে সংখ্যা ছিল, বড় করে লেখা ছিল তথ্যকেন্দ্রে তথ্য নেই কিন্তু তার সাথে আরো একটা জিনিস লেখা ছিল। লেখা ছিল ক্যাটাগরি-বি. মানুষ! এই মানুষটা কে তার পরিচয় কেউ জানে না, শুধু জানে যে সে একজন ক্যাটাগরি-বি. মানুষ। সুহান কিছুতেই বুঝতে পারে না একজন ক্যাটাগরি-বি. মানুষ কেমন করে এত সুরক্ষিত একটা তথ্যকেন্দ্রে চলে এসেছিল? মানুষটা এত সহজে কেমন করে মৃত্যুকে গ্রহণ করেছে? সে যদি কোনো গোপন তথ্য সগ্রহ করতে এসে থাকে তা হলে একবারও সে সেই তথ্য নিয়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করল না কেন?
তোমার কী মনে হয়েছে?
সুহান হঠাৎ করে চমকে উঠে লক্ষ করুল কিরি তাকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছে, প্রশ্নটা পুরোপুরি শুনতে পায় নি। সে লজ্জা পেয়ে বলল, আমি ঠিক খেয়াল করি নি তুমি কী জিজ্ঞেস করেছ?
আজকে রিগাকে দেখে তোমার কী মনে হয়েছে?
মনে হয়েছে মানুষটা একটা পেশাদার খুনি।
সেটা তো সবাই জানে। আর কিছু মনে হয় নি?
না, আমার আর কিছু মনে হয় নি। শুধু–
শুধু কী?
শুধু মনে হয়েছে আমি যেন কখনো তার মতো না হয়ে যাই। এত সহজে মানুষ দূরে থাকুক আমি যেন একটা পতঙ্গকেও কখনো হত্যা করতে না পারি।
কিরি কোনো কথা না বলে একবার সুহানের দিকে তাকাল তারপর নিচু গলায় বলল, পৃথিবী বড় কঠিন একটা জায়গা সুহান
