চতুর্থ এবং শেষ পর্ব

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে

#রুহান_রুহান - মুহম্মদ জাফর ইকবাল






এজেন্ট দ্রুচান বলল, না, আমি এক ঘণ্টার ভেতর রওনা দিতে পারব না। এখনো সবগুলো কুলেন্ট টিউব ওয়েল্ড করে লাগানো হয়নি। সময় লাগবে।

রিদি গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল, তাহলে আমাদের করার বিশেষ কিছু নেই। কনভয়টাকে মাঝখানে থামাতে হবে।

রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, অস্ত্র নিয়ে আমরা মাত্র দুইজন। ক্রিটিনাকে ধরলে তিনজন। তাদের গাড়িই আছে চারটা। কিছু একটা করা যাবে বলে মনে হয় না।

রাস্তার ভালো একটা জায়গা দেখে এমবুশ করতে হবে। রিদি বলল, প্রথম গাড়িটা থামাতে পারলে অন্যগুলোও থেমে যাবে।

রুহান কোনো কথা না বলে অন্যমনস্কভাবে মাথা ঘুরিয়ে দূরের মানমন্দিরটার দিকে তাকাল। রিদি বলল, তাহলে দেরি করে কাজ নেই, চলো

এখনই বের হয়ে পড়ি।

রুহান বলল, আমি অন্য একটি কথা ভাবছিলাম।

কী কথা?

ঐ যে মানমন্দিরটা দেখছ, তার কাচগুলো তাপ প্রতিরোধক। সূর্যের আলোর ভেতর যেটুকু দৃশ্যমান সেটা ঢুকতে দেয় কিন্তু তাপের অংশটুকু প্রতিফলিত করে দেয়। আমরা এই কাচগুলো ব্যবহার করে একটা কাজ করতে পারি।

কী কাজ?

আমাদের মধ্যে প্রায় তিরিশজন ছেলে-মেয়ে আছে। সবার কাছে যদি একটা কাচ দিই তারা সেটা হাতে নিয়ে সূর্যের আলোটা প্রতিফলিত করে ঐ গাড়িগুলোর উপরে ফেলে তাহলে গাড়িগুলোতে আগুন ধরে যাবে। আমরা অনেক দূর থেকে গাড়িগুলো জ্বালিয়ে দিতে পারব।

রিদি এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে বলল, সত্যি?

কয়েক হাজার বছর আগে আর্কিমিডিস নামে একজন বিজ্ঞানী এভাবে শত্রুদের জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

তুমিও সেটা করবে?

হ্যাঁ। একটু প্র্যাকটিস করতে হবে, কিন্তু আমার মনে হয় আমরা পারব। সবচেয়ে বড় কথা কাজটা করা যাবে গোপনে, তারা বুঝতেই পারবে না কী হচ্ছে।

রিদি বলল, ঠিক আছে, তাহলে দেরি করে লাভ নেই। কাজ শুরু করে দেয়া যাক।

মানমন্দিরের কাচগুলো খুলে নেয়ার কাজটুকু সহজ হলো না, কিন্তু কাচগুলো অক্ষত রেখে খোলারও প্রয়োজন ছিল না তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় বড় গোটা চল্লিশেক কাচ খুলে ফেলা হলো। সূর্যটা এতক্ষণে বেশ উপরে উঠে তার প্রখর আলোতে এখন যথেষ্ট উত্তাপ। বড় কাচগুলো দিয়ে তার প্রায় সবখানি প্রতিফলিত করা যায়।

এর মধ্যে ক্রিটিনা সবাইকে ডেকে এনেছে। তাদেরকে একটা জরুরি কাজ করতে হবে বলে সে সবাইকে একটা লম্বা সারিতে দাঁড়া করাল। সবাই উশখুশ। করছিল, রুহান হাত তুলে তাদের শান্ত করে বলল, আজ তোমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করতে হবে।

একজন জানতে চাইল, কী কাজ?

তোমরা সবাই নিশ্চয়ই অনুমান করেছ তোমাদের আবার ধরে নেবার জন্যে কিছু মানুষজন আসার কথা। বাজে মানুষ। খারাপ মানুষ। জঘন্য মানুষ।

সবাই মাথা নাড়ল। রুহান বলল, তারা আসছে।

সাথে সাথে সবার ভেতরে একটা আতঙ্কের ছাপ পড়ল। রুহান হাত ও বলল, তোমাদের ভয় পাবার কিছু নেই। সেই জঘন্য মানুষগুলোকে আমরা কাছে আসতে দেব না। দূর থেকে আমরা তাদের ধ্বংস করে দেব।

কীভাবে ধ্বংস করবে?

এই কাচগুলো দিয়ে। তোমরা সবাই নিশ্চয়ই কখনো না কখনো আয়না দিয়ে সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করেছ, দূরে কোথাও পাঠিয়েছ। তাই না?

সবাই মাথা নাড়ল। রুহান বলল, এখানেও তাই করবে, এই বড় কাচগুলো আয়নার মতো তবে–আলো নয় তাপকে প্রতিফলিত করে।

রুহান সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে গলা উঁচু করে বলল, আম সবাই যদি আলাদা আলাদাভাবে আয়নাগুলোকে দিয়ে এক জায়গায় সব তাপ কেন্দ্রীভূত করতে পারি, প্রচণ্ড তাপে সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠবে। তোমরা যদি আমার কথা বিশ্বাস না কর এখনই সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পার। আমি তোমাদের সবাইকে একটা করে কাচ দেব, তোমরা সূর্যের আলোকে এই কাচ দিয়ে প্রতিফলিত করে এক জায়গায় ফেলবে। পারবে না?

সবাই চিৎকার করে বলল, পারব।

চমৎকার! রুহান তখন পাশে সাজিয়ে রাখা কাচগুলো একজন একজনকে দিতে শুরু করে। চেষ্টা করা হয়েছে যথাসম্ভব বড় টুকরো দিতে, ভারী কাচগুলো নিচে রেখে সবাই দুই পাশে ধরে দাঁড়ায়। রুহান একপাশে সরে গিয়ে বলল, সাবধান, কারো যেন হাত না কাটে। ভাঙ্গা কাচ খুব ধারালো হয়।

সবাই মাথা নেড়ে জানাল তারা সবাধান থাকবে।

রুহান তখন বেশ খানিকটা দূরে একটা শুকনো গাছের গুড়ি দেখিয়ে বলল, সবাই চেষ্টা কর সূর্যের আলোটাকে এখানে প্রতিফলিত করতে। যখন প্রতিফলিত হবে তখন স্থিরভাবে ধরে রাখবে। ঠিক আছে?

সবাই মাথা নাড়ল।

চমৎকার! রুহান সামনে থেকে সরে গেল। বলল, শুরু কর।

ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে করতে হবে বুঝতে একটু সময় লাগল, সবাই তাদের কাচটা ঠিক করে ধরার চেষ্টা করতে থাকে। আলোটাকে গাছের গুড়িতে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করতে থাকে। যখন সবাই সূর্যের আলোকে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীভূত করতে পারল তখন গাছের গুড়িটা থেকে প্রথমে ধোঁয়া বের হতে থাকে তারপর হঠাৎ ধক করে আগুন ধরে ওঠে। সবাই আনন্দে চিৎকার করে ওঠে সাথে সাথে।

রুহান হাততালি দিয়ে বলল, চমৎকার! এসো, এবারে আরো দূরে কোথাও চেষ্টা করি।

দেখতে দেখতে সবাই ব্যাপারটা ধরে ফেলল, কোনো একটা জায়গা নির্দিষ্ট করে দিলে সবাই মিলে সেখানে আগুন ধরিয়ে দিতে পারছে। বেশ সহজেই।

রিদি প্রথমে ঠিক বিশ্বাস করে নি যে এটা সম্ভব যখন দেখল সত্যি সত্যি সবাই মিলে অনেক দূরে একটা জায়গায় আগুন লাগিয়ে দিতে পারছে সে হতবাক হয়ে গেল। মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, এটি কেমন করে সম্ভব? কী। আশ্চর্য!

রুহান অবশ্যি কথাবার্তায় আর সময় নষ্ট করল না। রাস্তাটার পাশে পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় এই জনা ত্রিশেক ছেলেমেয়েদের সবার কাছে বড় একটা কাচের টুকরো দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। সবাই ঝোপঝাড়ের আড়ালে নিজেদের আড়াল করে রাখল, হঠাৎ করে তাকালেও যেন কাউকে দেখা না যায়।

গাড়িগুলোতে আগুন ধরানোর জন্যে সেগুলো থামানো দরকার। তাই রুহান আর রিদি মিলে পাহাড় থেকে বেশ কিছু বড় বড় পাথর গড়িয়ে রাস্তার উপর নামিয়ে নিয়ে এলো। দেখে মনে হয় পাহাড়ের উপর থেকে এমনি বুঝি গড়িয়ে নেমেছে। এ জায়গায় এসে পাথরগুলো সরানোর জন্যে গাড়ি থামিয়ে সবাইকে গাড়ি থেকে নামতেই হবে।

সবরকম প্রস্তুতি নিয়েও রুহান সন্তুষ্ট হলো না। রাস্তার পাশে বড় পাথরের আড়ালে অস্ত্র নিয়ে তারা নিজেরা লুকিয়ে রইল। যদি কোনোভাবে দলটা থামানো না যায় তখন গোলাগুলি করে থামাতে হবে! রাস্তার এক পাশে থাকল রুহান আর ক্রিটিনা, অন্য পাশে রইল রিদি। এবারে শুধু অপেক্ষা করা।

অপেক্ষা করতে করতে যখন সবাই অধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেচে ঠিক তখন তারা পাহাড়ী রাস্তায় গাড়িগুলোর ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পেল। পাহাড় রাস্তার ঠিক কোথায় আছে তার উপর নির্ভর করে শব্দটা হঠাৎ হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছিল আবার হঠাৎ করে কমে আসছিল। এক সময় শব্দটা একটা নিয়মিত শব্দে পরিণত হলো এবং ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর দূরে গাড়িগুলোকে দেখা যেতে লাগল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেগুলো রাস্তায় পড়ে থাকা পাথরগুলোর সামনে এসে দাঁড়াল।

গাড়ির দরজা খুলে খুব সাবধানে একজন অস্ত্র হাতে নেমে আসে, সে সতর্ক চোখে চারদিকে দেখে অন্যদের নামতে ইঙ্গিত করল। অস্ত্র হাতে তখন বেশ অনেকগুলো মানুষ নেমে গাড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে সতর্কভাবে এদিক সেদিক তাকাতে থাকে। নেতাগোছের একজন বলল, কী মনে হয়? এটা কী কোন ট্রাপ?

অন্য একজন উত্তর করল, বুঝতে পারছি না। কথা নাই বার্তা নাই হঠাৎ করে রাস্তার মাঝে পাথর পড়ে আছে? আমার মনে হয় কেউ এনে রেখেছে।

সাবধান! দুইজনই কিন্তু খেলোয়াড়। মনে নাই এরা ক্ৰিভনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল!

সেটা অন্য ব্যাপার। এখন তার সাথে ত্রিশ পঁয়ত্রিশজন ছেলে-মেয়ে! আর যাই করুক এখন এরা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করবে না।

নেতাগোছের মানুষটি বলল, দেরি করে লাভ নেই। রাস্তা থে পাথরগুলো সরাও। অন্যেরা কভার দাও।

হঠাৎ একজন বলল, কী ব্যাপার এখানে এত গরম কেন?

হ্যাঁ! কী ব্যাপার? মানুষগুলো অবাক হয়ে এদিক সেদিক তাকায়। উত্তাপটুকু দেখতে দেখতে সহ্যের বাইরে চলে যায় তখন তারা যন্ত্রণায় ছটফট করে এদিকে সেদিকে ছুটতে শুরু করে।

রুহান, ক্রিটিনা আর রিদি নিঃশব্দে বসে থাকে। ছেলেমেয়েগুলো একজন একজন করে করে তাদের কাচ দিয়ে সূর্যের আলোর তাপ কেন্দ্রীভুত করতে শুরু করছে আর দেখতে দেখতে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। তারা গাড়ির ইঞ্জিন থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখল এবং হঠাৎ করে একটা বিস্ফোরণ করে গাড়ির ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ল এবং মানুষগুলো চিৎকার করে ছুটে সরে যেতে থাকে। কীভাবে কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে কয়েকজন ইতস্তত গুলি করল কিন্তু তার কোনো প্রত্যুত্তর এলো না বলে নিজেরাই আবার অস্ত্র নামিয়ে নিল।

রুহান, ক্রিটিনা আর রিদি তাদের অস্ত্র তাক করে নিঃশপে বসে থাকে। শাইকে বলা আছে প্রথম গাড়িটা জ্বালিয়ে দিতে পারলে দ্বিতীয়টা এবং সেটা করতে পারলে তার পরেরটা জ্বালিয়ে দিতে হবে। ছেলেমেয়েগুলো সত্যি সত্যি দ্বিতীয়টাতেও আগুন ধরিয়ে দিল, তখন হঠাৎ করে পিছনের দুটো গাড়ি পিছনে সরে যেতে থাকে। অন্য মানুষগুলোকে গাড়িতে তুলে নিয়ে হঠাৎ করে গাড়িগুলো যে পথে এসেছিল সেই পথে ফিরে যেতে থাকে। পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সবাই যে যার জায়গায় লুকিয়ে রইল। গাড়িগুলোর ইঞ্জিনের শব্দ মিলিয়ে যাবার পর প্রথমে রিদি এবং তার দেখাদেখি রুহান আর ক্রিটিনা পাথরের আড়াল থেকে বের হয়ে আসে। তাদের দেখাদেখি অন্যেরাও তখন পাহাড় থেকে ছুটে নিচে নেমে আসতে থাকে। রাস্তার উপর দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা গাড়ি দুটো ঘিরে সবাই লাফালাফি করে আনন্দে চিৎকার করতে থাকে। সাধারণ একটা কাচের টুকরো দিয়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা এভাবে গাড়িগুলো জ্বলিয়ে সবাইকে তাড়িয়ে দিয়েছে এই বিষয়টা এখনো তারা বিশ্বাস করতে পারছে না।

ঘণ্টাদুয়েক পরে যখন আবার সবাই রওনা দিয়েছে তখন কারো ভেতরেই চাপা ভয় আর আতঙ্কটুকু নেই, নিজেদের ভেতরে তখন বিচিত্র এক ধরনের আত্মবিশ্বাস। লরির ভেতরে তারা হাততালি দিয়ে গান গাইতে থাকে। দেখতে দেখতে পাহাড়ী এলাকা পার হয়ে তারা একটা উপত্যকায় নেমে আসে, সেখান থেকে একটা নদীর তীর ধরে এগোতে থাকে। রাস্তা ভালো নয়, যেতে হচ্ছে খুব ধীরে ধীরে, যখন অন্ধকার হয়ে গেল তখন তারা রাত কাটানোর জন্যে এক জায়গায় থেমে গেল। নদীর পানিতে হাত মুখ ধুয়ে তারা কিছু শুকনো খাবার খেয়ে বিশ্রাম নেয়। এজেন্ট দ্রুচান তার লরির নিচে শুয়ে শুয়ে সেটা মেরামত করতে থাকে। রাত বিরেতে কী হয় কেউ জানে না, তাই রুহান, রিদি আর ক্রিটিনা পালা করে পাহারা দেবে বলে ঠিক করল। ভোর রাতের দিকে তার পালা শেষ করে শুতে গিয়েছে, চোখে একটু ঘুম নেমে এসেছিল হঠাৎ করে ক্রিটিনা তাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, রুহান!

রুহান মুহূর্তে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠে, কী হয়েছে?

একটা গাড়ি।

গাড়ি?

হ্যাঁ।

কোথায়? ক্রিটিনা অন্ধকারে হাত দিয়ে দেখায়, ঐ যে, আসছে?

রুহান আবছা অন্ধকারে গাড়িটাকে দেখতে পেল। হেড লাইট নিভিয়ে চুপি চুপি আসছে। মুহূর্তের মধ্যে ওরা প্রস্তুত হয়ে যায়। লরিটির পাশে আড়াল নিয়ে ওরা ওদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ট্রিগারে আঙ্গুল দিয়ে বসে থাকে।

গাড়িটি রাস্তার পাশে দাঁড়া করিয়ে রাখা লরিটির কাছাকাছি এসে থেমে গেল। দরজা খুলে জনা দশেক মানুষ নেমে আসে, আবছা অন্ধকারেও দেখা যায় মানুষগুলো সশস্ত্র। কাছাকাছি আসার পর রিদি হঠাৎ উচ্চস্বরে বলল, থাম।

মানুষগুলো থেমে গেল। রুহান বলল, তোমরা আমাদের অস্ত্রের আওতার ভেতর আছ, কোনোরকম বোকামী করতে চাইলেই কিন্তু মারা পড়বে।

অন্ধকারে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর ভেতর থেকে একজন বলল, ভয় নেই। আমরা তোমাদের আক্রমণ করতে আসিনি।

তাহলে কী জন্যে এসেছ?

তোমাদের দলে যোগ দিতে এসেছি।

আমাদের দলে যোগ দিতে এসেছ?

হ্যাঁ।

রিদি আর রুহান প্রায় একই সাথে বিস্ময়ের এক ধরনের শব্দ করল। রুহান বলল, তোমরা কারা?

আমরা দক্ষিণের গ্রুজনীর দলের মানুষ।

রিদি তার হাতের আলো জ্বালায়, সেই আলোতে সামনে দাঁড়িয়ে। মানুষগুলোকে বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। মানুষগুলোর বয়স খুব বেশি নয়, দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ছাড়া সেখানে চোখে পড়ার মতো কিছু নেই। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা পাকা বাদামী চুলের একজন বলল, তোমরা দুজন নিশ্চয়ই রিদি আর রুহান?

রিদি আর রুহান মাথা নাড়ল, মানুষটি বলল, আমরা তোমাদের অনেক গল্প শুনেছি, তোমাদের দেখে খুব খুশি হলাম।

রিদি বলল, ঠিক কী গল্প শুনেছ জানি না! তবে আমরাও তোমাদের দেখে খুব খুশি হয়েছি।

রুহান বলল, এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই। তোমরা এসে বস। হাতের অস্ত্রগুলো ঐ গাছের উপর হেলান দিয়ে রাখতে পার।

বাদামী চুলের মানুষটি অস্ত্রটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, পুরো এলাকায় তোমাদের কথা সবাই জানে। আমার কী মনে হয় জান? আরো অনেকেই এখন তোমাদের সাথে যোগ দিতে আসবে।।

রিদি আর রুহান একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। বাদামী চুলের মানুষটি বলল, আমার মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি তোমরা শক্তিশালী একটা দল তৈরি করে ফেলতে পারবে। পার্বত্য এলাকার ওপাশে বিশাল একটা এলাকায় এখনো কেউ যায় নি। আমরা সবাই মিলে সে এলাকাটা আক্রমণ করতে পারি।

মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা একজন মানুষ তার গাল ঘষতে ঘষতে বলল, ঐ এলাকার মানুষগুলো খুব শক্ত সমর্থ। ধরে আনতে পারলে অনেক ইউনিটে বিক্রি করতে পারবে।

রিদি আর রুহান একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, রুহান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তাকে বাধা দিয়ে বাদামী চুলের মানুষটি বলল, প্রথমে ভালো কিছু অস্ত্র দরকার। গ্রুজনির অস্ত্র কিছু লুট করে আনা যায়–

রুহান এবার হাত তুলে বাধা দিয়ে বলল, দাঁড়াও দাঁড়াও, তোমরা আরো কিছু বলার আগে আমাদের কথা একটু শুনো।

রুহানের গলার স্বরে কিছু একটা ছিল, মানুষটি থেমে গিয়ে থতমত খেয়ে রুহানের দিকে তাকাল। রুহান শান্ত গলায় বলল, তোমরা খুব একটা বড় ভুল করেছ।

কী ভুল করেছি?

তোমরা যেরকম ভাবছ ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়।

মানুষটি অবাক হয়ে বলল, ব্যাপারটি মোটেও কী রকম নয়?

আমরা একটা দল তৈরি করছি না। দল তৈরি করে আশেপাশের এলাকায় ডাকাতি করতে যাচ্ছি না। মানুষ ধরে ধরে তাদের বিক্রি করতে যাচ্ছি না।

বাদামী চুলের মানুষটি অসহিষ্ণু গলায় বলল, তুমি কী বলছ? আমরা খুব ভালো করে জানি তুমি ত্রিশজন ছেলে-মেয়েকে লুট করে নিয়ে এসেছ। এজেন্ট দ্রুচান দশ পার্সেন্ট কমিশনে তাদেরকে পৌঁছে দিচ্ছে–

না, না, না। রুহান মাথা নাড়ল, আমরা তাদেরকে মুক্ত করে এনে। মুক্ত করে তাদেরকে তাদের এলাকায় ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছি।

এজেন্ট দ্রুচান-

এজেন্ট দ্রুচান আমাদের সাহায্য করছে। সে একটি ইউনিটও নিচ্ছে না।

বাদামী চুলের মানুষটি বিস্ফারিত চোখে বলল, এজেন্ট দ্রুচান কোন ইউনিট নিচ্ছে না?

না।

কেন?

রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমি জানি না তোমাকে এটা কেমন কে বোঝাব।

চেষ্টা কর!

আমরা মনে করি, মানুষ হয়ে মানুষকে বেচা-কেনা করা যায় না। সা! পৃথিবী এখন যেরকম স্বার্থপর হয়ে গেছে, লোভী হয়ে গেছে, হিংস্র হয়ে গেu. এটা ঠিক না। আমাদে একজনের অন্যজনকে সাহায্য করতে হবে, ভালোবাসতে হবে। আমাদের নিঃস্বার্থ হতে হবে। এজেন্ট দ্রুচান আমাদের কথা বিশ্বাস করে আমাদের সাহায্য করছে।

মানুষগুলো একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, তারা এখনও রুহানের কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি তোমরা আমার কথা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছ না, কিন্তু আমি যেটা বলছি সেটা সত্যি। পৃথিবীটা ঠিক দিকে যাচ্ছে না, আমি আর রিদি মিলে পৃথিবীটা ঠিক করতে পারব না। কিন্তু যেটা ঠিক সেটা করার চেষ্টা করতে পারব। আমাদের কথা শুনে অন্যেরা হয়তো সেটা বিশ্বাস করবে। কোথাও কেউ হতে। সত্যিকারভাবে চেষ্টা করবে।

বাদামী চুলের মানুষটির মুখে বিদ্রুপের এক ধরনের হাসি ফুটে উঠল। হেঁটে গাছে হেলান দিয়ে রাখা অস্ত্রটি তুলে নিয়ে বলল, আমরা ভেবেছিলাম তোমরা দুঃসাহসী মানুষ। এখন দেখছি সেটা পুরোপুরি ভুল ধারণা। তোম্রা ভীতু আর কাপুরুষ। শুধু যে ভীতু আর কাপুরুষ তাই নয় তোমাদের কোনো বাস্তব জ্ঞান পর্যন্ত নেই।

রিদি ক্রুদ্ধ হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, রুহান তাকে থামাল। বলল, আমি দুঃখিত, তোমরা ভুল একটা ধারণা করে এত কষ্ট করে এখানে এসেছ!

হ্যাঁ। সেটা সত্যি, তোমাদের খুঁজে বের করে এখানে আসতে আমাদের খুব কষ্ট হয়েছে। শুধু শুধু সময় নষ্ট!

আমরা খুব দুঃখিত।

মানুষগুলো কোনো কথা বলল না। রুহান বলল, তোমরা তাহলে ফিরে যাচ্ছ?

হ্যাঁ।

তোমাদের ফেরত যাত্রা শুভ হোক।

মানুষগুলো এবারেও কোনো কথা না বলে কঠোর মুখে তাদের গাড়িতে ফিরে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইঞ্জিন গর্জন করে ওঠে এবং গাড়িটি যে দিক দিয়ে এসেছিল সেই দিকে ফিরে যেতে শুরু করে।

কিছুক্ষণের মধ্যে তারা ফিরে আসবে। গলার স্বর শুনে রুহান আর রিদি মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, এজেন্ট দ্রুচান ঘুম ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে আছে। রুহান জিজ্ঞেস করল, কে ফিরে আসবে?

এই মানুষগুলো?

কেন?

তোমাদের সাথে যোগ দিতে।

রুহান অবাক হয়ে বলল, তুমি কেমন করে জান?

এজেন্ট দ্রুচান অবাক হয়ে বলল, আমি জানি। কেমন করে জানি সেটা জানি না। কিন্তু আমি জানি। আমিও এসেছিলাম মনে নেই?

ক্রিটিনা নরম গলায় বলল, আমি কারণটা জানি।

কী কারণ?

কারণটা খুব সহজ। মানুষ আসলে ভালো। তারা ভালো থাকতে চায়। যখন ভালো থাকার সুযোগ পায় তারা ভালো হয়ে যায়। ভালো থাকার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে।

কী ব্যাপার?

এটাকে মনে হয় বলে শান্তি। পৃথিবীর সবাই শান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে। অথচ শান্তি খুঁজে পাওয়া কী সহজ। অন্যের জন্যে কিছু একটা করাই হচ্ছে শান্তি। মানুষ কেন যে এটা বোঝে না কে জানে?

রুহান আর রিদি এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে ক্রিটিনার দিকে তাকিয়ে রইল।

গাড়িটি সত্যি সত্যি ফিরে এলো ঘণ্টা দুয়েক পরে। গাড়িতে অবশ্যি সবাই ছিল না, দশজনের ভেতর তিনজন ফিরে আসতে রাজি হয় নি, তাদের ধারণা ব্যাপারটা একটা হাস্যকর নির্বুদ্ধিতা। তারা নিজের এলাকায় ফিরে গেছ বাদামী চুলের মানুষটা সেই তিনজনের একজন।

অন্যেরা জানাল তারা হঠাৎ করে বুঝতে পেরেছে যে তারা আসবে। অসুখী। তারা একটু সুখ চায়। সুখ আর শান্তি। ভালো হয়ে থাকার শান্তি।

লরির খোলা দরজার কাছে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে রুহান তার লাল পাহাড় থেকে কিনে আনা বইটি পড়ছে তখন ক্রিটিনা জিজ্ঞেস করল, তোমার হাতে টা কী?

এটার নাম বই। আগে যখন সব মানুষের কাছে ক্রিস্টাল রিডার ছিল না তখন তারা এই রকম বই পড়ত।

কী আশ্চর্য! ক্রিটিনা রুহানের পাশে ঝুঁকে পড়ে বলল, দেখি তোমার বইটি।

ক্রিটিনা রুহানের এত কাছে ঝুঁকে এসেছে সে মেয়েটির মাথার চুলের হালকা এক ধরনের সুবাস পেল। বিবর্তনে মানুষের যে ইন্দ্রিয়গুলোর বিকাশ ফটেছে ঘ্রাণ তার একটি নয়, যদি হতো সে নিশ্চয়ই এই মেয়েটির শরীরের ঘ্রাণ তীব্রভাবে অনুভব করতে পারত।

ক্রিটিনা বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে বলল, কী আশ্চর্য! এখানে দেখছি নানা ধরনের চিহ্ন!

হ্যাঁ। এগুলোকে বলে বর্ণমালা। বর্ণমালা সাজিয়ে সবকিছু লেখা হয়।

সত্যি?

হ্যাঁ।

তুমি বর্ণমালা পড়তে পার?

হ্যাঁ। আমি শিখেছি।

ক্রিটিনা অবাক হয়ে বলল, তুমি আমাকে পড়ে শোনাও দেখি এখানে কী লেখা আছে।

রুহান পড়ল, মানুষের চোখ অত্যন্ত সংবেদনশীল। মাত্র সাতটি ফোটন হলেই চোখের রেটিনা সেটাকে দেখতে পায়। বিবর্তনের কারণে যদি চোখ আর মাত্র দশ গুণ বেশি সংবেদনশীল হয়ে যেত তাহলে খালি চোখেই আমরা কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া দেখতে পেতাম–

ক্রিটিনা চোখ বড় বড় করে বলল, বাবা গো! কী কটমটে কথা!

রুহান হেসে বলল, এটা মোটেও কটমটে কথা না। এটা খুব সাধারণ কথা। আসলে আমরা তো ক্রিস্টাল রিডারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি তাই বই থেকে পড়লে কিছু বুঝতে পারি না।

ক্রিটিনা ভুরু কুঁচকে বলল, এখন তো পৃথিবীতে আর ক্রিস্টাল রিডার তৈরি হয় না, তাই না?

না।

তার মানে আমাদের আবার এরকম বই পড়া শিখতে হবে?

রুহান সোজা হয়ে বসে বলল, হ্যাঁ। আসলে আমি ঠিক এই কথাটা সবাইকে বোঝাতে চাই কিন্তু কেউ সেটা বুঝতে চায় না। যতদিন পৃথিবীটা আবার ঠিক না হয় সবার কাছে ক্রিস্টাল রিডার না থাকে ততদিন কী ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করবে না? একশবার করবে!

এই রকম বই দিয়ে?

হ্যাঁ। রুহান ক্রিটিনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি জানি তুমি আমার কথা বিশ্বাস করতে চাইছ না। কিন্তু বিশ্বাস কর–

ক্রিটিনা হেসে বলল, কে বলেছে আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি না? আমি অবশ্যই তোমার কথা বিশ্বাস করেছি।

রুহান মাথা নেড়ে বলল, না, তুমি আসলে আমার কথা বিশ্বাস কর নি। তুমি আমাকে খুশি করার জন্যে এই কথাটা বলছ।

ঠিক আছে। ক্রিটিনা মুখ টিপে হাসল। হেসে বলল, এখন তা হলে তোমাকে আরেকটা কথা বলি, এই কথাটা শুনলে তুমি বুঝবে যে আসলেই আমি তোমার কথা বিশ্বাস করেছি।

কী কথা বলবে?

তুমি কী আমাকে পড়তে শেখাবে?

রুহানের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, তুমি সত্যি আমার কাছে শিখতে চাও?

হ্যাঁ। শিখতে চাই।

কেন?

ক্রিটিনা শব্দ করে হাসল। হেসে বলল, না! তোমাকে খুশি করার ও! আমি ঠিক করেছি আমাদের গ্রামের স্কুলটা আমি আবার চালু করব। স্কুলে। বাচ্চাদের আমি পড়তে শেখাব। তারা যেন কিছু একটা জানার সুযোগ পায়, শেখার সুযোগ পায়!

চমৎকার! রুহান নিজের অজান্তেই ক্রিটিনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমি ঠিক এরকম একটা কিছু চাচ্ছিলাম!

ক্রিটিনা বলল, তাহলে তুমি আমাকে কখন শেখাবে?

এখনই শেখাব।

এখন? এই লরির মধ্যে? যখন আমরা ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাচ্ছি?

হ্যাঁ। ভালো কাজে দেরি করতে হয় না।

সত্যি সত্যি রুহান ক্রিটিনাকে বর্ণমালা শেখাতে শুরু করে দিল।

দুজনে মিলে যখন বর্ণমালার মাঝামাঝি গিয়েছে তখন হঠাৎ লরিটি থেমে গেল। রুহান মাথা বের করে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

সামনে থেকে এজেন্ট দ্রুচান বলল, রাস্তার মাঝখানে দুইটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অনেক মানুষ অনেক অস্ত্র।

রুহানের পেটের মধ্যে কেমন যেন পাক খেয়ে ওঠে, চাপা গলায় বলল, সর্বনাশ!

তাড়াতাড়ি অস্ত্রটা নিয়ে সে লাফিয়ে নেমে আসে। এজেন্ট দ্রুচান চোখে বাইনোকুলার দিয়ে সামনের গাড়িগুলোকে দেখছে। তার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। রুহান জানতে চাইল, কী অবস্থা?

বুঝতে পারছি না।

সবাই কী পজিশান নিয়েছে?

নাহ্। হাঁটাহাটি করছে। দেখে মনে হয় না কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে। সবাই গল্পগুজব করছে।

তাহলে কী আমরা যাব?

এজেন্ট দ্রুচান বাইনোকুলার থেকে চোখ নামিয়ে বলল, একসাথে সবার যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি যাই দেখে আসি কী ব্যাপার।

এজেন্ট দ্রুচান খুব দুশ্চিন্তিত মুখে গেল কিন্তু সে যখন ফিরে এলো তখন তার মুখ ভরা হাসি। হাত নেড়ে চোখ বড় বড় করে বলল, তোমরা বিশ্বাস করবে না কী হচ্ছে?

কী হচ্ছে?

দুই গাড়ি বোঝাই লোকজন, আমাদের সাথে যোগ দেবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে।

রুহান চোখ কপালে তুলে বলল, তুমি ওদের বলেছ যে আমরা ডাকাতের দল তৈরি করছি না। লুটপাট করতে যাচ্ছি না?

আমার বলতে হয়নি! ওরা জানে। ওরা সেটা জেনেই এসেছে। ওরা ডাকাতের দলে যেতে চায় না।

রিদি অবাক হয়ে বলল, সত্যি?

সত্যি! তোমরা বিশ্বাস করবে না কী ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র নিয়ে চলে এসেছে। যদি আমরা সত্যি সত্যি ডাকাতের দল করতাম, আমাদের সাথে কেউ পারত না!

রুহান চোখ পাকিয়ে বলল, এজেন্ট দ্রুচান, তোমার যতই ডাকাতের দল করার ইচ্ছে হোক না কেন আমরা কিন্তু সেটা করছি না!

এজেন্ট দ্রুচান একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাসের ভঙ্গি করে বলল, আমি জানি রুহান! আমি সেটা খুব ভালো করে জানি।

ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে হলো কেউই বুঝতে পারল না, কিন্তু সবাই যখন ক্রিটিনাদের গ্রামে পৌঁছাল তখন তাদের সাথে আঠারোটা লরি এবং প্রায় তিনশত মানুষ। বেশিরভাগ সশস্ত্র—সবাই এসেছে রুহান আর রিদির সাথে কাজ করার জন্যে। ক্রিটিনার গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে গেল। কিন্তু তারা দেখল গ্রামের কেউ ঘুমায় নি, সবাই গভীর আগ্রহ নিয়ে তাদের জন্যে। অপেক্ষা করছে। ক্রিটিনাকে দেখে তার মা ছুটে এলো, বুকে জড়িয়ে বলল, মা তুই ফিরে এসেছিস?

ক্রিটিনা চোখ মুছে বলল, হ্যাঁ মা ফিরে এসেছি।

আমি ভেবেছিলাম তোকে আর কোনোদিন দেখব না।

ক্রিটিনা বলল, আমিও তাই ভেবেছিলাম মা, কিন্তু এই যে দুইজন রুহান আর রিদি তারা সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। তারা আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে।

ক্রিটিনার মা অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, জানি। আমি সব জানি। এখন সবাই জানে। এই এলাকার সব মানুষের মুখে মুখে এখন একটা মাত্র কথা।

কী কথা মা?

ঈশ্বর দুজন দেবদূতকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে, তারা এখন সারা পৃথিবীর সব মানুষের দুঃখ কষ্ট দূর করে দেবে।

ক্রিটিনা খিলখিল করে হেসে বলল, না মা, ওরা দেবদূত না। ওরা মানুষ। একটু বোকা সোকা কিন্তু একেবারে একশ ভাগ মানুষ। তারা যে কাজটা করছে সেই কাজটা দেবদূতরা পারত না, শুধু মানুষেরাই এই কাজ পারে।

আমাকে ঐ মানুষগুলোর কাছে নিয়ে যাবি? আমি ওদের গায়ে হাত বুলিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে তাদের মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করব?

এসো মা আমার সাথে।

ক্রিটিনা তার মাকে নিয়ে রুহান আর রিদিকে খুঁজে বের করে আবিষ্কার করল হারানো সন্তানদের মায়েরা রুহান আর রিদিকে ঘিরে রেখেছে। কেউ কেউ আকুল হয়ে কাঁদছে, কেউ কেউ তাদের হাত ধরে সেখানে চুমু খাবার চেষ্টা করছে।

রুহান কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু অনেক মানুষের ভিড়ে সে কিছু বলতে পারছে না। ক্রিটিনা তখন রুহান আর রিদিকে উদ্ধার করার জন্যে এগিয়ে যায়, সবাইকে ঠেলে সরিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, তোমরা সবাই সরে যাও। এই দুজন মানুষ অনেক দূর থেকে অনেক কষ্ট করে আমাদের সবাইকে উদ্ধার করে এনেছে। মানুষগুলো ক্লান্ত, তাদের একটু বিশ্রাম নিতে দাও।

মায়েরা চিৎকার করে বলল, আমরা আমাদের বাড়িতে তাদের জন্যে বিশ্রামের ব্যবস্থা করেছি। আমাদের বাড়িতে খাবারের ব্যবস্থা করেছি। আমরা তাদের আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাই!

ক্রিটিনা বলল, দুজন মানুষ ত্রিশজনের বাড়িতে যেতে পারবে না! তাদের। সাথে আরো তিনশ মানুষ আছে। তাদের সবার একটা ব্যবস্থা করতে হবেতোমরা আপাতত তাদের মুক্তি দাও।

কমবয়সী একজন মা বলল, আমরা তাদের কোনো একটা কথা শুনতে চাই।

ক্রিটিনা রুহানের হাত স্পর্শ করে বলল, রুহান তুমি কিছু একটা বল।

কী বলব?

ক্রিটিনা কাঁধ বাঁকিয়ে বলল, আমি জানি না। যা ইচ্ছে হয় বল!

রুহান একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে গলা উঁচু করে বলল, আপনাদের কাছে আপনাদের সন্তানদের ফিরিয়ে আনতে পেরে আমাদের খুব ভালো লাগছে।

অনেক মানুষের ভিড়, সবার কথাবার্তায় জায়গাটা সরগরম হয়ে ছিল, রুহান কথা বলতে শুরু করতেই সবাই চুপ করে গেল, চারপাশে হঠাৎ করে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। রুহান সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল, কাজটা ছিল খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সত্যি কথা বলতে কী যখন আমরা সেটা শুরু করেছিলাম তখন ঠিক কীভাবে আমরা করব সেটা জানতাম না। তারপর আমরা সেটা শুরু করেছিলাম।

রুহান একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমরা অসম্ভব আনন্দিত, আমরা সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটা শুরু করেছিলাম। সে কারণে আজ আপনাদের আপনাদের সন্তানদের ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু এই কাজটি করার কাতা। আরেকটি খুব বড় কাজ হয়েছে! মানুষ আবার নতুন করে বিশ্বাস করতে। করেছে যে একজনকে শুধু অন্যায় আর অপরাধ করে বেঁচে থাকতে হবে। মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে ঘৃণা করে, তাদের উপর অত্যাচার করে দিন কাটাতে হবে না। মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে পারবে, তাদের সম্মান করতে পার। এবং তার পরেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারবে।

রুহান এক মুহূর্তের জন্যে থামতেই সবাই এক ধরনের আনন্দধ্বনি কর। তার ঠিক কোন কথাটাতে সবাই এত আনন্দ পেয়েছে রুহান তা ধরতে পারল না। কম বয়সী একটি মা চিৎকার করে বলল, এখন আমরা অন্যজনের মুখে কিছু শুনতে চাই!

রিদি হাত নেড়ে বলল, আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না! রুহান যেটা বলেছে সেটাই আমার কথা।

এবারে অনেকে চিৎকার করে বলল, না, না, আমরা তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।

রিদি একটু ইতস্তত করে বলল, রুহানের সব কথা ঠিক। তবে আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, যারা পৃথিবীটাকে একটা নরকে পরিণত করেছে তারা কিন্তু এত সহজে এটা মেনে নেবে না। তারা পাল্টা আঘাত হানা। চেষ্টা করবে, প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করবে। আমাদের সে জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা যেটা শুরু করেছি সেটা এখনো শেষ হয়নি–সবাই মিলে সেটা শেষ করতে হবে!

এবারেও অনেকেই আনন্দের একটা শব্দ করল, যদিও রিদি যে কথাগুলো বলেছে সেটা মোটেও আনন্দের কথা নয়, সেটা ছিল খুব ভয়ের কথা, খুব আশঙ্কার কথা।

প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কেটে যাবার পর যখন গভীর রাতে সবাই ঘুমাতে গিয়ে তখন রিদি আর রুহান অনেকক্ষণ পর নিরিবিলি কথা বলার সুযোগ পেল। রিদি চোখ মটকে বলল, কেমন বুঝতে পারছ রুহান!

রুহান জিজ্ঞেস করল, তুমি কীসের কথা বলছ?

সব মিলিয়েই বলছি। তুমি যখন লাল পাহাড়ের বাজারে ক্রিটিনা আর অন্য ছেলে-মেয়েদের বাঁচানোর জন্যে তোমাদের অস্ত্রটা বের করেছিলে তখন কী তুমি কল্পনা করেছিলে এরকম একটা কিছু ঘটবে?

না। ভাবি নি।

তুমি কী ভেবেছিলে?

রুহান বলল, আমি কিছুই ভাবি নি। মানুষ হয়ে মানুষকে বেচা-কেনা করা যায় না, যেভাবেই হোক সেটা থামাতে হবে, এটা ছাড়া আর কিছুই ভাবি নি।

এখন তুমি বুঝতে পারছ কী ঘটছে? কী ঘটছে?

এখন আমাদের সাথে প্রায় তিনশ সশস্ত্র মানুষ। তারা যে শুধু সশস্ত্র তাই না, আমার ধারণা তাদের সবাই বেশ ভালো সৈনিক। আমি নিশ্চিত, যতই দিন যাবে এরকম মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে। দেখতে দেখতে আমাদের সাথে হাজার হাজার মানুষ চলে আসবে। আমরা তখন বিশাল একটা শক্তি হয়ে যাব। বুঝতে পারছ?

রুহান বলল, হ্যাঁ, বুঝতে পারছি।

রিদি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, না, তুমি বুঝতে পার নি।

আমি কী বুঝতে পারি নি!

আমরা যেটা অনুমান করছি সেটা কী ক্ৰিভন অনুমান করছে না?

রুহান মাথা নেড়ে বলল, মনে হয় করছে।

তা হলে?

তুমি বলছ, ক্রিভন সেটা কোনোদিনই করতে দেবে না?

রিদি মাথা নাড়ল, আমার তাই ধারণা। আমরা এখন পর্যন্ত যে সব কাজ করেছি তার প্রত্যেকটা ক্ৰিভনের মান-সম্মান, ব্যাবসা, বাণিজ্য, ক্ষমতার রাজত্ব সবকিছুর উপর একটা করে বিশাল আঘাত। ক্ৰিভনের এখন তার লোকজনের সামনে মুখ দেখানোর কোনো উপায় নেই। ক্ৰিভনকে যেভাবে হোক তার সম্মানকে উদ্ধার করতে হবে। সেটা কীভাবে করা সম্ভব, বলো দেখি?।

রুহান কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল।

রিদি বলল, বলো।

রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমাদের দুইজনকে ধরে নিয়ে।

হ্যাঁ। শুধু ধরে নিয়ে নয়, দুইজনকে খুব কঠিন একটা শাস্তি দিয়ে–এমন কঠিন একটা শাস্তি যে পৃথিবীর যে কোনো মানুষ যখন সেটা শুনবে তখন আতঙ্কে শিউরে উঠবে। রিদি এক মুহূর্ত থেমে বলল, সেটা কী হতে পা তুমি জান?

রুহান কিছুক্ষণ পর বলল, জানি।

সেটা কী?

আমি সেটা নিয়ে কথা বলতে চাই না।

ঠিক আছে। আমিও চাই না। শুধু আমি নিশ্চিত করতে চাই যে তুমিও বর্তমান পরিস্থিতিটা ঠিকভাবে বুঝতে পারছ।

আমি বুঝতে পারছি রিদি। জেনে হোক না জেনে হোক আমরা অসম্ভব বিপদের একটা কাজে হাত দিয়েছি। অনেকটা সিংহের লেজ ধরে ফেলার মতো, এখন সেটা ধরে রাখতেই হবে, ছেড়ে দিলে সিংহটা আমাদের খেয়ে ফেলবে।

রিদি শব্দ করে হেসে বলল, মাঝে মাঝে তুমি খুব বিচিত্র কথা বল রুহান। খুব বিচিত্র এবং মজার। যাই হোক, চল শুয়ে পড়া যাক।

তুমি যাও, আমার একটা কাজ করতে হবে।

কী কাজ?

সেটাও খুব বিচিত্র, তুমি জানতে চেয়ো না।

রিদি বলল, সেই কাজটা কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে না?

না।

আমি জানি, আমাদের খুব বিপদের ঝুঁকি আছে কিন্তু সেটা আজ রাতেই ঘটে যাবে বলে আমি মনে করি না। আমাদের এখানে এখন তিনশত সশস্ত্র মানুষ, তারা ছোট গ্রামটার চারপাশে পালা করে পাহারা দিচ্ছে। নাইট গগলস চোখে দিয়ে লোকজন দেখছে, গোপনে কেউ আক্রমণ করতে পারবে না।

সেটা নিয়েই ভাবছি রিদি। মনে হচ্ছে সেটাই দুশ্চিন্তার কথা।

রিদি শক্ত বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে বিড়বিড় করে বলল, যেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কথা তুমি সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। কিন্তু যেটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই সেটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে তুমি চুল পাকিয়ে ফেল। আমার ধারণা তোমার। এখন সময় হয়েছে- কথাটা শেষ করার আগেই রিদি গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল।

রুহান শুতে গেল একটু পরেই। শোবার আগে সে কয়েকটা কাঠি পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করে সেই কয়লা দিয়ে দেয়ালে একটা নির্দেশ লিখে গেল। ছোট একটা নির্দেশ, এটা লিখতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়, কিন্তু রুহান তার জীবনে বর্ণমালা ব্যবহার করে কিছু লেখেনি তাই তার বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল! রুহান খুব ভালো করে জানে বর্ণমালা ব্যবহার করে এই লেখা খুব বেশি মানুষ পড়তে পারবে না, তবুও তার মনে হলো এটা লিখে রাখা দরকার। খুব দরকার।

সে যে কত ক্লান্ত হয়েছিল সেটা সে নিজেই জানত না। রিদির মতোই বিছানায় শোয়া মাত্রই রুহান গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল।

গভীর রাতে রিদি আর রুহান তাদের দরজায় শব্দ শুনে চমকে জেগে উঠে। ভয়। পাওয়া গলায় রুহান জিজ্ঞেস করল, কে?

আমি গার্ড।

কী হয়েছে গার্ড?

একটা মেয়ে তোমাদের সাথে দেখা করতে এসেছে।

মেয়ে? রিদি আর রুহান অবাক হয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। এতো রাতে কোন মেয়ে তার সাথে দেখা করতে আসবে?

দরজা খুলতেই হুঁড়মুড় করে একটা মেয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। একটা চাদর দিয়ে তার পুরো শরীর ঢাকা, শীতে একটু একটু কাঁপছে। মেয়েটি অপ্রকৃতস্থের মতো তাদের দুজনের দিকে তাকায়। বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস ফেলে যন্ত্রের মতো বলতে থাকে, রিদি? রুহান? রিদি? রুহান? রিদি? রুহান?

রুহান নিঃশ্বাস বন্ধ করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটিকে সে চেনে। একজন সক্রেটিস। মেয়েটির নাম ক্ৰানা। এই মেয়েটির মাথায়। ইলেট্রড দিয়ে যখন সিস্টেম লোড করা হয়েছিল তখন সেখানে সে হাজির ছিল। রুহান মেয়েটিকে চিনতে পেরেছে কিন্তু মেয়েটি তাকে চিনতে পারে নি। চেনার কথা নয়–এরা সক্রেটিস, মাথায় স্টিমুলেশন দেবার আগে এরা কাউকে চেনে না।

রুহান তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটার হাতের দিকে তাকাল, একটা লাল লিভার শক্ত করে ধরে রেখেছে। লিভারটা সে চেনে, বিস্ফোরকে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্যে এই ধরনের লিভার ব্যবহার করা হয়।

ক্ৰানা একবার রিদি আর একবার রুহানের দিকে তাকিয়ে অনেকটা আপন মনে জিজ্ঞেস করে, রিদি? রুহান? রিদি?

রুহান বলল, হ্যাঁ। আমরা রিদি আর রুহান।

ক্রানা নামের মেয়েটা কিছুক্ষণ তাদের মুখের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে খুব ধীরে ধীরে তার শরীরের উপর থেকে চাদরটা সরাল, তারপর বলল, ক্রিভন আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছে। ক্ৰিভন? তোমরা চেনো ক্ৰিভনকে?

রুহান আর রিদি বিস্ফোরিত চোখে কানার শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার শরীরে বড় বড় দুটি টিউব বাঁধা। টিউবগুলো দুজনেই চেনে। এগুলো হাইব্রিড বিস্ফোরক। দুটো প্রয়োজন নেই একটা টিউব বিস্ফোরিত হলেই এই পুরো গ্রাম ভস্মীভূত হয়ে যাবে, কিন্তু ক্ৰিভন দুটি হাইব্রিড বিস্ফোরক শো দিয়েছে কারণ গ্রামটাকে ভস্মীভূত করা তার উদ্দেশ্য নয়। তার উদ্দেশ্য ভয় দেখানো।

ক্রানা ডান হাতে শক্ত করে লিভারটা চেপে ধরে রেখে বিড়বিড় করে বলাকা, ক্ৰিভন খুব মজার মানুষ। এক কথা অনেকবার বলে। অনেকবা। অনেকবার। আমাকে বলেছে রিদি আর রুহানকে খুঁজে বের করে নিয়ে যেতে। অনেকবার বলেছে। আর কী বলেছে জান? বলেছে রিদি আর রুহান যদি এক। কথা উচ্চারণ করে তাহলে এই লিভারটা ছেড়ে দিতে! কী আশ্চর্য একটা কথা!

রুহানের মনে হলো তার মেরুদণ্ড দিয়ে ভয়ের একটা শীতল স্রোত ব যেতে শুরু করেছে। মনে হলো সে বুঝি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না, হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে যাবে। ক্ৰানা এদিক সেদিক তাকিয়ে আবার আপন মনে বলে, রিপি রুহান তোমরা কী কথা বলবে? একটা কথা। মাত্র একটা কথা! তাহলে আমি লিভারটা ছেড়ে দিতাম–দেখতাম কী হয়! কী হবে বলে তোমার মনে হয়? তোমরা কী জান? রিদি? রুহান? তোমরা জান? জান কী হয়?

ক্রানার সামনে দাঁড়িয়ে রিদি আর রুহান কুলকুল করে ঘামতে থাকে। হেরে গেছে! তারা জানে তারা হেরে গেছে। ক্ৰিভনের মতো একজন অসুস্থ মানুষ কী। সহজে তাদের হারিয়ে দিল!

উঁচু জায়গাটা থেকে ক্রিটিনাদের গ্রামটা স্পষ্ট দেখা যায়। দিনেরবেলা হলে আরও স্পষ্ট দেখা যেত। এখন রাত, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, চাদের আলোতে সবকিছুই একটু অন্যরকম দেখায়। আবছা এবং রহস্যময়। গ্রামে ছোট ছোট বাসা, বাসার সামনে একটু খোলা জায়গা, খোলা জায়গা ঘিরে গাছ-গাছালি বাগান। এখন অনেক রাত বলে বাসাগুলো অন্ধকার থাকার কথা কিন্তু অনেক বাসাতেই আলো জ্বলছে। রিদি, রুহান আর প্রায় তিনশ সশস্ত্র মানুষকে আশ্রয় দেবার জন্যে গ্রামের মানুষেরা কাজকর্ম করছিল। রিদি রুহানকে ধরে নিয়ে আসার পর এখন গ্রামের মানুষদের ভেতর ভয়, আশঙ্কা আর উত্তেজনা। এই জায়গাটা থেকে সেই উত্তেজনাটুকু দেখা যায়। মানুষজন ভীত বিহ্বল হয়ে ছোটাছুটি করছে। কাছে থাকলে হয়তো তাদের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দও শোনা যেত।

রিদি আর রুহানকে দুটি ধাতব চেয়ারে বেঁধে বসানো হয়েছে, তৃতীয় চেয়ারটিতে বসেছে ক্ৰানা। ক্রানাকে বেঁধে না রাখলেও হতো কিন্তু তবু তাকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে যেন হঠাৎ করে উঠে না পড়ে। সে বিড়বিড় করে একটানা নিজের সাথে কথা বলে যাচ্ছে। হঠাৎ করে শুনলে মনে হয় অর্থহীন কিন্তু মন দিয়ে শুনলে একটা অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। এখানে যা ঘটছে তার পুরো ব্যাপারটা নিয়ে জানার ভেতরে একটা বিস্ময়, কী ঘটছে কেন ঘটছে। সেটা নিয়ে তার ভেতরে অসহায় এক ধরনের প্রশ্ন।

ক্ৰিভনের জন্যেও একটা চেয়ার রাখা হয়েছে। তার চেয়ারটি নরম এবং আরামদায়ক। চেয়ারটিতে সে বসে নি, সেখানে তার একটা পা তুলে সে ক্রিটিনাদের গ্রামের দিকে তাকিয়ে আছে। জোছনার আলোতে গ্রামটিকে মনে হচ্ছে রহস্যময় এবং অলৌকিক। ক্ৰিভন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, রিদি এবং রুহান, তোমরা দুজন মানুষ আমার অনেক ক্ষতি করেছ। শুধু আমার না, আরো অনেকের।

রিদি কিংবা রুহান কেউ কোনো কথা বলল না। ক্ৰিভন বলল, তোমরা কেন এসব করছ আমি জানি না। আমি চিন্তা করে তার কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না। অনেক চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছি, সেটা কী জান? সেটা হচ্ছে নির্বুদ্ধিতা। চরম নির্বুদ্ধিতা। এই পৃথিবীটা নির্বোধ মানুষের জন্যে না–এই পৃথিবীটা হচ্ছে বুদ্ধিমান মানুষের জন্যে। তোমাদের এই পৃথিবীতে থাকার কোনো অধিকার নেই।

ক্রিভন চেয়ার থেকে পা নামিয়ে দুই পা হেঁটে সামনে গিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু নির্বুদ্ধিতা হোক আর যাই হোক, তোমরা আমার অনেক বড় ক্ষতি করেছ। সেই ক্ষতিটা আমাকে পুষিয়ে নিতে হবে। যেভাবে হোক।

সেটা করার জন্যে আমাকে কী করতে হবে জান? প্রথমে সবার কাছে প্রমাণ করতে হবে যে যারা তোমাদের সাথে থাকে তারা হচ্ছে নির্বোধ! তারা এত নির্বোধ যে তারা পোকা মাকড়ের মতো মারা পড়ে। ঘটনাটা ঘটানোর জন্যে আমি নিজে এই গণ্ডগ্রামে চলে এসেছি। এখানে বসে থেকে সামনের যে গ্রামটা আছে সেটাকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেব। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই গ্রামে একটা মানুষ দূরে থাকুক একটা টিকটিকিও বেঁচে থাকবে না! কী আনন্দ, তাই না?

ক্রিভন কোনো কথা না বলে কিছুক্ষণ গ্রামটার দিকে তাকিয়ে রইল তারপর মাথা ঘুরিয়ে রিদি আর রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু শুধু গ্রামবাসীদের পোকামাকড় ব্যাক্টেরিয়া ভাইরাসের মতো মারলে তো হবে না তোমাদের দুইজনকেও একটা শাস্তি দিতে হবে। সেটি হতে হবে এমন যন্ত্রণার একটি শাস্তি যেটা তোমাদের শরীরের প্রত্যেকটা কোষ, তোমাদের মস্তিষ্কের প্রত্যেক নিউরন সেল, তার প্রত্যেকটা সিনান্স কানেকশান যেন মনে রাখে। যন্ত্রণাটা শুধু তোমাদের দিলে তো হবে না সেটা সবাইকে দেখাতেও হবে। বিশাল একটা স্টেডিয়ামের মাঝখানে তোমাদের শাস্তিটা দেব, কয়েক লাখ মানুষ স্টেডিয়ামে টিকেট কেটে সেটা দেখতে আসবে–এটা হচ্ছে আমার পরিকল্পনা। এই এলাকার পুরো মানুষ জানবে ক্রিভনের সাথে কেউ যদি লাগতে আসে তা কোনো মুক্তি নেই। ক্ৰিভনের চোখ দুটি জ্বলে ওঠে, সে হিসহিস করে বল, দরকার হলে তাদের আমি নরক থেকে ধরে আনব, ধরে এনে শাস্তি দেব।

ক্ৰিভন নিঃশব্দে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, তোমাদের শুধু শারীরিক যন্ত্রণার একটা শাস্তি দেব না, তোমাদের মানসিক একটা যন্ত্রণারও ব্যবস্থা করা দরকার। সে জন্যে তোমাদের এখানে এনেছি, চেয়ারে বসতে দিয়েছি, বেঁধে রেখেছি। বেঁধে না রাখলেও হতো–পালিয়ে তোমরা কোথায় যাবে? কেন এত যত্ন করে তোমাদের এখানে বসিয়েছি জান? তোমরা যেন পুরো ব্যাপারটা দেখতে পার! আমরা এক্ষুনি যে হত্যাকাণ্ড শুরু করব সেটা তোমরা নিজের চোখে দেখবে! তোমাদের নির্বুদ্ধিতার জন্যে এই মানুষগুলো একজন একজন করে মারা যাবে! তোমরা সেটা দেখবে। শরীরে আগুন নিয়ে ছোট ছোট শিশুরা চিৎকার করে ছোটাছুটি করবে তোমরা সেটা দেখবে! দেখে ভাববে এর জন্যে আমরা দায়ী! আমাদের নির্বুদ্ধিতা দায়ী। ক্ৰিভন ঘুরে তাকিয়ে বলল, বুঝেছ?

রিদি কিংবা রুহান কোনো কথা বলল না। তারা পুরো ব্যাপারটা ঠিক করে চিন্তাও করতে পারছিল না, মনে হচ্ছিল পুরো বিষয়টা বুঝি একটা দুঃস্বপ্ন, ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন।

ক্ৰিভন এসে তার নরম চেয়ারটিতে বসে পিছনে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো একজন মানুষকে বলল, স্টিমুলেশন দেবার কাজ শুরু করো।

কয়েকজন ছোটাছুটি করে একটা ছোট যন্ত্র নিয়ে আসে। ক্রানার চেয়ারের পিছনে যন্ত্রটা রেখে তারা ক্রানাকে চেপে ধরল। ক্ৰানা চিৎকার করে প্রতিবাদ করে, ভয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে থাকে। তার মাঝে একজন একটা ক্যাবল টেনে এনে একটা ধাতব কানেক্টর তার মাথার মাঝে ঢুকিয়ে দেয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে ক্ৰানা অচেতন হয়ে যায়। ক্রিভন সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথা নেড়ে বলল, সক্রেটিস খুব কাজের জিনিস, তবে ব্যবহার করা এত সোজা নয়!

কাউকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলা হয় নি তাই কেউ এই প্রশ্নের উত্তর দিল। ক্রিভন কিছুক্ষণ ক্ৰানার দিকে তাকিয়ে থেকে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, জ্ঞান ফিরিয়ে আন তাড়াতাড়ি, আমাদের হাতে বেশি সময় নেই।

কয়েকজন ক্রানাকে ঘিরে দাঁড়ায়, তার মুখে পানির ঝাঁপটা দেয়, শরীরে ধাক্কা দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্রানা চোখ খুলে তাকায়। ফিসফিস করে বলে, আমি কোথায়?

ক্রিভন এগিয়ে গিয়ে বলল, তুমি ঠিক জায়গাতেই আছ। এখন সুস্থ বোধ করছ তো?

ক্ৰানা একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সত্যি কথা বলতে কী আমার কোনো বোধ নেই। আমাকে কী জন্যে ডেকেছ বল।

একটু আগেই জানা কথা বলছিল পুরোপুরি অপ্রকৃতস্থ একজন মানুষের মতো মস্তিষ্কে স্টিমুলেশন দেবার সাথে সাথে সে কথা বলছে পুরোপুরি স্বাভাবিক মানুষের মতো!

ক্রিভন ক্রানার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, প্রথমে তোমাকে একটা ধন্যবাদ দেয়া দরকার। রিদি আর রুহান নামের দুই নির্বোধকে ধরে আনার জন্যে যে পরিকল্পনাটা তুমি করে দিয়েছিলে, সেটা চমৎকারভাবে কাজ করেছে।

শুনে খুব সুখি হলাম।

বুকের মাঝে হাইব্রিড বিস্ফোরক বেঁধে কাকে পাঠিয়েছিলাম তুমি কী জান?

না, আমি জানি না। আমামর জানার কথা নয়।

আমরা তোমাকে পাঠিয়েছিলাম।

ক্ৰানা ফিসফিস করে বলল, আমি বলে কেউ নেই। আমি ক্ৰানা নামে এই মেয়েটির মস্তিষ্কের একটা অবস্থা। আমার নিজের কোনো অস্তিত্ব নেই। তোমরা ক্ৰানাকে পাঠিয়েছিলে, আমাকে নয়।

একই কথা।

ক্রানা জোর দিয়ে বলল, না এক কথা নয়।

যাই হোক আমি সেটা নিয়ে এখন তোমার সাথে তর্ক করতে চাই না। আমার এখন তোমার সাহায্যের প্রয়োজন।

ক্ৰানা বলল, বলো, আমাকে কী করতে হবে।

সামনের এই গ্রামটি দেখছ? হ্যাঁ, দেখছি।

আমি এই গ্রামের প্রত্যেকটা জীবিত প্রাণীকে হত্যা করতে চাই।

ক্রানার কণ্ঠস্বর এক মুহূর্তের জন্যে থমকে যায়, এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বলল, কেন?

আমি এই গ্রামের মানুষকে একটা শাস্তি দিতে চাই। সেই শাস্তির খবরটি সব জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে আমার ক্ষমতাটি সম্পর্কে সবাইকে ধারণা দিতে চাই।

ক্রানা বলল, প্রাণী হত্যা করার জন্যে সবচেয়ে কার্যকরী বিষ নিশুনিয়া এখান থেকে দুটি নিশুনিয়া বোমা একটা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে গ্রামের মাঝামাঝি ছুড়ে দাও, ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে সবাই মারা যাবে। যন্ত্রণাহীন চমৎকার একটি মৃত্যু!

না, না, না— ক্ৰিভন মাথা নেড়ে বলল, আমি যন্ত্রণাহীন মৃত্যু চাই না। আমি ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করতে চাই। যন্ত্রণার প্রত্যেকটা মুহূর্ত ভিডিওতে ধরে রাখতে চাই। সেটা প্রচার করতে চাই।

তাহলে তোমার জন্যে সবচেয়ে উপযোগী বোমা হবে ক্রাটুশকা বোমা। প্রতি এক বর্গ কিলোমিটারের জন্যে এবটা বোমাই যথেষ্ঠ। এই বোমা থেকে যে গ্যাস বের হয় সেটা বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে প্রত্যেকটা প্রাণীর শরীরের প্রতি সেন্টিমিটার পুড়িয়ে দেবে। দেখতে দেখতে ফোঁসকা পড়ে দগদগে ঘা হয়ে যাবে। চোখের কর্ণিয়া পুড়ে অন্ধ হয়ে যাবে, প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। চিৎকার করতে থাকবে। নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে এই গ্যাস যাবার পর ফুসফুস ঝাঝরা হয়ে যাবে, নিঃশ্বাসের সাথে সাথে ফুসফুসের টুকরোগুলো বের হয়ে আসবে। বলা যেতে পারে তিন থেকে চার ঘণ্টার ভেতরে প্রত্যেকটা প্রাণী নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাবে। কম সময়ের ভেতরে সবাইকে হত্যা করার জন্যে এটাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। যদি আরও বেশি সময় নিয়ে কাজটা করতে চাও।

ক্রিভন বাধা দিয়ে বলল, না, আমার হাতে বেশি সময় নেই। আমি সময় নিয়ে করতে পারব না।

ক্ৰানা অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, তাহলে তোমার জন্যে কাটুশকা বোমাটিই ভালো। এর দুটি গ্রেড আছে তুমি দ্বিতীয় গ্রেডটি গ্রহণ কর। তোমার সংরক্ষণে সেটা আছে। এর ওজন তেইশ কেজি। এটা নিক্ষেপ করার জন্যে তোমার একটা ক্ষেপণাস্ত্র দরকার। জেনারেশন থ্রী, মাকাও মডেলটি ভালো। নিক্ষেপ করার সময় মাটির সাথে তিরিশ ডিগ্রী কোণ করতে হবে।

চমৎকার! ক্ৰিভন মাথা ঘুরিয়ে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে লক্ষ্য করে বলল, তোমরা ব্যবস্থা কর।

মানুষগুলো সাথে সাথে জেনারেশনে থ্রী মাকাও মডেল আর দ্বিতীয় গ্রেডের ক্রাটুশকা বোমা আনতে চলে গেল। ক্ৰানা চোখের কোণা দিয়ে তাদেরকে চলে যেতে দেখল, তারপর চেয়ারে মাথা হেলান দিয়ে বলল, অসম্ভব যন্ত্রণা দিয়ে কীভাবে পুরো গ্রামের সবাইকে হত্যা করতে হবে আমি সেটা বলে দিয়েছি। আমি কী এখন বিদায় নিতে পারি? তোমরা নিশ্চয়ই জান আমার মস্তিষ্ককে এখন বাড়তি ক্ষমতায় কাজ করতে হচ্ছে, সেটি কষ্ট। অনেক কষ্ট।

ক্ৰিভন শব্দ করে হেসে বলল, তোমাকে আমাদের অনেক ইউনিট দিয়ে কিনতে হয়েছে। সে জন্যে একটু কষ্ট তোমাকে করতেই হবে। পুরো ঘটনাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার সাহায্য দরকার। তার কারণ—

কী কারণ?

আমার পুরো সেনা বাহিনী আসছে। সবাইকে হত্যা করার পর আমার পুরো সেনাবাহিনীকে এখানে পাঠাব, অনেক অস্ত্র আছে সেগুলো উদ্ধার করতে হবে। তা ছাড়া

তা ছাড়া কী?

রিদি আর রুহানকে ধরে আনা হয়েছে। তাদেরকে শাস্তি দেয়ার একটি ব্যাপার আছে। সেটা নিয়েও তোমার সাথে কথা বলতে হবে।

ঠিক আছে। কিন্তু তাড়াতাড়ি কর। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। অসম্ভব কষ্ট। আমার মস্তিষ্কে যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে একজন মানুষের মস্তিষ্ক কখনো সেভাবে ব্যবহার করা হয় না। কখনো সেভাবে ব্যবহার করার কথা না।

ক্ৰিভন আবার হেসে বলল, তোমাকে আমি অনেকগুলো ইউনিট দিয়ে কিনেছি। তুমি একটু কষ্ট সহ্য কর।

রিদি আর রুহান নিঃশব্দে বসে আছে। কাছাকাছি কোনো একটা কনটেনার থেকে জেনারেশান থ্রী মাকাও মডেল, দ্বিতীয় গ্রেডের ক্রাটুশকা বোমা এবং আরও কিছু যন্ত্রপাতি আনা হতে থাকল। মানুষজন ব্যস্ত হয়ে সেগুলো সাজিয়ে রাখতে থাকে। রিদি আর রুহান নিঃশব্দে বসে দূরে ক্রিটিনার গ্রামটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

রুহান অনেকক্ষণ থেকেই গ্রামটির দিকে কী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেখানে একটা কিছু ঘটার জন্যে সে অপেক্ষা করছে। ঘুমানোর আগে কয়লা দিয়ে সে তার ঘরের দেয়ালে একটা নির্দেশ লিখে রেখেছিল, ক্রিটিনা কী সেই নির্দেশটা পড়তে পেরেছিল? পড়ার পর সেটাকে কী সে গুরুত্ব দিয়েছিল?

উত্তর থেকে একটা শীতল বাতাস বয়ে আসে। রুহান নিজের ভেতরে একটা কাঁপুনী অনুভব করে এবং ঠিক তখন তার মনে হলো গ্রামের ভেতর এক সাথে অনেকগুলো আলো জ্বলে উঠল। ভালো করে তাকালে বোঝা যায় সেগুলো। মশালের আগুন। রুহান নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে আর দেখতে পায় আলোগুলো গ্রামের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে। সারা গ্রামের ভেতর নতুন নতুন মশাল জ্বলে ওঠে আর সেগুলো গ্রামের একমাথা থেকে অন্য মাথায় সরে যেতে শুরু করেছে। দেখতে দেখতে সেগুলো সারিবদ্ধ হয়ে যায় এবং পুরো গ্রামটি জুড়ে মশালের আলো দিয়ে বিশাল একটা ক্রস আঁকা হয়ে যায়।

রুহানের সাথে সাথে অন্য সবাই গ্রামের দিকে তাকাল। ক্রিভন একটু অবাক হয়ে বলল, কী করছে গ্রামের মানুষেরা?

কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না, শুধু ক্ৰানা হঠাৎ করে সোজা হয়ে বসে চোখ বড় বড় করে ক্রসটির দিকে তাকিয়ে রইল। রুহান আড়চোখে তাকিয়ে দেখল হঠাৎ করে ক্রানার সারা মুখে আনন্দের একটা আভা ছড়িয়ে পড়ছে।

ক্রিভন এগিয়ে এসে বলল, তুমি কী বলতে পারবে এটা কী?

হ্যাঁ। ক্ৰানা মাথা নাড়ল, বলতে পারব।

এটা কী?

এটা একটা ক্রস।

ক্রিভন অধৈর্য হয়ে বলল, সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কেন ক্রস?

গ্রামের মানুষ একটা তথ্য পাঠানোর চেষ্টা করছে। খুব জরুরি একটা তথ্য।

সেটা কী তথ্য? কাকে পাঠাচ্ছে।

ক্রানা মাথা নেড়ে বলল, আমি বোঝার চেষ্টা করছি। বোঝা মাত্রই তোমাকে জানাব। আমার মনে হয় কিছুক্ষণের মাঝেই এটা আমি বুঝে যাব।

ঠিক আছে আমরা ততক্ষণে বাকি কাজ সেরে ফেলি। মানুষগুলো কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করে কাটুশকা বোমাটি ভেতরে প্রবেশ করায়। তারপর পিছনে সরে দাঁড়ায়। ক্ৰিভন জিজ্ঞেস করে, সবাই প্রস্তুত।

মানুষগুলো মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। প্রস্তুত।

ক্রিভন সুইচ টেপার জন্যে একটু এগিয়ে যেতেই ক্রানা বলল, একটু দাঁড়াও।

কেন?

তুমি কী বলেছ তোমার সেনাবাহিনী এই এলাকায় আসছে?

হ্যাঁ।

তাদের কী আসতেই হবে?

হ্যাঁ।

তাহলে আগে তাদের একটা খবর পাঠাও।

ক্ৰিভন বলল, কী খবর পাঠাব?

তাদের অস্ত্রের সিকিউরিটি মডিউলে একটা সংখ্যা প্রবেশ করাতে হবে। তাতে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতির জন্যে এলার্মটি কার্যকর হবে। তাদের নিরাপত্তার জন্যে এটা খুব জরুরি।

ক্ৰিভন অবাক হয়ে বলল, আমি কখনো শুনি নি, অস্ত্রের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের এলার্ম আছে।

ক্রানা হাসির মতো একটা শব্দ করে বলল, তোমরা যদি সবকিছু জানতে তাহলে নিশ্চয়ই অনেক ইউনিট খরচ করে আমাকে কিনে আনতে না।

ক্রিভন মাথা নাড়ল। সেটা সত্যি। ঠিক আছে তুমি কোডটি বল, আমি আমার সেনাবাহিনীর কাছে কোডটা পাঠিয়ে দিই।

ক্ৰানা একটা জটিল কোড উচ্চারণ করে অস্ত্রধারী একজন মানুষ ক্রিস্টাল রিডারে সেটা তুলে নিয়ে সেনাবাহিনীর কাছে পাঠানোর জন্যে চলে যায়।

ক্রিভন বলল, আমরা কী আমাদের অস্ত্রেও কোডটা ঢোকাব?

ক্ৰানা বলল, ঢোকাতে পার। তোমাদেরও একটা নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে।

অস্ত্রের ভেতর কোডটা ঢুকিয়ে ক্রিভন আবার তার ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে ফিরে এলো, ক্ষেপণাস্ত্রের সুইচ স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহূর্তে ক্ৰানা বলল, দাঁড়াও।

কী হলো।

বাতাসের দিক পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। বিষাক্ত গ্যাস এদিকে আসতে পারে, তোমাদের একটু নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার।

সেটি কীভাবে করব?

সবাই একটা প্রতিষেধক ক্যাপসুল তোমাদের জিভের নিচে রেখে দাও।

প্ৰতিষেধক ক্যাপসুল কোনটি?

তোমাদের চিকিৎসক নিশ্চয়ই জানে। তাকে জিজ্ঞেস কর।

ক্ৰিভন একটু অধৈর্য হয়ে বলল, আমরা সাথে কোনো চিকিৎসক আনি নি। তুমি কী জান না?

জানি। অবশ্যই জানি। কিন্তু আমি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ নই। আমি যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ। ক্ৰানা শান্ত গলায় বলল, আমি চিকিৎসা সংক্রান্ত উপদেশ দিতে চাই না। কারণ তুমি আমাকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কিনে আননি। যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কিনেছ।

ক্রিভন অধৈর্য হয়ে হাত ছুড়ে বলল, তুমি সময় নষ্ট করো না। বলে দাও কোনটি প্রতিষেধক ক্যাপসুল।

ক্ৰানা প্রতিষেধক ক্যাপসুলের নামটি বলে দিতেই একজন সেগুলো আনতে ছুটে চলে গেল। ক্রানা বলল, যতক্ষণ সেগুলো আনা না হচ্ছে তোমরা ততক্ষণ অন্য একটা কাজ করতে পার।

কী কাজ?

বাতাসের দিক পরিবর্তন করছে, আমি বুঝতে পারছি, উত্তর দিক থেকে শুষ্ক বাতাস আসছে। শুকনো বাতাস ক্রাটুশকা অক্সিডাইজড হতে দেরি হয়।

তার মানে কী?

তার মানে কাটুশকা বোমার কার্যকারিতা শতকরা ত্রিশ ভাগ পর্যন্ত কম হয়ে যেত পারে।

কিভন একটু বিরক্ত হয়ে বলল, শেষ মুহূর্তে এটা বলছ কেন?

ক্ৰানা শান্ত গলায় বলল, আমি এটা শেষ মুহূর্তে বলছি কারণ আমি এটা শেষ মুহূর্তে জানতে পেরেছি। কিন্তু সেটি নিয়ে তোমার ব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

ক্ৰিভন, আমি শতকরা ত্রিশ ভাগ অকার্যকর একটি বোমা কেন পাঠাব?

ক্রানা বলল, এগুলো রাসায়নিক বোমা। কেউ শতকরা একশ ভাগ কার্যকারিতা গ্যারান্টি দেয় না। তবে যেহেতু সমস্যাটি সহজ এর সমাধানটিও সহজ।

সমাধানটি কী?

ক্ৰানা বলল, যেহেতু বাতাস শুষ্ক, জলীয় বাষ্প নেই, কাটুশকা বোমার উপাদানে একটু পানি দাও। এগুলো রাসায়নিক বোমা, শেষ মুহূর্তে এখানে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থ দেয়া যায়।

ক্ৰিভন বলল, তুমি সেটা আগে বলছ না কেন?

আমি ঠিক সময়েই বলেছি, তুমি অধৈর্য হয়ে আছ বলে তোমার কাছে মনে। হচ্ছে আমি দেরি করে বলেছি। কাটুশকা বোমাটি বের করে আনো, ডানদিকৈর স্কুটা ঢিলে করে সেখানে পাঁচশ সিসি পানি ঢেলে দাও।

ক্ৰিভন অন্য কাউকে দায়িত্বটি না দিয়ে নিজেই কাটুশকা শেলটি বের করে আনে। ডানদিকের স্কুটা খুলে সেখানে একটু পানি ঢেলে দিয়ে আবার স্কুটা লাগিয়ে দেয়। শেলটা ক্ষেপণাস্ত্রে ঢুকিয়ে কানার দিকে তাকাল, আর কিছু?

না।

আমি সুইচ টিপতে পারি?

প্রতিষেধক ক্যাপসুলটা আসুক।

কাজেই ক্ৰিভনকে আরো কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হলো। সবাই প্রতিষেধক ক্যাপসুলটা জিভের নিচে দিয়ে ক্রিভন ক্ষেপণাস্ত্রটির কাছে এগিয়ে। যায়। ডানদিকে একটা লিভারকে টেনে ধরে সে সুইচটা চেপে ধরে। সাথে সাথে ভেতরে একটা যান্ত্রিক শব্দ হয়ে এলার্ম বেজে ওঠে। ক্রিভন পিছনে সরে আসে এবং হঠাৎ করে ঝাঁকুনি দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রটি কেঁপে ওঠে এবং একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সাথে সাথে কাটুশকার শেলটি উড়ে গেল।

ক্ৰিভনের মুখে একটা বিচিত্র হাসি ফুটে ওঠে। সে রিদি আর রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, নির্বুদ্ধিতার পরিণাম কী হতে পারে, তুমি নিজের চোখে দেখ।

রুহান ফিসফিস করে বলল, পৃথিবীর ইতিহাসে এর আগেও অনেকবার অনেক নৃশংসতা হয়েছে। কিন্তু কোনো নৃশংস মানুষ কিন্তু কখনো বেঁচে থাকে নি। তুমিও বেঁচে থাকবে না ক্ৰিভন।

ক্রিভন শব্দ করে হেসে বলল, তুমি নিজের চোখে দেখ কে বেঁচে আছে, আর কে বেঁচে নেই!

দূর গ্রাম থেকে একটা কোলাহলের মত শব্দ ভেসে আসে, ক্রিভন সেদিকে উৎসুকভাবে তাকিয়ে ক্রানাকে জিজ্ঞেস করল, শেলটি কী ফেটেছে।

ক্রানা মাথা নেড়ে বলল, নিশ্চয়ই ফেটেছে।

বিষক্রিয়া শুরু হয়েছে?

ক্রানা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, ক্ৰিভন, তুমি একটু আগে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আলোর মশাল দিয়ে গ্রামে একটা ক্রস তৈরি করার অর্থ কী?

হ্যাঁ। সেটা কী তুমি বুঝতে পেরেছ?

পেরেছি।

ক্রিভন ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল, সেটা কী?

মানুষ যখন কাউকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে, তখন হাত দুটো অনেক সময় একটার উপর আরেকটা চলে আসে, নিজের অজান্তে দুটি হাত দিয়ে তৈরি হয় একটা ক্রস।

ক্ৰিভন বলল, তুমি কি বলছ বুঝতে পারছি না।

আমি বলছি, এই ক্রসের অর্থ ভালোবাসা।

ভালোবাসা?

হ্যাঁ, ভালোবাসা।

ক্ৰিভন কুদ্ধ গলায় বলল, কার জন্যে ভালোবাসা? কীসের ভালোবাসা?

মানুষের জন্যে মানুষের ভালোবাসা।

কিন্তু সেটা বলার অর্থ কী?

তারা আমাকে মনে করিয়ে দিল, মানুষের জন্যে থাকতে হয়। ভালোবাসা।

ক্রিভন কাঠ কাঠ গলায় হেসে উঠে বলল, এটা চমৎকার একটা রসিকতা হলো, তারা বলছে ভালোবাসা আর তুমি ক্রাটুশকার শেল দিয়ে সেই ভালোবাসার জবাব দিলে! তোমার ভালোবাসায় সবার চামড়ায় ফোঁসকা পড়ে দগদগে ঘা হবে, ফুসফুস টুকরো টুকরো হয়ে বের হয়ে আসবে নিঃশ্বাসের সাথে!

ক্ৰানা মাথা নেড়ে বলল, না, ক্ৰিভন! তুমি বুঝতে পারছ না। কেউ যখন ভালোবাসার কথা বলে তখন তাকে হত্যা করা যায় না।

ক্রিভন চমকে উঠে বলল, তুমি কী বললে?

আমি বলেছি, মানুষ যখন মানুষের কাছে ভালোবাসার কথা বলে তখন তাকে হত্যা করা যায় না!

কিন্তু কিন্তু–

ক্ৰানা হেসে বলল, মনে নেই তুমি কাটুশকার শেলে স্কু খুলে পানি ঢুকিয়েছ?

হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে?

পুরো রাসায়নিক উপাদানগুলো তখন নষ্ট হয়ে গেছে। আমি তোমাকে মিথ্যে কথা বলেছি ক্রিভন।

ক্ৰিভন চিৎকার করে বলল, তুমি আমার সাথে মিথ্যা কথা বলতে পার না। এটা অসম্ভব। তুমি মানুষ নও তুমি মস্তিষ্কের একটা বিচ্যুতি–

তুমি ঠিকই বলেছ। আমার মিথ্যা বলার কথা নয়, শুধু একটি ব্যতিক্রম আছে। যদি কোথাও আমি একটি ক্রস দেখতে পাই, আমার সমস্ত যুক্তি তর্ক ওলটপালট হয়ে যায়! আমার ভেতরে ভালোবাসার বান ডেকে যায়-–

না! ক্ৰিভন চিৎকার করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে হুঁমড়ি খেয়ে পড়ে যায়, অবাক হয়ে একবার ক্রানার দিকে আরেকবার রিদি আর রুহানের দিকে তাকায়। ক্রানা হাসি মুখে বলল, তুমি ছোটাছুটি করো না, তোমার জিভের নিচে যে ক্যাপসুলটা দিয়েছ সেটা কোনো প্রতিষেধক নয়, সেটা ঘুমের ওষুধ! তুমি ঘুমিয়ে পড়ছ ক্ৰিভন। শুধু তুমি নও, তোমরা সবাই।

না। ক্ৰিভন গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে বলল, এটা হতে পারে না।

পারে। আমি যদি একটা মিথ্যা বলতে পারি তাহলে দশটা মিথ্যা বলতে পারি। আমি অবশ্যি দশটা মিথ্যা বলি নি। মাত্র তিনটা মিথ্যা বলেছি! তিন নম্বর মিথ্যাটা কী জান?

ক্রিভন কোনো কথা না বলে স্থির চোখে কানার দিকে তাকাল। ক্রানা খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, তোমাদের অস্ত্রগুলোর ভেতরে একটা কোড ঢুকিয়েছ মনে আছে? কোডগুলো অস্ত্রটাকে অকেজো করে দেয়। তোমার পুরো সেনাবাহিনীর কারো কাছে এখন কোনো অস্ত্র নেই! একটিও নেই!

ক্রিভন হাঁটু গেড়ে কয়েক পা এগিয়ে এসে কোমর থেকে হঠাৎ একটা ছোট রিভলবার বের করে হিংস্র গলায় বলল, আছে! একটা অস্ত্র এখনো আছে। এই অস্ত্রের কোনো কোড নেই। সেটা দিয়েই আমি তোমাদের শেষ করব।

ক্ৰিভন অস্ত্রটা প্রথমে রুহানের দিকে তাক করল। ট্রিগার টানার সাথে সাথে প্রচণ্ড একটা শব্দে কানে তালা লাগা গেল, শেষ মুহূর্তে রিদি তারই চেয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, নিজের শরীর দিয়ে রক্ষা করেছে রুহানকে।

রুহান বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। ক্রিভনের দেহের উপর রিদি উপুড় হয়ে পড়ে আছে। জোছনার নরম আলোতে দৃশ্যটিকে মনে হয় অতিপ্রাকৃতিক। যে ক্ষীণ কালচে তরলটি গড়িয়ে আসছে, সেটি রক্তের ধারা। জোছনার আলোতে সেটিকে লাল দেখাচ্ছে না, সেটাকে দেখাচ্ছে কালো!

রুহান তবুও জানে এটা রক্ত। রিদির রক্ত।

রুহানের পাশে পাশে হাঁটছে ক্রিটিনা। নদীর তীরে একটা বড় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রুহান বলল, তুমি এখন যাও।

ক্রিটিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তোমাকে একা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না রুহান।।

রুহান শব্দ করে হেসে বলল, পৃথিবীটা এর মধ্যে অন্যরকম হয়ে গেছে ক্রিটিনা। মানুষের এখন অন্য মানুষকে দেখে ভয় পেতে হয় না। তারা একা বের হতে পারে, তাদের অস্ত্র নিয়ে বের হতে হয় না।

সব তোমার জন্যে।

না। আমার জন্যে নয়–আমাদের জন্যে। রুহান গলার স্বর পাল্টে বলল, তোমার কী মনে হয় ক্রিটিনা রিদি ভালো হয়ে উঠবে না?

উঠবে। একটু সময় লাগবে, কিন্তু ভালো হয়ে যাবে।

আর ক্রানা?

ক্রানা খুব হাসিখুশি আছে। একেবারে শিশুর মতোন। কিহি চলে আসার পর কী খুশি হয়েছে তুমি দেখেছ?

দেখেছি। ক্রানার মতো সবাই কিহিকে খুব ভালোবাসে। রুহান বলল, তুমি জান কিহি আমাকে পড়তে শিখিয়েছিল।

ক্রিটিনা বলল, আর তুমি শিখিয়েছ আমাকে।

আমি যদি না শেখাতাম তাহলে কী সর্বনাশ হতো চিন্তা করেছ?

ক্রিটিনা হেসে বলল, খুব ভালো করে শেখাও নি। দেয়ালে তোমার লেখাটা পড়তে আমার অনেকক্ষণ লেগেছিল।

তাতে কিছু আসে যায় না। সেটা পড়েছ, পড়ে যেটা করার কথা সেটা করেছ সেটাই বড় কথা! এখন সবাইকে পড়তে শিখিয়ে দাও, কিহি তোমাকে সাহায্য করতে পারবে। ক্রিস্টাল রিডারের উপর আর ভরসা করে থাকার দরকার নেই।

রুহান হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, ক্রিটিনা, তুমি এখন যাও।

ক্রিটিনা মাথা নেড়ে বলল, তোমাকে ছাড়তে মন চাইছে না রুহান।

রুহান ক্রিটিনার মুখের দিকে তাকাল, তার চোখের কোণায় পানি চিক চিক করছে। রুহান ক্রিটিনার মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, আমারও তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না ক্রিটিনা। কিন্তু আমাকে যেতে হবে। কতদিন আমার মাকে দেখিনি। আমার ছোট দুটি বোন আছে, নুবা আর ত্রিনা তাদেরকেও দেখিনি। তারা কোথায় আছে, কেমন আছে আমি জানি না–

তুমি তাহলে কথা দাও আবার তুমি ফিরে আসবে।

আমি আবার আসব ক্রিটিনা।

আমার কাছে আসবে?

তোমার কাছে আসব।

আমি প্রতিদিন বিকেলে এখানে এসে এই পথের দিকে তাকিয়ে থাকব।

রুহান হেসে বলল, পাগলী মেয়ে! প্রতিদিন কেন অপেক্ষা করবে।

আমি করব। বলে ক্রিটিনা ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল।

রুহান যখন তার বাসায় পৌঁচেছে তখন গভীর রাত। দরজায় শব্দ শুনে মা জিজ্ঞেস করলেন, কে এসেছে?

আমি মা। আমি রুহান।

মা দরজা খুলে অবাক হয়ে রুহানের দিকে তাকালেন। ফিসফিস কতে বললেন, তুই এসেছিস?

হ্যাঁ মা। আমি এসেছি। মা বললেন, আয় বাবা একটু কাছে আয়।

রুহান এগিয়ে গেল, মা দুই হাতে তাকে শক্ত করে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন, আমি সৃষ্টিকর্তার হাতে তোকে সপে দিয়েছিলাম। সৃষ্টিকর্তা আবার তোকে আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে।

মা ছেড়ে দেবার পর রুহান জিজ্ঞেস করল, নুবা ত্রিনা কেমন আছে মা?

ভালো আছে।

কোথায় তারা?

ঘুমাচ্ছিল। এখন নিশ্চয়ই উঠেছে।

ঘুম ভাঙ্গা চোখে ততক্ষণে নুবা আর ত্রিনা উঠে এসেছে। অবাক হয়ে তার। তাদের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

রুহান হাত বাড়িয়ে বলল, কাছে আস।

দুজনে দ্বিধান্বিত ভাবে এগিয়ে এসে তাদের ভাইকে স্পর্শ করে। নুবা ফিসফিস করে বলে, তুমি আর চলে যাবে না তো?

রুহান হেসে বলল, ধুর বোকা। আমি কী চলে গিয়েছিলাম? আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল!

তোমাকে আবার কেউ ধরে নিয়ে যাবে না তো?

না। নেবে না।

ত্রিনা নুবার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, মনে নাই নুবা, সবাই বলেছে পৃথিবী আবার আগের মতো হবে। ভালো আর সুন্দর?

হ্যাঁ। ত্রিনা দুই চোখ বড় বড় করে বলল, দুইজন মানুষ এসেছে স্বর্গ থেকে, তারা সারা পৃথিবীটাকে সুন্দর করে দিচ্ছে!

নুবা চোখ বড় বড় করে রুহানের দিকে তাকাল, সেই মানুষ দুইজন নাকি অপূর্ব সুন্দর! তাদের চেহারা নাকী দেবদূতের মতোন। তাদের হাতের অস্ত্র দিয়ে তারা চোখ বন্ধ করে পৃথিবীর সব দুষ্টু মানুষকে শেষ করে দিতে পারে।

ত্রিনা বলল, তাদের মাথায় অনেক বুদ্ধি। তাদের বুকে নাকী সিংহের মতো সাহস।

নুবা বলল, পৃথিবীর সব মানুষ নাকী তাদের ভালোবাসে।

ত্রিনা বলল, আমরাও তাদেরকে ভালোবাসি। আমি আর নুবা প্রতি রাতে তাদের জন্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি।

নুবা ছেলেমানুষের মতো বলল, আর তুমি জান। সেই দুজনের একজনের নাম রুহান রুহান! ঠিক তোমার মতোন। কী আশ্চর্য, তাই না?

রুহান ছোট দুটি বোনকে কাছে টেনে এনে ফিসফিস করে বলল, হ্যাঁ খুব আশ্চর্য।

মা একদৃষ্টে তার সন্তানের দিকে তাকিয়েছিলেন হঠাৎ কাঁপা গলায় বললেন, রুহান।

কী মা?

তুই–তুই সেই রুহান। তাই না?

রুহান এক মুহূর্তের জন্যে চিন্তা করল, তারপর বলল, হ্যাঁ মা। আমি সেই রুহান রুহান।

(সমাপ্ত)