প্রথম পর্ব

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে

#সুহানের_স্বপ্ন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল





দ্রুমান ইঞ্জিন

রিশি মনিটরে একটা গ্রহকে স্পষ্ট করতে করতে বলল, আমি আমার জীবনে যতগুলো গ্রহ দেখেছি তার মাঝে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে এই গ্রহটা।

টিরিনা তার অবাধ্য চুলগুলোকে পিছনে সরিয়ে বলল, কেন? তুমি হঠাৎ এই গ্রহটার বিপক্ষে প্রচার শুরু করছ কেন? একটা গ্রহ হচ্ছে গ্রহ-তার মাঝে আবার ভালো খারাপ আছে নাকি?

থাকবে না কেন? একশবার থাকবে।

টিরিনা মুখ টিপে হেসে বলল, কী রকম?

মনে কর যে গ্রহে খোলা আকাশ, নিশ্বাস নেবার মতো বাতাস আর পানিতে ঢাকা বিশাল বিশাল সাগর বা হ্রদ আছে সেটা হচ্ছে ভালো গ্রহ। যে গ্রহে সেগুলো নেই সেটা হচ্ছে খারাপ গ্রহ।

টিরিনা খিলখিল করে হেসে বলল, তার মানে তুমি আসলে পৃথিবীকে ধরে নিয়েছ আদর্শ গ্রহ—যে গ্রহ যত বেশি পৃথিবীর কাছাকাছি সেই গ্রহ তোমার কাছে তত ভালো।

রিশিকে এক মুহূর্তের জন্য একটু বিভ্রান্ত দেখায়, সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, সেটা কি খুব অযৌক্তিক ব্যাপার হল? এখন না হয় আমরা সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছি—কিন্তু একসময় তো আমরা সবাই পৃথিবীতেই থাকতাম। আমাদের শরীরের বিবর্তন হয়েছে পৃথিবীর পরিবেশের উপযোগী হয়ে কাজেই পৃথিবীর মতো গ্রহকে ভালো বললে তোমার এত আপত্তি কেন?

টিরিনা হাসল। বলল, মোটেও আপত্তি নেই। আমি শুধু বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছি।

রিশি টিরিনার মুখে সূক্ষ্ম হাসি আবিষ্কার করে মুখটা অকারণে কঠোর করে বলল, উহুঁ, তুমি বোঝার চেষ্টা করছ না।

তা হলে আমি কী করছি?

তুমি আমার সাথে কৌতুক করার চেষ্টা করছ।

টিরিনা আবার খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, ঠিক আছে সেটাই না হয় হল—এটাও কি খুব বড় অপরাধ? আমরা দুইজন একটা মহাকাশযানে করে প্রায় আস্ত একটা গ্যালাক্সি পার হয়ে যাচ্ছি। বেশিরভাগ সময় কাটে আমাদের হিমঘরে। লিকুইড হিলিয়াম তাপমাত্রায় জমে পাথর হয়ে থাকি। দশ-বারো বছরে এক-আধবার আমাদের জাগিয়ে তোলা হয়। কিছুদিন আমরা জেগে থাকি তখন তোমার সাথে আমি কৌতুকও করতে পার না?

রিশি বলল, না সেটা আমি বলি নি। কৌতুক করতে পারবে না কেন, অবশ্যই পারবে। মানুষের যদি কৌতুকবোধ না থাকত তা হলে তারা মনে হয় এখনো বিবর্তনের উল্টো রাস্তায় গিয়ে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত।

টিরিনা চোখ বড় বড় করে রিশির দিকে তাকিয়ে বলল, তা হলে তোমার ধারণা বিবর্তনে আমরা ঠিক দিকেই এগুচ্ছি?

রিশি বলল, কেন? তোমার কি সন্দেহ আছে নাকি?

কী জানি? টিরিনা কাধ কঁকিয়ে বলল, এই আমাদের ছোটাছুটি দেখে মনে হয় বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালেই বুঝি ভালো ছিল। তুমি দেখেছ আমরা এখন এক মুহূর্ত বিশ্রাম নিই না। দিশ-বারো বছরে একবার আমাদের হিমঘর থেকে বের করে, আমরা তখন ছোটাছুটি করতে থাকি। ইঞ্জিন পরীক্ষা করি, জ্বালানি পরীক্ষা করি, ট্রাজেক্টরি পরীক্ষা করি, মনিটরের আসনে বসে থাকি—তোমার কি ধারণা এটা খুব চমৎকার একটা জীবন?

রিশি একটু অবাক হয়ে বলল, তোমার কী হয়েছে টিরিনা? আমি ভেবেছিলাম তুমি খুব আগ্রহ নিয়ে এই স্পেসশিপে এসেছিলে! হঠাৎ করে খেপে গেলে কেন?

টিরিনা হাসল। বলল, না খেপি নি। এগুলোও বিবর্তনের ফল, মেয়েদের শরীরে অন্যরকম হরমোন থাকে—তোমরা ছেলেরা সেটা বুঝবে না। ছেলেরা এসব বিষয়ে একটু ভোতা হয়

এবারে রিশি হা হা করে হেসে উঠল, বলল, তোমার কপাল ভালো মহাকাশযানে শুধু আমি আর তুমি! অন্য কেউ হলে পুরুষ জাতির বিরুদ্ধে অশোভন উক্তি করার জন্য তোমার বিরুদ্ধে নালিশ করে দিত, পঞ্চম মাত্রার অপরাধ হিসেবে তোমার এতক্ষণে বিচার হয়ে যেত।

ভারি তোমার বিচার—তোমার এই বিচারকে আমি ভয় পাই নাকি? বড়জোর এক বেলা কফি খেতে দেবে না।

শাস্তি হচ্ছে শাস্তি। কী পরিমাণ শাস্তি পেয়েছ সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। শাস্তি পেয়েছ কি না সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

মহাকাশযানের এই লম্বা যাত্রাগুলোতে যারা কোনো শাস্তি পায় না, উল্টো তাঁদেরই শাস্তি হওয়া দরকার বুঝতে হবে তাদের ভেতরে কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা নেই। আনন্দ স্ফূর্তি নেই।

ভালোই বলেছ। বলে হাসতে হাসতে রিশি আবার মনিটরের দিকে তাকাল এবং তার মুখের হাসি মিলিয়ে সেখানে এবারে একটা বিতৃষ্ণার ভাব ফুটে ওঠে। সে মাথা নেড়ে বলল, ছি! এটা একটা গ্রহ হল নাকি?

টিরিনা একটু এগিয়ে যায় গ্রহটা দেখার জন্য, মনিটরে কদাকার গ্রহটিকে একনজর দেখে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ, এটা ভালো গ্রহ না। বিচ্ছিরি একটা গ্রহ।

এর মাঝে বাতাস আছে কিন্তু সেই বাতাস হালকাভাবে বিষাক্ত। এই গ্রহ শীতল নয় কিন্তু তাপমাত্রা এমন যে তুমি কখনোই অভ্যস্ত হবে না। আলো আছে কিন্তু ঠিক ভুল তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের, সবকিছুকে দেখাবে লালচে পচা ঘায়ের মতো।

টিরিনা গ্রহটাকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখতে দেখতে বলল, গ্রহটার কোনো নাম আছে নাকি?

না। এই পচা গ্রহকে কেউ নাম দিয়ে সময় নষ্ট করবে ভেবেছ? এর কোনো নাম নেই—এটার কপালে জুটেছে শুধু একটা সংখ্যা, সাত সাত তিন দুই নয়।

টিরিনা তথ্যকেন্দ্রের মডিউলটি টেনে নামাতে নামাতে বলল, দেখি আমাদের তথ্যকেন্দ্রে এর সম্পর্কে কোনো তথ্য আছে নাকি।

মডিউলের সাথে যোগাযোগ করার এক মুহূর্ত পরেই টিরিনা চিৎকার করে বলল, কী আশ্চর্য!

রিশি এগিয়ে আসে, কী হয়েছে?

টিরিনা উত্তেজিত গলায় বলল, তুমি এটা বিশ্বাস করবে না, কিছুতেই বিশ্বাস করবে।

কী বিশ্বাস করব না?

তোমার এই ভয়ংকর পচা গ্ৰহটাতে কোনো একজন মানুষ আটকা পড়ে আছে। সে বিপদ সংকেত পাঠাচ্ছে!

রিশি চোখ কপালে তুলে বলল, কী বলছ তুমি?

আমি ঠিকই বলছি, এই দেখ। টিরিনা তথ্যকেন্দ্রের মডিউলটি রিশির সামনে খুলে দিল। সত্যি সত্যি সেখানে দেখা যাচ্ছে এই গ্রহটি থেকে কোনো একজন মানুষ চতুর্থ মাত্রার একটা বিপদ সংকেত পাঠাচ্ছে। বিপদ সংকেতটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি থেকে আসছে না। তার মাঝে বিপদ সংকেতের বিভিন্ন পর্যায়ের কোড রয়েছে, সেটি নিখুঁতভাবে নিরাপত্তাসূচক সংকেত ব্যবহার করছে। বিপদ সংকেতটি খুব দুর্বল। যে পাঠাচ্ছে সে তার শক্তিটুকু অপচয় করছে না, যে পরিমাণ সংকেত না পাঠালেই নয় তার বেশি কিছু পাঠাচ্ছে না।

রিশি আর টিরিনা বিপদ সংকেতটি বিশ্লেষণ করল, যে এখালে আটকা পড়ে আছে তার ভয়াবহ সংকট। খাবার এবং পানীয় শেষ হয়ে গেছে, কোনোরকম জ্বালানি নেই, সঞ্চিত শক্তিও শেষ হয়ে যাচ্ছে। টিরিনা কিছুক্ষণ তথ্যকেন্দ্রের মডিউলটির দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বলল, একটা জিনিসের হিসাব মিলছে না।

কী জিনিস?

এই গ্রহে কোনো মানুষের বেঁচে থাকার কথা নয়।

পরিষ্কার সিগন্যাল পাঠাচ্ছে—

সিগন্যাল পাঠানোর কথা নয়।

কেন?

এই গ্রহ থেকে প্রাকৃতিকভাবে কোনো শক্তি আসবে না যতখানি শক্তি নিয়ে শুরু করবে সেটাই সম্বল।

হ্যাঁ। রিশি মাথা নাড়ল, বলল, প্রায় কুড়ি বছর আগে প্রথম দলটা গিয়েছে। তাদের সাথে যে সাপ্লাই ছিল সেটা খুব বেশি হলে চার বছরের। চার বছরের আগেই ঠিক করা হল গ্রহটা ছেড়ে চলে আসা হবে–।

টিরিনা উত্তেজিত গলায় বলল, এই এখানেই হিসেব মিলছে না—যতবার তাদেরকে উদ্ধার করতে পাঠানো হয়েছে ততবারই অভিযাত্রী দল রয়ে গিয়েছে—ফিরে আসে নি। কিন্তু যে পরিমাণ রসদ জাছে সেটা দিয়ে কিছুতেই তাদের চলার কথা নয়।

রিশি মাথা নাড়ল, কিন্তু চলছে। এই দেখ একজন হলেও সে কোনোভাবে বেঁচে আছে। সে পাগলের মতো বিপদ সংকেত পাঠিয়ে যাচ্ছে।

তার মানে কিছু বুঝতে পারছ?

রিশি বলল, না। তুমি বুঝতে পারছ?

হ্যাঁ।

কী?

আমাদের এই গ্রহে গিয়ে এই উন্মাদ মানুষটাকে উদ্ধার করতে হবে।

রিশি ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি কেমন করে জান মানুষটা উন্মাদ?

এরকম জঘন্য একটা গ্রহে কোনোরকম খাবার পানীয় ছাড়া একা একা কুড়ি বছর থাকতে হলে যে কোনো মানুষ পাগল হয়ে যাবে।

রিশি বলল, ঠিকই বলেছ। আমি হলে আত্মহত্যা করে ঝামেলা চুকিয়ে দিতাম।

এই মানুষ করে নি, সেই জন্যই বলছি মানুষটা নিশ্চয়ই উন্মাদ। এই গ্ৰহটাকে মোটামুটিভাবে ভালবেসে ফেলেছে।

যে মানুষটা আছে তার পরিচয়টা কী? বের করা যাবে?

উহুঁ। এখন পর্যন্ত অনেকে গিয়েছে, যে কেউ হতে পারে।

রিশি বলল, যাবার আগে মানুষগুলো সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিয়ে যেতে হবে।

হ্যাঁ। আমি তথ্যকেন্দ্র থেকে বের করছি।

আমি তা হলে স্কাউটশিপটা রেডি করি। রিশি কন্ট্রোল রুম থেকে বের হয়ে যেতে যেতে বলল, একটু আগে তুমি অভিযোগ করেছিলে শুধু হিমঘরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় কাটাতে হয়, জীবনে কোনো উত্তেজনা নেই! এখন কী মনে হচ্ছে জীবনে উত্তেজনা এসেছে?

টিরিনা হাসল। বলল, হ্যাঁ খানিকটা উত্তেজনা এসেছে। মানুষটা একটু খ্যাপা টাইপের মতো হলে উত্তেজনাটুকু আরেকটু বাড়বে।

দূর থেকে গ্রহটাকে যত কদাকার মনে হচ্ছিল কাছে এসে সেটা তার চাইতে অনেক বেশি কদাকার মনে হল। রিশি ঠিকই বলেছিল এই গ্রহের প্রাকৃতিক আলোটা লালচে, পুরো গ্রহটাকে কেমন যেন পচা ঘায়ের মতো মনে হয়। স্কাউটশিপ দিয়ে গ্রহটার ভেতরে নামতে নামতে টিরিনা এক ধরনের বিতুল্লা নিয়ে গ্রহটার দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো একজন মানুষ যদি একা একা এখানে কুড়ি বছর কাটিয়ে দেয় তার নিশ্চিতভাবেই পাগল হয়ে যাবার কথা।

বিপদ সংকেতের সিগন্যালটি খুঁজে বের করে কিছুক্ষণেই তারা একটা বিধ্বস্ত আবাসস্থল খুঁজে বের করে ফেলল। স্কাউটশিপ দিয়ে আবাসস্থলের উপরে দুপাক ঘুরে তারা কাছাকাছি নেমে আসে। বৈরী গ্রহটায় টিকে থাকার উপযোগী মহাকাশচারীর পোশাক পরতে পরতে টিরিনা বলল, রিশি, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা নিতে ভুলো না।

কেন?

যে মানুষটা আছে সে কেমন মানুষ আমরা জানি না। যদি বাড়াবাড়ি খ্যাপা ধরনের হয় তা হলে একটু সাবধান থাকা ভালো।

হুঁ। রিশি মাথা নেড়ে বলল, এটাই এখন বাকি আছে একটা মানুষকে উদ্ধার করতে এসে আমরা তাকে খুন করে যাই।

আমি বলি নি তাকে খুন করে যাও। বলেছি একটু সাবধান থাক।

রিশি হাসল। বলল, আমি জানি টিরিনা। তোমার সাথে ঠাট্টা করছি। একটু পরে যখন এই মানুষটার সাথে দেখা হবে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি তখন কোনো ঠাট্টা-তামাশা করা যাবে না!

মহাকাশচারীর প্রায় আধা কিম্ভূতকিমাকার পোশাক পরে দুজনে পা টেনে টেনে প্রায় বিধ্বস্ত আবাসস্থলের কাছে হাজির হল। পুরোটা প্রায় ধসে আছে—সত্যিকার অর্থে কোনো দরজা নেই। কিছু ইট-পাথর সরিয়ে একটা সুড়ঙ্গ মতন করে রাখা আছে—এটাকেই মনে। হয় দরজা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রিশি গিয়ে সেই দরজায় ধাক্কা দিল, একটু পেছনে। টিরিনা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে রইল। বার কয়েক শব্দ করার পর ঘড়ঘড় করে শব্দ করে একটা গোলাকার দরজা খুলে যায়। রিশি সতর্কভাবে ভেতরে ঢুকল, পেছনে পেছনে টিরিনা। ভেতরে আবছা অন্ধকার, চারপাশে একটা মলিন বিবর্ণ ভাব, দেখেই কেমন যেন অসুস্থ-অশুভ বলে মনে হয়। ঘড়ঘড় শব্দ করে আবার দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়, তারা শুনতে পারল একটা দুর্বল পাম্প ভেতরের বিষাক্ত বাতাস সরিয়ে নিশ্বাস নেবার উপযোগী বাতাস দিয়ে ভরে দিচ্ছে। সহজ কাজটুকু করতে দীর্ঘ সময় লেগে গেল, যে মানুষটি এখানে থাকে সে তার সঞ্চিত শক্তি বাচিয়ে রাখার জন্য কোথাও এতটুকু বাজে খরছ করতে রাজি নয়।

একসময় ভেতরে বাতাসের চাপ গ্রহণযোগ্য হয়ে এল এবং তখন ঘড়ঘড় শব্দ করে ভেতরের দরজা খুলে গেল। রিশি এবং টিৰিনা হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি ধরে রাখে। দরজার অনাপাশে উসকোখুসকো চুলের মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটিও দুই হাতে একটি টাইটেনিয়ামের রড ধরে রেখেছে, তার চোখ দুটো অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মতো জ্বলজ্বল করছে। রিশি একটু ইতস্তুত করে বলল, আমরা তোমার বিপদ সংকেত পেয়ে তোমাকে উদ্ধার করতে এসেছি।

মানুষটা হাতের টাইটেনিয়ামের রডটি ধরে রেখে সতর্ক গলায় বলল, এল। ভেতরে এস। মানুষটির গলার স্বর শুষ্ক এবং কঠিন।

রিশি ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, আমার নাম রিশি। আর আমার সাথে আছে টিরিনা।

মানুষটি বলল, আমার নাম মান। তোমাকে অভিবাদন ধ্রুমান।

তোমাদেরকেও অভিবাদন। আমাকে উদ্ধার করতে আসার জন্য তোমাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা।

রিশি একটু অবাক হয়ে দেখল, মানুষটি মুখে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে কিন্তু হাতে শক্ত করে টাইটেনিয়ামের বন্ডটি ধরে রেখেছে। মানুষটি বলল, তোমরা ইচ্ছে করলে এই পোশাক খুলে ফেলতে পার। আমার এই ঘর দেখে খুব বিবর্ণ মনে হলেও এটি পুরোপুরি নিরাপদ।

রিশি এবং টিরিনাও সেটা লক্ষ করেছে। মহাকাশচারীর পোশাকের নিরাপত্তাসূচক আলোটি অনেকক্ষণ থেকেই সবুজ হয়ে আছে। টিরিনা তার পোশাকটি খুলতে গিয়ে থেমে গেল, জিজ্ঞেস করল, মান! তুমি হাতে এই টাইটেনিয়ামের রডটি অস্ত্রের মতো করে ধরে রেখেছ কেন?

মান নিজের হাতের দিকে তাকাল এবং মনে হল ব্যাপারটি প্রথমবার লক্ষ করল। সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাতের টাইটেনিয়ামের রঙটি একটা শেলফে রেখে বলল, তোমরা কিছু মনে করো না। আমি বিশ বছর একা একা এই হটাতে আছি। আমার আচার-ব্যবহারে নানা ধরনের অসঙ্গতির জন্ম হয়েছে—তোমরা কিছু মনে করো না।

টিরিনা হেলমেটটা খুলে হাতে নিয়ে বলল, না আমরা কিছু মনে করব না। একা একা থাকার জন্য বিশ বছর খুব দীর্ঘ সময়।

রিশি বলল, কোনো রকম খাওয়া, পানীয়, জ্বালানি ছাড়া তুমি কেমন করে এতদিন এখানে বেঁচে আছ?

কষ্ট করে।

কিন্তু শুধু কষ্ট করে তো এটি সম্ভব নয়।

দ্রুমান একটু হাসার চেষ্টা করল, সব মানুষকেই হাসলে সুন্দর দেখায় কিন্তু যে কোনো কারণেই হাসিমুখে দ্রুমানকে মুহূর্তের জন্য কেমন জানি ভয়ংকর দেখাল। সে তার এই ভয়ংকর হাসিটি বিস্তৃত করে বলল, আমাকে বেঁচে থাকার জন্য অনেক ফন্দিফিকির করতে হয়েছে।

রিশি তার পোশাক খুলতে খুলতে বলল, হ্যাঁ, ফিরে যাবার আগে আমরা তোমার ফন্দিফিকির দেখতে চাই।

দ্রুমান আবার ভয়ংকর হাসিটি হেসে বলল, দেখবে। নিশ্চয়ই দেখবে।

টিরিনা বলল, তোমার এখানে দেখছি নিয়মিত ইলেকট্রিক সাপ্লাই আছে। তার মানে কোনো এক ধরনের জেনারেটর আছে।

দ্রুমান মাথা নাড়ল, হঁ আছে।

সেটা তুমি কী দিয়ে চালাও? আমাদের মহাকাশযানের তথ্যকেন্দ্রে দেখেছি এই গ্ৰহটাতে বাইরের কোনো শক্তি নেই। খুব বাজে গ্রহ।

দ্রুমান বিচিত্র একটি দৃষ্টিতে টিরিনার দিকে তাকাল। বলল, আমার কাছে এখন এটাকে আর বাজে গ্রহ মনে হয় না। মানুষ যখন দীর্ঘদিন কোনো রোগে ভোগে তখন সেই রোগটার জন্য মায়া পড়ে যায়। আর এটা একটা আস্ত গ্রহ।

টিরিনা চোখ কপালে তুলে বলল, তার মানে এই হটার জন্যও তোমার একটু মায়া পড়ে গেছে।

দ্রুমান একটা নিশ্বাস ফেলল। বলল, গ্রহটার থেকে বেশি মায়া পড়েছে আমার এই জায়গাটার জন্য। এর প্রত্যেকটা পাথরের টুকরো আমার নিজের হাতে বানো। বেঁচে থাকার জন্য কী না করেছি। শেষ পর্যন্ত যখন ইলেকট্রিসিটির ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে পারলাম তখন মনে হল হয়তো বেঁচে যাব।

রিশি বলল, তোমাকে অভিনন্দন দ্রুমান—এরকম একটা পরিবেশে বেঁচে থাকা প্রায় অলৌকিক একটা ব্যাপার।

দ্রুমান মাথা ঘুরিয়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ, আসলেই এটা অলৌকিক।

টিরিনা ঘরটির ভেতরে ঘুরে দেখে। দেয়ালে আলোর সুইচ ছিল। প্রায় অন্যমনস্কভাবে সে একটা সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিল, সাথে সাথে পুরো ঘরটি উজ্জ্বল আলোতে ভরে যায়। দ্রুমান হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, না।

না? টিরিনা অবাক হয়ে বলল, কী না?

দ্রুমান কঠিন গলায় প্রায় ছুটে এসে আলোটা নিভিয়ে দিতেই পুরো ঘরটি আবার আবছা অন্ধকারে ঢেকে গেল। দ্রুমান কঠিন গলায় বলল, তুমি আলো জ্বালবে না। শক্তির অপচয় করবে না।

টিরিনা একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। একটু ইতস্তত করে বলল, কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝে তোমাকে আমরা নিয়ে যাব। তোমাকে এখানে থাকতে হবে না। এতদিন যেভাবে শক্তি বাচিয়েছ তোমাকে আর সেভাবে শক্তি বাঁচাতে হবে না!

হ্যাঁ। নিশি বলল, তুমি দুই-তিন বছরে যে পরিমাণ শক্তি খরচ কর আমাদের স্কাউটশিপে তার থেকে বেশি শক্তি জমা আছে?

থাকুক। তার মানে এই নয় যে তুমি শক্তির অপচয় করবে।

রিশি আর তর্ক করল না। বলল, ঠিক আছে। এটা তোমার জায়গা, তুমি যেটা বলবে সেটাই নিয়ম।

হ্যাঁ। দ্রুমান মাথা নেড়ে বলল, সেটা সব সময় মনে রাখবে। এটা আমার জায়গা। আমার অনুমতি ছাড়া এখানে তোমরা কিছু স্পর্শ করবে না। বুঝেছ?

রিশি মাথা নাড়ল। বলল, বুঝেছি!

মানুষটি একা একা থেকে পুরোপুরি অসামাজিক হয়ে গেছে, স্বাভাবিক ভদ্রতার বিষয়গুলোও পুরোপুরি ভুলে গেছে।

শুধু যে স্বাভাবিক ভদ্রতার বিষয়গুলো ভুলে গেছে তাই নয় রিশি আর টিরিনা একটু অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, মানুষটির আরেকটি বিচিত্র অভ্যাসের জন্ম হয়েছে। সে সব সময় নিজের সাথে কথা বলে। বেশিরভাগ সময় বিড়বিড় করে কিন্তু প্রায় সময়েই বেশ জোরে জোরে। তার এই ঘর, থাকার জায়গা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, শক্তি, শক্তির অপচয়, খাবার আর পানীয়ের সঞ্চয় এইসব বিষয় নিয়ে সব সময় নিজের সাথে পরামর্শ করছে। মানুষটি আবার দুর্ব্যবহার করবে এ ধরনের একটা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও টিরিনা জিজ্ঞেস করল, দ্রুমান, তুমি নিশ্চয়ই দীর্ঘদিন সত্যিকারের খাবার খাও নি?

না। আমার সব খাবার পুনরুজ্জীবিত খাবার।

শরীর থেকে যে বর্জ্য বেরিয়ে আসে সেটাকে পরিশোধন করে আবার খাবার তৈরির পদ্ধতিটি অনেক পুরোনো কিন্তু তার পরেও একজন মানুষ দিনের পর দিন এরকম খাবার খেয়ে যাচ্ছে চিন্তা করে বিশির শরীর কেমন জানি গুলিয়ে এল। টিরিনা বলল, আজকে তোমার সম্মানে এখানে একটি আনুষ্ঠানিক ভোজের আয়োজন করতে পারি।

দ্রুমান রু কুঁচকে বলল, তোমাদের কাছে কী কী খাবার আছে?

মেষ শাবকের মাংস থেকে শুরু করে সমুদ্রের মাছ, যবের রুটি থেকে শুরু করে ভুট্টা দানা, সত্যিকার ফলের কাস্টার্ড থেকে শুরু করে স্নায়ু উত্তেজক পানীয় সবকিছু আছে।

দ্রুমানের চোখ কেমন জানি চকচক করে ওঠে, সে সুড়ুৎ করে জিবে লোল টেনে বলল, শ্চমৎকার।

রিশি বলল, আমাদের হাতে খুব সময় নেই। আমার মনে হয় আমরা আমাদের ভোজটি দ্রুত সেরে নিয়ে রওনা দিয়ে দিই।

দ্রুমান রিশির কথার কোনো উত্তর দিল না। অবিশ্বাস্য ব্যাপার কিন্তু তাকে দেখে মনে হয় এই অভ গ্রহের অসুস্থ পরিবেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। রিশি বলল, মান। তোমার কি প্রস্তুত হতে সময় লাগবে? স্কাউটশিপ দিয়ে মহাকাশযানে পৌঁছাতে বেশ সময় লাগবে—সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ?

মান কোনো উত্তর দিল না, বিড়বিড় করে বর্জ্য পরিশোধনের সময় নিয়ে সে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক একটা কথা বলল। রিশি মোটামুটি নিশ্চিত হতে শুরু করেছে এই মানুষটি সম্ভবত খানিকটা অপ্রকৃতিস্থ।

ঘরটিতে তিন জন মানুষের বসে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। দুটি এলুমিনিয়ামের বাক্স এনে ব্রিশি এবং টিরিনার বসার জায়গা করা হল। যে টেবিলটাকে খাবারের টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে টিরিনা তার উপর একটা নিও পলিমারের চাদর বিছিয়ে দিল। তার উপর নানা রকম খাবার, গরম করে রাখা হয়েছে। দ্রুমান লোভাতুর চোখে খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে—সে শেষবার কবে এরকম একটি ভোজে অংশ নিয়েছিল নিশ্চয়ই মনে করতে পারবে না।

টিরিনা স্নায়ু উত্তেজক পানীয়ের বোতলটি খুলে দ্রুমানকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কাছে গ্লাস আছে?

দ্রুমান মাথা নাড়ল, বলল, ছে। তারপর উঠে একটা ড্রয়ার খুলে তিনটা ক্রিস্টালের গ্লাস নিয়ে এল। টিরিনা গ্লাসে পানীয় ঢালতে ঢালতে বলল, কী সুন্দর গ্লাস।

দ্রুমান মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। বিশেষ বিশেষ দিনে আমি এই গ্লাস ব্যবহার করি।

টিরিনা তার গ্লাসটি উঁচু করে বলল, মান, এই গ্রহে তোমার শেষ দিনটি উপলক্ষে

রিশি মাথা নাড়ল, বলল, শেষ দিন উপলক্ষে।

দ্রুমান কোনো কথা না বলে একদৃষ্টে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। যখন এক-দুটি কথা বলা ভদ্রভা তখন সে চুপ করে থাকে, কিন্তু যখন প্রয়োজন নেই তখন সে নিজের সাথে বিড়বিড় করে কথা বলে।

টিরিনা পানীয়টিতে চুমুক দিয়ে বলল, চমৎকার পানীয়।

রিশিও পানীয়তে চুমুক দিয়ে বলল, হ্যাঁ। চমৎকার।

দ্রুমান বিড়বিড় করে বলল, নিহিলিয়ান ডাবল ডোজ।

স্নায়ুকে আক্রমণ করার এক ধরনের ভয়ংকর বিষের নাম নিহিলিয়ান। দ্রুমান হঠাৎ করে এই বিষটির নাম উচ্চারণ করছে কেন ভেবে টিরিনা খুব অবাক হল। সে ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি নিহিলিয়ানের কথা কী বলছ?

গ্লাসের ভেতরে আমি দিয়ে রাখি। শুকিয়ে থাকে দেখে বোঝা যায় না।

রিশি আর টিরিনা ভয়ংকরভাবে চমকে উঠল, টিরিনা আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে বলল, কী বলছ তুমি?

হ্যাঁ চমৎকার বিষ। আমার সবচেয়ে পছন্দের।

রিশি লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, হঠাৎ করে তার হাত-পা অবশ হয়ে গেছে। সে দাড়াতে পারছে না। নড়তে পারছে না।

দ্রুমান একদৃষ্টে রিশি আর টিরিনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, তোমরা আর নড়তে পারবে না। আরো কিছুক্ষণ তোমার জ্ঞান থাকবে, তারপর তোমরা অজ্ঞান হয়ে যাবে।

রিশি অনেক কষ্ট করে কোনোভাবে বলল, কেন?

কারণ তোমরা হবে আমার শক্তির সঞ্চয়। আমি একা একা এখানে কীভাবে এতদিন বেঁচে আছি তোমরা বুঝতে পারছ না? বেঁচে আছি কারণ আমি শক্তির কোনো অপচয় করি নি। আমি আমার জেনারেটরের জন্য কী ইঞ্জিন ব্যবহার করেছি জানতে চাও? ব্যবহার। করেছি সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ইঞ্জিন। তোমরা জান সেটা কী?

রিশি ফিসফিস করে বলল, মানুষের শরীর?।

হ্যাঁ। মানুষের শরীর। দ্রুমান জিব দিয়ে পরিতৃপ্তির একটা শব্দ করে বলল, বির্তনে লক্ষ লক্ষ বছরে মানুষের শরীরকে নিখুত করা হয়েছে, সৃষ্টি জগতে এর চাইতে ভালো কোনো ইঞ্জিন তৈরি হয় নি। আমি সেই ইঞ্জিনকে ব্যবহার করেছি আমার জেনারেটরে।

রিশি জিজ্ঞেস করতে চাইল সেই ইঞ্জিনগুলো কারা কিন্তু সে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না, হঠাৎ করে তার হাত-পা অবশ হয়ে আসতে শুরু করেছে, সে দেখতে পাচ্ছে শুনতে পাচ্ছে কিন্তু কিছু করতে পারছে না।

দ্রুমান বিড়বিড় করে বলল, নিহিলিয়ান হচ্ছে বিষের রাজা। একটু হিসেব করে দিতে হয়, বেশি দিলে কোমাতে চলে যাবে—কম দিলে ঘণ্টা খানেকের মাঝে শরীর মেটাবলাইজ করে ফেলবে, শরীর সচল হয়ে যাবে। মাঝামাঝি একটা পরিমাণ আছে যেটা দিলে তোমরা প্রথমে সবকিছু দেখবে, বুঝবে কিন্তু কিছু করতে পারবে না। আস্তে আস্তে জ্ঞান হারাবে। সেই জন্য এটা আমার প্রিয় বিষ।

দ্রুমান ঘর থেকে বের হয়ে একটা ট্রলি নিয়ে এল। ট্রলিটা রিশির পাশে রেখে আবার নিজের সাথে কথা বলতে থাকে, এখন তোমাদের আমি ইঞ্জিন ঘরে নিয়ে যাব। এত সুন্দর করে ডিজাইন করেছি, তোমাদের এটা দেখা উচিত। মানুষ যখন একটা সুন্দর সঙ্গীত রচনা করে তখন সে চায় এটা দশজন শুনুক, সুন্দর ভাস্কর্য করলে চায় দশজন দেখুক।

দ্রুমান রিশিকে টেনে ট্রলির উপরে শুইয়ে বলল, এইখানেও সেই একই ব্যাপার। একজন মানুষ একা একা বিশ বছর থেকে এখানে আছে, সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনকে ব্যবহার করছে জেনারেটর চালানোর জন্য, শক্তির কোনো অপচয় নেই। একেবারে নিখুত একটা প্রক্রিয়া, আমি কীভাবে করেছি এটা তোমাদের দেখা দরকার। এইজন্য আমি নিহিলিয়ান বিষটা পছন্দ করি। তোমাদের শরীর পুরোপুরি অচল, কিন্তু তুমি দেখতে পাচ্ছ, তুমি শুনতে পাচ্ছ, বুঝতে পারছ। কী চমৎকার!

দ্রুমান প্রথমে রিশিকে তারপর টিরিনাকে ট্রলিতে করে ঠেলে ঠেলে এক পাশে একটা বন্ধ ঘরের সামনে নিয়ে আসে। ঘরের বড় তালা খুলতেই একটা বোটকা গন্ধ পেল রিশি। সে তার মাথা ঘুরাতে পারছে না, তাই এখনো কিছু দেখতে পাচ্ছে না। দ্রুমান রিশি আর টিরিনাকে ভেতরে ঢুকিয়ে ঠুলিটা ভাজ করে তাদেরকে আধশোয়া অবস্থায় নিয়ে আসতেই তারা পুরো দৃশ্যটি দেখতে পেল, একটা ভয়ংকর আতঙ্কে তারা চিৎকার করে উঠত কিন্তু তাদের শরীর পুরোপুরি অবশ বলে তারা শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।

ঘরের মাঝামাঝি জেনারেটরটি দাঁড় করানো আছে তার চারপাশে প্রায় পঞ্চাশ জন নগ্ন মানুষ শুয়ে আছে। মানুষগুলো নিশ্চয়ই অচেতন, কারণ তাদের কোথাও প্রাণের স্পন্দন নেই, শুধু তাদের পাগুলো জেনারেটরের মূল শ্যাফটটাকে যন্ত্রের মতো ঘুরিয়ে যাচ্ছে। প্রমান এক ধরনের উচ্ছসিত গলায় বলল, দেখেছ আমার ইঞ্জিন? আমি এটার নাম দিয়েছি দ্রুমান ইঞ্জিন।

সে কাছাকাছি একজন মানুষের কাছে গিয়ে বলল, ভালো করে তাকিয়ে দেখ, এই যে এই টিউব দিয়ে তার জন্য পুষ্টিকর তরল আসছে। এই টিউবটা নাকের ভেতর দিয়ে সরাসরি ফুসফুসে চলে গেছে। আমি এটা দিয়ে একেবারে বিশুদ্ধ অক্সিজেন সাপ্লাই দিই। শরীরের যা বর্জ্য সেগুলো এই টিউব দিয়ে আমি বের করে নিয়ে আসি। ডান দিকে তাকিয়ে দেখ আমার সিনথেজাইজার বর্জ্য থেকে সবগুলো যৌথমূল আলাদা করে আবার নূতন করে পুষ্টিকর তরল তৈরি করা হয় সেটা আবার তাদের শরীরে চলে আসছে। একটা পরিপূর্ণ সিস্টেম, বাইরে থেকে বলতে গেলে আমার কিছুই লাগছে না।

দ্রুমান তার জেনারেটর ঘরের ভেতর ঘুরতে থাকে, কোনো কোনো মানুষের চোখের পাতা তুলে পরীক্ষা করে সন্তুষ্টির মতো শব্দ করে আবার রিশি আর টিরিনার কাছে ফিরে আসে, তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ মানুষগুলো এটা কেন করছে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। দ্রুমান নিজেই তার চোখে-মুখে প্রশ্ন করার ভঙ্গি নিয়ে এসে বলল, আর এই প্রশ্নের উত্তরই হচ্ছে আমার সাফলা! আমার আবিষ্কার।

দ্রুমান কাছাকাছি এসে একজনের হাতটা একটু উপরে তুলে আবার ছেড়ে দিতেই সেটা নির্জীবের মতো পড়ে যায়, ঈমান বলল, দেখেছ? হাতগুলো পুরোপুরি অচল। আস্তে আস্তে শুকিয়ে কাঠির মতো হয়ে গেছে। জেনারেটরের শ্যাফটটা ঘোরানো হচ্ছে পা দিয়ে, হাতের কোনো প্রয়োজন নেই তাই আস্তে আস্তে হাতগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে। এই জেনারেটর চালানোর জন্য আমার দরকার একেবারে সুস্থ সবল নীরোগ মানুষ। এখানে সবাই সুস্থ সবল। আর নীরোগ। শুধু সুস্থ সবল আর নীরোগ নয়, তারা অসম্ভব সুখী মানুষ। তোমরা দেখতে পাচ্ছ তাদের মুখে এক ধরনের পরিতৃপ্তির হাসি? দেখেছ?

খুব ধীরে ধীরে রিশির চেতনা লোপ পেয়ে যাচ্ছে কিন্তু তার ভেতরেও সে দেখতে পেল কাছাকাছি শুয়ে থাকা নগ্ন মেয়েটির মুখে সূক্ষ্ম এক ধরনের হাসি, সেই মুখে কোনো যন্ত্রণার চিহ্ন নেই। দ্রুমানের নিজের মুখেও এক ধরনের পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল, সে বলল, দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনা এর সবই তো আসলে আমাদের মস্তিস্কের এক ধরনের প্রক্রিয়া। আমি সেই প্রক্রিয়াটাকেই নিয়ন্ত্রণ করছি। এদের মস্তিষ্কের কিছু কিছু জায়গা পাকাপাকিভাবে নষ্ট করে দিয়েছি যেন তারা আর কোনো দিন জেগে উঠে কারো কাছে অভিযোগ করতে না। পারে। কিছু কিছু জায়গা একটু পরিবর্তন করে দিয়েছি যার কারণে তাদের মুখে এরকম আনন্দের হাসি। তারা খুব আনন্দের সাথে এই কাজটা করছে। তাদের ভেতরে কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই, হিংসা নেই, রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, তারা খুব সুখে আছে। মাঝে মাঝে তাদেরকে দেখলে আমার এক ধরনের হিংসা হয়। মনে হয় আহা আমিও যদি তাদের মতো সুখী হতে পারতাম, আনন্দিত হতে পারতাম।

দ্রুমানের মুখে সত্যিই এক ধরনের বিষণ্ণতাব ফুটে ওঠে। তাকে দেখে মনে হতে থাকে সত্যি বুঝি এই মানুষগুলোর মতো সুখী হবার জন্য তার ভেতরে এক ধরনের ব্যাকুলতার জন্ম হয়েছে। সে রিশির চোখের পাতা টেনে চোখের মণিটা একনজর দেখে বলল, নিহিলিয়ানের কাজ শুরু করেছে। এখন তোমরা অচেতন হয়ে গেছ। তোমরা আর আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আমি একা একা কথা বলতে পারি। আমি বিশ বছর থেকে নিজের সাথে কথা বলছি। নিজের সাথে কথা বলার থেকে চমৎকার ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না। এর মাঝে কোনো বিরোধ নেই, তর্কবিতর্ক নেই। তোমরা ব্যাপারটা চেষ্টা করে দেখলে পারতে। এখন অবিশ্যি দেরি হয়ে গেছে, কারণ তোমরা আর কোনো দিন চেতনা ফিরে পাবে না। এক ধরনের ঐশ্বরিক আনন্দ দিয়ে আমি তোমাদের প্রমান ইঞ্জিন তৈরি করে ফেলব।

দ্রুমান টিরিনার ট্রলিটা ঠেলে ঘরের এক কোনায় নিতে নিতে বলল, আমার এই ইঞ্জিন ঘরেই সবকিছু। অস্ত্রোপচারটাও এই ঘরে করি। অবিশ্যি অস্ত্রোপচারের কাজটা খুব সহজ। আমি এই হেলমেটটা তোমাদের মাথায় পরিয়ে দেব মান একটা হেলমেট তুলে দেখাল, তারপর বলল, হেলমেটের নয়টা জায়গায় নয়টা ভ্রু আছে সেগুলো ঘুরিয়ে টাইট করতে হয়, বাস সাথে সাথে কাজ শেষ। ভিতরে কয়টা লিভার আছে, সেগুলো মস্তিষ্কের ঠিক ঠিক জায়গায় ফুটো করে কিছু পরিবর্তন করে দেয়। অত্যন্ত চমৎকার একটা যন্ত্র! এটা আমাকে তৈরি করে দিয়েছে ডক্টর নিশিনা–ঐ দেখ ডান দিক থেকে তিন নম্বর জায়গায় শুয়ে নগ্ন দেহে হাসিমুখে সে কাজ করে যাচ্ছে। বেচারা বুঝতেই পারে নি আমি তার ওপরে সেটা প্রথমবার ব্যবহার করব। কিছু কিছু মানুষ জীবনের জটিলতাগুলো বুঝতে পারে না।

দ্রুমান টিরিনার ট্রলিটা তার কাজ চালানোর মতো অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে উপরের উজ্জ্বল আলোটা জ্বেলে দিয়ে বলল, এই আলোটা জ্বালানোর জন্য আমার বাড়তি কিছু শক্তি ক্ষয় হচ্ছে কিন্তু আমি সেজন্য আজকে মোটেও চিন্তিত নই। আমি একটু বাড়তি আলো আজকে ব্যবহার করতেই পারি কারণ আমার জেনারেটরে আজকে দুটো নতুন দ্রুমান ইঞ্জিন লাগাতে যাচ্ছি। তোমরা দুজন। আমার বিদ্যুৎ শক্তি কয়েক শতাংশ বেড়ে যাবে আজ থেকে। কী চমৎকীর!

দ্রুমান টিরিনার অচেতন দেহের দিকে তাকিয়ে জিব দিয়ে একটা শব্দ করে বলল, তোমার পোশাকটা আগে খুলে নিই! কিছুক্ষণের ভেতরেই তুমি বেঁচে থাকার জন্য যেসব বাহুলা করতে হয় তার সবকিছু থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। তোমার শরীরে যে পোশাক আছে বা নেই তুমি সেটাও জানবে না। দ্রুমান টিরিনার পোশাকের জিপ টেনে খুলতে খুলতে বলল, তোমার এই সুন্দর সুগঠিত শরীর অন্যরকম হয়ে যাবে, হাতগুলো আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাবে, ঘাড় আর বুকের মাংসপেশি অকেজো হয়ে যাবে। তবে পা দুটো আরো সুগঠিত হয়ে যাবে। কোমরের মাংসপেশিগুলো হবে শক্ত–

দ্রুম্মান টিরিনার পোশাকের জিপ টেনে নিচে নামিয়ে এনে বলল, আমি তোমাকে এভাবে নগ্ন করে ফেলছি, তোমার কোনো আপত্তি নেই তো?

ঠিক তখনই একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটল, টিরিনার চোখ দুটো খুলে যায়। সে একদৃষ্টে দ্রুমানের দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বলল, হ্যাঁ আপত্তি আছে।

দ্রুমান ইলেকট্রিক শক খাওয়া মানুষের মতো ছিটকে পেছনে সরে যায়। তার চোখেমুখে বিস্ময় এবং তার থেকে বেশি আতঙ্ক। সে একটা হাত সামনে বাড়িয়ে অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মতো বলল, তু-ত-তুমি-তুমি-

আমি। টিরিনা তার ট্রলিতে উঠে বসল তারপর পোশাকের খুলে ফেলা জিপটি টেনে আবার বন্ধ করে দিয়ে বলল, তুমি দীর্ঘদিন একা একা আছ তাই বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির কী কী উন্নতি হয়েছে তার খবর রাখ না।

প্রমান এদিক-সেদিক তাকিয়ে ছুটে গিয়ে স্টেইনলেস স্টিলের একটা ধারালো সার্জিক্যাল চাকু হাতে নিয়ে চাপা গলায় চিৎকার করে বলল, খবরদার। খবরদার বলছি—

টিরিনা ট্রলি থেকে তার পা দুটো নিচে নামিয়ে বলল, তুমি শুধু শুধু উত্তেজিত হয়ে না মান।

খুন করে ফেলব আমি, তোমাকে খুন করে ফেলব।

আমার জন্য এই শব্দটা ব্যবহার করায় একটা সমস্যা আছে। টিরিনা হাসি হাসি মুখ করে বলল, একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে খুন করতে পারে। আমি তো ঠিক মানুষ নই।

দ্রুমান ভয় পাওয়া গলায় বলল, তুমি তা হলে কী?

সেটি আমিও পুরোপুরি নিশ্চিত নই। খুব স্থূলভাবে যদি বলতে চাও রোবট বা এনরয়েড বলতে পার। কেউ কেউ আবার সাইবর্গ বলে। তুমি কোনটা বলতে চাও সেটা আমি জানি না। টিরিনা উঠে দাঁড়িয়ে মানের দিকে অগ্রসর হয়ে বলল, তবে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ না। যে জিনিসটা তোমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে তোমার জেনে রাখা ভালো যে তুমি যে চাকুটা হাতে নিয়েছ সেটা দিয়ে আমার চামড়ায় আঁচড়ও দিতে পারবে না। কাটার কোনো প্রশ্নই আসে না।

দ্রুমান বিড়বিড় করে বলল, মিথ্যা কথা বলছ। তুমি মিথ্যা কথা বলছ।

টিরিনা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, তোমাকে কোনো কিছু বিশ্বাস করানোর জন্য আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে আমি চাই না তুমি নতুন করে কোনো বোকামি কর। আমি খালি হাতে তোমার মাথাটা গুড়ো করে ফেলতে পারব।

মিথ্যা কথা বলছ তুমি—

আমার চোখের দিকে তাকাও দ্রুমান।

দ্রুমান টিরিনার চোখের দিকে তাকায় এবং আতঙ্কে থরথর করে কাপতে থাকে। টিরিনার দুটি চোখ জ্বলছে, তীব্র আলোতে ঝলসে উঠছে দুটি চোখ।

টিরিনা ফিসফিস করে বলল, আমি মানুষ নই। কিন্তু আমার ভাবনা-চিন্তা মানুষের মতো। আরেকজন মানুষ এখন যা করত এখন আমিও তোমাকে তাই করব।

কী করবে তুমি?

টিরিনা এক পা এগিয়ে হঠাৎ খপ করে দ্রুমানের হাত ধরে ফেলল, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় প্রমান আর্তনাদ করে ওঠে, তার হাত থেকে ধারালো চাকুটা পড়ে যায়। টিরিনা ফিসফিস করে বলল, তুমি তোমার এই জেনারেটরে আরো একটি দ্রুমান ইঞ্জিন হয়ে থাকবে।

দ্রুমান কাতর গলায় বলল, না!

নগ্ন দেহে পা দিয়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে তুমি তোমার বন্ধু ডক্টর নিশিনার পাশাপাশি শুয়ে থাকবে। তোমার বন্ধু ভক্টর নিশিনার মুখে যেরকম প্রশান্তির হাসি ফুটে আছে তোমার মুখেও

সেরকম হাসি ফুটে থাকবে।

না-না–

টিরিনা তার যান্ত্রিক হাত দিয়ে মুহূর্তে দ্রুমানকে ট্রলিতে চিৎ করে শুইয়ে ফেলল। দ্রুত হাতে নিও পলিমারের স্ট্যাপ দিয়ে ট্রলিতে বেঁধে ফেলে বলল, তুমি একটু আগে বলেছ তোমার এককালীন সহকর্মী, তোমাকে উদ্ধার করতে আসা মহাকাশচারীদের দেখে মাঝে মাঝে তোমার হিংসা হয়। তোমার আর হিংসা হবে না। তুমি এখন তাদের একজন হয়ে যাবে।

দ্রুমান মাথা নাড়ল, বলল, না। আমি তাদের একজন হতে চাই না।

টিরিনা শেলফের ওপর রাখা হেলমেটটা হাতে নিয়ে মানের দিকে এগিয়ে আসে, তার মাথায় পরিয়ে নিচু গলায় বলল, চুপ করে শুয়ে থাক দ্রুমান। শক্তির অপচয় করো না।

স্কাউটশিপের মৃদু কম্পনে রিশির জ্ঞান ফিরে আসে। সে ঘোলাটে চোখে টিরিনার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কোথায়?

তুমি স্কাউটশিপে।

রিশি প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করে, কিছু একটা ভয়ংকর ব্যাপার ঘটেছিল মানুষের শরীর নিয়ে। নগ্ন দেহে অসংখ্য মানুষ কোথায় জানি শুয়ে আছে, কিন্তু সে মনে করতে পারছে না। টিরিনা তার মাথায় হাত রেখে বলল, তুমি ঘুমাও রিশি। তোমার কোনো ভয় নেই। কেউ তোমার ক্ষতি কতে পারবে না।

রিশি কয়েক মুহূর্ত টিরিনার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে ফেলল। স্মৃতি মুছে ফেলার যে ওষুধটা দেওয়া হয়েছে সেটা কাজ করতে শুরু করেছে।

টিরিনা এক ধরনের গভীর ভালবাসা নিয়ে রিশির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মানুষটিকে নিরাপদে পৌঁছে দেবার জন্য সে এসেছে। সে নিশ্চয়ই তাকে রক্ষা করবে। বুক আগলে রক্ষা করবে।

মানুষের মতো অসহায় আর কে এই জগতে?

ঘৃণার সঙ্গে বসবাস

নিশি গোল কোয়ার্টজের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নির্দিষ্ট জিনের কিছু বেস পেয়ারকে পরিবর্তন করে আজকাল যে কোনো মানবীকে সুন্দরী করে দেওয়া যায় বলে সৌন্দর্যের গুরুত্বটি কমে এসেছে-তারপরও একটু ভালো করে লক্ষ করলেই বোঝা যায় নিশির। সৌন্দর্যটি অন্যরকম। তার কিশোরীর মতো ছিপছিপে দেহ, সেখানে চলাচলে এক ধরনের। লাবণ্য, আকাশের মতো নীল চোখ, লালচে চুল এবং কোমল ও মসৃণ তুক। তার ভেতরে এক ধরনের সতেজ আত্মবিশ্বাস, যেটি সব সময়েই চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে থাকে। তার। অনুভূতি সব সময়েই খুব চড়া সুরে বাঁধা থাকে, এই মুহূর্তে যেটি উত্তেজনায় প্রায় আকাশছোঁয়া হয়ে আছে। তার সমস্ত মুখমণ্ডল প্রচণ্ড ক্রোধে রক্তাভ এবং অপ্রতিরোধ্য এক ধরনের আক্রোশে তার শরীর অল্প অল্প কঁপছে। নিশি এক ঝটকা মেরে তার মুখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলোকে পেছনে সরিয়ে ঘরের মাঝামাঝি বসে থাকা অণ্ডনের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার এবং আমার মাঝে যে সম্পর্ক সেটা সম্ভবত পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে খারাপ সম্পর্ক।

অশুন নিশির আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করা স্বামী। অশুন সুদর্শন-শক্ত-সমর্থ এক যুবক। তার বয়স নিশির বয়সের কাছাকাছি, মানসিক কাঠামো, বুদ্ধিমত্তা, আত্মবিশ্বাস এমনকি কথা বলার ভঙ্গিও দুজনের প্রায় একই রকম। দুজন এত কাছাকাছি ধরনের মানুষ হবার পরও কোনো একটি বিচিত্র কারণে একজন আরেকজনকে গ্রহণ করতে পারে নি। এই গ্রহণ করতে না পারাটুকু যুদি মৃদু অপছন্দের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকত তা হলে একটি কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি, তারা একজন আরেকজনকে সমস্ত মন-প্রাণ দিয়ে ঘৃণা করে। প্রাচীনকালে পরিবারের কাঠামোটির খুব গুরুত্ব ছিল, পরিবার হিসেবে টিকে থাকার একটি বড় শর্ত ছিল সন্তান পালন করা। তখন একজন পুরুষ ও রমণীর পক্ষে পরস্পরকে এত তীব্রভাবে ঘৃণা করে একসাথে বসবাস করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু এখন পরিবেশটি অন্যরকম। নিশি এবং অশুন যে একসাথে স্বামী ও স্ত্রী হিসেবে বসবাস করছে তার একটিমাত্র কারণ হচ্ছে পরস্পরের প্রতি অকল্পনীয় এক ধরনের ঘৃণী। এই ঘৃণা এত তীব্র এবং গভীর যে নিজের অজান্তেই তারা সেই ঘৃণাকে ভালবাসতে শুরু করেছে, লালন করতে শুরু করেছে। দুজন দুজনকে ছেড়ে গেলে এই তীব্র ঘৃণাটুকু হারিয়ে যাবে বলেই হয়তো ভারা আর আলাদা হয়ে যেতে পারছে না।

নিশি তীব্র দৃষ্টিতে অণ্ডনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে তোমাকে আমি একদিন বিয়ে করেছিলাম।

অশুন একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, কেন? বিশ্বাস না করার কী আছে?

তুমি বলতে চাও তোমাকে সত্যি আমি একসময় পছন্দ করতাম? তোমাকে আমি কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভালবেসেছিলাম?

না। অশুন মাথা নাড়ল, বলল, তুমি আমাকে কোনো দিন ভালবাস নি, আমি এই ব্যাপারটি তোমাকে নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি।

নিশি তার সুন্দর রু দুটি কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, তুমি এই ব্যাপারটিতে এত নিশ্চিত কেমন করে হলে?

কারণ আমাকে বা অন্য কোনো মানুষকেই তোমার ভালবাসার ক্ষমতা নেই। প্রকৃতপক্ষে তোমার মস্তিষ্কের গঠনে কাউকে ভালবাসা সম্ভব নয়।

নিশি কষ্ট করে নিজের ক্রোধকে সংবরণ করে বলল, তাই যদি সত্যি হয় তা হলে তোমাকে কেন আমি একদিন বিয়ে করেছিলাম?

কৌতূহল। অশুন মাথা নেড়ে বলল, তুমি একজন মেয়ে, পুরুষ কেমন করে আচরণ করে সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা ছিল না। তাই তুমি কৌতূহলী হয়ে আমাকে বিয়ে করেছিলে।

আর তুমি? নিশি তীব্র স্বরে বলল, আর তুমি কেন আমাকে বিয়ে করেছিলে?

অশুন আনন্দহীন এক ধরনের হাসি হেসে বলল, ভুল করে। আমি তোমাকে ভুল করে বিয়ে করেছিলাম। এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে তোমার ভেতরে এক ধরনের সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল, সে কারণে আমি তোমার প্রতি এক ধরনের জৈবিক আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম।

এখন সেই সম্মোহনী ক্ষমতা নেই? সেই জৈবিক আকর্ষণ নেই?

না নেই। অশুন প্রবল বেগে মাথা নেড়ে বলল, বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই। আমার কাছে তুমি আর একটি ঘিনঘিনে বিষাক্ত সাপের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। একটা বিষাক্ত সাপকে আমি যেরকম বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে পিষে মেরে ফেলতে পারি ঠিক সেরকম তোমাকে পিষে মেরে ফেলতে অামার একটুও দ্বিধা হবে না।

নিশি নিচু গলায় হিসহিস করে বলল, তা হলে মেরে ফেলছ না কেন?

অশুন হা-হা করে হেসে বলল, আইনের ভয়ে। যদি আইনের কোনো বাধা না থাকত তা হলে এতদিনে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে খুন করে ফেলতাম। আজ থেকে এক শ বছর আগে হলে আমি নিশ্চিতভাবে তোমাকে শারীরিকভাবে আঘাত করতাম! তোমার খুব সৌভাগ্য যে জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বাবহার করে মহিলাদের শারীরিক শক্তি পুরুষের সমান করে ফেলা হয়েছে। তা না হলে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে নির্দয়ভাবে আঘাত করতাম।

নিশি বিস্ফারিত চোখে অশুনের দিকে তাকিয়ে রইল। অশুন মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল, আমার প্রিয় ফ্যান্টাসি কী জান?

কী?

তোমাকে জনসমক্ষে অপমান করে একটি শারীরিক শাস্তি দিচ্ছি।

নিশি একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, আমি এখন একটু একটু বুঝতে পারছি কেন তোমাকে বিয়ে করেছিলাম। তুমি ঠিকই বলেছু, কৌতূহল এবং সম্ভবত এই কৌতূহলের কারণেই আমি তোমাকে এখনো স্বামী হিসেবে রেখে দিয়েছি। রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেই নি। কিছু একটাকে কেউ যখন খুব ঘেন্না করে তখন মানুষের সেটাকে নিয়ে এক ধরনের কৌতূহল হয়। শরীরের কোথাও যদি ঘা হয় তখন বারবার সেটা দেখার কৌতূহল হয়–অনেকটা সেরকম। তুমি হচ্ছ আমার জীবনের সেই দগদগে ঘা। লাল হয়ে পেকে থাকা খুঁজে ভরা বিষাক্ত ঘা।

অশুন এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে নিশির মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। নিশি থামতেই সে মাথা নেড়ে বলল, তুমি এখনো খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারি নিশি।

এর মাঝে গুছিয়ে বলার কিছু নেই। সত্যি কথা গুছিয়ে বলতে হয় না—উচ্চারণ করলেই হয়। তোমার সাথে বিয়ে না হলে ঘৃণা ব্যাপারটি কী সেটা আমি কোনো দিন জানতে পারতাম না। আমার জীবনটা এক অর্থে অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

ঘৃণা একটা পারস্পরিক ব্যাপার। অশুন মাথা নেড়ে বলল, এটা কখনো একপক্ষীয় হতে পারে না। নিশি, আমিও তোমাকে ঘৃণা করি। ভয়ংকর ঘৃণা করি। সত্যি কথা বলতে কী মেয়েমানুষ কত খারাপ হতে পারে সেটা তোমাকে না দেখলে আমি কখনো জানতে পারতাম না।

নিশির মুখে বিগ্রুপের একটা হাসি ফুটে উঠল। বলল, চমৎকার! তোমার মতো নিচু শ্রেণীর মানুষের কাছে আমি এর থেকে ভালো কোনো কথা আশা করি নি।

কেন? আমি নতুন কী বলেছি?

তুমি ঘৃণা কর আমাকে অথচ সেজন্য পুরো নারী জাতিকে নিয়ে একটা কুৎসিত কথা বললে!

অশুন এতক্ষণ ঘরের মাঝামাঝি বসে ছিল, এবারে সে খানিকটা ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাভলি এবং নিশির কাছাকাছি হেঁটে এসে বলল, তুমি একটা জিনিস জান? আমি কিন্তু তোমাকে তুমি হিসেবে ঘৃণা করি না। নিশি নামক একটি নির্বোধ মহিলা হিসেবে তুমি কিন্তু খুব খারাপ নও। বলা যেতে পারে একটা নির্বোধ মহিলার পক্ষে যতটুকু ভালো হওয়া সম্ভব তুমি মোটামুটি তাই। আমি তোমাকে ঘৃণা করি একটি মেয়ে হিসেবে। তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে যে তুমি একজন মেয়ে। বড় ধরনের সার্জারি না করে তুমি এর থেকে মুক্তি পাবে না। মেয়েমানুষ বিবর্তনের খুব বড় একটি ক্রটি।।

নিশির চোখ থেকে আগুন বের হতে থাকে। সে জোরে জোরে কয়েকবার নিশ্বাস নিয়ে বলল, আমি অনেক কষ্ট করে নিস্ত্রেকে শান্ত রাখছি। একটা লোহার রড দিয়ে আঘাত করে তোমার খুলি গুড়ো করে দেওয়া উচিত।

অশুন হালকা পায়ে একটা নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে বলল, তুমি না হয়ে অন্য কোনো মেয়ে হলে সম্ভবত তাই করত। আমার ধারণা নির্বোধ মেয়ে প্রজাতির তুমি মোটামুটি একটি গ্রহণযোগ্য সদস্য।

নিশি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, অশুন, তুমি কোনো দিন প্রাচীন ইতিহাস পড়েছ?

হ্যাঁ। কিছু পড়েছি।

তুমি জান আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে পৃথিবীর সব পুরুষ তোমার মতো চিন্তা করত? তাদের সবাই ভাবত পৃথিবীতে পুরুষ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ? নারী হচ্ছে দুর্বল? তুমি যে একজন আদিম মানুষ সেটি কি জান?

অশুন মাথা নাড়ল, হ্যাঁ জানি। আমি একজন প্রাচীন মানুষের মতো চিন্তা করি। প্রাচীন সবকিছু কিন্তু ভুল নয়, প্রাচীন অনেক কিছু সত্যি। অনেক কিছু খুঁটি। প্রাচীনকালে মানুষ অনেক কিছু অভিজ্ঞতা থেকে আবিষ্কার করেছিল, তার বেশিরভাগ ছিল সত্যি। এটিও তাই। মেয়ে হচ্ছে নিকৃষ্ট জীব। সত্যি স্বীকার করে নাও নিশি।

নিশি তীব্র দৃষ্টিতে অশুনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি জান এই কথাগুলো বলে তুমি প্রমাণ করেছ যে তুমি একটি আকাট নির্বোধ? আহাম্মকঃ বুদ্ধিহীন জড়পদার্থ? অশিক্ষিত মূর্খ? জংলি ভূত?

অশুন শব্দ করে হেসে বলল, অপ্রিয় সত্যি কথা সবার ভালো নাও লাগতে পারে।

তুমি কি হিটলারের নাম শুনেছ? যে মনে করত একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ। তুমি কি জান তার কী অবস্থা হয়েছিল? ইতিহাস তাকে কীভাবে আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলেছিল তুমি জান?

জানি।

তোমার মতো একটা মূখ আহাম্মক বুদ্ধিহীন জড়পদার্থ অশিক্ষিত জংলি ভূতের সেই একই অবস্থা হবে। চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই জানি তবুও আমি চেষ্টা করে দেখি তোমাকে খানিকটা জ্ঞান দেওয়া যায় কি না! তুমি কি জান মায়ের গর্ভে প্রতিটি সন্তান প্রকৃতপক্ষে মেয়ে হয়ে বড় হতে থাকে, ওয়াই ক্রমোজম শুধুমাত্র মেয়ে হয়ে গড়ে ওঠাকে বন্ধ করে দেয়। আর সেই ব্যাপারটিকে বলা হয় পুরুষ। তুমি কি জান পুরু বলে আসলে কোনো প্রজাতি নেই? যারা মেয়ে হয়ে বড় হতে পারে নি সেটাই হচ্ছে পুরুষ–তুমি কি এটা জান?

অশুন মাথা নাড়ল। বলল, হ্যাঁ। আমি শুনেছি।

শুনেছ। কিন্তু বিশ্বাস কর নি।

আমি বিশ্বাস করলেই কী আর না করলেই কী আসে যায়?

অনেক কিছু আসে যায়। তুমি কি আসলেই গর্দভ নাকি শুধু গর্দভের ভান করছ সেটা আমার জানা দরকার।

অশুন ক্রুদ্ধ চোখে নিশির দিকে তাকাল। নিশি তার মুখে শ্লেষের হাসি ফুটিয়ে বলল, তুমি জান মানব প্রজাতির অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য আসলে পুরুষ মানুষের কোনো প্রয়োজন নেই? তুমি জান শুধুমাত্র মেয়েদের দিয়ে মানুষের অস্তিত্ব বাচিয়ে রাখা যায়? তুমি জান মানুষের ক্লোন করার জন্য পুরুষের প্রয়োজন হয় না শুধুমাত্র নারীদের দিয়েই ক্লোন করা সম্ভব।

হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু এটা দিয়ে তুমি কী বোঝাতে চাইছ?

নিশি মাথা নেড়ে বলল, আমি কী বোঝাতে চাইছি সেটা যদি তুমি এখনো বুঝতে না পার তা হলে আমি নিশ্চয়ই আমার সময় নষ্ট করছি। তোমার বুদ্ধিমত্তা যদি শিম্পাঞ্জির কাছাকাছি হয়ে থাকে তা হলে আমার সম্ভবত তোমার সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ হয় না!।

অশুন মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে বলল, এমনও তো হতে পারে যে তুমি মেয়েদের স্বভাবসুলভ জড়তার, বুদ্ধিহীনতার কারণে সহজে একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে পারছ না।

না, সেটা হতে পারে না। কিন্তু তবু তুমি যদি চাও আমি তোমাকে আরো পরিষ্কার কথা বলতে পারি। আমি বলতে চাইছি এটি বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্য যে পুরুষ হচ্ছে বাহুল্য। অশুন, তোমার ভাগ্য খুব ভালো যে তুমি এই সময়ে পুরুষ হিসেবে জন্ম নিয়েছ। আজ থেকে কয়েকশ বছর পর পুরুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার চেষ্টা কর নি। তা হলে তোমার জন্ম হত না। কারণ বসন্ত রোগের জীবাণুকে যেভাবে পৃথিবী থেকে অপসারণ করা হয়েছে প্রকৃতি ঠিক সেভাবে তোমাদের মতো পুরুষকে পৃথিবী থেকে অপসারণ করত।

অন অবাক হয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি সত্যিই এটা বিশ্বাস কর, নাকি আমার সাথে ঝগড়া করার জন্য এটা বলছ?।

নিশি বলল, এর মাঝে বিশ্বাস করা না করার কী আছে? এটি বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্য বিশ্বাস করা না করার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞান বলেছে বংশ বৃদ্ধি করার জন্য পুরুষ মানুষের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রকৃতি বাহুল্যকে সহ্য করে না–প্রকৃতি পুরুষকেও সহ্য করবে না!

অন এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তুমি বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্যের কথা বলছ কিন্তু বিজ্ঞানের অবদানের কথা বলছ না?

বিজ্ঞানের কোন অবদান?

মানুষের জন্ম প্রক্রিয়ার ব্যাপারটি। পুরুষ আর মহিলার এক ধরনের জৈবিক প্রক্রিয়া দিয়ে শিল্প জন্ম হত। শিশুর জন্ম নিশ্চিত করার জন্য প্রকৃতি সেই জৈবিক প্রক্রিয়ার মাঝে এক ধরনের আনন্দের ব্যবস্থা রেখেছিল। তুমি কি জান মানুষের মস্তিষ্কে স্টিমুলেশন দিয়ে এখন কৃত্রিমভাবে তার থেকে এক শ গুণ বেশি আনন্দ দেওয়া সম্ভব? তুমি কি জান শিশুর জন্ম দেওয়ার জন্য সেই জৈবিক প্রক্রিয়া এখন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়? তুমি কি জান যে এখন একটি শিশুর জন্ম দেওয়ার জন্য পুরুষ কিংবা মহিলা কিছুরই প্রয়োজন নেই? হিসাব করে সাজিয়ে রাখা কিছু ডিএনএ দিয়ে একটা জৈব ল্যাবরেটরিতে এখন যে মানুষের জন্ম দেওয়া যায় সেটা তুমি জান?

জানি।

অশুন এক ধরনের উত্তেজনা নিয়ে বলল, ত্রা হলে ভবিষ্যতে যে মানব শিশুর জন্ম হবে ল্যাবরেটরিতে, তাদের যে বড় করা হবে কমিউনে সেটা কি তুমি অনুমান করতে পারছ না? এখন মেয়েদের একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানকে গর্ভধারণ করা এবং সন্তানের জন্ম দেওয়া। জন্ম দেওয়ার সেই প্রক্রিয়াটিই যখন উঠে যাবে তখন এই পৃথিবীতে মেয়েদের যে কোনো প্রয়োজনই থাকবে না তুমি কি সেটা জান না?

নিশি কয়েক মুহূর্ত অবাক হয়ে অন্তনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি সত্যিই আমাকে এটা বিশ্বাস করতে বলো?

হ্যাঁ বলি। অশুন কঠিন মুখে বলল, সত্যকে স্বীকার করে না, কারণ সত্য তোমাকে মুক্তি দেবে।

নিশি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, মানুষ নির্বোধ হলে খুব সুবিধা। তখন তাদের খুব ছোট একটা জগৎ হয় আর সেই বোকার জগতে তারা মহানন্দে বেঁচে থাকতে পারে। তুমিও সেরকম বোকার একটা স্বর্গে মহানন্দে বেঁচে আছ। কৃমি যেরকম বিষ্ঠায় বেঁচে থাকে অনেকটা সেরকম! কী আশ্চর্য, এই যুগে একজন মানুষ বলছে ভবিষ্যতে এই পৃথিবীতে থাকবে শুধু পুরুষ!

অগুন জোরগলায় বলল, অবিশ্যি থাকবে শুধু পুরুষ। পুরুষ মানুষ শক্তিশালী, ভাদের বুদ্ধিমত্তা বেশি, তারা বেশি সৃজনশীল, তারা কর্মঠ, তাদের রসবোধ তীক্ষ্ণ, তারা ত্যাগী, তারা আত্মবিশ্বাসী তারা সবদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ। প্রকৃতি কেন তা হলে এই শ্রেষ্ঠ প্রজাতিকে বেছে নেবে না? মেয়েদের একমাত্র দায়িত্ব সন্তান জন্ম দেওয়া, সেটিই যখন তাদের হাতে থাকবে না তখন তাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনটা কোথায়? তারা তখন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল। তারা নোংরা আবর্জনা।

নিশি তীব্র দৃষ্টিতে অশুনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমার ধারণাটা সত্যি কি না সেটা পরীক্ষা করে দেখতে চাও?

অশুন ভুরু কুঁচকে বলল, সেটা কীভাবে করা হবে?

আমি তোমাকে একটা চ্যালেঞ্জ দেব। সেই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ কর।

কী চ্যালেঞ্জ?

তুমি জান প্রযুক্তি এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইচ্ছে করলে একজন মানুষকে শীতলঘরে কয়েক হাজার বছর রেখে দেওয়া যায়।

অশুন ভুরু কুঁচকে বলল, হ্যাঁ জানি।

তোমাকে আমি চ্যালেঞ্জ করছি যে আমার সাথে এরকম একটি শীতলঘরে এক হাজার বছর থেকে বের হয়ে এসে দেখবে কার কথা সত্যি। তোমার না আমার?

অশুন অবাক হয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে কি ঠাট্টা করছে নাকি সত্যি কথা বলছে। কিন্তু নিশির চোখে-মুখে ঠাট্টার কোনো চিহ্ন নেই। সে ইতস্তত করে বলল, কিন্তু এটি বেআইনি কাজ। পৃথিবীতে এভাবে ভবিষ্যতে যাওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে।

নিশি শব্দ করে হেসে বলল, এই আইনকে ফাঁকি দেওয়ার অনেক উপায় আছে অসুন।

কিন্তু–

অশুনকে বাধা দিয়ে নিশি বলল, আমি জানি আমার এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সাহস তোমার নেই। অশুন তুমি আর দশটা পুরুষ মানুষের মতো ভীতু, দুর্বল এবং কাপুরুষ। সবচেয়ে বড় কথা তুমি খুব ভালো করে জান তুমি যদি আমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এক হাজার বছর ভবিষ্যতে যাও তা হলে হিমঘর থেকে কের হয়ে দেখবে সারা পৃথিবীতে শুধু মেয়ে, পুরুষ মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। তোমাকে যখন দেখবে আমি নিশ্চিত তোমাকে চিড়িয়াখানায় উলঙ্গ করে রেখে দেবে। ভবিষ্যতের মেয়েরা টিকিট কেটে তোমাকে দেখতে আসবে চিড়িয়াখানায়! সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এই মানব প্রাণীটি কেমন করে পৃথিবীতে এসেছিল সেটা নিয়ে কথা বলে তারা সম্ভবত হাসতে হাসতেই মারা যাবে!

অশুন মুখে শ্লেষের হাসি ফুটিয়ে বলল, আর যদি ঠিক তার উল্টো হয়? যদি দেখা যায় সবাই পুরুষ মহিলা বলে কিছু নেই এবং তোমাকেই যদি উলঙ্গ করে চিড়িয়াখানায় রেখে দেয়?

নিশি মুখে বিচিত্র একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, সেটাই যদি তুমি বিশ্বাস কর তা হলে আমার চ্যালেঞ্জটুকু গ্রহণ করার সাহস তোমার নেই কেন?

কে বলেছে সাহস নেই?

তা হলে আমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ কর।

অশুন কঠোর মুখে বলল, অবশ্যই গ্রহণ করব। কেন গ্রহণ করব জান?

কেন?

যখন আমরা হিমঘর থেকে বের হয়ে আসব, তখন তোমাকে যেভাবে টেনেহিচড়ে ধ্বংস করে প্রকৃতিকে ত্রুটিমুক্ত করবে সেই দৃশাটি দেখার জন্য। এই দৃশ্যটি দেখে আমি যে আনন্দ পাব পৃথিবীর আর কেউ সে আনন্দ কোনো দিন পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।

নিশি মাথা নাড়ল। বলল, আমি তোমার মনের ভাবটি ঠিক ঠিক বুঝতে পারছি অশুন। আমি ঠিক জানি তুমি কী ভাবছ—কারণ আমিও ঠিক একই জিনিস ভাবছি। তোমাকে ধ্বংস হতে দেখার চাইতে বেশি আনন্দ পৃথিবীতে আর কিছুতে নেই। এই পরিচিত জগৎ থেকে এক হাজার বছর ভবিষ্যতের অনিশ্চিত জ্বগতে যেতে আমার কোনো দ্বিধা নেই শুধু এই একটি কারণে, আমি এই তীব্র আনন্দটুকু পেতে চাই। এই আনন্দটুকুর জন্য আমি সবকিছু দিতে পারি।

চমৎকার।

নিশি শীতল গলায় বলল, তুমি তা হলে আমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলে?

হ্যাঁ করছি।

নিশি এবং অশুন একজন আরেক জনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে এত ভয়ংকর ঘৃণা প্রকাশ পেতে থাকে যে নিজের অজান্তেই দুজনের বুক কেঁপে ওঠে।

* * * * *

স্টিল ভন্টের দরজা খুলে নিশি এবং অশুন হিমঘর থেকে বের হয়ে এল। পৃথিবীতে এর মাঝে এক হাজার বছর পার হয়ে গেছে, যদিও এই দুজনের কাছে মনে হচ্ছে মাত্র কিছুক্ষণ আগে তারা এর মাঝে প্রবেশ করেছে।

নিশি অণ্ডনের দিকে তাকিয়ে বলল, কী আশ্চর্য! আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে তোমার মতো একটি নর্দমার কীটের সাথে আমি এক হাজার বছর কাটিয়ে দিয়েছি!

হ্যাঁ। অশুন একটি নিশ্বাস ফেলে বলল, ভাগ্যিস আমার দেহ কয়েক ডিগ্রি কেলভিন তাপমাত্রায় ছিল, তোমার কাছে অচেতন না হয়ে থাকার কথা কল্পনা করা যায়?

নিশি ছটফট করে বলল, আমার আর অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই। আমি এই মুহূর্তে বের হয়ে যেতে চাই। দেখতে চাই পৃথিবীতে শুধু মেয়ে আর মেয়ে। আমি চাই তারা মুহূর্তে তোমাকে ধরে নিয়ে যাক, তোমাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলুক।

হ্যাঁ। অশুন মাথা নেড়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। আমিও আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমরা যখন বের হব তারপর আর হয়তো তোমার সাথে দেখা হবে না। তোমাকে শেষ একটি কথা বলে যাই।

কী কথা?

তোমাকে যখন ধ্বংস করতে নিয়ে যাবে তখন তুমি একটি জিনিস ভেবে আনন্দ পাবার চেষ্টা করো।

নিশি জিজ্ঞেস করল, কী জিনিস?

তোমার মৃত্যুটি আমাকে অপূর্ব এক ধরনের আনন্দ দেবে। অচিন্তনীয় আনন্দ। তোমার কারণে আমি এই আনন্দটি পেতে পেরেছি।

সেটি নিয়ে কথা না বলে পরীক্ষা করেই দেখা যাক। চল আমরা বাইরে যাই। মানুষ খুঁজে বের করি।

হ্যাঁ চল। অশুন বলল, আর কিছুক্ষণ পর তোমাকে আর কখনোই দেখতে হবে না ব্যাপারটি চিন্তা করেই আনন্দে আমার নাচতে ইচ্ছে করছে।

নিশি মুচকি হেসে বলল, দেখা যাক কে সত্যিই নাচে।

নিশি এবং অশুন বাইরে এসে আবিষ্কার করল চারপাশের পৃথিবীটি তারা যেরকম কল্পনা করেছিল প্রায় সেভাবেই গড়ে উঠেছে। মানুষ প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ না করে তার সাথে সহাবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে চারপাশে এক ধরনের শান্ত কোমল পরিবেশ বড় বড় গাছ, নির্মেঘ আকাশ, হ্রদে টলটল জলরাশি। তারা যেখানে আছে সেটি একটি বনাঞ্চল। চারপাশে বিচিত্র বুনোফুল, সেখানে প্রজাপতি খেলা করছে। গাছের ডালে পাখির কিচিরমিচির শব্দ, বাতাসে হেমন্তকালের শীতল বাতাসের স্পর্শ।

দুজনে প্রায় আধাঘণ্টা হেঁটে প্রথমবার একটি লোকালয়কে খুঁজে পেল। ছবির মতো সুন্দর বাসার সামনে নানা বয়সী মানুষ একটি আনন্দমুখর পরিবেশে হইচই করছে। নিশি এবং অশুন নিশ্বাস বন্ধ করে মানুষগুলোর দিকে এগিয়ে যায়। প্রথমে একটি শিশু তাদের দেখে হঠাৎ আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকে এবং অন্যরা তাদের দিকে এগিয়ে আসে, কিছুক্ষণের মাঝেই নানা বয়সী মানুষ এক ধরনের বিস্ময়াভিভূত চোখ নিয়ে তাদের ঘিরে পাড়ায়। নিশি এবং অশুন মানুষগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করে এরা কি পুরুষ নাকি নারী? কিন্তু তারা বুঝতে পারে না। মানুষগুলো অবোধ্য ভাষায় কথা বলছে, তারা কিছু বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণের মাঝেই একজন একটি ভাষা অনুবাদক যন্ত্র নিয়ে আসে। মধ্যবয়স্ক মানুষটি সেটি মুখে লাগিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কী? তোমরা কোথা থেকে এসেছ?

নিশি এবং অন একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, এটি কী ধরনের প্রশ্ন? অন বলল, আমরা মানুষ। আমরা সুদূর অতীত থেকে এসেছি।

কী আশ্চর্য! কম বয়সী একজন আশ্চর্যধ্বনি করে বলল, তোমরা দুজন দেখতে দুরকম কেন?

নিশি এবং অশুন এই প্রথমবারের মতো নিজেদের ভেতর সূক্ষ্ম এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করে। নিশি কঁপা গলায় বলল, আমরা দুজন দেখতে দুরকম কারণ আমাদের একজন নারী অন্যজন পুরুষ।

নিশির কথা শুনে আতঙ্কের একটা শব্দ করে সবাই এক পা পিছিয়ে যায়। মানুষগুলো ফিসফিস করে ভয় পাওয়া গলায় বলে, সর্বনাশ! পুরুষ নারী!

মানুষগুলো একটু দূর থেকে তাদের ভয় পাওয়া চোখে দেখতে থাকে। ছোট ছোট শিশুগুলো বড়দের পেছনে লুকিয়ে যায়। মধ্যবয়স্ক মানুষটি কঁপা গলায় বলল, সর্বনাশ হয়েছে। প্রাচীনকালের পুরুষ আর নারী চলে এসেছে! এক্ষুনি নিরাপত্তাকর্মীদের ডাক।

নিশি অবাক হয়ে বলল, তোমরা এত অবাক হচ্ছ কেন? তোমরা কি নারী না পুরুষ?

মানুষগুলো কোনো কথা না বলে অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিশি এবং অশুন বুঝতে পারে মানুষগুলোর চেহারা পুরুষ বা নারী দুইই হতে পারে। তারা আগে কখনো এরকম চেহারার মানুষ দেখে নি। অশুন বলল, তোমরা কথা বলছ না কেন? তোমরা কি পুরুষ না নারী?

মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, নারী-পুরুষ এইসব আদিম বিভাজন বহুঁ আগে শেষ হয়ে গেছে। এখন এখানে নারী-পুরুষের মতো কোনো ভাগ নেই। এখানে সবাই মানুষ!

কিন্তু—কিন্তু–

কিন্তু কী?

নারী আর পুরুষ যদি না থাকে তা হলে শিশুদের জন্ম হয় কেমন করে?

শিশুদের জন্ম হয় না। ডিজাইন করে তৈরি করা হয়।

কে তৈরি করে।

আমাদের ল্যাবরেটরিতে।

নিশি কাঁপা গলায় বলল, তোমরা তোমাদের শিশুদের ভালবাস?

কেন ভালবাসব না? আমাদের সবাইকে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে। বুদ্ধি দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে, স্বপ্ন দিয়ে। তোমরা সেটা বুঝবে না।

কেন বুঝব না? নিশি প্রশ্ন দৃষ্টিতে বলল, না বোঝার কী আছে?

আমরা জানি প্রাচীনকালে মানুষের মস্তিষ্ক অপরিণত ছিল। তারা পুরুষ-মহিলা, সাদাকালো, জাতি-ধর্ম-ভাষা এসব নিয়ে মাথা ঘামাত। এখন আমরা তার ঊর্ধ্বে এসেছি।

কিন্তু–অশুন বলল, কিন্তু–

তোমরা বুঝবে না। মধ্যবয়স্ক মানুষটি এক ধরনের ভয় পাওয়া গলায় বলল, আমার মনে হয় তোমাদের এখনই নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে যাওয়া দরকার।

নিশি এবং অশুন ঠিক তখন এক ধরনের চাপা যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পেল। তারা চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল, আকাশপথে নিরাপত্তাকর্মীরা আসছে। নিশি এবং অন একজন। আরেকজনের দিকে তাকাল, তাদের দৃষ্টিতে ঘৃণার সাথে সাথে এই প্রথমবারের মতো আতঙ্কের ছায়া ফুটে ওঠে।

* * * * *

ভবিষ্যতের পৃথিবীতে নিশি এবং অশুন দীর্ঘদিন বেঁচে ছিল। তাদেরকে একটা ছোট ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি একজনের প্রতি অন্যজনের প্রচণ্ড ঘৃণা তাদেরকে এই দীর্ঘসময় বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিল