তৃতীয় পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#রুহান_রুহান - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
পাহাড়ের উপর থেকে নিচের উপত্যকাটির দিকে তাকিয়ে রিদি বলল, এই হচ্ছে সেই লাল পাহাড়।
রুহান বলল, এটা লালও না পাহাড়ও না তাহলে এর নাম লাল পাহাড় কেন?
রিদি হেসে বলল, আমাকে জিজ্ঞেস করো না। আমি এর নাম দিই নি।
তুমি এখানে আসতে চেয়েছ–এটা সম্পর্কে নিশ্চয়ই তুমি জান।
এমন কিছু জানি না, শুধু শুনেছি এই লাল পাহাড়টা কারো এলাকা না। সবার ভেতরে একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে যে এটা কেউ দখল করে নেবে না।
কেন?
রিদি ঘাড় বাঁকিয়ে বলল, সবারই ব্যাবসাপাতি করতে হয়। অস্ত্র কিনতে হয়। সৈনিক বিক্রি করতে হয়। যন্ত্রপাতি ঠিক করতে হয়। তাই লাল পাহাড়টা এই সব করার জন্যে রেখে দিয়েছে।
রুহান আঁকাবাঁকা রাস্তাটির দিকে তাকিয়ে রইল, সেটা পাহাড় ঘিরে নিচে উপত্যকায় নেমে গেছে। তাদেরকে এই পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে নেমে যেতে হবে। এরকম বেশ কয়েকটি রাস্তা চারদিক থেকে এসেছে। ওরা ইচ্ছে করলে ক্ৰিভনকে নিয়ে একেবারে উপত্যকায় নেমে যেতে পারত কিন্তু তা না করে এখানে নেমে পড়েছে। ক্রিভনের গলায় একটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র চেপে ধরে রেখে বিশাল একটা বুলেটপ্রুফ গাড়ি করে শহরের ভেতর ঢুকলে শহরের সব মানুষ নিশ্চয়ই বিস্ফারিত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা কারো চোখে আলাদা করে পড়তে চায় না, যে ঘটনা ঘটিয়ে এসেছে সেটা নিশ্চয়ই কয়েকদিনে জানা-জানি হয়ে যাবে কিন্তু তারাই যে সেই ঘটনার নায়ক সেটা তারা কাউকে জানতে দিতে চায় না। তাই দুজনে মাঝপথে নেমে গেছে, বাকীটা হেঁটে যাবে।
রিদি বলল, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে চল হাঁটি। পাহাড় ঘিরে পথটা গেছে, অনেকদূর হেঁটে যেতে হবে।
উঁহু। রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমাদের এখন রওনা দেয়া ঠিক হবে না।
কেন?
অনেকটা পথ। কমপক্ষে তিন চার ঘণ্টা তো লাগবেই। এখন এই রাস্তা আমাদের এতক্ষণ থাকা ঠিক না।
কেন? রাস্তায় থাকলে কী হবে?
ক্ৰিভনকে আমরা যেভাবে ধরে এনেছি সেটা একটা যুদ্ধবাজ নেতার জন্যে খুব বড় অপমান। বিশেষ করে এত হাজার হাজার মানুষের সামনে-
হ্যাঁ। সেটা ভুল বল নি।
রুহান বলল, সেই অপমান থেকে রক্ষা পাবার তার এখন একটাই পথ।
রিদি মাথা নেড়ে বলল, আমাদের ধরে নিয়ে দশ হাজার মানুষের সামনে একটা ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয়া?
হ্যাঁ। আমরা ক্ৰিভনকে এখানে ছেড়ে দিয়েছি। ক্ৰিভন জানে আমরা এখন এই পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাব। ঘণ্টা তিনেক লাগবে পৌঁছাতে। সে নিশ্চয়ই এই সময়ে তার দলবল নিয়ে আমাদের ধরতে ফিরে আসবে। কাজেই আমাদের এখন এই রাস্তায় থাকা ঠিক হবে না।
রিদি কিছুক্ষণ রুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ঠিকই বলেছ।
রুহান বলল, রাস্তা দিয়ে না হেঁটে আমরা এই পাহাড়ের ঢালু দিয়ে হেঁটে যাই। আমার মনে হয় আমরা তাহলে অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব।
রিদি আবার মাথা নেড়ে বলল, চমৎকার বুদ্ধি।
যদি দরকার হয় আমরা তাহলে ভালো একটা জায়গায় অপেক্ষা করতে পারি। যদি ক্ৰিভনের দলের সাথে যুদ্ধ করতেই হয় আমরা সেটা করব একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকে।
রিদি বলল, রুহান, তোমার মাথা খুব পরিষ্কার। তোমার মাথায় ইলেকট্রড বসিয়ে যে সক্রেটিস বানায় নি সেটাই আশ্চর্য।
চেষ্টা করেছিল। রুহান বলল, আমি ধোকা দিয়ে বের হয়ে এসেছি। রিদি চোখ বড় বড় করে বলল, আশ্চর্য!
আশ্চর্যের কিছু নেই। এখন চল ঢালু বেয়ে হাঁটতে শুরু করি। অন্ধকার হবার আগে পৌঁছে গেলে খারাপ হয় না।
চল।
দুজন তখন পাহাড়ী ছাগলের মতো পাথরের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে শুরু করে। এই পথ দিয়ে মানুষ হাঁটে না, তাই চারদিক গাছপালা ঝোপঝাড়ে ঢেকে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা গভীর জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল। পাহাড়ী পথে ক্রিভনের লোকজন চলে এলেও তারা কোনোদিন তাদের খুঁজে পাবে না।
একটা পাহাড়ী ঝর্ণার কাছে বসে তারা যখন ঘষে ঘষে তাদের মুখের রং ওঠানোর চেষ্টা করছিল তখন তারা অনেকগুলো সাজোয়া গাড়ির শব্দ শুনতে পেল। গাড়িগুলো কর্কশ শব্দ করতে করতে রাস্তায় ছোটাছুটি করছে। অনেক মানুষের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর এবং কিছু বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির শব্দও তারা শুনতে পেল। নিশ্চয়ই ক্রিভনের বাহিনী এসে তাদের খোঁজ করছে, তারা যেখানে আছে সেখানে কখনোই তারা খুঁজে পাবে না। ঘণ্টাখানেক পর রুহান আর রিদি আবার সাজোয়া গাড়িগুলোর কর্কশ শব্দ শুনতে পেল, তাদের খুঁজে না পেয়ে সেগুলো ফিরে যেতে শুরু করেছে।
রিদি রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার সন্দেহটা একেবারে একশ দশ ভাগ সত্যি ছিল।
রুহান বলল, তার অর্থ কী জান?
কী?
আমি এখন অপরাধীদের মতো চিন্তা করি।
রিদি শব্দ করে হেসে বলল, অপরাধীর মতো চিন্তা করা অপরাধ না, অপরাধীর মতো কাজ করা হচ্ছে অপরাধ।
রুহান বলল, কিন্তু তুমি আসল বিষয়টা ভুলে যাচ্ছ। অপরাধীর মতো চিন্তা করা অপরাধ না হতে পারে কিন্তু এটা খুব কষ্ট। আমি আগে এরকম ছিলাম না।
রিদি রুহানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি কী একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ?
কী?
আমরা দুজন একজন আরেকজন সম্পর্কে কিছুই জানি না।
রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমাদের একজন আরেকজনকে খুন করার কথা ছিল। অথচ এখন একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে পারব না। বেঁচে থাকার জন্যে তোমার আমাকে আর আমার তোমাকে দরকার।
রিদি এক দৃষ্টে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রুহান জিজ্ঞেস করল, কী লো? তুমি এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেন?
তোমাকে দেখছি।
আমাকে কী দেখছ?
যে মানুষটার সাথে আমার থাকতে হবে তার চেহারাটা কেমন সেটা এখনো ভালো করে দেখতে পারি নি। তোমার চেহারাটা দেখার চেষ্টা করছিলাম, তুমি কী জান—
জানি।
রিদি অবাক হয়ে বলল, কী জান?
তুমি নিশ্চয়ই বলতে চাইছ ঝর্ণার পানি দিয়ে আমি আমার মুখের রং ধুতে পারি নি। উল্টো সেই রং ছড়িয়ে পড়ে এখন আমাকে একটা ভূতের মতো দেখাচ্ছে।
রিদি শব্দ করে হেসে বলল, হ্যাঁ, আমি সেটাই বলতে যাচ্ছিলাম। তবে তুমি যখন নিজেই এটা আবিষ্কার করেছ তার একটাই অর্থ। আমিও আমার মুখের রং ধুতে পারি নি। আমাকেও নিশ্চয়ই ভূতের মতোই লাগছে!
ঠিকই অনুমান করেছ। চেষ্টা করে লাভ নেই। চল আগে লোকালয়ে যাই। তখন একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
লোকালয়ের মানুষেরা আমাদের দেখে ভয় পেয়ে যাবে।
তোমার তাতে কোনো আপত্তি আছে?
না। কোনো আপত্তি নেই। রিদি উঠে দাঁড়াল। বলল, চল যাই। তুমি বিশ্বাস করবে কী না জানি না, আমার খিদে পেতে শুরু করেছে।
রুহান বলল, অবশ্যই বিশ্বাস করব। আমারও ভয়ঙ্কর খিদে পেয়েছে। লাল পাহাড়ে গিয়ে ভালো কিছু খেতে পাব তো?
পাব। নিশ্চয়ই পাব।
দুজন আবার ঝোপঝাড় ভেঙ্গে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে থাকে।
রুহান এবং রিদি ভেবেছিল লাল পাহাড়ে পৌঁছানোর পর তাদের বিচিত্র পোশাক, রং মাখা মুখ এবং শরীরে ঝুলিয়ে রাখা নানা ধরনের অস্ত্র দেখে নিশ্চয়ই তাদের ঘিরে একটা ভিড় জমে যাবে, কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা কারণটা বুঝে গেল। পুরো লাল পাহাড় এলাকাটাই আসলে বিচিত্র মানুষের এলাকা। অনেক মানুষই মুখে বিচিত্র রং লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অনেকের পোশাক বিচিত্র, অনেকেই নানা ধরনের অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরো এলাকাটা একটা বড় মেলার মতো, নানা ধরনের আনন্দোৎসবের ব্যবস্থা রয়েছে। নানা ধরনের দোকানপাট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নানা ধরনের মানুষের ভিড়ে পুরো এলাকাটা গমগম করছে। এখানে নানা বয়সের নারী আর পুরুষ রয়েছে কিন্তু কোনো শিশু কিশোর নেই। দেখেই বোঝা যায় এই এলাকাটি ক্ষণস্থায়ী, মানুষ এখানে আসবে কিছু সময় কাটিয়ে চলে যাবে। কেউ এখানে পাকাপাকিভাবে থাকবে না।
রিদি মানুষের ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, রুহান জায়গাটা আমার পছন্দ হয়েছে।
রুহান হেসে বলল, আমরা যেরকম জায়গা থেকে এসেছি তারপর সরাসরি নরক না হলেই জায়গাটা আমাদের পছন্দ হবার কথা।
রিদি বলল, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ? এখানকার মানুষের চোখে মুখে সেই ভয় আর আতঙ্ক নেই।
হ্যাঁ। অনেকের মুখে হাসি। রুহান নিজেও হাসার চেষ্টা করে বলল, হাসতে কেমন লাগে ভুলেই গেছি।
রিদি বলল, পেটে কিছু পড়লে তুমিও হাসতে পারবে।
খুঁজে খুঁজে দুজনে একটা ভালো খাওয়ার জায়গা বের করল। পাথরের একটা বাসার সামনে চেয়ার টেবিল সাজানো। কাছেই পাথরের চুলোতে গনগনে আগুনে সত্যিকারের মাংস মশলা মাখিয়ে ঝলসানো হচ্ছে। অনেক মানুষের ভিড় তার মধ্যে দুজনে ঠেলেঠুলে একটা টেবিল দখল করে নিল। কমবয়সী একটা মেয়ে তাদের টেবিলে উত্তেজক পানীয়ের একটা জগ দিয়ে গেল। পাথরের গ্লাসে ঢেলে এক চুমুক খাওয়ার পরেই তাদের মন ভালো হয়ে যায়। তারা বসে বসে পা দুলিয়ে চারপাশের মানুষগুলোকে দেখতে থাকে।
তোমাদের সাথে বসতে পারি? গলার স্বর শুনে দুজনে তাকিয়ে দেখে মাঝবয়সী একজন মানুষ, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখ দুটো জ্বলজ্বলে এবং অস্থির।
রুহান পা দোলানো বন্ধ করে বলল, হ্যাঁ, পার।
রিদি বলল, ইচ্ছে করলে আমাদের পানীয়ও এক ঢোক খেতে পার।
মানুষটি তাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, তোমরা নিশ্চয়ই এই এলাকার মানুষ নও।
কেন?
এই এলাকার মানুষেরা পরিচয় হবার আগেই কাউকে তার পানীয়তে ভাগ বসাতে দেয় না।
রিদি আর রুহান দুজনেই শব্দ করে হাসল। রুহান বলল, অন্যদিন তোমাকে এত সহজে আমাদের পানীয়তে ভাগ বসাতে দেব না। আজ দিচ্ছি। আজ আমাদের মনটা খুব ভালো।
মানুষটা জিজ্ঞেস করল, কেন? তোমাদের মন ভালো কেন?
রুহান সরাসরি উত্তর দিল না, বলল, অনেকগুলো কারণ আছে, তোমাকে কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি? তা ছাড়া মন ভালো হতে কী আর কারণের দরকা। হয়? এই উত্তেজক পানীয় এক ঢোক খেলেই মন ভালো হয়ে যায়।
মানুষটি মাথা নেড়ে তার পানীয়ে চুমুক দিয়ে বলল, সেটা ঠিকই বলেছ। একটা সময় ছিল যখন সবসময়ে মানুষের মন খারাপ থাকত–কখন কী হয় সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করত। এখন উল্টো। ধরেই নিয়েছে জীবনটা যে কোনো সময় শেষ হয়ে যাবে। তাই যে কয়দিন আছে সেই কয়দিন ফূর্তি করে নাও।
রিদি আর রুহান দুজন কোনো কথা না বলে অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ল। মানুষটি বলল, তোমরা এখানে নতুন এসেছ?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
লাল পাহাড় ঘুরে দেখেছ?
না। এখনো দেখি নি। এখানে কী আছে দেখার মতো?
মানুষটি চোখ বড় বড় করে উৎসাহ নিয়ে বলল, এই এলাকার সবচেয়ে বড় বাজারটি এখানে। এমন কোনো জিনিস নেই যেটা এখানে পাওয়া যায় না। অস্ত্র পাতি গোলাবারুদ থেকে শুরু করে মানুষ মেয়েমানুষ সবকিছু এখানে পাওয়া যায়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। মানুষটি একটু ঝুঁকে বলল, কিনবে তোমরা কিছু? সুন্দরী মেয়েদের একটা চালান আসছে শুনেছি।
রিদি মাথা নেড়ে বলল, না আমরা কিছু কিনব না।
মানুষটার একটু আশাভঙ্গ হলো বলে মনে হলো। বলল, তোমরা এত ক্ষমতাশালী মানুষ, তোমরা যদি কিছু ইউনিট খরচ না কর তাহলে বাজার চালু থাকবে কেমন করে?
রুহান সোজা হয়ে বসে বলল, ক্ষমতাশালী? আমরা? তোমার এরকম ধারণা হলো কেমন করে?
বাহ্! মানুষটা দুই হাত তুলে বলল, তোমরা কী রকম অস্ত্র নিয়ে ঘুরছ দেখেছ? এরকম একটা অস্ত্র কত ইউনিটে বিক্রি হয় জান?
রুহান কিংবা রিদি দুজনের কেউই সেটা জানে না, তবে তারা সেটা প্রকাশ করল না, সাবধানে মাথা নাড়ল।
মানুষটা বলল, সারা লাল পাহাড়ে কারো কাছে এই অস্ত্র নেই, আর তোমাদের একজনের কাছেই আছে তিনটা করে! ক্ষমতা না থাকলে এগুলো হয় না।
রুহান আর রিদি একজন আরেকজনের দিকে তাকাল তারা এই বিষয়টা আগে। এভাবে চিন্তা করে নি। মানুষটা বলল, তোমরা কী কিছু কিনবে? ফূর্তি-ফার্তা করবে?
উঁহু। রুহান মাথা নাড়ল।
মানুষটা মাথা আরেকটু এগিয়ে আনল, নিচু গলায় ষড়যন্ত্রীর মতো বলল, কোনো গোপন রোগের চিকিৎসা করাতে চাও? আমার পরিচিত ভালো ডাক্তার আছে।
রুহান মাথা নাড়াতে গিয়ে হেসে বলল, না, আমাদের কোনো গোপন রোগ নেই।
আজকাল খুব একটা জনপ্রিয় অপারেশন হচ্ছে। পুরুষ মহিলা হওয়ার অপারেশন। মাত্র সাতদিন ক্লিনিকে থাকতে হয়—
রিদি আর রুহান দুজনেই মাথা নাড়ল। রিদি বলল, রক্ষে কর। এতদিন থেকে পুরুষ মানুষ হয়ে আছি অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আমি মহিলা হতে পারব না।
মানুষটি তবু হাল ছাড়ল না, বলল, আমারও তাই ধারণা। এরকম হাট্টাকাট্টা জোয়ান পুরুষ মানুষ, খামোখা অপারেশন করে মেয়ে হতে যাবে কেন? তোমাদের বরং দরকার বাড়তি পৌরুষত্ব। খুব ভালো হরমোন আছে এখানে। ব্ল্যাক মার্কেটের এক নম্বর জিনিস। লাগবে?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, না লাগবে না।
তাহলে দুই নম্বর হৃৎপিণ্ড? ছোট্ট শিশুর ভালো হৃৎপিণ্ড আছে। বুকের ভতর বসিয়ে দেবে টেরও পাবে না। আসল হৃৎপিণ্ডের সাথে সাথে চলবে। এখন যত পরিশ্রম করতে পার তার ডবল পরিশ্রম করতে পারবে।
রুহান হেসে বলল, না, আমার মনে হচ্ছে একটা হৃৎপিণ্ডতেই আমার বেশ কাজ চলে যাচ্ছে।
মানুষটি এবারে রীতিমতো হতাশ হয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে মনমরা হয়ে বসে পড়ল।
রিদি বলল, যদি একান্তই আমাদের সাহায্য করতে চাও তাহলে বলো রাত কাটানোর জন্যে ভালো একটা জায়গা কোথায় পাব? কোনো হাঙ্গামা হুঁল্লোড় চাই না, শুধু নিরিবিলি ঘুমাব।
রুহান বলল, ঘুমানোর আগে গরম পানিতে ভালো করে রগড়ে গোসল করব।
রিদি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, সেটাও করতে হবে।
এলোমেলো চুলের মানুষটা এবারে সোজা হয়ে বসল। চোখ বড় বড় করে বলল, এখানে চাররকম থাকার জায়গা আছে। প্রথমটা হচ্ছে দামি, অনেক ইউনিট লাগে–
না না না। রুহান বাধা দিল, আমরা খুব কম ইউনিটে থাকতে চাই। সম্ভব হলে কোনো ইউনিট খরচ না করে।
মানুষটা অবাক হয়ে বলল, কোনো ইউনিট খরচ না করে?
হ্যাঁ। মনে করো কাজের বিনিময়ে খাদ্য। কিংবা কাজের বিনিময়ে নিদ্রা।
মানুষটা কিছুক্ষণ তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বল, সত্যি তোমাদের কোন ধরনের কাজ দরকার?
রিদি আর রুহান দুজনেই মাথা নাড়ল। মানুষটা জিজ্ঞেস করল, কা ধরনের কাজ?
রুহান বলল, সেটা ভালো করে জানি না।
তোমাদের কাছে এত রকম অস্ত্র –সেগুলো নিশ্চয়ই ব্যবহার করতে পার?
রুহান আর রিদি একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, রিদি হাসি গোপ করে বলল, একটু একটু পারি।
তাহলে তোমরা হয়তো কোনো ব্যবসায়ীর বডিগার্ড হিসেবে কাজ করতে পারবে। কিংবা কোনো দোকানে নিরাপত্তা কর্মী। কী বলো?
রিদি আর রুহান কোনো কথা না বলে একটু কাঁধ ঝাঁকাল।
তোমরা ইচ্ছে করলে নিজেদের একটা দল খুলতে পার। কিছু মানুষ নিয়ে তাদের ট্রেনিং দিয়ে—
রুহান বলল, ডাকাতের দল? রক্ষে করো!
ডাকাত? ডাকাত বলছ কেন।
অস্ত্র নিয়ে ট্রেনিং দিয়ে হামলা করাকে বলে ডাকাতি।
মানুষটা শব্দ করে হেসে বলল, তোমরা খুব মজার মানুষ। এটা ডাকাতি হবে কেন? এটা এখন সবাই করে।
রিদি কিংবা রুহান কোনো কথা না বলে পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিল। রুহান বলল, তার চাইতে ভালো থাকার জায়গা কোথায় আছে বলো।
তোমরা যদি সোজা হেঁটে যাও, একেবারে পাহাড়ের নিচে দেখবে ছোট ছোট ঘর আছে। রাতের জন্যে ভাড়া দেয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পাহাড়ের নিচে। বলে অবশ্যি রাতে ঝড়ো বাতাসের খুব শব্দ হয়।
হোক। রুহান বলল, ঝড় বাতাস আমার ভালোই লাগে।
মানুষটি এবারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দুজনকে লক্ষ্য করে বলল, আচ্ছা। তোমরা বলবে তোমরা কারা? কী করো, কোথায় থাক?
রিদি বলল, এখনো জানি না। যখন জানব তখন বলব। নিশ্চয়ই বলব।
জান না মানে?
আমাদের দুজনের দেখা হয়েছে আজ দুপুরে। একজন আরেকজনকে ভালো করে চিনিই না। শুধু একজন আরেকজনের নামটা জানি।
মানুষটি কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে হা হা করে হেসে বলল, তোমরা খুব মজার মানুষ। তারপর চোখ টিপে বলল, বুঝতে পারছি সত্যি কথাটি বলতে চাইছ না। না বললে নাই–এখানে কেউ সত্যি কথা বলে না। শুধু আমি বলি। আমার নাম দ্রুচেন। এজেন্ট দ্রুচেন। সবাই চেনে আমাকে। কোনো দরকার হলে আমাকে খবর দিও। আমি নিয়ম মেনে চলি, তোমাদের কাজ জোগাড় করে দেব। দশ ভাগ কমিশন আমার।
ঠিক আছে।
তাহলে তোমরা ডিনার করো, আমি যাই। পানীয়ের জন্যে ধন্যবাদ।
রুহান হাসিমুখে বলল, লাল পাহাড়ের ভেতরের খবর দেবার জন্যে তোমাকেও ধন্যবাদ।
খাওয়া শেষ করে রিদি আর রুহান এলাকাটাতে খানিকক্ষণ ইতস্তত হাঁটে। বাজারের কাছাকাছি এলাকায় নাচ গান হচ্ছে। মানুষজন তাল-লয়হীন বিকট সঙ্গীতের সাথে নাচানাচি করছে। নেশা করে তাদের চোখ মুখ রক্তাভ, চালচলন কথাবার্তা সংযত। তারা সেখানে বেশি সময় না থেকে সরে এলো, আশেপাশে নানা ধরনের দোকানপাট। অস্ত্রের দোকান সবচেয়ে বেশি, সেখানে নানারকম স সাজানো আছে, মানুষজন সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে, কিনছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটা বড় নার্সিং হোম। সেখানে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেচা-কেনা tlk। গাড়ির বেশ বড় বড় দোকান। নানা ধরনের গাড়ি সাজানো রয়েছে। পোশকের অনেকগুলো দোকান। মনে হয় পোশাকের এক ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, বেশিরভাগই বিদঘুটে রঙের বিচিত্র সব পোশাক।
রিদি আর রুহান হাঁটতে হাঁটতে শহরের এক পাশে চলে এলো, সেখানে ছোট ছোট দোকান। রাস্তার পাশে স্থপ করে রেখে নানা ধরনের বিচিত্র পত্র বিক্রি হচ্ছে। ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্যে ফর্মালিনে ড়ুবিয়ে রাখা মানুষের আঙুল, চোখ, জিব। জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে তৈরি করা কিছু বিচিত্র জন্তু। সীসার কৌটায় ভরে রাখা তেজক্রিয় মৌল। বিভিন্ন জাদুঘর থেকে চুরি করে আনা প্রাচীন মূর্তির অংশ। রুহান হঠাৎ অবাক হয়ে দেখল কমবয়সী একজন মানুষ অনেকগুলো বই নিয়ে বসে আছে। সে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে যায়। রিদি জিজ্ঞেস করল, এগুলো কী?
কমবয়সী মানুষটি বলল, জানি না। তাহলে এগুলো বিক্রি করছ কেন?
কমবয়সী মানুষটি দাঁত বের করে হেসে বলল, আমি না জানলে ক্ষতি কী অন্য কেউ তো জানতে পারে।
রুহান বলল, আমি জানি। এগুলোকে বলে বই। আগে যখন মানুষের কাছে ক্রিস্টাল রিডার ছিল না তখন তারা এভাবে তথ্য বাঁচিয়ে রাখত।
রিদি অবাক হয়ে বলল, কী আশ্চর্য! এখানে কীভাবে তথ্য বাঁচিয়ে রাখবে?
রুহান বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে থেমে গেল। কমবয়সী মানুষটা যদি বুঝতে পারে সে বই নামের বিষয়টা সম্পর্কে জানে এমনকী সে অল্প বিস্তর পড়তেও পারে তাহলে শুধু শুধু বইগুলোর দাম বাড়িয়ে দেবে। সে দুই-একটা বই কিনতে চায়। বইগুলো উল্টে পাল্টে সে কয়েকটা বই বেছে নেয়। দাম নিয়ে কিছুক্ষণ দরাদরি করে বইগুলো কেনে। রিদি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী করবে এগুলো দিয়ে?
রুহান কিছু বলার আগেই কমবয়সী মানুষটা বলল, ঘরে সাজিয়ে রাখা যায়। আর নেশা করার কাজে লাগে। কাগজ ছিঁড়ে গোল করে পাকিয়ে ভিসুবিচিরাস নাক দিয়ে টানা যায়। হাশিস খাবার জন্যে আগুন জ্বালাতেও খুব সুবিধা। একটা একটা করে কাগজ ছিঁড়ে আগুন জ্বালাবে।
রিদি একটু চোখ বড় বড় করে মানুষটার দিকে তাকাল। মানুষটা মুখে। হাসি আরেকটু বিস্তৃত করে বলল, তা ছাড়া বাথরুম করার পর মুছে ফেলা। কাজেও লাগানো যায়–
রুহান রিদির হাত ধরে টেনে সরিয়ে নিতে নিতে বলল, চল, বইয়ে। ব্যবহার সম্পর্কে আরো জটিল কিছু বের হওয়ার আগে কেটে পড়ি।
মানুষটি আবার দাঁত বের করে হেসে বলল, আমার কাছে আরো মজার মজার সব বই আছে।
রুহান যেতে যেতে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, তুমি এগুলো কোথা থেকে আনো।
মানুষটি চোখ মটকে বলল, জানতে চাও?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
আমাকে কত ইউনিট দেবে বল?
এক ইউনিটও দেব না। কথা শুনতে ইউনিট দিতে হয় কে বলেছে?
মানুষটা চোখ মটকে বলল, কথার যদি দাম থাকে তাহলে দাম দেবে না?
রুহান মাথা নাড়ল। না, দাম দিয়ে কথা শুনতে হলে কথা শুনবই না।
এক হাজার ইউনিট। মানুষটা মুখ গম্ভীর করে বলল, আমাকে এক হাজার ইউনিট দিলে তোমাকে বলে দেব, এগুলো কোথায় পাওয়া যায়।
রুহান আবার মাথা নেড়ে বলল, কিছু প্রয়োজন নেই।
সে হেঁটে চলে যাচ্ছিল, লোকটা পিছন থেকে চিৎকার করে বলল, ঠিক আছে! পাঁচশ ইউনিট!
রুহান মাথা নেড়ে বলল, এক ইউনিটও না।
রিদি আর রুহান হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পেল মানুষটা পিছন থেকে চিৎকার করে বলল, ঠিক আছে! একশ ইউনিট।
রুহান এবারে আর কথার উত্তর দিল না। মানুষজনের ভিড় ঠেলে হেঁটে একটু এগিয়ে যেতেই কে যেন রুহানের আস্তিন টেনে ধরে। রুহান মাথা ঘুরিয়ে দেখে ঢুলুঢুলু চোখের একজন মানুষ, রুহানের হাতের বইগুলো দেখিয়ে বলল, তুমি এইগুলো ইউনিট খরচ করে কিনেছ?
হ্যাঁ, কেন? কী হয়েছে?
পূর্ব দিকে জঙ্গলের কাছে একটা দালান ভেঙ্গে পড়ে আছে, সেখানে গুলো পড়ে থাকে–হাজার হাজার। পোকা মাকড়ে খায়। আর তুমি বেকুব, এগুলো ইউনিট খরচ করে কিনেছ! তোমাদের মতো বোকা মানুষ আছে বলে অন্যেরা খেয়ে পরে বেঁচে থাকে।
রুহান হাসি চেপে রেখে বলল, কথাটা তুমি ভুল বল নাই। তবে তুমি আমাকে যতটা বোকা ভেবেছ, আমি তত বোকা নই। এই বইগুলো কোথায় পাওয়া যায় সেই খবরের জন্যে আমি কিন্তু একটা ইউনিটও খরচ করি না!
ঢুলুঢুলু চোখের মানুষটা বলল, তোমরা এখানে নতুন এসেছ?
হ্যাঁ।
তোমাদের কিছু লাগবে? কিছু সুন্দরী মেয়ে বিক্রি হচ্ছে।
রুহান আর রিদি একসাথে মাথা নেড়ে বলল, না লাগবে না।
খুব ভালো ক্লিনিক আছে পরিচিত। জটিল অপারেশন করাতে পার। গোপন অসুখ থাকলে-–
রিদি মাথা নেড়ে বলল, না, কোনো গোপন অসুখ নেই আমাদের।
ঢুলুঢুলু চোখের মানুষটা আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিল, রুহান আর রিদি তাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে দ্রুত সামনে হেঁটে যেতে শুরু করল।
দরজাটা ধাক্কা দিতেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল। ঘরের ভেতরে ভ্যাপ। এক ধরনের গন্ধ। আবছা অন্ধকারে দেখা যায় সারি সারি তাক, সেই তাকের উপর অসংখ্য বই। বইগুলো অযত্নে পড়ে আছে, ধূলায় ধূসর।
রুহান একটু এগিয়ে গিয়ে একটা বই টেনে নেয়। পৃষ্ঠা খুলে কী নে? আছে পড়ার চেষ্টা করে, মাছ যেমন করে পানি থেকে অক্সিজেন নেয় সেখানে। তার একটা ব্যাখ্যা লেখা রয়েছে। রিদি একটু অবাক হয়ে রুহানের দি তাকিয়েছিল, জিজ্ঞেস করল, তুমি কী করছ?
বইয়ে কী লেখা আছে সেটা পড়ার চেষ্টা করছি।
রিদি বিস্ফারিত চোখে বলল, কী বললে? পড়ার চেষ্টা করছ?
হ্যাঁ।
তুমি পড়তে পার?
খুব ভাল পারি না। শিখছি।
রিদি ভুরু কুঁচকে বলল, এত কাজ থাকতে তুমি পড়া শিখছ কেন? এটা যেন অনেকটা অনেকটা–
রুহান মুখে হাসি টেনে বলল, অনেকটা কী?
অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে শেখার মতো। তুমি যখন দুই পায়ে হাঁটতে পারো তখন হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে শেখার চেষ্টা করবে কেন? ক্রিস্টাল রিডার দিয়ে সব রকম তথ্য বিনিময় করা যায় তখন কাগজে বর্ণমালা লিখে তথ্য বিনিময় করতে চাইছ কেন?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমি জানি না। তবে—
তবে কী?
আমার কী মনে হয় জান?
কী?
রুহান বলল, আমার মনে হয় কিছুদিন পর আমাদের কাছে আর ক্রিস্টাল রিডার থাকবে না। পৃথিবীতে এত মারামারি কাটাকাটি হচ্ছে যে নতুন করে কেউ ক্রিস্টাল রিডার বানাতেও পারবে না। তখন কী হবে জান?
রিদি কেমন যেন বিচিত্র দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। খানিক্ষণ পর বলল, তুমি সত্যিই এটা মনে করো?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমি মনে করি। শুধু যে ক্রিস্টাল রিডার থাকবে নাম তা না। অস্ত্র থাকবে না। গাড়ি থাকবে না। কাপড় থাকবে না। খাবার থাকবে না!
কী বলছ তুমি?
আমি ঠিকই বলছি। রুহানের মুখটা অকারণেই গম্ভীর হয়ে যায়। সে থেমে থেমে বলল, আমাদের খুব দুর্ভাগ্য আমরা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়ে জন্মেছি। যখন সবকিছু ধ্বংস হচ্ছে। চারপাশে সবাই ডাকাত। জ্ঞান-বিজ্ঞান নেই লেখাপড়া নেই–
রিদি বাধা দিয়ে বলল, সে কী! তুমি দেখি বুড়ো মানুষদের মতো কথা বলতে শুরু করেছ।
রুহান হেসে বলল, ঠিকই বলেছ। আমি মনে হয় বুড়ো হয়ে গেছি। কিন্তু কথাগুলো তুমি খুব ভুল বলে নি।
রুহানের চোখ কেমন জানি চকচক করে ওঠে, সে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, আমি তো ইতিহাস খুব বেশি জানি না কিন্তু যেটুকু জানি সেখানে কী দেখেছি জান?
কী দেখেছ?
যখন মানুষের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায় তখন তারা আবার মাথা সোজা করে দাঁড়ায়। এখানেও নিশ্চয়ই দাঁড়াবে। যখন দাঁড়াবে তখন তো আবার জ্ঞান চর্চা করতে হবে। জানতে হবে, শিখতে হবে–তখন যদি ক্রিস্টাল রিডার না থাকে তখন তারা এই বই থেকে পড়বে।
রিদি কয়েক মুহূর্ত রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর হঠাৎ শব্দ করে হাসতে শুরু করল।
রুহান ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি বোকার মতো হাসছ কেন?
রিদি কষ্ট করে হাসি থামিয়ে বলল, তুমি বোকার মতো কথা বললে দোষ নাই কিন্তু আমি বোকার মতো হাসলে দোষ?
আমি কখন বোকার মতো কথা বলেছি?
রুহান মুখ শক্ত করে বলল, আমি বলি নি এই ঘরের এই পোকা খাওয়া বইগুলো পড়বে।
তাহলে কী বলেছ?
বলেছি দরকার হলে এই রকম বই পড়বে। ক্রিস্টালে যেরকম তথ্য রাখা যায় সেরকম বইয়েও তথ্য রাখা যায়। ক্রিস্টাল রিডার যদি না থাকে তাহলে বইয়ের তথ্য দিয়ে কাজ চালানো যাবে। সবাইকে আবার বর্ণমালা শিখতে হবে–
রিদি আবার হাসতে শুরু করল। রুহান চোখ পাকিয়ে বলল, তুমি আবা। বোকার মতো হাসছ কেন?
তোমার কথা শুনে। আমি এবারে কোন কথাটা হাসির কথা বলেছি?
এই যে বলছ সবাইকে বর্ণমালা শিখতে হবে। তারপর বলবে সবাই গাছের বাকল পরে থাকতে হবে। গুহার ভেতরে কাঁচা মাংস আগুনে ঝলসে খেতে হবে–বিবর্তনে বানর থেকে যেরকম মানুষ হয়েছে, সেরকম আবার উল্টো বিবর্তনে আমরা সবাই মানুষ থেকে বানর হয়ে যাব। আমাদের সবার ছোট ছোট লেজ গজিয়ে যাবে!
এবারে রুহানও হেসে ফেলল, হাসতে হাসতে বলল, তোমার সাথে কথা বলার কোনো অর্থ নেই। তুমি কোনো কিছুকে গুরুত্ব দাও না।
রিদি রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি তো ভবিষ্যতে অনেকদূর তাকাতে পার তাই সবকিছুকে গুরুত্ব দিতে পার। আমার সমস্যাটা কী জান?
কী?
আমি একদিন একদিন করে বেঁচে থাকি। তাই কোনো কিছুকে গুরুত্ব দিতে পারি না।
রুহান কিছুক্ষণ রিদির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমারও কী মনে হয় জান?
কী?
তুমি খুব একটা অদ্ভুত মানুষ।
রিদি চোখ বড় বড় করে বলল, কী আশ্চর্য! আমার ঠিক তাই মনে হচ্ছিল।
ঠিক কী মনে হচ্ছিল?
যে তুমি খুব আজব একজন মানুষ।
ঠিক কী কারণ জানা নেই হঠাৎ করে দুজনেই অকারণে হেসে ওঠে। পুরনো বিধ্বস্ত একটা ঘরে আবছা অন্ধকারে ধূলি ধূসরিত বইয়ের স্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজনের হাসির শব্দটি অত্যন্ত বিচিত্র শোনায়।
দুপুরবেলা একটা ছোট খাবার দোকানে রিদি আর রুহান এক বাটি গরম স্যুপের শুকনো রুটি চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে, তখন রুহান প্রথমে বিষয়টা লক্ষ করল। তাদের টেবিল থেকে দুই টেবিল দূরে বসে থাকা একজন মানুষ তাদের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। রুহানের সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্রই মানুষটি চোখ সরিয়ে নিল। রুহান চোখের কোনা দিয়ে মানুষটাকে লক্ষ্য করে, খাওয়া শেষ না করেই মানুষটি উঠে গেল। সম্ভবত তাদের চিনে ফেলেছে—এত বড় একটা কাণ্ড করে এসেছে তাদের পরিচয়টা কেউ জানবে না সেটা তো হতে শারে না। আগে হোক পরে হোক এটা জানাজানি হবেই।
রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে রিদিকে বলল, রিদি আমাদের পরিচয় কিন্তু এখানে জানাজানি হয়ে যাবে।
রিদি বলল, এখনও হয়নি সেটাই আশ্চর্য।
একটা মানুষ খুব সন্দেহজনক ভাবে উঠে গেল।
আবার ফিরে না আসা পর্যন্ত খেতে থাক। হালকা অস্ত্রটা খুলে রাখা যাক। দরকার হলে ব্যবহার করা যাবে।
রুহান বলল, যদি আমাদের পরিচয় জেনে থাকে তাহলে কিছু করার আগে অনেকবার চিন্তা করবে।
তা ঠিক।
রুহান চোখের কোনা দিয়ে চারদিকে এক নজর দেখে বলল, আমি এভাবে থাকতে পারব না।
কীভাবে থাকতে পারবে না?
এই যে সবসময় সতর্ক হয়ে, চোখ কান খোলা রেখে একটা হাত ট্রিগারের পর রেখে।
রিদি হেসে বলল, এখন বেঁচে থাকার এটাই হচ্ছে নিয়ম।
আমি এভাবে বেঁচে থাকতে চাই না।
তাহলে তুমি কীভাবে বেঁচে থাকতে চাও?
আমি আমার গ্রামে ফিরে যেতে চাই। সেখানে থাকতে চাই।
তোমার গ্রামে কে আছে রুহান?
আমার মা। আমার ছোট দুটি বোন। নুবা আর ত্রিনা।
রিদি কিছু না বলে কিছুক্ষণ রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রুহান জিজ্ঞেস। করল, তোমার কে আছে রিদি?
আমার কেউ নেই।
কেউ নেই?
না।
কেন নেই সেটা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে রুহান থেমে গেল। সে নিজে থে যদি বলতে না চায় তাহলে হয়তো জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না। রুহান বল, তাহলে তুমিও চল আমার সাথে। আমাদের গ্রামটা খুব সুন্দর, তোমার ভালো লাগবে।
রিদি কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রুহা। বলল, সারা পৃথিবীর সবাই বলছে যার জোর বেশি সে যেটা বলবে সেটাই হচ্ছে নিয়ম। মানুষ আর পশুর মধ্যে এখন কোনো পার্থক্য নেই। আমরা বলল সেটা ভুল। আমাদের গ্রাম দিয়ে সেটা শুরু করব। ছোট একটা স্কুল বানাব। ছেলে-মেয়েরা সেখানে পড়বে। ক্রিস্টাল রিডার না থাকলে আমরা বর্ণমা! শেখাব, বই বানাব, বই পড়াব। আবার জ্ঞান চর্চা শুরু করব। একজন মানুষ আরেকজনকে ভালোবাসবে-
রুহান হঠাৎ থেমে গেল। রিদি জিজ্ঞেস করল, কী হলো? শুনতে তো ভালোই লাগছিল, থামলে কেন?
ঐ লোকটা ফিরে এসেছে সাথে আরো দুইজন। একজন পুরুষ অন্য মহিলা।
রিদির শরীরটা একটু শক্ত হয়ে যায়। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, কী করতে ওরা?
কিছু করছে না, দেখছে। আমাদের দেখছে।
রুহান আর রিদি নিঃশব্দে বসে থাকে। মানুষগুলো কিছুক্ষণ তাদের দেখে আবার বের হয়ে গেল। রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ভালো লাগে না। আমার একেবারেই ভালো লাগে না। এভাবে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই।
রিদি কিছু না বলে নিঃশব্দে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল।
সন্ধ্যেবেলা দুজন আবার বের হয়েছে। গান বাজনার বিকট সুর থেকে সরে গিয়ে তারা মূল বাজারটার দিকে এগিয়ে যায় উজ্জ্বল আলোতে বিচিত্র পোশাক পরা মানুষজন হাঁটাহাঁটি করছে, জিনিসপত্র দরদাম করছে কিনছে। এখানে এলে ঠাৎ করে মনে হয় পৃথিবীতে বুঝি কোনো সমস্যা নেই।
হাঁটতে হাঁটতে সামনে একটু ভিড় দেখে দুজনে এগিয়ে যায়, একটা খাঁচার ভেতরে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে। পাশে একটা ছোট মঞ্চ, সেখানে একজন কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। কিশোরটি এক ধরনের শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, দেখে মনে হয় তার চারপাশে কী ঘটছে সে বুঝতে পারছে না। কিশোরটির পাশে একজন মানুষ হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে কথা বলছে।
রুহান এবং রিদি শুনল, মানুষটি বলছে, এর নাম কিসি। কিসির বয়স বারো কিন্তু তোমরা দেখতে পাচ্ছ তার বাড়ন্ত শরীর। একদিন সে যে একজন হাট্টাকাট্টা জোয়ান হবে সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা আমাদের নিজস্ব ডাক্তার দিয়ে কিসিকে পরীক্ষা করিয়েছি। কিসি একেবারে সুস্থ। সবল এবং নিরোগ তার শরীরে কোনো রোগ-জীবাণু নেই। কিসির পরিরারের জিনিসপত্র আমাদের কাছে আছে, ডি.এন.এ প্রোফাইলও আছে, ইচ্ছা করলে তোমরা দেখতে পার।
মানুষটি দম নেবার জন্যে একটু থামল, তখন রুহান আর রিদি বুঝতে পরল এখানে মানুষ বেচা-কেনা হচ্ছে। তারা আগে কখনো এটি দেখে নি, দুজনেই এক ধরনের কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে যায়। মানুষটি মাইক্রোফোনটা গুখের কাছে নিয়ে আবার কথা বলতে শুরু করে, এই ছেলেটাকে আমরা এনেছি দক্ষিণের অঞ্চল থেকে। অনেক কষ্ট করে আনতে হয়েছে, তোমরা জান সারা পৃথিবীতে মারামারি কাটাকাটি চলছে। এর মধ্যে মানুষ ধরে আনা সোজা কথা না। যেভাবে চলছে তাতে মনে হচ্ছে কিছুদিন পর সাধারণ মানুষ আর মানুষের বাজারে হাত দিতে পারবে না, দাম কমপক্ষে তিন-চার গুণ বেড়ে যাবে। এখনই সময় আমি অনেক কম দামে ছেড়ে দিচ্ছি, এই বাড়ন্ত কিশোরটি মাত্র দুই ইজার ইউনিট!
পাশে থেকে একজন বলল, দুই হাজার ইউনিট কী মাত্র হলো নাকি? এই দমে একটা গাড়ি কেনা যায়।
মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা বলল, গাড়ি আর মানুষ কী এক জিনিস? আস্ত একটা মানুষ পেয়ে যাচ্ছ। যদি এর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খোলা বাজারে বিক্রি করো তাহলে কত দাম পাবে জান? আজকাল ভালো একটা হৃৎপিণ্ডই পাঁচশো ইউনিটের কমে পাওয়া যায় না। হৃৎপিণ্ড ছাড়া আছে কিডনি, লিভার, লাংস। চোখের কর্ণিয়া, ব্রেন আর রক্ত। একেবারে ফ্রেশ রক্ত। তুমি যদি মানুষটাকে সারা জীবন পালতে না চাও কেটেকুটে বিক্রি করে দিতে পারো। তাতে লাভ হবে আরো বেশি। কিনবে কেউ?
বুড়ো মতো একজন মানুষ বলল, ধুর! পোলাপান দিয়ে কী করব? মেয়েমানুষ থাকলে দেখাও।
মেয়েমানুষ? মেয়েমানুষ থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে। আমাদে৷ কোম্পানির আসল বিজনেস হচ্ছে মেয়েমানুষের বিজনেস। আমাদের নেটওয়াএকেবারে গভীর গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। সারা দেশ খুঁজে আমরা সুন্দর মেয়েমানুষ ধরে আনি।
মানুষটি খাঁচা খুলে কিসি নামের কিশোরটাকে ভিতরে ঠেলে দিয়ে এ মেয়েকে হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে আসে। মেয়েটার ভাবলেশহীন মুখ। চোখে মুখে এক ধরনের বিচিত্র কাঠিন্য। মাথায় এলোমেলো চুল, শরীরে কাপড় অবিন্যস্ত। মানুষটা মেয়েটির চারপাশে ঘুরে মুখে একধরনের পরিতৃপ্তি শব্দ করে বলল, এই মেয়েটার নাম ক্রিটিনা। মেয়েটার শরীরটা একবার ভালো করে দেখ! দেখলেই জিবে পানি চলে আসে।
মানুষটার কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই শব্দ করে হেসে উঠল। উৎসাহ পেয়ে মানুষটা বলল, একেবারে গহীন একটা গ্রাম থেকে ধরে এনেছি, যেভ। এনেছি ঠিক সেইভাবে তোমাদের সামনে হাজির করেছি। তোমরা কল্পনা করা। নাও যখন এই মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে আনবে তখন তাকে দেখতে কেমন লাগবে। মনে হবে একেবারে আগুনের খাপরা।
মানুষটি একটু দম নিয়ে বলল, এই আগুনের খাপরার বয়স উনিশ। পরিরারের কাগজপত্র, ডি.এন.এ প্রোফাইল সবকিছু তৈরি আছে। ইচ্ছে করলে দেখতে পার। ডাক্তারী পরীক্ষা হয়েছে, একেবারে সুস্থ সবল নিরোগ। অনে কষ্ট করে অনেক দূর থেকে এনেছি তাই দাম একটু বেশি কিন্তু এই জিনিস কম দামে পাবে না।
বুড়ো মানুষটা মুখের লোল টেনে বলল, কত দাম?
পাঁচ হাজার ইউনিট।
পাঁচ হাজার? বুড়ো মানুষটা প্রায় আর্তনাদ করে বলল, পাঁচ হাজার ইউনিট কী ছেলেখেলা নাকি?
মাইক্রোফোন হাতে মানুষটা বলল, আমি কী বলেছি এটা ছেলেখেলা? ভালো জিনিস চাইলে তার দাম দিতে হয়। বুঝেছ?
বুড়ো মানুষটা বলল, আমাকে আগে ভালো করে দেখতে দাও।
দেখ দেখ, যত খুশি দেখ। এর মধ্যে কোনো ভেজাল নেই।
বুড়ো মানুষটি মঞ্চে উঠে মেয়েটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। তারপর সন্তুষ্টির মতো একটা শব্দ করে পকেট থেকে ইউনিটের বান্ডিল বের করে গুনে গুনে দিতে থাকে।
রুহান মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ মুখে কী গভীর একটা বিষাদের ছাপ। চোখ থেকে নেমে আসা পানি গালের উপর শুকিয়ে রয়েছে। বড় বড় চোখে এক ধরনের অবর্ণনীয় অবিশ্বাস নিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে এক গভীর হতাশা।
বুড়ো মানুষটা তার ইউনিটগুলো মাইক্রোফোন হাতের মানুষটাকে ধরিয়ে দিয়ে মেয়েটার হাত ধরে টেনে আনতে শুরু করে। কী করছে বুঝতে না পেরেই রুহান হঠাৎ গলা উঁচিয়ে বলল, এই যে বুড়ো, তুমি দাঁড়াও।
বুড়ো মানুষটি দাঁড়িয়ে গেল, তার মুখে ক্রোধের একটা ছায়া পড়ে। সে কঠিন চোখে ভিড়ের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কে তার সাথে এই অশোভন গলায় কথা বলছে। মানুষটা রুহান সেটা আবিষ্কার করে বুড়ো মানুষটা কেমন যেন থিতিয়ে যায়–তার সারা শরীর ঝুলে থাকা অস্ত্রগুলোই যে এর কারণ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে শুকনো গলায় বলল, হয়েছে?
তুমি মেয়েটাকে ছেড়ে দাও।
ছেড়ে দেব? কষ্ট করেও বুড়ো তার গলায় ঝাঁঝটুকু লুকাতে পারে না, কেন ছেড়ে দেব?
রিদি হতাশ একটা ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, রুহান এখন কী করবে সে জানে না। যেটাই করুক তাকে তার সাথে থাকতে হবে। মনে হচ্ছে এটা তার ভবিতব্য–রুহান কিছু একটা করে বসবে আর তাকে সেটা সামাল দিতে হবে। রিদি সতর্ক ভঙ্গিতে পিছন থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা তুলে নেয় এবং সেটা উপস্থিত কারো দৃষ্টি এড়াল না।
রুহান হেঁটে হেঁটে ছোট মঞ্চটার উপরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, মানুষ বেচাকেনা করা যায় না।
বুড়ো মানুষটার চোখে মুখে জ্বালা ধরানো এক ধরনের বিতৃষ্ণার ছাপ পড়ল। সে মাথা ঘুরিয়ে মাইক্রোফোন হাতে মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, কী বলছে এই মানুষ?
মাইক্রোফোন হাতের মানুষটা একটু এগিয়ে এসে বলল, তুমি এই মেয়েটাকে নিতে চাইছিলে? এটা তো বিক্রি হয়ে গেছে। তুমি চিন্তা করো না আমার কাছে আরও আছে। এই দেখ আমার সাপ্লাই-
রুহান মাথা নেড়ে বলল, উঁহু। আমি মোটেও সেটা বলি নাই। আমিক বলেছি মানুষ বেচা-কেনা বন্ধ।
বন্ধ?
হ্যাঁ। বন্ধ।
কবে থেকে?
অনেকদিন থেকে। মানুষ আগে যখন অসভ্য আর জংলী ছিল তখন একজন মানুষ আরেকজনকে বিক্রি করত। এখন মানুষ সভ্য হয়েছে এখন তারা মানুষ বিক্রি করে না।
মাইক্রোফোন হাতের মানুষটিকে এবারে পুরোপুরি বিভ্রান্ত দেখায়। সে আমতা আমতা করে বলল, দেখ। তুমি নিশ্চয়ই এখানে নতুন এসেছে! এখন বাজারে নিয়মিত মানুষ, মেয়েমানুষ, বাচ্চা-কাচ্চা বিক্রি হয়। বিশাল ব্যবসা। আমি অনেকদিন থেকে করছি–
রুহান তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, ভুল করছিলে। আর করবে না। সে খাঁচার ভেতরে আটকে থাকা মানুষগুলো দেখিয়ে বলল, এদে সবাইকে ছেড়ে দাও।
মাইক্রোফোন হাতের মানুষটির চোখে মুখে এবারে একটা ক্রোধের চিহ্ন ফুটে ওঠে, সে কঠিন চোখে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কে আমি জানি না। তুমি কী জন্যে এটা করছ সেটাও আমি জানি না। আমি বলছি, তুমি এখান থেকে যাও। আমার এই ব্যবসা আমি এমনি এমনি করি না। আমার গার্ডদের ডাকলে তোমার কপালে দুঃখ আছে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
তাহলে তুমি বলছ মানুষ বেচা-কেনা করা যায়?
অবশ্যই করা যায়। এই লাল পাহাড় হচ্ছে মুক্তাঞ্চল। যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো জিনিস এনে এখানে বিক্রি করা যায়। এটা হচ্ছে মুক্তাঞ্চলের অলিখিত আইন।
ভারি মজা তো।
মাইক্রোফোন হাতের মানুষটি বলল, মজা?
হ্যাঁ। তার মানে আমিও ইচ্ছে করলে মানুষকে বিক্রি করতে পারব?
অবশ্যই পারবে।
ঠিক আছে, আমি তাহলে চেষ্টা করে দেখি। বলে সে খপ করে মানুষটির কলার ধরে কাছে টেনে এনে তার হাত থেকে মাইক্রোফোনটা কেড়ে নেয়। এক হাতে মানুষটাকে ধরে রেখে অন্য হাতে মাইক্রোফোনটা মুখের সামনে ধরে সে বলল, তোমাদের কাছে বুড়া হাবড়া অপদার্থ একটা মানুষ বিক্রি করতে চাই। কথা বেশি বলে এ ছাড়া এর আর কোনো সমস্যা নেই। কে কিনতে চাও?
উপস্থিত মানুষদের ভেতর থেকে একজন কৌতুকপ্রিয় মহিলা জিজ্ঞেস করল, কত দাম?
খুব সস্তায় ছেড়ে দিচ্ছি। দাম মাত্র এক ইউনিট।
উপস্থিত মানুষগুলোর ভেতরে একটা হাসির রোল উঠল। মহিলাটি বলল, এত সস্তা হলে এক ডজন কিনতে চাই।
আমার কাছে এক ডজন নেই, একটাই আছে। এরকম অপদার্থ মানুষ ডজন ডজন তৈরি হয় না।
দাও তাহলে- মহিলাটি সত্যি সত্যি তার ব্যাগ খুলে ইউনিট বের করতে শুরু করে।
রুহান কলার ধরে রাখা মানুষটাকে বলল, দিই তোমাকে বিক্রি করে?
কী করছ তুমি বুঝতে পারছ না? মানুষটি ক্রুদ্ধ গলায় বলল, সবকিছু নিয়ে তামাশা করা যায় না।
আমি মোটেও তামাশা করছি না। রুহান ঠাণ্ডা গলায় বলল, তুমি যদি জোর করে ধরে এনে মানুষ বিক্রি করতে পার তাহলে আমি কেন জোর করে ধরে তোমাকে বিক্রি করতে পারব না?
মানুষটি চট করে এই যুক্তিটার উত্তরে কিছু বলতে পারল না। খানিক্ষণ আমতা আমতা করে বলল, তুমি এরকম পাগলামী করতে পার না—
রুহান তখন মানুষটিকে ছেড়ে দেয়। বলে, তুমি ঠিকই বলেছ। আমি এরকম পাগলামী করতে পারি না। মানুষ হয়ে মানুষকে বিক্রি করে দেয়া পাগলামী। এটা কেউ করতে পারে না। আমি যেমন তোমাকে করব না–তুমিও এদের করবে না। বুঝেছ?
মানুষটি কিছু অশ্লীল কথা উচ্চারণ করে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে বলল, গার্ড!
রিদি এবারে তার অস্ত্রটা মাথার উপরে তুলে চিৎকার করে বলল, খবরদার, কেউ নড়বে না।
তার চিৎকারে যে যেখানে ছিল সেখানেই থেমে গেল।
রিদি বলল, গার্ডরা, তোমরা ইচ্ছে করলে আমাকে গুলি করার চেষ্টা করতে পার। কিন্তু আমি আগেই বলে দিচ্ছি তোমরা অস্ত্রটা তোলার আগেই তোমাদের আমি শেষ করে দিতে পারব। বুঝেছ?
কেউ কোনো কথা বলল না। মানুষগুলো নিজেদের ভেতরে চাপা গলা কথা বলতে থাকে এবং হঠাৎ কমবয়সী একটা মেয়ে এগিয়ে এসে উত্তোও গলায় বলল, তোমরা কী খেলোয়াড়? তোমরাই কী ক্ৰিভনকে ধরে নিয়েছিলে?
রিদি আর রুহান একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, তাদের পরিচয় আর গোপন রাখার প্রয়োজন নেই। রিদি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
বিস্ময়ের একটা সম্মিলিত শব্দ শোনা গেল, এবারে অনেকেই তাদের কাজে আসার চেষ্টা করে, ভালো করে এক নজর দেখার চেষ্টা করে। কমবয়সী কয়েকটা মেয়ে আনন্দে এক ধরনের চিৎকার করতে থাকে। চারদিকে মানুষে হুঁটোপুটি শুরু হয়ে যায়।
রুহান মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থেকে বলল, তোমরা সবাই শান্ত হও। আমি তোমাদের সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি আজ থেকে লাল পাহাড়ে মানুষ বেচাকেনা বন্ধ। আর কেউ এখানে দূরের গ্রাম থেকে মানুষ ধরে এনে বিক্রি করতে পারবে না।
উপস্থিত মানুষগুলো উল্লাসের মতো এক ধরনের শব্দ করল। তারা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে সেরকম মনে হলো না, কোনো একটা বিষয় নিয়ে হৈ চৈ হচ্ছে সেটা নিয়েই আনন্দ!
কাছাকাছি ক্রিটিনা দাঁড়িয়ে ছিল, রুহান বলল, ক্রিটিনা তোমাকে কেউ বিক্রি করতে পারবে না। তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
ক্রিটিনা কোনো কথা না বলে স্থির চোখে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রুহান বলল, তুমি মুক্ত। তুমি যেখানে খুশি যেতে পার।
ক্রিটিনা ফিসফিস করে বলল, আমি তোমাকে ঘৃণা করি। অসম্ভব ঘৃণা করি।
রুহান চমকে ওঠে বলল, ঘৃণা করো? আমাকে?
হ্যাঁ। তুমি ভেবেছ আমি তোমাদের মতো মানুষদের চিনি না? খুব ভালো করে চিনি। গলায় একটা অস্ত্র ঝুলিয়ে তোমরা মনে করো সারা পৃথিবীটা তোমাদের। যা ইচ্ছা তাই করতে পার।
রুহান কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, বিশ্বাস করো, আমি সেরকম কিছু ভাবছি না।
আমি জানি তুমি ঐ মানুষটার কাছ থেকে কেন আমাদের ছিনিয়ে নিয়েছ।
কেন?
তুমি এখন আমাদের অন্য কোথাও বিক্রি করবে।
না, ক্রিটিনা বিশ্বাস করো, তোমাদের আমি অন্য কোথাও বিক্রি করব না। তোমরা যেখানে খুশি যেতে পার। তোমরা স্বাধীন–
ক্রিটিনা হঠাৎ আনন্দহীন শুকনো হাসিতে ভেঙ্গে পড়ল। হাসতে হাসতে বলল, আমরা স্বাধীন?
হ্যাঁ।
আমরা স্বাধীন হয়ে এখন কোথায় যাব? বাইরে তোমার মতো হাজার হাজার মানুষ বসে আছে আমাদের ধরে নিতে! আমরা কোথায় যাব? কী করব?
তোমাদের গ্রামে যাবে!
আমাদের গ্রাম কত দূর তুমি জান? এরা সেই গ্রামে কী করেছে তুমি জান? কত বাড়ি পুড়িয়েছে, কত মানুষ মেরেছে তুমি জান?
আমি দুঃখিত ক্রিটিনা–
ক্রিটিনা হঠাৎ চিৎকার করে বলল, খবরদার, যেটা বিশ্বাস করো না সেটা মুখে উচ্চারণ করো না।
রুহান থতমত খেয়ে বলল, আমি কী বিশ্বাস করি না?
দুঃখিত হবার কথা বলো না। কারণ তোমরা দুঃখিত না। তোমরা আমাদের লুট করে নিয়ে এখন কোথাও বিক্রি করবে। আমি জানি–
বিশ্বাস করো ক্রিটিনা—
ক্রিটিনার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলে উঠল। সে হিংস্র গলায় বলল, খবরদার, তুমি বিশ্বাস করার কথা মুখে আনবে না। আমি কাউকে বিশ্বাস করি না। কাউকে না।
রিদি রুহানের দিকে এগিয়ে এসে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব বিপদের মধ্যে পড়েছ।
রুহান একটু কষ্ট করে হেসে বলল, তোমার কী ধারণা?
আমার ধারণা তুমি এবং আমি দুজনেই খুব বিপদের মধ্যে পড়েছি। একজন মানুষের পুরো ব্যবসা তুমি লুট করে নিয়েছ সে কী এটা সহজভা। মেনে নেবে? নেবে না!।
আমি কিছু লুট করি নি। আমি এই মানুষগুলোকে মুক্ত করে দেবার চেষ্টা। করছিলাম।
রিদি শব্দ করে হেসে বলল, তুমি যাদেরকে মুক্ত করেছ তারাও তোমাকে বিশ্বাস করে নি, আর তুমি আশা করছ অন্যেরা বিশ্বাস করবে?
রুহান মাথা চুলকে বলল, কী করা যায় বুঝতে পারছি না।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সরে যেতে হবে। সবাইকে নিয়ে।
কিন্তু সেটা কীভাবে করব?
ঠিক এরকম সময় তারা দেখতে পেল একজন মানুষ ভিড় ঠেলে তাদের দিকে আসছে। কাছাকাছি এলে তারা মানুষটিকে চিনতে পারল, এজেন্ট দ্রুচেন।
এজেন্ট দ্রুচেন কাছে এসে দুজনের হাত ধরে ঝাকাতে ঝাকাতে বলল, অভিনন্দন। তোমাদের অনেক অনেক অভিনন্দন।
রুহান ভুরু কুঁচকে বলল, কেন? কীসের অভিনন্দন?
তোমরা দুজন মিলে এত বড় একটা সাপ্লাই লুট করে নিলে এটা কী সোজা কথা? কার কাছে বিক্রি করবে ঠিক করেছ কিছু? আমার পরিচিত কিছু খরিদ্দার আছে, খুব ভালো ব্যবসা করে। এখান থেকে পঞ্চাশ-ষাট কিলোমিটার দূরে থাকে, আমি তোমাদের সেখানে নিয়ে যেতে পারি। শতকরা দশ ভাগ কমিশন আমার, আমি আগে থেকে বলে রাখছি।
রুহান কিছু না বলে নিঃশব্দে এজেন্ট দ্রুচানের দিকে তাকিয়ে রইল। দ্রুচান বলল, কী হলো তুমি কথা বলছ না কেন?
রুহান তবু কোনো কথা বলল না। এজেন্ট দ্রুচান বলল, এর থেকে কম কমিশনে আমি কাজ করতে পারব না। অসম্ভব!
রুহান এবারেও কোনো কথা বলল না। দ্রুচান বলল, তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন? কত কমিশন দিতে পারবে?
রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমরা কোনো কমিশন দিতে পারব না এজেন্ট দ্রুচান। তার কারণ আমরা এই মানুষগুলোকে বিক্রি করার জন্যে লুট করি নি! তাদের যেখান থেকে ধরে আনা হয়েছে আমরা সেখানে গিয়ে তাদের রেখে আসব।
এজেন্ট দ্রুচান অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কী পাগল?
আমি বলেছি এই মানুষগুলোকে যেখান থেকে ধরে আনা হয়েছে আমরা তাদের সেখানে রেখে আসব।
এজেন্ট দ্রুচান একবার রিদির মুখের দিকে তাকাল তারপর মাথা ঘুরিয়ে আবার রুহানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা আমার সাথে ঠাট্টা করছ?
না, আমরা ঠাট্টা করছি না। আমরা সত্যি কথা বলছি।
এজেন্ট দ্রুচান তখনো বিষয়টা বুঝতে পেরেছে বলে মনে হলো না, মাথা চুলকিয়ে বলল, কিন্তু কেন?
রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তার কারণ আমরা বিশ্বাস করি যে মানুষ কখনো পণ্য হতে পারে না, একজন মানুষকে কখনো পণ্য হিসেবে বেচাকেনা করা যায় না।
এজেন্ট দ্রুচান বাধা দিয়ে বলল, কে বলেছে করা যায় না। সবাই করছে।
তাতে কিছু আসে যায় না। আমরা মনে করি একজন মানুষ কখনো অন্য মানুষকে বেচা-কেনা করতে পারে না।
এজেন্ট দ্রুচান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আসলেই সেটা যদি তোমাদের পরিকল্পনা হয়ে থাকে তাহলে তোমরা খুব বিপদের মধ্যে আছ!
তোমাদের নিরাপত্তা দেবার কেউ নেই–এই লোক ক্ৰিভনের খুব কাছের মানুষ। কিছুক্ষণের মধ্যে লোকজন আসবে তোমাদের ধরতে।
রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমারও তাই ধারণা।
তোমাদের এক্ষুনি সরে পড়তে হবে। এই মুহূর্তে।
ঠিকই বলেছ।
কীভাবে পালাবে এখান থেকে?
আমরা ভাবছিলাম তুমি আমাদের নিয়ে যাবে।
আমি? এজেন্ট দ্রুচান অবাক হয়ে বলল, আমি কেন নিয়ে যা যেখানে এক ইউনিট কমিশন নেই সেখানে আমি কেন তোমাদের নিয়ে যাব?
রুহান এজেন্ট দ্রুচানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি নিয়ে যা। কারণ সেটা হবে এই হতভাগ্য মানুষগুলোকে সাহায্য করার একটা সুযোগ। তুমি তাদের সাহায্য করবে।
এজেন্ট দ্রুচান অবাক হয়ে রুহানের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে যায়, চোখ মুছে নিজেকে। সামলে নিয়ে বলল, তুমি খুব মজার মানুষ। আমি বিশ্বাস করতে পারি না। কেউ একজন তোমার মতো করে কথা বলতে পারে।
রুহান বলল, আমি এমন কিছু বিচিত্র কথা বলি নি। পৃথিবীটা গড়ে উঠে মানুষের জন্যে মানুষের ভালোবাসার কারণে। তুমি যদি এই মানুষগুলো সাহায্য করো তাহলে সেই ভালোবাসাটা অনুভব করতে পারবে। মানুষের জন্যে। ভালোবাসার মতো সুন্দর জিনিস পৃথিবীতে আর কিছু নেই! বিশ্বাস করো।
এজেন্ট দ্রুচান এক ধরনের অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বলল, আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে তুমি আমাকে এসব বলছ।
রুহান বলল, তুমি বিশ্বাস করবে কী না, সেটা তোমার ব্যাপার। কি আমি যেটা বলছি সেটা সত্যি বলছি।
এজেন্ট দ্রুচান মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, আমি গেলাম। তোমরা কী করবে তোমরাই জান। আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি যে তোমরা যদি এখনই এখান থেকে সরে না পড়ে তোমাদের কপালে দুঃখ আছে। অনেক বড় দুঃখ।
এজেন্ট দ্রুচান চলে যাবার পর রিদি রুহানের সামনে দাঁড়িয়ে বল, তাহলে কী করবে ঠিক করেছ?
আপাতত সরে পড়ি।
কোথায় সরে পড়বে?
পাহাড়ের দিকে যাই। জঙ্গলে ঢুকে পড়ি–সেখানে চট করে কেউ খুঁওে পাবে না।
রিদি মাথা নাড়ল, খুব ভালো একটা পরিকল্পনা হলো বলে মনে হচ্ছে না কিন্তু আর তো কিছু করার নেই। রিদি জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, চল তাহলে রওনা দিই।
ঘণ্টাখানেক পরে পাহাড়ী পথে রুহান আর রিদি জনা ত্রিশেক নানা বয়সের তরুণ-তরুণী নিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। আবছা অন্ধকার, আকাশে একটা ভাঙ্গা দ, তার মৃদু আলোতে সবাই নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে। ছোট একটা উপত্যকা পার হলে তারা একটা পাহাড়ী রাস্তায় উঠতে পারবে। এই রাস্তা ধরে দক্ষিণে কয়েকশ কিলোমিটার যেতে হবে। কেমন করে যাবে তারা এখনো জানে না।
উপত্যকাটা পার হয়ে তারা পাহাড়ী রাস্তায় এসে ওঠে। কম বয়সী ছেলেমেয়েগুলো পথের পাশে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে। আবছা অন্ধকারে তাদের চেহারা দেখা যায় না, শুধু ভাগ্যের উপর অসহায়ভাবে সবকিছু অসমর্পণ করে দেয়ার ভঙ্গিটুকু বোঝা যায়।
রুহান নিচু গলায় বলল, তোমরা বিশ্রাম নেবার জন্যে খুব বেশি সময় পাবে না। আমাদের এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরে যেতে হবে।
অন্ধকারে বসে থাকা একজন তরুণ জিজ্ঞেস করল, কেন?
তোমাদের যাদের কাছ থেকে ছুটিয়ে এনেছি তারা তোমাদের আবার ধরে–তে আসতে পারে।
অন্ধকারে বসে থাকা তরুণটি বলল, তাতে কী আসে যায়? আমরা তোমাদের হাতে থাকি আর অন্যের হাতে থাকি তাতে কী আসে যায়?
রুহান কী উত্তর দেবে বুঝতে পারে না। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখন অনেক দূরে একটা লরির হেডলাইট দেখতে পেল।
রিদি নিচু গলায় বলল, সবাই পিছনে সরে যাও। বনের ভেতরে গিয়ে লুকিয়ে যাও।
আবছা অন্ধকারে বসে থাকা তরুণটি বলল, কেন? কেন আমাদের পিছনে সরে যেতে হবে?
কারা আসছে আমরা জানি না। তারা কী চায় সেটাও জানি না। যদি গোলাগুলি শুরু হয় তোমাদের নিরাপদে থাকা দরকার। মাথা নিচু করে মাটিতে শুয়ে থাক। যাও।
আবছা অন্ধকারে বসে থাকা তরুণ-তরুণীগুলো উঠে দাঁড়িয়ে হুঁটোপুটি করে বনের ভেতরে ছুটে যেতে থাকে। রিদি আর রুহান দুটি বড় গাছের মড়ালে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা লরিটির ইঞ্জিনের চাপা গুঞ্জন শুনতে পেল। দেখতে দেখতে সেটা তাদের কাছাকাছি চলে আসে। রিদি আর রুহান অবাক হয়ে দেখল তাদের কাছাকাছি এসে লরিটি থেমে যায়। তারা ভাবছিল লরির পিছন থেকে অস্ত্র হাতে অনেকগুলো মানুষ নামবে কিন্তু সেরকম কিছু হলো। তারা অবাক হয়ে দেখল শুধু ড্রাইভিং সীট থেকে একজন মানুষ নেমে এলে। আবছা অন্ধকারে তাকে স্পষ্ট দেখা যায় না, চোখে লাগানো ইফ্রারেড গগলসটা শুধু চোখে পড়ে। মানুষটি এদিকে সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ উচ্চস্বরে ডাক, রুহান, রিদি–
রুহান আর রিদি মানুষটির গলার স্বর চিনতে পারে, এজেন্ট দ্রুচান। গাছে। আড়াল থেকে দুজনে বের হয়ে এলো, রুহান বলল, কী ব্যাপার দ্রুচান? তুমি এখানে?
এজেন্ট দ্রুচান বলল, তোমার মানুষজন কোথায়? দেরি করো না, তাড়াতাড়ি ওঠো লরিতে। তোমাদের খোঁজে বিশাল বাহিনী রওনা দিচ্ছে।
রুহান এজেন্ট দ্রুচানের কাছে গিয়ে নরম গলায় বলল, আমি জানতাম তুমি আসবে।
এজেন্ট দ্রুচান বিরক্ত গলায় বলল, বাজে কথা বলো না। আমি নিজে জানতাম না আর তুমি কেমন করে জানতে?
তুমি না জানতে পার, কিন্তু আমি জানতাম। এই পৃথিবীটা টিকে যাণে কেন তুমি জান এজেন্ট দ্রুচান?
আমার এত বড় বড় জিনিস জানার কোনো সখ নেই রুহান। আমি শুধু জানি যদি এক্ষুনি এই লরিতে সবাই না ওঠো তাহলে কিন্তু কেউ পৌঁছাতে পারবে না।
রুহান এজেন্ট দ্রুচানের কথাটা না শোনার ভান করে বলল, এই পৃথিবীট। টিকে যাবে কারণ মানুষের ভেতরে এখনো মনুষ্যত্বটুকু বেঁচে আছে।
এজেন্ট দ্রুচান বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি যে কী বাজে বকতে পারো রুহা। সেটা অবিশ্বাস্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায় পাহাড়ী পথ দিয়ে লরিটি ছুটে যাচ্ছে। সামনের ড্রাইভিং সিটে এজেন্ট দ্রুচানের পাশে বসেছে রিদি। পিছনে অন্য সবার সাথে বসেছে রুহান। রুহান পিছনের খোলা অংশ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। লরির ভেতরে চুপচাপ বসে আছে অন্য সবাই।
বসে থাকতে থাকতে রুহানের চোখে হঠাৎ একটু ঘুমের মতো এসেছিল। হঠাৎ করে তার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল, তার কোলের উপর রাখা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা কেউ একজন হ্যাচকা টান দিয়ে সরিয়ে নিয়েছে। রুহান মাথা ঘুরিয়ে দেখে মানুষটি ক্রিটিনা। সে অস্ত্রটা তার দিকে তাক করে ধরে রেখেছে, আবছা অন্ধকারেও বোঝা যায় তার চোখ ধকধক করে জ্বলছে। রুহান কোনো কথা না বলে স্থির চোখে ক্রিটিনার দিকে তাকিয়ে রইল।
ক্রিটিনা হিংস্র গলায় বলল, লরি থামাও।
কেন?
আমরা নেমে যাব।
কোথায় নেমে যাবে?
সেটা তোমার জানার প্রয়োজন নেই।
রুহান বলল, ক্রিটিনা, আমরা তোমাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছি।
তোমাদের সাহায্যের কথা আমি খুব ভালো করে জানি! তোমরা হচ্ছ খুনে ৬াকাত ঠগ আর প্রতারক–
আমার কথা শোনো—
ক্রিটিনা চিৎকার করে বলল, আমি কোনো কথা শুনব না। লরি থামাও।
যদি না থামাই? তোমাকে আমি খুন করে ফেলব।
রুহান হাসার চেষ্টা করল, যদিও আবছা অন্ধকারে সেটা কেউ দেখতে পেল না। সে নরম গলায় বলল, খুন করে ফেলবে?
হ্যাঁ।
ঠিক আছে। করো খুন।
ক্রিটিনা হিংস্র গলায় বলল, আমাকে রাগানোর চেষ্টা কর না–
রুহান বলল, আমি তোমাকে মোটেও রাগানোর চেষ্টা করছি না, ক্রিটিনা আমি তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। তুমি বুঝতে চাইছ না। আমি তোমাকে বলেছি, তোমাদের আমরা তোমাদের গ্রামে নিয়ে যেতে যাচ্ছি–
মিথ্যে কথা বলবে না। ক্রিটিনা চিৎকার করে বলল, আমার সাথে মিথ্যে কথা বলবে না।
ঠিক আছে, আমি আর কথাই বলব না।
খুন করে ফেলব তোমাদের সবাইকে।
কীভাবে খুন করবে?
গুলি করে খুন করব।
তুমি কী আগে কখনো এরকম অস্ত্র ব্যবহার করেছ? তুমি কী জান কেমন করে গুলি করতে হয়?
ক্রিটিনাকে এক মুহূর্ত একটু ইতস্তত করতে দেখা যায়। ইতস্তত করে বলে, সব অস্ত্রই এক। আমি জানি ট্রিগার টানলেই গুলি হয়।
না। রুহান মাথা নাড়ল, নিরাপত্তার কিছু ব্যাপার থাকে। ট্রি। টানলেই গুলি হয় না। আমার কথা বিশ্বাস না করলে তুমি ট্রিগার টেনে দেখতে পার।
ক্রিটিনা ইতস্তত করে অস্ত্রটা বাইরে তাক করে ট্রিগার টানল, ঘট করে একটা শব্দ হলো কিন্তু কোনো গুলি হলো না। রুহান বলল, এখন আমার বা বিশ্বাস হলো? তুমি অস্ত্রটা আমার কাছে নিয়ে এসো, আমি তোমাকে দেখি দেই কেমন করে সেফটি লিভারটা টানতে হয়।
আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না।
ঠিক আছে, তাহলে অস্ত্রটা আমাকে দিতে হবে না। তুমি নিজেই কর। ডানপাশে উপরের লিভারটা টেনে নিজের দিকে আন।
ক্রিটিনা অনিশ্চিতের মতোন লিভারটি নিজের দিকে টেনে আনে। রুহান পরিতৃপ্তির মতো শব্দ করে বলল, চমৎকার! এখন তুমি ইচ্ছে করলে আমাকে গুলি করে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারবে। বিশ্বাস না করলে পরীক্ষা করে দেখ!
ক্রিটিনা অস্ত্রটা বাইরে তাক করে ট্রিগার টানতেই ভয়ঙ্কর শব্দ করে অস্ত্রটি গর্জন করে ওঠে। লরির ভেতরে বসে থাকা ছেলেমেয়েগুলো ভয় পেয়ে চিৎকার করে পিছনে সরে যায়। সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা রিদি এবং দ্রুচান গুলির শব্দ শুনে কারণটা বোঝার জন্যে রাস্তার পাশে লরি থামিয়ে নেমে আসে। রিদি চাপা গলায় বলে, কী হয়েছে রুহান?
বিশেষ কিছু না। রুহান হালকা গলায় বলল, কেমন করে অস্ত্র চালান হয় তার একটা ছোট ট্রেনিং হচ্ছে।
রিদি অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, তোমার মাথা খারাপ রুহাব। এটা কী ট্রেনিং দেবার সময়?
রুহান শব্দ করে হেসে বলল, ট্রেনিংয়ের সময় অসময় বলে কিছু নেই রিদি। তোমরা সেটা নিয়ে চিন্তা কর না। যাও লরি চালাতে থাক।
কিছুক্ষণের মধ্যে আবার লরি চলতে শুরু করে। লরির পেছনে বসে থেকে কিছুই হয়নি এরকম একটা ভঙ্গি করে রুহান শিস দিয়ে একটা সুর তোলার চেষ্টা করতে থাকে। ক্রিটিনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি কী লিভার আবার সামনে ঠেলে দেব?
তুমি যদি অস্ত্রটা এই মুহূর্তে ব্যবহার করতে না চাও তাহলে সেটাই নিরাপদ।
ক্রিটিনা লিভারটি ঠেলে দিয়ে অস্ত্রটা রুহানের দিকে এগিয়ে দেয়। বলে, নাও।
কী নেব?
এই অস্ত্রটা।
রুহান বলল, তোমার কাছে রাখ।
আমার কাছে রাখব?
হ্যাঁ।
কেন?
দুটি কারণে। এক, আমি চাই তুমি আমার কথা বিশ্বাস কর, যে সত্যিই আমরা তোমাদেরকে তোমাদের এলাকায় ফিরিয়ে দিতে চাই। দুই, আমার কাছে আরো একাধিক অস্ত্র আছে, তুমি যেহেতু অস্ত্র চালাতে শিখেই গেছ, এটা তোমার কাছে থাকলে আমাদের নিরাপত্তা বেশি হয়। যদি দরকার হয় তাহলে তুমিও এটা ব্যবহার করতে পারবে।
ক্রিটিনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি দুঃখিত, রুহান আমি যে তোমার কোনো কথা বিশ্বাস করি নি।
এখন করেছ?
তোমাকে বিশ্বাস করেছি, তোমার কথা এখনো বিশ্বাস করি নি।
রুহান শব্দ করে হেসে বলল, আমাকে যদি বিশ্বাস কর তাহলে আগে হোক পরে হোক একদিন আমার কথাকেও বিশ্বাস করবে।
ক্রিটিনা অস্ত্রটা কোলের উপর রেখে রুহানের পাশে বসল। একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোমরা কেন আমাদের উদ্ধার করছ?
রুহান বলল, আমি জানি না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, উত্তরটা পছন্দ হয়েছে?
হ্যাঁ। পছন্দ হয়েছে।
কেন?
পৃথিবী থেকে ভালো উঠে গেছে। এটা আবার ফিরে আসবে। এভাবেই আসবে। কেউ জানবে না কেন আসছে। আসবে গোপনে।
রুহান ক্রিটিনার দিকে তাকাল, আবছা অন্ধকারে তার চেহারাটা ভালো। করে দেখা যায় না। চেহারায় এক ধরনের বিষাদের ছাপ।
খুব ভোরবেলা লরিটি থামল। পিছনের দরজা খুলে প্রথমে রুহান তার পিছু ক্রিটিনা নেমে এলো, তারপর অন্য সবাই লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে থাকে। কয়েক ঘণ্টা আগেও সবার ভেতরে একটা চাপা আশঙ্কা কাজ করছিল। যখন বুঝতে পেরেছে যে আসলেই সবাইকে তাদের নিজের এলাকাতে নিয়ে যাও হচ্ছে তখন হঠাৎ করে সবার ভেতরে এক ধরনের নিশ্চিন্ত নির্ভাবনার ফুরফুরে আনন্দ এসে ভর করেছে। লরি থেকে নেমে সবাই হৈ চৈ চেচামেচি করতে থাকে–যারা একটু ছোট তারা ছোটাছুটি শুরু করে দেয়।
এজেন্ট দ্রুচান লরির নিচে থেকে একটা বাক্স টেনে নামিয়ে আনে, সেটা খুলতেই ভেতর থেকে শুকনো খাবার আর পানীয় বের হয়ে আসে। সবার মধ্যে সেটা ভাগ করে দিতে দিতে বলল, তাড়াতাড়ি সবাই খেয়ে নাও, আমরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রওনা দেব।
কমবয়সী একটা মেয়ে বলল, কেন আমাদের এক ঘণ্টার মধ্যে রওনা দিতে হবে? আমরা কী জায়গাটা একটু ঘুরে দেখতে পারি না?
এখানে দেখার মতো কিছু নেই।
মেয়েটি বলল, কে বলেছে নেই? ঐ যে দূরে একটা কাচের ঘর দেখা যাচ্ছে।
এজেন্ট দ্রুচান বলল, এটা একটা পুরানো মান-মন্দির। ভেঙ্গে চুরে আছে, দেখার মতো কিছু নেই।
কে থাকে ওখানে?
কেউ থাকে না। সাপ খোপ থাকলে থাকতেও পারে।
মেয়েটি আনন্দে হাততালি দিয়ে বলল, আমার সাপখোপ দেখতে খুন। ভালো লাগে। আমি কী দেখতে যেতে পারি?
রুহান বলল, ঠিক আছে যাও। সাপ-খোপ বাঘ সিংহ যেটা ইচেছ দেখতে যেতে পার তবে এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসতে হবে। তোমরা জান তোমাদে: ধরার জন্যে পিছু পিছু অনেক মানুষ আসছে।
একটা ছেলে কঠিন মুখে বলল, আসুক না ধরতে! ওদের বারটা বাজি? ছেড়ে দেয়া হবে না?
রুহান জানতে চাইল। বলল, কে বারটা বাজাবে?
ছেলেটি এক গাল হেসে বলল, কেন? তুমি? তুমি আর রিদি। তোমরা পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়, তোমাদের কাছে কে আসবে?
আশেপাশে যারা ছিল সবাই আনন্দের মতো একটা শব্দ করল।
সবাই চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাবার পর এজেন্ট দ্রুচান তার লরিটার কাছে 1য়ে বনেট খুলে ইঞ্জিনের দিকে উঁকি দেয়। কিছু একটা দেখে সে হঠাৎ শিস দেয়ার মতো শব্দ করে। রুহান জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
এজেন্ট দ্রুচান বলল, সমস্যা।
কী সমস্যা।
ইঞ্জিনের কুলেন্ট পাইপে লিক। সব কুলেন্ট পড়ে যাচ্ছে।
কীভাবে হলো?
পুরানো ইঞ্জিন সেটা হচ্ছে সমস্যা। ভালো কুলেন্ট পাওয়া যায় না, জোড়াতালি দিয়ে তৈরি হয় সেটা আরেকটা সমস্যা।
রুহান জিজ্ঞেস করল, তাহলে এখন কী করবে?
কুলেন্টের পাইপগুলো পাল্টাতে হবে।
কী দিয়ে পাল্টাবে?
আমার কাছে বাড়তি পাইপ আছে, কিন্তু ওয়েল্ডিং করতে হবে। একটু সময় নেবে।
রিদি পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল, এজেন্ট দ্রুচান, আমি তোমাকে সাহায্য করি?
এজেন্ট দ্রুচান বলল, তার চাইতে বেশি দরকার একটু রাস্তার দিকে লক্ষ্য এখা, হঠাৎ করে যদি আমাদের ধরতে চলে আসে তখন মহা বিপদ হবে।
রুহান বলল, ঠিক আছে আমি সেটা দেখছি।
রিদি জানতে চাইল, কীভাবে দেখবে?
রুহান পিছনে তাকিয়ে বলল, আমি ঐ মানমন্দিরটার উপরে গিয়ে দাঁড়াই, তাহলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাব।
রিদি মাথা নেড়ে বলল, যাও।
এজেন্ট দ্রুচান তার গলায় ঝোলানো বাইনোকুলারটি রুহানের হাতে দিয়ে বলল, এটা নিয়ে যাও।
ক্রিটিনা কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, রুহান, আমি কী তোমার সাথে যেতে পারি?
অবশ্যই যেতে পার ক্রিটিনা। মান-মন্দিরের উপরে একা একা দাঁড়িয়ে না থেকে দুজনে মিলে দাঁড়ালে সময়টা ভালো কাটবে। চল।
এক সময়ে এই এলাকায় জনবসতি ছিল এখন নেই। যে ছোট নুড়ি পাথরের রাস্তাটা ঘুরে ঘুরে মানমন্দির পর্যন্ত উঠে গেছে সেটা নানারকম ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। লম্বা লম্বা পা ফেলে তারা মানমন্দিরের কাছে এসে দাঁড়ায়। ভাঙ্গা মানমন্দিরের ভেতর থেকে তারা ছেলে-মেয়েদের চেচামেচি শুনতে পায়। তাদের কলরব শুনলে মনে হয় তারা বুঝি কোনো একটা আনন্দোৎসবে এসেছে।
মানমন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রিটিনা কপালের ঘাম মুছে বলল, কে গরম দেখেছ?
হ্যাঁ। বেশ গরম। রুহান একটু অবাক হলো, তারা সরাসরি রোদে দাঁড়িয়ে নেই, তাছাড়া সূর্যের আলো এখনো এত প্রখর হয়নি, কিন্তু এখানে তবু বেশ গরম। রুহান কারণটা ঠিক বুঝতে পারে না। মানমন্দিরটা কাচ দিয়ে তৈরি। বিভিন্ন জায়গায় কাচ ভেঙ্গে আছে, ফেটে আছে। লতাগুল্ম দিত। মানমন্দিরটা স্থানে স্থানে ঢেকে আছে তবুও বোঝা যায় এটি এক সময় চমৎকার একটা বিল্ডিং ছিল। রুহান উপরে উঠার সিড়ি খুঁজে বের করার জন্যে মানমন্দিরের ভেতরে ঢুকে আবিষ্কার করে ভেতরে বেশ ঠাণ্ডা। রুহান ক্রিটিনার দিকে তাকিয়ে বলল, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ ক্রিটিনা?
কী?
এটা একটা কাচের ঘর, ভেতরে ঠাণ্ডা কিন্তু বাইরে গরম।
তার মানে কী?
মানমন্দিরের কাচ সূর্যের আলোর তাপের অংশটিকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না, এটা বাইরে প্রতিফলিত হচ্ছে, সেজন্য বাইরে গরম। শুধু দৃশ্যমান আলোটা ঢুকতে দিচ্ছে ভিতরে, সেজন্যে ভেতরে অনেক আলো কিন্তু গরম নেই, ঠাণ্ডা।
ভারি মজা তো।
হ্যাঁ। এলাকটা নিশ্চয়ই উষ্ণ। মানমন্দিরকে ঠাণ্ডা রাখার জন্যে এরকম কাচ লাগানো হয়েছে।
ঠিকই বলেছ।
রুহান আর ক্রিটিনা কথা বলতে বলতে মানমন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যেতে থাকে। অনেক উঁচু মানমন্দির, ছাদে পৌঁছানোর পর তারা আবিষ্কার করল এখানে দাঁড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। যে রাস্তা ধরে তারা এসে সেই রাস্তাটি পাহাড়কে ঘিরে ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে তারা প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে। রুহান চারদিকে তাকিয়ে দেখে–যতদূর দেখা যায়, ফাঁকা ধূ ধূ পাহাড়, জনমানবের চিহ্ন নেই। পুরো দৃশ্যটাতে এক ধরনের মন খারাপ করা বিষয় রয়েছে, ঠিক কী কারণে মন খারাপ হয় সেটা বুঝতে না পেরে রুহান এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করে।
মানমন্দিরের ছাদে দাঁড়িয়ে তারা দেখতে পায় ছেলেমেয়েগুলো বাইরে ছুটোছুটি করছে। এখন তাদের দেখে বোঝাই যায় না যে সবাইকে মায়ের বুক থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পণ্য হিসেবে বিক্রি করার জন্যে। মনে হচ্ছে তারা বুঝি কোথাও পিকনিক করতে এসেছে।
মানমন্দিরের ছাদে দুজন ইতস্তত হাঁটে। চারপাশে বন জঙ্গল। এখানে জনবসতি কখনোই ছিল না, এক সময় হয়তো মানমন্দিরটা চালু ছিল তখন কিছু মানুষজন থাকত, আসত-যেত। এখন কেউ নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানে এখন মানুষের কোনো আগ্রহ নেই, উৎসাহ নেই।
রুহান–ক্রিটিনার গলার স্বর শুনে রুহান ঘুরে তাকাল। ক্রিটিনা বলল, তোমাকে আমার একটা কথা বলা হয়নি।
কী কথা?
তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
রুহান হেসে বলল, কী জন্যে ধন্যবাদ?
আমাদের উদ্ধার করে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছ, সেজন্যে নয়। সেজন্যে কৃতজ্ঞতা। কিন্তু ধন্যবাদ অন্য কারণে–
কী কারণে?
এই যে আমি তোমাকে বলছি তোমাকে অনেক ধন্যবাদ—এই কথাটি বলার সুযোগ করে দেবার জন্যে। এরকম কথা বলাই আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে পৃথিবীটা হচ্ছে স্বার্থপর নিষ্ঠুর একটা জায়গা। এখানে সবাইকে হতে হবে হিংস্র আর স্বার্থপর। যার যেটা প্রয়োজন সেটা কেড়ে নিতে হবে। এখানে ভালোবাসা আর মমতার কোনো স্থান নেই।
ক্রিটিনা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, আমিও একজন হিংস্র মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখালে সেটা ভুল। তুমি আবার আমার ভিতরে মানুষের উপরে বিশ্বাস ফিরিয়ে নিয়ে এসেছ। এই বিশ্বাসের কারণে আমি হয়তো খুব বিপদে পড়ব। হয়তো আমার দুঃখ হবে, কষ্ট হবে, যন্ত্রণা হবে, কিন্তু তবু আমি এই বিশ্বাসটা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।
কথা বলতে বলতে ক্রিটিনা দূরে তাকাল এবং হঠাৎ করে তার চোখ দুটি বিস্ফারিত হয়ে যায়। সে ভয় পাওয়া গলায় বলল, রুহান!
কী হয়েছে?
ঐ দেখ–
রুহান ক্রিটিনার দৃষ্টি অনুসরণ করে দূরে তাকায়, বহুদূরে পাহাড় ঘিরে রাস্তাটি উঠে এসেছে। সেই রাস্তায় অনেকগুলো গাড়ি একটা কনভর। গাড়িগুলো এইদিকে আসছে। ঘণ্টাখানেক সময়ের মধ্যে এগুলো এখানে পৌঁছে যাবে।
কেউ বলে দেয়নি কিন্তু তারা জানে এই কনভয়গুলো আসছে তাদের ধরে নেয়ার জন্যে।
(চলবে)
