তৃতীয় এবং শেষ পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#পৃ - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল
বুড়ো লী যদিও খুব আগ্রহ নিয়ে আমার মুখ থেকে কথা শুনবে বলে আমাকে ডেকে আনল কিন্তু আমি যখন বলতে শুরু করলাম সে খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে বলে মনে হল না। মাঝে মাঝেই সে অন্যমনস্ক হয়ে যেতে লাগল,এবং তার প্রশ্নগুলি হল অনাবশ্যক এবং সংগতিহীন। যখন ক্রিস্টালটি কমিউনিকেশান্স মডিউলে দিয়ে দেখানো হল, সে আধাবোজা চোখে পুরোটা দেখে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সময় হয়ে গেছে।
লেন জিজ্ঞেস করল, কীসের সময়?
যার জন্যে এই প্রস্তুতি।
কীসের প্রস্তুতি?
এই যে মহাকাশযানটিতে সবাইকে ঘুম থেকে তুলে আনা হচ্ছে, নিজেদের ভেতরে হানাহানি তৈরি করা হচ্ছে তার একটা কারণ আছে। সেটা কী আমি বলতে পারব না, তোমাদের নিজেদের ভেবে বের করতে হবে। তবে–
তবে কী?
তোমরা যে আটটা শিশুকে নিয়ে এসেছ সেটি মহাকাশযানের সব হিসেবকে গোলমাল করে দিয়েছে। কাজেই এই মহাকাশযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তোমরা জড়িয়ে গেছ। তোমরা চাও কি নাই চাও তোমাদের এখন পেছানোর উপায় নেই।
লেন ভয় পাওয়া গলায় বলল, তার মানে কী? কী হবে এখন?
আমি জানি না কী হবে। কিন্তু কিছু একটা হবে। বুড়ো লী খানিকক্ষণ চুপ থেকে আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, তুমি মুক্ত এলাকা থেকে যে ক্রিস্টালটা এনেছ সেখানে তোমাদের পালানোর খবরটা আছে। পুরোটুকু নেই কারণ পুরোটুকু কেউ জানে না। তোমরা যে আটজনকে নিয়ে পালিয়ে এসেছ তারা যে শিশু সেটাও সবাই জানে না।
আমি মাথা নাড়ালাম, না জানে না।
ক্রিস্টালে আরো কিছু ছোট ছোট তথ্য আছে তার মাঝে তোমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনটি মনে হয়েছে কি?
আমি বুড়ো লীয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, আমার কাছে?
হ্যাঁ।
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে মিয়ারা সম্পর্কে তথ্যটি। মিয়ারাকে গত আঠারো ঘণ্টা কেউ দেখে নি।
বুড়ো লী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, খুব ধীরে ধীরে তার মুখে হাসি ফুটে উঠতে থাকে। তার কুঞ্চিত মুখে হাসিটি হঠাৎ কেমন জানি বিচিত্র দেখায়। লেন অবাক হয়ে একবার আমার দিকে আরেকবার বুড়ো লীয়ের দিকে তাকাল তারপর একটু অধৈৰ্য্য গলায় বলল,আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কেন মিয়ারাকে দেখা যাচ্ছে না?
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, যারা মিয়ারাদের তৈরি করেছে তারা মিয়ারাকে নিয়ে গেছে। আমার মনে হয় শুধু মিয়ারা নয়, মহাকাশযানের অন্য নেতাদেরকেও এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বুড়ো লী মাথা নেড়ে বলল, তোমার ধারনা সত্যি কিহা। আমি হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে চোখ রেখেছি, গত বারো ঘণ্টায় নেতাদের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
লেন ভয় পাওয়া গলায় বলল, কেন দেখা যাচ্ছে না? তারা কোথায়?
বুড়ো লী পূর্ণ দৃষ্টিতে লেনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার ধারণা যদি ভুল না হয় তাহলে তোমরাও সেখানে যাবে।
আমরা?
হ্যাঁ লেন। শিশুগুলিকে প্রয়োজন। যেহেতু তোমরা শিশুগুলিকে নিয়ে পালিয়ে এসেছ তোমাদেরও শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। প্রতিহিংসা সৃষ্টিজগতের প্রাচীনতম অনুভূতি।
আমি দেখতে পেলাম লেন হঠাৎ করে শিউরে উঠল। বুড়ো লী নরম গলায় বলল, তোমাদের হাতে সময় বেশি নেই কিহা। তোমরা কী করবে ঠিক করে নাও।
আমি বুড়ো লীয়ের দিকে তাকালাম। লেন জিজ্ঞেস করল, তুমি তোমাদের হাতে সময় নেই কেন বলছ? আমাদের হাতে সময় নেই কেন বললে না?
বুড়ো লী জোর করে একটু হেসে বলল, আমার গলার স্বরটা একটু ভারি হয়েছে লক্ষ করেছ?
লেন মাথা নাড়ল, না, করি নি।
আরেকটু পর আরো ভারি হবে। আমাকে একটা ভাইরাস আক্রমণ করেছে, কয়েকঘন্টার মাঝে ভোকালকর্ডে সাময়িক একটা ইনফেকশান হয়, গলার স্বরটা ভারি হয়ে যায়। আবার নিজে থেকে কয়েকঘন্টার মাঝে সেরে যায়। তোমাদেরও নিশ্চয়ই হবে। খুব ছোঁয়াচে।
লেন বিভ্রান্ত মুখে বলল, তুমি কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না।
ভাইরাসটি অত্যন্ত নিরীহ ভাইরাস, কয়েকঘণ্টার জন্যে গলার স্বরটা একটু ভারি করা ছাড়া আর কিছুই করে না। কিহা এই ভাইরাসটি সাথে করে এনেছে। ইচ্ছে করে আনে নি, তার শরীরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে
সোনালী চুলের মেয়েটা? কনুইয়ে যে জ্বালা করে উঠল?
হ্যাঁ। সম্ভবতঃ তখনই। এটা পাঠানো হয়েছে আমাকে উদ্দেশ্য করে। কয়েকঘন্টার জন্যে আমার গলার স্বরটা একটু পরিবর্তন করতে চায়। কেন জান?
লেন ফ্যাকাসে মুখে বুড়ো লীয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, না, জানি না।
আমি নিচু গলায় বললাম, আমি জানি।
কেন?
তোমাকে এর আগে কেউ স্পর্শ করে নি। কারণ শক্তিকেন্দ্রের পারপাশে তুমি বিস্ফোরক লাগিয়ে রেখেছ। তুমি সেটা ইচ্ছে করলে তোমার গলার স্বর দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবে। কয়েকঘণ্টার জন্যে তোমার গলার স্বর এখন পাল্টে যাচ্ছে। এই সময়টাতে তুমি ইচ্ছে করলেও কিছু করতে পারবে না।
বুড়ো লী মাথা নাড়ল, চমক্কার। আমি মোটামুটিভাবে বিশ্বাস করে ফেলেছি যে তুমি নিনীষ স্কেলে অষ্টম মাত্রার বুদ্ধিমান। এখন কী হবে বলে মনে হয়?
আমি বুড়ো লীয়ের চোখের দিকে তাকালাম, সেখানে কোনো ভীতি বা আতংক নেই। শান্ত চোখে হয়তো সূক্ষ্ম এক ধরনের কৌতুক। আমি সেই শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, যে কয়েকঘণ্টা তোমার গলার স্বর অন্যরকম থাকবে তার মাঝে কেউ এসে তোমাকে হত্যা করবে।
লেন শিউরে উঠে বলল, কেন? হত্যা করবে কেন?
আমি ত্রিশ বছর থেকে ভরশূন্য ঘরে ভেসে আছি, আমার শরীরের সমস্ত মাংসপেশী অচল হয়ে গেছে। আমাকে এর বাইরে নেয়া সম্ভব না। আমি সেখানে বাঁচব না, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মারা যাব। তা ছাড়া
তা ছাড়া কী?
মহাকাশযানের প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গ করে আমি বড় অপরাধ করেছি। আমাকে শাস্তি দিতে হবে। প্রতিহিংসা বড় মধুর অনুভূতি।
লেন কোনো কথা বলল না, স্থির দৃষ্টিতে বুড়ো লীয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। বুড়ো লী চোখ নামিয়ে বলল, আমার গলা স্বর আরো ভারি হয়ে আসছে। তোমাদের হাতে সময় বেশি নেই কিহা এবং লেন।
আমি বুড়ো লীয়ের দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, তোমার রবোটটাকে আমার দরকার। আমি মন মেশিন নামের একটা জিনিস কিনে এনেছি সেটা ব্যবহার করে একটা অস্ত্র তৈরি করতে চাই।
কী রকম অস্ত্র?
আমি কিছু একটা ভাবব আর সেই ভাবনার সাথে সাথে একটা বিস্ফোরণ ঘটবে। কিছু বিস্ফোরক দরকার খুব ছোট আকারের। তার সাথে থাকবে ডেটনেটর। মন মেশিনের ট্রান্সমিটারটা থাকবে আমার মাথায়, হেলমেট থেকে খুলে সোজাসুজি সেটা আমার করোটিতে বসিয়ে নিতে চাই, সহজে যেন ধরা না পড়ে।
বিস্ফোরকগুলি তুমি কোথায় লাগাতে চাও?
আমি একটু ইতস্তুত করে বললাম, বাচ্চাগুলির হৃদপিণ্ডে।
লেন চমকে উঠে আমাকে আকড়ে ধরল, ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী বলছ তুমি?
আমি মাথা নাড়লাম, ঠিকই বলছি।
বুড়ো লী হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমার তাহলে একটা পরিকল্পনা আছে!
না। আমি মাথা নেড়ে বললাম, আমার সত্যিকার অর্থে কোনো পরিকল্পনা নেই। এটা এক ধরনের সাবধানতা।
লেন আর্ত স্বরে বলল, না, না–এটা হতে পারে না বাচ্চাগুলির হৃদপিণ্ডে আমি তোমাকে কিছু করতে দেব না–
বুড়ো লী সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বলল, লেন, তোমার এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। আমার কাছে চোখে দেখা যায় না এরকম ছোট বিস্ফোরক রয়েছে, সিরিঞ্জে দিয়ে শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া যাবে, বাচ্চাগুলির হৃদপিণ্ডে কিছু করা হবে না।
তাই বলে শরীরের মাঝে বিস্ফোরক?
আমি লেনের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললাম, বাচ্চাগুলিকে ধ্বংস করার জন্যে আমি তাদের হৃদপিন্ডে বিস্ফোরক লাগাচ্ছি না, লাগাচ্ছি তাদের বাঁচানোর জন্যে। পুরো ব্যাপারটা তুমি শুনলেই বুঝতে পারবে। এস আমার সাথে আমি তোমাকে বলি।
বুড়ো লীয়ের রবোটটা দেখতে অত্যন্ত কদাকার হলেও কাজকর্মে খুব চৌকস। আমি কী করতে চাই ব্যাপারটা জেনে নেবার পর সে কাজে লেগে গেল। মন মেশিনের ট্রান্সমিটারটা নিয়ে খানিকটা কাজ করতে হল। আমার মস্তিষ্কের দু-ধরনের তরঙ্গের সাথে সেটাকে টিউন করা হল। যখনই আমি একটি বিশেষ পদ্ধতিতে মিথ্যা কথা বলব প্রথম শ্রেণীর বিস্ফোরকগুলি বিস্ফোরিত হবে। দ্বিতীয় শ্রেণীর বিস্ফোরকগুলি বিস্ফোরিত হবে যখন আমি বিশাল দুটো প্রাইম সংখ্যাকে মনে মনে গুণ করার চেষ্টা করব তখন। প্রথম শ্রেণীর বিস্ফোরকগুলি রাখা হল খাবারের ক্যাপসুল, তথ্য ক্রিস্টাল কমিউনিকেশান্স মডিউল এ ধরনের আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারী জিনিসের মাঝে। দ্বিতীয় ধরনের বিস্ফোরকগুলি অত্যন্ত ছোট সিরিঞ্জ দিয়ে ছটফটে আটটি শিশুর শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া হল। মন মেশিনের ট্রান্সমিটারটির আকার ছোট করে নিয়ে আসা হল এবং বুড়ো লীয়ের রবোট আমার করোটির উপরে সেটা অস্ত্রোপাচার করে বসিয়ে দিল। সবশেষে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক দিয়ে আমার ক্ষত নিরাময় করে দেয়া হল, মাথার ভেতরে একটা ভোতা যন্ত্রণা ছাড়া আর কোথাও তার কোনো প্রমাণ রইল না।
সমস্ত কাজ শেষ করে বুড়ো লীয়ের ঘরে ফিরে এসে দেখি সে তার ঘরে একটা ছোট ভোজ সভায় আয়োজন করেছ। কিছু বিশেষ খাবার এবং বিশেষ পানীয় তার আশে পাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের কাজ শেষ।
যা। আমি মাথা নেড়ে বললাম, আমার এখন খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। যখনই আমি একটা মিথ্যা কথা বলব ঠিক তখনই আমাদের সাথে রাখা কোনো একটি টাইমার চালু হয়ে যাবে। ঠিক দুই সেকেন্ডের মাঝে যদি দ্বিতীয় একটা মিথ্যা কথা বলি তাহলে ফুড ক্যাপসুলের বিস্ফোরকটি বিস্ফোরিত হবে। যদি তিন সেকেন্ডের মাঝে তৃতীয় একটা মিথ্যা কথা বলি তাহলে তথ্য ক্রিস্টালে, চার সেকেন্ডের মাঝে হলে কমিউনিকেশান্স মডিউলে।
বুড়ো লী খিক খিক করে হেসে বলল, শেষ পর্যন্ত জোর করে নিজেকে সত্যবাদী তৈরি করে নিলে?
হ্যাঁ। অনেকটা সেরকম।
বুড়ো লী ভাসমান খাবার এবং পানীয়ের বোতলগুলি নিজের কাছে ধরে রাখতে রাখতে বলল, এসো, আমাদের বিদায়ের সময়টা স্মরণীয় করে রাখা যাক, অনেকদিন থেকে এই খাবারগুলি বাঁচিয়ে রেখেছি বিশেষ কোনো মুহূর্তের জন্যে।
আমি এবং লেন কোনো কথা বললাম না। লী সাবধানে বোতলের মুখ খুলে এক ঢোক পানীয় খেয়ে কী একটা কথা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখন আমরা ডকিং স্টেশনে এক ধরনের গুম গুম শব্দ শুনতে পেলাম। বুড়ো লী মুখ মুছে অস্পষ্ট স্বরে বলল, ওরা এসে গেছে।
ঘরটির একপাশে চতুষ্কোন হলোগ্রাফিক স্ক্রিনটি নিজে নিজে চালু হয়ে গেল এবং আমরা দেখতে পেলাম একটি ভাসমান যান স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ভেতর থেকে দশটি নানা আকারের রবোট বের হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটি রবোটের পায়ের নিচে থেকে এক ধরনের জেট বের হচ্ছে, ভরশূন্য পরিবেশে স্বচ্ছন্দে চলাচল করার জন্যে এই রবোটগুলি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে এসেছে। বাই ভার্বালের সবচেয়ে শেষ আরোহী সোনালি চুলের একটি মেয়ে। তার পিঠে একটি জেট প্যাক বাধা, হাতে ভয়ংকর দর্শন একটি অস্ত্র।
বুড়ো লী হলোগ্রাফিক স্ক্রিনটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কিহা
বল।
রোবট আর মানুষের এই দলটি এখানে প্রবেশ করার আগে তোমাদের একটা কখা বলতে চাই।
কী কথা?
বহুঁ বহুকাল আগে পৃথিবীতে বঙ্গোপসাগরের উপকুলে এক বুদ্ধিমান জাতি দাবা নামে একটা খেলা আবিষ্কার করেছিল। দ্বিমাত্রিক ক্ষেত্রে আটটি করে মোট চৌষট্টি ঘরের দুকে ষোলটি সাদা এবং মোলটি কাল গুটি নিয়ে খেলা হত। সেই খেলায়
আমি জানি। আমি সেই খেলা খেলেছি।
চমৎকার। বহুঁ প্রাচীন কালে হিসাব নিকাশ করার জন্যে কম্পিউটার নামক একটা যন্ত্র আবিষ্কার করা হয়েছিল, মানুষ সেই কম্পিউটারে দাবা খেলা শুরু করেছিল। এখনো তথ্য প্রক্রিয়ার যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে সেখানেও দাবা খেলা হয়। এই সব যন্ত্রপাতি মানুষ থেকে হাজারগুণ কী লক্ষগুণ বেশি দক্ষতা নিয়ে দাবা। খেলতে পারে। তোমার কী মনে হয় এইসব যন্ত্রপাতিক দাবা খেলায় হারানো সম্ভব?
সম্ভব।
অমির উওর গুনে বুড়ো লী আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, কেমন করে তুমি জান?
আমি জানি, কারণ আমি এই ধরনের যন্ত্রপাতিকে দাবা খেলায় হারিয়েছি। কী ভাবে হারিয়েছ?
এই সব যন্ত্রপাতি কখনো ভুল করে না। সেটাই হচ্ছে তাদের দুর্বলতা। আমি এই দুর্বলতা ব্যবহার করে তাদের খেলায় হারিয়েছি।
বুড়ো লী আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তার চোখে একটা কৌতুকের ছায়া পড়ল। সে হাত বাড়িয়ে আমার হাত স্পর্শ করে বলল, আমি পৃথিবীর নামে তোমাকে আশীর্বাদ করছি, তুমী জয়ী হও।
কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ গোলাকার দরজা খুলে গেল এবং ঘরে প্রথমে সোনালি চুলের মেয়েটি এবং তার পাশাপাশি অনেকগুলি রবোট এসে ঢুকল। ভরশূন্য পরিবেশে আমরা ওলট পালট খাচ্ছিলাম। কিন্তু যারা এসে ঢুকল তারা সবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোনালী চুলের মেয়েটি তার হাতের ভয়ংকর দর্শন অস্ত্রটি উঁচু করে ধরে বলল, বুড়ো লী, মহাকাশযানের কেন্দ্রস্থলে শক্তি কেন্দ্রে বিস্ফোরক বসানোর জন্যে তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
বুড়ো লী ক্লান্ত, স্বরে বলল, কথা বলে সময় নষ্ট করো না সোনালি চুলের রবোট।
আমি রবোট নই। আমি মানুষ। আমার নাম ইফা।
ইফা, তুমি জান না যে তুমি রবোট। তোমাকে প্রোগ্রাম করা হয়েছে নিজেকে মানুষ বলে ভাবার জন্যে।
মিথ্যা কথা।
বেশ। আমি তোমার সাথে তর্ক করতে চাই না। তুমি গুলি কর। কিহ এবং লেন তোমরা চোখ বন্ধ কর। প্রতিহিংসামূলক হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত ভয়ংকর ব্যাপার।
লেন একটা আর্ত চিৎকার করে আমাকে জাপটে ধরল এবং সোনালি চুলের মেয়েটি ঠিক সেই সময় বুড়ো লীকে গুলি করল, আমি দেখতে পেলাম বুড়ো লীয়ের দেহ চোখের পলকে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। হত্যা করার কত রকম পদ্ধতি থাকার পরেও কেন এখনো মানুষকে এরকম প্রতিহিংসা নিয়ে ভয়ংকর ভাবে হত্যা করা হয় কে জানে। সোনালি চুলের মেয়েটি এবারে অস্ত্রটি আমার এবং লেনের দিকে তাক করল। আমার ভয় পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু আমি ভয় পেলাম না, শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এখন কী চাও?
মূল তথ্যকেন্দ্রের আটজন মানুষ কোথায়?
পাশের ঘরে।
ইফা নামের সোনালি চুলের মেয়েটি ইঙ্গিত করতেই চারটি রবোট তাদের স্বয়ংক্রিয় জেট চালিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণের মাঝেই পাশের ঘরে শিশুগুলির চিঙ্কার এবং নানা কণ্ঠের প্রতিবাদ শুনতে পেলাম। লেন এতক্ষণ আমার বুকে মুখ গুজে রেখেছিল, এবার ভয় পাওয়া গলায় বলল, বাচ্চাগুলিকে কী করবে?
আমি জানি না।
লেন ইফার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কি জান মূল তথ্যকেন্দ্রের আটজন মানুষ আসলে শিশু?
শিশু?
হ্যাঁ। তাদের সামলানো খুব সহজ নয়। তারা আমার কথা শোনে। তুমি রোটগুলিকে ওদের স্পর্শ করতে নিষেধ কর, আমি তাদের নিয়ে আসছি।
ইফা এক মুহূর্তে কী একটা ভেবে বলল, ঠিক আছে যাও।
লেন ভেসে ভেসে পাশের ঘরে চলে গেল। আমি ইফার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে বললাম, আমি তোমাকে মুক্ত এলাকায় দেখেছিলাম, তখন তুমি আমাকে দেখে পালিয়ে যাচ্ছিলে–এখন অনেক সাহস দেখাচ্ছ, কারণটা কী?
ইফা কোনো কথা না বলে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমি নিচু গলায় বললাম, মানুষ ইচ্ছে করলে নিয়ম তৈরি করতে পারে আবার নিয়ম ভাঙতে পারে। রবোটেরা পারে না। তাদেরকে যেভাবে প্রোগ্রাম করা হয় ঠিক সেভাবে চলতে হয়। তোমাকে নিশ্চয়ই এখন সাহসী এবং নিষ্ঠুর হওয়ার জন্যে প্রোগ্রাম করা। হয়েছে।
ইফা ক্রুদ্ধ গলায় বলল, আমি রবোট নই। আমাকে কেউ প্রোগ্রাম করে নি।
তুমি হয়তো রবোট নও, কিন্তু তোমাকে প্রোগ্রাম করা হয়েছে ইফা। একজন। রবোটকে প্রোগ্রাম করা সহজ কিন্তু মানুষকে প্রোগ্রাম করা এত সহজ নয়। কিন্তু একবার যদি মানুষকে প্রোগ্রাম করা হয় সেখান থেকে তার কোনো মুক্তি নেই।
ইফা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ফিসফিস করে বললাম, তোমার জন্যে আমার করুণা হয় ইফা। অসম্ভব করুণা হয়।
ঠিক এরকম সময় বাইরে থেকে অনেকগুলি রবোট ভেতরে এসে হাজির হল, তাদের একজন মাথা নিচু করে বলল, মহামান্যা ইফা আমরা শক্তিকেন্দ্র পরীক্ষা করে এসেছি। সেখানে কোনো বিস্ফোরক নেই।
বিস্ফোরক নেই?
না।
আমি ইফার দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি সম্পূর্ণ বিনা কারণে বুড়ো লীকে হত্যা করেছ।
বিস্ফোরক রাখা আর বিস্ফোরক রাখার কথা বলা সমান অপরাধ। বুড়ো লী তার কাজের যথাযযাগ্য শাস্তি পেয়েছে।
তোমার ভিতরে কী কোনো অপরাধবোধ জন্ম নিয়েছে ইফা?
অপরাধবোধ?
কেন?
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, তুমি নিশ্চয়ই একজন রবোট। নিশ্চয়ই রবোট।
ইফা ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, না, আমি রবোট নই। আমি মানুষ। মানুষ। মানুষ।
আমি বুড়ো লীয়ের ছিন্নভিন্ন দেহের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, তুমি মানুষ নও। আমি প্রার্থনা করি তুমি মানুষ হও।
বাই-ভার্বালটি নিঃশব্দে মহাকাশযানের মাঝে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। প্রথমে জানালা দিয়ে বাইরে দেখা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ হল আর দেখা যাচ্ছে না। জানালাগুলি অন্ধকার করে দিয়ে বাইরের সাথে আমাদের যোগাযোগ কেটে দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তার বাধাধরা নিয়ম কানুন, কিছু করার নেই, কিন্তু আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। আমি সাধারণ মানুষ, আমার সাধারণ দায়িত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্যচক্রে আমি এক বিশাল ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছি। এর থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসব তার সম্ভাবনা বলতে গেলে নেই। এখন যে ঘটনাগুলি ঘটছে সেটাই হবে আমার জীবনের শেষ ঘটনাগুলি। এগুলি একটু মধুর হতে পারত কিন্তু হয় নি। বুড়ো লীয়ের হত্যাকাণ্ড নিজের চোখে দেখেছি। আটটি ফুটফুটে শিশুর হত্যাকাণ্ড দেখতে হবে, আমার আর লেনের কথা তো ছেড়েই দিলাম। আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে ফেললাম, জোর করে মাথা থেকে সবকিছু সরিয়ে দিলাম, এখন সুন্দর একটা কিছু ভাবতে হবে, মিষ্টি একটা কিছু ভাবতে হবে যেটি আমার বিক্ষিপ্ত মনটিকে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও শান্ত করে দিতে পারে। কী হতে পারে সেই জিনিস? আমার শৈশব? ফেলে আসা গ্রহটির বিশাল প্রান্তর? স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ আকাশ? একটু পর আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম যে আমি লেনের কথা ভাবছি।
আমি চোখ খুলে তাকালাম, সামনের সাড়িতে আটটি শিশুকে নিয়ে সে শান্ত মুখে বসে আছে–মুখে গভীর উদ্বেগের ছায়া। শিশুগুলি তাকে জড়াজড়ি করে ধরে রেখেছে, কোলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে দুজন, তার গালের সাথে গাল লাগিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছে একজন শিশু। সে হাত দিয়ে আকড়ে রেখেছে। সবাইকে। শিশুগুলির চোখে মুখে কোনো ভয় নেই, আতংক বা উদ্বেগ নেই। তাদের মুখে এক গভীর নিশ্চিন্ত বিশ্বাস। তারা জানে যতক্ষণ লেন তাদেরকে আকড়ে ধরে রাখবে ততক্ষণ তাদের কোনো ভয় নেই, বিপদ নেই।
আমি এই অপূর্ব দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে থাকি। আর কী আশ্চর্য! কিছুক্ষণ পর আমারও মনে হতে থাকে এই আটটি নিস্পাপ শিশুর কোনো ভয় নেই, কোন বিপদ নেই!
ঠিক এরকম সময় বাই-ভার্বালে একটা মৃদু কম্পন অনুভব করলাম এবং সাথে সাথে ভিতরের সব রবোটেরা সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের ঘিরে দাড়াল। আমরা নিশ্চয়ই গন্তব্য স্থানে পৌঁছে গেছি।
বাই-ভার্বালের গোল দরজা দিয়ে আমরা বের হয়ে এলাম। স্বচ্ছ মেঝে, স্বচ্ছ দেয়াল, উপরে স্বচ্ছ ছাদ প্রতি মুহূর্তে মনে হতে থাকে বুঝি কোথাও পড়ে যাব। সাবধানে হেঁটে হেঁটে আমরা দ্বিতীয় একটি ঘরে হাজির হলাম। সেখানে জোর করে শিশুগুলিকে লেনের কাছ থেকে আলাদা করা হল। শিশুগুলি ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করে কিন্তু এবোটগুলি তাতে ভ্রুক্ষেপ করল না। লেন জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখে শিশুগুলিকে অভয় দিয়ে, বলল, তোমরা যাও, আমি এক্ষুনি আসছি।
তারা কী বুঝল কে জানে! একজন একজন করে কান্না থামিয়ে একে অন্যকে জড়াজড়ি করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তখন আমাকে আর লেনকে পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে পাশের একটা ঘরে নিয়ে আসা হল। আমাদের বিবস্ত্র করা হল এবং আমাদের কাছে যা ছিল সব সরিয়ে নেয়া হল। আমি দেখতে পেলাম খাবারের ক্যাপসুলগুলি সরিয়ে নিল প্রাচীন ধরনের একটি রবোট। তথ্য ক্রিস্টালগুলি আধুনিক ধরনের কিছু রবোট, কমিউনিকেশান্স মডিউলটি যে পরীক্ষা করতে শুরু করল তাকে একজন মানুষের মতো দেখাচ্ছিল, যদিও আমি মোটামুটি নিশ্চিত সেও একজন রবোট।
আদের বিবস্ত্র অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকতে হল না। কিছুক্ষণের মাঝেই নূতন এক প্রস্ত নিও-পলিমার দিয়ে আমাদের আবৃত করা দেয়া হল। সত্যিকার পোষাক নয় তবে পোষাকের কাজ চলে যায়।
এতক্ষণ পর্যন্ত কেউ আমাদের সাথে একটা কথাও বলে নি আমরাও কিছু বলি নি। আমি এবারে আমার প্রথম কথাটি উচ্চরণ করলাম, স্পষ্ট গলায় জোর দিয়ে বললাম, আমি মহামতি গ্রাউলের সাথে দেখা করতে চাই।
সাথে সাথে ঘরটিতে একটি নীরবতা নেমে এল। যে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। খুব ধীরে ধীরে সবাই ঘুরে আমার দিকে তাকাল। আমি শুনতে পেলাম বিশাল এই ভবনে দূরে কোথাও তারস্বরে এলার্ম বাজতে শুরু করেছে।
দীর্ঘ সময় সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। আমি এবার আরো স্পষ্ট গলায় বললাম, আমি মহামতি গ্রাউলের সাথে দেখা করতে চাই। মহামতি গ্রাউল, যিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, যিনি এই বিশাল মহাকাশযানটি তৈরি করেছেন। যার চোখ কান অন্যকোন ইন্দ্রিয় নেই। যিনি সংবেদনশীল যন্ত্র দিয়ে বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করেন।
আমরা সমানে যারা দাঁড়িয়েছিল তারা তখনো নিঃশব্দে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি শুনতে পেলাম অনেকে এই ঘরের দিকে ছুটে আসছে। ঘরের দরজা খুলে গেল এবং বেশ কয়েকজন পুরুষ এবং মহিলা ভেতরে ঢুকে আমাদের ঘিরে দাঁড়াল। আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের লক্ষ করতে থাকি, কেন জানি মনে হয় এদের কেউই সত্যিকারের মানুষ নয়। হয় পুরোপুরি রবোট কিংবা রবোটের দেহে আটকে পড়ে থাকা কোনো একজন হতভাগ্য মানুষ।
বয়স্ক ধরনের একজন কয়েক পা এগিয়ে এসে ভীত গলায় বলল, তুমি কী বলছ?
আমি প্রায় ধমক দেয়ার মতো করে বললাম, আমি জানি আকি কী বলছি। আটটি শিশুকে কেন আনা হয়েছে আমি তাও জানি। মহামান্য গ্রাউলের রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতির নিয়ম মাফিক পরিবর্তন করার কথা। আটটি সুস্থ সবল হৃদপিণ্ড দরকার। আটটি শিশু থেকে সেই আটটি হৃদপিণ্ড নেয়া হবে।
বয়স্ক ধরনের মানুষটির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সে কাঁপা গলায় বলল, তুমি এসব কী বলছ? কোথায় শুনেছ এই সব?
আমি কোথায় শুনেছি সেটা তোমার জানার দরকার নেই। আমি এই মুহূর্তে মহামতি গ্রাউলের সাথে কথা বলতে চাই। এই মুহূর্তে–
কিন্তু সেটা তো অসম্ভব।
অসম্ভব?
হ্যাঁ।
বেশ। তুমি জান আমি কী করতে পারি?
কী করতে পার?
আমি তোমাদের পুরো এলাকা ধ্বংস করে দিতে পারি।
সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলি এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারা কেউ আমার কথা বিশ্বাস করছে না। আমি হিংস্র গলায় বললাম, তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করলে না? ঠিক আছে আমি তোমাদের আমার ক্ষমতা দেখাব।
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, আমার অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। এক সেকেন্ড অপেক্ষা করে বললাম, আমি ধ্বংস করে দেব সব।
নির্দিষ্ট সময় পর পর দুটি মিথ্যা কথা উচ্চারিত হওয়া মাত্র খাবার ক্যাপসুলে রাখা বিস্ফোরণটি প্রচন্ড শব্দ করে বিস্ফোরিত হল। প্রাচীন ধরনের রবোটের আশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবোটগুলিও ছিটকে উঠল উপরে, তারপর ঘুরতে ঘুরতে নিচে এসে পড়ল প্রচণ্ড শব্দে। হল ঘরটি কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেল, জঞ্জাল ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।
আমাদের যারা ঘিরে দাঁড়িয়েছিল তারা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একজন কী একটা বলতে চাইছিল আমি বাধা দিয়ে বললাম, আমার কথা বিশ্বাস হল?
কেউ কোনো কথা বলল না। আমি শান্ত গলায় বললাম, আমি তোমাদের আরো একটি সুযোগ দেব। দুই সেকেন্ড অপেক্ষা করে বললাম, সুযোগ গ্রহণ না করলে ধ্বংস করে দেব সবকিছু।
সাথে সাথে তথ্য ক্রিস্টালের বিস্ফোরকটি বিস্ফোরিত হল। এটি ছিল আরো শক্তিশালী। পুরো হল ঘর প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল সাথে সাথে। ছিন্ন ভিন্ন রবোটের ধ্বংসাবশেষ উপর থেকে নিচে পড়তে শুরু করল। মনে হল বুঝি এখানে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে। আমি তার মাঝে চিৎকার করে বললাম, এই মুহূর্তে আমাকে মহামতি গ্রাউলের কাছে নিয়ে যাও। শুধু তিনিই আমার সাথে কথা বলতে পারবেন, আর কেউ না।
এবার আমার সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলির মাঝে এক ধরনের চাঞ্চল্যের চিহ্ন লক্ষ করা গেল। আমি যেভাবে হাস্যকর ছেলেমানুষি যন্ত্র দিয়ে বড় বড় দুটি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছি কতক্ষণ সেটি তাদের কাছে গোপন রাখতে পারব জানি না, সময় আমার কাছে খুব মূল্যবান। যে কোনো মুহূর্তে আমি ধরা পড়ে যেতে পারি, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। মহামতি গ্রাউলকে নিশ্চয়ই অচিন্ত্যনীয় প্রতিরক্ষা দিয়ে আগলে রাখা হয়, আমি নিজে থেকে সেখানে কখনোই যেতে পারব না।
আমার সামনে দাড়ানো মানুষগুলি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে। একজন একটু এগিয়ে এস বলল, তুমি কেন মহামতি গ্রাউলের সাথে দেখা করতে চাও?
আমি গলায় অধৈর্যের স্বর ফুটিয়ে বললাম, আমি তোমাকে সেটা বললে তুমি বুঝবে না। তোমার কিংবা তোমাদের কারো সেই মানসিক পরিপক্কতা নেই।
কথাটি সত্যি নয়, তাই তিন সেকেন্ড পর যখন বললাম, আমি আর সহ্য করতে পারছি না–তখন তৃতীয় বিস্ফোরণটি ঘটল।
ভয়ংকর বিস্ফোরণের ধাক্কাটা কমে যেতেই উপস্থিত মানুষেরা ছোটাছুটি শুরু করে এবং কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যি আমাকে এবং লেনকে একটা ভাসমান যানে তুলে দেয়। সেটি অন্ধকার একটা সুড়ঙ্গে ছুটে যেতে থাকে। বিশাল বিশাল কিছু গেট নিজে থেকে খুলে যায় আবার আমাদের পিছনে বন্ধ হয়ে যায়। অসংখ্য ধরনের যন্ত্রপাতি আমাদের পরীক্ষা করে তারপর ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়।
এক সময় আমি আর লেন একটা বড় হলঘরের মতো জায়গায় পৌঁছালাম। তার ধবধবে সাদা দেয়াল, উঁচু ছাদ এবং স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ মেঝে। ঘরটিতে হালকা নরম একটি আলো, যদিও কোথা থেকে সেই আলো আসছে বুঝতে পারছি না। ভিতরে একটু শীতল, আমি আর লেন কাছাকাছি এসে দাঁড়ালাম। কেউ কিছু বলে দেয় নি কিন্তু আমার মনে হল এখানেই মহামতি গ্রাউলের সাথে দেখা হবে।
আমি আর লেন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম। কোথাও কোন চিহ্ন নেই কিন্তু তবু আমাদের মনে হতে থাকে কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি হঠাৎ এক ধরনের আতংক অনুভব করতে থাকি। বুকে আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে আমি লেনের দিকে তাকালাম, ঠিক তখন শুনতে পেলাম কে একজন ভারি গলায় বলল, তোমরা কেন আমার সাথে দেখা করতে এসেছ?
আমি আর লেন চমকে উঠে চারিদিকে তাকালাম, কেউ কোথাও নেই। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি মহামতি গ্রাউল। আপনার ভবনে আমি আহাম্মকের মতো তিনটি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছি, আমি–
হ্যাঁ। আমি খবর পেয়েছি। আমি অনুভব করছি তোমার করোটিতে একটা ছোট ট্রান্সমিটার বসানো আছি। তুমি নিশ্চয়ই তোমার মস্তিষ্ক তরঙ্গ ব্যবহার করে সেটা দিয়ে কাছাকাছি রাখা বিস্ফোরকে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছ।
আপনি সত্যিই অনুমান করেছেন মহামতি গ্রাউল। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে আমার এই ছলনাটুকু করতে হয়েছে। আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
আমার কর্মচারীদের ধোকা দেয়া খুব সহজ। তারা নির্বোধ।
আমি ক্ষমা চাই মহামতি গ্রাউল।
আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি।
আপনার প্রতি আমার অসংখ্য কৃতজ্ঞতা। অসংখ্য কৃতজ্ঞতা।
তুমি কেন এসেছ আমার কাছে?
আমার বলতে খুব দ্বিধা হচ্ছে মহামতি গ্রাউল। আমি আপনার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন না করে কথাটি কীভাবে উচ্চারণ করব বুঝতে পারছি না।
তুমি অসংকোচে বলতে পার কিহা।
তার আগে আমি কি একটা অনুরোধ করতে পারি?
কী অনুরোধ?
আমি কি আপনাকে দেখতে পারি?
মহামতি গ্রউল এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, আমাকে কেউ কখনন দেখে নি। যে মানুষ বেঁচে থাকবে সে আমাকে কখনো দেখবে না।
আমি আপনাকে সশরীরে দেখতে চাই নি মহামতি গ্রাউল। আমি আপনার একটা রূপ দেখতে চাইছি। আমি কাউকে না দেখে ভাল করে কথা বলতে পারি না মহামান্য গ্রাউল। না দেখে কথা বললে মনে হয় আমি তার উপাসনা করছি।
বেশ। তুমি আমাকে কী রূপে দেখতে চাও? পুরুষ না রমণী?
আপনার যা ইচ্ছে।
প্রায় সাথে সাথেই ঘরের মাঝামাঝি সৌম্য দর্শন একজন বৃদ্ধকে দেখা গেল। শরীরে আলগোছে একটি চাদর জড়ানো, সেখান থেকে এক ধরনের নরম আলো বের হচ্ছে। মাহমতি গ্রাউলের এই রূপটি দেখে আমার প্রাচীন গ্রন্থের দেবদূতের কথা মনে পড়ল। এটি সত্যিকারের কোনো মানুষ নয় কিন্তু রূপটি এত জীবন্ত যে আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। আমি আর লেন মাথা নত করে অভিবাদন করে বললাম, আপনাকে অভিভাদন। আমাদেরকে একটি শান্ত সমাহিত রূপে দেখা দেয়ার জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ। অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
তুমি এখন কী বলতে চাও বল।
আমার কথাটি বলার আগে আমার একটু ভূমিকা দেয়ার প্রয়োজন। আপনার সময় অত্যন্ত মূল্যবান কিন্তু তবুও আমি একটু সময় ভিক্ষা চাইছি।
সৌম্য দর্শন বৃদ্ধ মানুষটি আমার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি তোমাকে সময় দিচ্ছি। তুমি বল।
আপনি এই মহাকাশযানটি তৈরি করেছেন। এর মূল নক্সা আপনার, খুঁটিনাটি সব কিছু আপনার। দীর্ঘ সময় নিয়ে এটি মহাকাশে তৈরি হয়েছে। একসময় এটি পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছে। মানুষ যখন কিছু একটা সৃষ্টি করে তার এক ধরনের আনন্দ হয়। সাধারণ মানুষ সৃষ্টি করে সাধারণ জিনিস তার আনন্দটুকু হয় সাধারণ। আপনি সাধারণ মানুষ নন–আপনার সৃষ্টিও তাই সাধারণ নয় এবং সেটা সৃষ্টি করে আপনি যে আনন্দটুকু পেয়েছেন সেই আনন্দও নিশ্চয়ই অসাধারণ। আপনার সেই তীব্র আনন্দের অনুভূতি আমরা কল্পনাও করতে পারব না।
এই মহাকাশযান যখন পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছে আপনি সেখানে স্থান করে নিয়েছেন। এই মহাকাশযানের সৌভাগ্য, মহাকাশ অভিযাত্রীদের সৌভাগ্য আপনি তার নেতৃত্ব দিতে রাজি হয়েছেন। সেই নেতৃত্বটুকু এসেছে গোপনে। সাধারণ মানুষের কাছে আপনার কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। তাদের ধারণা মূল তথ্যকেন্দ্র এই মহাকাশযানকে চালিয়ে নিচ্ছে মহাকাশ দিয়ে। বহুদূরে পৃথিবীতে।
যখন মহাকাশযান পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছে হঠাৎ করে আপনি আবিষ্কার করলেন আপনার আর কিছু করার নেই। সাধারণ মানুষ শীতল ঘরে ঘুমিয়ে সময় কাটাতে পারে, আপনার ঘুমানোর সুযোগ নেই। আটটি সতেজ হৃদপিণ্ড আপনার জটিল বহুমুখী মস্তিষ্ক স্তরের নানা অংশে রক্ত সঞ্চালন করে। আপনি প্রতি মুহূর্তে সজীব, প্রতি মুহূর্তে কর্মক্ষম। সাধারণ মানুষের চোখ রয়েছে। কান রয়েছে, নাক, মুখ, ইন্দ্রিয় রয়েছে। শারীরিক বা আধা শারীরিক আনন্দের সুযোগ রয়েছে। আপনার সমস্ত কার্যকলাপ বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে। আপনি হঠাৎ করে আবিষ্কার করলেন আপনি নিঃসঙ্গ।
আমি কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলাম। মাথা নিচু করে সম্মান প্রদর্শন করে বললাম, আমি কি ভুল বলেছি মহামান্য গ্রাউল?
মহামতি গ্রাউল এক মুহূর্ত নীরব থেকে বললেন, না। তুমি ভুল বল নি কিহা।
আমি কি আরো একটু বলব?
বল।
আমাদের, সাধারণ মানুষের নিঃসঙ্গতা সাধারণ। সেটা দূর করার জন্যে আমরা সাধারণ কাজ করি। আপনি সাধারণ মানুষ নন–আপনি তাই সাধারণ কাজ করতে পারেন না। আপনি ঠিক করলেন সময় কাটানোর জন্যে একটা কৌতুক করবেন। কিছু বুদ্ধিমান মানুষকে বেছে নিয়ে তাদের সাথে বুদ্ধির কোনো একটা খেলা খেলবেন। এমনি-এমনি আপনি বুদ্ধিমান মানুষ বেছে নিতে চাইলেন না। আপনি ঠিক করলেন সত্যিকারের বুদ্ধিমান মানুষকে বেছে নিবেন। তাই একদিন। মহাকাশযানের সব মানুষকে জাগিয়ে তুলতে শুরু করলেন। তাদেরকে হানাহানি শুরু করতে দিলেন, তাদেরকে নেতৃত্ব নিয়ে যুদ্ধ করতে দিলেন। আপনি ঠিক করলেন যারা সবচেয়ে উপরে উঠে আসবে আপনি তাদের বেছে নিবেন।
মহামতি গ্রাউলের মুখ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে আসছিল, আমি হঠাৎ বুকের ভিতরে ভয়ের এক ধরনের কম্পন অনুভব করি। তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, তুমি কেমন করে এসব জান?
আমি কিছু জানি না মহামতি গ্রাউল। সব আমার অনুমান। আমার অনুমান ভুল। হতে পারে। যদি হয় আপনি আমার ভুল ধরিয়ে দেবেন মহামতি গ্রাউল। আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, আমার অনুমান কী ভুল হয়েছে মহামতি গ্রাউল?
হয় নি। বল তুমি কী বলতে চাও। তোমার দীর্ঘ ভূমিকা তুমি শেষ কর। আমার ভূমিকা প্রায় শেষ মহামতি গ্রাউল। আমি এক্ষুনি বলব আমি কী চাই। আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের আশা আকাঙ্খ সাধারণ। আমাদের স্বপ্নও সাধারণ। আপনি সাধারণ নন, আপনার আশা আকাঙ্খও সাধারণ নয়। আপনার কল্পনাও সাধারণ নয়। আমরা সেটা বুঝতে পারি না। সেটা কল্পনা করতে পারি না। আপনার ছোট একটি খেয়ালে মাহকাশযানে শত শত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হাজার হাজার মানুষকে স্বার্থপর লোভীতে পাল্টে দেয়া হয়েছে। এর অবসান ঘটাতে হবে মহামতি গ্রাউল।
লেন হঠাৎ করে আমার কনুই খামচে ধরল। আমি সাবধানে তার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে মহামতি গ্রাউলের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম। তার মুখমণ্ডল ধীরে ধীরে কঠোর হয়ে উঠল, তার নিঃশ্বাস দ্রুততর হয়ে ওঠে এবং একসময়ে থমথমে গলায় বললেন, তুমি কীভাবে এর অবসান ঘটাতে চাও?
আপনি এই মহাকাশযানটির কতৃত্ব মহাকাশযানের মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিন।
আর যদি না দিই?
আপনাকে দিতে হবে মহামতি গ্রাউল। মহাকাশযানের সমস্ত মানুষের কাছে অঙ্গীকার করা হয়েছে এটি পৃথিবীতে যাচ্ছে, কিন্তু আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছি নক্ষত্রপুঞ্জ তার ঠিক জায়গায় নেই। ভেগা নক্ষত্র অনেক উপরে, কালপুরুষ বাম দিকে সরে রয়েছে। আপনি এই মহাকাশযানকে অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন।
মহামতি গ্রাউলের মুখে এক ধরনের বিচিত্র হাসি ফুটে উঠল, তিনি সেই হাসি গোপন করার চেষ্টা না করে বললেন, আমি তোমার কথা শুনে মুগ্ধ হয়েছি কিহা। তোমার বুদ্ধিমত্তা নিশ্চয়ই নিনীষ স্কেলে আট এর কম নয়।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন কিন্তু সেটার কোনো অর্থ নেই মহামতি গ্রাউল।
আমি যদি তোমার অনুরোধ মহাকাশযানের কতৃত্ব মানুষের হাতে না দিই তুমি কী করবে কিহা?
আমি বুকভরা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, আমি আপনাকে হত্যা করতে বাধ্য হব মহামতি গ্রাউল।
মহামতি গ্রাউল বিস্মিত দৃষ্টিতে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন তারপর হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। লেন আমার দুই হাত শক্ত করে ধরে রেখে ফিসফিস করে বলল, হায় ঈশ্বর। হায় পরম করুণাময় ঈশ্বর।
মহামতি গ্রাউলের হাসি না থামা পর্যন্ত আমি চুপ করে রইলাম, তারপর নিচু গলায় বললাম, মানুষের স্বাভাবিক হিসেবে আপনি একজন উন্মত্ত দানব ছাড়া কিছু নন। আমি যদি আজ ব্যর্থ হই অন্য কোনো একজন আপনাকে হত্যা করবে। আপনাকে হত্যা করে এই মহাকাশযানকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
ঘরের মাঝামাঝি মহামতি গ্রাউলের যে প্রতিচ্ছবিটি ছিল সেটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে, তার আকার আরো বড় হয়ে আসে এবং গায়ের রং পরিবর্তিত হতে থাকে, একটু আগে যেটিকে শান্ত সৌম্য একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল ধীরে ধীরে সেটা সত্যিই যেন দানবের রূপ নিতে শুরু করে। লেন শক্ত করে আমার হাত ধরে রেখে আবার ফিস ফিস করে বলল, রক্ষা কর ঈশ্বর তুমি। রক্ষা কর। রক্ষা কর।
মহামতি গ্রাউলের গলার স্বরে একটা ধাতব প্রতিধ্বনি শোনা যেতে থাকে। তিনি খনখনে গলায় বললেন, কিহা, আমি তোমার সাহস দেখে মুগ্ধ হয়েছি। সাহস পুরোপুরি মানবিক অনুভূতি। শুধুমাত্র মানুষ সাহস নামক ব্যাপারটি দেখাতে পারে। পশুরা পারে না। রবোর্টরাও পারে না। তার কারণ এটি পুরোপুরি যুক্তিহীন এক ধরনের নির্বুদ্ধিতা। তবে তোমার সাহসের একটি পুরস্কার আমি দেব। তোমাকে আমি আমার নিজেকে দেখতে দেব। দেখ আমি দেখতে কেমন!
সাথে সাথে সমস্ত ঘর অন্ধকার হয়ে গেল এবং আমারা যে স্বচ্ছ মেঝের উপরে দাঁড়িয়েছিলাম তার নিচে আলো জ্বলে ওঠে। সেখানে বিশাল একটি স্বচ্ছ পাত্রে এক ধরনের তরল পদার্থে থলথলে একটা জিনিস কিলবিল করতে থাকে সেখান থেকে শিরা উপশিরা বের হয়ে গিয়েছে। তাকে ঘিরে আটটি হৃদপিণ্ড ধ্বক ধ্বক করে তার মাঝে রক্ত প্রবাহিত করে যাচ্ছে সেই রক্তের স্রোত পাশে পুষ্টি এবং অক্সিজেন ট্যাংকের ভেতর দিয়ে চলে আসছে। সমস্ত দৃশ্যটি একটি ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো, দেখে লেন একবার আর্ত চিৎকার করে উঠল।
আমি মহামতি গ্রাউলের গলার স্বর শুনতে পেলাম, আমার দেহ–যদি সেটাকে দেহ বলতে চাও, যেভাবে রক্ষা করা আছে এর উপরে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটালেও কিছু হবে না। তোমরা যে আটটি হৃদপিণ্ড দেখতে পাচ্ছ এখন আমরা সেগুলি পাল্টে দেব আটটি সতেজ হৃদপিণ্ড দিয়ে। এই মুহূর্তে তার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে
না। আমি শক্ত গলায় বললাম, আপনি সেটা করবেন না মহামতি গ্রাউল। আটটি শিশুর হৃদপিণ্ডে আমরা বিস্ফোরক লাগিয়ে রেখেছি। আমি সেগুলি যে কোনো মুহূর্ত বিস্ফারিত করে দিতে পারি কিন্তু আমি করব না। আমি মানুষ, মানুষ অনেক অন্যায় করতে পারে, কিন্তু শিশু হত্যা করতে পারে না। আপনি আপনার নিরাপত্তার জন্যে কখনই সেই হৃদপিণ্ড ব্যবহার করবেন না। প্রায় অদৃশ্য সেই বিস্ফোরক রক্তস্রোতে মিশে আপনার মস্তিষ্কে যেতে পারে। কিংবা কে জানে মহামতি হিংস্র গলায় বললেন, কে জানে কী?
কে জানে সেই বিস্ফোরকে ভয়ংকর কোনো ভাইরাস রয়েছে কী না সেই ভাইরাস আপনার রক্তকে দূষিত করে দেবে কিনা–
যেভাবে নিচে আলো জ্বলে উঠেছিল ঠিক সেভাবে আলো নিভে গেল এবং আবার আমরা আমাদের সামনে মহামতি গ্রাউলকে দেখতে পেলাম। তার চেহারায় এক ধরনের বিকৃতি হয়েছে ভয়ংকর একটা দৃষ্টিতে তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাকে দেখে আমি নিজের ভেতরে এক ধরনের অশুভ অসহায় আতংক অনুভব করতে থাকি। মহামতি গ্রাউল হিংস্র গলায় বললেন, তোমরা কীভাবে আমাকে হত্যা করতে চাও?
আমরা নই। আমি। আমি আপনাকে বুদ্ধি দিয়ে হত্যা করতে চাই।
বুদ্ধি দিয়ে?
হ্যাঁ মহামতি গ্রাউল। আমি জানি আপনি মিয়ারাকে এনেছেন। আমি জানি মহাকাশযানের অন্য ছয়জন নেতাও এখানে আছে। আপনি তাদের সাথে সময় কাটাবেন, কোন একটি বুদ্ধির খেলা খেলবেন। আমি চাই–আমি এক মুহূর্তের জন্যে থামলাম।
মহামতি গ্রাউল বললেন, তুমি চাও–
আমি চাই আপনি অন্য ছয়জনের সাথে আমাকে যুক্ত করবেন। আমিও আপনার সাথে সেই ভয়ংকর খেলায় অংশ নিতে চাই। অন্যদের সাথে আমিও আপনার মস্তিষ্কের সাথে সরাসরি যুক্ত হতে চাই।
মহামাতি গ্রাউলের চেহারা হঠাৎ আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তিনি তীব্র চোখে। আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কঠিন গলায় বললেন, তুমি কেমন করে জান তারা আমার মস্তিষ্কের সাথে সরাসরি যুক্ত?
আমি জানি না মহামতি গ্রাউল, কিন্তু আমি অনুমান করছি। আমি জানি আপনার চোখ নেই, কান নেই, বাইরের জগতের সাথে সরাসরি যোগাযোগ নেই। অন্য এক বা একাধিক মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগের আপনার একটি মাত্র উপায়, এক সাথে যুক্ত করে দেয়া। সেই মস্তিষ্ক আপনার মস্তিষ্কের একটা অংশ হয়ে থাকবে। আপনি তাকে পীড়ন করবেন। আমি জানি মহামান্য গ্রাউল। আপনি একজন দানব ছাড়া আর কিছু নন।
মহামতি গ্রাউল একটা নিঃশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তোমার দুঃসাহস দেখে মুগ্ধ হয়েছি কিহা। তুমি স্বেচ্ছায় আমার মস্তিস্কের সাথে যুক্ত হতে চাও?
চাই মহামান্য গ্রাউল। আপনাকে আমি ধ্বংস করতে চাই।
তুমি আমাকে ধ্বংস করতে পারবে?
আমি জানি না পারব কি না। কিন্তু আমাকে চেষ্টা করতে হবে। মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করে। আপনি মানুষের মস্তিষ্ক দিয়ে তৈরী কিন্তু আমি জানি না আপনি মানুষ কী না।
তুমি কীভাবে আমাকে হত্যা করবে?
আমি আপনাকে এখন বলব না। যদি আপনি আমার মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত হন। তাহলে আপনি জানবেন।
আর যদি না হই?
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, তাহলে আমার কিছু করার নেই। সম্ভবত আপনি তাহলে এখন আমাদের হত্যা করবেন। আমি একটু অপেক্ষা করে বললাম, যদি সত্যিই আমাদেরকে হত্যা করেন আমি আশা করব আপনি আমাদের কয়েক মুহূর্ত সময় দেবেন। আমি আমার সাথে দাঁড়ানো মেয়েটির কাছে ক্ষমা চাইব তারপর বিদায় নেব। এবং
এবং কী?
এবং তাকে বলব যদি সত্যিই আমরা পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারতাম তাহলে আমি তার সামনে হাটু গেড়ে বসে বলতাম, লেন তুমি কি আমাকে তোমার জীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিবে?
মাহামতি গ্রাউলের মুখে এক ধরনের হাসি ফুটে উঠে তিনি এক ধরনের কোমল গলায় বললেন, লেন তুমি তাহলে কী বলবে?
লেন কোন কথা বলল না, আমাকে শক্ত করে ধরে হঠাৎ হুঁ হুঁ করে কেঁদে ফেলল। আমি তাকে বুকে আকড়ে রেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললাম, লেন, এক মুহূর্তের ভালবাসা আর এক যোজনের ভালবাসার কোন পার্থক্য নেই। ভালবাসা ভালবাসাই। তুমি আমাকে ক্ষমা কর।
মহামতি গ্রাউল এক ধরনের কৌতুকের দৃষ্টি নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন তারপর শান্ত গলায় বললেন, কিহা। আমি তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করলাম। তোমার মস্তিষ্ককে আমি আমার মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত করব। তুমি অসাধারণ বুদ্ধিমান। তোমার মরণ খেলাটি দেখার আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে।
আমি খুব সাবধানে আমার বুক থেকে একটা নিঃশ্বাস বের করে দিলাম। এই মহাকাশযান মহামতি গ্রাউলের থাবা থেকে হয়তো শেষপর্যন্ত রক্ষা করা যাবে। বুড়ো লী যেভাবে বলেছিল সেভাবে, শক্তিশালী যন্ত্রের সাথে যেভাবে দাবা খেলতে তার নিয়মে। যন্ত্র প্রস্তুতি নেয় নিখুঁত একটি খেলার যেখানে কোন ভুল হয় না, তার সাথে খেলতে হয় নির্বোধের মতো যে নির্বুদ্ধিতা আসলে সুপরিকল্পিত। আমিও তাই করছি, যে বুদ্ধির খেলায় মহামতি গ্রাউল আগ্রহ নিয়ে রাজি হয়েছে সেটি আমাকে খেলতে হবে না। কারণ আমার মস্তিষ্কে কিটুনিয়া ভাইরাসের ছোট একটা ক্যাপসুল ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। মুক্ত এলাকা থেকে আমি দুই হাজার ইউনিট দিয়ে কিনেছিলাম। ক্যাপসুলটি নির্দিষ্ট সময় পরে নিজে থেকে ফেটে বের হয়ে আসবে, কিলবিল করে ছড়িয়ে যাবে মস্তিষ্কে, নিউরন সেলকে ধ্বংস করে বাড়তে থাকবে প্লাবনের মতো, দেখতে দেখতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আমার মস্তিষ্ক! নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে মহামতি গ্রাউলের মস্তিষ্ক, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে মিয়ারার মস্তিষ্ক–অন্য সবার মস্তিষ্ক যারা যারা যুক্ত হয়েছে এই বিশাল মস্তিষ্ক স্তরে। মহামতি গ্রাউলকে ধ্বংস করার জন্যে যে পদ্ধতিটি আমি বেছে নিয়েছি সেটি আসলে বুদ্ধিহীন নির্বোধ একটা প্রক্রিয়া। বুদ্ধির খেলায় তাকে পরাজিত করার সেই দুঃসাহস কার আছে?
আমি আবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে লেনের দিকে তাকালাম। লেন আমার মস্তিষ্কের কিটুনিয়া ভাইরাসের কথা জানে না, সে তাই অবিশ্বাস্য চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।
বিশাল এই মহাকাশযানটিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নেয়ার একটি মাত্র উপায়, মহামতি গ্রাউল নামের দানবটিকে ধ্বংস করা। আমাকে তাই করতে হবে, আমার নিজের প্রাণ দিয়ে। সৃষ্টি জগতের ইতিহাসে সেরকম অসংখ্য আত্মত্যাগের কথা লেখা আছে একজন বা একাধিক মানুষ হাসিমুখে প্রাণ দিয়ে যুদ্ধে জয়ী হয়েছে, বিশাল জনপদ নগর রক্ষা করেছে দেশকে শত্রুর হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছে। এই মহাকাশযানের ইতিহাস যখন লেখা হবে সেই ইতিহাসে আমার কথা নিশ্চয়ই উল্লেখ করা হবে, কীভাবে আমি মহামতি গ্রাউল নামের একটি দানবকে ধ্বংস করে পৃথিবীর মানুষকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছি। সেটা অনেক বড় করে ব্যাখ্যা করা হবে। আমার বুকের ভেতর এখন আত্মত্যাগের এক মহান পরিতৃপ্তির অনুভূতি হওয়ার কথা।
কিন্তু আমার ভিতরে এক গভীর বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। এক ভয়ংকর শূন্যতা আমার বুকের ভিতর হুঁ হুঁ করে বইতে থাকল। আমার না দেখা পৃথিবী নয়, ফেলে আসা গ্রহটি নয়, বিস্ময়কর এই মহাকাশযানটি নয়, সৃষ্টিজগৎ এবং তার বিশাল রহস্য নয়, আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কালো চোখের একটি মেয়ের ভালবাসা আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাবে সেই গভীর বেদনায় আমার সমস্ত হৃদয় সমস্ত অনুভূতি আচ্ছন্ন হয়ে আসতে থাকে।
কিন্তু আমি আমার মুখে একটা আত্মবিশ্বাসের চিহ্ন ফুটিয়ে রাখলাম, আমি জানি মহামতি গ্রাউল তার সংবেদনশীল যন্ত্র দিয়ে আমাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করছেন।
ঘরটির ছাদ নিচু, দেখে ঘর না মনে হয়ে একটি সুড়ঙের মতো মনে হয়। আমি স্বচ্ছ একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আমার পাশে দুজন অস্ত্রোপাচারকারী রবেট নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষনের মাঝেই তারা আমার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার শুরু করবে। আমার কাছেই লেন দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখমণ্ডল রক্তহীন। আমি আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত কয়টি একটি ভয়ংকর নৈরাশ্যে ড়ুবিয়ে দিতে চাইছিলাম না, প্রাণপন চেষ্টা করছিলাম লেনের সাথে আনন্দদায়ক কিছু বলতে। কিন্তু বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না এবং অনুভব করছিলাম ধীরে ধীরে দুজনেই আরো বেদনাতুর হয়ে উঠছি।
আমি মুখে জোর করে একটা স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে রেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোটটির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী?
রবোর্টটি থমথমে গলায় বলল, আমার কোন নাম নেই। আমি মানুষ নই তাই আমার নামের প্রয়োজনও নেই।
সত্যি কথা। কিন্তু তুমি কি তোমার দায়িত্ব সত্যিকার ভাবে পালন করতে পার।
অবশ্যি পারি। আমি খুব অল্প সময় আগেই ছয়জনের মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেছি।
আমি ভাল করে রবোটটিকে আবার দেখলাম, সে নিশ্চয়ই মিয়ারা এবং অন্যান্য নেতাদের মাথায় অস্ত্রোপচার করেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারা কোথায়?
তাদের দেহটি পরিশোধনাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র মস্তিষ্কটি মহামতি গ্রাউলের মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
কোথায়?
এই ঘরেই রয়েছে। রবোটটি তার যান্ত্রিক হাত দিয়ে দেখালো, কাছাকাছি ছয়টি চতুষ্কোণ সিলিন্ডার সাজাননা।
আমি বুকের ভেতরে এক ধরনের আতংক অনুভব করলাম, কিন্তু সেটা প্রকাশ করে সহজ গলায় বললাম, আমি কী তাদের দেখতে পারি?
পার।
আমি এগিয়ে গেলাম, সিলিন্ডারের উপর স্বচ্ছ একটি ঢাকনা এবং তার নিচে অর্ধস্বচ্ছ এক ধরনের তরলে থলথলে একটি মস্তিষ্ক ভাসছে। এটি যে একজন মানুষের অবশিষ্ট সেটি বোঝার কোন উপায় ছিল না, কিন্তু দুটি চোখ তার, অপটিক নার্ভসহ অক্ষত রয়েছে এবং সেটি নিস্পলক চোখে উপরের দিকে তাকিয়েছিল। আমার ভুলও হতে পারে কিন্তু মনে হল আমাকে দেখে চোখ দুটির মাঝে এক ধরনের চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল। আমি রবোটটিকে জিজ্ঞেস করলাম, এটি কার মস্তিষ্ক?
মিয়ারার।
আমি কি তার সাথে কথা বলতে পারি?
পার। বলে রকেটটি বুকে ঝুকে পড়ে কী একটা যন্ত্র চালু করে দিল। সাথে সাথে আমি মিয়ারার গলার স্বর শুনতে পেলাম। সে একধরনের উত্তেজিত গলায় বলল, কিহা! লেন! তোমরা?
হ্যাঁ। আমরা। তোমাকে এভাবে দেখব আমি কখনো ভাবি নি। আমি–আমি দুঃখীত।
একথা কেন বলছ? আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, তুমি তুমি তুমি কি ভাল আছ?
আমি অবশ্যি ভাল আছি। আমি চমৎকার আছি। আমি এর থেকে চমৎকার কখনো থাকি নি।
আমি হতবাক হয়ে বললাম, তুমি কেমন করে চমক্কার আছ? তোমার দেহই নেই–
মিয়ারা হাসির মতো একটা শব্দ করে বলল, মানুষের দেহ একটা বাহুল্য ছাড়া কিছু নয়। আমি এখন জানি। তোমাদের যে দেহ আছে সেই অনুভূতিটি তুমি পাও তোমার মস্তিষ্ক থেকে। যদি কারো দেহ না থাকে কিন্তু মস্তিষ্ক তাকে দেহের অনুভূতি দেয় তাহলে দেহের প্রয়োজন কী?
আমি তখনো পুরো ব্যাপারটি বুঝে উঠতে পারি নি। একটু পরে আমি নিজেও এই ধরনের একটি বস্তুতে পরিণত হব, তখন কী আমার ভেতরেও এই ধরনের সুখী পরিতৃপ্ত একটা ভাবের জন্ম হবে? আমি একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি সত্যিই সুখী?
হ্যাঁ। আমি সত্যিই সুখী। সুখ আনন্দ এগুলি হচ্ছে মস্তিষ্কের এক ধরনের অনুভূতি। একজন মানুষ খুব কষ্টের মাঝে বা যন্ত্রণার মাঝে থাকতে পারে, সেই কষ্ট এবং যন্ত্রণার মাঝে থেকেও যদি তার মস্তিষ্কে সুখের অনুভূতি জাগানো যায় তাহলে সে সুখ অনুভব করবে। শুধু তাই নয় তার সেই সুখ হবে সত্যিকারের সুখ।
আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললাম, আমি তোমাকে দেখে খুব খুশি হলাম মিয়ারা। কাউকে সুখী দেখলে আমার খুব আনন্দ হয়।
তোমরা এখানে কেন এসেছ কিহা?
সেটি অনেক বড় একটি কাহিনী। তুমি নিশ্চয়ই জানবে। আমি তোমার পাশাপাশিই থাকব।
সত্যি?
সত্যি। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম এবং হঠাৎ করে পুরো ব্যাপারটিকে আমার কাছে অবাস্তব একটি দুঃস্বপ্নের মতো মনে হতে থাকে। আমি লেনের দিকে তাকালাম, তার রক্তশূন্য ফ্যাকাসে মুখে ধীরে ধীরে এক অবর্ণনীয় আতংক এসে ভর করতে শুরু করেছে।
হঠাৎ করে রববাটটি আমার কনুই স্পর্শ করে বলল, কিহা। তোমার অস্ত্রোপচারের সময় হয়েছে।
আমি চমকে উঠলাম, এখান থেকে ছুটে পালানোর একটা প্রবল ইচ্ছাকে অনেক কষ্টে আটকে রেখে আমি শান্ত গলায় বললাম, চল।
লেন পিছন থেকে এসে আমার হাত ধরে বলল, না কি এটা হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না।
আমি সাবধানে নিজেকে লেনের হাত থেকে মুক্ত করে বললাম, আমাদের আর কিছু করার নেই লেন।
লেন হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল, উপরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, গ্রাউল। গ্রাউল তুমি কোথায়? কোথায়?
আমি চমকে উঠে বললাম, কী করছ তুমি লেন?
লেনের মুখে হঠাৎ রক্তের ছটা দেখা যায়, তার চোখে জ্বল জ্বল করছে, নিঃশ্বাসের সাথে বুক উপরে উঠছে এবং নামছে মাথায় এলোমেলো চুল, তাকে অপ্রকৃতস্থের মতো দেখাতে থাকে। সে চিৎকার করে বলন, গ্রাউল। তুমি কোথায়?
এই যে আমি এখানে। মহামতি গ্রাউলের স্বর খুব কাছে কোনো জায়গা থেকে শোনা যায়।
লেন চিৎকার করে বলল, আমি তোমাকে দেখতে চাই, তোমার সাথে কথা বলতে চাই।
গ্রাউল প্রায় কোমল স্বরে বলল, তুমি এতক্ষণ এখানে কিহার সাথে ছিলে একটিবার একটি কথাও বললে না, এখন হঠাৎ করে কী বলতে চাও?
আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই?
কী প্রশ্ন?
তার আগে আমি তোমাকে দেখতে চাই। শেষবার দেখতে চাই।
বেশ।
সাথে সাথে সুড়ঙের মতো ঘরটির এক কোণায় আমরা মহামতি গ্রাউলকে দেখতে পেলাম, ঈষৎ সবুজ বর্ণে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষের মাথা। একটু আগে। দেখা গ্রাউলের সাথে তার কোন মিল নেই। এই মানুষটির চেহারা কুর এবং নিষ্ঠুর।
লেন ভয় পাওয়া গলায় বলল, তুমি গ্রাউল।
সবুজ রংয়ের মাথাটি হিংস্র গলায় বলল, হ্যাঁ।
লেন একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম অসংখ্য নক্ষত্র জ্বল জ্বল করছে। আমি জানতাম সেই নক্ষত্রের পিছনে রয়েছে আরো নক্ষত্র, আরো নীহারিকা। তার পিছনে আরো নক্ষত্র, অরো নীহারিকা, তার কোন শেষ নেই। আমার সামনে এই অসীম মহাকাশ যার শুরু নেই শেষ নেই।
লেন এক মুহূর্তের জন্যে চুপ করল, মহামতি গ্রাউল স্থির হয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, লেন সেই দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, অসীম মহাকাশের ব্যাপারটি আমার ছোট মস্তিষ্ক সহ্য করতে পারল না। আমি ব্যাপারটি চিন্তা করতে পারলাম না। আমার মাথা ঘুরে উঠল, আমি চিৎকার করে আমার মায়ের কাছে ছুটে গেলাম। আমার মা আমাকে বুকে জড়িয়ে বলল, ভয় কি মা আমার! এই তো আমি।
গ্রাউলকে হঠাৎ কেমন জানি বিভ্রান্ত দেখায়। ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, তুমি প্রশ্ন কর–
করছি। প্রশ্ন করছি। লেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গ্রাউলের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার ছোট মস্তিষ্কটি যখন বিশাল একটি ব্যাপার সহ্য করতে পারছিল না আমি সেখান থেকে বের হয়ে এসেছিলাম আমার মায়ের বুকের মাঝে আশ্রয় নিয়ে। আমি তার কথা শুনেছি, তার মুখের কোমল চেহারা দেখেছি, তার দেহের ঘ্রাণ, তার স্পর্শ অনুভব করেছি। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়–আমার মস্তিষ্ককে সেই ভয়ংকর চিন্তা থেকে মুক্ত করে নিয়ে গেছে–
গ্রাউল হঠাৎ ভয়ংকর চিৎকার করে বলল, তুমি কী বলতে চাও?
লেনের চোখ হঠাৎ শ্বাপদের মতো জ্বলতে থাকে। সে হিংস্র স্বরে বলল, তোমার চোখ নেই কান নেই। তোমার ঘ্রাণ নেয়ার নাক নেই, স্পর্শের অনুভূতি নেই। তোমার রয়েছে শুধু এক ভয়ংকর মস্তিষ্ক। মানুষের মস্তিষ্ক থেকে সেই মস্তিষ্কের ক্ষমতা সহস্রগুণ বেশি দুর্বলতাগুলিও সহস্র গুণ বেশি। নিশ্চয়ই বেশি। সেই মস্তিষ্কে যদি হঠাৎ লাগামছাড়া ভয়ংকর একটা ভাবনা এসে হাজির হয় তুমি কী করবে? কী করবে? কোন ইন্দ্রিয় তোমাকে রক্ষা করবে? কোন ইন্দ্রিয়?
গ্রাউলের চেহারা হঠাৎ ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তার সবুজ মুখাবয়ব বিকৃত হয়ে যায়, মুখ গহ্বর থেকে ধারালো দাত, লকলকে জিব বের হয়ে আসে। জড়ানো গলার স্বরে সে চিৎকার করে বলল, আসবে না–কোন ভয়ংকর ভাবনা আসবে না, আসবে না–
আসবে। নিশ্চয়ই আসবে। তাই তুমি মহাকাশযানের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষকে তোমার পাশে এনে হাজির করেছ। যদি কখনো সেই ভয়ংকর ভাবনা এসে হাজির হয় তুমি তোমার আশে পাশে আটকে রাখা মস্তিষ্কের সাহায্যে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। তারা হবে তোমার মায়ের চেহারা? ঘ্রাণ? তার গলার স্বরে? তার স্পর্শ!
লেন হঠাৎ হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মত হাসতে শুরু করে। তার অপ্রকৃতস্থ হাসি সুড়ঙের মতো সেই ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। মহামতি গ্রাউলের চেহারা আরো ভয়ংকর হয়ে উঠে তার মুখাবয়ব বিস্তৃত হতে হতে ঘরের ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেই ভয়ংকর চেহারা থেকে এক অবিশ্বাস্য আক্রোশ ফুটে বের হতে শুরু করে। লেন সেই ভয়ংকর চেহারার দিকে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বলল, তুমি। ভেবেছ আমি তোমাকে ভয় পাব? তোমার দানবের চেহারা দেখে আমি আতংকে শিউরে উঠব? না। আমি তোমাকে ভয় পাই না। এতটুকু ভয় পাই না। কারণ আমি জানি তুমি তোমার নিজের ভেতরের সেই ভয়ংকর ভাবনার ভয়ে থরথর করে কাপতে থাক। তুমি ভীতু কাপুরুষ–তুমি অসহায় দুর্বল–তুমি তুচ্ছ! ইচ্ছে করলে আমি তোমাকে ধ্বংস করে দিতে পারি। ধ্বংস করে দিতে পারি
না! গ্রাউল হঠাৎ আর্তনাদ করে বলল, না!
হ্যাঁ। লেন হিংস্র গলায় বলল, হ্যাঁ। হ্যাঁ। হ্যাঁ। আমি তোমাকে এখন সেই প্রশ্নটি করব। যে প্রশ্নটির ভয়ে তুমি থর থর করে কাপছ। যে প্রশ্নটি করলে তুমি আমার চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাবে আমি তোমাকে সেই প্রশ্নটি করব। লেন এক মূহুর্ত থেমে বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে তীব্র স্বরে বলল, তুমি আমাকে বল, তোমার সেই ভয়ংকর ভাবনাটি কী? বল।
গ্রাউলের মুখাবয়ব হঠাৎ এক অবর্ণনীয় আতংকে বিকৃত হয়ে যায়। চোখের মণি ঘোলাটে হয়ে আসে, মুখের মাংশপেশী থরথর করে কাঁপতে থাকে, তার লকলকে জিভ মুখ থেকে বের হয়ে আসে, মুখের কষ থেকে লোল গড়িয়ে পড়ে। সেই বিকৃত কাতর চেহারায় ভাঙা গলায় বলল, না–না–না–আমি সেটা ভাবতে চাই না–ভাবতে চাই না
তোমাকে ভাবতে হবে! লেন চিৎকার করে বলল, ভাবতে হবে। ভাবতে হবে। ভেবে ভেবে আমাকে বলতে হবে। বলতে হবে।
না। হ্যাঁ। হ্যাঁ। হ্যাঁ। আমাকে বল। লেন হিংস্র গলায় চিৎকার করে বলল, বল।
গ্রাউল হঠাৎ পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। অবর্ণনীয় আতংকে থর থর করে কাপতে কাঁপতে বলল, একটা শিশু হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। সামনে একটা রাস্তা। সেই রাস্তা দূর দিগন্তে গিয়ে এক বিন্দুতে মিলে গেছে। শিশুর হাতে একটা ফুলের ঝাপি। সেই ঝাঁপিতে সে রাস্তার পাশে থেকে বুনোফুল তুলছে। সেই ফুল নিয়ে সে ছুটে গিয়েছে সামনে আর দিগন্ত তখন আরো দূরে সরে গিয়েছে। শিশুটি আবার ফুল তুলেছে ঝাপিতে। আবার ছুটে গিয়েছে সামনে দিগন্ত আরো দূরে সরে গিয়েছে। গ্রাউল হঠাৎ ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, শিশুটির বুনোফুলের ঝাপি থেকে হঠাৎ সব ফুল ঝড়ে গেছে নিচে, শিশুটি ফুল তুলতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। আবার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। আবার চেষ্টা করছে। তারপর আবার ছুটে গেছে সামনে। তখন সেই দিগন্ত আবার সরে গেছে দূরে। শিশুটি ছুটে যেতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। আবার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। পারছে না। হঠাৎ ফুলের ঝাপি থেকে সব ফুল ঝড়ে গেল নিচে। শিশুটি সেই ফুল কুড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। চেষ্টা করছে–চেষ্টা করছে–চেষ্টা করছে! পারছে কিন্তু পারছে না। ছুটে যাচ্ছে কিন্তু যেতে পারছে না। পারছে না–পারছে না
গ্রাউলের কথা জড়িয়ে যায়, গোঙানোর মতো শব্দ করতে থাকে সে। চোখের মণি চোখ থেকে ঠিকরে বের হয়ে আসতে থাকে, ঘোলাটে কালচে বেগুনি রংয়ের মতো চেহারা হয়ে আসে তার নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে না। থর থর করে কাপছে। থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে সে অস্পষ্ট হয়ে আসতে থাকে। অস্পষ্ট হয়ে আসতে থাকে।
আমি লেনের দিকে তাকালাম, সে নেশাগ্রস্থ মানুষের মতো টলছে, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। তাল সামলে কোনভাবে দুই পা এগিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু পারল না, জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিল সে। আমি ছুটে গিয়ে তাকে জাপটে ধরলাম। সাথে সাথে সমস্ত মহাকাশযান নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল।
আমি লেনকে বুকে চেপে ধরে রেখে ফিস ফিস করে ডাকলাম, লেন, জেগে উঠো। দেখ তুমি গ্রাউলকে ধ্বংস করে দিয়েছ! দেখ! দেখ!
লেন জেগে উঠল না। আমার বুকে অচেতন হয়ে পড়ে রইল।
মহাকাশযানের বড় করিডোর ধরে মাঝারি ধরনের একটা ভাসমান যানে করে আমরা নিচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলাম। কয়দিনের মাঝে আমরাও শীতল ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে যাব, তার আগে শেষবার মহাকাশযানটা ঘুরে দেখছি। কিছুদিন আগেও অসংখ্য মানুষে পুরো এলাকাটা জনাকীর্ণ ছিল, এখন কেউ নেই। গ্রাউলের হাত থেকে কর্তৃত্ব সরিয়ে নিয়ে সাথে সাথে মহাকাশযানকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যে লোভকে পুঁজি করে মানুষকে অমানুষে রূপান্তরিত করা হয়েছিল সেউ লোভের সামগ্রীকে হঠাৎ করে সবার কাছে সহজলভ্য করে দেয়া হয়েছে। তখন রাতারাতি মহাকাশযানের বিচিত্র জটিল সেই নৃশংস অমানবিক জীবনটি পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে গেছে। মহাকাশচারীদের আবার শীতল ঘরে ফিরে যেতে বলা হয়েছে, কেউ প্রতিবাদ না করে স্বেচ্ছায় ফিরে গেছে। মহাকাশযানটিতে আবার সেই ভুতুড়ে নৈঃশব্দ নেমে এসছে। পৃথিবীর কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আবার সবাইকে জাগিয়ে তোলা হবে, প্রাণচাঞ্চল্যে আবার ভরপুর হয়ে উঠবে এই বিশাল মহাকাশযান।
পৃথিবী আর পৃথিবীর মানুষ নিয়ে গ্রাউল সবার কাছে মিথ্যে তথ্য দিয়ে। আসছিল। পৃথিবীর মানুষ নিজেদের মাঝে হানাহানি করছে সেটি সত্যি নয়। হানাহানি করার জন্যে পৃথিবীতে এখন কোনো মানুষ নেই। মানুষের স্বেচ্ছাচারিতায় সমস্ত পৃথিবী বাসের অযোগ্য হয়ে গিয়েছিল, প্রায় দুই হাজার বছর আগে শেষ মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে গ্রহান্তরে পাড়ি দিয়েছে। এই দুই হাজার বছর প্রকৃতি নিজের হাতে পৃথিবীকে আবার মানুষের বাসের যোগ্য করে গড়ে তুলেছে। আবার সেখানে নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর সবুজ বনারণ্য গড়ে উঠেছে। আমরা সেখানে গিয়ে আবার নূতন করে মানব জীবন শুরু করব।
পৃথিবীর কথা ভাবতে ভাবতে আমি অন্যমনস্ক ভাবে বাইরে তাকিয়েছিলাম, লেন এসে আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি তার দিকে ঘুরে তাকালাম, তার ঝকঝকে খাপ খোলা চেহারা দেখে আবার আমার বুকের ভেতর এক ধরণের বেদনা বোধ হতে থাকে। লেন নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, কী দেখছ?
না। কিছু না।
আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমরা বেঁচে আছি।
আমি হেসে বললাম, আসলে আমরা বেঁচে নেই। এই পুরো ব্যাপারটা আসলে মহামতি গ্রাউলের অত্যাশ্বর্য মস্তিষ্কের একটা স্বপ্ন দৃশ্য। এক্ষুনি তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে তখন–
লেন আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, দোহাই তোমার। গ্রাউলের কথা বল না।
সে কেমন আছে শুনবে না?
না, শুনতে চাই না।
বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে। পুরোপুরি উন্মাদ—
লেন কাতর গলায় বলল,আমি শুনতে চাই না।
আমি লেনকে নিজের কাছে টেনে এনে বললাম, কেন শুনতে চাও না? কী আশ্চর্য শক্তিতে তুমি তাকে পরাস্ত করে পুরো মহাকাশযান আর তার হাজার হাজার মহাকাশচারীকে রক্ষা করেছ সেটা শুনবে না?
না। আমি শুনব না। আমি সব কিছু ভুলে যেতে চাই।
ঠিক তখন পিছনে কিছু একটা ভেঙে পড়ার শব্দ হল এবং সাথে সাথে একাধিক শিশুর উল্লাস ধ্বনি শোনা গেল। লেনের মুখে অধৈর্যের একটা ছায়া পড়ে, সে কাতর গলায় বলল, ঐ দেখ আবার শুরু করল ওরা! কী করি ওদের নিয়ে বল তো?
আমি হেসে বললাম, মানুষের এক সাথে একটি করে সন্তান থাকার কথা। সেই একটি সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে বাবা মায়ের কালো ঘাম ছুটে যায়। তোমার সন্তান হচ্ছে আটটি। এই সমস্যার কোন সমাধান নেই লেন। এর আগে কথা জানত না তখন তবু সামলে দেয়া যেত। এখন ওরা কথা শিখেছে ওদেরকে আর কোনভাবে সামলে নেয়া যাবে না। তুমি কিছুদিনে পাগল হয়ে যাবে লেন!
আমি একা কেন? তুমিও পাগল হয়ে যাবে।
হ্যাঁ। আমিও মনে হয় পাগল হয়ে যাব–
আমার কথা শেষ হবার আগেই শিশুগুলি হুঁটোপুটি করতে করতে আমাদের কাছে হাজির হল। তারা কয়েকজন মিলে একজনকে নিচে ফেলে দেবার চেষ্টা করছে, যারা ফেলছে এবং যাকে ফেলছে সবারই একধরনের বিচিত্র উল্লাস হচ্ছে বলে মনে হয়। লেন বৃথাই তাদের শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলল, কী হচ্ছে? কী হচ্ছে ওখানে?
খেলছি।
কী খেলছ?
খেলছি আমরা পৃ’তে গিয়েছি।
পৃ?
হ্যাঁ। পৃ মানে পৃথিবী!
আমি সাবধানে একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। এই শিশুরা আমাদের জন্যে নতুন পৃথিবী গড়ে তুলবে। ভালবাসাময় আনন্দের একটা পৃথিবী।
নতুন পৃ।
———-
ৃ
