প্রথম পর্ব
#বেজি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
নিয়াজ ট্রলারের ছাদে বসে দেখল সমুদ্রের গাঢ় সবুজ উপকূলটি প্রথমে হালকা নীল হয়ে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। যতক্ষণ উপকূলটা দেখা যাচ্ছিল ততক্ষণ মনে হচ্ছিল বুঝি বা তীরের সাথে একটা যোগাযোগ আছে, সেটি যখন অদৃশ্য হয়ে গেল তখন হঠাৎ নিয়াজ অসহায় অনুভব করে, চারিদিকে শুধু পানি আর পানি, তার মাঝে ছোট একটা ট্রলার টুকটুক করে এগিয়ে যাচ্ছে এই ব্যাপারটিকেই তার কেমন জানি অবাস্তব মনে হয়। চিন্তা করলেই নিয়াজের পেটের ভেতরে পাক দিয়ে ওঠে। সে সাঁতার জানে না, পানি নিয়ে সব সময়েই তার ভেতরে একটা ভয়। তার চাপাচাপিতেই ট্রলারে সবার জন্যে লাইফ-জ্যাকেট রাখা হয়েছে কিন্তু হঠাৎ যদি কোনো কারণে ট্রলার ডুবে যায় তাহলে এই লাইফ-জ্যাকেট দিয়ে তারা কী করবে?
নিয়াজের পাশেই শ্রাবণী দুই হাঁটুতে মুখ রেখে দূরে তাকিয়ে ছিল। তার চোখেমুখে কেমন যেন একধরনের উঁদাসী ভাব। নিয়াজ নিচুগলায় জিজ্ঞেস করল, “তোর ভয় লাগছে না তো?”
শ্রাবণীর চোখমুখের উদাস ভাবটা কেটে গিয়ে সেখানে একটা তেজি ভাব ফুটে উঠল। গলা উঁচিয়ে বলল, “তোদের ধারণা মেয়ে হলেই তার সব সময় ভয় লাগতে থাকবে?”
নিয়াজ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না, না, তা না। আমার নিজের ভয় লাগছে তো তাই তোকে জিজ্ঞেস করছি। পানি দেখলেই আমার ভয় লাগে।”
শ্রাবণী শব্দ করে হেসে বলল, “কী বলছিস তুই? পানি দেখলে ভয় লাগে? পানির মতো এত সুন্দর জিনিস দেখে কেউ ভয় পায়? দেখ, তাকিয়ে দেখ।”
নিয়াজ তাকিয়ে দেখল, পানির রংটি আশ্চর্যরকম নীল, চারিদিকে যতদূর চোখ যায় সেই নীল পানি এবং এই নীল রংটির মাঝে একটা অপূর্ব সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। সে মাথা নেড়ে বলল, “তা ঠিক। সমুদ্রের পানির মাঝে কিছু একটা আছে। একটা অন্যরকম ব্যাপার। তীর থেকে একরকম আবার ওপর থেকে অন্যরকম।”
“আর তুই এই সুন্দর পানিকে ভয় পাচ্ছিস?”
জয়ন্ত পা ছড়িয়ে বসে অনেকক্ষণ থেকে একটা সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করছিল, বাতাসের জন্যে সুবিধে করতে পারছিল না, শেষপর্যন্ত সফল হয়ে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, “মানুষের শরীরের সিক্সটি পার্সেন্ট হচ্ছে পানি, হিসেব করলে পা থেকে এই বুক পর্যন্ত আসে। সেই পানিকে তুই পছন্দ করিস না?”
শ্রাবণী আবার শব্দ করে হেসে বলল, “ওভাবে বলিস না তো! সিক্সটি পার্সেন্ট পানি বললেই মনে হয় শরীরের নীচের অংশটা পানিতে থলথল করছে!”
জয়ন্ত নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে হা হা করে হেসে বলল, “আর সুঁই দিয়ে ছোট একটা ফুটো করলেই সব পানি লিক করে বের হয়ে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যাচ্ছে!”
নিয়াজ মুখ কুঁচকে জয়ন্তর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই এর মাঝে একটা সিগরেট ধরিয়ে ফেললি, এই সুন্দর পরিবেশটাকে পলিউট করে দিলি? বাতাসটাকে বিষাক্ত করে দিলি?”
জয়ন্ত সিগারেটে আরেকটা লম্বা টান দিয়ে বলল, “দ্যাখ নিয়াজ তোকে আমি লোকাল গার্জিয়ান বানাইনি যে বসে বসে আমার ওপর মাতবরি করবি। আর বাতাসের পলিউশানের কথা যদি বলিস তাহলে ঐ তাকিয়ে দেখ তোর এই ট্রলারের শ্যালো ইঞ্জিন থেকে কী পরিমাণ কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে।”
“তাই বলে এই একবিংশ শতাব্দির মানুষ হয়ে তুই সিগারেট খাবি? আমি বুঝতেই পারি না মেডিক্যালের একজন স্টুডেন্ট হয়ে সে কেমন করে সিগারেট খেতে পারে।”
“এটাকে বলে নেশা। সিগারেটে নিকোটিন বলে একটা বস্তু থাকে। সেটা রক্তের মাঝে মিশে গিয়ে স্নায়ুতে এক ধরনের আরাম দেয়। মেডিক্যালের একজন স্টুডেন্ট কেমন করে এই সহজ জিনিসটা জানে না আমি সেটাও বুঝতে পারি না।”
শ্রাবণী একটা ছোট ধমক দিয়ে বলল, “তোরা থামবি? দুই সতিনের মতো ঝগড়া শুরু করে দিলি দেখি!”
সিগারেট খাওয়া এবং না খাওয়ার তর্ক এত সহজে থামার কথা ছিল না কিন্তু ঠিক তখন তারা দেখতে পেল ট্রলারের পাশ দিয়ে বিশাল একটি সামুদ্রিক কচ্ছপ ভেসে যাচ্ছে। তিনজনই খানিকটা উত্তেজিত হয়ে এই বিশাল কচ্ছপটার দিকে তাকিয়ে রইল। শ্রাবণী বলল, “ইশ, সাথে ক্যামেরাটা থাকলে একটা ছবি নেয়া যেত!”
নিয়াজ বলল, “নিয়ে এলি না কেন?”
“ভাবলাম, যাচ্ছি রিলিফ ওয়ার্ক করতে, পিকনিক করতে তো আর যাচ্ছি না। পিকনিকে গেলেই না ক্যামেরা ক্যাসেট প্লেয়ার এসব নিয়ে যায়!”
নিয়াজ বলল, “এটা তো আর লোক দেখানো ব্যাপার না যে সাথে ক্যামেরা নিতে পারব না! আসল কথা হচ্ছে সিনসিয়ারিটি। আন্তরিকতা।”
জয়ন্ত সমুদ্রটাকে তার সিগারেটের এ্যাশট্রে হিসেবে ব্যবহার করে একটু ছাই ফেলে বলল, “রিলিফ ওয়ার্কে গিয়ে যখন দেখবি মানুষ দুদিন ধরে না খেয়ে আছে, গায়ে কাপড় নেই তখন এমনিতেই ক্যামেরা আর ক্যাসেট প্লেয়ারের কথা ভুলে যাবি।”
ট্রলারের ছাদে তিনজন চুপ করে বসে রইল। গত সপ্তাহে এরকম সময়েই ভয়ঙ্কর একটা সাইক্লোন এই এলাকায় সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। টেলিভিশনে সেই ছবি দেখে কারো বিশ্বাস হতে চায় না বাতাসের মতো নিরীহ একটি জিনিস এরকম প্রলয়ঙ্কর ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
জয়ন্ত অন্যমনস্কভাবে তার সিগারেটে দুটো টান দিয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাই দা ওয়ে, তোদের দুজনকে থ্যাংকস। ছুটির মাঝে ফুর্তিফার্তা না করে আমার কথায় রিলিফ নিয়ে চলে এলি। একা একা এসব কাজে খুব বোরিং লাগে। আর বদমাইশ সাইক্লোনটা দেখ, হিট করার জন্যে কী একটা সময় বেছে নিল।”
শ্রবণী বলল, “তুই কী ভেবেছিলি সাইক্লোন পঞ্জিকা দেখে দিনক্ষণ ঠিক করে আসবে?”
“না তা অবশ্যি ভাবিনি।” জয়ন্ত শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে বলল, “আর শ্রাবণী তোকে স্পেশাল থ্যাংকস। পুরুষমানুষকে রাজি করাতে পারি না, আর তুই মেয়ে হয়ে রিলিফ নিয়ে চলে এলি!”
“তোদের নিয়ে তো মহামুশকিল হল!” শ্রাবণী অধৈর্য হয়ে বলল, “মেয়ে আর ছেলে এই জিনিসটা মনে হয় এক সেকেণ্ডের জন্যেও তোরা ভুলতে পারিস না।”
“কে বলে ভুলতে পারি না?” জয়ন্ত ষড়যন্ত্রীর মতো মুখ করে বলল, “আমরা তো ভুলতেই চাই। তোরাই তো ভুলতে দিস না।”
“কখন আমরা তোকে ভুলতে দেই না?”
“ঐ যে লজ্জাবনত কটাক্ষ, ব্রীড়াময়ী ভঙ্গি, লাস্যময়ী হাসি!”
“কী বললি? কী বললি তুই? আমি ব্রীড়াময়ী ভঙ্গি আর লাস্যময়ী হাসি দিই? ধাক্কা দিয়ে যখন পানিতে ফেলে দেব তখন লাস্যময়ী হাসি আর ব্রীড়াময়ী ভঙ্গির মজাটা টের পাবি। কচ্ছপ কপ করে কাঁচা খেয়ে ফেলবে।”
“ফর ইওর ইনফরমেশান ইওর হাইনেস শ্রাবণী- কচ্ছপ কখনো কাউকে কপ করে খেয়ে ফেলে না।”
“তোকে বলেছে!”
নিয়াজ শ্রাবণী আর জয়ন্তর হালকা কথাবার্তায় মন দিতে পারছিল না। যতক্ষণ পর্যন্ত গন্তব্যে না-পৌঁছাচ্ছে সে ঠিক স্বস্তি পাচ্ছে না। সমুদ্রের ভয়ঙ্কর ঢেউয়ে ছোট ট্রলার উথালপাথাল হয়ে দুলবে এরকম একটা ভয় ছিল কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি, সমুদ্রটি একটা বড় দিঘির মতো শান্ত, কিন্তু তবুও সে বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে হচ্ছে হঠাৎ করে কিছু-একটা ঘটে যাবে।
সামনে দূরে কোন-একটা দ্বীপ খুজঁতে খুজঁতে সে শুকনো গলায় বলল, “আর কতক্ষণ যেতে হবেরে?”
জয়ন্ত চোখ কপালে তুলে বলল, “কতক্ষণ যেতে হবে মানে? মাত্র তো শুরু করলাম। এখনো কমপক্ষে চার ঘণ্টা।”
“চার ঘণ্টা!”
“হ্যাঁ। কেন? তোর ভয় লাগছে?”
নিয়াজ দুর্বলভাবে হাসল, বলল, “না ঠিক ভয় না। নার্ভাস।”
“ধূর! নার্ভাস লাগার কি আছে? নিচে গিয়ে শুয়ে থাক।”
“শোওয়ার জায়গা কই? টয়লেট পেপার দিয়ে ট্রলার বোঝাই করে রেখেছিস।”
“টয়লেট পেপার?” জয়ন্ত হা হা করে হেসে বলল, “টয়লেট পেপার তুই কোথায় দেখলি? ওগুলো হচ্ছে মেডিক্যাল সাপ্লাই।”
“আমাদের দেশের মানুষের ওরকম মেডিক্যাল সাপ্লাই কোনো কাজে লাগে না। তাদের দেশে যেগুলো কোন কাজে আসে না সেগুলো এখানে রিলিফ নাম দিয়ে পাঠিয়ে দেয়।”
“সেটা ঠিকই বলেছিস।” জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলল, “একবার বন্যার পর রিলিফ নিয়ে গেছি, ব্রিটিশ একটা অর্গানাইজেশন রিলিফ পাঠিয়েছে, বাক্স খুলে দেখি ভিতরে সান ট্যানিং লোশান! মানুষকে বোঝাতেও পারি না জিনিসটা কী কাজে লাগে।”
জয়ন্তের কথা শুনে শ্রাবণী আর নিয়াজ দুজনই খানিকক্ষণ হাসল এবং তারপর খানিকক্ষণ পশ্চিমা দেশের মুণ্ডুপাত করল। জয়ন্ত তার সিগারেটের শেষ অংশটুকুতে একটা লম্বা টান দিয়ে তার গোড়াটা সমুদ্রে ফেলে দিয়ে ট্রলারের ছাদে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। শ্রাবণী হাঁটুতে মুখ রেখে উদাস হয়ে বসে থাকে এবং নিয়াজ কিছু একটা করে সময় কাটানোর জন্যে নীচে নেমে এল। তার ব্যাগে কিছু বই এবং কাগজপত্র আছে। সেগুলো দেখে সময় কাটাতে চায়।
মানবসভ্যতার বিকাশের উপর গভীর জ্ঞানের একটা বই পড়ার চেষ্টা করে নিয়াজ বেশি সুবিধা করতে পারল না, তখন সে একটা রগরগে ডিটেকটিভ বই নিয়ে বসল। ওষুধের একটা বড় বাক্সের উপর পা তুলে দিয়ে ট্রলারের বেঞ্চে আধাশোয়া হয়ে সে দীর্ঘ সময় নিয়ে বইটা পড়ে প্রায় শেষ করে বাইরে তাকায়। চারিদিকে এখনো সেই পানি। সবকিছুর যেরকম একটা সীমা থাকে, পানির বেলাতেও সেটা মনে হয় সত্যি, এত সুন্দর নীল দেখেও সে কেমন জানি হাঁপিয়ে উঠছে। নিয়াজ বইটা বগলে নিয়ে আবার ট্রলারের ছাদে উঠে এল। সেখানে জয়ন্ত লম্বা হয়ে শুয়ে সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছে, হঠাৎ করে গড়িয়ে পানিতে পড়ে না যায় ভেবে নিয়াজ রীতিমতো আঁতকে উঠে। শ্রাবণী সেই একইভাবে পা দুলিয়ে উদাস-মুখ করে বসে আছে, নিয়াজকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “খিদে পেয়েছে?”
নিয়াজের খাওয়ার কথা মনেই ছিল না, কিন্তু শ্রাবণীর কথা শুনেই চট করে খিদে পেয়ে গেল, মাথা নেড়ে বলল, “কিছু তো পেয়েছেই।”
“নিচে দ্যাখ আমার ব্যাগটা আছে। নিয়ে আয়। কয়টা স্যাণ্ডউইচ বানিয়ে এনেছি।”
নিয়াজ শ্রাবণীর ব্যাগটা নিয়ে এল। ভেতরে প্লাস্টিকের বাক্সে স্যাণ্ডউইচ, কয়টা লাড্ডু, কলা এবং কয়েকটা কোল্ড ড্রিংকস। দেখে নিয়াজের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল, “বাহ! এই দ্যাখ, তুই যে সবসময় বলিস ছেলে আর মেয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য নাই সেটা সত্যি
নয়। তুই কি মনে করিস কখনে আমি কিংবা জয়ন্ত এখাবে গুছিয়ে খাবার আনতে পারতাম ?”
জয়ন্ত নিজের নাম শুনে চোখ খুলে বলল, “কী হয়েছে?”
শ্রবণী হেসে বলল, “দেখলি খাবারের গন্ধে কীরকম জেগে উঠেছে?”
“খাবার?” জয়ন্ত এবারে সত্যি সত্যি উঠে বসল, “খাবারের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম! কে এনেছে খাবার?”
“শ্রাবণী!”
জয়ন্ত হাতে কিল মেরে বলল, “ফ্যান্টাস্টিক ! যা ক্ষিদে পেয়েছে কী বলব। বঙ্গোপসাগরের এই রুচিকর হাওয়ায় মনে হচ্ছে একটা আস্ত ঘোড়া খেয়ে ফেলতে পারব।’’
শ্রাবণী স্যান্ডউইচ বের করতে করতে বলল, “সরি জয়ন্ত, তোর জন্যে আমি ঘোড়া রান্না করে আনিনি। স্যান্ডউইচ খেতে হবে।”
“বিপদে পড়লে বাঘে ঘাস খায়, আর এটা তো স্যান্ডউইচ।”
শ্রাবণী কিছু খাবার আলাদা করে নিয়াজের হাতে দিয়ে বলল, “এটা মাঝিকে দিয়ে আয়।”
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলল, “জব্বার মিয়া তোর এই আধুনিক খাবার খেতে পারবে না। শুঁটকি দিয়ে ভাত যদি থাকে দে।”
“বাজে বকিস না।”
নিয়াজ হাতে করে স্যান্ডউইচ আর কলা নিয়ে ট্রলারের ছাদে হামাগুড়ি দিয়ে পিছনে এগিয়ে গিয়ে ডাকল, “জব্বার মিয়া।”
জব্বার মিয়া মধ্যবয়সী মানুষ। দেখে মনে হয় জগতের কোনোকিছুতেই সে কখনো বিস্মিত হয় না। চোখেমুখে এক ধরনের শান্ত এবং পরিতৃপ্ত ভাব। নিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল, “জে।” শ্যালো ইঞ্জিনের প্রবল শব্দের জন্যে তাকে প্রায়ই চিৎকার করে কথা বলতে হয়।
“নেন। স্যাণ্ডউইচ খান।”
জব্বার মিয়া মুখে মনোরম একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, “আপনারা খান।”
“আমরা তো খাচ্ছি। আপনিও খান।”
“জায়গামত পৌঁছে খাব। এখন থাক।”
নিয়াজ ঠিক বুঝতে পারল না যে মানুষটা খেতে চাইছে না তাকে পীড়াপীড়ি করা উচিত হবে কি না। সে ফিরে আসার জন্যে মাথা ঘুরিয়েই দেখতে পায় বহুদূরে হালকা ছায়ার মতো একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছে। সে জব্বার মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা কি ঐখানে যাচ্ছি?”
“জে না।“
“তাহলে কোথায় যাচ্ছি?”
“আরো দূরে।”
“আর কতক্ষণ?”
জব্বার মিয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে সময় কেমন জানি অনিশ্চিতের মতো বলল, “এই তো আর কিছুক্ষণ।” কথাটার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ নেই, তাছাড়া সময়ের অনুমান করার জন্যে যার সূর্যের দিকে তাকাতে হয় তার কাছে সময় সম্পর্কে সুক্ষ্ম কোনো সদুত্তর পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
নিয়াজ হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে এসে বলল, “জব্বার মিয়া তোর সাহেবি খাবার খাবে না।”
শ্রাবণী বিরক্ত হয়ে বলল, “বাজে কথা বলিস না। না-খেলে না-খাবে তুই দিয়ে আয়।”
নিয়াজ ইতস্তত করে বলল, “ইয়ে খেতে চাইছে না তাকে জোর করে—”
শ্রাবণী নিয়াজের হাত থেকে খাবারগুলো নিয়ে বলল, “পুরুষমানুষের জিনেটিক কোডিংয়ে কিছু গোলমাল আছে, কমনসেন্স কম। একজনকে খাবার দিলে সে না খায় কেমন করে?”
শ্রাবণী ট্রলারের উপর দিয়ে হেঁটে পিছনে গিয়ে জব্বার মিয়ার হাতে খাবার ধরিয়ে দিয়ে ফিরে এল, জব্বার মিয়াকে আপত্তি করার কোনো সুযোগ পর্যন্ত দিল না। নিয়াজ একধরনের বিস্ময় নিয়ে শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে থাকে, মেয়েটির মাঝে একধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা আছে যেটা সে হাজার চেষ্টা করেও আয়ত্ত করতে পারবে না।
শ্রাবণী দূরে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “দ্যাখ কি সুন্দর একটা দ্বীপ!”
“দেখেছি।”
“কী নাম এটার?” শ্রাবণী জব্বার মিয়াকে জিজ্ঞেস করল, “জব্বার ভাই এইটা কোন দ্বীপ?”
“হকুনদিয়া।”
“হকুনদিয়া? কী পিকুলিয়ার নাম।”
“জে। আগে এটার নাম ছিল দিঘলদিয়া। এখন হকুনদিয়া। উপরে হকুন উড়ে তাই নাম হকুনদিয়া!’’
শ্রাবণী একটা গল্পের খোঁজ পেয়ে জব্বার মিয়ার দিকে এগিয়ে গেল, “শকুন উড়ে?”
“জে। হকুন উড়ে।”
“কেন?”
“কোনো মানুষ যেতে পারে না। যেই যায় সেই মরে। মরার খোঁজে হকুন উড়ে।”
শ্রাবণী চোখ বড় বড় করে জব্বার মিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, “যেই যায় সেই মরে?”
“জে। পাঁচ-ছয় বছর আগে পাগলা ডাক্তার খুন হওয়ার পর আর কেউ যেতে পারে না।”
“পাগলা ডাক্তার?”
“জে।”
“এখানে একজন পাগলা ডাক্তার থাকতেন?”
জব্বার মিয়া দাঁত বের করে হেসে বলল, “আসলে পাগল ছিলেন না। এলাকার লোক মায়া করে ডাকত পাগলা ডাক্তার। বিজ্ঞান মতে গবেষণা করতেন। অনেক আলেমদার মানুষ ছিলেন।”
“খুন হলেন কেমন করে?”
জব্বার মিয়া এই পর্যায়ে একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে দার্শনিকের মতো বলল, “এইটা দুনিয়ার নিয়ম। যতো ভালো মানুষ সব খুন হয়ে যায়। বদ মানুষেরা বেঁচে থাকে।”
এতক্ষণে দ্বীপটি আরো কাছে চলে এসেছে, সবুজ গাছে ঢাকা। বড় বড় নারকেল গাছ উপকূলটিকে ঢেকে রেখেছে। এত সুন্দর একটা দ্বীপ সম্পর্কে কীরকম অশুভ একটি প্রচার। পাগলা ডাক্তার ভদ্রলোকটির জন্যে শ্রাবণী একধরনের সমবেদনা অনুভব করে। মানুষটি নিশ্চয়ই অন্যরকম ছিলেন, তা না হলে সবকিছু ছেড়েছুড়ে এরকম নির্জন দ্বীপে কেউ জীবন কাটাতে আসে?
শ্রাবণী নিয়াজ আর জয়ন্তর কাছে ফিরে এসে বলল, “এই দ্বীপটা দেখেছিস, কী সুন্দর!”
নিয়াজ গোগ্রাসে স্যান্ডউইচ খেতে খেতে বলল, “হু।”
“এখানে কোনো মানুষ থাকতে পারে না, গেলেই মারা পড়ে।”
“সত্যি?”
“জব্বার ভাই তো তাই বলল।”
“আর তুই বিশ্বাস করে বসে আছিস?”
“কেন বিশ্বাস করব না? দ্বীপের নাম পর্যন্ত পাল্টে ফেলেছে, আগে ছিল দিঘলদিয়া, এখন হয়ে গেছে হকুনদিয়া। হকুন মানে বুঝলি তো? শকুন।”
জয়ন্ত এক কামড়ে কলার একটা বড় অংশ মুখে পুরে খেতে খেতে বলল, “মানুষ গেলে কেন মারা পড়ে সেটা বলেছে?”
“না। একজন পাগলা ডাক্তার থাকতেন, সেই পাগলা ডাক্তার খুন হয়ে যাবার পর থেকে এই অবস্থা।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং!” জয়ন্ত দ্বীপটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটা হন্টেড। এতদিন শুধু হন্টেড হাউজ শুনে এসেছি, এখন দেখা যাচ্ছে হন্টেড আইলেন্ড! আস্ত একটা দ্বীপ হন্টেড। পাগলা ডাক্তারের প্রেতাত্মা কন্ট্রোল করছে!”
শ্রাবণী বলল, “সবকিছু নিয়ে ঠাট্টা করবি না।”
“কে বলেছে আমি ঠাট্টা করছি?” জয়ন্ত বিশেষ মনোযোগ দিয়ে খেতে খেতে বলল, “আমি বলি কী, ফেরত যাওয়ার আগে এই হকুনদিয়া দ্বীপটা ইনভেস্টিগেট করে যাই।”
“কেন?”
“আমি কখনো হন্টেড প্লেস দেখি নাই। এটা হচ্ছে সুযোগ। সত্যিকথা বলতে কী, পাগলা ডাক্তারের প্রেতাত্মাকে যদি একটা শিশির ভেতরে ভরে নিয়ে যেতে পারি—”
শ্রাবণী বিরক্ত হয়ে বলল, “বাজে কথা বলবি না।”
ট্রলারটি হকুনদিয়া দ্বীপের খুব কাছ দিয়ে যাবার সময় তিনজনই খুব কৌতুহল নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তাদের কেউই জানত না আগামী আটচল্লিশ ঘন্টার মাঝেই এই দ্বীপটিকে নিয়ে তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে।
ট্রলারটি যখন গন্তব্যে পৌঁছেছে তখন বেলা গড়িয়ে এসেছে। নিয়াজ, জয়ন্ত আর শ্রাবণী বড় একটি রিলিফ-কাজের ছোট একটা অংশ হিসেবে এসেছে, কাজেই তাদের কোনো গুরুত্ব দেবে কি না সেটা নিয়ে খুব সন্দেহের মাঝে ছিল, কিন্তু দেখা গেল তাদের আশঙ্কা অমূলক। বিশাল একটি বার্জ সমুদ্রের মাঝে নোঙর করে রাখা আছে। সেটি ঘিরে নানারকম কর্মব্যস্ততা। অসংখ্য ট্রলার এবং নৌকা, কিছু ছোট লঞ্চ, বেশকিছু স্পিডবোট দাঁড়িয়ে আছে, তার মাঝে নানারকম রিলিফ-সামগ্রী তোলা হচ্ছে, লোকজনের হৈচৈ চেঁচামেচিতে একটা কর্মমুখর পরিবেশ। কিন্তু তার ভেতরেই তিনজন পৌঁছানো মাত্রই তাদেরকে রিলিফ কাজের দায়িত্বে যে-মানুষটি তার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। ভদ্রলোক জাতীতে ব্রিটিশ, মধ্যবয়স্ক, চুলদাড়িতে পাক ধরেছে। রোদে পোড়া চেহারা। তাদেরকে দেখে ভারি খুশি হলেন। জরুরিভাবে যোগাযোগ করে এই জিনিসগুলো আনা হয়েছে, বোঝা গেল ওগুলো ছাড়া রিলিফ ওয়ার্কের ওষুধপত্রে একধরনের অসংগতি থেকে যেত। ব্রিটিশ ভদ্রলোক ইংরেজিতে বললেন, “তোমরা অনেক কষ্ট করে এসেছ, এখন বিশ্রাম নাও। বার্জের ওপরে তোমাদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।”
জয়ন্ত ইংরেজি মোটামুটি গুছিয়ে লিখতে পারে কিন্তু বলার সময় তার খানিকটা বাধো-বাধো ঠেকে। তাই দিয়েই সে বলল যে তারা ট্রলারে শুয়ে-বসে এসেছে এবং মোটেও ক্লান্ত নয়। এই কথা শুনে সাথে সাথে তাদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল, শারিরীক পরিশ্রম করার মতো অনেক মানুষ আছে, কিন্তু মোটামুটি লেখাপড়া জানে এখানে এরকম মানুষের খুব অভাব।
বার্জ থেকে নানা রিলিফ বের করে ট্রলার এবং নৌকায় তোলা হতে লাগল। ম্যাপে ছোট ছোট দ্বীপগুলো চিহ্নিত আছে। কোথায়, কত মানুষ মারা গেছে, কতজন ঘরবাড়ি হারিয়েছে, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে লিখে রাখা আছে। ম্যাপ এবং লিস্ট দেখে জিনিসপত্রের পরিমাণ ঠিক করে চিরকুটে সংখ্যাটি লিখে দেওয়া হতে লাগল। সেটি দেখে মালপত্র বোঝাই করে ট্রলার-নৌকা-লঞ্চগুলো চলে যেতে শুরু করল। যেগুলো গিয়েছে সেগুলো ফিরে আসতে শুরু করেছে। সেখানে মালপত্র বোঝাই করে আবার তাদের নতুন জায়গায় পাঠানো হতে লাগল। রিলিফ ওয়ার্কে আরো অনেকে এসছে। একটা বড় অংশ এসেছে কিছু এনজিও থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজের আরো কিছু ছাত্র এসেছে। ছাত্রী হিসেবে শ্রাবণীই একজন তবে ব্রিটিশ রিলিফ টিমের সাথে কয়েকজন মহিলা এসেছে। জয়ন্ত যদিও মুখ টিপে হেসে বলল, “তারা শুধু নামেই মহিলা, দেখতে শুনতে আকারে এবং আকৃতিতে সবাই এই দেশের বড় সন্ত্রাসীর মতো!”
সমস্ত কাজ শেষ করে ঘুমুতে ঘুমুতে গভীর রাত হয়ে গেল। বার্জের ডেকে সবার শোওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, শুধু মেয়েদের আলাদা কেবিন দেয়া হয়েছে। শ্রাবণীর কেবিনটি দেখে জয়ন্ত এবং নিয়াজের চোখ হিংসায় ছোট ছোট হয়ে গেল। ছোট বাংক বেড, মাথার কাছে গোল জানালা, ছোট খেলনার মতো একটা সিংক, লাগোয়া বাথরুম, সবকিছু ঝকঝক তকতক করছে।
জয়ন্ত দেখেশুনে মুখ ছুঁচালো করে বলল, “তোরা না নারীবাদী মহিলা,আমাদেরকে শুকনো ডেকের মাঝে শুইয়ে রেখে নিজে এরকম কেবিন নিয়ে ঘুমুচ্ছিস যে?”
“আমি নিইনি। আমাকে দেয়া হয়েছে।”
“ছুড়ে ফেলে দে। বলে দে থাকব না এখানে।”
শ্রাবণী বক্তৃতা দেয়ার ভঙ্গি করে বলল, “যে জাতি নারীদের সম্মান করে না সেই জাতির উন্নতি হয় না। তোরাও শেখ।”
পরের দিনটিও ব্যস্ততার মাঝে কাটল। বিকেলের দিকে তারা একটা দলের সাথে কাছাকাছি ছোট একটা দ্বীপে রিলিফ নিয়ে গেল। তাদেরকে আসতে দেখে অনেক আগে থেকে মানুষজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুকনো অভুক্ত মানুষ, ঘরবাড়ি ভয়ঙ্কর সাইক্লোন আর জলোচ্ছাসে উড়ে গেছে। আগে থেকে খবর পেয়েছিল বলে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে অবশ্য বেশির ভাগ মানুষ প্রাণে বেঁচে গিয়েছে।
ফিরে আসার সময় আবার তারা হকুনদিয়া দ্বীপের অন্য পাশ দিয়ে ফিরে এল। গভীর অরণ্যে ঢেকে থাকা দ্বীপটি দূর থেকে খুব রহস্যময় মনে হয়। এখানে কোনো মানুষ নেই। কেউ গেলে সাথে সাথে মারা পড়ে চিন্তা করলেই কেমন জানি ভয় হয়।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে জয়ন্ত আবিষ্কার করল, আজকের দিনটিতে তাদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে বেশকিছু ভলান্টিয়ার এসছে, তাদেরকে ব্যস্ত রাখার জন্যে সব কাজকর্মই তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে বার্জটি নোঙর করে রাখা হয়েছে সেই দ্বীপটি ঘুরে দেখা যেতে পারে, কিন্তু এটি একেবারেই সাদামাটা একটা দ্বীপ। সাইক্লোনে ঘরবাড়ি ধুয়েমুছে গিয়ে আরো সাদামাটা হয়ে গেছে। গ্রাম্য পথ ধরে হেঁটে আবিষ্কার করল সঙ্গে শ্রাবণী থাকার কারণে পেছনে ছোট ছোট বাচ্চার একটি বড় মিছিল তৈরি হয়ে গেছে। বাচাগুলোর সাথে কথা বলার চেষ্টা করে লাভ হল না। শহরের এই মানুষগুলোকে তারা বুঝতে পারে না। কথাবার্তা বললে তারা দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। এরকম সময়ে জয়ন্ত বলল, “চল, হকুনদিয়া দ্বীপ থেকে ঘুরে আসি।”
নিয়াজ ভুরু কুচঁকে বলল, “কী বললি?”
“বলেছি হকুনদিয়া দ্বীপ থেকে ঘুরে আসি।”
“কীভাবে যাবি?”
“খোঁজ করলেই একটা স্পিডবোট ট্রলার কিছু একটা পেয়ে যাব।”
শ্রাবণী বলল, “তারপর যখন খুন হয়ে যাবি তখন কী হবে?”
জয়ন্ত বলল, “তুই সত্যিই বিশ্বাস করিস ওখানে গেলেই মানুষ খুন হয়ে যায়?”
“সবাই যখন বলছে তখন নিশ্চয়ই একটা কারণ আছে।”
জয়ন্ত একটু রেগে বলল, “এখানকার মানুষেরা আরো কী বলছে শুনিস নি?”
“কী বলছে?”
“বলেছে সাইক্লোনটা সোজা এদিকে আসছিল, এখানকার এক পীর সাহেব ধমক দিয়ে পুবদিকে সরিয়ে নিয়েছেন। বলছে গভীর রাতে গ্রামের রাস্তায় বাস্তায় ওলাবিলা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে, যার অর্থ গ্রামের সব মানুষ কলেরায় মরে যাবে। বলছে চাঁদনী রাতে সুপারি গাছে বসে বসে পরীরা আকাশে উড়ছে। আরও শুনবি?”
“থাক, অনেক বক্তৃতা হয়েছে।”
জয়ন্ত গলা উঁচিয়ে বলল, “তোরা যেতে না চাইলে নাই। দরকার হলে আমি একা যাব।”
“কেন?”
“প্রমাণ করতে চাই পুরোটা কুসংস্কার। আর কিছু না হোক তখন মানুষ আবার এই সুন্দর দ্বীপটায় থাকতে পারবে।”
শ্রাবণী কিছু না বলে জয়ন্তর চোখে তাকিয়ে রইল। জয়ন্ত বলল, “মনে করিস না আমি পাগলামো করছি। এরকম একটা ব্যাপার জেনেশুনেও যদি দ্বীপটাতে অন্তত পা না ফেলে আসি তাহলে নিজের কাছে নিজের খারাপ লাগবে, মনে হবে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিয়ে ফেললাম।”
“ঠিক আছে।” শ্রাবণী মাথা নেড়ে বলল, “আমি যাব।”
নিয়াজ বলল, “তাহলে আমি একা আর বসে থেকে কী করব? আমিও যাব।”
জয়ন্ত হাতে কিল দিয়ে বলল, “চমৎকার! আমি গিয়ে দেখি একটা স্পিডবোট-ট্রলার-নৌকা কিছু একটা পাই কি না।”
শ্রাবণী মনে মনে আশা করছিল রিলিফ-কাজে সবাই ব্যস্ত থাকবে, জয়ন্তের এরকম পাগলামোর জন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু দেখা গেল কিছুক্ষণের মাঝেই জয়ন্ত একগাল হাসি নিয়ে ফিরে এল, সে জব্বার মিয়াকেই পেয়ে গেছে। জব্বার মিয়া চাইছে না তারা সেখানে যাক, কিন্তু যখন জোরাজুরি করেছে তখন শেষপর্যন্ত পৌঁছে দিতে রাজি হয়েছে।
কিছুক্ষণের মঝেই দেখা গেল, সমুদ্রের নীলপানি কেটে জব্বার মিয়ার ট্রলারটা ছুটে যাচ্ছে।
ট্রলারের ছাদের ওপর তিনজন চুপচাপ বসে আছে।
হকুনদিয়া দ্বীপে পৌঁছে ট্রলারটাকে টেনে খানিকটা বালুর ওপর তুলে জব্বার মিয়া নেমে এল, সে এমনিতেই কথা বেশি বলে না। এখন আরও কম কথা বলছে। জয়ন্ত বলল, “থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ জব্বার মিয়া। আপনি নামিয়ে না দিলে আমাদের এখানে আসা হত না।”
“কাজটা ভালো হল না।” জব্বার মিয়া নিচু গলায় বলল, “এর আগেরবার যে খুন হয়েছে, আপনাদের মতোই একজন ছিল। কিছু-একটা সাহস দেখানোর জন্যে এসেছিল, এসে খুন হল।”
জয়ন্ত একটু ফ্যাকাশে মুখে বলল, “আমরা খুন হব না। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।”
“এখানে আসতে চেয়েছিলেন, এসেছেন।” জব্বার মিয়া শক্তমুখে বলল, “আমি এখানে অপেক্ষা করি, আপনারা একটু ঘুরাঘুরি করে আসেন, ফেরত নিয়ে যাই।”
নিয়াজ মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, জব্বার ভাই ঠিকই বলেছে। তুই আসতে চেয়েছিলি, এসেছিস। এখন চল যাই।”
জয়ন্ত বলল, “তোরা যেতে চাইলে যা। আমি না-দেখে যাব না।”
“এখানে দেখার কি আছে? জঙ্গল গাছপালা দেখিসনি কখনো?”
জয়ন্ত বলল, “আমি ভেতরে ঢুকে দেখতে চাই।”
জব্বার মিয়া একটা নিশ্বাস ফেলে ট্রলারের পাটাতন থেকে একটা কাঠ সরাল। দেখা গেল সেখানে হাতে-তৈরি একটা বন্দুক। বন্দুকটা হাতে নিয়ে বলল, “তাহলে এইটা সাথে রাখেন।”
জয়ন্ত ভুরু কুচঁকে বলল, “বেআইনি অস্ত্র? লাইসেন্স আছে?”
“লাইসেন্স কোথায় থাকবে! হাতে-তৈরি বন্দুক ট্রলারে রাখি। চোর-ডাকাতের উৎপাতের জন্য রাখতে হয়।”
“না।” জয়ন্ত মাথা নাড়ল, “বেআইনি অস্ত্র রাখব না।”
জব্বার মিয়া খানিকক্ষণ জয়ন্তর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা নিশ্বাস ফেলে বন্দুকটা আবার পাটাতনের ভেতরে রেখে কাঠ দিয়ে ঢেকে দিল। জয়ন্ত বলল, “আপনি কোনো চিন্তা করবেন না জব্বার মিয়া। আমাদের কিছু হবে না। আমরা বেশি ভিতরে যাব না, একটু ঘুরোঘুরি করে চলে আসব।”
“আমায় গিয়ে রিলিফ নিয়ে যেতে হবে। রিলিফ পৌঁছে দিয়েই আমি চলে আসব। আপনার ঠিক এইখানে থাকবেন।”
“ঠিক আছে।”
জব্বার মিয়া এবার ট্রলারের ছাদের সাথে লাগানো একটা লম্বা কিরিচ টেনে বের করে ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এইটা সাথে রাখেন। এইটা রাখার জন্যে লাইসেন্স লাগে না।”
জয়ন্ত ইতস্তত করে কিরিচটা হাতে নিল, সাবধানে ধার পরীক্ষা করে বলল, “এইটা রাখব?”
নিয়াজ বলল, “রেখে দে। কখন কী কাজে লাগে।”
“যদি কোন বিপদ দেখেন আগুন জ্বালাবেন।”
“আগুন?”
“হ্যাঁ। ম্যাচ আছে সাথে?”
“আছে।“”
“দুইটা মোমবাতি নিয়ে যান—”
“দিনের বেলা মোমবাতি দিয়ে কী করব?”
“সাথে রাখেন।” বলে জব্বার মিয়া দুইটা বড় বড় মোমবাতি বের করে দিল।
নিয়াজ মোমবাতিগুলো হাতে নেয়, হঠাৎ করে সে কেমন যেন আতঙ্ক অনুভব করতে থাকে। শুকনো গলায় বলল, “আর কিছু লাগবে জব্বার ভাই?”
“দড়ি। আর লাঠি।”
“কেন? দড়ি আর লাঠি কেন?”
জব্বার মিয়া বলল, “জানি না। তবে মানুষ বিপদে পড়লে লাগে। আগে যে লোকটা খুন হল...” জব্বার মিয়া হঠাৎ করে থেমে গেল।
নিয়াজ ভয়ে ভয়ে বলল, “যে খুন হল?”
“না, কিছু না।” জব্বার মিয়া মাথা নেড়ে বলল, “আপনারা যখন যাবেনই তখন ভয় দেখিয়ে লাভ কী?”
“তবু শুনি।”
“শোনার কিছু নাই। একটা গর্তের মাঝে পড়ে ছিল, সাথে দড়ি আর অন্য মানুষ থাকলে বের হতে পারত।”
“ও।”
“হ্যাঁ। সবসময় তিনজন একসাথে থাকবেন।”
“ঠিক আছে।”
“আমি অন্ধকার হবার আগেই আসব।”
“ঠিক আছে।”
জব্বার ট্রলার থেকে একটা লম্বা বাঁশ এবং নাইলনের কিছু দড়ি বের করে দিল। বাঁশটা কেটে তিন টুকরা করে তিনজনের হাতে দিয়ে বলল, “আল্লার মেহেরবান।”
নিয়াজ ফিসফিস করে বলল, “আল্লাহ মেহেরবান।”
“আর শোনেন—” জব্বার মিয়া নিচুগলায় বলল, “চোখগুলি সাবধান।”
“চোখ?”
“হ্যাঁ। চশমা থাকলে সবসময় চশমা পরে থাকবেন।”
জয়ন্ত অবাক হয়ে বলল, “কেন?”
জব্বার মিয়া কোন কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
জব্বারের ট্রলারটা শব্দ করে সমুদ্রের বুকে অদৃশ্য হয়ে যাবার পর ওরা তিনজন একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। জয়ন্ত দুর্বল গলায় বলল, “কাজটা ঠিক করলাম কি না বুঝতে পারলাম না।”
শ্রাবণী বলল, “ঠিক করিসনি। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।”
জয়ন্ত দ্বীপটার দিকে তাকাল। গাছপালা-ঢাকা নিঝুম একটা দ্বীপ। সমুদ্রের ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়ছে, এছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। জয়ন্ত হাতের কিরিচটার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে বলল, “ভেতরে আর নাইবা গেলাম। বীচটাতে একটু হাঁটাহাঁটি করে দেখি।”
শ্রাবণী মাথা নাড়ল, বলল, “আমাদের জোর করে এখানে এনেছিস, এখন পিছাতে পারবি না।”
“তুই কী করতে চাস?”
“ভেতরে যাব।”
“ভেতরে যাবি?”
“হ্যাঁ।”
জয়ন্ত কিছুক্ষণ শ্রাবণীর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “বেশ।”
তিনজন হেঁটে হেঁটে যখন দ্বীপের ভেতর ঢুকছিল তখন শরৎকালের রৌদ্র মাত্র সতেজ হতে শুরু করেছে।
যেখানে মানুষের জনবসতি আছে সেখানে পায়ে চলার পথ তৈরি হয়ে যায়, এই দ্বীপটিতে দীর্ঘদিন কোনো মানুষ থাকেনি বলে কোনো পথঘাট নেই। ভেতরে ঢুকতে হলে ঝোপঝাড় ভেঙে ঢুকতে হয়, তিনজন সেভাবেই ঢুকেছে। সবার আগে জয়ন্ত। তার হাতে বড় কিরিচ, ঝোপঝাড় বা বুনোলতা বেশি থাকলে সেটা কেটে পথটা খানিকটা পরিষ্কার করছে। জয়ন্ত থেকে কয়েক হাত পেছনে শ্রাবণী। সবার পিছনে নিয়াজ। পা ফেলার আগে বাঁশের লাঠিটা দিয়ে মাঝে মাঝে পরীক্ষা করছে। ঠিক কী কারণে কারোই সঠিক জানা নেই। বালুবেলায় প্রখর রোদ ছিল, ভেতরে তার কিছু অবশিষ্ট নেই। বড় বড় গাছের ছায়ায় আলো-আঁধারি একধরনের আবছা অন্ধকার।
তিনজন চুপচাপ মিনিট দশেক হাঁটার পর শ্রাবণী হঠাৎ করে নিচুগলায় বলল, “থাম।”
অন্য দুজন সাথে সাথে থেমে যায়। নিয়াজ ভয়-পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে?”
“না, কিছু হয়নি।”
“তাহলে?”
“আমার শুধু মনে হচ্ছে কেউ আমাদের লক্ষ্য করছে।”
শ্রাবণীর কথা শুনে জয়ন্ত আর নিয়াজ চারিদিকে তাকাল, যতদূর চোখ যায় শুধু গাছ, লতাপাতা ঝোপঝাড়। কেউ যদি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের লক্ষ্য করে সেটি বোঝার কোনো উপায় নেই। ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার জন্য জয়ন্ত হাত নেড়ে বলল, “কে এখানে লক্ষ্য করবে? তোর মনের ভুল।”
“আমি যখন ছোট ছিলাম একদিন রাতে ঘুম ভেঙে গেল। আমার শুধু মনে হতে লাগল কেউ একজন ঘরে আছে, আমাকে লক্ষ্য করছে। ভয়ে আমি গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলাম। সকালে উঠে দেখি চোর সবকিছু চুরি করে নিয়ে গেছে।”
জয়ন্ত পরিবেশটা হাল্কা করার জন্য বলল, “তোর যে এরকম অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা আছে আগে কখনো বলিসনি তো!”
“আগে কখনো দরকার পড়েনি।”
“ঠিক আছে ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখা যাক।”
“কীভাবে?”
“কিছুক্ষণ সামনে হেটে হঠাৎ করে ঘুরে পেছনদিকে তাকাই, দেখি কাউকে দেখা যায় কিনা।”
“ঠিক আছে।”
কথা না বলে তিনজনে বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে গেল এবং হঠাৎ করে পেছনে ঘুরে কয়েক পা ছুটে গেল। ওরা অবাক হয়ে দেখল সত্যি সত্যি কী একটা প্রাণী দুদ্দাড় করে পেছনে ছুটে গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
শ্রবণী ভয়-পাওয়া গলায় বলল, “দেখেছিস? দেখেছিস? আমি বলেছি না!”
জয়ন্ত খানিকক্ষণ প্রাণীটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা একটা বেজি। নেউল। ইংরেজিতে বলে উইজল।”
“নেউল? বেজি?”
“হ্যাঁ।”
শ্রাবণী ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই কেমন করে জানিস?”
“আমি জানি কারণ আমি বেজি দেখেছি। আমাদের গ্রামের বাড়িতে একজন মানুষ ছিল। তার একটা পোষা বেজি ছিল।”
“ও।”
“অসম্ভব হিংস্র প্রাণী। কিন্তু সাইজটা বেড়ালের মতো। কাজেই আমার মনে হয় তোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
“এরকম করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কেন?”
“মনে হয় আগে কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখেনি।”
“ফাজলেমি করবি না। বাঁশ দিয়ে মাথায় একটা বসিয়ে দেব।”
“ঠিক আছে ফাজলেমি করব না।”
“দ্যাখ কীভাবে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে, যেন আমাদের কথা বুঝতে পারছে।”
“বুঝতে পারছে না। বেজি হচ্ছে বেজি। তাদের মানুষের কথা বোঝার কথা নয়।”
“তাহলে পালিয়ে যাচ্ছে না কেন?”
“কৌতুহলে।”
“এত কৌতুহল কেন?”
জয়ন্ত মাথা নেড়ে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, “তুই কি বলতে চাইছিস এই বেজিটা দেখে আমাদের ভয়ে চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যাওয়া উচিত?”
“না, তা বলছি না।” শ্রাবণী ইতস্তত করে বলল, “কিন্তু এটার ভাবভঙ্গি দেখে ভালো লাগছে না। হয়তো এটা পাগল, হয়তো এটা র্যাবিড।”
“ঠিক আছে আমি এটাকে তাড়িয়ে দিচ্ছি,” বলে জয়ন্ত তার কিরিচ উচিয়ে বেজিটার দিকে ছুটে গেল। বেজিটা শেষমুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করল এবং একেবারে শেষমুহূর্তে পেছনের দুই পায়ের ওপর ভর দিয়ে প্রায় মানুষের মতো দাঁড়িয়ে পেছন দিকে লাফিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
জয়ন্ত স্বীকার না করে পারল না, বেজিটা একটু অস্বাভাবিক। এই ধরনের বুনা প্রাণী মানুষকে আরো অনেক বেশি ভয় পায়।
জয়ন্ত শ্রাবণীর কাছে এসে বলল, “হয়েছে তো? তোর বেজি পালিয়েছে।”
শ্রাবণী মাথা নাড়ল, কিন্তু কোনো কথা বলল না।
তিনজন আবার হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে নিয়াজ চাপা গলায় বলল, “আমার ব্যাপারটা ভালো লাগছে না।”
জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “কোন ব্যাপারটা?”
নিয়াজ বলতে পারল না। প্রকৃত ব্যাপারটি যদি তারা জানত তাহলে তাদের কারোই ভালো লাগত না। তারা তখনো বুঝতে পারছিল না প্রতি পদক্ষেপেই তারা একটা বিশাল বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
আরো মিনিট দশেক হাঁটার পর হঠাৎ করে গাছপালা হালকা হয়ে তারা খোলা একটা জায়গায় চলে এল। ঘন অরণ্য থেকে বের হওয়ার কারণেই তাদের ভেতরের চাপা আতঙ্কের ভাবটা একটু কমে এসেছে। তারা চারিদিকে ঘুরে তাকাল এবং আবিষ্কার করল প্রায় এক কিলোমিটার দূরে একটা বাসা। এরকম একটি দ্বীপের জন্যে বাসাটি নিঃসন্দেহে আধুনিক। কিন্তু এতদূর থেকেও তাদের বুঝতে কোনো অসুবিধে হয় না যে বাসাটি দীর্ঘদিন থেকে অব্যাবহৃত হয়ে পড়ে আছে। ঝোপঝাড়ে ঢেকে আছে, জানালা খোলা, দরজা ভাঙা এবং রঙ উঠে বিবর্ণ হয়ে আছে।
নিয়াজ বলল, “ওটা নিশ্চয়ই পাগলা ডাক্তারের বাসা।”
“হ্যাঁ।” শ্রাবণী মাথা নাড়ল, “ভদ্রলোক নিশ্চয়ই খুব শৌখিন ছিলেন। এরকম একটা নির্জন দ্বীপে কী চমৎকার বাসা তৈরি করেছেন দেখেছিস?”
“শৌখিন এবং মালদার।” জয়ন্ত বলল, “এরকম একটা নির্জন দ্বীপে এরকম একটা বাসা তৈরি করতে অনেক মালপানি দরকার।”
শ্রাবণী কোনো কথা না বলে দূরে বাসাটির দিকে তাকিয়ে রইল। খানিক্ষণ পর বলল, “এতদূর যখন এসেছি তখন বাসাটি দেখে যাই।”
নিয়াজ ইতস্তত করে বলল, “চল তাহলে, দেরি করিস না।”
তিনজনের ছোট দলটা আবার রওনা দিল। একটু আগে সবাই মিলে যেভাবে সাবধানে হাঁটছিল, খোলামেলা জায়গায় এসে সেই সাবধানতাটুকু অনেক কমে গেল। তাড়াতাড়ি গিয়ে ফিরে আসার জন্যে এবারে নিয়াজ হাঁটছে সামনে, নিয়াজের পিছনে জয়ন্ত এবং সবার পিছনে শ্রাবণী।
হাঁটতে হাঁটতে নিয়াজ সম্ভবত একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল, বাংলোর মতো চমৎকার বাসাটির কাছাকাছি চলে এসেছে সেটাও দেখছিল একটু পরে পরে, তাই ঠিক কোথায় পা ফেলছে খেয়াল করেনি। হঠাৎ করে নিয়াজ আবিষ্কার করল, সামনের ঝোপঝাড় লতাপাতার আড়ালে মাটি নেই এবং সে একটা গর্তে পড়ে যাচ্ছে। নিজেকে বাঁচানোর সহজাত প্রবৃত্তিতে সে হাতের কাছে ঝোপঝাড় গাছপালা যেটাই পেল সেটাই ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু কোনটাই তার ওজনকে ধরে রাখার মতো শক্ত নয় এবং সে সবকিছু নিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখন জয়ন্ত আর শ্রাবণী ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলল। নিয়াজ আতঙ্কে চীৎকার করে হাত-পা ছুড়তে থাকে এবং আরেকটু হলে সে অন্যদেরকে টেনে নিয়ে গর্তে পড়ে যেত, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা নিজেদের সামলে নিল। শ্রাবণী আর জয়ন্ত কোনমতে নিয়াজকে গর্ত থেকে টেনে তুলল।
ঘটনার আকস্মিকতায় এত হতবাক হয়ে গেছে যে নিয়াজ প্রথমে কোনো কথা বলতে পারল না। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে বলল, “বুবি ট্র্যাপ।”
“বুবি ট্র্যাপ?” জয়ন্ত ভুরু কুঁচকে বলল, “এই জঙ্গলে বুবি ট্র্যাপ কে বসাবে?”
শ্রাবণী সাবধানে গর্তের কাছে এগিয়ে গেল। বেশ বড় গোলাকার একটা গভীর গর্ত। গর্তের ওপর লতাপাতা গাছপালা দিয়ে ঢাকা। উপর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে এতবড় একটা গর্ত। শ্রাবণী মাথা নেড়ে বলল, “নিয়াজ ঠিকই বলেছে। আসলেই বুবি ট্র্যাপ।”
“এখানে বুবি ট্র্যাপ কে বসাবে?” জয়ন্ত সাবধানে পুরো জায়গাটা দেখে বলল, “এই দ্বীপে কোন মানুষ থাকে না।”
“হয়তো থাকে।”
“যদি থাকে তাহলে সে বুবি ট্র্যাপ বাসাবে কেন?” জয়ন্ত গর্তের উপর লতাপাতা গাছপালাগুলো দেখে বলল, “আমার মনে হয় এটা ন্যাচারাল ফেনোমেনন। এমনিতেই একটা বড় গর্তের উপর কিছু ঝোপঝাড় গজিয়েছে।”
“কোনো কারণ ছাড়াই?”
“কারণ থাকলেও সেটা প্রাকৃতিক কারণ।”
জয়ন্তের ব্যাখ্যাটা কারোরই ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না, কিন্তু আপাতত সেটা গ্রহণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। শ্রাবণী খানিকক্ষণ গর্তটা পরীক্ষা করে নিয়াজকে জিজ্ঞেস করল, “তুই ব্যথা পাসনি তো?”
নিয়াজ মাথা নাড়ল, “মনে হয় না। একটু-আধটু ছাল উঠে গেছে।”
শ্রাবণী তার ব্যাগ খুলে একটা মলম জাতীয় টিউব বের করে বলল, “নে, লাগিয়ে নে। এন্টিসেপটিকের কাজ করবে।”
নিয়াজ শুকনো গলায় বলল, “পড়ে গেলে কী হত?”
“কী আর হত, দড়ি দিয়ে বেঁধে আমরা টেনে তুলে ফেলতাম।”
“মনে পড়ে জব্বার মিয়া বলেছিল গর্তের মাঝে পড়ে গিয়ে মরে গিয়েছিল?”
“এই গর্তের ভেতর পড়লে কেউ মরে যায় না, বড়জোর হাত-পা ভেঙে যেত।” শ্রাবণী আবার গর্তে ভেতর উঁকি দিয়ে হঠাৎ কী একটা দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে পিছনে সরে গেল।
জয়ন্ত ভয় পাওয়া গলায় বলল, “কী? কী হয়েছে?”
“ভেতরে তাকিয়ে দ্যাখ।”
জয়ন্ত একটু এগিয়ে গিয়ে ভেতরে তাকাল। ভেতরে অন্ধকার, ভালো দেখা যায় না। সরসর করে একধরনের শব্দ হচ্ছে। সে রোদ থেকে চোখ আড়াল করে ভেতরে তাকিয়ে শিউরে উঠল, এক মানুষ সমান একটি গর্তের নিচে কিলবিল করছে সাপ। একটি-দুটি সাপ নয়, অসংখ্য সাপ। জয়ন্ত নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। একধরনের আতঙ্ক নিয়ে সে নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে।
নিয়াজ অবাক হয়ে গুড়ি মেরে এগিয়ে এল, বলল, “কী?”
জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, “সাপ।”
“সাপ?”
“হ্যাঁ।”
“কী সাপ?”
“জানি না, তাকিয়ে দ্যাখ।”
নিয়াজ রোদ থেকে চোখ আড়াল করে নিচে তাকিয়ে হতচকিত হয়ে গেল। কিছুক্ষণ সে নিশ্বাস নিতে পারে না। তারপর বড় একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “তোরা যদি আমাকে টেনে তুলতে না পারতি কী হত বুঝতে পারছিস?”
জয়ন্ত মাথা নাড়ল।
“আমি আর এখানে এক সেকেণ্ডও থাকছি না। চল যাই।”
জয়ন্ত কোনো কথা না বলে যন্ত্রমুগ্ধের মতো গর্তের নীচে তাকিয়ে থাকে।
নিয়াজ বলল, “কী হল? কথা বলছিস না কেন?”
“স্নেক-পীট। এটা হচ্ছে সাপের গর্ত, এখানে সাপেরা থাকে।”
“হ্যাঁ। সাপদের বাসা।”
“কিন্তু—”
“কিন্তু কী?”
“গর্তের দেয়ালটা তাকিয়ে দেখ।”
“কী দেখব?”
“দেখেছিস দেয়ালটা কত মসৃণ? তার মানে এখান থেকে কোনো সাপ বের হতে পারে না।”
শ্রাবণী কয়েক হাত পিছনে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “তুই কী বলতে চাইছিস?”
“সাপগুলো যদি এখান থেকে বের হতে না পারে তাহলে ওরা খায় কী?”
শ্রাবণী চোখ পাকিয়ে বলল, “সাপের লাঞ্চ ডিনার নিয়ে তোর এত মাথাব্যথা কেন?”
“না,” জয়ন্ত একটু অধৈর্য হয়ে বলল, “বুঝতে পারছিস না, দেখে মনে হচ্ছে এখানে কেউ সাপগুলোকে পুষছে?”
“একটু আগে তুই-ই না বললি এখানে কোন মানুষ নাই?”
“সেইজন্যেই তো বুঝতে পারছি না।”
শ্রাবণী মাথা নেড়ে বলল, “সাপদের বের হওয়ার জন্যে লিফট লাগে না। তারা গর্ত দিয়ে বের হতে পারে। নিচে গর্ত আছে। আর না থাকলে তারা গর্ত করে নেবে।”
জয়ন্ত মাথা নাড়ল, বলল, “তা ঠিক। কিন্তু—”
“কিন্তু কী?”
“দেখে মনে হয়, কেউ যেন খুব যত্ন করে একটা স্নেক-পীট তৈরি করেছে। দ্যাখ একবার তাকিয়ে দ্যাখ।”
শ্রাবণী মুখ শক্ত করে বলল, “জয়ন্ত, পৃথিবীতে রাজাকারদের পরে আমি যে-জিনিসটা ঘেন্না করি সেটা হচ্ছে সাপ। কাজেই তুই আমাকে সাপ দেখানোর চেষ্টা করবি না।”
জয়ন্ত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ঠিক আছে, তোকে দেখানোর চেষ্টা করব না। কিন্তু এটা একটা ফ্যানটাসটিক জায়গা।”
নিয়াজ বলল, “আমার মতো আছাড় খেয়ে ভেতরে তো পড়িসনি তাই মনে হচ্ছে ফ্যানটাসটিক জায়গা।”
“ব্যথা তো পাসনি।”
“ব্যাথা না পেলে কী হবে? ভয় পেয়েছি। ভয়। বুঝলি?”
জয়ন্ত নিয়াজের কাঁধে হাত রেখে বলল, “আই অ্যাম সরি নিয়াজ। আমি খুব ইনসেনসেটিভ মানুষের মতো ব্যবহার করছি।”
“ঠিক আছে। এখন সেনসেটিভ মানুষের মতো ব্যবহার কর। এখান থেকে বের হ।”
জয়ন্ত পকেট থেকে সিগারেট বের করে মুখে লাগিয়ে সাবধানে ম্যাচ দিয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে দূরের বাসাটির দিকে তাকিয়ে বলল, “বাসাটার এত কাছে এসে না-দেখে চলে যাব?”
নিয়াজ ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, “তোর এখনো শখ আছে?”
“না মানে, এখন তো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। এরকম একটা গর্তে পড়ে গিয়ে মানুষ সাপের কামড় খেয়ে মারা যায়। এর মাঝে কোনো রহস্য নেই, কোনো ভৌতিক ব্যাপার নেই।”
“তুই কী বলতে চাইছিস?”
“আমি বলছিলাম কী— এখন যেহেতু কারণটা জেনে গিয়েছি আমাদের তো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঐ বাসাটায় গিয়ে একটু ঘুরে দেখে আসি।”
নিয়াজ শ্রাবণীর দিকে তাকাল। শ্রাবণী বলল, “জয়ন্তের কথায় একটা যুক্তি অবশ্যি আছে। এতদূর যখন এসেছি বাসাটা দেখে যাই। দেখি পাগলা ডাক্তারের কোনো রহস্যভেদ করতে পারি কি না।”
জয়ন্ত বলল, “তুই নিশ্চিত থাক, এবার আমি সামনে সামনে যাব। লাঠি দিয়ে ঠুকে ঠুকে দেখব কোনো গর্ত আছে কিনা।”
নিয়াজ একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “চল। কিন্তু তোদের বলে রাখছি, বাসাটায় যাব, ঢুকব আর বের হব।”
“ঠিক আছে।”
“ওয়ার্ড অব অনার?”
জয়ন্ত নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “ওয়ার্ড অব অনার।”
তিনজনের ছোট দলটা বাসার সামনে এসে একধরনের মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। জংলী গাছপালায় পুরোটা ঢেকে গিয়েছে কিন্তু তবু বোঝা যায় একসময় এটি নিশ্চয়ই ছবির মতো একটা সুন্দর বাসা ছিল। দোতলা কাঠের বাসা। ওপরে একটি চমৎকার ডেক। এখানে বসে নিশ্চয়ই সমুদ্র দেখতে পাওয়া যায়। বাসাটি ঘিরে যত্ন করে গাছপালা লাগানো হয়েছিল। সেগুলো পুরো এলাকাটিকে ছায়া দিয়ে ঢেকে রেখেছে। একসময়ে একটা গেট ছিল। এখন সেখানে কিছু নেই। সুড়কি বিছানো ছোট একটা পথ।
তিনজন হেঁটে হেঁটে বাসাটির বারান্দায় এসে দাঁড়াল। জানালাগুলো খোলা। কাঁচ ভেঙে গিয়ে কেমন যেন অসহায় মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। জয়ন্ত দরজাটি ধাক্কা দিতেই সেটি ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেল। কয়েক সেকেণ্ড অপেক্ষা করে জয়ন্ত ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে।
দীর্ঘদিন কেউ না-আসায় ঘরের ভেতরে একধরনের ভ্যাপসা গন্ধ। জয়ন্ত সাবধানে চারিদিকে তাকিয়ে আরো কয়েক পা ভেতরে ঢুকে হাত দিয়ে অন্য দুজনকে ইঙ্গিত করতেই তারা ভেতরে ঢুকল।
ঘরটি একসময় নিশ্চয়ই খুব সুন্দর করে সাজানো ছিল, এখনো তার কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে। তিনজন সাবধানে হেঁটে ঘরটিকে পরীক্ষা করে। একটি শেলফ কাত হয়ে পড়ে আছে। একটা টেবিল-ল্যাম্প একপাশে ভাঙা। একটা সুদৃশ্য চেয়ার। ঘরের দেয়ালে ধূলি-ধূসরিত একটা অয়েল পেইন্টিং। শ্রাবণী কাছে গিয়ে ফুঁ দিতেই খানিকটা জায়গা পরিষ্কার হয়ে উজ্জ্বল রঙ বের হয়ে এল। শ্রাবণী দেয়ালে টাঙানো অন্য ছবিগুলো পরীক্ষা করে দেখল, এলোমেলো চুলের হাসিখুশি একজন মানুষ একটি বিদেশী মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রাবণী বলল, “এটা নিশ্চয়ই পাগলা ডাক্তার।”
জয়ন্ত এগিয়ে এসে বলল, “তুই কেমন করে বুঝতে পারলি?”
“দেখছিস না পাশে ফরেনার মেয়ে?”
“পাশে ফরেনার মেয়ের সাথে পাগলা ডাক্তারের কী সম্পর্ক?”
“আমাদের দেশের যত সাকসেসফুল মানুষ তাদের সবার বিদেশী বউ।”
“তোকে বলেছে!”
“বিশ্বেস করলি না?”
“আর এই পাগলা ডাক্তার সাকসেসফুল কে বলেছে? সাকসেসফুল মানুষ এরকম জঙ্গলে থাকে? থেকে খুন হয়ে যায়?”
শ্রাবণী দার্শনিকের মতো মুখভঙ্গি করে বলল, “বেঁচে থাকাটাই যদি জীবনের অর্থ হয়ে থাকে তাহলে কচ্ছপ হচ্ছে সবচে সাকসেসফুল। কয়েকশ বছর বেঁচে থাকে।”
নিয়াজ একটু অধৈর্য হয়ে বলল, “অনেক ফিলসফি হয়েছে। এখন চল যাই।”
জয়ন্ত বলল, “একটু অন্য ঘরগুলো দেখ যাই।”
“কথা ছিল ঢুকব এবং বের হব।”
“এই তো ঢুকেছি। এখন অন্যঘরগুলোতে ঢুকে বের হয়ে যাব।”
নিয়াজ হতাশ হওয়ার ভঙ্গিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
নিচের সবগুলো ঘরই ধূলায় ধূসর। মাকড়শার জাল এবং পোকামাকড়ে ঢেকে আছে। কিছু ব্যবহারী জিনিস, দেয়ালে আরো কিছু ছবি, কয়েকটা আসবাবপত্র পাওয়া গেল। দেতলায় ওঠার সিঁড়িটা একটু নড়বড়ে মনে হল। জায়গাটা দিনের বেলাতেই অন্ধকার, তাই মোমবাতি দুটো জ্বালিয়ে নেয়া হল। তিনজন সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। জয়ন্ত কয়েক পা উঠে বলল, “সিঁড়ি মনে হয় ঘুণ ধরে ক্ষয়ে গেছে। সাবধান।”
শ্রাবণী জিজ্ঞেস করল, “সাবধানটা কীভাবে হব? ওজন কম করে দেব?”
“তা বলছি না। নিচে দেখে পা ফেলিস। রেলিংটা শক্ত করে ধরে রাখিস। হঠাৎ করে ভেঙ্গে গেলে যেন আছাড় খেয়ে পড়ে না যাস।”
“নিয়াজের মতো!”
“হ্যাঁ, নিয়াজের মতো।”
নিয়াজ বিরক্ত কয়ে বলল, “ব্যাপারটা ফানি ছিল না। যদি পড়ে যেতাম তাহলে মরে যেতাম।”
শ্রাবণী বলল, “এবং হকুনদিয়ার নামটি সার্থক হতো।”
উপরে উঠে একটা দরজা পাওয়া গেল। দরজাটি বন্ধ। জয়ন্ত কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে বলল, তালা মারা রয়েছে।”
“আমাদের কাছে চাবি নেই, কাজেই এখন এটি মিশন ইমপসিবল।”
“জোরে একটা লাথি দিয়ে দেখি, তালা ভাঙতে পারি কি না।”
“একজনের বাসায় তালা ভেঙে ঢোকা আইনত দণ্ডনীয়।”
জয়ন্ত দাঁত বের করে হেসে বলল, “কিন্তু যদি সেই বাসাটা হয় হকুনদিয়ার পাগলা ডাক্তারের বাসা এবং সেই বাসায় গত পাঁচবছর কেউ ঢুকে না থাকে তাহলে সেটা আইনত দণ্ডনীয় নয়। সেটা ভদ্রতা-” বলে জয়ন্ত একটু পিছিয়ে এসে প্রচণ্ড জোরে লাথি দিল। দীর্ঘদিনের অব্যবহারে মরচে পড়ে তালা নিশ্চয়ই নড়বড়ে হয়েছিল, জয়ন্তের লাথিতে তালা ভেঙে দরজা শব্দ করে ভেতরের দিকে খুলে যায়।
শ্রাবণী চোখ বড় বড় করে বলল, “তোর পায়ে জোর তো ভালোই আছে। রাত্রিবেলা মানুষের ঘরের দরজা ভেঙে বেড়াস নাকি?”
জয়ন্ত বুকে থাবা দিয়ে বলল, “হাফ ব্যাক, নাজিরপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন।”
নিয়াজ জয়ন্তকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে বিস্ময়সূচক শব্দ করল, বলল, “কী আশ্চর্য!”
জয়ন্ত এবং শ্রাবণী ভেতরে ঢুকে নিয়াজের মতোই চমৎকৃত হয়ে যায়। ভেতরে অত্যন্ত চমৎকার আধুনিক একটি ল্যাবরেটরি। চমৎকার শ্বেতপাথরের টেবিল। দামি মাইক্রোস্কোপ। উপরে তাকে কাঁচের শেলফ। টেবিলের পাশে ছোট ফ্রিজ, হিটার সেন্ট্রিফিউজ। পাশে শেলফে সারি সারি বই খাতা, নোট বই।
শ্রাবণী অবাক হয়ে বলল, “এই ল্যাবরেটরিটা দেখি একেবারে চকচক করছে।”
“দরজা জানালা সব বন্ধ ছিল বলে নষ্ট হয়নি।”
“কী সুন্দর ল্যাবরেটরি দেখেছিস?” নিয়াজ মুগ্ধ হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে বলল, “এরকম একটা জঙ্গলে জায়গায় কেউ এরকম ল্যাবরেটরি তৈরি করতে পারে?” নিয়াজ হাতের মোমবাতিটা নিয়ে শেলফের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা বই টেনে নেয়। ধূলা ঝেড়ে বইটা দেখে বলল, “জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিঙের বই।”
“তার মানে পাগলা ডাক্তার একজন জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ার ছিল?”
নিয়াজ বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় হাতে-লেখা নামটি পড়ে বলল, “পাগলা ডাক্তারের ভালো নাম মাজেদ খান। ড. মাজেদ খান।”
“এরকম সুন্দর একটা নাম থাকার পরও তাকে সবাই পাগলা ডাক্তার ডাকে কেন?”
“আমাকে জিজ্ঞেস করিস না। আমি এই নাম দিইনি।” নিয়াজ শেলফ থেকে আরো কয়েকটা বই নামিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। নিয়াজ পড়াশোনা সংক্রান্ত ব্যাপারে খুব উৎসাহী। কোনো বই পেলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না-দেখে নামিয়ে রাখে না। যদিও একটু আগে সে চলে যাবার জন্যে অধৈর্য হয়ে উঠেছিল কিন্তু হঠাৎ করে বই এবং কাগজপত্র দেখে সে খুব উৎসাহী হয়ে উঠে। মোমবাতিটা টেবিলে বসিয়ে সে কাগজপত্র বের করে দেখতে থাকে। জয়ন্ত একটা মাইক্রোস্কোপের ধূলা ঝেড়ে চোখ লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করে। শ্রাবণী একধরনের বিস্ময় নিয়ে ঘরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকে। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এরকম একটি নির্জন দ্বীপে একজন মানুষ এরকম চমৎকার একটি ল্যাবরেটরি দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে।
নিয়াজ বই এবং কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ করে বলল, “এই দ্যাখ! কী পেয়েছি।”
“কী?” জয়ন্ত মাইক্রোস্কোপ থেকে চোখ তুলে নিয়াজের দিকে তাকাল।
“ডায়েরি।”
“ডায়েরি?” শ্রাবণী নিয়াজের দিকে এগিয়ে এল।
“হ্যাঁ। পার্সোনাল ডায়েরি।” নিয়াজ পৃষ্ঠাগুলো ওল্টাতে থাকে এবং হঠাৎ করে সেখান থেকে ভাঁজ-করা একটা কাগজ নিচে পড়ল। শ্রাবণী কাগজটা তুলে নিয়ে ভাঁজ খুলে তাকায়, ভেতরে টানা হাতে কিছু একটা লেখা। শ্রবণী কৌতুহলী হয়ে মোমবাতির আলোতে পড়ার চেষ্টা করে। মানুষটির হাতের লেখা সুন্দর হলেও পড়তে কষ্ট হয়। সম্ভবত লিখেছে খুব তাড়াহুড়ো করে। সেজন্যে পড়তে শ্রাবণীর সময় লাগল। পড়ে হঠাৎ করে শ্রাবণীর ভুরু কুঞ্চিত হয়ে উঠে। সে কাঁপা গলায় বলল, “কী লেখা এখানে?”
নিয়াজ মুখ তুলে তাকাল, বলল, “কী লেখা?”
শ্রাবণী ভয়-পাওয়া গলায় বলল, “পড়ে-দ্যাখ।”
নিয়াজ কাগজটি হাতে নিয়ে মোমবাতির আলোতে পড়ার চেষ্টা করে। সেখানে লেখা, “এ আমি কী করেছি! একজন একজন করে সবাইকে খুন করেছে, এখন কি আমার পালা? কেউ যদি ভুল করে এই দ্বীপে চলে আসে তার কী হবে?”
ওরা একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, “কী লিখেছে এখানে? কে খুন করেছে? কাকে খুন করেছে?”
নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকে। পেছন থেকে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে। তারপর কিছু পৃষ্ঠা আগে চলে আসে। হঠাৎ করে সে মুখ তুলে তাকায়। মোমবাতির আলোতে দেখায় তার মুখ ভয়ে রক্তশূন্য হয়ে আছে। শ্রাবণী ভয়-পাওয়া গলায় বলল, “কী লেখা আছে ডায়েরিতে?”
“বেজি!”
“বেজি? কী হয়েছে বেজির?’’
“এই বেজিগুলো সাধারণ বেজি নয়। মাজেদ খান ইঞ্জিনিয়ারিং করে ওদের মাঝে বুদ্ধিমত্তার একটা জিন ঢুকিয়ে দিয়েছে।”
“কী বলছিস তুই!”
“হ্যাঁ। এই দ্যাখ।” নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা খুলে পড়ে শোনাল, “সুইডেনের ক্রান্স লেবরেটরিতে প্রফেসর সোয়ান্সন যে এক্সপেরিমেন্টটি করেছেন আমি আজকে সেটি করেছি। বেজির যে-ক্লোনটি তৈরি করেছি তার তিন নম্বর ক্রমোজমে বুদ্ধিমত্তার জিনটিতে মানুষের বুদ্ধিমত্তার জিনটি বসিয়ে দিয়েছি। জানিনা এই ভ্রুনটা ঠিকভাবে বড় হবে কি না, যদি বড় হয় তাহলে প্রথম একটা স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাঝে মানুষের এরকম একটা জিন ঢুকিয়ে দেয়া হল।”
নিয়াজ মুখ তুলে তাকাল। কাঁপা গলায় বলল, “তার মানে বুঝতে পারছিস? মাজেদ খান এখানে কিছু বেজি তৈরি করেছে যেগুলোর বুদ্ধিমত্তা মানুষের মতো--”
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলল, “কী বলছিস পাগলের মতো?”
“আমি পাগলের মতো বলছি না, এই দ্যাখ মাজেদ খান কি লিখেছে।” নিয়াজ ডায়েরির আরো কিছু পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পড়তে থাকে। “বেজিটির বুদ্ধিমত্তা অন্য বেজি থেকে বেশি কি না সেটা আজকে প্রমাণিত হয়ে গেল। বেজিটি খাঁচা থেকে পালিয়ে গেছে। এই খাঁচা থেকে কোনোভাবে বেজিটির পালিয়ে যাবার কথা নয়। কারণ বুদ্ধিমত্তাহীন কোনো প্রাণী এই খাঁচার ছিটকিনি খুলতে পারবে না। শুধুমাত্র অত্যন্ত উন্নত শ্রেনীর বুদ্ধিমত্তা আছে এরকম একটা প্রাণীই ছিটকিনি খুলে বের হয়ে যেতে পারে। কাজটি খুব ভুল হয়ে গেল। সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রাণী ছাড়া পেয়ে গেল। এখন এটি যদি তার বাচ্চাদের মাঝে এই বুদ্ধিমত্তার জিন ছড়িয়ে দেয়? তারা যদি নতুন বাচ্চার জন্ম দেয়? এই পুরো দ্বীপটি বুদ্ধিমান বেজি দিয়ে ভরে উঠে?”
শ্রাবণী ভয়-পাওয়া গলায় বলল, “তার মানে আমাদের পিছু-পিছু যে বেজিটা আসছিল সেটা মানুষের মতো বুদ্ধিমান?”
কেউ শ্রাবণীর কথার উত্তর দিল না। নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল, “এই দ্যাখ কী লেখা- আমি এই দ্বীপের সব বেজিগুলো মারার চেষ্টা করেছি। গুলি করে মারার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেই বুদ্ধিমান বেজিকে মনে হয় মারতে পারিনি। আজকে প্রথম কিছু বেজির বাচ্চাকে পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে ছুটে যেতে দেখলাম। তাহলে কি বুদ্ধিমান নতুন বেজির বাচ্চার জন্ম হয়েছে? সর্বনাশ! এখন কী হবে? আমি বেজিগুলোকে মারার চেষ্টা করেছি বলে আমাকে শত্রু হিসেবে ধরে নিয়েছে। এই বেজিগুলো কি এখন থেকে আমাকে কিংবা সব মানুষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে?”
মোমবাতির আলোতে সবাই চুপ করে বসে থাকে। কেউ কোনো কথা বলতে পারে না। নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ করে থেমে গিয়ে আবার পড়তে শুরু করল, “বেজিদের একটি বুদ্ধিমান প্রজন্মের জন্ম হলে তারা কী করবে? সবার আগে নিজেদের খাবার সংগ্রহের ব্যাপারটি নিশ্চিত করবে। আজকে আমি তাই আবিষ্কার করেছি। তারা একটি বড় গর্ত করে সেখানে সাপদের এনে জড়ো করেছে। আমি জানতাম না সাপ তাদের এত প্রিয় খাবার। সাপগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্যে ইঁদুর ধরে এনে গর্তের মাঝে ছেড়ে দিচ্ছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার।”
নিয়াজ মুখ তুলে তাকিয়ে বলল, “এখন বুঝতে পারছিস আমি যেই গর্তটাতে পড়তে যাচ্ছিলাম সেটা কোথা থেকে এসেছে?”
“হ্যাঁ। বুঝতে পেরেছি।”
শ্রাবণী ভয় পাওয়া গলায় বলল, “এখন কী হবে?”
জয়ন্ত অনিশ্চিতের মতো মাথা নাড়ল, বলল, “আমি জানি না।” সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে হেঁটে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকে দিল। অন্য দুজন এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ করে ছিটকিনি আটকে দিয়ে তারা প্রথমবার স্বীকার করে নিল এখানে তারা একটা ভয়ঙ্কর বিপদের মুখোমুখি এসে পড়েছে।
নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ করে থেমে গিয়ে আবার পড়তে শুরু করল, “বুদ্ধিহীন প্রাণী চলে সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে কিন্তু বুদ্ধিমান প্রাণী নতুন জিনিস শিখতে পারে। এই বেজিগুলো বুদ্ধিমান। তারা প্রতিদিন নতুন জিনিস শিখছে। আজকে আবিষ্কার করলাম, বেজিগুলো আমার পোষা কুকুরটিকে মেরে ফেলেছে। রাত্রিবেলা কুকুরটার চিৎকার শুনে আমি বন্দুক নিয়ে ছুটে বের হয়ে গেছি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বেজিগুলো জানে, একটা প্রাণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে তার দৃষ্টি। কাজেই সবার আগে সেগুলো কুকুরটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার চোখদুটো খুবলে তুলে নিয়েছে। তার পরের অংশটি সহজ। বেজিগুলো ধারালো দাঁত দিয়ে কুকুরের ঘাড়ের বড় আর্টারিটা ছিন্ন করে দিয়েছে। কী নৃশংস! বেজিগুলো তাদের থেকে অনেক বড় প্রানীকে হত্যা করতে শিখে গেছে, এখন কি আমাদের হত্যা করবে? আমার ল্যাবরেটরি এসিসটেন্ট খুব ভয় পেয়েছে। ভয় পাওয়ারই কথা।”
নিয়াজ ডায়েরি থেকে মুখ তুলে বলল, “মনে আছে জব্বার মিয়া কী বলেছিল?”
“কী বলেছিল?”
“চোখদুটো সাবধান।”
“হ্যাঁ। মনে আছে—”
“এখন বুঝেছিস তো কেন?”
কেউ কোন কথা না বলে নিয়াজের দিকে তাকিয়ে রইল। নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ করে থেমে যায়। একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে আবার পড়তে শুরু করল, “আজকে আমার ল্যাবরেটরি এসিস্টেন্ট খুন হয়ে গেল। মৃতদেহটি বাসার সামনে পড়েছিল। চোখদুটো খুবলে নিয়ে ঘাড়ের বড় আর্টারিগুলো ধারালো দাঁত দিয়ে কেটে নিয়েছে। কাজটি করেছে প্রায় নিঃশব্দে। আমি রাতে কোন শব্দও শুনতে পারিনি। তাকে আমি ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু সে আমার কথা না-শুনে ঘর থেকে বের হয়েছিল। কেন বের হল? আমার ধারণা বেজিগুলো কোনো একটা বুদ্ধি বের করে তাকে বের করে নিয়েছে। এখন এই দ্বীপে আমি একা। আমার ধারণা বাইরে থেকে কোনো সাহায্য না পেলে আমার অবস্থাও আমার ল্যাবরেটরি এসিস্টেন্টের মতো হবে।”
নিয়াজ আবার মুখ তুলে তাকাল। জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “ডায়েরি কি এখানেই শেষ?”
“না। আরো কয়েক পৃষ্ঠা আছে।”
“কী লেখা আছে এখানে?”
নিয়াজ পড়তে শুরু করে, “বুদ্ধিমান প্রাণীর প্রথম চেষ্টাটাই হল তার বুদ্ধিমত্তাকে ছড়িয়ে দেওয়া। কাজেই এই-বেজিগুলো যে সেরকম চেষ্টা করবে সে-ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। এই দ্বীপের যেদিকেই তাকাই সেদিকেই আমি বেজিগুলোকে দেখতে পাই। নিষ্পলক দৃষ্টিতে দূর থেকে আমাকে লক্ষ্য করে। দৃষ্টিগুলো দেখে আমার বুক কেঁপে ওঠে। আমি আজকাল ঘর থেকে বের হই না। মাথার কাছে লোডেড বন্দুক রাখি। কিন্তু কেন জানি মনে হয়, এই বন্দুক আমাকে রক্ষা করতে পারবে না। আমার মনে হয়, এটি খুব বড় সৌভাগ্য যে বেজিগুলো এই দ্বীপের মাঝে আটকা পড়ে আছে। এখান থেকে অন্য দ্বীপে কিংবা দেশের মূল ভূখণ্ডে যেতে পারছে না। যদি একবার চলে যায় তখন কী হবে! পৃথিবীর মানুষ আমাকে যেন ক্ষমা করে। আমার মনে হয় প্রাণীটা বুদ্ধিমান হবার পর নিশ্চয়ই তারা ভাব বিনিময় করার জন্যে নিজেদের একটা ভাষা আবিষ্কার করেছে। ডেকের ওপর বসে আমি বাইনোকুলার দিয়ে চারপাশের বেজিগুলোকে দেখি। মনে হয় এগুলো এখন নিজেদের মাঝে কথা বলছে। মনে হচ্ছে বেজিগুলোর নিজস্ব কোনো ভাষা আছে। শুধু-যে ভাষা আঝে তা নয় - মনে হয় সামনের পা দুটোকে হাত হিসেবে ব্যাবহার করার চেষ্টা করে। আজকাল আমাকে খুব সাবধান থাকতে হয়, মনে হয় বেজিগুলো ঘরের ছিটকিনি খুলে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে।”
“যে-জিনিসটি এখনো বেজিগুলো শিখেনি সেটা হচ্ছে আগুনের ব্যবহার। তাহলে কি এই আগুন দিয়েই কোনোভাবে এদের ধ্বংস করতে হবে? আমি জানি না। আমার কী হবে আমি জানি না। আমি যে ভুল করেছি সেজন্যে ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করুন।”
নিয়াজ ডায়েরিটা বন্ধ করে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ডায়েরিটা এখানেই শেষ।”
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। মোমবাতির আলোটি স্থির হয়ে ছিল, মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে, দেয়ালে তাদের বড় ছায়া পড়েছে। শ্রাবণী কাঁপা গলায় বলল, “এখন কী হবে?”
“মাজেদ খানের একটা বন্দুক ছিল, সে পুরো ব্যাপারটা জানত তারপরও নিজেকে বাঁচাতে পারে নাই। আমরা কেমন করে বাঁচব?”
নিয়াজ সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের কোনো আশা নেই।”
“সব আমার দোষ।” জয়ন্ত মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি যদি তোদের জোর করে নিয়ে না আসতাম—”
“ওসব বলে লাভ নেই।” শ্রাবণী মাথা নেড়ে বলল, “এখন কী করা যায় সেটা বল।”
“এমন কী হতে পারে যে আমরা শুধু শুধু ভয় পাচ্ছি?”
“মানে?”
“এই-যে বুদ্ধিমান বেজির ব্যাপারট— আসলে এটা খানিকটা বাড়বাড়ি। আসলে সেরকম কিছু নেই। একটা বেজি আর কত বিপজ্জনক হবে? এইটুকু একটা জন্তু—”
নিয়াজ এবং শ্রাবণী নিশব্দে জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। জয়ন্ত বলল, “আগেই কেন ভয়ে কাবু হয়ে থাকব? ব্যাপারটা দেখা যাক। এই ডায়েরিটা পাঁচ বছর আগের লেখা, পাঁচবছরে কত কী হতে পারে।”
“উল্টোটাও হতে পারে।” নিয়াজ বলল, “পাঁচবছর আগে এটা যত ভয়ঙ্কর ছিল এখন হয়তো আরো অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে।”
“হ্যাঁ। উল্টোটাও হতে পারে— কিন্তু আগেই সেটা ধরে নেব কেন? এই-যে আমরা তিনজন হেঁটে হেঁটে এসেছি, আমাদের কিছু হয়েছে? সত্যিই যদি ভয়ঙ্কর বেজি আক্রমণ করে মানুষকে মেরে ফেলতে পারত তাহলে আমাদের মারল না কেন?”
“তা ঠিক।” নিয়াজ মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে তুই কী করতে চাস?”
“প্রথমে এখান থেকে বের হয়ে বাসাটা দেখি। কী হচ্ছে না হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করি। এখন মনে হচ্ছে জব্বার মিয়ার বন্দুকটা নিয়ে এলে খারাপ হত না।”
“মাজেদ খানের একটা বন্দুক ছিল, সেটা খুঁজে দেখলে হয়।”
শ্রাবণী ভুরু কুঁচকে বলল, “তুই কখনো বন্দুক দিয়ে গুলি করেছিস?”
“না। কিন্তু সেটা আর কত কঠিন হবে?”
“একটা নাকি ধাক্কা লাগে, বেকায়দা ধাক্কা লেগে নাকি মানুষ উল্টে পড়ে।”
“ধুর। বাজে কথা। পুঁচকে পুঁচকে সন্ত্রাসীরা বন্দুক দিয়ে কাটা রাইফেল দিয়ে গুলি করছে না?”
“তুই তো আর সন্ত্রাসী না। সন্ত্রাসী হলে তো আর চিন্তা ছিল না।”
“যাই হোক,” নিয়াজ বলল, “এখন আর সেটা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। আমাদের কাছে বন্দুক নাই, আছে বাঁশের লাঠি, সেটা হাতে নিয়ে বের হতে হবে।”
“হ্যাঁ।” জয়ন্ত লাঠিটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সাবধানে দরজা খুলে তারা ল্যাবরেটরি-ঘর থেকে বের হয়। একটা ছোট করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে। পাশাপাশি কয়েকটা ঘর, একটা সম্ভবত স্টোর রুম, একটা লাইব্রেরি, আরেকটা ছোট বিশ্রাম করার ঘর। করিডোরের একপাশে দরজা, দরজা খুলে সম্ভবত বারান্দায় যাওয়া যায়। দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে জয়ন্ত দরজা খুলে বের হয়ে এল। ভেতরে অন্ধকার থেকে হঠাৎ প্রখর আলোতে এসে তাদের সবার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। মোমবাতিগুলো ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে তারা বারান্দার রেলিঙের কাছে এগিয়ে যায়, ভালো করে দেখার জন্যে তাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। উজ্জ্বল আলোতে চোখ সয়ে যাবার পর তারা আবিষ্কার করল এই বারান্দাটি থেকে একপাশে সমুদ্রের চমৎকার একটি দৃশ্য দেখা যায়, অন্যপাশে দ্বীপের গাছগাছালি। তাদের মনের ভেতরে বেজি নিয়ে ভয়ঙ্কর দুর্ভাবনাটি না থাকলে নিঃসন্দেহে এখানে দাঁড়িয়ে তারা দৃশ্যটি উপভোগ করত। তারপরও তারা সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। শ্রাবণী হেঁটে বারান্দার অন্যপাশে এসে বনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বড় বড় গাছ, গাছের নিচে ঝোপঝাড়। গাছপালা ঝোপঝাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শ্রাবণী একধরনের অস্বস্তি বোধ করে, অস্বস্তিটি ঠিক কেন বোধ করছে সে ধরতে পারে না - তার শুধু মনে হয় ওখানে কিছু-একটা জিনিস ঠিক নেই। শ্রাবণী রেলিঙে ঝুঁকে পড়ে আরো তীক্ষ্ণচোখে তাকাল, হঠাৎ করে মনে হল গাছের নিচে ঝোপের আড়ালে কিছু একটা যেন নড়ে উঠেছে। শ্রাবণী তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে হঠাৎ ভয়ানকভাবে চমকে উঠে। বাসাটি ঘিরে গাছপালাগুলোর নিচে যতদূর চোখ যায় অসংখ্য বেজি নিশ্চল হয়ে বসে আছে। এতদূর থেকে বোঝা যায় না কিন্তু তাদের ছোট ছোট কুতকুতে চোখ তাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে নিবদ্ধ হয়ে আছে। শ্রাবণী আতঙ্কে একটা আর্ত চিৎকার করে উঠল এবং সেই চিৎকার শুনে নিশ্চল বেজিগুলো একসাথে পেছনের দুই পায়ের ওপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
জয়ন্ত কাঁপা গলায় বলল, “কী হয়েছে?”
শ্রবণী হাত তুলে দেখাল, “ঐ দেখ।”
জয়ন্ত এবং নিয়াজ তাকিয়ে দেখে বাসাটি ঘিরে কয়েক হাজার বেজি পেছনের পায়ের ওপর ভর দিয়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে স্থিরচোখে তাদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে আছে।
(চলবে)
