প্রথম পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#কেপলার টুটুবি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
ছেলেটির চুল সোনালি রঙের, চোখ দুটো আকাশের মতো নীল। চেহারায় কোথায় জানি এক ধরনের বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে। মেয়েটির মাথা ভরা লালচে চুল, চোখ দুটি মেঘের মতো কালো। চেহারার মাঝে এক ধরনের উচ্ছল সজীবতা। ছেলেটি মেয়েটির একটি হাত স্পর্শ করে নরম গলায় বলল, আমি তোমাকে আজ একটি কথা বলতে চাই।
মেয়েটি খিল খিল করে হাসল, বলল, জানি। তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, আমিও তোমাকে আজ একটা কথা বলতে চাই।
ছেলেটার চোখে মুখে বিস্ময়ের একটা সূক্ষ্ম ছাপ পড়ল, বলল, তুমিও আমাকে একটা কথা বলবে?
হ্যাঁ।
তাহলে বল। মেয়েটি রহস্যের মতো ভান করে বলল, তুমি আগে বল।
ছেলেটি কয়েক মুহূর্ত মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, তুমি তো সবই জান। আমি খুব নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। খুবই একাকী একজন মানুষ। আমি যন্ত্রের মতো কাজ করে যেতাম–কেন করতাম নিজেই জানতাম না। তোমার সাথে পরিচয় হবার আগে আমার জীবনটা ছিল একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন, সাদামাটা। মাঝে মাঝে আমার মনে হতো জীবনটা বুঝি পুরোপুরি অর্থহীন। তোমার সাথে পরিচয় হবার পর হঠাৎ করে সবকিছু অন্যরকম হয়ে। উঠল। মনে হতে লাগল আমি যেন জীবনটার একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছি।
মেয়েটি মাথা নাড়ল, হাসি হাসি মুখে বলল, আমি জানি।
তুমি এতো চমৎকার একটি মেয়ে, তোমার মাঝে এতো বিশাল প্রাণশক্তি, তুমি এতো চঞ্চল হাসিখুশি, শুধু তাই নয়, তুমি বুদ্ধিমান, প্রতিভাবান, সফল, তোমার সাথে আমার মতো একজন মানুষের সম্পর্ক হবার কথা ছিল না। কিন্তু তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দাও নি তুমি আমার জীবনটাকে পরিপূর্ণ করেছ। আমি সেজন্যে তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
মেয়েটি কোনো কথা বলল না, হাসি হাসি মুখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটি এবারে মেয়েটার হাতটা নিজের কাছে টেনে এনে বলল, তুমি জান আমাদের চারপাশের জগণ্টা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে। তুমি জান এই পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠছে। প্রতিদিন শুনছি আমাদের চারপাশে আছে ভয়ংকর রবোমানব, তারা নাকি খুব ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করছে। তারা নাকি আমাদের মাঝে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। যখন তারা আমাদের মূল নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবে তখন আমরা নাকি হয়ে যাব দ্বিতীয় প্রজাতি। ছেলেটার মুখটা হঠাৎ একটু কঠিন হয়ে ওঠে, সে চাপা গলায় বলে, আমি কিন্তু সেটা বিশ্বাস করি না।
মেয়েটা এবারেও কোনো কথা বলল না, স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল! ছেলেটা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মানব সভ্যতা ছেলেখেলা না। মানুষের জন্যে মানুষের ভালোবাসা দিয়ে হাজার হাজার বছরে এটা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। আর কিছু রোবট মানুষের চেহারা নিয়ে মানুষের মাঝে ঢুকে মানুষকে পরাজিত করে তাদের সভ্যতা দখল করে নেবে? অসম্ভব!
মেয়েটি নিষ্পলক চোখে ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তাকে দেখে মনে হয় ছেলেটার কথাগুলো যেন সে বুঝতে পারছে না, কিংবা বুঝতে পারলেও বিশ্বাস করতে পারছে না। ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি অত্যন্ত গোপন একটা প্রজেক্টে কাজ করি। কী নিয়ে কাজ করি আমি সেটা তোমাকে বলতে পারব না, বলার অনুমতি নেই। যদি অনুমতি থাকত তাহলে আমি তোমাকে বলতে পারতাম, তুমি তাহলে বুঝতে পারতে আমরা কতোদূর এগিয়ে আছি। রবোমানবদের খুঁজে বের করার জন্যে আমাদের আর জটিল লোবোগ্রাফি করতে হবে না, আমি যে পদ্ধতিটা নিয়ে কাজ করছি সেটা ব্যবহার করে আমরা খুব সহজে রবোমানবদের বের করে ফেলতে পারব। এর মাঝে সেটা ব্যবহার শুরু হয়েছে, খুব চমৎকার ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমার মতো আরো অনেকে কাজ করছে, দেখবে আমাদের মানুষদের হারানো খুব কঠিন।
মেয়েটির মুখে এবারে মৃদু একটু হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটি একটু অধৈর্য হয়ে বলল, তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছ না। তাই না?
মেয়েটি মাথা নাড়ল, বলল, করছি।
আমার যদি অনুমতি থাকত তাহলে আমি তোমাকে আমার প্রজেক্টের কথা খুলে বলতাম।
তোমাকে বলতে হবে না, আমি জানি।
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল, তুমি জান?
হ্যাঁ।
কীভাবে জান?
মেয়েটি নরম গলায় বলল, আমি আসলে একজন রবোমানব। আমার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তোমার কাছ থেকে এই প্রজেক্টের তথ্যগুলো বের করার।
ছেলেটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে দেখে মনে হয় সে কিছু বুঝতে পারছে না। মেয়েটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমি তোমাকে আজকে এই কথাটা বলব ঠিক করে রেখেছিলাম।
ছেলেটি নিস্পলক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব ধীরে ধীরে তার চেহারা থেকে অবিশ্বাসের ছাপটুকু সরে যায়, সেখানে এক ধরনের অবর্ণনীয় আতংকের ছাপ পড়ে। তারপর আতংকের ছাপটুকু সরে সেখানে একটি গভীর বিষাদের ছাপ পড়তে শুরু করে। ছেলেটি খুব ধীরে ধীরে, শোনা যায় না এরকম গলায় বলল, তুমি একজন রবোমানব?
হ্যাঁ।
সত্যিকারের রবোমানব?
হ্যাঁ সত্যিকারের রবোমানব।
আমাদের এতোদিনের যে সম্পর্ক সেগুলো সব মিথ্যা?
মেয়েটি খিল খিল করে হাসল, বলল, মিথ্যা কেন হবে? সব সত্যি। আগে যা কিছু ঘটেছে সেগুলোও সত্যি। এখন যেটা ঘটবে সেটাও সত্যি।
এখন কী ঘটবে? প্রশ্নটা করতে গিয়ে ছেলেটার গলার স্বর একটু কেঁপে উঠল।
মেয়েটি একটু হাসল, বলল, আমি তোমার মাথার খুলিটা কেটে তোমার মস্তিষ্কটা বের করে নেব। আমার ব্যাগে একটা ক্রায়োজেনিক প্যাকেট আছে, সেটাতে করে নিয়ে যাব। তোমার মস্তিষ্কটা নষ্ট হবে না, তার সাথে আমরা একটা ইন্টারফেস তৈরি করব, তারপর আমরা সেখান থেকে তোমার সব তথ্য বের করে নেব।
ছেলেটি হতবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল, কাঁপা গলায় বলল, তুমি এরকম একটা কাজ করতে পারবে?
কেন পারব না? এটা আমার জন্যে খুব সহজ একটা কাজ। তুমি জান আমরা মানুষ না আমরা হচ্ছি রবোমানব। মানুষের যে দুর্বলতাগুলো আছে সেগুলো সরানোর জন্যে আমাদের জন্ম হয়েছে। আমাদের মাঝে অপ্রয়োজনীয় কোনো অনুভূতি নেই। আমাদের মাঝে ভালোবাসা নেই, মমতা নেই, অপরাধবোধ নেই, দুঃখবোধ নেই। তুমি যেভাবে একটা গণিতের সমস্যার সমাধান কর আমি ঠিক সেভাবে তোমার খুলি কেটে তোমার মস্তিষ্ক বের করে নিই।
কথা শেষ করে মেয়েটি ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল। ছেলেটি অবাক হয়ে আবিষ্কার করল সেই হাসিটি একজন মমতাময়ী মানবীর মতো নরম এবং কোমল।
কয়েক ঘণ্টা পর নিরাপত্তাবাহিনীর দুইজন মানুষ ছেলেটির মৃতদেহটি সমুদ্রের বালুবেলায় একটি ঝাউগাছের নিচে আবিষ্কার করে। একজন নিচু হয়ে মৃতদেহটি পরীক্ষা করে বলল, মাথার খুলি কেটে মস্তিষ্কটি নিয়ে গেছে।
অন্যজন বলল, নিখুঁত কাজ। এক ফোটা রক্তও পড়ে নি।
প্রথমজন বলল, মৃতদেহটি কীরকম বিবর্ণ দেখেছ? শরীরের সব রক্ত বের করে নিয়েছে।
অন্যজন কোনো কথা বলল না। তারা জানে রবোমানবের দেহটি জৈবিক। সেটাকে রক্ষা করতে তাদেরকে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হয়। রবোমানবেরা জানে মানুষের রক্ত খুব ভালো প্রোটিন।
বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুল তার জন্যে আলাদা করে রাখা উঁচু চেয়ারটিতে বসার পর আকাদেমীর অন্য দশজন সদস্য তাদের চেয়ারে বসল। কালো গ্রানাইটের গোল টেবিলটা ঘিরে চেয়ারগুলো রাখা, টেবিলটা খুব বড় নয়; যেন সবাই সবাইকে কাছে থেকে দেখতে পায় আর কোনোরকম মাইক্রোফোন ছাড়াই তারা যেন খালি গলায় কথা বলতে পারে। ঘরটির দেয়াল ধবধবে সাদা, ছাদটা অনেক উঁচু, সেখান থেকে হালকা নরম একটা আলো ছড়িয়ে পড়ছে। বশাল একটা হলঘরের মাঝখানে গ্রানাইটের কালো টেবিল আর কয়টি চেয়ার, এ ছাড়া আর কোনো আসবাবপত্র নেই।
ঘরের একমাত্র দরজাটি নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত মহামান্য থুল অপেক্ষা করলেন, তারপর আকাদেমীর সকল সদস্যদের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, আমি প্রথমেই তোমাদের সবার কাছে ক্ষমা চাইছি।
কম বয়সী গণিতবিদ শ্রুম বলল, তার কোনো প্রয়োজন নেই মহামান্য থুল।
তাকে বাধা দিয়ে মহামান্য থুল বললেন, আছে। এই ঘরের আমরা এগারোজন হচ্ছি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এগারোজন মানুষ। পৃথিবীর মানুষ এই টেবিলকে ঘিরে বসে থাকা এই এগারোজনকে পৃথিবী পরিচালনার দায়িত্ব দয়েছে। আমাদের পরস্পরকে বিশ্বাস করতে হবে। আমরা যদি একজন আরেকজনকে বিশ্বাস না করি তাহলে এই আকাদেমী একটা অর্থহীন জটলায় পরিণত হবে। আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছি যে আমি তোমাদের অবিশ্বাস করেছি। আমি তোমাদের সবার লোবোগ্রাফ করিয়ে এই ঘরে ঢুকতে দিয়েছি।
পদার্থবিদ ক্রন বলল, আমরা বুঝতে পারছি মহামান্য থুল। আপনার জায়গায় আমাদের কেউ থাকলেও সেও এই সময়ে ঠিক এই কাজটি করত। পৃথিবীর এখন অনেক বড় দুঃসময়।
মহামান্য থুল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি জানি তোমরা আমার শংকাটুকু বুঝতে পারবে। তারপরেও আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে আমি তোমাদের জানাতে চাই আমি নিজেও নিজের লোবোগ্রাফি করে এই ঘরে ঢুকেছি। মহামান্য থুল হাতের স্বচ্ছ কাগজটি টেবিলে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটি আমার রিপোর্ট। আমি দেখেছি, তোমরাও দেখতে পার। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এই ঘরে যারা আছে তারা সবাই মানুষ। আমিও মানুষ। এখানে কোনো রবোমানব নেই।
জীববিজ্ঞানী ত্রানা বলল, আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করছি মহামান্য থুল।
না। মহামান্য থুল মাথা নেড়ে বললেন, আমি তোমাদের সবার রিপোর্ট দেখেছি। তোমাদেরও আমার রিপোর্টটি দেখতে হবে। আমরা সভা শুরু করার আগে সবাই নিশ্চিত হতে চাই যে এই চার দেওয়ালের ভেতর কোনো রবোমানব নেই। সবাই নিশ্চিত হতে চাই যে আমরা সবাই মানুষ।
বিজ্ঞান আকাদেমীর দশজন সদস্যের কেউ হাত বাড়িয়ে রিপোর্টটি নিতে রাজি হল না। সমাজবিজ্ঞানী লিহা বলল, মহামান্য থুল, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আমাদের কারো পক্ষে সেটি করা সম্ভব নয়। আপনার লোবোগ্রাফি রিপোর্ট দেখে আপনার মনুষত্ব যাচাই করার মতো ধৃষ্ঠতা দেখানোর দুঃসাহস এই
পৃথিবীতে কারো নেই।
মহামান্য থুলের মুখে এক ধরনের কাঠিন্য ফুটে উঠল, সেটি তার চরিত্রের সাথে পুরোপুরি বেমানান। তিনি কঠিন গলায় বললেন, তাহলে আমার উপর আরোপিত ক্ষমতাবলে আমি আদেশ করছি, লিহা, তুমি লোবোগ্রাফি রিপোর্টটি দেখে আমাদের সকল সদস্যদের সেটি জানাও।
লিহা অত্যন্ত কুণ্ঠার সাথে রিপোর্টটি হাতে নিয়ে সেটি খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ে মাথা তুলে বলল, এই রিপোর্টে মহামান্য থুলের জিনেটিক কোডিং নির্দিষ্ট করা আছে, এখানে লেখা আছে রবোমানবের বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনোটিই তার শরীরে পাওয়া যায় নি। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে একজন মানুষ।
মহামান্য থুলের মুখ থেকে কাঠিন্যটুকু সরে গিয়ে সেখানে তার পরিচিত হাসিটুকু ফুটে উঠল। তিনি সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে বললেন, চমৎকার! এখন আমরা সবাই নিশ্চিতভাবে জানি এখানে আমরা সবাই মানুষ। আমরা এখন মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারব।
মহামান্য থুল গ্রানাইটের মসৃণ টেবিলটার উপর অন্যমনস্কভাবে টোকা দিতে দিতে বললেন, তোমরা সবাই জান আমি কেন তোমাদের ডেকে এনেছি। এখানে আমরা যে কথা বলব পৃথিবীর কেউ সে কথাগুলো জানবে না। এগুলো রেকর্ড করা হবে না তাই ভবিষ্যতেও কেউ কখনো জানতে পারবে না। আমি এই সিদ্ধান্তগুলো কেন নিয়েছি সেটা তোমরা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছ?
কেউ কোনো কথা বলল না, কয়েকজন শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। মহামান্য থুল বললেন, তোমরা সবাই জান রবোমানব প্রজেক্টটি আমাদের অনুমতি ছাড়া শুরু করা হয়েছিল। মানুষের মনুষত্ববোধ থাকবে না কিন্তু মানুষের বুদ্ধিমত্তা থাকবে এরকম রবোট তৈরি করার অনুমতি পৃথিবীর নির্বোধতম মানুষটিও দেবে না। আর সেগুলোকে মানুষের রূপ দিয়ে এন্ড্রয়েড তৈরি করতে দেয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সেটাই ঘটেছে। যখন আমাদের শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেটা ধরতে পেরেছে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিছু শহরের কিছু কাউন্সিলার তার জন্যে দায়ী। তারা তাদের শহরে গোপন এন্ড্রয়েড শিল্প গড়ে উঠতে দিয়েছে। কারা দায়ী, কীভাবে সেটা গড়ে উঠতে পেরেছে সেটা নিয়ে আলোচনা করা এখন একটি একাডেমিক ব্যাপার। আমি সেটা নিয়ে আলোচনা করার জন্যে তোমাদের ডাকি নি। আমি ডেকেছি অন্য কারণে। আমি সেটি বলার আগে আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বিজ্ঞানী জুহুকে বর্তমান পরিস্থিতিটি ব্যাখ্যা করতে বলব।
তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বিজ্ঞানী জুহু মাথা নিচু করে বলল, আমি এই আকাদেমীর কাছে ক্ষমা চাইছি, আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি নি।
মহামান্য থুল বললেন, আমি তোমাকে আত্মবিশ্লেষণ করতে বলি নি। তোমাকে আমি শুধুমাত্র বর্তমান পরিস্থিতির উপর একটা রিপোর্ট দিতে বলেছি।
তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বিজ্ঞানী জুহু একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যখন আমরা ভেবেছিলাম আমরা অবস্থাটি আয়ত্তের মাঝে আনতে যাচ্ছি ঠিক তখন আমরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যাচ্ছি। রবোমানবেরা এখন সংঘবদ্ধ শক্তি, তারা নিজেরা নিজেদের তৈরি করছে। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন একসময় কিছু মানুষ ওদের তৈরি করেছিল। জৈবিক মানুষ ব্যবহার করে তাদের তৈরি করা হয় মস্তিষ্ক থেকে মানবিক অনুভূতিগুলো সরিয়ে নিয়ে সেখানে নিউরনগুলোকে নতুন করে পুনর্বিন্যাস করা হয়–সেজন্যে আমাদের স্বীকার করতেই হবে তাদের বুদ্ধিমত্তা মানুষ থেকে বেশি। যেহেতু তাদের কোনো মানবিক অনুভূতি নেই তাই তারা হচ্ছে ভয়ংকর একরোখা-তারা যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ করতেও তাদের এতোটুকু দ্বিধা হয় না।
জুহু একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, পৃথিবী থেকে অপরাধ ধীরে ধীরে ওঠে যাচ্ছে। একসময় মানুষ যে কারণে অপরাধ করত এখন সেই কারণগুলোর বেশিরভাগই নেই, তাই অপরাধ করার প্রয়োজনও হয় না। তারপরেও ছোটখাট কিংবা বড়সড়ো অপরাধ যখন কেউ করে আমাদের নিরাপত্তাবাহিনী তাদের ধরতে পারে। আমাদের নেটওয়ার্ক পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক, সবার সুনির্দিষ্ট তথ্য সেখানে আছে, কেউ এর বাইরে কখনো যেতে পারে না।
জুহু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, হঠাৎ করে তাকে কেমন জানি হতাশাগ্রস্থ এবং ক্লান্ত মনে হয়। অনেকটা অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, এই পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্কটিই হয়েছে আমাদের সর্বনাশ। আমরা এই নেটওয়ার্কের ওপর খুব বেশি নির্ভর করি। রোমানবেরা এই নেটওয়ার্কের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে, নেটওয়ার্কের তথ্য পরিবর্তন করে তাদের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারা সর্বশেষ কী করার চেষ্টা করছে শুনলে আপনারা হতবাক হয়ে যাবেন।
পদার্থবিদ ক্রন একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, কী করার চেষ্টা করছে?
তারা ডাটাবেসের তথ্য এমনভাবে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে যে লোবোগ্রাফি করে আমরা যখন একজন রবোমানবকে আলাদা করি, নেটওয়ার্ক তখন যেন তার আসল তথ্য লুকিয়ে তার সম্পর্কে বানানো তথ্য দেয়। তারা যদি সেটা করতে পারে আমরা তখন কোনোভাবে তাদের খুঁজে পাব না। তারা আমাদের মাঝে লুকিয়ে থেকে একদিন আমাদের পরাজিত করে পুরো পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। এই পৃথিবীতে মানুষ থাকবে না, থাকবে শুধু রবোমানব।
জীববিজ্ঞানী ত্রানা বলল, সমস্যাটা কী তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। প্রাচীনকালে রবোট তৈরি হতো যন্ত্রপাতি দিয়ে! লোহালক্কর, ফটোটিউব, ভালব, ইলেকট্রনিক, ফটোট্রনিক সার্কিট দিয়ে। তাদের খুঁজে বের করতে হত নাএমনিতেই তারা মানুষ থেকে আলাদা হয়ে থাকত! এই রবোমানবেরা সেরকম নয়। তারা পুরোপুরি মানুষ, শুধুমাত্র তাদের মস্তিষ্কটা নতুনভাবে ম্যাপিং করেছে। নিউরনগুলোকে ওভারড্রাইভ করার জন্যে মস্তিষ্কের একেবারে ভেতরে, যেটাকে থ্যালামাস বলে সেখানে একটা অত্যন্ত ছোট, চোখে দেখা যায় না এতো ছোট মাইক্রোস্কোপিক ইমপ্লান্ট বসানো হয়। সেটা কিছুক্ষণ পরপর নিউরনগুলোকে বাড়তি স্টিমুলেশান দেয়। শুধু যে স্টিমুলেশান দেয় তা নয় সেটা দিয়ে ম্যাপিং পরিবর্তন করে ফেলতে পারে, একটি রবোমানবকে ভিন্ন রবোমানবে পাল্টে দিতে পারে, নতুন তথ্য ঢুকিয়ে দিতে পারে। এদের প্রোগ্রাম করা যায় কিন্তু এরা পুরোপুরি জৈব মানুষ। সেজন্যে এদের কোনোভাবে ধরা যায় না।
মহামান্য থুল বললেন, আমি তোমাদের আরো মন খারাপ করা খবর দিই। রবোমানব খুঁজে বের করার অসাধারণ একটা পদ্ধতি একটা কমবয়সী ছেলে বের করেছিল, রবোমানবেরা তার মস্তিষ্ক কেটে নিয়ে গেছে। শুধু যে মস্তিষ্ক কেটে গিয়েছে তা নয়, রবোমানবেরা তার মস্তিষ্ক থেকে সব তথ্য বের করে এখন আমাদের থেকে এগিয়ে গেছে। আর কয়েকদিনের ভেতর সব জায়গায় রবোমানবেরা ঢুকে যাবে।
বিজ্ঞান আকাদেমীর সদস্যরা চুপ করে বসে রইল। একটু পর গণিতবিদ শ্রুম বলল, আমাদের কী কিছুই করার নেই?
আছে। অনেক কিছু করার আছে। আমরা তার চেষ্টা করছি।
জুহু বলল, কিন্তু নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমরা কয়েকদিনের মাঝে নেটওয়ার্কটি হারাব। আমি খুব দুঃখিত আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি, মানুষের এতো বড় বিপর্যয়ের জন্যে আমি দায়ী-
মহামান্য থুল হাত তুলে তাকে থামালেন, তুমি কেন মিছিমিছি নিজের উপর দোষ চাপিয়ে দিচ্ছ। এখানে তোমার কিছু করার ছিল না।
কিন্তু এই দায়িত্বটি ছিল আমার।
তোমার একার নয়, আমাদের সবার। মহামান্য থুল সবার দিকে একবার তাকালেন তারপর বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এবারে আমি তোমাদের বলি আমি কেন তোমাদের ডেকে এনেছি।
সবাই তাদের চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। মহামান্য থুল তার হাতের নখগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করতে করতে বললেন, আমরা সত্যের মুখোমুখি হই। পৃথিবীর মানুষ প্রথমবার সত্যিকারের একটা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। রবোমানবেরা আমাদের সভ্যতা ধ্বংস করার পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। প্রাচীনকালে এক দেশের মানুষেরা অন্য দেশ দখল করে সেই দেশের মানুষদের হত্যা করে নিশ্চিহ্ন করে দিত। এই রবোমানবদের কাছ থেকে আমরা ঠিক সেরকম একটা বিপদ আশংকা করছি। যদি কোনোভাবে তারা নেটওয়ার্ক দখল করতে পারে তাহলে তারা পৃথিবীর মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে। আমরা কোনোভাবে সেটা হতে দিতে পারি না। যে কোনো মূল্যে কিছু মানুষ হলেও আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
জীববিজ্ঞানী ত্রানা বলল, আপনি ঠিক কী বলছেন আমরা বুঝতে পারছিনা মহামান্য থুল।
আমি একটি মহাকাশযান প্রস্তুত করেছি। সেই মহাকাশযানে করে আমরা পৃথিবীর কিছু মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়ে দিতে চাই। দূরবর্তী কোনো নক্ষত্রের কোনো গ্রহে তারা নতুন করে মানুষের বসতি স্থাপন করবে। ছয়শত মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে কেপলার টুটুবি গ্রহটি আছে। অন্য কিছু খুঁজে না পেলেও অন্তত এই গ্রহটিতে থাকতে পারবে। পৃথিবী থেকে মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তারা বেঁচে থাকবে। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও না কোথাও মানুষের বংশধরেরা বেঁচে থাকবে। মানুষের সভ্যতা বেঁচে থাকবে।
বিজ্ঞান আকাদেমীর দশজন সদস্য চুপ করে বসে রইল, কেউ একটি কথাও বলল না। মহামান্য থুল বলল, তোমরা চুপ করে বসে আছ কেন? কিছু একটা বল।
পদার্থবিজ্ঞানী ক্রন বলল, আমাদের কিছু বলার নেই মহামান্য থুল। মানব সভ্যতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের আর কিছু করার নেই।
মহামান্য থুল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কিছু করার নেই সেটি সত্যি নয় ক্রন। আমাদের অনেক কিছু করার আছে এবং আমরা একেবারে শেষ পর্যন্ত তার চেষ্টা করব, কিন্তু আমি কোনো ঝুঁকি নেব না। মানুষ হয়ে আমি রবোমানবের পদানত হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। যদি বেঁচে থাকতেও হয় আমি জানব অল্প কিছু মানুষ সত্যিকারের মানুষ হয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। রবোমানবের হাতে যদি আমার মৃত্যু হয় আমি শান্তি নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারব।
সমাজবিজ্ঞানী লিহা বলল, মহামান্য থুল, মহাকাশযানে কারা যাবে, সাথে কী থাকবে, কোথায় যাবে, নিরাপত্তার জন্যে কী করা হবে এই সব খুঁটিনাটি কী ঠিক করা হয়েছে?
মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, না করা হয় নি। গোপনীয়তার জন্যে আমি কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছি, কিন্তু খুঁটিনাটি কিছুই করা হয় নি। আমি তোমাদের ডেকেছি এই পরিকল্পনাটা পূর্ণাঙ্গ করার জন্যে।
বিজ্ঞান আকাদেমীর সবচেয়ে কমবয়সী সদস্য পরিবেশবিজ্ঞানী কিহি বলল, সময় নষ্ট না করে আমরা তাহলে কাজ শুরু করে দিই।
হ্যাঁ। মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, কাজ শুরু করে দাও।
তোমার নাম কী?
টুরান।
টুরান, তুমি মাত্র বাইশ বছরের একজন যুবক। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবনে ঝাঁপ দিতে চাও? তুমি কোথায় বসতি স্থাপন করবে কিংবা আদৌ কোথাও বসতি স্থাপন করতে পারবে কী না সেটি কেউ জানে না।
তুমি কেন এই প্রশ্ন করছ?
টুরান, এখানে প্রশ্ন করব আমি, তুমি উত্তর দেবে। তুমি প্রশ্ন করতে পারবে। বল, তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইছ?
তুমি যে উত্তর শুনলে খুশি হবে সেটি দেব নাকি সত্যি উত্তর দেব? (হাসি) প্রথমে আমাকে খুশি করার জন্যে উত্তরটি দাও।
খুব শৈশব থেকে আমার মহাকাশ নিয়ে কৌতূহল। জন্মের পর থেকে আমার স্বপ্ন ছিল মহাকাশচারী হওয়ার। আমি সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। আমি নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে ঘুরে বেড়াতে চাই। আমি অজানাকে জানতে চাই।
চমৎকার টুরান। এবারে সত্যি কারণটি বল।
এই পৃথিবী নিয়ে আমার ঘেন্না ধরে গেছে। আমি এই দূষিত গ্রহ থেকে পালাতে চাই।
কেন?
আমার সম্পর্কে সব তথ্য তোমার কাছে আছে। তুমি জান।
টুরান। তোমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বল, কেন?
তোমরা নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে সব তথ্য জান। কেন আমার কাছে আবার জানতে চাইছ?
আমি তোমাকে বলেছি তুমি প্রশ্ন দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। বল। কেন?
আমার ভালোবাসার মেয়েটি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
একটা মেয়ের জন্যে তুমি আস্ত পৃথিবীটাকে পরিত্যাগ করতে চাইছ।
হ্যাঁ।
তোমার নাম কী মেয়ে?
ইহিতা।
সুন্দর, একটি নাম। ইহিতা।
তুমিও খুব ভালো করে জান আমিও খুব ভালো করে জানি এটি মোটেও সুন্দর একটি নাম নয়। কাজেই কাজের কথায় চলে আসি।
ঠিক আছে ইহিতা। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের একটা অনিশ্চিত যাত্রায় যেতে চাইছ?
এটি মোটেও অনিশ্চিত যাত্রা নয়। পৃথিবী থেকে যখন একটা মহাকাশযান মহাকাশে পাড়ি দেয় সেটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট যাত্রা। এর প্রতিটি মুহূর্ত অসংখ্যবার সঠিকভাবে যাচাই করে দেখা হয়।
সেটি সত্যি ইহিতা। কিন্তু তুমি জান এর গন্তব্য অনিশ্চিত। এটি যেখানে যাবে সেখানে পৃথিবীর মানুষ আগে কখনো যায় নি।
বলতে পার সেটি আমার মূল আকর্ষণ।
কেন?
গত কিছুদিনে আমার জীবনের খুব কষ্টের সময় গিয়েছে। আমি সেগুলো ভুলে থাকতে চাই কিন্তু ভুলে থাকতে পারি না। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশে গেলে হয়তো ভুলে থাকতে পারব।
স্মৃতি ভুলে থাকা কোনো কঠিন কিছু নয়। নিউরন থেকে স্মৃতি মুছে দিলেই হয়।
আমি মানুষ। আমি রবোমানব নই যে নিউরনের স্মৃতি পুনর্বিন্যাস করব। তুমি কষ্ট করবে?
মানুষ হলেই কষ্ট পেতে হয়। কষ্ট করতে হয়। চেষ্টা করতে হয় কষ্টকে ভুলে থাকতে।
তোমার কষ্টের কথাটা কী বলবে?
আমার ভালোবাসার মানুষটি একটি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমরা বিয়ে করার দিন ঠিক করেছিলাম।
আমি দুঃখিত ইহিতা। শুনে আমি খুব দুঃখ পেলাম।
শুনে তুমি আসলে খুব দুঃখ পাও নি। এটি ভদ্রতার কথা।
তুমি কেন বলছ শুনে আমি দুঃখ পাই নি?
কারণ নেটওয়ার্কে আমার সব তথ্য আছে। তুমি আমার সম্পর্কে সবকিছু জান। তুমি কেন আমার সাথে কথা বলছ আমি সেটাও বুঝতে পারছি না।
এটি নিয়ম। আমাদের প্রত্যেকের সাথে কথা বলতে হয়।
তোমার নাম কী? টর।
টর, তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ?
আমার বয়স চল্লিশ। আমি পৃথিবীর জীবন মোটামুটি দেখেছি। জীবনটা আমার কাছে একঘেয়ে মনে হচ্ছে। আমি নতুন কিছু চাই, নতুন উত্তেজনা চাই।
তোমার পরিরার?
আমার পরিরার নেই। আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেকদিন আগে।
টর, মহাকাশযান যদি তোমার একঘেয়ে মনে হয়?
সে আশংকাটুকু আছে। কিন্তু আমি সেখানেও উত্তেজনা খুঁজে নিতে পারব।
তাহলে পৃথিবীতে উত্তেজনা কেন খুঁজে নিচ্ছ না টর?
চেষ্টা করেছি। আমাকে দেবার মতো উত্তেজনা পৃথিবীতে নেই।
তুমি কি মনে কর পৃথিবী থেকে মহাকাশে অভিযান করার জন্যে যে বিশাল মহাকাশযানটি প্রস্তুত করা হয়েছে সেটি শুধুমাত্র তোমাকে উত্তেজনা দেবার জন্যে?
না। কিন্তু আমি যদি উত্তেজনা পাই ক্ষতি কী?
উত্তেজনার খোঁজে তুমি যদি দায়িত্বহীন হয়ে যাও?
উল্টোটাও তো হতে পারে।
উল্টো কি হতে পারে টর?
মহাকাশযানের ভয়ংকর কোনো বিপর্যয়ে অন্য সবাই যখন পিছিয়ে যাবে তখন ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে আমি এগিয়ে যাব। সবাইকে রক্ষা করব।
তুমি এটা বিশ্বাস কর, টর?
হ্যাঁ, বিশ্বাস করি। আমার ধারণা তুমিও বিশ্বাস কর।
তুমি কেন এ কথা বলছ?
কারণ নেটওয়ার্কে আমার সব তথ্য আছে। তুমি নিশ্চয়ই আমার সবকিছু জান। আমি যেগুলো জানি না তুমি সেগুলোও জান। আমি কী ঠিক বলেছি?
হ্যাঁ তুমি ঠিক বলেছ।
তোমার নাম কী?
নুট।
তোমার বয়স কত?
আঠারো।
তোমার বয়স মাত্র আঠারো। তুমি কেন পৃথিবীর নিরাপদ জীবন ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ?
মহাকাশ নিয়ে আমার একটি আকর্ষণ আছে।
সেটাই কী একমাত্র কারণ?
হ্যাঁ। সেটাই একমাত্র কারণ।
নুট।
বল।
আমি যদি বলি সেটা একমাত্র কারণ না।
(নিরুত্তর)
নুট।
বল।
আমার কথার উত্তর দাও। তুমি নিশ্চয়ই জান আমাদের নেটওয়ার্কে তোমার সব তথ্য আছে? তুমি মাত্র আঠারো বছরের একজন তরুণ। কিন্তু এর মাঝে তুমি তোমার ঘরে ভয়ংকর ভিরবিয়াস ড্রাগ তৈরি করে বিক্রি করার চেষ্টা করেছ। পৃথিবীতে থাকলে তোমাকে দীর্ঘ সময় শুদ্ধকরণ প্রতিষ্ঠানে কাটাতে হবে। সেজন্যে তুমি মহাকাশে পালিয়ে যেতে চাইছ।
(নিরুত্তর)
আমার কথার উত্তর দাও নুট।
(নিরুত্তর)
নুট।
বল। আমার কথার উত্তর দাও।
(নিরুত্তর)
তোমার নাম কী?
আমার নাম নীহা।
নীহা, তোমার বয়স কত?
ষোল।
নীহা।
বল।
নীহা, তুমি মাত্র ষোল বছরের একটি মেয়ে। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইছ?
আমি তোমার প্রশ্নটি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি পৃথিবীতে থাকি আর মহাকাশযানে থাকি আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোনো গ্রহতেই থাকি, এর মাঝে পার্থক্য কী?
কোনো পার্থক্য নেই?
না।
কেন নেই, নীহা?
আমি গণিত ছাড়া আর কোনো কিছু বুঝি না। আমি প্রতিমুহূর্তে আমার মস্তিষ্কে গণিতের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করি। আমি যখন তোমার সাথে কথা বলছি তখন গণিত নিয়ে চিন্তা করতে করতে কথা বলছি। সত্যি কথা বলতে কী আমি রূপাকভ সমীকরণ নিয়ে চিন্তা করছিলাম। এই মাত্র তার একটি সমাধান পেয়ে গেছি।
তোমাকে অভিনন্দন নীহা।
এটি মোটেও অভিনন্দন পাওয়ার মতো কাজ নয়। খুবই সহজ কাজ।
নীহা। তুমি কিন্তু এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর দাও নি। কেন পৃথিবী আর মহাকাশযানে কিংবা অন্য কোনো গ্রহে থাকা একই ব্যাপার?
তার কারণ আমার চারপাশে কী আছে তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমার প্রয়োজন ছোট একটা ডেস্ক, ভাবনা করার জন্য নিরিবিলি একটু জায়গা।
পৃথিবীর কী নিরবিলি জায়গা নেই নীহা?
আছে।
তাহলে কেন মহাকাশযানের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ?
তার কারণ পৃথিবীতে থাকলে আমার চারপাশের সমাজ আমাকে সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করতে বলবে। আমাকে নিরিবিলি বসে থাকতে দিবে না।
মহাকাশযানে তোমাকে নিরিবিলি বসে থাকতে দেবে?
দেবে। সেখানে মানুষের কোনো দায়িত্ব নেই। মহাকাশযান চালানোর জন্যে শক্তিশালী কম্পিউটার থাকে। তাছাড়া–
তাছাড়া কী, নীহা?
মহাকাশযানে ওঠার পর আমাদের শীতল ঘরে দীর্ঘদিনের জন্যে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। আমার এই ব্যাপারটা নিয়ে আগ্রহ আছে।
কী ধরনের আগ্রহ?
তাপমাত্রা কমিয়ে শরীরের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে রাখলেও মস্তিষ্কের কোনো একটি ধাপ সচল থাকে বলে আমার ধারণা। আমি দীর্ঘ যাত্রায় মস্তিষ্কের সেই সচল অংশটুকু ব্যবহার করে দেখতে চাই।
নীহা।
বল।
তুমি কী জান তুমি খুব অদ্ভুত একটি মেয়ে।
(নিরুত্তর)
নীহা।
বল।
তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
এটি আরেকটি কারণ।
কোনটি আরেকটি কারণ নীহা?
জন্মের পর থেকে আমি শুনে আসছি যে আমি অদ্ভুত একটি মেয়ে। তাই আমি এমন একটা জায়গায় যেতে চাই সেখানে পৃথিবীর কেউ নেই। কেউ যেন আমাকে না বলে আমি অদ্ভুত একটি মেয়ে।
নীহা।
বল।
আমার ধারণা বহুদূর কোনো গ্রহেও তোমাকে বলা হবে তুমি অদ্ভুত একটি মেয়ে।
(নিরুত্তর)
তুমি কী তবুও মহাকাশযান করে যেতে চাও?
হ্যাঁ।
যেতে চাই।
তোমার নাম কী?
আমার নাম সুহা।
তোমার সাথে যে শিশুটি আছে তার নাম কী?
ক্লদ।
সে তোমার কী হয়?
ক্লদ আমার ছেলে।
আমি তার মা।
সুহা, তোমার বয়স কতো?
আমার বয়স ছাব্বিশ।
ক্লদের বয়স কত? চার।
তুমি তোমার চার বছরের সন্তানকে নিয়ে মহাকাশযানে করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতে রওনা দিতে চাও?
আমি ব্যাপারটি সেভাবে দেখছি না।
তুমি ব্যাপারটি কীভাবে দেখছ?
আমি মনে করি আমার চার বছরের ছেলেকে নিয়ে এই মহাকাশযানে করে দূর মহাকাশে রওনা দিতে পারলে আমি আমার সন্তানের জীবন নিশ্চিত করতে পারব।।
তুমি কেন এই কথা বলছ?
কারণ আমি জানি রবোমানবেরা পৃথিবী দখল করে নেবে। তখন তারা কোনো মানুষকে রাখবে না। যদিবা রাখে তাদেরকে রবোমানবের আজ্ঞাবহ নিচু শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে থাকতে হবে। আমি আমার সন্তানের জন্যে সেই ধরনের জীবন চাই না। আমি তাকে মানুষের সম্মানিত জীবন দিতে চাই।
তুমি কেন বলছ এই পৃথিবী রবোমানবেরা দখল করে নেবে।
তার কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি তারা প্রায় দখল করে ফেলছে।
তুমি কীভাবে সেটা জান সুহা?
সংবাদ মাধ্যমে আগে রবোমানব খুঁজে পাওয়ার খবর দেয়া হতো। এখন দেয়া হয় না। যার অর্থ রবোমানবদের আর খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে না। কিংবা–
কিংবা কী?
কিংবা শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীতে রবোমানবেরা ঢুকে গেছে যেটি আরো বিপজ্জনক।
তুমি কী মানুষের কর্মদক্ষতাকে বিশ্বাস কর না?
করি। কিন্তু—
কিন্তু কী সুহা?
রবোমানবেরাও এক ধরনের মানুষ। আমাদের যা আছে তাদেরও তার সবকিছু আছে। তাদের একটা বাড়তি জিনিস আছে, সেটা হচ্ছে থ্যালামাসে ইমপ্ল্যান্ট করে দেয়া নিউরন স্টিমুলেটর। সেটা তাদের মস্তিষ্ককে অনেক বেশি দক্ষ করে তুলেছে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি এই রবোমানবেরা খুব তাড়াতাড়ি পৃথিবী দখল করে নেবে। আমি তার আগে পৃথিবী ত্যাগ করতে চাই।
তোমার চার বছরের ছেলে ক্লদ? সেও কী যেতে চায়?
ক্লদকে এখনো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া হয় না।
ক্লদের বাবা?
আমি তার সম্পর্কে কথা বলতে চাই না।
কেন?
কারণ আমি তার সম্পর্কে একটি ভালো কথাও বলতে পারব না। আমি ক্লদের সামনে কিছু বলতে চাই না।
ঠিক আছে। আমি কী ক্লদের সাথে একটু কথা বলতে পারি?
পার।
ক্লদ।
উঁ। তুমি কী জান তুমি কোথায় যাচ্ছ।
জানি।
কোথায়?
আকাশে।
আকাশে কোথায়?
রাত্রিবেলা যে তারাগুলো মিটমিট করে সেখানে।
সেখানে গিয়ে তুমি কী করবে?
আমি তারাগুলো ধরে একটা কাচের বোতলে রাখব। রাত্রিবেলা সেগুলো বোতলের ভেতর মিটমিট করবে।
চমৎকার ক্লদ। তোমাকে আরেকটা জিনিস জিজ্ঞেস করতে পারি?
পার। তুমি তোমার মাকে কতটুকু ভালোবাস?
অনেকটুকু। এই ঘরের সমান। আরো বেশি।
চমৎকার ক্লদ। চমৎকার।
ঘরটি ছোট, ঘরের ছাদ বেশ নিচু, ইচ্ছে করলে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। ঘরটির মাঝে একটি ধাতব টেবিল, টেবিল ঘিরে তেরোজন নারী-পুরুষ বসে আছে। ঘরটির ভেতর নিরানন্দ পরিবেশ কিন্তু ঠিক কেন সেটি নিরানন্দ হঠাৎ করে বোঝা যায় না। ধাতব টেবিলের একপাশে যে বসে আছে তার চেহারায় এক ধরনের কাঠিন্য লুকিয়ে আছে। সে টেবিলে থাবা দিতেই টেবিলের চারপাশে বসে থাকা নারী ও পুরুষগুলো ঘুরে তার দিকে তাকাল। মানুষটি সুনির্দিষ্ট কারো দিকে না তাকিয়ে বলল, বিজ্ঞান আকাদেমী কী নিয়ে তাদের গোপন সভা করেছে সেটা কি জানা গেছে?
কমবয়সী একটা মেয়ে খিলখিল করে হেসে বলল, আমাদের নিয়ে!
অবশ্যি আমাদের নিয়ে? কিন্তু আমাদের কোন বিষয়টা নিয়ে সেটা জানা গেছে?
মাঝবয়সী একজন মানুষ বলল, মোটামুটি অনুমান করতে পারি।
ঠিক আছে অনুমান কর।
মানুষটি বলল, আমরা রবোমানবেরা নেটওয়ার্ক দখলের দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছি। সমাজের সব জায়গায় আমাদের রবোমানবেরা আছে—তারা গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। আগে যেরকম প্রতিদিন মানুষেরা কিছু রবোমানব ধরে ফেলতো-আজকাল সেটা পারছে না। তার প্রধান কারণ–
কঠিন চেহারার মানুষটি বিরক্তির সুরে বলল, আমরা সবাই এগুলো জানি। আমি তোমাকে যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটা বল। বিজ্ঞান আকাদেমী কী নিয়ে সভা করেছে?
তারা একটা মহাকাশযান পাঠাবে।
মহাকাশযান?
হ্যাঁ।
তুমি কেমন করে সেটা জান? বিজ্ঞান আকাদেমীর সভা ছিল গোপন। বিজ্ঞান আকাদেমীর কোনো সদস্যের মাঝে আমরা কোনো রবোমানব ঢুকাতে
পারি নি।
মধ্যবয়স্ক মানুষটি তার গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, বিজ্ঞান আকাদেমীর সভা শেষ হওয়ার সাথে সাথে পৃথিবীর অনেক জায়গায় অনেক রকম কাজ শুরু হয়ে গেছে। সব কাজগুলো হচ্ছে একটা মহাকাশযানকে নিয়ে। আমরা তাই অনুমান করছি একটি মহাকাশযান পাঠানো হবে।
মহাকাশযানে কী পাঠানো হবে?
কমবয়সী মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, মানুষ। মানুষের ফিটাস। মানুষের জিনোম।
কঠিন চেহারার মানুষটি কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল, জিজ্ঞেস করল, সত্যি?
হ্যাঁ। নেটওয়ার্কের তথ্য আমরা আজকাল যখন খুশি পরীক্ষা করতে পারি। আমি নিশ্চিতভাবে জানি অসংখ্য মানুষ, মানুষের ফিটাস আর জিনোম প্রস্তুত করা হচ্ছে!
কঠিন চেহারার মানুষটির মুখে বিচিত্র একধরনের হাসি ফুটে ওঠে, সে দুলে দুলে হাসতে হাসতে বলল, মানুষ তাহলে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে! নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্যে মহাকাশযানে করে কিছু মানুষ বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। পৃথিবীতে না থাকলেও অন্য কোথাও যেন মানুষেরা বেঁচে থাকে?
হ্যাঁ। মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, সবকিছু দেখে আমাদের তাই মনে হচ্ছে।
কঠিন চেহারার মানুষটি তরল গলায় বলল, আমার ঘনিষ্ঠ রবোমানবেরা, তোমাদের অভিনন্দন। সেই দিনটি আর খুব বেশি দূরে নয় যখন আমরা পৃথিবীর দায়িত্ব নেব।
সবাই মাথা নাড়ল, শুধু মধ্যবয়স্ক মানুষটি গম্ভীর গলায় বলল, এখন আমাদের অনেক কাজ। পৃথিবীর দায়িত্ব নেবার আগে আমাদের নিজেদের কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে।
কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, আমরা কি প্রস্তুতি নেইনি?
নিয়েছি। বেশ কিছু প্রস্তুতি নিয়েছি। নেটওয়ার্কটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সাথে সাথে আমাদের কাজে লেগে যেতে হবে।
তুমি ঠিকই বলেছ। কঠিন চেহারার মানুষটি হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়, নিজের হাতের আঙুলগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার ঘনিষ্ঠ রবোমানবেরা, তোমাদের মাঝে যারা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছ আমি তাদের পুরস্কার দিতে চাই!
ধাতব টেবিল ঘিরে বসে থাকা সবাই একটু নড়েচড়ে বসে তার দিকে তাকাল। কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, তোমরা সবাই জান মানুষ রোমানব খুঁজে বের করার একটা পদ্ধতি বের করেছিল। যে ছেলেটি সেটা বের করেছিল তার অসাধারণ গাণিতিক প্রতিভা থাকলেও মানুষ হিসেবে সে ছিল অতি নির্বোধ। আমাদের একজন এজেন্ট তার করোটি কেটে মস্তিষ্কটা বের করে নিয়ে এসেছে! সেই মস্তিষ্ক থেকে আমরা সব তথ্য বের করে এনেছি, বলতে পার এই ঘটনাটি রবোমানবের জীবনের বিশাল বড় একটি সাফল্য। যে এজেন্ট সেই কাজটি করেছে সেও আমাদের মাঝে আছে–আমি এখন তাকে পুরস্কৃত করতে চাই।
কঠিন চেহারার মানুষটি টেবিলের অন্য মাথায় বসে থাকা লাল চুলের কমবয়সী হাসিখুশি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, বল, তুমি কী পুরস্কার চাও?
লাল চুলের মেয়েটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমি এখন কোনো পুরস্কার চাই না। আমরা রবোমানবেরা যখন নেটওয়ার্ক দখল করে পৃথিবীর দায়িত্ব নিয়ে নেব তখন আমাকে পুরস্কার দিও! আমি তখন তোমার কাছে একটা পুরস্কার চাইব।
তখনো তুমি পুরস্কার পাবে। এখন তুমি কী পুরস্কার চাও বল।
লাল চুলের মেয়েটা রহস্যের ভঙ্গি করে বলল, সত্যি বলব?
বল।
আমি যে মস্তিষ্কটা কেটে এনেছি সেটাকে একটা ইন্টারফেস দিয়ে কমিউনিকেশন মডিউলের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যার অর্থ সেই মানুষটার সাথে আমি এখন কথা বলতে পারি। আমি কমিউনিকেশন মডিউল ব্যবহার করে আমার পরিচিত এই ছেলেটার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলতে চাই। তাই তুমি পুরস্কার হিসেবে আমাকে এই মস্তিষ্কটা দিতে পার।
কঠিন চেহারার মানুষটি দুলে দুলে হাসতে হাসতে বলল, আমি ভেবেছিলাম রবোমানবের ভেতর থেকে মায়া-মমতা ভালোবাসা সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
লাল চুলের মেয়েটি হাসল, বলল, এটি মায়া মমতা ভালোবাসা না–এটা হচ্ছে একটা বিনোদন। যে মানুষের কোনো দেহ নেই, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই তার সাথে কথা বলার বিষয়টা প্রায় রূপকল্পের মতো। মানুষটি একটা শব্দহীন আলোহীন অস্তিত্বহীন জগতে অনন্ত জীবনের জন্য আটকা পড়ে আছে তার ভেতরে যে অমানুষিক আতংক আর হতাশা সেটি বিনোদনের জন্যে অসাধারণ।
কঠিন চেহারার মানুষটি লাল চুলের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, তথাস্তু। তোমার প্রিয় মানুষটির মস্তিষ্ক নিয়ে খেলা করার জন্যে সেটা তোমাকে দিয়ে দেয়া হল।
লাল চুলের মেয়েটি বলল, ধন্যবাদ। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, আমার মনে হচ্ছে আমরা আমাদের কাজে ঠিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি না। যেটি করা দরকার সেটি না করে অন্যান্য ছেলেমানুষী কাজে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছি।
কঠিন চেহারার মানুষটির মুখের মাংসপেশি একটু শিথিল হয়ে সেখানে একটা হাসির আভাস পাওয়া গেল। সে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। আমরা সত্যিকারের কাজ না করে আনুষঙ্গিক কাজ বেশি করছি। কিন্তু আমি সেটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত না। কেন জান?
কেন?
তার কারণ তুমি গোপনে সত্যিকারের কাজ করে যাচ্ছ?
মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কঠিন চেহারার মানুষটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমাদের ভেতর থেকে মায়া মমতা ভালোবাসা এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় অনুভূতিগুলো সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভয়ের অনুভূতিটি সরানো হয় নি। নিরাপত্তার জন্যে ভয়ের অনুভূতি দরকার। আমরা এখনো ভয় পাই। তুমি যেরকম ভয় পাচ্ছ। কঠিন চেহারার মানুষের মুখের হাসিটি আস্তে আস্তে সরে গিয়ে সেখানে আবার কাঠিন্যটি ফিরে আসে, সে শীতল গলায় বলল, তুমি কেন ভয় পাচ্ছ বলবে?
মধ্যবয়স্ক মানুষটি আমতা আমতা করে বলল, না–আমি ভয় পাচ্ছি না। আমি-
না পেলে ক্ষতি নেই। যখন প্রয়োজন হবে তখন ভয় পেলেই হবে। কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, আমি বলেছি যে তোমাদের সবার কাজের জন্যে একটা পুরস্কার দেব। একজনকে দিয়েছি। তোমাকেও দেব।
আমাকে? আ-আমাকে?
হ্যাঁ। ছোট একা সীসার টুকরো। তোমার কপালে, শব্দের চেয়ে তিনগুণ গতিতে সেটা ঢুকে যাবে। সীসা নরম ধাতু, সেটা টুকরো টুকরো হয়ে তোমার মস্তিষ্ককে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। তুমি কিছু বোঝার আগেই তোমার সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
কঠিন চেহারার মানুষটি তার ড্রয়ার থেকে একটা পুরানো ধাঁচের রিভলবার বের করে আনে। সেটির দিকে তাকিয়ে মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায়, অবর্ণনীয় আতংকে সেটি কদর্য হয়ে ওঠে। মানুষটি কাঁপা গলায় বলল, তু–তুমি কী বলছ?
আমি কী বলেছি তুমি শুনেছ। রবোমানবদের এই বিস্ময়কর সাফল্যের কারণ হচ্ছে শৃঙ্খলা। কারণ হচ্ছে নেতৃত্ব। এই নেতৃত্বকে তুমি গোপনে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছ? তোমার এতো বড় দুঃসাহস?
কঠিন চেহারার মানুষটি তার চেপে রাখা রিভলবারটি মধ্যবয়স্ক মানুষের কপালের দিকে তাক করে। মধ্যবয়স্ক মানুষটি ভাঙা গলায় বলল, আমি দুঃখিত। আমি খুবই দুঃখিত–
মিথ্যা কথা বলো না। রবোমানবেরা কখনো দুঃখিত হয় না।
লাল চুলের মেয়েটি হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলল, দাঁড়াও! দাঁড়াও।
কঠিন চেহারার মানুষটা মাথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
আমি কী একটু অন্যপাশে সরে বসতে পারি? কেন?
দৃশ্যটা যেন একটু ভালো করে দেখতে পারি। গুলি খাবার পর যখন একজন ছটফট করতে থাকে সেই দৃশ্যটি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।
কঠিন চেহারার মানুষটি লালচুলের মেয়েটিকে অন্যপাশে বসার সময় দিয়ে ট্রিগার টেনে ধরে।
কোনো আদি নেই কোনো অন্ত নেই। কোনো শুরু নেই কোনো শেষ নেই। এক ফোটা আলো নেই, এক বিন্দু শব্দ নেই। তাপ নেই, স্পর্শ নেই, অনুভূতি নেই। আলাে বর্ণ শব্দ গন্ধ স্পর্শ উত্তাপহীন এই জগতে সে কতদিন থেকে আটকে আছে কে জানে। কত লক্ষ বছর সে এভাবে আটকে থাকবে? এই বিশাল শূন্যতা থেকে তার কোনো মুক্তি নেই?
কতকাল পার হয়ে গেছে কে জানে তখন হঠাৎ মনে হল বহুদূর থেকে কে যেন তাকে ডাকছে। সত্যি ডাকছে নাকি এটি কনা? কেউ কি তাকে ডাকতে পারে? সে কি কারো কথা শুনতে পারে?
সে আবার তার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করল। এবারে সে স্পষ্ট শুনতে পায় কেউ একজন তাকে ডাকছে। বলছে, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ, সে শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু সে কেমন করে বলবে যে সে শুনতে পাচ্ছে? তার কথা বলার ক্ষমতা নেই। তার কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই। তার মুখ নেই, কণ্ঠ নেই। তার সমস্ত চেতনা গভীর প্রত্যাশায় আকুলি-বিকুলি করে ওঠে কিন্তু সে কিছু করতে পারে না।
তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?
কণ্ঠস্বরটি পরিচিত, বহু পরিচিত। নারী কণ্ঠ, সে কতবার এই কণ্ঠ শুনেছে। তার ভালবাসার মেয়ের কণ্ঠ কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরটি শুনে সে অমানুষিক আতঙ্কে শিউরে ওঠে। চিৎকার করে উঠতে চায়, তুমি? তুমি? তুমি?
হ্যাঁ। আমি।
তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। রিসার্চ ল্যাব তোমার মস্তিষ্ক থেকে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। একটা ইন্টারফেসের সাথে একটা কমিউনিকেশন্স মডিউল লাগিয়ে দিয়েছে।
আমি কোথায়?
আমার ঘরে। আমার বসার ঘরে। টেবিলের উপর একটা কাচের জারে তরলের মাঝে ড়ুবে আছ। থলথলে কুৎসিত একটা মস্তিষ্ক দেখলে গা ঘিন ঘিন করে, কিন্তু তবু আমি রেখে দিয়েছি। এখান থেকে বৈদ্যুতিক তার বের হয়ে এসেছে ইলেকট্রনিক প্রসেসর হয়ে মাইক্রোফোনে এসেছে, স্পিকারে এসেছে। আমি তোমার সাথে কথা বলতে পারি, তোমার কথা শুনতে পারি।
কেন? তুমি কেন আমার কথা শুনতে চাও?
এমনি! একজন মানুষের যখন দেহ থাকে না শুধু মস্তিষ্ক থাকে তখন সে কেমন করে চিন্তা করে আমার জানার ইচ্ছে করে।
তুমি–তুমি এমন নিষ্ঠুর কেমন করে হতে পার?
ওগুলো পুরানো কথা। আপেক্ষিক কথা। দুর্বল মানুষের কথা। নিষ্ঠুরতা বলে আসলে কিছু নেই।
আছে।
ঠিক আছে তাহলে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। একজন মানুষ যখন অন্য একজন মানুষকে হত্যা করে সেটা কী নিষ্ঠুরতা?
হ্যাঁ। সেটি নিষ্ঠুরতা?
মানুষকে হত্যা করা বড় নিষ্ঠুরতা নাকি তার মস্তিষ্ককে একটা গ্লাসের জারে পুষ্টিকর তরলের মাঝে ড়ুবিয়ে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখা বড় নিষ্ঠুরতা?
মানুষকে হত্যা করে তার মস্তিষ্ককে বাঁচিয়ে রাখা অনেক বড় নিষ্ঠুরতা অনেক অনেক বড় নিষ্ঠুরতা-অনেক অনেক অনেক-
নারী কণ্ঠের উচ্ছল হাসির শব্দে সব কথা চাপা পড়ে গেল। মেয়েটি শুনতে পেল না অসহায় একটি মস্তিষ্ক থেকে হাহাকারের মতো করে ভেসে এলো, আর নিষ্ঠুরতার মাঝে আনন্দ খুঁজে পাওয়া হচ্ছে আরো বড় নিষ্ঠুরতা।
মহামান্য থুল হলঘরে প্রবেশ করা মাত্রই তাকে সম্মান দেখানোর জন্যে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। ছোট শিশুটি মেঝেতে বসে একটা চতুষ্কোণ খেলনা দিয়ে খেলছিল, সবাইকে দাঁড়াতে দেখে সেও তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে যায়।
বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুল একটু এগিয়ে গিয়ে ছোট শিশুটির থুতনি ধরে আদর করে বললেন, বস। তোমরা সবাই বস।
তিনি নিজে এসে একটি চেয়ারে বসার পর সবাই তাদের জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল। মহামান্য থুল সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে বললেন, আমি তোমাদের শুধু বিদায় দিতে আসি নি তোমাদের এক নজর দেখতে এসেছি। পৃথিবীর বাইরে যারা নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করবে আমি নিজের চোখে তাদের একটিবার দেখতে চাই।
।টুরান বলল, আমাদের এতো বড় দায়িত্ব দিয়েছেন সেজন্যে আপনাদের সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। আমাদের কৃতজ্ঞতা।
আমরা তোমাদের দায়িত্ব দিই নি, তোমরা দায়িত্বটুকু নিয়েছ। সেজন্যে তোমাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। আমি তোমাদের ফাইলগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েছি। আমার ধারণা তোমরা চমৎকার একটি দল হবে। তোমাদের মতো একটি দলের হাতে আমরা নিঃসন্দেহে আরো অনেকের দায়িত্ব দিতে পারি। মহামান্য থুল সবার দিকে তাকালেন তারপর নরম গলায় বললেন, তোমরা নিশ্চয়ই জান তোমাদের মহাকাশযানে তোমাদের সাথে আরো বেশ কিছু মানুষ, মানুষের ভ্রণ এবং জিনোম পাঠানো হচ্ছে। যখন তোমরা নিশ্চিতভাবে একটি বাসস্থান খুঁজে নেবে শুধুমাত্র তখন পর্যায়ক্রমে তাদের জাগিয়ে তোলা হবে কিংবা বড় হতে দেয়া হবে।
ইহিতা জিজ্ঞেস করল, সেই ধরনের মানুষের সংখ্যা কত?
থুল একটু হাসলেন, হেসে বললেন, সংখ্যাটি আমি জানি, কারণ অনেক ভেবে-চিন্তে সংখ্যাটি ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু আমরা ঠিক করেছি সংখ্যাটির কথা তোমাদের বলব না। এটি থাকুক তোমাদের জন্যে একটা বিস্ময়।
টর ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, মহামান্য থুল, যাত্রার শুরুতেই আমাদেরকে শীতল ঘরে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। আমরা কেউ যদি চাই তাহলে কী আমরা জেগে থাকতে পারি?
না। তোমাদের জেগে থাকার কোনো সুযোগ নেই। ইচ্ছে করে সেই সুযোগ রাখা হয় নি। তেমাদের ভ্রমণটি তো আর এক দুই দিন বা এক দুই মাসের নয়। এটি কয়েকশ বছরের হতে পারে। আমরা চাই না তোমরা মহাকাশযানের কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে থেকে থুথুড়ে বুড়ো হয়ে যাও!
মহামান্য থুলের কথা বলার ভঙ্গি শুনে সবাই হালকা গলায় হেসে ওঠে। টর কিছু একটা বলতে চাইছিল গুল তাকে থামালেন, বললেন, টর! তোমার হতাশ হবার কোনো কারণ নেই। আমি জানি সারাজীবন তুমি শুধু উত্তেজনা খুঁজে বেড়িয়েছ! তোমাকে আমরা মোটেই নিরাশ করব না। এই মহাকাশযানে যদি কিছুমাত্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয় সেটা মোকাবেলা করার জন্যে অবশ্যই তোমাদের ঘুম থেকে ডেকে ওঠানো হবে।
ধন্যবাদ মহামান্য থুল।
তোমাদের আর কারো কোনো প্রশ্ন আছে?
কেউ কিছু বলার আগেই ক্লদ বলল, আমি কি ক্লাটুনকে সাথে নিতে পারি?
ক্লাটুন? ক্লাটুন কে?
ক্লদের মা সুহা বলল, ওর পোষা কুকুর।
থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, আমি দুঃখিত ক্লদ। মহাকাশযানে তুমি ক্লাটুনকে নিতে পারবে না। কিন্তু তোমার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই কারণ তোমাদের মহাকাশযানে কুকুর বেড়াল পশুপাখি সবকিছু আছে। তুমি নিশ্চয়ই অন্য একটি ক্লাটুন পেয়ে যাবে!
ক্লদ মাথা নাড়ল, বলল, উঁহু। পাব না।
কেন পাবে না?
আমার ক্লাটুনের বুদ্ধি অন্য সব কুকুর থেকে বেশি।
সুহা তার ছেলেকে থামিয়ে বলল, ঠিক আছে ক্লদ, এখন আমি একটু কথা বলি?
ক্লদ মাথা নেড়ে চুপ করে গেল। সুহা এবারে মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে বলল, মহামান্য থুল, আমার একটা প্রশ্ন ছিল আমি কী আপনাকে সেটা জিজ্ঞেস করতে পারি?
কর।
আমি কখনো ভাবি নি চার বছরের একটা শিশুকে নিয়ে আমার মতো একজন মাকে এই মহাকাশযানে যেতে দেয়া হবে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম সবাই হবে পূর্ণবয়স্ক অভিজ্ঞ মহাকাশচারী। এরকম একটি অভিযানে কেন আমাদের দুজনকে নেয়া হল?
থুল একটু হাসলেন, বললেন, তার কারণ এটি অন্যরকম একটি অভিযান। এই মহাকাশযানে আরো অনেক মানুষ, অনেক প্রাণী, গাছপালা, পশুপাখি অনেক কিছু থাকবে, কিন্তু তারা জেগে উঠবে যখন তোমরা তোমাদের অভিযান শেষ করে বেঁচে থাকার মতো একটা আবাসস্থল খুঁজে পাবে তখন। মূল অভিযানে তারা কেউ নেই, তাদের ভূমিকা মহাকাশযানের যন্ত্রপাতির মততা, জ্বালানির মতো, রসদের মতো! শুধু তোমাদের ভূমিকা হচ্ছে মানুষের।
থুল একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, মানুষের শক্তি হচ্ছে বৈচিত্র্যে, তাই তোমাদের দলটি তৈরি করা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মানুষ দিয়ে। তোমরা সবাই একে অন্যের থেকে ভিন্ন। আমরা চাই তোমাদের মানবিক অনুভূতিগুলি প্রবলভাবে থাকুক। সেটা করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে একটি শিশুর উপস্থিতি। তাই এখানে একটা শিশুকে আনা হয়েছে। শিশু থাকতে হলে তার মাকে থাকতে হয়। তাই তুমি এসেছ।
কিন্তু যদি কখনো কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি হয়?
ছোট শিশুকে নিয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি পাড়ি দেয়ার অনেক উদাহরণ এই পৃথিবীতে আছে। কাজেই সেটা নিয়ে আমরা মোটেও চিন্তিত নই।
থুল একবার সবার দিকে তাকালেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের আর কোনো প্রশ্ন আছে?
ক্লদ হাত তুলে আবার কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল সুহা তাকে থামাল। নীহা তখন দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, মহামান্য থুল শীতল ঘরে থাকার সময় আমাদের মস্তিষ্ক কি পুরোপুরি অচল হয়ে থাকবে?
থাকার কথা। তাপমাত্রা কমিয়ে তোমাদের জড় পদার্থ তৈরি করে ফেলা হবে।
আমরা কী তখন মস্তিষ্ক একটুও ব্যবহার করতে পারব না?
থুল হাসলেন, বললেন, তুমি চেষ্টা করে দেখ পার কিনা। না পারলেও ক্ষতি নেই, কারণ তুমি যে চিন্তাটি করতে করতে শীতল ঘরে ঘুমিয়ে পড়বে, ঘুম ভাঙবে ঠিক সেই চিন্তাটি নিয়ে। তুমি জানতেও পারবে না তার মাঝে হয়তো কয়েকশ বছর কেটে গেছে।
নীহা বলল, আমি এই অভিজ্ঞতাটুকু পাওয়ার জন্যে আর অপেক্ষা করতে পারছি না।
তোমাকে আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। মহামান্য থুল আবার সবার দিকে তাকালেন, জিজ্ঞেস করলেন, আর কোনো প্রশ্ন আছে?
সবাই মাথা নাড়ল, জানাল তাদের আর কোনো প্রশ্ন নেই। থুল এবারে মুটের দিকে তাকিয়ে বললেন, নুট, সবাই কিছু না কিছু বলেছে। তুমি এখনো কিছু বল নি। তুমি কি কিছু জিজ্ঞেস করবে?।
নুট নিঃশব্দে মাথা নেড়ে জানাল সে কিছু জিজ্ঞেস করবে না। মহামান্য থুল তখন উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, তোমাদের সাথে আমার কিংবা পৃথিবীর কোনো মানুষের সাথে সম্ভবত আর কখনো দেখা হবে না। আমি তোমাদের জন্যে শুভ কামনা করছি।
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে একবার আলিঙ্গন করে ধীর পায়ে হেঁটে হলঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
স্কাউটশিপটা এক ধরনের ভোতা যান্ত্রিক শব্দ করতে করতে মহাকাশযানের পাশে এসে থামল। স্বয়ংক্রিয় কিছু যন্ত্রপাতি স্কাউটশিপটাকে আঁকড়ে ধরে। মহাকাশযানের গোলাকার দরজার সাথে বায়ুনিরোধক সংযোগটা নিশ্চিত করার পর ঘরঘর শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। বাতাসের চাপটি সমান হবার সময় একটা মৃদু কম্পন অনুভব করা গেল তারপর হঠাৎ করে সবকিছু পুরোপুরি নীরব হয়ে যায়।
সাতজন মহাকাশচারীকে মহাকাশযানে তুলে দেবার জন্যে যে চারজন ক্রু এসেছে তারা স্কাউটশিপের সিট থেকে নিজেদের মুক্ত করে ভাসতে ভাসতে কাজ শুরু করে দেয়। সবাইকে সিট থেকে মুক্ত করে ক্রুরা তাদেরকে খোলা দরজাটি দিয়ে মহাকাশযানের ভেতর নিয়ে আসে। যন্ত্রপাতিগুলো ইতস্তত ভেসে বেড়াচ্ছিল সেগুলোকে মহাকাশযানের গায়ে আটকে দিতে দিতে একজন ক্রু বলল, তোমরা ভারশূন্য পরিবেশটাতে একটু অভ্যস্ত হয়ে নাও, ভবিষ্যতে কাজে দেবে। টুরান একটু সামনে এগুতে যাওয়ার চেষ্টা করে শূন্যে পুরোপুরিভাবে একটা ডিগবাজি খেয়ে বিব্রতভাবে বলল, ট্রেনিংয়ের সময় ভেবেছিলাম বিষয়টা খুব সোজা!
হাসিখুশি চেহারার ত্রুটি মহাকাশযানের এক অংশ থেকে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে অন্য অংশে ভেসে যেতে যেতে বলল, যে কোনো বিষয় অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর সোজা। তোমরাও দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে!
ইহিতা মহাকাশযানের দেয়াল ধরে সাবধানে একটু এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে বলল, কিন্তু আমরা তো অভ্যস্ত হবার সুযোগ পাব না। মহাকাশযানটির ভেতরে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ বল তৈরি করার জন্যে তোমরা তো একটু পরেই এটাকে তার অক্ষের উপর ঘোরাতে শুরু করবে।
টুরান মহাকাশযানের মাঝামাঝি একটা জায়গায় ঝুলে ছিল, সেখান থেকে সরে যাবার চেষ্টা করতে করতে বলল, আমাদেরকে একটু পরে শীতলঘরে আটকে দেবে, মাধ্যাকর্ষণ দিয়েছ কী দাও নি সেটা তো আমরা জানতেও পারব না!
মধ্যবয়স্ক একজন ক্রু একটা প্যানেলের সামনে নিজেকে আটকে ফেলে বলল, মহাকাশযানের কক্ষপথে ঠিকভাবে চালিয়ে নিতে মহাকাশযানে একটা কৌণিক ভরবেগ দিতে হয়–মাধ্যাকর্ষণট
ি আসল উদ্দেশ্য না।
টর ভাসতে ভাসতে খানিকদূর এগিয়ে গিয়ে বলল, আমি এখনো মনে করি আমাদের শীতলঘরে বন্ধ করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। মহাকাশযানের যাত্রাটা আমাদের উপভোগ করতে দেয়া দরকার।
ইহিতা হেসে বলল, বারো জি ত্বরণে যাওয়ার সময় তুমি সেটা উপভোগ করবে বলে মনে হয় না! স্কাউটশিপেই আমাদের কী অবস্থা হয়েছিল মনে আছে?
টর মহাকাশযানের একটা ভাসমান মডিউলকে ধরার চেষ্টা করে বলল, যেহেতু সত্যিকারের মহাকাশযানে এসেছি একটু বাড়তি উত্তেজনা তো পেতেই পারি।
মহাকাশচারীদের ছোট দলটি যখন ভারশূন্য পরিবেশে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল তখন দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ক্লদকে সবার আগে বিষয়টিতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে দেখা গেল। সে মহাকাশযানের এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়ালে রবারের বলের মতো ছুটে যেতে লাগল, এবং তার মুখের আনন্দধ্বনি মহাকাশযানের পরিবেশটুকুকে বেশ অনেকখানি সহজ করে তুলে।
কিছুক্ষণের মাঝে মহাকাশযানের শক্তিশালী কুরু ইঞ্জিন গর্জন করে ওঠে এবং পুরো মহাকাশযানটি কেঁপে ওঠে। মহাকাশযানের ভেতর বাতাসের প্রবাহ শুরু হয়ে যায়। বিশাল মহাকাশযানের নানা অংশে আলো জ্বলে ওঠে এবং অসংখ্য যন্ত্রপাতি গুঞ্জন করে ওঠে।
কয়েকজন ক্রু মহাকাশযানের কন্ট্রোল প্যানেলে কাজ করছিল। তারা এবারে সবাইকে ডাকল, বলল, মহাকাশযানের কোয়ান্টাম কম্পিউটার চালু হয়েছে। তোমরা এসে নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নাও।
সুহা বৃথাই তার ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলল, আমাদের সবাইকে আসতে হবে? ক্লদকেও?।
মধ্যবয়স্ক ক্রু বলল, ঠিক আছে, ক্লদকে একটু পরে আনলেও হবে। অন্যরা এসো।
দলের বাকি ছয়জন সদস্য ভাসতে ভাসতে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। টর জানতে চাইল, কোথায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার?
এই যে আমি এখানে। মহাকাশযানের ভেতর একটা কণ্ঠস্বর গম গম করে ওঠে।
টুরান বলল, এখানে মানে কোথায়?
এখানে মানে এই মুহূর্তে এখানে। যদি তুমি অন্য কোথাও থাকো আমি সেখানেও থাকব। আমি এই মহাকাশযানের সবজায়গায় আছি। সবসময়ে আছি।
নীহা জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী?
কণ্ঠস্বরটি তরল গলায় বলল, আমি তো আর তোমাদের মতো মানুষ নই যে আমার একটা নাম কিংবা পরিচয় থাকতে হবে। কিন্তু তোমরা যদি চাও আমাকে ট্রিনিটি নামে ডাকতে পার। ট্রিনিটি নামটি আমার খুব পছন্দের।
নীহা বলল, ট্রিনিটি, তোমার সাথে পরিচয় হয়ে খুব খুশি হলাম।
ধন্যবাদ নীহা।
তুমি আমার নাম জান?
শুধু নাম? আমি তোমার সবকিছু জানি। সত্যিকথা বলতে কী আমি তোমার সম্পর্কে এমন অনেক কিছু জানি যেটা তুমি নিজেই জান না!
সেটা কীভাবে সম্ভব?
খুবই সম্ভব। তুমি ইরিত্রা রাশিমালার যে সমস্যাটা নিয়ে চিন্তা করছ, তুমি যে তার সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছ, তুমি কী সেটা জান? জান না। আমি জানি।
কী আশ্চর্য!
এটা মোটেও আশ্চর্য কিছু নয়। আমার জন্যে এটা খুবই সোজা। তোমাদের সবার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার ওপর, আমি তোমাদের সবসময় চোখে চোখে রাখি। তোমাদের শরীরের ভেতরে এমনকি মস্তিষ্কের ভেতরেও আমি উঁকি দিতে পারি!
কী আশ্চর্য! নীহা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার বলল, কী আশ্চর্য!
সুহা চোখের কোনা দিয়ে ক্লদকে দেখার চেষ্টা করছিল, সে তখন মহাকাশযানের এক অংশে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বিপজ্জনকভাবে অন্যদিকে ছুটে যাচ্ছে। সুহার চোখে মুখে আতংকের একটা ছায়া পড়ল, মনে হয় সেটা দেখেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার ট্রিনিটি তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, সুহা! তুমি চিন্তা করো না। আমি তোমার ছেলে ক্লদকে চোখে চোখে রাখছি! তার কিছু হবে না।
সত্যি?।
সত্যি। সে চেষ্টা করলেও নিজেকে ব্যথা দিতে পারবে না। আমাদের এই মহাকাশযানের নিরাপত্তার ব্যবস্থার খুঁটিনাটি জানলে তুমি হতবাক হয়ে যাবে।
তোমার সাথে কথা বলেই আমি হতবাক হয়ে যাচ্ছি।
স্কাউটশিপে করে আসা ক্রুদের একজন বলল, ট্রিনিটি। আমরা কী আনুষ্ঠানিকভাবে তোমার কাছে এই মহাকাশচারীদের দায়িত্ব দিয়ে ফিরে যেতে পারি?
অবশ্যই পার। তোমার তথ্য ক্রিস্টালটি আমার ভিডি রিডারে প্রবেশ করিয়ে দাও। আমি তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সাতজন মহাকাশচারীর দায়িত্ব নিয়ে নেব।
মধ্যবয়স্ক ক্রুটি তার পিঠে ঝোলানো ব্যাগ থেকে চতুষ্কোণ একটি ক্রিস্টাল বের করে কন্ট্রোল প্যানেলের নির্দিষ্ট জায়গায় ঢুকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ একধরনের যান্ত্রিক শব্দ হল, প্যানেলে কিছু আলোর ঝলকানি হল তারপর ক্রিস্টালটি আবার বের হয়ে এলো। সবাই আবার তখন ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, চমৎকার! ছয়জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ এবং একজন শিশুর দায়িত্ব আমি নিয়ে নিচ্ছি। এই সাতজন মানুষ ছাড়াও শীতলঘরে আরো অসংখ্য মানুষ, প্রাণী, বৃক্ষলতা, তাদের দ্রুণ এবং তথ্য রয়েছে আমি সেগুলোর দায়িত্বও নিয়ে নিচ্ছি।
মধ্যবয়স্ক ক্রুটি কন্ট্রোল প্যানেল থেকে চতুষ্কোণ ক্রিস্টালটি বের করে সাবধানে নিজের ব্যাগে রেখে বলল, তাহলে আমরা বিদায় নিই?
ট্রিনিটি বলল, হ্যাঁ তোমাদের বিদায় নেয়ার সময় হয়ে গেছে। আমি যখন আমার সবগুলো কুরু ইঞ্জিন চালু করব তখন তোমাদের স্কাউটশিপ নিয়ে এই মহাকাশযান থেকে দূরে থাকা ভালো, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর ঢুকে যাওয়া উচিত।
চারজন ক্রু তাদের যন্ত্রপাতি বাক্সে ঢুকিয়ে নিয়ে বিদায় নেবার জন্যে প্রস্তুত হল। মধ্যবয়স্ক ক্রু, একটু এগিয়ে এসে একজন একজন করে সাতজন মহাকাশচারীর সবার হাত স্পর্শ করল, তারপর বলল, তোমরা কারা, কেন তোমরা এই মহাকাশযানে এসেছ, তোমরা কোথায় যাবে, কতদিনের জন্য যাবে, কেন যাবে আমরা কেউ সেগুলো কিছু জানি না। আমাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তোমাদের এই মহাকাশযানে এনে ট্রিনিটির হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে। আমরা সেই দায়িত্ব শেষ করে তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি।
টুরান বলল, আমরা কারা কেন কোথায় যাচ্ছি তার সবকিছু আমরা জানি, কিন্তু আমাদের সেই কথাগুলো কাউকে বলার কথা নয়, তাই তোমাদেরকেও বলছি না–
মধ্যবয়স্ক ক্রু বলল, আমরা সেটি নিয়ে কোনোরকম কৌতূহল দেখাচ্ছি না! কিন্তু আমরা জানি তোমাদের এই মিশন মানবজাতির জন্যে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তোমাদের সাফল্য কামনা করি।
তোমাদের ধন্যবাদ।
অন্য তিনজন ক্রু এগিয়ে এসে সবার হাত স্পর্শ করে বিদায় নিয়ে মহাকাশযানের গোল দরজা দিয়ে ভেসে ভেসে বের হয়ে গেল। গোল দরজাটা বন্ধ হয়ে যাবার পর তারা একটা মৃদু গর্জন এবং কম্পন অনুভব করে। একটু পরেই স্বচ্ছ জানালা দিয়ে তারা স্কাউটশিপটাকে নীল আলো ছড়িয়ে ছুটে যেতে দেখে।
টুরান তখন অন্য সবার দিকে তাকিয়ে বলল, এখন থেকে আমরা একা। একেবারে একা।
ইহিতা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। আমাদের জন্যে ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করে আছে আমরা জানি না। যদি কখনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে।
নীহা বলল, ট্রিনিটি আমাদের সাহায্য করবে।
টুরান মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। অবশ্যই। ট্রিনিটি অবশ্যই আমাদের সাহায্য করবে।
ইহিতা বলল, আমাদের কিছুক্ষণের মাঝে শীতলঘরে ঢুকে যেতে হবে, কতোদিন সেখানে আমরা থাকব জানি না। আবার কখন সবার সাথে দেখা হবে বলতে পারি না। আমার তাই মনে হয় শীতলঘরে যাবার আগে নিজেদের মাঝে একটু কথা বলে নিই। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা।
টুরান কন্ট্রোল প্যানেলের একটা মনিটর ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, আমাদের ভরশূন্য পরিবেশে থাকার অভ্যাস নেই। এভাবে ভেসে ভেসে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা সোজা নয়।
ইহিতা ভুরু কুঁচকে বলল, গুরুত্বপূর্ণ কথা তাহলে কেমন করে বলতে হয়।
টুরান কাঁধ ঝাকুনি দিয়ে বলল, আমার গুরুত্বপূর্ণ কিংবা হালকা কোনো ধরনের কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না।
ইহিতা কিছুক্ষণ স্থির চোখে টুরানের দিকে তাকিয়ে রইল, কথা বলার প্রস্তাবটি আমি না দিয়ে যদি একজন পুরুষমানুষ দিত তাহলে কী তুমি আরেকটু আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে?
সম্ভবত।
ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, টুরান। তোমার ব্যক্তিগত জীবনের একটা ঘটনাকে তুমি এই মহাকাশযানের এতো বড় একটা অভিযানে টেনে আনবে আমি সেটা বিশ্বাস করি নি।
টুরান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি দুঃখিত। কিন্তু আমার কিছু করার নেই।
টর একটু এগিয়ে এসে বলল, ঠিক আছে, টুরানের যদি আগ্রহ না থাকে থাকুক। আমরা অন্যেরা তোমার গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো শুনি।
ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমরা তো যন্ত্র নই। আমরা মানুষ। মানুষের কাছে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ কথা মাত্র একটিই হতে পারে।
টুরানের মুখে এক ধরনের হাসি ফুটে ওঠে, সেটি কী? একজনের জন্যে অন্যজনের সহমর্মিতা।
টুরান এবার হাসির মতো শব্দ করল, বলল, সহমর্মিতা অনেক কঠিন শব্দ। আমরা না হয় সেটি ব্যবহার না করলাম। তাছাড়া এই ধরনের শব্দ আমি বিশ্বাস করি না।
টর বলল, টুরান, তুমি কেন ইহিতাকে কথা বলতে দিচ্ছ না?
ইহিতা বলল, সত্যি কথা বলতে কী, আমার মনে হয় আমার আর কথা বলার প্রয়োজন নেই। আমরা এখন আমাদের শীতলঘরে যাই। যাবার আগে সবার জন্যে শুভেচ্ছা। আমরা আবার যখন জেগে উঠব, সেটি হবে আমাদের জন্যে নতুন জীবন।
নীহা বলল, আমি সেই নতুন জীবনের জন্যে অপেক্ষা করে আছি।
সুহা বলল, তোমরা আমার সন্তানটির জন্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করো যেন তাকে আমি একটি সুন্দর জীবন দিতে পারি।
নীহা বলল, নিশ্চয়ই পারবে সুহা। নিশ্চয়ই পারবে।
ইহিতা নুটের দিকে তাকিয়ে বলল, নুট, তুমি কখনো কোনো কথা বল না। আজকে কী বলবে?
নুট জোর করে হাসার চেষ্টা করে মাথা নাড়ল, সে বলবে না। ৪২
ঠিক আছে, নুট। আশা করছি ভবিষ্যতে কখনো আমরা তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাব!
টুরান বলল, চল আমরা শীতলঘরে যাই। আমি এই অতীতকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পিছনে ফেলে যেতে চাই।
টর বলল, আমি কী ঠিক করেছি জান? কী?
আমি শীতলঘরে ঢুকব না। আমি বাইরে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে থাকব। আমি মহাকাশযানটির গতিবিধি দেখতে চাই।
হঠাৎ করে ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর গমগম করে ওঠে, না টর। সেটি সম্ভব নয় তোমাকে শীতলঘরে ঢুকতে হবে।
আমি ঢুকব না। আমি মানুষ, আমি একটা কম্পিউটারের নির্দেশ মানতে রাজি নই।
টর। আমি তোমার সাথে তর্ক করতে চাই না। একটা মহাকাশযানের মূল কম্পিউটার হিসেবে আমার অনেক ক্ষমতা। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমি তোমাকে শীতলঘরে যেতে বাধ্য করতে পারি।
কীভাবে?
আমি তোমাকে সেটি বলব না। তুমি যদি আমার কথা না শোনো আমি তোমাকে বাধ্য করতে পারব। আমার সেই ক্ষমতা আছে।
টর কঠোর মুখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ট্রিনিটি, আমি তোমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। আমাকে বাধ্য কর।
ট্রিনিটি বলল, সেটি না করলেই ভালো করতে। বিশ্বাস কর আমি অনেক কিছু করতে পারি।
টর মুখ শক্ত করে বলল, আমি বিশ্বাস করি না!
ঠিক আছে, আমি তাহলে অন্যদের বলছি। তোমরা শীতল ঘরে যাও, প্রস্তুতি নাও।
টুরান ইতস্তত করে বলল, আর টর?
ট্রিনিটি বলল, সেও আসবে। তোমরা সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না।
টুরান বলল, আমার মনে হয় আমরা নিজেদের মাঝে একটা বোঝাঁপড়া করে নিতে পারতাম। আমাদের মাঝে কাউকেই নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হয় নি। আমরা সেটা করে নিতে পারতাম, তাহলে এই ঝামেলাটুকু হত না।
ইহিতা বলল, একটু আগে আমি সেই প্রস্তাবটি করেছিলাম তখন তুমি রাজি হও নি। এখন তুমি নিজে এই প্রস্তাবটি করছ।
টুরান মুখ শক্ত করে বলল, দুটি আসলে এক বিষয় নয়।
ইহিতা ভেসে ভেসে সামনে অগ্রসর হতে হতে বলল, দুটি আসলে একই বিষয়। তুমি সেটা খুব ভালো করে জান।
টুরান কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল, সে স্বীকার করতে চাইছে না কিন্তু এই মেয়েটি আসলে সত্যি কথাই বলেছে।
ট্রিনিটি গমগমে গলায় বলল, উপরে যে ঘরটিতে সবুজ বাতি জ্বলছে তোমরা সবাই সেখানে যাও। সবার জন্যে আলাদা করে একটা ক্যাপসুল রাখা আছে। তোমরা সেখানে ঢুকে যাও। টরকে নিয়ে তোমরা চিন্তা করো না। আমি নিশ্চিতভাবে বলছি, সেও চলে আসবে। সম্ভবত তোমাদের আগেই সে ক্যাপসুলে ঢুকে যাবে।
প্রথমে ক্লদ, তার পিছু পিছু তার মা সুহা, তাদের পিছনে পিছনে ইহিতা নুট আর নীহা, সবশেষে টুরান উপরের ঘরটিতে এসে ঢুকল। দেয়ালের সাথে সাতটি ক্যাপসুল লাগানো, ক্যাপসুলের ওপর ছোট স্ক্রিনে তাদের ছবি। সবাই নিজের ক্যাপসুল খুঁজে বের করে নেয়। ক্লদ আনন্দের শব্দ করে বলল, আমার ক্যাপসুলটি কতো সুন্দর দেখেছ, মা?
সুহা বলল, হ্যাঁ বাবা খুব সুন্দর।
ভেতরে ভিডি রিডার আছে।
হ্যাঁ। তুমি খেলতে পারবে। আমাদের সাথে কথা বলতে পারবে।
আমি ভিতরে ঢুকি?
ঢুকে যাও। ঢুকে যাবার আগে শুধু আমাকে একটু আদর দিয়ে যাও।
ক্লদ তার মাকে একবার জড়িয়ে ধরল। সুহা গভীর মমতায় শিশুটিকে ক্যাপসুলের ভেতর শুইয়ে দেয়। আবার তার সাথে কবে দেখা হবে সে জানে। কত বছর পার হয়ে যাবে? একশ বছর? দুইশ বছর? নাকি লক্ষ বছর?
ক্লদের ক্যাপসুলের ঢাকনাটি নেমে এসে ক্যাপসুলটি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে অন্য সবাই একট আর্ত চিৎকার শুনতে পায়। ইহিতা চমকে ওঠে বলল, কী হয়েছে?
ট্রিনিটি বলল, টরকে শীতলঘরে আনছি। ছোট একটা ইলেকট্রিক শক দিয়েছি।
ইহিতা কঠিন গলায় বলল, তুমি আমাদের একজন অভিযাত্রীকে ইলেকট্রিক শক দিতে পার না।
পারি। শুধু ইলেকট্রিক শক নয়, আরো অনেক কিছু করতে পারি। এই মহাকাশযানটি আমার দায়িত্বে। এটি ঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্যে আমাকে অনেক কিছু করতে হয়।
আমি ভেবেছিলাম একটি কম্পিউটার কখনো একজন মানুষকে অত্যাচার করতে পারে না। তাদেরকে সেই অধিকার দেয়া হয় নি।
ঠিক তখন আবার একটা ভয়ংকর আর্ত চিৎকার শুনতে পেল, আগের থেকে জোরে এবং আগের থেকে দীর্ঘ সময়ব্যাপী। প্রায় সাথে সাথেই সবাই দেখতে পেল টর বাতাসে ভেসে ভেসে দ্রুত এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ঘরের দরজায় সে আঘাত খেয়ে পিছনে ছিটকে গেল এবং দেয়াল আঁকড়ে ধরে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সে ঘরের ভেতরে ঢুকে পাগলের মতো নিজের ক্যাপসুলটি খুঁজতে থাকে। তার চোখ-মুখ রক্তশূন্য, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় বিকৃত এবং কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরে সে তার ক্যাপসুলে হুঁড়মুড় করে ঢুকে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। ইহিতা ক্যাপসুলে মাথা ঢুকিয়ে টরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী হয়েছে টর?।
টর বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল, কানের ভেতর ভয়ংকর শব্দ, মনে হয় মস্তিষ্কের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। কী ভয়ানক যন্ত্রণা তুমি চিন্তা করতে পারবে না!
এখন বন্ধ হয়েছে?
হ্যাঁ বন্ধ হয়েছে। টর হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, আমি এই ট্রিনিটিকে খুন করে ফেলব। সৃষ্টিকর্তার দোহাই, খুন করে ফেলব।
ট্রিনিটি একটা কম্পিউটার! কম্পিউটারকে খুন করবে কেমন করে?
সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও!
টর কথা শেষ করার আগেই ক্যাপসুলের দরজাটি নেমে আসে। ইহিতা মৃদু স্বরে বলল, কাজটা ঠিক হল না।
নীহা জানতে চাইল, কোন কাজটা?
আমরা এখনো আমাদের যাত্রা শুরু করিনি এর মাঝে ট্রিনিটির সাথে টরের বিরোধ!
ট্রিনিটি গমগমে গলায় বলল, তোমরা সেটা নিয়ে মাথা ঘামিও না। আমার সাথে কারো বিরোধ নেই।
ইহিতা বলল, না থাকলেই ভালো। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, চল আমরা আমাদের ক্যাপসুলে ঢুকে যাই।
নীহা বলল, চল।
সবাই যখন নিজের ক্যাপসুলে ঢুকছে তখন ইহিতা দেখল নুট তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ইহিতা অবাক হয়ে বলল, নুট! কিছু বলবে?
নুট মাথা নাড়ল। ইতিহা জিজ্ঞেস করল, কী বলবে?
নুট মৃদু গলায় ফিসফিস করে বলল, আমার খুব ভয় করছে।
কিসের ভয়?
শীতলঘরে ঘুমানোর পর যদি আর কখনো জেগে না উঠি!
ইহিতা নুটের হাত ধরে বলল, জেগে উঠবে। নিশ্চয়ই জেগে উঠবে।
তুমি আমাকে কথা দিচ্ছ?
ইহিতা একমুহূর্ত ইতস্তত করে বলল, হ্যাঁ। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। যাও ক্যাপসুলে শুয়ে পড়।
নুট তার ক্যাপসুলে যেতে যেতে আবার ফিরে এসে ইহিতার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার যদি কিছু করার জন্যে কখনো সাহায্যের দরকার হয় তুমি আমাকে বল। তুমি যেটা বলবে আমি সেটা করব।
ইহিতা হেসে বলল, অবশ্যই বলব নুট। অবশ্যই বলব।
ক্যাপসুলের ঢাকনাটা নেমে আসার সাথে সাথে ইহিতা একটা মিষ্টি গন্ধ অনুভব করতে পারল। তাদেরকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে সম্ভবত কোনো একটি গ্যাস ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ইহিতা সামনে রাখা মনিটরটা স্পর্শ করে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, আমি পৃথিবীটাকে শেষবার দেখতে চাই।
মনিটরে ধীরে ধীরে নীল পৃথিবীটার ছবি ভেসে উঠল। এই অপূর্ব সুন্দর নীল গ্রহটি ছেড়ে সে চলে যাবে? আর কখনো এই গ্রহটি সে দেখতে পাবে না? তাদের নতুন গ্রহ কেপলার টুটুবি দেখতে কেমন হবে? পৃথিবীর মতো সুন্দর?
গভীর একটা বেদনায় তার বুক টনটন করতে থাকে। ইহিতা অনুভব করে খুব ধীরে ধীরে অপূর্ব নীল গ্রহটি আবছা হয়ে আসছে। তার চোখে ঘুম নেমে আসছে। ঘুম। গভীর ঘুম।
কতো বছর পর তার এই ঘুম ভাঙবে?
(চলবে)
