দ্বিতীয় পর্ব

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে

#কেপলার_টুটুবি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল



ছোট ঘরটির ধাতব টেবিল ঘিরে বারোজন নারী পুরুষ বসে আছে, দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এরা সবাই রবোমানব। কঠিন চেহারার মানুষটি টেবিলে থাবা দিতেই সবাই তার দিকে তাকাল। সে একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, আগে যতবার এই ঘরটিতে তেমাদের নিয়ে বসেছি, প্রত্যেকবার আমার ভেতরে এক ধরনের চাপা ভয় কাজ করেছে। যদি মানুষেরা খবর পেয়ে যায়–যদি তারা আমাদের ধরতে চলে আসে! মানুষটি তার আঙুল দিয়ে টেবিলে একটু শব্দ করে বলল, এই প্রথমবার আমার ভেতরে কোনো ভয় নেই। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে নেটওয়ার্কটি এখনো দখল করি নি, কিন্তু নেটওয়ার্কটির গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে এসেছে। এখন হঠাৎ করে নিরাপত্তাবাহিনীর কেউ আর আমাদের ধরতে চলে আসবে না!

লালচে চুলের মেয়েটি বলল, তোমাকে অভিনন্দন!

আমাকে অভিনন্দন দেবার কিছু নেই। আমরা সবাই মিলে করেছি।

কিন্তু তোমার নেতৃত্বে করেছি। তুমি অসাধারণ একটি পরিকল্পনা করেছ। নেটওয়ার্কে যখন প্রথমবার তোমার ছবি আর নামটি চলে আসবে, যখন সবাই জানবে নতুন পৃথিবীর নতুন নেতা তুমি-তখন পৃথিবীর গোবেচারা মানুষগুলোর কী অবস্থা হবে কল্পনা করেই আমার শরীরে শিহরণ হতে থাকে!

কঠিন চেহারার মানুষটি হাসি হাসি মুখে বলল, তোমার শিহরণকে আর দুটি দিন আটকে রাখ। এখন থেকে ঠিক দুইদিন পর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে নেটওয়ার্ক দখল করব।

কমবয়সী একজন মানুষ ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল, নেটওয়ার্ক দখল করার পর, সবচেয়ে প্রথম আমরা কী করব?

সবকিছু ঠিক করা আছে। সময় হলেই দেখতে পাবে?

আমাদের আগে থেকে বলবে না?

বলব। তোমাদের নিয়ে কাজ করেছি, তোমাদের না বললে কাকে বলব? কঠিন চেহারার মানুষটার মুখ হঠাৎ করে আরো কঠিন হয়ে যায়, সবার প্রথম আমরা বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজনকে ধরে আনব। সত্যি কথা বলতে কী ধরে আনা হবে না, যেখানে যাকে পাওয়া যাবে সেখানেই তাকে শেষ করে দেয়া হবে। তবে পৃথিবীর গোবেচারা মানুষদের আমরা সেটা জানাব না। তাদেরকে জানাব ওদের ধরে আনা হয়েছে বিচার করার জন্যে। তারপর আমরা ওদের বিচার করে শাস্তি দেব।

হাসিখুশি একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল, কোন অপরাধের জন্যে আমরা তাদের শাক্তি দেব?

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, অপরাধের কী আর শেষ আছে? মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করার অপরাধ। রবোমানবদের প্রতি অবিচার করার অপরাধ? পৃথিবীর সম্পদ ধ্বংস করার অপরাধ! এমন কী তাদের বিরুদ্ধে শিশু হত্যার অপরাধ পর্যন্ত আনতে পারি?

লাল চুলের মেয়েটি বলল, সেটা কী কেউ বিশ্বাস করবে? এই দুর্বল কাপুরুষ অথব কিছু মানুষ-তারা শিশু হত্যা করতে পারে সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না।

কঠিন চেহারার মানুষটি টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, একশবার বিশ্বাস করবে। পুরো নেটওয়ার্ক আমাদের দখলে, সেই নেটওয়ার্কে হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য সংরক্ষিত করে রাখা হবে। আমরা দিনকে রাত রাতকে দিন করতে পারব। সূর্যকে চাদ, চাঁদকে সূর্য করে ফেলতে পারব। বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি থুলকে সবচেয়ে বড় ভণ্ড হিসেবে দেখানো হবে। মানুষটি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আর এই বুড়োটিকে আমি নিজের হাতে খুন করতে চাই।

লাল চুলের মেয়েটি খিল খিল করে হেসে বলল, আমাকে সেই দৃশ্যটি নিজের চোখে দেখতে দেবে?

কেন?

দুটি কারণে, প্রথমত, এসব দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। দ্বিতীয়ত, তোমর মনে আছে আমার ঘরে একটা ছেলের মস্তিষ্ক আমি বাঁচিয়ে রেখেছি?

মনে আছে।

আমি তাকে এই ঘটনাটি নিজের মুখে বর্ণনা করতে চাই। যখন একজন মানুষের একটা মস্তিষ্ক ছাড়া আর কিছু থাকে না তখন তার থেকে অসহায় আর কিছু নেই। সেই অসহায় মানুষটির মস্তিষ্ক যখন আকুলি বিকুলি করতে থাকে সেটি দেখার চাইতে বড় বিনোদন আর কিছু হতে পারে না!

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, ঠিক আছে, আমি তোমাকে সেই দৃশ্যটি দেখতে দেব।

ধন্যবাদ! তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। অনেক অনেক ধন্যবাদ!

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, আজকে আমরা একত্র হয়েছি তোমাদের কিছু তথ্য জানতে। এখন পৃথিবীর সবকিছু পরিচালনা করে বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজন মানুষ। নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবার পর বিজ্ঞান আকাদেমীর জায়গায় চলে যাব আমরা এগারোজন মানুষ।

ধাতব টেবিল ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ করে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। কঠিন চেহারার মানুষটি হাসি হাসি মুখে বলল, কী হল, তোমরা হঠাৎ করে এতো শান্ত হয়ে গেলে কেন?

কেউ কোনো কথা বলল না। মানুষটি তার মুখের হাসিটিকে আরো বিস্তৃত হতে দিয়ে বলল, কী হল, তোমরা কেউ কথা বলছ না কেন?

সুদর্শন একজন মানুষ তার কপাল থেকে ঘাম মুছে বলল, আমরা এখানে বারোজন আছি, কিন্তু তুমি বলেছ আমরা এগারোজন!

তার মানে কী?

তার মানে এই বারোজনের একজন–

বারোজনের একজন?

থেকেও নেই।

চমৎকার বিশ্লেষণ! চমৎকার! তুমি যখন এতো চমৎকার বিশ্লেষণ করতে পার তোমাকে তাহলে আরো একটু বিশ্লেষণ করতে দিই। তুমি বল কোন মানুষটি এখানে থেকেও নেই?

সুদর্শন মানুষটি সবার মুখের দিকে তাকাল তারপর ঘুরে কঠিন চেহারার মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলল, এখানে যারা আছে তাদের কেউই কখনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নি। শুধু আমি তোমার সাথে পাশাপাশি কাজ করেছি। তুমি আর আমি মিলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছি।

তার অর্থ কী?

তার অর্থ আমাদের এই বারোজনের মাঝে কাউকে যদি মারা যেতে হয়, তাহলে সেটি হবে তুমি না হয় আমি।

চমৎকার, তাহলে তুমিই বল। মানুষটি কী তুমি না আমি?

সুদর্শন চেহারার মানুষটি একদৃষ্টে কঠিন চেহারার মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে ওঠে–সে ফিস ফিস করে বলল, দোহাই লাগে, আমাকে তুমি মেরে ফেলো না। আমি কী করেছি শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে!

কী করেছ?

কথা দাও তুমি আমাকে মেরে ফেলবে না।

রবোমানবেরা মানুষ নয়, তাদের কথার কোনো মূল্য নেই।

তবু কথা দাও!

না, আমি নাটকীয়তা পছন্দ করি না। তুমি বল।

সুদর্শন মানুষটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পৃথিবীর সাতজন মহাচারীকে নিয়ে একটি মহাকাশযান মহাকাশে যাত্রা করেছে। সেই সাতজন মহাকাশচারীর মাঝে দুইজন রবোমানব ঢুকিয়ে দিয়েছি।

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, কেমন করে সেটা করেছ?

নেটওয়ার্কের গভীরে আমার নিজস্ব যোগাযোগ আছে–

সুদর্শন মানুষটির কথা শেষ হবার আগেই কঠিন চেহারার মানুষটি তার পকেট থেকে একটা রিভলবার বের করে সুদর্শন মানুষটিকে পরপর অনেকগুলো গুলি করল। সুদর্শন মানুষটি কাত হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল, তার চোখে এক ধরনের অবিশ্বাসের দৃষ্টি।

কঠিন চেহারার মানুষটি ফিসফিস করে বলল, যে বিজ্ঞান আকাদেমীর সবচেয়ে গোপন প্রজেক্টে নিজের নাক গলাতে পারে তাকে বিশ্বাস করা ঠিক না।

সবাই মাথা নাড়ল, বলল, না। ঠিক না।

তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

কোনো উত্তর নেই। লাল চুলের মেয়েটি মাথা ঝাঁকিয়ে গলার স্বর আরেকটু উঁচু করে বলল, শুনতে পাচ্ছ আমার কথা?

এবারেও কোনো উত্তর নেই। লাল চুলের মেয়েটি খিল খিল করে হেসে বলল, আমি জানি তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ, তুমি ইচ্ছে করে আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না। কেন আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না? তুমি কী আমার উপরে রাগ করেছ?

না আমি রাগ করিনি। যে মানুষটির দেহ নেই, হাত পা মুখ চোখ কিছু নেই, যার অস্তিত্ব হচ্ছে শুধু একটা মস্তিষ্ক সে রাগ করতে পারে না।

চমৎকার। তোমার আর আমার সম্পর্কটি তাহলে ভালোবাসার সম্পর্ক! মধুর একটি ভালোবাসার সম্পর্ক!

আমি তোমার নিষ্ঠুরতা দেখে হতবাক হয়ে যাই। কী বলতে চাও বল। আলোহীন বর্ণহীন শব্দহীন গন্ধহীন অনুভূতিহীন আমার শূন্য জগৎটি ভয়ংকর। এর চাইতে ভয়ংকর কিছু হতে পারে না। কিন্তু তুমি প্রতিদিন আমার সাথে দুইএক মিনিট যে কথাগুলো বল সেটি সেই শূন্যতার জগৎ থেকেও ভয়ংকর। বল তুমি কী বলতে চাও। বলে আমাকে মুক্তি দাও।

আমি তোমাকে একটা সুসংবাদ দিতে চাই।

সুসংবাদ?

হ্যাঁ। সুসংবাদ।

কী সুসংবাদ? শুনতে আমার আতংক হচ্ছে। কিন্তু তুমি বল।

আর আটচল্লিশ ঘণ্টার মাঝে আমরা নেটওয়ার্ক দখল করে নেব। তখন পুরো পৃথিবীটা হবে আমাদের।

তোমরা পুরো পৃথিবীটা নিয়ে কী করবে?

লাল চুলের মেয়েটি খিল খিল করে হেসে বলল, এটি আবার কীরকম প্রশ্ন? মানুষ পৃথিবীটা দখল করে কী করেছে?

মানুষ তো পৃথিবী দখল করে নি! মানুষ সবাইকে নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থেকেছে। একেবারে ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে বিশাল নীল তিমিসবাইকে নিয়ে বেঁচে থেকেছে। তার কারণ মানুষের বেঁচে থাকার একেবারে গোড়ার কথা হচ্ছে ভালোবাসা! তোমাদের তো ভালোবাসা নেই–তোমরা কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? তোমরা কেন বেঁচে থাকবে?

লাল চুলের মেয়েটি খিল খিল করে হাসতে হাসতে বলল, আমরা কেমন করে বেঁচে থাকি সেটা দেখানোর জন্যেই আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব! বুঝেছ?

মস্তিষ্কটি উত্তরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল লালচুলের মেয়েটি খুট করে সুইচটি বন্ধ করে দিল। কাচের জারে ভেসে থাকা থলথলে মস্তিষ্কটির দিকে তাকিয়ে তার এক ধরনের ঘৃণাবোধ হয়। সে হেঁটে হেঁটে জানালার কাছে দাঁড়ায়। দূর পাহাড়ের পিছনে সূর্যটা আড়াল হয়ে যাচ্ছে, চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। লালচুলের মেয়েটি বাইরে তাকিয়ে থাকে, তার ভুরু দুটি কুঞ্চিত, কিছু একটা তাকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছে। মস্তিষ্কটি সত্যিই জিজ্ঞেস করেছে, পৃথিবী দখল করে তারা কী করবে?

সত্যিই তো। তারা কী করবে?

বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুল দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছিলেন, তার পাশে তথ্যবিজ্ঞানী জুহু দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যটা পাহাড়ের আড়ালে চলে যাবার সাথে সাথে চারদিকে আবছা অন্ধকার নেমে আসে।

মহামান্য থুল নিচু গলায় বললেন, যতক্ষণ সূর্য আকাশে থাকে ততক্ষণ একটিবারও মনে হয় না সেটি আড়াল হয়ে গেলে অন্ধকার নেমে আসবে।

তথ্যবিজ্ঞানী জুহু কী বলবে বুঝতে না পেরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। মহামান্য থুল মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালেন, জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের হাতে আর কতোক্ষণ সময় আছে?

সময় নেই। রবোমানবেরা ইচ্ছে করলে এখন যে কোনো মুহূর্তে নেটওয়ার্ক দখল করে নিতে পারে। তারা করছে না, অনুমান করছি তারা আরো একটু গুছিয়ে নিতে চাইছে।

তার মানে আমাদের হাতে খুব বেশি হলে আটচল্লিশ থেকে বাহাত্তর ঘণ্টা সময়।

জুহু বলল, কিংবা আরো কম!

নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবার পর কী হবে বলতে পারবে?

সবার আগে আমাদের এগারোজনকে খুন করবে।

তারপর?

তারা পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের সকল তথ্য পেয়ে যাবে। যত প্রতিষ্ঠান আছে তা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। পানি, বিদ্যুৎ, খাবার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। চিকিৎসার নিয়ন্ত্রণ নেবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করবে। এক সময় পৃথিবীতে বিশাল অস্ত্র ভাণ্ডার ছিল, এখন নেই। যদি থাকত তাহলে সবার আগে তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতো।

তারপর কী করবে বলে তোমার ধারণা?

পৃথিবীর সবচেয়ে কর্মক্ষম মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে যাবে।

হত্যা করার জন্যে?

ভয় দেখানোর জন্যে প্রথমে নিশ্চয়ই অনেক মানুষকে হত্যা করবে। তারপর তারা কর্মক্ষম মানুষগুলোকে রবোমানবে পাল্টে দিতে শুরু করবে।

তারপর?

তারপর ধীরে ধীরে পৃথিবীর সব মানুষকে রবোমানবে পাল্টে দেবে। কেউ কেউ হয়তো পালিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেবে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ রবোমানব হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক দিয়ে নিখুঁতভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে।

তারপর?

জুহুকে একটু বিভ্রান্ত দেখা গেল। ইতস্তত করে বলল, পৃথিবীর সব মানুষকে রবোমানবে পাল্টে দেয়ার পর কী আর কিছু বাকি থাকল?

নিশ্চয়ই বাকি আছে। তারপর কী হবে বলে তোমার ধারণা?

জুহু কোনো উত্তর দিল না।

রবোমানব বাবা-মায়ের রবোমানব সন্তান হবে পরের প্রজন্ম?

নিশ্চয়ই তাই হবে।

মহামান্য থুল খুব ধীরে ধীরে ঘুরে জুহুর দিকে তাকালেন, বললেন, তোমার ধারণা মানুষের মায়েরা যেভাবে তাদের সন্তানদের ভালোবেসে বুক আগলে রক্ষা করে রোমানবের মায়েরাও তাই করবে? যে ভালোবাসাকে তাদের মস্তিষ্ক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সন্তানের জন্যে সেই ভালোবাসা আবার ফিরে আসবে?

জুহু ইতস্তত করে বলল, আমি জানি না মহামান্য থুল। আমি সত্যিই জানি। আপনি কী জানেন?।

না। জানি না।

আপনি কি অনুমান করতে পারেন?

যে বিষয়টি সত্যি সত্যি জানা সম্ভব আমি সেটা অনুমান করতে চাই না।

এটা সত্যি সত্যি জানা সম্ভব?

মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, আজকে শুধু আমি প্রশ্ন করব। তুমি উত্তর দেবে। ঠিক আছে?

আপনি যেটি বলবেন সেটিই হবে মহামান্য থুল।

এবার আমি তোমাকে সম্পূর্ণ অন্য একটি প্রশ্ন করি।

জুহু মাথা নেড়ে বলল, করেন মহামান্য থুল।

আমাদের নেটওয়ার্কটি যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কী হবে?

জুহু চোখ বড় বড় করে মহামান্য থুলের দিকে তাকাল, আমতা আমতা করে বলল, নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেলে?

হ্যাঁ। আমাদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেলে-

আমাকে ক্ষমা করবেন মহামান্য থুল, কিন্তু আপনার প্রশ্নটি তো একটি অবাস্তব প্রশ্ন। এই নেটওয়ার্কটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেন কোনোভাবে এটি ধ্বংস না হয়। ঝড়, ভূমিকম্প, সুনামি, বন্যা, নিউক্লিয়ার বোমা কোনো কিছু যেন ধ্বংস করতে না পারে ঠিক সেভাবে এই নেটওয়ার্কটি তৈরি করা হয়েছে। মহামান্য থুল আপনি সবচেয়ে ভালো করে জানেন কোনোভাবে এই নেটওয়ার্ক

ধ্বংস করা সম্ভব নয়, আপনার যৌবনে আপনি এর ডিজাইন টিমে ছিলেন।

হ্যাঁ। আমি ছিলাম। আমি জানি যদি একটি নেটওয়ার্ক কোনোভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে তাহলে সেই নেটওয়ার্ককে পৃথিবীর সব মানুষের দায়িত্ব দেয়া যায় না। কাজেই এই নেটওয়ার্ককে ধ্বংস করা যাবে না। তারপরেও আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করি, যদি এই নেটওয়ার্কটি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কী হবে?

জুহু মাথা চুলকে বলল, মহামান্য থুল, আমার কথাকে আপনি ধৃষ্টতা হিসেবে নেবেন না। আপনার প্রশ্নটি অনেকটা এরকম, আমরা জানি পৃথিবীর আহ্নিক গতি কখনো বন্ধ হবে না, এটি সবসময়েই নিজের অক্ষের উপর চব্বিশ ঘণ্টায় একবার ঘুরবে। কিন্তু যদি বন্ধ হয় তাহলে কী হবে?

মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, হ্যাঁ। অনেকটা সেরকম।

জুহু বলল, মুহর্তে পৃথিবী লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। পানি, খাবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। রাস্তাঘাটে গাড়ি চলবে না। প্লেন উড়বে না। মানুষ মানুষকে চিনবে না। কাজে বের হয়ে নিজের ঘরে ফিরে আসতে পারবে না। চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে। স্কুল কলেজ গবেষণা বন্ধ হয়ে যাবে। এক কথায় সমস্ত পৃথিবী অচল হয়ে যাবে।

তারপর কী হবে?

সারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যাবে।

তারপর কী হবে?

মানুষে মানুষে হানাহানি শুরু হয়ে যাবে।

মহামান্য থুল খুব ধীরে ধীরে ঘুরে জুহুর দিকে তাকালেন, নিচু গলায় বললেন, তোমার তাই ধারণা? যখন খুব বড় বিপদ নেমে আসে তখন মানুষ একে অন্যকে সাহায্য না করে একে অন্যের সাথে হানাহানি শুরু করে? মানুষ তখন স্বার্থপরের মতো নিজের বিষয়টা দেখবে?

জুহু অপ্রস্তুত মুখে বলল, এর উত্তর আমি জানি না মহামান্য থুল। একটু থেমে সে যোগ করল, আপনি কী জানেন?

মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, না। জানি না।

অনুমান করতে পারেন?

যে বিষয়টা সত্যি সত্যি জানা সম্ভব আমি সেটা অনুমান করতে চাই না।

জুহু অবাক হয়ে মহামান্য থুলের দিকে তাকাল, একটু আগে তিনি ঠিক এই বাক্যটিই বলেছিলেন! জুহু দ্বিতীয়বার তাকে প্রশ্ন করার সাহস পেল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, মহামান্য থুল।

বল।

আমি আসলে আপনাকে একটা খারাপ খবর দিতে এসেছিলাম।

কী খারাপ খবর?।

মানুষের সভ্যতা বাঁচিয়ে রাখার জন্যে আমরা একটি মহাকাশযানে করে সাতজন মহাকাশচারী পাঠিয়েছিলাম।

হ্যাঁ। সাতজনের একটি পূর্ণাঙ্গ টিম। একজন শিশুসহ।

সেই টিমটিতে যেন কোনো রবোমানব যেতে না পারে তার জন্যে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু–

কিন্তু কী?

সাতজনের ভেতর দুইজন রবোমানব ঢুকে গেছে।

মহামান্য থুল ঘুরে জুহুর দিকে তাকালেন, কোন দুইজন?

জানি না। কেউ জানে না।

এখন কী করবে?

বুঝতে পারছি না মহামান্য থুল। সেজন্যে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।

আমার মনে হয় কিছুই করার প্রয়োজন নেই। যেভাবে চলছে চলুক।

আমরা পৃথিবী থেকে সিগন্যাল পাঠিয়ে মহাকাশযানটা ধ্বংস করে দিতে পারি।

মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, আমরা যদি রবোমানব হয়ে যেতাম তাহলে নিশ্চয়ই তাই করতাম। কিন্তু আমরা তো রবোমানব নই। আমরা খুব সাধারণ মানুষ। একটি তুচ্ছ কীটপতঙ্গের উপর হাত তুলতেও আমাদের হাত কাঁপে। আমরা কেমন করে কিছু অসহায় নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করব?

টুরান চোখ খুলে তাকাল। তার ঘুম ভেঙে গেছে–ঠিক করে বলতে হলে বলতে হবে তার ঘুম ভাঙিয়ে তাকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে। যার অর্থ তারা হয়তো কেপলার টুটুবি গ্রহে পৌঁছে গেছে। মাঝখানে কতোটুকু সময় পার হয়েছে কে জানে? এক বছর? একশ বছর? এক লক্ষ বছর? কী আশ্চর্য!

টুরান নিজের হাত নাড়ানোর চেষ্টা করল, পারল না। সেটি এখনো শিথিল হয়ে আছে। সে জানে ঘুম ভাঙার পর বেশ কিছুক্ষণ তার শরীর শিথিল হয়ে থাকবে, সেখানে জোর পাবে না। ধীরে ধীরে তার শরীরে শক্তি ফিরে পাবে। টুরান ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে থাকে। ক্যাপসুলের ভেতর মিষ্টি গন্ধের একটি শীতল বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে–এটি নিশ্চয়ই তার শরীরকে সতেজ করে তুলবে। খুব হালকা একটি সঙ্গীতের শব্দ ভেসে আসছে। মিষ্টি একটা সঙ্গীত, মনে হয় বহুদূরে কোনো একটা নদীর তীরে সে দাঁড়িয়ে আছে আর দূরে কোথাও কোনো একজন নিঃসঙ্গ শিল্পী নদীতীরে একটা গাছে হেলান দিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। টুরান তার চোখ বন্ধ করল। বুক ভরে কয়েকবার নিঃশ্বাস নিল, ভেতরে ভেতরে সে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করছে।

ক্যাপসুলের ভেতর টুক করে একটা শব্দ হল, সঙ্গীতটি বন্ধ হয়ে গেছে। ভেতরে একটা সবুজ আলো জ্বলে উঠেছে। টুরান তার হাতটি চোখের সামনে নিয়ে এল, তার শরীরে শক্তি ফিরে এসেছে। সে হাত দিয়ে ক্যাপসুলের ঢাকনাটি স্পর্শ করতেই সেটা নিঃশব্দে খুলে গেল। টুরান সাবধানে ক্যাপসুল থেকে বের হয়ে এসে ক্যাপসুলের পাশে দাঁড়াল। সে দাঁড়াতে পারছে, ভেসে যাচ্ছে না যার অর্থ মহাকাশযানটি তার অক্ষের উপর ঘুরছে, মহাকাশযানের মাঝে কৃত্রিম একটা মাধ্যাকর্ষণ তৈরি করে রাখা আছে।

টুরান মাথা ঘুরিয়ে ডানদিকে তাকাতেই সে চমকে ওঠে। মহাকাশযানের দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে ইহিতা বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

বসার ভঙ্গিটি দুঃখি মানুষের মতো, দেখে মনে হয় কিছু একটা নিয়ে ইহিতা গভীর বিষাদে ড়ুবে আছে। টুরান জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

কিছু হয় নি।

তুমি এমন করে বসে আছ কেন?

আমি তো এমন করেই বসি।

টুরান বলল, আমরা কেপলার টুটুবিতে পৌঁছে গেছি, মানুষের নতুন সভ্যতা শুরু করব, তোমার মাঝে তার উত্তেজনা দেখছি না।

আমরা কেপলার টুটুবিতে পৌঁছাই নি। আমাদের যাত্রা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

টুরান চমকে ওঠে বলল, কী বলছ তুমি?

আমরা সৌরজগতের ভেতরেই আছি।

টুরান উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, কেন? আমাদের যাত্রা কেন বন্ধ করে দেয়া

হল?

ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি না। ট্রিনিটি কিছু বলতে রাজি হচ্ছে না। যখন সবাই জেগে উঠবে তখন বলবে তার আগে বলবে না।

অন্যদের কখন জাগাবে? তোমাকে কেন আগে জাগিয়েছে?

আমাকে আগে জাগায় নি, সবাইকে একই সাথে জাগানো শুরু করেছে। একেকজনের শরীর একেকভাবে কাজ করে তাই একেকজন একেক সময়ে জেগে উঠছে।

টুরান হেঁটে হেঁটে অন্য ক্যাপসুলগুলোর কাছে যায়, ভেতরে কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করে আবার ইহিতার কাছে ফিরে এসে বলল, আমার কাছে পুরো ব্যাপারটি খুব দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে।

ইহিতা কথাটার কোনো উত্তর দিল না। টুরান তখন বলল, আমার কাছে মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু ঘটেছে। খুব খারাপ এবং ভয়ংকর।

সেটি কী হতে পারে?

আমি জানি না।

সবাই ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর ট্রিনিটি সবাইকে একটা ছোট হলঘরে নিয়ে এলো। ঘরটিতে বসার জন্যে কার্যকর চেয়ার, চেয়ারের সামনে ডেস্ক এবং ডেস্কে ধূমায়িত খাবার। ক্লদ ছাড়া আর কেউ সেই খাবারে উৎসাহ দেখাল না।

টুরান বলল, ট্রিনিটি, তুমি ভূমিকা ছেড়ে দিয়ে সোজাসুজি কাজের কথায় চলে এসো।

ট্রিনিটি বলল, আমি আসলে ভূমিকা করছি না। সোজাসুজি কাজের কথায় চলে এসেছি। আমি তোমাদেরকে একটি দুঃসংবাদ দেবার জন্যে ডেকে তুলেছি।

কেউ কোনো কথা না বলে দুঃসংবাদটি শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। ট্রিনিটি ভাবলেশহীন গলায় বলল, পৃথিবীটি রবোমানবেরা দখল করে নেবে সেই আশংকায় এই মহাকাশযানে করে তোমাদের সাতজনের নেতৃত্বে বিশালসংখ্যক মানুষ, মানুষের দ্রুণ, জিনোম, পশুপাখি, গাছপালা পাঠানো হচ্ছিল। এর উদ্দেশ্য মানুষ দূর মহাকাশের কোনো একটি উপযুক্ত গ্রহে বসতি স্থাপন করবে। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের কথা কিছুক্ষণ আগে পৃথিবী থেকে আমাকে জানানো হয়েছে তোমাদের সাতজনের মাঝে দুইজন রবোমানব।

ক্লদ ছাড়া অন্য সবাই ভয়ানক চমকে উঠল। ক্লদ ঠিক সেই মুহূর্তে তার খাবারের মাঝে একটা লাল চেরি আবিষ্কার করেছে। সে এটা খাবে না কি এটা দিয়ে খেলবে সেটি নিয়ে মনস্থির করতে পারছিল না।

টুরান কাঁপা গলায় বলল, কোন দুইজন?

আমি জানি না। পৃথিবীর মানুষও জানে না। এটি জানলে পুরো ব্যাপারটা খুব সহজ হয়ে যেতো।

সবাই সবার দিকে তাকাল, চোখে চোখ পড়তেই আবার তারা নিজেদের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ইহিতা জিজ্ঞেস করল, আমাদের ভেতর যারা রবোমানব তারা নিজেরা কী জানে যে তারা রবোমানব?

রবোমানবের মস্তিষ্কের থ্যালামাসে একটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ইমপ্ল্যান্ট বসানো হয় যেটা মস্তিষ্ককে পরিবর্তন করে, ওভার ড্রাইভ করে। তোমাদের দুজনের সেই ইমপ্লান্ট কার্যকর করা হয়ে থাকলে তোমরা ইতোমধ্যে জান যে তোমরা রবোমানব।

ইহিতা জানতে চাইল, সেটা কী কার্যকর করা হয়েছে?

আমি জানি না। এই মহাকাশযানে সেটা পরীক্ষা করার উপায় নেই।

নীহা জিজ্ঞেস করল, এখন কী করা হবে? আমরা কী আবার পৃথিবীতে ফিরে যাব?

না। ট্রিনিটি কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, তোমাদের সাতজনকে এই মহাকাশযান ছেড়ে চলে যেতে হবে।

সবাই চমকে উঠল, সুহা আর্তচিৎকার করে বলল, কী বলছো!

আমি কী বলেছি তোমরা সেটি শুনতে পেয়েছ, তারপরেও আমি আবার বলি। তোমাদের এই সাতজনকে মহাকাশযান ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমার এই মহাকাশযানের নিরাপত্তার জন্যে এখানে কোনো রবোমানবকে স্থান দেয়া যাবে না।

সুহা হাহাকারের মতো শব্দ করে বলল, আমরা কোথায় যাব? আমি আমার এই শিশু বাচ্চাকে নিয়ে কোথায় যাব?

ক্লদ এই ছোট হলঘরের ভেতরের উত্তেজনাটুকু টের পেতে শুরু করেছে। সে তার খাওয়ার প্যাকেটটি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল।

ট্রিনিটি বলল, আমরা পৃথিবী থেকে খুব বেশিদূর যাই নি। গ্রহাণু বেল্ট পার হয়েছি মাত্র। গতিপথ পরিবর্তন করে আমি মহাকাশযানটিকে মঙ্গলগ্রহ ঘিরে একটি কক্ষপথে নিয়ে এসেছি। তোমাদের একটা স্কাউটশিপে করে আমি মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

টুকন চিৎকার করে বলল, মঙ্গলগ্রহে?

হ্যাঁ মঙ্গলগ্রহে।

তুমি কী জান মঙ্গলগ্রহ হচ্ছে পৃথিবীর ভাগাড়। মানুষ যখন পুরোপুরি সভ্য হয় নি তখন ভয়ংকর পরীক্ষাগুলো করেছে মঙ্গলগ্রহে? এখানে রয়েছে তেজস্ক্রিয়তা, রয়েছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। শুধু তাই না এখানে জৈবিক পরীক্ষা হয়েছে। নতুন প্রাণ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। এরকম ভয়ংকর একটা জায়গায় আমাদের পাঠাবে?

হ্যাঁ। ট্রিনিটি শান্ত গলায় বলল, আমার কোনো উপায় নেই। আমি যখন জেনেছি তোমাদের দুজন রবোমানব এবং কোন দুজন রবোমানব আমার জানা নেই তখন এছাড়া আমার কিছু করার নেই। একটি কম্পিউটার হিসেবে আমাকে কোনো মানুষকে হত্যার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। যদি দেয়া হতো তাহলে শীতলঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় সাতজনকেই হত্যা করে আমি নিশ্চিত হয়ে যেতাম।

টর বিড়বিড় করে বলল, ভাগ্যিস ক্ষমতা দেয়া হয় নি। ক্ষমতা ছাড়াই তুমি যা ইচ্ছে তাই করতে পার।

ইহিতা বলল, ট্রিনিটি, তুমি কী বলছ সেটা চিন্তা করেছ?

চিন্তা প্রক্রিয়াটি মানুষের। আমি মানুষ নই, তাই চিন্তা করতে পারি না। তবে যে কোনো বিষয় আমি আমার মতো বিশ্লেষণ করতে পারি। কাজেই আমি যেটা বলেছি সেটা অনেক ভাবে বিশ্লেষণ করে বলেছি।

না। ইহিতা মাথা নাড়ল, তুমি পুরোপুরি বিশ্লেষণ কর নি। তুমি বলেছ মানুষকে হত্যা করার ক্ষমতা তোমাকে দেয়া হয় নি। কিন্তু যদি আমাদের ভয়ংকর বাস-অযোগ্য মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে দাও আমরা কিন্তু সবাই মারা যাব। রবোমানব আর সাধারণ মানুষ সবাই মারা যাব। কাজেই তুমি আসলে আমাদের হত্যাই করছ।

ট্রিনিটি গমগমে গলায় বলল, তোমার বক্তব্য সঠিক নয়। মঙ্গলগ্রহে অনেকবার মানুষ এসেছে গেছে। এখানে তারা অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছে। এখানে অনেক জায়গায় মানুষের পরিত্যক্ত আবাসস্থল আছে, সেখানে খাবার আছে, রসদ আছে। তোমরা ইচ্ছে করলেই একরম একটি দুটি আবাসস্থল খুঁজে বের করে সেখানে আশ্রয় নিতে পার। সেখানে তোমরা মানুষেরা এবং রবোমানবেরা নিজেদের মাঝে বোঝাপাড়া করে নিতে পারবে।

টুরান বলল, আমরা সেই বোঝাঁপড়া এখানে বসে করতে পারি।

ট্রিনিটি বলল, না।

ইহিতা বলল, এটি সরাসরি আমাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া।

ট্রিনিটি বলল, আমার কিছু করার নেই।

সুহা হাহাকার করে বলল, আমার সাথে একটি ছোট শিশু। একটা নিরাপদ জীবনের জন্যে আমি ছোট শিশুকে নিয়ে বের হয়েছি। আমাদের এই বিপদের মাঝে ঠেলে দিয়ো না।

ট্রিনিটি বলল, স্কাউটশিপটা প্রস্তুত করে রাখা আছে। তোমরা সেখানে ওঠো।

নীহা অবাক হয়ে বলল, এখনই?

হ্যাঁ। এখনই।

আমরা যদি রাজি না হই।

ট্রিনিটি বলল, অবশ্যই রাজি হবে। টরকে জিজ্ঞেস করে দেখো আমার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে থাকা সম্ভব কী না!

ইহিতা বলল, আমাদের পুরো ব্যাপারটি ভেবে দেখার সময় দিতে হবে। আমরা মানুষ, এই মহাকাশযানটির নেতৃত্ব আমাদের দেয়া হয়েছে। তুমি একটা কম্পিউটার, তোমায় আমাদের সাহায্য করার কথা। আমাদের আদেশ নির্দেশ মেনে চলার কথা। আমাদের পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে দাও, ভাবনা-চিন্তা করতে দাও।

তোমরা মানুষ—এবং রবোমানব, শুধুমাত্র এই কারণে আমি তোমাদের ভাবনা-চিন্তা করতে দেব না। তার কারণ তোমরা এমন কোনো একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে পারবে যার কারণে আমি তোমাদের রেখে দিতে বাধ্য হব। আমি সেরকম পরিস্থিতিতে যেতে রাজি নই। তোমরা স্কাউটশিপে উঠে যাও।

ঘরের ভেতরে যারা আছে তারা সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। সুহা কাতর গলায় বলল, তোমাদের ভেতর যে রবোমানব সে নিজের পরিচয় দিয়ে দাও। দোহাই তোমাদের। আমাদের সবাইকে মেরে ফেলো না?

নীহা বলল, রবোমানবদের বুকের ভেতর কোনো ভালোবাসা থাকে না। তারা তোমার কথাকে কোনো গুরুত্ব দেবে না। তারা একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছে। সেই উদ্দেশ্য সফল না হওয়া পর্যন্ত তারা এখান থেকে যাবে না।

ট্রিনিটি গমগমে গলায় বলল, তোমরা স্কাউটশিপে উঠে যাও। এক মিনিটের মাঝে স্কাউটশিপে উঠে না গেলে আমি জোর করতে বাধ্য হব।

ক্লদ জিজ্ঞেস করল, মা, আমরা স্কাউটশিপে করে কোথায় যাব? মঙ্গলগ্রহে। ক্লদের মুখে হাসি ফুটে উঠল, বলল, কী মজা হবে। তাই না মা?

সুহা অসহায়ভাবে একবার ক্লদের মুখে আরেকবার সবার মুখের দিকে তাকাল। ট্রিনিটি আবার বলল, দশ সেকেন্ড পার হয়ে গেছে। আর পঞ্চাশ সেকেন্ড বাকি আছে।

সবাই পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। ট্রিনিটি বলল, আর চল্লিশ সেকেন্ড।

সবার আগে ইহিতা ওঠে দাঁড়াল। তার দেখাদেখি অন্য সবাই। ইহিতা ফিসফিস করে বলল, ট্রিনিটি, তুমি মানুষ হলে আমি তোমাকে অভিশাপ দিতাম। কিন্তু তুমি একটি নির্বোধ কম্পিউটার, তোমাকে অভিশাপ দেয়া অর্থহীন। তবু আমি অভিশাপ দিচ্ছি। তুমি যেন মানুষের হাতে ধ্বংস হও।

ট্রিনিটি বলল, পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড।

স্কাউটশিপটি গর্জন করতে করতে নিচে নামতে থাকে। যতদূর দেখা যায় বিস্তৃত লালাভ একটি গ্রহ, লালচে মেঘ, নিচে প্রবলবেগে ধূলিঝড় বয়ে যাচ্ছে।

স্কাউটশিপটির তীব্র ঝাকুনি সহ্য করতে করতে নীহা বলল, মঙ্গল গ্রহ সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ এর ভর পৃথিবীর দশভাগের এক ভাগ, ব্যাসার্ধ পৃথিবীর অর্ধেক। তাই এখানে আমাদের ওজন হবে সত্যিকার ওজনের মাত্র তিনভাগের এক ভাগ।

টুরান বলল, যতক্ষণ মঙ্গলগ্রহে থাকব সারাক্ষণ আমাদের বায়ুনিরোধক পোশাক পরে থাকতে হবে। সেটি অত্যন্ত বিশেষ ধরনের পোশাক, তার ওজন দিয়ে আমাদের ওজন একটু বাড়ানো হবে, তারপরেও আমাদের সবসময়ই নিজেদের হালকা মনে হবে।

নীহা মনিটরে কিছু তথ্য দেখে বলল, মঙ্গলগ্রহের বায়ুমণ্ডল খুবই হালকা, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মাত্র একশ ভাগের এক ভাগ। বাতাসের পঁচানব্বই ভাগই কার্বনডাই অক্সাইড! তিন ভাগ নাইট্রোজেন।

সুহা জানতে চাইল, অক্সিজেন? অক্সিজেন নেই?

খুবই কম। এক হাজার ভাগের এক ভাগের মতো।

টুরান বলল, আমাদের পোশাকে সেই অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন আলাদা করে নিঃশ্বাস নেবার জন্যে দেয়া হবে।

টর জিজ্ঞেস করল, পানি আছে?

প্রচুর পানি, কিন্তু সেগুলো দুই মেরুতে জমা আছে। বরফ হিসেবে।

ইহিতা বলল, কিছু মাথা খারাপ বিজ্ঞানী মেরু অঞ্চলের বরফ গলিয়ে পানির প্রবাহ তৈরি করে এখানে প্রাণের বিকাশ ঘটাতে চেয়েছিল।

সুহা জানতে চাইল, প্রাণের বিকাশ হয়েছিল?

ইহিতা মাথা নেড়ে বলল, পরিষ্কার করে কেউ বলতে পারে না। এটা হচ্ছে পৃথিবীর অন্ধকার জগতের সময়ের ঘটনা। সারা পৃথিবী তখন নানারকম দেশে ভাগ হয়েছিল। কেউ গরিব কেউ বড়লোক। শক্তি বলতে তেল গ্যাস-এক দেশ তেল গ্যাসের জন্যে আরেক দেশ দখল করে ফেলত। সেই সময় পৃথিবীতে কোনো নিয়ম নীতি ছিল না, যার জোর সে পৃথিবী শাসন করত। সেই সময়ে উন্নত দেশের কিছু মাথাখারাপ বিজ্ঞানী মঙ্গলগ্রহের উপযোগী প্রাণ তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। কেউ বলে পেরেছিল, কেউ বলে পারে নি।

নীহা জানতে চাইল, তুমি এতো কিছু কেমন করে জান?

কৌতূহল।

স্কাউটশিপটা একটা ঝড়ো হাওয়ার মাঝে আটকা পড়ে যায়, ভয়ানক ঝাকুনি হতে থাকে। ভেতরের সবাই সিটের সামনে ব্র্যাকেটগুলো ধরে তাল সামলানোর চেষ্টা করে। টর একটা কুৎসিত গালি দিয়ে বলল, মঙ্গলগ্রহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে হয়।

শুধু ক্লদ আনন্দে চিৎকার করে ওঠে, তার কাছে মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে একটা খেলা।

স্কাউটশিপটা পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত থেমে গেল। টুরান বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, সবাই ঠিক আছ?

সেটা নির্ভর করে ঠিক থাকা বলতে কী বোঝায় তার ওপর। নীহা বলল, বেঁচে আছি।

আপাতত বেঁচে থাকা মানেই হচ্ছে ঠিক থাকা।

ইহিতা বলল, কেউ একজন স্কাউটশিপের লগটা পড়ে বলবে আমরা এখন কোথায়। কী করব?

পঁচিশ ডিগ্রি অক্ষাংশ যেটা এখন গ্রীষ্মকাল। তাপমাত্রা শূন্যের নিচে পাঁচ ডিগ্রি, যেটা এখানকার হিসেবে বেশ গরম।

টুরান বলল, খুব কাছাকাছি মানুষের একটা আশ্রয়স্থল থাকার কথা, যে জন্যে স্কাউটশিপটা এখানে থেমেছে।

হ্যাঁ। মনিটরে সেটা দেখতে পাচ্ছি। এখানে কেউ নেই, আমরা মনে হয় আশ্রয় নিতে পারব।

নীহা বাইরে তাকিয়ে বলল, আমাদের স্কাউটশিপটা রীতিমতো একটা ধুলার ঝড় তৈরি করেছে। ধুলাটুকু সরে গেলে মনে হয় সূর্যটাকে দেখতে পাব। আকারে ছোট দেখাবে।

ইহিতা বলল, আকার নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না, সূর্যটাকে দেখলে অন্তত মনে হবে পরিচিত কিছু একটা দেখছি!

স্কাউটশিপের জানালা দিয়ে সবাই বাইরে তাকিয়েছিল, ধুলো সরে গেলে তারা বিস্তীর্ণ প্রান্তর দেখতে পেল। যতদূর চোখ যায় লাল পাথরে ঢাকা, ঘোলাটে লাল আকাশে একটি লালচে সূর্য। রুক্ষ পাথুরে প্রান্তর দেখে মন খারাপ হয়ে যায়।

রুহান বলল, আমরা এই ছোট স্কাউটশিপে বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। মানুষের ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে হবে।

নীহা বলল, তাহলে দেরি না করে চল রওনা দিই।

রওনা দেয়ার আগে অনেক প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের সবার দীর্ঘ সময়ের জন্যে স্পেসস্যুট পরে নিতে হবে।

ইহিতা বলল, অন্তত স্কাউটশিপে স্পেসস্যুটগুলো দেয়ার জন্যে ট্রিনিটিকে একটা ধন্যবাদ দিতে হয়।

টর বলল, ট্রিনিটির নাম কেউ মুখে আনবে না। আমি নিজের হাতে একদিন ট্রিনিটিকে খুন করব।

ট্রিনিটি নিয়ে আরো আলাপ শুরু হয়ে যাবার উপক্রম হতে চলছিল কিন্তু তখন ক্লদ চিৎকার করে বলল, আমি স্কাউটশিপে থাকতে চাই না। আমি বের হতে চাই।

রুহান বলল, শুধু তুমি নও। ক্লদ আমরা সবাই বের হতে চাই।

তাহলে আমরা কেন বের হচ্ছি না?

টুরান নরম গলায় বলল, স্পেসস্যুটটা পরেই আমরা বের হব। একটু সময় দাও।

দেখা গেল একটু সময় দিয়ে হল না। সাতজন মানুষের স্পেসস্যুট পরতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগে গেল। সবচেয়ে ঝামেলা হলো ক্লদকে স্পেসস্যুট পরাতে। নুট এমনিতে কোনো কথা বলে না কিন্তু ক্লদকে স্পেসস্যুটে পরানোর সময় সে তাকে সাহায্য করল। স্পেসস্যুট পরার পর স্বচ্ছ নিওপলিমারের একটা আবরণ তাদের শরীরটাকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলল। মাথায় একটা হেলমেট, সেই হেলমেটের সাথে যোগাযোগ মডিউলে একে অন্যের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা। পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার। বায়ুমণ্ডল থেকে যেটুকু অক্সিজেন পাওয়া সম্ভব সেটাকেই সংগ্রহ করে ক্রমাগত সিলিন্ডারে ভরে দেয়ার একটা পাম্প কাজ করে যাচ্ছে।

স্কাউটশিপ থেকে বের হওয়ার মুহূর্তটি ছিল সবচেয়ে অনিশ্চিত মুহূর্ত। নিরাপত্তার জন্যে সবাইকে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বের হতে হবে। কেউ মুখ ফুটে বলছে না কিন্তু সবাই জানে তাদের ভেতর যে দুজন রবোমানব তারা হাতে আগ্নেয়াস্ত্রটি নিয়েই সেটা ঘুরিয়ে অন্য সবাইকে শেষ করে দিতে পারে। যারা মানুষ তারা জানে না এখানে কোন দুজন রবোমানব, কিন্তু যারা রবোমানব তারা খুব ভালো করে জানে এখানে কারা মানুষ।

সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে হাতে নিয়ে নামছে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। তীব্র উত্তেজনাটুকু কমিয়ে দিল ক্লদ, সে বলল, আমাকে? আমাকে অস্ত্র দেবে না?

সুহা বলল, বাবা, এটা খেলনা না। এটা সত্যিকারের অস্ত্র।

আমি জানি এটা খেলনা না। আমি খুব সাবধানে ধরে রাখব।

উঁহু। বড় না হওয়া পর্যন্ত হাতে অস্ত্র নেয়া নিষেধ।

টুরান তার দিকে একটা ডিটেক্টর এগিয়ে দিয়ে বলল, তুমি বরং এটা নিতে পার।

এটা কী?

এটা তেজস্ক্রিয়তা মাপার একটা ডিটেক্টর। মঙ্গল গ্রহে পৃথিবী থেকে অনেক তেজস্ক্রিয়তা ফেলা হয়েছে। আমরা যেন ভুল করে কোনো তেজস্ক্রিয় জায়গায় চলে না যাই সেজন্যে এটা আমাদের সাথে রাখতে হবে। আশপাশে তেজস্ক্রিয় কিছু থাকলেই এটা কট কট শব্দ করবে।

হাতে সত্যিকারের একটা অস্ত্র নিতে না পারার দুঃখটা ক্লদের খানিকটা হলেও ঘুচে গেল। সে ডিটেক্টরটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকে দেখতে থাকে কোথাও কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায় কি না।

স্কাউটশিপের গোল দরজা বন্ধ করে সাতজনের দলটা হাঁটতে শুরু করে। স্পেসস্যুটের ভেতর বাতাসের তাপ, চাপ, জলীয় বাষ্পের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে রাখার পরও তারা বাইরের হিমশীতল পরিবেশটুকু অনুভব করে। একধরনের ঝড়ো বাতাস বইছে, মাঝে মাঝেই চারদিকে ধূলায় ধূসর হয়ে যাচ্ছিল তার মাঝে তারা সারি বেঁধে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। স্পেসস্যুটের পোশাকে নানা ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি তারপরেও তাদের নিজেদের অনেক হালকা মনে হয়, প্রতিটি পদক্ষেপ দেবার সময় তারা খানিকটা উপরে ওঠে যায়। যদিও তারা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে কিন্তু দেখে মনে হয় লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে।

কতোক্ষণ গিয়েছে জানে না তখন হঠাৎ করে ক্লদের আনন্দধ্বনি শোনা গেল, পেয়েছি! পেয়েছি!

ইহিতা জানতে চাইল, কী পেয়েছ?

তেজস্ক্রিয়তা।

টুরান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথায় তেজস্ক্রিয়তা পেয়েছ?

এই তো আমার ডিটেক্টরে। এই দেখ কট কট শব্দ করছে।

সবাই অবাক হয়ে শুনল সত্যিই ডিটেক্টরটা কট কট শব্দ করছে। নীহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, আমরা কি ভুল করে কোনো তেজস্ক্রিয় এলাকায় চলে এসেছি?

টুরান মাথা নাড়ল, বলল, না। আমি নিশ্চিতভাবে পরীক্ষা করে দেখেছি। আশপাশে কোনো তেজস্ক্রিয়তা নেই।

তাহলে এখন কোথা থেকে আসছে?

ইহিতা উপরের দিকে তাকাল, বলল, হয়তো বাতাসে ভেসে আসছে?

টুরান ডিটেক্টরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, না এটা উপর থেকে আসছে। এটা নিচে থেকে আসছে।

হঠাৎ করে ডিটেক্টরের শব্দ বেড়ে যেতে শুরু করে। সাথে সাথে তারা পায়ের নিচে একটা কম্পন অনুভব করে।

মাটির নিচে দিয়ে কিছু একটা তাদের দিকে আসছে। সবাই তাদের অস্ত্র হাতে তুলে নিল।

কম্পনের সাথে সাথে এবার তারা সামনে পাথরের মাঝে কিছু একটা নড়ে যেতে দেখল। মাটির নিচে দিয়ে কিছু একটা তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের মনে হতে থাকে যে কোনো মুহূর্তে পাথর ভেদ করে কিছু একটা ভয়ংকর চিৎকার করে বের হয়ে আসবে, কিন্তু কিছু বের হলো না। তাদের পায়ের নিচে দিয়ে সেটা ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল। ডিটেক্টরে তেজস্ক্রিয়তার শব্দটা কমতে কমতে এক সময় মিলিয়ে গেল।

সুহা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, এটা কী?

ইহিতা বলল, কোনো একটা প্রাণী।

মঙ্গলগ্রহে প্রাণী আছে?

আগে ছিল না। মনে হচ্ছে এখন আছে।

কাছে এলে তেজস্ক্রিয়তা বেড়ে যায় কেন?

নিশ্চয়ই শক্তি পায় তেজস্ক্রিয়তা থেকে। এটা যেহেতু তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাগাড়, শক্তিটাও এখান থেকে পাবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? তেজস্ক্রিয়তার শক্তি অনুপরমাণুকে ছিন্নভিন্ন। করে দিতে পারে। এই প্রাণীর দেহ তাহলে কী দিয়ে তৈরি?

এটা নিশ্চয়ই আমাদের পরিচিত প্রাণীর মতো না। অন্যরকম।

কীভাবে অন্যরকম?

জানি না। হয়তো প্রাণী আর যন্ত্রের একটা হাইব্রিড।

টুরান বলল, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে চল অগ্রসর হই। চার দেওয়াল আর ছাদের নিচে থাকলে মনে হয় একটু ভরসা পাব।

হ্যাঁ চল।

সবাই আবার অগ্রসর হতে থাকে। ক্লদ জিজ্ঞেস করল, মঙ্গল গ্রহের প্রাণীটা দেখতে কেমন হবে?

সুহা বলল, আমি জানি না। জানতেও চাই না। সেটা যেন আমরা কোনোদিন জানতে না পারি।

ক্লদ বলল, আমি কিন্তু জানতে চাই।

কেউ তার কথার উত্তর দিল না। সবার জীবনই যদি একটা শিশুর জীবনের মতো সহজ সরল হত তাহলে মন্দ হত না!

কুগুরাভ সমীকরণের দ্বিতীয় সমাধানটা নীহার মাথায় আসি আসি করেও আসছিল না। কমপ্লেক্স প্লেনের কোথায় সমাধানটি হবে বোঝা যাচ্ছে, সমাধানটির ক্ষেত্রটিও পেয়ে গেছে শুধু সমাধানটি পাচ্ছে না। নীহা গভীরভাবে চিন্তা করে নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল হঠাৎ করে সে বাস্তব জগতে ফিরে এল। কেউ একজন তাকে ডাকছে, নীহা। কোথায় যাচ্ছ তুমি? দাঁড়াও।

নীহা দাঁড়াল, কুগুরাভ সমীকরণের কথা চিন্তা করতে করতে সে কখন সবাইকে ছেড়ে একা একা খানিকটা দূরে চলে এসেছে লক্ষ করে নি। নীহা শুনল, টর বলছে, আমরা পৌঁছে গেছি।

কোথায় পৌঁছে গেছি?

যেখানে পৌঁছানোর কথা। মানুষের আবাসস্থল।

মানুষ কী আছে?

না। মানুষের থাকার কথা নয়। মঙ্গলগ্রহে এখন আমরা কয়জন ছাড়া আর কোনো মানুষ নেই।

নীহা হেঁটে হেঁটে অন্যদের কাছে ফিরে এল। জিজ্ঞেস করল, মানুষের আবাসস্থলটা কোথায়?

টর হাত দিয়ে সামনের একটা পাথরের স্তৃপকে দেখিয়ে বলল, এইতো, এটা।

নীহা বলল, দেখে মোটেই মানুষের আবাসস্থল মনে হচ্ছে না।

টর হাতে ধরা মডিউলটা দেখে বলল, মনে না হলেও কিছু করার নেই। এটাই সেই জায়গা। মনে হয় মাটির নিচে তৈরি করেছে।

ইহিতা জিজ্ঞেস করল, এখন আমরা কী করব?

সুহা বলল, ভেতরে ঢুকব। অন্ততপক্ষে চারদিকে দেয়াল আর মাথার উপরে একটা ছাদ তো থাকবে।

কেমন করে ঢুকব? নীহা জানতে চাইল, দরজা কোথায়? চাবি কোথায়?

টুরান বলল, একটা ব্যবস্থা থাকবে। জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে আশ্রয় দেয়ার একটা কোড আছে, সেই কোডটি দিলেই দরজা খুলে যাবে। আগে দরজাটি খুঁজে বের করা যাক।

দরজাটা সহজেই খুঁজে পাওয়া গেল। কী প্যাডে যখন কোড সংখ্যাটি প্রবেশ করানো হচ্ছে তখন ক্লদ দরজাটাকে পা দিয়ে একটা লাথি দেয়, সাথে সাথে কঁাচ ক্যাচ শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। টুরান অবাক হয়ে বলল, দরজাটা খোলা।

ইহিতা দরজাটা পরীক্ষা করে বলল, কেউ একজন এটা ভেঙে আগে ভেতরে ঢুকেছে।

নীহা বলল, তার মানে এটা আশ্রয় হতে পারে, কিন্তু নিরাপদ আশ্রয় নয়। টুরান বলল, এখন কী করব?

টর বলল, অবশ্যই ভেতরে ঢুকব। ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে দুশ্চিন্তা করার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে!

সে অস্ত্রটা হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল, বলল, আমি সবার আগে যাই। তোমরা পিছনে পিছনে এসো।

ভেতরে একটা ঝাঁপসা খোলা আলো। একটা সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে, সাবধানে পা ফেলে টর এগিয়ে যায়। অন্যেরা তার পিছু পিছু নামতে থাকে। নিচে একটুখানি খোলা জায়গা সেখানে দাঁড়িয়ে তারা চারদিকে তাকায়। সামনে একটা ভারী দরজা, দরজার ওপরে একটা বাতি জ্বলছে নিভছে। টর এগিয়ে এসে দরজা লাথি দিতেই দরজাটা খুলে গেল, দরজায় অন্যপাশে একজন দীর্ঘদেহী মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটির হাতে একটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, অস্ত্রটি তাদের দিকে তাক করে মানুষটি ভারী গলায় বলল, তোমরা কারা? এখানে কেন এসেছ? তোমরা জান না এখানে ভয়ংকর বিপদ?

টর বলল, আমরা ঘটনাক্রমে এখানে এসেছি, আমাদের একটু আশ্রয় দরকার। এখানে বিপদটি কী?

মানুষটি তাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, টরের কথাটি শুনেছে কিংবা শুনে থাকলেও বুঝেছে বলে মনে হল না। মানুষটি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল, তোমরা কারা? এখানে কেন এসেছ? তোমরা জান না এখানে ভয়ংকর বিপদ?

ইহিতা বলল, এটা সত্যিকারের মানুষ না। হলোগ্রাফিক ছবি।

টর মানুষটির হলোগ্রাফিক শরীরের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলে যেতে যেতে বলল, কিছু একটা বিপদের কথা বলছে। মানুষকে সাবধান করার জন্যে এটাকে বসানো হয়েছে।

ইহিতা বলল, টর খুব সাবধান।

আমি সাবধান আছি।

ক্লদ বলল, আমার যন্ত্র আবার কটকট শব্দ করছে।

সবাই চমকে উঠল। শুনতে পেল সত্যিই তেজস্ক্রিয়তা মাপার ডিটেক্টরটি খুব মৃদুভাবে শব্দ করছে। টুরান ডিটেক্টরটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল। এখানে খুব অল্প তেজস্ক্রিয়তা আছে। আমাদের জন্যে বিপজ্জনক পরিমাণে নয়কিন্তু আছে।

টর হাতের অস্ত্রটা ধরে সাবধানে অগ্রসর হয়। চারপাশে কয়েকটা ঘর, ঘরের ভেতর নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরের মেঝেতে মানুষের ব্যবহারী কিছু জিনিসপত্র, জামাকাপড়, পানীয় এর বোতল–শুকনো রক্তের ছোপ, সবকিছু মিলিয়ে মনে হয় এখানে কোনো একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে।

শেষ ঘরটির ছাদ ভেঙে পড়েছে। দেওয়ালে বিস্ফোরণের চিহ্ন–একদিকে একটা বিশাল গর্ত। সেই গর্ত দিয়ে একটা সুড়ঙ্গে মতো বের হয়ে গেছে। তারা কিছুক্ষণ এই সুড়ঙ্গটার দিকে তাকিয়ে থাকে, ইহিতা নিচু গলায় বলল, এই সুড়ঙ্গটা কী যাবার জন্যে নাকি আসার জন্যে?

টর বলল, আমরা ভিতরে ঢুকে দেখতে পারি।

ইহিতা মাথা নাড়ল, বলল, না। আমরা এমনিতেই অনেক বড় বিপদের মাঝে আছি। নতুন করে বিপদ ডেকে আনার কোনো প্রয়োজন নেই।

ঠিক তখন ক্লদের কথা শোনা গেল, সে চিৎকার করছে, সবাই এসো দেখে যাও।

সবাই গিয়ে দেখল, সে একটা ছোট দরজা খুলে ভিতরে তাকিয়ে আছে। টুরান নিচু হয়ে দেখল, একটি মৃতদেহ। মানুষটি কতদিন আগে মারা গেছে বোঝার উপায় নেই, সমস্ত শরীর শুকিয়ে চামড়া হাড়ের উপর লেগে আছে। মানুষটির হাতে একটি ভিডি রেকর্ডার শক্ত করে ধরে রেখেছে।

সবাই এক ধরনের আতংক নিয়ে মৃতদেহটির দিকে তাকিয়ে রইল। নীহা ভয়ার্ত গলায় বলল, মানুষটির চোখে মুখে কী আতংক লক্ষ করেছ?

ইহিতা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ কী দেখে এতো ভয় পেয়েছ কে জানে?

হাতের ভিডি রেকর্ডারে হয়তো রেকর্ড করা আছে।

টর তখন নিচু হয়ে মৃত মানুষটির হাতে শক্ত করে ধরে রাখা ভিডি রেকর্ডারটি ছুটিয়ে আনে। উপরের লাল বোতামটি স্পর্শ করার সাথে সাথে ঘরের মাঝামাঝি একটি মানুষের ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাফিক ছবি ভেসে আসে। অস্পষ্ট ছবি, মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে মাঝে মাঝে ছবিটা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে তারপর আবার ফিরে আসছে। তারা শুনতে পেল, মানুষটি কাঁপা গলায় বলছে, বিপদ। এখনে খুব বড় বিপদ। তোমরা কারা আমার কথা শুনছ আমি জানি না, কিন্তু আমি তোমাদের বলছি তোমরা এক্ষুণি এই আবাসস্থল ছেড়ে চলে যাও। তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো এই আবাসস্থলের দেয়াল ভেঙে ফেলেছে তারা এখন এখানে ঢুকতে পারে… কিমি আর লুসাকে ধরে নিয়ে গেছে… আমাদেরকেও নেবে… কী ভয়ংকর একটি প্রাণী… এদের জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, ধ্বংস নেই… কী ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো…

ইহিতা এগিয়ে এসে ভিডি রেকর্ডারের বোতাম টিপে সেটাকে বন্ধ করে বলল, ক্লদের মতো ছোট একটা শিশুর সামনে এটা দেখা ঠিক হচ্ছে না।

টর বলল, কিন্তু আমাদের জানা দরকার মানুষটি কী বলছে।

সুহা বলল, ঠিক আছে আমি ক্লদকে সরিয়ে নিই। তোমরা দেখ।

ক্লদ বলল, না আমি যাব না। আমি শুনব মানুষটি কী বলছে।

না তুমি শুনবে না।

আমি শুনব।

না। তুমি শুনবে না–বলে সুহা ক্লদকে ধরে সরিয়ে নিল।

সবাই তখন মানুষটির কথা শুনল। কথাগুলো অনেকটা তার দিনলিপির মতো, সে ছাড়াছাড়া ভাবে, বিচ্ছিন্নভাবে বলছে। অনেক কথা বলছে, বেশিরভাগই আতংকের কথা, অসহায়তার কথা। ক্রোধ এবং ক্ষোভের কথা। তারপরও তার কথা থেকে তারা অনেকগুলো জরুরি বিষয় জানতে পারল। এই মানুষগুলো বুদ্ধিমান প্রাণী সৃষ্টির একটা গোপন মিশনে এসেছিল। পৃথিবীর মতো এখানে যেহেতু কোনো জৈব জগৎ নেই তাই প্রাণীটার শক্তির জন্যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করেছে। যে প্রাণীটি তৈরি হয়েছে সেটি সত্যিকার অর্থে বুদ্ধিমান প্রাণী হয় নি। যেহেতু নতুন করে তাদের জন্মানোর কোনো উপায় নেই তাই অন্যভাবে নিজেদের তৈরি করার পদ্ধতি বের করে নিয়েছে। মানুষদের ধরে তাদের শরীর টুকরো টুকরো করে ব্যবহার করছে। পুরো প্রক্রিয়াটা বীভৎস–যারা এই গোপন মিশনে এসেছিল তারা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে। যারা পালাতে পারে নি তারা প্রাণীগুলোর হাতে মারা পড়েছে।

যে বিষয়টা সবচেয়ে ভয়ংকর সেটি হচ্ছে তাদের ধ্বংস করা যায় না–গুলি করে বা বিস্ফোরণে শরীরটাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিলেও তারা ছিন্ন ভিন্ন অংশগুলো জুড়ে দিয়ে নতুন করে তাদের তৈরি করে নেয়। তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে শক্তি পায় বলে তাদের কোনো রসদের অভাব নেই। মাটির নিচে দিয়ে এরা সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে, প্রয়োজন না হলে উপরে ওঠে না, সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত চলে যেতে পারে।

মানুষটির কাছ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য পেয়েছে। মানুষের এই আবাসস্থলটি তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো দখল করে নিলেও এখন থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে একটা খুব সুরক্ষিত আবাসস্থল রয়েছে যেখানে তেজস্ক্রিয় প্রাণী ঢুকতে পারে না। সেখানে কোনোভাবে আশ্রয় নিতে পারলে তারা বেঁচে যাবে।

ভিডি রেকর্ডে মানুষের কথাগুলো শেষ হবার পর সবাই একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, টর জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন কী করব?

টুরান বলল, করার তো খুব বেশি কিছু নেই। এই আবাসস্থলটা মোটেও নিরাপদ নয়, তাই আমাদের যেতে হবে সুরক্ষিত আবাসস্থলটিতে।

কেমন করে যাব? প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার পথ।

হেঁটে যাওয়া ছাড়া কি অন্য কোনো পথ আছে?

টর মাথা নাড়ল, বলল, নেই।

তাহলে দেরি করে লাভ নেই। চল রওনা দিই।

ইহিতা বলল, আমাদের সাথে চার বছরের একটা শিশু আছে ভুলে যেও।

টুরান বলল, না। আমরা ভুলি নি।

নীহা খানিকটা অনিশ্চিত ভাবে বলল, আমি একটা বিষয় জিজ্ঞেস করতে পারি?

অবশ্যই। ইহিতা বলল, জিজ্ঞেস তো করতেই পার, কিন্তু আমরা কেউ তার উত্তর জানি কী না সেটা অন্য ব্যাপার।

নীহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোমরা লক্ষ করেছ আমরা কিন্তু ছোট একটা ঘটনা থেকে আরেকটা ঘটনার মাঝে দিয়ে যাচ্ছি। আমরা পুরো ব্যাপারটা কখনো দেখছি না।

টর ভুরু কুঁচকে বলল, পুরো ব্যাপারটা কী?

আমরা এই গ্রহে আটকা পড়েছি, আমরা কোনোভাবে মহাকাশযানে ফিরে যেতে পারব না। আগে হোক পরে হোক তেজস্ক্রিয় প্রাণী আমাদের খেয়ে ফেলবে।

টর বলল, তুমি কী বলতে চাইছ?।

নীহা বলল, আমি বলছি কেউ একজন আমাকে ভবিষ্যতের একটা পরিকল্পনা দেখাও। মিনিট মিনিট করে বেঁচে থাকতে আমার ঘেন্না ধরে গেছে।

ইহিতা নরম গলায় বলল, নীহা! আমরা যে বিষয়টা ভুলে থাকার ভান করছি, তুমি ঠিক সেই ব্যাপারটা টেনে এনেছ। সত্যি কথা বলতে কী আমরা মিনিট মিনিট করে বেঁচে আছি কারণ সেটা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। আমরা শুধু সময়টা কাটিয়ে যাচ্ছি, এ ছাড়া আর কিছু করার নেই, সেজন্যে।

নীহা বলল, আমি এই পৃথিবীতে কারো কাছে কিছু চাই নি। শুধু নিজের জন্যে একটু সময় চেয়েছিলাম। নিরিবিলি নিজের সাথে একটু সময়। আমি সেটাও পেলাম না। সেজন্যে দুঃখ দুঃখ লাগছে।

তারা যখন কথা বলছে তখন সুহা আর ক্লদও সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, ক্লদ কৌতূহলী চোখে নীহার দিকে তাকিয়ে রইল, সুহা বলল, মানুষকে কখনো আশা ছেড়ে দিতে হয় না।

নীহা বলল, আমি আশা ছেড়ে দিতে চাই না। আমাকে বল, আমি কী নিয়ে আশা করে থাকব? আমি এই অনিশ্চিত অবস্থাটা আর সহ্য করতে পারছি না, মনে হচ্ছে আমাদের ভেতরে যে দুইজন রবোমানব আছে তারা যদি আমাকে গুলি করে মেরে ফেলত তাহলেই বুঝি বেশি ভালো হত! কে রবোমানব? আমাকে মেরে ফেলবে অনুগ্রহ করে?

সবাই নীহাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল, কী বলবে কেউ বুঝতে পারছে না। নীহা ভাঙা গলায় বলল, আমাকে এখানে রেখে তোমরা যাও। আমি বসে কুগুরাভ সমীকরণের সমাধানের কথা চিন্তা করতে থাকি। এক সময় তেজস্ক্রিয় প্রাণী এসে আমাকে খেয়ে সব ঝামেলা চুকিয়ে দেবে! অন্তত আমি যেটা করতে ভালোবাসি সেটা করতে করতে মারা যাব।

এই দীর্ঘ সময়ে নুট নিজে থেকে কখনো একটি কথাও বলে নি। এবার সে এগিয়ে এসে বলল, আমি কী একটা কথা বলতে পারি?

সবাই চমকে ওঠে নুটের দিকে তাকাল।

ইহিতা বলল, নুট! তুমি যে আমাদের সাথে আছ সেই কথাটি আমাদের কারো মাথাতেই আসে না! অবশ্যই তুমি কথা বলতে পারবে। আমরা শুনতে চাই তুমি কী বলবে। কেমন করে বলবে!

নুট ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, কথা না বলতে বলতে আমি কেমন করে কথা বলতে হয় সেটাই ভুলে গেছি!

নীহা বলল, তোমার গলার স্বর সুন্দর। আমাদের মাঝে তোমার সবচেয়ে বেশি কথা বলা উচিত ছিল।

নুট দুর্বলভাবে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, ধন্যবাদ নীহা। কিন্তু আমি অবশ্যি গলার স্বর নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলাম না। তুমি যে বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন করেছ আমি সারাক্ষণ শুধু সেটাই ভেবেছি। ভেবে ভেবে একটা উত্তর পেয়েছি।

কী উত্তর পেয়েছ?

তুমি ভবিষ্যতের একটা পরিকল্পনা জানতে চেয়েছ, আমি তোমাকে সেই পরিকল্পনা দিতে পারি। একেবারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

সত্যি?

হ্যাঁ।

পরিকল্পনাটা খুবই সহজ, তার জন্যে আমাদের এক-দুইজনকে হয়তো মারা যেতে হবে, কিন্তু যারা বেঁচে থাকবে তাদের একটা সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকবে।

ইহিতা বলল, সেটি কী বলে ফেল নুট।

আমাদের এখনই পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মানুষের আবাসস্থলটাতে যেতে হবে। সেখানকার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে নয়। অন্য কারণে।

কী কারণে?

এই লম্বা পথ পায়ে হেঁটে যেতে আমাদের কয়েকদিন লাগবে। এই সময়টাতে তেজস্ক্রিয় প্রাণী নিশ্চিতভাবে আমাদের আক্রমণ করবে। তখন আমরা একটা ভয়ংকর বিপদে পড়ব। আমার ধারণা তখন আমাদের মাঝে কারা মানুষ কারা রবোমানব সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

কেউ কোনো কথা না বলে স্থির দৃষ্টিতে নুটের দিকে তাকিয়ে রইল। নুট বলল, আমরা যদি রবোমানবদের আলাদা করতে পারি তখন হয় তারা না হয় আমরা বেঁচে থাকব। আমাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি, দুই কারণে। প্রথম কারণ, আমরা সংখ্যায় বেশি।

ইহিতা জানতে চাইল, দ্বিতীয় কারণ?

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আমি জানি আমাদের কোন দুইজন রবোমানব। কাজেই তারা হঠাৎ করে কিছু করতে পারবে না। অন্ততপক্ষে আমি সতর্ক থাকব!

সবাই ভয়ানকভাবে চমকে উঠল, টর তীব্র স্বরে জিজ্ঞেস করল, কোন দুইজন?

নুট মাথা নাড়ল, বলল, আমি বলব না। আমি সেটা জানি কিন্তু আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। প্রমাণ ছাড়া আমার কথার কোনো গুরুত্ব নেই, বরং সেটা একটা জটিলতা তৈরি করবে। আমি তাই প্রমাণের জন্যে অপেক্ষা করছি।

টর মাথা নেড়ে বলল, আসলে তুমি জান না।

জানি।

তুমি কথা বলতে না সেটাই ভালো ছিল।

নুট হাসার চেষ্টা করল, আমি বলতে চাই নি কিন্তু নীহা ভেঙে পড়ছে দেখে বলছি। নুট নীহার দিকে তাকিয়ে বলল, যখন আমরা একশভাগ খাঁটি প্রমাণসহ রবোমানবদের আলাদা করব–তখন ট্রিনিটি আমাদের যে কয়জন বেঁচে থাকবে সেই বাকি মানুষদের মহাকাশযানে নিয়ে নেবে। তুমি সেটাকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হিসেবে নিতে পার।

নীহা কিছুক্ষণ নুটের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, ধন্যবাদ নুট। তুমি আমার ভেতরে যথেষ্ট কৌতূহল তৈরি করেছ! আমি আরো এক দুই দিন বেঁচে থাকার জন্যে চেষ্টা করতে রাজি আছি!

চমৎকার।

ক্লদ নুটের পোশাক স্পর্শ করে বলল, নুট!

বল।

কোন দুইজন রবোমানব আমিও সেটা জানি।

নুট হাসল, বলল, চমৎকার! কিন্তু কাউকে সেটা বল না। আমাদের কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।

ক্লদ মাথা নাড়ল, না বলব না।

মহামান্য থুল বাগানে তার চেয়ারটিতে বসেছিলেন। সূর্য ড়ুবে যাবার পর একটা শীতল বাতাস বইতে শুরু করেছে। তার একটা গরম কাপড় গায়ে দিয়ে বসা উচিত ছিল। দুই হাত বুকের কাছে এনে অনেকটা শিশুর মতো গুটিসুটি মেরে তিনি চেয়ারে বসে রইলেন।

পাশে তথ্যবিজ্ঞানী জুহু দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, মহামান্য থুল, এখন আপনার ঘরের ভেতরে চলে যাওয়া উচিত।

মহামান্য থুল বললেন, ঠিকই বলেছ, কিন্তু উঠতে আলস্য লাগছে। বয়স হয়ে গেলে এটি হচ্ছে সমস্যা! সহজ কাজটিও তখন কঠিন।

তাহলে কি আপনার জন্যে একটা গরম কাপড় নিয়ে আসব?

না, না, না, কোনো প্রয়োজন নেই! মহামান্য থুল ব্যস্ত হয়ে বললেন, তুমি বরং চেয়ারটা টেনে বস। তোমার সাথে একটু কথা বলি।

জুহু একটা চেয়ার টেনে মহামান্য থুলের কাছে বসল। মহামান্য থুল দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, পৃথিবীতে খাবারের পরিবহনের কাজটা কী শেষ করা হয়েছে?

করা হয়েছে মহামান্য থুল। আপনি যেভাবে বলেছেন সেভাবে পৃথিবীর একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও খাদ্যশস্যকে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

শুকনো প্রোটিন?

সেটিও।

মৌলিক ওষুধপত্র।

যথেষ্ট পরিমাণে।

চমৎকার।

কেন সেটি করা হল সেটি আমরা কেউ বুঝতে পারছি না। মূল ভাণ্ডার থেকে প্রয়োজনের সময় খাবার পাঠানো অনেক বেশি কার্যকর পদ্ধতি। এখন অনেক জায়গায় নতুন করে শস্য সংরক্ষণের জন্যে ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এতো অল্প সময়ে সেটা করা খুব সহজ হয় নি। তারপরেও করেছি–আপনার নির্দেশ সবাই খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছে।

ধন্যবাদ জুহু।

মহামান্য থুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, জুহু।

বলুন মহামান্য থুল।

আমরা যে মহাকাশযানটা পাঠিয়েছিলাম তার খবর কী জান?

জানি মহামান্য থুল। জুহু মাথা নেড়ে বলল, তাদের নিয়ে দুঃসংবাদ আছে।

কী দুঃসংবাদ।

সাতজন মহাকাশচারীর মাঝে দুইজন রবোমানব জানার পর মহাকাশযানের মূল কম্পিউটার সাতজন অভিযাত্রীকেই মহাকাশযান থেকে বের করে দিয়েছে।

বের করে দিয়েছে? কোথায়? মঙ্গল গ্রহে।

মহামান্য থুল শিস দেয়ার মতো শব্দ করলেন। মঙ্গল গ্রহ তো থাকার উপযোগী গ্রহ নয়। সেখানে গত শতাব্দীতে তেজস্ক্রিয় এক ধরনের প্রাণী তৈরি করা হয়েছিল। সেই প্রাণীগুলো তো এখনো শেষ হয় নি।

জুহু মাথা নাড়ল, বলল, খুবই ভয়ংকর পরিবেশ। মহাকাশচারীদের বেঁচে থাকার কথা না। সম্ভবত সবাই এর মাঝে মারা গেছে।

মহামান্য থুল মাথা নেড়ে বললেন, যদি সম্ভব হয় তুমি তাদের সাথে একটু যোগাযোগ করতে পারবে?

পারব মহামান্য থুল। যদি তারা বেঁচে থাকে তাহলে পারব।

চমৎকার।

মহামান্য থুল হঠাৎ করে একটা গভীর চিন্তায় ড়ুবে গেলেন। জুহু কী করবে বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইল। তারপর অত্যন্ত দ্বিধান্বিত ভাবে বলল, মহামান্য থুল, আমি কী এখন চলে যাব?

হ্যাঁ, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। যাবার আগে শুধু তোমার কাছে একটা জিনিস জানতে চাই।

বলুন মহামান্য থুল।

প্রিসা নগরীর উত্তরে একটা বন আছে না?

আছে মহামান্য থুল।

সেই বনে কী একটা আগুন লাগানো সম্ভব?

জুহু অবাক হয়ে বলল, আগুন লাগনো?

হ্যাঁ।

আপনি আদেশ দিলে অবশ্যই সম্ভব!

কিন্তু কাজটি করতে হবে গোপনে। মহামান্য থুল দুর্বল ভঙ্গিতে হেসে বললেন, কেন এটা করতে চাইছি তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো না!

আমার খুবই কৌতূহল হচ্ছে, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করব না।

ধন্যবাদ জুহু। তুমি আগামীকাল দুপুরে বনটিতে আগুন লাগিয়ে দিও। আর তার একটু আগে লিন্টাস শহরের নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্রের পানি সরবরাহ কেন্দ্রে পাঁচ লিটার তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ফেলে আসতে হবে।

পাঁচ লিটার তেজস্ক্রিয় আয়োডিন?

হ্যাঁ।

কাজটি খুবই বিপজ্জনক, কিন্তু আপনি চাইলে অবশ্যই করা সম্ভব। জুহু। খুব কষ্ট করে তার বিস্ময়টুকু গোপন করে বলল, আর কিছু মহামান্য থুল?

হ্যাঁ। আরো কয়েকটা ছোট বড় কাজ। যদি আমার জন্য করে দাও তাহলে খুব ভালো হয়।

আপনি বলুন।

মহামান্য থুল তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে জুহুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই যে এখানে আমি লিখে দিয়েছি! তুমি পড়ে হাসাহাসি করো না!

জুহু বলল, আপনার নির্দেশ শুনে আমি হাসাহাসি করব? কী বলছেন আপনি মহামান্য থুল!

নির্দেশগুলো হাস্যকর সেজন্যে বলছি!

জুহু কাগজের লেখাগুলো পড়ল। সেখানে বিচিত্র বিচিত্র অনেকগুলো নির্দেশ দেয়া আছে। মাজুরা ইলেকট্রিক কোম্পানির ফোরম্যানকে অগ্রিম বোনাস দেয়া, সবুজ পৃথিবী শিশু স্কুলের বাচ্চাদের সকাল দশটায় আর্ট মিউজিয়ামে নেয়া, মাহীরাহদের সুইস গেট খুলে নিচের শুষ্ক অঞ্চলকে প্লাবিত করে দেয়া, বিনোদনের জন্যে আলাদা করে রাখা দুটি উপগ্রহকে অচল করে দেয়া, এরকম অনেকগুলো বিচিত্র নির্দেশ দেয়া আছে। মহামান্য থুলের ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জুহুর মনে কোনো সন্দেহ নেই বলে সে কাগজে লেখাগুলো পড়ে বিচলিত হল না। মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি নিশ্চিত থাকুন মহামান্য থুল। আপনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন ঠিক সেভাবে প্রত্যেকটা কাজ করা হবে।

ধন্যবাদ জুহু। অনেক ধন্যবাদ।

জুহু মহামান্য থুলকে অভিবাদন জানিয়ে লম্বা পা ফেলে বের হয়ে এল। থুল একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মাইক্রোফোনের সুইচটি অন করে লাল চুলের মেয়েটি বলল, তুমি কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

মস্তিষ্কটি ভারী গলায় বলল, হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি।

লাল চুলের মেয়েটি বলল, আজকে খুব একটা বিশেষ দিন। আজকে তোমার সাথে অবশ্যই কথা বলতে হবে।

মস্তিষ্কটি কোনো উত্তর দিল না। মেয়েটি বলল, কী হল তুমি কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন?

তুমি জান, আমি তোমার উচ্ছাসে অংশ নিতে পারি না। যেটি তোমার বিশেষ দিন পৃথিবীর মানুষের জন্যে সেটি নিশ্চয়ই খুব অশুভ একটি দিন।

লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, তুমি ঠিকই অনুমান করেছ! তুমি শুনতে চাও না কেন এটি মানুষের জন্যে অশুভ?

না। আমি শুনতে চাই না।

না চাইলেই হবে না। তোমাকে শুনতে হবে। এগুলো গোপন কথা। ভয়ংকর গোপন কথা। সারা পৃথিবীতে এখন আমরা মাত্র কয়েকজন রবোমানব এটি জানি। এটা কাউকেই বলার কথা না। কিন্তু আমি নিশ্চিন্তে তোমাকে সবকিছু বলতে পারি! তোমার মতো নিরাপদ শ্রোতা সারা পৃথিবীতে আর একটিও নেই।

আমি শুনতে চাই না।

তোমাকে শুনতে হবে। লাল চুলের মেয়েটি কঠিন মুখে বলল, তোমাকে অবশ্যই শুনতে হবে। আমার যা ইচ্ছে হয় আমি তোমাকে বলব তোমার তার সবকিছু শুনতে হবে!

লাল চুলের মেয়েটি তার পানীয়ের গ্লাসে খানিকটা উত্তেজক পানীয় ভরে এনে জানালায় পা ভাঁজ করে বসে বলল, তুমি শুনে নিশ্চয়ই আতংকিত হবে, আমরা আমাদের কাউন্ট ডাউন শুরু করেছি। আগামীকাল বিকেল তিনটা হচ্ছে আমাদের আক্রমণের সময়। পৃথিবীর সব বড়বড় আক্রমণ হয় ভোর রাতে। আমরা ঠিক করেছি আমাদের আক্রমণটি হবে দিনের আলোতে। সন্ধ্যেবেলা সব মানুষ যখন সারাদিনের ব্যস্ততা কাটিয়ে নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে বিশ্রাম নেবে তখন আমরা আমাদের ঘোষণাটি প্রচার করব। ঘোষণায় কী বলা হবে শুনতে চাও?

মস্তিষ্কটি নিচু গলায় বলল, না শুনতে চাই না।

তুমি শুনতে চাও কি না চাও তাতে কিছু আসে যায় না। ঘোষণাটি হবে এরকম, বলা হবে, পৃথিবীর রবোমানবেরা। তোমরা যে ঘোষণাটির জন্য দীর্ঘদিন থেকে অপেক্ষা করছিলে, আমরা এখন সেই ঘোষণাটি করতে চাই। আজ থেকে পৃথিবীতে সকল বৈষম্য সকল অবিচারের অবসান হয়েছে। এই পৃথিবীতে যে সম্প্রদায়ের বুদ্ধিমত্তা বেশি, যে সম্প্রদায়ের মেধা বেশি, ক্ষমতা বেশি সেই সম্প্রদায়ের অধিকারও বেশি। মানুষের যে অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে পৃথিবীতে সভ্যতা গড়ে উঠতে পারছে না, সেই নেতৃত্বকে অপসারণ করা হয়েছে। প্রিয় রবোমানব এবং মানুষেরা তোমরা শুনে খুশি হবে যে নেতৃত্বের কারণে পৃথিবীতে আমাদের অত্যাচার নির্যাতন অবিচার আর বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে সেই নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।

মস্তিষ্কটি আর্ত চিৎকার করে উঠল, না! লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হেসে ওঠে বলল, না? কেন না? এটা হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না।

মেয়েটি তার পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। এটি আসলেই হতে পারে না। এটি আসলে একটা মিথ্যা ঘোষণা। বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজন সদস্যকে বিচার করা হবে সেই ঘোষণাটি আসলে সত্যি নয়। কেন সত্যি নয় জান?

না। জানি না।

তার কারণ, আগামীকাল বিকেল তিনটার সময় সবার আগে তাদের বাসায় গিয়ে তাদের হত্যা করা হবে। কে কাকে হত্যা করবে সেটাও ঠিক হয়ে গেছে। আমাদের সর্বাধিনায়ক হত্যা করবে তোমাদের মহামান্য থুলকে! নিজের হাতে। সেই দৃশ্যটি দেখার জন্যে আমার সমস্ত শরীর আকুলি বিকুলি করছে! মেয়েটি অপ্রকৃতস্থের মতো একটা শব্দ করে বলল, আহ্! সেই দৃশ্যটি কী অভূতপূর্ব হবে তুমি চিন্তা করতে পার?

মস্তিষ্কটি কাতর গলায় বলল, আমি চিন্তা করতে চাই না। আমি শুনতে চাই। তোমার দোহাই লাগে–

মেয়েটির শরীরে উত্তেজক পানীয় কাজ করতে শুরু করেছে। সে মাটিতে পা দাপিয়ে বলল, তোমাকে শুনতে হবে হতভাগা মস্তিষ্ক! তোমাকে সব শুনতে হবে। নেটওয়ার্ক দখল করে আমরা কীভাবে সব রবোমানবকে নির্দেশ পাঠাব তোমাকে সেটা শুনতে হবে। কীভাবে অস্ত্রাগারের দরজা খুলে দেয়া হবে সেটা শুনতে হবে। কীভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দখল হবে শুনতে হবে, কীভাবে শস্যভাণ্ডার দখল হবে শুনতে হবে, কীভাবে সুস্থ সবল মানুষের মাথায় ইমপ্লান্ট বসিয়ে রবোমান তৈরি করব শুনতে হবে।

মস্তিষ্কটি আর্ত চিৎকার করে বলল, শুনতে চাই না! আমি কিছুই শুনতে চাই–দোহাই তোমার–

লাল চুলের মেয়েটি অপ্রকৃতস্থের মতো হাসতে থাকে। কিছুতেই হাসি থামাতে পারে না।

সাতজনের ছোট দলটি নিঃশব্দে হেঁটে যেতে থাকে। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। পৃথিবী হলে এখানে পাখির ডাক থাকত, ঝি ঝি পোকার ডাক থাকত { গাছের পাতার মাঝে বাতাসের শিরশির শব্দ থাকত। দূর থেকে কোনো একজন নিঃসঙ্গ ভবঘুরের গানের সুর ভেসে আসত। এখানে কিছু নেই। ইহিতার কাছে এই নৈঃশব্দটুকু অসহ্য মনে হয়।

ইহিতা দূরে তাকাল। সূর্যটি অস্ত যাচ্ছে, লাল এই গ্রহে দূরে নিপ্রাণ সূর্যটিকে কেমন যেন অপরিচিত মনে হয়। ঠিক পৃথিবীর মতোই খুব ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নেমে আসবে। একটু পর ঘুটঘুটে অন্ধকারে ড়ুবে যাবে। মঙ্গল গ্রহের কুৎসিত চাঁদ দুটি আকাশে থাকবে কী না কে জানে, থাকলেই সেটা কতোটুকু আলো দিতে পারবে সেটাই বা কে জানে। শৈশবে এই গ্রহটিকে নিয়ে সে কতো পড়াশোনা করেছে, তখন কী সে কল্পনা করেছিল একটি নির্বোধ কম্পিউটারের কারণে এই গ্রহটিতে নির্বাসিত হয়ে যাবে?

একটি ঢালু পাহাড়ের নিচে এসে সুহা বলল, আমরা এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। ক্লদ মনে হয় একটু ক্লান্ত হয়ে গেছে।

ক্লদ বলল, উঁহু। আমি ক্লান্ত হই নি। আমি কখনো ক্লান্ত হই না।

ইহিতা বলল, চমৎকার! কিন্তু পরিশ্রম করলে ক্লান্ত হওয়াটা দোষের কিছু নয়। তুমি যদি ক্লান্ত হও, তাহলে আমাদের বল। আমরা তোমাকে ট্রান্সপোর্টারে বসিয়ে নিয়ে যাব। কোনো পরিশ্রম ছাড়াই তখন যেতে পারবে।

টুরান বলল, আমাদের একটা বাই ভার্বাল থাকলে চমৎকার হতো, অনেক তাড়াতাড়ি যেতে পারতাম।

টর দাঁত কিড়মিড় করে বলল, হতভাগা ট্রিনিটি আমাদের ছোট একটা স্কাউটশিপে করে এখানে পাঠিয়েছে, খাবার আর পানি নিয়েই টানটানি, এখানে বাই ভার্বাল কেমন করে পাঠাবে? ৮৪

নীহা আপন মনে তার কুগুরাভ সমীকরণ সমাধান খুঁজে যাচ্ছিল, তার চারপাশে সবাই কে কী বলছে ভালো করে শুনছিল না। হঠাৎ করে সে বলল, আমার অনেকক্ষণ থেকে একধরনের অস্বস্তি হচ্ছে। আমি কেন জানি আমার ভাবনায় মনোযোগ দিতে পারছি না।

কেন?

আমার–আমার—নীহা তার ব্যাকটিকে শেষ না করে থেমে গেল।

ইহিতা জানতে চাইল, তোমার কী?

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, কেউ আমাদের চোখে চোখে রাখছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমাদের লক্ষ করছে। কেমন জানি অশুভ একটা অনুভূতি।

সুহা বলল, সেটি হতেই পারে। আমরা সবাই তেজস্ক্রিয় প্রাণীকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে আছি।

নীহা মাথা নাড়ল, বলল, না সেরকম নয়। আমার অনুভূতিটি অনেক বাস্তব। মনে হচ্ছে কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। চারদিকে অন্ধকারমনে হচ্ছে অন্ধকারের বাইরে অনেকগুলো চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

টুরান কষ্ট করে একটু হাসির মতো শব্দ করল, বলল, তেজস্ক্রিয় প্রাণী নিয়ে ভয় আমার ভেতরেও আছে। কিন্তু অশুভ অনুভূতি বা অন্ধকারে চোখ এগুলো তোমার কল্পনা। কারণ তেজস্ক্রিয় প্রাণী যদি কাছাকাছি আসে তাহলে আমাদের মিটারে আমরা রিডিং পাব। এই দেখো এখানে কোনো রিডিং নেই। বলে টুরান

তেজস্ক্রিয়তা মাপার ছোট যন্ত্রটি নীহাকে দেখাল।

ঠিক তখন তেজস্ক্রিয়তা মাপার যন্ত্রটা থেকে হঠাৎ করে কট কট করে এক ধরনের শব্দ হতে থাকে। সবাই বিস্ফারিত চোখে মিটারটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে কাটাটি নড়ছে, কিছু আলো জ্বলতে নিভতে থাকে আর শব্দটা দ্রুততর হতে থাকে।

ইহিতা নিচু গলায় বলল, নীহার ধারণা সঠিক। প্রাণীগুলো আমাদের দিকে আসছে।

নীহা আর্ত চিৎকার করে বলল, সর্বনাশ!

সুহা বলল, আমরা কী করব?

ইহিতা বলল, প্রাণীগুলোকে ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে।

কীভাবে?

অস্ত্র দিয়ে। ইহিতা ডানে বামে তাকাল, বলল, পিছনে বড় পাথরগুলো আছে, এখানে দাঁড়াই তাহলে শুধু সামনের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি নাও। শোনো খুব কাছে না আসা পর্যন্ত গুলি কর না। গুলি যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট

হয়।

সবাই ছুটে বিশাল পাথরটাকে পিছনে রেখে দাঁড়াল। ইহিতা হেলমেটের সুইচ টিপে সেটাকে ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর জন্যে সংবেদনশীল করার চেষ্টা করে। অবলাল আলোতে কিছু দেখতে পেল না কিন্তু আলট্রাভায়োলেট তরঙ্গে যেতেই সে প্রাণীগুলোকে স্পষ্ট দেখতে পায়। অনেকগুলো প্রাণী গুড়ি মেরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রাণীর শরীরের যে জায়গা থেকে অতিবেগুনি রশ্মি বের হচ্ছে শুধু সেই অংশটুকু দেখতে পাচ্ছে তাই প্রকৃত আকারটা বোঝা যাচ্ছে না। অনুমান করা যায় প্রাণীটি আকারে খুব উঁচু নয়–হাত-পা থাকতে পারে, দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে।

ইহিতা ফিসফিস করে বলল, তোমাদের হেলমেট অতিবেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নাও।

নীহা জানতে চাইল, তাহলে কী হবে?

প্রাণীগুলো দেখতে পাবে।

নীহার সাথে সাথে অন্য সবাই তাদের হেলমেটের গগলস অতি বেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নিল, সাথে সাথে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসা প্রাণীগুলো দেখতে পায়। টর চাপা স্বরে একটা কুৎসিৎ গালি দিয়ে বলল, আরেকটু কাছে আয় হতভাগারা–অনেকদিন কারো উপর গুলি চালাই নি।

ইহিতা ফিসফিস করে বলল, সাবধান, প্রয়োজন না হলে গুলি করো না।

কেমন করে বুঝব প্রয়োজন নেই!

যদি দেখ প্রাণীগুলো থেমে গেছে। যদি দেখ আমাদের দিকে এগিয়ে না এসে ইতস্তত অন্যদিকে যাচ্ছে।

কেন থেমে যাবে? কেন ইতস্তত অন্যদিকে যাবে?

ইহিতা ফিসফিস করে বলল জানি না। শুধু দেখ যায় কি না।

সবাই অস্ত্র তাক করে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে ঠিক তখন যেন ইহিতার ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করার জন্যেই প্রাণীগুলোর গতি কমে আসে, প্রাণীগুলোর অনেকগুলো থেমে যায়, অনেকগুলো ইতস্তত এদিক-সেদিক হাঁটতে থাকে।

টুরান ফিসফিস করে বলল, কী হয়েছে? ইহিতা বলল, সবাই চুপ। কেউ একটা কথা বলবে না। একটা শব্দ করবে। কোনো কিছু না নড়লে প্রাণীগুলো দেখতে পায় না। কেউ নড়বে না। একেবারে কাছে এলেও নড়বে না।

সবাই নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকে। প্রাণীগুলো ইতস্তত এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। একটা প্রাণী তাদের কাছাকাছি এসে ডানদিকে সরে যায় সেখান থেকে হঠাৎ করে ঘুরে সোজাসুজি তাদের দিকে এগিয়ে আসে। সুহা ফিসফিস করে বলল, সর্বনাশ!

অন্য কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই দেখল কিছু একটা দুলতে দুলতে তাদের দিকে আসছে। কাছাকাছি আসার পর প্রথম প্রাণীটার অবয়ব স্পষ্ট দেখা যায়। রেডিয়েশন মিটারটি নিঃশব্দ করে রাখা আছে বলে সেটি শব্দ করছে না কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রচণ্ড রেডিয়েশনে তার কাটাটি থরথর করে কাঁপছে।

প্রাণীটি আরো কাছে এগিয়ে আসে, এটি পৃথিবীর কোনো প্রাণীর মতো নয়। মনে হয় মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে একটি অতিকায় কুৎসিত ক্লেদাক্ত কীট তৈরি করা হয়েছে। ধারালো দাঁতের পিছনে লকলকে জিব। চোখ আছে কী নেই বোঝা যায় না। প্রাণীটি খুব কাছে এসে তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখল তারপর একটু বাম দিকে সরে দুলতে দুলতে নড়তে নড়তে সরে গেল। হঠাৎ করে তারা মাটিতে একটা কম্পন অনুভব করে সাথে সাথে সবগুলো প্রাণী একসাথে ঘুরে গেল তারপর ছুটতে ছুটতে দূরে অদৃশ্য হয়ে গেল। ইহিতা ফিসফিস করে বলল, এখনো কেউ কোনো শব্দ করো না। কেউ একটুও নড়ো না। প্রাণীগুলো আগে একেবারে সরে যাক।

যখন প্রাণীগুলো একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল তখন নীহা একটা দীর্ঘশ্বাসকে বুক থেকে বের করে দিয়ে বলল, খুব বাঁচা বেঁচে গেছি।

টর বলল, একটা গুলি পর্যন্ত করতে পারলাম না।

তুমি গুলি করতে চাইছিলে?

হ্যাঁ। অনেকদিন কোনো অস্ত্র ব্যবহার করি নি, হাত নিশপিশ করছিল।

সবাই এক ধরনের সন্দেহের চোখে টরের দিকে তাকিয়ে থাকে। টুরান একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি একটা কথা বলতে পারি?

সবাই এবার ঘুরে টুরানের দিকে তাকাল, সুহা বলল, বল।

টুরান বলল, তোমাদের মনে আছে আমরা যখন মহাকাশযানে করে আমাদের যাত্রা ঠিক শুরু করতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন ইহিতা আমাদের সবার সাথে একবার কথা বলতে চাইছিল?

সবাই মাথা নাড়ল। টুরান বলল, আমি এক ধরনের গোয়ার্তুমি করে ইহিতাকে কথা বলতে দিই নি। তার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। অপমানসূচক কথা বলেছিলাম।

ইহিতা নিচু গলায় বলল, তুমি এমন কিছু অপমানসূচক কথা বল নি।

বলেছিলাম। আমার খুব কাছাকাছি থাকা একটি মেয়ে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল সেই থেকে আমি পুরোপুরি নারী জাতির বিদ্বেষী হয়ে গিয়েছিলাম কোনো মেয়েকে সহ্যই করতে পারতাম না। কোনো মেয়ের কথাও শুনতে চাইতাম না। বিষয়টা খুবই বড় নির্বুদ্ধিতা হয়েছিল।

কেউ কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে টুরানের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে কী বলতে চাইছে।

ইহিতা তখন যে কথাগুলো বলতে চাইছিল, আমি এখন তোমাদের সাথে সেই কথাগুলো বলতে চাই।

টর জিজ্ঞেস করল, সেই কথাগুলো কী?

আমরা সাতজন মানুষ অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা পথ পাড়ি দিচ্ছি, এইমাত্র একটা খুব বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি। সামনে পাব কিনা জানি না। বিপদ আসবে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এই রকম অসম্ভব বিপজ্জনক অবস্থা হলে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সব সময় সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটি নেয়া যায় না–তার সময় থাকে না। তখন খুব দ্রুত মোটামুটি সঠিক একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেটা খুবই জরুরি।

টর বলল, আমি এখনও বুঝতে পারছি না, তুমি কী বলতে চাইছ!

তুমি বুঝতে পারছ না কারণ আমি এখনো কথাটি বলি নি।

তাড়াতাড়ি বলে ফেল।

টুরান বলল, আমি যদি ঠিক করে অনুমান করে থাকি তাহলে ইহিতা আমাদের বলতে চেয়েছিল মানুষের একটা দল হিসেবে আমাদের একটা দলপতি থাকা দরকার। যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শুধু তাই না, দলপতিকে মেনে নিলে আমরা সবাই তার সিদ্ধান্তটি কোনোরকম প্রশ্ন না করে মেনে নিতে পারব।

টুরান একটু থামল এবং সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে সবার দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, এই মুহূর্তে আমাদের একজন দলপতি দরকার। আমি দলপতি হিসেবে ইহিতার নাম প্রস্তাব করছি। একটু আগে ইহিতা আমাদের যে কথাগুলো বলেছে তার প্রত্যেকটি কথা সত্যি বের হয়েছে। সে আমাদের ভয়ংকর বিপদে নিজে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।

টর বলল, আমাদের মাঝে দুইজন রবোমানব আছে, তুমি কেমন করে জান ইহিতা একজন রবোমানব না?

টুরান থতমত খেয়ে বলল, সেটা আমি জানি না। কেউই জানে না।

নুট একটু এগিয়ে এসে বলল, আমি জানি, ইহিতা রবোমানব না।

টর মাথা ঘুরিয়ে নুটের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি জান না। তুমি অনুমান করছ।

নুট বলল, না। আমি জানি। আমার টুরানের প্রস্তাবটা খুব পছন্দ হয়েছে। আমিও ইহিতাকে আমাদের দলপতি হিসেবে গ্রহণ করছি।

নীহা বলল, আমিও।

সুহা বলল, আমিও তাকে দলপতি হিসেবে চাই।

ক্লদ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আলাপটা বোঝার চেষ্টা করল। সে এমনিতে খুবই ছটফটে ছেলে, কিন্তু একটু আগে এতো কাছে থেকে তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো দেখার পর থেকে সে হঠাৎ করে চুপ হয়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ ইহিতার দিকে তাকিয়ে বলল, আমিও চাই।

টর বলল, তার মানে বাকি রয়েছি শুধু আমি?

কেউ কোনো কথা বলল না। টর বলল, আমার অবশ্যি কোনো পথ বাকি থাকল না। আমাকেও মেনে নিতে হচ্ছে।

টুরান বলল, চমকার।

ইহিতা বলল, আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না মঙ্গল গ্রহের এই পাহাড়ের নিচে এই ধূলিঝড়ের মাঝে, তেজস্ক্রিয় প্রাণীদের আনাগোনার মাঝে আমরা বসে বসে একটা নাটক করছি! কিন্তু আমি এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করব না। সময় খুব মূল্যবান। আমি সময়টা বাঁচাতে চাই। আমাকে যেহেতু দলপতির দায়িত্ব দিয়েছ আমি সেই দায়িত্ব নিচ্ছি-শুধুমাত্র এই বিপজ্জনক পথের অংশটুকুতে। যদি ঠিকভাবে মানুষের আবাসস্থলে পৌঁছাতে পারি তখন অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে।

সেটি তখন দেখা যাবে। টুরান বলল, তাছাড়া আমরা একটি খেলার টিম তৈরি করছি না যে একেক খেলায় একেকজন দলপতি হবে।

ইহিতা বলল, সেই আলোচনা থাকুক। তোমরা সবাই এখনই রওনা দাও। দ্রুত আমি আসছি।

নীহা জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথা থেকে আসছ?

সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। সবাই হাঁটতে শুরু কর।

সবাই হাঁটতে হাঁটতে দেখল, ইহিতা পিঠ থেকে তার ব্যাকপেক নামিয়ে মাটিতে উবু হয়ে কিছু একটা করছে। কী করছে কেউ অনুমান করতে পারল না।

ইহিতা তার কাজ শেষ করে একটু জোরে হেঁটে ছোট দলটির সাথে যোগ দিল। টর জিজ্ঞেস করল, কাজ শেষ হয়েছে?

হ্যাঁ হয়েছে।

টর আশা করছিল ইহিতা বলবে সে কী করেছে, ইহিতা বলল না। তখন টর নিজেই জিজ্ঞেস করল, তুমি পিছনে কী করে এসেছ?

এমন কিছু নয়।

তার মানে তুমি আমাদের বলতে চাইছ না?

না।

কেন?

টর, তোমার একটা বিষয় বুঝতে হবে। তোমরা আমাকে তোমাদের দলপতি বানিয়েছ, এখন আমার উপর কিছু বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়েছে। শুধু আমাকে বেঁচে থাকলে হবে না। তোমাদেরকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেজন্যে আমাকে কিছু বাড়তি কাজ করতে হয়ে। আমি সেটা করছি। যখন তোমাদের এটা জানার প্রয়োজন হবে আমি তোমাদের জানাব।

টর কিছু বলল না, ইহিতার কথাটা তার খুব পছন্দ হল বলে মনে হল না।

ছোট দলটি চারঘণ্টা হাঁটার পর ইহিতা বলল, আমরা এখন বিশ্রাম নেব।

নীহা বলল, তোমার এই অসাধারণ সিদ্ধান্তের জন্যে অনেক ধন্যবাদ ইহিতা। আমি ভেবেছিলাম তুমি আর কোনোদিন বুঝি একটু বিশ্রাম নেবার কথা বলবে না।

ইহিতা বলল, শক্তি থাকতে থাকতে আমি যতটুকু সম্ভব পথ অতিক্রম করে ফেলতে চাইছিলাম।

ক্লদ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, টুরান এতোক্ষণ তাকে ট্রান্সপোর্টারে শুইয়ে এনেছে, এবারে তাকে নিচে শুইয়ে দিয়ে বলল, ভাগ্যিস মঙ্গল গ্রহে মাধ্যাকর্ষণ বল অনেক কম, তা নাহলে ক্লদকে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যেত।

সুহা টুরানের হাত স্পর্শ করে বলল, আমি যে তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না! কতোটুকু পথ ক্লদকে ট্রান্সপোর্টারে করে এনেছ!

টুরান পাথরে পা ছড়িয়ে বসে বলল, ধন্যবাদ দেবার তুমি আরো ভালো সুযোগ পাবে–এবারে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নেয়া যাক।

ইহিতা বলল, সবাইকে মনে করিয়ে দিই–এবার যখন রওনা দেব তখন কিন্তু আর থামাথামি নেই। রওনা দেবার আগে সবাই খানিকটা স্নায়ু-উত্তেজক পানীয় খেয়ে নিও। তাহলে খিদেও পাবে না, ক্লান্তও হবে না। ঘুমাতেও হবে না।

নীহা বলল, যখন রওনা দেব তখন সেটা দেখা যাবে। এই মুহূর্তে আমার ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আমি একটু ঘুমাই যখন রওনা দেবে তখন ডেকে তুলো।

সুহা বলল, তুমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাও। তোমাকে দেখে আমার হিংসা হচ্ছে।

কেন? হিংসা হচ্ছে কেন?

এরকম একটা পরিবেশে যার ঘুম পায় তাকে দেখে হিংসা হতেই পারে!

নীহা চোখ বন্ধ করতে করতে বলল, তোমাকে কুগুরাভ সমস্যাটা শিখিয়ে দেব-তার সমাধানের কথা চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে যাবার মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই!

(চলবে)