চতুর্থ এবং শেষ পর্ব

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র

#ইরাকাস - মুহম্মদ জাফর ইকবাল



গভীর রাতে ইঞ্জিনের একটা চাপা শব্দে বুলবুলের ঘুম ভেঙে গেল। মাঝে মাঝে এ রকম হয়, কোনো একটা ট্রলার, কোনো একটা স্পিডবোট কাছাকাছি কোনো একটা নদী দিয়ে যায়, সে তার ঘরে বসে তার শব্দ শুনতে পায়। বিশাল একটা গাছের একেবারে উপরে তার ঘর। তাই অনেক দূর থেকে শব্দ ভেসে আসে। শব্দগুলো বাড়ে-কমে, তারপর একসময় ক্ষীণ থেকে ক্ষীণ হতে হতে দূরে মিলিয়ে যায়।

কিন্তু ইঞ্জিনের এই শব্দটা ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে গেল না। শব্দটা বাড়তে থাকে, কমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে কাছাকাছি এগিয়ে আসতে থাকে। বুলবুলের একবার মনে হলো সে উড়ে গিয়ে দেখে আসে কীসের শব্দ, কোথায় আসছে কিন্তু শেষপর্যন্ত রাতের অন্ধকারে তার আর বের হওয়ার ইচ্ছে করল না।

যে ইঞ্জিনের শব্দ শুনে বুলবুলের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল সেটি আসছিল একটা মাঝারি আকারের লঞ্চ থেকে। লঞ্চটি ভাড়া করেছে পাখি-বিশেষজ্ঞ ডক্টর আশরাফ। সুন্দরবনের পাখি বৈচিত্র্যের একটা পরিসংখ্যান নেয়ার জন্যে সে তার ছোট একটা দল নিয়ে এসেছে। দলের মাঝে বেমানান সদস্যটি হচ্ছে ডক্টর আশরাফের চৌদ্দ বছরের মেয়ে মিথিলা।

গভীর রাতে বুলবুল যখন একটা ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছিল তখন এই লঞ্চের বড় কেবিনটাতে একটা ছোট নাটক অভিনীত হচ্ছিল, নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রী ডক্টর আশরাফ আর মিথিলা, বাবা আর মেয়ে।

ডক্টর আশরাফ ক্রুদ্ধ চোখে তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলছিল, তোর হয়েছেটা কী? সারাক্ষণ মুখটা ভোঁতা করে বসে থাকিস?।

মিথিলা বাবার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বলল, আই অ্যাম সরি যে খোদা আমাকে এমন ভেঁত মুখ দিয়ে জন্ম দিয়েছে।

মানুষ ভোঁতা মুখ নিয়ে জন্ম নেয় না। মানুষ মুখ ভোঁতা করে রাখে।

আব্বু, আমি এখানে আসতে চাইনি, তুমি আমাকে জোর করে। এনেছ। এখন তুমি বলছ আমাকে জোর করে আনন্দ পেতে হবে?

ডক্টর আশরাফ চোখ কপালে তুলে বলল, জোর করে? জোর করে কেন হবে? সুন্দরবন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। পৃথিবীর মানুষ এটাকে এক নজর দেখার সুযোগ পেলে কৃতার্থ হয়ে যায়

আব্বু! তুমি অনেক বড় বৈজ্ঞানিক হতে পার কিন্তু তুমি খুব সোজা সোজা কিছু জিনিস জান না।

কী জিনিস জানি না?

একা একা কেউ কোনো কিছু উপভোগ করতে পারে না। আমি এখানে একা। একেবারে একা।

একী? লঞ্চভর্তি মানুষ। আমার স্টুডেন্ট রিসার্চার—

হ্যাঁ, লঞ্চভর্তি মানুষ—তোমার স্টুডেন্ট রিসার্চার সবাই তোমার কথায় উঠে বসে। তুমি তাদের বেতন দাও, তারা তোমার চাকরি করে। তোমার রেফারেন্স পেলে তারা বড় ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন পায়। সারাক্ষণ তারা তোমার তোয়াজ করে, তোমাকে খুশি করার জন্যে আমাকেও তোয়াজ করে। এই রকম মানুষদের নিয়ে তুমি খুশি আছ, খুব ভালো কথা। আমাকে খুশি হতে বলো না।

ডক্টর আশরাফ কঠিন মুখে বলল, তোদের সমস্যা কি জানিস? তোরা বেশি বুঝিস।

আই অ্যাম সরি আব্বু—কিন্তু আমরা বেশি বুঝি না। আমাদের যেটুকু বোঝার কথা ঠিক ততটুকু বুঝি। কিন্তু তোমাদের সমস্যা কি জানো? তোমরা আমাদের কিছুই বোঝ না। তোমাদের ধারণা তোমরা যেটা বোঝ সেটাই ঠিক আর আমাদের সবাইকেই সেটা বুঝতে হবে।

কখন আমি সেটা করেছি?

এই যে তুমি ধরেই নিয়েছ, এই লঞ্চে করে এক গাদা মানুষের সাথে এই জঙ্গলে এলে আমার খুব আনন্দ পেতে হবে! আই অ্যাম সরি আব্বু, আমি আনন্দ পাচ্ছি না। কিন্তু তুমি যদি চাও এখন থেকে আমি মুখে আনন্দ আনন্দ একটা ভাব করে রাখব। কথা শেষ করে মিথিলা তার মুখে একটা কৃত্রিম হাসির ভান করল।

ডক্টর আশরাফের ইচ্ছে করল মেয়ের গালে একটা চড় দিয়ে তার মুখের এই টিটকারির হাসিটি মুছে দেয়। কিন্তু সে অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত রাখল। মিথিলার মা মারা যাওয়ার পর সে তার মেয়েটিকে ঠিক করে মানুষ করতে পারেনি। মেয়েটি উদ্ধৃত দুর্বীনিত হয়ে বড় হচ্ছে। শুধু যে উদ্ধত আর দুর্বীনিত তা নয়, মিথিলা অসম্ভব আবেগপ্রবণ। অত্যন্ত সহজ সাধারণ কথায় সে রেগে ওঠে, বিচলিত হয়ে যায়। চোখ থেকে পানি বের হয়ে আসে। নিজের জগতের বাইরে যে একটা জগৎ থাকতে পারে সেটা সে জানে না, জানার কোনো আগ্রহও নেই। ডক্টর আশরাফ মাঝে মাঝে তার স্ত্রী সুলতানার ওপর এক ধরনের ক্ষোভ অনুভব করে, কেন এত অল্প বয়সে এ রকম একটি মেয়েকে রেখে মরে গেল? ডক্টর আশরাফ নিজের কাজকর্ম গবেষণা নিয়ে নিজে ব্যস্ত থেকেছে, মেয়েটি কেমন করে বড় হচ্ছে সেটি লক্ষ করেনি। যখন লক্ষ করেছে তখন দেরি হয়ে গেছে। এখন এই মেয়েটিকে কোনো দিন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বলে মনে হয় না।

রাত্রি বেলা লঞ্চের কেবিনে নিজের ঘরে মিথিলা বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেল। চৌদ্দ বছরের একটি মেয়ের জগৎটি খুব বিচিত্র, খুব নিঃসঙ্গ এবং একাকী।

পরের দিনটি বুলবুল শুরু করল খুব সতর্কভাবে। আকাশে না উড়ে সে বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে গেল এবং গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে দেখল নদীর মাঝামাঝি একটা লঞ্চ দাঁড়িয়ে আছে। বুলবুল বহুদিন লঞ্চ নৌকা কিছু দেখেনি—সে এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে। লঞ্চের ভেতর মানুষগুলো ব্যস্ত হয়ে হাঁটাহাঁটি করছে, বুলবুল একসময় দেখল মানুষগুলো একটা নৌকায় করে ভীরের দিকে আসছে। নৌকাটা তীরে পৌঁছানোর আগেই বুলবুল বনের আরো গভীরে সরে যাচ্ছিল, তখন সে দেখতে পেল প্রায় তার বয়সী একটা মেয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এত দূর থেকে ভালো করে চেহারা দেখা যায় না কিন্তু তার দাঁড়ানোর। ভঙ্গিটির মাঝে এক ধরনের দুঃখী দুঃখী ভাব রয়েছে। বুলবুল এক ধরনের। বিস্ময় নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

ডক্টর আশরাফের দলটি নদীর তীর ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে সারাটি দিন বনের ভেতর ঘুরে বেড়াল। তারা পাখির ছবি তুলল, ভিডিও করল, কাগজে নোট নিল। বাইনোকুলারে তারা দূর থেকে পাখিগুলোকে লক্ষ করল, তাদের সংখ্যা গুনল, পাখির বাসা খুঁজে বের করার চেষ্টা করল, তাদের খাবার পরীক্ষা করে দেখল। মাঝে মাঝেই তারা দাঁড়িয়ে গেল এবং নিজেদের ভেতর উত্তপ্ত আলোচনা করতে লাগল। দলটার সাথে দুজন মানুষ ছিল রাইফেল নিয়ে, তারা চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছিল, নদীর তীরে বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছে, কখন কী ঘটে যায় কেউ বলতে পারে না।

দলটির কেউ অবশ্যি টের পেল না, দূর থেকে আরো অনেক সতর্ক হয়ে তাদের ওপর চোখ রাখছিল বুলবুল। ডক্টর আশরাফ কিংবা তার দলের অন্য কেউ যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারত যে এখানে সতেরো বছরের একটি কিশোর থাকে, দুই পাখা মেলে সে আকাশে উড়ে যেতে পারে তাহলে নিশ্চিতভাবেই তারা তাদের ক্যামেরা নোটবই বাইনোকুলার সব কিছু ছুড়ে ফেলে শুধু তাকে এক নজর দেখার জন্যে ছুটে আসত।

বুলবুলের আজকের দিনটি হলো খাপছাড়া, একদিকে দূর থেকে এই দলটির ওপর চোখ রাখছে, আবার সুযোগ পেলে নদীর তীরে গিয়ে লঞ্চের পাশে দাঁড়াচ্ছে, ঠিক কী কারণ জানা নেই লঞ্চের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা উদাসী মেয়েটিকে আরো এক নজর দেখার জন্যে তার এক ধরনের কৌতূহল হচ্ছিল। কত দিন সে কোনো মানুষ দেখে না, কত দিন সে কোনো মানুষের সাথে কথা বলে না!

সূর্য ড়ুবে যাওয়ার অনেক আগেই পাখি পর্যবেক্ষকরা লঞ্চে ফিরে গেল। বুলবুল তখন কিছু একটা খেয়ে নেয়-সারা দিনের উত্তেজনায় তার খাওয়ার কথাই মনে ছিল না। সূর্য ড়ুবে যাওয়ার পর সে নদীর তীরে একটা উঁচু গাছে উঠে বসে, লঞ্চটাকে এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, অস্পষ্টভাবে মানুষের কথাবার্তা, হাসাহাসি শোনা যায়।

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে লঞ্চের মানুষগুলোর কথাবার্তা কমতে থাকে এবং শেষপর্যন্ত এক সময় নীরব হয়ে আসে। বুলবুল কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল তারপর খুব সাবধানে ডানা ঝাঁপটিয়ে সে উড়তে থাকে, প্রথমে অনেক দূর দিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরে আসে, তারপর বৃত্তটা ছোট করে, খুব সাবধানে উড়ে উড়ে সে লঞ্চের ছাদে নামল। কয়েক মুহূর্ত সে চুপচাপ বসে থাকে, যখন নিশ্চিত হলো যে কেউ তাকে দেখে ফেলেনি তখন সে খুব সাবধানে ছাদ থেকে তার মাথার্টি নিচে দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। ঠিক কী দেখার চেষ্টা করবে নিজেই বুঝতে পারছিল না, তখন সে উত্তেজিত গলার স্বর শুনতে পেল। বুলবুল সরে গিয়ে যে কেবিন থেকে উত্তেজিত স্বর ভেসে আসছে সেখানে উঁকি দিয়ে ডক্টর আশরাফকে দেখতে পেল। ডক্টর আশরাফ হাত নেড়ে বলছে, আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না, একজন মানুষ কিছু

করে বিছানায় শুয়ে কেমন করে দিন কাটাতে পারে।

বুলবুল শুনতে পেল কেবিনের অন্য পাশ থেকে মিথিলা বলছে, আমাকে আমার মতো থাকতে দাও আব্বু।

মিথিলার গলার স্বরে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ। বুলবুল একটু সরে গিয়ে মেয়েটিকে দেখার চেষ্টা করল। আজ ভোরে সে এই মেয়েটিকে লঞ্চের রেলিং ধরে বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। ডক্টর আশরাফ কঠিন গলায় বলল, আমি তো তোকে তোর মতোই থাকতে দিচ্ছি।

না আব্বু। তুমি আমাকে আমার মতো থাকতে দিচ্ছ না। তুমি। আমাকে বিরক্ত করছ।

মিথিলার কথা শুনে ডক্টর আশরাফ কেমন যেন ক্ষেপে গেল, চিৎকার করে বলল, আমি বিরক্ত করছি? যদি শুনতে পাই আমার মহারানী মেয়ে সারা দিন না খেয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল, আমি যদি সেই খবর নিতে আসি, তাহলে সেটা বিরক্ত করা হয়?

হ্যাঁ আব্বু হয়। তোমার এটা আগে চিন্তা করা উচিত ছিল, আমার যখন খেতে ইচ্ছে করে না, আমি তখন খাই না। বাসায় তুমি সেটা জান না—কারণ তুমি বাসায় থাকো না।

ডক্টর আশরাফ কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না, তারপর থমথমে মুখে বলল, আমি কোনো টং দেখতে চাই না। খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর।

আমার খিদে নেই।

একজন মানুষ সারা দিন না খেয়ে থাকলে তার খিদে থাকে না কেমন করে?

আমি সেটা জানি না। কিন্তু আমার খিদে নেই।

আমাকে রাগাবি না, মিথিলা। আমি অনেক সহ্য করেছি।

কেন আব্বু? তুমি কী করবে? তুমি কি আমাকে মারবে নাকি?

দিন রাত মুখটাকে এমন ভেঁতা করে রাখবি—তোকে তো মারাই উচিত। কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটাকে একবার দেখেছিস?

মিথিলা ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, আই অ্যাম সরি আব্বু, আমার চেহারাটা খারাপ। আম্মু তো মরে গেছে—তোমার আর ঝামেলা নাই। তোমার সুন্দরী একজন কলিগকে বিয়ে করো, তোমার বাচ্চাগুলোর চেহারা যেন ভালো হয়।,

কী বললি? কী বললি তুই? বলে ডক্টর আশিরাফ এগিয়ে গিয়ে তার মেয়ের গালে প্রচণ্ড জোরে একটা চড় মেরে বলল, তোর এত বড় সাহস? তুই আমার সাথে এভাবে কথা বলিস?

মিথিলা প্রস্তুত ছিল না, সে প্রায় হুঁমড়ি খেয়ে পড়ে গেল, কোনোমতে সে উঠে দাঁড়িয়ে এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে তার বাবার দিকে তাকায়। সে যতটুকু রাগ হয়েছে তার থেকে অনেক বেশি অবাক হয়েছে। যতটুকু অবাক হয়েছে তার থেকে অনেক বেশি দুঃখ পেয়েছে। তাকে দেখে মনে হয় সে যেন এখনো ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছে না। মিথিলা বিচিত্র একটা দৃষ্টিতে তার বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর ফিসফিস করে বলল, তুমি আমাকে মারতে পারলে আব্বু?

ডক্টর আশরাফ কোনো কথা না বলে হিংস্র চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মিথিলা এবার ফিসফিস করে বলল, ঠিক আছে আব্বু। গুড বাই।

ডক্টর অশিরাফ তখনো রাগে কাঁপছিল, সে কেবিন থেকে বের হয়ে নিজের কেবিনে গিয়ে ঢুকে সশব্দে তার দরজা বন্ধ করে দিল।

বুলবুল নিজের ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ অনুভব করে, তার মনে হতে থাকে এভাবে লুকিয়ে বাবা আর মেয়ের এ রকম ব্যক্তিগত একটা ঘটনা তার দেখা উচিত হয়নি। কত দিন সে কোনো মানুষ দেখে না, লুকিয়ে সে তাদের দেখতে এসেছিল। কিন্তু তাই বলে মানুষের এ রকম ব্যবহার? বাবার সাথে মেয়ের? মেয়ের সাথে বাবার?

বুলবুলের মনটা খারাপ হয়ে যায়, সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, ঠিক যখন সে উড়ে যাবে তখন হঠাৎ করে নিচে দরজা খোলার শব্দ হলো, বুলবুল তখন মাথা নিচু করে তাকালো। দেখতে পেল মিথিলা তার কেবিন থেকে বের হয়ে এসেছে, ওপর থেকে তার মুখটা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গিটুকু স্বাভাবিক নয়। অনেকটা অপ্রকৃতিস্থর মতো সামনে হেঁটে যায়। কয়েক মুহূর্ত রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ সে রেলিংয়ের ওপর উঠে দাঁড়ায়, তারপর কিছু বোঝার আগেই সে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বুলবুল কিছু চিন্তা করার সময় পেল না, সে ঠিক একই গতিতে ছাদ। থেকে লাফিয়ে পড়ল এবং মির্থিলা নদীর পানি স্পর্শ করার আগের মুহূর্তে তাকে খপ করে ধরে ফেলল। তারপর তার বিশাল ডানা ঝাঁপটে সে উড়ে আসে, বৃত্তাকারে ঘুরে সে লঞ্চের ছাদে ফিরে এসে সাবধানে তাকে ছাদে নামিয়ে দিল।

মিথিলার কিছুক্ষণ লাগল বুঝতে এবং শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে যে আসলে সে পানিতে ড়ুবে যায়নি, একেবারে শেষ মুহূর্তে তাকে কেউ ধরে ফেলেছে, তাকে নিরাপদে ছাদে নামিয়ে দিয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব মিথিলা কোনোভাবেই বুঝতে পারছিল না, সে হকচকিত হয়ে তখনো তাকিয়ে ছিল। জোছনার আলোতে সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে, সামনে বিস্ময়কর একটি মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, মানুষের মতো কিন্তু মানুষ নয়—কারণ সে জোছনার আলোতে স্পষ্ট দেখতে পারছে তার বিশাল দুটি পাখা। মিথিলা কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তুমি কে?

বুলবুল কোনো উত্তর দিল না। সে কী উত্তর দেবে? সে কী বলবে, আমার নাম বুলবুল? আমি একই সাথে মানুষ এবং পাখি। আমি এই বনে একা একা উড়ে বেড়াই? সে কেমন করে এই মেয়েটিকে বলবে সে কে?

মিথিলা আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি কে? তুমি কেন আমাকে বাঁচিয়েছ?

বুলবুল তখনো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। মিথিলা আরেকটু এগিয়ে এসে বুলবুলকে আরেকটু কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করে। তারপর ফিসফিস করে বলে, তুমি কি মানুষ?

বুলবুল এবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি না।

তুমি জান না?

বুলবুল মাথা নাড়ে। না।

মিথিলা তার হাতটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বুলবুলকে স্পর্শ করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কেন আমাকে বাঁচিয়েছ?

আমার মা একদিন তোমার মতো পানিতে লাফ দিয়েছিল। তখন একজন তাকে বাঁচিয়েছিল, সেই জন্যে আমি এখনো আছি। বুলবুল নিচু গলায় বলল, একদিন তুমিও কারো মা হবে। বেঁচে না থাকলে কেমন করে হবে?

মিথিলা অবাক হয়ে এই বিস্ময়কর ছায়ামূর্তিটির দিকে তাকিয়ে থাকে। গলার স্বর একজন কম বয়সী কিশোরের মতো। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে বলল, আমাকে বাঁচানোর জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ।

বুলবুল কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। মিথিলা নিচু গলায় বলে, এর পরের বার কি তুমি আমাকে বাঁচাবে?

বুলবুল হাসির মতো শব্দ করল, বলল, এরপরের বার তুমি কখনো এটা করবে না। কখনো না।

কেন না?

তাহলে আমি খুব কষ্ট পাব।

কেন তুমি কষ্ট পাবে? তুমি আগে আমাকে কখনো দেখো নাই।

বড় হওয়ার পর আমি কোনো মানুষ দেখি নাই। তুমি প্রথম। তুমি আমাকে কষ্ট দিয়ো না। তুমি যখন চলে যাবে তখন আমি তোমার কথা মনে রাখব।

ঠিক এ রকম সময় ডক্টর আশরাফ তার কেবিন থেকে বের হয়ে এল, মেয়ের গায়ে হাত তোলার আগের মুহূর্তে তার ভেতর ছিল ভয়ঙ্কর ক্রোধ। এখন ক্রোধের বদলে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে তীব্র অপরাধবোধ। অভিমানী মেয়ে রাগে-দুঃখে কিছু একটা করে ফেললে কী হবে? সে মেয়ের কেবিনের সামনে গিয়ে ডাকল, মথিলা

কেবিনের দরজা হাট করে খোলা, ভেতরে কেউ নেই, হঠাৎ করে তার বুকটা ধ্বক করে ওঠে, সে পাগলের মতো বের হয়ে আসে, এদিক-সেদিক তাকিয়ে চিৎকার করে ডাকে, মিথিলা! মিথিলা-মা।

লঞ্চের ছাদে বুলবুল হঠাৎ চঞ্চল হয়ে ওঠে, মিথিলাকে ফিসফিস করে বলল, আমি যাই! তুমি আমার কথা কাউকে বলো না!

তারপর তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তার বিশাল দুটি ডানা মেলে সে আকাশে উড়ে গেল। মিথিলা অবাক হয়ে দেখল বিশাল একটা পাখির মতো ডানা মেলে একজন আকাশে উড়ে যাচ্ছে, চাদের আলোতে তাকে কী বিচিত্ৰই না দেখাচ্ছে।

নিচে থেকে সে আবার তার বাবার ব্যাকুল গলার আওয়াজ শুনতে পেল, মিথিলা–মিথিলা–

মিথিলা লঞ্চের ছাদ থেকে বলল, বাবা! এই যে আমি।

কোথায়?

লঞ্চের ছাদে।

ডক্টর আশরাফ সিড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে আসে, দেখে জোছনার আলোতে তার মেয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলল, মিথিলা মা, তুই এখানে?

হ্যাঁ আব্বু।

হঠাৎ করে মনে হলো তুই তুই—তুই বুঝি—

আমি কী?

না কিছু না। ডক্টর আশরাফ মেয়েকে নিজের কাছে টেনে এনে বলল, আই অ্যাম সরি মা, আমি তোর গায়ে হাত তুলেছি। তুই আমাকে মাপ করে দে।

মিথিলা বলল, ছিঃ! আব্বু! তুমি কী বলছ?

ডক্টর আশরাফ নরম গলায় বলল, আর কখনো হবে না মা। তোকে আমি কথা দিচ্ছি—

মিথিলা নিচু গলায় বলল, আমিও কথা দিচ্ছি।

কী কথা দিচ্ছিস?

আমি আর কখনো রাগ করব না। মন খারাপ করব না—

সত্যি?

হ্যাঁ সত্যি।

আমি খুব বোকা একটা মেয়ে আব্বু। আমি আর বোকা থাকব না আব্বু।

ডক্টর আশরাফ অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকাল, বলল, কী হয়েছে তোর মিথিলা?

জানি না আব্ব আমার কী হয়েছে। কিন্তু তুমি ঠিকই বলেছ আমার কিছু একটা হয়েছে। আমার কী মনে হচ্ছে জান?

কী মনে হচ্ছে?

মনে হচ্ছে আমি আর ছোট মেয়ে না। মনে হচ্ছে আমি বড় হয়ে গেছি। অনেক বড় হয়ে গেছি।

ডক্টর আশরাফ অবাক হয়ে তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

মিথিলার পরিবর্তনটা পরদিন সবাই লক্ষ করল। সে সকালবেলা সবার আগে কাপড় জামা পরে প্রস্তুত হয়ে গেছে। মাথায় কাপড়ের একটা টুপি, চোখে কালো চশমা। পিঠে একটা ব্যাগ এবং গলায় বাইনোকুলার। নৌকা তীরে এসে নেমে কাদার ভেতর দিয়ে ছপছপ করে হেঁটে সে ডাঙ্গায় উঠে এল। পুরো দলটির পেছনে পেছনে সে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়াল, গুনগুন করে একটা ইংরেজি গানের সুর গাইত গাইতে বাইনোকুলার লাগিয়ে সে সব গাছের ওপর দিয়ে নিজের অজান্তেই কিছু একটা খুঁজে বেড়াতে লাগল।

ডক্টর আশরাফ একটু অবাক হয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, তুই কী দেখিস গাছের ওপর?

কিছু না আব্বু। এমনি দেখি। চোখ খোলা রাখলে দেখিস কত কী দেখা যায়।

মিথিলা হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করল, আমরা যদি উড়তে পারতাম তাহলে কী মজা হতো তাই না আব্বু!

তোকে কে বলেছে আমরা উড়তে পারি না! প্লেনে হেলিকপ্টারে আমরা উড়ি না!

মিথিলা মাথা নেড়ে বলল, না, না, না! আমি ঐ রকম উড়ার মতো বলছি না। সত্যিকার উড়ার কথা বলছি। পাখির মতো উড়ার কথা বলছি!

পাখি রয়েছে বিবর্তনের শেষ মাথায়, আমরাও রয়েছি শেষ মাথায়। আমাদের উড়ার কথা থাকলে এতদিনে আমরা পাখি হয়ে যেতাম!

মিথিলা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমাদের যদি পাখা থাকত তাহলে কী মজা হতো তাই না?

ডক্টর আশরাফ হাসল, বলল, আমাদের যত ওজন আমাদের উড়তে হলে যে পাখা লাগবে, শরীরে সেই পাখা লাগানোর জায়গাই থাকবে না! শুধু পাখাই থাকতে হবে-শরীর আর থাকবে না!

মিথিল ভুরু কুঁচকে চিন্তা করে। ডক্টর আশরাফ জিজ্ঞেস করল, কী ভাবিস?

তাহলে আমাদের শরীরটা হালকা হতে হবে?

হ্যাঁ। পাখির যে রকম। হাড়গুলো হালকা, বিশাল ফুসফুস। মেদহীন ছিপছিপে শরীর!

মিথিলা কোনো কথা বলল না, একটা নিঃশ্বাস ফেলে বাইনোকুলারটা চোখে লাগিয়ে আবার সে গাছগুলোর ওপর দিয়ে দেখতে লাগল। দূরে কোথাও এক জায়গায় হঠাৎ করে অসংখ্য পাখি কিচিরমিচির করে ডাকতে ডাকতে তাদের মাথায় ওপর দিয়ে উড়ে গেল। ডক্টর আশরাফদের দলের লোকজন বিস্মিত হয়ে সেই পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কোথা থেকে হঠাৎ করে এতগুলো পাখি এসেছে? কোথায় যাচ্ছে?

রাত্রি বেলা অনেক দিন পর মিথিলা সবার সাথে বসে খেলো, গল্পগুজব করল এবং একজন যখন তাকে একটা গান গাইতে বলল সে একটুও সংকোচ না করে একটা ইংরেজি গান গেয়ে শোনাল। ডক্টর আশরাফ এক ধরনের মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে তার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। এক রাতের মাঝে মেয়েটির মাঝে এ রকম একটা পরিবর্তন হবে কে জানত!

রাত্রি বেলা যখন সবাই ঘুমিয়ে গেছে তখন মিথিলা খুব সাবধানে তার কেবিন খুলে বের হয়ে এল। কেউ যেন বুঝতে না পারে সেভাবে নিঃশব্দে সে লঞ্চের ছাদে এসে দাঁড়াল। জোছনার আলোতে পুরো বনভূমিটিকে একটি অতিপ্রাকৃত ভূখণ্ডের মতো মনে হয়। অনেক দূর থেকে কোনো একটা বুনো পশু ডাকতে থাকে, এক ধরনের বিষণ্ণ করুণ কণ্ঠস্বর মনে হয়, শুনে মিথিলার বুকের মাঝে এক ধরনের কষ্ট হতে থাকে।

মিথিলা লঞ্চের ছাদে হাঁটতে থাকে, তার দৃষ্টি আকাশের দিকে। কালকের সেই রহস্যময় ডানাওয়ালা কিশোরিটি কি আসবে আবার? যখন। হেঁটে হেঁটে একসময় সে ক্লান্ত হয়ে গেল, মনে হলো আর বুঝি সে আসবে তখন সে দেখতে পায় আকাশে বৃত্তাকারে কিছু একটা উড়ছে। বিশাল ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়তে উড়তে সেই রহস্যময় ছায়ামূর্তিটি কাছে আসতে থাকে।

মিথিলা দুই হাত উপরে তুলে নাড়তে থাকে, তখন খুব ধীরে ধীরে বুলবুল ডানা মেলে প্রায় নিঃশব্দে নিচে নেমে আসে। মিথিলা কাছে গিয়ে বুলবুলকে স্পর্শ করে বলল, আমি বুঝেছিলাম তুমি নিশ্চয়ই আসবে!

বুলবুল বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল, কী সুন্দর জোছনা উঠেছে, আমি তাই উড়তে বের হয়েছি। ভাবলাম তোমাদের লঞ্চটা দেখে যাই। তখন দেখি তুমি ছাদে দাঁড়িয়ে আছ, তাই এসেছি।

আমি না হয়ে যদি অন্য কেউ হতো?

আমি বুঝতে পেরেছি অন্য কেউ না। তোমরা যখন আজ জঙ্গলে গিয়েছিলে আমি তোমাদের সবাইকে দেখেছি।

দেখেছ?

হ্যাঁ। মিথিলা হেসে ফেলল, বলল, আমি বাইনোকুলার দিয়ে তোমাকে সবগুলো গাছের উপর খুঁজেছিলাম।

বুলবুল মাথা নেড়ে বলল, তোমরা কখনো খুঁজে আমাকে পাবে না। আমি গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারি। তোমরা আমাকে দেখবে না, কিন্তু আমি তোমাদের দেখি।

কী মজা!

শুধু পাখিগুলো মাঝে মাঝে ঝামেলা করে।

কী ঝামেলা করে?

হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে যায়। ডাকাডাকি করে ছোটাছুটি শুরু করে দেয়।

মিথিলা চোখ বড় বড় করে বলল, ও আচ্ছা! বনের মাঝে হঠাৎ করে অনেকগুলো পাখি উড়ে উড়ে এল—

হ্যাঁ। ওগুলো আমার সাথে ছিল। ওরা আমার ঘরে ঘুমায়।

তোমার ঘর? তোমার ঘর কোথায়?

জঙ্গলে অনেক উঁচু একটা গাছের ওপর আমি ঘর তৈরি করছি।

ইশ! কী মজা।

বুলবুল কোনো কথা বলল না, নির্জন বনভূমিতে উঁচু একটা গাছের উপরে ছোট একটা কাঠের ঘরে দিনের পর দিন রাতের পর রাত একেবারে একা একা থাকা সত্যিই খুব মজার কি না বুলবুল কখনোই সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি। কিন্তু সে কোনো কথা বলল না।

মিথিলা জোছনার আলোতে কিছুক্ষণ বুলবুলের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ইশ! তোমার কী মজা তুমি উড়তে পার।

তুমি উড়তে চাও?

চাই না আবার? এক শ বার উড়তে চাই।

তুমি আমার সাথে উড়বে?

মিথিলা অবাক হয়ে বলল, উড়ব? তোমার সাথে?

হ্যাঁ!

কেমন করে?

তুমি আমার পিঠে বসবে, আমি তোমাকে নিয়ে উড়ে যাব।

সত্যি? তুমি পারবে?

কেন পারব না?

মিথিলার চোখ চকচক করে ওঠে, ইতস্তত করে বলল, কিন্তু–কিন্তু–

কিন্তু কী?

যদি পড়ে যাই?

বুলবুল হেসে ফেলল, বলল, পড়বে না। তুমি যখন পড়তে চেয়েছিলে তখনো আমি তোমাকে পড়তে দেই নাই। মনে আছে?

মিথিলা একটু হাসার চেষ্টা করল, বলল, মনে আছে।

আমি তোমাকে পড়তে দিব না, আর তুমি আমাকে শক্ত করে ধরে রাখবে।

ঠিক আছে। মিথিলা এক কথায় রাজি হয়ে গেল।

বুলবুল তার দুই ডানা বিস্তৃত করে একটু সামনে ঝুঁকে দাঁড়াল। মিথিলা পেছন থেকে তার গলা ধরে তার পিঠে ঝুলে পড়ল। বুলবুল জিজ্ঞেস করল, তুমি ঠিক করে ধরেছ?

ধরেছি।

ঠিক আছে তাহলে আমরা উড়ছি।

বুলবুল তার শক্তিশালী ডানা দুটি ঝাঁপটে সামনে কয়েক পা এগিয়ে পা দিয়ে নিচে ধাক্কা দিয়ে উপরে উঠে পড়ে। মিথিলা শক্ত করে বুলবুলের গলা চেপে ধরে ভয়ের একটা শব্দ করল, প্রথমে বুলবুল খানিকটা নিচে নেমে আসে তারপর খুব ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে। ডানা ঝাঁপটে বুলবুল মিথিলাকে নিয়ে বনভূমির দিকে উড়ে যায়, গাছের উপর দিয়ে সে আকাশের দিকে এগুতে থাকে, দেখে মনে হয় সে বুঝি সোজা চাঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বুলবুল জিজ্ঞেস করল, তুমি ঠিক আছ?

মিথিলা বলল, হ্যাঁ। ঠিক আছি। তুমি?

আমিও ঠিক আছি।

তুমি কোথায় যাবে বল?

তোমার যেখানে ইচ্ছ।

বুলবুল ডানা ঝাঁপটে মিথিলাকে আরো উপরে নিয়ে যায়। মিথিলা এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে নিচে তাকিয়ে থাকে। জোছনার আলোতে নিচের বনভূমিকে রহস্যময় মনে হয়। ছোট ছোট খাল, নদী বনভূমিকে জড়িয়ে রেখেছে, জোছনার আলোতে সেগুলো চিকচিক করছে। চারপাশে নিস্তব্ধ, এতটুকু শব্দ নেই, তার মাঝে পাশ দিয়ে হঠাৎ একটা রাতজাগা পাখি ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। মিথিলা চমকে উঠল, ওটা কী?

আমার বন্ধু।

তোমার বন্ধু?

হ্যাঁ। মাঝে মাঝে অনেক রাতে আমি যখন আকাশে উড়ি তখন সে আমার সাথে সাথে ওড়ে!

কী মজা! সব পাখি তোমার বন্ধু?

হ্যাঁ সব পাখি আমার বন্ধু আমি ওদের দেখে-শুনে রাখি। ওরা খুব ভালো। ওরাও আমাকে দেখে-শুনে রাখে।

মিথিলা বুলবুলের গলা জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে নিচে তাকায়। তার ভেতরে অত্যন্ত বিচিত্র এক ধরনের অনুভূতির জন্ম হয়, যে অনুভূতির সাথে তার পরিচয় নেই। সে ফিসফিস করে বলল, আমার কী মনে হচ্ছে জান?

কী?

আমার মনে হচ্ছে আমি সারা জীবন এখানে থেকে যাই। আমার কী যে ভালো লাগছে।

সত্যি?

হ্যাঁ সত্যি।

আমি জানি তুমি এখানে থাকবে না। কেমন করে থাকবে? থাকার কোনো উপায় নাই। আমার থাকতে হয় তাই থাকি। তা না হলে কি আমি থাকতাম? কিন্তু তুমি যে বলেছ তোমার এখানে থেকে যাওয়ার ইচ্ছে করছে, সে জন্যেই আমি খুশি! আমার যখন মন খারাপ হবে তখন আমি তোমার এই কথাটা মনে করব!

তখন মিথিলা তার মন খারাপের কথা বলল। তার মায়ের কথা বলল, তার মা কেমন করে মারা গেল সেই কথা বলল। তার স্কুলের কথা বলল, তার বন্ধুদের কথা বলল। বুলবুল তার জন্মের কথা বলল, জহুরের কথা বলল, আনোয়ারার কথা বলল। ডক্টর সেলিমের কথা বলল, লিপির কথা বলল। মিথিলা তার খেলার সাথীদের কথা বলল, তারপর গুনগুন করে একটা গান গেয়ে শোনাল।

ধীরে ধীরে যখন পুবের আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে তখন বুলবুল মিথিলাকে নিয়ে ফিরে আসে। তাকে লঞ্চের ছাদে নামিয়ে দিয়ে সে উড়ে যায়। তার সমস্ত শরীর ক্লান্ত কিন্তু বুকের ভেতর বিচিত্র এক ধরনের অনুভূতি—যার সাথে সে পরিচিত না। যেটা সে কোনোভাবে বুঝতে পারছিল না।

পরদিন ভোরে ডক্টর আশরাফ নাশতার টেবিলে তার মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে মেয়ের কেবিনে গিয়ে দেখতে পেল সে ঘুমে কাদা হয়ে আছে। ডক্টর আশরাফ ডেকে বলল, মিথিলা, মা উঠবি না? নাশতা করবি না?

মিথিলা ঘুমের মাঝে বিড়বিড় করে বলল, খুব ঘুম পাচ্ছে আব্বু! আমি এখন উঠব না!

ডক্টর আশরাফ মেয়েকে আর বিরক্ত করল না, সারারাত ঘুমানোর পরেও কেমন করে একজনের ঘুম পায় সেটা সে বুঝতে পারল না। এই বয়সী মেয়েদের তাদের বাবারা নিশ্চয়ই কখনো বুঝতে পারে না।

রাত্রিবেলা খাবার টেবিলে ডক্টর আশরাফ ঘোষণা করল তাদের এবারকার অভিযান শেষ, পরদিন ভোরে তারা ফিরে যাচ্ছে।

মিথিলা চমকে উঠে বলল, ফিরে যাচ্ছি?

হ্যাঁ।

কেন আব্বু? এত তাড়াতাড়ি কেন?

ডক্টর আশরাফ হেসে ফেলল, বলল, তাড়াতাড়ি? এই কয়দিন আগেই তুই একেবারে অধৈর্য হয়ে গিয়েছিলি কখন ফিরে যাব! এখন বলছিস তাড়াতাড়ি?

হ্যাঁ আব্বু। মিথিলা ইতস্তত করে বলল, আগে আমার ভালো লাগছিল না। এখন ভালো লাগছে।

ভালো লাগলে ভালো। আমরা আবার আসব।

কিন্তু—

কিন্তু কী?

আরো কয়েক দিন থাকো না আব্বু। অন্য কিছু স্টাডি করো।

অন্য কী স্টাডি করব?

বনে কত কী আছে। গাছপালা সাপ ব্যাঙ গোসাপ—

ডক্টর আশরাফ হেসে বলল, আমি তো গাছপালা সাপ ব্যাঙের এক্সপার্ট না। আমি পাখির এক্সপার্ট–

তাহলে পাখিই স্টাডি করো?

এ রকম সময় খাবার টেবিলের একপাশে বাস থাকা চশমা পরা। একজন বলল, স্যার, মিথিলার কথায় একটা যুক্তি আছে।

কী যুক্তি?

আজকে আমাদের লঞ্চের ছাদে এটা পেয়েছি। বলে চশমা পরা ছেলেটি ডক্টর আশরাফের দিকে একটা পালক এগিয়ে দেয়। পালকটি কমপক্ষে এক ফুট লম্বা এবং সেটি দেখে এক সাথে সবাই বিস্ময়ের একটা শব্দ করল। ডক্টর আশরাফ পালকটি হাতে নিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে সেটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে বলে, এর অর্থ তোমরা কি জান?

কী স্যার?

এর অর্থ এই পাখিটির ডানার বিস্তৃতি ছয় থেকে আট মিটার।

এটা কী পাখি স্যার?

আমি জানি না।

একজন অবাক হয়ে বলল, আপনি জানেন না?

না। আমার জানামতে এত বড় পাখি পৃথিবীতে নেই।

তাহলে এটা কোথা থেকে এল স্যার?

ডক্টর আশরাফ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি জানি না।

আমরা কি এটা নিয়ে একটু স্টাডি করব? এটা খুঁজব?

আমরা গত কয়েক দিন যেভাবে স্টাডি করেছি তাতে এই পাখিটার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া উচিত ছিল। যেহেতু পাইনি—

ডক্টর আশরাফ আবার চুপ করে যায়, চশমা পরা ছেলেটি বলল, যেহেতু পাইনি?

যেহেতু পাইনি তার অর্থ, পাখিটা অনেক বুদ্ধিমান। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে।

মিথিলা আস্তে আস্তে বলল, হয়তো এটা পাখি না।

এটা পাখি না? এটা তাহলে কী?

হয়তো এটা পরী।

সবার জোরে হেসে ওঠার কথা ছিল, কিন্তু কেউ হেসে উঠল না।

গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে গেছে তখন মিথিলা নিঃশব্দে লঞ্চের ছাদে উঠে এল। চাঁদের আলো খুব বিচ্ছিন্ন, জোছনা রাতে সেটি ঝলমল করতে থাকে কিন্তু একদিন পরেই মনে হয় তার ঔজ্জ্বল্য কমে এসেছে। মিথিলা চাদটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তুই পাশে গহিন অরণ্য, সেখানে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তার মাঝে কত বিচিত্র প্রাণী তাদের জীবনকে তাদের নিজেদের মতো করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

মিথিলা নিঃশব্দে লঞ্চের ছাদে পায়চারী করতে থাকে। চাদটা যখন একটু ঢলে পড়ল তখন সে দেখতে পেল বিশাল একটা পাখির মতো ডানা মেলে বুলবুল লঞ্চটাকে ঘিরে বৃত্তাকারে ঘুরছে। ধীরে ধীরে বৃত্তটিকে ছোট করে নিঃশব্দে বুলবুল লঞ্চের ছাদে নেমে এল।

মিথিলা এগিয়ে গিয়ে বুলবুলের হাত ধরে বলল, তুমি এত দেরি করে এসেছ?

বুলবুল ফিসফিস করে বলল, আমি আরো আগে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু লঞ্চে মানুষজন জেগে আছে, চলাফেরা করছে; তাই দেরি হলো। কেউ আমাকে দেখে ফেললে কী বিপদ হবে জান?

মিথিলা মাথা নেড়ে বলল, জানি। বিপদ মনে হয় একটু হয়েছে।

কী বিপদ?

তোমার একটা পালক এইখানে খুঁজে পেয়েছে। সেইটা দেখে সবার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সবাই বলছে, এত বড় পালক কোনো পাখির হতে পারে না।

সর্বনাশ!

হ্যাঁ। তোমাকে খুব সাবধান থাকতে হবে।

ঠিকই বলেছ।

তোমাকে যদি কেউ দেখে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

বুলবুল মাথা নাড়ল, বলল, ঠিকই বলেছ। সর্বনাশ হয়ে যাবে।

মিথিলা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমরা কাল সকালে চলে যাব।

চলে যাবে?

হ্যাঁ। আমার খুব মন খারাপ হবে।

বুলবুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমারও।

মিথিলা বলল, আমার মনে হচ্ছে কেন তোমার সাথে দেখা হলো? দেখা না হলেই তো মন খারাপ হতো না।

বুলবুল মাথা নাড়ল, বলল, না। আমার সেটা মনে হচ্ছে না। আমার কী মনে হচ্ছে জান?

কী?

আমার মনে হচ্ছে আমার কী সৌভাগ্য যে তোমার সাথে দেখা হলো, এখন আমি সারাজীবন তোমার কথা মনে রাখতে পারব। বুলবুল আস্তে আস্তে বলল, আমি যখন আকাশে উড়ব তখন ভাবব একদিন তোমাকে নিয়ে আমি আকাশে উড়েছিলাম।

মিথিলা ফিসফিস করে বলল, আমার অসিলে চলে যেতে ইচ্ছে করছে না।

বুলবুল কথাটির কোনো উত্তর দিল না, একটু পরে বলল, তুমি কি আজকে আবার উড়তে চাও?

তোমার কোনো কষ্ট হবে না তো?

না। কোনো কষ্ট হবে না।

তাহলে চল যাই।

কিছুক্ষণের ভেতর বুলবুল মিথিলাকে নিয়ে আকাশে উড়ে গেল। ঠিক তখন একজন ডক্টর আশরাফের কেবিনে জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছিল। ডক্টর আশরাফ ঘুম থেকে উঠে ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী হয়েছে?

আপনি বিশ্বাস করবেন না স্যার। নিজের চোখে দেখলেও বিশ্বাস করবেন না।

কী হয়েছে?

বিশাল বড় একটা পাখির পালক কোথা থেকে এসেছে আমি জানি।

কোথা থেকে।

একজন মানুষ, তার পাখির মতোন পাখা।

ডক্টর আশরাফ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল। বলল, কী বলছ?

বলছি, একজন মানুষ তার পাখির মতো পাখা।

সে কোথায়?

মিথিলাকে নিয়ে আকাশে উড়তে গেছে। একটু পরে আসবে।

মি-মিথিলাকে নিয়ে? মিথিলাকে?

হ্যাঁ স্যার। মানুষটা মিথিলাকে চিনে, দুজন খুব বন্ধু। আমি স্যার তাদের কথা শুনেছি।

ডক্টর আশরাফ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সবাইকে ডেকে তোলে। এই ক্রিয়েচারটাকে ধরতে হবে। মনে হয় এটা হবে। বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার।

ঘণ্টা দুয়েক পর যখন মিথিলাকে পিঠে নিয়ে বুলবুল লঞ্চের ছাদে নেমে এল তারা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি প্রায় দুই ডজন মানুষ তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। মিথিলা তার পিঠ থেকে নেমে যখন বুলবুলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তখন এক সাথে সবাই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

মুহূর্তের মাঝেই বুলবুল বুঝে যায় কী হচ্ছে, সে তার শক্তিশালী পাখা। দিয়ে আঘাত করে কয়েকজনকে নিচে ফেলে দেয়। পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না, কেউ একজন একটা লোহার রড দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেছে, জ্ঞান হারিয়ে অচেতন হওয়ার আগে সে। শুনতে পেল মিথিলা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলছে, না! না! না!

মিথিলাকে ডক্টর আশরাফ ধরে রাখতে পারছে না, আরো দুজন মিলে মিথিলাকে আটকে রেখেছে। সে হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মানুষের মতো চিৎকার করে কাঁদছে, তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে।

বুলবুলকে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। শুধু হাত বেঁধেই কেউ নিশ্চিত হতে পারেনি, তাই পা দুটিকেও শক্ত করে বাঁধা হয়েছে। লঞ্চের ছাদে রেলিংয়ের সাথে তার শরীরটা বেঁধে রাখা হয়েছে। তার সারা দেহ রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। সে জানত তাকে যদি ধরে ফেলতে পারে সেটাই হবে তার শেষ, তাই সে প্রাণপণে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছিল, এতগুলো মানুষের সাথে সে একা কিছুতেই পেরে ওঠেনি। শেষ মুহূর্তে একজন লোহার বউ দিয়ে মাথায় মেরে বসেছে, তখন সে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। তা না হলে সে হয়তো কোনোভাবে নিজেকে মুক্ত করে উড়ে যেতে পারত। খুব ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরে এসেছে, মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। তার চারপাশে কী ঘটছে সে ভালো করে বুঝতে পারছে না। তার সামনে অনেক মানুষ, তাকে অবাক হয়ে দেখছে, এটুকুই সে বুঝতে পারে। শুনতে পেল কেউ একজন বলল, জ্ঞান ফিরেছে! স্যারকে ডাকো। স্যারকে ডাকো।

কিছুক্ষণের মাঝেই ডক্টর আশরাফ লঞ্চের ছাদে চলে এল। বুলবুলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সে অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। তাকে ডাকল, এই।

বুলবুল চোখ খুলে তাকাল, কোনো কথা বলল না। ডক্টর আশরাফ জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথা থেকে এসেছ?

বুলবুল কোনো কথা বলল না। তার কথা বলার ইচ্ছে নেই, তা ছাড়া সে কোথা থেকে এসেছে সেটা সে কাউকে কেমন করে বোঝাবে? ডক্টর আশরাফ আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথা থেকে এসেছ?

বুলবুল কোনো উত্তর দিল না। ডক্টর আশরাফ আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি কী?

বুলবুল কষ্ট করে চোখ তুলে ডক্টর আশরাফের দিকে তাকালো, তারপর ফিসফিস করে বলল, আমি জানি না। আপনি বলবেন আমি কী?

ডক্টর আশরাফ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে বুলবুলের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর উঠে দাঁড়ায়। যারা তার আশপাশে ছিল তাদের লক্ষ করে বলল, এই ক্রিয়েচারটাকে একটু পরীক্ষা করা দরকার। মেডিকেল পরীক্ষা।

একজন একটু এগিয়ে এসে বলল, করেছি স্যার।

কী দেখেছ?

অনেক ব্লাড লস হয়েছে। মানুষ হলে বলতাম রক্ত দিতে হবে। কিন্তু এটা তো মানুষ না, কী বলব বুঝতে পারছি না। কী ট্রিটমেন্ট করব বুঝতে পারছি না।

বেঁচে থাকবে?

জানি না স্যার। মাথার পেছনে রড দিয়ে মারা হয়েছে, ব্রেন ইনজুরি হয়েছে কি না বুঝতে পারছি না। মানুষ হলে এতক্ষণে মরে যেত।

ডক্টর আশরাফ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এই প্রাণীটা মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রাণী। চেষ্টা করো এটাকে বাঁচিয়ে রাখতে।

চেষ্টা করব স্যার।

তবে শেষ পর্যন্ত অবশ্য বেঁচে না থাকলে ভালো।

কেন স্যার?

প্রাণীটার মানুষ অংশটা খুব প্রবল। আমার মেয়েকে মুগ্ধ করে ফেলেছে, বুঝতে পারছ না? যদি তার কথাবার্তা চিন্তাভাবনা মিডিয়াতে চলে আসে সায়েন্টিফিক কমিউনিটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবাই তখন এটার ইমোশনাল অংশটা নিয়ে কথা বলবে। সায়েন্টিফিক অংশটা চাপা পড়ে যাবে।

তাহলে কি স্যার এটাকে মেরে ফেলব?

এই মুহূর্তে না। আমাদের ঢাকা ফিরতে ফিরতে এখনো তিন দিন। এর আগে আমরা কাউকে কিছু জানতে দিচ্ছি না। এই তিন দিন নিজেরা এটাকে স্টাডি করি। ঢাকায় ফেরার পর দেখা যাক। কাজেই তোমরা কেউ বিশ্রাম নেবে না, সবাই কাজ কর।

উৎসাহী বিজ্ঞানীরা মাথা নাড়ল, বলল, জি স্যার। আমরা বিশ্রাম। নিচ্ছি না।

ছবি ভিডিও তোলার আগে রক্ত মুছে নিও। ইনজুরিগুলো যেন দেখা যায়-প্রাণীটার মাঝে মানুষ মানুষ ভাব থাকায় মুশকিল। কেউ দেখলে অন্য রকম ভাবতে পারে!

জি স্যার। এখন মানুষের সমস্যা নিয়ে মানুষেরা যত ভাবে পশুপাখির সমস্যা নিয়ে তার থেকে বেশি ভাবে।

ঠিকই বলেছ।

ঠিক এ রকম সময় মিথিলাকে তার কেবিনে আটকে রাখা হয়েছিল। যে মানুষটি তার জন্যে খাবার এনেছে সে খানিকটা নির্বোধের মতো দাঁড়িয়ে আছে, কারণ মিথিলা পুরো ভাত তরকারি তার মুখের ওপর ছুড়ে মেরেছে। খবর পেয়ে ডক্টর আশরাফ এসেছে। তাকে দেখে মিথিলা অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করে বলল, আব্বু।

বলো মিথিলা।

এটা কি সত্যি তুমি ওদের বলেছ আমাকে কেবিনের মাঝে তালা মেরে রাখতে?

ডক্টর আশরাফ বলল, এটাকে অন্যভাবে নিও না। তোমার ভালোর জন্য আমরা তোমাকে এখানে আটকে রাখছি।

আমার ভালোর জন্যে? মিথিলা চিৎকার করে বলল, আমার ভালোর জন্যে?

হ্যাঁ। তুমি অত্যন্ত নির্বোধের মতো কিছু কাজ করেছ।

কী কাজ করেছি?

পাখাওয়ালা ঐ প্রাণীটার সাথে ওড়ার চেষ্টা করেছ। তুমি কি জান তুমি কত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলে?

কীসের ঝুঁকি?

প্রাণীটা যদি তোমাকে ওপর থেকে ফেলে দিত?

ফেলে দিত? আমাকে? কেন আমাকে ফেলে দিবে?

ডক্টর আশরাফ বলল, এ রকম ভয়ঙ্কর একটা বন্য প্রাণী যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। তুমি কেমন করে তার পিঠে উঠে আকাশে উড়তে গেলে? তোমার কি বিন্দুমাত্র কাণ্ডজ্ঞান নাই?

আব্বু! ও মোটেও বন্য প্রাণী না—

আমার সাথে তর্ক করবে না। আমি এই বিষয়গুলো তোমার থেকে অনেক বেশি জানি। তুমি কি জানো সে কত হিংস্রভাবে আমার স্টুডেন্টদের আক্রমণ করেছে? আরেকটু হলে এটা তাদের মেরেই ফেলত।

আব্বু! তোমরা ওকে ধরার চেষ্টা করেছ আর সে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে না?

ডক্টর আশরাফ মাথা নেড়ে বলল, খুব একটা লাভ হয় নাই। তাকে আমরা ঠিকই ধরেছি।

শুধু ধরো নাই তাকে তোমরা মেরেছ। হঠাৎ করে মিথিলার গলা ভেঙে গেল, বলল, কেমন আছে এখন?

আছে একরকম।

বেঁচে আছে, নাকি তোমরা মেরে ফেলেছ?

মেরে ফেলব কেন?

লোহার রড দিয়ে তোমরা তার মাথায় মেরেছ—

আমাদের সেফটির জন্যে। একটা বন্য প্রাণী আমাদের আক্রমণ করবে আর আমরা চুপচাপ বসে থাকব?

মিথিলা একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, ঠিক আছে। এখন আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। আমাকে কেবিন থেকে বের হতে দিবে?

না।

ওকে একবার দেখতে দিবে?

কোনো প্রশ্নই আসে না।

আমাকে বাথরুমেও যেতে দিবে না?

সেটা দেব, তবে খুব সাবধানে। দেখতে হবে তুই যেন কোনো পাগলামি না করিস। একটু থেমে যোগ করল, আমরা ঢাকা রওনা দিয়ে দিয়েছি, দুই দিনে ঢাকা পৌঁছে যাব, তখন তোর যা ইচ্ছে হয় করিস।

ডক্টর আশরাফ চলে যাওয়ার পর মিথিলা কেবিনটা খুব ভালো করে পরীক্ষা করল। লোহার দেয়াল, লোহার দরজা ভেঙে বের হওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই। দরজার মাঝে কাচ লাগানো আছে, সেই কাচ ভেঙে ফেলা যাবে কিন্তু বড় জোর সে তার হাতটা বের করতে পারবে। যদি কোনোভাবে তালার চাবিটা পেতে পারত তাহলে হাত বের করে তালাটা খুলতে পারত। কিন্তু চাবি পাবে কোথায়?

ঠিক তখন তার একটা জিনিস মনে পড়ল, বাথরুমেও তালা দেয়া আছে। ভাড়া করা লঞ্চ, কেবিনের প্যাসেঞ্জারের জন্যে আলাদা বাথরুমে রয়েছে। সাধারণ মানুষেরা যেন যেতে না পারে সে জন্যে তালা মারা থাকে, কেবিনের মানুষেরা যাওয়ার সময় চাবি নিয়ে স্কুলে বাথরুমে যায়। বাথরুমের চাবিটা প্রথমে নিজের কাছে রাখতে হবে, তারপর খুব সাবধানে তার কেবিনের তালাটাকে বাথরুমের তালা দিয়ে পাল্টে দিতে হবে। তারপর যখন কেউ লক্ষ করবে না তখন দরজার কাচ ভেঙে হাত বের করে চাবি দিয়ে তালাটা খুলে ফেলতে হবে, কাজটা সহজ নয় কিন্তু চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

কাজেই মিথিলা খুব ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করল। সে এর আগে কখনোই এ রকম কিছু করেনি, আজকে করবে। খুব ঠান্ডা মাথায় সে পুরোটা করবে, একটা শেষ চেষ্টা করবে।

রাতের খাবারটা সে আগের বারের মতো মানুষটার মুখে ছুড়ে দিল না। সে খানিকটা খেলো এবং খানিকটা লুকিয়ে রাখল। গভীর রাতে সবাই যখন মোটামুটি ঘুমিয়ে গেছে, তখন সে ঘরের ভেতর লুকিয়ে রাখা ভাততরকারি পানির সাথে মিশিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে বমি করার মতো শব্দ করতে থাকে। সাথে সাথে দরজায় ধাক্কা দিয়ে শব্দ করতে থাকে।

কিছুক্ষণের মাঝেই খবর চলে গেল এবং ডক্টর আশরাফ উদ্বিগ্ন মুখে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল, জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে মিথিলা?

শরীর খারাপ লাগছে আব্বু। বমি হচ্ছে।

বমি হচ্ছে? কেন?

জানি না। বলে আবার সে বমি করার ভঙ্গি করল, মনে হলো আবার বমি করে দেবে। ডক্টর আশরাফ তাকে ধরল, মিথিলা দরজার কপাট ধরে বমি করার ভঙ্গি করে দরজায় লাগানো তালাটা সাবধানে খুলে নেয়।

মিথিলা টলতে টলতে হেঁটে বাইরে ঝোলানো বাথরুমের চাবিটা নিয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যায়। ডক্টর আশরাফ বলল, আমি খুলে দিই।

মিথিলা বিড়বিড় করে বলল, আমি পারব।

সে বাথরুমের তালাটা খুলে হাতে নিয়ে সেখানে তার ঘরের তালাটা ঝুলিয়ে দেয়। বাথরুমের ভেতর ঢুকে সে দরজা বন্ধ করে একটা বড় নিঃশ্বাস নেয়। এখন পর্যন্ত সবকিছু পরিকল্পনামতো হয়েছে। মিথিলার ইচ্ছে করল সে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দেয়। বাথরুমের ভেতর সে কয়েকবার বমি করার শব্দ করল, তারপর পানি ছিটিয়ে হাত-মুখ ধুতে শুরু করল। সে তার সুটকেসের চাবিটা নিয়ে এসেছে, সুতলি দিয়ে বাঁধা বাথরুমের চাবিটার জায়গায় স্যুটকেসের চাবিটা লাগিয়ে নেয়। বাথরুমের চাবিটা কোমরে খুঁজে নিয়ে সে বাথরুম থেকে বের হলো, বাইরে ডক্টর আসরাফ ঘুমঘুম চোখে দাঁড়িয়ে ছিল, মিথিলাকে জিজ্ঞেস করল, ঠিক আছে?

হ্যাঁ ঠিক আছে।

তাহলে ঘুমিয়ে যা।

ঘুম আসছে না। তোমার কাছে ঘুমের ট্যাবলেট আছে?

হ্যাঁ, আছে।

বেশি করে কয়েকটা দেবে? খেয়ে ঘুমাব।

বেশি করে নয়। একটা দিচ্ছি, খেয়ে ঘুমিয়ে যা।

মিথিলা তখন সুতলিতে বাঁধা স্যুটকেসের চাবিটা বাথরুমের চাবি হিসেবে আগের জায়গায় ঝুলিয়ে দেয়, তারপর নিজের ঘরে ঢোকে, ঢোকার সময় দরজার কড়ায় সে বাথরুমের তালাটা ঝুলিয়ে দিল। তারপর ঘরে ঢুকে নিজের বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।

ডক্টর আশরাফ একজন লোককে ডাকিয়ে মিথিলার ঘরটা একটু পরিষ্কার করিয়ে দেয়। তারপর মিথিলার হাতে একটা ট্যাবলেট দিয়ে বলল, এটা খেয়ে ঘুমিয়ে যা।

দুইটা দাও।

দুইটা লাগবে না। একটাই যথেষ্ট।

না আব্বু। আমাকে দুইটা দাও। আমি মড়ার মতো ঘুমাতে চাই।

একটু ইতস্তত করে ডক্টর আশরাফ তাকে দুইটা ট্যাবলেট দিল। মিথিলা দুইটা ট্যাবলেট নিয়ে মুখে দিয়ে ঢক ঢক করে পানি খেয়ে বলল, এখন আমি ঘুমাব।

ডক্টর আশরাফ বলল, হ্যাঁ, এখন ঘুমিয়ে যা।

গুড নাইট আব্বু। বলে সে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে জিভের নিচে লুকিয়ে রাখা ট্যাবলেট দুটো বের করে ফেলল, কী কুৎসিত গন্ধ, মনে হলো এবারে বুঝি সে সত্যি সত্যি বমি করে দেবে।

মিথিলা আরো ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করল তারপর সে উঠে বসল। কেউ এখন তাকে নিয়ে মাথা ঘামাবে না, সবাই জানে সে দুইটা ঘুমের ট্যাবলেই খেয়ে মরার মতো ঘুমাচ্ছে। মিথিলা সুটকেস থেকে তার একটা টি-শার্ট বের করে হাতে পেঁচিয়ে নিয়ে সাবধানে দরজার কাচে আঘাত করে। দরজার কাচকে সে যতটুকু শক্ত ভেবেছিল সেটা তার থেকে অনেক বেশি শক্ত। কোনো কিছু দিয়ে জোরে আঘাত করে ইচ্ছে করলেই সে কাচটা ভেঙে ফেলতে পারে কিন্তু সে কোনো শব্দ করতে চাচ্ছিল না।

শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টার পর কাচে একটা ফাটল তৈরি হলো, তখন সে সাবধানে চাপ দিয়ে একটা বড় টুকরো আলাদা করে নেয়। চাপ দিয়ে সাবধানে আরো একটু ভেঙে সে আরো কয়েক টুকরো কাচ সরিয়ে নেয়। এখন মোটামুটিভাবে হাত বের করার মতো জায়গা হয়েছে। চাবিটা নিয়ে সে হাতটা বাইরে বের করে দরজার কড়াতে লাগানো তালাটা খোলার চেষ্টা করে। দুই হাতে যে কাজটি পানির মতো সহজ, এক হাতে সেই কাজটিই প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। তার ভয় করছিল হঠাৎ করে তার হাত থেকে চাবিটা না নিচে পড়ে যায়, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

শেষ পর্যন্ত মিথিলা তালার ভেতর চাবি ঢোকাতে পারল এবং একটু চাপ দিতেই তালাটা খুট করে খুলে যায়। মিথিলা দরজার কড়া থেকে তালাটা খুলে নিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি সে শেষ পর্যন্ত মুক্ত হতে যাচ্ছে।

মিথিলা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তারপর খুব সাবধানে দরজা খুলে কেবিন থেকে বের হয়ে আসে। বাইরে আবছা অন্ধকার, কেউ কোথাও নেই। লঞ্চের ইঞ্জিনের ধ্বক ধ্বক শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। মিথিলা রেলিংয়ের পাশে এসে দাঁড়ায়, পানি কেটে লঞ্চটা এগিয়ে যাচ্ছে। বাইরে আবছা অন্ধকার। মিথিলা আবার নিজের কেবিনে ঢুকে একটা পার্টির বোতল আর তার নিজের একটা তোয়ালে নিয়ে খুব সাবধানে বের হয়ে এল। এদিক সেদিক তাকিয়ে সে এবারে সাবধানে ছাদের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। তার ভয় হচ্ছিল ছাদে ওঠার দরজায় কেউ থাকবে, কিন্তু সেখানে কেউ নেই। তার আরো বেশি ভয় হচ্ছিল উপরে কেউ পাহারায় থাকবে কিন্তু ভাগ্য ভালো সেখানেও কেউ নেই।

ছাদের রেলিংয়ে বুলবুলকে বেঁধে রেখেছে। সে মাথা নিচু করে অবসন্নের মতো বসে ছিল, মিথিলা ছুটে গিয়ে তাকে স্পর্শ করতেই সে চোখ খুলে তাকালো, মিথিলাকে দেখে মুহূর্তের মাঝে তার মুখে একটা হাসি ফুটে ওঠে। সে নরম গলায় বলল, তুমি?

হ্যাঁ। আমি। আমাকে আটকে রেখেছিল, কোনোমতে পালিয়ে এসেছি।

আমি ভাবি নাই তোমার সাথে আর দেখা হবে।

আমিও ভাবি নাই। মিথিলা তার মাথায় গালে হাত বুলিয়ে বলল, কেমন আছ তুমি?

ভালো ছিলাম না। তুমি এসেছ এখন আমি খুব ভালো আছি।

মিথিলা বলল, কেউ এসে পড়বে। আগে তোমাকে খুলে দিই।

বুলবুল কোনো কথা বলল না। মিথিলা তার বাঁধন খুলে দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল। খুব শক্ত করে বেঁধেছিল, মিথিলার খুব কষ্ট হলো বাঁধন খুলতে। শেষ পর্যন্ত যখন খুলতে পারল তখন বুলবুল তার দুই হাত আর পায়ে হাত বুলিয়ে হাসার চেষ্টা করল।

মিথিলা টাওয়েলটা ভিজিয়ে তার মুখ থেকে শুকনো রক্ত মুছিয়ে দিয়ে বলল, তুমি এখন যাও। কেউ এসে পড়ার আগে তুমি যাও। এক্ষুণি যাও।

বুলবুল অনেক কষ্ট করে হাসার চেষ্টা করল, বলল, আমার যাওয়ার ইচ্ছে করছে না।

মিথিলা তাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, লক্ষ্মী ছেলে আমার! ইচ্ছা না করলেও তোমাকে যেতে হবে।

বুলবুল নিজের পায়ের ওপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, হুঁমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল কোনোমতে মিথিলাকে ধরে সামলে নেয়। নিজের পাখা দুটো এবার বিস্তৃত করে দেখে নেয় তারপর সে মিথিলার দিকে তাকালো, বলল, ঠিক আছে মিথিলা।।

মিথিলা তার দুই হাত এগিয়ে দিয়ে বুলবুলকে গভীর মমতায় আলিঙ্গন করে ছেড়ে দিয়ে বলল, যাও! তুমি উড়ে যাও।

বুলবুল কিছুক্ষণ নিষ্পলক দৃষ্টিতে মিথিলার দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব ধীরে ধীরে তার দুই চোখ পানিতে ভরে ওঠে। সে ফিসফিস করে বলল, মিথিলা।

বল।

তুমি আমাকে মনে রেখো।

মনে রাখব। আমি তোমাকে মনে রখব।

আমি তাহলে যাই?

যাই বলতে হয় না। বলতে হয় আসি।

আমি তাহলে আসি?

আস বুলবুল।

বুলবুল তখন এগিয়ে যেতে থাকে। খুব ধীরে ধীরে তার দুই পাখা বিস্তৃত করে ডানা ঝাঁপটিয়ে সে উপরে উঠে যায়। মিথিলা দেখতে পায় বিশাল শক্তিশালী দুটি পাখা দুর্বল ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে উপরে তুলে নেয়ার চেষ্টা করছে, অনেক কষ্টে সে উড়ে যাচ্ছে, উড়ে যেতে যেতে সে একবার পেছনে ফিরে তাকালো।

মিথিলা তার মুখে অনেক কষ্টে একটা হাসি ধরে রাখে। হাসি হাসি মুখে সে বুলবুলের দিকে তাকিয়ে তার হাত নাড়ে। বুলবুল আবার মাথা ঘুরিয়ে নিল, তারপর ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়ে যেতে লাগল। খুব ধীরে ধীরে সে দূরে সরে যেতে থাকে, মিলিয়ে যেতে থাকে।

পুবের আকাশে তখন সূর্য উঠছে, দেখে মনে হয় বুলবুল বুঝি ডানা। ঝাঁপটিয়ে ঠিক সূর্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইকারাসের মতো।

মিথিলা তখন তার দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে আকুল হয়ে কাঁদল।

শেষ কথা

মিথিলা তার শিশু সন্তানটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ঘুমাও বাবা আর কত দুষ্টুমি করবে?

আগে তুমি গল্প বল, তাহলে ঘুমাব।

মিথিলা তখন তাকে ডেডিলাসের পুত্র ইকারাসের গল্প বলল। ইকারাস তার ডানা ঝাঁপটিয়ে কীভাবে সূর্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সেই গল্পটুকু বলার সময় মিথিলা কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মোছে।

আম্মু কেন এটা করে মিথিলার শিশুপুত্র বুলবুল সেটা কখনো বুঝতে পারে না। বুলবুল শুধু একটা জিনিস জানে–তার আম্মু তাকে খুব ভালোবাসে, কারণে-অকারণে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, বুলবুল। আমার সোনা বুলবুল! 

                        -------------