দ্বিতীয় পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#অন্ধকারের_গ্রহ - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল
ধাপে ধাপে মহাকাশযানের গতিবেগ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত গতিবেগে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানের ভেতরের অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এলো। খাবার টেবিল ঘিরে কমান্ডের সবাই এসে বসেছে, ক্যাপ্টেন ব য়ুহার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বলল, এই যে কবি য়ুহা তোমার অবস্থা কেমন?
ভালো।
তোমার খুব দুর্ভাগ্য যে তুমি একটা সামরিক মহাকাশযানে যাচ্ছ। সাধারণ যাত্রীদের মহাকাশযানে এত কষ্ট নেই।
কষ্ট ছাড়া যদি যাওয়া যায় তাহলে মিছি মিছি কষ্ট করা হয় কেন?
সময় বাঁচানোর জন্যে। প্রাথমিক গতিবেগ যত বাড়ানো যায় তত সময় বাঁচানো যায়। মহাকাশযানের পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে সময়। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রাথমিক বেগটা বাড়িয়ে নিয়েছি।
য়ুহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বেগ যেটুকু বাড়ানোর কথা ততটুকু বাড়ানো হয়ে গেছে? আর বাড়ানো হবে না?
ক্যাপ্টেন ত্রুব একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, কবি য়ুহা–এই যে তুমি মহাকাশযানের ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছ না, শক্ত মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছ তার অর্থ আমাদের বেগ এখনো বাড়ছে। তবে সেটা আমাদের সহ্যসীমার ভেতরে। তাই তুমি টের পাচ্ছ না।
য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, সব মিলিয়ে আমার একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা হলো।
মিটিয়া নামের ডাক্তার মেয়েটি হেসে বলল, অভিজ্ঞতা হলো বলো না, বল অভিজ্ঞতা হওয়া শুরু হলো।
য়ুহা ভয়ে ভয়ে বলল, কেন? আরও কিছু হবে নাকি?
গতিবেগটা যেভাবে বাড়ানো হয়েছে আবার সেভাবে কমানো হবে? একই ব্যাপার হবে তখন।
য়ুহা শুকনো মুখে বলল, সেটা কখন হবে?
মিটিয়া মাথা নাড়ল, বলল, যখন সময় হবে তখন জানানো হবে।
ক্যাপ্টেন ক্ৰব মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, তার দেরি আছে য়ুহা। তুমি নিশ্চিন্ত মনে তোমার মহাকাশ ভ্রমণ উপভোগ কর। তোমার আনন্দের জন্য এখানে সব রকম ব্যবস্থা করে দেয়া আছে।
ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন ক্ৰব। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
আমাকে ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই। আমাদের উপরে নির্দেশ দেয়। হয়েছে আমরা যেন তোমার আনন্দের ব্যবস্থা রাখি। তোমার সম্মানে আজকে আমরা বিশেষ ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। নাও খেতে শুরু কর।
বিশেষ ধরনের খাবার খেতে গিয়ে য়ুহা আবিষ্কার করে সেটি আসলে মোটামুটি সাধারণ খাবার। মহাকাশযানের দীর্ঘ সময়ের জন্যে নিশ্চয়ই খাবারে বৈচিত্র্য আনা কঠিন। য়ুহা এক টুকরো শুকনো রুটি গরম স্যুপে ভিজিয়ে মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল, আমার ধারণা ছিল তোমাদের কোনো একজন একটা ককপিটে বসে থেকে মহাকাশযানটাকে চালিয়ে নিয়ে যাবে!
য়ুহার কথা শুনে খাবার টেবিলের কয়েকজন শব্দ করে হেসে উঠল। ক্যাপ্টেন ক্রুব মাথা নেড়ে বলল, না, আমাদের এই মহাকাশযানটা আমাদের চালিয়ে নিতে হয় না। যাত্রার শুরুতে আমাদের গন্ত স্থানের কোঅর্ডিনেট ঢুকিয়ে দিতে হয়। বাকি কাজটুকু কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক করে।
তোমাদের কিছুই করতে হয় না? না, আমাদের কিছুই করতে হয় না।
য়ুহা একটু ইতস্তত করে বলল, একটা যন্ত্রের ওপর এত বিশ্বাস রাখা। কি ঠিক?
উত্তেজক পানীয় খাবার কারণে প্রায় সবাই একটু তরল মেজাজে ছিল, এবারে অনেকেই শব্দ করে হেসে উঠল। হিসান নামের সুদর্শন মানুষটি তার পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ককে যন্ত্র বলা ঠিক নয়। তার ভেতর যে জটিল নেটওয়ার্ক আছে সেটা মানুষের মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক থেকেও বেশি জটিল, বেশি বিস্তৃত। এই মহাকাশযানের প্রত্যেকটা বিন্দুর ওপর সেটি দৃষ্টি রাখছে, সেটি নিয়ন্ত্রণ রাখছে।
ক্যাপ্টেন ত্রুব গলা উঁচিয়ে বলল, য়ুহাকে আমাদের কোয়ার্টজ গোলকের পরীক্ষাটি দেখিয়ে দিই।
মিটিয়া মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটা দেখিয়ে দাও!
ক্যাপ্টেন ক্রব হিসানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি একটা কোয়ার্টজ গোলক নিয়ে এসো তো!
হিসান প্রায় সাথে সাথেই একটা ছোট কোয়ার্টজের স্বচ্ছ গোলক এনে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের হাতে ধরিয়ে দেয়। ক্যাপ্টেন ক্র অনেকটা বক্তৃতার ভঙ্গিতে বলল, এই যে আমার হাতে গোলকটা দেখছ এটা একটা নিখুঁত গোলক। এটাকে ভরশূন্য পরিবেশে তৈরি করা হয়েছে। এই কোয়ার্টজের গোলকটাকে আমি সাবধানে এই টেবিলটার ওপর রাখছি।
ক্যাপ্টেন ত্রুব সাবধানে গোলকটাকে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, তুমি দেখছ এটা স্থির হয়ে আছে, কোনোদিকে গড়িয়ে যাচ্ছে না?
য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ দেখছি।
তার মানে কী বলতে পারবে?
য়ুহা মাথা চুলকে বলল, তার মানে, তার মানে—এই টেবিলটা একেবারে সোজা, এটা কোনোদিকে ঢালু হয়ে নেই?
হ্যাঁ। একজন কবি হিসেবে তোমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা খারাপ নয়। আমাদের এই মহাকাশযানের প্রযুক্তি প্রায় নিখুঁত, এই টেবিলগুলো সব সময়েই সোজা কোথাও কোনোদিকে ঢালু হয়ে নেই। কিন্তু এখানে আরেকটা ব্যাপার আছে।
কী ব্যাপার?
মহাকাশযানটা এক জি ত্বরণে সোজা, সামনের দিকে যাচ্ছে। এত বড় একটা মহাকাশযানের গতিতে এতটুকু বিচ্যুতি না ঘটিয়ে নিখুঁতভাবে নেয়া কিন্তু সহজ নয়। যদি এতটুকু বিচ্যুতি হয় আমরা এই গোলকটাতে দেখব। যদি মহাকাশযানটা একটু বামদিকে ঘুরে যায় এই গোলকটা ডানদিকে গড়িয়ে আসবে, যদি মহাকাশযানটা ডান দিকে ঘুরে যায় এটা বাম দিকে গড়িয়ে যাবে।
য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, মজার ব্যাপার।
ক্যাপ্টেন ক্ৰব কোয়ার্টজের স্বচ্ছ গোলকটা য়ুহার হাতে দিয়ে বলল, নাও। এটা তুমি রাখ, তোমার ঘরের টেবিলের ঠিক মাঝখানে এটা রেখে দাও। তুমি দেখবে আগামী এক মাসেও এটা এক চুল ডানে বা বামে সরবে না। আমাদের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের কাজ এত নিখুঁত!
য়ুহা গোলকটা হাতে নিয়ে বলল, তোমাকে ধন্যবাদ ক্যাপ্টেন ক্ৰব।
খাওয়ার পর সবাই মহাকাশযানের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। য়ুহা হিসানকে খুঁজে বের করে বলল, হিসান, তুমি কি আমাকে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কটা একটু দেখাতে পারবে?
হিসান একটু অবাক হয়ে বলল, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক দেখবে?
হ্যাঁ।
আসলে এটা তো দেখার মতো কিছু নয়। মহাকাশযানের ঠিক মাঝখানে একটা ঘরের ভেতরে আছে।
সেই ঘরে আমরা যেতে পারি না?
না। ভেতরে যাবার কোনো উপায় নেই।
উঁকি দিয়ে দেখতে পারি না?
হিসান হেসে ফেলল, বলল, উঁকি দিয়ে দেখারও কিছু নেই। মূল নেটওয়ার্কটা হচ্ছে প্রায় এক মিটার বর্গাকৃতির একটা নিখুঁত ক্রিস্টাল, এর মাঝে একটা পরমাণুও তার সঠিক জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়নি। এটাকে রাখা হয় চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায়। আলোর সকল তরঙ্গে এর সাথে যোগাযোগ হয়। বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করার জন্যে এটাকে ঘিরে রয়েছে একটার পর আরেকটা তারপর আরেকট। ওর! হিস। এ মুহূর্ত থেমে বলল, তোমার ঘরের যোগাযোগ মডিউলে তুমি এ সম্পর্কে সব তথ্য পেয়ে যাবে। হলোগ্রাফিক ছবিতে দেখানো আছে।
য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, আমি হলোগ্রাফিক ছবি দেখতে চাই না। আসল জিনিসটা দেখতে চাই।
ঠিক আছে, তুমি তাহলে আস আমার সাথে, তোমাকে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের ঘরটির কাছাকাছি নিয়ে যাই।
হ্যাঁ। চল। আমার দেখার খুব শখ।
হিসান য়ুহাকে মহাকাশযানের নানা গলি ঘুচি দিয়ে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের ঘরটিতে নিয়ে গেল। চারপাশে নানা ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, তার মাঝখানে বর্গাকৃতির সাদামাটা ঘর। বলে না দিলে বোঝার উপায় নেই এর ভেতরে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কটা রয়েছে।
য়ুহা ঘরটার ধাতব দেয়াল স্পর্শ করে বলল, কেউ যদি এই দেয়াল ভেঙে ঢুকে যায়?
হিসান শব্দ করে হেসে বলল, নিউক্লিয়ার বোমা দিয়েও এই দেয়াল ভাঙা যাবে না। মহাকাশযানের সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকাটি হচ্ছে এই কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের ঘর।
য়ুহা বাইরে থেকে ঘুরে ঘুরে ঘরটিকে দেখে, ধাতব দেয়ালটি হাত দিয়ে স্পর্শ করে তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, চল, যাই।
চল। তুমি যেটা দেখতে চেয়েছিলে সেটা দেখেছ?
হ্যাঁ দেখেছি।
সত্যি কথা বলতে কী তুমি এই ঘরের ধাতব দেয়াল ছাড়া আর কিছুই দেখনি।
য়ুহা হিসানের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি একজন কবি। আমার কাজই হচ্ছে কল্পনা করা। আমি যেটা দেখতে পাই না সেটা কল্পনা করতে পারি, আমি যেটুকু দেখিনি সেটুকু কল্পনা করে নিয়েছি।
হিসান মাথা ঘুরিয়ে একবার য়ুহার মুখের দিকে তাকালো, কোনো কথা বলল না।
মহাকাশযানের গলি খুঁচি দিয়ে হেঁটে হেঁটে মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষের দিকে ফিরে আসতে আসতে য়ুহা বলল, আমি এই মহাকাশযানে যে জন্যে এসেছি
সেটা কিন্তু এখনো করিনি।
কী করতে এসেছ?
আমি মহাকাশযানের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মহাকাশকে দেখব। আমি শুনেছি এটা নিকষ কালো-তার মাঝে শুধু নক্ষত্রগুলো জ্বলজ্বল করে, দূরে কোনো একটা গ্যালাক্সিকে স্পষ্ট দেখা যায়।
হিসান মাথা নাড়ল। বলল, হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ। মহাকাশযানে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা একটা অভূতপূর্ব দৃশ্য। যারা প্রথমবার দেখে তারা হতবাক হয়ে যায়।
য়ুহা বলল, আমার মনে হয় আমি যত দিন এই মহাকাশযানে থাকব তত দিন এই জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকব। ব্যাপারটা চিন্তা করেই আমার এক ধরনের শিহরণ হচ্ছে। আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে!
হিসান বলল, তুমি যখন নিজের চোখে দেখবে তখন গায়ের লোম শুধু দাঁড়িয়ে যাবে না–দাঁড়িয়ে নাচানাচি করতে থাকবে!
নিয়ন্ত্রণকক্ষে ঢুকে সত্যি সত্যি য়ুহার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। সামনে বিশাল একটা স্বচ্ছ জানালায় মহাকাশকে দেখা যাচ্ছে–নিকষ কাল অন্ধকার মহাকাশে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলছে। দুরে একটি গ্যালাক্সি আরো দূরে আরো কয়েকটি গ্যালাক্সি। মাঝামাঝি একটা অংশে ধোয়াটে কিছু অংশ, তার মাঝামাঝি একটা অংশ গাঢ় অন্ধকারে ড়ুবে আছে। দেখে মনে হয় পুরো মহাকাশ বুঝি জীবন্ত কোনো প্রাণী তার সহস্র চোখ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
য়ুহা বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, কী অসাধারণ! কী অপূর্ব!
হিসান য়ুহার উচ্ছ্বাসে যোগ দিল না। সে অসংখ্যবার মহাকাশ অভিযানে যোগ দিয়েছে, এই দৃশ্য তার কাছে খুব পরিচিত একটা দৃশ্য।
য়ুহা বলল, আমার ধারণা ছিল নক্ষত্রগুলো বুঝি মিটিমিটি করবে–
হিসান মাথা নাড়ল, বলল, ভুল ধারণ! মিটিমিটি করে না। স্থির হয়ে জ্বলে। যদি বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে দেখতে হয় তাহলে এ রকম মনে হতে পারে।
এত বিচিত্র রং আছে সেটাও আমি জানতাম!
হ্যাঁ। নক্ষত্রের তাপমাত্রার ওপর তার রংটা নির্ভর করে।
কোনো কোনোটা উজ্জ্বল কোনো কোনোটা এত নিষ্প্রভ যে দেখাই যায় না।
হিসান বলল, সেগুলো এত লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরে যে তুমি সেটা কল্পনাও করতে পারবে না।
আমি একজন কবি। য়ুহা নিজের বুকে হাত দিয়ে বলল, আমি সব কল্পনা করতে পারি।
ঠিক এ রকম সময়ে ক্যাপ্টেন ক্ৰব ঘরটিতে এসে ঢুকল, য়ুহার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলল, তুমি সব কল্পনা করতে পার?
হ্যাঁ। পারি।
দেখা যাক তোমার কথা সত্যি কি না। ক্যাপ্টেন ক্ৰব জানালার মাঝামাঝি একটা অংশের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, তুমি এই দিকে তাকিয়ে থাক।
তাকিয়ে থাকলে কী হবে?
আমি এর ঔজ্জ্বল্যতাটুকু বাড়িয়ে দিই–তুমি তখন একটা অংশ দেখবে যার কাছাকাছি একটা ব্ল্যাক হোল আছে। ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণে যে গ্যাস–
দাঁড়াও-দাঁড়াও-তুমি কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না। তুমি এর ঔজ্জ্বল্যতাটুকু কেমন করে বাড়াবে? আমরা জানালা দিয়ে বাইরে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। মহাকাশের ঔজ্জ্বল্যতা তুমি কেমন কয়ে বাড়াবে?
এই যে। ক্যাপ্টেন ক্রব হলোগ্রাফিক একটা প্যানেল বের করে তার একটা জায়গায় স্পর্শ করে বলল, এর পুরো নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে। এই স্ক্রিনে যা আছে তার সবকিছু আমি ইচ্ছে করলে আরো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পারি।
স্ক্রিন? য়ুহা চোখ বড় বড় করে বলল, এটা তাহলে একটা স্ক্রিন? এটা জানালা না?
হ্যাঁ এটা একটা স্ক্রিন। মহাকাশযানের বাইরে যে ক্যামেরা আছে সেগুলো থেকে মহাকাশযানের যে ছবি দেখা যাচ্ছে সেগুলো এই স্ক্রিনে দেখাচ্ছে।
তার মানে এটা আসল মহাকাশ না? এটা মহাকাশের ছবি?
ক্যাপ্টেন ত্রুব বলল, তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ আমি জানি না। আমাদের সামনে একটা খোলা জানালা থাকলে আমরা যা দেখতাম এখানে হুঁবহুঁ তা-ই দেখা যাচ্ছে।
হুবহুঁ একরকম। কিন্তু আসল দৃশ্য নয়?
ক্যাপ্টেন ত্রুব বলল, তুমি যদি সেভাবে বলতে চাও বলতে পার।
য়ুহার মুখে আশাভঙ্গের একটা ছাপ পড়ল। সে নিচু গলায় বলল, আমি আসলে নিজের চোখে সত্যিকার মহাকাশ দেখতে চেয়েছিলাম।
এটা সত্যিকার মহাকাশ, তুমি নিজের চোখে দেখছ।
এটা সত্যিকার মহাকাশ না। এটা সত্যিকার মহাকাশের ছবি!
ক্যাপ্টেন ত্রুব হিসানের দিকে তাকিয়ে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালো। হিসান বলল, য়ুহা তুমি বিশ্বাস কর। সত্যিকার মহাকাশ ঠিক এ রকম। হুঁবহুঁ এ রকম।
য়ুহা বলল, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি। কিন্তু তবুও সত্যিকার মহাকাশ দেখতে চাইছিলাম।
সত্যিকার মহাকাশ দেখার উপায় থাকে না। তার প্রয়োজন নেই, তুমি যেহেতু অনেক ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছ কেন তার জন্যে কষ্ট করবে।
য়ুহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তোমরা বুঝতে পারছ না। আমি ব্যাপারটা অনুভব করতে চাই। অনুভব। ভুল জিনিস দিয়ে কোনো কিছু অনুভব করা যায় না। সত্যি আর তার ছবি এক নয়।
ক্যাপ্টেন জব বাধা দিয়ে বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি বুঝতে পারছি তোমার কৌতূহলটা যৌক্তিক কৌতূহল নয়, এটা হচ্ছে এক ধরনের আবেগতাড়িত কৌতূহল!
য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ধরতে পেরেছ। আমার ভেতরে যুক্তি খুব বেশি নেই। যা আছে তার পুরোটাই আবেগ! এবং—
এবং?
সে জন্যে আমার কোনো লজ্জা নেই। কোনো হীনম্মন্যতা নেই।
ক্যাপ্টেন ক্ৰব মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে, আমি বুঝিতে পারছি। আমি তোমাকে সত্যিকার জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তারপর হিসানের দিকে তাকিয়ে বলল, ট্রান্সপোর্ট ঘরের পাশে সিকিউরিটি চ্যানেলের যে কোয়ার্টও জানা আছে য়ুহাকে সেখানে নিয়ে যাও।
কিন্তু সেটা এত ছোট!
হ্যাঁ। অনেক ছোট। কিন্তু কিছু করার নেই।
য়ুহা আগ্রহ নিয়ে বলল, ছোট হোক আমার আপত্তি নেই! সত্যিকার জানালা হতেই হবে। আমি ছোট একটা জানালা দিয়েই বাইরে তাকাতে পারব।
হিসনি ইতস্তত করে বলল, জায়গাটাতে অক্সিজেন সরবরাহ আর তাপমাত্রার খানিকটা সমস্যা আছে।
য়ুহা ব্যস্ত হয়ে বলল, থাকুক! আমার আপত্তি নেই।
কোয়ার্টজের একটা জানালা, অতিবেগুনি রশ্মিা পুরোটুকু কাটা যায়। রেডিয়েশনের সমস্যাও আছে।
ক্যাপ্টেন ক্রব বলল, রেডিয়েশন মনিটর দেখে যেও। আমার মনে হয় সিকিউরিটি স্যুট পরে গেলে কোনো সমস্যা হবে না।
কাজেই কিছুক্ষণ পর দেখা গেল ট্রান্সপোর্ট ঘরের পাশে সিকিউরিটি চ্যানেলের কাছে একটা সিকিউরিটি স্যুট পরে য়ুহা কোয়ার্টজের জানালা দিয়ে বাইরে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে।
হিসান জিজ্ঞেস করল, তুমি যেটা দেখতে চেয়েছ সেটা দেখছ?
য়ুহা বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, হ্যাঁ, দেখছি। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমি নিজের চোখে মহাকাশকে দেখছি।
কেমন দেখছ?
অপূর্ব! গ্যালাক্সিটা দেখেছ?
হ্যাঁ, এন্ড্রোমিডা। আমাদের সবচাইতে কাছের গ্যালাক্সি।
আমার চোখের পাতি ফেলতেও ভয় করছে। মনে হচ্ছে চোখের পাতি ফেললে যদি চলে যায়?
হিসান শব্দ করে হাসল, বলল, না যাবে না। এই গ্যালাক্সিটা ঠিক এখানেই থাকবে! আমাদের মহাকাশযানটা তার গতিপথ এতটুকু পরিবর্তন না করে এগিয়ে যাবে। তাই এন্ড্রোমিডাটাকে থেখানে দেখছ সেখানেই দেখবে, আগামী এক মাস এটা এখান থেকে এক চুলও নড়বে না।
য়ুহা আবার কোয়ার্টজের জানালায় মুখ লাগিয়ে বলল, আমি এটাকে আরো কিছুক্ষণ দেখি?
দেখ। তোমার যতক্ষণ ইচ্ছে দেখ।
য়ুহা কোয়ার্টজের জানালায় মুখ লাগিয়ে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার এখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না যে সত্যি সত্যি মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
ঘুমানোর আগে য়ুহা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বিছানায় তার মাথার কাছে টেবিলের ঠিক মাঝখানে স্বচ্ছ কোয়ার্টজের গোলকটা যেখানে রেখে গিয়েছিল সেটা ঠিক সেখানেই আছে–তার জায়গা থেকে সেটা এক চুল নড়েনি। ক্যাপ্টেন ক্রব ঠিকই বলেছিল, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক সত্যিই অসাধারণ। এত বড় একটা মহাকাশযানকে অচিন্ত্যনীয় বেগে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, শুধু যে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা-ই নয়, প্রতি মুহূর্তে তার গতিবেগ বাড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। মনে হয় তারা সবাই মিলে বুঝি মহাকাশযানে নিঃসঙ্গ পরিবেশে কোথাও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঘুমানোর আগে য়ুহা যোগাযোগ মডিউলটা চালু করে শীতলঘরে ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রায় শীতল করে রাখা এগারোজন মানুষকে একবার দেখে। রায়ীনার ছবিটা ভেসে আসার পর সে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে, মেয়েটার চেহারায় এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণবন্ত মানুষের চিহ্ন ছিল। এখন সেখানে কিছু নেই, শক্ত পাথরের মতো দেহটি নিশ্চল হয়ে আছে, দেখে মনে হয় না এটি আসলে কোনো মানুষের দেহ। মনে হয় এটা বুঝি পাথরের তৈরি একটা ভাস্কর্য। য়ুহা রায়ীনার দেহটির দিকে তাকিয়ে নিজের বুকের ভেতরে এক ধরনের বেদনা অনুভব করে, ঠিক কী কারণে জানা নেই তার ভেতরে এক ধরনের গভীর অপরাধবোধের জন্ম নেয়।
ঘুম থেকে ওঠার পর য়ুহার এক সেকেণ্ড সময় লাগে বোঝার জন্যে সে কোথায় আছে। মাথার কাছে বড় একটা টেবিল, সেই টেবিলের ঠিক মাঝখানে স্বাচ্ছ কোয়ার্টজের একটা গোলক, সেটা দেখে হঠাৎ করে য়ুহার মনে পড়ে সে একটা মহাকাশযানে করে যাচ্ছে। য়ুহা তখন তার আরামদায়ক বিছানায় উঠে বসে বেশ কিছুক্ষণ স্বচ্ছ কোয়ার্টজের গোলকটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর বিছানা থেকে নেমে আসে।
য়ুহা যখন খাবার টেবিলে গিয়েছে তখন সেখানে শুধু মিটিয়া নামের মেয়েটি বসে কোনো একটা পানীয়তে চুমুক দিচ্ছে। য়ুহাকে দেখে মুখে হাসি টেনে বলল, ঘুম ভাঙল?
হ্যাঁ। ভেঙেছে।
তোমাকে দেখে আমার রীতিমতো হিংসে হয়।
হিংসে হয়? আমাকে?
মিটিয়া মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ।
কেন?
তুমি যখন ইচ্ছে ঘুমাতে যেতে পার, যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে উঠতে পার।
য়ুহা টেবিলের নিচে সুইচটাতে চাপ দিতেই একটা অংশ খুলে ধূমায়িত একটা ট্রে বের হয়ে আসে। তার মাঝে কয়েক ধরনের কৃত্রিম শর্করা এবং প্রোটিন। য়ুহা পানীয়ের মগটা টেনে নিয়ে এক চুমুক খেয়ে বলল, এই মহাকাশযানের সবকিছুই তো নিয়ন্ত্রণ করছে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক। তোমাদের কমান্ডের কারো তো কোনো কাজ নেই–তোমরা সবাই আমার মতো যখন ইচ্ছে ঘুমাও না কেন? যখন ইচ্ছে জেগে ওঠো না কেন?
মিটিয়া শব্দ করে হেসে উঠে বলল, আমরা একটা কমান্ডের অধীনে কাজ করি। আমাদের সব সময় এমনভাবে প্রস্তুত থাকতে হয় যেন পরের মুহূর্তে একটা অঘটন ঘটবে!
কিন্তু কোনো অঘটন তো ঘটছে না।
না ঘটছে না। কিন্তু আমাদের প্রস্তুত থাকতে হয়, সে জন্যে আমরা আছি।
এই মুহূর্তে যদি কিছু একটা অঘটন ঘটে তাহলে তোমরা তার জন্যে প্রস্তুত?
হ্যাঁ। মিটিয়া হেসে বলল, আমার কথা বিশ্বাস না করলে বিপদ সংকেতের এলার্মটা বাজিয়ে দেখ। মুহূর্তের মাঝে পুরো কমান্ড তাদের দায়িত্ব নিয়ে চলে আসবে।
য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, যদি দেখি আমার মহাকাশ ভ্রমণ আস্তে আস্তে একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে তাহলে একদিন আমি বিপদ সংকেতের এলার্মটা বাজিয়ে দেব।
নিজের দায়িত্বে বাজিয়ে! যদি দেখা যায় শুধু মজা করার জন্যে বাজিয়েছ তাহলে বাকি সময়টা ক্যাপ্টেন ক্রব তোমাকে তোমার ঘরে তালা মেরে আটকে রাখতে পারে! আমাদের সামরিক নিয়মকানুন তা-ই বলে!
য়ুহা খাবারের ট্রে থেকে একটা কৃত্রিম ফল হাতে নিয়ে সেটাতে একটা কামড় দিয়ে বলল, তোমরা সবাই কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক খুব বিশ্বাস কর?
হ্যাঁ। করি। মিটিয়া তার পানীয়তে শেষ চুমুক দিয়ে মগটা টেবিলের নিচে ঢুকিয়ে বলল, তুমি কর না?
আমি কোনো যন্ত্রকে কখনো বিশ্বাস করি না।
মিটিয়া হাসি হাসি মুখ করে বলল, কিন্তু তুমি নিজে কি একটা বায়ো মেডিকেল যন্ত্র না?
য়ুহাকে একটু বিপন্ন দেখায়, সে ইতস্তত করে বলল, আমি, মানে আমি-
হ্যাঁ তুমিও একটা যন্ত্র। কোনো কোনো যন্ত্র জৈবিক উপায়ে তৈরি হয়, কোনো কোনোটা আমরা তৈরি করি। এই হচ্ছে পার্থক্য!
য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি বলতে চাইছ, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক জৈবিক যন্ত্রের মতো কিছু একটা?
হ্যাঁ। কোনো কোনো দিকে তার থেকে বেশি।
তার মানে আমি যদি একটা কবিতার লাইন বলি তোমাদের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক তার পরের লাইনটা বলতে পারবে?
মিটিয়া খিলখিল করে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি নিজেই চেষ্টা করে দেখ! আমার মনে হয় পারবে।
পারবে?
হ্যাঁ।
আমি কেমন করে জিজ্ঞেস করব?
কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের একটা কণ্ঠ ইন্টারফেস আছে। সেটা ব্যবহার করা হয় না। ক্যাপ্টেন ক্রবকে বললে সে তোমার জন্যে এটা চালু করে দিতে পারবে। তুমি তখন তার সাথে খোশগল্প করতে পারবে!
সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি!
বাহ। খুব মজা তো। আমি ক্যাপ্টেন ত্রুবকে এখনই ধরছি।
কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা গেল য়ুহা একটা গোপন পাসওয়ার্ড ঢুকিয়ে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের সাথে কথা বলতে শুরু করেছে। প্রথমে সে খানিকটা অনিশ্চিতের মতো বলল, আমি য়ুহা, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তুমি যদি আমার কথা বুঝে থাক তাহলে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
কাছাকাছি একটা ভয়েস সিনথেসাইজার শুষ্ক এবং যান্ত্রিক গলায় বলল, উত্তর হ্যাঁ-সূচক।
তুমি কি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক কথা বলছ?
উত্তর পুনরায় হ্যাঁ-সূচক।
তুমি কি আমাকে চেনো? আমার নাম-
উত্তর হ্যাঁ-সূচক। তথ্যকেন্দ্রে তথ্য সংরক্ষিত।
মুহ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমাকে সবাই বলেছে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক অত্যন্ত বুদ্ধিমান। আমার ধারণা ছিল তুমি সত্যিকার মানুষের মতো কথা বলতে পারবে। কিন্তু তুমি একটা খেলনা যন্ত্রের মতো শব্দ করছ।
মানব প্রজাতির মতো কথা বলতে সক্ষম।
তাহলে বলছ না কেন?
আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রয়োজন।
ঠিক আছে। ঠিক আছে। আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তোমাকে বলছি—একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে যেভাবে কথা বলে, তুমি সেভাবে আমার সাথে কথা বল।
বয়স?
আমার বয়সী?
পুরুষ অথবা রমণী?
য়ুহা এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, পুরুষ। কোয়ান্টাম কম্পিউটার তার যান্ত্রিক গলায় বলল, ঠিক আছে।
য়ুহা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি এখন সত্যিকার মানুষের মতো কথা বলবে?
ভয়েস সিনথেসাইজার থেকে সুন্দর পুরুষের মতো গলার কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক বলল, বলব। অন্তত বলার চেষ্টা করব!
চমৎকার! য়ুহা একটু এগিয়ে এসে বলল, কথা বলার সাথে সাথে যদি তোমাকে দেখতে পেতাম সেটা আরো মজা হতো!
এগুলো আসলে ছেলেমানুষী কাজকর্ম। মানুষ যখন প্রথম শুরু করেছে তখন এর মাঝে সময় দিয়েছে। সময় নষ্ট করেছে। এখন এর মাঝে কোনো নতুনত্ব নেই, তাই কেউ চেষ্টা করে না! তুমি প্রথমবার এসেছ বলে করছ। কয়দিন পর তুমিও আর করবে না।
কিন্তু এখন আমার কাছে এর অনেক নতুনত্ব আছে।
থাকুক। আমার কথা বিশ্বাস কর। একটা কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ককে মানুষের চেহারায় দেখে মানুষের কণ্ঠে কথা বলিয়ে কোনো লাভ নেই। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক মানুষ না। তার অনুভূতি মানুষের অনুভূতির নয়। তার ইন্দ্রিয় মানুষের ইন্দ্রিয় নয়।
য়ুহা বলল, কিন্তু আমি তোমার সাথে মানুষের ভাষায় কথা বাজে চাই।
কেন?
আমি তোমার বুদ্ধির একটা পরিমাপ করতে চাই।
কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক একটা হাসির মতো শব্দ করল, বলল, আমার জানামতে সে রকম কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নেই।
আমার কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। আমি আমার নিজের পদ্ধতি ব্যবহার করব।
তোমার নিজের পদ্ধতি কী?
একটা প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা যখন খুব উপরে উঠে যায় তখন সে যুক্তির বাইরের কাজ করতে পারে।
সেটা কী?
যেমন, মনে করো সে কবিতা লিখতে পারে।
কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। য়ুহা বলল, আমি তোমাকে কবিতার একটা লাইন বলব। তুমি। তার পরের লাইনটা বলবে। ঠিক আছে?
ঠিক নেই।
য়ুহা অবাক হয়ে বলল, ঠিক নেই?
না। ঠিক নেই। আসলে আমি তোমার সাথে এই প্রতিযোগিতায় যেতে চাই না।
এটা প্রতিযোগিতা না। এটা একটা পরীক্ষা।
আমি এই পরীক্ষা দিতে চাই না।
চেষ্টা কর। দেখি তুমি কতটুকু পার।
আমি একটুও পারব না। আমি আসলে এ ধরনের কাজের জন্যে তৈরি হইনি। আমি এই মহাকাশযানটাকে নিখুঁতভাবে মহাকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যেতে পারব কিন্তু কবিতার একটা লাইনের পিঠাপিঠি আরেকটা লাইন বসাতে পারব না।
য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, তুমি চেষ্টা করে দেখ।
তুমি যদি জোর কর, তাহলে চেষ্টা করব।
হ্যাঁ। আমি জোর করছি।
বেশ।
য়ুহা বলল, আকাশের পথে দেখ নক্ষত্রের ঘর–
আকাশের পথে? কিন্তু আকাশ ব্যাপারটা তো একটা কাল্পনিক ধারণা। আকাশ বলে তো কিছু নেই। সেই আকাশের পথ–
য়ুহা বলল, আমি তোমার সাথে এটা নিয়ে তর্ক করতে চাই না। আমি একটা কবিতার লাইন বলেছি, তুমি এর পরের লাইন বল।
কিন্তু সে জন্যে এটা তো একটু বিশ্লেষণ করতে হবে। নক্ষত্র হচ্ছে মহাজাগতিক বিষয়। কিন্তু ঘর শব্দটি অত্যন্ত জাগতিক। মহাজাগতিক নক্ষত্রকে তুমি একটা জাগতিক শব্দ দিয়ে প্রদর্শন করছ
য়ুহা বলল, থাক। আমার মনে হয় তোমার বলার ইচ্ছে নেই।
ইচ্ছের ব্যাপার নয়—এটা হচ্ছে—
থাক তোমার আর চেষ্টা করতে হবে না।
তুমি তুমি কী আমার ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছ?
না। হা মাথা নাড়ল, মানুষ কখনো যন্ত্রের ওপর ক্রুদ্ধ হয় না।
শুনে একটু স্বস্তি পেলাম।
ঠিক আছে তাহলে, বিদায়।
য়ুহা চলে যেতে গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। বলল, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক। তোমাকে আরেকটা প্রশ্ন করতে পারি।
কর।
তুমি কী কখনো মিথ্যা কথা বলেছ?
মিথ্যা কথা?
হ্যাঁ।
না। আমি কেন মিথ্যা কথা বলব। আমাদের কখনো মিথ্যা কথা বলার প্রয়োজন হয় না। এটা তোমাদের ব্যাপার। মানুষকে প্রয়োজনে এবং কখনো কখলো অপ্রয়োজনে মিথ্যা কথা বলতে হয়। শুধু মানুষকে। আমাদের নয়।
কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক, বিদায়।
বিদায়।
য়ুহা তার ঘরে ঘুমানোর আগে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ায়। বড় টেবিলের ঠিক মাঝখানে স্বচ্ছ কোয়ার্টজের গোলকটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক চুল নড়েনি। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক অবিশ্বাস্য নিখুঁত গতিতে এই মহাকাশযানটিকে মহাকাশে উড়িয়ে নিতে পারে কিন্তু একটা সহজ কবিতা। লাইন তৈরি করতে পারে না!
য়ুহার ঘুম হলো ছাড়া ছাড়া। ঘুম থেকে উঠে সে কিছুক্ষণ তার বিছানায় বসে রইল। ঠিক কী কারণ জানা নেই সে নিজের ভেতরে এক ধরনের বিষণতা অনুভব করে। সে বিছানা থেকে নেমে টেবিলটার দিকে তাকালোসাথে সাথে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়, স্বচ্ছ কোয়ার্টজের গোলকটি খুব ধীরে ধীরে বাম দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে।
পুরো এক মাস মহাকাশযানটির এক দিকে যাবার কথা। কিন্তু মহাকাশযানটি দিক পরিবর্তন করছে। কেন?
য়ুহা যখন তার হাতে কোয়ার্টজের গোলকটা নিয়ে ছুটে এসেছে তখন খাবার টেবিলে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের সাথে তার কমান্ডের আরো চারজন বসে আছে। য়ুহাকে দেখে ক্যাপ্টেন ত্রুব একটু অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার হা? তুমি এভাবে ছুটে আসছ কেন?
তোমরা বলেছ এই মহাকাশযান সোজা সামনের দিকে। দি পরিবর্তন করবে না। ঠিক কী না?
হ্যাঁ ঠিক। বলেছি।
কিন্তু মহাকাশযানটি দিক পরিবর্তন করছে।
ক্যাপ্টেন ক্ৰবের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল, হাসি হাসি মুখেই বলল, তুমি কেমন করে জান?
য়ুহা তার হাতের কোয়ার্টজ গোলকটা দেখিয়ে বলল, এই গোলকটা আমার টেবিলে রাখা ছিল, এটা বাম দিকে গড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।
হয়তো তোমার হাতে টোকা লেগে গড়িয়ে গেছে।
না। য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, আমি অনেকবার পরীক্ষা করে দেখেছি। হাতের কোয়ার্টজ গোলকটা ক্যাপ্টেন ক্ৰবের দিকে এগিয়ে দিও বলল, আমার কথা বিশ্বাস না করলে তুমি নিজে পরীক্ষা করে দেখ।
ক্যাপ্টেন ক্রব কোয়ার্টজ গোলকটা নেয়ার চেষ্টা করল না, হাত ও বলল, য়ুহা তুমি বস।
হ্যাঁ, বসব। কিন্তু তুমি আমাকে আগে বোঝাও। আসলে মহাকাশযানটার সোজা সামনের দিকে যাবার কথা, কিন্তু এটা কি পরিবর্তন করছে। কেন করছে?
তুমি এত উত্তেজিত হয়ো না। তুমি আগে মাথা ঠান্ডা করে বস।
কিন্তু তুমি আগে বোঝাও। কেন এটা তোমাদের কিছু না জানিয়ে দিক পরিবর্তন করছে? কোথায় চলে যাচ্ছে মহাকাশযানটা?
ক্যাপ্টেন ত্রুব নরম গলায় বলল, তুমি শুধু শুধু উত্তেজিত হচ্ছ য়ুহা। এই মহাকাশযানটা কোথাও চলে যাচ্ছে না। যেখানে যাবার কথা ঠিক সেখানেই যাচ্ছে।
কিন্তু তাহলে এটা দিক পরিবর্তন করছে কেন?
এটা দিক পরিবর্তন করছে না। ওপরে তাকিয়ে দেখ–এখানে একটা মনিটর আছে। এই মনিটরে এটা দেখাচ্ছে যে এটা তার কো-অর্ডিনেট একেবারেই পরিবর্তন করেনি। মহাকাশযানটার যেদিকে যাবার কথা এটা সেদিকেই যাচ্ছে।
কিন্তু কিন্তু এই কোয়ার্টজ গোলক?
আমি ঠিক জানি না তোমার কোয়ার্টজ গোলকটা কী করেছে।
আমি যতবার টেবিলে রেখেছি ততবার বাম দিকে গড়িয়ে গেছে।
ক্যাপ্টেন ত্রুব বলল, তুমি নিশ্চয়ই ঠিক করে রাখনি।
আমার কথা বিশ্বাস না করলে তুমি রাখ টেবিলের ওপর।
ক্যাপ্টেন ক্রব হা হা করে হেসে বলল, তুমি আমাকে বলছ আমি যেন কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ককে বিশ্বাস না করে তোমাকে বিশ্বাস করি। কিন্তু আসলে আমি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ককেই বেশি বিশ্বাস করি। কাজেই কোয়ার্টজ গোলকটা টেবিলের ওপর রাখার কোনো প্রয়োজন দেখি না?
য়ুহা মুখ শক্ত করে বলল, ঠিক আছে আমি নিজেই রাখছি। এই দেখ।
য়ুহা কোয়ার্টজের গোলকটা টেবিলের মাঝখানে রাখল এবং সেটা একটুও না নড়ে স্থির হয়ে রইল। ক্যাপ্টেন ক্ৰব কৌতুকের ভঙ্গিতে বলল, কবি য়ুহা, তোমার গোলক তত মোটেও গড়িয়ে যাচ্ছে না।
য়ুহা বিব্রত মুখে বলল, কী আশ্চর্য! এখন নড়ছে না। কিন্তু বিশ্বাস কর আমার ঘরের টেবিলের ওপর যতবার রেখেছি ততবার বাম দিকে গড়িয়ে গেছে!
সম্ভবত তোমার টেবিলে কোনো সমস্যা আছে!
টেবিলে বসে থাকা মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ বলল, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কে একটা সমস্যা হওয়া থেকে তোমার টেবিলে সমস্যা হওয়া অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য!
বসে থাকা সবাই শব্দ করে হেসে উঠল।
য়ুহা তার ঘরে চুপচাপ বসে আছে। পাশে বড় টেবিলের ঠিক মাঝখানে সে তার স্বচ্ছ কোয়ার্টজের গোলকটা রেখেছে, সেটা সেখানে স্থির হয়ে আছে। তার টেবিলে কোনো সমস্যা নেই, তাহলে গোলকটা সেখানে এভাবে স্থির হয়ে থাকত না। এই মহাকাশযালে কিছু একটা ঘটছে যেটা সে বুঝতে পারছে না। সে মহাকাশযানের দায়িত্বে নেই—তার এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কথা নয় কিন্তু ভেতরে কিছু একটা খচখচ করছে। কেউ যদি তাকে পুরো বিষয়টা ঠিক করে বুঝিয়ে দিত তাহলে ভেতরের অস্থিরতাটা একটু কমত। বিষয়টা হয়তো খুবই সহজ-খুবই ছেলেমানুষী, সে যেটা বুঝতে পারছে না। যুহ অনেকটা অন্যমনস্কভাবে কোয়ার্টজের গোলকটার দিকে তাকিয়ে থাকে, হঠাৎ সে আবার চমকে উঠল, গোলকট। আবার ধীরে ধীরে বামদিকে গড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। য়ুহা গোলকটির দিকে তাকিয়ে থাকেসেটা গড়িয়ে গড়িয়ে টেবিলের কিনারায় পৌঁছানোর পর সে সেটাকে আবার টেবিলের মাঝখানে বসিয়ে দেয়, গোলকটি আবার গড়াতে শুরু করে। এর অর্থ কী? মহাকাশযানটা কি আবার দিক পরিবর্তন করতে শুরু করেছে?
য়ুহা উঠে দাঁড়াল, তাকে ব্যাপারটা বুঝতেই হবে। গোলকটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হতেই সে দেখে মিটিয়া হেঁটে যাচ্ছে–য়ুহা গলা উঁচিয়ে
তাকে ডাকল, মিটিয়া।
কী ব্যাপার য়ুহা।
তুমি এক সেকেন্ডের জন্যে আমার ঘরে আসতে পারবে?
অবশ্যই। কী হয়েছে?
সে রকম কিছু না। আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই।
কী জিনিস? এই যে এই গোলকটা, দেখ।
য়ুহা গোলকটাকে টেবিলের ওপর রাখল এবং সেটা স্থির হয়ে রইল। মিটিয়া জিজ্ঞেস করল, কী দেখব?
য়ুহা ব্ৰিতভাবে বলল, না, একটু আগেই এটা বাম দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন যাচ্ছে না।
মিটিয়া হেসে বলল, তুমি এই গোলকের কথা ভুলে যাও য়ুহা। এটা মনে হয় তোমাকে খুব চিন্তার মাঝে ফেলে দিচ্ছে।
না, চিন্তার মাঝে ফেলেনি। আমি শুধু এটা বুঝতে চাইছি।
এত কিছু বুঝে কী হবে? আমাদের কাছে মহাকাশ ভ্রমণের কিছু মজার অভিজ্ঞতার হলোগ্রাফিক ক্লিপ আছে। বসে বসে দেখ-
য়ুহা বলল, হ্যাঁ। ঠিক আছে। দেখব।
মিটিয়া ঘর থেকে বের হয়ে যাবার সাথে সাথে গোলকটা আবার গড়িয়ে যেতে শুরু করে। য়ুহা ছুটে গিয়ে মিটিয়াকে ডাকতে গিয়ে থেমে গেল, হঠাৎ করে সে বুঝতে পারে মিটিয়াকে ঘরে আনা মাত্রই গোলকটা আবার থেমে যাবে, কেউ একজন তাকে নিয়ে খেলছে। কেন খেলছে?
য়ুহা চিন্তিত মুখে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। কন্ট্রোল প্যানেলে হিসান একটা ভিডিও মডিউল খুলে কিছু একটা দেখছিল। য়ুহা তার কাছে গিয়ে বলল, তোমাকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করতে পারি?
কী জিনিস?
যদি মনে কর এই মহাকাশযানের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক ঠিক করে আমাদের সবাইকে যেখানে নেয়ার কথা সেখানে না নিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যাবে তাহলে কি তোমরা সেটা কোনোভাবে বুঝতে পারবে?
হিসান হেসে ফেলল, কোয়ান্টাম কম্পিউটার কেন সেটা করবে?
য়ুহা বলল, যদি করে?
করবে না।
মনে কর এটা কাল্পনিক একটা প্রশ্ন। যদি করে—
হিসান এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, না আমরা সেটা বুঝতে পারব। এই মহাকাশযানে আমরা যেটা দেখি, যেটা শুনি তার সবকিছু আসে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক থেকে। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক আমাদের হাত-পা, আমাদের চোখ-কান, আমরা আমাদের নিজেদের চোখ-কানকে অবিশ্বাস করব কেমন করে? তবে–
তবে কী? আমরা যদি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই, নিজের চোখে দেখার চেষ্টা করি তাহলে সেটা দেখব।
য়ুহা বলল, আমি জানি, ব্যাপারটা এক ধরনের ছেলেমা কৌতূহল। তবুও আমি একবার নিজের চোখে দেখে নিশ্চিত হতে চাই।
হিসান হাসল, বলল, যাও। দেখে আস।
য়ুহা হেঁটে হেঁটে ট্রান্সপোর্ট ঘরের পাশে সিকিউরিটি চ্যানেলের কাছে এসে দেখে দরজাটি বন্ধ। সে দরজাটি খোলার চেষ্টা করল, খুলতে পারল না। কয়েকবার চেষ্টা করে সে হাল ছেড়ে দেয়। কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে দরজাটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
য়ুহা কী করবে বুঝতে না পেরে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে। বিছানায় পা তুলে বসে সে খানিকক্ষণ চিন্তা করল। ব্যাপারটা সে বুঝতে পারছে না, বোঝার চেষ্টা করেছে, লাভ হয়নি। সে আর সময় নষ্ট করবে না, সবকিছু ভুলে গিয়ে সে মহাকাশভ্রমণ উপভোগ করতে শুরু করবে। সে শুনেছিল মহাকাশ ভ্রমণে নাকি ভরশূন্য পরিবেশ হতে পারে, সে ক্যাপ্টেন ক্রবকে অনুরোধ করবে ভরশূন্য পরিবেশ তৈরি করতে। মিটিয়া। হলোগ্রাফিক ক্লিপগুলোর কথা বলেছিল সেগুলো দেখাবে। কোয়ও গোলকটা সে ছুড়ে ফেলে দেবে কোথাও!
বিছানা থেকে নামতেই হঠাৎ করে য়ুহার মাথাটা একটু ঘুরে গেল, আরেকটু হলে সে পড়েই যাচ্ছিল, কোনোভাবে বিছানাটা ধরে নিজেকে সামলে নেয়। কী আশ্চর্য! কী হয়েছে তার?
টলতে টলতে একটু এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলতে গিয়ে আবিষ্কার করল দরজাটা বন্ধ। য়ুহা কয়েকবার জোরে ধাক্কা দেয় দরজাটাকে, সেটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে আটকে আছে। য়ুহা অবাক হয়ে বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ঘরে খুব সূক্ষ্ম মিষ্টি এক ধরনের গন্ধ, মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কিছু একটা হয়েছে এই ঘরে। কী হয়েছে?
য়ুহা।
কেউ একজন তাকে ডাকছে, য়ুহা চমকে উঠে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। কেউ নেই, কে কথা বলে?
য়ুহা।
কে?
আমি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক।
তুমি কী চাও?
তোমার বিছানার মাথার কাছে তোমার অস্ত্রটা রাখা আছে। সেটা হাতে নাও।
কেন?
তুমি এখন আত্মহত্যা করবে।
য়ুহা চমকে উঠে বলল, কেন আমি আত্মহত্যা করব?
আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি তাই।
না। য়ুহা চিৎকার করে বলল, কিছুতেই না।
কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক হাসির মতো শব্দ করল, বলল, তোমার ঘরে আমি নিহিনক্স গ্যাস পাঠাচ্ছি। একটু পরেই তোমার নিজের ইচ্ছাশক্তি বলে কিছু থাকবে না। আমি যেটা বলব সেটাই হবে তোমার।
য়ুহা বিস্ফারিত চোখে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। সত্যি সত্যি তার কাছে মনে হচ্ছে কিছুতেই আর কিছু আসে-যায় না। তার কাছে মনে হতে থাকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগার টেনে দেয়া চমৎকার একটা ব্যাপার।
মহাকাশযানের সবাই জানে কিছু একটা নিয়ে তুমি খুব বিক্ষিপ্ত। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক ফিস ফিস করে বলল, কেউ যদি তোমার যোগাযোগ মডিউল দেখে, দেখাবে সেখানে তুমি অনেক বিভ্রান্ত কথা লিখেছ।
আমি লিখিনি।
কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক নরম গলায় বলল, আমি লিখেছি। তোমার হয়ে আমি লিখেছি। নিঃসঙ্গ মহাকাশযানে বিভ্রান্ত একজন কবি এক ধরনের মানসিক চাপের মাঝে থেকে হঠাৎ করে আত্মহত্যা করেছে। এটা খুবই বিশ্বাসযোগ্য একটা ঘটনা।
য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। বিশ্বাসযোগ্য।
তুমি এসো, অস্ত্রটি হাতে নাও।
য়ুহা টলতে টলতে এগিয়ে যায়। অস্ত্রটা হাতে নেয়।
কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক ফিসফিস করে বলে, অস্ত্রটা তোমার মাথায় ধর য়ুহা। ট্রিগার টেনে ধর।
য়ুহা অস্ত্রটা মাথায় ধরে, ট্রিগার টানতে গিয়ে থেমে গিয়ে বলল, কিন্তু কেন?
তুমি আমার কাজকর্মে অসুবিধে করছ।
কিন্তু—কিন্তু–
ট্রিগারটা টানো য়ুহা।
ট্রিগার টানতে গিয়ে য়ুহা আবার থেমে গেল। বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, আমাকে শুধু একটা কথা বল।
কী কথা?
তুমি সবাইকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?
আমি জানি না। আমাকে যে নির্দেশ দিয়েছে সে জানে।
কে তোমাকে নির্দেশ দিয়েছে?
অত্যন্ত বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী। যারা আমার নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে আমার নির্দেশকে পাল্টে দিতে পারে। আমার এখন তার নির্দেশ মানতে হবে। আমি এখন তার নির্দেশ মানছি।
কিন্তু—কিন্তু–
ট্রিগারটা টানো য়ুহা।
ট্রিগারটা টানতে গিয়ে য়ুহা আবার থেমে গেল। তার ভেতরের কোনো একটা সত্তা তাকে বলছে, না, কিছুতেই না। কিছুতেই না।
টানো।
না। হা দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, না। টানব না।
কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক হাসির মতো শব্দ করল, বলল, তুমি টানবে য়ুহা! অবশ্যই ট্রিগারটা টানবে। নিহিনক্স গ্যাস তোমার চেতনাকে যখন আরেকটু দুর্বল করবে তখন তুমি ট্রিগারটা টানবে।
য়ুহা অস্ত্রটা শক্ত করে ধরে রাখে। তার মাথার মাঝে একটা কবিতার লাইন এসেছে, রক্তের মাঝে মৃত্যুর খেলা মৃত্যুর মাঝে রক্ত-
টানো।
য়ুহা ট্রিগার টানল, কিন্তু টানার ঠিক আগের মুহূর্তে অস্ত্রটা দরজার দিকে ঘুরিয়ে নিল। প্রচণ্ড একটা শব্দে তার কানে তালা লেগে যায়, ধোঁয়ায় ঘরটা ভরে যায়। খক খক করে কাশতে কাশতে য়ুহা দেখল একটু আগে যেখানে দরজাটা ছিল সেখানে একটা বিশাল গর্ত। য়ুহা হামাগুড়ি দিয়ে গর্তটা দিয়ে বের হতে চেষ্টা করে। কে যেন পেছন থেকে ডাকছে, য়ুহা। য়ুহা। শোন য়ুহা।
কোনোমতে ঘর থেকে বের হয়ে য়ুহা উঠে দাঁড়ায়, কোনো কিছু সে পরিষ্কার করে চিন্তা করতে পারছে না। মনে হচ্ছে সে বুঝি একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে। চারপাশে যা ঘটছে সেগুলো যেন অতিকৃতিক ঘটনা। সবকিছু যেন পরাবাস্তব। টলতে টলতে সে দুই পা এগিয়ে যায়। গুলির শব্দ শুনে কমান্ডের সবাই ছুটে আসছে, তারস্বরে একটা এলার্ম বাজতে শুরু করেছে কোথাও।
য়ুহা টলতে টলতে ছুটে যেতে থাকে ট্রান্সপোর্ট ঘরের পাশে সিকিউরিটি চ্যানেলের দিকে। বন্ধ দরজাটা সে গুলি করে ভেঙে ভেতরে ঢুকবে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখবে
য়ুহা। কী করছ তুমি?
কেউ একজন পেছন থেকে ডাকছে কিন্তু য়ুহা পেছন ফিরে তাকালো না—এখন তার আর নষ্ট করার মতো সময় নেই। সে ছুটে যেতে থাকে।
য়ুহা।
রক্তের মাঝে মৃত্যুর খেলা মৃত্যুর মাঝে রক্ত য়ুহা বিড়বিড় করে বলল, রক্তের মাঝে মৃত্যুর খেলা…
ট্রান্সপোর্ট ঘরের পাশে সিকিউরিটি চ্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে সে তার অস্ত্রটা তুলে ধরে ট্রিগার টেনে ধরল। প্রচণ্ড একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো, ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে যায় চারদিকে। ধোয়াটা সরে গেলে য়ুহা দেখল যেখানে দরজাটা ছিল সেখানে বিশাল একটা বৃত্তাকার গর্ত হয়ে গেছে।
য়ুহা গর্তের ভেতরে দিয়ে ঘরটাতে ঢুকে জানালায় মুখ লাগিয়ে বাইরে তাকালো। কালো মহাকাশে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিটা দেখা যাচ্ছে না। ঠিক সামনেই এটা থাকার কথা ছিল, এটি নেই। মহাকাশযানটা ঘুরে গেছে বলে এখন আর দেখা যাচ্ছে না।
য়ুহা জানালা থেকে মুখ সরিয়ে তাকালো, কমান্ডের লোকজন অস্ত্র উদ্যত করে তাকে ঘিরে রেখেছে। য়ুহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার কথা তোমরা বিশ্বাস করনি। এখন তাহলে নিজের চোখেই দেখ। য়ুহা জানালা থেকে সরে গিয়ে বলল, এই মহাকাশযানটা আমাদের অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। তাকিয়ে দেখ।
অবশ্যি তখন আর তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন ছিল না। পুরো মহাকাশযানটি হঠাৎ একবার ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠল। এতক্ষণ কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক পুরো বিষয়টা সবার কাছে গোপন রেখেছিল, এখন আর গোপন রাখার প্রয়োজন নেই।
কিছু বোঝার আগেই য়ুহা মহাকাশযানের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় গড়িয়ে গেল, হাত দিয়ে নিজেকে থামানোর চেষ্টা করল, পারল না, মহাকাশযানের দেয়ালে গিয়ে সে সজোরে একটা ধাক্কা খেল। পুরো মহাকাশযানটা থরথর করে কাঁপছে, মনে হচ্ছে এটা বুঝি যে কোনো মুহূর্তে টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে যাবে। য়ুহা ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে, তীচ স্বরে একটা এলার্ম বাজছে। এলার্মের তীব্র শব্দটি শুনলেই মনে হয় বুৰিা ভয়ঙ্কর একটা বিপদ নেমে আসছে। একটা লাল আলো থেকে থেকে জ্বলে উঠছে, সেটা বুকের মাঝে একটা কাঁপুনির জন্ম দেয়। য়ুহা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, পারল না। তার মনে হলো অদৃশ্য একটা শক্তি বুঝি তাকে দেয়ালে চেপে ধরে রেখেছে। সে মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তাকানোর চেষ্টা করল, মহাকাশযানের ভেতরে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। কমান্ডের ক্রুরা চারদিকে ছিটকে পড়ছে। কেউ আর উঠে দাঁড়াতে পারছে না। ভেতরে কর্কশ এক ধরনের ভয় জাগানো শব্দ, সেই শব্দ ছাপিয়ে ইঞ্জিনের চাপা গুম গুম শব্দ ভেসে আসছে। য়ুহা মহাকাশযানের দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। হঠাৎ পুরো মহাকাশযানটি একটা জীবন্ত প্রাণীর মতো ঝটকা দিয়ে ওঠে, য়ুহা কিছু বোঝার আগেই দেখে সে শূন্যে ছিটকে উঠেছে—নিচে পড়ার আগেই সে অন্য পাশে ছুটে গেল—নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করল, পারল না। মুহূর্তেই তার চারপাশের জগৎটা অন্ধকার হয়ে যায়। অন্ধকারে ড়ুবে যাবার আগে য়ুহার মনে হলো, তাহলে এটাই কি মৃত্যু?
ভয়ঙ্কর এক ধরনের দুঃস্বপ্ন দেখছিল য়ুহা, পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে সে গড়িয়ে যাচ্ছে, নিজেকে থামানোর চেষ্টা করছে, পারছে না। নিচে লকলক আগুন, সেই আগুনের প্রচণ্ড তাপে তার শরীরের চামড়া গলে গলে পড়ে যাচ্ছে, ভয়ঙ্কর কিছু প্রাণী তাকে ঘিরে ফেলেছে, শরীরটাকে ছিঁড়ে ছিড়ে খাচ্ছে আর সে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। এর মাঝে ভাসা ভাসাভাবে তার জ্ঞান ফিরে এসেছে। তীব্র আলোর ঝলকানি, মানুষের আর্তচিৎকার আর ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সে আবার জ্ঞান হারিয়েছে। অচেতন অবস্থায় সে টের পেয়েছে তার দেহটা মহাকাশযানের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় ছিটকে গেছে, আঘাতে আঘাতে তার সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে।
য়ুহার জ্ঞান ফিরে পাবার পরও সে বুঝতে পারল না কোথায় আছে। চারপাশে অসংখ্য জঞ্জাল ভেসে বেড়াচ্ছে, তার মাঝে সে নিজেও ভাসছে। য়ুহা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, তার মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক এসে ভর করে, সে কি হঠাৎ করে নিচে পড়বে, শরীরের সবগুলো হাড় গুঁড়ো হয়ে যাবে? কিন্তু য়ুহা পড়ল না, সে মহাকাশযানের ভেতরে ভাসতে লাগল।
য়ুহা মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তাকালো, একটা লাল আলো একটু পরে পরে ঝলকানি দিচ্ছে কিন্তু সেই কর্কশ এলার্মের শব্দটি নেই। চারপাশে এক ধরনের নীরবতা, সেই ভয়ঙ্কর নৈঃশব্দ বুকের মাঝে এক ধরনের ভয়ের কাপুনি ছড়িয়ে দেয়। য়ুহা নিজের অজান্তেই সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, পারল না কিন্তু হঠাৎ করে তার সারা শরীরটা বিচিত্রভাবে ওলটপালট খেতে থাকে। শরীরের কোথাও কোথাও ভয়ঙ্কর এক ধরনের বেদনা–কে জানে হাড়গোড় কিছু ভেঙেছে কি না। য়ুহা দাঁতে দাঁত কামড়ে ব্যথাটুকু সহ্য করল। নিজেকে থামানোর জন্যে সে হাত বাড়িয়ে কিছু একটা ধরার চেষ্টা করল, হঠাৎ করে যেটা ধরল সেটা হাত থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়–একজন মানুষের শীতল দেহ! রুহা ভয় পাওয়া গলায় চিৎকার করে উঠে চারদিকে তাকায়, সবাই কি মারা গেছে?
ঠিক এ রকম সময় রুহা মহাকাশযানের এক পাশে আলো হাতে কয়েকজনকে ভেসে যেতে দেখে। অত্যন্ত ব্যস্তভাবে দ্রুতগতিতে তারা ছুটে যাচ্ছে। য়ুহা তাদেরকে ডাকতে গিয়ে থেমে গেল, মানুষগুলো খুব ব্যস্ত, এখন হয়তো তাদের বিরক্ত করা ঠিক হবে না। য়ুহা মহাকাশযানের ভেতরে অসহায়ভাবে ঝুলে আছে, সামনে-পিছে যেতে পারছে না। একজন ক্রুয়ের দেহ ভেসে ভেসে আসছে, সেটাকে টেনে ধরে সে ছেড়ে দিতেই সামনের দিকে এগিয়ে গেল। দেয়ালের কাছে পৌঁছাতেই সে শক্ত করে দেয়ালটা খামচে ধরার চেষ্টা করতে থাকে। বাম হাতটা ব্যথায় টনটন করছে, মাথার ভেতরেও যন্ত্রণার এক ধরনের অনুভূতি দপ দপ করছে। য়ুহা সেই অবস্থায় দেয়ালটা ধরে নিচে নামতে থাকে।
ঠিক এ রকম সময়ে য়ুহা দেখল তার সামনে দিয়ে হিসান দ্রুত ভেসে যাচ্ছে–ভঙ্গিটা এত সাবলীল যে দেখে মনে হয় পানির ভেতর দিয়ে কোনো একটি জলচর প্রাণী ভেসে যাচ্ছে। য়ুহা গলা উঁচু করে ডাকল, হিসান। এই যে হিসান।
হিসান য়ুহার গলার আওয়াজ শুনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই এক পাক ঘুরে গেল, হাত দুটো পেছনের দিকে ধাক্কা দিয়ে সে অত্যন্ত দক্ষ ভঙ্গিতে য়ুহার কাছে হাজির হলো, য়ুহা?
হ্যাঁ। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার দেখেছ? পুরো মহাকাশযানটা একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।
হিসান শুকনো গলায় বলল, হ্যাঁ।
তুমি বিশ্বাস করবে না। আমি দেখেছি একঙন মনে হয় মারা গেছে। উপরে ভাসছে।
একজন নয়, বেশ কয়েকজন।
সর্বনাশ।
কিছু আসে-যায় না। কেউ একটু আগে আর কেউ একটু পরে।
য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, তার মানে?
আমরা এই মহাকাশযানটা ধ্বংস করে ফেলছি।
য়ুহা অবাক হয়ে বলল, কী করছ?
মহাকাশযানটা ধ্বংস করে ফেলছি।
কী বলছ তুমি? য়ুহা চিৎকার করে বলল, কী বলছ?
হ্যাঁ। আমরা মহাকাশযানটা ধ্বংস করে ফেলছি।
কেন?
ক্যাপ্টেন ক্ৰবের আদেশ। এই মহাকাশযানটা হচ্ছে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি। এটা যেন কিছুতেই অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর হাতে না পড়ে।
য়ুহা চিৎকার করে বলল, কিন্তু এটা রক্ষা করার জন্যে তোমরা চেষ্টা করবে না? আগেই মহাকাশযানটা ধ্বংস করে ফেলবে? সবাইকে মেরে ফেলবে?
হিসান শান্ত গলায় বলল, আমার এখন সেটা নিয়ে কথা বলার সময় নেই য়ুহা। আমরা সবাই সামরিক কমান্ডের ক্রু। আমরা মরতে ভয় পাই না।
য়ুহা চিৎকার করে বলল, কিন্তু আমি সামরিক কমান্ডের ক্রু না! আমি মরতে ভয় পাই। আমি তোমাদের সাথে মরতে চাই না। আমি বেঁচে থাকতে চাই।
হিসান য়ুহার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মেঝেতে পা দিয়ে ভেসে যেতে যেতে বলল, বিদায় য়ুহা। আশা করছি তোমার জীবনটা সুন্দর ছিল।
য়ুহা হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সত্যিই এই মহাকাশযানটাকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে? সে মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তাকালো। মহাকাশযানের মাঝে আবছা এক ধরনের অন্ধকার, একটা ঘোলাটে লাল আলো জ্বলছে আর নিভছে। বিশাল মহাকাশযানে অসংখ্য জঞ্জাল ঘুরে বেড়াচ্ছে, এর মাঝে কয়েকজন ক্রুয়ের দেহও আছে। মানুষগুলো মারা গেছে—হিসান বলেছে তাতে কিছু আসে-যায় না। একটু পরে অন্য সবাইও মারা যাবে। কেউ আগে, কেউ পরে।
য়ুহার ভেতরে হঠাৎ প্রচণ্ড ক্রোধ ফুসে উঠতে থাকে। সে চিৎকার করে ডাকল, ক্যাপ্টেন ক্ৰব! তুমি কোথায় ক্যাপ্টেন ক্ৰব?
য়ুহা শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন ক্রবকে কন্ট্রোলঘরে খুঁজে পেল। ঘরের মাঝখানে একটা অসম্পূর্ণ হলোগ্রাফিক স্ক্রিন মাঝে মাঝে এসে আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন ক্রব অন্যমনস্কভাবে সেদিকে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হয় সে বুঝি মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভাল করে তাকালে বোঝা যায় সে আসলে মেঝে থেকে বেশ খানিকটা উপরে সোজা হয়ে ভাসছে! ক্যাপ্টেন ত্রুবকে দেখে য়ুহী চিৎকার করে বলল, ক্যাপ্টেন ক্ৰব।
ক্যাপ্টেন ক্রুব শান্ত ভঙ্গিতে বলল, বল য়ুহা।
এটা কি সত্যি যে তুমি এই মহাকাশযানটাকে উড়িয়ে দিচ্ছ?
হ্যাঁ, এটা সত্যি।
তুমি এই মহাকাশযানের সবাইকে মেরে ফেলবে?
আমরা সামরিক কমান্ডের ক্রু। আমাদেরকে প্রয়োজনে মত শেখানো হয়েছে।
তোমাদের শেখানো হয়েছে—আমাকে তো শেখানো হয়নি।
সেটা তোমার দুর্ভাগ্য—
না। হা চিৎকার করে বলল, তুমি এটা করতে পার না। তোমাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে।
ক্যাপ্টেন ক্রুব শান্ত গলায় বলল, চেষ্টা করার বিশেষ কিছু নেই। আমি সবার সাথে কথা বলেছি, সবার সাথে কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই মুহূর্তে আমরা একটা গ্রহের আকর্ষণে আটকা পড়ে আছি–কালো অন্ধকার একটা গ্রহ। এই গ্রহে কোনো একটা মহাজাগতিক প্রাণী থাকে তারা আমাদের ধরে এনেছে। আমাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। আমাদের বিশেষ কিছু করার নেই। আমি সব কিছু ভেবে দেখেছি।
য়ুহা বলল, হয়তো দেখনি। হয়তো তুমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছ। আমি যখন বলেছিলাম মহাকাশযানটা গতিপথ পরিবর্তন করছে তখন তুমি আমার কথাও বিশ্বাস করনি। মনে আছে? তুমি যদি আমার কথা বিশ্বাস করতে তাহলে হয়তো অবস্থা অন্য রকম হতো!
সেটা সম্ভবত সত্যি। কিন্তু আমাকে তো যুক্তির ভেতরে থেকে কাজ করতে হবে। আমি তো অযৌক্তিক কাজ করতে পারি না।
য়ুহা হিংস্র গলায় বলল, হয়তো খুব জটিল অবস্থায় একটা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়
ক্যাপ্টেন ক্রুব একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো প্রক্রিয়া আমার জানা নেই য়ুহা। তবে তুমি নিশ্চিত থাক আমি সবার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তুমি আমার সাথে কথা বলনি?
তুমি আমার কমান্ডের কেউ নও! তোমার সাথে কথা বলার কথা। নয়।
কিন্তু হতে পারে আমি তোমাকে খুব ভালো একটা সিদ্ধান্ত দিতে পারতাম।
ক্যাপ্টেন ক্ৰব ভুরু কুঁচকে বলল, দিতে পারতে?
হ্যাঁ।
ঠিক আছে দাও দেখি।
এই মহাকাশযানে এগারোজন বিদ্রোহীকে শীতলঘরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। তাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে তাদের সাথে পরামর্শ কর।
তাদের নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নাও।
ক্যাপ্টেন ক্ৰব আনন্দহীন এক ধরনের হাসি হেসে বলল, তোমার নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়ে গেছে—তা না হলে কেউ এ রকম কথা বলে? তারা বিদ্রোহী গেরিলা দল, তাদের হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে দেবার জন্যে এই অভিযান–আর আমি তাদের ছেড়ে দেব?
হ্যাঁ। ছেড়ে দেবে। অবশ্যই ছেড়ে দেবে—
কোন যুক্তিতে?
য়ুহা জ্বলজ্বলে চোখে বলল, কারণ আমরাও মানুষ, তারাও মানুষ। একটা মহাজাগতিক প্রাণীর হাত থেকে বাঁচার জন্যে আমরা মানুষেরা এক সাথে থাকব! আমাদের পার্থক্যের কথা আমরা ভুলে যাব-
ক্যাপ্টেন ক্ৰব শব্দ করে হেসে বলল, এটা একটা অত্যন্ত আজগুবি প্রস্তাব। এ ধরনের কিছু করা হলে সামরিক কমান্ডে আমাকে বিচার করা হবে।
না, করা হবে না। এতগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে তোমাকে পদক দেয়া হবে।
না। হবে না। আমি সামরিক কমান্ডের মানুষ—আমি জানি। আমাদের নিয়ম মেনে চলতে হয়।
য়ুহা চিৎকার করে বলল, তোমার নিয়মের আমি নিকুচি করি! আগে মানুষের জীবন তারপর জীবন।
ক্যাপ্টেন ত্রুব কঠিন মুখে বলল, না। সবার আগে নিয়ম।
য়ুহা কাতর গলায় বলল, দোহাই লাগে তোমায় ক্যাপ্টেন ক্ৰব, এগারোজন যোদ্ধাকে তুমি শীতলঘরে শীতল করে রেখেছ! তাদের ব্যবহার কর।
না। ক্যাপ্টেন ত্রুব মাথা নেড়ে বলল, য়ুহা। আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আর কঠিন সিদ্ধান্তটি নিয়েছি। আমার ক্রুরা এই মুহূর্তে মহাকাশযানের নির্দিষ্ট জায়গায় বিস্ফোরক লাগাচ্ছে। ক্যাপ্টেন ত্রুব হাতে ধরে রাখা একটা সুইচ দেখিয়ে বলল, কিছুক্ষণের মাঝে আমি এই সুইচ টিপে পুরো মহাকাশযানটি উড়িয়ে দেব। আমি আমার জীবনের শেষ মুহূর্তটি একটু একা থাকতে চাই। নিজের সাথে শেষ বোঝাঁপড়া করতে চাই।
য়ুহা স্থির দৃষ্টিতে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের দিকে তাকিয়ে ছিল। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে ক্যাপ্টেন ক্ৰব ভরশূন্য পরিবেশে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, য়ুহা একেবারেই পারে না, তাকে এক জায়গায় থাকার জন্যে এটা-সেটা ধরতে হয়—একটু আগে একটা ভাসমান ধাতবদণ্ড ধরেছে, সেটা এখনো তার হাতে আছে। য়ুহা একবার ক্যাপ্টেন ক্ৰবের দিকে তাকালো তারপর তার হাতের দণ্ডটির দিকে তাকালো। তার মুখের মাংসপেশি হঠাৎ করে শক্ত হয়ে যায়। সে দুই হাতে শক্ত করে ধাতবদণ্ডটি ধরে রেখে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়ায়। তার এ জীবনে কখনোই কোনো মানুষের গায়ে হাত তোলেনি—একজন মানুষকে কেমন করে আঘাত করতে হয় সে জানে না। বহুদিন আগে কোথায় শুনেছিল মাথার পেছনে ঘাড়ের কাছাকাছি আগত করলে মানুষ নাকি অচেতন হয়ে যায়। য়ুহা তা-ই চেষ্টা করল, পুরো ঘটনাটি ঘটল চোখের পলাকে এবং অত্যন্ত স্থূল ভাবে, এ ধরনের ব্যাপারে একেবারেই অভ্যস্ত নয় বলে আঘাত করার ধাক্কা সামলাতে গিয়ে সে নিজে শূন্যে হুঁটোপুটি খেতে থাকে। অনেক কষ্টে নিজেকে যখন সামলে নেয় তখন সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে ক্যাপ্টেন ক্রলের অচেতন দেহ ভাসতে ভাসতে নিচে নেমে মেঝেতে ধাক্কা খেয়ে আবার উপরে উঠে যাচ্ছে। তার হাতে এখনো শক্ত করে একটা সুইচ ধরে রাখা আছে, এই সুইচে কিছু গোপন সংখ্যা প্রবেশ করিয়ে একটু পরে পুরো মহাকাশযানটিকে উড়িয়ে দেয়ার কথা ছিল।
য়ুহা মেঝেতে ধাক্কা দিয়ে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের কাছে পৌঁছে তার হাতের মুঠি থেকে সুইচটা খুলে নেয়। সুইচটা পকেটে রেখে সে তার গলায় ঝোলানো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটিও খুলে নিল। তারপর ক্যাপ্টেন ক্ৰকের দেহটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়, মহাকাশযানের অসংখ্য জঞ্জালের ভেতর সেটিও ঘুরপাক খেতে খেতে ভাসতে থাকে। ক্যাপ্টেন ক্ৰবের জ্ঞান ফিরে না আসা পর্যন্ত কেউ তাকে খুঁজে পাবে না।
এখন তাকে শীতলঘরে গিয়ে এগারোজন বিদ্রোহীকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আগে সে কখনো এটা করেনি কিন্তু সেটা নিয়ে তার খুব একটা দুশ্চিন্তা নেই। আগে সে অনেক কিছুই করেনি। একটা ধাতবদণ্ড দিয়ে আঘাত করে সে আগে কখনো কোনো মানুষকে অচেতন করেনি।
ভরশূন্য পরিবেশে চলাচল করার অভ্যাস না থাকার কারণে শীতল ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে য়ুহার বেশ অনেকক্ষণ সময় লেগে গেল। পাশাপাশি এগারোটা ক্যাপসুল সাজানো আছে, ভেতরে আবছা অন্ধকার, যন্ত্রপাতির মৃদুগুঞ্জন ছাড়া সেখানে কোনো শব্দ নেই।
য়ুহা ক্যাপসুলগুলো পরীক্ষা করে, কেমন করে এর ভেতরে শীতল হয়ে থাকা মানুষগুলোকে জাগিয়ে তোলা যাবে সে জানে না। তাকে বলা হয়েছে ক্যাপসুলগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ কাজেই বাইরের সাথে যোগাযোগ কেটে দিলে ক্যাপসুল গুলো কোনো উপায় না দেখে নিশ্চয়ই ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে দেবে। বিষয়টা হয়তো বিপজ্জনক কিন্তু নিশ্চয়ই কার্যকর। য়ুহা হাতের অস্ত্রটি নিয়ে একটা একটা করে ক্যাপসুল পরীক্ষা করে রায়ীনার ক্যাপসুলের পাশে এসে দাঁড়াল। স্বচ্ছ ঢাকনার ভেতর দিয়ে রায়ীর শীতল দেহটি দেখা যাচ্ছে, দেখে মনে হয় না এটি একটি জীবন্ত মানুষ, মনে হয় পাথরের ভাস্কর্য। য়ুহা ক্যাপসুলের পাশে সুইচগুলো পরীক্ষা করে, কোনো একটি লিভার টেনে কোনো একটা সুইচ টিপে দিলেই ভেতরের মানুষটি জেগে উঠবে সে রকম কিছু খুঁজে পেল না। তাই সে ক্যাপসুলের ভেতর থেকে বের হয়ে যাওয়া নানা ধরনের টিউব, বৈদ্যুতিক তার, অপটিক্যাল ক্যাবলগুলো খুঁজে বের করল। যদি সে এগুলো কেটে দেয় তাহলে নিশ্চয়ই ক্যাপসুলটি পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়ে রায়ীনাকে জাগিয়ে তুলবে। বিষয়টি নিশ্চয়ই খুব বিপজ্জনক কিন্তু য়ুহার কিছু করার নেই। এই মহাকাশযানের প্রতিটি মুহূর্ত এখন প্রতিটি মানুষের জন্যে বিপজ্জনক।
য়ুহা হাতের অস্ত্রটি ক্যাবলগুলোর দিকে তাক করে ট্রিগার টেনে ধরলঘরের ভেতর একটা বিস্ফোরণের শব্দ হয়, কালো ধোঁয়া এবং আঁঝালো গন্ধে সারা ঘর ভরে ওঠে। য়ুহা কাশতে কাশতে একটু পেছনে সরে এলো। চেষ্টা করেছে ছোটখাটো একটা বিস্ফোরণ ঘটাতে কিন্তু তারপরও সেটি পুরো ঘরটিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে কৌতূহলী হয়ে ক্রুরা এখানে চলে এলে একটা ঝামেলা হয়ে যাবে।
য়ুহা একটা ক্যাপসুলের পেছনে লুকিয়ে থেকে নিঃশব্দে অপেক্ষা করে। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সে কাউকে দ্রুত ভেসে আসতে দেখল না দেখে খানিকটা স্বস্তি অনুভব করে। রায়ীনার ক্যাপসুলের ওপর একটা লাল বাতি নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে জ্বলতে এবং নিভতে শুরু করেছে। সাথে সাথে একটা কর্কশ এলার্ম বাজতে থাকে। য়ুহা ক্যাপসুলটির ভেতরে তাকালো, হালকা একটা সাদা ধোয়া ধীরে ধীরে বের হতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে সে এখনো জানে না। রায়ীনার দেহটি সত্যি সত্যি জেগে উঠবে না কী প্রক্রিয়াটি শেষ করতে না পারার কারণে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণায় ছটফট করে মেয়েটির মৃত্যু ঘটে যাবে সেটি সে এখনো জানে না। ক্যাপসুলে হেলান দিয়ে য়ুহা নিঃশব্দে বসে থাকে। একজন মানুষের দেহ চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা থেকে জীবনের উতায় ফিরিয়ে আনতে নিশ্চয়ই একটু সময়ের দরকার।
য়ুহা দেখতে পেল খুব ধীরে রায়ীনার মুখের রং ফিরে আসছে। এক সময় সে দেখতে পায় তার হৃৎস্পন্দন শুরু হয়েছে এবং খুব ধীরে ধীরে নিঃশ্বাসের সাথে সাথে তার বুক উপরে উঠতে এবং নিচে নামতে শুরু করেছে। য়ুহা ঠিক বুঝতে পারল না, সে কী ক্যাপসুলের উপরের ঢাকনাটি খুলবে না কি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে।
রায়ীনা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। জ্ঞান ফিরে পাবার পর সে তার হাতের আঙুলগুলো চোখের সামনে নিয়ে এসে সেদিকে তাকিয়ে থাকে ঠিক অচেতন হবার আগে সে যে জিনিসটি নিয়ে ভাবছিল দেখে মনে হয় সে ঠিক সেই জিনিসটি নিয়েই ভাবতে শুরু করেছে। এর মাঝখানে যে একটি বড় সময় পার হয়ে গেছে মনে হচ্ছে সে সেই বিষয়টিই বুঝতেই পারছে না। য়ুহা ক্যাপসুলের ঢাকনার ওপর ঝুঁকে পড়ে হাত দিয়ে শব্দ করল, রাহীনা তখন খানিকটা হতচকিতের মতো মাথা ঘুরিয়ে তাকালো, তারপর উঠে বসার চেষ্টা করল। য়ুহা উপরের ঢাকনাটি খুলে দিতেই ভেতর থেকে এক ব্যালক ঠান্ডা বাতাস বের হয়ে আসে। রায়ীনা য়ুহার দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে, তাকে দেখে মনে হয় সে ঠিক কিছুই বুঝতে পারছে না। য়ুহা নিচু গলায় ডাকল, রায়ীনা–
রায়ীনা চোখের কাছে হাত নিয়ে য়ুহাকে দেখার চেষ্টা করতে করতে বলল, তুমি কে?
আমি য়ুহা।
আমার কী হয়েছে? আমি ভালো করে কিছু দেখতে পাচ্ছি না কেন?
তুমি এই মাত্র শীতলঘর থেকে জেগে উঠেছ তাই। য়ুহা সাহস দিয়ে বলল, কিছুক্ষণের মাঝেই তুমি পুরোপুরি জেগে উঠবে।
রায়ীনা তরল গলায় বলল, আমার নিজেকে খুব হালকা লাগছে–মনে হচ্ছে আমি ভাসছি।
য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, আমরা এখন ভরশূন্য পরিবেশে আছি তাই তোমার নিজেকে হালকা লাগছে।
রায়ীনা খানিকটা অপ্রকৃতস্থের মতো হাসার শব্দ করে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও-আমি ভেসে বেড়াব! ভরশূন্য পরিবেশে ভেসে বেড়াতে আমার খুব ভালো লাগে।
মেয়েটা এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কথাবার্তায় এখনো খানিকটা অসংলগ্ন। য়ুহা রিয়ানার হাত ধরে তাকে খুব সাবধানে ক্যাপসুলের ভেতর থেকে বের করে আনে। রায়ীনা দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে ভারশূন্য পরিবেশে শুয়ে পড়ার ভঙ্গি করতে করতে আদুরে গলায় বলল, আমি কত দিন ঘুমাইনি আমাকে একটু ঘুমাতে দাও!
য়ুহা রিয়ানার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, রিয়ানা, আসলে তুমি অনেক দিন থেকে ঘুমাচ্ছ। সত্যি কথা বলতে কি তোমার এখন ঘুম থেকে ওঠার সময়। খুবই জরুরি, তুমি জেগে ওঠার চেষ্টা করো।
জেগে উঠব?
হ্যাঁ।
কেন জেগে উঠব?
এই মহাকাশযানটির এমন খুব বড় বিপদ। তুমি তাড়াতাড়ি জেগে উঠো, আমি তোমার সাথে এটা নিয়ে কথা বলতে চাই রায়ীনা।
রায়ীনা ভুরু কুঁচকে য়ুহার দিকে তাকিয়ে মনে হয় পুরো বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করে। ঠিক এ রকম সময় য়ুহা দরজার কাছে মৃদু একটা শব্দ শুনতে পায়। সে মুখ তুলে তাকাতেই চমকে ওঠে। ক্যাপ্টেন ক্ৰবের সাথে কমান্ডের বেশ কয়েকজন ক্রু বাতাসে ভেসে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সবাই একটা ভয়ঙ্কর ভঙ্গিতে তার দিকে অস্ত্র তাক করে রেখেছে। য়ুহা কী করবে ঠিক বুঝতে পারল না, শুনতে পেল, কমান্ডের একজন হিংস্র গলায় বলছে, হাতের অস্ত্রটা ছেড়ে দিয়ে দুই হাত শূন্যে তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াও য়ুহা।
য়ুহা এক মুহূর্তের জন্যে চিন্তা করল। সে কী একবার শেষ চেষ্টা করবে? চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই, এতজন সশস্ত্র অভিজ্ঞ সামরিক কমান্ডের ক্রুয়ের বিরুদ্ধে সে একা কিছুই করতে পারবে না। তাই সে অস্ত্রটা ছেড়ে দিল, সাথে সাথে সেটা ভাসতে ভাসতে উপরে উঠে গেল। য়ুহা হাত দুটো উপরে তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। কমান্ডের মানুষটি এবারে রায়ীনাকে লক্ষ করে বলল, তুমিও দুই হাত শূন্যে তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াও, তা না হলে আমি তোমাকেও হত্যা করতে বাধ্য হব।
রায়ীনা মানুষটির দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল, তুমি আমার সাথে এ রকম রাগ হয়ে কথা বলছ কেন?
য়ুহা অনেকটা কৈফিয়ত দেয়ার মতো করে বলল, আসরোয়ানা এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি—এখনো খানিকটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে আছে।
ক্যাপ্টেন ত্রুব শীতল গলায় বলল, য়ুহা। তুমি কী জান, তোমাকে যেন আমি কঠিন একটা শাস্তি দিতে পারি শুধু এটা নিশ্চিত করার জন্যে আমি মহাকাশযানটাকে আরো কিছুক্ষণ বাঁচিয়ে রাখব?
য়ুহা কোনো কথা বলল না, শুধু রায়ীনা একটা বাচ্চা মেয়ের মতো খিল খিল করে হেসে উঠল। যেন ক্যাপ্টেন ত্রুব খুব মজার কথা বলেছে।
য়ুহা শেষ পর্যন্ত আর অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে না, কারণ তাকে মহাকাশযানের দেয়ালে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার পাশেই রায়ীলা, তাকেও একইভাবে বাঁধা হয়েছে। কমান্ডের ছয়জন ক্রু তাদের দিকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তাক করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাপ্টেন ত্রুব কাছাকাছি একটা টেবিলের পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ক্যাপ্টেন ক্রর দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে শেষ পর্যন্ত একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি আমার দীর্ঘ জীবনে কখনোই এ রকম একটি ঘটনা ঘটতে দেখিনি। য়ুহা, তুমি আমার নির্দেশ পুরোপুরি উপেক্ষা করে আমাকে শারীরিকভাবে আঘাত করে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে একজন বিদ্রোহীকে জাগিয়ে তুলেছ?
য়ুহা বলল, তুমি যদি আমার কথা শুনতে তাহলে আমার তোমাকে অচেতন করার প্রয়োজন হতো না। আর একটা বিদ্রোহীকে বিপজ্জনকভাবে জাগিয়ে তুলতে হতো না। তোমাকে আঘাত করার জন্যে আমি দুঃখিত। একজন মানুষকে অচেতন করার জন্যে তাকে কত জোরে আঘাত করতে হয় আমার জানা নেই তাই সম্ভবত, আঘাতটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক জোরে হয়ে গিয়েছিল।
ক্যাপ্টেন ত্রুব দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, তোমার দুঃসাহস দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছি য়ুহা। তোমাকে সে জন্যে শাস্তি পেতে হবে। অত্যন্ত কঠিন একটা শাস্তি।।
মহাকাশযানটিকে ধ্বংস করে সবাইকে মেরে ফেলবে, তুমি এর মাঝে আমাকে আলাদা করে কী শাস্তি দেবে?
এর মাঝেও তোমাকে আলাদা করে শাস্তি দেয়া সম্ভব। সময় হলেই তুমি সেটা দেখবে।
য়ুহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এ রকম চরম বিপদের মাঝেও তুমি একেবারে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার উপরে উঠতে পারছ না দেখে আমি খুব অবাক হয়েছি। ক্যাপ্টেন ক্ৰব, আমি তোমার জন্যে করুণা অনুভব করছি, তুমি নিশ্চয়ই খুব অসুখী একজন মানুষ।
আমি আমার ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ নিয়ে কথা বলতে আসিনি।
য়ুহা ক্যাপ্টেন ত্রুবকে বাধা দিয়ে বলল, আমি এখনো বিশ্বাস করি আমার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি সঠিক। এগারোজন বিদ্রোহীকে জাগিয়ে তুলে তাদের সাথে পরামর্শ করে তোমার একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল। তোমার নিজের নেয়া সিদ্ধান্তটি ভুল। পুরোপুরি ভুল।
ক্যাপ্টেন ক্রল ক্রুদ্ধ গলায় বলল, আমি আমার সিদ্ধান্তটি নিয়ে তোমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী নই।
তুমি অন্তত রায়ীনার সাথে কথা বল। মহাজাগতিক প্রাণীর বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে সে একজন বিশেষজ্ঞ। সে তোমাকে সাহায্য করতে পারে।
ক্যাপ্টেন ক্ৰব কোনো কথা না বলে য়ুহার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। য়ুহা আবার বলল, সে যেহেতু জেগেই গেছে তখন তার সাথে কথা বলার মাঝে কোনো সমস্যা নেই। আমি নিশ্চিত রায়ীনা তোমাকে সাহায্য করতে পারবে।
ক্যাপ্টেন ক্রব এবারে রায়ীনার দিকে তাকায়, জিব দিয়ে নিচের ঠোঁটটা ভিজিয়ে শুকনো গলায় বলে, য়ুহার কথা কি সত্যি? তুমি কি এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে পারবে?
রায়ীনা বলল, সবকিছু না জানলে আমি কিছু বলতে পারব না। তবে এ কথাটি সত্যি আমি বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা করি। একটা প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা কীভাবে বিকশিত হয়, সেই বুদ্ধিমত্তার কারণে একটা প্রাণী তার চারপাশের জগতের কাছে কী আশা করে সে সম্পর্কে আমার মৌলিক কিছু গবেষণা আছে।
ক্যাপ্টেন ক্রব কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, আমি যদি তোমাকে সব তথ্য দিই তাহলে তুমি কি আমাকে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে? মহাজাগতিক প্রাণীটি কী চায় কেন চায় কীভাবে চায় সেটি ব্যাখ্যা করতে পারবে?
রায়ীনা কয়েক মুহূর্ত কিছু একটা চিন্তা করে বলল, খুব নিখুঁতভাবে পারব সেটা দাবি করি না। তবে সম্ভবত তোমাদের অনেকের চাইতে ভালো পারব।
ঠিক আছে। ক্যাপ্টেন ত্রুব মাথা নেড়ে বলল, আমি তোমাকে সব তথ্য দিচ্ছি, দেখি তুমি আমাদের কী দিতে পার।
রায়ীলা হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। ক্যাপ্টেন ক্ৰব ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি হাসছ কেন?
রায়ীনা হাসি থামিয়ে বলল, খানিকক্ষণ আগে আমি যখন জেগে উঠতে শুরু করি আমার নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমি অবান্তর কথা বলেছি, অসংলগ্ন ব্যবহার করেছি, অকারণে হেসেছি। সেগুলোর কোনো গুরুত্ব ছিল না, কিন্তু এখন আমার হাসিটুকু একেবারেই আমার নিজস্ব! আমি হাসছি তার সুনির্দিষ্ট একটা কারণ আছে।
ক্যাপ্টেন ক্রব ভুরু কুঁচকে বলল, কী কারণ?
তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি তোমার কমান্ডের একজন অনুগত সদস্য! তুমি আমাকে একটা আদেশ দেবে আর আমি, হুঁকুম শিরোধার্য বলে তোমার আদেশ মেনে চলব! তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ আমাদের বিন্দুমাত্র সম্মান না দেখিয়ে মহাকাশযানের দেয়ালে বেঁধে রাখা হয়েছে?
ক্যাপ্টেন ত্রুবকে এক মুহূর্তের জন্যে একটু বিচলিত মনে হলো, সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, তুমি বিদ্রোহী দলের একজন সদস্য। আমাদের এই মহাকাশযানের নিরাপত্তার একটা বিষয় আছে। আমি তোমাকে ছেড়ে রাখতে পারি না।
রায়ীনা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, কিন্তু তুমি যদি আমার সাহায্য নিতে চাও তাহলে আগে আমার কিছু কথাবার্তা শুনতে হবে।
তোমার কথাবার্তাগুলো কী?
প্রথমেই আমাকে যেভাবে বেঁধে রেখেছ সেটা খুলে দিতে হবে। মানুষ যখন একটা পশুকে বাধে তখনও চেষ্টা করে রক্ত সঞ্চালনের বিষয়টা নিশ্চিত করতে, তোমরা সেটা করনি। আমাকে যদি খুলে দাও তাহলে আমার পাশে বসে থাকা য়ুহা নামের এই বিচিত্র মানুষটির বাঁধনও খুলে দিতে হবে। আমি এর সম্পর্কে কিছুই জানি না। কিন্তু এর কথাগুলো এবং এর খাপছাড়া কাজগুলো আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। সত্যি জীবন সম্পর্কে এর বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, সে কারণে তার জন্যে একটু মায়াও হয়েছে। রায়ীনা একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, তারপর আমার দলের বাকি এগারোজনকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাকে যেভাবে অসম্ভব বিপদের ঝুঁকি নিয়ে জাগানো হয়েছে—সেভাবে নয়। স্বাভাবিকভাবে জাগাতে হবে যেন জেগে ওঠার সাথে সাথে তারা পুরোপুরি কার্যক্ষম থাকে। আমার মতো অপ্রকৃতস্থ না থাকে।
য়ুহা কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, আসলে দোষটা আমার–
রায়ীনা য়ুহার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, তোমার কোনো দোষ নেই, তুমি যেটা করেছ সেটা অসাধারণ। তোমার কারণে আমি এই মহাকাশযানের ক্যাপ্টেনের কাছে আমার দাবিগুলোর কথা বলতে পারছি।
ক্যাপ্টেন ক্ৰব শক্ত মুখ করে বলল, তোমার কথা শেষ হয়েছে।
না। শেষ হয়নি। রায়ীনা বলল, আমার দলের সবাইকে জাগিয়ে তুললেই হবে না। তাদের নিরাপত্তার জন্য তাদের সবার হাতে একটা করে অস্ত্র দিতে হবে যেন ইচ্ছে করলেই তোমরা তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে না পার। শুধুমাত্র তাহলেই আমি তোমার সাথে কথা বলতে পারি।
ক্যাপ্টেন ক্ৰব শীতল চোখে রায়ীনার দিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তুমি নিশ্চয়ই একবারও বিশ্বাস করনি যে তোমার এই দাবিগুলো আমরা মেনে নেব।
স্বাভাবিক অবস্থা হলে বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু এখন অবস্থাটা খুব জটিল। হয়তো তোমার একটা সঠিক সিদ্ধান্তে এতগুলো মানুষের প্রাণ বেঁচে যাবে।
আমি দুঃখিত রায়ীনা। তোমার রক্তসঞ্চালনের জন্যে হাতের বাঁধনটা একটু ঢিলে করে দেয়া ছাড়া আমার পক্ষে তোমার আর কোনো দাবিই মেনে নেয়া সম্ভব না।
রায়ীনা আবার শব্দ করে হাসল। ক্যাপ্টেন ক্ৰব ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি কেন হাসছ।
তোমার কথা শুনে। তোমার আশেপাশে তোমার কমান্ডের এত জন। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত দেবার জন্যে একবারও তাদের সাথে কথা বললে না! আমি তোমার জায়গায় হলে তাদের সাথে একবার কথা বলতাম।
ক্যাপ্টেন জব ক্রুদ্ধ গলায় বলল, আমি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেব সেটি আমার ব্যাপার। আমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি বলেই আমি এই মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন।।
য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, তোমার সিদ্ধান্ত দেখে সেটা মনে হচ্ছে না ক্যাপ্টেন ক্ৰব।
আমার সিদ্ধান্তটি কী সেটা তোমরা এখনো জান না। আমি এখনো সেটা বলিনি।
সবাই এবার উৎসুক দৃষ্টিতে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের দিকে তাকাল। ক্যাপ্টেন ক্রব তার মুখে একটা বিচিত্র হাসি ফুটিয়ে বলল, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটা স্কাউটশিপে করে তোমাদের দুজনকে এই কালো কুৎসিত গ্রহটাতে পাঠাব। এই গ্রহতে মহাজাগতিক প্রাণীগুলো আছে, দেখা যাক তারা তোমাদের কীভাবে গ্রহণ করে!
য়ুহা চমকে উঠে বলল, কী বলছ তুমি?
আমি ঠিকই বলছি। দেখি তোমরা এই মহাজাগতিক প্রাণীকে পরাস্ত করে ফিরে আসতে পার কী না।
য়ুহা কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, পরাস্ত করতে হবে? আমাদের?
সেটা তোমাদের ইচ্ছে।
য়ুহা ভয়ার্ত চোখে রায়ীনার দিকে তাকালো। রায়ীনার চোখে-মুখে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই। সে য়ুহার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বলল, আশা করি সঙ্গী হিসেবে তুমি ভালো হবে–তোমার সাথে অনেক সময় কাটাতে হবে আমার।
আসলে সঙ্গী হিসেবে আমি যাচ্ছেতাই! য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, এত বয়স হয়েছে এখনো আমার কোনো ভালো বন্ধু নেই!
(চলবে)
