তৃতীয় এবং শেষ পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#অন্ধকারের_গ্রহ - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল
রায়ীনা বলল, আমি স্কাউটশিপে ওঠার আগে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাই।
ক্যাপ্টেন ত্রুব বলল, তুমি অর্থহীন কথা বলো না। তোমার বন্ধুরা সবাই একটি করে জড় পদার্থ হয়ে আছে। একটা স্ক্রু ড্রাইভারের কাছ থেকে বিদায় নেয়া আর তোমার বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।
রায়ীনা বলল, কে আমার বন্ধু কে ক্রু ড্রাইভার আমি সেটা নিয়ে তর্ক করতে চাই না। আমি বলছি যে আমি আমার এই বন্ধুদের সাথে আমার জীবনকে এক সুতায় বেঁধেছি। আমার কাছে আমি যেটুকু গুরুত্বপূর্ণ আমার এই বন্ধুরাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমি চলে যাবার আগে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাই।
ক্যাপ্টেন ত্রুব বলল, এটি অত্যন্ত ছেলেমানুষী, অর্থহীন একটা প্রক্রিয়া।
রায়ীনা বলল, আমি ছেলেমানুষ এবং এই মুহূর্তে আমার জীবনের কোনো অর্থ নেই। তবে তুমি নিশ্চিত থাক আমি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করব না। শুধু তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসব।
ক্যাপ্টেন ত্রুব বলল, তারা সেটি জানতেও পারবে না।
রায়ীনা বলল, যদি কখনো তাদেরকে জাগিয়ে তোলা হয় তখন তারা জানতে পারবে।
হিসান ক্যাপ্টেন বের কাছে গিয়ে গলা নামিয়ে বলল, ক্যাপ্টেন ক্রব, মেয়েটি যখন চাইছে তাকে অনুমতি দেয়া যেতে পারে। আমরা কয়েকজন তাকে শীতল ঘরে নিয়ে যাব তারপর ফিরিয়ে আনব। প্রতিমুহূর্ত তাকে চোখে চোখে রাখব।
ক্যাপ্টেন ত্রুব হিসানের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে। আমি তোমাকে দায়িত্ব দিচ্ছি তুমি এই মেয়েটিকে শেষবারের মতো শীতলঘর থেকে ঘুরিয়ে আনে। সে তার বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসুক। ক্যাপ্টেন ক্রব এক মুহূর্ত থেমে যোগ করল, মনে রেখো সে যদি অন্য কিছু করতে চায় তুমি তাকে সাথে সাথে গুলি করে হত্যা করতে পার।
স্কাউটশিপটা ছোট, দুজন পাশাপাশি বসতে পারে। নানারকম যন্ত্রপাতিতে বোঝাই, যার কোনটা কী কাজ করে সে সম্পর্কে য়ুহার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। য়ুহাকে প্রথমবারের মতো বায়ু-নিরোধক একটা পোশাক পরিয়ে দিচ্ছিল মিটিয়া। সে নিঃশব্দে কাজ করছে, য়ুহা জিজ্ঞেস করল, তুমি এবারে কিন্তু গুন গুন করে গান গাইছ না।
না। গাইছি না। মিটিয়া একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আসলে সব ।সময় গান গাইতে ইচ্ছে করে না।
সেটা আমি বুঝতে পারছি।
যাই হোক, তুমি এই পোশাকটি কখনো ব্যবহার করনি।
য়ুহা বাধা দিয়ে বলল, করেছি। আমাকে যখন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল তখন তারা এই পোশাকটা পরিয়েছিল।
সেটা ছিল খুবই কৃত্রিম একটা পরিবেশ—এখন পরিবেশটা খুব ভিন্ন। মিটিয়া গম্ভীর গলায় বলল, সব সময় মনে রাখতে হবে তোমার চলাফেরা হবে খুব সীমিত। এমনিতে তুমি যা যা করতে পার এই বিদঘুটে পোশাক পরে তুমি কিন্তু তার বিশেষ কিছুই করতে পারবে না।
য়ুহা জিজ্ঞেস করল, তাহলে আমাদের এই পোশাক পরাচ্ছ কেন?
তোমরা গ্রহটিতে যাচ্ছ সে জন্যে–
আমরা মোটেও গ্রহটিতে যাচ্ছি না-আমাদের জোর করে এই অন্ধকার গ্রহটাতে পাঠানো হচ্ছে।
মিটিয়া একটু থতমত খেয়ে বলল, আমি দুঃখিত য়ুহা।
তোমার দুঃখিত হবার কিছু নেই মিটিয়া।
যাই হোক, আমি যেটা বলছিলাম, এই পোশাকটা যদিও অত্যন্ত বিদঘুটে কিন্তু এটি একটি অসাধারণ পোশাক। একজন মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে যা যা দরকার তার সবকিছু এর ভেতরে আছে। একবার চার্জ করিয়ে নিলে এটা একজন মানুষকে পুরো আটচল্লিশ ঘণ্টা বাঁচিয়ে রাখতে পারে! এর ভেতরে যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে, অস্ত্র আছে
অস্ত্র আছে? য়ুহা চমকে উঠে বলল, আমাদের হাতে তোমরা অস্ত্র তুলে দিচ্ছ?
হ্যাঁ, দিচ্ছি তার কারণ তোমরা এখন সেটা ব্যবহার করতে পারবে। নিচের অন্ধকার গ্রহটাতে পৌঁছানোর পর সেটাকে চালু করা হবে।
নিচের গ্রহ সম্পর্কে তুমি কিছু জান মিটিয়া?
না। আমি বিশেষ কিছু জানি না। তোমাকে এই মুহূর্তে বলা হয়তো ঠিক হবে না কিন্তু গ্রহটি অত্যন্ত কুৎসিত। এর মাঝে এক ধরনের অশুভ ব্যাপার লুকিয়ে আছে।
য়ুহা কোনো কথা না বলে চুপ করে বসে রইল।
মহাকাশযান থেকে স্কাউটশিপটা উড়ে গেল কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই। য়ুহা মাথা ঘুরিয়ে একবার পেছন দিকে তাকিয়ে মহাকাশযানটিকে দেখার চেষ্টা করল, ঠিক কী কারণ জানা নেই সেটিকে একটা বিধ্বস্ত জাহাজের মতো দেখাচ্ছে। সে আর কখনো এখানে ফিরে আসতে পারবে কী
জানে না। য়ুহা মাথা ঘুরিয়ে রায়ীনার দিকে তাকালো, রায়ীনা।
বল।
তোমার কী মনে হয়? এই গ্রহটার প্রাণীগুলো কী রকম?
আমার এখনো কোনো ধারণা নেই। তবে প্রাণীগুলো বুদ্ধিমান সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
তারা কী আমাদের থেকে বুদ্ধিমান?
রায়ীনা শব্দ করে হেসে বলল, আমরা বুদ্ধিমান তোমাকে কে বলেছে? আমরা যদি বুদ্ধিমান হতাম তাহলে কি নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করি? নিজেদের গ্রহটাকে ধ্বংস করে মহাজগতের এখানে-সেখানে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি? মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে হত্যা করি? জোর করে অপছন্দের মানুষদের কালো কুৎসিত অন্ধকার একটা গ্রহে ঠেলে পাঠিয়ে দিই?
তার পরও আমরা তো একটা সভ্যতা গড়ে তুলেছি তুলিনি—
এটাকে সভ্যতা বলে না।
য়ুহা সভ্যতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে থেমে গেল। হঠাৎ করে তার মাথাটা একটু ঘুরে উঠেছে, হালকা এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে কোথা থেকে। সে রায়ীনার দিকে তাকিয়ে ভয় পাওয়া গলায় ডাকল, রায়ীলা—
হ্যাঁ। রায়ীনা মাথা নাড়ে, আমাদের অচেতন করে দিচ্ছে।
কে অচেতন করছে? কেন করছে?
ক্যাপ্টেন জব নিশ্চিত করতে চাইছে যেন আমরা এই স্কাউটশিপটা ব্যবহার করে অন্য কিছু করতে না পারি। রায়ীনা ঘুমঘুম গলায় বলল, য়ুহা, আমি জানি না এই স্কাউটশিপটা আমাদের ঠিকভাবে গ্রহটাতে পৌঁছাতে পারবে কী না। যদি না পারে তাহলে বিদায়! তোমার সাথে পরিচয় হওয়াটা আমার জন্যে চমৎকার একটা অভিজ্ঞতা ছিল।
য়ুহা কিছু একটা বলতে চাইছিল, কিন্তু কিছু বলার আগেই সে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল।
য়ুহা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল সে একটি গহিন বনে হারিয়ে গেছে, যেদিকেই যায় সে দেখতে পায় শুধু গাছ আর গাছ। কৃত্রিম গাছ নয়, সত্যিকারের গাছ। সেই গাছের ডাল, গাছের পাতায় তার শরীর আটকে যাচ্ছে, লতাগুলোতে সে জড়িয়ে যাচ্ছে, তখন শুনতে পেল বহুদূর থেকে কেউ যেন তাকে ডাকছে, য়ুহা।
য়ুহা এদিকে সেদিকে তাকালো, কাউকে দেখতে পেল না। শুধু মনে হলো কণ্ঠস্বরটি বুঝি আরো কাছে এগিয়ে এসেছে—আবার ডাকছে, য়ুহা। এ রকম সময় সে ধড়মড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠল, তার ওপর ঝুঁকে পড়ে আছে রায়ীনা, তাকে ধাক্কা দিতে দিতে সে ডাকছে।
য়ুহা এসে বসে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বলল, আমরা কোথায়? আমরা গ্ৰহটাতে নেমে এসেছি।
আমরা তো বেঁচে আছি তাই না?
মনে হচ্ছে বেঁচে আছি। তবে এটাকে তুমি যদি বেঁচে থাকা না বলতে চাও তাহলে অন্য ব্যাপার।
য়ুহা স্কাউটশিপের গোল জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, সর্বনাশ, কী বিদঘুটে গ্রহ!
রায়ীনা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ এটা খুব বিদঘুটে একটা গ্রহ।
য়ুহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি কখনো চিন্তা করিনি, আমার জীবনের শেষ সময়টা কাটাব এ রকম একটা বিদঘুটে অন্ধকার গ্রহে।
তোমার জীবনের শেষ সময়টা কোথায় কাটানোর কথা ছিল?
আমি ভেবেছিলাম আমার নিজের পরিচিত মানুষের সাথে। সাধারণ মানুষ। সাদামাটা মানুষ।
রায়ীনা মাথা ঘুরিয়ে য়ুহার দিকে তাকিয়ে বলল, বিষয়টা নিয়ে আমারও এক ধরনের কৌতূহল! তুমি তো সামরিক কমান্ডের কেউ নও-তুমি কেমন করে এই মহাকাশযানে আছ?
আমি একজন কবি! আমি একাডেমির কাছে আবেদন করেছিলাম যে আমি মহাকাশ ভ্রমণে যেতে চাই। একাডেমি এদের সাথে আমাকে যেতে দিয়েছে।
রায়ীনা হাসার চেষ্টা করে বলল, তুমি এখন নিশ্চয়ই খুব আফসোস করছ যে কেন এসেছিলে?
না, আসলে করছি না। সবকিছুই তো অভিজ্ঞতা, এটাও এক ধরনের অভিজ্ঞতা। একটা জীবন তো নানারকম অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু না।
রায়ী অন্যমনস্কভাবে বলল, তা ঠিক।
য়ুহা বলল, এখান থেকে বের হয়ে যদি আবার নিজের পরিচিত মানুষদের কাছে ফিরে যেতে পারতাম, তাহলে অভিজ্ঞতার গুরুত্বটুকু আরো অনেক বাড়ত।
রায়ীনা আবার অন্যমনস্কভাবে বলল, তা ঠিক।
য়ুহ্য জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন কী করব?
রায়ীনা বলল, আমি প্রথম ছত্রিশ ঘণ্টা বিশেষ কিছু করতে চাই না।
য়ুহা একটু অবাক হয়ে বলল, প্রথম ছত্রিশ ঘণ্টা?
হ্যাঁ। ছত্রিশ ঘণ্টার পর আমি মহাকাশযান থেকে আরো কয়েকটি স্কাউটশিপ আশা করছি। আমাদের সাহায্য করার জন্যে তখন আরো কিছু মানুষ আসবে। যন্ত্রপাতি আসবে! অস্ত্র আসবে! তখন যদি কিছু করা যায় করব।
য়ুহা হতচকিত হয়ে বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। ছত্রিশ ঘণ্টা পর মহাকাশযান থেকে স্কাউটশিপ কেন আসবে?
তার কারণ ছত্রিশ ঘণ্টা পর আমার দলের লোকজন মহাকাশযানটা দখল করে নেবে। চব্বিশ ঘণ্টার মাঝেই সেটা ঘটে যাবার কথা, আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্যে আরো বারো ঘণ্টা হাতে রাখছি। আর তারা মহাকাশযানটা দখল করার পর আমাকে সাহায্য করার জন্যে ছুটে আসবে।
য়ুহা বিস্ফারিত চোখে রায়ীনার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার দলের লোকেরা কেমন করে মহাকাশযানটা দখল করবে?
তোমার মনে আছে এই স্কাউটশিপ রওনা দেবার আগে আমি আমাদের দলের লোকদের কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়েছিলাম?
হ্যাঁ। মনে আছে।
আসলে আমি মোটেও বিদায় নিতে যাইনি। ক্যাপ্টেন ক্ৰব ঠিকই বলেছিল, কাউকে যখন হিমঘরে শীতল করে রাখা হয় তখন তার ভেতরে আর একটা ক্রু ড্রাইভারের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। আমি গিয়েছিলাম আমাদের একজনের লিকুইড হিলিয়াম সরবরাহে ঘোট একটু ফুটো করতে-খুব ছোট, খালি চোখে কিছুতেই ধরা পড়বে না কিন্তু সময় দেয়া হলে লিকুইড হিলিয়ামটা বের হয়ে যাবে! সবাই যখন ভেবেছে আমি গভীর আবেগে বিদায় নিয়ে আসছি, আসলে তখন আমার জুতোর গোড়ালিতে লাগানো টাইটেনিয়ামের সূক্ষ্ম পিনটি দিয়ে টিউবে একটা ছোট ফুটো করেছি। ঘণ্টা তিনেক পর যখন শরীরটাকে ঠান্ডা রাখতে পারবে না তখন তাকে জাগিয়ে তোলা হবে! তুমি আমাকে যেভাবে জাগিয়েছিলে।
কী আশ্চর্য!
না, মোটেও আশ্চর্য নয়। এটা হচ্ছে খুব বাস্তব একটা কাজ! যাই হোক আমি যার ক্যাপসুলে এই ঘটনা ঘটিয়ে রেখে এসেছি তার নাম হচ্ছে রিহি। রিহি হচ্ছে আমাদের মাঝে সবচেয়ে বুদ্ধিমান। আমাদের ধারণা, তার নিউরনের সিনালের সংখ্যা আমাদের থেকে দশ গুণ বেশি! সে নিশ্চয়ই জানবে তখন কী করতে হবে। অন্য সবাইকে তখন জাগিয়ে তুলবে। পরের অংশ সহজ–মহাকাশযানটা দখল করে নেয়া! ছোটখাটো যুদ্ধ হতে পারে কিন্তু সেই যুদ্ধে কেউ তাদের হারাতে পারবে না। তাদেরকে হারানোর মতো সামরিক বাহিনী এখনো জন্মায়নি।
তুমি সত্যি বলছ?
হ্যাঁ। আমি সত্যি বলছি। তাই আমি পরের ছত্রিশ ঘণ্টা বিশেষ কোনো অ্যাডভেঞ্চার না করে বসে থাকতে চাই। যতটুকু সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করতে চাই। যখন সময় হবে তখন যেন সেটা ব্যবহার করতে পারি।
মুহ বিস্ফারিত চোখে বলল, রায়ীন, আমি যতই তোমাকে দেখছি ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি।
রায়ীনা হেসে বলল, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি তোমার জীবনে খুব বেশি মানুষ দেখনি। তাই অল্পতেই মুগ্ধ হয়ে যাও!
না, আমি অল্পতে মুগ্ধ হই না। তুমি আসলেই অসাধারণ।
ঠিক আছে, আমি অসাধারণ! সেটা নিয়ে পরে আলোচনা করব। এখন ঠিক করা যাক ছত্রিশ ঘণ্টা সময় কীভাবে কাটানো যায়।
য়ুহা এবং রায়ীনা কিছুক্ষণের মাঝেই আবিষ্কার করল বিশেষ কিছু না করে ছত্রিশ ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দেয়া খুব সহজ নয়। স্কাউটশিপে যে যন্ত্রপাতিগুলো আছে সেগুলো ব্যবহার করে তারা গ্রহটা সম্পর্কে তথ্য বের করার চেষ্টা করছিল কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই সেই কাজটা শেষ হয়ে গেল। তারা আবিষ্কার করল গ্রহটা মোটামুটি বিচিত্র, বায়ুমণ্ডল বলতে গেলে নেই, তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি। গ্রহটার পৃষ্ঠে আলো বিকিরণকারী এক ধরনের যৌগ আছে, সেখান থেকে নিস্প্রভ এক ধরনের আলো বের হয়, পুরো গ্রহটা সেজন্যে কখনো পুরোপুরি অন্ধকার নয় কিন্তু কখনোই পরিষ্কার করে কিছু দেখা যায় না। চারপাশে কেমন যেন মন খারাপ করা বিষঃ এক ধরনের পরিবেশ। এটা মূলত সিলিকনের গ্রহ, গ্ৰহটার ভর খুব কম, তাই বায়ুমণ্ডল আটকে রাখতে পারেনি। ছোট গ্রহ বলে পৃষ্ঠদেশ একেবারে অসম। জৈবিক প্রাণীর রুটিন বাঁধা পরীক্ষাগুলোতে কিছু ধরা পড়েনি কিন্তু এই গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব আছে তার একটি প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রহটির পৃষ্ঠ থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর একটা সিগন্যাল মহাকাশে পাঠানো হয়। এ ধরনের একটা সিগন্যাল পাঠাতে হলে তার জন্যে জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তির একটা নির্দিষ্ট ধরনের উন্নতি হতে হয় মানুষের সভ্যতার সমকক্ষ সভ্যতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
সিগন্যালটি নির্দিষ্ট একটা সময় পরপর পাঠানো হয়, মোটামুটি সহজেই কোথা থেকে সিগন্যালটা পাঠানো হচ্ছে জায়গাটুকু নির্দিষ্ট করা গেছে। এই গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব খুঁজে বের করতে হলে মনে হয় এই জায়গাটা দিয়েই শুরু করতে হবে। তবে নিজে থেকে সেখানে হাজির হওয়াটা খুব বিপজ্জনক একটি কাজ হয়ে যেতে পারে।
প্রথম কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই য়ুহা এবং রায়ীনার ভেতরে এক ধরনের। ক্লান্তি এসে ভর করল, কোনো কিছু না করার এক ধরনের ক্লান্তি আছে, সেই ক্লান্তি খুব সহজেই একজনকে কাবু করে ফেলে। য়ুহা বলল, এই ছোট স্কাউটশিপে বসে থাকতে অসহ্য লাগছে! আমি কি স্কাউটশিপের বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসতে পারি? অপরিচিত একটা গ্রহে পা দিতে কেমন লাগে সেটা একটু দেখতে চাই! কখনো এ রকম একটা অভিজ্ঞতা হবে আমি ভাবিনি।
রায়ীনা বলল, আমারও অসহ্য লাগছে, কিন্তু এক সাথে দুজন বের হওয়া ঠিক হবে না। তুমি বের হও আমি তোমার ওপর চোখ রাখি, তারপর আমি বের হব, তখন তুমি আমার ওপর চোখ রাখবে।
য়ুহা তখন খুব সাবধানে স্কাউটশিপ থেকে বের হয়ে এলো। তার শরীরে তাপ নিরোধক পোশাক, তারপরও বাইরের শীতল গ্রহটিতে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। য়ুহা উপরের দিকে তাকালো, সেখানে কুচকুচে কালো আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। চারদিকে এবড়ো থেবড়ো পাথর, শুষ্ক এবং বিবর্ণ। য়ুহা স্কাউটশিপটি ছেড়ে কয়েক পা এগিয়ে গেল এবং হঠাৎ তার ভেতরে এক ধরনের বিচিত্র অনুভূতি হতে থাকে, তার মনে হয় কেউ যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। য়ুহা মাথা ঘুরিয়ে চারদিকে তাকালো, আবছা অন্ধকারে উঁচু-নিচু পাথর, তার ভেতর থেকে সত্যিই কি কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে?
য়ুহা।
বল।
আমার মনে হচ্ছে তোমার হৃৎস্পন্দন হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। কিছু কী হয়েছে?
না। কিছু হয়নি।
তুমি কী কোনো কারণে ভয় পেয়েছ?
না ভয় পাইনি। তবে—
তবে কী?
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কেউ যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
মানুষের মন খুব বিচিত্র। রায়ীনা হাসির মতো শব্দ করে বলে, সত্যি সত্যি কেউ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি একটু চিন্তিত হতাম কিন্তু এটা যদি তোমার একটা কল্পনা হয়ে থাকে তাহলে আমি ব্যাপারটাকে খুব গুরুত্ব দেব না।
য়ুহা মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে তাকালো, চারপাশে শুষ্ক বিবর্ণ পাথর, কোথাও কিছু নেই। য়ুহা জোর করে মাথা থেকে চিন্তাটা সরিয়ে দেয়। মহাকাশের এই বিশেষ পোশাকে অভ্যস্ত হতে সময় নেবে, য়ুহা সাবধানে আর কয়েক পা অগ্রসর হয়। হাঁটা বলতে যা বোঝায় এটা মোটেও সে রকম নয়—গ্রহটার মাধ্যাকর্ষণ এত কম যে পায়ের ধাক্কাতেই অনেকটুকু উপরে উঠে যায়, মনে হয় সে বুঝি হেঁটে যাচ্ছে না, লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে। শরীরের ভরকেন্দ্রটিও ঠিক জায়গায় নেই, পেছনে নানা ধরনের বোঝা, তাই একটু সামনে ঝুঁকে হাঁটতে হচ্ছে। এই পোশাকের সাথে একটা জেট প্যাক লাগানো আছে, সুইচ টিপেই সে উপরে উঠে যেতে পারবে, সামনে-পেছনে যেতে পারবে। য়ুহা এই মুহূর্তে সেটা অবশ্যি পরীক্ষা করে দেখার সাহস পেল না। এই পোশাকের সাথে একটা অস্ত্র ও থাকার কথা। অস্ত্রটা কোথায় আছে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটাও সে বুঝতে পারছে না। মনে মনে আশা করে আছে তাকে কখনোই অস্ত্রটা হাতে তুলে নিতে হবে না। পৃথিবীতে একটা জিনিসকেই সে অপছন্দ করে, সেটা হচ্ছে অস্ত্র।
যুহ অন্যমনস্কভাবে আরো একটু সামনে এগিয়ে যেতেই রায়ীনার একটা সতর্কবাণী শুনতে পেল, য়ুহা, তুমি আর সামনে যেয়ো না।
কেন?
কোনো কারণ নেই। স্বাভাবিক নিরাপত্তার নিয়ম হচ্ছে অচেনা জায়গায় বেশি দূর না যাওয়া।
য়ুহা বলল, ঠিক আছে। আমি ফিরে আসছি।
য়ুহা ঘুরে যাওয়ার চেষ্টা করে আবিষ্কার করল মহাকাশ অভিযানের এই বেঢপ পোশাক পরে খুব সহজ কাজগুলোও মোটেও সহজে করা যায় না। কোনোভাবে তাল সামলানোর চেষ্টা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হঠাৎ করে তার মনে হলো কিছু একটা যেন সরে গেছে। য়ুহা থমকে দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরে তাকালো, সাথে সাথে সে রায়ীনার গলার স্বর শুনতে পায়, কী হয়েছে?
না কিছু না। তবে—
তবে কী?
আমার মনের ভুলও হতে পারে, কিন্তু আমার মনে হলো কী একটা যেন সরে গেছে।
রায়ীনা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, তুমি বাইরে আর অপেক্ষা করে স্কাউটশিপে চলে এসো। রায়ীনা যদিও গলার স্বরটি শান্ত রাখার চেষ্টা করেছে তার পরেও সেখানে উদ্বেগটুকু লুকিয়ে রাখতে পারল না।
আসছি। য়ুহা একটু এগিয়ে যেতেই দেখল অন্ধকার গ্রহের পাথরের আড়াল থেকে কিছু একটা দ্রুত সরে যাচ্ছে। সে আতঙ্কিতভাবে অন্যপাশে তাকালো, তার স্পষ্ট মনে হয় চারদিক থেকে কিছু একটা তাকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।
রায়ীনা।
কী হয়েছে?
আমার চারদিকে কিছু একটা এসেছে। মনে হয় কিছু একটা করার চেষ্টা করছে।
তুমি তোমার মাথা ঠান্ডা রাখ য়ুহা। দৌড়ানোর চেষ্টা করবে না। ঠিক যেভাবে আসছিলে সেভাবে আসতে থাক। কোনো রকম বিপদ হলে আমি আছি।
ঠিক আছে।
য়ুহা স্কাউটশিপটার দিকে এগুতে থাকে এবং হঠাৎ করে তার হেডফোনে কর্কশ একটা ধাতব শব্দ শুনতে পায়। অর্থহীন একটা শব্দ কিন্তু শব্দ সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। য়ুহার হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হয়ে ওঠে। মহাকাশের বেঢপ পোশাকের ভেতর সে কুলকুল করে ঘামতে থাকে। য়ুহা আরো দুই পা এগিয়ে গেল এবং হঠাৎ করে মনে হলো কোনো একটা প্রাণী খুব কাছে দিয়ে ছুটে গেছে, আবছা অন্ধকারে তার শরীরের খুঁটিনাটি কিছু দেখা গেল না। শুধু তার অস্তিত্বটা অনুভব করা গেল।
ভয় পেয়ো না য়ুহা। তুমি এগিয়ে আসতে থাকো-রায়ীনা তাকে সাহস দেয়ার চেষ্টা করল, তোমার কিছু হলে আমি আছি।
ঠিক আছে রায়ীনা।
য়ুহা আরো দুই পা এগিয়ে গেল, বড় কিছু পাথরের আড়ালে এখন স্কাউটশিপটা আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে। আর একটু এগিয়ে গেলেই সেখানে পৌঁছে যাবে। নিজের অজান্তেই য়ুহার পদক্ষেপ হঠাৎ দ্রুততর হয়ে ওঠে।
ঠিক এ রকম সময় বড় একটা পাথরের আড়াল থেকে একটা প্রাণী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তার ধাক্কায় সে ছিটকে পড়ে যায়। সাথে সাথে নানা আকারের আরো কিছু প্রাণী তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে হুঁটোপুটি খেতে থাকে। য়ুহা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে হাত দিয়ে প্রাণীগুলো নিজের ওপর থেকে সরানোর চেষ্টা করল কিন্তু পারল না, প্রাণীগুলো তাকে জাপটে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ায় চেষ্টা করতে থাকে। য়ুহা হাত দিয়ে প্রাণীগুলোকে আঘাত করার চেষ্টা করল, নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল কিন্তু কোনো লাভ হলো না।
হেডফোনে রায়ীনার গলার স্বর শুনতে পেল য়ুহা, আসছি। আমি আসছি!
য়ুহাকে যখন টেনেহিঁচড়ে বেশ কিছুদূর নিয়ে এসেছে তখন রায়ীনা দৌড়ে তার কাছে পৌঁছালো। হাতের অস্ত্রটি দিয়ে অনির্দিষ্টভাবে গুলি করতে করতে সে ছুটে এসেছে। পেছন থেকে একটা প্রাণীকে টেনে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে, অস্ত্রটা দিয়ে সেটাকে আঘাত করে, তার পরেও সরাতে না পেরে সে আবার গুলি করল।
গুলির আঘাতে প্রাণীটা ছিটকে পড়ে গেল, কর্কশ এক ধরনের শব্দ করতে করতে সেটি উঠে দাঁড়ায়, তারপর উবু হয়ে উঠে সেটি হামাগুড়ি দিয়ে পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়। রায়ীনা য়ুহাকে টেনে নিয়ে যাওয়া বিচিত্র প্রাণীগুলোর দিকে অস্ত্রটা তাক করে গুলি করল এবং তখন হঠাৎ প্রাণীগুলো য়ুহাকে ছেড়ে দিয়ে ছুটে পালিয়ে যেতে শুরু করল।
প্রাণীগুলো পালিয়ে যাবার পর য়ুহা উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল, তোমাকে ধন্যবাদ রায়ীনা। তুমি না এলে সর্বনাশ হয়ে যেত।
তুমি ঠিক আছ তো?
হ্যাঁ। ঠিক আছি।
তাহলে চল, স্কাউটশিপে।
এক সেকেন্ড দাঁড়াও- য়ুহা হঠাৎ নিচু হয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করল, ভয় পাওয়া গলায় বলল, এই দেখো কী পড়ে আছে।
রায়ীনা এগিয়ে যায়, কী পড়ে আছে?
একটা হাত। তোমার গুলিতে প্রাণীটার শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে।
রায়ীনা নিচু হয়ে হাতটা তুলে নেয়, সেটা তখনো নড়ছে, কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হাতটা মানুষের হাত।
স্কাউটশিপের ভেতরে ছোট টেবিলটার ওপর মানুষের একটা হাত, সেটি শুকিয়ে অস্থিচর্মসার হয়ে আছে, কিন্তু তারপরেও বুঝতে এতটুকু সমস্যা হয় না যে হাতটি মানুষের। রায়ীনার গুলিতে হাতটি শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে কিন্তু যে ব্যাপারটা তারা বুঝতে পারছে না সেটি হচ্ছে যে হাতটি এখনো জীবন্তু। তার আঙুলগুলো নড়ছে এবং মাঝে মাঝেই সেটা উল্টে যাওয়ার চেষ্টা করে। যতবার এটা উপুড় হয়েছে ততবার সেটা তার আঙুলগুলো দিয়ে খামচে খামচে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। শুধু তাই নয়, ধরে ফেলার মতো কোনো কিছু পেলে হাতটা সেটা শক্ত করে ধরে ফেলে এবং তখন সেটাকে ছুটিয়ে নিতে যথেষ্ট কষ্ট হয়। য়ুহা এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে এই কাটা হাতটির দিকে তাকিয়ে থাকে, আঙুল দিয়ে খামচে খামচে সেটা টেবিলের কিনারা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, য়ুহা হাত দিয়ে ঠেলে সেটাকে টেবিলের মাঝামাঝি এনে বলল, আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না একটা হাত কেমন করে জীবন্ত থাকে।
রায়ীনা কোনো একটা ভাবনায় ড়ুবে ছিল, এবারে য়ুহার দিকে তাকিয়ে বলল, একটা হাত আলাদাভাবে জীবন্ত থাকে না।
এই যে থাকছে। নাড়াচাড়া করছে।
রায়ীনা হাসার চেষ্টা করে বলল, নাড়াচাড়া করে মানে জীবন্ত থাকা নয়! অনেক রকেট, মহাকাশযান, বাইভার্বাল নাড়াচাড়া করে, তার মানে এই নয় যে সেগুলো জীবন্ত।
তুমি বলছ এটা জীবন্ত না?
আমার তা-ই ধারণা।
তাহলে এটা কেমন করে নড়ছে?
এটাকে নাড়ানো হচ্ছে।
কে নাড়াচ্ছে? কীভাবে নাড়াচ্ছে?
রায়ীনা মুখে হাসি টেনে বলল, এতক্ষণ পর তুমি একটা সত্যিকারের প্রশ্ন করেছ। কে নাড়াচ্ছে এবং কীভাবে নাড়াচ্ছে। আমাদের সেটা খুঁজে বের করতে হবে।
তার মানে তুমি বলতে চাইছ–
রায়ীনা মাথা নাড়ল, আমি আসলে এখনো কিছুই বলতে চাইছি না। তবে তুমি যদি খুব বিরক্ত না হও তাহালে খানিকক্ষণ জোরে জোরে চিন্তা করতে পারি।
করো। জোরে জোরে চিন্তা করো, তোমার চিন্তাটা শুনি।
তোমাকে যখন প্রাণীগুলো আক্রমণ করল তখন সেখানে আবছা অন্ধকারে পরিষ্কার করে কিছু দেখা যাচ্ছিল না, তার পরেও মনে হচ্ছিল প্রাণীগুলোর হাত-পা আছে, শরীর আছে, মাথা আছে। মাথায় নাক মুখ চোখ আছে কী না আমরা এখনো জানি না। অন্ধকারের মাঝে গুলি করে শরীরের একটা অংশ আমরা আলাদা করে ফেলেছি—সেটা হচ্ছে একটা হাত। কাজেই মোটামুটি নিশ্চিত যে প্রাণীগুলো আসলে মানুষের আকৃতির।।
তার মানে তুমি বলছ এখানে মহাজাগতিক প্রাণী নেই, আছে মানুষ–
রায়ীনা বলল, আমি যখন তোমার সাথে কথা বলব তখন তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে পারবে। এখন আমি চিন্তা করছি। চিন্তার ভেতরে কেউ প্রশ্ন করতে পারে না!
ঠিক আছে, তুমি চিন্তা কর। আমি আর প্রশ্ন করব না।
হাতটা যেহেতু মানুষের, তার মানে শরীটাও মানুষের। কিন্তু আমরা জানি মানুষের শরীর অত্যন্ত কোমল একটা জিনিস। একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, নির্দিষ্ট চাপ এবং সুনির্দিষ্ট পরিবেশ না থাকলে সেটা বেঁচে থাকতে পারে না। তাকে কিছুক্ষণ পরপর খেতে হয়। তাকে প্রতি মুহূর্তে ফুসফুসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অক্সিজেন নিতে হয়, সেটা রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে দিতে হয়—এ রকম নানা ধরনের ঝামেলা আছে।
রায়ীনা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, আমরা জানি এই গ্রহটির তাপমাত্রা শূন্যের কাছাকাছি, বায়ুমণ্ডল বলতে গেলে নেই এবং যেটুকু আছে সেখানে অক্সিজেনের কোনো চিহ্ন নেই। আমাদের দুজনকে দেখলেই সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এই গ্রহটিতে বেঁচে থাকার জন্যে আমাদের কী বেটপ একটা পোশাক পরে থাকতে হচ্ছে কিন্তু এই মানুষগুলোর কোনো পোশাক নেই—বাতাসবিহীন, অক্সিজেনবিহীন শীতল একটা গ্রহে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সেটা হতে পারে শুধু একটি উপায়ে–
কী উপায়ে? জিজ্ঞেস করতে গিয়ে য়ুহা থেমে গেল, রায়ীনার চিন্তার প্রক্রিয়াটাতে সে বাধা দিতে চায় না।
রায়ীনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সেটা হতে পারে যদি আসলে মানুষগুলো হয় মৃত!
মৃত? মাঝখানে কথা বলার কথা নয় জেনেও য়ুহা নিজেকে সামলাতে পারল না।
হ্যাঁ। মৃত। কিন্তু মৃত মানুষ হাঁটে না, চলাফেরা করে না, কাউকে আক্রমণ করে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে না। কাজেই অনুমান করছি এই মৃত মানুষগুলোকে অন্য কেউ চালাচ্ছে। তার স্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে এই কাটা হাতটা। দেখা যাচ্ছে এটা এখনো নিজে নিজে চলছে।
আমি অনুমান করছি এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ দিয়ে এবং আমার অনুমান সত্যি কী না সেটা খুব সহজেই পরীক্ষা করে দেখা যায়। যদি এই হাতটা বৈদ্যুতিক পরিরাহী কিছু দিয়ে আমরা ঢেকে দিই তাহলে এর মাঝে বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ পৌঁছাতে পারবে না। তখন নাড়াচাড়াও করতে পারবে না।
রায়ীনা স্কাউটশিপের জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, এই জানালায় পাতলা মাইলারের ওপর বৈদ্যুতিক পরিরাহী স্বর্ণের একটা সূক্ষ্মা স্তর আছে। আমার অনুমান সত্যি হলে আমরা এটা দিয়ে হাতটা যদি মুড়ে দিই তাহলে হাতটা নাড়াচাড়া করা বন্ধ করে দেবে।
য়ুহা চোখ বড় বড় করে বলল, তোমার জোরে জোরে চিন্তা করা শেষ?
হ্যাঁ।
তাহলে আমরা এই মাইলার আর স্বর্ণের আবরণ দিয়ে হাতটাকে মুড়ে দেব?
হ্যাঁ। এলুমিনিয়ামের ফয়েল দিয়েও করা যেত কিন্তু এই স্কাউটশিপে সেটা খুঁজে পাব বলে মনে হয় না।
য়ুহা জানালা থেকে মাইলারের পর্দাটুকু খুলে আনে, সেটা দিয়ে হাতটাকে মুড়ে দিতেই হঠাৎ করে কাটা হাতটা স্থির হয়ে গেল। য়ুহা চোখ বড় বড় করে বলল, তোমার অনুমান সত্যি, রায়ীনা! তোমাকে যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি।
রায়ীনা নিচু গলায় বলল, বোঝা যাচ্ছে তুমি মুগ্ধ হবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে থাক! তোমাকে মুগ্ধ করা খুব কঠিন নয়। যাই হোক, আমাদের পরীক্ষাটা সম্পূর্ণ করার জন্যে কাটা হাতটার ওপর থেকে স্বর্ণের আবরণ দেয়া মাইলারের পর্দাটা আবার খুলে ফেলতে হবে, তাহলে কাটা হাতটা আবার নাড়াচাড়া করতে শুরু করবে।
য়ুহা বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। দেখি তো। সে বেশ উৎসাহ নিয়ে মাইলারের পর্দাটা খুলে ফেলল এবং প্রায় সাথে সাথেই হাতটা নড়তে শুরু করে। য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, রায়ীনা তুমি সত্যিই অসাধারণ! এখন পর্যন্ত তোমার প্রত্যেকটা কথা সত্যি বের হয়েছে।
কথাগুলো সহজ ছিল সে জন্যে!
এবারে তুমি বল এই মহাকাশের প্রাণীটা সম্পর্কে। যে প্রাণীটা এই মৃত মানুষগুলোকে নাড়াচাড়া করাচ্ছে সেটা কী রকম? তাদের কী অক্টোপাসের মতো শুড় আছে? অনেকগুলো চোখ? মাকড়সার মতো অনেকগুলো পা? কী খায়?
রায়ীনা মাথা নাড়ল, বলল, উঁহু। আমার কী মনে হয় জানো?
কী?
আসলে এখানে কোনো মহাকাশের প্রাণী নেই!
য়ুহা চোখ কপালে তুলে বলল, মহাকাশের প্রাণী নেই?
না। এখানে হয়তো মানুষের একটা বসতি ছিল, কিংবা কোনো একটা মহাকাশযান বিধ্বস্ত হয়ে মহাকাশচারীরা এখানে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের সাথে ছিল কোনো ধরনের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক, সেই কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে সবকিছু দখল করে নিয়েছে। সেটা ধীরে ধীরে আরো ক্ষমতাশীল হয়েছে, মানুষগুলো যখন মারা গেছে তখন তাদের মৃতদেহ ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
য়ুহা অবাক হয়ে বলল, তুমি সত্যিই তা-ই মনে করো?
হ্যাঁ। আমার তা-ই ধারণা।
কেন? তোমার এ রকম ধারণা কেন হলো?
দেখছ না এই প্রাণীগুলোর প্রযুক্তি ঠিক আমাদের মতন। যদি একেবারে ভিন্ন ধরনের বুদ্ধিমান প্রাণী হতো তাহলে তাদের প্রযুক্তি হতো একেবারে অন্য রকম। হয়তো বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ দিয়ে যোগাযোগ না করে যোগাযোগ করত নিউট্রিনো বীম দিয়ে। হয়তো মানুষের দেহ ব্যবহার করে অন্য কিছু ব্যবহার করত।
য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, তোমার কথায় এক ধরনের যুক্তি আছে।
রায়ীনা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, শুধু যুক্তি থাকলেই হয় না। আমি দেখেছি জীবনে যে সব ব্যাপার ঘটে তার বেশির ভাগেরই কোনো যুক্তি নেই!
এ রকম কেন বলছ?
আমার দিকে দেখ? আমার কি একটা গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করে এখন এই গ্রহে আটকা পড়ার কথা ছিল? আমার জন্ম হয়েছিল একটা শান্তশিষ্ট মেয়ে হিসেবে। আমি বড় হয়েছি জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিবেশে, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে। অথচ এখন আমার বন্ধু মহাজগতের বড় বড় গেরিলারা। আমি যুদ্ধ করতে পারি, আমার প্রাণের বন্ধু মারা গেলেও আমি চোখ থেকে এক ফোটা পানি ফেলি না। আমার বুকের ভেতরটা এখন পাথরের মতো কঠিন।
য়ুহা আস্তে আস্তে বলল, আসলে মানব জাতির পুরো ইতিহাসটাই হচ্ছে এ রকম। মানুষের একটা গোষ্ঠী সবকিছু নিয়ে নিচ্ছে। অন্য গোষ্ঠী তার প্রতিবাদ করছে। সেটা নিয়ে বিরোধ। সংঘর্ষ। যুদ্ধ। যে জিনিসটি খুব সহজে মেনে নেয়া যায় সেটি কেউ মানছে না–একজনের সাথে আরেকজন শুধু শুধু যুদ্ধ করছে।
রায়ীনা বিষণ্ণ গলায় বলল, মাঝে মাঝে আমি এক ধরনের ক্লান্তি অনুভব করি। মনে হয় অস্ত্রটা ভাঁজ করে রেখে একটা ল্যাবরেটরিতে খানিকটা সময় কাটাই।
য়ুহা নরম গলায় বলল, নিশ্চয়ই তুমি একসময় তোমার অস্ত্রটা ভজ করে রেখে ল্যাবরেটরিতে ঢুকবে। নিশ্চয়ই ঢুকবে।
রায়ীনা কোনো কথা না বলে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমাদের ছত্রিশ ঘণ্টার কত ঘণ্টা পার হয়েছে য়ুহা।
বেশি না, খুব বেশি হলে মাত্র বারো ঘণ্টা।
রায়ীনা স্কাউটশিপের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো, উপরে কুচকুচে কালো আকাশ, সেই আকাশে এই মুহূর্তে একটি মহাকাশযান এই গ্রহটাকে ঘিরে ঘুরছে। তার দলের মানুষেরা এই মুহূর্তে হয়তো সেই মহাকাশযানটা দখল করার চেষ্টা করছে। তারা কি পারবে দখল করতে? তারপর তারা কি আসবে তাদের এই ভয়ঙ্কর গ্রহ থেকে উদ্ধার করতে? যদি কেউ না আসে?
রায়ীনা জোর করে চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে দিল।
চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে য়ুহার চোখে একটু তন্দ্রার মতো এসেছিল, ঠিক এ রকম সময় একটা বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো এবং তার সাথে সাথে স্কাউটশিপটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে ওঠে। য়ুহা চমকে উঠে বলল, ওটা কীসের শব্দ?
রায়ীনা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, গুলির শব্দ।
গুলির শব্দ?
হ্যাঁ। মনে হয় ওরা এখন অস্ত্র নিয়ে এসেছে!
সর্বনাশ!
য়ুহার কথা শেষ হবার আগেই আবার বিস্ফোরণের শব্দ হলো এবং স্কাউটশিপটা ভয়ানকভাবে দুলে উঠল।
রায়ীনা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এ জন্যে আমি এদের সাথে গোলাগুলি করতে চাইনি! আমরা গুলি করেছি তাই আমরা এখন তাদের শত্রু হয়ে গিয়েছি।
আবার একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো, এবারে স্কাউটশিপের ভেতরে কিছু ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে। এক কোনা থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে কালো ধোঁয়া উঠতে থাকে। য়ুহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, সর্বনাশ! আমরা এখন কী করব?
সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হতো যদি আমরা কিছু না করতাম।
কিন্তু তাহলে আমাদের মেরে ফেলবে না?
মেরে ফেলার কথা না। আমি যদি আরেকটি বুদ্ধিমান প্রাণী পেতাম তাহলে কখনোই রাগ হয়ে তাকে মেরে ফেলতাম না। আমি মৃত অবস্থায় যেটুকু গুরুত্বপূর্ণ বেঁচে থাকা অবস্থায় তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ
রায়ীনার কথার মাঝখানে ঠিক মাথার ওপর একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো এবং সেখান থেকে কিছু যন্ত্রপাতি ভেঙেচুরে নিচে এসে পড়ল। য়ুহা শুকনো গলায় বলল, রায়ীনা, কিছু একটা কর।
রায়ীনা স্কাউটশিপের নিচে গুড়ি মেরে বসে বলল, আমি একটা জিনিস ভাবছি।
য়ুহা একটু অস্থির হয়ে বলল, ভাবাভাবির অনেক সময় পাবে। এখন কিছু একটা কারো। গুলি শুরু কর! মৃত মানুষকে তো আর দ্বিতীয়বার মারা যায় না। তোমার ভয়টা কীসের?
গুলি করা থেকে ভালো কিছু করা যায় কী না ভাবছি।
সেটা কী?
গুলি করা মানেই শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। তা ছাড়া গুলি করা মানে ধ্বংস করা
কাছাকাছি আরেকটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো এবং স্কাউটশিপের একটা বড় অংশ হুঁড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। য়ুহা ক্রুদ্ধ গলায় বলল, তারা আমাদের ধ্বংস করলে কোনো দোষ নেই, আমরা করলেই দোষ?
যুক্তিতর্কের সময় এটা না— রায়ীনা নিচু গলায় বলল, আমাদের খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা করতে হবে।
কী করবে?
যেহেতু আমরা দেখছি বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ দিয়ে এরা যোগাযোগ করছে, তাই আমরা ইচ্ছে করলে তাদের সমস্ত সিগন্যাল জ্যাম করে দিয়ে তাদেরকে অচল করে রাখতে পারি।
সেটা কেমন করে করবে?
রায়ীনা হাত দিয়ে স্কাউটশিপের যোগাযোগ মডিউলটা দেখিয়ে বলল, এই যোগাযোগ মডিউলটা দেখেছো?
হ্যাঁ, দেখেছি।
এটা থেকে খুব শক্তিশালী সিগন্যাল বের হয়। মহাকাশযান থেকে মহাকাশযানে এই সিগন্যাল পাঠানো হয়। আমরা তাদের ফ্রিকোয়েন্সিতে আমাদের সিগন্যাল পাঠাব, সবকিছু জ্যাম হয়ে যাবে!
য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি পারবে?
গুলি করে যোগাযোগ মডিউলটাই যদি উড়িয়ে না দেয় তাহলে পারার কথা?
তাহলে দেরি করো না। শুরু করে দাও।
একটু সময় দাও-ওটা খুলে আনি।
য়ুহা অধৈৰ্য্য গলায় বলল, কেন? খুলে আনতে হবে কেন?
আমার মাথায় অন্য একটা বুদ্ধি এসেছে!
কিন্তু তোমার বুদ্ধি কাজে লাগানোর আগেই আমরা মরে ভূত হয়ে যাব।
না। এত সহজে আমরা মরে ভূত হয়ে যাব না! এই প্রাণীগুলো আমাদের দিকে গুলি করতে পারে কিন্তু আমাদের মারবে না।
রায়ীনা গুড়ি মেরে স্কাউটশিপের কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে গিয়ে টেনেহিঁচড়ে যোগাযোগ মডিউলটা খুলে আনে। আবার গুড়ি মেরে য়ুহার কাছে এসে যোগাযোগ মডিউলের কন্ট্রোল বোতামটি চেপে ধরে বলল, আগে দেখে নিই কোন ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করছে।
রায়ীনা সঠিক ফ্রিকোয়েন্সি বের করে সেখানে তীব্র কিন্তু অর্থহীন সিগন্যাল পাঠাতেই হঠাৎ করে বাইরের গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। য়ুহা সাবধানে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল স্কাউটশিপ ঘিরে ইতস্তত কিছু প্রাণী নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলো হঠাৎ করে আবার নড়ে উঠবে না ব্যাপারটা নিশ্চিত হবার পর য়ুহা আবার রায়ীনার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আসলেই অসাধারণ রায়ীনা!
এর মাঝে অসাধারণের কিছু নেই। রায়ীনা একটু হেসে বলল, আমি যেটা করেছি সেটা হচ্ছে একেবারে প্রাগৈতিহাসিক একটা ব্যাপার। এই প্রাগৈতিহাসিক উপায়ে আমি যে এটা করতে পেরেছি সেটাই হচ্ছে রহস্য!
য়ুহা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, আমরা এখন কী করব?
স্কাউটশিপের ভেতরে থাকাটা বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে! যে কোনো মুহূর্তে নতুন একটা ফ্রিকোয়েন্সিতে সিগন্যাল আসতে পারে। ফ্রিকোয়েন্সিটা এমনভাবে অদলবদল করতে পারে যে আমরা হয়তো আর তাল রাখতে পারব না। এই প্রাণী বল, মানুষ বল, মৃতদেহ বল–তারা নতুন করে আক্রমণ শুরু করতে পারে। বসে বসে গুলি খাওয়ার কোনো অর্থ নেই আমাদের বের হয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ঠিকই বলেছ।
সাথে যোগাযোগ মডিউলটা রাখি—আবার কাজে দেবে।
একেবারে ম্যাজিকের মতো কাজে দেবে।
রায়ীনা বলল, প্রয়োজন না হলে আমি এই প্রাণীগুলোর শত্রু হতে চাই। আমি শত্রু হয়ে দেখেছি। খুব কষ্ট।
য়ুহা কোনো কথা না বলে রায়ীনার মুখের দিকে তাকালো। কমবয়সী একটা মেয়ে কিন্তু এর ভেতরেই তার জীবনে কত কিছু ঘটে গেছে।
স্কাউটশিপকে ঘিরে থাকা প্রাণীগুলোকে দেখে য়ুহা এবং রায়ীনা হতবাক হয়ে গেল–এগুলো মানুষেরই দেহ কিন্তু কোনোটাই পূর্ণাঙ্গ নয়। কারো হাত নেই, কারো পা নেই–কারো বুকের ভেতর বিশাল একটা গর্ত। দুটি মানুষের মাথারই অস্তিত্ব নেই। শুধু ধড়টি দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজনের মুখমণ্ডলের খানিকটা অংশ উড়ে গেছে, চোখের জায়গায় খালি কুটুরী। দেখে মনে হয় এই মূর্তিগুলোকে বুঝি সরাসরি নরক থেকে তুলে আনা হয়েছে।
য়ুহা বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, রায়ীনা, এখান থেকে চল। এই মূর্তিগুলো যদি হঠাৎ করে জীবন্ত হয়ে যায় তাহলে সেই দৃশ্যটা আমি সহ্য করতে পারব না।
রায়ীনা মাথা নাড়ল, ঠিকই বলেছ, আমিও পারব না।
সরাসরি নরক থেকে উঠে আসা কিছু দেহাবশেষকে স্থির অবস্থায় রেখে য়ুহা আর রাহীন সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
য়ুহা জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন কোথায়?
মনে আছে এই গ্রহ থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর একটা সিগন্যাল বের হচ্ছে?
হ্যাঁ, তুমি বলেছিলে।
আমরা গিয়ে দেখতে পারি সেটা কী রকম। কেন বের হচ্ছে, কীভাবে বের হচ্ছে।
কোনো বিপদ হবে না তো?
বিপদ তো হতেই পারে–রায়ীনা হাসার চেষ্টা করে বলল, কিন্তু বিপদ দেখে তুমি পিছিয়ে আস সে রকম কোনো প্রমাণ তো আমি পাইনি!
য়ুহা শব্দ করে হেসে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ! আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না—কিছুদিন আগেও আমি কখনো চিন্তা করিনি শব্দের পেছনে শব্দ বসিয়ে কবিতা লেখা ছাড়া আমি আর কিছু করতে পারি। কিন্তু দেখো আমি কত কী করেছি।
রায়ীনা নরম গলায় বলল, তুমি আর কী কী করেছ আমি জানি —কিন্তু তুমি আমাকে একটা নতুন জীবন দিয়েছ। যদি সবকিছু ঠিক করে শেষ হয় আর আমি সত্যি সত্যি নিজের জীবনে ফিরে যেতে পারি সেটা হবে তোমার জন্যে। শুধুমাত্র তোমার জন্যে।
আমি এমন কিছুই করিনি।
আর আমরা যদি এই গ্রহ থেকে বের হতে না পারি, এখানে মারা পড়ি, এই গ্রহের কোনো একটা ভয়ঙ্কর প্রাণী আমাদের মৃতদেহটাকে ব্যবহার করে উৎকট নাটক করে তাহলে—
তাহলে কী?
তাহলে তুমি কিছু মনে করো না। তোমার সাথে আমি খুব কম সময় কাটিয়েছি, কিন্তু সময়টা ছিল চমৎকার!
তোমাকে ধন্যবাদ রায়ীনা।
মহাকাশের পোশাকের ভেতর থেকে একজন আরেকজনকে স্পর্শ করতে পারবে না জেনেও, য়ুহা হাত দিয়ে রায়ীনার কাধ স্পর্শ করল।
গ্রহটার পাথরের ভেতর দিয়ে দুজনে নিঃশব্দে হাঁটতে থাকে। ছোট-বড় পাথর ছড়িয়ে আছে, উঁচু-নিচু পথ। পাথর থেকে এক ধরনের ঘোলাটে আলো বের হচ্ছে, কোথাও নিষ্প্রভ, কোথাও বেশ আলো। মাঝে মাঝে বিশাল খাদ, তার গভীরে কী আছে বাইরে থেকে বোঝা যায় না, জেট প্যাক ব্যবহার করে তারা সেই জায়গাগুলো উড়ে পার হয়ে যায়। জেট প্যাকের জ্বালানি খুব সীমিত, তাই সেগুলো তারা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, খুব বেশি প্রয়োজন না হলে তারা জেট প্যাক ব্যবহার করছে না। সত্যিকারের বড় কোনো বিপদে হয়তো এই জেট প্যাক ব্যবহার করেই তারা নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করবে। য়ুহা আগে কখনো জেট প্যাক ব্যবহার করেনি, রায়ীনা তাই তাকে ছোটখাটো নিয়মগুলো শিখিয়ে দিচ্ছে। অজানা অন্ধকার একটা কুৎসিত গ্রহে নিজের জীবন হাতে নিয়ে যদি এই জেট প্যাক ব্যবহার করতে না হতো তাহলে য়ুহা এই পুরো প্রক্রিয়াটা রীতিমতো উপভোগ করতে পারত।
হেঁটে হেঁটে তারা যখন ক্লান্তির একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছেছে তখন তারা দূরে একটা বিধ্বস্ত মহাকাশযান দেখতে পেল। মহাকাশযানের আকারটি দেখেই রায়ীনা বুঝতে পারে এটি ক্যাটাগরি তিন মহাকাশযান। আন্তঃগ্যালাক্টিক অভিযানে এগুলো ব্যবহার করা হয়, এই মহাকাশযানটি প্রায় একটা শহরের মতো এখানে কয়েকশ মহাকাশচারী থাকে। এই বীভৎস গ্রহে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এই মহাকাশযানটি দেখে মনে হয় এটি বুঝি কোনো একটি পরাবাস্তব জগতের দৃশ্য।
মহাকাশযানের কাছাকাছি এসে য়ুহা আর রায়ীনা বড় বড় কয়টা পাথরের আড়ালে নিজেদের আড়াল করে লুকিয়ে রইল। ভেতরে কী আছে তারা জানে না, হঠাৎ করে ভেতরে ঢুকে তারা বিপদে পড়তে চায় না, বাইরে থেকে আগে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে চায়। বেশ অনেকক্ষণ নিঃশব্দে বসে থেকেও তারা মহাকাশযানের ভেতর যখন কোনো কিছু ঘটতে দেখল না, তখন তারা মহাকাশযানের ফাটল দিয়ে খুব সাবধানে ভেতরে ঢুকে গেল।
ভেতরে বেশ অন্ধকার, হেলমেটের নিয়ন্ত্রণ বোতাম স্পর্শ করে চশমার কার্যকারিতা দশ ডিবি বাড়িয়ে নেয়ার পর মহাকাশযানের ভেতরটুকু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভেতরের দৃশ্য দেখে তারা দুজনেই একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে যে রকম অনুমান করেছিল–মহাকাশযানটি ঠিক সে রকম বিধ্বস্ত। যন্ত্রপাতি ভেঙে পড়ে আছে, দেয়ালে বড় বড় ফাটল, প্রচণ্ড উত্তাপে নানা অংশ গলে পুড়ে কদাকার হয়ে আছে—কিন্তু তাদের সেই দৃশ্যগুলো বিচলিত করেনি। তাদেরকে বিচলিত করেছে মহাকাশচারীদের মৃতদেহগুলো। মহাকাশযানের এখানে-সেখানে সেগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সবগুলো যে নিচে পড়ে আছে তা নয়, কোনো কোনোটা উবু হয়ে বসে আছে এমন কী কোনো কোনোটা বিচিত্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, এটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না।
রায়ীনা জানতে চাইল, কোনটা তোমার একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না?
এই যে মৃতদেহগুলো দাঁড়িয়ে আছে, বসে আছে। এগুলো আমার একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না। প্রথমত মৃতদেহ কেন আমাদের চোখের সামনে থাকবে? আর থাকতেই যদি হয় তাহলে কেন দাঁড়িয়ে থাকবে?
রায়ীনা বলল, আমার কী মনে হয় জান?
কী?
এই মৃতদেহগুলো আসলে কাজকর্ম করছিল। ছোটাছুটি করছিল। হঠাৎ করে যে যেভাবে ছিল সেভাবে থেমে গেছে। সেজন্যে মনে হচ্ছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ বসে আছে।
য়ুহা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ করে থেমে গেল কেন?
জানি না। রায়ীনা মাথা নাড়ে, মনে হয় আমাদের জন্যে। আমরা মহাকাশযানের ভেতর ঢুকেছি সে জন্যে সবকিছু থামিয়ে দিয়েছে। মনে হয় বোঝার চেষ্টা করছে আমাদের মতলবটা কী!
তার মানে মহাকাশের প্রাণীগুলো আমাদের দেখছে?
নিশ্চয়ই দেখছে, আমাদের কি লুকিয়ে থাকা সম্ভব।
যদি আমাদের দেখছে তাহলে ধরার জন্যে ছুটে আসছে না কেন?
দুটি কারণ হতে পারে, এক: ছুটে আসবে, এক্ষুণি সবাই ছুটে আসবে। দুই: ছুটে আসার প্রয়োজন নেই। কারণ ছুটে গিয়ে আমাদের ধরে যেখানে আনার কথা আমরা সেখানেই বসে আছি!
সর্বনাশ! য়ুহা বলল, তুমি না বলছিলে, আসলে এখানে কোনো মহাজাগতিক প্রাণী নেই। পুরোটাই হচ্ছে কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক।
হ্যাঁ। আমার এখনো তা-ই মনে হয়। আমাদের জন্যে সেটা নিরাপদ। আমরা তাহলে আমাদের পরিচিত যন্ত্রপাতি, পরিচিত অস্ত্রপাতি, পরিচিত প্রযুক্তি দিয়েই নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারব।
রায়ীনার কথা শেষ হওয়া মাত্রই হঠাৎ মহাকাশযানটা একটু দুলে ওঠে, সাথে সাথে অত্যন্ত বিচিত্র একটা ঘটনা ঘটল। মহাকাশযানের নানা জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সবগুলো মৃতদেহ একসাথে নড়তে শুরু করল। দাঁড়িয়ে থাকা মৃতদেহগুলো সামনে ঝুঁকে পড়ে পা ঘষে ঘষে হাঁটতে থাকে। বসে থাকা মৃতদেহগুলো বসে থাকা অবস্থাতেই নিজেকে ঘষে ঘষে টেনে নিতে থাকে। কিছু মৃতদেহ হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যায়। অনেকগুলো বুকে ঘষে ঘষে এগুতে থাকে। তারা হাতে ছোটখাটো যন্ত্রপাতি টেনে নিতে থাকে, সেগুলো এখানে-সেখানে বসাতে থাকে, যন্ত্রগুলো টানাটানি করতে থাকে–সব মিলিয়ে অন্ধকার মহাকাশযানের ভেতরে অত্যন্ত কর্মব্যস্ততার একটা দৃশ্য ফুটে ওঠে, কিন্তু সেই দৃশ্যটি এত অবাস্তব, এত অবিশ্বাস্য যে য়ুহা এবং রায়ীনা দুজনেই হতবাক হয়ে যায়।
য়ুহা বলল, আমার দেখতে ভালো লাগছে না।
রায়ীনা বলল, আমারও ভালো লাগছে না।
চল, বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করি।
হ্যাঁ। আমার হিসেব যদি ঠিক হয়ে থাকে তাহলে আর কিছুক্ষণের মাঝেই আমাদের উদ্ধার করতে কেউ না কেউ চলে আসবে!
যদি না আসে?
আসবে। আমার দলের লোকগুলো অসাধারণ। রায়ীনা মহাকাশযান থেকে বের হওয়ার জন্যে ঘুরে গিয়ে বলল, একটু পরে তুমি নিজেই দেখবে।
মহাকাশযানের ভেতর থেকে বের হতে গিয়ে রায়ীনা থমকে দাঁড়াল এবং তার সাথে য়ুহাও থেমে গিয়ে একটা চাপা আর্তনাদের মতো শব্দ করল। মহাকাশযানের যে বিশাল ফাটল দিয়ে তারা ঢুকেছিল, সেই ফাটল দিয়েই তারা বের হয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু সেদিক দিয়ে একজন-দুজন নয় অসংখ্য মৃত মানুষ বিচিত্র ভঙ্গিতে দেহটাকে টেনে টেনে এসে হাজির হচ্ছে।
য়ুহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, এরা কী চায়?
এখানে আসছে কেন? রায়ী নিচু গলায় বলল, জানি না।
মৃতদেহগুলো গাদাগাদি করে তাদের দিকে এগিয়ে হাসতে থাকে, য়ুহা তখন চিল্কার করে বলল, কী চাও তোমরা? সরে যাও সামনে থেকে।
দেহগুলো সরে যাবার কোনো লক্ষণ দেখলি না, বরং গাদাগাদি করে তারা আরও এক পা এগিয়ে এলো। মৃতদেগুলো প্রাণহীন চোখ দিয়ে তাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে য়ুহার বুক কেঁপে ওঠে। সে ভয় পাওয়া গলায় অস্ত্র উঁচিয়ে বলল, সরে যাও বলছি, তা না হলে কিন্তু গুলি করে দেব।
প্রাণীগুলো সরে গেল না বরং আরো এক পা এগিয়ে এলো–এত কাছে। যে তারা ইচ্ছে করলে এখন এই য়ুহা আর রায়ীনাকে স্পর্শ করতে পারে। য়ুহা অস্ত্রটা ঝাকুনি দিয়ে বলল, গুলি করে দেব, দেব গুলি করে–
প্রাণীগুলো আরো এক পা এগিয়ে এলো–য়ুহা তখন ট্রিগার টেনে ধরে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মৃতদেহগুলোর হাত পা মাথা উড়ে যায়, ঠিক সেই অবস্থায় মৃতদেহগুলো আরো এক পা এগিয়ে এলো। রায়ীনা হাত দিয়ে য়ুহার হাত ধরে বলল, শুধু শুধু গুলি করে লাভ নেই। মৃত মানুষকে মারা যায় না—
কিন্তু—
কোনো কিন্তু নেই। পেছনে সরে যাও।
য়ুহা আর রায়ীনা পেছনে সরে এলো। মৃতদেহগুলো তখন আরো একটু এগিয়ে আসে, এভাবে তাদের দুজনকে ঠেলে ঠেলে মৃতদেহগুলো তাদের একটা অন্ধকার গহ্বরের কাছে নিয়ে আসে। মৃতদেহগুলো তখন চারপাশ থেকে ঘিরে তাদের দুজনকে গহ্বারের মাঝে ঠেলে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করল। য়ুহা আর রায়ীনা আতঙ্কিত হয়ে হাতের অস্ত্র দিয়ে গুলি করে প্রাণীগুলোকে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মৃতদেহগুলো ঠেলে ঠেলে তাদের গহ্বরের মাঝে ফেলে দেয়। হা আর রায়ীনা অন্ধকার ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাবার শেষ মুহূর্তে বাইরে তাকিয়ে দেখে, যে প্রাণীগুলো এতক্ষণ তাদেরকে ঠেলে ঠেলে এনে গহ্বরের মাঝে ফেলে দিয়েছে হঠাৎ করে সেগুলো মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেছে। কেউ আর এতটুকু নড়ছে না, হাত পা মাথাহীন ভয়ঙ্কর দেহগুলো যেটা যেখানে ছিল ঠিক সেখানে স্থির হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে তারা তাদের দায়িতু পালন করেছে। এখন আর তাদের কিছুই করার নেই।
পিচ্ছিল আঠালো চটচটে এক ধরনের তরলের ভেতর দিয়ে দুজনে গড়িয়ে গড়িয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় হাজির হলো। জায়গাটি বিচিত্র। এটি আশ্চর্য রকম সমতল এবং চারপাশের দেয়ালগুলো দেখলে প্রাগৈতিহাসিক কারুকাজের কথা মনে পড়ে। য়ুহা এবং রায়ীনা উঠে দাঁড়াল, চটচটে আঠালো তরলে তারা মাখামাখি হয়ে আছে। য়হা ভয় পাওয়া গলায় বলল, আমরা কোথায়?
রায়ীনা বলল, তুমি শুনে বিশ্বাস করবে কী না জানি না, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমরা কোনো একটা প্রাণীর পেটের ভেতরে হাজির হয়েছি!
পেটের ভেতরে?
হ্যাঁ।
য়ুহা ভয়ে ভয়ে চারদিকে তাকালো, চারপাশের অংশটুকুর তার পরিচিত কোনে কিছুর সাথে কোনো মিল নেই। সে তার জীবনে এ রকম বিচিত্র কিছু দেখেনি। রায়ীনা নিচু গলায় বলল, তুমি দেয়ালগুলো দেখো–কিছুক্ষণ থেকেই হেডফোনে একটা খসখসে চাপা শব্দ আসছিল য়ুহা তাই ভালো করে কথা শুনতে পেল না, সে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী বলেছ?
তুমি দেয়ালগুলো দেখ–সেগুলো নড়ছে।
য়ুহা চারপাশের দেয়ালগুলোর দিকে তাকালো, সেগুলো শুধু নড়ছে না ধীরে ধীরে সেগুলোর আকার পাল্টে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে সেখানে ছোট ছোট অসংখ্য বিন্দু বড় হতে শুরু করছে। য়ুহা তার অস্ত্রটি হাতে নিয়ে বলল, এটা জীবন্ত?
রায়ীনার হেডফোনেও একটা কর্কশ শব্দ, সে তার মাঝে চিৎকার করে বলল, হ্যাঁ, মনে হয় এটা জীবন্ত।
রায়ীনার কথা শেষ হবার সাথে সাথে য়ুহা তার হেডফোনে একটা যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পেল, য়ুহা কথাটা পরিষ্কার বুঝতে পারল না, রায়ীনাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী বলেছ?
আবার প্রতিধ্বনির মতো একটা শব্দ হলো, তার ভেতরে রায়ীনা বলল, আমি কিছু বলিনি।
তাহলে কে বলেছে?
আবার ভোঁতা একটা শব্দ হলো। রায়ীনা চারদিক ঘুরে তাকালো, বলল, অন্য কেউ বলছে।
অন্য কেউ?
হ্যাঁ।
কী বলছে?
বুঝতে পারছি না।
রায়ীনার কথা শেষ হবার আগেই খসখসে একটা শব্দ শোনা গেল, বুঝি বুঝি বুঝি…
য়ুহা চমকে ওঠে, কে কথা বলে?
প্রতিধ্বনির মতো একটা গমগমে আওয়াজ আসে, কে? কে? কে?
রায়ীনা নিচু গলায় বলল, কেউ একজন আমাদের সাথে কথা বলতে চাইছে।
য়ুহা বলল, কী বলছে?
দুর্বোধ্য কিছু শব্দ শুনতে পেল তারা, সেই অর্থহীন শব্দগুলোর মাঝে শুধু মানুষ শব্দটা তারা বুঝতে পারে। য়ুহা বলল, হ্যাঁ। আমরা মানুষ। তোমরা কারা?
মানুষ প্রতিধ্বনির মতো আবার শব্দ হয় মানুষ! সত্যি মানুষ! জীবন্ত মানুষ! মানুষ!
হ্যাঁ। আমরা জীবন্ত মানুষ। তোমরা কারা?
আমরা? আমরা? মানুষ না। মানুষ না। তোমরা মানুষ। আমরা মানুষ।
আবার দুর্বোধ্য কিছু শব্দ শুনল, দ্রুত বিজাতীয় এক ধরনের ভাষার কথা বলতে থাকে তার মাঝে বুদ্ধিমত্তা, চেতনা, অনুভূতি এ রকম কয়েকটা শব্দ তারা বুঝতে পারল। রায়ীনা চারদিকে চোখ বুলাতে বুলাতে বলল, আমরা তোমাকে দেখতে চাই।
দেখতে চাও? দেখতে চাও?
হ্যাঁ।
এই তো আমি। আমি।
তুমি কি একা?
একা। আমি একা। আমি এক এবং একা।
এই গ্রহে তুমি একা?
আমি একা। আমি সব। আমি সব।
তুমি কি এই মহাকাশযানগুলো ধ্বংস করেছ?
ধ্বংস? ধ্বংস?
হ্যাঁ। এই বিধ্বস্ত মহাকাশযানটা কি তুমি ধ্বংস করেছ?
না। আমি করি নাই।
য়ুহা লক্ষ করল দুর্বোধ্য একটা দুটো শব্দ দিয়ে কথা শুরু করলেও খুব দ্রুত এই প্রাণীটি অর্থবহ কথা বলতে শুরু করেছে। য়ুহা জিজ্ঞেস করল, তুমি কী চাও?
আমি মানুষ বুঝতে চাই। গমগমে এক ধরনের কণ্ঠস্বরে মহাকাশের প্রাণীটি বলে, বিধ্বস্ত মহাকাশযানে কোনো জীবন্ত মানুষ নাই। আমি জীবন্ত মানুষ বুঝতে চাই।
য়ুহা বলল, আমরা জীবন্ত মানুষ।
আমি বুঝতে চাই।
রায়ীনা বলল, আমরাও তোমাকে বুঝতে চাই। তুমি কেমন করে দেখ কেমন কথা বল আমরা বুঝতে চাই। তোমরা কেমন করে চিন্তা কর বুঝতে চাই।
তোমরা আলাদা। তোমাদের কথা আলাদা। চিন্তা আলাদা। আমি এক। আমি একা।
তুমি কেমন করে কথা বল? দেখ? শোন? স্পর্শ কর?
আমি কথা বলি না। দেখি না। শুনি না। স্পর্শ করি না। আমি এক। আমি একক।
রায়ীনা গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি চিন্তা কর?
আমি চিন্তা করি।
তুমি কীভাবে চিন্তা কর?
তোমরা যেভাবে চিন্তা কর আমি সেভাবে চিন্তা করি। তোমাদের সবার আলাদা আলাদা মস্তিষ্ক। আমার একটা মস্তিষ্ক।
কোথায় তোমার মস্তিষ্ক? দেখতে চাই।
এই গ্রহের ভেতরে বিশাল মস্তিষ্ক।
গ্রহের ভেতরে?
হ্যাঁ, এই গ্রহের ভেতরে বিশাল জায়গা জুড়ে আমার মস্তিষ্ক। আমার সেই মস্তিষ্ক আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে।
আমরা যে রকম হাঁটতে পারি। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারি তুমি সেটা পার না?
না। আমার তার প্রয়োজন হয় না। আমার যেটা দরকার আমি সেটা আমার নিজের কাছে নিয়ে আসি।
রায়ীনা নিঃশ্বাস বন্ধ করে বলল, আমাদেরকে যেভাবে এনেছ?
হ্যাঁ। তোমাদেরকে যেভাবে এনেছি।
কেন এনেছ আমাদের।
আমি আগে শুধু মৃত মানুষ দেখেছি। শুধু মৃত মানুষ নিয়ে কাজ করেছি। আমি জীবন্ত মানুষ দেখতে চাই, তারা কেমন করে কাজ করে বুঝতে চাই।
তুমি কী বুঝতে পেরেছ?
আমি তাদের আরো গভীরভাবে দেখতে চাই। আরো গভীরভাবে বুঝতে চাই। আরো নিবিড়ভাবে দেখতে চাই, শরীরের প্রত্যেকটা কোষ দেখতে চাই, মস্তিষ্কের প্রত্যেকটা নিউরন দেখতে চাই
য়ুহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, কীভাবে দেখবে তুমি?
খুলে খুলে।
না য়ুহা চিৎকার করে বলল, আমি দেব না। কিছুতেই দেব না।
দেব না?
না। আমাদের ছেড়ে দাও। যেতে দাও।
য়ুহা অবাক হয়ে দেখে তাদের চারপাশের দেয়ালগুলো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। একটু আগে সেগুলো প্রায় মসৃণ ছিল, এখন সেগুলো অসমান, কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। গোলাকার অংশ ফুলে ফুলে বের হয় আসছে। তার চারপাশে শুড়ের মতো অংশ কিলবিল করতে করতে নড়ছে। য়ুহা চারদিকে তাকিয়ে খপ করে অস্ত্রটা তুলে নেয়, সাথে সাথে শুড়ের মতো একটা অংশ তাকে জড়িয়ে ধরে ফেলে। য়ুহা ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে, পারে না। সে রায়ীনার দিকে তাকালো, বেশ কয়েকটা শুড়ের মতো জিনিস তাকেও জাপটে ধরেছে, রায়ীনা প্রাণপণ চেষ্টা করছে মুক্ত হবার জন্যে কিন্তু মুক্ত হতে পারছে না। গোলাকার জিনিসগুলো তাদের কাছাকাছি এগিয়ে আসছে, য়ুহা তখন সেগুলোকে চিনতে পারে। গোলাকার জিনিসগুলো এক ধরনের চোখ, একটি দুটি নয় অসংখ্য চোখ তাদের দেখছে। গভীরভাবে দেখছে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
পেঁচিয়ে থাকা শুড়গুলো য়ুহাকে জাপটে ধরে ওলট পালট করে, কানের ভেতর ভেঁতা একটা যান্ত্রিক শব্দ, চোখের সামনে একটা লাল পর্দা ঝুলছে। মাথার ভেতরে একটা দপদপে যন্ত্রণা, মনে হচ্ছে পুরো মস্তিষ্কটা বুঝি ফেটে বের হয়ে যাবে। সে মাথা ঘুরিয়ে রায়ীনাকে দেখার চেষ্টা করল। কিলবিলে শুড় আর ছোট-বড় অসংখ্য চোখের আড়ালে সে ঢাকা পড়ে গেছে। সামনে কিছু একটা খুলে যায়, বিশাল এলাকা জুড়ে কিছু একটা থলথল করছে, নড়ছে, মাঝে মাঝে বুদবুদের মতো কিছু একটা বের হয়ে আসছে। শুড়ের মতো কিছু বের হয়ে আসছে, আবার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। অহা টের পেল তাকে সেখানে ফেলে দেয়া হলো, থলথলে আঠালো একটা ঘন তরলের মাঝে সে ড়ুবে যাচ্ছে, অসংখ্য নল তাকে পেচিয়ে ধরেছে, তাকে দেখছে, নাড়ছে। য়ুহা পরিষ্কার করে কিছু চিন্তা করতে পারছিল না। ভয়ঙ্কর আতঙ্কে সে চিৎকার করে ওঠে, রায়ীনা–রায়ীনা-
কেউ তার কথার উত্তর দিল না।
য়ুহা। য়ুহা–
য়ুহা চোখ খুলে তাকালো। কেউ একজন তাকে ডাকছে, ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছিল তার মাঝে সে কোনোভাবে চোখ খুলে তাকালো। বিড়বিড় করে বলল, আমরা কি বেঁচে আছি না মরে গেছি?
বেঁচে আছি।
তাহলে এ রকম লাগছে কেন?
কী রকম লাগছে?
মনে হচ্ছে মরে গেছি!
মনে হয় আমরা মরেই গিয়েছিলাম, আবার বেঁচে গেছি।
য়ুহা উঠে বসে, সমতল একটা জায়গায় বসে আছে–চারপাশে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মতো বিচিত্র নক্সা। য়ুহা চারদিকে তাকিয়ে বলল, আমরা কোথায়?
জানি না।
আমরা কী যেতে পারব?
সেটাও জানি না। প্রাণীটা আর কোনো কথা বলছে না।
য়ুহা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে চারদিকে তাকায়, ঠিক কী কারণ জানা নেই সে নিজের ভেতরে এক ধরনের বিষঃ বেদনা অনুভব করে, মনে হয় কিছু একটা ঘটে গেছে, যেটা সে বুঝতে পারছে না।
রায়ীনা বলল, আমাদের এখন বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করা দরকার।
প্রাণীটা যেতে দেবে?
কেন দেবে না? আমাদের শরীরের প্রত্যেকটা কোষ খুলে খুলে তার যেটা জানা দরকার জেনে গেছে। আমাদের সবকিছু সে জানে।
সবকিছু?
হ্যাঁ। সবকিছু। আমরা কী চিন্তা করি, কী ভাবি সব কিছু।
য়ুহা ক্লান্ত গলায় বলল, ব্যাপারটা চিন্তা করেই আমার শরীরটা কেমন যেন গুলিয়ে আসছে।
রায়ীনা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এসব নিয়ে ভাবার অনেক সময় পাওয়া যাবে। এখন চল, দেখি এখান থেকে বের হওয়া যায় কি না। আমার হিসেব অনুযায়ী আমার খোজে আমার দলের লোকজনের এতক্ষণে চলে আসার কথা।
য়ুহা আর রায়ীনা অস্ত্র হাতে সতর্ক পায়ে এগুতে থাকে। কেউ তাদেরকে বাধা দিল না-কেন বাধা দিল না সেই ভাবনাটি তাদের ভেতরে খচখচ করতে থাকে। তাহলে কি এমন কিছু ঘটেছে যেটা তারা জানে না?
বিধ্বস্ত মহাকাশযান থেকে বের হয়েই তারা স্কাউটশিপটা দেখতে পায়। মহাকাশযানের কাছাকাছি একটা বড় পাথরের ওপর একটা অতিকায় গুবরে পোকার মতো সেটা বসে আছে। রায়ীনা হাসিমুখে য়ুহার দিকে তাকিয়ে বলল, দেখেছো? আমি বলেছি না? আমার খোঁজে আমার লোকজন চলে আসবে?
য়ুহা বলল, তোমাকে যতই দেখছি আমি ততই মুগ্ধ হচ্ছি!
মুগ্ধ হওয়ার অনেক সময় পাওয়া যাবে, এখন চল। তাড়াতাড়ি।
য়ুহা রায়ীনায় পিছু পিছু দ্রুত হাঁটতে থাকে। রায়ীনা বলল, আমি বুঝতে পারছি না আমার দলের লোকজন স্কাউটশিপের ভেতর বসে আছে কেন? তারা আমাদের খুঁজছে না কেন?
হয়তো খুঁজেছে।
আমি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না কেন?
সেটা বুঝতে পারছি না। চেষ্টা করেছ?
হ্যাঁ করেছি।
হঠাৎ তারা একটা বিচিত্র ব্যাপার দেখতে পায়। স্কাউটশিপটা গর্জন করে উঠে থরথর করে কাঁপতে থাকে। দেখে মনে হয় উড়ে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। য়ুহা চমকে উঠে বলল, রায়ীনা! স্কাউটশিপটা কি চলে যাচ্ছে?
অসম্ভব! আমাদের না নিয়ে কিছুতেই যাবে না!
হয়তো অনেক খুঁজেছে। খুঁজে না পেয়ে চলে যাচ্ছে।
হতেই পারে না। আমাকে না নিয়ে যাবে না–
রায়ীনা পাথরের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে স্কাউটশিপের কাছে হাজির হয়, তখন সেটা নড়তে শুরু করেছে। রায়ীনা ইঞ্জিনের একটা অংশ ধরে জানালায় মুখ রাখে এবং মুহূর্তে তার মুখমণ্ডল রক্তহীন হয়ে যায়। য়ুহা জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে রায়ীনা? কী হয়েছে?
রায়ীনা কোনো কথা না বলে শূন্য দৃষ্টিতে য়ুহার দিকে তাকিয়ে রইল।
য়ুহা আবার জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
রায়ীনা এবারেও তার প্রশ্নের উত্তর দিল না, শূন্য দৃষ্টিতে য়ুহার দিকে তাকিয়ে রইল। য়ুহা এগিয়ে গিয়ে রায়ীনাকে সরিয়ে জানালায় মুখ রেখে ভেতরে তাকালো, স্কাউটশিপে অনেকেই আছে, সবার সামনে দুজনতাদেরকে সে স্পষ্ট চিনতে পারল, একজন রায়ীনা, অন্যজন য়ুহা।
য়ুহা বিস্ফারিত চোখে রায়ীনার দিকে তাকালো, কঁপা গলায় বলল, ওরা কারা?
আমি আর তুমি।
আমরা কারা?
আমি জানি না।
য়ুহা আর রায়ীনা বিধ্বস্ত মহাকাশের পাশে দাঁড়িয়ে দেখল স্কাউটশিপটি গর্জন করে উপরে উঠে পেছনে তীব্র লাল আলোর একটা জ্বলন্ত শিখা বের করে উড়ে গেল, যতক্ষণ সেটা মিলিয়ে না গেল তারা দুজন সেদিকে তাকিয়ে রইল। যখন সেটা ছোট একটা আলোর বিন্দু হয়ে মিলিয়ে গেল তখন য়ুহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এমন কী হতে পারে যে আমি আর তুমি আসল য়ুহা আর আসল রায়ীনা। আমাদেরকেই রেখে আমাদের অন্য দুজনকে নিয়ে গেছে?
রায়ীনা য়ুহার দিকে তাকালো, বলল, তুমিই বল? তুমি কি সত্যিকার য়ুহা?
য়ুহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, না, আমি আসল য়ুহা না।
কেন?
আসল য়ুহা একজন কবি। সে শব্দের পাশে শব্দ বসিয়ে কবিতা লিখতে পারত। আমি পারি না। চেষ্টা করে দেখেছি আমি শব্দের পাশে শব্দ আর বসাতে পারি না।
রায়ীনা মাথা নাড়ল, বলল, আসল রায়ীনা মানুষের বুদ্ধিমত্তার ওপর গবেষণা করত। কুরিত্রা সমীকরণের সহগগুলো সে মনে মনে হিসাব করে বের করতে পারত। আমি পারি না।
য়ুহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমাদের মতো দুঃখী আর কেউ নেই। তাই না রায়ীনা?
রায়ীনা মাথা নাড়ল। য়ুহা জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন কী করব রায়ীনা।
মহাকাশের এই প্রাণীটা যেন আমাদের মতো কাউকে নিয়ে এ রকম নিষ্ঠুরত্ত করতে না পারে সেটা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। মহাকাশযানটি এখানে বিধ্বস্ত হয়েছিল বলে সে মহাকাশের সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করেছে। আমরা প্রাণীটিকে হত্যা করতে পারব না–কিন্তু সে যেন আর বাইরের কারো সাথে যোগাযোগ করতে না পারে সেটা তো নিশ্চিত করতে পারি।
আমরা কী পারব?
পারব। আগে আমরা কখনো আমাদের প্রাণের ঝুঁকি নিইনি। এখন আমাদের প্রাণের কোনো ঝুঁকি নেই। আমরা এখন নিরাপদ স্কাউটশিপে করে মহাকাশযানে যাচ্ছি। আমাদের শুধু দুটি দেহ এই গ্রহে রয়ে গেছে। আমার আর তোমার এই দেহ দুটির কোনো মূল্য নেই।
মহাকাশযানের সবাই সবিস্ময়ে দেখল ভয়ঙ্কর একটি বিস্ফোরণে কুৎসিত কালো গ্রহটির শক্তিশালী এন্টেনাটি উড়ে গেছে। মহাকাশযানের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক সাথে সাথেই কুৎসিত কালো গ্রহের সেই মহাজাগতিক প্রাণীর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে গেল। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক নিজে থেকে একবার চালু নেয়ার সাথে সাথে, মহাকাশযানের ভেতরে আলো জ্বেলে ওঠে। শক্তিশালী কুরু ইঞ্জিন গর্জন করে ওঠে। মহাকাশযানটি নিজ অক্ষের ওপর ঘুরতে শুরু করার সাথে সাথে কৃত্রিম মহাকর্ষে ভেসে থাকা সবকিছু নিচে নেমে আসে। মহাকাশচারীরা অনেক দিন পর হেঁটে হেঁটে যেতে থাকে।
য়ুহা আর রায়ীনার সম্মানে এবং তাদের প্রতি গভীর ভালোবাসায় যে ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের ক্রু এবং বিদ্রোহী দলের সদস্যরা পাশাপাশি বসে পানাহার করছিল। সেখানে মহাকাশযানের বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে রাখা সত্যিকার ভেড়ার মাংস, জৈবিক যবের রুটি এবং প্রাকৃতিক আঙুরের রসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মহাজাগতিক সিম্ফোনির সপ্তম অংশটি শুনতে শুনতে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের ক্রু এবং বিদ্রোহী দলের সদস্যরা একে অন্যের সাথে হাসি তামাশায় মেতে উঠেছিল। উত্তেজক পানীয় খেতে খেতে তরল কণ্ঠে তাদের কথাবার্তা পুরো মহাকাশযানে একটা অন্য ধরনের আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে নিচের কালো কুৎসিত গ্রহটার একটা বড় পাথরের পাশে য়ুহা এবং রায়ীনার দেহ দুটি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। য়ুহা তার হাতের অস্ত্রটির ট্রিগারে হাত দিয়ে রায়ীনার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে ছেড়ে যেতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রায়ীনা।
রায়ীনা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি। আমি আর তুমি তো সত্যিকারের য়ুহা নই, সত্যিকারের রায়ী নই। আমরা হচ্ছি তাদের জোড়াতালি দেয়া দেহ! আমাদের কোনো গুরুত্ব নেই য়ুহা। তার পরেও চলে যেতে আমার খুব কষ্ট লাগছে।
য়ুহা রায়ীনাকে গভীর মমতায় আলিঙ্গন করে বলল, আমাকে বিদায় দাও রায়ীনা।
রায়ীনা য়ুহার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, বিদায় দিতে পারল না। ধীরে ধীরে তার চোখ অশ্রুতে ভরে যায়, য়ুহার ছেলেমানুষী মুখটা যখন ঝাঁপসা হয়ে যাচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে তারা ট্রিগার টেনে ধরে।
বায়ুমণ্ডল নেই বলে গুলির শব্দটি গ্রহের ভেতর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে পারেনি।
সমাপ্ত
