প্রথম পর্ব

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে

#অন্ধকারের_গ্রহ - মুহাম্মদ জাফর ইকবাল



টেবিলের অন্যপাশে বসে থাকা মানুষটা একবার ভিডিও মডিউলটার দিকে তাকালো, তারপর য়ুহার দিকে তাকালো, তাকে দেখে মনে হয় সে বুঝি এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে য়ুহা তার সামনে বসে আছে।

তুমি য়ুহা?

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। আমি য়ুহা। মনে নাই আমি গত সপ্তাহে এসেছিলাম

হ্যাঁ আমার মনে আছে। মানুষটা মাথা নাড়ল, তুমি শব্দ দিয়ে কী যেন কর।

আমি শব্দশিল্পী। য়ুহা তার ছেলেমানুষী মুখটা গম্ভীর করার চেষ্টা করে বলল, তোমরা যাকে বল কবি।

কবি?

হ্যাঁ। আমি শব্দকে এমনভাবে সাজাতে পারি যে সাধারণ একটা কথা অসাধারণ হয়ে যাবে।

তাজ্জবের ব্যাপার। সামনে বসে থাকা মানুষটা তার গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, আমি ভেবেছিলাম এসব জিনিস উঠে গেছে। ভেবেছিলাম কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক দিয়ে সব করা যায়। ছবি আঁকা যায়, সংগীত তৈরি করা যায়, কবিতা লেখা যায়—

য়ুহা হা হা করে হাসল, বলল, যাবে না কেন? নিশ্চয়ই যায়। কিন্তু সেই ছবি, সেই সংগীত কিংবা সেই কবিতা হবে খুব নিম্নস্তরের। হাস্যকর, ছেলেমানুষী! খাঁটি শিল্প যদি চাও তাহলে দরকার খাঁটি মানুষ। খাঁটি কবিতা লিখতে পারে শুধু খাঁটি মানুষের খাঁটি মস্তিষ্ক। য়ুহা নিজের মাথায় টোকা দিলে বলল, আসল কবিতা লিখতে হলে দরকার আসল নিউরনের মাঝে আসল সিনান্স সংযোগ।

টেবিলের অন্যপাশে বসে থাকা মানুষটা ফেঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তুমি মনে কিছু নিও না ছেলে, কিন্তু আমার ধারণা ছিল লেখক কবি শিল্পী এই ধরনের মানুষকে কেউ গুরুত্ব দিয়ে নেয় না। তোমার চিঠিটা দেখি সবাই খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছে। প্রাথমিক বাছাই হয়ে সেটা একেবারে তিন ধাপ উঠে গেছে। একাডেমি দেখি সাথে সাথে অনুমতি দিয়ে দিল—

য়ুহা টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, দেবে না কেন? একশ বার দেবে। একজন কবির ইচ্ছা লক্ষ মানুষের ইচ্ছা থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন কবি যেটা ভাবে সেটা হচ্ছে পুরো জাতির ভাবনার নির্যাস। প্রাচীনকালে—

টেবিলের অন্যপাশে বসে থাকা মানুষটা সহৃদয় ভঙ্গিতে হাত তুলে য়ুহাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, সবই বুঝলাম, কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়।

কোন জায়গায়?

এত কিছু থাকতে তুমি মহাকাশযানে উঠতে চাইছ কেন?

য়ুহার ছেলেমানুষী চেহারায় এখন উত্তেজনার ছাপ পড়ল। সে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তুমি বুঝতে পারছ না? আমি হচ্ছি একজন কবি। আর করিরা হচ্ছে সৌন্দর্যের পূজারি। আমি বুভুক্ষের মতো সৌন্দর্য খুঁজে বেড়াই। এই বায়োডোমের প্রত্যেকটা বিন্দুতে আমি সৌন্দর্য খুঁজেছি। এখন আমি এই সৌন্দর্য খুঁজতে চাই মহাকাশের শূন্যতা থেকে। মহাকাশের প্রায় অলৌকিক নিঃসঙ্গতা থেকে–

টেবিলের সামনে বসে থাকা মানুষটা আবার হাত তুলে য়ুহাকে থামালো। ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি জান মহাকাশযানে যেতে হলে কী পরিমাণ প্রশিক্ষণ নিতে হয়? দশ জি তুরণে যখন মহাকাশযানটা যেতে শুরু করে তখন মনে হয় পুরো মহাকাশযানটা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। শরীরটা হয়ে যায় সিসার মতো ভারি। প্রচণ্ড চাপে হৃৎপিণ্ড থেমে যেতে চায়। মনে হয় চোখের মণি কোটর থেকে বের হয়ে আসবে। কোনো কিছু পরিষ্কার করে চিন্তা করা যায় না চোখের সামনে তখন কাঁপতে থাকে একটা লাল পর্দা, মাথায় তো একটা যন্ত্রণা!।

য়ুহার চোখ উত্তেজনায় চকচক করতে থাকে, সে নিঃশ্বাস আটকে রেখে বলে, আমি তো সেই অভিজ্ঞতাই পেতে চাই!

পাবে। সেই অভিজ্ঞতাই পাবে। মনে হয় তার থেকে বেশিই পাবে। ছোট একটা মহাকাশযানে অল্প কিছু মানুষ। কোনো যোগাযোগ নেই, যেদিকে তাকাও কুচকুচে কালো অন্ধকার আকাশ, তার মাঝে নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। তার ওপর কথা বলতে বলতে মানুষটা হঠাৎ থেমে গেল।

য়ুহা জিজ্ঞেস করল, তার ওপর কী?

নাহ্। কিছু না।

বলে ফেলো। আমি সবকিছু জানতে চাই।

মানুষটা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বিপদ আপদ আছে না? মহাজাগতিক দস্যু আছে। আন্তঃ গ্যালাক্টিক বিদ্রোহী আছে। গেরিলা যুদ্ধ আছে। ছিনতাই আছে। সেদিন খবর পেলাম আস্ত একটা মহাকাশযান নিখোঁজ হয়ে গেছে–

এই সব রকম অভিজ্ঞতা নিয়ে হচ্ছে একজন মানুষের জীবন।

য়ুহার চকচকে চোখ আর ছেলেমানুষী মুখের দিকে তাকিয়ে মানুষটা হেসে ফেলল, বলল, ঠিক আছে তাহলে তুমি এই সবকিছু নিয়েই মানুষ হবার জন্যে প্রস্তুতি নাও। আমার কাছে যেটুকু তথা আছে সেটা দেখে মনে হচ্ছে তোমার প্রশিক্ষণের তারিখ দেওয়া হয়েছে। সেটা শেষ হওয়ার পর প্রথম যে মহাকাশযান রওনা দেবে সেটাতে তোমাকে তুলে দেয়া হবে।

সেটা কী রকম মহাকাশযান হবে? কে কে থাকবে সেখানে?

আগে থেকে তো বলা যাবে না। একটা বাণিজ্যিক মহাকাশযান হতে পারে–যেটা হয়তো আকরিক নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাকাশযান হতে পারে। বিজ্ঞানীদের গবেষণা মহাকাশযানও হতে পারে। তোমার কপাল খারাপ হলে অপরাধী বোঝাই দুবৃত্তদের একটা মহাকাশযান হতে পারে।

য়ুহা তার কপালের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে বলল, যেটাই হোক আমি কোনোটাকে ভয় পাই না! আমি একবার ভয়াবহ নিঃসঙ্গতাটা অনুভব করতে চাই। মানুষেরা চেতনা বুঝতে হলে আগে বুঝতে হয় নিঃসঙ্গতা-

বুঝবে। তুমি নিঃসঙ্গতা বুঝবে। একা থাকার কী যন্ত্রণা তুমি সেটা খুব ভালো করেই বুঝবে। টেবিলের সামনে বসে থাকা মানুষটা য়ুহার দিকে তাকিয়ে সহৃদয়ভাবে হেসে বলল, যখন একজনের টুটি আরেকজন চেপে ধরতে চাইবে, তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিও না।

য়ুহা বলল, সেটাও এক ধরনের অভিজ্ঞতা। একজন কবির কাছে সেটারও একটা মূল্য আছে।

য়ুহা আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল, মানুষটা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, যাও, তুমি এখন পাশের ঘরে যাও। তোমার শরীরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।

য়ুহা উঠে দাঁড়িয়ে পাশের ঘরের দিকে রওনা দিল।

মহাকাশ একাডেমি থেকে য়ুহা যখন বের হয়েছে তখন দুপুর হয়ে গেছে। সূর্য মাথার ওপর এবং বেশ তীব্র রোদ। মুহ। নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। এই মহাকাশে মানুষ যেখানেই বসতি তৈরি করেছে সেখানে নীল আকাশ তৈরি করেছে, সূর্য তৈরি করেছে। এই সব আসলে কৃত্রিম, আসল পৃথিবীর আসল আকাশ আর সেই আকাশে জ্বলজ্বলে প্রখর সূর্য না জানি কী রকম! পৃথিবীর নির্বোধ মানুষেরা সেই গ্ৰহটাকে নষ্ট না করে ফেললে এখনো তো মানুষেরা সেখানে থাকতে পারত। আবার কি কখনো পৃথিবীর মানুষ পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারবে?

কমান্ডার একটু অবাক হয়ে এগারোজন মানুষের দিকে তাকিয়ে রইল, গত কয়েক দিনের অবরোধে ছয়জন মারা গেছে, তা না হলে এখানে সতেরোজন থাকত। মাত্র সতেরোজন মানুষ ছোট একটা স্কাউটশিপে করে এসে পুরো বায়োডোমের অস্তিত্বটাই প্রায় শেষ করে ফেলেছিল। একটা ছোট ঘরের মাঝে গাদাগাদি করে রাখা এই মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে কেউ কি অনুমান করতে পারবে এরা কত দুর্ধর্ষ, কত সুশৃঙ্খল, নিজেদের আদর্শের জন্যে কত আন্তরিক? এ রকম বিদ্রোহী দলকে কি কখনোই পুরোপুরি পরাস্ত করা যাবে?

কমান্ডার একটা নিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের দলপতি কে?

মানুষগুলো তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না, এক ধরনের ভাবলেশহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কমান্ডার বলল, আমি তোমাদের একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি, তোমাদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ, তার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখের নিচে কালি, গালের চামড়াটা নির্মমভাবে ঘষতে ঘষতে পিচিক করে মেঝেতে থুথু ফেলে বলল, মিছি মিছি সময় নষ্ট করো না। আমাদের নিয়ে কী করতে চাও করে ফেল।

তুমি যদি জিজ্ঞেস করো আমি কী করতে চাই তাহলে আমি কী বলব জান?

মানুষগুলো ভাবলেশহীন চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, কোনো উত্তর দিল না। কমান্ডার তখন নিজেই বলল, আমি বলব যে, আমি তোমাদের সবাইকে ছেড়ে দিতে চাই। সত্যি কথা বলতে কী ছেড়ে দেবার আগে তোমাদের সবাইকে নিয়ে একবেলা খেতে চাই। খাঁটি যবের রুটি, মসলা মাখানো ঝলসানো তিতির পাখির মাংস, আঙুরের রস-

মধ্যবয়স্ক মানুষটা বিরক্ত গলায় বলল, ফালতু কথা বলো না। আমাদের নিয়ে কী করতে চাও করো। মারতে চাইলে মেরে ফেক, আফা চুকে যাক।

কমান্ডার জিব দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বলল, মেরে ফেলাটা তো সবচেয়ে সহজ, তোমাদের জন্যেও সহজ, আমাদের জন্যেও সহজ। কিন্তু এত সহজে কি কাউকে মারা যায়? তোমাদের যে ছয়জন মারা গেছে তাদের মস্তি

ও এর মাঝে কয়োজেনিক চেম্বারে রেখে দেয়া হয়েছে। তাদের সাথেও যোগাযোগ করা হবে। তোমাদের কথা তো ছেড়েই দিলাম, তোমাদের মস্তি স্কের প্রত্যেকটা নিউরনকে ওলটপালট করে দেখা হবে সেখানে কী আছে! কমান্ডার একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বিষয়টা আমার হাতে নেই। যদি আমার হাতে থাকত তাহলে আমি তোমাদের সবাইকে ছেড়ে দিতাম। ছেড়ে দেবার আগে তোমাদের সবাইকে উষ্ণ সুগন্ধী পানিতে গোসল করার সুযোগ করে দিতাম। গোসল করে তোমরা ভাজভাঙা নিও পলিমারের কাপড় পরতে-

মধ্যবয়স্ক মানুষটা হিংস্র গলায় বলল, ফালতু কথা বলো না। তোমার ফালতু কথা শুনে আমার বমি এসে যাচ্ছে।

কমান্ডার মাথা নাড়ল, বলল, আমি দুঃখিত। আমি খুবই দুঃখিত যে আমার একেবারে আন্তরিক কথাগুলোকেও তোমার কাছে ফালতু কথা মনে হচ্ছে! শুধু যে ফালতু মনে হচ্ছে তা-ই না, কথাটা শুনে তোমার বমি এসে যাচ্ছে। যা-ই হোক, আমি তাহলে আর কথা বলব না। তোমাদের সাথে কথা বলার জন্যে, তোমাদের মুখ থেকে কথা বের করার জন্যে বিশেষ বাহিনীই আছে। তারাই বলবে। তবে আমি আগের থেকে তোমাদের সাবধান করে দিই, তাদের পদ্ধতিটা কিন্তু তোমাদের ভালো লাগবে না। একেবারেই ভালো লাগবে না।

কমান্ডার ছোট ঘরটা থেকে বের হতে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গেল, গাদাগাদি করে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, আমি জানি আমার কথাগুলো শুনতে তোমাদের খুবই বিরক্তি লাগছে, তারপরেও আমাকে বলতেই হবে, তোমরা অসম্ভব ভালো যুদ্ধ করেছ। আমি মুগ্ধ হয়েছি। এত অল্প যোদ্ধা দিয়ে যে এ রকম একটা অপারেশন করা যায় সেটা অবিশ্বাস্য।

ছোট ঘরের মেঝেতে গাদাগাদি করে বসে থাকা মানুষগুলো কোনো কথা বলল না। কমান্ডার তাদের সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে কোনায় বসে থাকা একটা কমবয়সী মেয়ের দিকে তাকালো, বলল, আমার এখনো বিশ্বাস হয় না, মেয়ে, তুমিও কি যুদ্ধ করছিলে?

মেয়েটি অন্যমনস্কভাবে সামনে তাকিয়ে ছিল, কমান্ডারের কথা শুনে তার দিকে ঘুরে তাকালো, বলল, তুমি কি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছ?

হ্যাঁ। আমার কৌতূহল—তুমিও কি সত্যি যুদ্ধ করেছ?

হ্যাঁ। করেছি।

কমান্ডার মাথা নেড়ে বলল, কী আশ্চর্য। তোমাকে দেখে মনেই হয় না তুমি যুদ্ধ করতে পার। তোমাকে দেখে মনে হয় একজন ভাবুক, একজন বিজ্ঞানী বা সে রকম কিছু। তোমার বয়সী একজনের এখন জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার কথা অথচ তুমি কি না–

মেয়েটা হাসার মতো শব্দ করে বলল, তুমি কেমন করে জান আমি জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করি না? আরোপিত বুদ্ধিমত্তার ওপরে আমার একটা মডেল আছে। একটু সময় পেলেই আমি সেটার একটা গাণিতিক বিশ্লেষণ করব। সত্যি কথা বলতে কী আমি এটা নিয়েই ভাবছিলাম যখন

তুমি আমার মনোযোগটা নষ্ট করলে।

খোঁচা খোঁচা দাড়িসহ মধ্যবয়স্ক মানুষটা পিচিক করে মেঝেতে একটু থুথু ফেলে বলল, আমাদের রায়ীনা খুঁটি বৈজ্ঞানিক। একশ ভাগ খাঁটি বৈজ্ঞানিক।

কমান্ডার একবার মধ্যবয়স্ক মানুষটার দিকে তাকালো, তারপর কমবয়সী মেয়েটার দিকে তাকালো, জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম রায়ীনা?

মেয়েটা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ।

তার মানে তোমরা তোমাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য দেবে না সেটা সত্যি না? তুমি তোমার নাম বলেছ, তুমি কী নিয়ে গবেষণা করেছ সেটা বলেছ-

তুমি যদি চাও তাহলে আমার পছন্দের খাবার কী, আমার প্রিয় সিম্ফোনি কোনটা, কোন প্রাইম সংখ্যাটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সেগুলোও তোমাকে বলে দিতে পারব। কিন্তু আসলে আমাদের সেগুলো নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। যে ছয়জন মারা গেছে তার মাঝে একজন আমার খুব প্রিয় বন্ধু ছিল।

কমান্ডার একটা নিঃশ্বাস ফেলে বাল, আমি জানি। তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করবে না, কিন্তু তবু বলি। আমি খুবই দুঃখিত বীনা, আমি খুবই দুঃখিত।

মেঝেতে গাদাগাদি করে বসে থাকা মানুষগুলো কোনো কথা বলল না, শুধু মধ্যবয়স্ক মানুষটা আবার পিচিক করে মেঝেতে থুথু ফেলল।

রায়ীনা অন্যমনস্কভাবে শুনে তাকিয়ে ছিল, এবারে মাথা ঘুরিয়ে মধ্যবয়স্ক মানুষটার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, এটা তোমার খুব খারাপ একটা অভ্যাস, এভাবে মেঝেতে থুথু ফেলবে না।

ঠিক আছে ফেলব না। বলে সে নিজের অজান্তেই আরেকবার মেঝেতে থুথু ফেলল।

কন্ট্রোল রুমে উঁকি দিয়েই য়ুহী ক্যাপ্টেন ক্রবকে দেখতে পেল। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে মহাকাশযানের সব কয়জন ক্রুয়ের ত্রিমাত্রিক ছবি তাকে দেখানো হয়েছে কিন্তু য়ুহার কারো চেহারাই মনে নেই। মহাকাশযানের ক্যাপ্টেনের কাধে একটা লাল তারা থাকে সেটা তার মনে আছে, কাজেই কন্ট্রোল রুমের মধ্যবয়সী মানুষটা নিশ্চয়ই মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন, তার কাঁধে একটা লাল তারা জ্বল জ্বল করছে।

য়ুহা কন্ট্রোল রুমে ঢুকে ক্যাপ্টেন ক্ৰবের সামনে দাঁড়াল। ক্যাপ্টেন ক্ৰবের সামনে একটা হলোগ্রাফিক প্যানেল, সেখানে কোনো একটা অদৃশ্য সুইচকে সে টানাটানি করছিল। য়ুহাকে দেখে ক্যাপ্টেন ক্ৰব হাত নামিয়ে তার দিকে দুই পা এগিয়ে এলো, তুমি নিশ্চয়ই য়ুহা?

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। আমি য়ুহা।

কবি য়ুহা?।

য়ুহা একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, অনেকে আমাকে তা-ই বলে।

আমার ত্রিশ বৎসরের জীবনে আগে কখনো এ রকম ঘটনা ঘটেনি। একাডেমি থেকে নির্দেশ দিয়েছে একজন কবিকে নিয়ে যেতে। শুধু তা-ই না, সেই নির্দেশে বলা আছে তোমার সৃজনশীলতাকে উৎসাহ দেয়ার উপযোগী একটা পরিবেশ তৈরি করে দিতে! খুব একটা মজার কথা বলেছে এ রকম ভাব করে ক্যাপ্টেন ক্রুব হা হা করে হাসতে লাগল।

য়ুহা কী বলবে বুঝতে না পেরে একটু হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। ক্যাপ্টেন ত্রুব হাসি থামিয়ে বলল, একজন কবির জন্যে সৃজনশীল পরিবেশ কী আমার সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই!

য়ুহা বলল, আসলে আমাদের জন্যে আলাদা কোনো পরিবেশের প্রয়োজন হয় না। যে কোনো পরিবেশই আমাদের জন্যে সৃজনশীল পরিবেশ।

ভালো। খুব ভালো। শুনে নিশ্চিন্ত হলাম।

আমি কি তোমাদের কোনো কাজে সাহায্য করতে পারি?

তোমার পেছনে যদি আমাদের সময় দিতে না হয় সেটাই হবে আমাদের জন্যে একটা রিরাট সাহায্য।

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, দিতে হবে না। আমি প্রশিক্ষণটা খুব ভালোভাবে নিয়েছি। তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না আমাকে এগারো জি তে নিয়ে গিয়েছিল, আমি তবু জ্ঞান হারাইনি।

ভালো, খুব ভালো।

য়ুহা একটু ইতস্তত করে বলল, ক্যাপ্টেন ক্ৰব, আমি কি মহাকাশযানটা ঘুরে দেখতে পারি?

অবশই। ক্যাপ্টেন ক্ৰব একটু চিন্তা করে বলল, তোমার সাথে আমি বরং একজন ক্রুকে দিয়ে দিই, প্রথমবার সে তোমাকে সবকিছু দেখিয়ে দিক।

ক্যাপ্টেন জব তার যোগাযোগ মডিউলের একটা বোতাম টিপতেই নিঃশব্দে একজন ক্রু এসে হাজির হলো। সোনালি চুলের কমবয়সী একটা মেয়ে, তার মুখে এক ধরনের কাঠিন্য। মেয়েটি কোনো কথা না বলে ঘরের এক কোণায় নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল। ক্যাপ্টেন ত্রুব সরাসরি তার দিকে না তাকিয়ে বলল, ক্লিজা, তুমি য়ুহাকে মহাকাশযানটা একটু ঘুরিয়ে দেখাও।

ক্লিডা বলল, দেখাচ্ছি মহামান্য ক্যাপ্টেন। তারপর ঘুরে য়ুহার দিকে তাকিয়ে বলল, চল, আমার সাথে।

য়ুহা ক্লিডার সাথে ঘর থেকে বের হতে হতে এফ, আমার নাম য়ুহা।

জানি। আমাদের রেকর্ডে তোমার নাম আছে। তুমি নিশ্চয়ই ক্লিডা। হ, আমি কর্পোরাল ক্লিডা।

তার মানে, আমার তোমাকে কর্পোরাল ক্লিডা বলে সম্বােধন করতে হবে? শুধু ক্রিড়া বললে হবে না?

তুমি যেহেতু আমাদের কমান্ডের নও তুমি যা ইচ্ছে তা-ই ডাকতে পার।

আচ্ছা ক্লিভা, তোমাকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করি?

কর।

ক্যাপ্টেন ত্রুব যখন তোমাকে ডাকল, আর তুমি যখন এলে তখন এসে তুমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে। কোনো কথা বললে না! কারণটা কী?

ক্লিডা এমনভাবে য়ুহার দিকে তাকালো যেন সে খুব একটা বিচিত্র কথা বলেছে, ভুরু কুঁচকে বলল, আমি নিজে থেকে কেন ক্যাপ্টেন ক্ৰকে কিছু জিজ্ঞেস করব? ক্যাপ্টেন ক্ৰব আমাকে ডেকেছে, দেখেছে আমি এসেছি।

তার যখন ইচ্ছে করবে তখন সে কথা বলবে।

কিন্তু আমাকে যদি ডাকত আমি ঘরে গিয়েই জিজ্ঞেস করতাম, ক্যাপ্টেন ক্ৰব! তুমি কি আমাকে ডেকেছ?

তুমি সেটা করতে পার, কারণ তুমি কমান্ডের মাঝে নেই। যারা কমান্ডের মাঝে থাকে তাদের কিছু নিয়মকানুন মানতে হয়।

এটাই তোমাদের নিয়ম? আমি আসলে সেটাই জানতে চাচ্ছিলাম। হ্যাঁ, এটাই নিয়ম।

যুহ বলল, তুমি কিছু মনে করো না ক্লিড়া তোমার কাছে আমার আরও একটা প্রশ্ন।।

বল, কী প্রশ্ন।

তুমি যখন এলে, ক্যাপ্টেন ক্রব যখন তোমার সাথে বলল তখন সে তোমার দিকে না তাকিয়ে কথা বলেছে। আমরা যখন একজন আরেকজনের সাথে কথা বলি তখন তার দিকে তাকাই। আমার মনে হলো, মনে হলো।

কী মনে হলো?

মনে হলো যেন তোমাকে একটু তাচ্ছিল্য করা হলো।

য়ুহার কথা শুনে ক্লিডা একটু অবাক হয়ে তাকালো, বলল, তাচ্ছিল্য?। মোটেও তাচ্ছিল্য করা হয়নি।

নিশ্চয়ই করেনি কিন্তু আমার মনে হলো।

তোমার মনে হওয়াটা ভুল। আমাদের কমান্ডে একেকজন একেক ধাপে থাকে। যারা নিচের ধাপে থাকে তারা সব সময়েই উপরের ধাপের যে আছে তার আদেশ মেনে চলে। এটা শৃঙ্খলার জন্যে প্রয়োজন, শৃঙ্খলা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

য়ুহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার জীবনে কোনো শৃঙ্খলা নেই। আগে কখনো ছিল না, পরেও থাকবে বলে মনে হয় না।

ক্লিডা মুখ শক্ত করে বলল, শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো বড় কাজ করা যায় না।

য়ুহা বলল, বড় কাজ করার জন্যে সবার জন্মও হয় না। অনেকের জন্ম হয় ছোট কাজ করার জন্যে। ছোট আর তুচ্ছ। কিন্তু খুব প্রয়োজনীয়। সবাই যদি বড় কাজ করে তাহলে কেমন করে হবে?

ক্লিডা একবার য়ুহার দিকে তাকালো কিন্তু কোনো কথা বলল না। য়ুহা গলার স্বর পাল্টে বলল, আমাকে একবার মহাকাশযানটা দেখাও।

কোথা থেকে শুরু করতে চাও? ইঞ্জিন। আমি প্রথমে দেখতে চাই মহাকাশযানের ইঞ্জিন।

বেশ। চল তাহলে ইঞ্জিনঘরে যাই। এই মহাকাশযানের ইঞ্জিন দুটো। দুটোই কুরু ইঞ্জিন। এর জ্বালানি হিসেবে বের করা হয় পদার্থ এবং প্রতিপদার্থ। নিরাপত্তার দিক দিয়ে এই জ্বালানির কোনো তুলনা নেই। বিশাল একটা মহাকাশযানকে এটা অনির্দিষ্ট সময় দশ জি ত্বরণে রাখতে পারে। মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে একটা ব্ল্যাক হোলের কাছে বিপজ্জনকভাবে গিয়ে বের হওয়ার একমাত্র উদাহরণটুকু এই কুরু ইঞ্জিনের।

ক্লিডা শান্ত গলায় কথা বলতে থাকে, য়ুহা এক ধরনের মুগ্ধ চোখে কথাগুলো শোনে। সে আগে কখনোই এ ধরনের কোনো কথা শোনেনি।

খাবার টেবিলে ক্যাপ্টেন ত্রুব য়ুহাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি মহাকাশযানটা দেখেছ?

হ্যাঁ দেখেছি।

তোমার কী মনে হয়, যেতে পারবে আমাদের সাথে?।

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, অবশ্যই পারব। চমৎকার একটা মহাকাশযান। দেখে মনে হয় এর প্রত্যেকটা স্কু বুঝি অনেঃ যত্ন করে তৈরি করা হয়েছে।

সেটা তুমি খুব ভুল বলনি।

আমরা কখন রওনা দেব?

চব্বিশ ঘণ্টার মাঝে। কার্গো পৌঁছানোর সাথে সাথে।

আমাদের কার্গোটা কী?

য়ুহার কথা শুনে খাবার টেবিলের সবাই এক মুহূর্তের জন্যে থেমে গেল। য়ুহা একটা অবাক হয়ে বলল, আমি কি ভুল কিছু জিজ্ঞেস করে ফেলেছি?

বলতে পার। এটা সামরিক মহাকাশযান। এখানে কেউ নিজে থেকে কিছু জানতে চায় না। যার যেটা জানার দরকার তাকে সেটা জানানো হয়।

য়ুহা মুখে হাসি টেনে বলল, আর আমি যদি জিজ্ঞেস না করেই কিছু একটা জেনে যাই, সেটা কি বেআইনি হবে?

ক্যাপ্টেন ক্ৰব তার পানীয়ের গ্লাসটা স্নায়ু উত্তেজক পানীয় দিয়ে ভরতে ভরতে বলল, না সেটা বেআইনি হবে না। তুমি কি কিছু জেনেছ?

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ জেনেছি।

কী জেনেছ?

এই মহাকাশযানের কার্গো হচ্ছে মানুষ। এগারোজন মানুষ।

ক্যাপ্টেন ক্ৰব চোখ বড় করে য়ুহার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কেমন করে সেটা অনুমান করলে?

ক্লিডা যখন আমাকে মহাকাশযানটি দেখাচ্ছিল তখন শীতলঘরে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে এগারোটা ক্রায়োজেনিক ক্যাপসুল চার্জ করা হচ্ছিল। তার মানে নিশ্চয়ই এগারোজন মানুষকে নেয়া হবে।

ক্যাপ্টেন ক্ৰব তার পানীয়ে চুমুক দিয়ে বলল, আর কিছু অনুমান করেছ?

হ্যাঁ করেছি।

কী অনুমান করেছ?

য়ুহা পানীয়ের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বলল, এই এগারোটা মানুষকে তোমরা নিশ্চয়ই খুব ভয় পাও। তা না হলে তাদের ক্রয়োজেনিক ক্যাপসুলে করে কেন নেবে? আমার মতো যাত্রী হিসেবে নিতে পারতে।

ক্যাপ্টেন ক্ৰব মাথা নাড়ল, বলল, ভালো অনুমান করেছ য়ুহা।

য়ুহা তার পানীয়টুকু এক চুমুকে শেষ করে দিয়ে বলল, আমি মানুষগুলো দেখার জন্যে খুব আগ্রহী হয়ে আছি।

কেন?

আমার মনে হচ্ছে তাদের মাঝে নিশ্চয়ই রহস্য আছে। আমি একজন কবি, মানুষের চরিত্র, তাদের চরিত্রের রহস্য বুঝতে আমার খুব ভালো লাগে।

ঘুম থেকে উঠে য়ুহা আবিষ্কার করল মহাকাশযানের ক্রুদের প্রত্যেকের হাতে একটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। সে একটু অবাক হয়ে একজন ক্রুকে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের সবার হাতে অস্ত্র কেন? কিছু কি হয়েছে?

মানুষটি বলল, না, কিছু হয়নি। এটা সামরিক মহাকাশযান, আমরা সামরিক মানুষ। আমাদের হাতে অস্ত্র থাকতে হয়।

কিন্তু গতকাল তো ছিল না।

মহাকাশযানের কাজকর্মে প্রতিমুহূর্ত অস্ত্র রাখতে হয় না। সে জন্যে আমরা রাখি না। আজকে অস্ত্র রাখতে হবে।

য়ুহা কৌতূহলী চোখে বলল, বিপজ্জনক মানুষগুলো আসছে বলে?

বলতে পার।

তোমার অস্ত্রটা একটু দেখাবে?

মানুষটি হেসে ফেলল, বলল, এগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক অস্ত্র। না বুঝে কোনো একটা সুইচ স্পর্শ করে কিংবা একটা লিভার টেনে তুমি এখানে প্রলয়কাণ্ড করে ফেলতে পার! তোমার হাতে অস্ত্র দেয়াটা ঠিক হবে না!

তবে—

তবে কী?

একাডেমি থেকে যে চিঠিটা এসেছে সেই চিঠিতে লেখা আছে তোমার সব কৌতূহলকে সম্মান করতে। তুমি যদি ক্যাপ্টেন ক্ৰবের কাছে আবেদন কর, তোমাকে একটা অস্ত্র দেখানো হতে পারে।

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে, আমি তাহলে তা-ই করি। ব্যাপারটা মন্দ হয় না। কী বল? কবির হাতে অস্ত্র!

ক্যাপ্টেন ত্রুব য়ুহার কথা শুনে একটু অবাক হয়ে বলল, তুমি অস্ত্র চালানো শিখতে চাও?

আসলে ঠিক চালানো শিখতে চাই তা নয়। একটা সত্যিকারের অস্ত্র হাতে নিয়ে দেখতে চাই। যদি চালানো না শিখি তোমরা তো অস্ত্র হাতে নিতে দেবে না।

সেটা ঠিক। এই অস্ত্রগুলো খুব বিপজ্জনক। কিন্তু অস্ত্র কেন হাতে নিতে চাও?

য়ুহা একটু ইতস্তত করে বলল, তুমি কিছু মনে করো না ক্যাপ্টেন ক্ৰব–আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে একটা অস্ত্র আসলে সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে অশুভ জিনিস। তুমি কি চিন্তা করতে পারে, একটা অস্ত্র তৈরি করা হয়েছে মানুষকে হত্যা করার জন্যে। হত্যা! মানুষ কেন মানুষকে হত্যু! করবে? আর সেই হত্যা করার জিনিসটা মানুষ কেন হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে?

ক্যাপ্টেন ক্রব কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, মানুষের সভ্যতার ইতিহাস পড়েছ কবি য়ুহা? পুরো ইতিহাসটুকুই হচ্ছে যুদ্ধের ইতিহাস-

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। পড়েছি। সেজন্যেই বলছি। আমি তাই এই অশুভ জিনিসটা একবার স্পর্শ করে দেখতে চাই।

বেশ। আমি ব্যবস্থা করে দিই। তোমাকে একটা প্রশিক্ষণ দেব, যদি সেটা নিতে পার তোমাকে একটা অস্ত্র নিয়ে ঘুরতে দেব।

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, না, না, আমি অস্ত্র নিয়ে ঘুরতে চাই না। আমি শুধু একবার স্পর্শ করতে চাই।

সেটা তোমার ইচ্ছা। কিন্তু একাডেমি থেকে তোমাকে যে অনুমতিপত্র দিয়েছে তাতে তুমি নিজের কাছে একটা অস্ত্র রাখতে পার।

য়ুহা মাথা নাড়ল, না। না। আমি অস্ত্র রাখতে চাই না।

ক্যাপ্টেন ক্রব কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, সেটা তোমার ইচ্ছা।

যে মানুষটি য়ুহাকে অস্ত্র ব্যবহার করা শেখাল তার নাম হিসান। সে প্রথমে য়ুহাকে মহাকাশযানে রাখা সবগুলো অস্ত্র দেখাল, একজন মানুষ কাঁধে করে আস্ত নিউক্লিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে যেতে পারে সেটা য়ুহা জানত না, দেখে সে খুব অবাক হলো। একটা মহাকাশযান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যে অন্য একটা মহাকাশযানকে উড়িয়ে দেয়া যায় সেটাও সে জানত না। সাধারণ অস্ত্রগুলো বেশ হালকা এর ভেতরে ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা চালানোর মতো এত বিস্ফোরক কেমন করে থাকে সেটা একটা রহস্য। হিসান ব্যাপারটা য়ুহাকে বোঝানোর চেষ্টা করল। রুহা ঠিক ভালো করে বুঝতে পারল না।

য়ুহাকে সে অস্ত্রটি ব্যবহার করতে শেখানো হলো সেটি হালকা এবং দেখতে প্রায় খেলনার মতো। কোনো কিছুকে আঘাত করার আগে সেটাকে লেজার রশ্মি দিয়ে লক করে নিতে হয়। ট্রিগার টানার সাথে সেকেন্ডে দশটি বিস্ফোরক ছুটে যায়। লক্ষ্যবস্তুকে ভেদ করে বিস্ফোরিত হয়, কাজেই এর ধ্বংস ক্ষমতা অসাধারণ। ভুল করে কোথাও চাপ দিয়ে হঠাৎ করে যেন কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে না ফেলে সে জন্যে একাধিক সেফটি লক রয়েছে।

মহাকাশযানের ভেতরেই অস্ত্র চালানোর অনুশীলন ঘর রয়েছে। য়ুহাকে সেখানে প্রশিক্ষণ দিয়ে হিসান তার হাতে অস্ত্রটা তুলে দিয়ে বলল, নাও। এখন এটা তোমার অস্ত্র। তুমি যতদিন মহাকাশযানে থাকবে তুমি এটা নিজের কাছে রাখতে পারবে।

না। আমি নিজের কাছে রাখতে চাই না। আমি শুধু একবার এটাকে হাতে নিয়ে দেখতে চাই।

নাও, দেখ।

য়ুহা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা হাতে নিয়ে দাঁড়াল। সে এখন ইচ্ছে করলেই একটা মানুষকে খুন করে ফেলতে পারবে চিন্তা করেই তার শরীর কাটা দিয়ে ওঠে। য়ুহা অস্ত্রটা হাতে নেয়, ট্রিগারে আঙুল রেখে সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে সে একটা সত্যিকার অস্ত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

য়ুহা বুক থেকে নিঃশ্বাসটা ছেড়ে দিয়ে বলল, তুমি কি জান, এই অস্ত্রটা কি কখনো ব্যবহার করা হয়েছে?

হিসান মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ হয়েছিল।

কখন, কীভাবে?

বেশ কয়েকবার। একটা বিদ্রোহ বন্ধ করার জন্যে—

কেউ কি মারা গিয়েছিল?

হ্যাঁ। এই অস্ত্রটি দিয়ে প্রায় সতেরোজনকে মা্রা হয়েছিল। সব রেকর্ড করা থাকে, নতুন করে ব্যবহার করার আগে রেকর্ড মুছে দেয়া হয়।

য়ুহা অস্ত্রটি হাতে নিয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, তা এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে সে হাতে একটা অস্ত্র ধরে রেখেছে যেটা দিয়ে সতেরো জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। সতেরোটি প্রাণ! হয়তো সতেরোটি পরিরার। সতেরোজন ভালোবাসার মানুষ। য়ুহার শরীরটা কেমন জানি শিউরে ওঠে, সে প্রায় ছটফট করে অস্ত্রটা হিসানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, নাও। রেখে দাও।

এটা তোমার নামে ইস্যু করা হয়েছে। তুমি রাখতে পার।

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, না, না, আমি রাখতে চাই না।

একটা অস্ত্র আসলে একজনের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন করে দিতে পারে। যখনই তুমি এটা হাতে নেবে তখনই তুমি অনুভব করবে তুমি একজন ভিন্ন মানুষ। অন্য মানুষ থেকে তোমার ক্ষমতা বেশি। তুমি নিজে ভেতরে এক ধরনের নতুন আত্মবিশ্বাস অনুভব করবে। নতুন ক্ষমতা অনুভব করবে।

য়ুহা আবার মাথা নাড়ল, বলল, না। আমার এই আত্মবিশ্বাসের দরকার নেই। ক্ষমতারও দরকার নেই। যে ক্ষমতার অনুভূতির জন্যে হাতে অস্ত্র নিতে হয় আমার সেই অনুভূতির প্রয়োজন নেই।

হিসান হেসে বলল, আমি ভেবেছিলাম, তুমি একজন কবি। সব রকম অভিজ্ঞতাই তোমার কাছে মূল্যবান।

সেটা সত্যি, সব অভিজ্ঞতাই আমার কাছে মূল্যবান। তবে কিছু অভিজ্ঞতা আমি এগিয়ে গিয়ে গ্রহণ করি, কিছু অভিজ্ঞতা থেকে পালিয়ে চলে আসি। হাতে অস্ত্র রাখাটা সে রকম একটা অভিজ্ঞতা।

কেন?

আমার মনে হয় অস্ত্র খুব বুঝি অশুচি একটা জিনিস। মনে হয় এটা হাতে নিলে আমিও বুঝি অশুচি হয়ে যাব।

হিসান তার নিজের অস্ত্রটি হাতবদল করে খুব অবাক হয়ে য়ুহার দিকে তাকিয়ে রইল।

য়ুহা যদিও বলেছিল সে কিছুতেই অস্ত্র হাতে নেবে না কিন্তু দেখা গেল সত্যি সত্যি তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা হাতে নিয়ে সে কার্গো বেতে অপেক্ষা করছে। অন্য কিছু দেখুক আর না-ই দেখুক এগারোজন বন্দীকে তার দেখার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু নিরাপত্তার খাতিরে অস্ত্র ছাড়া কারো সেখানে যাবার কথা নয়।

শেষ পর্যন্ত এগারোজন বন্দী হেঁটে হেঁটে কার্গো বে’তে এসেছে তখন য়ুহা অবাক হয়ে আবিষ্কার করল মানুষগুলো নেহায়েতই নিরীহ ধরনের। কয়েকজন মধ্যবয়স্ক, পোড় খাওয়া চেহারা, অন্যরা কমবয়সী। দু-একজন বয়সে প্রায় কিশোর। চারজন নানা বয়সী মেয়ে, এর মাঝে একজনকে আলাদা করে চোখে পড়ে, চেহারার মাঝে এক ধরনের কমনীয়তা রয়েছে, দেখে মনেই হয় না সে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে পারে। য়ুহা অবাক হয়ে ক্যাপ্টেন এবকে জিজ্ঞেস করল, এরা সবাই যোদ্ধা?

হ্যাঁ।

এরা সবাই বিদ্রোহী দলের?

হ্যাঁ।

এরা কোথায় ধরা পড়েছে?

একটা স্কাউটশিপ করে বায়োডোম আক্রমণ করতে এসেছিল। অসাধারণ যুদ্ধ করেছে।

যুদ্ধে কি কেউ মারা গেছে?

হ্যাঁ, অনেকে মারা গেছে। এদের মারা গেছে ছয়জন।

এখন এদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?

ক্যাপ্টেন ক্রব য়ুহার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, বলার নিয়ম নেই।

নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যে নেয়া হচ্ছে। তাই না?

সম্ভবত।

মস্তিষ্ক স্ক্যান করে সব তথ্য বের করা হবে?

সম্ভবত।

এরা আর কখনোই মুক্তি পাবে না?

সম্ভবত না।

য়ুহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি কি এদের সাথে কথা বলতে পারি?

ক্যাপ্টেন ত্ৰুব য়ুহার দিকে ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস, তুমি কী নিয়ে কথা বলতে চাও?

আমি ঠিক জানি না।

তারা তোমার কথার উত্তর দেবে না। শুধু শুধু চেষ্টা করো না।

তবুও, আমি কি তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতে পারি?

ক্যাপ্টেন ক্রুব একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে যাও। কিন্তু মনে রেখো আমি তোমাকে যেতে নিষেধ করেছিলাম।

য়ুহা তখন বন্দীদের দিকে এগিয়ে গেল। এগারোজন বন্দী কার্গো বে-এর খোলা জায়গাটিতে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল, য়ুহী একটু এগিয়ে গিয়ে তাদের উদ্দেশ করে বলল, তোমরা কেমন আছ?

মানুষগুলো খানিকটা অবাক হয়ে য়ুহার দিকে তাকালো, কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না। য়ুহা আবার জিজ্ঞেস করল, কেমন আছ তোমরা?

এবারেও কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না। য়ুহা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, আমি তোমাদের একটা প্রশ্ন করেছি, তোমরা কেমন আছ?

মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ পিচিক করে মেঝেতে থুথু ফেলে বলল, আমাদের বিরক্ত করো না, যদি কিছু করার না থাকে তাহলে জাহান্নামে যাও।

য়ুহার চোখে-মুখে বেদনার একটা ছায়া পড়ল, সে বলল, আমি জানি তোমরা এখন খুব দুঃসময়ের মাঝ দিয়ে যাচ্ছ, তার মানে এই নয় যে তোমরা অকারণে রূঢ় হবে।

কমবয়সী একজন ব্যঙ্গ করে বলল, আহা হা! সোনামণি মনে কষ্ট পেয়েছে। আস, আস! কাছে অস, তোমার গালে একটা চুমু দিই।

এবারে বন্দীদের সবাই শব্দ করে আনন্দহীন এক ধরনের হাসি হেসে উঠল। য়ুহা আহত গলায় বলল, তোমরা ঠিক বুঝতে পারছ না। আমরা এবং তোমরা একই মানুষ। তোমাদের জন্যে আমাদের সম্মানবোধ থাকবে ঠিক সে রকম আমাদের জন্যে তোমাদের সম্মানবোধ থাকতে হবে।

মধ্যবয়স্ক মানুষটি এবার গলা উঁচিয়ে বলল, তুমি জাহান্নামে যাও ছেলে। দূর হও এখান থেকে।

রুহা আহত দৃষ্টিতে মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল, দেখে মনে হয় তার চোখে পানি এসে যাবে। কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, ঠিক বলতে পারল না। তখন বন্দীদের ভেতরে কমনীয় চেহারার মেয়েটা বলল, ছেলে, তুমি একটা জিনিস মনে হয় ধরতে পারনি।

য়ুহা বলল, আমার নাম য়ুহা।

য়ুহা। তুমি মনে হয় একটা জিনিস–

আমি আমার নাম বলেছি। তোমারও উচিত তোমার পরিচয় দেওয়া।

আমার নাম রায়ীনা।

তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম রায়ীনা।

মেয়েটা হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি করে বলল, য়ুহা, তুমি একটা জিনিস এখনো ধরতে পারিনি। আমরা আর তোমরা এক মানুষ নই। তোমাদের সবার ঘাড়ে একটা করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র রয়েছে। তোমরা আর কিছুক্ষণের মাঝে আমাদের সবাইকে শীতলঘরে ঢুকিয়ে ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রায় নিয়ে একটা জড়বস্তুতে পাল্টে দেবে। আমাদের আর কখনো জাগিয়ে তোলা হবে কি না জানি না। যদি জাগিয়ে তোলাও হয় সেটা কত শত বৎসর পরে হবে আমরা সেটা জানি না। কাজেই এই সময়টুকু আমাদের একান্তই নিজস্ব সময়। আমাদের এটা ব্যবহার করতে দাও। যদি তুমি সত্যিই মনে করো আমাদের সম্মান দেখাবে তাহলে আমাদের একলা থাকতে দাও। বুঝেছ?

য়ুহা মাথা নাড়ল, বলল, বুঝেছি। আমি খুবই দুঃখিত–

রায়ীনা কঠিন গলায় বলল, এই শব্দগুলো তোমরা ব্যবহার করো না। তোমরা পেশাদার সৈনিক, তোমার ঘাড়ে অস্ত্র, তোমাদের ঠান্ডা মাথায় শক্র হত্যা করানো শেখানো হয়। আমরা তোমাদের শত্রু, আমাদের জন্যে তোমাদের কোনো দুঃখবোধ নেই। শুধু শুধু কথাগুলো উচ্চারণ করে আমাদের অপমান করো না।

য়ুহা মৃদু গলায় বলল, আসলে আমি পেশাদার সৈনিক না।

তাহলে তুমি কে?

আমি–আমি–আমি একজন—

কী?

য়ুহা প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারল না, বিড়বিড় করে বলল, না, কিছু না। কেউ না। আমি একজন একজন মানুষ। সাধারণ মানুষ।

য়ুহা যখন ক্যাপ্টেন ক্রবের কাছে পৌঁছাল তখন ক্যাপ্টেন ক্রব নরম গলায় বলল, এখন বুঝেছ, আমি কেন তোমাকে ওদের কাছে যেতে নিষেধ করেছিলাম?

হ্যাঁ, বুঝেছি।

তুমি জগৎটাকে যেমন কল্পনা করো জগন্টা সে রকম না। জগৎটা অনেক কঠিন।

য়ুহা নিচু গলায় বলল, বাইরে। শুধু বাইরে জগৎটা কঠিন। ভেতরে সব এক। নিশ্চয়ই সব এক।

পাশাপাশি এগারোটি ক্রায়োজেনিক সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রত্যেকটার ভেতরে একজন করে মানুষ। নিয়ন্ত্রণকক্ষে বড় প্যানেলের সামনে দুজন দাঁড়িয়ে আছে। একজন মাথা ঘুরিয়ে পেছনে দাঁড়ানো ক্যাপ্টেন ক্রবকে জিজ্ঞেস করল, আমি কি শীতল করতে শুরু করব?

হ্যাঁ। কর।

মানুষটি মাইক্রোফোনের বোতামটি স্পর্শ করে বলল, তোমাদের দেহকে শীতল করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। বিষয়টি তোমাদের জন্যে অনেক সহজ হবে যদি তোমরা আমার কথাগুলো মন দিয়ে শোন। শরীরকে শীতল করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তোমাদের শরীরে স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন হওয়ার জন্যে আমরা চাই তোমরা সবাই তোমাদের হাত দুটি বুকের ওপর নিয়ে এসো, বাম হাতের ওপর ডান হাতটি রাখ।।

এগারোজন বন্দীর ভেতর মাত্র চারজন সেই নির্দেশ অনুযায়ী হাত দুটো বুকের ওপর আনল। য়ুহা মনিটরগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল, সে দেখল মধ্যবয়স্ক রূঢ় ধরনের মানুষটি মুখ বিকৃত করে একটা অশালীন শব্দ উচ্চারণ করেছে। য়ুহা মাথা ঘুরিয়ে রায়ীনার দিকে তাকালো, মেয়েটি দুই হাত সামনে এনে হাতের আঙুলে কিছু একটা গুনছিল, সে মাইক্রোফোনে দেয়া নির্দেশটি শুনেছে বলে মনে হলো না।

কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়ানো মানুষটি মাইক্রোফোনের কাছে মুখ এনে নিচু গলায় বলল, আমরা এখন তোমাদের সিলিন্ডারে নিহিলা গ্যাসের মিশ্রণ পাঠাচ্ছি। তোমাদের শরীর অবসন্ন হয়ে আসবে, চোখের পাতা ভারি হয়ে আসবে। তোমাদের শরীরের জন্যে পুরো বিষয়টি সহজ হবে যদি তোমরা পুরো শরীরটাকে ঢিলে করে রাখ, স্নায়ুকে নরম করে রাখ। আমি এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনব তার মাঝে তোমাদের সবার চোখে ঘুম নেমে আসার কথা।

কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নিচু গলায় গুনতে শুরু করে, এক-দুই-তিন-চার-পাঁচ-ছয়…

য়ুহা দেখতে পায় দশ পর্যন্ত গোনার অনেক আগেই একজন একজন করে সবাই অচেতন হয়ে পড়ছে। সবার শেষে অচেতন হলো রায়ীনা এবং অচেতন হওয়ার পরও তার মস্তিষ্কে এক ধরনের কর্মকাণ্ডের স্ক্যান দেখা যেতে লাগল।

ক্যাপ্টেন ক্ৰব বলল, এই মেয়েটা একটু অন্য রকম।

য়ুহা জানতে চাইল, কী রকম?

সব সময় কিছু না কিছু চিন্তা করছে। মস্তিষ্কটাকে ব্যবহার করছে।

কী নিয়ে চিন্তা করছে বলা সম্ভব?

কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি বলল, মস্তিষ্কের যে জায়গা থেকে সিগন্যাল আসছে সেটা গাণিতিক চিন্তাভাবনার জায়গা। মেয়েটা সম্ভবত কোনো গাণিতিক সমস্যার কথা ভাবছে।

য়ুহা অবাক হয়ে বলল, মেয়েটা অচেতন হয়েও ভাবছে।

ক্যাপ্টেন জব বলল, আমরা সবাই ভাবি। কেউ বেশি কেউ কম।

কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ক্যাপ্টেন ক্ৰবের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, আমি এদের ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রায় নেবার অনুমতি চাইছি ক্যাপ্টেন ক্ৰব।

ক্যাপ্টেন ক্ৰব অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, অনুমতি দিলাম।

মানুষটি প্যানেলের একটি বোতাম স্পর্শ করতেই মৃদু একটা হিস হিস শব্দ শোনা যেতে থাকে, সিলিন্ডারগুলোর পাশ থেকে এক ধরনের সাদা ধোয়া বের হতে শুরু করে। য়ুহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী হচ্ছে?

কিছু না।

সাদা ধোয়াগুলো কী?

জলীয় বাষ্প। সিলিন্ডার থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে।

তাদের শরীর কী শীতল হতে শুরু করেছে?

হ্যাঁ। শুরু করেছে। মানুষটি মনিটরের এক জায়গায় হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, এইখানে তাদের শরীরের তাপমাত্রা দেখতে পাবে।

য়ুহা দেখতে পায় খুব ধীরে ধীরে তাদের শরীরের তাপমাত্রা কমে আসছে। ঠিক কী কারণে জানা নেই সে নিজের বুকের ভেতরে এক ধরনের বেদনা অনুভব করে। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, পুরোপুরি শীতল হতে কতক্ষণ সময় নেবে?

দুই থেকে তিন ঘণ্টার মাঝে করার নিয়ম। আমরা হয়তো আরো একটু তাড়াতাড়ি করব।

দুই ঘণ্টা পর য়ুহা শীতলঘরটিতে আবার ফিরে এসে প্যানেলগুলোর দিকে তাকালো। এগারোজন মানুষকে এগারোটি পাথরের মূর্তির মতো দেখাচ্ছে। তাদের শরীরে প্রাণের স্পন্দন দূরে থাকুক কোনো ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কোনো চিহ্ন নেই। য়ুহা দীর্ঘ সময় রায়ীনার নিষ্প্রাণ মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটির দেহে সত্যি কি আবার প্রাণ সঞ্চার করা যাবে? সেটি কি এই মেয়েটির জন্যে একটি জীবনের শুরু হবে না কি একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের শুরু হবে?

য়ুহা কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, এই এগারোজনকে দেখে-শুনে রাখবে কে?

আমাদের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক।

য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, যদি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কে কোনো সমস্যা হয়

মানুষটি শব্দ করে হেসে বলল, সমস্যা হবে না।

যদি হয়।

হবে না।

আমি কথার কথা বলছি। যদি হয়?

মানুষটি বলল, তুমি কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জান না বলে এ রকম বলছ। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কে কখনো সমস্যা হয় না। এখানে চারটি স্তর আছে। একটি স্তর নষ্ট হলে অন্যটা দায়িত্ব নেয়। সেটা নষ্ট হলে অন্যটা। যখন কোনো স্তর নষ্ট হয় সেটা নিজে থেকে নিজেকে সারিয়ে নেয়। অনেকটা জৈবিক প্রাণীর মতো শুধু প্রাণী থেকে অনেক বেশি চৌকস!

য়ুহা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, যদি কেউ কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক একটা নিউক্লিয়ার বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয় তাহলে কি এই এগারোজন মারা যাবে?

না। মারা যাবে না। এই সিলিন্ডারের যে ব্যাকআপ সিস্টেম আছে সেটা দায়িত্ব নেবে। তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। মানুষটি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, তুমি এ রকম অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন কেন জিজ্ঞেস করছ?

রুহা মাথা নাড়ল, বলল, মোটেও অদ্ভুত প্রশ্ন নয়। এগুলো অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। এগারোজন মানুষের জীবনের দায়িত্ব খুব সহজ দায়িত্ব নয়।

মানুষটি হা হা করে হেসে বলল, এই কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক পুরো মহাকাশযানটা মহাকাশে উড়িয়ে নেবে। শুধু এই এগারোজন নয় আমাদের সবার জীবনের দায়িত্ব কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের।

য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, ভাগ্যিস আমার কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক হয়ে জন্ম হয়নি–আমি কখনো এত বড় দায়িত্ব নিতে পারতাম না!

মানুষটি হেসে বলল, কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার এই দায়িত্বটি নেয়। রুটিনমাফিক নেয়।

মিটিয়া নামে কমান্ডের ডাক্তার মেয়েটি য়ুহার ওপর ঝুঁকে পড়ে তার কপালের পাশে একটা প্রোব লাগাচ্ছিল। মেয়েটি বেশ হাসিখুশি, দুক্ষ হাতে কাজ করতে করতে সে গুনগুন করে একটা ভালোবাসার গান গাইছে। প্রিয় মানুষটি মহাকাশে হারিয়ে গেছে, ভালোবাসার মেয়েটি জানালা দিয়ে দূর আকাশের একটি নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এটি কি তার প্রিয় মানুষের মহাকাশযান-গানের কথাগুলো এ রকম।

য়ুহা বলল, তুমি খুব সুন্দর গাইতে পার।

মিটিয়া হেসে বলল, তার অর্থ তুমি কখনো গান বা সঙ্গীত শোনো না! সে জন্যে বলছ আমি সুন্দর গাইতে পারি।

য়ুহা বলল, শুনি। সে জন্যেই বলছি। তোমার গলা খুব সুন্দর।

ধন্যবাদ।

কমান্ডের এই কঠিন কাজ করতে করতে তুমি গান গাইবার সময় পাও?।

পাই না। তাই কাজ করার সময় গুনগুন করি।

তুমি এখন কী করছ মিটিয়া।

মিটিয়া মাথা নেড়ে বলল, বিশেষ কিছুই না। তুমি যেহেতু প্রথমবার যাচ্ছ তাই তোমাকে নিয়ে আমরা একটু বেশি সতর্ক থাকছি, আর কিছু না।

আমাকে নিয়ে তোমাদের ব্যস্ত হতে হবে না। প্রশিক্ষণের সময় আমাকে খুব ভালোভাবে প্রস্তুত করে দিয়েছে।

প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আর আসল মহাকাশযানে অনেক পার্থক্য। প্রশিক্ষণ ক্যাম্প সবকিছু হয় নিয়মমাফিক। রুটিনমাফিক। সত্যিকারের মহাকাশযানে বিচিত্র বিচিত্র ঘটনা ঘটে। প্রত্যেকটা অভিযান হচ্ছে নতুন, প্রত্যেকটা অভিযান হচ্ছে বিচিত্র! এখন পর্যন্ত একটা অভিযানে আমি যাইনি যেখানে নতুন একটা কিছু ঘটেনি।

য়ুহা মাথা ঘুরিয়ে মিটিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার কী মনে হয়? এই অভিযানেও কী নতুন কিছু ঘটবে?

ঘটতেই পারে?

কী ঘটতে পারে বলে তোমার মনে হয়?

মিটিয়া খিল খিল করে হেসে বলল, সেটা আমি আগে থেকে কেমন করে বলব? তুমি যেহেতু নতুন মানুষ তুমি কিছু একটা কর।

য়ুহা মাথা নেড়ে বলল, সেটা তুমি খারাপ বলনি! আমারই কিছু একটা করা দরকার।

মিটিয়া বড় বড় দুটি বেল্ট হাতে নিয়ে বলল, এখন তুমি কয়েক মিনিট চুপ করে বস, তোমাকে এই সিটের সাথে এখন শক্ত করে বেঁধে ফেলতে হবে!।

য়ুহা নিঃশব্দে বসে রইল, মিটিয়া তার দক্ষ হাতে তাকে আরামদায়ক চেয়ারটায় আটকে ফেলে বলল, চমৎকার! এখন তুমি ইচ্ছে করলেও কোনো বিপদ ঘটাতে পারবে না।

য়ুহা বলল, আমার বিপদ ঘটানোর কোনো ইচ্ছে নেই!

শুনে খুশি হলাম। মিটিয়া য়ুহার হাত ধরে বলল, তোমার শরীরের সকল কাজকর্ম এখন কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। তোমার কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়। তার পরেও যদি মনে করো তোমার কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে তাহলে এই লাল লিভারটা টেনে ধরো।

ঠিক আছে।

তুমি এখন চুপচাপ শুয়ে থাক। কিছুক্ষণের মাঝেই আমরা রওনা দেব।

চমৎকার। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ মিটিয়া।

ধন্যবাদ য়ুহা।

মিটিয়া চলে যাবার পর য়ুহা আরামদায়ক চেয়ারটাতে সমস্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় অপেক্ষা করতে থাকে। তার এখনো বিশ্বাস হয় না যে সে সত্যি সত্যি একটি মহাকাশ অভিযানে যাচ্ছে। পদার্থ প্রতি পদার্থের বিক্রিয়ায় যে প্রচণ্ড শক্তির সৃষ্টি হবে সেই শক্তিতে এই মহাকাশ্যানটি তীব্র গতিতে ছুটে যাবে। সেই গতির কারণে সময় স্থির হয়ে যেতে চাইবে–সেই মুহূর্তগুলো কি সে অনুভব করতে পারবে? য়ুহা এক ধরনের উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।

ক্যাপ্টেন ক্ৰবের গলায় একটা ঘোষণা শুনতে পেল য়ুহা, শান্ত গলায় বলছে, মহাকাশযানের সবাইকে যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হতে বলছি। আমি ইঞ্জিন দুটো শুরু করছি এখন।

য়ুহা একটা চাপা গুমগুম শব্দ শুনতে পেল। হঠাৎ করে মহাকাশযানটি থরথর করে কাঁপতে থাকে। কিছু একটা হঠাৎ ঘটে গেল, য়ুহার মনে হতে থাকে অদৃশ্য কোনো একটা শক্তি তাকে যেন তার চেয়ারে প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরেছে! য়ুহা প্রাণপণে নিজেকে সেখান থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে, তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে চায়, সে বড় বড় মুখ করে নিঃশ্বাস নেয়, ৩ মনে হয় সে বুঝি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।

মহাকাশযানের মাঝে একটা লাল আলো কিছুক্ষণ পর পর ঝলকানি দিতে থাকে। একটা চাপা যান্ত্রিক শব্দ ভেসে আসে। পুরো মহাকাশযানটি থরথর করে এমনভাবে কাঁপতে থাকে যে য়ুহার মনে হতে থাকে পুরো মহাকাশযানটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যতই সময় যেতে থাকে য়ুহার মনে হয় অদৃশ্য শক্তিটা বুঝি তাকে আরো জোরে চেপে ধরছে। তার মনে হতে থাকে সে বুঝি তার চোখের পর্দাটাও আর খুলতে পারবে না। মাথায় এক ধরনের ভোতা যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকে, চোখের ওপর একটা লাল পর্দা খেলা করতে থাকে। মুখের ভেতরটা শুকিয়ে গেছে, সে প্রবল এক ধরনের তৃষ্ণা অনুভব করে। য়ুহার মনে হতে থাকে সে বুঝি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে, কিন্তু যে কোনো মূল্যে সে জেগে থাকতে চায়। য়ুহা প্রচণ্ড গতির সেই বিস্ময়কর শুরুটুকু নিজের চোখে দেখতে চায়, নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে চায়। প্রাণপণে সে চোখ খোলা রেখে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে থাকে। সে বিড়বিড় করে নিজেকে বলল, আমি অচেতন হব না। কিছুতেই অচেতন হব না। কিছুতেই হব না?

য়ুহা দাঁতে দাঁত কামড় দিয়ে শক্ত হয়ে বসে থাকে। সে অনুভব করতে থাকে তার শরীরের মাংসপেশিতে ভোতা এক ধরনের যন্ত্রণা। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, মনে হচ্ছে কেউ যেন টেনে তার মুখের মাংসপেশি পেছন দিকে সরিয়ে নিয়েছে, মুখ থেকে দাঁতগুলো বের হয়ে আসছে, চেষ্টা করেও সে সেটা বন্ধ করতে পারছে না। এটি একটি অভূতপূর্ব অনুভূতি। য়ুহা নিজেকে বোঝাল, পৃথিবীর খুব বেশি মানুষের এই অনুভূতিটি অনুভব করার সৌভাগ্য হয়নি। আমি নিঃসন্দেহে একজন সৌভাগ্যবান মানুষ। অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মানুষ।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি য়ুহা এক সময় এই ভয়ঙ্কর পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেল। সে অনেক কষ্ট করে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। কোনো একটা বিচিত্র কারণে সে পরিষ্কার করে কিছু চিন্তা করতে পারছিল না, মাথার ভেতরে কিছু একটা দপদপ করছে, সে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে অপেক্ষা করছে কখন এটি শেষ হবে। বুকের ওপর চেপে বসে থাকা অদৃশ্য পাথরটি সরে যাবে, আবার সে উঠে বসতে পারবে।

য়ুহার কাছে যখন মনে হয় বুঝি অনন্তকাল কেটে গেছে তখন হঠাৎ করে মহাকাশযানের ত্বরণ কমে আসতে শুরু করে। য়ুহার হঠাৎ করে মনে হতে থাকে তার সারা শরীর বুঝি পাখির পালকের মতো হালকা হয়ে আসছে। যখন মিটিয়া এসে তার বেল্টটি চাপ দিয়ে খুলে তাকে বের করে আনল, তখন য়ুহা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, অনেক ধন্যবাদ মিটিয়া, আমার মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি আর কখনো এই অদৃশ্য দানবের হাত থেকে মুক্তি পাব না!

মিটিয়া য়ুহার দিকে তাকিয়ে বলল, প্রথমবার হিসেবে তুমি চিৎকার করেছ য়ুহা। তোমাকে নিয়ে আমাদের রীতিমত গর্ব হচ্ছে।

ধন্যবাদ মিটিয়া।

এরপরের ধাপে তুমি নিশ্চয়ই আরো ভালো করবে!

পরের ধাপ?

হ্যাঁ। এর পরের ধাপ!

য়ুহা ভুরু কুঁচকে বলল, এর পরের ধাপ মানে কী?

মহাকাশযানটি ক্রমাগত তার গতিবেগ বাড়িয়ে চলে। একবারে তো করা যায় না, তাই এটাকে ধাপে ধাপে করতে হয়। প্রত্যেকবারই তার গতিবেগ আগের থেকে বাড়িয়ে তোলা হয়। মাঝে মাঝে আমরা বিরতি দিই, তখন দৈনন্দিন কাজগুলো সেরে নিতে হয়। খাওয়া-দাওয়া করি।

য়ুহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, আবার মহাকাশযানের গতি বাড়ানো হবে? আবার আমাকে মহাকাশযানের চেয়ারে বেল্ট দিয়ে বেঁধে বসতে হবে?

হ্যাঁ। মিটিয়া মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, একবার নয়, অনেকবার।

অনেকবার?

হ্যাঁ। প্রত্যেকবারই আগেরবার থেকে বেশি তীব্রতায় এবং বেশি সময় ধরে।

য়ুহা ফ্যাকাসে মুখে বলল, সত্যি?

হ্যাঁ, সত্যি। তবে ভয় নেই-তুমি দেখবে ধীরে ধীরে পুরো ব্যাপারটায় তুমি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছ!

তার মানে আমার আর কষ্ট হবে না?

মিটিয়া য়ুহার হাত স্পর্শ করে বলল, আমি সেটা বলিনি। কষ্ট যেটুকু হবার সেটা তো হবেই।

তাহলে?

কষ্ট সহ্য করা শিখে যাবে।

ঘণ্টা দুয়েক পর য়ুহা আবার আবিষ্কার করল, তাকে মহাকাশযানের আরামদায়ক চেয়ারটিতে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকে। বিশাল মহাকাশযানটি আবার ঝটকা দিয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। মহাকাশযানের ভেতর একটা লাল আলোর ঝলকানি দেখা যায়, য়ুহার মনে হতে থাকে তার বুকের ওপর একটা অদৃশ্য পাথর ধীরে ধীরে চেপে বসেছে। হব না। আমি অচেতন হব না। য়ুহা বিড়বিড় করে বলল, আমি কিছুতেই অচেতন হব না।

য়ুহা তার সমস্ত স্নায়ুকে শক্ত করে পাথরের মতো বসে থাকে। মনে হতে থাকে বুঝি অনন্তকাল কেটে যাচ্ছে।

(চলবে)