দ্বিতীয় এবং শেষ পর্ব

#বেজি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল



আমরা যখন হেঁটে আসছিলাম— এই কয়েক হাজার বেজি ইচ্ছে করলে আমাদের ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারত।” শ্রাবণী বলল, “কেন করেনি কে জানে।”

জয়ন্ত কিংবা নিয়াজ কোনো কথা বলল না।

“একটি দুটি খ্যাপা জন্তু-জানোয়ার থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, কিন্তু এরকম কয়েক হাজার থেকে রক্ষা পাবে কেমন করে?”

নিয়াজ একটু নড়েচড়ে বলল, “জব্বার মিয়া। আমাদের একমাত্র ভরসা জব্বার মিয়া।”

শ্রাবণী বলল, “কীভাবে?”

জব্বার মিয়া এসে যখন দেখবে আমরা নেই, তখন আমাদের খোঁজ নেয়ার একটা ব্যবস্থা করবে না?”

“সেটা কখন করবে? ততক্ষণ আমরা কী করব?”

“ততক্ষণ যেভাবেই হোক আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।”

জয়ন্ত এতক্ষণ চুপচাপ ওদের কথা শুনছিল। এবারে সোজা হয়ে বসে বলল, “দ্যাখ— আমরা মনে হয় ব্যাপারটাকে একটু বেশি মেলোড্রামাটিক করে ফেলছি। বাইরে যে-প্রাণীটা দুই পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রাণীটা কী? প্রাণীটা হচ্ছে বেজি। একটা বেজির ভয়ে আমরা আকুপাকু করব সেটা ঠিক হচ্ছে না—”

শ্রাবণী বাধা দিয়ে বলল, “একটা নয় কয়েক হাজার -”

জয়ন্ত প্রায় নাটকের ভঙ্গিতে পা দিয়ে শব্দ করে বলল, “কয়েক হাজার হোক আর কয়েক লক্ষ হোক তাতে কিছু আসে যায় না। বেজি হচ্ছে বেজি। আমি এই লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এদের বারোটা বাজিয়ে দেব।”

অনেকক্ষণ পর শ্রাবণীর মুখে হাসি ফুটে উঠল, বলল, “শুনে খুশি হলাম। এই পিটানোর কাজটা কখন শুরু করবি? এখনই বের হবি লাঠি হাতে?”

জয়ন্ত একটু ক্রুদ্ধ চোখে শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই ঠাট্টা করছিস? এটা ঠাট্টার সময়?”

শ্রাবণী বলল, “আই অ্যাম সরি। তুই ঠিকই বলেছিস, এটা ঠাট্টার সময় নয়, কিন্তু তুই একটা লাঠি নিয়ে ইয়া-আলী বলে লাফঝাঁপ দিয়ে বেজি মারছিস, দৃশ্যটা কল্পনা করে কেমন জানি হাসি পেয়ে গেল।”

জয়ন্ত কোনো কথা না বলে একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমি বিশ্বাস করতে পারি না একজন মানুষ এরকম সময়ে ঠাট্টা করতে পারে।”

নিয়াজ বলল, “এটা দোষের ব্যাপার না, এরকম একটা সময়ে যে ঠাট্টা করতে পারে বুঝতে হবে তার মাথা ঠাণ্ডা, বিপদের সময় সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”

জয়ন্ত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “তা ঠিক।”

“কাজেই এখন ঠাণ্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভেবে দেখা যাক।” নিয়াজ শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই শুরু কর।”

“আমি? আমি কেন?”

“এক্ষুনি না প্রমাণ করে দিলাম যে তোর মাথা সবচেয়ে ঠাণ্ডা।”

“আমার মাথা ঠাণ্ডা না। কখনো ছিল না। তোর প্রমাণে গোলমাল আছে।”

“ঠিক আছে, জয়ন্ত তাহলে তুই বল।”

জয়ন্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “প্রথমে উপরতলাটা সিকিউর করতে হবে যেন ঐ বদমাইশ বেজিগুলো উপরে আসতে না পারে।”

“সেটা কীভাবে করবি?”

“নিচের দরজা উপরের দরজা সবকিছু বন্ধ রেখে।”

“তারপর?”

“তারপর এই পুরো বাসাটি খুঁজে দেখতে হবে কী কী জিনিসপত্র আছে। সেই জিনিসপত্র দিয়ে একটা নতুন প্ল্যান করতে হবে।”

“ভেরি গুড।”

“বন্দুকটা খুঁজে পেলে খারাপ হয় না।’’

“যদি না পাই?”

“তাহলে আপাতত আমাদের হাতে একমাত্র অস্ত্র হচ্ছে এই ম্যাচটা।” জয়ন্ত পকেট থেকে ম্যাচটা বের করে বলল, “যদি সিগারেট না খেতাম তাহলে এই ম্যাচটাও থাকত না।”

“তাহলে আপাতত পরিকল্পনা হচ্ছে এই বাসাটিকে দুর্গের মতো ব্যবহার করে থাকা?”

জয়ন্ত শ্রাবণীর দিকে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।”

“খাওয়াদাওয়া?”

“তুই যদি কিছু না এনে থাকিস তাহলে বন্ধ।”

“আমি কোত্থেকে আনব?” ব্যাগ হাতড়ে কয়েক টুকরো চকলেট বের করে বলল, “এই হচ্ছে একমাত্র ফুড সাপ্লাই।”

নিয়াজ বলল, “আমরা নিশ্চয়ই এখানে মাসখানেক থাকার পরিকল্পনা করছি না, বড় জোর আজকের দিনটা।”

“তা ঠিক।” জয়ন্ত দুর্বলভাবে হেসে বলল, “কিন্তু খাওয়ার কথা বলতেই কেমন জানি খিদে পেয়ে গেল!”

নিয়াজ হাসার চেষ্টা করে বলল, “শুধু-শুধু খাওয়ার কথা চিন্তা না করে কাজে লেগে যাওয়া যাক।”

“হ্যাঁ।” জয়ন্ত বলল, “একজনকে সবসময় থাকতে হবে বারান্দার কাছাকাছি। বেজির গুষ্টি কোনো বদমাইশি করার চেষ্টা করলেই অন্যদের জানিয়ে দেবে।”

শ্রাবণী বলল, “আমি বসে বসে এই বেজির বাচ্চাগুলো দেখতে পারব না। তোরা কেউ দ্যাখ।”

জয়ন্ত বলল, “ঠিক আছে, আমি দেখছি। তোরা ল্যাবরেটরি, স্টোর রুম, রেস্ট এরিয়া খুঁজে দেখ কী কী পাওয়া যায়।”

“কোনো বিশেষ কিছু খুঁজব নাকি?”

“একটা মেশিনগান হলে মন্দ হয় না!”

জয়ন্তের কথা শুনে দুজনেই শব্দ করে হাসল এবং হঠাৎ করে বুঝতে পারল দীর্ঘ সময় পর এই প্রথমবার তারা হাসছে। আনন্দহীন হাসি, কিন্তু তবুও হাসি। 

ল্যাবরেটরিতে বেশ কিছু জিনিসপত্র পাওয়া গেল, যেমন বেশ কিছু সলভেন্ট, এগুলো দিয়ে এই মুহূর্তে কোনোকিছু পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই, কিন্তু বিশাল একটা আগুন জ্বালানোর জন্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। বড় বড় কয়েকটা কাঁচের বোতলে কিছু এসিড এবং ক্ষার পাওয়া গেল। ড্রয়ারে প্রচুর সিরিঞ্জ রয়েছে। সিরিঞ্জের ভেতরে এই এসিড কিংবা ক্ষার ভরে কিছু ভয়ানক অস্ত্র তৈরি করা যেতে পারে।এছাড়াও ধারালো ব্লেড এবং চাকু রয়েছে। রবারের গ্লাভস রয়েছে প্রচুর। যদিও দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে খানিকটা আঠা আঠা হয়ে আছে। ওরা সবচে খুশি হলো চোখের ওপর পরার জন্যে প্লাস্টিকের গগলস পেয়ে, পাজি বেজিগুলো যদি চোখের ওপর হামলা চালাতেই বেশি পছন্দ করে তাহলে এগুলো কাজে লাগবে। ল্যাবরেটরির ড্রয়ারে তারা একটা বাইনোকুলার পেয়েই সেটা সাথে সাথে জয়ন্তকে দিয়ে এল, বেজিগুলোর কাজকর্ম এখন খুব ভালোভাবে দেখা যাবে। স্টোররুমে অনেক ধরনের ব্যাবহারি জিনিস পাওয়া গেল। মোমবাতি দুটি শেষ হয়ে আসছিল, সৌভাগ্যক্রমে সেখানে কয়েক বাক্স মোমবাতি পাওয়া গেল। নাইলনের দড়ি, স্ক্রু ড্রাইভার, করাত-হাতুড়ি এ-ধরনের বেশকিছু প্রয়োজনীয় জিনিসও ছিল। বেশকিছু ব্যাটারি ছিল কিন্তু সেগুলো কোনো কাজে আসবে না, নষ্ট হয়ে ভেতর থেকে আঠালো ক্যামিকেল বের হয়ে আসছে। তবে সবচেয়ে দরকারি জিনিসটা তারা পেয়ে গেল বিশ্রাম নেবার ঘরে। সোফার কুশনের নিচে লুকিয়ে রাখা একটা দোনলা বন্দুক এবং ড্রয়ারের ভেতরে বন্দুকের গুলি। বন্দুকটা হাতে নিয়ে নিয়াজের মুখে হাসি ফুটে ওঠে, যুদ্ধবাজ জেনারেলের মতো বন্দুকটা উপরে তুলে বলল, “এবারে দেখে নেব বেজির বাচ্চা বেজিদের।”

শ্রবণী বলল, “এভাবে কথা বলিস না, তোকে সন্ত্রাসীর মতো দেখাচ্ছে।’’

নিয়াজ মাথা নেড়ে বলল, “বন্দুক জিনিসটা নিশ্চয়ই খারাপ। হাতে নিলেই নিজের ভিতরে কেমন জানি মান্তান-মাস্তান ভাব এসে যায়।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ, হাতে নিয়ে দ্যাখ।”

শ্রাবণী হাতে নিয়ে বলল, “কোথায়? আমার তো হাতে নিয়ে নিজেকে কীরকম জানি বেকুব-বেকুব লাগছে!”

নিয়াজ বলল, “সেটাই ভালো। আসলে বেকুব-বেকুবই লাগার কথা।”

“আয় জয়ন্তকে সুসংবাদটা দিই, এখন আমাদের হাতে অস্ত্র আছে। মেশিনগান না হলেও বন্দুক তো বটেই!”

জয়ন্ত বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে বারান্দায় গুড়ি মেরে বসেছিল, পায়ের শব্দ শুনে চোখ তুলে তাকিয়ে নিয়াজ আর শ্রাবণীকে বন্দুক হাতে আসতে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বন্দুক! কোথায় পেলি?”

“সোফার কুশনের নিচে লুকানো ছিল।’’ শ্রাবণী বলল, “বন্দুকটা হাতে নেয়ার পর থেকে নিয়াজ মাস্তান-মাস্তান ব্যবহার করছে!”

জয়ন্ত বাইনোকুলারটা শ্রাবণীর কাছে দিয়ে বন্দুকটা হাতে নিয়ে চাপ দিয়ে সেটা খুলে ব্যারেলের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে বলল, “ময়লা হয়ে আছে, পরিষ্কার করতে হবে।”

শ্রাবণী অবাক হয়ে বলল, “তুই বন্দুক চালাতে পারিস?”

“আমার এক মামা পাখি শিকার করতেন, তাঁর সাথে মাঝে মাঝে যেতাম।”

“পাখি শিকার!” শ্রাবণী চোখ কপালে তুলে বলল, “ইশ! কী নিষ্ঠুর।”

“তুই কি চিকেন খাস না?”

“খাই। কেন?”

“চিকেন এক ধরনের পাখি। সেটা জ্যান্ত খাওয়া হয় না। মেরে কেটেকুটে খাওয়া হয়, সেটা নিষ্ঠুর না?”

নিয়াজ বাইনোকুলারটা নিয়ে বেজিগুলোকে দেখার চেষ্টা করছিল। জয়ন্ত বলল, “দেখেছিস? মোস্ট ফেসিনেটিং।’’

শ্রাবণী জিজ্ঞেস করল, “কী জিনিজ মোস্ট ফেসিনেটিং?”

“এই বেজিগুলো। মনে হচ্ছে এদের মাঝে একটা সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।”

“এতে অবাক হবার কী আছে? প্রায় জন্তুদেরই তো সমাজব্যবস্থা থাকে। জংলী কুকুর, হায়েনা, হাতি—”

“না, না, সেরকম না। এখানে মনে হচ্ছে এদের দায়িত্ব ভাগ করা আছে। কেউ কেউ শ্রমিক, কেউ কেউ—”

“আঁতেল?”

জয়ন্ত শব্দ করে হেসে বলল, “হ্যাঁ অনেকটা সেরকম। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আর ডিসকভারি চ্যানেলে সবসময়ে দেখেছি জন্তু-জানোয়ারে সবচেয়ে যেটা বেশি শক্তিশালী সেটাই হচ্ছে নেতা। কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে অন্য ব্যাপার।”

“কী ব্যাপার?”

“কড়ই গাছের নিচে শুকনো হাড়-জিরজিরে একটা বেজি বসে আছে আর অনেকগুলো ধুমসো মোটা মোটা বেজি সেটাকে পাহারা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো বেজি দেখা করতে আসে, সেটাকে এসকর্ট করে নিয়ে যায়, হাড়-জিরজিরে বুড়ো বেজিটার সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে থাকে। আর সবচেয়ে পিকুলিয়ার—”

“কী?”

“মনে হয় এই বেজিগুলোর একটা ভাষা আছে, নিজেদের মাঝে এরা কথা বলে। মনে হয় হাড়-জিরজিরে বুড়ো বেজিটা হাত নাড়িয়ে কথা বলে, কিছু একটা অর্ডার দেয়। সে-ই নেতা।”

“সত্যি?’’

“হ্যাঁ, দ্যাখ বাইনোকুলারটা দিয়ে।”

শ্রাবণী বাইনোকুলারটা চোখে দিয়ে দূরে তাকায়। কড়ই গাছের নিচে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে একটা শুকনো দুর্বল বেজি বসে আছে। গাছটিকে ঘিরে আরো অনেকগুলো বেজি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই বোঝা যায়, এই শুকনো হার-জিরজিরে দুর্বল বেজিটি আসলে দুর্বল নয়, অন্য-বেজিগুলো ক্রমাগত তার কাছে আসছে এবং যাচ্ছে, আদেশ নিচ্ছে এবং ছুটে চলে যাচ্ছে। যদি ব্যাপারটি এরকম পরিবেশে না হত শ্রাবণী নিশ্চিতভাবে এর মাঝে খানিকটা কৌতুক খুঁজে পেত, কিন্তু এখন সে কোনো কৌতুক খুঁজে পেল না। 

ঠিক দুপুরবেলা বেজিগুলো প্রথমবার তাদের আক্রমন করল। নিয়াজ বাইনোকুলার চোখে দিয়ে বসেছিল। হঠাৎ করে সে চিৎকার করে বলল, “বেজিগুলো কিছু একটা করছে।”

জয়ন্ত ল্যাবরেটরি-ঘরে কিছু কাঠের টুকরায় কাপড় বেঁধে মশাল তৈরি করছিল। সেগুলো টেবিলে রেখে চিৎকার করে জানতে চাইল, “কী করছে?”

“ছুটোছুটি করছে।”

“কেন?”

“বুঝতে পারছি না।”

কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই কারণটা বোঝা গেল। বেজিদের বিশাল বাহিনী থেকে একটা বিরাট অংশ হঠাৎ করে বাসাটির দিকে ছুটে আসতে শুরু করল। এর মাঝে তারা বাসার দরজা জানালা যতটুকু সম্ভব বন্ধ করে দিয়েছিল কিন্তু তবু বেজিগুলোকে নিরুৎসাহিত করা গেল না। পুরানো বাসার ফাঁকফোকর দিয়ে সেগুলো পিলপিল করে ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। জয়ন্ত হাতের বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শ্রাবণী আর নিয়াজ বড় বড় লাঠিগুলো নিয়ে অপেক্ষা করে। “এই ঘরের ভেতরে যদি ঢুকে যায় তাহলে গুলি করব। ঠিক আছে?” অন্য দুজন মাথা নাড়ল। “মশালগুলো রেডি আছে। সলভেন্টে চুবিয়ে শুধু আগুন লাগাতে হবে।”

“ঠিক আছে।”

“সিরিঞ্জগুলোতে এসিড ভরে রেখেছি, খুব কাছে এলে সেটা পুশ করে দেয়া যেতে পারে, কিন্তু সেটা হচ্ছে একেবারে নিরুপায় হলে। লাস্ট রিসোর্ট।’’

শ্রাবণী বলল, “আমার মনে হয় সবাই চোখে প্ল্যাস্টিকের গগলস পরে নিই।”

“হ্যাঁ, যদি কোনোভাবে ঘরে ঢুকে যায়, তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।’’

বেজিগুলো বুদ্ধিমান, কাজেই তারা খুব বুদ্ধিমানের মতো কিছু করবে এরকম একটা আশঙ্কা ছিল। কিন্তু দেখা গেল সেরকম বুদ্ধিমানের মতো কিছু করল না। দল বেঁধে বেজিগুলো তাদের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করতে লাগল। নিচে দরজা জানালা বন্ধ থাকলেও জানালার ভাঙা কাঁচ এবং ঘরে ফাঁকফোকর দিয়ে সেগুলো ঢুকতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মাঝেই সিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দ শোনা গেল এবং তারপরই ল্যাবরেটরির দরজায় সেগুলো ধাক্কা দিতে শুরু করল। ল্যাবরেটরির দরজাটা ছিটকিনি দিয়ে বন্ধ করে রাখা আছে। কয়েকটা বেজি সেগুলো ধাক্কা দিয়ে খুলতে পারবে না। তবু তারা তিনজন আতঙ্কে শিটিয়ে রইল। শুধু-যে দরজা ধাক্কা দিচ্ছে তা নয়, তারা দেখতে পেল দরজার নব ঘুরিয়ে বেজিগুলো দরজা খোলার চেষ্টা করছে। ব্যাপারটি অবিশ্বাস্য যে বেজির মতো একটা প্রাণী জানে দরজা খোলার জন্যে নব ঘোরাতে হয়। কী করবে বুঝতে না পেরে জয়ন্ত দরজার ভেতর থেকে কয়েকটা লাথি মেরে চিৎকার করে বলল, “বদমাইশ বেজির বাচ্চা বেজি। ভাগ এখান থেকে, না হলে খুন করে ফেলব গুলি করে।”

জয়ন্তের কথা শুনে এক মুহূর্তের জন্যে হঠাৎ করে দরজায় ধাক্কা থেমে গেল। মনে হল জয়ন্তের কথা বুঝি বুঝতে পেরেছে। কিন্তু পরমুহূর্তে আবার দরজায় ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে। কান পেতে ওরা শুনতে পেল, বেজিগুলো মুখ দিয়ে বিচিত্র নানা ধরনের শব্দ করছে। নিয়াজ আর শ্রাবণী কি করবে বুঝতে পারছিল না। যদি কোনোভাবে দরজা ভেঙে বেজিগুলো ঢুকে যেতে পারে তাহলে কী হবে তারা চিন্তাও করতে পারে না। এক মুহূর্তে হয়তো তাদের ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে।

হঠাৎ ঝনঝন করে কোথায় জানি কাচ ভাঙার শব্দ হল। জয়ন্ত বন্দুক হাতে ল্যাবরেটরির পিছনে ছুটে গিয়ে হতবাক হয়ে যায়। বেজিগুলো আসলেই বুদ্ধিমান, সামনে তাদেরকে ব্যস্ত রেখে সেগুলো পিছন দিয়ে ঢুকে পড়ছে। ল্যাবরেটরির পিছনে পর্দার পিছনে কাঁচের জানালা ভেঙে বেজিগুলো ঢুকতে শুরু করেছে। জয়ন্ত হতবাক হয়ে দেখল, বেজিগুলো মুখে পাথরের টুকরো ধরে সেগুলি দিয়ে কাচের ওপর আঘাত করে কাঁচ ভেঙে ফেলছে। কাঁচের ধারালো ভাঙা টুকরোয় বেজিগুলোর পা কেটে যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলো ভ্রুক্ষেপ করল না, লাফিয়ে লাফিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। কিছু বোঝা আগেই জয়ন্ত টের পেল গোটাদশেক বেজি তাকে ঘিরে ফেলেছে। জয়ন্ত পিছনে ঘুরে লাথি দিয়ে কয়েকটা বেজিকে দূরে ছুড়ে দিয়ে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল, সে পিছন থেকে কোনোটাকে আক্রমন করতে দিতে চায় না। কিছু বোঝার আগেই একটা বেজি লাফিয়ে তার শরীর বেয়ে উপরে উঠে তার চোখে কামড় দেয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু শক্ত প্ল্যাস্টিকের গগলস থাকায় সেটা প্ল্যাস্টিকের উপর তার ধারালো দাঁতের চিহ্ন রেখে নিচে গড়িয়ে পড়ল। জয়ন্ত হাত দিয়ে বেজিটাকে সরিয়ে দিয়ে বন্দুক দিয়ে গুলি করার চেষ্টা করে কিন্তু বেজিগুলো ক্রমাগত ছুটছে বলে কিছুতেই নিশানা ঠিক করতে পারে না।

জয়ন্তের চিৎকার শুনে নিয়াজ আর শ্রাবণী লাঠি হাতে ছুটে এসে বেজিগুলোকে আঘাত করার চেষ্টা করে। প্রচণ্ড আঘাতে বেজিগুলো ছিটকে পড়ে বিচিত্র শব্দ করতে শুরু করে। জয়ন্ত ঘরের ভেতরে গুলি করার সাহস পায় না বলে বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করে কয়েকটার মাথা থেঁতলে দিল। বেজিগুলো এক ধরনের জান্তব চিৎকার শব্দ করে তাদের শরীরে বেয়ে উঠার চেষ্টা করে চোখে কামড় দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু প্ল্যাস্টিকের গগলস থাকায় তারা প্রতিবারই রক্ষা পেয়ে গেল। ঘরের ভেতরে ভয়ঙ্কর একটা নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে গেছে। একটার পর একটা বেজি এসে ঢুকছে, কতক্ষণ এদের সাথে টিকে থাকতে পারবে তারা বুঝে উঠতে পারছিল না। অসম্ভব দ্রুত বেজিগুলো কিছু বোঝার আগে তাদের শরীর বেয়ে উপরে উঠে কামড়ে ধরার চেষ্টা করতে থাকে। জয়ন্ত কোনমতে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে চিৎকার করে বলল, “মশালগুলো নিয়ে আয়—”

শ্রাবণীর শরীরে কয়েকটা বেজি কামড়ে ধরেছে, তার মাঝে সে কোনোভাবে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে ছুটে গিয়ে মশালটা নিয়ে সলভেন্টের ড্রামে ভিজিয়ে নিয়ে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে দিল। সাথে সাথে সেটা দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। দ্বিতীয় মশালটা জ্বালিয়ে সে জয়ন্ত আর নিয়াজের কাছে ছুটে এল, একটা মশাল নিয়াজের হাতে দিয়ে অন্য মশাল নিয়ে এলোপাথাড়ি বেজিগুলোকে মারতে থাকে। সারা ঘরে বেজির লোম পোড়া একটা গন্ধে ভরে গেল। হঠাৎ করে বাইরে থেকে বেজি ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল। ভেতরের বেজিগুলোও ঘরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে পড়ে, আগুন জিনিসটাকে মনে হয় সত্যিই ওরা ভয় পায়।

জয়ন্ত হিংস্র গলায় চিৎকার করে বলল, “কোথায় পালিয়েছিস বদমাইশ বেজির দল? সবগুলোকে খুন করে ফেলব। জবাই করে ফেলব, পুড়িয়ে কয়লা করে দেব—”

নিয়াজ আর শ্রাবণীও বেজিগুলোকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু বড় ল্যাবরেটরির আনাচে-কানাচে কোথাও লুকিয়ে আছে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এক পলকের জন্যে একটা দেখতে পেলেও সেটা চোখের পলকে অন্য কোথাও সরে যাচ্ছে। হঠাৎ এক কোণা থেকে একটা বেজি ছুটে এসে অবিকল মানুষের গলায় বলল, “ক্রিঁকি, ক্রিঁকি” এবং এরকম শব্দ করতে করতে সেটি জানালার ফুটো দিয়ে বের হয়ে গেল। সাথে সাথে ঘরের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা বেজিগুলো ক্রিঁকি, ক্রিঁকি শব্দ করতে করতে ছুটে পালিয়ে যেতে শুরু করে। 

নিয়াজ, শ্রাবণী আর জয়ন্ত প্রচণ্ড আক্রোশে পালিয়ে যেতে থাকা বেজিগুলোকে লাঠি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করে কয়েকটার মাথা থেঁতলে দিল। শেষ বেজিটি পালিয়ে যাবার পর তারা ল্যাবরেটরি-ঘরটির চারিদিকে তাকাল। সমস্ত ঘরের লণ্ডভণ্ড অবস্থা। গোটা-ছয়েক বেজি মরে পড়ে আছে। গোটা-দশেক অর্ধমৃত হয়ে এখানে-সেখানে ছটফট করছে। নিজেদের দিকে তাকানো যায় না, চোখগুলো বেঁচে গিয়েছে কিন্তু শরীরের প্রায় পুরোটুকু ক্ষতবিক্ষত। জামাকাপড় ছিঁড়ে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে আছে। 

শ্রাবণী নিয়াজ এবং জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে দেখতে যদি তোদের মতো দেখাচ্ছে তাহলে খবর বেশি ভালো নয়।”

জয়ন্ত বন্দুকটা হেলান দিয়ে রেখে বলল, “তোকে আরো বেশি খারাপ দেখাচ্ছে।”

“কত খারাপ?”

“ডাইনি বুড়ির মতো।”

“থ্যাংক ইউ জয়ন্ত। তোর মতো আন্তরিক সমবেদনাসম্পূর্ণ মানুষ পাওয়া খুব কঠিন।”

নিয়াজ নিজের হাতপায়ের দিকে লক্ষ্য করে বলল, “আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এটা ঘটেছে।”

“ঘটেছে না। বল ঘটছে।” শ্রাবণী বলল, “আমি বাজি রেখে বলতে পারি এই বদমাইশগুলি আর দশ মিনিটের মাঝে ফেরত আসছে।”

নিয়াজ কাঁচভাঙা জানালাগুলোর দিকে তাকাল, বলল, “আবার যখন আসবে তখন কী করব?”

জয়ন্ত দাঁড়িয়ে বলল, “জানালাগুলো কাঠের তক্তা দিয়ে লোহা মেরে বন্ধ করে দিতে হবে।”

“তক্তা কোথায় পাবি?”

জয়ন্ত লেবরেটরির চেয়ার টেবিল দেখিয়ে বলল, “এগুলো ভেঙে বের করতে হবে।”

নিয়াজ প্রথমে ভাবল জয়ন্ত ঠাট্টা করছে, কিন্তু তার মুখে কৌতুকের কোনো চিহ্ন নেই। নিয়াজ একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “চল তাহলে, দেরি করে লাভ নেই।”

শ্রাবণী ঘরের মৃত এবং অর্ধমৃত বেজিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “এগুলো কী করব?”

“দরজা খুলে বাইরে ফেলে বদমাইশগুলো দেখলেই গা ঘিনঘিন করছে।”

কিছুক্ষণের মাঝে দেখা গেল সবাই মিলে ঘরটকে আবার সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছে। 

পরের আক্রমনটা কখন হবে কেমন করে হবে সেটা এখনো কেউ জানে না।

দেয়ালে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে তিনজন বসে আছে। শরীরের নানা জায়গায় রক্ত শুকিয়ে আছে। কোথাও পানি নেই। তিনজন তিনটি বিকারে খানিকটা এলকোহল নিয়ে একটুকরো কাপড়ে ভিজিয়ে রক্ত মোছার চেষ্টা করছে। 

শ্রাবণী বলল, “শুধু শুধু চেষ্টা করছি। বেজির দল আবার এল বুঝি।”

“প্রথম ধাক্কাটা তো সামলে নিয়েছি।”

শ্রাবণী জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, “পরের ধাক্কাটা হবে আরো শক্ত।”

নিয়াজ একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমরা কি একটার পর একটা ধাক্কা সহ্য করতে থাকব? আমাদের কী এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে না?”

“হ্যাঁ। যেতে হবে।”

“সেটা কীভাবে করব? এই ল্যাবরেটরিতে অল্প কয়টা বেজি আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়ে দিয়েছে, বাইরে আমরা কেমন করে যাব? আমাদের ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে না?’’

জয়ন্ত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই শ্রাবণী চিৎকার করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে অন্য দুজন তাকিয়ে দেখে একটা সাপ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। 

জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, “ভয় পাবি না, কেউ ভয় পাবি না। আমার কাছে বন্দুক আছে, আরেকটু কাছে এলেই গুলি করে দেব।”

জয়ন্ত কথা শেষ করার আগেই দ্বিতীয় সাপটিকে দেখা গেল এবং সেটি পুরোপুরি ঘরের ভেতরে আসার আগেই দরজার নিচে দিয়ে তৃতীয় সাপটির মাথা প্রবেশ করলো।

শ্রাবণী পেছনে সরে গিয়ে একটা টেবিলের ওপরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “কী হচ্ছে এখানে? কী হচ্ছে? এত সাপ কোথা থেকে আসছে? কোথা থেকে আসছে?”

শ্রাবণীর কথা শেষ হবার আগেই আরো দুটি সাপের মাথা উঁকি দিল। জয়ন্ত আতঙ্কিত হয়ে দেখল, দরজার নিচে দিয়ে আরো সাপের মাথা কিলবিল করছে। জয়ন্ত হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, হঠাৎ করে সে এত সাপ কোথা থেকে আসছে খানিকটা অনুমান করতে পারে। কিন্তু এখন সেটা নিয়ে চিন্তা করার সময় নেই। সে বন্দুকটা তুলে চিৎকার করে বলল, “সরে যা সবাই, পেছনে সরে যা।”

জয়ন্ত বন্দুকটা তুলে বড় কয়েকটা সাপ লক্ষ করে নিশানা করে ট্রিগার টেনে ধরল। গুলি হবে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না, কিন্তু গুলি হল। বন্ধ ঘরে সেই বিকট শব্দে সবার কানে তালা লেগে যায়। ধোঁয়া সরে গেলে দেখতে পেল সাপগুলো গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। কয়েকটা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারা অনেকগুলো বেজির চিৎকার শুনতে পেল, সেগুলো দুদ্দার করে সিঁড়ি দিয়ে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে।

নিয়াজ হাতের লাঠি দিয়ে সাপগুলোকে মারার চেষ্ট করে। কয়েকটার শিরদাঁড়া ভেঙে দিল। কয়েকটা ল্যাবরেটরির কোনায় লুকিয়ে গেল। 

প্রাথমিক উত্তেজনাটুকু কেটে যাবার পর শ্রাবণী কাঁদো-গলায় বলল, “দেখলি? দেখলি বেজিগুলো কী করছে?”

“সাপ ধরে এনে ছেড়ে দিচ্ছে।”

“কত বড় বদমাইশ দেখেছিস?”

নিয়াজ হাতের লাঠিটা হাতে নিয়ে সতর্ক-চোখে ঘরের চারপাশে তাকাতে তাকাতে বলল, “তুই এমনভাবে কথা বলছিস যেন ওগুলো বেজি না, মানুষ।”

“হ্যাঁ।” শ্রাবণী মাথা নেড়ে বলল, “ফিচলে বুদ্ধি দেখেছিস?”

জয়ন্ত বলল, “পড়িস নি, অহি-নকুল সম্পর্ক। এই হচ্ছে সেই অহি-নকুল। নকুল অহিকে ধরে এনে এখানে ছেড়ে দিচ্ছে।”

“এরপরে কী করবে?”

“ভাগ্যিস এখনো আগুন জ্বালানো শিখেনি, যদি জানত তাহলে আমি হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর বাসায় আগুন লাগিয়ে দিত।”

নিয়াজ একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “আঁতেলদের মতো শুধু কথা বলিস না, কী করা যায় ভেবে ঠিক কর।”

জয়ন্ত রেগে গিয়ে বলল, “আমি আঁতেলদের মতো শুধু কথা বলছি?”

“বলছিসই তো। সেই তখন থেকে ভ্যাদর ভ্যাদর করছিস।”

শ্রাবণী বিরক্ত হয়ে বলল, “এটা ঝগড়া করার সময়? চুপ করবি তোরা?”

দুজনে চুপ করে কঠিন মুখে শ্রাবণীর দিকে তাকাল। শ্রাবণী বলল, “আগে এই ঘরটা মোটামুটি সিকিওর ছিল, এখন এর ভেতরে সাপ ছেড়ে দিয়েছে। ভেতরে কয়টা সাপ লুকিয়ে আছে কে জানে। এখানে থাকা যাবে না।”

“এখন পর্যন্ত দেখা গেছে বেজিগুলো আগুনকে ভয় পায়। আগুনটাই আমাদের ভরসা।”

জয়ন্ত নিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী করবি আগুন দিয়ে?”

“ধর, অনেকগুলো মশাল তৈরি করে সেগুলো হাতে নিয়ে যদি হেঁটে যাই? বিচে গিয়ে জব্বার মিয়ার ট্রলারের জন্যে অপেক্ষা করি?”

জয়ন্ত খানিকক্ষণ তীক্ষ্ণচোখে নিয়াজের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “ইট মে ওয়ার্ক। ঠিকই বলেছিস। তবে একটা ডেঞ্জার আছে।”

“কী ডেঞ্জার?”

“যদি আমাদের আক্রমন করে বসে আমাদের কিছু করার নেই।”

“বন্দুকটা আছে।”

“হ্যাঁ, বন্দুকটা দিয়ে কিছু গুলি করতে পারি, কয়েকটা মারতে পারি, কিন্তু তাতে লাভ কী?”

শ্রাবণী অস্থির হয়ে বলল, “কিন্তু কিছু-একটা তো করতে হবে, আমরা তো এভাবে বসে থাকতে পারব না?”

জয়ন্ত একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “বেঁচে থাকার জন্যে দরকার হলে এভাবে বসেই থাকতে হবে। এখনো জব্বার মিয়া আছে, জব্বার মিয়া হচ্ছে আমাদের বাইরের পৃথিবীর সাথে কানেকশন। সে যখন এসে দেখবে আমরা বিচে নাই তখন নিশ্চয়ই কিছু-একটা করবে। দরকার হলে আমাদের এখানে সাপের সাথে বেজির সাথে বসে থাকতে হবে।”

বেজিদের দ্বিতীয় আক্রমণটা হলো আরো পরিকল্পিত। বাসার ছাদে ধুপধাপ শুনে তারা বারান্দায় এসে দেখে, পাশের একটা বড় কড়ই গাছের ওপরে বেজিগুলো একটা গাছের লতা বেঁধেছে। সেই লতাটি ধরে ঝুল খেয়ে ছাদের ওপর বেজিগুলো লাফিয়ে এসে নামছে। দৃশ্যটি নিজের চোখে না দেখলে তারা বিশ্বাস করত না। বেজির মতো একটা প্রাণী যে গাছের ডালে একটা লতা বাঁধতে পারে সেটাই বিশ্বাস হতে চায় না। দড়ির মতো চমৎকার এরকম একটা লতা কোথায় পেয়েছে সেটাও একটা রহস্য। 

নিয়াজ বাইনোকুলার দিয়ে দেখে বলল, “লতাটি বেণির মতো বুনে নেওয়া হয়েছে।”

তিনজন খানিকক্ষণ বেজিদের এই অবিশ্বাস্য কার্যক্রম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। শেষ পর্যন্ত জয়ন্ত বলল, “এগুলোকে থামাতে হবে।”

নিয়াজ জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে থামাব?”

“গুলি করে।”

বন্দুকে গুলি ভরতে গিয়ে জয়ন্ত থেমে গিয়ে বন্দুকটা নিয়াজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “নে এবারে তুই গুলি কর।”

“আমি আগে কখনো গুলি করিনি।”

“সেইজন্যেই দিচ্ছি। এইম করে ট্রিগার টেনে ধরবি।”

“নিশানা যদি না হয়?”

“না-হওয়ার কী আছে? ছররা গুলি, নিশানার দরকারও নেই।”

নিয়াজ গাছের লতা বেঁধে ঝুলে আসা একটা বেজিকে গুলি করতেই বেজিগুলো কর্কশ স্বরে চিৎকার করতে শুরু করল। তারা অবাক হয়ে লক্ষ করল, বেজিগুলো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, চোখের পলকে সেগুলো কোথাও লুকিয়ে গেল। দেখে মনে হল কোথাও কিছু নেই। মিনিট দশেক পর ধীরে ধীরে বেজিগুলো বের হয়ে আসে, তারপর আবার লতাটি টেনে টেনে একটা বেজি গাছের উপর উঠতে থাকে। তাদের ধৈর্যের কোনো অভাব নেই এবং কিছুক্ষণের মাঝে আবার লতায় ঝুল খেয়ে বাসার ছাদে লাফিয়ে পড়তে শুরু করে। দেখে মনে হয় বেজিগুলো বুঝে গিয়েছে তাদের কাছে গুলি বেশি নেই। এভাবে খুব বেশিবার তাদেরকে উৎপাত করা হবে না।

বাসার ছাদে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা উপস্থিত হওয়ার পর সেগুলো নিশ্চয়ই কার্নিশ বেয়ে ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। একসাথে কতগুলো আসবে এবং কীভাবে আক্রমন করবে তারা এখনো জানে না। বসে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। ছাদে বেজিদের ধুপধাপ শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। চারপাশে একধরনের ভয়-ধরানো আতঙ্ক। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এসছে, কিছুক্ষণ পর অন্ধকার হয়ে আসবে, তখন কী হবে কে জানে!

ঠিক এরকম সমযে তারা অনেক দূর থেকে একটা ট্রলারের শব্দ শুনতে পেল। 

শ্রাবণী বলল, “জব্বার মিয়া ট্রলার নিয়ে এসেছে।”

অন্য দুজন কোনো কথা বলল না। এই ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের জগৎ থেকে পালিয়ে যাবার একটা অদম্য ইচ্ছা কাজ করছে কিন্তু কিছু করতে পারছে না। হঠাৎ করে তাদের ভেতরে একধরনের অস্থির হতাশা এসে ভর করে। 

নিয়াজ প্রায় বেপরোয়া হয়ে বলল, “চল মশাল জ্বালিয়ে বের হয়ে যাই।”

গত কয়েক ঘন্টার ঘটনায় তাদের ভেতরে এরকম ভয়ঙ্কর একটা চাপ পড়েছে যে, সেটা সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। তারা আরো একটু হলে নিয়াজের কথায় হয়তো সত্যি সত্যি বের হয়ে পড়তো। কিন্তু ঠিক তখন হঠাৎ করে ঝুপঝাপ করে চারিদিকে থেকে বেজিগুলো লাফিয়ে পড়তে শুরু করল। 

জয়ন্ত চিৎকার করে বলল, “ল্যাবরেটরি ঘরে—”

কিন্তু জয়ন্তর কথা শেষ হবার আগেই প্রায় বিশ থেকে ত্রিশটি বেজি তার ওপর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রচণ্ড ধাক্কা সহ্য করতে না-পেরে সে হুমড়ি খেয়ে নিচে পড়ে যায়। জয়ন্ত ছটফট করতে থাকে এবং তার সারা শরীরে বেজিগুলো কিলবিল করতে থাকে। 

নিয়াজ আর শ্রাবণী পাগলের মতো লাঠি দিয়ে মারার চেষ্টা করে কিন্তু সেগুলো ভ্রুক্ষেপ করে না। নিয়াজ এগিয়ে আসা কিছু বেজিকে লক্ষ্য করে গুলি করে ভয় দেখানো চেষ্টা করল কিন্তু একই জায়গায় কাছাকাছি জয়ন্ত এবং শ্রাবণী, সে গুলি করতে পারল না। বন্দুকের কুঁদো দিয়ে বেজিগুলোর মাথা আর শরীর থেঁতলে দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল।

শ্রাবণী ছুটে ল্যাবরেটরি ঘরে গিয়ে দুটো মশাল জ্বালিয়ে নিয়ে বাইরে ছুটে আসে। জয়ন্তকে বাঁচানোর জন্যে মশাল দিয়ে তার শরীরের ওপরেই বেজিগুলোকে এলাপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে। 

এইভাবে তারা কতক্ষণ যুদ্ধ করেছে জানে না, কিন্তু শেষপর্যন্ত বেজিগুলো কর্কশ শব্দ করতে করতে জয়ন্তকে ছেড়ে সরে যায়। জয়ন্ত টলতে টলতে কোনোভাবে উঠে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড আক্রোশে একটা লাঠি তুলে নিয়ে বেজিগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাঠির প্রচণ্ড আঘাতে বেজিগুলোর মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, শিরদাঁড়া ভেঙে সেগুলো ছটফট করতে থাকে। নিয়াজ আর শ্রাবণীর জ্বলন্ত মশালের আগুনের ঝাপটায় শেষপর্যন্ত শেষ বেজিটিও পালিয়ে যাবার পর জয়ন্ত দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে বলল, “মোস্ট পিকুলিয়ার।”

শ্রাবণী আর নিয়াজ জয়ন্তের কাছে গিয়ে তাকে পরীক্ষা করে। শরীরের নানা জায়গায় কেটে গেছে। আগুনের হলকায় বুক পেট হাতের কনুই ঝলসে গেছে। সারা শরীরে কালিঝুলি মেখে তাকে কিম্ভূতকিমাকার দেখাচ্ছে। 

জয়ন্ত নিয়াজ আর শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে বলল, “বেজিগুলো এবার শুধু আমাকে আক্রমণ করল কেন? আমি কী করেছি?”

শ্রাবণী চিন্তিতভাবে বলল, “হ্যাঁ। আমিও বুঝতে পারছি না। মনে হল একেবারে চিন্তাভাবনা পরিকল্পনা করে তোকে ধরেছে।”

জয়ন্ত কাঁপা গলায় বলল, “একসাথে এতগুলো আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যে ইচ্ছে করলে আমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারত। কিন্তু মনে হল ওদের অন্য একটা উদ্দেশ্য ছিল—”

“কী উদ্দেশ্য?”

“কিছু বুঝতে পারছি না। মনে হয়েছে সারা শরীর তন্নতন্ন করে খুঁজেছে কিছু-একটার জন্যে—”

নিয়াজ হঠাৎ চিৎকার করে বলল, “এই দ্যাখ।”

শ্রাবণী ছুটে গেল, জয়ন্ত পিছু পিছু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে গেল। টেবিলের নিচে একটা বেজি মরে পড়ে আছে। সম্ভবত লাঠির আঘাতে মাথাটা পুরোপুরি থেঁতলে গেছে। তবে বেজিটা এখনো শক্ত করে একটা ম্যাচের বাক্স ধরে রেখেছে। নিয়াজ অবাক হয়ে বলল, “এটা কোথায় পেয়েছে?”

জয়ন্ত নিজের পকেটে হাত দিয়ে বলল, “আমার ম্যাচ। আমার পকেট থেকে নিয়েছে।”

তিনজনই একজন আরেকজনের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, “বুঝতে পেরেছিস আমাকে কেন ধরেছে?”

“হ্যাঁ।”

“আমাকে নিশ্চয়ই ম্যাচ দিয়ে সিগারেট ধরাতে দেখেছে, তাই এখন ম্যাচটা চায়। আগুন ধরানো শিখতে চায়।”

নিয়াজ নিচু হয়ে মৃত বেজিটার সামনের দুই পা দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখা ম্যাচটি হাতে নিয়ে বলল, “তাহলে কী আমরা বেজিদের সাথে একটা সন্ধি করতে পারি? আমরা ওদের এই ম্যাচটা দেব, তারা আমাদের চলে যেতে দেবে!”

শ্রাবণী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক তখন মনে হল খুব কাছে থেকে ট্রলারের শব্দটা শোনা যাচ্ছে। তারা প্রায় ছুটে বের হয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়াল, সেখান থেকে সমুদ্রের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। জব্বার মিয়া তার ট্রলারটা নিয়ে আসছে। 

শ্রাবণী অবাক হয়ে বলল, “কী আশ্চর্য! জব্বার মিয়া এখানে চলে এল কেমন করে? সে কেমন করে জানে আমরা এখানে?”

“নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই—” নিয়াজ ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে সুবিধে করতে পারল না।

“নিশ্চয়ই কী?”

জয়ন্ত বলল, “শুলির শব্দ শুনে অনুমান করেছে আমরা নিশ্চয়ই মাজেদ খানের বাসার আছি?”

“হ্যাঁ। তাই হবে!”

তিনজন বারান্দায় দাঁড়িয়ে জব্বার মিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু কয়েকটা গাছের আড়ালে থাকার কারণে তারা মোটামুটি বেশ স্পষ্ট জব্বার মিয়াকে দেখতে পেলেও জব্বার মিয়া তাদের দেখতে পাচ্ছে না। 

নিয়াজ বলল, “এই সুযোগ। আমাদের এখন অল্প কিছুদূর যেতে হবে! মাত্র এইটুকু।”

“কিন্তু মাত্র এইটুকু যেতে কতগুলো বেজি পার হয়ে যেতে হবে দেখেছিস?”

“হ্যাঁ।” শ্রাবণী মাথা নাড়ল, “ঠিকই বলেছিস।”

“কিন্তু কিছু তো করার নেই। আয় মশালে আগুন জ্বালিয়ে বের হয়ে যাই।” 

নিয়াজের কথা শুনে সবাই বাইরে তাকাল। কয়েক হাজার বেজি নিশ্চল হয়ে বসে আছে দেখে আবার তারা সাহস হারিয়ে ফেলল। এই দুঃস্বপ্নের জগৎ থেকে পালিয়ে যাবার সুযোগ এত কাছে চলে এসেছে তবুও যেতে পারছে না বলে তারা একধরনের হতাশায় ছটফট করতে থাকে।

তারা দেখতে পেল জব্বার মিয়া ট্রলারটাকে খানিকটা টেনে তীরে তুলল যেন ঢেউয়ে ভেসে না যায়। তারপর রোদ থেকে চোখ আড়াল করে এদিক-সেদিক তাকাল। কিছু দেখতে না পেয়ে চিন্তিত মুখে নৌকার পাটাতন তুলে তার হাতে বানানো পাইপগানটা তুলে হেঁটে আসতে শুরু করল। হাঁটার ভঙ্গি দেখে বোঝা গেল জব্বার মিয়া এই জায়গাটা মোটামুটি চেনে। সে এখন মাজেদ খানের বাসার দিকেই আসছে।

জয়ন্ত অন্য দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “সর্বনাশ, এখন দেখি জব্বার মিয়া এদিকে আসছে। একেবারে সোজাসুজি বেজিদের মুখে পড়বে।”

“হ্যাঁ। ওকে আসতে নিষেধ কর।” শ্রাবণী ভয়-পাওয়া গলায় বলল, “চিৎকার করে নিষেধ করে দে।”

নিয়াজ চিৎকার করে জব্বার মিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। সেই চিৎকার শুনে বেজিগুলো সচকিত হয়ে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল কিন্তু জব্বার মিয়া কিছু শুনতে পেল না। দ্বীপটার ঠিক এই জায়গা দিয়ে সমুদ্রের হাওয়া শনশন করে বইছে। গাছের পাতার শব্দ, সমুদ্রের গর্জন, সব মিলিয়ে কিছু শোনার কথা নয়। 

তিনজন একধরনের আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে রইল এবং দেখতে পেল জব্বার মিয়া আলগোছে তার পাইপগানটা ধরে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে পা দিতে আসছে।

শ্রাবণী ফ্যাকাশে মুখে বলল, “সর্বনাশ! কী হবে এখন! জব্বার মিয়া যে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না—”

তিনজনে মিলে আবার চিৎকার করল। মনে হল জব্বার মিয়া কিছু-একটা শুনতে পেল। কিন্তু সেটা শুনে সে থেমে না গিয়ে আরো বেশি উৎসাহ নিয়ে ওপরে ছুটে আসতে শুরু করল।

জয়ন্ত বলল, “জব্বার মিয়াকে থামাতে হবে। এক্ষুণি থামাতে হবে।”

“কীভাবে থামাবি?”

“বন্দুকটা দে, একটা গুলি করি। গুলির শব্দ শুনলে থেমে যাবে।”

ব্যাপারটা পুরোপুরি চিন্তা না করেই জয়ন্ত বন্দুকটা হাতে নিয়ে একটা ফাঁকা আওয়াজ করল এবং সাথে সাথে জব্বার মিয়া চমকে উঠে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে গেল। 

গুলির প্রচণ্ড শব্দে বেজিগুলো এক মুহূর্তের জন্যে নিচু হয়ে যায় এবং পরমুর্হূর্তে মাথা তুলে তাকিয়ে জব্বার মিয়াকে দেখতে পেয়ে তাকে আক্রমণ করার জন্যে ছুটে যেতে থাকে।

এতদূর থেকেও তারা জব্বার মিয়ার মুখে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের চিহ্ন দেখতে পেল, সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কয়েক মুহূর্ত সে ছুটে-আসা বেজিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মাজেদ খানের বাসার দিকে ছুটতে শুরু করল। 

জয়ন্ত, শ্রাবণী এবং নিয়াজ একটি ভয়ের ছবির দৃশ্যের মতো দেখতে পেল একজন মানুষ তার প্রাণ নিয়ে ছুটছে এবং তার পেছন থেকে ঢেউয়ের মতো ধূসর মৃত্যু এগিয়ে আসছে। 

জব্বার মিয়া ছুটছে এবং তার মাঝে কয়েকটা বেজি লাফিয়ে তার শরীরের নানা জায়গায় কামড় দিয়ে ঝুলে পড়ল। জব্বার মিয়া হাত দিয়ে সেগুলো ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে কিন্তু কোনো লাভ হয় না। শেষপর্যন্ত হাতের পাইপগানটা লাঠির মতো ব্যবহার করে প্রচণ্ড আঘাতে সে কিছু বেজিকে ছিটকে ফেলে দিল। ছুটতে ছুটতে সে একটা গুলি করে বেশকিছু বেজিকে রক্তাক্ত করে দিল কিন্তু তবু বেজিগুলো থামল না।

মাজেদ খানের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে জয়ন্ত নিয়াজ আর শ্রাবণী দেখতে পেল ছুটতে ছুটতে জব্বার মিয়া বাসার খুব কাছে চলে এসেছে কিন্তু কবু শেষ রক্ষা করতে পারবে বলে মনে হয় না। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অসংখ্য বেজি পেছন থেকে একসাথে জব্বার মিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাল সামলাতে না পেরে সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। পরমুহূর্তে দেখা গেল জব্বার মিয়া একটা ধূসর আবরণে ঢেকে গেছে, তার ওপর অসংখ্য বেজি কিলবিল করছে, চোখের পলকে নিশ্চয়ই তাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে।

শ্রবণী চিৎকার করে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। এই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটি দেখার মতো সাহস তার নেই।

জয়ন্ত কয়েক মুহূর্ত নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ যেন সংবিৎ ফিরে পায়। সে চিৎকার করে বলল, “জব্বার মিয়াকে বাঁচাতে হবে!”

“কীভাবে?”

“জানি না।” জয়ন্ত বন্দুকে গুলি ভরে নিচে ছুটতে ছুটতে বলল, “তোরা মশালে আগুন জ্বালিয়ে আন, তাড়াতাড়ি।”

জয়ন্ত চিৎকার করতে করতে ছুটে গেল। জব্বার মিয়া ছটফট করছে, তার ওপরে ঢেউয়ের মতো বেজিগুলো দৌড়াদৌড়ি করছে, তাদের হিংস্র আস্ফালনের মাঝেও জয়ন্ত জব্বার মিয়ার চিৎকার শুনতে পেল। জয়ন্ত জব্বার মিয়াকে বাঁচিয়ে তার কাছাকাছি বেজিগুলোকে লক্ষ করে গুলি করল। গুলির আঘাতে অসংখ্য বেজি ছিটকে পড়ে যায়, মুহূর্তের জন্যে সেগুলো থমকে দাঁড়ায়, বেশকিছু ছুটে পালিয়ে যেতে চেষ্ট করে। জয়ন্ত সেই অবস্থায় চিৎকার করে জব্বার মিয়ার কাছাকাছি ছুটে যেতে যেতে দ্বিতীয়বার গুলি করল। বেজিগুলো এবারে লাফিয়ে খানিকটা দূরে সরে গেল, কিন্তু একেবারে চলে গেল না। তারা কুতকুতে হিংস্র চোখে জব্বার মিয়া এবং জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে রইল।

ততক্ষণে শ্রাবণী আর নিয়াজও ছুটে আসছে। তাদের দুই হাতে চারটি জ্বলন্ত মশাল। সেখানে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। আগুন দেখে বেজিগুলো আরো কয়েক পা পিছিয়ে যায়।

জয়ন্ত ছুটে গিয়ে এবার জব্বার মিয়াকে টেনে তোলার চেষ্টা করল। সারা শরীর রক্তাক্ত। মনে হয় বেজিগুলো খুবলে তার শরীর থেকে মাংস তুলে নিয়েছে। জব্বার মিয়া চোখ খুলে তাকাল। তার চোখে আতঙ্ক এবং অবিশ্বাস।

নিয়াজ এবং শ্রাবণী মশালগুলো নাড়তে নাড়তে আগুনের শিখা দিয়ে বেজিগুলোকে ভয় দেখাতে দেখাতে এগিয়ে আসতে থাকে। বেজিগুলো নিরাপদ দূরত্বে থেকে একধরনের চাপা গর্জন করতে থাকে। শ্রাবণী এবং জয়ন্ত মিলে জব্বার মিয়াকে টেনে সোজা করে দাঁড় করাল।

নিয়াজ মাটি থেকে তার পাইপগানটা তুলে নেয়। এটা দিয়ে কীভাবে গুলি করতে হয় সেটা সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই, তবু সেটি বেজিদের দিকে তাক করে রাখল।

শ্রাবণী চোখের কোণা দিয়ে বেজিগুলোকে লক্ষ করে, সেগুলো আক্রমণের ভঙ্গিতে তাদের লেজ নাড়ছে। যে-কোনো মুহূর্তে আবার তাদের আক্রমণ করে বসতে পারে। 

জব্বার মিয়াকে দুই পাশ থেকে ধরে জয়ন্ত আর শ্রাবণী মাজেদ খানের বাসার দিকে নিতে থাকে, তাদের ঠিক পেছনে পেছনে নিয়াজ মশালটি নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসে।

বাসার সিঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যাবার পর হঠাৎ করে বেজিগুলো আক্রমণ করল। তাদের নিজস্ব কোনো সংকেত আছে, সেটি পাওয়ামাত্রই চলন্ত ট্রেনের মতো ছুটে এসে কয়েকশ বেজি তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার প্রচণ্ড ধাক্কায় তারা সিঁড়ির ওপরে আছড়ে পড়ল। হাত থেকে মশাল ছিটকে পড়ে এবং হঠাৎ করে শ্রাবণী বুঝতে পারল তাদেরকে বেজিগুলো এখন শেষ করে ফেলবে। ঘাড়ের কাছে কোথায় জানি কয়েকটা বেজি কামড়ে ধরেছে। সেগুলো ছোটানোর জন্যে সে প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু একটাকে সরানোর আগেই আরো দশটি এসে জাপটে ধরছে। আগুনের মশালের ওপরে কেউ গড়াগড়ি খাচ্ছে, মাংস এবং লোম পোড়ার বিভৎস একটা উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগে। যন্ত্রণায় কেউ একজন চিৎকার করছে, গলার স্বরটি কার শ্রাবণী বুঝতে পারল না। মৃত্যু তাহলে এরকম, এই ধরনের একটা কথা মনে হল তার, ব্যাপারটি ভয়ঙ্কর, ব্যাপারটি বীভৎস। তার মাথায় একটা বেজি কামড়ে ধরে শক্ত চোয়ালের আঘাতে ছিড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পায়ে কয়েকটা কামড়ে ধরে মাংস ছিঁড়ে নিতে চাইছে। ভয়ঙ্কর যন্ত্রনায় শ্রাবণী আর্তনাদ করে উঠল। মৃত্যু যদি আসবেই সেটি তাহলে আরো তাড়াতাড়ি কেন আসছে না?

শ্রাবণী প্রচণ্ড যন্ত্রণায় অচেতন হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ভেতরেও কে জানি তাকে বলল, চেষ্টা কর, বেঁচে থাকার চেষ্টা কর। সে তাই শেষবার চেষ্টা করল, চিৎকার করে বলল, “ক্রিঁকি, ক্রিঁকি, ক্রিঁকি।”

হঠাৎ করে জাদুমন্ত্রের মতো বেজিগুলো থেমে গেল। একটি আরেকটির দিকে তাকাল। মনে হচ্ছে কিছু-একটা বুঝতে পারছে না। শ্রাবণী আবার বলল, “ক্রিঁকি, ক্রিঁকি, ক্রিঁকি।”

সাথে সাথে বেজিগুলো লাফিয়ে তাদের শরীর থেকে নেমে গিয়ে অবিকল মানুষের গলায় “ক্রিঁকি, ক্রিঁকি, ক্রিঁকি।” বলতে বলতে ছুটে পালিয়ে যেতে শুরু করে।

বেজিগুলো সরে যেতেই শ্রাবণী মাথা তুলে তাকাল। অন্য তিনজন সিঁড়ির ওপরে এবং নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাদেরকে দেখে মানুষ বলে চেনা যায় না। দেখে মনে হয় রক্তাক্ত কিছু মাংসপিণ্ড। 

শ্রাবণী কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে ভয়-পাওয়া গলায় ডাকল, “নিয়াজ, জয়ন্ত।”

কোনোমতে নিয়াজ আর জয়ন্ত উঠে বসে। তারা বিস্ফারিত চোখে শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে থাকে, বেজিগুলো যে তাদের টুকরো-টুকরো না করেই চলে গেছে এখনো সেটা তাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।

শ্রাবণী টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তোরা উঠতে পারবি?”

“মনে হয় পারব।” নিয়াজ বন্দুকটার ওপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। 

শ্রাবণী গিয়ে জয়ন্তের হাত ধরে তুলল। জয়ন্ত আর নিয়াজ মিলে চেষ্টা করে জব্বার মিয়াকে টেনে তুলল।

তারপর ছোট দলটা কোনোভাবে নিজেদেরকে টেনে হিঁচড়ে নিতে থাকে।

সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “শ্রাবণী, তুই কেমন করে জানলি যে ক্রিঁকি, ক্রিঁকি বললে বেজিগুলো আমাদের ছেড়ে দেবে?”

“যদি জানতাম তাহলে আরো আগেই বলতাম। জানতাম না বলেই তো এই অবস্থা।”

“কী বলছিস তুই, আমরা জানে বেঁচে গিয়েছি জানিস?”

“আমি এত নিশ্চিত নই। একবার বেঁচে গিয়েছি মানে এই নয় যে বার বার বেঁচে যাব। তবে এইভাবে মরব কখনো ভাবিনি।”

“এখনো তো মরিনি—”

শ্রাবণী কোনো কথা বলল না।

জয়ন্ত আবার জিজ্ঞেস করল, “তুই কেমন করে বুঝতে পারলি ক্রিঁকি, ক্রিঁকি বললে ওগুলো চলে যাবে?”

“মনে নেই ল্যাবরেটরিতে প্রথম যখন এসেছিল, পালিয়ে যাবার সময় একটা বেজি বলল ক্রিঁকি ক্রিঁকি। তখন সবগুলো মিলে পালিয়ে গেল।”

“হ্যাঁ। মনে আছে।”

“আমার মনে হল হয়তো ক্রিঁকি ক্রিঁকি মানে, বিপদ বিপদ পালাও। সেটা শুনে হয়তো সবগুলো পালাবে।”

নিয়াজ এই অবস্থায় হাসার চেষ্টা করে বলল, “তুই বেজিদের একটা মাত্র শব্দ শিখেছিস, সেটা দিয়েই চারজন মানুষের জান বাঁচিয়ে দিয়েছিস। কী আশ্চর্য!”

শ্রাবণী কোনো কথা বলল না। সে কোনোকিছু চিন্তা করতে পারছিল না, যদি পারত তাহলে বুঝতে পারত ব্যাপারটি সত্যিই খুব আশ্চর্য।

ল্যাবরেটরি-ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে চারজন মেঝের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। তাদের শরীর থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ে মেঝের বড় অংশ রক্তাক্ত হয়ে যেতে থাকে।


শ্রাবণী চোখ খুলে দেখল জয়ন্ত জব্বার মিয়ার হাত ধরে পালস্ পরীক্ষা করছে। শ্রাবণী কোনোভাবে উঠে বসল। শরীরের নানা জায়গা ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। একটু নড়লেই প্রচণ্ড ব্যথায় শরীর অবশ হয়ে আসতে চায়, সেই অবস্থায় হামাগুড়ি দিয়ে জয়ন্তর কাছে যেতে যেতে বলল, “কী হয়েছে?”

“অবস্থা খুব ভালো না। তবে রক্তটা বন্ধ করা দরকার।”

“তবু ভালো।”

“হ্যাঁ। কিন্তু এখনই হাসপাতালে নেওয়া দরকার।”

শ্রাবণী বিচিত্র দৃষ্টিতে জয়ন্তের দিকে তাকাল। সে এখনো একজনকে হাসপাতালে নেয়ার কথা ভাবছে ব্যাপারটি তার বিশ্বাস হতে চায় না। 

জয়ন্ত এলকোহলে ভরা একটা বিকার শ্রাবণীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “নে, তোর শরীরের রক্ত মুছে নে। দেখতে খুব খারাপ লাগছে।”

শ্রাবণী আবার জয়ন্তর দিকে তাকাল। দেখতে খারাপ লাগা না-লাগার ব্যাপারটি নিয়ে এখনো কেউ মাথা ঘামাতে পারে সেটিও তার বিশ্বাস হয় না।

জয়ন্ত নরম গলায় বলল, “আয় কাছে আয়, তোর মুখটা মুছে দিই।”

শ্রাবণী কিছু বলার আগেই জয়ন্ত একটা কাপড়ের টুকরো এলকোহলে ভিজিয়ে শ্রাবণীর কপাল এবং গালে শুকিয়ে থাকা রক্ত মুছে দিতে দিতে বলল, “তোকে সব সময় দেখেছি সেজেগুজে সুন্দর হয়ে থাকা একজন মানুষ। তাই তোকে এভাবে দেখলে আমরা ইনসিকিওর ফিল করি।”

ক্ষতস্থানগুলোতে এলকোহলের স্পর্শ লাগামাত্র জায়গাগুলো তীব্রভাবে জ্বালা করে ওঠে। শ্রাবণী দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করল। 

জয়ন্ত নিচুগলায় বলল, “সবচেয়ে সমস্যাটা হয়েছে কি জানিস?”

“কী?”

“পানি।”

“হ্যাঁ, তৃষ্ণায় বুকটা একেবারে ফেটে যাচ্ছে।”

“এত বিলিডিং হয়েছে, যে আর পারছি না। এভাবে আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না।”

এরকম সময় জব্বার মিয়া চোখ খুলে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ট্রলারে আপনাদের জন্যে পানি নিয়ে এসেছি।”

জয়ন্ত জব্বার মিয়ার উপর ঝুঁকে পড়ে বলল, “আপনার এখন কেমন লাগছে?”

“দুর্বল লাগছে।” জব্বার মিয়া একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, “আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না।”

“কেন চিন্তা করব না?”

“আমাদের হচ্ছে বিড়ালের জান। আমরা এত সহজে মরি না। আল্লাহ হায়াত দিলে বেজির বাচ্চা বেজি কিছু করতে পারবে না।”

শ্রাবণী জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই হচ্ছে খাঁটি স্পিরিট।”

জব্বার মিয়া আস্তে আস্তে বলল, “তবে আপনারা যদি তখন না আসতেন তাহলে কেউ আমারে বাঁচাতে পারত না। আজরাইল জানটা কবচ করে নিয়েই ফেলেছিল!”

জয়ন্ত কাঁধ স্পর্শ করে বলল, “ঠিক আছে। এখন আর বেশি কথা বলবেন না। শক্তিটা বাঁচিয়ে রাখেন।”

শ্রাবণী হামাগুড়ি দিয়ে নিয়াজের কাছে গিয়ে বলল, “নিয়াজ তোর কী অবস্থা?”

নিয়াজ চোখ খুলে তাকিয়ে বলল, “বেশি ভালো না।’’

“ভালো না হলে হবে কেমন করে? উঠে বস।”

নিয়াজ খুব কষ্ট করে উঠে বসল, একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “যা পানির তৃষ্ণা পেয়েছে কী বলব!”

শ্রাবণী হাসার চেষ্টা করে বলল, “এই ট্রলারেই পানি আছে, চিন্তা করিস না!”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ।”

“আমি আর পারছি না। এখানে থেকে পানি তৃষ্ণায় মরার থেকে বাইরে বেজির কামড় খেয়ে মরা অনেক ভালো।”

“ঠিকই বলেছিস।”

জয়ন্ত কষ্ট করে উঠে দাঁড়িয়ে আরো একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বলল, “এতক্ষণে বাইরে অন্ধকার হয়ে গেছে। আমাদের ফেরত যাওয়ার কাজটা আরো কঠিন হয়ে গেল।”

“যত সময় যাচ্ছে তত দুর্বল হয়ে যাচ্ছি।” নিয়াজ একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, “বেজির দল আবার যদি এ্যাটাক করে, মনে হয় আর নিজেদের রক্ষা করতে পারব না।”

“কিন্তু চেষ্টা করতে হবে।” জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলল, “আমরা এতক্ষণ যখন পেরেছি, বাকিটাও পারতে হবে।”

“কীভাবে পারবি?”

“সেটাই চিন্তা করছি।” জয়ন্ত দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করে বলল, “আমাদের অস্ত্র হচ্ছে বন্দুক, পাইপগান, কিরিচ আর আগুন। কিন্তু সামরিকভাবে তার সমাধান করতে পারব মনে হয় না। সমাধানটা হতে হবে কূটনৈতিক!”

শ্রাবণী শব্দ করে হেসে বলল, “ভালোই বলেছিস।”

“না-না, আমি ঠাট্টা করছি না। আমি সিরিয়াসলি বলছি।”

“কিন্তু সেই কূটনৈতিক মিশনটা চালাবি কেমন করে?”

“সেটাই ভাবছি। বেজিগুলো ম্যাচটা নেয়ার জন্যে খুব ব্যস্ত। সেটা দিয়ে একটা কম্প্রোমাইজ করা যেতে পারে। তুই বেজির ভাষা ব্যবহার করে দেখিয়েছিস যে তাদের সাথে ডায়ালগও করা যায়।”

“কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র একটা শব্দ জানি, সেটা হচ্ছে ক্রিঁকি। এক শব্দ দিয়ে কূটনৈতিক আলাপ কেমন করে হয়?”

“সেটাই হয়েছে মুশকিল।” জয়ন্ত চিন্তিতভাবে মাথা নেড়ে বলল, “কথা দিয়ে যদি না পারি তাহলে কাজকর্ম দিয়ে করতে হবে। জেসচার দিয়ে করতে হবে।”

“কী হবে তোর সেই জেসচার?”

জয়ন্ত কথা না বলে চুপ করে রইল এবং ঠিক তখন শ্রাবণী হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, “ওটা কী?”

শ্রাবণীর দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই টেবিলের নিচে তাকায়। মোমবাতির আলোয় দুটি চোখ জ্বলজ্বল করছে। 

জয়ন্ত বন্দুকটা হাতে নিয়ে বলল, “কী আবার হবে? একটা ধুমসো বেজি।”

“এটা এখানে এসেছে কেন?”

“এখনো জানিস না কেন আসে?”

“হ্যাঁ জানি।” শ্রাবণী চিন্তিত মুখে বলল, “কিন্তু যখন আসে তখন তো দল বেধে আসে। এখন একা এসেছে কেন? কোন দিকে দিয়ে এসেছে?”

জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলল, “তুই কি ভেবেছিস আমরা ল্যাবরেটরি-ঘরটা পুরোপুরি সীল করতে পেরেছি? পারি নাই। কত ফাঁকফোকর আছে। তার কোনো একটা দিয়ে ঢুকে গেছে।”

শ্রাবণী চিন্তিত মুখে বলল, “এমনভাবে বসে আছে যেন আমাদের সব কথা বুঝতে পারছে।”

“হ্যাঁ।” জয়ন্ত বলল, “আমার ধারণা ব্যাটা স্পাইগিরি করতে এসেছে।”

নিয়াজ একটা লাঠি নিয়ে বলল, “দাঁড়া ব্যাটার স্পাইগিরি করা বের করছি।”

“কী করবি?”

“পিটিয়ে ঘিলু বের করে দেব।”

আজ সারাদিনে তারা অসংখ্য বেজির ঘিলু পিটিয়ে বার করে দিয়েছে, শরীর থেঁতলে দিয়েছে, শিরদাঁড়া ভেঙে দিয়েছে, পুড়িয়ে দিয়েছে। কাজেই নিয়াজের কথাটা অর্থহীন আস্ফালন নয়। তবে প্রতিবারই এই বীভৎস কাজগুলো করেছে নিজেদের বাঁচাতে গিয়ে। একসাথে যখন অসংখ্য বেজি তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন হাতের লাঠিটা ঘোরালেই কিছু বেজি তার আঘাতে থেঁতলে গেছে। তবে এটা ভিন্ন ব্যাপার, নিয়াজ নির্দিষ্ট একটা বেজিকে একটা উচিৎ শিক্ষা দেবার চেষ্টা করছে!

বেজি অত্যন্ত ধূর্ত প্রাণী। ল্যাবরেটরি-ঘরে টেবিলের নিচে ঘাপটি মেরে থাকা একটা বেজিকে নিয়াজ লাঠি দিয়ে কিছু একটা করে ফেলতে পারবে সেটা কেউই ভাবেনি। কিন্তু নিয়াজ হঠাৎ করে সেই অসাধ্য সাধন করে ফেলল। লাঠিটা দিয়ে খোঁটা মেরে বেজিটাকে দেয়ালের সাথে আটকে ফেলে চিৎকার করে বলল, “ধরেছি শালার ব্যাটাকে, যাবি কোথায় এখন? স্পাইগিরি করতে এসেছিস?”

জয়ন্ত এবং শ্রাবণী এগিয়ে গেল। ধূসর রঙের বড়োসড়ো বেজিটা লাঠির চাপে আটকা পড়ে কাতর শব্দ করছে। 

নিয়াজ হিংস্র গলার বলল, “আরেকটা লাঠি দিয়ে এই জানোয়ারের বাচ্চার মাথাটা থেঁতলে দে দেখি। বোঝাই শালার ব্যাটাকে মজাটা!”

শ্রাবণী হঠাৎ উত্তেজিত গলায় বলল, “দাঁড়া, দাঁড়া, পাগলামি করিস না।”

“কী হয়েছে?”

শ্রাবণী মোমবাতিটা নিয়ে আরেকটু কাছে গিয়ে বেজিটাকে ভালো করে লক্ষ করে বলল, “দেখছিস না এটা কোনো কথা বলার চেষ্টা করছে?”

নিয়াজ এবং জয়ন্ত ভালো করে তাকাল, সত্যি সত্যি বেজিটা সামনের দুই পা-কে হাতের মতো নেড়ে কিছু-একটা বলার চেষ্টা করছে। তারা কান পেতে শোনার চেষ্টা করল, দেখল বেজিটা মাথা নেড়ে অবিকল মানুষের গলায় বলল, “সুসু সুসু।”

শ্রাবণী উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরেকটা শব্দ শিখলাম। সুসু। সুসু মানে নিশ্চয়ই আমাকে মেরো না প্লিজ।”

জয়ন্ত মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিকই বলেছিস।“ সে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বলল, “দেখি এর সাথে কথাবার্তা চালানো যায় কি না।”

শ্রাবণী বলল, “দাঁড়া, উল্টাপাল্টা কিছু বলে এটাকে কনফিউজ করিস না।”

“কী করব তাহলে?”

“যেহেতু এটা বলছে ছেড়ে দিতে, কাজেই এটাকে ছেড়ে দিতে হবে। এটা হচ্ছে ওদের কাছে নাইস জেসচার দেখানোর সুযোগ।”

নিয়াজ বলল, “ছেড়ে দেব?”

শ্রাবণী বলল, “আগেই ছাড়িস না। কথা বলার চেষ্টা করে দেখি।” সে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বেজিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “সুসু।”

হঠাৎ করে ম্যাজিকের মতো একটি ব্যাপার হল। বেজিটি এতক্ষণ ছটফট করে কাতর শব্দ করছিল, সবকিছু একমুহূর্তে থেমে গেল। বেজিটি প্রবল ঔৎসুক্য নিয়ে শ্রাবণীর দিকে তাকাল। শ্রাবণী আবার বলল, “সুসু।”

নিম্নশ্রেনীর প্রাণীর চোখেমুখে আনন্দ বা দুঃখের ছাপ পড়ে না কিন্তু শ্রাবণীর স্পষ্ট মনে হল বেজিটির চোখমুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেছে। বেজিটি সামনের দুটি পা হাতের মতো নেড়ে নেড়ে বলল, “সুসু সুসু...”

শ্রাবণী নিয়াজকে বলল, “বেজিটাকে ছেড়ে দে।”

“ছেড়ে দেব?”

“হ্যাঁ।” শ্রাবণী লাঠিটা হাত দিয়ে সরিয়ে দিতেই বেজিটা মুক্ত হয়ে দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল, দৌড়ে পালিয়ে গেল না। শ্রাবণী চাপা গলায় বলল, “দেখেছিস, এটা আমাকে বিশ্বাস করেছে!”

“হ্যাঁ।” জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, “দ্যাখ বিশ্বাসটা পাকা করা যায় কি না।”

শ্রাবণী বলল, “সুসু সুসু...”

বেজিটাও বলল, “সুসু সুসু ...“

শ্রাবণী চাপা গলায় বলল, “একটা মোমবাতি আর ম্যাচটা দে।”

জয়ন্ত তাড়াতাড়ি একটা মোমবাতি আর ম্যাচ এগিয়ে দিল। শ্রাবণী ম্যাচের বাক্স থেকে একটা ম্যাচের কাঠি বের করে বাক্সের পাশে ঘসে আগুন জ্বালাতেই বেজিটি বিচিত্র একটি ভয়ের শব্দ করে লাফিয়ে পিছনে সরে গেল। 

জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, “ভয় পেয়েছে।”

“কিন্তু পালিয়ে যায়নি। দূর থেকে দেখছে।” শ্রাবণী নরম গলায় বলল, “সুসু সুসু...” তারপর ম্যাচটি দিয়ে মোমবাতিটি জ্বালিয়ে দিল।

বেজিটি তীক্ষ্ণচোখে সেটি দেখে খুব ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে এসে মোমবাতিতে আগুনের শিখাটি দেখে। এর আগে এত কাছে থেকে কোনো বেজি আগুনের শিখা দেখেনি। 

জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, “বুদ্ধিমত্তার প্রথম ব্যাপারটাই হচ্ছে কৌতুহল। বেজিটার কী কৌতুহল দেখেছিস!”

শ্রাবণী বলল, “বেজি সাহেব, তোমাকে আমি আগুন জ্বালানো শিখিয়েছি। এখন আগুন নেভানো শিখিয়ে দেই। এই দ্যাখো এভাবে আগুন নেভায়—” শ্রাবণী ফু দিয়ে মোমবাতিটি নিভিয়ে দিতেই বেজিটি চমকে একটু পিছনে সরে গেল। কিন্তু পালিয়ে গেল না।

জয়ন্ত খুশি-খুশি গলায় বলল, “কূটনৈতিক সস্পর্ক প্রায় হয়েই গেছে এবারে বেজিটাকে চলে যেতে দে।”

শ্রাবণী বলল, “যাওয়ার আগে কিছু-একটা উপহার দেওয়া যায় না?”

“কী উপহার দিবি?”

“ফুলের তোড়া আর মানপত্র।”

“ফাজলেমি করিস না। ম্যাচটা নেবার জন্যে পাগল কিন্তু সেটা এখন দেয়া যাবে না।”

“ঠিক আছে,” শ্রাবণী বলল, “এই মোমবাতিটা দিই।”

শ্রাবণী মোমবাতিটা বেজির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “সুসু।”

বেজিটা তার ছুঁচালো নাক দিয়ে মোমবাতিটা কয়েকবার শুঁকে সেটাকে কামড়ে ধরল। তারপর লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যেতে শুরু করল। 

জয়ন্ত বলল, “নিয়াজ দরজাটা খুলে দে। বেজিটাকে সসম্মানে যেতে দিই।”

নিয়াজ দরজাটা খুলে দিতেই মোমবাতিটা কামড়ে ধরে রেখে বেজিটা লাফিয়ে বের হয়ে গেল।

জব্বার মিয়া একটা কাতর শব্দ করতেই জয়ন্ত মোমবাতিটা হাতে নিয়ে তার কাছে এগিয়ে যায়। শরীরের নিচে রক্তে ভিজে গেছে। জয়ন্ত চিন্তিত মুখে বলল, “আবার ব্লিডিং শুরু হয়েছে।”

শ্রাবণী এগিয়ে গিয়ে বলল, “দেখি মোমবাতিটা ধর দেখি।”

জয়ন্ত মোমবাতিটা ধরল, শ্রাবণী একটা কাপড়েরর টুকরো দিয়ে জব্বার মিয়ার ক্ষতস্থান বেঁধে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে।

নিয়াজ আবার দেয়ালে হেলান দিয়ে বলল, “কেউ যদি আমাকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দিত, আমি তাকে চোখ বুজে এক লাখ টাকা দিয়ে দিতাম।”

“মাত্র এক লাখ?” শ্রাবণী বলল, “আমি দশ লাখ দিতাম।”

জয়ন্ত বলল, “কল্পনাতেই যখন দিবি বেশি করে দে। টাকায় না দিয়ে ডলারে দে।”

“ঠিক আছে তাই সই। এক মিলিয়ন ডলার দিতাম।”

“তোরা এমনভাবে কথা বলছিস যেন সবাই এক একজন বিল গেটস।”

“ভৈরবের ফেরিতে ছোট ছোট বাচ্চারা পানি বিক্রি করে, এক গ্লাস পানি এক টাকা! এখন মনে হচ্ছে বিল গেটস না হয়ে ঐ পানিওয়ালা বাচ্চা হলেই ভালো হত, ঢক ঢক করে পুরো কলসি পানি খেয়ে ফেলতাম।”

জয়ন্ত হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, বলল, “হ্যাঁ এভাবে আর থাকা যাচ্ছে না। আয় বের হই।”

“বের হব?” শ্রাবণী তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে জয়ন্তের দিকে তাকাল, “তুই সিরিয়াস?”

“হ্যাঁ। যদি আক্রমন করতে চায় বলব সুসু সুসু...”

“তারপরও যদি আক্রমন করে?”

“তাহলে কিছু করার নেই। বন্দুক দিয়ে গুলি করে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে আগুন ধরিয়ে কোনোভাবে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করব।”

শ্রাবণী দুর্বলভাবে হেসে বলল, “একেকজনের কী দশা হয়েছে দেখেছিস?”

“যখন এনার্জি পাবি না তখনই চিন্তা করবি ট্রলার পর্যন্ত পৌঁছলেই বোতল ভরা ঠাণ্ডা পানি! সাথে সাথে শরীরে এড্রনালিনের ফ্লো শুরু হয়ে যাবে।”

নিয়াজ বলল, “সমস্যা শুধু জব্বার মিয়াকে নিয়ে।”

জব্বার মিয়া সাথে সাথে চোখ খুলে বলল, “আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আপনারা যদি পারেন, আমিও পারব।”

“ঠিক আছে, তবে রওনা দিই। ওঠো সবাই।”

জব্বার মিয়া খুব ধীরে ধীরে বসল। তারপর জয়ন্তের হাত ধরে সাবধানে উঠে দাঁড়াল। জয়ন্ত উৎসাহ দিয়ে বলল, “চমৎকার!”

ছোট দলটা রওনা দেয়ার প্রস্তুতি নিল। শ্রাবণীর হাতে বন্দুক, নিয়াজের হাতে পাইপগান, জয়ন্তের হাতে কিরিচ। সবার হাতেই একটা করে লাঠি এবং মশাল। সলভেন্টের বড় বোতল সাথে আছে, প্রয়োজন হলে ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া যাবে।

শ্রাবণী বলল, “বাইরে অন্ধকার, মোমবাতি জ্বালিয়ে নিই?”

জব্বার মিয়া বলল, “চাঁদনী রাত আছে। মোমবাতি জ্বালালে দূরে কিছু দেখবেন না। তাছাড়া বাতাসে নিভে যাবে।”

জয়ন্ত বলল, “হ্যাঁ, জব্বার মিয়া ঠিকই বলেছে। বাসা থেকে বের হবার সময়ই মোমবাতি নিভিয়ে নেব। ভালো জোছনা হলে পরিষ্কার দেখা যায়।”

দলটি দরজা খুলে ধীরে ধীরে বের হল। করিডোর ধরে হেঁটে সিঁড়ির সামনে দাঁড়াল। ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে সাবধানে নেমে এল। বাইরের দরজা খুলে বারান্দায় বের হয়ে আসে। 

জব্বার মিয়া ঠিকই বলেছে, আকাশে মস্তবড় চাঁদ। শহরে তারা কখনো আমাবস্যা পূর্নিমার খবর রাখে না, আকাশে চাঁদটি ওঠে, অপরাধীর মতো ডুবেও যায় অপরাধীর মতো। অথচ এখানে চাঁদটি কী ভয়ঙ্কর অহঙ্কারীর মতো পুরো আকাশটিকে উজ্জ্বল করে রেখেছে। 

জয়ন্ত ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটি নিভিয়ে দিতেই হঠাৎ করে জোছনার আলোতে চারিদিকে প্লাবিত হয়ে গেল। মনে হচ্ছে পুরো এলাকাটি বুঝি জোছনার আলোতে উথালপাথাল করছে।

শ্রাবণী নিশ্বাস ফেলে বলল, “ইশ! কী সুন্দর।”

জয়ন্ত বলল, “আসলেই।”

“যদি একটু পরে মরে যাই তোরা কোনো দাবি রাখিস না।”

কেউ কোনো কথা বলল না, এই সুন্দর পরিবেশে ভয়ঙ্কর বীভৎস একটা মৃত্যুর কথা কেউ চিন্তা করতে পারছে না। শুধু জব্বার মিয়া নিচু গলায় বলল, “আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখেন। হায়াত মউত আল্লাহর হাতে।”

জয়ন্ত বলল, “আয় রওনা দিই।”

চারজনের ছোট দলটি নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে পথে নেমে এল। সুড়কি বিছানো পথে তারা খুব সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যায়। সামনে বড় বড় গাছ ঝোপঝাড় তার নিচে হাজার হাজার বেজি নিঃশব্দে বসে আছে, তারা জানে বেজিগুলো তীক্ষ্ণচোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। 

শ্রাবণীর হৃৎপিণ্ড বুকের মাঝে ধকধক করে শব্দ করছে, প্রতিমুহূর্তে মনে হতে থাকে বেজিগুলো বুঝি তাদের ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। 

সবার আগে শ্রাবণী, তার পেছনে জব্বার মিয়া, জব্বার মিয়াকে দুইপাশ থেকে নিয়াজ আর জয়ন্ত ধরে রেখেছে।

কাঁপা-কাঁপা পা ফেলে শ্রাবণী আরো একটু এগিয়ে এল। এখন বেজিগুলোর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, এত কাছে যে প্রতিবার পা ফেলার আগে তাকে লক্ষ্য করতে হচ্ছে সে কোথায় পা ফেলছে, কোনো বেজির উপর পা ফেলে দিচ্ছে কি না। জোছনার আলোতে চারদিক থই থই করছে, তার মাঝে বড় বড় গাছের ছায়া। জোছনার নরম আলোতে সবকিছু দেখা যায় কিন্তু কিছু স্পষ্ট বোঝা যায় না। গাছের নিচে ঝোপের আড়ালে বেজিগুলো বসে আছে অনুভব করা যায়, কিন্তু ঠিক ভালো করে দেখা যায় না। নিশ্বাস বন্ধ করে শ্রাবণী আরো কয়েক পা এগিয়ে গেল। তার মনে হলো হঠাৎ করে সামনে একটা বড় গাছের নিচে কিছু-একটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। হিংস্র শব্দ করে কিছু বেজি নড়তে শুরু করেছে। আতঙ্কে শ্রাবণীর হৃৎপিণ্ড থেমে আসতে চায়, সে কাঁপা গলায় বলল, “সুসু-সুসু...”

সাথে সাথে সবকিছু যেন স্থির হয়ে যায়, নিঃশব্দ হয়ে যায়। বিস্তীর্ণ এলাকায় হিংস্র-চোখে বসে থাকা বেজিগুলো হঠাৎ যে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। অনভ্যস্ত হাতে শক্ত করে ধরে রাখা বন্দুকটা নিয়ে শ্রাবণী আবার বলল, “সুসু-সুসু...” কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে আবার উচ্চকণ্ঠে বলল, “সুসু-সুসু...”

হঠাৎ করে প্রতিধ্বনির মতো কথাগুলো ফিরে আসতে শুরু করে। মনে হয় সমস্ত বনাঞ্চল যেন প্রতিধ্বনি করে উঠে, “সুসু-সুসু...”

জয়ন্ত কাঁপা গলায় বলল, “কমিউনিকেট করা গেছে। মনে হয় বেঁচে গেলাম।”

“এখনো জানি না। “শ্রাবণী বলল, “হাঁটতে থাক।”

চারজনের ছোট দলটা দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। হাতে করে রাখা সলভেন্টের ভারী বোতলগুলো ঠেলে নেয়া কষ্টকর হতে থাকে। তারা তখন একটা একটা করে ফেলে দিয়ে আসতে থাকে। 

তাদের ডানে বায়ে সামনে পিছনে বেজি। ধূসর বেজিগুলো সরে গিয়ে তাদের জায়গা করে দিচ্ছে, তারা সে জায়গায় পা ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে। একটু পরপর তার দাঁড়িয়ে পড়ে চাপা গলায় বলছে, “সুসু-সুসু...” যার অর্থ “আমাদের মেরে ফেলো না প্লিজ!”

তার প্রত্যুত্তরে বেজিগুলোও বলছে, “সুসু-সুসু।” পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রজাতির কাছে সেটাও যেন অবোধ প্রাণীগুলোর একধরনের আকুতি।

জোছনার নরম আলোতে পা ফেলে ফেলে হাজার হাজার বেজিকে পিছনে ফেলে তারা শেষপর্যন্ত বালুবেলায় চলে এল। বালুবেলার নরম বালুতে পা ফেলে তারা এগিয়ে যায়। এই তো সামনে আর কিছুদূরে ট্রলারটি সমুদ্রের ঢেউয়ে দুলে দুলে উঠছে। আর কয়েকপা এগিয়ে গেলে তারা বেঁচে যাবে, ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্ন থেকে তারা রক্ষা পেয়ে যাবে।

ঠিক তখন জয়ন্ত দাঁড়িয়ে গেল। নিয়াজ বিরক্ত হয়ে বলল, “কী হল?”

“তোরা যা আমি আসছি।”

নিয়াজ অবাক হয়ে বলল, “কোথা থেকে আসছিস?”

“বেজিগুলোর কাছ থেকে।”

“বিদায় নিয়ে আসবি?” নিয়াজ খেপে গিয়ে বলল, “গালে চুমু দিয়ে বিদায় নিয়ে আসবি?”

“না, একটা জিনিস দিয়ে আসব।”

“কী জিনিস?”

“ম্যাচটা। মনে নেই ম্যাচটার জন্যে কী করল?”

নিয়াজ রেগে বলল, “দ্যাখ জয়ন্ত পাগলামি করিস না। তোর একগুঁযেমির জন্যে আমরা সবাই মরতে বসেছিলাম। এখন আবার একগুঁয়েমি করে ফেরত যাচ্ছিস? ফাজলেমির একটা সীমা থাকা দরকার।”

জয়ন্ত বলল, “তোদের যা ইচ্ছে বলতে পারিস। এই বেজিগুলো হচ্ছে মানুষের বুদ্ধিমত্তার একটা অংশ, তাদের বুদ্ধিমত্তাকে সম্মান করতে হবে। তোরা যা, আমি ম্যাচটা দিয়েই চলে আসব। বুদ্ধিমত্তার প্রথম স্টেপ হচ্ছে আগুন। ওদেরকে আগুন জ্বালানোর একটা সুযোগ করে দিই।”

নিয়াজ ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, “ঢং করার জায়গা পাচ্ছিস না? এটা একটা ঢং করার ব্যাপার হল? ন্যাকামো হল?”

“হোক।” জয়ন্ত পাথরের মত মুখ করে বলল, “তোরা যা।”

শ্রাবণী, নিয়াজ এবং জব্বার মিয়া হতবুদ্ধি হয়ে দেখল, জয়ন্ত আবার গভীর অরণ্যের মাঝে ঢুকে যাচ্ছে। মানুষের বুদ্ধিমত্তার একটি অংশ বহন করছে যে-প্রাণী সেই প্রাণীর তীব্র কৌতুহলকে সম্মান না-দেখিয়ে সে ফিরে যেতে পারবে না।

জোছনার নরম আলোয় জয়ন্তের অপসৃয়মান দেহটিকে একটি অতিপ্রাকৃত প্রতিমূর্তির মতো মনে হতে থাকে।

চাঁদের আলোতে সমুদ্রের পানি কেমন জানি ঝিকমিক করছে। তার মাঝে চাপা শব্দ করে ট্রলারটি এগিয়ে যাচ্ছে। নিয়াজ অনভ্যস্ত হাতে ট্রলারের হালটি ধরে রেখেছে, সে কল্পনাও করতে পারে না দুদিন আগে ট্রলারের উপর বসে থাকা নিয়ে তার ভেতরে একধরনের আতঙ্ক ছিল অথচ এখন সে এটি সমুদ্রের ওপর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ট্রলারের ভেতরে জব্বার মিয়া লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। তার দুর্বল দেহে চেতনা আসছে এবং চলে যাচ্ছে। ট্রলারটি সোজা দক্ষিণে গেলে লোকালয় পাওয়া যাবে, সেখান থেকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে। জব্বার মিয়া ভয় পায় না, সমুদ্রের বুকে সে এর থেকে অনেক বড় দুর্ঘটনাও পার হয়ে এসেছে। মৃত্যু বারবার আসে না, একবারই আসে এবং সত্যি সত্যি যখন আসবে সে একটুও ভয় না-পেয়ে তার মুখোমুখি হবে।

চাঁদটি এখন ঠিক মাথার ওপরে। পিছনে হকুনদিয়া দ্বীপ। জোছনার নরম আলোতে এত দূর থেকে হকুনদিয়া দ্বীপটি দেখা পাওয়ার কথা নয়, কিন্তু সেটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কারণ পুরো দ্বীপটি দাউদাউ করে জ্বলছে। আগুনের কমলা রঙের শিখা জীবন্ত প্রাণীর মতো লকলক করে নাচছে। সমস্ত আকাশ সেই আগুনের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

ট্রলারের ছাদে হাত রেখে শ্রাবণী দাঁড়িয়ে ছিল। সে জয়ন্তের হাত স্পর্শ করে বলল, “মন খারাপ করিস না জয়ন্ত।”

জয়ন্ত কাঁপা গলায় বলল, “আমি দায়ী। আমি যদি ম্যাচটা না দিয়ে আসতাম—”

শ্রাবণী নিচু গলায় জোর দিয়ে বলল, “না, তুই দায়ী না। এই বেজিগুলো প্রকৃতির স্বাভাবিক সৃষ্টি না। এটা মানুষের তৈরি একটি কৃত্রিম সৃষ্টি। যেটা স্বাভাবিক না সেটা প্রকৃতিতে থাকে না, থাকতে পারে না।”

“কিন্তু আমি যদি ম্যাচটি না দিয়ে আসতাম তাহলে এতবড় আগুন লাগত না।”

“তোর ধারণা কাজটি ভুল হয়েছিল?”

“অবশ্যই ভুল হয়েছিল।”

“একটা ভুলের জন্যে যে প্রাণী সারা পৃথিবী থেকে শেষ হয়ে যায় সেই প্রাণীর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কথা না।”

“কিন্তু—”

“না জয়ন্ত। এই বেজিগুলো ছিল একটা ভয়ঙ্কর ভুল। তোর আরেকটা ভুল দিয়ে সেই ভুলটি সংশোধন করা হল।”

জয়ন্ত কোনো কথা না বলে দূরে হকুনদিয়া দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রইল। আগুনের লাল আভায় পুরো আকাশটি আলোকিত হয়ে আছে। ভয়ঙ্কর আগুনের মাঝে বেজিগুলো না-জানি কী ভায়াল চিৎকার করে আর্তনাদ করছে।

॥ সমাপ্ত ॥