তৃতীয় এবং শেষ পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#কেপলার_টুটুবি - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
নীহা ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠল। টুরান ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করে বলল, নীহা! ওঠ।
নীহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী হয়েছে?
প্রাণীগুলো আসছে। রেডিয়েশান মিটারে আমরা সিগন্যাল পাচ্ছি।
সর্বনাশ! এখন কী হবে?
ইহিতা বলল, যা হবার সেটাই হবে। ভয় পাবার কিছু নেই। অস্ত্রটা তৈরি রাখ।
নীহা অস্ত্রটা তাক করে গুড়ি মেরে বসে বলল, আমরা তো নড়ছি না, প্রাণীগুলো আমাদের দেখছে কেমন করে?
জানি না। মনে হয় বাইরের তাপমাত্রা কমে যাবার কারণে আমাদের স্পেসস্যুট থেকে অনেক বেশি তাপ বিকিরণ করছে।
নীহা কথা না বলে তার চোখের গগলসটি অতি বেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নিল, সাথে সাথে চারপাশের জগৎটা অন্য রকম দেখাতে থাকে, তার মাঝে সে দূরে প্রাণীগুলোকে দেখতে পেল। সেগুলো গুড়ি মেরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, খুব ধীরে ধীরে চারদিকে থেকে তাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।
ইহিতা ফিসফিস করে বলল, আমি না বলা পর্যন্ত কেউ গুলি শুরু করবে না।
ঠিক আছে।
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল, দেখতে পেলো প্রাণীগুলো তাদের দিকে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে। রেডিয়েশন মিটারের কাটাটি নড়তে থাকে, প্রাণীগুলো থেকে চারপাশে তীব্র তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাণীগুলো আরেকটু কাছে এগিয়ে এল, এখন তাদের চেহারাগুলো দেখা যেতে শুরু করেছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ করল প্রাণীগুলো একরকম নয়, তাদের মাঝে গঠনগত একটা মিল আছে, সবগুলোরই সামনে বীভৎস ধারালো দাঁত, বড় মুখ। মুখটি কখনো শরীরের উপর, কখনো নিচে। অনেকগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। কখনো তাদের অতিকায় মাকড়শার মতো মনে হয়, কখনো ক্লেদাক্ত কীটের মতো মনে হয়।
প্রাণীগুলো আরেকটু এগিয়ে এল, তাদের হিংস্র গর্জন খুব ক্ষীণভাবে তারা শুনতে পায়। মাটিতে মৃদু কম্পন অনুভব করতে পারে।
যদিও কথা ছিল ইহিতা অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত কেউ গুলি করবে না, কিন্তু হঠাৎ করে টর প্রচণ্ড আক্রোশে গুলি করতে শুরু করল। সাথে সাথে যেন নরক নেমে আসে, প্রাণীগুলো ছুটে তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সেগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু তারপরেও সেগুলো থেমে যায় না–আরো ভয়ংকর আক্রোশে সেগুলো ছুটে আসতে থাকে। প্রাণীগুলোর ছিন্নভিন্ন দেহগুলোও গড়িয়ে গড়িয়ে পাথরে ঘষতে ঘষতে কাঁপতে কাঁপতে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।
ইহিতা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে একটা প্রাণীকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়ার পরও তার প্রতিটি অংশ যদি আলাদাভাবে জীবিত থেকে যায় প্রতিটি অংশই যদি নিজের মতো করে তাদের আক্রমণ করতে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে তারা কেমন করে টিকে থাকবে?
ইহিতা তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে কয়েকবার গুলি করে প্রাণীগুলোকে খানিকটা দূরে সরিয়ে দিল। তারপর দ্রুত তার পকেট থেকে রিমোট কন্ট্রোলটা বের করে। পথের মাঝখানে সে একটা সনিক চার্জার বসিয়ে এসেছে, সেটা ব্যবহার করা যায় কীনা পরীক্ষা করে দেখতে চায়।
রিমোট কন্ট্রোলের প্যানেলটি চোখের সামনে ধরে সে দ্রুত তার রেটিনা স্ক্যানিং করে নিয়ে বোতামগুলো স্পর্শ করে। প্রায় সাথে সাথেই সে একটা কম্পন এবং একটু পর বিস্ফোরণের চাপা শব্দ শুনতে পেল। ইহিতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ক্ষ্যাপা প্রাণীগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল এবং হঠাৎ করে তার মনে হল প্রাণীগুলোর মাঝে এক ধরনের নতুন চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।
ইহিতা চিৎকার করে বলল, থামাও। গুলি থামাও! সবাই গুলি থামাও।
সবাই গুলি থামাল এবং দেখতে পেল হঠাৎ প্রাণীগুলো পিছনে ছুটে যেতে শুরু করেছে। ছুটে যাবার সময় প্রাণীগুলো তাদের শরীরের ছিন্নভিন্ন অংশগুলো মুখে করে নিয়ে যেতে থাকে। শরীরের নানা অংশে সেগুলো ছুঁড়ে দিতে থাকে এবং সেগুলো শরীরে লেগে কিলবিল করে নড়তে থাকে।
ইহিতা রদ্ধশ্বাসে এই বিচিত্র দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল, এখন গুলি করো না–প্রাণীগুলোকে চলে যেতে দাও।
নীহা কাঁপা গলায় বলল, কোথায় যাচ্ছে? আমি যেখানে সনিক চার্জার লাগিয়ে এসেছি সেখানে। কেন?
প্রথমবার যখন প্রাণীগুলো আমাদের দিকে ছুটে এসেছিল তখন হঠাৎ করে ছুটে চলে গিয়েছিল, মনে আছে?
মনে আছে।
আমি পরীক্ষা করে দেখেছিলাম–দূরে একটা বিস্ফোরণ হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর খুব ছোট কম্পনের শব্দ তরঙ্গ ভেসে এসেছিল, ভূমিকম্পের বেলায় যেরকম হয়। তাই ভাবলাম-
কী ভাবলে?
প্রাণীগুলো ছোট কম্পনের শব্দ তরঙ্গ শুনতে পেলে সেদিকে নিশ্চয়ই ছুটে যায়। তাই পথে একটা সনিক চার্জার লাগিয়ে এসেছিলাম। এখান থেকে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে সেটা বিস্ফোরণ করিয়েছি। আসলেই প্রাণীগুলো সেদিকে ছুটে গেছে।
কেন? কেন ছুটে যায়?
এখনো জানি না, কিন্তু সেটা নিয়ে পরে চিন্তা করা যাবে। আমাদের এক্ষুণি রওনা দিতে হবে। আমাদের কাছে আর সনিক চার্জার নেই, প্রাণীগুলো আবার আক্রমণ করলে আর ফেরাতে পারব না। এক্ষুণি রওনা দিতে হবে।
টুরান বলল, তাছাড়াও এই তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো থেকে অনেক তেজস্ক্রিয় পদার্থ বের হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক নয়।
নীহা বলল, হ্যাঁ চল রওনা দিই। ট্রান্সপোর্টারে করে আমি ক্লদকে নিতে পারি।
ক্লদ মাথা নাড়ল, বলল, না। আমি ট্রান্সপোর্টারে যাব না। আমি হেঁটে যাব।
নীহা মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে।
ইহিতা টরের দিকে তাকিয়ে বলল, আর টর, শোনো।
বল।
আমি কিন্তু বলেছিলাম আমি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ গুলি করবে না। তুমি আমার নির্দেশ শোনো নি। তুমি আগেই গুলি শুরু করেছ।
টর থতমত খেয়ে বলল, আমি দুঃখিত।
ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার কেন জানি মনে হয় তুমি আসলে সেরকম দুঃখিত নও। কিন্তু শুনে রাখ–
কী?
মানুষের আবাসস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমি তোমাদের দলপতি। তোমাদের আমার কথা শুনতে হবে। এটা একটা আদেশ। মনে থাকবে?
মনে থাকবে।
যদি মনে থাকে তাহলে আমাকে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। ঠিক আছে?
টর পাথরের মতো মুখ করে বলল, ঠিক আছে।
সাতজনের ছোট দলটা তখন মঙ্গলগ্রহের রুক্ষ পাথরের উপর দিয়ে হাঁটতে থাকে। তাদের হাঁটার গতি দ্রুত। যেভাবে হোক তারা মানুষের আবাসস্থলে পৌঁছাতে চায়।
সাতজনের ছোট দলটি যখন মানুষের আবাসস্থলের কাছাকাছি পৌঁছেছে তখন সূর্যটি বেশ উপরে ওঠে গেছে। সূর্যের ম্লান আলোতে মঙ্গলগ্রহের বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে কেমন যেন নিঃসঙ্গ দেখায়। টর বলল, আমার মনে হয় আমরা শেষ পর্যন্ত আবাসস্থলে পৌঁছে গেছি।
নীহা বলল, হ্যাঁ। আরো কয়েকদিনের জন্যে বেঁচে থাকার সুযোগ হল।
টর বলল, ব্যাপারটা ভালো হল কি না বুঝতে পারছি না!
নীহা বলল, জীবন কখনো খারাপ হতে পারে না। জীবন সবসময়ই ভালো।
কে বলেছে? সুহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সবকিছু অন্যরকমও হতে পারে।
হলেও আর কতোটুকু হবে?
অনেকখানি হতে পারে।
নীহা ভুরু কুঁচকে বলল, কীভাবে?
সুহা বলল, কাছে এসো দেখাচ্ছি।
নীহা দুই পা এগিয়ে সুহার কাছে যেতেই সে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা নীহার মাথায় ধরল। মুহর্তে সুহার চেহারাটি একটি হিংস্র মানবীতে পাল্টে গেল। সে হিসহিস করে বলল, সবাই তোমাদের হাতের অস্ত্র নিচে ফেলে দুই হাত উপরে তুলে দাঁড়াও। এক সেকেন্ড দেরি করলে এই নির্বোধ মেয়েটার খুলি ফুটো হয়ে যাবে।
সবাই হতবাক হয়ে সুহার দিকে তাকিয়ে থাকে। সুহা প্রায় যান্ত্রিক গলায় বলল, এখনো যদি না বুঝে থাক তাহলে পরিষ্কার করে বলে দিই। আমি দুজন রবোমানবের একজন।
টুরান কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, আরেকজন কে?
ক্লদ বলল, আমি।
সবাই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল, তুমি!
হ্যাঁ আমি। বলে ক্লদ এগিয়ে নীহার হাত থেকে হ্যাচকা টান মেরে তার অস্ত্রটা নিয়ে নেয়।
সুহা সবার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলল, আমি তোমাদের সাথে খোশগল্প করার জন্যে আসি নি। হাতের অস্ত্র নিচে ফেল।
টর ইহিতাকে জিজ্ঞেস করল, ইহিতা, কী করব? তুমি যদি অনুমতি দাও তাহলে এই ডাইনিবুড়িকে শেষ করে দিই।
তাহলে অন্যদের কথা জানি না কিন্তু নিশ্চিতভাবে নীহাকে হারাব।
সুহা চিষ্কার করে বলল, বাজে কথা বল না। অস্ত্র ফেল, তা না হলে এই মুহূর্তে এর খুলি উড়িয়ে দেব।
ইহিতা এক পা এগিয়ে এসে বলল, আমার মনে হয় না তুমি এই মুহূর্তে সেটা করবে। তুমি রবোমানব হতে পার কিন্তু রবোট নওনীহার মাথায় গুলি করা মাত্রই আমাদের চারজনের অস্ত্র তোমাকে ঝাঁঝরা করে দেবে! কাজেই তুমি এতো সহজে গুলি করবে না।
তুমি রবোমানবকে চেনো না। রবোমানবের ভেতরে বিন্দুমাত্র দুর্বলতা নেই
শব্দটা দুর্বলতা নয়। শব্দটা হচ্ছে মানবিক মায়া মমতা-
সুহা হিস হিস করে বলল, অর্থহীন কথা বলে সময় নষ্ট কর না। তোমাদের মানবিক মায়ামমতা দুর্বলতা কি না সেটা এই মুহূর্তে প্রমাণিত হবে! তোমাদের নিজেদের রক্ষা করার একটি মাত্র উপায়-সেটি হচ্ছে আমাকে গুলি করা। করো গুলি। চিৎকার করে বলল, করো।
নীহা হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
সুহা হিংস্র ভঙ্গিতে বলল, করতে পারবে না। কাজেই সময় নষ্ট করো না। হাতের অস্ত্র ফেলে দাও।
ইহিতা অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, সে ঠিকই বলেছে। আমাদের আর কিছু করার নেই–হাতের অস্ত্র ফেলে দিতে হবে।
টর বলল, কিন্তু এই ডাইনি বুড়ি তাহলে সাথে সাথে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।
সম্ভবত। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই, অন্তত নীহা জানবে আমরা আমাদের নিজেদের বাঁচানোর জন্যে তাকে মারা যেতে দিই নি।
টর কাঁপা গলায় বলল, তুমি আমাদের দলপতি, তুমি যেটাই বলবে আমি সেটাই শুনব। আমরা কি শেষ চেষ্টা করব না?
ইহিতা বলল, ক্লদের দিকে তাকাও। দেখো সে কীভাবে অস্ত্রটা তোমার দিকে তাক করে ধরেছে। সম্ভবত সে তোমাকে গুলি করবে, কিন্তু তুমি কি পারবে এই চার বছরের শিশুটাকে গুলি করে মারতে?
টর মাথা নাড়ল, বলল, না।
আমি জানি তুমি আমি কেউ পারব না। আমরা মানুষ সেই জন্যে এখানে এই মুহূর্তে হয়তো সবাই মারা যাব। কিন্তু জেনে রাখো যে কারণে আমরা সবাই এখানে মারা যাব ঠিক সেই কারণে পৃথিবীর অসংখ্য জায়গায় অসংখ্য মানুষ একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখবে।
সুহা চিৎকার করে বলল, অস্ত্র ফেল।
টর ইহিতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ইহিতা। তুমি আমাদের দলপতি। তুমি বল, অস্ত্র ফেলব?
আমি খুবই দুঃখিত টর, কিন্তু আমাদের অস্ত্র ফেলতে হবে।
টর হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলল। ইহিতা আর টুরান তাদের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলল। নুট তার হাতের অস্ত্র তুলে বলল। আমি আমার হাতের অস্ত্রটি ছুঁড়ে ফেলার আগে একটি কথা বলতে পারি?
কী কথা?
নুট একটু এগিয়ে এসে বলল, মনে আছে আমি বলেছিলাম আমি জানি আমাদের ভেতরে কোন দুজন রবোমানব? তোমরা কী বিশ্বাস কর আমি সেটা জানতাম?
সুহা মাথা নাড়ল, বলল, অসম্ভব। আমরা পুরো সময় নির্বোধ মানুষের মতো অভিনয় করে গেছি।
নুট এক হাতে তার অস্ত্রটি ধরে রেখেছিল, অন্য হাতটি উপরে তুলে দেখিয়ে বলল, এটা কী দেখেছ?
একটা লিভার।
হ্যাঁ। এই লিভারটি ছেড়ে দিলে কী হবে জান?
কী হবে?
এটা খুব ছোট একটা বিস্ফোরক ডেটোনেট করবে। বিস্ফোরকটা কোথায় আছে জানতে চাও?
সুহা হিংস্র মুখে জিজ্ঞেস করল, কোথায়?
তোমার ছেলে ক্লদের শরীরে!
মিথ্যা কথা!
তোমার মনে আছে, ক্লদকে স্পেসস্যুট পরাতে কে সাহায্য করেছিল? আমি। কেন আমি এতো ব্যস্ত হয়ে তাকে সাহায্য করেছিলাম? ছোট্ট এই বিস্ফোরকটি রাখার জন্যে!
তুমি মিথ্যা কথা বলছ!
ঠিক আছে! নুট হাতের অস্ত্রটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, পরীক্ষা হয়ে যাক! আমাকে গুলি কর। আমার হাত থেকে লিভারটি মুক্ত করিয়ে দাও।
ক্লদ চিৎকার করে বলল, না! না! সুহা, গুলি করো না।
নুট হা হা করে হেসে বলল, আমি কম কথা বলি, তাই অনেক বেশি চিন্তা করি। চিন্তা করে করে সব কিছু বের করে ফেলা যায়। আরো একটা জিনিস জান?
কী?
আমাকে মানুষের এই দলটাতে কেন রেখেছে জান?
কেন?
আমার একটা অপরাধী মন আছে-যেটা এখানে আর কারো নেই। আমি অপরাধীর মতো চিন্তা করতে পারি-যেটা তোমাদের মতো রবোমানবদের বিপদে ফেলে দিতে পারে। নুট আবার হাসার চেষ্টা করে বলল, সুহা! নির্বোধ রবোমানব, তুমি কী লক্ষ করেছ, আমি সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। অন্যদের আড়াল করে ফেলেছি। তুমি আমাকে গুলি না করে অন্যদের গুলি করতে পারবে না।
সুহা কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নুটের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘুরে ক্লদের দিকে তাকাল, বলল, ক্লদ তুমি নিচ থেকে সবগুলো অস্ত্র তুলে নিয়ে এস।
ক্লদ বলল, কেন?
আমার সাথে তর্ক করবে না, নিয়ে এস?
ক্লদ নিচে পড়ে থাকা অস্ত্রগুলো তুলে নিয়ে আসে। সুহা তখন ধাক্কা দিয়ে নীহাকে সরিয়ে দিল, তারপর ক্লদকে বলল, অস্ত্রগুলো দাও।
ক্লদ জিজ্ঞেস করল, কেন?
তুমি এতোগুলো রাখতে পারবে না সেজন্যে।
ক্লদ বলল, অস্ত্রগুলো ভারী না, তাছাড়া মঙ্গলগ্রহে মাধ্যাকর্ষণ বল খুব কম। আমি এগুলো রাখতে পারব।
বাজে তর্ক করো না। অস্ত্রগুলো দাও আমার হাতে।
ক্লদ তার শিশুসুলভ কণ্ঠে কিন্তু একজন বড় মানুষের ভাষায় বলল, সব অস্ত্র তোমার হাতে থাকলে তোমার কাছ থেকে আমাকে নিরাপত্তা কে দেবে! তা ছাড়া-
তা ছাড়া কী?
কথা ছিল আমি এখন প্রথম মানুষ হত্যা করব। তুমি আমাকে এখনো হত্যা করতে দিচ্ছ না।
ক্লদ! নির্বোধের মতো আচরণ করো না! দেখতে পাচ্ছ না এই অপরাধীটা দাবি করছে তোমার জীবন তার হাতে? যতক্ষণ পরীক্ষা করে সেটা নিশ্চিত না হতে পারছি ততক্ষণ তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
ক্লদ চিৎকার করে বলল, তুমি বলেছিলে তুমি নিখুঁত পরিকল্পনা করেছ, এখানে দেখা যাচ্ছে তোমার পরিকল্পনায় শুধু ভুল আর ভুল! তুমি বলেছিলে মানুষ হচ্ছে নির্বোধ! এখন দেখা যাচ্ছে তুমি মানুষ থেকেও নির্বোধ?।
সুহা ধমক দিয়ে বলল, বাজে কথা বলো না। আমার পরিকল্পনা নিখুঁত।
তাহলে কেন এখনো আমি একটা মানুষকে হত্যা করতে পারছি না!
পারবে। সময় হলেই পারবে।
কখন সময় হবে?
সুহা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রেডিয়েশান মনিটরের দিকে তাকাল। সেখানে আবার তেজস্ক্রিয়তার চিহ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে। সে ভুরু কুঁচকে বলল। প্রাণীগুলো আবার আসছে।
ক্লদ জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন কী করব?
তুমি ছুটে যাও আবাসস্থলের দিকে। অস্ত্রগুলো রেখে যাও।
না। আমি অস্ত্র নিয়ে যাব। বলে সে দুই হাতে কোনোভাবে অস্ত্রগুলো ধরে আবাসস্থলের দিকে ছুটতে থাকে।
নুট শব্দ করে হাসল, বলল, আমি তোমাকে যতই দেখছি—ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি! তুমি কী সত্যিই ক্লদকে জন্ম দিয়েছিলে?
হ্যাঁ দিয়েছিলাম। তাতে কী হয়েছে?
মা হয়ে তুমি যেভাবে তোমার নিজের সন্তানকে হত্যা করার ব্যবস্থা করলে। আমি সেটা দেখে মুগ্ধ হয়েছি সুহা। এখন তুমি আমাদের হত্যা করবে তখন আমার হাতের লিভারটি ছুটে যাবে সাথে সাথে ক্লদের শরীরের ভেতর বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হবে–তুমি নিশ্চিত করলে তখন যেন সে তোমার কাছ থেকে দূরে থাকে! তোমার যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
এর ভেতরে কোন বিষয়টি অযৌক্তিক? একটা অবাধ্য শিশুর হাতে যখন অস্ত্র ওঠে যায় সে কতো বিপজ্জনক তুমি জান?
জানি। নুট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ক্লদ ছুটে অনেকদূর চলে গিয়েছে তাই তোমার মনে ধারণা হয়েছে সে তোমার কথা শুনতে পারছে না। তুমি ভুলে গেছো আমাদের হেলমেটের মাঝে কমিউনিকেশান মডিউল লাগানোএকশ কিলোমিটার দূর থেকেও কথা শোনা যায়। ক্লদ তোমার কথাগুলো শুনেছে। তার হাতে একটি নয় দুটি নয় চার-চারটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। সে ফিরে আসছে–তোমার কী মনে হয় চার বছরের একটা শিশুর সাথে তুমি বোঝাপাড়া করতে পারবে?।
সুহা চমকে পিছনে তাকাল, তার গলা থেকে একটা হিংস্র শ্বাপদের মতো শব্দ বের হয়ে এলো। সে তার অস্ত্রটি শক্ত হাতে ধরে পায়ে পায়ে ক্লদের দিকে এগুতে থাকে। সবাই বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে, চার বছরের একটা শিশুও হাতে একটা অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে, দেখে মনে হচ্ছে সে বুঝি একটা খেলনা ধরে রেখেছে। কিন্তু এটা মোটেও খেলনা নয়-এটা ভয়ংকর একটা অস্ত্র!
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। একটা মা আর তার শিশু সন্তান একজন আরেকজনের দিকে উদ্যত অস্ত্র হাতে এগিয়ে যাচ্ছে-একজন আরেকজন হত্যা করতে চায়। কী ভয়ংকর একটি দৃশ্য–এর চাইতে ভয়াবহ, এর চাইতে নিষ্ঠুর কোনো কিছু কি হওয়া সম্ভব?
নুট নীহা টর টুরান আর ইহিতা নিঃশ্বাস বন্ধ করে সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটির দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে।
মঙ্গল গ্রহের লাল পাথরে পাশাপাশি পড়ে থাকা সুহা আর ক্লদের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থেকে ইহিতা বলল, আমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না এটি সম্ভব।
নীহা বলল, আমি নিজের চোখে দেখেও এটা বিশ্বাস করতে পারছি না।
টর নুটের দিকে তাকালে, জিজ্ঞেস করল, তোমার হাতের লিভারটি কী আসলেই বিস্ফোরকের সাথে জুড়ে দেয়া, নাকি পুরোটি একটি ধোঁকা?
নুট মাথা নাড়ল, বলল, না। এটা ধোকা না। এটা সত্যি। আমি জানতাম এরা দুজন রবোমানব।
ক্লদের শরীরে সত্যি বিস্ফোরক লাগানো আছে?
হ্যাঁ। ছোট বিস্ফোরক। এই দেখ–সে নিচু হয়ে ক্লদের ছিন্নভিন্ন স্পেসস্যুটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ছোট একটা বিস্ফোরকের গোলক বের করে আনে। সেটি দূরে ছুঁড়ে দিয়ে নুট তার লিভারটি ছেড়ে দিতেই দূরের বিস্ফোরকটি বিস্ফোরিত হল।
টর নুটের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাকে স্বীকার করতেই হবে তুমি অসাধারণ। আমি কখনোই এই দুজনকে রবোমানব হিসেবে সন্দেহ করতে পারতাম না।
নুট কোনো কথা বলল না, অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। ইহিতা বলল, রেডিয়েশান মনিটরে রিডিং দিতে শুরু করেছে। প্রাণীগুলো আবার আসছে। আমাদের আবাসস্থলের ভেতর ঢুকে যাওয়া দরকার। চল যাই।
টুরান জিজ্ঞেস করল, মৃতদেহ দুটি?
এই মুহূর্তে কিছু করার নেই। পরে যদি সুযোগ পাই সমাহিত করে দেব।
লাল পাথরের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অস্ত্রগুলো তুলে পাঁচজন দ্রুত আবাসস্থলের দিকে যেতে থাকে প্রাণীগুলো আসার আগে তারা ভেতরে ঢুকে যেতে চায়।
আবাসস্থলের ভেতরটা খুব সাজানো গোছানো। মানুষজন থাকার জন্যে পরিপাটি ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাতাসের তাপ চাপ রক্ষা করা আছে বলে তারা স্পেসস্যুট খুলে বসেছে। শুধু তাই নয় তারা সত্যিকারের খাবারের প্যাকেট বের করে সেগুলো গরম করে ধূমায়িত কফির সাথে বসে বসে খেয়েছে। গত ছত্রিশ ঘণ্টার উত্তেজনা শেষে হঠাৎ করে একটা নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকতে পেরে তাদের মাঝে এক ধরনের আলস্য ভর করেছে।
কফির মগে চুমুক দিয়ে টুরান বলল, আমরা কী তাহলে এখন আমাদের মহাকাশযানে ফিরে যেতে পারি?
ইহিতা বলল, নিশ্চয়ই পারি। এখন আমাদের মাঝে কোনো রোমানব নেই। আমরা নিশ্চয়ই মহাকাশযানে ফিরে যাব।
টর বলল, তোমরা যা ইচ্ছে তাই বলতে পার–আমি কিন্তু তোমাদের পরিষ্কার করে একটা কথা বলতে চাই
কী কথা? মহাকাশযানে গিয়ে আমি ট্রিনিটিকে নিজ হাতে খুন করব!
ইহিতা শব্দ করে হাসল, বলল, তুমি কীভাবে সেটা কর, আমি সেটা দেখতে চাই।
নীহা জিজ্ঞেস করল, কিন্তু আমরা এখন মহাকাশযানে ফেরত যাব কেমন করে?
টুরান বলল, আমরা ট্রিনিটির সাথে যোগাযোগ করব, ট্রিনিটি কিছু একটা ব্যবস্থা করবে। একটা স্কাউটশিপ পাঠাবে এখানে বা সেরকম কিছু একটা করবে।
তাহলে ট্রিনিটির সাথে যোগাযোগ করতে হবে?
হ্যাঁ।
কেমন করে করব?
এই আবাসস্থলাটাতে অনেক ভালো কমিউনিকেশন্স মডিউল থাকার কথাএসো খুঁজে বের করি।
নীহা আর টুরান মিলে আবাসস্থলে কমিউনিকেশন্স মডিউল খুঁজতে থাকে, আবাসস্থলের দোতলাতে সেটা পেয়ে গেল। টুরান কয়েকটা সুইচ স্পর্শ করে বলল, কী আশ্চর্য! দেখেছ, আমাদের জন্যে এখানে ম্যাসেজ রাখা আছে?
কী ম্যাসেজ?
এখনো জানি না। টুরান আরেকটা বোতাম চাপ দিতেই সামনে একটা আলোর ঝলকানি দেখা গেল, তারপর ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমি ট্রিনিটি বলছি। স্কাউটশিপে করে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া মহাকাশচারীদের সাথে যোগাযোগ করতে চাই। জরুরি। আবার বলছি, স্কাউটশিপে করে…।
নীহা বলল, আমি সবাইকে ডেকে আনি। সবাই মিলে শুনি ট্রিনিটি কী বলে।
যাও ডেকে আনো।
কিছুক্ষণের মাঝেই সবাই ওপরে কমিউনিকেশন মউিডলের কাছে চলে এলো। টুরান তখন যোগাযোগের চ্যানেলটি চালু করে। সাথে সাথে ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমি ট্রিনিটি, মহাকাশযান থেকে তোমাদের সবার জন্যে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
টর বলল, বাজে কথা বলল না। মানুষকে শুভেচ্ছা জানানোর মতো বুদ্ধিমত্তা তোমার নেই।
আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত—
টর মাঝপথে থামিয়ে বলল, আমি তোমাকে বলেছি, তুমি বাজে কথা বলবে। আমাদেরকে ভয়ংকর বিপদের মাঝে ঠেলে দিয়ে বলছ তুমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত? তুমি জান অন্তর মানে কী? বেজন্ম কোথাকার!
ট্রিনিটি হাসির মতো শব্দ করে বলল, টর, আমি তোমার ক্ষোভটুকু পরিষ্কার বুঝতে পারছি। তবে তোমাকে দুটি ব্যাপার বুঝতে হবে। প্রথমত আমি যেটা করেছি সেটা না করে আমার উপায় ছিল না। খুব সোজা ভাষায় যদি বলতে হয় তাহলে বলা যায়, আমি একটা কম্পিউটার, আমাকে যেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে আমাকে ঠিক সেভাবে কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, তুমি যখন আমার ওপর রেগে যাও কিংবা রেগে গালাগাল কর আমি কিন্তু সেগুলো বুঝি না! তুমি যথার্থই বলেছ, আমার সেগুলো বোঝার ক্ষমতা নেই।
টুরান বলল, ঠিক আছে। ঠিক আছে! তুমি কী বলার জন্যে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছ সেটা বলে ফেল।
ট্রিনিটি বলল, পৃথিবী থেকে তোমাদের সাথে খুব জরুরিভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইহিতা অবাক হয়ে বলল, পৃথিবী থেকে? আমাদের সাথে?
হ্যাঁ।
কে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে?
আমার জানা নেই। গোপনীয় চ্যানেল। তোমরা যদি প্রস্তুত থাকো তাহলে আমি চ্যানেলটি তোমাদের জন্যে উন্মুক্ত করে দিই।
অবশ্যই। ইহিতা বলল, অবশ্যই উন্মুক্ত করে দাও।
সাথে সাথে ঘরের ভেতর কিছু আলোর বিচ্ছুরণ দেখা গেল কিছু যান্ত্রিক শব্দ ভেসে এলো এবং বেশ কয়েক মিনিট পর হঠাৎ করে ঘরের ঠিক মাঝখানে তারা বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুলকে দেখতে পেল। মহামান্য থুল একটা সবুজ ঘাসের লনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তারা শুনতে পেল মহামান্য থুল একটু ঘুরে তাদের দিকে বললেন, তোমাদের জন্যে শুভেচ্ছা। আমি খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে তোমাদের সাথে যোগাযোগ করছি।
নীহা চিৎকার করে বলল, মহামান্য গুল? আপনি?
নীহার কথাটি মহামান্য থুল সেই মুহূর্তে শুনতে পেলেন না। মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে তার কথাটি পৌঁছাতে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট সময় নেবে, মহামান্য থুলের উত্তরটি ফিরে আসতে আরো পাঁচ মিনিট। নীহা এবং অন্যেরা শুনতে পেলো মহামান্য থুল ঠিক সেই কথাটিই বললেন, মুখোমুখি কথা বলার যে সুবিধেটুকু আছে সেটি এখন আমাদের মাঝে নেই, তোমাদের কথা আমার কাছে এবং আমার কথা তোমাদের কাছে পৌঁছানোর মাঝে বেশ অনেকখানি সময় নেবে। তোমরা কেমন আছ আমি জানি না। আমার জানা প্রয়োজন। আমি এখন চুপ করছি, তোমরা বল। কেমন আছ বল।
টুরান বলল, এর মাঝে অনেক কিছু ঘটে গেছে। কোনো মানুষের জীবনে এতো অল্প সময়ে এতো কিছু ঘটতে পারে সেটা বিশ্বাসই হতে চায় না। মহামান্য থুল আপনি শুনে খুশি হবেন যে আমরা ভয়ংকর ভয়ংকর বিপদের মাঝে থেকেও রক্ষা পেয়েছি। কীভাবে সেটা ঘটেছে সেটা আপনাকে বলবে ইহিতা। আমরা ইহিতাকে আমাদের দলপতি তৈরি করেছি। ইহিতা একজন অসাধারণ-দলপতি, সে কীভাবে আমাদের রক্ষা করে এনেছে সেটি শুনলে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন! টুরান ইহিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ইহিতা! তুমি বল।
ইহিতা একটু বিব্রত হয়ে বলল, আমি এমন কিছুই করি নি! তারপর সে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে মহাকাশযানে কী ঘটেছে এবং কীভাবে তারা শেষ পর্যন্ত এই নিরাপদ আবাসস্থলে আশ্রয় নিয়েছে সেটি বলল। তাদের ভেতরে যে দুজন রবোমানব আছে এবং সেই দুজন শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিজেরাই নিজেদের হত্যা করেছে সেটি বলার সময় ইহিতার মুখে গভীর একটা বেদনায় ছাপ পড়ে।
ইহিতার কথা শেষ হবার পর প্রায় দশ মিনিট সময় পরে তারা মহামান্য থুলের কথা শুনতে পেল, মহামান্য থুল বললেন, পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে একটা নির্জন গ্রহের ছোট একটা আবাসস্থলে তোমরা কোনো ভাবে নিজেদের রক্ষা করে বেঁচে আছ। কিন্তু আমি তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ। সত্যি কথা বলতে কী শুধু আমি নই, পৃথিবীর মানুষ তোমাদের কাছে ঋণী থাকবে। তোমরা সবাই জান রবোমানবেরা কিছুক্ষণের মাঝেই পৃথিবীর নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবে। দখল করার পর নিশ্চিতভাবেই তারা আমাকে এবং বিজ্ঞান আকাদেমীর সবাইকে হত্যা করতে আসবে। আমি সেটা নিয়ে খুব বেশি দুর্ভাবনা করছি না। তোমরা জান আমি দীর্ঘ একটি আনন্দময় জীবন কাটিয়েছি, আমি এখন খুব আনন্দের সাথে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারি। কিন্তু আমাদের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করতে আমরা কি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি? রবোমানব যখন নেটওয়ার্ক দখল করে এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি কমিউনিটি, প্রতিটি অস্ত্রাগার প্রতিটি যোগাযোগ ব্যবস্থা এক কথায় পুরো পৃথিবীর সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে তখন পৃথিবীর মানুষ রবোমানবের হাতে ধ্বংস হয়ে যাবে?
মহামান্য থুল একটু থামলেন, অন্যমনস্কভাবে নিজের হাতের দিকে তাকালেন তারপর আবার মাথা তুলে সামনের দিকে তাকালেন, তাকিয়ে বললেন, এর সঠিক উত্তর কেউ জানতো না। এখন আমি জানি। ভবিষ্যতে যে ভয়ংকর বিপদটি আসবে সেই বিপদের মাঝে মানুষ ভেঙে পড়বে না। তোমরা যেমন ভেঙে পড়নি। তারা নিজেদের মাঝে নেতৃত্ব তৈরি করে নেবে। সেই নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে তারা একে অন্যকে সাহায্য করবে। ঠিক যেরকম তোমরা করেছ। আর ঠিক তখন যদি আমরা রবোমানবকেও একই ধরনের বিপদের মাঝে ফেলতে পারি তখন তারা হবে ভয়ংকর রকম স্বার্থপর, তারা হবে হিংস্র, তারা হবে নিষ্ঠুর, তারা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে একে অন্যকে হত্যা করবে। ঠিক এখানে যেরকম করেছে।
মহামান্য থুল একটু হাসির মতো ভঙ্গি করলেন, তোমাদের প্রতি পৃথিবীর মানুষের কৃতজ্ঞতা! তোমাদের কাছ থেকে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি পেয়েছি। আমাদের কী করতে হবে সেটা নিয়ে আমি একটু ভাবনার মাঝে ছিলাম, আমার ভাবনা দূর হয়েছে।
মহামান্য থুলের কথা শেষ হবার আগেই সবাই প্রায় এক সাথে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু আপনার কী হবে? আপনার কী হবে?
তারা সেই প্রশ্নের উত্তর পেল না, প্রশ্নটি মঙ্গলগ্রহ থেকে পৃথিবীতে গিয়ে সেখান থেকে আর ফিরে এলো না, তার কারণ ততক্ষণে সেখানে একটি মহাপ্রলয় শুরু হয়ে গেছে।
লাল চুলের মেয়েটি টেবিলে কাচের জারে তরলের মাঝে ড়ুবিয়ে রাখা থলথলে মস্তিষ্কটির দিকে একধরনের বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে রইল তারপর খুট করে সুইচটাতে চাপ দিয়ে মাইক্রোফোন অন করে বলল, এই, তুমি কী জেগে আছ?
স্পিকারে একটা ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল, জেগে আছি।
আমার হয়েছে মুশকিল, কাচের জারে তোমাকে-তার মানে এই থলথলে মস্তিষ্কটা দেখতেই কেমন জানি গা ঘিনঘিন করে, আবার একটু কথা না বললে ভালোও লাগে না।
তোমার কাছে আমার অনুরোধ তুমি আমাকে ধ্বংস করে দাও! আমার এই অস্তিত্ব যে কী ভয়ংকর তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।
লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, কে বলেছে কল্পনা করতে পারি না। অবশ্যই পারি! কল্পনা করতে পারি বলেই তো তোমাকে বাঁচিয়ে রাখছি। তুমি হচ্ছ আমার সবচেয়ে বড় বিনোদন।
স্পিকার থেকে কাতর একটি কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, দোহাই তোমার! দোহাই আমাকে আর কষ্ট দিও না। আমাকে শেষ করে দাও।
বাজে কথা বলো না, তার চাইতে আমি তোমাকে কী বলতে এসেছি সেটা শোনো! আর কিছুক্ষণের মাঝেই পুরো নেটওয়ার্কটি আমরা দখল করে নেব। সাথে সাথে আমরা বের হব–সারাজীবন যেটা করতে পারিনি তখন সেটা করতে পারব–প্রকাশ্যে আমরা অস্ত্র নিয়ে বের হব। সবচেয়ে প্রথম কী করব তোমাকে তো বলেছি, বলেছি না?
লাল চুলের মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল, বলে থাকলেও আবার বলি। আনন্দের কথা অনেকবার শোনা যায়! মেয়েটি হাসি থামিয়ে বলল, সবার আগে হত্যা করব তোমাদের থুথুড়ে বুড়ো হতভাগা থুলকে! তার বাসভবন এরই মাঝে ঘিরে ফেলা হয়েছে। গ্রিন সিগনেল পেলেই আমরা অস্ত্র হাতে ঢুকে যাব!
স্পিকার থেকে হাহাকারের মতো শব্দ ভেসে আসে, না! না!
হ্যাঁ। হ্যাঁ। আমাদের সবার হাতে থাকবে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। তোমার খুলি কেটে আমি তোমাকে বের করে এনেছিলাম বলে আমাকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। থুলকে প্রথম গুলিটি করার সুযোগ দেয়া হবে আমাকে! বুঝেছ? আমাকে!
একটা অসহায় যন্ত্রণার শব্দ শোনা গেল। লাল চুলের মেয়েটি সেই যন্ত্রণার শব্দটি উপভোগ করতে করতে বলল, পুরো ব্যাপারটা খুব গোপনীয়। কেউ কারো কাছে সেটা বলতে পারছে না। শুধু আমি তোমাকে বলতে পারছি! মেয়েটি আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে।
হাসির শব্দটি যে একটি অসহায় মস্তিষ্কের নিউরনে দীর্ঘসময় বিচ্ছুরিত হতে থাকল সেই কথাটি কেউ জানতে পারল না।
--------------
দরজা ভেঙে বারোজন রোমানব মহামান্য থুলের বাসভবনে ঢুকে পড়ল। তারা সবাই জানে এই সময়টিতে তিনি বাসার পিছনে নরম ঘাসের ওপর একটি হেলান দেয়া চেয়ারে বসে দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। রবোমানবগুলো তার বাসভবনের ভেতর দিয়ে ছুটে পিছনে চলে আসে, তাদের ধারণা সত্যি। মহামান্য থুল সত্যি সত্যিই একটা হেলান চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন। রবোমানবের পায়ের শব্দ শুনে তিনি ঘুরে তাকালেন। তার মুখে কোনো ভয় বা আতংকের ছাপ। পড়ল না। শুধুমাত্র একটু বিস্ময়ের ছাপ উঁকি দিয়ে গেল।
রবোমানবের এই ছোট দলটির দলপতি, নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি একটু এগিয়ে এসে মহামান্য থুলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, থুল! তোমার খেলা শেষ।
মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, আমি আমার দায়িত্বটিকে কখনো খেলা হিসেবে নিই নি।
মানুষটি ধমকের সুরে বলল, আমি তোমার সাথে কথার মারপ্যাচ পরীক্ষা করতে আসি নি। আমি কেন এসেছি সেটা তুমি খুব ভালো করে জান। আমি কী বলছি সেটা আরো ভালো করে জান!
থুল মাথা নাড়লেন। বললেন, হ্যাঁ। জানি। বেশ ভালো ভাবেই জানি। তারপরও তোমার মুখ থেকে শোনার একটু আগ্রহ হচ্ছে।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হিংস্র গলায় বলল, অন্য কোনো সময় হলে আমি তোমার সাথে এই আলোচনার যেতাম না। কিন্তু আজকে-শুধু আজকে বলে আমি তোমার সাথে কথা বলছি। আজকে আমার মনটা আনন্দে ভরপুর।
মহামান্য থুল বললেন, আমি শুনি তোমার কথা।
আমরা রবোমানবেরা পৃথিবীটা দখল করে নিয়েছি।
পৃথিবী? মহামান্য থুল ভুরু কুঁচকালেন। পৃথিবী তো অনেক বড় ব্যাপার। এক সময় সাত বিলিয়ন মানুষ ছিল। এখন সেটাকে কমিয়ে আমরা দুই বিলিয়নে নামিয়ে এনেছি। দুই বিলিয়ন মানুষের পৃথিবী কেমন করে কেউ দখল করে?
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, নির্বোধের মতো কথা বলো না! তুমি খুব ভালো করে জান এখন পৃথিবী দখল করার জন্যে পৃথিবীর মাঠে ঘাটে দৌড়াতে হয় না। পুরো পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে নেটওয়ার্ক, কাজেই শুধু নেটওয়ার্ককে দখল করতে হয়!
সেটি প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হা হা করে হাসল। বলল, আমরা সেই অসম্ভব। কাজটি করেছি। আমরা নেটওয়ার্কটি দখল করেছি। কাজটি খুব সহজ ছিল না, একদিনেও আমরা এটা করি নি, ধীরে ধীরে করেছি। নির্বোধ মানুষের ভেতর একজন একজন করে রবোমানব ঢুকিয়েছি, তারা খানিকটা করে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্য রবোমানব ঢুকিয়েছে। একটু একটু করে আমরা তোমাদের নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি। এখন এটা আমাদের নেটওয়ার্ক! এই পৃথিবীর দুই বিলিয়ন মানুষের প্রত্যেককে আমরা নিয়ন্ত্রণ করব। তাদের জীবন-মরণ এখন আমাদের হাতে!
মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, কাজটা খুব বুদ্ধিমানের হয় নি। কোন কাজটা?
এই যে একটা নেটওয়ার্ক দিয়ে পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে সেবা দেয়া। তুমি কিছু মনে করো না, নেটওয়ার্কটা কিন্তু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে তৈরি হয় নি। সাহায্য করার জন্য তৈরি হয়েছে। তবে তুমি ঠিকই অনুমান করেছ। মানুষের দৈনন্দিন সব কাজই নেটওয়ার্ক দিয়ে করতে হয়, তাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
হ্যাঁ। তুমি ব্যাপারটা বুঝেছ! আমরা যদি কোনো বাবা-মাকে বলি আমাদের কথা না শুনলে তোমার চার বছরের বাচ্চাটার রক্তের তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যাবে তাহলে কোন বাবা-মা আমাদের অবাধ্য হবে? আর নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে থাকলে রক্তে তেজস্ক্রিয় দেয়া পানির মতো সহজ। স্কুলের লাঞ্চের প্যাকেট পর্যন্ত নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে।
মহামান্য থুলকে কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাল। তিনি একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার সাথে কথা বলে আমার মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি একটু এগিয়ে এসে বলল, বুড়ো তোমার চিন্তার কোনো কারণ নেই। তোমার মন খারাপের অনুভূতি দূর করার জন্যে আমরা এসেছি!
আমাকে হত্যা করার কথা বলছ?
হ্যাঁ। শুধু তোমাকে না, এই মুহূর্তে বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজন সদস্যকেই হত্যা করা হচ্ছে। তোমাকে দিয়ে শুরু করব। তোমাকে নিজের হাতে হত্যা করার জন্যে সবাই আগ্রহী, আমি অনেক বেছে এই মেয়েটিকে সুযোগ দিয়েছি।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করতেই লাল চুলের মেয়েটি হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এল। থুল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমার ঠিক তোমার বয়সী একটা মেয়ে আছে।
আমার তোমার বয়সী বাবা নেই।
তুমি আমাকে হত্যা করবে?
হ্যাঁ।
আমার গুলি করতে খুব ভালো লাগে।
ঠিক আছে গুলি কর।
মেয়েটি তার অস্ত্রটি উপরে তুলতেই মহামান্য থুল হাত তুলে তাকে থামালেন বললেন, এক সেকেন্ড।।
কী হয়েছে?
আমাকে হত্যা করার আগে আমি কি তোমাদের একটা কথা বলতে পারি?
কী কথা?
একটি নেটওয়ার্ক দিয়ে পুরো মানবজাতিকে একটা শৃঙ্খলার মাঝে আনার মাঝে একটা ঝুঁকি আছে সেটা যে আমরা অনুমান করেছিলাম সেটা কি তোমরা জান?
তুমি কী বলতে চাইছ?
তোমরা যে নেটওয়ার্কটি দখল করতে চাইবে সেটা আমরা অনুমান করেছিলাম সেটা কী তোমরা জান?
এটা একটা ছোট শিশুও অনুমান করতে পারবে।
কাজেই আমরা কী করেছি তোমরা জান?
কী করেছ?
নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করে দিয়েছি। এই মুহূর্তে সেটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির এক মুহূর্ত সময় লাগল কথাটি বুঝতে। যখন বুঝতে পারল তখন সে হা হা করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, বুড়ো ভাম কোথাকার! তুমি আমাকে বুদ্ধিহীন প্রতিবন্ধী ভেবেছ? তুমি ভেবেছ আমি জানি না যে এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা সম্ভব না? সরাসরি নিউক্লিয়ার বোমা ফেলেও এটা ধ্বংস করা যায় না? ওর কোনো নিয়ন্ত্রণ কক্ষ নেই, এটা বন্ধ করার কোনো সুইচ নেই! এর বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ করার কোনো উপায় নেই, মূল কেন্দ্রে মানুষ ঢোকার ব্যবস্থা নেই। ভূমিকম্প, সুনামি এর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না! তুমি ভেবেছ আমি এসব জানি না? তুমি ভেবেছ আমি জানি না যে এটি অনেক জায়গায় এটি কপি করে রাখা আছে? তুমি ভেবেছ আমি তোমার এই অর্থহান প্রলাপ বিশ্বাস করব?
মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, আমি একবারও সেটি ভাবি নি। আমি ভেবেছি তুমি আমার কথা শুনে খোঁজ নেবে আমি কী সত্যি কথা বলেছি নাকি মিথ্যে কথা বলে তোমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছি।
রবোমানবেরা তাদের হেডফোনে কিছু শোনার চেষ্টা করে, তাদেরকে হঠাৎ করে বিভ্রান্ত দেখা যায়, নিজেদের ভেতরে ফিসফিস করে কথা বলে তারপর নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির কাছে ছুটে আসে, চাপা গলায় বলে, আসলেই নেটওয়ার্ক থেকে কোনো তথ্য আসছে না।
মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, এটা কোনো কূট চাল নয়! তোমাদের বিভ্রান্ত করার কোনো কৌশল নয়। আসলেই নেটওয়ার্কটিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি চিৎকার করে বলল, অসম্ভব!
নেটওয়ার্ক দখল করার মতো অসম্ভব একটা কাজ যদি তোমরা করতে পার, তাহলে সেটা ধ্বংস করার মতো আরেকটা অসম্ভব কাজ কেন আমরা করতে পারব না?
এটা কেউ করতে পারবে না–নিশ্চয়ই এখানে অন্য কিছু আছে।
অন্য কিছু নেই।
আছে। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হিংস্র গলায় বলল, নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা অসম্ভব। স্বয়ং শয়তান এলেও পারবে না। আমি এক্ষুণি বের করছি আসলে কী হয়েছে। মানুষটি তার পকেট থেকে ছোট কমিউনিকেশন মডিউল বের করে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। সে হতবাক হয়ে আবিষ্কার করে সেটি নীরব হয়ে আছে। সে বোতামগুলো স্পর্শ করল, কোনো লাভ হল না। তারপর সেটা ধরে সে ঝাঁকুনি দিল, দুই হাতে সেটাকে পাগলের মতো আঘাত করতে লাগল।
মহামান্য থুল বললেন, কোনো লাভ নেই। তুমি আমার কথা বিশ্বাস কর, পৃথিবীতে এখন কোনো নেটওয়ার্ক নেই। নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তোমরা যেন পৃথিবীর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পার সেজন্যে আমরা নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করেছি!
অসম্ভব!
হ্যাঁ। প্রায় অসম্ভব। তারপরও করেছি। খুব বেশি জানাজানি হতে দেই নি, ধ্বংস করার দায়িত্বটি নিয়েছিলাম আমি! মহামান্য থুল একটু হাসলেন, এই প্রথম আমি কিছু একটা ধ্বংস করলাম!
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে ওঠে, সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে, অসম্ভব! অসম্ভব! তুমি আমাকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করছ। তোমাদের অন্য কোনো মতলব আছে! তোমরা খুব ভালো করে জান নেটওয়ার্ক। ধ্বংস হলে পুরো পৃথিবীর সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যাবে! পুরো পৃথিবী অচল হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হচ্ছে মাথায় গুলি করার মতো।
মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ! পুরো পৃথিবী এখন ওলট-পালট হয়ে যাবে! কোথাও কোনো তথ্য নেই, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সমস্ত পৃথিবীতে এখন বিশৃঙ্খল অবস্থা শুরু হবে! চরম বিশৃঙ্খলা!
তুমি বলতে চাইছ তুমি নিজের হাতে পৃথিবী ধ্বংস করছ?
মহামান্য থুল বাধা দিয়ে বললেন, আমি মোটেও পৃথিবী ধ্বংস করছি না। আমি শুধু নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করেছি। নেটওয়ার্ক! নেটওয়ার্ক ধ্বংসের কারণে পৃথিবী ধ্বংস হবে না—পৃথিবী অনেক বড় ব্যাপার। এতে অল্পে পৃথিবী ধ্বংস হয় না। বড়জোর বিশৃঙ্খলা হবে, হই চই হবে, ওলট-পালট হবে কিন্তু ধ্বংস মোটেও হবে না। তোমরা যেহেতু সব খবর রাখো, তোমরা নিশ্চয়ই জান খাদ্যশস্যের যেন কোনো অভাব না হয় সেজন্যে আমরা অনেকদিন থেকে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত খাবার মজুদ করেছি। ওষুধপত্র মজুদ করেছি, প্রয়োজনীয় রসদ মজুদ করেছি! কাজেই পৃথিবীর মানুষ প্রথম কয়েকদিন হই চই করবে, একটু বিশৃঙ্খল হবে তারপর নিজেরা নিজেদের নেতৃত্ব তৈরি করে নিজেদের দায়িত্ব নেবে! তোমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাবে না।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি বিস্ফারিত চোখে মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে রইল, সে এখনো তার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। মানুষের চেহারায় নিষ্ঠুরতা সরে গিয়ে সেখানে এখন এক ধরনের আতংকের ছাপ পড়তে শুরু করেছে। সে তার শুকনো ঠোঁটকে জিভ দিয়ে ভিজিয়ে মাথা নেড়ে বলল, আমি তোমার একটি কথাও বিশ্বাস করি না।
মহামান্য থুল তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, না করলে নেই। তারপরও তোমাদের জানিয়ে রাখছি। আমার মনে হয় তোমাদের আরো একটা তথ্য জানিয়ে রাখা দরকার। মানুষের উপর যখন বড় বিপদ নেমে আসে তখন তারা একে অন্যের বিভেদ ভুলে যায়, তারা তখন এক সাথে কাজ করে। তার কারণ হচ্ছে মানুষের সভ্যতার জন্মই হয়েছে একজনের জন্যে অন্যের মমতা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। রবোমানবেরা তাদের ভেতর থেকে মমতা আর ভালোবাসা তুলে দিয়েছে। তাই রবোমানবেরা যখন বড় বিপদে পড়ে তখন তারা কী করে জান?
কী করে?
তারা স্বার্থপর হয়ে যায়। হিংস্র হয়ে যায়। একে অন্যকে সরিয়ে নেতৃত্ব নিতে চায়। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। তখন কী হয় জান?
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি কোনো কথা না বলে থুলের দিকে তাকিয়ে রইল। মহামান্য থুল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তখন রবোমানবেরা একে অন্যকে হত্যা করে! কাজেই আমি কাগজে লিখে দিতে পারি আজ থেকে তিন মাস পরে পৃথিবীতে কোনো রোমানব থাকবে না। যেহেতু নেটওয়ার্ক থেকে কোনো সাহায্য পাবে না তাই একজন আরেক জনকে হত্যা করতে থাকবে!
লালচুলের মেয়েটি বলল, তুমি এটা কী ভাবে জান?
মঙ্গল গ্রহে আমরা ছোট একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছি। সেই এক্সপেরিমেন্টে দেখা গেছে বড় বিপদের মাঝে রবোমানবের মা তার সন্তানকে হত্যা করে ফেলে!
লাল চুলের মেয়েটি নিষ্ঠুর চেহারার দলপতির দিকে তাকাল। দলপতির চেহারায় নিষ্ঠুরতাটুকু সরে গিয়ে এখন সেখানে একধরনের উদ্ভ্রান্ত ভাব চলে এসেছে। লাল চুলের মেয়েটি বলল, আমি কি এখন গুলি করতে পারি।
দলপতি বলল, দাঁড়াও। এক সেকেন্ড। তারপর ঘুরে মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এখনো বিশ্বাস করি না তুমি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছ। কিন্তু আমি তারপরও জানতে চাই সত্যিই যদি ধ্বংস করে থাক তাহলে সেটি কেমন করে করেছ?
মহামান্য থুল হেসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, তোমার পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব না। তোমার মস্তিষ্ক সেটা বোঝার ক্ষমতা রাখে না।
আমি তবু শুনতে চাই। রবোমানবদের দলপতি ক্ষিপ্ত স্বরে বলল, আমাকে বল।
আমি তোমাকে পুরো ব্যাপারটি বোঝাতে পারব না, বড় জোর তোমাকে একটু ধারণা দিতে পারি। মহামান্য থুল তার আঙুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি জানি না, তোমরা লক্ষ করেছ কি না প্রিসা নগরীর উত্তরের বনাঞ্চলে একটা আগুন জ্বলছে। শীতের মওসুমে প্রায়ই জ্বলে—এটি এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। তবে আগুনের কারণে যে ধোয়া হয় সেটা সূর্যের আলোকে আটকে দেয় তাই নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সৌর বিদ্যুতের প্যানেলগুলো প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে না। সেটি এমন কোনো গুরুতর ব্যাপার না, কিন্তু ঠিক একই সময় মাহীরা হদের সুইস গেট খুলে নিচের শুষ্ক অঞ্চল পাবিত করা হয়েছে। খুবই স্বাভাবিক একটা কাজ কিন্তু হদের পানির উচ্চতা কমে গিয়েছে, পানি দিয়ে বিদ্যুৎ প্লান্ট শীতল করা হলে এক সময় সেটি সম্ভব হবে না! তোমরা লক্ষ করেছ কিনা জানি না দুটো বিনোদন উপগ্রহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, মানুষের বিনোদনের উপায় নেই, নগরীতে বিক্ষোভ হয়েছে তার জন্যে নিরাপত্তা কর্মীরা ব্যস্ত, ঠিক তখন শক্তি কেন্দ্রে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন পাওয়া গেছে, নিরাপত্তা কেন্দ্র, শক্তি কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে! মাজুরা ইলেকট্রিক কোম্পানির ফোরম্যানকে অগ্রিম বোনাস দেয়া হয়েছে-এই মানুষটি বোনাস পেলেই শহরে গিয়ে উত্তেজক পানীয় খায়, ভোরে ঠিক করে কাজ করতে পারে না। সেজন্যে সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এবং একটা দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারেনি। অগ্নিকাণ্ডের জন্যে যে ফায়ারব্রিগেড যাবার কথা তাদেরও সমস্যা হয়েছে সবুজ পৃথিবীর স্কুলের বাচ্চাদের জন্যে! তারা আর্ট মিউজিয়ামে গিয়েছে সকাল দশটায় সেজন্যে রাস্তাটা সাময়িকভাবে বন্ধ! এরকম অসংখ্য ছছাট ছোট ঘটনা আলাদা আলাদা ভাবে পুরোপুরি গুরুত্বহীন। কিন্তু যখন একটার সাথে আরেকটা জুড়ে দেখ দেখবে সেটি ভয়াবহ বিপজ্জনক! নেটওয়ার্কের কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে যাবে। গিয়েছে!
রবোমানবের দলপতি হিংস্র গলায় বলল, তার মানে তুমি দাবি করছ কী করলে কী হবে তার সবগুলো তুমি আগে থেকে জান?
হ্যাঁ জানি। আমাকে কেউ দাবা খেলায় কখনো হারাতে পারে না—কী হলে কী হতে পারে তার সম্ভাব্য সবকিছু আমি বলতে পারি। এখানেও আমি বলতে পারি, তাই কিছু ছোটখাট ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এর সবগুলোর সম্মিলিত ফল হচ্ছে নেটওয়ার্ক ধ্বংস হওয়া। মহামান্য থুল বললেন, ক্যাওস থিওরি বলে একটা থিওরি আছে। সেখানে বলা হয় এখানে হয়তো একটা প্রজাপতি তার ডানা ঝাঁপটেছে–তার ফলস্বরূপ অন্য গোলার্ধে একটা ঘূর্ণিঝড় হয়ে যাবে! এখানেও তাই, পার্থক্য হল আমি নিজের হাতে একটি একটি করে সেটা সাজিয়েছি।
রবোমানবের দলপতি বলল, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না!
ঠিক আছে। তোমার ইচ্ছা। মহামান্য থুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে চুপ করলেন।
লাল চুলের মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, আমি কী এখন এই বুড়োটিকে গুলি করব!
দলপতি হিংস্র গলায় বলল, হ্যাঁ। করো। এর এই অভিশপ্ত মস্তকটাকে ছিন্নভিন্ন করে দাও।
লাল চুলের মেয়েটি তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তুলে গুলি করল। ঝলক ঝলক রক্ত বের হয়ে দেহটি ঘুরে পড়ে যাবার কথা ছিল কিন্তু দেহটি পড়ে গেল না। বরং মহামান্য থুল ওঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি তোমাদের আরো একটু বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম। তোমরা কেউ অনুমান করতে পার নি আমি যে আমি নই? আমি আমার হলোগ্রাফিক ছবি। নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেছে, জরুরি বিদ্যুৎ দিয়ে এই হলোগ্রাফিক ছবি তোমাদের দেখানো হয়েছে, মনে হয় আর দেখানো সম্ভব নয়। সত্যিই যদি আমাকে চাও বাইরে খুঁজতে হবে। আমি এখন বাইরে। লক্ষ লক্ষ বিভ্রান্ত আতংকিত মানুষের সাথে মিশে গেছি।
প্রচণ্ড আক্রোশে সবগুলো রবোমানব মহামান্য থুলের হলোগ্রাফিক ছবিটিকেই গুলি করতে থাকে। মহামান্য থুল হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে বইলেন। খুব ধীরে ধীরে তার ছবিটি মিলিয়ে গেল।
রাস্তার ফুটপাথ দিয়ে অসংখ্য মানুষ ছুটছে। একটা ছোট শিশু কাঁদছে আর তার মা শিশুটির হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শিশুটি জিজ্ঞেস করল, এখন কী হবে মা? নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেছে–
আমি জানি না। মা ভয় পাওয়া গলায় বললেন, আমি জানি না বাবা।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৃদ্ধ বলল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।
মা জিজ্ঞেস করল, আপনি কেমন করে জানেন?
বৃদ্ধ হাসলেন, বললেন, আমি জানি! মানুষের অসাধ্য কিছু নেই।
আপনাকে চেনা চেনা লাগছে। আপনাকে কী আমি আগে কখনো দেখেছি?
আমি জানি না। অনেকের চেহারা হয় এরকম, দেখলেই মনে হয় আগে কোথায় জানি দেখেছি। মনে হয় আমার চেহারা সেরকম।
আপনি সত্যিই বলছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে?
হ্যাঁ। বিশ্বাস কর। আমি বলছি সব ঠিক হয়ে যাবে।
মা শিশুটিকে নিয়ে ছুটতে থাকে। শিশুটি এখন নতুন উৎসাহে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলল, মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাসছিস কেন?
এমনি।
তোর ভয় করছে না?
না। আমার ভয় করছে না।
কেন ভয় করছে না?
ঐ যে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
কোন বুড়ো কী না কী বলেছে—
কী বলছ তুমি মা? তুমি মহামান্য থুলকে চিনতে পার নি?
মা থমকে দাঁড়ালেন, পিছনে তাকালেন কিন্তু থুলকে আর খুঁজে পেলেন না।
পুলিশ কমিশনার অসহায়ভাবে হাত নেড়ে বললেন, আমি কী করব?
তাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো বলল, তাহলে কে করবে? তোমাকেই তো করতে হবে। তুমি আমাদের পুলিশ কমিশনার। তুমি না করলে কে করবে?
পুলিশ কমিশনারকে আরো অসহায় দেখায়, কিন্তু আমি তো শুধু পুলিশ কমিশনার। আইন শৃঙ্খলার বিষয়টা দেখি।
এটা তো আইন শৃঙ্খলারই ব্যাপার। নেটওয়ার্ক কাজ করছে না, পুরো শহরের সবকিছু থেমে গেছে। আমরা কোথায় বিদ্যুৎ পাব, কোথায় খাবার পানি পাব, কোথায় খাবার পাব, আমাদের ছেলে মেয়েরা কেমন করে স্কুলে যাবে, কেমন করে লেখাপড়া করবে কিছু জানি না। আমাদের অসুখ হলে কে চিকিৎসা করবে তাও জানি না!
পুলিশ কমিশনার মাথা নাড়ল, বলল, এগুলো তো আমারও প্রশ্ন।
তাহলে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দাও।
তেজি চেহারার একজন মহিলা বলল, মানুষজন কিন্তু ক্ষেপে উঠছে।
কমবয়সী একজন তরুণ বলল, সবাই খুব ভয় পেয়েছে। সারা শহরে আতংক।
বুড়ো মতোন একজন বলল, তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত দিতে হবে। বলতে হবে আমরা এখন কী করব।
পুলিশ কমিশনার বলল, আমরা চেষ্টা করছি কেন্দ্রে যোগাযোগ করার জন্যে। কোনো উত্তর পাচ্ছি না।
তেজি চেহারার মহিলাটি বলল, আমরা এসব শুনতে চাই না। তুমি কিছু একটা কর।
পুলিশ অফিসার খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, তাহলে আমরা সবাই এক সাথে বসি। বসে চিন্তা-ভাবনা করে কিছু একটা ঠিক করি।
তুমি যেটা ভালো মনে কর সেটা কর। কিন্তু কিছু একটা কর।
ঠিক আছে। ঠিক আছে। তাহলে আমরা সবাই আমাদের শহরের হলঘরটাতে বসি?
পুলিশ কমিশনারকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে।
তেজি চেহারার মহিলাটি বলল, কিন্তু আমরা সবাইকে খবর দিব কেমন করে? নেটওয়ার্ক নেই।
সবার বাসায় বাসায় যেতে হবে। বাসায় বাসায় গিয়ে বলতে হবে।
বুড়ো মতন মানুষটা বলল, একজন কয়েকজনকে খবর দেবে, তারা প্রত্যেকে আরো কয়েজনকে খবর দেবে এভাবে সবার কাছে খবর পৌঁছানো যাবে।
পুলিশ কমিশনার বলল, হ্যাঁ। সেটাই ভালো। আমি আমার পুলিশ বাহিনীকেও পাঠিয়ে দিই।
হলঘরে শহরের সব মানুষ চলে এসেছে। বসার জায়গায় সবাইকে জায়গা দেয়া যায় নি তাই অনেক দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর রীতিমতো গরম, মানুষেরা হাত দিয়ে নিজেদের বাতাস করার চেষ্টা করছে। হলঘরের সামনে উঁচু মঞ্চে পুলিশ কমিশনার দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে মুখে এক ধরনের আতংক। সে হাত তুলতেই সবাই চুপ করে গেল।
পুলিশ অফিসার একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে বলল, প্রিয় নগরবাসী এখানে আসার জন্যে সবাইকে ধন্যবাদ। তোমরা সবাই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ কেন তোমাদেরকে এখানে ডাকা হয়েছে।
সবাই নিঃশব্দে বসে থাকে, সবার মাঝে এক ধরনের চাপা ভয়।
পুলিশ কমিশনার বলল, তোমরা সবাই দেখেছ আমাদের নেটওয়ার্কটি কাজ করছে না। এটি অসম্ভব একটি ব্যাপার—এরকম ভয়ংকর একটি ব্যাপার যে ঘটতে পারে আমরা সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। এখনো আমি সেটা বিশ্বাস করতে পারছি না। পুলিশ কমিশনার একবার ঢোক গিলে বলল, আমি ভেবেছিলাম এটি একটি ছোট দুর্ঘটনা এবং অত্যন্ত দ্রুত এই সমস্যাটি মিটিয়ে ফেলা হবে। তোমরাও নিশ্চয়ই তাই ভেবেছিলে–আমরা সবাই অপেক্ষা করছিলাম যে নেটওয়ার্কটি চালু হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক না থাকায় আমরা অন্যান্য শহরে খোঁজ নিতে পারছিলাম না, সব যোগাযোগ বন্ধ। তারপরও লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিয়েছি এবং যেটুকু সম্ভব জানা গেছে শুধু এখানে নয়, সব জায়গায় নেটওয়ার্ক বন্ধ।
কমবয়সী একটি মেয়ে প্রায় হাহাকারের মতো শব্দ করে বলল, তাহলে আমাদের কী হবে?
পুলিশ কমিশনার বলল, সেটা নিয়ে কথা বলার জন্যেই তোমাদের সবাইকে ডেকেছি। বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রেখে আলোচনা করা যাক।
বয়স্ক একজন মানুষ বলল, আমি একটা বইয়ে পড়েছিলাম প্রাচীন কালে সব শহরে শহর পরিচালনার জন্যে একটি কমিটি থাকত। সেই কমিটির সদস্যরা শহরের ভালো-মন্দ দায়িত্ব নিত। আমরাও কাজ চালানোর জন্যে এরকম একটা কমিটি করতে পারি।
একজন জিজ্ঞেস করল, সেই কমিটির সদস্য কে হবে?
আরেকজন বলল, নেটওয়ার্ক যদি না থাকে তাহলে সেই সদস্যরা কেমন করে কাজ করবে?
কমবয়সী মেয়েটি ভয় পাওয়া গলায় বলল, কিন্তু তোমরা কেউ কেন সত্যিকারের বিষয়টা নিয়ে কথা বলছ না? নেটওয়ার্কটি কেমন করে বন্ধ হয়ে গেল? আমরা সবসময় জানতাম নিউক্লিয়ার বোমা দিয়েও এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা যায় না।
সামনের দিকে বসে থাকা মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ বলল, আমি ব্যাপারটা তোমাদের জন্যে ব্যাখ্যা করতে পারি।
সবাই ঘুরে মানুষটির দিকে তাকাল। এই শহরের মানুষ আগে কখনো এই মধ্যবয়স্ক মানুষটিকে দেখেনি। মানুষটির উঁচু চোয়াল এবং মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখগুলো কোটরের ভেতর এবং দেখে মনে হয় সেটা ধিকিধিকি করে জ্বলছে। মানুষটি ওঠে দাঁড়াল এবং লম্বা পা ফেলে মঞ্চে ওঠে পুলিশ কমিশনাররের পাশে দাঁড়াল। তারপর পোশাকের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে লম্বা বেঢপ একটা রিভলবার বের করে আনে। সেটা উপরে তুলে একটা গুলি করতই ঝনঝন শব্দ করে একটা আলো ভেঙ্গে পড়ে হলঘরের খানিকটা অন্ধকার হয়ে যায়। হলঘরে বসে থাকা মানুষগুলো এক সাথে সবাই চিৎকার করে আবার হঠাৎ করে থেমে যায়।
মধ্যবয়স্ক কোটরাগত চোখের মানুষটা রিভলবারটাকে একনজর দেখে বলল, আমার আসলে পুলিশ কমিশনারের কপালে এই গুলিটা করার কথা ছিল কিন্তু রক্তের ছিটে লেগে আমার শার্টটা নোংরা হবে তাই তাঁকে গুলি করি নি।
নেটওয়ার্ক বন্ধ, কাপড় ধুতেও পারব না।
হলঘর বোঝাই মানুষগুলো বিস্ফারিত চোখে মধ্যবয়স্ক মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা কেউ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমি রবোমানব। এই হলঘরের পিছনে আরো দুজন রবোমানব আছে, তাদের হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র রয়েছে, একটু যদি নাড়াচাড়া করো, আমার কথার অবাধ্য হও তাহলে সবাইকে গুলি করে শেষ করে দেয়া হবে। আমাদের কাছে মানুষ আর ব্যাক্টরিয়ার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।
কেউ কোনো কথা বলল না, নিঃশব্দে রবোমানবটির দিকে তাকিয়ে রইল। রবোমানবটি হলঘরের মানুষগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, আজ আমার খুব আনন্দের দিন। এতোদিন আমরা মানুষের ভয়ে লুকিয়ে থাকতাম। এখন আমাদের আর লুকিয়ে থাকতে হবে না। আমরা প্রকাশ্যে এসেছি। এই মুহূর্তে পৃথিবীর প্রত্যেকটা শহরে নগরে রবোমানবেরা বের হয়ে তার দায়িত্ব নিচ্ছে। পুরো পৃথিবী এখন রবোমানবদের হাতের মুঠোয়।
বয়স্ক একজন মানুষ বলল, আমি বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমি বলছ পুরো পৃথিবীটা তোমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু কেমন করে সেটা তোমাদের হাতের মুঠোয় গিয়েছে?
তার কারণ আমরা পৃথিবীর নেটওয়ার্ক দখল করেছি। যে পৃথিবীর নেটওয়ার্ক দখল করতে পারে সে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে।
কিন্তু নেটওয়ার্ক তত বন্ধ। বন্ধ নেটওয়ার্ক দখল করে কী লাভ?
আমরা বন্ধ নেটওয়ার্ক দখল করি নি।
তাহলে নেটওয়ার্ক বন্ধ কেন?
নিশ্চয়ই কোনো একটা কারণে নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়েছে।
সেই কারণটা কী?
মধ্যবয়স্ক মানুষটার কোটরাগত চোখ দুটো হঠাৎ যেন জ্বলে ওঠে, সে হিংস্র গলায় বলল, তুমি সীমা অতিক্রম করেছ? আমি তোমার কথায় উত্তর দিতে বাধ্য নই।
কিন্তু আমাদের জানতে হবে।
বেশ। জেনে নাও। বলে রবোমানবটি তার রিভলবার তুলে বুড়ো মানুষটির মাথা লক্ষ্য করে গুলি করল। পুরো হলঘরটিতে গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
বুড়োমানুষের দেহটি ঢলে নিচে পড়ে গেল। রবোমানবটি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোমাদের জন্যে এটি একটি উদাহরণ হয়ে রইল। কেউ যদি সীমা অতিক্রম করে তার বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
কেউ কোনো কথা বলল না।
আমরা পৃথিবী দখল করেছি এই বিষয়টি নিয়ে কারো প্রশ্ন আছে?
এবারেও কেউ কোনো কথা বলল না।
চমৎকার। রবোমানবটি মুখে সন্তুষ্টির একটা ভাব ফুটিয়ে বলল, এবার তাহলে সকলে ঘরে ফিরে যাও। কাল সকালে আমাদের পঞ্চাশজন মানুষ দরকার। সুস্থ সবল নীরোগ পঞ্চাশ জন মানুষ। কমবয়সী পঞ্চাশজন মানুষ। নাবী এবং পুরুষ। আজ রাতের মাঝে নেটওয়ার্ক চালু হয়ে যাবে। সেই নেটওয়ার্কে আমরা নির্দেশ পাঠাব।
এবারেও কেউ কোনো কথা বলল না। রবোমানবটির মুখে ক্রুর একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, এই পঞ্চাশজনের জীবনকে আমরা মহিমান্বিত করে দেবো। তারা তুচ্ছ মানুষের জীবন পরিত্যাগ করে সত্যিকার রবোমানবের জীবনে পা দেবে।
উপস্থিত সবাই হঠাৎ করে আতংকে শিউরে ওঠে।
আবছা অন্ধকার একটি ঘরে কয়েকজন তরুণ গা ঘেষাঘেষি করে বসে আছে। তাদের সামনে একটি মনিটর। সেখানে আলোর কোনো বিচ্ছুরণ নেই। একজন নিচু গলায় বলল, নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে?
না, চালু হয়নি।
আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমি মনে মনে প্রার্থনা করছি যেন নেটওয়ার্ক চালু না হয়।
শুধু তুমি নয় এই প্রথমবার আমরা সবাই প্রার্থনা করছি যেন নেটওয়ার্ক চালু না হয়।
রবোমানবেরা নেটওয়ার্কটা দখল করে নিয়েছে, তুমি চিন্তা করতে পার সেটি কী ভয়ানক ব্যাপার?
না আমি চিন্তাও করতে পারি না।
একটা জিনিস লক্ষ করেছ?
কী জিনিস?
নেটওয়ার্কটা যদি চালু না হয় তাহলে রবোমানবেরা কিছু করতে পারবে।
আমরাও কিছু করতে পারব না।
কিন্তু আমরা অনেক, তারা মাত্র তিনজন। আমরা ইচ্ছে করলে তাদের আংগুল দিয়ে টিপে মেরে ফেলতে পারব।
তাদের হাতে অস্ত্র আছে।
আমরাও অস্ত্র জোগাড় করতে পারি।
কেমন করে? নেটওয়ার্ক বন্ধ-তুমি কিছুই জোগাড় করতে পারবেনা।
আমরা অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে ফেলতে পারি।
কী বলছ তুমি? এটা কতো বড় অপরাধ তুমি জান?
নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকলে এটা কোনো অপরাধ না।
যদি নেটওয়ার্ক চালু হয়ে যায়?
এখনো হয় নি।
হে ঈশ্বর তুমি নেটওয়ার্কটি বন্ধ রাখ।
কে জানে পৃথিবীর অন্য জায়গায় কী হচ্ছে!
ঠিক এখানে যা ঘটছে নিশ্চয়ই হুবহু তাই ঘটছে।
হে বিধাতা, তুমি নেটওয়ার্কটি বন্ধ রাখ। রবোমানবেরা যেন কোনোভাবে নেটওয়ার্ক চালু করতে না পারে।
রবোমানব তিনজনের একজন জিজ্ঞেস করল, তোমরা কী চাও?
পেশীবহুল তরুণটি তার অস্ত্রটি হাত বদল করে বলল, তোমরা কাল বলেছিলে তোমরা সুস্থ সবল নীরোগ পঞ্চাশজন মানুষ চাও। আমরা সুস্থ সবল নিরোগ পঞ্চাশজন এসেছি।
একজন রবোমানব তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি তুলে বলল, আমাদের সাথে তামাশা করার চেষ্টা করো না। এই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি দিয়ে তোমাদের সবাইকে শেষ করে দেব।
আমরা সেটা অনুমান করেছিলাম। তাই দেখতেই পাচ্ছ আমরা সুস্থ সবল নীরোগ পঞ্চাশজন খালি হাতে আসিনি। সবার হাতে অস্ত্র। অস্ত্রাগার ভেঙে নিয়ে এসেছি।
।সোনালি চুলের একটি মেয়ে বলল, পৃথিবীর নেটওয়ার্ক কেন বন্ধ সেটা আমরা এখন বুঝতে পারছি। তোমরা এটি দখল করেছ জানতে পেরে নেটওয়ার্কটি অচল করে দেয়া হয়েছে। তোমরা সোনার হরিণ ধরার চেষ্টা করেছ। ধরে আবিষ্কার করেছ এটা মরা ইঁদুর। মানুষের বুদ্ধি রবোমানবের থেকে অনেক বেশি।
রবোমানবটি হিংস্র গলায় বলল, আমার কাছে বুদ্ধি নিয়ে বড়াই করো না। তোমরা সরে যাও, না হলে গুলি করে শেষ করে দেব।
পেশীবহুল তরুণটি বলল, এই কথাটা বরং আমরাই বলি। অস্ত্র ফেলে দিয়ে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়াও না হলে আমরা গুলি করে শেষ করে দেব।
তরুণটির কথা শেষ হবার আগে রবোমানব তিনটি তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করতে শুরু করে। পঞ্চাশজন তরুণ তরুণীও তাদের অস্ত্র তুলে নেয়। হলঘরটির মাঝে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
যেভাবে হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। হলঘরের একপাশে গুলিবিদ্ধ তিনজন রবোমানব পড়েছিল। অন্য পাশে তরুণ-তরুণীরা। খুব ধীরে ধীরে তরুণ-তরুণীরা ওঠে দাঁড়াতে থাকে। শরীর থেকে ধূলা ঝাড়তে ঝাড়তে একজন বলল, রবোমানবদের বলা হয় নি আমরা অস্ত্রাগার ভেঙ্গে শুধু অস্ত্র নিই নি, গুলি নিরোধক পোশাকও নিয়েছি।
পঞ্চাশজন তরুণ-তরুণী তিনটি রবোমানবকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল। একজন বলল, আমি কখনো চিন্তা করিনি আমি আমার হাতে অস্ত্র তুলে নেব, আমি সেই অস্ত্র দিয়ে কাউকে গুলি করব। আমি কখনোই কোনো প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হতে চাই নি।
সোনালি চুলের মেয়েটি বলল, তুমি সেটি নিয়ে মাথা ঘামিও না। রবোমানব তিনটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু এখনো মারা যায় নি। হাসপাতালে নিলে বাঁচিয়ে ফেলবে।
একজন শুধু মুখ শক্ত করে বলল, আমরা এই প্রাণীগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করব?
সোনালি চুলের মেয়েটি বলল, হ্যাঁ বাঁচানোর চেষ্টা করব।
কেন?
কারণ আমরা মানুষ। কারণ আমরা রবোমানব নই।
তিনজন গুলিবিদ্ধ রবোমানকে হাসপাতালে নিতে নিতে একজন তরুণ জিজ্ঞেস করল, সারা পৃথিবীতে এখন কী হচ্ছে কে জানে?
অন্য একজন বলল, ঠিক এখানে যা হচ্ছে নিশ্চয়ই সব জায়গাতেই তাই হচ্ছে।
তুমি তাই ভাবছ?
হ্যাঁ। নেটওয়ার্কটি ইচ্ছে করে বিকল করা হয়েছে।
তার মানে আমাদের নেটওয়ার্ক ছাড়া বেঁচে থাকতে হবে?
হ্যাঁ। আর মজার কথা কী জান?
কী?
আমরা নেটওয়ার্ক ছাড়াই কিন্তু বেঁচে থাকা শুরু করে দিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী, অভিজ্ঞতাটা কিন্তু খুব খারাপ না।
তরুণ কয়েকজন শব্দ করে হেসে উঠল। একজন তরুণী বলল, তুমি ঠিকই বলেছ! নেটওয়ার্কবিহীন জীবনটা আমার কাছেও মন্দ লাগছে না। এর মাঝে একটা স্বাধীন স্বাধীন ভাব আছে, কেমন যেন বনভোজনের আনন্দ আছে!
কয়েকজন মাথা নাড়ল, বলল, ঠিকই বলেছ!
বেশ কিছু মানুষের জটলার ভেতর থেকে উত্তেজিত কথাবার্তা শোনা যেতে থাকে। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন মহিলা আরেকজনকে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে এখানে?
রোমানবগুলো ধরা পড়েছে।
ধরা পড়েছে? মহিলার চোখ দুটো উত্তেজনায় চক চক করে ওঠে। কতো বড় বদমাইস দেখেছ? কী পরিমণ হিংস্র এই রবোমানবেরা–এদেরকে পিটিয়ে শেষ করে দেয়া দরকার।
কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো মানুষটি নরম গলায় বরল, আমরা তো মানুষ-আমরা তো কখনোই অন্য মানুষকে খুন করে ফেলার কথা বলতে পারি না।
কিন্তু রোমানবেরা তো মানুষ না?
তারা মানুষের একটা রূপান্তরিত রূপ। মস্তিষ্কে একটা পরিবর্তন এনে তাদেরকে দান করে ফেলা হয়।
মহিলাটি উত্তেজিত গলায় বলল, আমিও তো তাই বলছি। এই দানবগুলোকে শেষ করে দিতে হবে।
বুড়ো মানুষটি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, দানবগুলোকে তো মানুষের সাথে তুলনা করলে হবে না। একটা বনের পশু যদি কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে কী আমরা পশুটাকে দোষ দিই? পশুর তো দোষ নেই, তাদের তো সেই বুদ্ধিমত্তা নেই। এখানেও তাই–
তাহলে রবোমানবদের কী করব?
আপাতত আটকে রাখতে হবে, তারপর বিজ্ঞানীদের গবেষণা করতে দিতে হবে-তারা কোনোভাবে রবোমানবদের ভেতরে মানুষের প্রবৃত্তি ফিরিয়ে আনতে পারে কী-না।
পারবে না। কিছুতেই পারবে না।
বুড়ো মানুষটি হাসল, বলল, কিন্তু চেষ্টা করতে হবে তো?
ঠিক তখন জটলটা ভেঙ্গে গেল, দেখা গেল বেশ কিছু উত্তেজিত মানুষ কয়েকজন রবোমানবকে পিছমোড়া করে বেঁধে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। মহিলটি জিজ্ঞেস করল, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
পুলিশ কমিশনারের কাছে।
কী করবে?
জেলখানায় আটকে রাখবে।
রাগী চেহারার একজন মানুষ বলল, এদেরকে খুন করে ফেলা উচিত। মনে আছে প্রথম কয়েকদিন আমাদের ওপর কী অত্যাচার করেছে? কতজনকে মেরেছে।
পিছমোড়া করে বেঁধে নেয়া মানুষগুলোর একজন বলল, আমাদের খুন করতে হবে না। একটা ঘরে বন্ধ করে রাখলে নিজেরাই নিজেদের খুন করে ফেলব। খবর পেয়েছি সব জায়গায় তাই হচ্ছে!
কী আশ্চর্য! কেন?
এদের ভেতরে কোনো ভালোবাসা নেই। আমাদের জন্যেও নেই, নিজেদের জন্যেও নেই।
মানুষগুলো রবোমানবদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল-পিছন পিছন অনেক মানুষ হৈ-হুল্লোড় করতে করতে যেতে থাকে। মহিলাটি সেদিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, দুই সপ্তাহ আগেও যদি কেউ আমাকে বলত সারা পৃথিবীটা এভাবে ওলট-পালট হয়ে যাবে, আমি বিশ্বাস করতাম না।
বুড়ো মানুষটি বলল, তোমাদের এই শহরের কী অবস্থা?
প্রথম প্রথম খুব খারাপ অবস্থা ছিল। মানুষজন যখন বুঝেছে নেটওয়ার্ক ছাড়াই দিন কাটাতে হবে তখন আস্তে আস্তে সব ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে।
বুড়ো মানুষটি মাথা নেড়ে বলল, ও আচ্ছা!
হ্যাঁ। প্রথম প্রথম সবাই অসম্ভব ক্ষেপেছিল, পরে বুঝতে পেরেছে। রবোমানবদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তখন সবাই মেনে নিয়েছে।
বুড়ো মানুষটি মাথা নাড়ল। মহিলাটি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখন মোটামুটি সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মাঝে আছে। আশে পাশের শহরের সাথে যোগাযোগ হয়েছে, দিন কেটে যাচ্ছে। তবে–
তবে কী?
শুধু একটা সমস্যা।
কী সমস্যা।
বাচ্চাদের স্কুলের সমস্যা। আগে নেটওয়ার্ক থেকে পাঠগুলো আসত—এখন সেরকম কিছু আসছে না। মানুষজনকে শিক্ষক হতে হচ্ছে। শিক্ষকের খুব অভাব। বিশেষ করে বিজ্ঞান আর গণিতের শিক্ষকের।
বুড়ো মানুষটা বলল, আমি মোটামুটিভাবে বিজ্ঞান আর গণিত জানি। তোমরা যদি চাও তাহলে আমি বাচ্চাদের বিজ্ঞান আর গণিত পড়াতে পারি।
মহিলাটির চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কিছু একটা বলতে গিয়ে সে থেমে যায়। ইতস্তত করে বলল, কিন্তু–
কিন্তু কী?
নেটওয়ার্ক নেই বলে আমাদের কোনো অর্থ সম্পদ নেই। তোমাকে তো বেতন দিতে পারব না।
বুড়ো মানুষটি বলল, আমাকে বেতন দিতে হবে না। স্কুলের কোনো কোনায় একটু ঘুমানোর জায়গা আর একটুখানি খাবার দিলেই হবে।
সেটা দিতে পারব। আমি বাসা থেকে তোমায় জন্যে দুটো কম্বল নিয়ে আসব।
বুড়ো মানুষটা হাসি হাসি মুখে বলল, হ্যাঁ। দুটো কম্বল হলেই হয়ে যাবে।
তুমি তাহলে চল আমার সাথে, আমাদের স্কুলটাতে নিয়ে যাই।
বুড়ো মানুষটি সারাদিন স্কুলের বাচ্চাদের নানাভাবে ব্যস্ত রাখল। তাদের মজার মজার গল্প করল, গণিত শেখাল, বিজ্ঞান শেখাল, বেসুরো গলায় গান গাইল, বিজ্ঞানের ছোট ছোট পরীক্ষা করল। তারপর বিকেল বেলা স্কুলের বারান্দায় বসে বসে সব বাচ্চাদের বিদায় দিল।
একটি ছোট মেয়ে হাত নেড়ে বুড়ো মানুষটিকে বিদায় দিয়ে তার মায়ের হাত ধরে চলে যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। মা জিজ্ঞেস করল, কী হলো।
আমি ঐ বুড়ো দাদুকে একটা কথা বলে আসি?
কথা বলবে? যাও।
ছোট মেয়েটি বুড়ো মানুষটার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে পারি?
বল।
কানে কানে বলতে হবে। কেউ যেন শুনতে না পারে।
বুড়ো মানুষটি তার মাথা নিচু করল, মেয়েটি তখন তার কানে ফিস ফিস করে বলল, আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি মহামান্য থুল। কিন্তু তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি কাউকে বলে দেব না!
বুড়ো মানুষটি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তার বাম চোখটা মটকে বলল, আমি জানি তুমি কাউকে বলে দেবে না!
অন্ধকার নেমে এলে দুজন গুড়ি মেরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কে?
আমরা।
গোপন সংকেত?
কোমাডো ড্রাগন।
সাথে সাথে খুট করে দরজা খুলে গেল। ভেতরে আবছা অন্ধকার, যে দরজাটা খুলেছিল, একজন দীর্ঘদেহী মানুষ, একটু সরে দাঁড়িয়ে সে দুজনকে ঢুকতে দিল। একজন নারী এবং একজন পুরুষ ঘরের ভেতরে ঢুকে। নারীটি কমবয়সী একটি মেয়ে, লাল চুল একটি রুমাল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। পুরুষ মানুষটির চেহারায় একটি অস্বাভাবিক কাঠিন্য।
ঘরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা একজন জিজ্ঞেস করল, কী খবর?
নিষ্ঠুর কঠিন চেহারার মানুষ কিংবা লাল চুলের মেয়ে কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না। তারা হেঁটে ঘরের মাঝামাঝি ধাতব টেবিলটার পাশে রাখা চেয়ারটাতে বসে। পুরুষ মানুষটি নিজের হাতে কিছুক্ষণ মাথাটা চেপে ধরে রেখে সোজা হয়ে বসে বলল, খিদে পেয়েছে। কোনো খাবার আছে?
শুকনো প্রেটিন আর কিছু কৃত্রিম খাবার। খানিকটা রক্তের জেলো।
তাই দাও। উত্তেজক পানীয় নেই?
খুঁজলে একটা বোতল পাওয়া যেতে পারে।
খুঁজে দেখ।
খাবার এবং পানীয় টেবিলে দেবার পর দীর্ঘদেহী মানুষটি এসে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, কী খবর?
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি কিছু শুকনো প্রোটিন চিবুতে চিবুতে এক ঢোক উত্তেজক পানীয় খেয়ে বলল, আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? তোমরা সবাই খুব ভালো করে জান খবর ভালো না।
সেটা তো জানি। কিন্তু কতো খারাপ?
আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা ছিল নেটওয়ার্ক দিয়ে। নেটওয়ার্ক দিয়ে পৃথিবীর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল। কিন্তু নেটওয়ার্কটিই নেই আমরা কী করব?
এখন আমরা কী করব?
মানুষের সাথে মিশে যেতে হবে।
মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা জিজ্ঞেস করল, তার মানে আমরা কী ধরে নেব রবোমানবের বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে? আমরা মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছি?
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি মাথা ঘুরিয়ে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলল, মানুষ নিজেও পরাজিত হয়েছে। আমাদের হাত থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে তারা নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছে, এখন তারা পশুর মতো বেঁচে আছে।
দীর্ঘদেহী মানুষটি বলল, তোমার ধারণা সত্যি নয়। মাত্র দুই সপ্তাহ পার হয়েছে তার মাঝে মানুষ নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে। আমি কয়েকটি শহর ঘুরে এসেছি। সেখানে মানুষেরা রীতিমতো উৎসব করছে।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি কিছুক্ষণ দীর্ঘদেহী মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল তারপর একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখন আমাদের মানুষের সাথে মিশে যেতে হবে। দরকার হলে এখন আমাদের তাদের উৎসবে যোগ দিতে হবে।
দীঘদেহী মানুষটি বলল, তুমি বলেছিলে বিকেল তিনটার সময় নেটওয়ার্ক দখল হবে। দুই ঘণ্টার ভিতরে মানুষদের আঘাত করতে হবে। শহরগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। রবোমানবেরা তোমার কথা বিশ্বাস করে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে শহরের দখল নেবার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত নেটওয়ার্ক দখল হয় নি-বরং নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়েছে। সারা পৃথিবীর খবর জানি না কিন্তু বেশির ভাগ শহরে রবোমানদের ধরে ফেলেছে। কোথাও কোথাও মেরে ফেলেছে। কোথাও জেলে আটকে রেখেছে।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি তীব্র দৃষ্টিতে দীর্ঘদেহী মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এই সবকিছু জানি। তুমি কেন আবার এই কথাগুলো আমাকে শোনাচ্ছ?
তুমি আমাদের আনুষ্ঠানিক দলপতি। সেজন্যে শোনাচ্ছি। রবোমানবদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব তোমার হাতে ছিল। তুমি কী তোমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছ?
হ্যাঁ। আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি। এর চাইতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না।
তাহলে কেন পৃথিবীর সব রবোমানব দুই সপ্তাহের মাঝে ধ্বংস হয়ে গেল?
সবাই ধ্বংস হয়নি। তুমি কেন অসংলগ্ন কথা বলছ?
দীর্ঘদেহী মানুষটি এক পা অগ্রসর হয়ে বলল, আমি অসংলগ্ন কথা বলছি। রবোমানব হিসেবে আমি আমার দলপতির কাছে কৈফিয়ত চাইছি।
আমি তোমার কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই। যেটা হয়েছে সেটা একটা দুর্ঘটনার মতো। আমরা কেউ ভুলেও চিন্তা করিনি মানুষ হয়ে মানুষেরা নিজেরা নিজেদের মাথায় গুলি করবে। নেটওয়ার্ক ধ্বংস করবে।
দলপতি হিসেবে তোমার সবকিছু চিন্তা করা উচিত ছিল।
মধ্যবয়স্ক মহিলাটি বলল, তুমি আমাদের দলপতি। তোমাকে সব দায় দায়িত্ব নিতে হবে।
নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হঠাৎ এক ধরনের বিপদ আঁচ করতে পারে, সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকায়, তোমরা কী বলতে চাইছ?
কেউ কোনো কথা না বলে তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
নিষ্ঠুর চেহারায় মানুষটি তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা রিভলবার বের করার চেষ্টা করে, কিন্তু তার আগেই দীর্ঘদেহী মানুষটি একটি লোহার রড দিয়ে নিষ্ঠুর মানুষটির মাথায় আঘাত করল। একটা কাতর শব্দ করে সে নিচে পড়ে যায়, তার হাতে তখনো রিভলবারটি রয়ে গেছে। দীর্ঘদেহী মানুষটি রিভলবারটি নিজের হাতে নিয়ে নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির মাথার দিকে তাক করল।
লাল চুলের মেয়েটি তার মাথার রুমালটি খুলে চুলগুলো তার পিঠে ছড়িয়ে পড়তে দিয়েছে। সে আংগুল দিয়ে চুলোর জটাগুলো মুক্ত করতে করতে একটু বিরক্ত হয়ে বলল, নির্বোধের মতো কাজ করো না। গুলির শব্দ শুনলে মানুষ
সন্দেহ করবে। ওকে যদি মারতে চাও নিঃশব্দে মেরে ফেল।
মধ্যবয়স্ক মহিলাটি টেবিলের ওপর থেকে উত্তেজক পানীয়ের বোতলটা থেকে খানিকটা পানীয় ঢকঢক করে খেয়ে বলল, যদি ওকে মেরে ফেলবে বলেই ঠিক করেছিলে তাহলে আরেকটু আগে মেরে ফেললে না কেন? আমাদের আধবোতল উত্তেজক পানীয় বেঁচে যেত!
দীর্ঘদেহী মানুষটি লোহার রডটি নিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা রবোমানবের দলপতির দিকে এগিয়ে গেল। নিষ্ঠুর চেহারার দলপতি শূন্য দৃষ্টিতে দীর্ঘদেহী মানুষটির দিকে তাকিয়ে থেকে ফিস ফিস করে বলল, থুল সত্যি কথাই বলেছিল! আমাদের কেউ বেঁচে থাকবে না। আমরা সবাই সবাইকে মেরে ফেলব।
দীর্ঘদেহী রবোমানবটি লোহার রডটি ওপরে তুলে প্রচণ্ড বেগে নিচে নামিয়ে আনে। ঘরের দেওয়াল গোল ছোপ ছোপ রক্তে ভরে উঠতে থাকে।
টেবিলে কাচের জারে ডুবিয়ে রাখা মস্তিষ্কটিতে এক ধরনের বিবর্ণ রংয়ের ছোপ পড়েছে। লাল চুলের মেয়েটি সেদিকে তাকিয়ে থেকে বুঝতে পারল মস্তিষ্কটিতে এক ধরনের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। গত কিছুদিন সে নিয়মিত তার বাসায় আসে নি, মস্তিষ্কটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতে পারে নি, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে নি। তারা ভেবেছিল রবোমানবেরা সারা পৃথিবীকে দখল করতে যাচ্ছে—আসলে হয়েছে ঠিক তার উল্টো। বনের পশুর মতো এখন রবোমানবেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি ঠিকই বলেছিল, ভয়ানক বিপদে রবোমানবেরা একে অন্যকে হত্যা করতে থাকে। এক ঘণ্টাও হয় নি তারা তাদের দলপতিকে হত্যা করেছে। নতুন দলপতি কে হবে সেটা নিয়ে বিরোধ হয়েছে, আরেকটু হলেই তাকেও হত্যা করে ফেলতো। অনেক কষ্ট করে সে বেঁচে এসেছে। সময় খুব কঠিন, নিজে বেঁচে আসার জন্যে তাকে অন্য সবাইকে খুন করে আসতে হয়েছে। সে নিজেও গুলি খেয়েছে, আঘাতটা কতোটুকু গুরুতর বুঝতে পারছে না, কোনো হাসপাতালেও যেতে পারছে না—নিজের বাসায় এসে আশ্রয় নিয়েছে।
লাল চুলের মেয়েটি ওঠে দাঁড়িয়ে যন্ত্রণার একটা শব্দ করে মস্তিষ্কের সুইচটি অন্য করে দিল। জিজ্ঞেস করল, তুমি জেগে আছ?।
মস্তিষ্কটি বলল, হ্যাঁ জেগে আছি। আমি আসলে জেগেই থাকি।
আমি কয়েকদিন আসতে পারি নি। তোমার পুষ্টি দিতে পারি নি।
আমি জানি। আমি বুঝতে পারছি আমার মাঝে এক ধরনের প্রদাহ শুরু হয়েছে। আমি খুব আশা করে আছি এখন আমি মারা যাব।
লাল চুলের মেয়েটি যন্ত্রণাকাতর শব্দ করে বলল, আমি তোমাকে মারা যেতে দেব না। আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব।
মস্তিষ্কটি বলল, তুমি এমন করে কেন কথা বলছ? তোমার কী কোনো যন্ত্রণা হচ্ছে?
হ্যাঁ।
কেন?
আমি গুলি খেয়েছি। আমার রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
তোমাকে কে গুলি করেছে? মানুষ?
না। লাল চুলের মেয়েটি বলল, আমাকে অন্য রবোমানব গুলি করেছে। যেই রবোমানবকে আমি হত্যা করেছি তারা আমাকে গুলি করেছে।
মস্তিষ্কটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর জিজ্ঞেস করল, তুমি কেন রবোমানব হয়ে রবোমানবকে হত্যা করতে গিয়েছ?
লাল চুলের মেয়েটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তুমি সেটা বুঝবে না।
তোমরা কি পৃথিবী দখল করে নিয়েছ?
লাল চুলের মেয়েটি প্রশ্নের উত্তর দিল না। মস্তিষ্কটি আবার জিজ্ঞেস করল, তোমরা কি পৃথিবী দখল করে নিয়েছ?
লাল চুলের মেয়েটি এবারেও প্রশ্নের উত্তর দিল না। মস্তিষ্কটা তখন একটু হাসির মতো শব্দ করল। বলল, তার মানে তোমরা পৃথিবী দখল করতে পার নি! আমি জানতাম তোমরা পারবে না।
লাল চুলের মেয়েটি এবারেও কোনো কথা বলল না। মস্তিষ্কটি নরম গলায় বলল, তোমার জন্যে আমার খুব মায়া হচ্ছে। তোমার সাথে প্রতিদিন আমি কথা বলেছি, আমি জানি তুমি অসম্ভব নিঃসঙ্গ একটি মেয়ে। রবোমানবের কোনো বন্ধু নেই। কোনো প্রিয়জন নেই। কোনো আপনজন নেই। আমি যেরকম অসম্ভব নিঃসঙ্গ—আমার যেরকম কোনো অস্তিত্ব নেই। আমার যেরকম শুরু নেই, শেষ নেই, আমি যেরকম অন্ধকার একটা জগতে থাকি, তুমি এবং তোমার মতো রবোমানবেরাও সেরকম অন্ধকার বোধহীন অনুভূতিহীন একটা জগতে থাক। তোমার জন্যে আমার মায়া হয়। মায়া হয় আর করুণা হয়। অসম্ভব করুণা হয়।
লাল চুলের মেয়েটি টলতে টলতে এগিয়ে গিয়ে তার ব্যাগ থেকে বেঢপ একটা রিভলবার বের করে এনে ফিসফিস করে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু তোমার মতো বোধশক্তিহীন অনুভূতিহীন অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন একটা মস্তিষ্ক আমাকে করুণা করবে সেটি হতে পারে না।
তুমি কী করবে?
লাল চুলের মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। মস্তিষ্কটি আবার জিজ্ঞেস করল, কী করবে? তুমি কী করবে?
লাল চুলের মেয়েটি খুব ধীরে ধীরে রিভালবারটি নিজের মাথায় স্পর্শ করে। একবার চারিদিকে তাকাল তারপর ট্রিগারটি টেনে ধরে। ছোটঘরটিতে গুলির শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে।
মস্তিষ্কটি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? কী হয়েছে এখানে?
কেউ তার কথার উত্তর দিল না। মস্তিষ্কটির চেতনা ধীরে ধীরে অবশ হতে শুরু করেছে। কেউ তাকে বলে দেয়নি কিন্তু সে জানে তার সময় শেষ হয়ে আসছে। নিজের ভেতরে সে তীব্র একটি প্রশান্তি অনুভব করে। আর কিছুক্ষণ তারপরই সে এই অন্ধকার বোধশক্তিহীন চেতনহীন, আদি-অন্তহীন, মমতাহীন জগৎ থেকে মুক্তি পাবে।
সেই তীব্র আনন্দের জন্যে এই হতভাগ্য মস্তিষ্কটি অপেক্ষা করতে থাকে।
--------------
খুব ধীরে ধীরে নীহার ঘুম ভেঙ্গে যায়। পঞ্চম ঘাত কিনিস্কা রাশিমালা নিয়ে চিন্তা করতে করতে সে ঘুমিয়েছিল, ঠিক যখন সমাধানটা তার মাথায় উঁকি দিতে শুরু করেছে তখন তার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল। যখন সে চোখ খুলেছে তখন হঠাৎ করে সমাধানটা সে পেয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই নীহার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ক্যাপসুলের ভেতর মিষ্টি একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। একটা মৃদু সংগীতের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে সেটি ভেসে আসছে কিন্তু নীহা জানে এটি ঠিক ক্যাপসুলের ভেতরেই তার জন্যে তৈরি করা সংগীতের ধ্বনি। নীহা তার হাতটি নাড়ানোর চেষ্টা করল, দুর্বলভাবে সেটি একটু নাড়াতে পারল। এখনো তার শরীরে শক্তি ফিরে আসে নি। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।
নীহা তার চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করে। সে অনুভব করে সারা শরীরে এক ধরনের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এই উষ্ণতাটুকু তার শরীরটাকে জাগিয়ে তুলছে। কতোদিন পর সে জেগে উঠছে? শেষবার যখন জেগে উঠেছিল তখন সেটি ছিল একটি ভয়ংকর দুঃসংবাদের মতো। এবারে? এবারে নিশ্চয়ই ওরকম কিছু নয়। যদি সেরকম কিছু হতো তাহলে ক্যাপসুলের ভেতর এরকম মিষ্টি একটা সংগীতের ধ্বনি তাকে শোনানো হতো না। ক্যাপসুল থেকে বাইরে বের হওয়ার জন্যে সে আর অপেক্ষা করতে পারছে না।
শেষ পর্যন্ত ক্যাপসুলের ঢাকনাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল। নীহা ভেতরে ওঠে বসে তারপর সাবধানে ক্যাপসুল থেকে নেমে আসে। একটু দূরে স্বচ্ছ কোয়ার্টজের জানালার পাশে নুট দাঁড়িয়েছিল, নীহার পায়ের শব্দ শুনে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। নীহা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, নুট! কেমন আছ তুমি?
নীহা ভেবেছিল মুট কোনো কথা বলবে না, মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেবে সে ভালোই আছে। কিন্তু তাকে অবাক কয়ে নুট কথা বলল, আমি ভালোই আছি নীহা! তুমি কেমন আছ?
আমিও ভালো আছি! কিনিস্কা রাশিমালার সমাধানটা মনে হয় পেয়ে গেছি!
চমৎকার। শীতলঘরে তোমার ঘুম কেমন হল?।
নীহা অবাক হবার ভান করে বলল, কী আশ্চর্য নুট! তুমি পর পর দুটি কথা বললে! প্রশ্ন করলে! এমনটি তো আগে কখনো হয় নি।
নুট হেসে ফেলল, বলল, আসলে কোয়ার্টজের এই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে গ্রহটাকে দেখে মনটা ভালো হয় গেছে। তাই কথা বলার ইচ্ছে করছিল। তোমাকে দেখে কথা বলে ফেলছি।
গ্রহ? নীহা অবাক হয়ে বলল, আমরা একটি গ্রহে এসেছি? কেপলার টুটুবি?
মনে হয়।
নীহা টলমলে পায়ে এগিয়ে গিয়ে কোয়ার্টজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিস্ময়ের একটা শব্দ করল, বলল, কী সুন্দর! ঠিক যেন পৃথিবী।
কেপলার টুটুবি গ্রহটি তোমাদের পছন্দ হয়েছে জেনে ভালো লাগছে।
ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শুনে দুজনেই ঘুরে তাকাল। ট্রিনিটি বলল, এটি আমার খুঁজে পাওয়া তৃতীয় গ্রহ।
তৃতীয় গ্রহ? তুমি এর আগে আরো দুটি গ্রহে গিয়েছ? নীহা অবাক হয়ে বলল, আমাদের ডেকে তোলনি কেন?
গ্রহগুলিকে ঠিক করে উজ্জীবিত করতে পারিনি তাই তোমাদের ডাকিনি।
উজ্জীবিত? গ্রহকে উজ্জীবিত করে কেমন করে?
মানুষ প্রাণী গাছপালা বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করাকে বলি উজ্জীবিত করা।
এই গ্রহটিকে পেরেছ?
সহ্য সীমার ভেতরে নিয়ে এসেছি।
সেটা কী, বলবে আমাদের?
বলব। অবশ্যই বলব। তোমাদের আরো তিনজন জেগে উঠুক, তখন এক সাথে বলব।
ট্রিনিটির কথা শেষ হবার আগেই অন্য তিনটি ক্যাপসুলের ঢাকনা খুলে যায়। ভেতর থেকে টলমলে পায়ে ইহিতা, টুরান আর টর একজন একজন করে বের হয়ে আসে।
নীহা আনন্দের মতো শব্দ করে বলল, এসো তোমরা। দেখে যাও। আমরা কেপলার টুটুবি গ্রহে এসেছি। আমাদের গ্রহ।
শীতলঘর থেকে সদ্য ওঠা তিনজন টলমল পায়ে এগিয়ে এসে কোয়ার্টজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, নিজের অজান্তেই তাদের মুখে দিয়ে আনন্দের একটা ধ্বনি বের হয়ে আসে।
ইহিতা বলল, দেখেছ, গ্রহটা ঠিক পৃথিবীর মতো!
ট্রিনিটি বলল, পুরোপুরি নয়। কিছু পার্থক্য রয়েছে, তোমাদের অভ্যস্ত হয়ে যেতে হবে।
কী পার্থক্য? টর জিজ্ঞেস করল, কোনো ভয়ংকর প্রাণী?
না। কোনো ভয়ংকর প্রাণী নেই।
তাহলে?
সূর্যটা বড়। দিনগুলো লম্বা। রাতের আকাশে চাঁদ দুটি।
সেগুলো খুব কঠিন কিছু নয়। দুটি চাঁদ ভালোই লাগবে মনে হয়।
আবহাওয়াতে বৈচিত্র্য কম। মাধ্যাকর্ষণ একটু বেশি, বাতাসে অক্সিজেনও একটু কম। আমি পৃথিবীর প্রাণীগুলো পাঠিয়েছি তারা বেশ মানিয়ে নিয়েছে। তোমরাও নিশ্চয়ই মানিয়ে নিতে পারবে।
টর বলল, আমি আর অপেক্ষার করতে পারছি না। আমি গ্রহটাতে নামতে চাই।
একটু প্রস্তুত হয়ে নাও, এই গ্রহটা হবে তোমাদের নতুন পৃথিবী। আমি সেটাকে তোমাদের জন্যে পাঁচশ বছর থেকে প্রস্তুত করেছি। দেখো তোমাদের পছন্দ হয় কি না।
স্কাউটশিপটা পুরো গ্রহটাকে একবার প্রদক্ষিণ করে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। সমুদ্রের বালুবেলায় স্কাউটশিপটা স্থির হয়ে দাঁড়াল। নিরাপত্তা বন্ধনী থেকে নিজেদের মুক্ত করে সবাই স্কাউটশিপের দরজায় এসে দাঁড়াল।
ইহিতা বলল, সবাই প্রস্তুত?
হ্যাঁ।
দরজাটি খুলব?
খোলো।
ইহিতা দরজার একটি বোতাম স্পর্শ করতেই মৃদু একটা শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল, সাথে সাথে এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস স্কাউটশিপে প্রবেশ করে। সেই নোনা বাতাসে সজীব এক ধরনের ঘ্রাণ। ঠিক তখন একটা বুনো পাখি তারস্বরে ডাকতে ডাকতে স্কাউটশিপের উপর দিয়ে উড়ে গেল।
ইহিতা সবার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা সবাই কী এখন নামার জন্যে প্রস্তুত?
সবাই মাথা নাড়ল, হ্যাঁ, প্রস্তুত।
চল তাহলে নামি।
চল।
নীহা জিজ্ঞেস করল, কে আগে নামবে?
তুমি। ইহিতা বলল, তোমার পদচিহ্ন দিয়েই এই নতুন পৃথিবী শুরু হোক। নীহা চোখ বড় বড় করে বলল, আমার পদচিহ্ন দিয়ে?
সবাই মাথা নাড়ল। টর বলল, হ্যাঁ তোমার। নতুন পৃথিবীটা শুরু হোক সবচেয়ে নিস্পাপ মানুষের পদচিহ্ন দিয়ে।।
নীহা একটু হাসল, তারপর বলল, ঠিক আছে। তাহলে আমি নামি।
নীহা তখন স্কাউটশিপের সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। শেষ ধাপে পৌঁছে সে হঠাৎ থেমে গেল। পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলল, আমি কি আরেকজনের সাথে তার হাত ধরে নামতে পারি?
ইহিতা হাসিমুখে বলল, অবশ্যই পার নীহা।
নীহা তখন লাজুকমুখে বলল, নুট তুমি কী আমার হাত ধরবে? তুমি আর আমি কী হাত ধরে একসাথে কেপলার টুটুবির এই নতুন পৃথিবীতে নামতে পারি?
নুট বলল, অবশ্যই নামতে পারি নীহা। অবশ্যই।
স্কাউটশিপের ভেতরে দাঁড়িয়ে সবাই দেখল নুট আর নীহা হাত ধরাধরি করে বালুবেলায় পা দিয়েছে। নরম বালুতে পায়ের ছাপ রেখে দুজন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
ইহিতা ফিসফিস করে বলল, দ্বিতীয় পৃথিবীর প্রথম মানব ও মানবী। তারপর সে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে তার চোখ দুটো মুছে নেয়।
কে জানে কেন তার চোখে পানি এসেছে?
(সমাপ্ত)
