তৃতীয় পর্ব
#টুকুনজিল- মুহম্মদ জাফর ইকবাল
বিপদ
বাসায় এসে দেখি সারা বাসা থমথম করছে। বল্টু আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, আজ তোমাকে ধোলাই দেয়া হবে।
আমাকে? আমি ঢোক গিলে বললাম, কেন?
তুমি আম্মার আংটি চুরি করেছ।
আমি চমকে উঠলাম। কী সর্বনাশ! ধরা পরে গেছি? জোর করে অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, আমি!
হ্যাঁ। চুরি করে তোমার বিছানার নিচে রেখেছ।
বিছানার নিচে? আমি একটু অবাক হলাম, ঘুলঘুলির উপর রেখে গিয়েছিলাম, বিছানার নিচে কেমন করে এল?
বল্টু হাতে কিল দিয়ে বলল, আজকে তোমাকে রাম-ধোলাই দেবে। আম্মা বলেছে, তোমরা চোরের গুষ্টি।
ইচ্ছে হল বল্টুর মাথাটা ধড় থেকে ছিঁড়ে আলাদা করে ফেলি, কিন্তু সেটা তো ইচ্ছে করলেই করা যায় না। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে আমি ডাকলাম, টুকুনজিল-
কোনো সাড়া নেই। আমি আবার ডাকলাম, টুকুনজিল—তুমি কোথায়?
তবু কোনো সাড়া নেই। তাহলে কি চলে গেছে? কিন্তু একবার আমাকে বলে যাবে ন? সোনা দিয়ে বৈদ্যুতিক যোগাযোগ ঠিক করার পর তার মহাকাশযান গতিবেগ ফিরে পেয়েছে, আর কোনো সমস্যা নেই, তাই আর দেরি করে নি। পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আমার বিশ্বাস হতে চাইল না, আবার ডাকলাম, টুকুনজিল।
তবু কোনো সাড়া নেই।
টুকুলজিল থাকলে আর কোনো সমস্যা ছিল না—এত বড় একটা ব্যাপারের সামনে সোনার আংটি একটা তুচ্ছ জিনিস। কিন্তু টুকুনজিল যদি ফিরে চলে গিয়ে থাকে, তা হলে টুকুনজিলের কথা মুখে আনা মানে নিজেকে পাগল প্রমাণ করা। আগেরবার তো শুধু ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছেন—এবারে নিশ্চয়ই ধরে একেবারে পাগলা-গারদে দিয়ে আসবেন।
বিছানার নিচে সোনার আংটিটা পাওয়া গেছে। এখন সবাইকে বোঝাৰ কেমন করে? যদি টুকুনজিল ফিরে না আসে তাহলে বলা যায় ছোট খালার বাসায় থাকা আমার শেষ হয়ে গেল! ভালোই হল হয়তো, খামোকা মা-বাবা ভাই-বোন সবাইকে ছেড়ে এখানে পড়ে আছি। এখানে আসার পর থেকে কতরকম যন্ত্রণা। কিন্তু মা মনে বড় কষ্ট পাবেন। ভিন্ন গ্রহের এক প্রাণী যেন তার মহাকাশযান সারাতে পারে, সেজন্যে সোনার আংটি চুরি করেছি কথাটা কাউকেই বিশ্বাস করানো সম্ভব না। বাবা হয়তে বিশ্বাস করবেন, কিন্তু বাবা বিশ্বাস করলেই কী আর না করলেই কী?
আমার মনটা এত খারাপ হল যে বলার নয়, ইচ্ছে হল ডাক ছেড়ে কাঁদি, কিন্তু কেঁদে লাভ কি?
খাবার টেবিলে কেউ কোনো কথা বলল না। খালু অবশ্যি এমনিতেই বেশি কথা বলেন না, ছোট খালা সেটা পুষিয়ে নেন। আজ ছোট খালা একটিবার মুখ খুললেন না। সাধারণত বল্টু আর মিলি বেশ বকরবকর করে, আজ মনে হয় ভয়ের চোটে তারাও বেশি কথা বলছে না। বল্টুর মুখে অবশ্যি সারাক্ষণই একটা আনন্দের হাসি লেগে রইল, আমাকে ধোলাই দেয়া হবে, এর মাঝে বল্টু যদি আনন্দ না পায়, তাহলে কে আনন্দ পাবে?
পুরো খাওয়াটা কোনো রকম কথাবার্তা ছড়াই শেষ হয়ে যেত, কিন্তু এর মাঝে টেলিফোন এল। ছোট খালু টেলিফোনে খানিকক্ষণ কথা বলে আবার খেতে বসলেন। টেলিফোন করেছেন ডাক্তার চাচা, কিছু একটা অস্বাভাবিক জিনিস ঘটেছে তাঁর চেম্বারে। ছোট খালু নিজে থেকে না বললে জানার উপায় নেই, আমার আজকে জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছে না। ছোট খালা জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে কামরুলের চেম্বারে।
চুরি।
কী চুরি হয়েছে?
এখনো ধরতে পারছে না। কিছু ফাইল। বিলুর ফাইলটাও।
ফাইল দিয়ে কী করবে চোর?
সেটাই তো কথা!
কেমন করে চুরি হল?
বুঝতে পারছে না, দরজা-জানালা কিছু ভাঙে নি, কী ভাবে ভিতরে ঢুকে গেছে।
আশ্চর্য ব্যাপার!
এইটুকু কথা বলার পর আবার সবাই চুপ করে গেল। ইলিশ মাছের ডিম রান্না হয়েছে আজকে, আমার খুব ভালো লাগে ইলিশ মাছের ডিম খেতে, কিন্তু আজ আর খাওয়ায় কোনো আনন্দ লেই।
খাওয়া শেষ হবার পর খালু বললেন, বল্টু আর মিলি, তোমরা তোমাদের ঘরে যাও।
বল্টু বলল, আমরা থাকি, আব্বা?
ছোট খালু গম্ভীর গলায় বললেন, না। বল্টু আর মিলি উঠে নিজের ঘরে গিয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে উকি মারার চেষ্টা করতে লাগল। খালু চেয়ারে হেলান দিয়ে মেঘস্বরে বললেন, বিলু, তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে।
কথাটা কি আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না, তবু আমি মুখে একটা কৌতূহলের ভাব ফোটানোর চেষ্টা করি, কি কথা, খালু?
তোমার ছোট খালার একটা আংটি আজ সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সেটা তোমার ঘরে পাওয়া গেছে।
আমার ঘরে? আমি খুব অবাক হবার ভান করলাম, কোথায়?
ছোট খালা বললেন, তোর বিছানার নিচে।
বিছানার নিচে? কী আশ্চর্য! আমি তখনো অবাক হবার ভান করতে থাকি। জিনিসটা খুব সোজা নয়।
খালু আবার মেঘস্বরে বললেন, আংটিট কেমন করে তোমার ঘরে গেল বোঝাতে পারবে ?
আমি কী আর বলব? টুকুনজিল থাকলে পারতাম, কিন্তু সে চলে গেছে, এখন আমি কেমন করে বোঝাব? আমি মাথা নাড়লাম, পারব না।
ছোট খালা সরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এবারে হঠাৎ একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, চিৎকার করে বললেন, তোকে এখানে আনাই ভুল হয়েছে। ছোটলোকের জাত। প্রথম দিন স্কুলে গিয়ে গুণ্ডার মতো মারপিট করে এসেছিস। এই বয়সে সিগারেট খাওয়া শিখেছিস। ওতেই শেষ হয় নি, এখন চুরি করা শিখেছিস। কতদিন থেকে চুরি করছিস কে জানে! ছোটলোকের জাত, কোনদিন বাসায় কার গলায় ছুরি চালিয়ে দিবি-
ছোট খালার কথা শুনে আমার মাথায় একেবারে আগুন ধরে গেল, অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত করলাম। খালু বললেন আহ্ শানু, তুমি কী বলছ এইসব?
ছোট খালা চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে এক পাক ঘুরে আঙুল থেকে আংটিটা খুলে খাবার টেবিলের উপর ছুড়ে দিয়ে বললেন, এই আংটিটার কি পা আছে? নিজে নিজে হেঁটে গেছে বিলুর ঘরে? হেঁটে হেটে গেছে?
এরপর যে-জিনিসটা ঘটল তার জনো কেউ প্রস্তুত ছিল না। হঠাৎ করে আংটিটা ছোট একটা লাফ দিল টেবিলের উপর। তারপর ঠিক মানুষের হাঁটার ভঙ্গিতে টেবিলের উপর হেঁটে বেড়াতে শুরু করল। ছোট খালার কাছাকাছি এসে আবার ছোট ছোট দুটি লাফ দিল আংটিটা!
ছোট খালা একটা চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে পিছনে সরে এলেন। খালু দাঁড়াতে গিয়ে তাল হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন, কোনোমতে টেবিল ধরে সামলে নিলেন। আমিও একটা চিৎকার দিচ্ছিলাম, হঠাৎ বুঝে গেলাম কী হয়েছে। টুকুনজিল এসেছে! টুকুনজিল!!
ছোট খালা ঢোক গিলে বললেন, কী হচ্ছে এটা? কী হচ্ছে?
তার কথা শুনেই কি না জানি না, আংটিটা আবার হেঁটে বেড়াতে শুরু করল। আমি অনেক কষ্ট করে হাসি চেপে বললাম, দেখেছ ছোট খালা? দেখেছ? এই আংটিটা নিজে নিজে হেঁটে যেখানে খুশি চলে যায়!
কেন ? কেন যাচ্ছে? হায় আল্লাহ!
খালু আংটিটা ধরার চেষ্টা করলেন, ধরতে পারলেন না, হাত ফসকে আংটিটা একটা লাফ দিয়ে ডালের বাটিতে ডুবে গেল।
ঠিক তখন একটা আলোর ঝলকানি দেখলাম, সাথে সাথে ছোট খালা একটা ভয়ঙ্কর চিৎকার দিলেন।
খালু ছোট খালার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে, শানু? কি হয়েছে?
ছোট খালা কাঁপতে কাঁপতে তাঁর হাতটি মেলে ধরলেন, বল্টু আর মিলিও ছুটে এসেছে তাদের ঘর থেকে। সবাই মিলে দেখল—হাতের উল্টো পিঠে ছোট গোল পোড়া দাগ।
বল্টু শুকনো মুখে বলল, সিগারেটের ছ্যাঁকা। ঠিক বিলুর মতো।
ছোট খালা প্রায় কাঁদতে শুরু করলেন বললেন, এক্ষুণি হল। এইমাত্র-এইমাত্র কে জানি ছ্যাঁকা দিল।
হঠাৎ করে ছোট খালা আমার দিকে ঘুরে তাকালেন, আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, এই বিলু-বিলু সব জানে। জিনের আছর আছে। আমি শুনেছি সারা রাত জিনের সাথে কথা বলে।
খালু ছোট খালার হাত ধরে বললেন, আহ্! কী আজেবাজে কথা বলছ!
ছোট খালার হিষ্টিরিয়ার মতো হয়ে গেল, চিৎকার করে বললেন, বাজে কথা বলছি আমি? বাজে কথা? ওর চোখের দিকে তাকাও, দেখেছ কী রকম দৃষ্টি? ওটা কি মানুষের দৃষ্টি? হায় আল্লাহ, আমি কী সর্বনাশ করেছি। নিজের ঘরে শয়তান ডেকে এনেছি। বাণ মেরে দিচ্ছে, যাদু করে দিচ্ছে সবাইকে- ছেলেপুলের সংসার আমার তছনছ করে দিচ্ছে-
আমি কিছু একটা বলার চেষ্টা করলাম। খালু ধমক দিয়ে বললেন, যাও, তোমার ঘরে যাও।
আমি আমার ঘরে বসে শুনতে পেলাম ছোট খালা হাউ হাউ করে কাঁদছেন। কী যন্ত্রণা!
ফিসফিস করে বললাম, টুকুনজিল।
কি হল?
তুমি কোথায় গিয়েছিলে? ডেকে পাচ্ছিলাম না!
ইঞ্জিনটা ঠিক হয়েছে কি না পরীক্ষা করে দেখলাম।
ঠিক হয়েছে?
নিরানব্বই দশমিক নয় নয় নয় নয় নয় নয় নয় ভাগ।
তা হলে তো ঠিকই হয়ে গেছে।
সোনাতে ভেজাল মিশানো ছিল, আলাদা করি নি। তাই অল্পকিছু গোলমাল আছে।
কোথায় গিয়েছিলে ?
চতুর্থ গ্রহ। দ্বিতীয় চন্দ্র।
আমি অবাক হয়ে বললাম, মঙ্গল গ্রহে? মঙ্গল গ্রহের চাঁদে?
হ্যাঁ।
এত তাড়াতাড়ি আবার ঘুরে চলে এসেছ! এত তাড়াতাড়ি?
আমি খুব তাড়াতাড়ি যেতে পারি।
কী মজা! তুমি এখন তোমার দেশে ফিরে যেতে পারবে?
পারব।
কবে যাবে ?
সময় সংকোচনের প্রথম প্রবাহের দ্বিতীয় পর্যায়ে মূল তরঙ্গের পর।
সেটা কবে ?
শুরু হয়ে গেছে।
আমি চমকে উঠে বললাম, তার মানে তুমি চলে যাবে?
হ্যাঁ। কালকে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধে। পরশুদিন বেশ কষ্ট হবে। তার পরের দিন খুব কঠিন, সাফল্যের সম্ভাবনা চার দশমিক তিন। তার পরের দিন সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি।
তুমি চলে যাবে!
টুকুনজিল কোনো উত্তর দিল না। একটু পরে বলল, তোমার মস্তিষ্কে অবতরঙ্গ তৈরি হচ্ছে, মূল তরঙ্গের পাশে দুটি ছোট তরঙ্গ—কেন এটা হচ্ছে?
তুমি চলে যাবে, তাই আমার মন-খারাপ হচ্ছে।
মন খারাপ ? মন খারাপ মানে কি?
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, তুমি মন খারাপ মানে জান না? তোমার কখনো মন খারাপ হয় না?
না। সেটা কেমন করে হয় ?
আমি একটু মাথা চুলকালাম, যার কখনো মন খারাপ হয় না, তাকে কেমন করে বোঝাব মন খারাপ কী জিনিস? একটু ভেবে বললাম, মন খারাপ হচ্ছে মন ভালো হওয়ার উল্টোটা। হাসিখুশির উল্টো হচ্ছে মন খারাপ।
হাসিখুশি? সেটা কি?
তুমি হাসিও জান না? আমি খুক খুক করে হেসে ফেললাম শুনে।
তুমি কী করলে এটা?
আমি একটু হাসলাম।
হাসলে এরকম শব্দ করতে হয়?
হ্যাঁ, একেকজন মানুষ একেক রকমভাবে হাসে। কেউ হাঃ হাঃ করে শব্দ করে, কেউ হোঃ হোঃ করে শব্দ করে, কেউ খিকখিক শব্দ করে-
সম্পূর্ণ যুক্তিবহির্ভূত ব্যাপার। তুমি আবার হাস দেখি।
এমনি, এমনি কেমন করে হাসব, একটা হাসির ব্যাপার হলেই শুধু হাসা যায়।
অত্যন্ত কৌতুহল-উদ্দীপক ব্যাপার। মানুষের মাঝে অনেক কিছু শেখার আছে। হাসি। মন খারাপ। আর কী আছে তোমাদের?
আমি মাথা চুলকালাম, বললাম, ভয় বলে আরেকটা জিনিস আছে।
ভয় ?
হ্যাঁ, ভয়।
একটু ভয় পাও দেখি।
আমি আবার খুকখুক করে হেসে বললাম, খামোকা আমি ভয় পাব কেমন করে? একটা ভয়ের জিনিস হোক, তখন—
সেটা কী রকম ?
আমি আবার মাথা চুলকালাম, অনেক যখন বিপদ হয়, তখন ভয় পায় মানুষ।
সত্যি?
হ্যাঁ। তোমার যখন বিপদ হয়েছিল, তুমি ভয় পেয়েছিলে না?
না। আমাদের কোনো অনুভূতি নেই। আমাদের হচ্ছে যুক্তি-তৰ্ক আর হিসেব। চুলচেরা হিসেব।
তোমাদের কোনো অনুভূতি নেই? রাগ-দুঃখ, ভয়-ভালবাসা কিছু নেই ?
না !
ভারি আশ্চর্য!
টুকুনজিল বলল, তুমি আমাকে শেখাবে?
তুমি যদি শিখতে চাও, শেখাব। আগে থেকে বলে রাখি, তোমার কিন্তু লাভ থেকে ক্ষতিই বেশি হবে।
আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। বাসার সামনে দুটি মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে দেখা যায় না, কিন্তু মনে হয় ভিতরে কেউ বসে আছে। শুধু মনে হয় বসে বসে এদিকে তাকিয়ে আছে। কিছু-একটা ব্যাপার আছে এর ভিতরে। সবাইকে এখন বলে দেয়ার সময় হয়েছে, তাহলে আর আমার কোনো দায়িত্ব থাকবে না। আমি ডাকলাম, টুকুনজিল।
বল।
আমি কি এখন তোমার কথা সবাইকে বলতে পারি?
পার। কাকে বলবে তুমি?
আমার ডাক্তার চাচাকে বলেছিলাম, বিশ্বাস করেন নি। মনে করেছিলেন, আমি পাগল। আমি একটু হাসলাম—
টুকুনজিল বলল, তুমি হাসলে এখন, তার মানে এটা হাসির ব্যাপার?
হ্যাঁ। বুঝতে পারলে, কেন এটা হাসির ব্যাপার?
এখনো বুঝি নি। ঠিক আছে বল, কাকে বলবে?
আমার স্যারকে। স্যার আমার কথা বিশ্বাস করবেন। তুমি কি সেই আংটির খেলাটা দেখাতে পারবে ? ক্লাসের সবাইকে।
পারব। তুমি যদি চাও, তা হলে তোমাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখব সবার সামনে।
পারবে তুমি? পারবে?
পারব। খুব সহজ। আমার ইঞ্জিনের এখন অনেক শক্তি।
আমি খুশিতে একেবারে হেসে ফেললাম।
টুকুনজিল বলল, আবার হাসলে তুমি। এটা হাসির ব্যাপার? এটা হাসির ব্যাপার?
অনেক কথা হল আমার টুকুনজিলের সাথে। প্রথম যখন দেখা হয়েছিল, একেবারে ভালো করে কথা বলতে পারত না, একটা কথা বলত এক শ’ বার, এখন প্রায় মানুষের মতো কথা বলতে শিখে গিয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, তার হাসতে শেখার চেষ্টা। মাঝে-মাঝেই হাসার মতো শব্দ করে—বেশির ভাগ সময়েই ভুল জায়গায়। আমি তাকে শুধরে দিচ্ছি, কে জানে, তার গ্রহে ফিরে যাবার আগে সে হয়তো হাসতে শিখে যাবে
💜💜💜💜
ছিনতাই
আজকেও আমি বল্টুর স্কুলে নেমে হেটে হেঁটে আসছিলাম। ক্লাসে আজকে কী মজা হবে চিন্তা করে আমার মুখের হাসি বন্ধ হচ্ছিল না। ক্লাস শুরু হওয়ার পরই আমি হাত তুলে বলব, স্যার, একটা কথা বলতে পারি?
স্যার বলবেন, কি কথা?
আমি বলব, খুব জরুরী কথা।
স্যার বলবেন, বল।
ঠিক তখন টুকুনজিল আমাকে বেঞ্চের উপর দিয়ে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে আসবে, স্যারের সামনে এনে মেঝে থেকে এক হাত উপরে ঝুলিয়ে রাখবে। স্যার নিশ্চয়ই এত অবাক হবেন যে কথা পর্যন্ত বলতে পারবেন না! আমি তখন বলব, স্যার, আপনার সাথে আমার বন্ধু টুকুনজিলের পরিচয় করিয়ে দিই।
স্যার বলবেন, টুকুনজিল ?
আমি তখন বলব, জ্বি স্যার, মহাকাশের প্রাণী টুকুনজিল। তাকে দেখা খুব শক্ত, ম্যাগনিফাইং গ্লাস ছাড়া দেখা যায় না—
ঠিক এরকম সময়ে কে যেন আমার ঘাড়ে টোকা দিল। আমি চমকে পিছনে তাকালাম। খুব ভালো কাপড় পরা একজন মানুষ। সামনে চুল একটু পাতলা হয়ে এসেছে, চোখে চশমা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই যে, খোকা, শোন—
আমাকে বলছেন ?
হ্যাঁ, তুমি একটু এদিকে আসবে?
এখন তো আমার স্কুলে যাবার সময়।
এক মিনিট—
আমি হঠাৎ টের পেলাম, আমার দুই পাশে আরো দুইজন মানুষ আমার দুই হাত শক্ত করে ধরেছে। মানুষগুলো ভালো কাপড়-পরা, মুখ কেমন যেন হাসি হাসি, কেউ দেখলে ভাববে আমার পরিচিত কোনো মানুষ কিছু-একটা মজার কথা বলবে আমার সাথে। কিন্তু আমার বুঝতে বাকি থাকে না, এর মাঝে মজার কিছু নেই। লোক দুজন আমাকে প্রায় শূন্যে ঝুলিয়ে নিয়ে যায়। কাছেই সেই মাইক্রোবাসটা দাঁড়িয়ে আছে, কাছাকাছি আসতেই দরজাটা খুলে গেল আর দুই জোড়া শক্ত হাত আমাকে ভিতরে টেনে নিল। পুরো ব্যাপারটা ঘটল চোখের পলকে, আমি কিছু বোঝার আগে।
মাইক্রোবাসের জানালা টেনে তুলে রাখা, বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই। ভিতরে সব কয়জন বিদেশি, লাল রঙের চেহারা দেখলেই পিলে চমকে যায়। একজন হলুদ দাঁত বের করে হাসার ভঙ্গি করে বলল, কুকা, টোমাড় কুনু বয় নায়—যার অর্থ নিশ্চয়ই খোকা, তোমার কোনো ভয় নেই।
আমি গলা ফাটিয়ে একটা চিৎকার দিতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন হাতের কনুইয়ের কাছে একটা খোঁচা লাগল, হাতটা সরানোর চেষ্টা করতেই দেখলাম কেউ-একজন শক্ত করে ধরে রেখেছে। মাথা ঘোরাতেই দেখলাম, একটা সিরিঞ্জে করে কী-একটা ইনজেকশান দিচ্ছে আমাকে।
প্রচণ্ড ভয়ে আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, কিন্তু তার আগেই হলুদ দাঁতের লোকটা আমার মুখ চেপে ধরে বলল, কুকা, কুনু বয় নায়।
আমার গলা দিয়ে শব্দ বের হল না, যেটুকু বের হল, মাইক্রোবাসের ইঞ্জিনের শব্দে চাপা পড়ে গেল তার বেশির ভাগ। আরেকটা চিৎকার দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু শরীরে জোর পাই না আমি। হঠাৎ করে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। নিশ্চয়ই আমাকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। চোখ বন্ধ করার আগে দেখতে পেলাম, হলুদ দাঁতের লালমুখো বিদেশিটা আমার উপর ঝুঁকে মুখে হাসির ভঙ্গি করে রেখেছে। তারপর আর কিছু মনে নেই।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমি অনেক রকম স্বপ্ন দেখলাম। ছাড়া-ছাড়া আজগুবি সব স্বপ্ন। এক সময় স্বপ্নে দেখলাম আমি বাড়ি ফিরে গেছি, বাবা একটা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে এমন একটা ভঙ্গি করলেন, যেন আমাকে দেখতেই পান নি। আমি ডাকলাম, বাবা।
বাবা অবাক হয়ে বললেন, কে কথা বলে?
আমি বললাম, আমি।
আমি কে ?
আমি বিলু।
হ্যাঁ।
বাবা আকুল হয়ে বললেন, তুই কোথায় বাবা বিলু?
আমি বললাম, এই তো, বাবা।
বাবা মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন, কিন্তু তবু আমাকে দেখতে পেলেন না। বললেন, কোথায় তুই? কোথায়? দেখতে পাই না কেন ?
আমি বললাম, এই তো বাবা, আমি এখানে ।
কোথায় ?
এই তো বাবা, বাবা--
বিলু বিলু বিলু—
আমার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, কেউ-একজন সত্যি আমাকে ডাকছে। আমি আস্তে আস্তে চোখ খুললাম, উজ্জ্বল আলো ঘরে, তার মাঝে একজন আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে আগে কোথায় জানি দেখেছি লোকটাকে, কিন্তু মনে করতে পারলাম না।
আমার হঠাৎ করে সব মনে পড়ে গেল। স্কুলে যাচ্ছিলাম আমি, তখন রাস্তা থেকে ধরে এনেছে আমাকে, আমি উঠে বসার চেষ্টা করলাম। মাথার কোথায় জানি প্রচণ্ড যন্ত্রণা করে উঠল হঠাৎ মনে হচ্ছে ভিতরে একটা শিরা ছিড়ে গেছে বা অন্য কিছু। আমার সামনে দাঁড়ানো লোকটা অন্তরঙ্গ সুরে বলল, কেমন লাগছে বিলু তোমার?
কথা শুনে মনে হল যেন আমার কতদিনের পরিচিত। আমি জিব দিয়ে আমার শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বললাম, খারাপ। খুব খারাপ।
এই তো এক্ষুণি ভালো লাগবে তোমার।
আপনি কে? আমি কোথায়?
এক্ষুণি জানবে তুমি, আমি কে। নাও, এই ওষুধটা খেয়ে নাও।
ছোট একটা গ্লাসে করে লাল রঙের একটা ওষুধ আমার মুখের কাছে ধরল মানুষটা। আমি মাথা নাড়লাম, কি-না-কি খাইয়ে দিচ্ছে কে জানে।
খেয়ে নাও, খেয়ে লাও, ভালো লাগবে- বলে প্রায় জোর করে ওষুধটা আমার মুখের মাঝে ঢেলে দিল। ওষুধটা মিষ্টি এবং চমৎকার একটা সুগন্ধ, তবু আমি খেলাম না, মুখে রেখে দিলাম। লোকটা আবার কাছে আসতেই আমি পিচকারির মতো তার মুখে ওষুধটা কুলি করে দিলাম- মানুষটাকে চিনতে পেরেছি, আজ সকালে সে আমাকে ধরে এনেছে।
লাল ওষুধটা তার চশমা বেয়ে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে। দেখতে দেখতে তার চমৎকার কাপড়ে লাল লাল ছোপ হয়ে যায়।
ঠা ঠা করে কে যেন হেসে উঠল হঠাৎ, আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, লালমুখের আরেকজন বিদেশি মানুষ। আগে একে দেখেছি বলে মনে পড়ল না। কে জানে, হয়তো দেখেছি, এদের সবগুলোকে একই রকম দেখায়।
ভালো কাপড়-পরা মানুষটি তার লাল লাল ছোপ কাপড় নিয়ে আমার দিকে হিংস্র চোখে তাকাল। আমি একেবারে লিখে দিতে পারি, ঘরে আর কেউ না থাকলে আমাকে মেরে বসত। কিন্তু আমি জানি আমার গায়ে কেউ হাত দেবে না। সারা পৃথিবীতে শুধু আমিই টুকুনজিলের খোঁজ জানি, এই লোকগুলো সে জন্যেই আমাকে ধরে এনেছে।
বিদেশ লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হড়বড় করে কী যেন বলল, আমি তার একটা অক্ষরও বুঝতে পারলাম না। নিশ্চয়ই ইংরেজি হবে,কিন্তু এটা কী রকম ইংরেজি!
একটা রুমাল দিয়ে মুখ কপাল এবং ঘাড় মুছতে মুছতে ভালো কাপড়-পরা মানুষটি বলল, এই সাহেব বলছেন যে তোমার অনেক বড় বিপদ ছিল, সেটা কি তুমি জানতে ?
কি বিপদ ?
একটা প্রাণী তোমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, অনেক কষ্ট করে তোমাকে রক্ষা করা হয়েছে।
কোন প্রাণী ?
মহাকাশের প্রাণী।
আমাকে ধরে নিতে এসেছিল ?
হ্যাঁ!
রাগে আমার পিত্তি জ্বলে গেল, বললাম, মিথ্যুক— আপনার লজ্জা করে না এরকম মিথ্যা কথা বলতে? আমাকে মহাকাশের প্রাণী ধরে আনে নি, আপনারা ধরে এনেছেন। বিদেশি দালাল।
বিদেশি লোকটা তখন ভালো কাপড়-পরা মানুষটির সাথে খানিকক্ষণ কথা বলল। আমি ইংরেজি একটু একটু বুঝতে পারি, কিন্তু বিদেশিদের উচ্চারণ বড় খটমটে। দু'জনে কী কথা হল আমি পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝতে পারলাম, বিদেশি লোকটি এই মানুষটিকে চলে গিয়ে অন্য একজনকে আসতে বলছে। এই বিদেশি মানুষটি নিশ্চয়ই কোনো বড় মানুষ, কারণ সে যখনই কথা বলে, ভালো কাপড়-পরা মানুষটি মাথা নেড়ে নেড়ে বলে, জ্বি স্যার, জ্বি স্যার, অবশ্যই স্যার-
মানুষটি বের হওয়ার পর ঘরে শুধু আমি আর বিদেশি। সে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার মতো ভঙ্গি করল, আমার ইচ্ছে করল জিব বের করে একটা ভেংচি কেটে দিই। কিন্তু দিলাম না, হাজার হলেও একজন বিদেশি মানুষ। আমি মনে মনে বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোন দেশের মানুষ?
বেশ কয়েকবার বলার পর বিদেশিটা বুঝতে পারল আমি কী জিজ্ঞেস করছি। উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন?
আমি আবার মনে মনে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বললাম, দেখতে চাই কোন দেশের মানুষ এত বদমাইশ।
এই কথাটা কিন্তু সে একবারেই বুঝে গেল, আর আমার মনে হল কথাটা শুনে তার কেমন যেন একটু মন-খারাপ হয়ে গেল। লোকটা কেমন জানি সরু চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ।
দরজা খুলে এবার শাড়ি-পরা একজন মেয়ে এসে ঢুকল ঘরে। খুব সুন্দর চেহারা মেয়েটির, একেবারে সিনেমার নায়িকাদের মতো। মেয়েটি প্রথমে খানিকক্ষণ বিদেশি লোকটার সাথে কথা বলে আমার দিকে এগিয়ে এল, আমার গায়ে হাত দিয়ে বলল, আমার নাম শায়ালা। তোমার নাম নিশ্চয়ই বিলু?
আমি মাথা মাড়লাম।
তুমি নাকি ঠিক করে কথা বলতে চাইছ না।
আপনারা ছেলেধরার দল, ছেড়ে দিন, আমি আগে পুলিশের সাথে কথা বলব।
ছেলেধরা? শায়লা নামের মেয়েটা কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল হঠাৎ একটু ইতস্তত করে বলল, তুমি তো সব কিছু জান না, তাই তোমার এরকম মনে হচ্ছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কী চান?
আমরা চাই, তুমি যেন আমাদের সাহায্য কর।
কী সাহায্য ?
আমরা যেন মহাকাশের প্রাণীটাকে আটকে ফেলতে পারি, তাহলে তোমার আর কোনো বিপদ থাকবে না। তুমি চলে যেতে পারবে।
আমি মেয়েটার মুখের দিকে তাকালাম, এত সুন্দর চেহারা মেয়েটার, কিন্তু কী রকম মিথ্যা কথা বলছে। জিজ্ঞেস করলাম, আটকে ফেলে কী করবেন?
তার উপর গবেষণা করা হবে।
তার কি কোনো ক্ষতি হবে?
ক্ষতি ? ক্ষতি—না, মানে—ঠিক ক্ষতি হবে না মনে হয়।
কতদিন লাগবে গবেষণা করতে ?
অনেকদিন, এক বছর, দুই বছর, দশ বছর।
ততদিন তাকে আটকে রাখবেন?
অনেক যত্ন করে রাখা হবে, কোনো অসুবিধে হবে না তার।
আমি কোনো কথা বললাম না, টুকুনজিল আমাকে বলেছে তিনদিনের মাঝে তাকে চলে যেতে হবে, যদি যেতে না পারে তাহলে আটকা পড়ে যাবে পুথিবীতে। আর এরা তাকে জোর করে আটকে রাখতে চাইছে দশ বছর। আমি তো সেটা হতে দিতে পারি না।
শায়লা নামের মেয়েটা বলল, কি হল, কথা বলছ না কেন?
আমি চোর, গুন্ডা, বদমাইশ, বিদেশি দালাল আর ছেলেধরার দলের সাথে কথা বলব না।
শায়লার মুখটা একটু লাল হয়ে গেল, বলল, তুমি কাকে চোর-গুণ্ডা বলছ? এই যে ইনি- এর নাম বব কার্লোস। ডক্টর বব কার্লোস। মহাকাশের প্রাণীদের অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন সারা জীবন। পৃথিবীর সবাই তাঁকে এক ডাকে চেনে।
এই জন্যে তাঁর সাত খুন মাফ? আমাকে আগে ছেড়ে দিন, তারপর আমি কথা বলব।
কিন্তু ছেড়ে দিলে তোমার অনেক বিপদ---
মিথ্যুক।
তুমি যদি সাহায্য কর, তোমাকে অনেক বড় পুরস্কার—
মিথ্যুক! মিথ্যুক!!
বিলু তুমি অবুঝ হয়ে না। আমার কথা শোন-
আমি মিথ্যুকদের সাথে কথা বলি না।
শায়লা হাল ছেড়ে দিয়ে বব কার্লোস নামের বিদেশি লোকটার দিকে তাকাল। বব কার্লোস কিছু-একটা জিজ্ঞেস করল শায়লাকে, উত্তরে শায়লাও কিছু-একটা বলল। দুজনে কথা হল বেশ খানিকক্ষণ। কার্লোসকে কেমন যেন ক্লান্ত দেখায়। হেঁটে হেঁটে একটা চেয়ারে গিয়ে বসে। শায়লা আবার এগিয়ে আসে আমার দিকে, তার মুখে আগে যেরকম একটা হাসি-খুশির ভাব ছিল, এখন আর সেটা নেই। কেমন যেন কঠিন মুখ করে রেখেছে—দেখে একটু ভয়ই লাগে। শায়লা বলল, ডক্টর কার্লোস তোমাকে কয়েকটা কথা বলবেন, তুমি খুব মন দিয়ে শোন।
বব কার্লোস কথা বলতে শুরু করল। গলার স্বরটা গমগমে, একটা কথা বলে থেমে যায়, শায়লা তখন সেটা আমাকে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়। বব কার্লোস বললঃ
ছেলে, তুমি মন দিয়ে শোন আমি কি বলি। মহাকাশের এই প্রাণী আসছে আমরা দুই বছর থেকে জানি। আমাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে, আমরা তাকে পৃথিবীতে আসতে সাহায্য করেছি। সে পৃথিবীতে এসে ডুব মেরেছে, আমাদের সাথে আর যোগাযোগ করছে না। কার সাথে যোগাযোগ করেছে? তোমার সাথে। কেন ? ঘটনাক্রমে।
কিন্তু শুনে রাখ, পৃথিবীর সবগুলো উন্নত দেশ মিলে এক শ’ এগারো বিলিওন ডলার খরচ করেছে এই প্রজেক্টে। এক শ’ এগারো বিলিওন ডলার কত টাকা তুমি জান? জান না। তোমার দেশকে বেচলেও এত টাকা হবে না। কেন আমরা এই টাকা খরচ করেছি জান ? কারণ, এই প্রাণী এমন অনেক টেকনোলজি জানে যেটা আমরা জানি না। সেই টেকনোলজি শিখতে আমাদের এক শ’ বছরে এক শ’ টিলিওন ডলার লেগে যাবে। হয়তো আরো বেশি। তাই শুনে রাখ, এটা খুব জরুরি। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলার জন্যে এই প্রজেক্ট শুরু করা হয় নি। এই প্রজেক্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তোমার জীবন, তোমার বন্ধুত্ব এসবের কোনো মূল্য নেই এই প্রজেক্টের সামনে। কোনো মূল্য নেই।
আমরা সব জানি। আমরা জানি এই প্রাণী তোমার কাছে ঘুরঘুর করে। আমরা তার কথাবার্তা খবরাখবর সবকিছু ধরতে পারি কিন্তু তাকে ধরতে পারি না। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই তাকে ধরতে পারি নি। কিছুতেই তাকে দেখতে পারি নি।
শেষ পর্যন্ত আমরা বুঝেছি কেন তাকে ধরতে পারি না। তোমার ডাক্তারের কাছ থেকে তোমার ফাইলটা আনা হয়েছে, সেখানে আমরা দেখেছি তুমি মহাকাশের প্রাণীর কথা বলেছ। আমরা প্রথমবার বুঝতে পেরেছি কেন আমরা তাকে কখনো দেখতে পারি নি, কারণ সে ছোট, খুবই ছোট। আমাদের জন্যে সেটা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর আবিষ্কার। আমাদের সব যন্ত্রপাতি নূতন করে তৈরি করতে হয়েছে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়ে গেছে আমাদের। এখন আমরা আবার তাকে ধরার জন্যে প্রস্তুত হয়েছি। তোমাকে এখন আমাদের দরকার। তুমি যদি নিজে থেকে আমাদের সাহায্য কর, তাহলে ভালো। খুবই ভালো। যদি না কর, কোনো ক্ষতি নেই, আমরা তোমাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেব। শুনে রাখ ছেলে, তুমি বেঁচে থাক কি মরে যাও তাতে কিছু আসে যায় না- কিছু আসে যায় না। আমরা এই প্রজেক্টে এক শ’ এগারো বিলিওন ডলার খরচ করেছি। এই টাকা আমরা পানিতে ফেলে দেব না। এই প্রাণীটা আমাদের দরকার। অনেক দরকার।
আমরা তাকে একটা নাম দিয়েছিলাম। এন্ড্রোসিলিকান। এন্ড্রোমিডা থেকে এসেছে, তাই এন্ড্রো, শরীরটা কার্বনভিত্তিক না হয়ে সিলিকনভিত্তিক বলে সিলিকান। দুই মিলে এন্ড্রোসিলিকান। আর এই প্রাণী নিজেকে কী বলে ডাকে? টুকুনজিল! টুকুনজিল একটা নাম হল! নাম হল? দুই বেলা নিজের জগতে খবর পাঠাচ্ছে, আমার নাম টুকুনজিল—আমার নাম টুকুনজিল। কী প্রচণ্ড ছেলেমানুষি। কী প্রচণ্ড নির্বুদ্ধিতা। কিন্তু কেন এটা করছে? কারণ তুমি তাকে এই নাম দিয়েছ। তুমি।
কী করছে এই হতভাগা প্রাণী ? দিনরাত চরিশ ঘন্টা তোমার পিছনে পিছনে ঘুরঘুর করছে! তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে সে সত্যি। বোঝার চেষ্টা করছে তুমি কেমন করে হাস। তুমি কেমন করে কথা বল। কেমন করে রাগ হও। হতভাগা টুকুনজিল! এক শ’ এগারো বিলিওন ডলার খরচ করা হয়েছে এর পিছনে, আর এই প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে তোমার মতো একজন নির্বোধ ছেলের পিছনে। তুমি ভাবছ আমরা এটা মেনে নেব?
না! তুমি সাহায্য কর ভালো। যদি না কর কিছু আসে যায় না। তোমাকে আমরা ধরে এনেছি, সেটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা। এখন তোমাকে ব্যবহার করব। তার কারনে তোমার যদি কোনো ক্ষতি হয়, কিছু করার নেই। তুমি যদি মরে যাও, কেউ যদি আর তোমাকে খুঁজে না পায়, কিছু করার নেই। এতে পৃথিবীর কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। পৃথিবীতে তোমার জন্যে কেউ ব্যস্ত নয়, তোমার পাগল বাবা কিছু করতে পারবে না। কেউ তার কথা শুনবে না।
বব কার্লোস কথা বন্ধ করে আমার চোখের দিকে তাকাল। মনে হল কেমন যেন বিষণ্ণ চোখের দৃষ্টি। মানুষের চোখের রং যদি নীল হয় তাকে দেখতে কেমন জানি অদ্ভুত দেখায়, মনে হয় যেন মানুষ নয়, যেন অশরীরী কোনো প্রাণী। খুব আস্তে আস্তে আমাকে জিজ্ঞেস করল, মহাকাশের প্রাণীকে ধরতে তুমি আমাদের সাহায্য করবে?
টুকুনজিলকে এরা আটকে ফেলবে? ফিরে যেতে দেবে না তার দেশে? কেটে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করবে? আমি কেমন করে সেটা করতে দিই তাদের? আমি মাথা নেড়ে আস্তে আস্তে বললাম, তুমি আর তোমার চৌদ্দ গুষ্টি জাহান্নামে যাও। আমি টুকুনজিলকে ধরিয়ে দেব না।
💚💚💚💚
কালরাত
খুব সুন্দর একটা ঘরে আমাকে আটকে রেখেছে। রাতে বিস্বাদ কিন্তু খুব সুন্দর করে সাজানো খাবার খেতে দিয়েছে। ঘরে কোনো জানালা নেই। ধবধবে সাদা দেয়াল, উপরে উজ্জ্বল আলো। ঘরে আর একটি জিনিসও নেই, আমি চুপচাপ বসে থেকেছি। আমাকে দিয়ে কী করবে জানি না। বুকের ভেতর চাপা কেমন জানি একটা ভয়। বসে থেকে অপেক্ষা করতে-করতে আমি একসময় নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কারণ যখন ঘুম ভাঙল আমি একেবারে চমকে জেগে উঠলাম।
বেশ কয়েকজন মানুষ আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই বিদেশি। আমাকে ধরে প্রায় শূন্যে ঝুলিয়ে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। চেয়ারটা খুব চমৎকার, মহাকাশচারীরা যেরকম চেয়ারে বসে রকেটে করে যায়, অনেকটা সেরকম। লোকগুলো চেয়ারের হাতলে আমার হাত দুটি লাল রঙের নাইলনের ফিতা দিয়ে বেঁধে ফেলল। চেয়ার থেকে দু’টি বড় বড় বেল্ট বের হয়ে এসেছে, সেটা বুকের উপর দিয়ে নিয়ে আমাকে শক্ত করে বেধে ফেলল। পা দুটি খোলা ছিল, এক জন সেগুলোও চেয়ারের নিচে কোথায় জানি আটকে দিল। চেয়ারটাতে মাথা রাখারও একটা জায়গা আছে সেখানে মাথাটা রেখে কপালের উপর দিয়ে একটা বেল্ট টেনে এনে মাথাটাও আটকে ফেলল।
আমি প্রথমে একটা বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু মানুষগুলো দৈত্যের মতো, তাদেরকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেও কোনো লাভ নেই, আমি কিছুক্ষণের মাঝে হাল ছেড়ে দিলাম। প্রচণ্ড আতঙ্কে আমি সেই আশ্চর্য চেয়ারে শক্ত হয়ে শুয়ে রইলাম।
চেয়ারটাতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নেয়ার পর এক জন কোথায় একটা সুইচ টিপে দিতেই চেয়ারটা আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকে। আরেকটা সুইচ টিপে দিতেই চেয়ারটা কাত হয়ে লম্বা একটা বিছানার মতো হয়ে গেল। তখন আরেকজন লোক কপালের চারপাশে চুষনির মতো কী-একটা জিনিস লাগিয়ে দিতে থাকে, সেখান থেকে লম্বা ইলেকট্রিক তার বের হয়ে এসেছে সেগুলো গিয়েছে পাশে রাখা নানারকম যন্ত্রপাতিতে—কিছুক্ষণের মাঝে ঘরটা যন্ত্রপাতিতে বোঝাই হয়ে গেছে। সেগুলো থেকে নানারকম আলো বের হচ্ছে, নানারকম শব্দ। লোকগুলো গম্ভীর মুখে যাওয়া-আসা করছে, যন্ত্রপাতি টানাটানি করছে, কথাবার্তা বলতে গেলে নেই, যেটুকু হচ্ছে খুব নিচু গলায়।
আমি কয়েকবার জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করলাম, কী করছ তোমরা? কী করছ? কেউ আমার কথায় কোনো গুরুত্ব দিল না, এক জন শুধু দৈত্যের মতো হলুদ দাঁত বের করে হাসার ভঙ্গি করে বলল, কুনু বয় নায়।
কথাটির অর্থ নিশ্চয়ই “কোনো ভয় নেই”, কিন্তু ভয়ে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার মতো অবস্থা হল। আমি কুলকুল করে ঘামতে শুরু করেছি, বুকের মাঝে হৃৎপিণ্ড ঢাকের মতো শব্দ করছে। ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে কাঁদি, কিন্তু দৈত্যের মতে লোকগুলোর মুখে মায়াদয়ার কোনো চিহ্ন নেই। দেখে মনে হয় দরকার হলে খুব ঠাণ্ডা মাথায় হাসিমুখে আমাকে মেরে ফেলবে।
কিন্তু আমাকে নিশ্চয়ই মারবে না। টুকুনজিলের সাথে যোগাযোগ করার জন্যে আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে না? প্রচণ্ড আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে আমি অসহায়ভাবে শুয়ে কী হয় দেখার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি।
বব কার্লোস এল একটু পরে, আমি তাকেও কয়েকবার ডাকলাম, কিন্তু আমাকে সে পুরোপুরি উপেক্ষা করে যন্ত্রপাতির সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সুইচ টিপে পরীক্ষা করে দেখতে লাগল। আমি কান পেতে লোকগুলোর কথা শোনার চেষ্টা করতে লাগলাম, কি বলাবলি করছে বোঝার চেষ্টা করলাম। মনে হল আমার মস্তিষ্কের নানারকম তরঙ্গ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছে সেগুলোকে একটা খুব শক্তিশালী এমপ্লিফায়ার দিয়ে বাড়িয়ে নিয়ে বাসায় ছাদে লাগানো এন্টেনা দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে দেবে। বব কার্লোসের দলবল আশা করছে টুকুনজিল আমার মস্তিষ্কের তরঙ্গের সাথে পরিচিত, কাজেই এই সংকেত পেয়ে বুঝতে পারবে আমি কোথায়, তখন ছুটে আমার সাথে দেখা করতে আসবে। এই ঘরে নানারকম যন্ত্রপাতি রাখা আছে, টুকুনজিল আসামাত্র তাকে ধরে ফেলা হবে।
টুকুনজিল আর যাইহোক বোকা নয়। আমাকে অনেকবার বলেছে যে বিজ্ঞানীদের থেকে সে দূরে দূরে থাকতে চায়, কেন সেটা সে কখনো ঠিক করে বলে নি। এখন খানিকটা বুঝতে পারছি, সে নিশ্চয়ই ব্যাপারটা আগেই টের পেয়ে গিয়েছিল। টুকুনজিল নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে যে, এটা তাকে ধরার একটা কৌশল, তাহলে কেন সে জেনেশুনে এই ফাঁদে পা দিতে আসবে আমি বুঝতে পারছিলাম না। যখন পুরোপুরি প্রস্তুতি নেয়া হল, তখন হঠাৎ করে ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
দৈত্যের মতো এক জন মানুষ ছোট একটা সিরিঞ্জ নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল, শার্টের হাতাটা একটু গুটিয়ে কিছু বোঝার আগে ঘ্যাঁচ করে আমার হাতে সিরিঞ্জটা বসিয়ে লাল রঙের ওষুধটা শরীরে ঢুকিয়ে দিল। সেই ওষুধটায় কী ছিল জানি না, কিন্তু হঠাৎ করে মনে হল কেউ যেন গনগনে জ্বলন্ত সীসা আমার শরীরে ঢুকিয়ে দিয়েছে, সমস্ত শরীরে যেন আগুন ধরে গেছে। সমস্ত শরীর প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কুকড়ে উঠে আমার মনে হতে থাকে, কেউ যেন আমার শরীরের চামড়া ছিলে নিচ্ছে টেনে টেনে। আমি ভয়ঙ্কর যন্ত্রণায় অমানুষের মতো চিৎকার করতে থাকি, মনে হতে থাকে আমার গলা দিয়ে বুঝি রক্ত বের হয়ে আসবে সেই চিৎকারে। লোকগুলো আমার চিৎকারে এতটুকু কান না দিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে যন্ত্রপাতিগুলো পরীক্ষা করতে থাকে। আমার মনে হতে থাকে সমস্ত শরীর যেন আগুনে ঝলসে দিচ্ছে কেউ, মনে হতে থাকে শরীরের এক-একটি অংশ যেন টেনে টেনে ছিড়ে নিচ্ছে শরীর থেকে।
প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমি প্রায় অচেতন হয়ে যাচ্ছিলাম, তার মাঝে শুনলাম বব কার্লোস বলল, ভেরি গুড! ভেরি ভেরি গুড!
এর পর ইংরেজিতে কী বলল আমি বুঝতে পারলাম না, কিন্তু মনে হল আমার প্রচণ্ড যন্ত্রণার ব্যাপারটি ঠিক তাদের মনের মতো হয়েছে, এবং সেই সংকেত নিখুঁতভাবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। লোকগুলো খুব খুশিতে কথা বলতে থাকে, একজন কী-একটা বলল, অন্য সবাই তখন হো হো করে হেসে উঠল খুশিতে।
অসহায়ভাবে শুয়ে আমি প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকি। আমার চোখের কোন দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে, আমি তখন ভাঙা গলায় বাবাকে ডাকতে থাকি। বাবা-বাবা গো, তুমি কোথায়—
দ্বিতীয়বার ইনজেকশনটি দিল প্রায় আধা ঘন্টা পর। আবার আমি পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকি। মনে হতে থাকে যে মাথার মাঝে কিছু-একটা গোলমাল হয়ে গেছে, কিছুতেই আর চিৎকার থামাতে পারি না। সমস্ত শরীরটা থরথর করে কাঁপতে থাকে। যন্ত্রণা যেন শরীরের মাঝে সাপের মতো কিলবিল করে ছুটতে থাকে, উপর থেকে নিচে, নিচে থেকে উপরে—মনে হতে থাকে বিষাক্ত ছুরি দিয়ে কেউ যেন গেঁথে ফেলছে আমাকে। আমার চোখের সামনে লাল রঙের আলো খেলা করতে থাকে, আমি পাগলের মতো ভাবতে থাকি, হায় খোদা, আমি এখনো মরে যাচ্ছি না কেন? কেন মরে যাচ্ছি না? কেন মরে যাচ্ছি না?
হঠাৎ কে যেন আমার ভেতরে বলে, বিলু! কি হয়েছে তোমার বিলু?
কে? টুকুনজিল? তুমি এসেছ!
ঘরের মাঝে সব কয়জন মানুষ তখন মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল। বব কার্লোস চিৎকার করে কী-একটা বলল, ঘরে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল হঠাৎ, ঘড়ঘড় করে কোথায় একটা শব্দ হল। বিদ্যুৎ-স্ফুলিঙ্গ খেলা করতে থাকে আর বিচিত্র শব্দে যন্ত্রপাতিগুলো আর্তনাদ করতে থাকে। তীব্র একটা লাল আলো একপাশে একটা জায়গা আলোকিত করে দেয়। ঝাঁঝালো একটা গন্ধ পেলাম আমি। লোকজনের উত্তেজিত কথাবার্তা আর যন্ত্রপাতির গুঞ্জনে কানে তালা লেগে যায় হঠাৎ।
টুকুনজিল আবার বলল, বিলু, তোমার কী হয়েছে? তুমি এরকম করছ কেন?
কষ্ট। বড় কষ্ট টুকুনজিল।
কষ্ট? সেটা কি?
আমি কোনোমতে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ফেললাম! হঠাৎ করে আমার কপালে একটু গরম লাগতে থাকে, নিশ্চয়ই টুকুনজিল নামার চেষ্টা করছে। শুনলাম সে বলল, চার শ’ তেরো মেগাসাইকেল। তিন মিলি সেকেন্ড পরপর। দুই তরঙ্গের অপবর্তন অসম বন্টন তোমার মস্তিষ্কের তরঙ্গে দেখি অনেক গোলমাল। দাঁড়াও, ঠিক করে দিই।
আমার কপালে চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করলাম, তারপর হঠাৎ করে একেবারে ম্যাজিকের মতো সমস্ত যন্ত্রণা দূর হয়ে গেল। আমার তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল একটু নড়লেই আবার যন্ত্রণা শুরু হয়ে যাবে, কিন্তু শুরু হল না। সমস্ত শরীর তখনো একটু একটু কাঁপছে, ঘামে ভিজে গেছে জামা-কাপড়। শরীরটা হালকা লাগছে হঠাৎ করে, মনে হতে থাকে যে বাতাসে ভেসে যাব আমি। বুকের ভেতর কেমল যেন আনন্দ এসে ভর করে।
আমি কিন্তু তখন ভেউ ভেউ করে কেঁদে বললাম, টুকুনজিল, তুমি না এলে এই রাক্ষসগুলো আমাকে মেরে ফেলত।
কেউ তোমাকে মারতে পারবে না, বিলু। আমি তোমাকে বাঁচাব।
এরা তোমাকে ধরতে চায়, টুকুনজিল।
আমাকে কেউ ধরতে পারবে না।
হঠাৎ বব কার্লোসের গলা শুনতে পেলাম আমি, ইংরেজিতে কী বলেছে ঠিক বুঝতে পারলাম না, ‘এক মিনিট’ কথাটা শুধু ধরতে পারলাম। আমি টুকুনজিলকে জিজ্ঞেস করলাম, কি বলছে তুমি বুঝতে পারছ, টুকুনজিল?
হ্যাঁ। বলেছে এক মিনিটের মাঝে আমি যদি লেজার শিল্ডের মাঝে না ঢুকে যাই তাহলে তোমাকে মেরে ফেলবে। অত্যন্ত অর্থহীন অযৌক্তিক একটা কথা।
কেন ?
লেজার শিল্ডটা তৈরি করেছে মেগাওয়াট পাওয়ার দিয়ে, ছোট একটা ফুটে রেখেছে ঢোকার জন্য, ঢোকার পর ফুটোটা বন্ধ কুরে দেবে। আমি লেজারলাইটের মাঝে আটকা পড়ে যাব। বের হতে চেষ্টা করলেই আমার মহাকাশযান মেগাওয়াট পাওয়ারে একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি কেন সেখানে ঢুকব? কখনো ঢুকব না।
আমি ঢোক গিলে বললাম, বলছে, তুমি না ঢুকলে আমাকে মেরে ফেলবে।
অত্যন্ত অযৌক্তিক ব্যাপার। দুটোর মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। আর মরে গেলে ঠিক কী হয়, বিলু?
আমি ছটফট করে বললাম, মরে গেলে সব শেষ।
কেন, শেষ কেন ? আবার ঠিক করা যায় না?
না। মরে গেলে কেউ বেঁচে আসে না।
এটা হতেই পারে না।
আমি ঢোক গিলে বললাম, পারে টুকুনজিল, পারে। আমি জানি। তুমি কিছু-একটা কর তাড়াতাড়ি, কতক্ষণ হয়েছে?
ত্রিশ সেকেন্ড।
সর্বনাশ টুকুনজিল, একেবারে তো সময় নেই!
মরে গেলে শেষ কেন হবে ? আমি দেখতে চাই কেমন করে শেষ হয়।
আমি চিৎকার করে বললাম, না, তুমি দেখতে চেয়ো না, টুকুনজিল। দেখতে চেয়ো না। কিছু-একটা কর।
হা হা হা। টুকুনজিল হঠাৎ হাসির মতো শব্দ করে বলল, এটা কি হাসির ব্যাপার?
না, এটা হাসির ব্যাপার না। ভয়ের ব্যাপার! ভয়ানক ভয়ের ব্যাপার। কিছু-একটা কর ।
ঠিক আছে, তাহলে তোমাকে নিয়ে যাই এখান থেকে। হা হা হা।
পর মুহূর্তে কী হল ঠিক বুঝতে পারলাম না। প্রচও একটা বিস্ফোরণ হল, আগুনের একটা হলকা ছুটে এল আমার দিকে, আতঙ্কে চোখ বন্ধ করলাম আমি, আর হঠাৎ মনে হল আমি প্রচণ্ড বেগে আকাশের দিকে ছুটে যাচ্ছি। নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না আমি, হঠাৎ মনে হল আমি বুঝি মরে যাচ্ছি-তারপর আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান হবার পর আমার বেশ কিছুক্ষণ লাগল বুঝতে আমি কোথায়। যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি সাদা ধোঁয়ার মতো। সামনে-পিছনে উপরে-নিচে চারদিকে হালকা সাদা ধোঁয়া। আমার মনে হতে থাকে, সাদা ধোঁয়ার মাঝে শূন্যে ঝুলে আছি আমি। একবার মনে হল আমি বোধহয় মরে গেছি। বেশি পাপও করি নি, বেশি পুণ্যও করি নি, তাই মনে হয় দোজখ আর বেহেশতের মাঝখানে ঝুলে আছি আমি।
আমার হাত-পা সারা শরীর তখনো চেয়ারের সাথে বাঁধা। ভালো করে নড়তে পারছি না, ভয়ে ভয়ে ডাকলাম, টুকুনজিল! তুমি কোথায়?
এই যে এখানে ।
এখানে কোথায় ?
তোমার চেয়ারের নিচে।
কেন? নিচে কেন?
তোমাকে ধরে রেখেছি।
ধরে রাখার দরকার কী ?
মাধ্যাকর্ষণ বল। ধরে না রাখলে তুমি পড়ে যাবে।
কোথায় পড়ে যাব?
নিচে ।
নিচে কোথায় ?
নিচে মাটিতে। প্রায় সাত হাজার ফুট নিচে।
আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল ভয়ে, ঢোঁক গিলে বললাম, আমি কোথায় টুকুনজিল?
আকাশে ।
আকাশে ? কী সর্বনাশ। তাড়াতাড়ি নিচে নামাও।
কেন ?
আকাশে ঝুলে থাকবে কেমন করে? আকাশে কখনো কেউ ঝুলে থাকে নাকি?
তোমার শরীরে খুব ক্ষতিকর জিনিস ঢুকিয়ে দিয়েছিল। শরীর সেগুলো এখন পরিষ্কার করছে। সে জন্যে তোমার এখন ঘুমানো দরকার, মস্তিষ্কে এখন যেন কোনো অসম কম্পন না হয়, সেই জন্যে তোমাকে এখানে রেখেছি।
কোনোদিন শুনেছ কেউ আকাশে ঝুলে ঝুলে ঘুমায়?
এখানে কোনো শব্দ নেই, ধৈর্যচ্যুতি নেই, অসঙ্গতি নেই।
না থাকুক। আমাকে নিচে নামাও।
ঠিক আছে।
আমি হঠাৎ করে বুঝতে পারি চেয়ারটা ভাসতে-ভাসতে নিচে নামতে শুরু করেছে। ঠান্ডা বাতাসে শরীরটা মাঝে মাঝে শিউরে উঠছিল। চারদিকে তখনো সাদা ধোঁয়ার মতো মেঘ। হঠাৎ করে মেঘ কেটে গেল, আমি অবাক হয়ে দেখলাম, নিচে রাস্তাঘাট বাড়িঘর গাছপালা পুকুর। মেঘের ফাঁকে আকাশে বড় চাঁদ, তার আলোতে সবকিছু কেমন যেন অবাস্তব মনে হতে থাকে। নিচে তাকিয়ে আমার হঠাৎ তয়ে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। যদি টুকুনজিল হঠাৎ ছেড়ে দেয় আমাকে? ভয়ে ভয়ে ডাকলাম আবার, টুকুনজিল।
বল।
তুমি এত ছোট একটা প্রাণী, আমাকে উপরে ধরে রেখেছ, কষ্ট হচ্ছে না তো?
আমি ধরে রাখি নি। আমার মহাকাশযান ধরে রেখেছে।
তোমার মহাকাশযানের যন্ত্রপাতি সব ঠিক আছে তো?
আছে।
হঠাৎ করে ছেড়ে দিলে কিন্তু সর্বনাশ হয়ে যাবে। নিচে পড়লে আমি কিন্তু একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে যাব। আমাকে ছেড়ে দিও না!
আমি তোমাকে বেশি সময়ের জন্যে কখনো ছাড়ি নি।
আমি চমকে উঠে বললাম, বেশি সময়ের জন্যে ছাড় নি মানে ? কম সময়ের জন্যে ছেড়েছ কখনো ?
হ্যাঁ। মাঝে মাঝে নিচে গিয়ে দেখে আসছি কি হচ্ছে।
আমি চিৎকার করে বললাম, সর্বনাশ! মাথা খারাপ হয়েছে তোমার?
টুকুনজিল কোনো কথা বলল না, আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম, টুকুনজিল!
তবু কোনো সাড়া নেই। আমি নিচে পড়ে যাচ্ছি মার্বেলের মতো। গলা ছেড়ে ডাকলাম আমি, টু-কু-ন-জি-ল।
কি হল?
কোনোমতে নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, কোথায় ছিলে তুমি?
নিচে গিয়েছিলাম দেখতে। ভারি মজা হচ্ছে নিচে। হা হা হা ।
আমি ঢোক গিলে বললাম, আমাকে এভাবে ফেলে রেখে তুমি চলে যেও না আর, খবরদার ফিরে আসতে একটু দেরি হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে!
দেরি হবে না।
তবু তুমি যেয়ো না।
অনেক মজা হচ্ছে নিচে। হা হা হা। কেউ বুঝতে পারছে না কি হয়েছে।
হ্যাঁ, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমিও তো বুঝতে পারছি না কি হয়েছে।
খুব সোজা। প্রথমে তোমার সাথে লাগানো সব ইলেকট্রিক তারগুলো কেটে দিলাম। তারপর তোমাকে তুলে নিয়ে এলাম ঘরের মাঝখানে, সেখান থেকে দেয়ালে আঘাত করলাম আমার ব্লাষ্টার দিয়ে, তারপর ফুটো দিয়ে তোমাকে বের করে আনলাম। বেশি তাড়াতাড়ি বের করেছিলাম বলে তুমি সহ্য করতে পার নি, জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে—
কী আশ্চর্য!
আশ্চর্য কেন হবে? আমার ইঞ্জিনগুলো ফিউসান দিয়ে কাজ করে, অনেক শক্তি ইঞ্জিনে।
কথা বলতে বলতে আমরা ধীরে ধীরে নিচে নামছি। আস্তে আস্তে টুকুনজিলের উপর আমার বিশ্বাস ফিরে এসেছে। আমি বুঝতে পেরেছি যে আমার কোনো ভয় নেই, আমাকে সে কখনোই ভুল করে ফেলে দেবে না। সত্যি কথা বলতে কি, আকাশে উড়ে বেড়াতে আমার বেশ মজা লাগতে শুরু করেছে। বললাম, টুকুনজিল।
বল।
আরো খানিকক্ষণ উড়ে বেড়ালে কেমন হয়?
না।
কেন ?
তোমার ঘুম প্রয়োজন। অবশ্যি অবশ্যি প্রয়োজন। শরীরের সব ক্ষতিকর প্রভাব দূর হবে তা’ হলে।
একটু দেরি হলে কোনো ক্ষতি নেই।
আছে। আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।
টুকুনজিলের কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে ঘুমে। কোনোমতে বললাম, কোথায় নিয়ে রাখবে আমাকে?
তোমার বাসায় ?
না না না।
তোমার স্কুলে ?
স্কুলে ? হ্যাঁ, স্কুলে রাখতে পার।
ঠিক আছে, এখন তুমি ঘুমাও। তোমার আর কোন ভয় নেই।
আমার মনে হল সত্যি আমার আর কোন ভয় নেই।
💗💗💗💗
ব্ল্যাক মার্ডার
আমার খুব আরামের একটা ঘুম হল। এরকম আরামের ঘুম আমার অনেক দিন হয় নি। সেই যখন ছোট ছিলাম, তখন একপাশে মা আর অন্যপাশে বাবার সাথে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমাতাম, তখন মনে হয় আমার এরকম আরামের ঘুম হত। কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা নেই, শুধু আরাম আর শান্তি আর সুখ। এত আরামে যে ঘুমিয়েছি আজ, কে জানে এর মাঝে হয়তো টুকুনজিলের হাত ছিল, মাথার মাঝে নিখুঁত সুষম কোনো কম্পন তৈরি করে দিয়েছে।
আমার ঘুম ভাঙল মানুষজনের কথার স্বরে। এক জন বলল, নিশ্চয়ই মরে গেছে।
আমাকে দেখেই নিশ্চয়ই বলছে। আমি চোখ খুলে ওঠার চেষ্টা করলাম। তখনো আমার হাত-পা-শরীর বাঁধা, উঠতে পারলাম না।
আরেকজন বলল, মরে নি, মরে নি। এখনো নড়ছে। কিন্তু মরে যাবে।
অনেক বেলা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। চারদিকে বেশ আলো, গাছপালার নিচে আমি শুয়ে আছি। আমি চোখ পিটপিট করে তাকালাম। পাশে স্কুল বিল্ডিং, তার জানালা থেকে কথা বলছে সবাই।
এক জন চেঁচিয়ে বলল, আরে। এটা তো বিলু।
আমি গলার স্বরটা চিনতে পারলাম, তারিক কথা বলছে।
বিলু! বিলু! বিলু! বলে সবাই চেঁচামেটি করে দুপদাপ করে ছুটে আসতে থাকে। আমি টুকুনজিলকে ডাকলাম, টুকুনজিল।
বল ।
আমার বন্ধুদের কি আমি তোমার কথা বলতে পারি?
তোমার ইচ্ছে। কিন্তু--
টুকুনজিলের কথা শেষ হবার আগেই দুপদাপ করে দৌড়ে সবাই হাজির হল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, এখানে কে বিলুকে বেঁধে ফেলে রেখে গেছে? কী সর্বনাশ! বিলু, তুই কেমন আছিস?
আমি বললাম, ভালো আছি আমি। কোনো চিন্তা নেই। আগে হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দে।
সবাই টানাটানি করে আমার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিতে থাকে। সুব্রত বলল, সাবধান। এই জায়গাটা কিন্তু খুব খারাপ। অনেক সাপ আছে এখানে তোর কপাল ভালো তোকে সাপে কামড়ায় নি।
শুনতে পেলাম টুকুনজিল বলল, দুইটা পুরুষ কেউটে, একটা মেয়ে কেউটে, চারটা দাঁড়াস। আমি না করে দিয়েছি-কেউ কাছে আসে নি। পশুপাখির বুদ্ধিবৃত্তি খুব সহজ, নিচু স্তরের। ওদেরকে কিছু বলা খুব সোজা।
টুকুনজিল সোজাসুজি আমার মাথায় কথা বলছে, অন্যেরা তাই কিছু শুনতে পেল না, তাদের কাছে মনে হল একটা ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। পল্টু বলল, তোকে এখানে কে ফেলেছে? দিনের বেলাতেই ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে। আর কত মশা দেখেছিস ?
শুনলাম টুকুনজিল বলল, নয় হাজার সাত শ’ চল্লিশটা মশা ছিল কাল রাতে। কেউ তোমার কাছে আসে নি। চার হাজার পাঁচ শ’ তিরাশিটা পিঁপড়া, এক হাজার এগারোটা মাকড়শা, সাত শ’ তেরোটা চিনে জোঁক, নয় শ উনিশটা গুবরে পোকা—
খুলে দেয়ার পর আমি জায়গাটা চিনতে পারলাম। স্কুলের পিছনে গাছপালা ঢাকা জঙ্গলের মতো জায়গাটা। সাপখোপের ভয়ে কেউ কখনো এখানে আসে না, টুকুনজিল যে কী ভাবে এখানে আমাকে রেখেছে কে জানে!
তারিক বলল, তোকে কে এখানে এনে ফেলে রেখে গেছে?
আমি বললাম, সব বলব তোদের, চল। তোরা আজকে এখানে কী করছিস?
ব্ল্যাক মার্ডারের মিটিং না?
ও, আচ্ছা। আমার উপর দিয়ে কত রকম ঝড় বয়ে গেছে যে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আজকে স্কুলে ব্ল্যাক মার্ডারের গোপন মিটিং, আমার রক্ত-শপথ করে ব্ল্যাক মার্ডারের মেম্বার হওয়ার কথা। আমরা তাড়াতাড়ি হেঁটে চলে আসছিলাম, নান্টু দাঁড়িয়ে বলল, চেয়ারটা দেখেছিস? ইস! কী দারুণ চেয়ার!
হ্যাঁ। একেবারে রকেটের চেয়ার।
আয় চেয়ারটা নিয়ে যাই।
আমি বললাম, এখন চল। পরে নিলেই হবে।
কেউ যদি নিয়ে যায়?
কে নেবে এখান থেকে ? তোর মাথা খারাপ হয়েছে ?
নান্টু তবু খুঁতখুঁত করতে থাকে।
আমরা জঙ্গলের মতো জায়গাটা থেকে বের হয়ে আসি। সবাই এখনো একটা ঘোরের মতো অবস্থায় আছে, একটু পরপর অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। মাহবুব বলল, খালিপায়ে হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছে না তো, বিলু?
আমি হেসে বললাম, আমি সারাজীবন খালিপায়ে হেঁটেছি, আমার কোনো অসুবিধে হয় না
সুব্রত জিজ্ঞেস করল, তোর কি খিদে পেয়েছে? আমার হঠাৎ খিদে চাগিয়ে উঠল। সত্যি খিদে পেয়েছে ভীষণ। বললাম, হ্যাঁ, খুব খিদে পেয়েছে।
তারিক বলল, তুই চিন্তা করিস না, আমরা খাবার নিয়ে আসব তোর জন্যে। সুব্রত বলল, হ্যাঁ, তুই কোনো চিন্তা করিস না। তোকে আমরা এখন থেকে রক্ষা করব। আর কেউ তোকে কিছু করতে পারবে না।
আমার শুনে বড় ভালো লাগল।
ব্ল্যাক মার্ডারের গোপন মিটিং আধা ঘণ্টার জন্য পিছিয়ে দেয়া হল। পল্টু গেল আমার জন্যে কিছু খাবার কিনে আনতে। সে সম্ভবত ব্ল্যাক মার্ডারের ক্যাশিয়ার। মাহবুব গেল তার বাসা থেকে আমার জন্যে এক জোড়া জুতা আনতে। আমি কিছুতেই তাকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না যে আমি খালিপায়ে যতক্ষণ খুশি হাঁটাহাঁটি করতে পারি, আমার কোনো অসুবিধে হয় না। সুব্রত আর তারিক গেল অন্য মেম্বারদের ডেকে আনতে।
আমি এক স্কুলের বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে থাকলাম। গত চব্বিশ ঘন্টায় এত কিছু ঘটেছে যে মনে হচ্ছে অনেক দিন হয়ে গেছে। এই স্কুলে সবসময় এত ছাত্র গমগম করতে থাকে যে এখন কেউ কোথাও নেই দেখে কেমন জানি লাগে। আমি টুকুনজিলকে ডাকলাম কয়েকবার, সাড়া পেলাম না। কোথায় গেছে কে জানে। হয়তো আবার চট করে মঙ্গল গ্রহ থেকে ঘুরে আসতে গেছে। কী বিচিত্র একটা ব্যাপার! কে জানে কখনো আমাকে নিয়ে যেতে পারবে কি না?
নানান কথা ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলাম, হঠাৎ দেখি স্কুলের গেট খুলে লিটন এসে ঢুকল, তার সাথে আরো তিনজন ছেলে। এই তিনজনের একজনকেও আমি চিনি না, লিটনের বন্ধু। আমাকে দেখেই লিটনের মুখে কেমন-একটা হাসি ফুটে উঠল, খারাপ রকমের হাসি, এরকম হাসিকে আমি খুব ভয় পাই। কাছে এগিয়ে এসে তার বন্ধুদের বলল, বলেছিলাম না আজকে পেয়ে যাব?
আমি জোর করে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে রাখলাম। বললাম, আমাকে খুঁজছ তুমি ?
লিটল আমার কথার উত্তর দিল না, বন্ধুদের বলল, একটা দল আছে ওদের, নাম দিয়েছে ব্ল্যাক মার্ডার! হাঃ—ব্ল্যাক মার্ডার! হেসে মরে যাই ; আজকে নাকি মিটিং!
লিটন এবার আমার দিকে ঘুরে তাকাল, জিজ্ঞেস করল, তোর আর সাগরেদরা কই?
ক্লাসের অনেকের সাথে আজকাল আমি তুই তুই করে বলি। ভালো বন্ধু, তাই। লিটনের সাথে বলতে গেলে আমার কথাই হয় না, তার সাথে তুই তুই করে কথা বলার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমাকে তুই তুই করে বলছে বদমাইশি করে। আমি বেশি গা করলাম না, বললাম, এখানে কেউ কারো সাগরেদ না।
লিটন মুখ বাঁকা করে বলল, ভালোই হল, তোকে একা পেলাম।
কেন ?
তোকে একটা জিনিস বলতে এসেছি।
কি জিনিস ?
তুই যে-জঙ্গল থেকে এসেছিস সেই জঙ্গলে ফিরে যা।
কি বলতে চাইছে বুঝতে কোনো অসুবিধে হল না, কিন্তু আমি তবু না বোঝার ভাল করে বললাম, মানে ?
বলছি, তুই তোর নীলাঞ্জনা স্কুলে ফিরে যা।
কেন ?
বলেছি ফিরে যেতে, ফিরে যা, বাজে তর্ক করিস না।
আস্তে আস্তে আমার মেজাজ আবার খারাপ হয়ে গেল, বলব না বলব না করেও বলে ফেললাম, আমি থাকলে ফার্স্ট হতে পারবি না?
মুহূর্তে লিটনের মুখ লাল হয়ে যায়। কিছু বোঝার আগে ধাক্কা মেরে আমাকে ফেলে দিল নিচে। আমি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম, প্রথম দিন স্কুলে আমাকে অসম্ভব মেরেছিল লিটন। আজকেও মারবে?
লিটনের তিনজন বন্ধু এবারে হাতা গুটিয়ে এগিয়ে এল। লিটন একগাল হেসে বলল, এরা আমার কারাটে স্কুলের বন্ধু। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ব্ল্যাক বেল্ট-ব্ল্যাক বেল্ট আর রেড বেল্ট।
মারামারি করবি ?
তুই করবি?
তোরা চারজন আর আমি একা?
কেন, ভয় করে? কাপড়ে পেচ্ছাব হয়ে যাবে?
আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল, বললাম, লিটন, চারজন মিলে এক জনকে মারতে এসেছিস, লজ্জা করে না? বাপের ব্যাটা হলে একা আয়!
একা তো তোকে কিমা বানিয়েছিলাম। আজকে কিমা না, একেবারে কাবাব বানিয়ে ছেড়ে দেব। জন্মের মতো সিধে হয়ে যাবি। এই বলে রাখলাম। স্কুল ছেড়ে যদি না যাস তোর জান শেষ।
আগেরবার লক্ষ্য করেছি, মারপিট করার সময় লিটন হাত ব্যবহার না করে পা ব্যবহার করে, কে জানে কারাটের সেটাই হয়তো নিয়ম। পা দিয়ে দূর থেকে মারা যায়, জোরে মারা যায়— নানারকম সুবিধে। আমি সতর্ক থাকলাম, হঠাৎ করে মারতে দেব না।
লিটনের তিন বন্ধুর এক জন প্রথমে পা চালাল, ঘুরে লাফিয়ে উঠে উল্টো দিকে। আমি সতর্ক ছিলাম, সময়মতো লাফিয়ে সরে গেলাম বলে মারতে পারল না, উল্টো আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মুখে একটা ঘুসি মেরে দিলাম, গায়ের জোরে।
তারপর যেটা হল সেটা বিস্ময়কর। ছেলেটা খুসি খেয়ে ডিগবাজি খেয়ে উল্টে গেল, তারপর শূন্যে উড়ে গেল পাখির পালকের মতো। স্কুলের শিউলি গাছটার উপর দিয়ে উড়ে গেল ছেলেটা, দেয়াল পার হয়ে বাইরে গিয়ে পড়ল আছাড় খেয়ে। এত উপর থেকে যত জোরে পড়ার কথা তত জোরে পড়ল না, পড়ল অনেক আস্তে, না হলে আর বেঁচে থাকতে হত না বাছাধনের।
টুকুনজিল এসে গেছে আমার পাশে! আমার আর ভয় কি? লিটন এবং তার বাকি দু’জন বন্ধুর চোখ একেবারে ছানাবড়া হয়ে গেছে। ফ্যাকাসে মুখে মাছের মতো ঢোক গিলল কয়েকবার, একবার আমার দিকে তাকাল, তারপর শিউলি গাছটার দিকে তাকাল, তারপর তাকাল দেয়ালের ওপাশে যেখানে তাদের বন্ধু উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আমি একগাল হেসে বললাম, এবারে কে আসবি?
আর কেউ কাছে আসার সাহস পাচ্ছে না। কাজেই আমি এগিয়ে গেলাম, লাফিয়ে উঠে নেচে কুদে মাথা ঝাঁকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে ভয়ঙ্কর একটা ভঙ্গি করে লিটনের পেটে একটা ঘুসি হাঁকালাম, সাথে সাথে লিটন উড়ে গেল বাতাসে। হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে লিটন উড়ে যাচ্ছে, দৃশ্যটি বড় মজার, যে না দেখেছে তাকে বোঝানো যাবে না। টুকুনজিল তাকে নিয়ে ফেলল আরও দূরে, মাঠের মাঝখানে। যত উপর দিয়ে গিয়েছে সত্যি সত্যি সেখান থেকে পড়লে শরীরের একটা হাড়ও আস্ত থাকত না, কিন্তু টুকুনজিল মোটামুটি যত্ন করেই তাকে আছাড় দিয়ে ফেলল।
অন্য দুজন অবিশ্বাস ভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি একটা ছোট লাফ দিয়ে হাত-পা ছুড়ে বিকট একটা চিৎকার দিয়ে সামনে লাফিয়ে পড়তেই দু’জন একেবারে চোঁচোঁ দৌড়। কোনো মানুষকে আমি আমার জীবনে এত জোরে দৌড়াতে দেখি নি।
লিটন স্কুলের মাঠ থেকে ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকে প্রাণপণে ছুটতে থাকে। আমি খানিকক্ষণ তার পিছু পিছু ধাওয়া করি, স্কুলের দেয়ালের কাছে পৌঁছে একবার পিছন ফিরে তাকাল, তারপর প্রাণের ভয়ে খামচে খামচে এই ছয়ফুট দেয়ালটা টিকটিকির মতো উঠে গেল। অন্য পাশে কাঁচা নর্দমা, কিন্তু লিটনের তখন এত কিছু ভাবার সময় নেই। সে চিৎকার করে লাফিয়ে পড়ল সেখানে। ঝপাং করে একটা শব্দ হল, পড়ে ডুবে গেল কি না দেখতে পারলাম না।
স্কুলের বারান্দায় বসে হাসতে হাসতে আমার পেটে খিল ধরে যায়। শুনলাম টুকুনজিলও হাসছে হা হা হা, হি হি হি।
আমি বললাম, এখন তুমি ঠিক জায়গায় হাসছ টুকুনজিল। এটা আসলেই অনেক হাসির ব্যাপার!
(চলবে)
