দ্বিতীয় পর্ব

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে

#রুহান_রুহান - মুহম্মদ জাফর ইকবাল





হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি নিয়ে ছেলেটি দরদর করে ঘামছে। রুহানের দিকে শূন্য

দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমি কখনো অস্ত্র ব্যবহার করি নি।

রুহান ছেলেটির কাঁধ স্পর্শ করে বলল, আমরা কেউই করি নি! তাতে কিছু আসে যায় না।

ছেলেটি ভাঙ্গা গলায় বলল, আমাকে মেরে ফেলবে।

সম্ভবত। রুহান নরম গলায় বলল, আপাতত সেটা নিয়ে চিন্তা কর না।

আমি কী করব?

তুম এখন দৌড়ে ঐ দিকে দেয়ালের পিছনে যাবে।

কিন্তু–

রুহান বলল, এর মধ্যে কোনো কিন্তু নেই। এখন ভয় পেলে হবে না। যাও।

আমি কী গুলি করতে করতে যাব?

গুলি করতে করতে দ্রুত ছুটতে পারবে না। কোনো কিছুর আড়ালে থেকে ঐ গ্রুজান জানোয়ারটার দিকে এক পশলা গুলি কর, সে তখন নিজেকে বাঁচানোর জন্যে আড়ালে সরে যাবে। জানোয়ারটা আড়াল থেকে আবার বের হবার আগে ছুটে কোনো একটা কিছুর আড়ালে চলে যাবে। আবার বের হবার আগে আবার এক পশলা গুলি করবে।

ছেলেটি ফ্যাকাসে মুখে বলল, তোমার কী ধারণা তাহলে আমি যেতে পারব?

রুহান হাসার চেষ্টা করে। বলল, হ্যাঁ পারবে অবশ্যই পারবে। যাও।

ছেলেটা চোখ বন্ধ করে একবার সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে তারপর অস্ত্র হাতে এগিয়ে যায়।

দেয়ালের আড়াল থেকে অস্ত্রটা বের করে ছেলেটা ছাড়া ছাড়াভাবে কয়েকটা গুলি করল। জান সম্ভবত এর জন্যে প্রস্তুত ছিল না, তার গলায় কুৎসিত একটা গালি শোনা গেল। ছেলেটা দৌড়ে একটা পাথরের আড়ালে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে একটা বড় গাছের আড়ালে। আবার এক পশলা গুলি করে ছুটে আরেকটা পাথরের আড়ালে চলে গেল। জান সম্ভবত এরকম কিছু আশা করে নি, সে কুৎসিত ভাষায় গালাগাল করতে থাকে এবং তার মধ্যে ছেলেটা অন্যপাশে দেয়ালের আড়ালে চলে গেল।

রুহান মাথা ঘুরিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যদের বলল, দেখেছ?

অন্যেরা মাথা নাড়ল। রুহান বলল, এটাই হবে আমাদের টেকনিক। যাও পরেরজন। খুব সাবধান।

পরেরজনও ছাড়া ছাড়াভাবে গুলি করতে করতে এক পাথর থেকে অন্য পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে অন্য পাশে চলে গেল। তৃতীয়জন রওনা দেবার। আগে রুহানের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমি পারব না।

কেন পারবে না? দেখছ না দুজন চলে গেছে।

ছেলেটি শূন্য দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার ভয় করে।

আমাদের সবার ভয় করে। কিন্তু সে জন্যে বসে থাকলে তো হবে না। যাও।

না। আমি পারব না।

তুমি পারবে। যাও।

ছেলেটা তবুও দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে। তখন সামরিক পোশাক পরা একজন এসে ছেলেটাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। ছেলেটা হত বিহ্বলের মতো ফাঁকা জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে যে ছুটে যেতে হবে সেটাও যেন ভুলে গেছে।

রুহান চিৎকার করে বলল, দৌড়াও! দৌড়াও–

ছেলেটা রুহানের দিকে তাকাল, দেখে মনে হলো সে কী বলছে সেটা বুঝতে পারছে না। ঠিক তখন একটা গুলির শব্দ শোনা গেল এবং সাথে সাথে ছেলেটির শরীরটি মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে লাফিয়ে উঠে ধপ করে নিচে পড়ে গেল। রুহান তার চোখটি সরিয়ে নিতে চেষ্টা করল কিন্তু সরাতে পারল না, বিস্ফারিত চোখে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটির মুখে যন্ত্রণার। কোনো চিহ্ন নেই, সেখানে এক ধরনের বিস্ময়।

রুহান নিঃশব্দে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু মানুষের চিৎকার এবং হইচইয়ের শব্দ শোনা যায়। ছেলেটির দেহটি সরিয়ে নিচ্ছে, এক্ষুনি কাটাকাটি করে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সরিয়ে নেবে, তারপর সেগুলো প্যাকেটে সংরক্ষণ করে। চড়া দামে বিক্রি করা হবে।

রুহানের হাতে কে যেন একটা অস্ত্র ধরিয়ে দিয়েছে, রুহান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। ভাবলেশহীন মুখে একজন মানুষ তাকে স্পর্শ করে বলল, এখন তুমি।

আমি?

হ্যাঁ। যাও।

রুহান সামনের খোলা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে দেখল সেখানে বড় বড় কয়েকটা পাথর। গাছ-গাছালি, ছোট একটা খাল এবং ঝোপঝাড়। তার ভেতর দিয়ে তাকে ছুটে যেতে হবে। সে যখন ছুটে যাবে তখন গ্রুজান তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে তাক করে থাকবে তাকে গুলি করে মেরে ফেলার জন্যে। এটা যেন একটা খেলা। যাদের নিয়ে এই খেলাটি খেলা হচ্ছে তারা যেন মানুষ নয়, তারা যেন খেলার গুটি।

ভাবলেশহীন চেহারার মানুষটি রুহানকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, যাও।

রুহান স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি হাতে দেয়ালের আড়াল থেকে বের হয়ে এলো। একটা পাথর থেকে অন্য পাথরের আড়ালে ছুটে না গিয়ে সে সোজা গ্রুজানের দিকে হেঁটে যেতে থাকে।

পেছন থেকে কে যেন চিৎকার করে ওঠে, এই ছেলে তুমি কোথায় যাচ্ছ?

রুহান সেই কথায় কান দিল না।

গ্রুজান স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অবাক হয়ে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো কিছু একটা বলবে কিন্তু কিছু বলল না। রুহান তার কাছাকাছি গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল। জানের মুখে একটা বিচিত্র হাসি ফুটে ওঠে, খসখসে গলায় বলল, তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

রুহান কোনো কথা না বলে স্থির চোখে জানের দিকে তাকিয়ে রইল। গ্রুজান মুখ বিকৃত করে বলল, নর্দমার পোকা! তুমি যখন ছুটে যাবে তখন তোমাকে আমি পাখির মতো গুলি করে মারতে পারি। সামনাসামনি মারার আমার কোনো ইচ্ছে নেই। যাও। ভাগো–পালাও।

রুহান এবারেও কোনো কথা না বলে স্থির দৃষ্টিতে জানের দিকে তাকিয়ে রইল। গ্রুজান ধমক দিয়ে বলল, আহাম্মকের বাচ্চা! কী হলো তোমার?

কিছু হয় নি।

তাহলে?

রুহান ফিসফিস করে বলল, তোমার আর আমার মধ্যে কে বেঁচে থাকবে সেটা নির্ভর করছে–কে আগে তার অস্ত্রটি তুলতে পারে।

গ্রুজান হতচকিতের মতো রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তু-তু-তুমি?

হ্যাঁ।

আহাম্মকের বাচ্চা! তুমি ভাবছ তুমি আমাকে গুলি করবে?

আমি কিছু ভাবছি না। আমি তোমার দিকে তাকিয়ে আছি। যেই মুহূর্তে তুমি অস্ত্রটা তোলার চেষ্টা করবে, আমি তখন তোমাকে গুলি করব।

জান হতবাক হয়ে রুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তু-তুমি?

হ্যাঁ। আমি প্রস্তুত।

গ্রুজান রুহানের চোখের দিকে তাকাল। গ্রুজানের চোখে প্রথমে ছিল তাচ্ছিল্য, রুহানের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেই দৃষ্টিতে প্রথম বিস্ময় তারপর খুব ধীরে ধীরে বিস্ময়কর এক ধরনের আতঙ্ক এসে ভর করে। রুহান দেখতে পায় গ্রুজানের সমস্ত শরীর ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে আসছে, দেখতে পায় তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছে। গ্রুজান প্রথমে বড় বড় কয়েকটা নিঃশ্বাস নিল তারপর ঠিক যেই মুহূর্তে অস্ত্রটি তোলার চেষ্টা করে রুহান সাথে সাথে তাকে গুলি করল।

রুজানের দেহটি গড়িয়ে তার পায়ের কাছে এসে পড়ল। রুহান স্থির দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। চারপাশে মানুষের চিকার, হইচই, চেচামেচি এবং পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রুহান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে, কিছুতেই তার কিছু আসে যায় না। সে কখনোই ভাবে নি যে সে কখনো কোনো মানুষকে খুন করবে, কিন্তু কী আশ্চর্য সে সত্যি সত্যি একটা মানুষকে খুন করেছে। সত্যিই কী যাকে খুন করেছে সে মানুষ?

মধ্যবয়স্ক মানুষটি চতুর্থবারের মতো রুহানকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কেমন করে জানকে হত্যা করেছ?

রুহান চতুর্থবারের মতো উত্তর দিল, আমি জানি না।

মধ্যবয়স্ক মানুষটির পাশে বসে থাকা লাল চুলের মহিলাটি বলল, তুমি জান না বললে তো হবে না। সবাই দেখেছে তুমি তাকে গুলি করে মেরেছ।

রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমি আসলে হত্যা, খুন এসব কখনো দেখি নি। যখন দেখলাম ছেলেটাকে গ্রুজান মেরে ফেলল–

না না না। লাল চুলের মহিলাটি মাথা নেড়ে বলল, তুমি কেন মেরেছ সেটা জিজ্ঞেস করি নি। জিজ্ঞেস করেছি কেমন করে মেরেছ।

রুহান একটু অবাক হয়ে বলল, আমাকে যে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা দিয়েছিল —

আমরা সেটা জানি! লাল চুলের মহিলাটি একটু অধৈর্য হয়ে বলল, আমরা জানতে চাইছি গ্রুজানের মতো এত বড় একজন যোদ্ধাকে তুমি কেমন করে হত্যা করলে?

রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমি জানি না।

মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, তুমি অস্ত্র ব্যবহার করা কোথায় শিখেছ?

আমি কোথাও শিখি নি। এটা ছিল আমার প্রথম অস্ত্র ব্যবহার।

মধ্যবয়স্ক মানুষটি মাথা নেড়ে বলল, অসম্ভব!

না। অসম্ভব না। রুহান মাথা নেড়ে বলল, সত্যিই আমি এর আগে কখনো অস্ত্র হাতে নেই নি।

রুহানের সামনে বসে থাকা চারজন মানুষ কেমন যেন হতচকিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এতক্ষণ চুপ করে বসে থাকা দুজন নিজেদের ভেতরে নিচু গলায় একটু কথা বলল। তারপর রুহানের দিকে তাকাল, একজন বলল, তোমাকে অভিনন্দন ছেলে।

রুহান অবাক হয়ে বলল, অভিনন্দন?

হ্যাঁ।

আমি তোমাদের একজনকে মেরে ফেলেছি সে জন্যে তোমরা আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছ?

হ্যাঁ। তুমি যেভাবে গ্রুজানকে মেরেছ তার তুলনা নেই। মানুষটি জিব দিয়ে পরিতৃপ্ত ভঙ্গির একটা শব্দ করে বলল, তোমার মতো এরকম তড়িৎগতির মানুষ আমরা আগে কখনো দেখি নাই।

রুহান এখনো মানুষটির কথা বিশ্বাস করতে পারছিল না, ইতস্তত করে বলল, কিন্তু তোমাদের জান?

মানুষটি হাত নেড়ে পুরো বিষয়টি উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে বলল, আরে ধেৎ, তোমার জান! এক গ্রুজান গিয়েছে তো আরেক গ্রুজান আসবে। সত্যি কথা বলতে কী গ্রুজান তো আর পুরোপুরি ক্ষতি হয় নি তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি *রে দিয়েছি। কিন্তু তোমাকে তো আমরা পেয়েছি।

আমাকে?

হ্যাঁ। আমরা একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান। মানুষ ধরে এনে তাকে বিক্রি করি। কখনো কেটেকুটে কখনো মগজে ইলেকট্রড বসিয়ে কখনো সৈনিক হিসেবে এবং যদি খুব কপাল ভালো হয় তখন আমরা তোমার মতো একজন পাই, যাকে আমরা খেলোয়াড় হিসেবে বিক্রি করতে পারি।

রুহান অবাক হয়ে বলল, খেলোয়াড়? কীসের খেলোয়াড়?

লাল চুলের মহিলাটি বলল, এক সময় পৃথিবীতে কত হাজার রকম বিনোদন ছিল! এখন কিছু নেই। এখন একমাত্র বিনোদন হচ্ছে এই খেলা—

কীসের খেলা?

একজন আরেকজনকে গুলি করার খেলা।

রুহান হতবাক হয়ে সামনে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। সে এখনো পরিষ্কার করে বুঝতে পারছে না তারা কী নিয়ে কথা বলছে। মধ্যবয়স্ক মানুষটি মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, আমরা তোমাকে একেবারে প্রথম শ্রেণীর ট্রেনিং দিব। তোমাকে সব ধরনের অস্ত্র চালানো শেখাব তারপর তোমাকে লক্ষ ইউনিটে বিক্রি করব।।

লাল চুলের মহিলাটি মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, তোমার উপর বাজি ধরা হবে।

বাজি?

হ্যাঁ। আমরা আশা করছি দেখতে দেখতে তোমার রেটিং উপরে উঠে যাবে। আমাদের নাম তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে।

রুহান খানিকটা বিস্ময় নিয়ে তার সামনে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, এখানে তোমাকে ট্রেনিং দেয়া যাবে না। ট্রেনিংয়ের জন্যে তোমাকে আমাদের কেন্দ্রীয় অফিসে পাঠাতে হবে।

সেটা কোথায়?

লাল চুলের মহিলাটি বলল, এখান থেকে শ খানেক কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ের উপর। চমত্তার জায়গা।

মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, হ্যাঁ চমৎকার জায়গা, পাহাড়ের উপর চমৎকার একটি হৃদ। সেই হৃদের পাশে অফিস।

সেখানে আজেবাজে মানুষের ভিড় নেই।

খাওয়া খুব ভালো। সব খাঁটি প্রাকৃতিক খাবার। মধ্যবয়স্ক মানুষটি জিব দিয়ে তার ঠোঁট চেটে বলল, তুমি যদি চাও তোমাকে সঙ্গিনী দেয়া হবে। চমৎকার সব মেয়ে আছে হেড অফিসে।

রুহান কোনো কথা না বলে মানুষগুলোর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। লাল চুলের মহিলাটি বলল, তোমার কী কোনো প্রশ্ন আছে ছেলে?

আমার নাম রুহান।

ও, আচ্ছা। হ্যাঁ। রুহান–তোমার কী কোনো প্রশ্ন আছে রুহান?

হ্যাঁ। আমার একটা প্রশ্ন আছে।

কী প্রশ্ন?

আমি যদি তোমাদের প্রস্তাবে রাজি না হই? আমি যদি মানুষকে গুলি করে মারার এই খেলা খেলতে না চাই?

সামনে বসে থাকা মানুষগুলো একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখে একটু কৌতুকের হাসি ফুটে ওঠে এবং সে হঠাৎ শব্দ করে হেসে ওঠে।

রুহান বলল, কী হলো? তুমি হাসছ কেন?

মানুষটি হাসি থামিয়ে বলল, তোমার কথা শুনে। তোমার আগে কেউ কখনো এই প্রশ্ন করে নি।

ঠিক আছে। কিন্তু আমি এই প্রশ্ন করছি।

ঠিক আছে ছেলে–

আমার নাম রুহান।

ঠিক আছে রুহান, আমি তোমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিই। মধ্যবয়স্ক মানুষটা আবার জিব দিয়ে তার ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিয়ে বলল, পৃথিবীটা এখন আগের মতো নেই রুহান। মানুষ এখন নিজের ইচ্ছে মতো কিছু করতে পারে না। এখন মানুষ হয় আদেশ দেয় না হয় আদেশ শোনে। তোমার এখন আদেশ শোনার কথা। তুমি যদি আমাদের আদেশ না শোনো তাহলে তোমাকে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই।

লাল চুলের মহিলাটি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, তোমাকে এখন আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু তোমার মস্তিষ্কটা আমরা ব্যবহার করতে পারব না, কিংবা তোমার হৃৎপিণ্ডটা কারো কাছে বিক্রি করতে পারব না সে কথাটা তো কেউ বলে দেয় নি। বুঝেছ?

রুহান একটু মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি।

চমৎকার! মধ্যবয়স্ক মানুষটা বলল, তুমি তাহলে প্রস্তুত হয়ে যাও। তোমাকে আমরা এখনই আমাদের কেন্দ্রীয় অফিসে পাঠাব।

সামনে বসে থাকা চারজন মানুষ উঠে দাঁড়ায় এবং রুহান হঠাৎ নিজের ভেতরে এক ধরনের ক্লান্তি অনুভব করে। গভীর এক ধরনের ক্লান্তি।

রুহান তার ঘরের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। সামনে বিশাল একটি হদ, সেইদকে ঘিরে গাঢ় সবুজ রঙের বনভূমি। দূরে পর্বতমালা, ধীরে ধীরে তার রং হালকা হয়ে মিলিয়ে গেছে। অপূর্ব এই প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে রুহান বুভুক্ষের মতো তাকিয়ে থাকে। স্বচ্ছ কোয়ার্টজের জানলাটি তাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সে আসলে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী। বাইরের এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য কোয়ার্টজের জানলা দিয়ে দেখতে পাবে কিন্তু কখনোই তার অংশ হতে পারবে না। স্বচ্ছ কোয়ার্টজের জানলা দিয়ে তাকে এই প্রকৃতি থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে।

রুহান একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল এবং ঠিক তখন তার ঘরের ভেতর খুট করে একটা শব্দ হলো। রুহান মাথা ঘুরিয়ে তাকায় এবং দেখতে পায় তার ঘরের দরজা খুলে একজন কমবয়সী মেয়ে ভেতরে ঢুকছে। তার মুখটি শীর্ণ এবং চোখের নিচে কালি। মেয়েটির চুল উষ্কখুষ্ক এবং চোখ দুটি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, প্রায় অপ্রকৃতস্থ মানুষের মতো। রুহান একটু অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শীর্ণ মেয়েটি কোনো কথা না বলে জ্বলজ্বলে চোখে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল।

রুহান একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, তুমি কি আমার কাছে এসেছ?

মেয়েটি রুহানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ফিসফিস করে বলল, ওমেগা ফাংশনের তৃতীয় সংখ্যাটি কত জান?

মেয়েটি কী বলছে রুহান তার কিছুই বুঝতে পারল না, মাথা নেড়ে বলল, না জানি না।

আমার ধারণা কমপ্লেক্স তলে তার কোনো রুট নেই। তোমার কী ধারণা?

আমি বলতে পারব না।

নেই। নিশ্চয় নেই। ওমেগা ফাংশনের সহগের উপর সেটা নির্ভর করার কথা। শীর্ণ মেয়েটি বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে বলতে ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে যেতে শুরু করে এবং তখন রুহান হঠাৎ করে শিউরে ওঠে। মেয়েটার মাথার পেছন থেকে একটা ধাতব ইলেকট্রড বের হয়ে আসছে। তার মস্তিষ্কের ভেতর সেটা প্রবেশ করানো রয়েছে।

শীর্ণ মেয়েটি দুই হাত পাশে ঝুলিয়ে একটি বিচিত্র ভঙ্গিতে করিডোর ধরে হটতে শুরু করে। রুহান মেয়েটিকে ডাকবে কী না বুঝতে পারে না। তার পিছু পিছু হেঁটে হেঁটে সে একটা হলঘরে হাজির হলো। সেখানে আরো বেশ কয়েকজন মানুষ বিক্ষিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এক নজর দেখেই রুহান বুঝতে পারে তাদের সবার মস্তিষ্কে ইলেকট্রড প্রবেশ করিয়ে রাখা আছে। তাদের দৃষ্টি হয় অস্বাভাবিক উজ্জ্বল না হয় উদভ্রান্তের মতো। তারা সবাই বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলছে। দুই-একজনের একটি হাত হঠাৎ হঠাৎ নড়ে উঠছে, মনে হয় সেটার উপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পুরো দৃশ্যটি এত অস্বাভাবিক যে রুহান স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

হলঘরের এক কোনা থেকে হঠাৎ একজন তার কাছে এগিয়ে আসে, ব্যস্ত গলায় বলল, এনেছ? এনেছ তুমি?

তার কী আনার কথা সে জানে না, সেটা নিয়ে সে কোনো প্রশ্ন না তুলে বলল, না আনি নি।

না আনলে কেমন করে হবে? উপাদানগুলোর পরিমাপ সমান হতে হবে। বিস্ফোরকের ক্ষমতা নির্ভর করে তার উপাদানগুলোর উপর। অক্সিজেন সমৃদ্ধ উপাদান। তুমি যদি না আনো- মানুষটি নিজের মনে কথা বলতে বলতে অন্যদিকে সরে গেল।

রুহান খুব সাবধানে তার বুকের ভেতর থেকে একটা নিঃশ্বাস বের করে দেয়। আর একটু হলে সম্ভবত তারও এখানে এভাবে থাকতে হতো। বুদ্ধিমত্তা। পরীক্ষা করার সময় সে যদি প্রশ্নগুলোর উত্তর ইচ্ছে করে ভুল করে না দিত তাহলে কী তার মস্তিষ্কেও এভাবে ইলেকট্রড বসিয়ে দিত না?

কে যেন তার কাঁধে হালকাভাবে স্পর্শ করে। রুহান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, একজন বয়স্ক মানুষ, চুল ধবধবে সাদা, মুখে বয়সের বলিরেখা। মানুষটি নরম গলায় বলল, তুমি কে? তোমার মাথায় তো ইলেকট্রড নেই, তুমি এখানে কী করছ?

রুহান বলল, আমার নাম রুহান। আমি জানি না আমি এখানে কী করছি।

বয়স্ক মানুষটি হেসে বলল, আমরা আসলে কেউই জানি না আমরা কী করছি। আমাদের জন্মাটাই একটা বড় রহস্য।

রুহান কথাটি সহজ অর্থেই বলেছিল, বৃদ্ধ মানুষটি অনেক ব্যাপক অর্থে দার্শনিকভাবে গ্রহণ করেছে।

বৃদ্ধ মানুষটি তার হাত বাড়িয়ে বলল, আমার নাম কিহি। আমি সক্রেটিসদের দেখাশোনা করি।

রুহান ভুরু কুঁচকে বলল, কাদের দেখাশোনা করো?

কিহি হাত দিয়ে মস্তিষ্কে ইলেকট্রড বসানো চারপাশের অপ্রকৃতস্থ মানুষগুলোকে দেখিয়ে বলল, এই যে এই ছেলে-মেয়েগুলোকে। এদেরকে এখানে সক্রেটিস বলে।

এরাই তাহলে সেই সক্রেটিস! আমি এদের কথা শুনেছি।

হ্যাঁ। একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর রসিকতা। সক্রেটিস খুব জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। এই ছেলে-মেয়েগুলোর মস্তিষ্কে যখন এই ইলেকট্রড দিয়ে ইম্পালস দেয়া হয় তখন এরাও কিছুক্ষণের জন্যে জ্ঞানী হয়ে যায়। সে জন্যে এদেরকে বলে সক্রেটিস।

এদের সবাইকে দেখে মনে হয় এরা অপ্রকৃতস্থ।

হ্যাঁ। এরা অপ্রকৃতস্থ। যখন মস্তিষ্কে ইম্পালস দেয়া হয় তখন এরা কিছুক্ষণের জন্যে স্বাভাবিক হয়। তখন তারা কোনো কোনো বিষয়ে অনেক বড় বিশেষজ্ঞ হয়ে যায়। তারা তখন অনেক বড় বড় সমস্যা সমাধান করতে পারে।

কিন্তু এমনিতে এরা অপ্রকৃতস্থ।

হ্যাঁ, এমনিতে এরা অপ্রকৃতস্থ।

রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এটি একটি অত্যন্ত বড় ধরনের নিষ্ঠুরতা।

হ্যাঁ। এটি অত্যন্ত বড় একটি নিষ্ঠুরতা।

রুহান কিহির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি যদি জান এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা তাহলে তুমি কেন এ ধরনের কাজ করো? কেন ছেড়েছুড়ে চলে যাও না?

কিহি একটু হাসার চেষ্টা করল কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো না। নিচু গলায় বলল, পারলে চলে যেতাম। নিশ্চয় চলে যেতাম। কিন্তু পারছি না।

কেন পারছ না?

যারা আমাকে ধরে এনেছে তারা কী কখনো আমাকে যেতে দেবে?

রুহান ভালো করে কিহির দিকে তাকাল, সে বুঝতে পারে নি এই বৃদ্ধ মানুষটাও তাদের মতো একজন ধরে আনা বন্দী মানুষ। রুহান থতমত খেয়ে বলল, আমি দুঃখিত কিহি। আমি বুঝতে পারি নি। আমি ভেবেছিলাম এখানে বুঝি শুধু কমবয়সী তরুণদের ধরে আনে। আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি ওদের একজন।

কিহি মাথা নেড়ে বলল, না। আমি ওদের একজন নই। হাত দিয়ে চারপাশের অপ্রকৃতস্থ ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখিয়ে বলল, আমি এদের একজন। এই দুর্ভাগা ছেলে-মেয়েগুলোর দেখাশোনা করি। এদের মতো অসহায় পৃথিবীতে আর একজনও নেই। যতদিন এখানে থাকে আমি তাদের খানিকটা মমতা দিই, ভালোবাসা দিই। অপ্রকৃতস্থ হলেও তারা ভালোবাসা বুঝে। এখন কী মনে হয় জান?

কী?

আমাকে যদি এখন ছেড়েও দেয়। আমি সম্ভবত ওদের ছেড়ে চলে যেতে পারব না।

রুহান কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কিহি অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ অপ্রকৃতস্থ ছেলে-মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে আবার মাথা ঘুরিয়ে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, এখানে যারা আসে তাদের সবার মাথাতেই ইলেকট্রড বসানো থাকে। তুমি অন্যরকম, এখানে তোমাকে কেন এনেছে?

রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমার মাথায় ইলেকট্রড নেই–মনে হয় সরাসরি বুলেট বসাবে!

কেন? এরকম কথা কেন বলছ?

আমি একজন খেলোয়াড়।

বৃদ্ধ কিহি কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল, খেলোয়াড়? মানুষকে গুলি করার যে খেলা সেই খেলার খেলোয়াড়?

হ্যাঁ। আমাকে ট্রেনিং দেবার জন্যে এনেছে।

কিহি কিছুক্ষণ রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর নিচু গলায় বলল, আমি জানি না কে বেশি দুর্ভাগা। তুমি নাকি এই সক্রেটিসের সন্তানেরা।

ঠিক এরকম সময় হলঘরের এক কোনায় দুজন উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটি শুরু করে দেয়, অন্যেরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। কিহি এগিয়ে যায়, শান্ত গলায় বলে, কী হলো? তোমরা দুজন আবার কী নিয়ে ঝগড়া শুরু করলে?

যে দুজন চেচামেচি করছিল তারা প্রায় সাথে সাথে কিহির দিকে তাকিয়ে অপরাধীর মতো একটু হাসার চেষ্টা করে চুপ করে গেল। কিহি ঠিকই বলেছে। এই মানুষগুলো অপ্রকৃতস্থ কিন্তু তারপরেও তারা কিহির মমতাটুকু অনুভব করতে পারে।

রুহান বলল, এরা তোমাকে খুব ভালোবাসে।

হ্যাঁ। কিহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, মাথায় যখন ইলেকট্রড বসায় তখন মস্তিষ্কের কোথায় কী ক্ষতি হয় কে জানে কিন্তু এরা একেবারে শিশুর মতো হয়ে যায়।

ঠিক তখন কোথায় জানি ঘটাং করে একটা শব্দ হলো এবং ঘরঘর শব্দ করে কাছাকাছি একটা দেয়াল সরে যেতে শুরু করল। ঘরের ভেতরে অপ্রকৃতস্থ মানুষগুলোর মধ্যে হঠাৎ কেমন যেন একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সবাই হুঁটোপুটি করে বড় হলঘরটার এক কোনে গিয়ে একজন আরেকজনকে ধরে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকে। দরজার খোলা অংশটা দিয়ে চারজন মানুষ এসে ঢুকল। তাদের গায়ে নীল রঙের জাম্পস্যুট। ছোট করে ছাটা চুলের একজন মহিলার হাতে একটা ছোট ব্যাগ, সেখান থেকে কিছু যন্ত্রপাতি উঁকি দিচ্ছে। একজন মধ্যবয়স্ক ছোটখাটো মানুষ অন্য দুজন বিশাল দেহী।

মধ্যবয়স্ক মানুষটি কিহির দিকে তাকিয়ে বলল, কী খবর বুড়ো। তোমার জ্ঞানী শিশুরা কেমন আছে?

কিহি কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মানুষটা হাসি হাসি মুখে বলল, আমাদের দেখে ইঁদুরের ছানার মতো এক কোনায় কেমন জড়ো হয়েছে দেখেছ?

কিহি এবারেও কোনো কথা বলল না।

যন্ত্রপাতির ব্যাগ হাতে ছোট করে ছাটা চুলের মেয়েটি বলল, স্টিমুলেশন দেবার পর এরাই আবার কেমন গুছিয়ে কথা বলতে থাকে! দেখে বিশ্বাস হয় না।

কিহি জিজ্ঞেস করল, কাউকে নেবে?

হ্যাঁ।

কাকে?

মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ তার ক্রিস্টাল রিডারটা দেখে বলল, ক্রানাকে।

দূরে জড়াজড়ি করে থাকা ছেলে-মেয়েগুলোর মধ্যে একটা মেয়ে হঠাৎ আতঙ্কের একটা শব্দ করে নিজের মুখ-ঢেকে আকুল হয়ে কাঁদতে শুরু করে। রুহান চিনতে পারল, কিছুক্ষণ আগে এই মেয়েটিই তার ঘরে ঢুকে গিয়েছিল।

মেয়েটির আকুল হয়ে কান্না শুনে নীল জাম্পস্যুট পরা মানুষগুলো এক ধরনের কৌতুক অনুভব করে। তারা নিজেরা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে হাসতে শুরু করে।

রুহান বলল, এর ভেতরে তোমরা হাসার মতো কী খুঁজে পেলে।

রুহানের কথা শুনে মানুষগুলো কেমন যেন অবাক হয়ে তার দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। মধ্যবয়স্ক মানুষটা অবাক হয়ে বলল, তুমি কে?

রুহান বলল, আমি এখানে নিজ থেকে আসি নি। তোমরা আমাকে ধরে এনেছ। তোমরা বলো আমি কে?

মানুষটার মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। থমথমে গলায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন ছোট করে চুল ছাটা মহিলাটি বলল, এর নাম রুহান। রুহান আমাদের নতুন খেলোয়াড়।

খে-খেলোয়াড়? মধ্যবয়স্ক মানুষটার পাথরের মতো কঠিন মুখটা দেখতে দেখতে কেমন জানি নরম হয়ে যায়। মুখে একধরনের বিস্ময়ের ভাব ফুটে ওঠে, বিগলিত ভঙ্গিতে বলে, তুমি খেলোয়াড়?

রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমি সেটা শুনেছি। এখনো জানি না।

তোমাকে আমাদের সবার পক্ষ থেকে অভিনন্দন। আমাদের এই ট্রেনিং সেন্টার তোমাকে নিশ্চয়ই একেবারে প্রথম শ্রেণীর একটা খেলোয়াড় বানিয়ে দেবে।

মানুষটির কথার সাথে সাথে অন্যেরাও কেমন জানি বিগলিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে থাকে।

রুহান বলল, তোমরা এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর দাও নি। কোন প্রশ্ন?

রুহান নিচু গলায় বলল, তোমাদের দেখে ও তোমাদের কথা শুনে মেয়েটি ভয় পেয়ে কাঁদছে। এর মধ্যে কোন অংশটুকু হাসির?

মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখে অপমানের একটা সূক্ষ্ম ছাপ পড়ল। সে হাত দিয়ে পুরো ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার ভান করে বলল, তুমি সেটা এখন বুঝবে না। এখানে কিছুদিন থাক তাহলে নিজেই বুঝতে পারবে।

রুহান মাথা নেড়ে বলল, মনে হয় না।

মধ্যবয়স্ক মানুষটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে-মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, এখানে ক্রানা কে?।

আকুল হয়ে কাঁদতে থাকা মেয়েটা আরো জোরে ড়ুকরে কেঁদে উঠল। মানুষটা বলল, তুমি?

মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল।

এসো তাহলে। চলে এসো।

মেয়েটা মাথা নাড়ল, সে আসবে না।

না এলে চলবে না। মধ্যবয়স্ক মানুষটার কণ্ঠস্বর কঠোর হয়ে ওঠে, এসো।

মেয়েটা মাথা নেড়ে বলল, না।

মানুষটা এবার পিছনে তাকাল, বিশাল দেহী দুজন মানুষ এবারে এগিয়ে যায়। ক্রানা নামের মেয়েটিকে দুইজন দুই পাশ থেকে ধরে ফেলে তারপর প্রায় শূন্যে তুলে সরিয়ে নিয়ে আসে। ক্রানা হাত পা ছুড়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে কিন্তু সেই কান্নায় মানুষগুলো এতটুকু বিচলিত হয় না।

মধ্যবয়স্ক মানুষটা কিহির দিকে তাকিয়ে বলল, বুড়ো তুমি আস আমাদের সাথে।

কিহি কোনো কথা না বলে মাথা নাড়ল। রুহান জিজ্ঞেস করল, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে মেয়েটিকে?

সিস্টেম লোড করার জন্যে। ছোট করে চুল ছাটা মহিলাটা বলল, ক্রিভন থেকে একটা অর্ডার এসেছে। ক্রিভন অনেক বড় যুদ্ধবাজ মানুষ। সে একটা যুদ্ধের এক্সপার্ট কিনতে চায়।

রুহান অবাক হয়ে বলল, এই বাচ্চা মেয়েটা যুদ্ধে এক্সপার্ট?

মহিলাটি হেসে বলল, আমরা যখন সিস্টেম ললাড করে দেব সে এক্সপার্ট হয়ে যাবে। এমনিতে কেউ বুঝবে না কিন্তু যখন স্টিমুলেশন দেবে তখন। বুঝবে।

কেমন করে স্টিমুলেশন দেয়?

মাথার পিছনে ইলেকট্রড লাগানো আছে সেখানে হাই ফ্ৰিকয়েন্সী পালস পাঠাতে হয়।

রুহানের শরীর কেমন যেন গুলিয়ে আসে, সে এক ধরনের অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তার বিশ্বাস হতে চায় না একজন মানুষকে অন্য একজন মানুষ এভাবে ব্যবহার করতে পারে।

মহিলাটি রুহানের বিস্ময়টি ধরতে পারল না, বেশ সহজ গলায় বলল, তুমি দেখতে চাও আমরা কেমন করে সিস্টেম লোড করি?

রুহানের একবার মনে হলো বলে না, সে দেখতে চায় না। কিন্তু কী হলো কে জানে, সে বলল, হ্যাঁ দেখতে চাই।

তাহলে এসো আমাদের সাথে।

পাহাড়ের মতো দুজন মানুষ ক্রানা নামের মেয়েটাকে প্রায় টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, তার পিছু পিছু অন্যেরা হাঁটতে থাকে। রুহান সবার পিছনে পিছনে হেঁটে আসে। সে নিজের ভেতরে কেমন জানি গভীর এক ধরনের বিষণ্ণতা অনুভব করে।

মাঝারি আকারের একটা ঘরের ঠিক মাঝখানে উঁচু একটা শক্ত টেবিলে ক্রানাকে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হলো। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কিছু মনিটর লাগানো হয়েছে। ঘরের এক কোনায় বড় একটা যন্ত্রপাতির প্যানেল সেখানে ছোট করে চুল ছাটা মহিলাটি যন্ত্রপাতিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যবয়স্ক মানুষটি। বিশালদেহী মানুষ দুজন দরজার কাছে দুটি টুলে চুপচাপ বসে আছে, তাদের মুখ ভাবলেশহীন, দেখে মনে হয় তাদের চারপাশে কী ঘটছে সেটা তারা জানে না।

কিহি ক্রানার হাত ধরে রেখে ফিসফিস করে তার সাথে কথা বলছে, তাকে শান্তনা দিচ্ছে সাহস দিচ্ছে। ক্রানার চোখের দৃষ্টি অপ্রকৃতস্থ, এক ধরনের শূন্য দৃষ্টিতে সে উপরের দিকে তাকিয় আছে।

রুহান কিছুক্ষণ ক্ৰানার দিকে তাকিয়ে রইল, দৃশ্যটি তার কাছে অত্যন্ত নিষ্ঠুর বলে মনে হলো, সে হেঁটে ঘরের এক কোনায় বসানো যন্ত্রপাতিগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ছোট করে চুল ছাটা মহিলাটি দক্ষ হাতে বিভিন্ন যন্ত্রপাতিগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, বিজ্ঞান অনেকদূর এগিয়েছিল। আমাদের কপাল খারাপ–পৃথিবীতে এরকম দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে গেল তা না হলে বিজ্ঞান নিশ্চয়ই আরো এগোত।

মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, উঁহু। প্রকৃতি বাড়াবাড়ি সহ্য করো না। মানুষ বিজ্ঞান নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিল তাই প্রকৃতি এটা বন্ধ করে দিয়েছে।

রুহান একটু অবাক হয়ে মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখের দিকে তাকাল, সে কী সত্যিই এটা বিশ্বাস করে?

মহিলাটি কয়েকটা সুইচ অন করে বলল, আমাদের এই যন্ত্রটা আছে বলে সক্রেটিসদের মাথায় সিস্টেম লোড করতে পারছি। ওদের বিক্রি করে কিছু ইউনিট কামাই করছি। যাদের নেই তারা কী করবে?

মধ্যবয়স্ক মানুষটা বলল, তারা আঙুল চুষবে। তারপর হা হা করে হাসতে লাগল যেন খুব বড় একটা রসিকতা করে ফেলেছে।

মহিলাটি মাথা তুলে চারদিকে তাকিয়ে বলল, সবাই রেডি? আমি তাহলে কাজ শুরু করি?

রুহান জিজ্ঞেস করল, এখন কী করবে?

মহিলাটি প্যানেলের একটা স্বচ্ছ খুপরিতে উজ্জ্বল একটা ক্রিস্টাল দেখিয়ে বলল, এই যে এই ক্রিস্টালটাতে পুরো সিস্টেম আছে। আমি ক্রানার ইলেকট্রডের ভিতর দিয়ে এটা মাথার ভেতরে পাঠাব।

তখন কী হবে?

মাথায় নতুন সিনান্স কানেকশন হবে-দরকার হলে তার পুরানো কানেকশন খুলে নেবে।

তাহলে কী হয়?

বলতে পার এই মেয়েটা একটা নতুন মানুষ হয়ে যাবে–আসলে ঠিক মানুষ না। একটা নতুন যন্ত্র।

রুহান বুকের ভেতর নিঃশ্বাস আটকে রেখে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে রইল। কী অবলীলায় কী ভয়ঙ্কর একটা কথা বলে দিল।

মহিলাটি একটা সুইচ টিপে দিতেই ঘরের মাঝখানে টেবিলে বেঁধে রাখা ক্ৰানার দেহটা ধনুকের মতো বেঁকে যায়, সে রক্ত শীতল করা কণ্ঠস্বরে আর্তনাদ করে ওঠে।

রুহান ক্রানার কাছে ছুটে গিয়ে বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় তার শরীর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে, চোখ দুটো মনে হচ্ছে কোঠর থেকে ঠেলে বের হয়ে আসবে।

রুহান আর্তস্বরে চিৎকার করে বলল, বন্ধ করো। বন্ধ করো এক্ষুনি!

ছোট করে ছাটা চুলের মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, বন্ধ করব? কী বন্ধ করব?

যেটা করছ সেটা। দেখছ না মেয়েটা যন্ত্রণায় কী করছে?

মহিলাটি মধ্যবয়স্ক মানুষটির দিকে একবার তাকাল তারপর খানিকটা হতাশার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, যন্ত্রণা ছাড়া মানুষ সিস্টেম লোড করবে কেমন করে? তোমাকে বলেছি না সিনান্স কানেকশান উপড়ে ফেলা হচ্ছে

কতক্ষণ থাকবে এরকম?

এই তো কিছুক্ষণ। ধৈর্য ধরো দেখবে ঠিক হয়ে যাবে।

রুহান আবার ক্রানার কাছে ফিরে গেল, কিহি তার দুই হাত শক্ত করে ধরে তার সাথে নিচু গলায় কথা বলছে, ক্রানা, সোনামণি আমার। একটু ধৈর্য ধরো, একটুখানি সহ্য করো, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। এই যে দেখ আমি তোমার পাশে আছি, তোমার দিকে তাকিয়ে আছি, তোমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছি। এই দেখ আমি ঈশ্বরের কাছে তোমার জন্যে প্রার্থনা করছি–যেন তোমার সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। ক্রানা সোনামণি আমার

রুহান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল এবং দেখতে পেল খুব ধীরে ধীরে ক্রানার শরীর দুমড়ে মুচড়ে উঠতে উঠতে এক সময় শান্ত হয়ে আসে। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সে মুখ হা করে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে চোখ খুলে তাকাল। কিহি ক্ৰানার মুখের কাছাকাছি নিজের মুখটি নিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, এখন তোমার কেমন লাগছে ক্ৰানা।

ক্রানা শান্ত দৃষ্টিতে কিহির দিকে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলল, আমার ভালো খারাপ কিছুই লাগছে না। সত্যি কথা বলতে কী আমার কোনোরকম অস্তিত্ব আছে বলেই মনে হচ্ছে না।

রুহান একটু অবাক হয়ে ক্ৰানার দিকে তাকাল, মেয়েটি খানিকক্ষণ আগেই পুরোপুরি অপ্রকৃতস্থ ছিল অথচ এখন একেবারে স্বাভাবিক মানুষের মতো কথা বলছে। কিহি কানার হাত স্পর্শ করে বলল, তুমি আমাকে চিনতে পারছ ক্ৰানা।

হ্যাঁ। অবশ্যই চিনতে পারছি। তুমি হচ্ছ কিহি। আমাদের সবার প্রিয় কিহি। তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি কে? তাকে দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে।

এ হচ্ছে রুহান।

ক্ৰানা ফিসফিস করে বলল, রুহান রুহান!

ঘরের কোনায় যন্ত্রপাতির প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট করে ছাটা চুলের মেয়েটি গলা উঁচিয়ে ডাকল, বুড়ো।

কিহি মনে হয় এই অবহেলার ডাকটিতে অভ্যস্ত, বেশ সহজভাবেই বলল, বলো।

তুমি কিছুক্ষণ মেয়েটার সাথে কথা বলতে পারবে? যেন সে সজাগ থাকে?

পারব।

চমৎকার! আমরা তার অবচেতন মনে কাজ করছি।

ঠিক আছে। বলে কিহি আবার ক্রানার উপর ঝুঁকে পড়ল। বলল, তোমার সব কথা মনে আছে কানা?

ক্ৰানা মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। মনে আছে।

তুমি এখন আমাকে চিনতে পারছ ক্ৰানা?

হ্যাঁ। চিনতে পারছি। তুমি কিহি। আমাদের সবার খুব প্রিয় একজন মানুষ তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে রুহান।

তুমি কী আমার সব কথা বিশ্বাস করবে ক্ৰানা?

করব। নিশ্চয়ই করব।

তাহলে শোন। আমাদের মনে যে দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ-বেদনা হয় সেগুলো হচ্ছে মস্তিষ্কের ভেতরের বিশেষ এক ধরনের পরিস্থিতি।

ক্ৰানা নামের মেয়েটার মুখে খুব সূক্ষ্ম এক ধরনের হাসি ফুটে ওঠে, সে বলে, আমি জানি। আমার মস্তিষ্কে এখন এরা কিছু একটা করছে এখন আমি সবকিছু বুঝতে পারি।

কিহি গলা নামিয়ে বলল, হ্যাঁ। এরা তোমার মস্তিষ্কে এক ধরনের স্টিমুলেশন দিচ্ছে। যখন স্টিমুলেশন বন্ধ করে দেবে তখন তুমি আবার আগের মতো হয়ে যাবে। স্টিমুলেশন থাকতে থাকতে আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই যেটা তুমি সবসময় মনে রাখবে।

কী কথা কিহি? আমরা সবাই তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমরা তোমার সব কথা মনে রাখব।

কিহি কানার হাত ধরে নরম গলায় বলল, দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ-বেদনাযন্ত্রণা-সুখ সবকিছুই যদি মস্তিষ্কের বিশেষ একটা অবস্থা হয়ে থাকে তাহলে কেন আমরা সেটা নিয়ন্ত্রণ করব না? কেন আমরা আমাদের মস্তিষ্কের পরিস্থিতিকে সবসময় আনন্দ কিংবা সুখের পরিস্থিতি করে রাখব না? তাহলে যখন দুঃখ-কষ্ট আর যন্ত্রণা আসবে সেটাও আমাদের কষ্ট দিতে পারবে না!

ক্ৰানা ফিসফিস করে বলল, সেটা আমরা কেমন করে করব?

কিহি ক্ৰানার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বলল, তুমি মনে করে নাও পৃথিবীতে কোনো অশুভ কিছু নেই। মনে করো সবাই ভালো। মনে মনে কল্পনা করো পৃথিবীটা খুব সুন্দর একটা জায়গা। এখানে শুধু আনন্দ আর সুখ। ক্রানা তুমি মনে মনে কল্পনা করো যে তুমি খুব খু-উব সুখী একজন মানুষ। তারপর তুমি মনের ভেতরে সেই সুখটা ধরে রাখ। পারবে না?

ক্ৰানা ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ সেভাবে থাকে। তার মুখে এক ধরনের অপার্থিব হাসি ফুটে ওঠে, দেখে মনে হতে থাকে তার ভেতরে এক ধরনের অলৌকিক শান্তি এসে ভর করেছে। চোখ দুটো বন্ধ করে সে ফিসফিস করে বলল, হ্যাঁ কিহি। আমি পারছি। আমার ভেতরে এক ধরনের গভীর শান্তি এসেছে। আমার মনে হচ্ছে আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিতে পারব। কারো বিরুদ্ধে আমার আর কোনো ক্ষোভ নেই কিহি। আমার ভেতরে আর কোনো আক্রোশ নেই।

ক্রানার হাতে অল্প চাপ দিয়ে কিহি বলল, চমৎকার! এটা তোমার ভেতর ধরে রাখতে পারবে না?

ক্রানা বলল, আমি জানি না। এখন তো আমার মস্তিষ্কের ভেতর স্টিমুলেশন দিচ্ছে তাই কাজটা খুব সহজ। যখন স্টিমুলেশন থাকবে না তখন কী হবে আমি জানি না।

নিজের উপর বিশ্বাস রাখ ক্ৰানা, তুমি পারবে। তোমার কাজটা আরো সহজ করে দিচ্ছি। কিহি তার ডান হাতটা জানার চোখের সামনে ধরে বলল, এই দেখ আমার হাতে একটা ক্রস আঁকা আছে। যখন তুমি মনে মনে সুখ আর আনন্দ আর গভীর এক ধরনের শান্তি অনুভব করছ তখন তুমি এই ক্রসটির দিকে তাকিয়ে থাক। তোমার মস্তিষ্কে তাহলে এর স্মৃতি রয়ে যাবে। ভবিষ্যতে। যখনই তুমি এই ধরনের একটি ক্রস চিহ্ন দেখবে সাথে সাথে তোমার এই গভীর আনন্দ, সুখ আর শান্তির কথা মনে হবে।

কিন্তু আমি কোথায় দেখব এই ক্রস?

দেখবে। অনেক জায়গায় দেখবে। দুটো গাছের ডাল একটার উপর দিয়ে আরেকটা যাবার সময় ক্রস চিহ্ন তৈরি করে। মানুষ কিছু একটা মনে রাখার জন্যে ক্রস চিহ্ন আঁকে। তোমার দুই হাত যখন তোমার কোলের উপর রাখ একটা হাত অন্য হাতের উপর ক্রস তৈরি করে। মানুষ পায়ের উপর পা রেখে বসে। সেটাও ক্রস। তোমার চারপাশে ক্রস, ক্ৰানা। কাজেই তুমি ভুলবে না। কিছুতেই ভুলবে না।

ঠিক আছে।

তুমি তাহলে আমার হাতের চিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাক। বুকের ভেতর গভীর আনন্দ, সুখ আর শান্তি অনুভব করতে করতে তাকিয়ে থাক। প্রিয় ক্রানা আমার, সোনামণি, তোমার জন্যে আমাদের সবার গভীর ভালোবাসা। গভীর গভীর ভালোবাসা। .

রুহান এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে কিহি এবং ক্রানার দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখে মনে হতে থাকে সে বুঝি কোনো একটি অলৌকিক জাদুমন্ত্রের প্রক্রিয়া দেখছে। কী গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে কিহি তার প্রত্যেকটা কথা উচ্চারণ করছে। আর কী সহজেই ক্ৰানা তার প্রত্যেকটা শব্দ বিশ্বাস করছে। ক্রানার মুখে গভীর এক ধরনের প্রশান্তির চিহ্ন, দেখে মনে হয় পৃথিবীর কোনো নীচতা, হীনতা কোন ষড়যন্ত্র, কোনো অন্যায়, কোনো অবিচার তাকে বুঝি আর কোনোদিন স্পর্শ করতে পারবে না।

খুব ধীরে ধীরে একসময় ক্ৰানার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। গভীর এক ধরনের ঘুমে সে অচেতন হয়ে পড়ে।

ঘরের এক কোনায় প্যানেলের সামনে বসে থাকা ছোট করে ছাটা চুলের মহিলাটি মুখে এক ধরনের সন্তুষ্টির শব্দ করে বলল, চমৎকার! আরো একটা সক্রেটিস রেডি।

মধ্যবয়স্ক মানুষটা বলল, কোনো ঝামেলা ছাড়া শেষ হলো।

মহিলাটি বলল, হ্যাঁ, এর জন্যে আমাদের বুড়োকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত। সে কত কী আজগুবি কথা বলে আর আমাদের বেকুব সক্রেটিসরা তার সব কথা বিশ্বাস করে বসে থাকে।

কিহি বলল, এগুলো আজগুবি কথা না। আমি যেটা বলি সেটা বিশ্বাস করেই বলি। এটা এক ধরনের সম্মোহন।

ঠিক আছে, ঠিক আছে। মহিলাটি হাত দিয়ে পুরো ব্যাপারটি উড়িয়ে দিয়ে বলল, আমাদের সক্রেটিসরা যদি শান্তিতে থাকে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। স্টিমুলেশন দেয়ার সময় ঠিক ঠিক তথ্যগুলো দিতে পারলেই হলো।

পাহাড়ের মতো বড় বড় মানুষগুলো এবার উঠে আসে। ক্রানার অবচেতন দেহটা একটা স্ট্রেচারে শুইয়ে দিয়ে তারা ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল, কিহি ঘুমন্ত ক্রানার মুখমণ্ডল আলতোভাবে স্পর্শ করে ফিসফিস করে বলল, বিদায় ক্ৰানা। সোনামণি আমার।

ক্রানাকে নিয়ে বের হয়ে যাবার পর বৃদ্ধ কিহিকে কেমন যেন অসহায় দেখায়। দেখে মনে হয় কেউ বুঝি তার ভেতর থেকে কিছু একটা উপড়ে নিয়ে চলে গেছে।

রুহান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর বিষণ্ণতাটুকু আরো গভীরভাবে চেপে বসেছে।

এই অস্ত্রটার নাম মেগাট্রন। কমবয়সী মানুষটা ভারী অস্ত্রটা হাত বদল করে বলল, কে এর নাম মেগাট্রন রেখেছে জানি না, কিন্তু খুব স্বার্থক নামকরণ। এটি আসলেই একটা মেগা অস্ত্র। প্রতি সেকেন্ডে দশটা গুলি করতে পারে, লেজার লক অটোমেটিক। অত্যন্ত চমৎকার অস্ত্র–শুধু একটা সমস্যা। অস্ত্রটা ভারী। সব মানুষ সহজে এটা নাড়াচাড়া করতে পারে না।

রুহান এক দৃষ্টে কমবয়সী মানুষটার দিকে তাকিয়ে থেকে কথাগুলো শুনছে, কিন্তু ঠিক মনোযোগ দিতে পারছে না। তার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে একজন অস্ত্র বিশেষজ্ঞ তাকে অস্ত্রের উপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

অস্ত্র বিশেষজ্ঞ মানুষটি বিশাল মেগাট্রনটি টেবিলের উপর রেখে তুলনামূলকভাবে ছোট একটা অস্ত্র হাতে নিয়ে বলল, এটার নাম ক্রিকি। ক্রিকি প্রায় মেগাট্রনের মতোই তবে এর গুলির ভর একটু কম। অস্ত্রটা ক্রোমিয়াম এলয় দিয়ে তৈরি, তাই এর ওজন হালকা। অপরাধজগতে খুব জনপ্রিয়। গত খেলায় খেলোয়াড়দের কেউ কেউ এটা ব্যবহার করেছে। মানুষটা অস্ত্রটা টেবিলে রেখে এবারে তৃতীয় একটা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। কুচকুচে কালো এবং হালকা, গুলির লম্বা ম্যাগাজিন বাঁকা হয়ে বের হয়েছে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞ মানুষটা মুখে সন্তুষ্টির একটা শব্দ করে বলল, তবে এটা হচ্ছে খেলোয়াড়দের সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র। ব্ল্যাক মার্কেটে এর দাম এখন তেতাল্লিশ হাজার ইউনিট। এত হালকা যে হাতে নিলে মনে হয় বুঝি খেলনা, কিন্তু এটা খেলনা নয়, এটা একেবারে খাঁটি অস্ত্র। প্রতি সেকেন্ডে গুলি করে পাঁচটা—তবে সেই পাঁচটার ট্রাজেক্টরী নিখুঁত। খেলোয়াড়রা তো যুদ্ধ করে না যে তাদের প্রতি সেকেন্ডে দশটা গুলি দরকার—খেলোয়াড়রা হিসেব করে গুলি করে। এর আগের টুর্নামেন্টের শেষ খেলায় মাত্র একটা গুলি খরচ হয়েছিল। বিশ্বাস হয়?

রুহান এক ধরনের ক্লান্তি নিয়ে মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকে। পৃথিবীতে এত ধরনের অস্ত্র আছে কে জানত। শুধুমাত্র মানুষকে হত্যা করার জন্যে মানুষেরাই এই অস্ত্রগুলো আবিষ্কার করেছে রুহানের সেটা বিশ্বাস হতে চায় না।

কম বয়সী অস্ত্র বিশেষজ্ঞ রুহানের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কোনটা নিতে চাও?

রুহান বলল, আমি কোনোটাই নিতে চাই না।

রুহান খুব একটা মজার কথা বলেছে এরকম ভান করে কম বয়সী অস্ত্র বিশেষজ্ঞ হা হা করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, একজন খেলোয়াড় খালি হাতে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে দৃশ্যটা কল্পনা করতেও কষ্ট।

খেলোয়াড়ের হাতে অস্ত্র থাকতেই হবে?

হ্যাঁ। খেলাটি হচ্ছে তোমার প্রতিপক্ষকে হত্যা করা। তুমি যদি হত্যাই করতে না পার তাহলে কে তোমার খেলা দেখবে?

রুহান বিষণ্ণ দৃষ্টিতে অস্ত্রগুলোর দিকে তাকায়। একটা একটা করে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, নেড়েচেড়ে দেখে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে তার অঙ্গভঙ্গি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে।

শেষ পর্যন্ত রুহানকে তার শরীরের কাঠামোর সাথে মিলে যায় এরকম কয়েকটা অস্ত্র বেছে দেয়া হলো। একজন খেলোয়াড় যতগুলি খুশি অস্ত্র নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যেহেতু পুরো খেলাটিই হচ্ছে এক ধরনের ক্ষীপ্রতার খেলা তাই কেউ বেশি অস্ত্র নিয়ে যায় না, দুটি কিংবা খুব বেশি হলে তিনটি ভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে যায়। অস্ত্রগুলো কোমর থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হয় কিংবা উরুতে

বেঁধে নেয়া হয়। কেউ কেউ একটা পিঠে ঝুলিয়ে রাখতে পছন্দ করে। গুলির বাড়তি ম্যাগাজিনগুলো বেল্টের মতো করে বুকে কিংবা পায়ের সাথে বেঁধে নেয়া হয়। প্রথম দিন রুহানকে তার অস্ত্রগুলোর সাথে পরিচিত করানো হলো। দূরে টার্গেট তাকে দিয়ে লক্ষ্যভেদ করানো হলো। যে মানুষ জীবনে কখনো অস্ত্র হাতে স্পর্শ করে নি সেই হিসেবে তার নিশানা অসাধারণ। রুহানের ভেতরে এক ধরনের সহজাত ক্ষীপ্রতা আছে যেটা সচরাচর মানুষের ভেতর চোখে পড়ে না। রুহান নিজেও সেটা জানত না।

সারাদিন প্রশিক্ষণ নিয়ে রুহান সন্ধ্যেবেলা পরিশ্রান্ত ঘর্মাক্ত আর ক্লান্ত হয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলো। কিছুক্ষণ নিজের বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে তারপর বাথরুমে টগবগে গরম পানিতে রগড়ে রগড়ে গোছল করে বের হয়ে আসে। টেবিলে তার খাবার ঢাকা দেয়া ছিল, রুহান ঢাকনা খুলে খেতে বসে। ফলের রস, যবের রুটি, ভেড়ার মাংসের স্টু, গরম স্যুপ আর কাচা সবজি। বহুদিন সে একরম খাবার খাওয়া দূরে থাকুক চোখেই দেখে নি। খেতে বসে তার হঠাৎ করে মায়ের কথা মনে পড়ল, তার ছোট দুটি বোনের কথা মনে পড়ল। খাবার টেবিলে শুকনো রুটি আর পাতলা পানির মতো স্যুপ খেতে গিয়ে ছোট বোন দুটি কী আপত্তিই না করত। ক্ষুধার্ত রুহানের হঠাৎ করে খিদেটা যেন উবে যায়। সে দীর্ঘসময় খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর খানিকটা রুটি আর এক বাটি স্যুপ খেয়ে উঠে যায়।

রুহান তার নিজের ঘর থেকে বের হয়ে হলঘরের দিকে এগিয়ে যায়, তার খুব সৌভাগ্য যে তাকে ছোট একটা ঘরের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখে নি। তাকে তার ঘর থেকে বের হতে দিয়েছে অন্যদের সাথে মেলামেশা করতে দিয়েছে। মাথায় ইলেকট্রড বসানো ছেলে-মেয়েগুলোর সাথে কথাবার্তা বলার খুব একটা সুযোগ নেই, কিন্তু বৃদ্ধ কিহি খুব চমৎকার একজন সঙ্গী। রুহান বড় হলঘরে গিয়ে কিহিকে খুঁজে বের করল। সে একটা নরম চেয়ারে গা ড়ুবিয়ে বসে। আছে, চোখের দৃষ্টি বহুদূরে। রুহানকে দেখে কিহি সোজা হয়ে বসে বলল, কী খবর রুহান। খেলোয়াড় হবার প্রথম দিনটি তোমার কেমন গেছে?

রুহান কিহির পাশে বসে বলল, আমি ঠিক যেরকম ভেবেছিলাম, সেরকম।

তুমি কী রকম ভেবেছিলে?

অর্থহীন শারীরিক ব্যাপার। সহজাত ব্যাপার। রুহান একটু থেমে কিহির কে তাকিয়ে বলল, তুমি বলতে পারবে কিহি, পৃথিবীটা এরকম কেন হয়ে গেল? পৃথিবীর মানুষ কী এর চাইতে ভালো একটা পৃথিবী পেতে পারে না?

অবশ্যই পারে। কিহি রুহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, এবং তুমি নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ পৃথিবীর মানুষ সেই পৃথিবী পাবে।

কখন পাবে? কীভাবে পাবে?

সেটা আমি জানি না। কিহি মাথা নেড়ে বলল, আমি ইতিহাস ঘেটে ..দখেছি মানুষের সভ্যতা মাঝে মাঝেই এরকম অন্ধ কানাগলিতে ঘুরপাক খায় 1•• শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে বের হয়ে আসে।

কীভাবে বের হয়ে আসে?

কিহি দুর্বলভাবে হেসে বলল, সেটাও আমি জানি না। মানুষের একেবারে ভেতরে মনে হয় মনুষ্যত্ব বলে একটা জিনিস থাকে। যত দুঃসময়ই হোক সেই মনুষত্ব বুকের ভিতরে ধিকিধিকি করে জ্বলতে থাকে। যখন সবকিছু অন্ধকারে ঢেকে যায় তখন সেই মনুষ্যত্বের ছোট আগুনটা হঠাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে।

রুহান কিহির দিকে তাকিয়ে রইল। এই বৃদ্ধ মানুষটি কথা বলে খুব সুন্দর করে। তার কথা রুহানের খুব বিশ্বাস করার ইচ্ছে করে, কিন্তু সে যেটা বলছে সেটা কী আসলেই সত্যি?

রুহান কিহির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বলছ এক সময় আবার মানুষের সভ্যতা মাথা তুলে দাঁড়াবে?

হ্যাঁ। মাথা তুলে দাঁড়াবে।

রুহান নিজেকে দেখিয়ে বলল, এই যে, আমাকে দেখ।

কিহি হাসিমুখে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, দেখছি।

তোমার কী মনে হয় আমি একজন রক্তপিপাসু খুনি?

না। মোটেও মনে হয় না রুহান। তোমাকে দেখে মনে হয় তুমি একজন খুব হৃদয়বান তরুণ।

কিন্তু আমাকে কেমন করে মানুষ খুন করতে হয় তার ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। কত দ্রুত কতগুলো অস্ত্র দিয়ে আমি কতগুলো মানুষকে খুন করতে পারি সেটাই হবে আমার কাজ। আর আমি যদি সেটা না করি, তাহলে কী হবে জান?

কিহি বিষণ্ণ মুখে মাথা নেড়ে বলল, জানি।

তাহলে আমাকে অন্যেরা মেরে ফেলবে। এখন তুমিই বল কিহি, আমি কী বেঁচে থাকব না মরে যাব?।

কিহি তার হাত দিয়ে রুহানের হাত স্পর্শ করে বলল, তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে রুহান। মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।

একজন খুনির কী মানুষের মর্যাদা আছে?

কিহি মাথা নেড়ে বলল, না। নেই।

তাহলে?

কিহি বিষণ্ণ মুখে মাথা নেড়ে বলল, আমি তোমার এই প্রশ্নের উত্তর জানি রুহান।

রুহান আর কিহি দুজন চুপচাপ বসে থাকে। সামনে অপ্রকৃতস্থ তরুণ তরুণীরা তাদের শিশুর মতো ভঙ্গিতে নিজেদের সাথে কথা বলছে, তর্ক করছে, কেউ কেউ ঝগড়া করছে। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তাদের দেখতে দেখতে রুহান একসময় বলল, কিহি, তুমি বিশ্বাস করো একসময় মানুষ আবার তাদের সভ্যতা ফিরে পাবে।

হ্যাঁ। আমি বিশ্বাস করি।

সভ্যতার জন্যে দরকার জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণা।

হ্যাঁ।

রুহান তার গলায় ঝোলানো ক্রিস্টাল রিডারটা দেখিয়ে বলল, তার জন্যে দরকার আমাদের ক্রিস্টাল রিডার। যেটা আমার জন্যে তথ্য বাঁচিয়ে রাখবে, তথ্য দেয়া-নেয়া করবে।

হ্যাঁ। কিহি আবার মাথা নাড়ল।

কিন্তু আমি শুনেছি গত পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীতে একটা ক্রিস্টাল রিডার তৈরি হয়নি। তাহলে আমরা নতুন কিছু শিখব কেমন করে?

কিহির মুখে সূক্ষ্ম এক ধরনের হাসি ফুটে ওঠে। সে রুহানের হাতটা নিজের কাছে টেনে এনে যেখানে কিছু বিদঘুটে চিহ্ন এঁকে দেয়া হয়েছে সেটা দেখিয়ে বলল, এটা কী তুমি জান?

না। এটা কী?

এখানে একটা সংখ্যা লেখা আছে।

রুহান অবাক হয়ে বলল, সংখ্যা লেখা আছে?

হ্যাঁ। আমি যদি ভুল না করে থাকি তাহলে সংখ্যাটি হচ্ছে ছয় শূন্য তিন তিন নয় চার দুই।

রুহান অবাক হয়ে বলল, তুমি এটা কেমন করে বললে?

আমি এটা পড়েছি। যখন ক্রিস্টাল রিডার ছিল না তখন মানুষ লিখত এবং সেই লেখা পড়ত। প্রত্যেক কথা লেখা হতো বর্ণমালা দিয়ে। ক্রিস্টাল রিডার আসার পর ভাষার এই লিখিত রূপটা উঠে গেছে। এখন আমরা সরাসরি ক্রিস্টাল রিডারে বলি, ক্রিস্টাল রিডার থেকে শুনি। সেটাতে সবকিছু বাঁচিয়ে রাখি।

রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, আমি বর্ণমালার কথা শুনেছি। আমাদের গ্রামে একজন বুড়ো মানুষ ছিল, কুরু। সে আমাকে বলেছিল।

কিহি বলল, যদি সত্যি সত্যি ক্রিস্টাল রিডার পৃথিবী থেকে উঠে যায় তাহলে আমাদের এক ধাপ পিছিয়ে যেতে হবে। আমাদের আবার বর্ণমালা শিখতে হবে। আমাদের আবার পড়তে শিখতে হবে, লিখতে শিখতে হবে।

রুহান কিহির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি লিখতে পড়তে জানো?

হ্যাঁ। আমি একটু একটু শিখেছি। আমি বুড়ো মানুষ, আমার অনেক অবসর। আমি আমার অবসরে এ ধরনের অর্থহীন কাজ করি।

রুহান হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বলল, তুমি আমাকে লিখতে পড়তে শেখাবে কিহি।

কেন শেখাব না! অবশ্যই শেখাব। বর্ণমালাগুলো তোমার ক্রিস্টাল রিডারে ঢুকিয়ে নাও, দেখবে দেখতে দেখতে শিখে যাবে।

আমি কোথায় বর্ণমালাগুলো পাব?

আমার কাছে আছে। আমি তোমাকে দেব।

ধন্যবাদ কিহি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

কিহি তার আরামদায়ক চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, পৃথিবীর পুরো জ্ঞানভাণ্ডারই এরকম বর্ণমালা দিয়ে লেখা আছে।

রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, আমিও এটা শুনেছি।

আরো প্রাচীন কালে সেগুলো রাখা হতো কাগজে লিখে, সেগুলোর নাম ছিল বই।

বই?

হ্যাঁ। এখনো পৃথিবীর অনেক জায়গায় বড় বড় লাইব্রেরীতে বই সাজানো আছে। কেউ আর সেগুলো পড়তে পারে না। কিন্তু তবু সাজিয়ে রাখা আছে। কিহি হঠাৎ ঘুরে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কখনো বই দেখেছ?

না।

আমার কাছে একটা বই আছে। তুমি দেখতে চাও?

হ্যাঁ। দেখতে চাই। রুহান উত্তেজিত হয়ে বলল, দেখাবে আমাকে?

কিহি হেসে বলল, কেন দেখাব না? অবশ্যই দেখাব। এসো আমার সাথে।

রুহান কিহির পিছনে পিছনে লম্বা করিডোর ধরে হেঁটে তার ছোট ঘরটিতে হাজির হলো। একটা শক্ত বিছানার পাশে একটা টেবিল, সেখানে কিছু দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র। সেখান থেকে চতুষ্কোণ একটা জিনিস হাতে তুলে নিয়ে কিহি রুহানের হাতে দিল। রুহান সেটা হাতে নিয়ে খুলে, ভেতরে সারি সারি সাদা পৃষ্ঠা, সেই পৃষ্ঠাগুলোতে বিচিত্র নক্সার মতো চিহ্ন সাজানো। এগুলো নিশ্চয়ই বর্ণমালা দিয়ে লেখা। রুহান কিছুক্ষণ বিস্ময় নিয়ে বইটির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর সেটি কিহির হাতে দিয়ে বলল, তুমি এটা পড়তে পারবে?

কিহি হেসে বলল, হ্যাঁ। পারব।

আমাকে একটু পড়ে শোনাও না।

কিহি বইটি তার চোখের সামনে খুলে ধরে বলল, এটা একটা কবিতার বই। কোনো একজন প্রাচীন কবির লেখা কবিতা। এই যে দেখ, এখানে লেখা–

ধান কাটা হয়ে গেছে কবে যেন খেতে মাঠে পড়ে আছে খড়

পাতা কুটো ভাঙা ডিম–সাপের খোলস নীড় শীত

এইসব উত্রায়ে ওইখানে মাঠের ভিতর

ঘুমাতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ–কেমন নিবিড়।

রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কী সুন্দর কথাগুলো।

কিহি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। কথাগুলো খুব সুন্দর। যখন শুরু করেই দিয়েছি, তাহলে তোমাকে বর্ণমালার কয়েকটা অক্ষর দেখিয়ে দিই।

রুহান বলল, হ্যাঁ, দেখাও। সে বইয়ের একটা পৃষ্ঠা খুলে তার উপর ঝুঁকে পড়ল।

সারাটি দিন রুহানকে অস্ত্রের ব্যবহার আর শারীরিক দক্ষতার উপর ট্রেনিং দেয়া হয়। ক্লান্ত ঘর্মাক্ত হয়ে ফিরে এসে সে গোসল করে খেয়ে বর্ণমালাগুলো নিয়ে বসে। দেখতে দেখতে সে পড়তে শিখে গেল। তার এখনো বিশ্বাস হয় না পৃথিবীর সব মানুষ একসময় পড়তে পারত। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যে ক্রিস্টাল রিডারে অভ্যস্ত বলে তার কাছে বর্ণমালা ব্যবহার করে পড়ার এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে মনে হচ্ছে আদিম একটা পদ্ধতি। কিন্তু সত্যি সত্যি যদি পৃথিবী থেকে একদিন ক্রিস্টাল রিডার উঠে যায় তখন তো জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ধরে রাখার জন্যে এই বর্ণমালার কাছেই ফিরে আসতে হবে। প্রথম প্রথম পড়তে এবং পড়ে কিছু একটা বুঝতে তার যেরকম কষ্ট হতো এখন আর সেটা হয় না। কিহির কাছ থেকে যে কবিতার বইটি এনেছে সেটা সে পড়তে পারে, পড়ে বুঝতে পারে শুধু যে বুঝতে পারে তা নয়, অনুভবও করতে পারে।

দেখতে দেখতে রুহানের জীবনটি মোটামুটি একটা ছকের ভেতর চলে। এলো। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠার পরই তাকে বেশ কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করতে হয়। তারপর তাকে কিছু একটা খেতে হয়–স্বাস্থ্যকর এবং বলকারক খাবার। তারপর তাকে কিছুক্ষণ খেলোয়াড়দের নানা ধরনের খেলার ভিডিও দেখতে হয়, সেটা তার জন্যে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। কোন খেলোয়াড়ের কী বিশেষত্ব সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে বোঝানো হয়। কে কোন খেলায় কেন জিতেছে সেটা ব্যাখ্যা করা হয়। দেখতে দেখতে রুহান এক ধরনের ক্লান্তি অনুভব করে। তার মাঝে মাঝে মনে হয় সে যদি একজন খেলোয়াড় না হয়ে একজন সক্রেটিস হয়ে যেত তাহলেই কী ভালো হতো? মানুষকে কত সহজে কত দ্রুত খুন করা যায় এই বিদ্যাটা তাহলে অন্তত তাকে নিশ্চয়ই হয়তো শিখতে হতো না।

খানিকক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর রুহানকে অস্ত্র হাতে ট্রেনিং শুরু করতে হয়। শরীরের নানা জায়গায় অস্ত্রগুলো বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। সেগুলো তাকে চোখের পলকে টেনে বের করে গুলি করতে হয়। নানা ধরনের টার্গেট থাকে সেখানে লক্ষ্যভেদ করতে হয়। রুহান নিজেই বুঝতে পারে, সে সাধারণ একজন মানুষ থেকে দেখতে দেখতে বিচিত্র বোধশক্তিহীন একজন পেশাদার হত্যাকারীতে পাল্টে যাচ্ছে। মানুষকে কত দ্রুত কোথায় আঘাত করতে হবে সেটি বুঝি তার থেকে ভালো করে আর কেউ জানে না। সে কী এটাই চেয়েছিল?

রুহান বুঝতে পারছিল পাহাড়ের কাছাকাছি এই ট্রেনিং সেন্টার থেকে তার বিদায় নেবার সময় চলে আসছে। একজন মানুষকে যতটুকু শেখানো সম্ভব মোটামুটি সবই তাকে শেখানো হয়েছে। এখন তাকে কোনো একটি সত্যিকার খেলায় নামিয়ে দিতে হবে। যেখানে সে মুখোমুখি দাঁড়াবে একজন সত্যিকার মানুষের সামনে, যে মানুষটি হবে ঠিক তার মতো একজন খেলোয়াড়। ঠিক তার মতোই ক্ষীপ্র, তার মতোই মানুষকে হত্যা করার জন্যে প্রস্তুত।

তাই একদিন ভোরবেলা যখন ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করল তার ঘরের ভেতর চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারল সে যে সময়ের জন্যে অপেক্ষা করছে সেই সময়টুকু চলে এসেছে।

কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন বলল, রুহান, তোমার এখন আমাদের সাথে যেতে হবে।

কোথায় শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়ে রুহান থেমে গেল। জিজ্ঞেস করে কী হবে? রুহান শান্ত গলায় বলল, এখানে আমার সাথে অনেকের পরিচয় হয়েছে। আমি কী তাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারি?

না। মানুষটি শীতল গলায় বলল, তোমাকে আমরা খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করেছি। বিদায় নেয়ার মতো ছেলেমানুষী মানবিক বিষয়গুলো তোমার ভেতরে থাকার কথা নয়। তোমাকে বুঝতে হবে, তুমি হবে বোধশক্তি ভালোবাসাহীন একটা ক্ষীপ্র যন্ত্র।

রুহান মাথা নেড়ে বলল, ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেবার জন্যে তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

মানুষটি হাসিমুখে মাথা নাড়ল, রুহানের বিদ্রুপটুকু ধরতে পারল না।

এবারে একজন একটা কালো কাপড় নিয়ে এলো। বলল, তোমার চোখ দুটো বেঁধে নিতে হবে রুহান।

রুহান একবার ভাবল সে জিজ্ঞেস করবে, কেন আমার চোখ বেঁধে নিতে হবে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল না। কী হবে জিজ্ঞেস করে?

চোখ বাঁধা অবস্থায় রুহানকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সে কিছু দেখতে না পেয়েও বুঝতে পারছিল হল ঘরে অপ্রকৃতস্থ কিছু তরুণ-তরুণী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কিছু বলছে না কিন্তু তারপরেও সে অনুভব করল তারা বুঝি ফিসফিস করে বলছে, বিদায়। বিদায়। রুহান রুহান।

মেয়েটি রুহানের থুতনি ধরে মুখটা উঁচু করে বলল, ইশ! তোমার চেহারাটা কি মিষ্টি! দেখে মনেই হয় না যে তুমি এত বড় খুনি।

রুহান কিছু বলল না। সে কী আসলেই খুব বড় খুনি? মেয়েটা তার মুখটা ডান থেকে বামে নাড়িয়ে বলল, এরকম মিষ্টি চেহারার মানুষ হয়ে তুমি মানুষ খুন করার খেলোয়াড় হলে কেমন করে?

রুহান এবারেও কিছু বলল না। মেয়েটা হাতে খানিকটা কালো রং নিয়ে রুহানের চিবুকের নিচে লাগিয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। রুহান বলল, তুমি কী করছ? আমার মুখে রং লাগাচ্ছ কেন?

তোমার মুখে একটু নিষ্ঠুর ভাব আনার চেষ্টা করছি। চোয়ালের হাড় উঁচু থাকলে মানুষকে নিষ্ঠুর দেখায়। চোখটাও গভীরে ঢোকাতে হবে। চুলগুলো আরো ছোট করে ছাটতে হবে।

কেন? আমাকে এরকম নিষ্ঠুর দেখাতে হবে কেন? আমাকে যে কাজে ব্যবহার করছ সেটা কী যথেষ্ট নিষ্ঠুর না?

সেজন্যেই তো এটা জরুরি। একটা নিষ্ঠুর কাজে যাচ্ছে একজন মানুষ, তার চেহারাটা যদি ছোট শিশুর মতো কোমল হয় তাহলে কেমন করে হবে?

মেয়েটা তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখের নিচে খানিকটা রং লাগিয়ে মাথা বাঁকা করে তাকে দেখল। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলল, নাহ্। তোমার চেহারায় নিষ্ঠুরতা ঠিক আসছে না।

রুহান বলল, ছেড়ে দাও। আমি হয়তো আর ঘণ্টাখানেক বেঁচে আছি। এখন কী এগুলো ভালো লাগে?

মেয়েটা হাত দিয়ে পাশের টেবিলে ঠোকা দিয়ে বলল, কাঠে ঠোকা। কাঠে ঠোকা। অপয়া কথা বল না। ঘণ্টাখানেক বলছ কেন? তুমি অনেকদিন বেঁচে থাকবে। সব খেলোয়াড়কে খুন করে তুমি হবে খেলোয়াড়দের খেলোয়াড়। হাজার ইউনিট দিয়ে মানুষ তখন তোমার খেলা দেখতে আসবে।

রুহান কোনো কথা বলল না। তার ভেতরে সে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করে। পাথরের দেয়ালে ঘেরা একটা মাঠের মধ্যে কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে, সেখানে থাকবে ঠিক তার মতো একজন মানুষ হত্যা করতে যার এতটুকু দ্বিধা নেই, শিকারিরা যেভাবে পাখিকে গুলি করে ঠিক সেভাবে গুলি করবে সে। চারপাশে থাকবে হাজার হাজার মানুষ। তারা চিৎকার করবে আনন্দে। মানুষকে খুন করার দৃশ্য কী আসলেই আনন্দের হতে পারে?

মেয়েটা বলল, তুমি কী ভাবছ?

কিছু না।

মানুষ কিছু না ভাবতে পারে না। ভাবনাতে কিছু না কিছু থাকতে হয়। তোমার বলা উচিত ছিল আমি কী ভাবছি, সেটা বলতে ইচ্ছে করছে না।

রুহান বলল, আমি কী ভাবছি বলতে ইচ্ছে করছে না।

ঠিক আছে, বলতে হবে না। মেয়েটা রুহানের মুখে কয়েক জায়গায় একটু রং মাখিয়ে আবার তাকে ভালো করে লক্ষ্য করে, তারপর হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। কোনোভাবেই রুহানকে নিষ্ঠুর রক্তলোভী একটা মানুষে পাল্টে দেয়া যাচ্ছে না।

রুহান জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী মেয়ে?

আমার নাম জেনে তুমি কী করবে?

কিছু করব না। এমনি জানতে চাইছি।

আমার নাম ত্রিনা।

ত্রিনা? কী আশ্চর্য!

কেন? আশ্চর্য কেন?

আমার একটি ছোট বোন আছে, তার নাম ত্রিনা। রুহান এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, তোমার কী মনে হয় ত্রিনা, আমি কী কখনো আবার আমার ছোট বোনকে দেখব?

সত্যি কথা বলব?

বলো।

ত্রিনা নামের মেয়েটা বলল, একজন খেলোয়াড়ের ভাই বোন মা এসব থাকতে হয় না। যার আপনজন থাকে সে কখনো খেলোয়াড় হতে পারে না।

রুহান বলল, ও।

ত্রিনা বলল, হ্যাঁ। এখন তুমি কথা বল না, তুমি কথা বললে আমি তোমার মুখে ঠিক করে রং লাগাতে পারি না।

রুহান বলল, ঠিক আছে ত্রিনা। আমি এখন কথা বলব না, ত্রিনা।

রুহান অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, প্রতিবার ত্রিনা কথাটা উচ্চারণ করতেই তার ভেতরে কিছু একটা যেন কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে সত্যিই বুঝি সে তার বোনের সাথে কথা বলছে।

ত্রিনা চলে যাবার পর নীল কাপড় পরা চারজন মানুষ তার অস্ত্রগুলো নিয়ে। এলো। তারা সময় নিয়ে অস্ত্রগুলো তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বেল্ট দিয়ে বেঁধে দিতে থাকে। গুলির ম্যাগাজিন ঝুলিয়ে দিতে থাকে। রুহান বলল, আমাকে যত গুলি দিচ্ছ মনে হচ্ছে একজন নয়, একশজনের সাথে যুদ্ধ করব।

মানুষ চারজনের কেউ তার কথার উত্তর দিল না। একটু পরেই যে ঘটনাটি ঘটবে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা–সেটা নিয়ে কেউ হালকা কিছু বলতে চায় না। বলার সাহস পায় না। রুহানকে অস্ত্র দিয়ে সাজিয়ে দেবার পর তারা তাকে সামনে হাঁটিয়ে নিতে থাকে। তখন রুহান প্রথমবার অসংখ্য মানুষের কলরব শুনতে পায়। তার সাথে সাথে লাউড স্পীকারে একজন মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। একজন মানুষ চিৎকার করে কিছু একটা বলছে–গলার স্বরে উত্তেজনা। কী বলছে স্পষ্ট করে বুঝতে পারছে না শুধুমাত্র কণ্ঠস্বরে প্রায় উন্মত্ততার কাছাকাছি উত্তেজনাটুকু ধরা পড়ছে।

রুহান পাশের মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, কী বলছে ওখানে?

তোমার কথা।

আমার কথা?

হ্যাঁ।

আমার কী কথা?

তুমি কী ভয়ঙ্করভাবে আজকে তোমার প্রতিপক্ষকে হত্যা করবে, এইসব।

রুহান একটু অবাক হয়ে মানুষটার দিকে তাকাল। সত্যিই কী তাই বলছে? সত্যিই কী এই ধরনের কথা বলা যায়? বলা সম্ভব?

হঠাৎ হাজার হাজার মানুষের চিৎকার শোনা যায়। রুহান মাথা ঘুরিয়ে পাশের মানুষটিকে জিজ্ঞেস করল, সবাই চিৎকার করছে কেন?

তোমার প্রতিপক্ষ এইমাত্র মাঠে এসেছে। সবাই তাকে অভিনন্দন। জানাচ্ছে। তুমি যখন যাবে, তখন তোমাকেও এভাবে অভিনন্দন জানাবে।

আমি কখন যাব?

এই তো এক্ষুণি যাবে। যখন তোমাকে ডাকবে।

হঠাৎ করে রুহান নিজের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করে। কিছুক্ষণের মধ্যে যে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে সে তার জন্যে আর অপেক্ষা করতে পারছে না। এটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ হয়ে যাক–সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারবে না। রুহানের নিঃশ্বাস দ্রুততর হয়ে আসে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাস জমে ওঠে। সমস্ত শরীর টান টান হয়ে থাকে উত্তেজনায়।

ঠিক এরকম সময়ে পাশে দাঁড়ানো মানুষটি বলল, চল। তোমাকে ডাকছে।

রুহান কোনো কথা না বলে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। সামনে একটা বড় স্টেনলেস স্টীলের গেট। কাছাকাছি আসতেই সেটা নিঃশব্দে খুলে গেল, সাথে সাথে সে বাইরে অসংখ্য মানুষের গুঞ্জন শুনতে পেল। লাউড স্পীকারে মানুষটির কথা হঠাৎ করে স্পষ্ট হয়ে যায়। গমগমে উত্তেজিত গলায় একজন বলছে, তোমরা যারা নিঃশ্বাস বন্ধ করে নিষ্ঠুর একটা হত্যাকারীকে দেখার জন্যে ধৈর্য ধরে বসে আছ, সে আসছে। সে তোমাদের সামনে আসছে। এই ভয়ঙ্কর রক্তপিপাসু হিংস্র মানুষটি হচ্ছে রুহান রুহান!

রুহান খোলা গেট দিয়ে হেঁটে বাইরে মাঠে এসে দাঁড়ায়, চারপাশে পাথরের দেয়াল, তার উপরে বসার জায়গা সেখানে হাজার হাজার মানুষ বসে আছে। তাকে দেখে তারা আনন্দে চিৎকার করতে থাকে। রুহানের এখনো বিশ্বাস হয় না, এই হাজার হাজার মানুষ একটা হত্যাকাণ্ড দেখতে এসেছে? কে কাকে হত্যা করতে পারে সেই ভয়ঙ্কর খেলার দর্শক এরা? এরা কী মানুষ? মানুষ কী এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড দেখে আনন্দ পেতে পারে? পাওয়া সম্ভব?

রুহান হাজার হাজার মানুষের চিৎকার আর আনন্দধ্বনি শুনতে শুনতে চারদিকে তাকাল। তখন সে মাঠের অন্য পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার প্রতিদ্বন্দ্বীক

ে দেখতে পেল। মাঠটি অনেক বড়, মানুষটি অনেক দূরে পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার চেহারাটি ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। না দেখেও সে বুঝতে পারে মানুষটির মুখমণ্ডল নিশ্চয়ই পাথরের মতো শক্ত, চোখের দৃষ্টি কুর। রুহান এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। এই মানুষটি তাকে হত্যা করবে নাকি সে এই মানুষটিকে হত্যা করবে?

হঠাৎ করে আবার সে লাউড স্পীকারে একজন মানুষের গমগমে গলার স্বরে উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়। মানুষটি উন্মত্তের মতো চিৎকার করে বলে, তোমরা সবাই যে খেলাটি দেখার জন্যে শত শত কিলোমিটার দূর থেকে এসেছ, এক্ষুণি সেই খেলাটি দেখবে। এই খেলা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ খেলা। এই খেলা হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ মানুষকে হত্যা করার খেলা!

বিশাল মাঠের চারপাশে বসে থাকা অসংখ্য মানুষ এক ধরনের আনন্দধ্বনি করে ওঠে।

মানুষটির উত্তেজিত কণ্ঠস্বর আবার গমগম করে ওঠে, এই বিশাল আনন্দ মেলায় সবাইকে স্বাগতম। আজকের এই খেলা যিনি আয়োজন করেছেন, এই অঞ্চলের সেই অলিখিত সম্রাট, যুদ্ধবাজ নেতা সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীর অধিনায়ক বীর সাহসী যোদ্ধা ক্ৰিভনকে সবার পক্ষ থেকে অভিনন্দন।

রুহান দেখতে পেল একেবারে সামনের সারিতে বসে থাকা জমকালো পোশাকে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ উঠে দাঁড়াল, উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে তাকে অভিনন্দন জানাল। ক্ৰিভন হাত নেড়ে সবার অভিবাদনের প্রত্যুত্তর দেয় তারপর আবার নিজের জায়গায় বসে যায়।

লাউড স্পীকারে গমগমে গলায় মানুষটি বলে, তোমরা সবাই দেখেছ, মাঠের উত্তর পাশে দাঁড়িয়ে আছে রুহান রুহান। ভয়ঙ্কর হিংস্র রুহান রুহান। মাঠের দক্ষিণ পাশে দাঁড়িয়ে আছে রিদি-নিষ্ঠুর রক্তপিপাসু রিদি।

আমার প্রিয় দর্শকেরা। তোমরা কী এখন এই দুই হিংস্র মানুষ, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তেজনাময় খেলার খেলোয়াড়দের খেলা দেখতে চাও?

হাজার হাজার মানুষ উন্মত্ত গলায় চিৎকার করে ওঠে দেখতে চাই! দেখতে চাই!!

লাউড স্পীকারে আবার মানুষটির গলা শোনা গেল, তাহলে দেখ! রুহান রুহান এবং রিদি হাজার হাজার মানুষ তোমাদের খেলা দেখতে এসেছে। দেখাও তোমাদের খেলা দেখাও। হত্যা করো একজন আরেজনকে। হত্যা করো। হত্যা—হত্যা–

লাউড স্পীকারে ভয়ঙ্কর একটা বাজনা বেজে হঠাৎ করে সেটি থেমে যায়। রুহানের মনে হয় কোথাও কোনো শব্দ নেই। চারপাশে পাথরের দেয়াল, দেয়ালের উপর সারি সারি বসে থাকা মানুষ সবকিছু কেমন যেন অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যায়। মনে হয় কোথাও কেউ নেই। শুধু বহুঁ দূরে দুই পা অল্প একটু ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ। যে কোনো মুহূর্তে মানুষটি একটা অস্ত্র তুলে নিয়ে তাকে গুলি করবে।

মানুষটি অনেক দূরে, তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। রুহানের কী হলো কে জানে, হঠাৎ করে এই মানুষটার সত্যিকার চেহারা দেখার একটা অদম্য ইচ্ছে তার বুকের ভেতর জেগে উঠল। যে মানুষটাকে সে হত্যা করবে কিংবা যে মানুষটা তাকে হত্যা করবে, তাকে সে ভালো করে একবার দেখবে না, চোখে চোখে তাকাবে না, সেটা তো হতে পারে না। রুহান তাই এক পা অগ্রসর হলো।

বহুদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও ঠিক এক পা অগ্রসর হলো। কী আশ্চর্য! সে যেরকম মানুষটিকে কাছে থেকে দেখতে যাচ্ছে ঠিক সেরকম এই মানুষটিও তাকে কাছে থেকে দেখতে চাচ্ছে? তার যেরকম কৌতূহল রিদি নামের মানুষটারও কী ঠিক সেই একই রকম কৌতূহল? রুহান তখন আরো এক পা অগ্রসর হয়–রিদি নামের মানুষটাও এক পা অগ্রসর হয়। রুহান হাত দিয়ে মাথা থেকে টুপিটা খুলে নেয়। ডান হাতে টুপিটা ধরে রাখায় আপাতত সেই হাতটি অচল হয়ে গেল। রিদিকে সে এটা জানিয়ে দিতে চায়। সে এই মুহূর্তে ডান হাতে অস্ত্র তুলে নেবে না, ইচ্ছে করলেও পারবে না। রিদিও তার মাথা থেকে টুপিটা খুলে হাতে নেয়। এই মানুষটাও রুহানকে জানাল, সে এই মুহূর্তে তাকে গুলি করবে না। আগে কাছে এসো তোমাকে একবার ভালো করে দেখি।

দুজন দুজনের দিকে হেঁটে যেতে থাকে। পাথরের দেয়ালের উপরে বসে থাকা সারি সারি মানুষের ভেতরে একটা বিস্ময়ধ্বনি শোনা যায়, কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, দুজন খেলোয়াড় একজন আরেকজনের কাছে এত সহজে এগিয়ে যেতে পারে। নতুন এক ধরনের উত্তেজনার জন্যে সবাই সোজা হয়ে বসে, তাদের হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে আসে। নিঃশ্বাস দ্রুততর হয়।

রুহান আর রিদি হেঁটে হেঁটে একজন আরেকজনের খুব কাছাকাছি এসে থামল। এত কাছে যে ইচ্ছে করলে একজন আরেকজনকে স্পর্শ করতে পারে। কিন্তু তারা একজন আরেকজনকে স্পর্শ করল না, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

রিদির মুখে ছোপ ছোপ কালো রং, চেহারায় ভয়ঙ্কর একটি ছাপ দেয়ার চেষ্টা করেছে। রুহান অবাক হয়ে দেখল ছোপ ছোপ কালো রঙের আড়ালে রিদির চেহারায় এক আশ্চর্য সারল্য। চোখের দৃষ্টি স্বচ্ছ, বিষণ্ণ এবং বেদনাতুর। তরুণটি তার দিকে বিস্ময়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মনে হয় সে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

রুহান রিদির দিকে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল, আমি পারব।

কী পারবে না?

আমি তোমাকে হত্যা করতে পারব না।

রিদির মুখে বিচিত্র এক ধরনের হাসি ফুটে ওঠে। সে হাসিটাকে ধরে রেখে বলল, চারদিকে তাকিয়ে দেখ, কত মানুষ। তারা সব দেখতে এসেছে তুমি আমাকে কেমন করে হত্যা করবে আর আমি তোমাকে কেমন করে হত্যা করব।

আসুক।

তারা অপেক্ষা করছে।

করুক। তুমি চাইলে আমাকে হত্যা করতে পার। রুহান মাথা নেড়ে বলল, কিন্তু আমি তোমাকে হত্যা করব না।

তুমি তাহলে কী করবে?

রুহান বলল, আমি জানি না।

তুমি কিছু না করে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। তোমাকে কিছু একটা করতে হবে।

করতেই হবে?

হ্যাঁ। করতেই হবে।

রুহান মাথার টুপিটা পরে বলল, ঠিক আছে, তাহলে কিছু একটা করি।

এর পর সে যে কাজটা করল তার জন্যে রিদি প্রায় হাজার দশেক শ্বাসরুদ্ধ দর্শক এমন কী সে নিজেও প্রস্তুত ছিল না। হঠাৎ করে সে ঘুরে দাঁড়ায়, তারপর পাথরের দেয়ালের দিকে ছুটে যায়। এবড়ো থেবড়ো দেয়াল ধরে সে ক্ষীপ্র সরীসৃপের মতো উপরে উঠে কিছু বোঝার আগে জমকালো পোশাক পরা ক্ৰিভনের মাথার উপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা ধরে।

শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বসে থাকা হাজার দশেক দর্শক বিস্ময়ের এক ধরনের আর্ত শব্দ করে হঠাৎ করে একেবারে নিশ্ৰুপ হয়ে যায়, মনে হয় একটা সূচ ফেললেও বুঝি তার শব্দ শোনা যাবে।

রুহান ফিসফিস করে বলল, ক্ৰিভন! তোমার সেনাবাহিনীকে বলে দাও তারা যদি একটুও বোকামী করে তাহলে তোমার মস্তিষ্কে কমপক্ষে এক ডজন। বুলেট ঢুকে যাবে।

ক্রিভন কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তুমি কী চাও?

আমি ভালো করে জানি না। রুহান অস্ত্রটা ক্ৰিভনের মাথায় আলতোভাবে স্পর্শ করে বলল, আগে তোমার সেনাবাহিনীর কাছে নির্দেশ পাঠাও, তারা যেন হাতের অস্ত্র নিচে নামিয়ে রাখে। এই মুহূর্তে

ক্ৰিভনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে, সে তার পাশে বসে থাকা সামরিক পোশাক পরা একজনকে বলল, জেনারেল, তুমি এক্ষুনি নির্দেশ দাও। এই মুহূর্তে। কেউ যেন কোনো পাগলামী না করে।

চমৎকার! রুহান এবার ক্ৰিভনের বুকের কাপড় টেনে তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় তারপর তাকে ঠেলে সামনের দিকে নিয়ে যায়। মাথার পিছনে অস্ত্রটা ধরে রেখে বলল, এবারে আমার সাথে চলো।

ক্ৰিভন ভয় পাওয়া গলায় বলল, কোথায়?

রুহান বলল, আমি ভালো করে জানি না। তারপর তাকে ধাক্কা দিয়ে পাথরের দেয়াল থেকে নিচে ফেলে দেয়। দেয়ালটি খুব বেশি উঁচু নয় কিন্তু ক্ৰিভন প্রস্তুত ছিল না বলে নিচে লুটোপুটি খেয়ে পড়ল, রুহান লাফিয়ে নাম ঠিক তার পাশে। রুহানের পোশাক ধরে তাকে টেনে তুলে বলল, ব্যথা পেয়েছ?

ক্ৰিভন মুখে যন্ত্রণার চিহ্নটা সরাতে সরাতে বলল, না। পাইনি।

চমৎকার! রুহান তাকে নিজের খুব কাছাকাছি টেনে এনে বলল, ক্ৰিভন, তুমি আমার কাছাকাছি থাক। তোমার গার্ডগুলোর যদি মাথা মোটা হয় আর তোমাকে বাঁচানোর জন্যে দূর থেকে গুলি করার চেষ্টা করে তাহলে সেট। যেন শুধু আমাদের গায়ে না লাগে, তোমার ঘিলুও যেন খানিকটা বের হয়ে আসে। বুঝেছ?

ক্ৰিভন ফ্যাকাসে মুখে বলল, কেউ গুলি করবে না।

না করলেই ভালো।

রুহান ক্ৰিভনকে টেনে মাঠের মাঝামাঝি নিয়ে যায় যেখানে রিদি দুই হাতে দুটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রিদির মুখে বিচিত্র এক ধরনের হাসি ফুটে উঠল। বলল, রুহান! তুমি এটা কী করেছ?

এই পুরো এলাকার অলিখিত যুদ্ধবাজ সম্রাটকে ধরে এনেছি। কেন?

তুমি বলেছ হাজার হাজার দর্শক অনেকগুলো ইউনিট খরচ করে আমাদের খেলা দেখতে এসেছে। কিছু একটা যদি না করি তাহলে তাদের খুব আশাভঙ্গ হবে।

রিদি কিছুক্ষণ রুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ভালো মানুষের মতো হেসে ফেলল, তারপর কাছে এসে রুহানের পিঠে থাবা দিয়ে বলল, আমি আমার জীবনে তোমার চাইতে বিচিত্র মানুষ দেখি নি!

রুহান বলল, সেটা নিয়ে পরেও কথা বলা যাবে। কিন্তু ক্ৰিভনকে নিয়ে কী করি?

রিদি হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে গাল ঘষে বলল, দর্শকদের একটা সহজ উপায় হচ্ছে এই মাঠের মাঝখানে একে গুলি করে মেরে ফেলা। দর্শকদের তাহলে একেবারেই আশা ভঙ্গ হবে না। তারপর আমরা ঘোষণা করে দিই আমরা এখন এই সাম্রাজ্যের হর্তাকর্তা বিধাতা!

ক্রিভনের মুখ হঠাৎ একেবারে রক্তশূন্য হয়ে যায়। সে ভাঙ্গা গলায় বলল, ঈশ্বরের দোহাই লাগে তোমাদের, তোমরা যা চাও তাই দেব আমি–আমাকে মেরো না।

যা চাই তাই দেবে?

হ্যাঁ। ঈশ্বরের কসম খেয়ে বলছি–

বেশ। রিদি অস্ত্রটা তার গলায় স্পর্শ করে বলল, এই মুহূর্তে আমাদের হওনকে এখান থেকে বের হয়ে একটা বুলেটপ্রুফ গাড়িতে করে নিয়ে যাও।

নিয়ে যাব। অবশ্যই নিয়ে যাব। একশবার নিয়ে যাব।

কোথায় নিয়ে যাবে?

ক্রিভন ভাঙ্গা গলায় বলল, তোমরা যেখানে বলবে। তোমরা যেখানে যেতে চাও–

যাবার কোনো জায়গা আছে নাকি আবার। পুরো দুনিয়াটাই তো তোমরা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে রেখেছ!

জঙ্গলে?

মাথা খারাপ, জঙ্গলে গিয়ে আমি শেয়াল কুকুরের মতো লুকিয়ে থাকব?

তাহলে কোথায় যাবে?

লাল পাহাড়ে গেলে কেমন হয়?

লাল পাহাড়ে? ক্ৰিভনের মুখটা বিবর্ণ হয়ে যায়। লা-লাল পাহাড়ে?

হ্যাঁ। রিদি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা দিয়ে গলায় খোঁচা দিয়ে বলল, কোনো সমস্যা আছে?

না, নেই।

চমৎকার! রিদি ক্ৰিভনকে ধাক্কা দিয়ে বলল, চল যাই।

ক্রিভন অনিশ্চিত ভঙ্গিতে দুই পা হেঁটে সামনে যায়। রিদি পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে একবার দর্শকদের মুখের দিকে তাকাল। তারপর রুহানের দিকে চোখ মটকে বলল, দর্শকদের আরেকটু আনন্দ দেয়া যাক কী বলো?

রুহান মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে। সেও তার অস্ত্রটা বের করে নেয়। তারপর কেউ কিছু বোঝার আগে দর্শকের মাথার উপর দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে সবাই মাথা নিচু করে যে যেখানে আছে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করে, হুঁটোপুটি করে ছুটে পালাতে শুরু করে। রিদি হা হা করে হেসে বলল, হায়রে আমাদের মুরগি ছানার দল! ইউনিট খরচ করে মানুষ মারা দেখতে এসেছে অথচ সাহসের নমুনা দেখ!

রুহান বলল, অনেক হয়েছে, এখন চল।

রিদি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, দেখা যাক আসলেই আমরা পালাতে পারি কি না!

ক্রিনের পোশাকের পিছনে ধরে তারা তাকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে। সমস্ত এলাকাটা তখন মানুষের হৈ চৈ চিৎকারে একটা নারকীয় পরিবেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে কোনো জায়গা থেকে কেউ গুলি করে তাদের শেষ করে দিতে পারে কিন্তু সেটা নিয়ে এখন চিন্তা করার সময় নেই।

রুহান আর রিদি পাশাপাশি ছুটতে থাকে। কিছুক্ষণ আগেও তাদে একজনের আরেকজনকে হত্যা করার কথা ছিল।