প্রথম পর্ব


সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে


#রুহান_রুহান - মুহম্মদ জাফর ইকবাল







বৃদ্ধ কুরু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পৃথিবীতে এখন খুব দুঃসময়।

ছোট শিশু অর্থহীন কথা বললে বড় মানুষেরা যেভাবে সকৌতুকে তার দিকে তাকায় অনেকে সেভাবে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। কেউ কোনো কথা বলল না। পৃথিবীর মানুষ আজকাল বেশি কথা বলে না, কী নিয়ে কথা বলবে। কেউ জানে না। বৃদ্ধ কুরুর মতো দুই-একজন ছাড়া সবাই জন্মের পর থেকেই দেখে আসছে পৃথিবীতে খুব বড় দুঃসময়। সবাই সেটা মেনে নিয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছে, সেই বেঁচে থাকাটাও খুব অর্থপূর্ণ বেঁচে থাকা নয়। তাই কেউ সেগুলো নিয়ে কথা বলতে চায় না। সেটা নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগও করে না। শস্যক্ষেত্রের পাশে উঁচু ঢিবিতে দাঁড়িয়ে থেকে সবাই উত্তর দিকে তাকিয়ে রইল। বহুদূরে কোথাও আগুন লেগেছে, সেই আগুন থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে কালো ধোঁয়া আকাশে উঠছে। এটি কোনো নতুন দৃশ্য নয়, অনেকদিন থেকেই তারা দেখছে দূরে কোথা থেকে জানি মাঝে মাঝে কুণ্ডুলী পাকিয়ে কালো ধোঁয়া আকাশে ওঠে। যতই দিন যাচ্ছে সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলি আরো ঘন ঘন এবং আরো কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে। কে জানে কোনো একদিন হয়তো এই গ্রামটা দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকবে। এই গ্রামের বাড়িঘর, শস্যক্ষেত্র সব পুড়ে ছাই হয়ে যাবে আর কুচকুচে কালো ধোঁয়া আকাশে পাক খেয়ে উঠতে থাকবে।

রুহান নিঃশব্দে দূরে তাকিয়ে রইল, কালো ধোয়ার রেখাঁটি একটি অশুভ সংকেতের মতো ঝুলছে, সেটি থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা যায় না। সেটা কত দূরে কেউ জানে না। পৃথিবীতে এখন কারো সাথে কারো যোগাযোগ নেই, তাই ঠিক কোথায় কী ঘটছে তা কেউ অনুমান করতে পারে না। মাঝে মাঝে ক্লান্ত বিধ্বস্ত অপরিচিত কোনো মানুষ যখন এই গ্রামের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে যায়, সবাই তখন তাকে ঘিরে ধরে তার কাছ থেকে জানতে চায়–সে কোথা থেকে এসেছে, কী দেখেছে। এছাড়া সেই মানুষগুলোর কেউ কেউ মুখ ফুটে কিছু বলতে চায় না, তাড়া খাওয়া পশুর মতো তারা ভীত আতঙ্কিত মুখে তাকিয়ে থাকে। মাথা নেড়ে বিড় বিড় করে অস্পষ্ট দুই একটি কথা বলে আরো দক্ষিণের দিকে হেঁটে যেতে থাকে। কেউ কেউ উদাসী মুখে ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব ঘটনার বর্ণনা দেয়, সেই সব ঘটনার সবকিছু বিশ্বাস করা যায় কী না সেটাও কেউ জানে না।

বৃদ্ধ কুর আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, শুধু শুধু এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে। যাও সবাই নিজের কাজে যাও।

আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের দুই-একজন আবার মাথা নাড়ল কিন্তু কেউ চলে গেল না। দিনের আলো থাকতে থাকতে তারা মাঠে, শস্যক্ষেতে কাজ করে কিন্তু বেলা পড়ে এলে তাদের কারো বেশি কিছু করার থাকে না। বৃদ্ধ কুরু শেষবারের মতো ধোঁয়ার কুণ্ডলিটা একবার দেখে উঁচু ঢিবি থেকে নিচে নামতে শুরু করে।

এতক্ষণ রুহান চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, এবারে বৃদ্ধ কুরুকে বলল, কুরু আমি তোমার সাথে আসি?

আসবে? এসো।

রুহান হাত ধরে বৃদ্ধ কুরুকে উঁচু ঢিবি থেকে নামতে সাহায্য করল, ব্যাপারটি আজকাল একটু অস্বাভাবিক। মানুষ যখন দুঃসময়ে থাকে তখন ছোটখাটো দ্রতা বা ভালোবাসাটুকুও নিজের ভেতর আড়াল করে রাখে, অন্যদের সামনে প্রকাশ করতে চায় না। বৃদ্ধ কুরু একটু হেসে বলল, রুহান, তুমি জোয়ান ছেলে, আমার মতো বুড়ো মানুষের সাথে কী করবে? যাও নিজের বয়সী ছেলে-মেয়ের সাথে হৈ হুঁল্লোড় করো।

রুহান হাসল। বলল, সেটা তো সবসময়েই করি। মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যায় তখন হৈ হুঁল্লোড় করতে ভালো লাগে না।

বৃদ্ধ কুরু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি দুঃখিত, রুহান যে তোমার বয়সী একটা ছেলেকে এরকম কথা বলতে হচ্ছে। মন খারাপ তো তোমাদের হবার কথা নয়-মন খারাপ হবে আমাদের মতো বুড়ো মানুষদের।

রুহান কোনো কথা বলল না। বৃদ্ধ কুরুর পাশাপাশি নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল। গ্রামের পাথর ছড়ানো পথের দুপাশে ঝোপঝাড়। বাসাগুলো লতাগুল্ম। দিয়ে ঢেকে আছে। বাসার ছাদে সোলার প্যানেলগুলোতে শেষ বিকেলের সোনালি আলো। বাতাসে শরতের হিমেল স্পর্শ।

বৃদ্ধ কুরু তার বাসার সামনে এসে দাঁড়াল। ভারী দরজার সামনে লাগানো ছোট মডিউলে চোখের রেটিনা স্ক্যান করানোর সাথে নিঃশব্দে দরজাটা খুলে গেল। বৃদ্ধ কুরু ঘরের ভেতরে ঢুকে রুহানকে ডাকল, এসো রুহান।

রুহান ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, তুমি এখন রেটিনা স্ক্যান করে ঘরে কে?

বৃদ্ধ কুরু দুর্বল ভঙ্গিতে হেসে বলল, ক্রিস্টালগুলোর জন্যে তা না হলে আমার ঘরে মূল্যবান কী আছে, বল?

রুহান মাথা ঘুরিয়ে বৃদ্ধ কুরুর দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার অনেকগুলো এস্টাল?

বলতে পারো। এত ক্রিস্টাল দিয়ে তুমি কী করবে?

বৃদ্ধ কুরু হাসার চেষ্টা করে বলল, জানি না কী করব। আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন পুরো পৃথিবীতে নেটওয়ার্ক ছিল। পৃথিবীর যে কোনো মানুষ যে কোনো জায়গা থেকে তথ্য আনতে পারত। এখন তো আর পারে না। তাই ক্রিস্টালগুলো জোগাড় করেছিলাম—যতটুকু সম্ভব তথ্য জমা করে রাখার জন্যে এত তথ্য তো আমি সারাজীবনে দেখতে পারব না, তবু এক ধরনের সখ।

তোমার কাছে কীসের কীসের ক্রিস্টাল আছে কুরু?

বৃদ্ধ কুরু একটু হেসে বলল, কীসের নেই! ব্যাক্টেরিয়া ভাইরাস থেকে শুরু করে নীল তিমি, পরমাণু থেকে গ্যালাক্সী, প্রেতচর্চা থেকে বিজ্ঞান সবকিছু আছে।

পৃথিবীর সব ক্রিস্টাল কী কারো কাছে আছে?

উঁহু। সেটি সম্ভব না। জ্ঞান তো থেমে থাকে না। নতুন জ্ঞানের জন্ম হলেই নতুন ক্রিস্টালে সেটা রাখা হয়। তাই একজনের কাছে কখনোই সব ক্রিস্টাল থাকতে পারে না।

রুহান বৃদ্ধ কুরুর ঘরের একটা পুরানো চেয়ার টেনে সেখানে বসে বলল, কুরু, তোমার কী মনে হয় এখনো পৃথিবীতে নতুন জ্ঞানের জন্ম হচ্ছে? নতুন ক্রিস্টালে সেটা লেখা হচ্ছে?

বৃদ্ধ কুরু কিছুক্ষণ রুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি জানি না রুহান। যদি সত্যি সত্যি সেটা বন্ধ হয়ে থাকে, তাহলে বুঝবে পৃথিবীতে সভ্যতা বলে আর কিছু নেই।

রুহান আর বৃদ্ধ কুরু কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল, বাইরে পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যেতে থাকে, সন্ধ্যেবেলা মানুষের মতো সব পশুপাখিও মনে হয় ঘরে ফিরে আসে। রুহান উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ স্বচ্ছ কোয়ার্টজের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে তারপর আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ কুরুর দিকে তাকিয়ে বলল, কুরু, আমার মাঝে মাঝে মাথার মধ্যে খুব ভয়ানক একটা চিন্তা আসে।

বৃদ্ধ কুরু জিজ্ঞেস করল, কী চিন্তা?

আমাদের যে ক্রিস্টাল রিডারগুলো আছে, সেগুলো যদি এক সময় নষ্ট হয়ে যায় তখন কী হবে?

নষ্ট হয়ে যায়?

হ্যাঁ।

কিন্তু বৃদ্ধ কুরু ঠিক বুঝতে পারল না, ইতস্তত করে বলল, নষ্ট হয়ে যায় মানে কী?

এখন যদি আমি আমার কথা জমা করতে চাই, ক্রিস্টাল রিডারে সেটা জমা থাকে। শুনতে চাই ক্রিস্টাল রিডারে শুনতে পাই। কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে ক্রিস্টাল রিডারে খোঁজ করি। সবকিছু আমরা করি ক্রিস্টাল রিডার দিয়ে—

হ্যাঁ। বৃদ্ধ কুরু এখনো ঠিক বুঝতে পারছে না, ভুরু কুঁচকে বলল, ক্রিস্টাল রিডার দিয়েই তো করব।

রুহান বলল, কিন্তু ক্রিস্টাল রিডার তো একটা যন্ত্র। একটা যন্ত্র তো নষ্ট হতেই পারে। পারে না?

কিন্তু এটা তো সেরকম যন্ত্র না। এর মাঝে কিছু নড়ছে না, কিছু ঘুরছে না। ক্রিস্টালের অণুগুলোর মাঝে তথ্য সাজানো হয় সেখান থেকে তথ্য বের হয়ে আসে।

রুহান একটু উত্তেজিত গলায় বলল, কিন্তু তারপরেও সেটা তো নষ্ট হতে পারে। আমাদের গুরুনের ক্রিস্টাল রিডার নষ্ট হয়ে গেছে না?

বৃদ্ধ কুরু হেসে বলল, গুরুনের কথা ছেড়ে দাও। সে নিদানি পাতার নির্যাস খেয়ে নেশা করে তার ক্রিস্টাল রিডারটা ফায়ার প্লেসের আগুনে ফেলে দিয়েছে। সেটা নষ্ট হবে না তো কী হবে?

তা যাই হোক, কিন্তু তার ক্রিস্টাল রিডার তো নষ্ট হয়েছে। এখন সে পাগলের মতো একটা খুঁজছে-খুঁজে পাচ্ছে না। আমি শুনেছি পৃথিবীতে আর ক্রিস্টাল রিডার তৈরি হয় না।

বৃদ্ধ করু একটু গম্ভীর হয়ে বলল, হ্যাঁ। আমিও শুনেছি পৃথিবীর নেটওয়ার্ক ধ্বংস হবার পর আর ক্রিস্টাল রিডার তৈরি হয় না। শেষ ক্রিস্টাল রিডার তৈরি হয়েছে পঞ্চাশ বছর আগে।

রুহান বৃদ্ধ কুরুর সামনে একটা চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বলল, তাহলে? তাহলে হলে তুমি বল, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে কী হবে? যখন কারো কাছে ক্রিস্টাল রিডার থাকবে না, তখন কী হবে? ছোট বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে নতুন কিছু কেমন করে শিখবে?

বৃদ্ধ কুরু বিচিত্র একটা দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর মাথা নেড়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। আমি এভাবে চিন্তা করি নি। আমরা আমাদের সব তথ্য, সব জ্ঞানের বিনিময়, সব কিছু করি ক্রিস্টাল রিডার দিয়ে যদি আমাদের ক্রিস্টাল রিডার না থাকে তখন কী হবে আমি জানি না–

রুহান উত্তেজিত গলায় বলল, কিন্তু সবসময় তো ক্রিস্টাল রিডার ছিল না তখন মানুষ কী করত?

একসময় কম্পিউটার নামে একটা যন্ত্রে কথা বলত। তার আগে হাত দিয়ে কিছু সুইচে করে তথ্য পাঠাত, তার আগে ছিল কাগজ আর কলম। পাতলা এক ধরনের সেলুলয়েড আর কালি বের হবার এক ধরনের টিউব। তার আগে ছিল গাছের পাতা–তার আগে মাটির আস্তরণ–

রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। গাছের পাতা, মাটির আস্তরণ আর কাগজে কেমন করে তথ্য সংরক্ষণ করত। এগুলো তো যন্ত্র নয়, এর পরমাণু তো সংঘবদ্ধভাবে সাজানো থাকে না!

না না না। বৃদ্ধ কুরু মাথা নেড়ে বলল, তখন অন্য একটা ব্যাপার ছিল। সব ভাষার তখন লিখিত রূপ ছিল। অক্ষর ছিল, বর্ণ ছিল সেগুলো দিয়ে মানুষ তাদের কথাকে লিখে রাখত।

লিখে রাখত?

হ্যাঁ! এখন আমরা কিছু বললেই সেটা যেরকম সংরক্ষিত হয়ে যায় আগে সেটা ছিল না। আগে কিছু সংরক্ষণ করতে হলে সেটা বিশেষ বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করে লিখতে হতো। সেই চিহ্নগুলো মানুষ মনে রাখত, সেটা দেখে তারা বলতে পারত কী লেখা আছে। সব শিশুকেই তার জীবনের শুরুতে লেখা আর পড়া ব্যাপারটা শিখতে হতো। সেটা শেখার পর তারা জ্ঞান অর্জন শুরু করতে পারত।

কী আশ্চর্য! রুহান অবাক হয়ে বলল, কী জটিল একটা প্রক্রিয়া।

হ্যাঁ। এখন ক্রিস্টাল রিডারে চাপ দিলেই কথা! ছবি ও ভিডিও বের হয়ে আসে। আগে সেটা ছিল না। আগে যে চিহ্নগুলো দেখে মানুষ পড়তো, সেই চিহ্নগুলোর নাম ছিল বর্ণমালা বা এলফাবেট।

কী আশ্চর্য! রুহান মাথা নেড়ে বলল, তুমি এত কিছু কেমন করে জান?

বৃদ্ধ কুরু হেসে বলল, আমি বুড়ো মানুষ। আমার তো কোনো কাজকর্ম নেই, আমি তাই বসে বসে আমার ক্রিস্টালগুলো দেখি! প্রাচীন কালে মানুষ কী করত তা আমার জানতে বড় ভালো লাগে।

রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমারও এগুলো খুব জানার ইচ্ছে করে। এক সময় এসে তোমার ক্রিস্টালগুলো দেখে যাব

এসব জানার অনেক সময় পাবে রুহান। এখন গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এসব শেখ। চিকিৎসা বিজ্ঞান শেখ-যখন আমার মতো বুড়ো হবে তখন অন্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে পারবে।

রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমি বুড়ো হতে হতে যদি সব ক্রিস্টাল রিডার নষ্ট হয়ে যায়, তখন?

বৃদ্ধ কুরু হাত দিয়ে নিজের বুক স্পর্শ করে বলল, দোহাই তোমার! এন্ড্রোমিডার দোহাই, এরকম ভয়ঙ্কর কথা বলো না। আমার ক্রিস্টাল রিডার নষ্ট হবার আগে যেন আমার মৃত্যু ঘটে।

তোমার মৃত্যু হলে তুমি বেঁচে যাবে। কিন্তু আমাদের কী হবে?

বৃদ্ধ কুরু মাথা নেড়ে বলল, এই মন খারাপ আলোচনা থাকুক রুহান। তার চাইতে বলো তুমি কী খাবে? আমার কাছে খুব ভালো স্নায়ু উত্তেজক একটা পানীয় আছে।

রুহান হেসে বলল, আমার স্নায়ু এমনিতেই অনেক উত্তেজিত। স্নায়ু শীতল করার কোনো পানীয় থাকলে আমাকে দাও।

বৃদ্ধ কুরু রান্নাঘরের শীতল কক্ষ থেকে একটা পানীয়ের বোতল বের করে দুটি স্বচ্ছ গ্লাসে সেটা ঢালতে ঢালতে বলল, স্নায়ুকে শীতল করে লাভ নেই। জোয়ান বয়সের ছেলে-মেয়ের স্নায়ু বুড়োদের মতো শীতল হবে কেন? তোমাদের স্নায়ুতে সবসময়েই থাকবে উত্তেজনা। একেবারে টান টান উত্তেজনা!

রুহান তার গ্লাসটি হাতে নিয়ে একটা চুমুক দিতেই সারা শরীরে একটা আরামদায়ক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বুকের ভেতর চেপে থাকা দুর্ভাবনাগুলো কেটে মাথার ভেতরে ফুরফুরে এক ধরনের আনন্দ এসে ভর করে। সে জিব দিয়ে একটা শব্দ করে বলল, চমক্কার পানীয় কুরু।

হ্যাঁ। খুব চমৎকার! এই পানীয় এমনি এমনি খেতে হয় না। চমক্কার একটা সঙ্গীত শুনতে শুনতে এটি খেতে হয়। প্রাচীন একটা সঙ্গীত।

রুহান সোজা হয়ে বসে বলল, শোনাবে কুরু?

কেন শোনাব না? তুমি হাট্টা কাট্টা জোয়ান একটা মানুষ, এই বুড়ো মানুষের ঘরে এসেছ, বুড়ো মানুষের প্রাচীন একটা সঙ্গীত তোমাকে তো শুনতেই হবে।

বৃদ্ধ কুরু উঠে গিয়ে শেলফে রাখা ক্রিস্টাল রিডারের কাছে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় একটা নির্দেশ দিতেই ঘরের ভেতরে হালকা নীল আলোর একটা বিচ্ছুরণ হলো এবং পর মুহূর্তে ঘরের কোণায় ত্রিমাত্রিক একটা কিশোরী মেয়েকে দেখা গেল। হলোগ্রাফিতে মেয়েটিকে একটি জীবন্ত রূপ দেয়া হয়েছে, সেই রূপটি এত নিখুঁত যে দেখে মনে হয় মেয়েটিকে বুঝি স্পর্শ করা যাবে। কিশোরী মেয়েটি এদিক সেদিক তাকিয়ে বৃদ্ধ কুরুর দিকে তাকিয়ে তার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলে, শরতের এই সন্ধ্যেবেলায় তুমি কেমন আছ কুরু?

মেয়েটি সত্যি নয়, এটি শুধুমাত্র একটি হলোগ্রাফিক ছবি, কিন্তু সেটি এত জীবন্ত যে তার সাথে সত্যিকারের মানুষের মতো কথা না বলে উপায় নেই। বৃদ্ধ কুরু তাই নরম গলায় বলল, আমি ভালোই আছি মেয়ে। আমাকে একটা প্রাচীন গান শোনাতে পারবে?

প্রাচীন? কত প্রাচীন?

এবারে রুহান উত্তর দিল। বলল, প্রাচীন। অনেক প্রাচীন। মানুষ যখন যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু করে নি, একে অন্যকে মারা শুরু করে নি সেই সময়কার গান।

মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, সেরকম গান তো একটি দুটি নয়, অসংখ্য। তোমাকে আরো নির্দিষ্ট করে বলতে হবে।

রুহান বলল, ঠিক আছে, বলছি। সেই গানে নদী আর নদীর ঢেউয়ের কথা থাকতে হবে। আকাশ ভরা কালো মেঘের কথা থাকতে হবে। একটা মেয়ে আর একটা ছেলের ভালোবাসার কথা থাকতে হবে। বিরহের কথা থাকতে হবে-

আরো কিছু?

হ্যাঁ। যে গান শুনে বুকের ভেতর হাহাকার করতে থাকবে সেরকম একটা গান।

মেয়েটি মিষ্টি গলায় বলল, চমৎকার! প্রাচীন সঙ্গীত-কলার সবুজ ক্রিস্টালটা ঢোকাতে হবে।

কুরু শেলফের ডালা খুলে প্রাচীন সঙ্গীত-কলার সবুজ ক্রিস্টালটা ক্রিস্টাল রিডারে ঢুকিয়ে দিল। কয়েক মুহূর্ত পরে হলোগ্রাফের কিশোরী মেয়েটি আবছা হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকে আর প্রায় সাথে সাথে সারা ঘরে বিষণ্ণ একটা সুর বেজে ওঠে। বহুদূর থেকে কোনো একজন একাকী নারীর করুণ কণ্ঠ শোনা যায়। সেই কণ্ঠে একই সাথে ভালোবাসা এবং বেদনা। আনন্দ এবং যন্ত্রণা। রুহান তার হাতের পানীয়ের গ্লাসটি হাতে নিয়ে পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।

রুহান যখন বৃদ্ধ কুরুর বাসা থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলো তখন বেশ রাত। আকাশে একটা ভাঙ্গা চাঁদ, চারিদিকে তার নরম জ্যোৎস্নার আলো। ঝিঁঝিপোকা ডাকছে এবং মাঝে মাঝে দূর বনাঞ্চল থেকে রাত জাগা পশুর ডাক শোনা যাচ্ছে। রুহান হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করে শরতের শুরুতেই বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। জ্যাকেটের কলার একটু উপরে তুলে সে হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। একটু আগে শুনে আসা প্রাচীন সঙ্গীতের রেশটুকু এখনো তার মাথার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। কী অপূর্ব আর মায়াময় সেই কণ্ঠস্বর, এখনো সেটি যেন তার বুকের ভেতর হাহাকারের মতো শূন্যতা তৈরি করে যাচ্ছে।

আনমনে হাঁটতে হাঁটতে রুহান হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, কাছাকাছি কোনো একটি বাসা থেকে একজন মানুষের ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর আর একটি মেয়ের কান্নার শব্দ। ভেসে আসছে। রুহান শব্দ অনুসরণ করে এগিয়ে যায়, ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর আর কান্নার শব্দটি আসছে কিসিমার বাসা থেকে। তাদের এলাকার সবচেয়ে সাদাসিধে। সবচেয়ে শান্তশিষ্ঠ আর সবচেয়ে নিরীহ পরিরার হচ্ছে কিসিমাদের পরিরার। গাছপালায় ঢাকা তার ছোট বাসার সামনে কিছু মানুষের জটলা, রুহান-গেট খুলে ভিতরে ঢুকে গ্রাউসকে দেখতে পায়। গ্রাউসের সামনে কিসিমা এবং তাকে। শক্ত করে ধরে রেখেছে কিসিমার মেয়ে ত্রায়িনা। ত্রায়িনার চোখে মুখে আতঙ্ক, সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

গ্রাউসের বয়স রুহান থেকে খুব বেশি নয় কিন্তু তাকে অনেক বেশি বয়স্ক দেখায়। সে লম্বা এবং চওড়া, তার পেশীবহুল শক্ত দেহ, সোনালি চুল এবং নীল চোখ। গাউস সুদর্শন কিন্তু কোনো একটি অজ্ঞাত কারণে তাকে দেখলে তার সুদর্শন চেহারাটুকু চোখে না পড়ে নিষ্ঠুর ভঙ্গিটুকু প্রথমে চোখে পড়ে।

রুহানকে ঢুকতে দেখে গ্রাউস ক্রুদ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি এখানে কী করতে এসেছ?

আমি এদিক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তোমাদের কথা শুনে এসেছি।

আমাদের কথা শুনে তোমার আসার কোনো প্রয়োজন নেই। গ্রাউস চোখ লাল করে বলল, তুমি যেখানে যাচ্ছিলে সেখানে যাও।

গ্রাউসের কথা শুনে রুহান একই সাথে এক ধরনের ক্রোধ এবং অপমান অনুভব করে। সে শীতল গলায় বলল, এটি কিসিমাদের বাসা। আমি এখানে থাকব না চলে যাব সেটি বলবে কিসিমা–তুমি নয়।

গ্রাউস হিংস্র পশুর মতো একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোমার বেশি সাহস হয়েছে, তাই না?

রুহান মাথা নেড়ে বলল, না। আমার মোটেও সাহস বেশি হয় নি। তারপর মাথা ঘুরিয়ে কিসিমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী হয়েছে কিসিমা? এয়িনা কাঁদছে কেন?

কিসিমার মুখে এক ধরনের হতচকিত ভাব, দেখে মনে হয় একটা কিছু বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, গ্রাউস বলছে তার ত্রায়িনাকে দরকার।

রুহান চমকে উঠে গ্রাউসের মুখের দিকে তাকাল। গ্রাউসের মুখটি হঠাৎ আরো কঠোর হয়ে যায়। গলা উঁচিয়ে বলল, বলেছিই তো। বলেছি তো কী হয়েছে?

রুহান তীক্ষ্ণ চোখে গ্রাউসের দিকে তাকিয়ে বলল, এটা তুমি কী বলছ। গ্রাউস?

গ্রাউস হঠাৎ হাত দিয়ে রুহানের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল, তুমি কোথাকার মাস্তান, আমাকে উপদেশ দিতে এসেছ?।

রুহান পড়ে যেতে যেতে কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে গ্রাউসের দিকে তাকাল। গ্রাউস হিংস্র মুখে বলল, রুহান, তুমি আমার সাথে লাগতে এসো না। তোমাকে আমি শেষ করে দেব।

রুহান তীক্ষ্ণ চোখে গ্রাউসের দিকে তাকিয়ে বলল, কাউকে শেষ করে দেয়া এত সহজ নয় গ্রাউস।

গ্রাউস হিংস্র মুখে বলল, তুমি দেখতে চাও?

না, আমি দেখতে চাই না। কিন্তু আমাদের গ্রামটি এখনো জঙ্গল হয়ে ওঠে নি যে যার যেটা ইচ্ছা সে সেটা করতে পারবে।

গ্রাউস এবারে শব্দ করে হেসে উঠে বলল, রুহান, তাহলে নতুন জীবনের জন্যে প্রস্তুত হও। তোমার প্রিয় গ্রামটাতে এখন নতুন পৃথিবীর নিয়ম আসতে যাচ্ছে।

তুমি কী বলতে চাইছ?

আমি বলতে চাইছি আমার যেটা ইচ্ছা আমি সেটা করব।

রুহান মাথা নেড়ে বলল, না। আমরা সবাই মিলে কিছু নিয়ম ঠিক করেছি

রুহানকে কথা শেষ করতে না দিয়ে গ্রাউস বলল, ঐ সব মান্ধাতা আমলের নিয়মের দিন শেষ। নতুন পৃথিবীতে এখন নতুন নিয়ম।

সেই নিয়মটা কী?

যার ক্ষমতা আছে তার ইচ্ছাটাই হচ্ছে নিয়ম।

রুহান এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে গ্রাউসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যি সত্যি কেউ এরকম একটি কথা বলতে পারে সে নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করত না। খানিকক্ষণ নিঃশব্দে গ্রাউসের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমার ক্ষমতা আছে?

আছে।

তোমার ইচ্ছাটি তাহলে নিয়ম?

হ্যাঁ।

রুহান একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, এখন তোমার ইচ্ছে কিসিমার ছোট মেয়ে ত্রায়িনাকে তুলে নিয়ে যাবে?

গ্রাউস মুখে একটা অশালীন ভঙ্গি করে বলল, সে মোটেই ছোট মেয়ে নয়। সে যথেষ্ট বড় হয়েছে।

বেশ। রুহান হঠাৎ করে নিজের ভেতরে এক ধরনের অদম্য ক্রোধ অনুভব করে। সে দাতে দাঁত ঘষে বলল, দেখি তাহলে তুমি কেমন করে ত্রায়িনাকে তুলে নিয়ে যাও। রুহান দুই পা এগিয়ে কিসিমা আর ত্রায়িনার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, এসো।

গ্রাউস কয়েক মুহূর্ত স্থির চোখে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর বলল, কাজটা ভালো করলে না রুহান।

রুহান কোনো কথা না বলে স্থির চোখে গ্রাউসের দিকে তাকিয়ে রইল। গ্রাউস হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে চলে যেতে শুরু করে, গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ঘুরে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, এর জন্য তোমাকে মূল্য দিতে হবে রুহান।

রুহান নিচু গলায় বলল, দেব।

অনেক মূল্য।

দেব।

গ্রাউস চলে যাবার পর রুহান মাথা ঘুরিয়ে কিসিমা আর তার মেয়ে ত্রায়িনার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা ভেতরে যাও, অনেক রাত হয়েছে।

কিসিমা ভাঙ্গা গলায় বলল, তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব রুহান-

এখানে ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই।

ত্রায়িনা ফেঁপাতে ফোঁপাতে বলল, যদি আবার আসে?

আসবে না। তোমরা ভালো করে দরজা বন্ধ করে রেখ। আমি ভোরবেলা সবার সাথে কথা বলব। ভয় পাবার কিছু নেই।

ত্রায়িনা বড় বড় চোখে রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, সত্যি?

হ্যাঁ। সত্যি–কথা বলবে গিয়ে রুহানের গলা কেঁপে উঠল, কারণ সে জানে কথাটি আসলে সত্যি নয়। নতুন পৃথিবীতে সবকিছু পাল্টে গেছে, এখন কোথাও কোনো নিয়ম নেই। এখানে যার শক্তি বেশি, যার ক্ষমতা বেশি তার ইচ্ছেটাই হচ্ছে নিয়ম। ঠিক গ্রাউস যেভাবে বলেছে।

খাবার টেবিলে মা বলল, রুহান এত রাত করে ফিরেছিস! দিন কাল ভালো না জানিস না?

রুহান প্লেটের শুকনো রুটিটা পাতলা স্যুপে ভিজিয়ে নরম করে নিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল, কেন মা? দিন কাল নতুন করে আবার খারাপ হলো কেন?

দেখছিস না কী হচ্ছে? যার যা খুশি সেটা করা শুরু করেছে।

মা কী নিয়ে কথা বলছে রুহান সেটা ভালো করে জানে। পৃথিবীর এক এলাকার সাথে এখন অন্য এলাকার কোনো যোগাযোগ নেই, প্রত্যেকটা এলাকা। এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো কোনোভাবে টিকে আছে। কোথাও কোথাও পরিবেশ একেবারে নারকীয় কোথাও কোথাও সবাই মিলে এখনো মোটামুটি শান্তিতে বেঁচে আছে।

রুহানদের এলাকাটা এতদিন বেশ ভালোই ছিল, বেঁচে থাকার জন্য কিছু নিয়ম তৈরি করে সবাই দিন কাটাচ্ছে, কিন্তু সেটা আর থাকবে বলে মনে হয় না। একটু আগে সে নিজেই কিসিমার বাসায় গ্রাউসের কাজকর্ম দেখে এসেছে। তবুও সে কিছু না জানার ভান করে জিজ্ঞেস করল, নতুন কিছু হয়েছে নাকি?

মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললে বলল, হয়নি আবার। প্রত্যেকদিনই কিছু একটা হচ্ছে। এই তো সেদিন কয়জন এসে তিয়াশার বাসার একটা সোলার প্যানেল খুলে নিয়ে গেছে।

রুহান এটার কথাও জানে, তারপরেও না জানার ভান করে বলল, তাই নাকি?

হ্যাঁ। মা গলা নামিয়ে বলল, কিসিমার মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যাবে বলে গ্রাউস কয়দিন থেকে হুমকি দিচ্ছে শুনেছিস?

রুহান একটু আগেই সেটা নিজের চোখে দেখে এসেছে, শেষ মুহূর্তে গ্রাউস পিছিয়ে না গেলে কিছু একটা হয়ে যেতে পারত কিন্তু মাকে সেটা বলার ইচ্ছে। করল না।

মা আড় চোখে তারা ছোট দুটি মেয়ে নুবা আর ত্রিনার দিকে তাকাল। তারপর ফিস ফিস করে বলল, এই দুজন যখন বড় হবে তখন যে কী হবে!

রুহান তার ছোট দুই বোনের দিকে তাকাল। সে তার মায়ের সাথে কী নিয়ে কথা বলছে সেটা নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। এই মুহূর্তে ক্রিস্টাল রিডারে নতুন একটা ক্রিস্টাল ঢুকিয়ে বিচিত্র একটা সঙ্গীতের মর্মোদ্ধার করার চেষ্টা করছে। এই বয়সের ছেলে-মেয়ের নিজেদের একটা জগত আছে, তার বাইরে যারা থাকে তারা সেই জগতটার কিছুই বুঝতে পারে না।

মা নুবা আর ত্রিনার দিকে তাকিয়ে বলল, কী হলো? তোরা খাবার টেবিলে বসে কী শুরু করেছিস? খাচ্ছিস না কেন?

নুবা ঠোঁট উল্টে বলল, তোমার এই শুকনো রুটি আর জ্যালজেলে স্যুপ দুই মিনিট পরে খেলে কিছু ক্ষতি হবে না।

মা একটু আহত গলায় বলল, এটাই যে পাচ্ছিস তার জন্যেই খুশি থাক। সামনে কী দিন আসছে কে জানে?

ক্রিস্টাল রিডার থেকে একটা বিদঘুটে শব্দ বের হয়ে এলো। সাথে সাথে দুই বোন হেসে কুটি কুটি হয়ে যায়। মা ভুরু কুঁচকে জানতে চাইল, কী হচ্ছে? এই বিদঘুটে শব্দের মাঝে তোরা হাসির কী পেলি?

ত্রিনা মুখ গম্ভীর করে বলল, তুমি বিদঘুটে কী বলছ মা? এটা নতুন ধরনের সঙ্গীত। এটা যে তৈরি করেছে তার চেহারা দেখলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। সবুজ রঙের চুল, গোলাপি-

ব্যস! অনেক হয়েছে। মা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, যে মানুষের চুল সবুজ, তাকে নিয়ে আমি কোনো কথা শুনতে চাই না।

নুবা বলল, কী বলছ মা? ক্রোমোজমের একটা জিনকে পাল্টে দিলেই চুল সবুজ হয়ে যায়। আমার যদি একটা ছোট জিনেটিক ল্যাব থাকত-

থাক। এমনিতেই পারি না, এখন আবার জিনেটিক ল্যাব।

নুবা তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, রুহান, একটা জিনেটিক ল্যাব তৈরি করতে কত ইউনিট লাগবে?

রুহান লাল রঙের পানীয়টা এক ঢোক খেয়ে বলল, সেটা তো জানি না! এখন তো আর ইউনিটেরও কোনো মূল্য নেই। পৃথিবীতে যখন নেটওয়ার্ক ছিল তখন সবকিছু করা যেত। এখন তো কিছু করারও উপায় নেই।

ত্রিনা মাথা নেড়ে বলল, পৃথিবীটা কেন এরকম হয়ে গেলা রুহান?

রুহান একটু মাথা নেড়ে বলল, সেটাই যদি জানতাম তাহলে তো কাজই হতো!

ত্রিনা একটা নিঃশ্বাস ফেলে, বার বছরের ছোট কচি একটা মুখের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান একটা বিষণ্ণতা সেখানে এসে ভর করে। বলে, সবাই মিলে

পৃথিবীকে কেন আগের মতো করে ফেলে না?

এই প্রশ্নটির উত্তর রুহানের জানা নেই। সে নিঃশব্দে খাবার টেবিলে বসে রইল।


ঘুম থেকে উঠে কী হচ্ছে বুঝতে রুহানের একটু সময় লাগল। লাথি দিয়ে দরজা খুলে তার ঘরে কয়েকজন ঢুকে গেছে। কিছু বোঝার আগেই একজন রুহানকে টেনে বিছানা থেকে তুলে নেয়, তারপর ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায়। আবছা আলোয় মানুষগুলোর চেহারা স্পষ্ট দেখা যায় না, শুধু নিষ্ঠুরতার ছাপটুকু বোঝা যায়। তারা আলগোছে লেজার গাইডেড স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলো ধরে রেখেছে, বুকের উপর গুলির বেল্ট, মাথায় রঙিন রুমাল বাঁধা। পিঠে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ঠেকিয়ে যে মানুষটি রুহানকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল তাকে সে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কারা? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?

মানুষটি রুহানকে ধাক্কা দিয়ে একটা অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করে বলল, এত খবরে তোমার দরকার কী?

রুহান হলঘরে এসে দেখল তার মা নুবা আর ত্রিনাকে দুইহাতে শক্ত করে ধরে রেখে ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের চোখে মুখে অবর্ণনীয় আতঙ্ক, নুবা ত্রিনার মুখে বিস্ময়। রুহানকে ঠেলে নিয়ে আসতে দেখে মা কাতর গলায় জিজ্ঞেস করল, আমার ছেলে কী করেছে? তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?

মানুষগুলো তার কথার কোনো উত্তর দিল না। তখন মা ছুটে এসে একজনের হাত ধরে বলল, কী হলো? তোমরা কথা বলছ না কেন? কী করেছে আমার ছেলে?

মানুষটি ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, তোমার ছেলে কিছু করে নাই।

তাহলে তাকে কেন ধরে নিয়ে যাচ্ছ? এই সময়ে কিছু না করাটাই অপরাধ।

কম বয়সী হালকা পাতলা একটা মানুষ হা হা করে হেসে উঠল, যেন খুব মজার একটা কথা শুনতে পেয়েছে। হাসতে হাসতেই বলল, ঠিকই বলেছ। সারা দুনিয়াতে মারামারি হচ্ছে আর জোয়ান একটা ছেলে কিছু না করে ঘরে বসে থাকবে মানে?

মা পিছু পিছু এসে বলল, কিন্তু আমার ছেলে তো কখনো মারামারি করে নি। কখনো কোনো অন্যায় করেনি–

হালকা পাতলা মানুষটা বলল, আমরাই কী আগে করেছি নাকি? শিখে নিয়েছি। তোমার ছেলেও শিখে নেবে। যুদ্ধ করার জন্যে যৌবন কাল হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সময়।

মা মানুষটার হাত ধরে বলল, দোহাই লাগে তোমাদের। আমার ছেলেকে তোমরা ছেড়ে দাও। তোমাদের পায়ে পড়ি–

মানুষটি ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তার মাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। ধাক্কা সামলাতে গিয়ে মা পড়ে যেতে যেতে কোনোভাবে দেওয়াল ধরে। নিজেকে সামলে নেয়। নুবা আর ত্রিনা ভয় পেয়ে ছুটে এসে তাদের মাকে দুই পাশ থেকে জাপটে ধরে ভয় পেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

রুহান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই তাকে ধাক্কা মেরে বাসার বাইরে নিয়ে এলো। রাস্তায় বড় বড় কয়েকটা লরি হেডলাইট জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লরির ইঞ্জিনগুলো ঘরঘর শব্দ করছে। গ্রামের চারপাশে ভয়ঙ্কর ধরনের কিছু মানুষ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হেডলাইটের তীব্র আলোতে এই মানুষগুলোকে কেমন যেন অস্বাভাবিক হিংস্র দেখায়। রুহান দেখতে পেল গ্রামে তার বয়সী যত যুবক সবাইকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে, ভীত মুখে তারা দাঁড়িয়ে আছে। বেশিরভাগই ঘুমের পোশাকে, চুল উষ্কখুষ্ক, চোখে মুখে হতচকিত বিভ্রান্তির ছাপ স্পষ্ট। রুহান গ্রউসকেও দেখতে পেল, তাকেও একজন ধাক্কা দিতে দিতে নিয়ে আসছে।

মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ আলগোছে একটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ধরে রেখে তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। তার মাথায় একটা রঙিন রুমাল বাঁধা, পরনে জলপাই রঙের সামরিক পোশাক। বুকের উপর গুলির বেল্ট এবং কোমর থেকে। যোগাযোগ মডিউল ঝুলছে। তার হাতে একটা জ্বলন্ত মশাল, সেটি হাতে নিয়ে

সে চিৎকার করে বলল, সবাই এক লাইনে দাঁড়াও।

ঠিক কীভাবে সবাই হঠাৎ করে এক লাইনে দাঁড়াবে, লাইনটি কী সামনে পিছনে হবে না পাশাপাশি হবে সেটা নিয়ে সবার ভেতরে এক ধরনের হুঁটোপুটি শুরু হয়ে যায়। মধ্যবয়স্ক মানুষটা এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজনের মুখে আঘাত মেরে চিৎকার করে বলল, ইঁদুরের বাচ্চার মতো ছুটাছুটি করছ কেন? পাশাপাশি দাঁড়াও সব নর্দমার পোকা।

রুহান এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে, সে অপমান কিংবা ক্রোধ অনুভব করে না, তার ভেতরে ভয় বা আতঙ্কও নেই। সত্যি কথা বলতে কী হঠাৎ করে তার বিস্মিত হবার ক্ষমতাটুকুও চলে গেছে। সে একটা অবিশ্বাস্য ঘোরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে, তার চারপাশে কী ঘটছে সে যেন ঠিক বুঝতেও পারে না। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এবং দেখল তার দুপাশে সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

নিষ্ঠুর চেহারার মধ্যবয়স্ক মানুষটি মশালের আলোতে খুব কাছে থেকে তাদের একজন একজন করে পরীক্ষা করল। যাদেরকে দুর্বল বা রুগ্ন মনে হলো। তাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল, যাও, নোংরা আবর্জনা, ছারপোকার বাচ্চারা–ভাগ এখান থেকে।

রুহানের সামনে মানুষটা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ রক্তাভ এবং শরীর থেকে এক ধরনের কটু গন্ধ বের হয়ে আসছে। রুহানের মনে হলো মানুষটা একটা কিছু বলবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু না বলে হেঁটে সামনে এগিয়ে গেল।

সবাইকে এক নজর দেখে মানুষটা আবার সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, হতভাগা জানোয়ারের বাচ্চারা, তোমাদের লজ্জা হওয়া উচিত, বিষ্ঠার সাগরে তোমাদের ড়ুবে মরা উচিত। ছারপোকার বাচ্চাদের মতো তোমাদের টিপে টিপে মারা উচিত। একেকজন এরকম দামড়া জোয়ান হয়ে তোমরা ঘরে বসে আছ, তোমাদের লজ্জা করে না?

মানুষটি সবার দিকে তাকাল, কেউ কোনো উত্তর দিল না।

কথা বলছ না কেন, আহাম্মকের বাচ্চারা?

এবারেও কেউ কোনো কথা বলল না। মধ্যবয়স্ক মানুষটা মাটিতে থুতু ফেলে বলল, এই জঙ্গলের মাঝে থাক, দুনিয়ার কোনো খোঁজ খবর রাখ না। তোমরা কী জান সারা পৃথিবীতে এখন কী হচ্ছে? মানুষটা সবার দিকে একবার মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলল, জান না! আমি জানতাম তোমরা জানবে না। সারা দুনিয়ায় এখন যুদ্ধ হচ্ছে। সবার সাথে সবার যুদ্ধ। যার গায়ে জোর আছে, যার শক্তি আছে সে টিকে থাকবে। যার জোর নাই, শক্তি নাই সে ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন তোমরা বল, তোমরা কী টিকে থাকতে চাও নাকি ধ্বংস হতে চাও?

কেউ কোনো কথা বলল না। মানুষটা তখন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা বাঁকিয়ে বলল, কেউ কথা বল না কেন?

ভয় পেয়ে কয়েকজন বিড় বিড় করে বলল, টিকে থাকতে চাই।

চমৎকার! মানুষটা তার নোংরা দাঁত বের করে হাসার চেষ্টা করে বলল, আমরা তোমাদের টিকে থাকার একটা সুযোগ করে দেব। এই নতুন পৃথিবীতে নতুন নিয়ম। যার জোর আছে, ক্ষমতা আছে সে যেটা বলবে সেটাই হবে। নিয়ম। যার জোর নাই সে মাথা নিচু করে সেই নিয়ম মানবে। বুঝেছ?

রুহান একটু অবাক হয়ে মধ্যবয়স্ক মানুষটির দিকে তাকাল। গ্রাউস যে কথাগুলো বলেছিল এই মানুষটি ঠিক সেই কথাটাই বলছে। তাহলে কী নতুন পৃথিবীতে এইটাই নিয়ম? যার ক্ষমতা আছে সে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে? পৃথিবীতে ন্যায় অন্যায় বলে কিছু থাকবে না? সত্যি-মিথ্যা বলে কিছু থাকবে না? যার ক্ষমতা আছে সে যত বড় দানবই হোক, তার ইচ্ছেটাই হবে সব?

ঠিক তখন কে যেন কিছু একটা বলল, মধ্যবয়স্ক মানুষটা সেদিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে মাথা উঁচু করে বলল, কে কথা বলে?

রুহান এবারে শুনল গ্রাউস বলছে, আমি। আমি কথা বলছি।

তুমি কী বলতে চাও ছেলে?

গ্রাউস উত্তেজিত গলায় বলল, তুমি যেটা বলছ আমিও সেটা বলি। আমাদের গ্রামে আমি সেটা শুরু করেছি।

তুমি শুরু করেছ?

হ্যাঁ।

কী শুরু করেছ?

এই গ্রামে আমার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, আমি তাই সবাইকে বলেছি আমার ইচ্ছাটাই নিয়ম। আমি যা খুশি তা করতে পারি।

সত্যি?

হ্যাঁ। তুমি ওদের জিজ্ঞেস করে দেখ–সবাই এখন আমাকে ভয় পায়।

মধ্যবয়স্ক মানুষটার মুখে বিচিত্র একটা হাসি ফুটে উঠল। মাথা নেড়ে বলল, তুমি সামনে এসো।

গ্রাউস তখন সামনে এগিয়ে গেল। মধ্যবয়স্ক মানুষটা মশালের আলোতে গ্রাউসকে ভালো করে দেখে তারপর অন্য সবার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা আসলেই একে ভয় পাও?

কয়েকজন বিড়বিড় করে অস্পষ্ট গলায় কিছু একটা বলল, তার উত্তর হ্যাঁ কিংবা না দুটোই হতে পারে।

গ্রাউস গলায় একটু উত্তেজনা এনে বলল, আমার সোলার প্যানেলটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি একজনের বাসা থেকে সেটা খুলে এনেছি। কেউ কিছু বলতে সাহস পায়নি। সেদিন কমবয়েসী একটা মেয়েকেও তুলে আনতে গিয়েছিলাম-

চমৎকার! মধ্যবয়স্ক মানুষটার মুখে হাসি আরও বিস্তৃত হয়, পৃথিবীর নতুন নিয়মটা তুমি তোমার গ্রামে চালু করে দিয়েছ, জোর যার ক্ষমতা তার?

গ্রাউসের মুখে বাঁকা একটা হাসি ফুটে ওঠে, সে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।

মধ্যবয়স্ক মানুষটা কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে গ্রাউসের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর হঠাৎ করে হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা তুলে গ্রাউসের মাথায় ধরে বলল, দেখি তোমার কতটুকু ক্ষমতা।

মুহূর্তে গাউসের মুখ রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সে বিস্ফারিত চোখে মধ্যবয়স্ক নিষ্ঠুর মানুষটার মুখের দিকে তাকাল। খুব বড় একটা রসিকতা হচ্ছে এরকম একটা ভান করে নিষ্ঠুর চেহারার মধ্যবয়সী মানুষটা ট্রিগার টেনে ধরে। কর্কশ কান ফাটানো একটা শব্দ হলো, রুহান শিউরে উঠে দেখল গ্রাউসের দেহটা একটু লাফিয়ে উঠে নিচে পড়ে যায়। রুহানের মনে হলো সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে, অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করে সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মধ্যবয়স্ক মানুষটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা আবার আলগোছে ধরে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, আর কেউ আছে নাকি?

কেউ কোনো কথা বলল না। মধ্যবয়স্ক মানুষটা বলল, কী শিখলে তোমরা। এই ঘটনা থেকে?

এবারেও কেউ কোনো কথা বলল না। মানুষটা সহৃদয় ভঙ্গিতে হেসে বলল, আসলে তোমরা নতুন কিছু শেখ নাই। আমি যেটা বলেছি সেটা শুধু তোমাদের হাতে কলমে দেখালাম, এর বেশি কিছু নয়। আমার হাতে অস্ত্র তাই আমার কাছে ক্ষমতা। আমি যাকে ইচ্ছা খুন করতে পারি। পৃথিবীর কেউ কিছু করতে পারবে না। মধ্যবয়স্ক মানুষটা পা দিয়ে গ্রাউসকে দেখিয়ে বলল, এই আহাম্মকটা দাবি করছিল তার অনেক ক্ষমতা! আসলে তার কোনো ক্ষমতাই ছিল না। খালি হাতে ক্ষমতা হয় না! ক্ষমতার জন্যে দরকার অস্ত্র। বুঝেছ?

দুই-একজন দুর্বলভাবে মাথা নাড়ল। মানুষটা হাতের মশালটা একটু উপরে তুলে বলল, তোমাদের সবার হাতে আমি অস্ত্র দেব। আমি দেখব তোমাদের কয়জন সেই অস্ত্রের মর্যাদা রাখতে পারে।

রুহান নিঃশব্দে মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার এখনো বিশ্বাস হতে চায় না যে তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে সত্যিই একজন মানুষ! তার যে কথাগুলো সে শুনছে, সত্যিই একজন মানুষ সেগুলো বলছে।

মানুষটি এবার আস্তে আস্তে হেঁটে তাদের দিকে এগিয়ে এলো। কাছাকাছি। এসে নিচু গলায় বলল, তোমরা সবাই এখন এই লরিগুলোর পিছনে গিয়ে ওঠ। আমি ঠিক পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি।

সবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একজন ভাঙ্গা গলায় বলল, আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?

মানুষটি শীতল গলায় বলল, আমি কী তোমাদের বলেছি যে তোমরা আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে? বলেছি?

কেউ কোনো কথা বলল না। মানুষটি এবারে হুংকার দিয়ে বলল, সবাই গরিতে ওঠ। যে পিছনে পড়ে থাকবে সে পিছনেই পড়ে থাকবে। অকর্মা বেজন্মা আহম্মকদের এই পৃথিবীতে কোনো জায়গা নেই।

ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সশস্ত্র মানুষগুলো হঠাৎ করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলো তুলে ২৩স্তত গুলি করতে থাকে। প্রচণ্ড গুলির শব্দে তাদের কানে তালা লেগে যায়। তার মাঝে ভয়ে আতঙ্কে অধীর হয়ে সবাই ছোটাছুটি করে লরিতে উঠতে থাকে। পায় সাথে সাথেই লরিগুলোর ইঞ্জিন গর্জন করে পাথুরে পথের উপর দিয়ে ছুটে (ঠতে শুরু করে। হৃদের পাশ দিয়ে যাবার সময় রুহান তাদের ছোট বাসাটা দেখতে পেল। বাসার দরজায় মূর্তির মতো তার মা ছোট বোন দুটিকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়া হলো না, রুহান জানে না আর কোনোদিন তাদের সাথে দেখা হবে কি না।

লরির পিছনে পা ঝুলিয়ে চারজন সশস্ত্র মানুষ বসে আছে। একটু আগেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করে তারা একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করছিল। লরি চলতে শুরু করার সাথে সাথে তারা বেশ সহজ ব্যবহার করতে শুরু করল। একজন বেসুরো গলায় গান গাওয়ার চেষ্টা করে, অন্যেরা সেটা নিয়ে হাসি তামাশা করে।

রুহানের পাশে তাদের গ্রামের সবচেয়ে নিরীহ ছেলে কিলি বসেছিল, অন্ধকারে দেখা যায় না কিন্তু রুহান মোটামুটি নিশ্চিত, সে বসে বসে কাঁদছে। এক সময় ভাঙ্গা গলায় জিজ্ঞেস করল, আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে রুহান।

রুহান বলল, আমি জানি না।

তোমার কী মনে হয় রুহান, আমাদের কি মেরে ফেলবে?

কেন? শুধু শুধু মেরে ফেলবে কেন?

গ্রাউসকে যে মেরে ফেলল।

গ্রাউসকে মেরেছে কারণ সে ছিল আহাম্মক। তুমি আর আমি কী আহাম্মক?

কিলি মাথা নেড়ে বলল, না। আমরা আহাম্মক না। কিন্তু—

কিন্তু কী?

আমার খুব ভয় করছে।

রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যখন ভয় পাবার কথা তখন ভয় পেতে হয়। যারা কখনো ভয় পায় না তারা স্বাভাবিক না।

কিলি বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে লরিগুলো সারি বেঁধে ছুটে চলেছে। চাঁদ ড়ুবে গিয়ে বাইরে অন্ধকার। শরতের শেষ রাতের হিমেল বাতাসে রহান একটু শিউরে উঠল, এভাবে ধরে নিয়ে যাবে জানলে সে নিশ্চয়ই একটা গরম জ্যাকেট পরে আসত।

কিলি আবার গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, রুহান।

বলো।

ওরা আমাদের নিয়ে কী করবে বলে তোমার মনে হয়?

রুহান মাথা নেড়ে বলল, জানি না।

আমাদের অস্ত্র চালানো শেখাবে, যুদ্ধ করতে শেখাবে এটা কী তোমার সত্যি মনে হয়।

হতেও পারে। পৃথিবীতে এখন খুব খারাপ সময়। সব জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে। পৃথিবীতে যুদ্ধ করার মানুষের খুব অভাব।

কিলি একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার খুব অস্থির লাগছে রুহান।

রুহান কিলির ঘাড়ে হাত রেখে বলল, ধৈর্য ধরো কিলি, দেখবে এক সময়। সব ঠিক হয়ে যাবে।

ঠিক এরকম সময়ে হঠাৎ করে চারদিক থেকে গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। পা ঝুলিয়ে বসে থাকা চারজন অস্ত্র তাক করে উবু হয়ে বসে গেল। একজন চাপা গলায় বলল, সবাই মেঝেতে মাথা নিচু করে শুয়ে থাক। উঠবে না। খবরদার।

রুহান অন্য সবার সাথে মাথা নিচু করে মেঝেতে শুয়ে থাকে। শুনতে পায় তাদের মাথার উপর দিয়ে শিস দেবার মতো শব্দ করে গুলি ছুটে যাচ্ছে। লরিতে বসে থাকা চারজন সশস্ত্র মানুষ ছাড়া ছাড়া ভাবে গুলি করছে, তার শব্দে তাদের কানে তালা লেগে যাবার মতো অবস্থা।

যেভাবে গুলি শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই হঠাৎ করে গুলি থেমে গেল। সশস্ত্র মানুষগুলো আবার পা ঝুলিয়ে বসে হালকা গলায় কথা বলতে শুরু করে। তাদের দেখে মনেই হয় না একটু আগে সবাই এত ভয়ঙ্কর গোলাগুলির ভেতর দিয়ে এসেছে। আর সেই ভয়ঙ্কর গোলাগুলিতে যে কেউ মারা পড়তে পারত।

রুহান একটু এগিয়ে গিয়ে বলল, শোনো। তোমাদের সাথে আমি একটু কথা বলতে পারি।

একজন মাথা ঘুরিয়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা শক্ত করে ধরে রেখে বলল, কী কথা?

সাধারণ কথা।

মানুষটি কঠিন গলায় বলল, তোমরা ভেতরে এতজন আছ, নিজেদের ভেতরে কথা বল। আমাদের সাথে কেন কথা বলতে চাইছ?

রুহান বলল, ভেতরে যারা আছে এখন তাদের কারো কথা বলার আগ্রহ নেই।

সে খুব একটা মজার কথা বলেছে সেরকম ভাব করে মানুষটা শব্দ করে হেসে উঠল। বলল, কেন? কথা বলার আগ্রহ নেই কেন?

তোমাদের যদি কেউ মাঝরাতে ঘর থেকে ধরে নিয়ে যেত তাহলে তোমাদেরও কথা বলার কোনো আগ্রহ থাকত না।

পা ঝুলিয়ে বসে থাকা অন্য একজন বলল, এই! এ তো কথাটা মিথ্যা বলে নাই। মনে আছে আমাদের যেদিন ধরে এনেছিল, তখন আমরা কী ভয় পেয়েছিলাম?

রুহান জিজ্ঞেস করল, তোমাদেরকেও ধরে এনেছিল!

ধরে না আনলে কেউ নিজে থেকে আসবে নাকি?

কেন ধরে এনেছিল?

মানুষটা হাত দিয়ে পুরো বিষয়টা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে বলল, দুদিন পরে তো নিজেরাই দেখবে। এখন এত কৌতূহল কেন?

রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কৌতূহল খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার।

মানুষটা মাথা নাড়ল, চলন্ত লরি থেকে পিচিক করে নিচে একটু থুতু ফেলে বলল, ব্যবসা।

রুহান বলল, ব্যবসা?

হ্যাঁ। ব্যবসা।

কিসের ব্যবসা?

মানুষের। তোমাদের ধরে এনেছি বিক্রি করার জন্যে।

বিক্রি করার জন্যে?

হ্যাঁ।

রুহান নিঃশ্বাস আটকে রেখে বলল, কার কাছে বিক্রি করবে?

যে ভালো দাম দেবে তার কাছে।

রুহান এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না। কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, যারা ভালো দাম দেবে তাদের কাছে বিক্রি করে দেবে?

হ্যাঁ। অনেক বড় বড় পার্টি আছে। এখন সবচেয়ে বড় যে পার্টি তার নাম ক্রিভান।

ক্রিভান?

হ্যাঁ। সে এখন সবচেয়ে ক্ষমতাশালী। রাতকে দিন করতে পারে দিনকে রাত।

তারা আমাদের নিয়ে কী করবে?

যুদ্ধ করার জন্যে অনেক মানুষের দরকার। ভালো যোদ্ধা পাওয়া খুব সোজা কথা না।

পা ঝুলিয়ে বসে থাকা অন্য একজন বলল, সবাইকে তো আর যুদ্ধ করার। জন্যে কেনে না, অন্য কাজেও কেনে।

অন্য কী কাজে কেনে?

যদি কারো ভালো বুদ্ধি-শুদ্ধি থাকে তাহলে তার মগজটা ব্যবহার করা হয়। মাথার মাঝে ফুটো করে ইলেকট্রড ঢুকিয়ে দেয়। বাইরে থেকে ইমপালস পাঠিয়ে হিসেব নিকেশ করে। তাদেরকে বলে সক্রেটিস।

রুহান নিজের অজান্তে কেমন যেন শিউরে উঠল, সশস্ত্র মানুষটি সেটা লক্ষ্য করল না। খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ক্লোন করার মেশিন তো আজকাল আর পাওয়া যায় না। তাই অনেক সময় হৃৎপিণ্ড, কিডনি, ফুসফুস এইগুলোর জন্যেও বিক্রি হয়। ভালো একজোড়া কিডনির অনেক দাম।

প্রথম মানুষটি বলল, সবচেয়ে বেশি দামে কী বিক্রি হয় জান?

কী?

খেলোয়াড়।

রুহান অবাক হয়ে বলল, খেলোয়াড়?

হ্যাঁ। একটা খেলোয়াড় মগজে ইলেকট্রড লাগানো সক্রেটিস থেকেও একশ দুইশ গুন বেশি দামে বিক্রি হয়।

কীসের খেলোয়াড়?

মানুষটি হাত নেড়ে পুরো ব্যাপারটা শেষ করে দেবার ভঙ্গি করে বলল, সবকিছু আগেই জেনে ফেললে হবে কেমন করে? সময় হলে জানবে।

দ্বিতীয়জন বলল, এখন তোমরা ঘুমাও। অনেক দূর যেতে হবে।

প্রথমজন বলল, এত দামি কারগো নিচ্ছি রাস্তাঘাটে অনেক হামলা হবে। গোলাগুলি শুরু হলেই তোমরা মেঝেতে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকবে। বুঝেছ?

রুহান মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি।

রুহান তার নিজের জায়গায় ফিরে আসে। পা ছড়িয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মা আর দুই বোন নুবা আর ত্রিনা এখন কী করছে কে জানে। সে কী আর কোনোদিন তাদের কাছে ফিরে যেতে পারবে?

পাহাড়ী একটা পথ দিয়ে গর্জন করে লরিগুলো ছুটে যাচ্ছে। বাইরে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে কত রকম অজানা বিপদ গুড়ি মেরে আছে। রুহান জানে আজ রাতে তার চোখে ঘুম আসবে না।

কিন্তু নিজেকে অবাক করে দিয়ে সে একসময় ঘুমে ঢলে পড়ল।


ঘরঘর শব্দ করে লরির পিছনের দরজাটা খুলে গেল, চোখে রোদ পড়তেই রুহান ধড়মড় করে জেগে ওঠে। একজন মানুষ তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটাতে। একটা ঝাকুনি দিয়ে চিৎকার করে বলল, নামো সবাই। কোনো সময় নষ্ট করবে না-তাহলে কপালে দুঃখ আছে।

কপালে কী ধরনের দুঃখ থাকতে পারে সেটা নিয়ে কেউ কৌতূহল দেখাল, সবাই হুঁটোপুটি করে নামতে শুরু করল। চারপাশে কংক্রীটের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা বড় একটা জায়গা, ছাড়া ছাড়াভাবে সেখানে কয়েকটা বড় গাছ, গাছে ধূলায় ধূসর বিবর্ণ পাতা। একটু সামনে কংক্রীটের একটা দালান। মাঝামাঝি একটা বড় লোহার দরজা, এ ছাড়া আর কোনো দরজা-জানলা নেই। এরকম কুৎসিত এবং মনখারাপ করা কোনো দালান রুহান আগে দেখেছে বলে মনে করতে পারল না।

স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে মানুষগুলো সবাইকে ঘিরে রেখে এগিয়ে নিয়ে যায়। কুৎসিত দালানের সামনে পৌঁছতেই লোহার ভারী দরজাটা ঘরঘর শব্দ করে খুলে গেল। কেউ বলে দেয়নি কিন্তু সবাই বুঝে গেল তাদের এখন ভেতরে ঢুকতে হবে। রুহান ভেতরে পা দেবার আগে একবার পিছন ফিরে তাকাল। তার কেন জানি মনে হলো একবার ভেতরে ঢুকে গেলে তার জীবনটা একেবারেই পাল্টে যাবে। সেই জীবন থেকে আর কখনোই সে আর ফিরে আসতে পারবে না।

লম্বা একটা করিডোর ধরে তারা এগিয়ে যায়। মাঝখানে একটা বড় হলঘরের মতো, সেখানে উঁচু ছাদ থেকে হলদে এক ধরনের আলো ঝুলছে। কংক্রীটের ধূসর দেয়াল, পাথরের অমসৃণ মেঝে। হলঘরের মাঝামাঝি কঠোর চেহারার একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা ঝাঁকিয়ে সে বলল, তোমাদের এক ঘণ্টা সময় দেয়া হলো প্রস্তুত হবার জন্যে। এর মাঝে তোমরা তোমাদের নোংরা পোশাক খুলে গরম পানি দিয়ে গোসল করো। টিবিলে গরম স্যুপ, মাংসের স্টু আর রুটি রাখা আছে-ঝটপট কিছু খেয়ে নাও। তারপর একাডেমীর পোশাক পরে বের হয়ে এসো।

কোথায় বের হয়ে আসবে, তারপর কী করবে এ ধরনের খুঁটিনাটি জিনিস জানার একধরনের কৌতূহল হচ্ছিল কিন্তু রুহান কিছু জিজ্ঞেস করার আগ্রহ পেল না। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে কঠোর চেহারার মানুষটা হলঘরের পিছনের দিকে একটা দরজা দেখিয়ে দেয় এবং সাথে সাথে সবাই হুঁটোপুটি করে সেদিকে ছুটে যেতে শুরু করে।

দরজার কাছাকাছি একজন রুহানের কনুই খামচে ধরল। রুহান মাথা ঘুরিয়ে কিলিকে দেখতে পায়। কিলি ফ্যাকাসে মুখে বলল, রুহান।

কী হয়েছে।

এখন আমাদের কী করবে বলে তোমার মনে হয়?

কেমন করে বলি!

আমাদের কী মেরে ফেলবে বলে মনে হয়?

রুহান হেসে বলল, যদি আমাদের মেরেই ফেলবে, তাহলে এত কষ্ট করে ধরে এনেছে কেন?

হয়তো আমাদের কিডনি, ফুসফুস, লিভার এগুলো কেটেকুটে নেবে।

যদি নিতে চায় নেবে, তার জন্যে আগে থেকে দুশ্চিন্তা করে লাভ নেই। সময় হলে দেখা যাবে। এখন যেটা করতে বলেছে সেটা করো। গোসল করো, নতুন পোশাক পরে পেট ভরে খাও।

কিলি মাথা নেড়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ।

রুহান গলা নামিয়ে বলল, এরা খুব খারাপ মানুষ। তাই সাবধান! আগ শাড়িয়ে কিছু করবে না, নিজে থেকে কিছু করবে না। তারা যেটা বলছে শুধু সেটা করবে। সবার আগে থাকবে না, সবার পিছেও থাকবে না। সবসময় মাঝামাঝি থাকবে। ঠিক আছে?

কিলি মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে।

প্রায় ফুটন্ত গরম পানিতে নগ্ন হয় সারা শরীর রগড়ে রগড়ে রুহান গোসল করল। দেয়ালে আলখাল্লার মতো কালো রঙের এক ধরনের পোশাক ঝুলছিল, সেটা পরে নিয়ে সে খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। সবাই বুভুক্ষের মতো খাচ্ছে। বিষয়টি কেমন জানি অস্বস্তিকর, এভাবে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার দৃশ্যে এক ধরনের অমানবিক নিষ্ঠুরতা আছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, চোখ সরিয়ে নিতে হয়। রুহান এগিয়ে একটা ছোট বাটিতে খানিকটা স্টু ঢেলে একপাশে সরে দাঁড়াল। তার খুব খিদে পেয়েছে কিন্তু কেন জানি খেতে ইচ্ছে করছে না, মনে হচ্ছে এই পুরো বিষয়টিতে এক ধরনের লজ্জা ও এক ধরনের অসম্মান রয়েছে। রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে পুরো বিষয়টি নিজের ভেতর থেকে সরিয়ে ফেলতে চেষ্টা করে। অন্যমনস্কভাবে শুকনো রুটি ছিঁড়ে স্টুতে ভিজিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করে। বিস্বাদ খাবার, খুব খিদে পেয়েছে তা না হলে এরকম খাবার খেতে পারত কী না সন্দেহ রয়েছে।

খাবার পর সবাই আবার বড় হলঘরটির মাঝে একত্র হলো। হলঘরের মাঝামাঝি বেশ কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তারা সবাইকে সারি করে দাঁড় করাল। তারপর একজন একজন করে সামনে একটা ছোট ঘরে পাঠাতে শুরু করল।

ভেতরের ঘরগুলোতে কী হচ্ছে বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না। রুহান। অনুমান করতে পারে সেখানে সবাইকে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তাদেরকে ধরে এনেছে বিক্রি করার জন্যে, কার জন্যে কত দাম ধরা হবে সেটা নিশ্চয়ই এখন ঠিক করা হচ্ছে। সেটা কীভাবে ঠিক করা হবে? বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা নেবে? শারীরিক পরীক্ষা নেবে? মানুষকে যখন পণ্য হিসেবে বিক্রি করা হয়, তখন এই পরীক্ষাগুলোর কী কোনো অর্থ আছে? একেবারে সাধারণ একজন মানুষই কী উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় অসাধারণ হয়ে ওঠে না? তাকে যখন পণ্য হিসেবে বেচা-কেনা করা হয় তখন কী তার ভেতরে কোনোভাবে সেই উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা জন্ম নিতে পারে?

প্রথমে কিছুক্ষণ রুহানের ভেতর খানিকটা কৌতূহল ছিল। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় তার কৌতূহলটুকু উবে গেল। শেষ পর্যন্ত তাকে যখন ছোট ঘরটিতে ডেকে নেয়া হলো তখন রুহানের ভেতরে এক ধরনের ক্লান্তি এসে ভর করেছে।

ছোট ঘরটিতে একটা উঁচু বিছানা, তার পাশে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। মহিলাটি তার দিকে কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ো।

রুহান কোনো কথা না বলে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মহিলাটি উপর থেকে কিছু যন্ত্রপাতি নামিয়ে এনে তাকে পরীক্ষা করতে থাকে। ত্বক থেকে টিস্যু নিয়ে জিনেটিক কোডিং করা হলো, রক্ত নিয়ে তার শ্রেণীবিভাগ করা হলো, রক্তচাপ মাপা হলো, শরীরের ঘনত্ব মেপে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিন্যাস নির্ধারণ করা হলো, নিউরনের সংখ্যা সিনাঙ্গের ঘনত্ব পরীক্ষা করা হলো সবশেষে তার হাতের ত্বকে ছ্যাকা দিয়ে বেগুনি রঙের একটা বিদঘুটে চিহ্ন একে দেয়া হলো।

রুহান হাতটা নিজের কাছে টেনে এনে বলল, এটা তুমি কী করলে?

মহিলাটি একটু অবাক হয়ে রুহানের দিকে তাকাল, মনে হলো সে কারো প শুনতে অভ্যস্ত নয়। মহিলাটি প্রশ্নের উত্তর দেবে রুহান সেটা আশা করেনি। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মহিলাটি খসখসে গলায় বলল, এটা তোমার কোড। তোমার ত্বক কেটে পাকাপাকিভাবে লিখে দেয়া হয়েছে, এটা কখনো মুছে যাবে না।

রুহান ক্রুদ্ধ চোখে তার হাতের উপর একে দেয়া বিদঘুটে চিহ্নগুলো পরীক্ষা করতে করতে বলল, আমার কোডটা কী অন্যভাবে দেয়া যেত না?

আমরা এমনভাবে দিই যেন আমাদের কোড রিডার সেটা পড়তে পারে।

তোমাদের কোড রিডার?

হ্যাঁ। তোমার তথ্যগুলো আমাদের তথ্যকেন্দ্রে রাখতে হবে।

তার জন্যে আরো আধুনিক কোনো উপায় ব্যবহার করা যেত না? কোনো ইলেকট্রনিক পদ্ধতি, কোনো বায়োজিনেটিক পদ্ধতি

মহিলাটির মুখে প্রথমবার এক ধরনের হাসি ফুটে ওঠে, একজন মানুষের চেহারায় যত নিষ্ঠুরতার ছাপই থাকুক না কেন, হাসি সেটা সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কোনো একটি বিচিত্র কারণে এই মহিলার বেলায় সেটি ঘটল না, তার মুখের হাসিতে তাকে কেমন যেন ভয়ঙ্কর দেখাতে থাকে। মহিলাটি সেই ভয়ঙ্কর মুখে ফিস ফিস করে বলল, ছেলে, তুমি পৃথিবীর কোনো খবর রাখ না?

রুহান একটু অবাক হয়ে বলল, কেন? কী হয়েছে?

পৃথিবীতে এখন ইলেকট্রনিক্স বা বায়োজিনেটিক পদ্ধতি বলে কিছু নেই। পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান নেই। কোনো প্রযুক্তি নেই। পৃথিবী এখন অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে! যে যত তাড়াতাড়ি এই অন্ধকারে অভ্যস্ত হতে পারবে সে তত বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে। বুঝেছ?

রুহান তার হাতের বিচিত্র চিহ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, এই চিহ্নগুলো সেই অন্ধকারের চিহ্ন?

হ্যাঁ। প্রাচীনকালে মানুষ তাদের পশুদের হিসেব রাখার জন্যে লোহার শিক গরম করে কিছু চিহ্ন এঁকে দিত। এখন আমরা সেটা মানুষের জন্যে করি। মহিলাটি স্থির চোখে রুহানের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, বুঝেছ?

বুঝেছি।

চমৎকার! এখন পাশের ঘরে যাও।

রুহান পাশের ঘরে যাবার জন্যে উঁচু বিছানা থেকে নেমে এলো। মহিলাটি বের হবার দরজাটি দেখিয়ে বলল, আর শোনো। তোমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার আগে কথা বলবে না। এটা স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি না, এখানে শেখার কিছু নেই। এটা একটা দোকান ঘর। তোমাদের ধরে এনে তোমাদের দাম ঠিক করা হচ্ছে, তার বেশি কিছু নয়।

রুহান পাশের ঘরে যেতে যেতে থেমে গিয়ে বলল, প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে কী হয়?

সেটা জানার জন্যে আগ্রহ দেখিও না। যাও। বিদায় হও।

রুহান পাশের ঘরে এসে দাঁড়াল। এখানে বসার জন্যে একটা চেয়ার, সামনে নিচু টেবিল। সেখানে বিচিত্র কিছু জিনিস। টেবিলের অন্য পাশে দুটি চেয়ারে দুজন মানুষ বসে আছে, মানুষ দুজনের মুখ ভাবলেশহীন, তারা রুহানের দিকে তাকিয়ে তাকে বসার জন্যে ইঙ্গিত করল।

রুহান বসে টেবিলের উপরে ভালো করে তাকায়, নানা ধরনের জ্যামিতিক নকশা, কিছু কাগজ, কিছু বিচিত্র ছবি তার সাথে ছোটখাটো কিছু যন্ত্রপাতি। মানুষ দুজনের একজন বলল, দেখি তোমার হাতটা দেখাও।

রুহান একটু আগে বিদঘুটে চিহ্ন এঁকে দেয়া হাতটা মানুষটার সামনে এগিয়ে দেয়। চিহ্নগুলোতে কিছু একটা ছিল যেটা দেখে মানুষটা একটু সোজা হয়ে বসে রুহানকে ভালো করে দেখল। সে টেবিল থেকে একটা ছবি তুলে এনে রুহানকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, এটা কীসের ছবি?

ছবিটা দেখে মনে হয় সেখানে সাদা এবং কালো রং বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, কিন্তু রুহান একটু ভালো করে দেখেই বুঝতে পারল, আসলে ছবিটি একটি মেয়ের। কালো চুল ছড়িয়ে সবগুলো দাঁত বের করে হাসছে, চট করে সেটা বোঝা যায় না। রুহান বলল, এটা একটা মেয়ের ছবি।

মানুষ দুজন এবার নিজেদের ভেতর দৃষ্টি বিনিময় করল। সম্ভবত খুব বেশি মানুষ বিক্ষিপ্ত সাদা কালো রঙের মাঝে মেয়ের ছবিটি খুঁজে পায় না। দুজন মানুষের ভেতর তুলনামূলকভাবে বয়স্ক মানুষটি গলা পরিষ্কার করে বলল, আমি তোমাকে কয়েকটা সংখ্যা বলব। সেগুলো শুনে তুমি তার পরের সংখ্যাটি বলবে।

রুহান তার গলায় ঝোলানো ক্রিস্টাল রিডারটি হাত দিয়ে স্পর্শ করে বলল, ঠিক আছে।

তার আগে তোমার ক্রিস্টাল রিডার বন্ধ করে নাও।

রুহান অবাক হয়ে বলল, ক্রিস্টাল রিডার বন্ধ করে নেব?

হ্যাঁ।

তাহলে সংখ্যাগুলো মনে রাখব কেমন করে?

সংখ্যাগুলো তোমার মাথায় রাখতে হবে।

মাথায়?

হ্যাঁ। বন্ধ কর।

রুহান অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মানুষ দুজনের দিকে তাকিয়ে ক্রিস্টাল রিডার বন্ধ করে দিল। বয়স্ক মানুষটি বলল, সংখ্যাগুলো হচ্ছে এক এক দুই তিন পাঁচ আট তেরো একুশ চৌত্রিশ–

ক্রিস্টাল রিডারটি চালু থাকলে সংখ্যাগুলো সেখানে রেকর্ড হয়ে যেত, তাকে নিচু গলায় শুনিয়ে দিত। এখন পুরোটা তাকে মনে রাখতে হচ্ছে। সংখ্যা হলো এক এক দুই তিন পাঁচ আট-হঠাৎ করে রুহান বুঝে ফেলে আগের দুটি সংখ্যা যোগ করে পরের সংখ্যাটি তৈরি হচ্ছে। তার মানে তারা যে সংখ্যাটি জানতে চাইছে সেটি হচ্ছে একুশ এবং চৌত্রিশের যোগফল, পঞ্চান্ন। রুহান একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, পঞ্চান্ন।

মানুষ দুজনই এবারে সোজা হয়ে বসল। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় কিছু একটা বলল, তারপর আবার রুহানের দিকে তাকাল। তুলনামূলকভাবে কমবয়সী মানুষটি বলল, আমি তোমাকে ত্রিমাত্রিক একটা ছবি দেখাব। ছবিটি দেখে তোমাকে তার পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফল বলতে হবে।

আমি কী এবার ক্রিস্টাল রিডারটি চালু করতে পারি?

মানুষটি মাথা নেড়ে বলল, না।

রুহান একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে।

মানুষটি টেবিল থেকে একটা কার্ড তুলে সোজা করে ধরল। বেশ কয়েকটি টিউব দিয়ে তৈরি একটি ত্রিমাত্রিক ছবি। পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফল বের করার জন্যে সামনে পিছনে ডানে বামে এবং উপর নিচে এই ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে টিউবগুলোর ক্ষেত্রফল বের করে যোগ দিতে হবে। ছবিটির দিকে তাকিয়ে রুহান হঠাৎ করে বুঝতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে এর ক্ষেত্রফল বের করা সম্ভব। টিউবগুলো গুনে সেটাকে ছয় গুণ করতে হবে। সেখান থেকে যে পৃষ্ঠাগুলো একটা আরেকটাকে স্পর্শ করে আছে সেগুলো বাদ দিতে হবে। রুহান চট করে ত্রিমাত্রিক ছবিটির ক্ষেত্রফল বের করে নেয়।

কমবয়সী মানুষটি জিজ্ঞেস করল, কত?

উত্তরটা বলতে গিয়ে হঠাৎ রুহান থমকে গেল। তাদের যখন লরি করে আনছিল তখন মানুষগুলো তাদের একটা কথা বলেছিল। তারা বলেছিল যাদের বুদ্ধি থাকে তাদের মগজে ইলেকট্রড ঢুকিয়ে সেটাকে ব্যবহার করা হয়। তার বুদ্ধির পরীক্ষা নিচ্ছে, সে যদি এই পরীক্ষায় ভালো করে তাহলে কী তার মগজেও ইলেকট্রড ঢুকিয়ে দেবে? সর্বনাশ!

কী হলো? কমবয়সী মানুষটি বলল, উত্তর দাও।

রুহান উওর দিল। সঠিক উত্তরটি না দিয়ে সে একটা ভুল উত্তর দিল। সঠিক উত্তরের কাছাকাছি একটা ভুল উত্তর।

কমবয়সী মানুষটার চোখে মুখে একটা আশাভঙ্গের ছাপ পড়ে। সে খানিকটা কৌতূহল নিয়ে বলল, ঠিক করে বল।

রুহান আবার চিন্তা করার ভান করে নতুন একটা উত্তর দিল। সেটিও ভুল।

মানুষ দুজন আবার একজন আরেকজনের দিকে তাকায় তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে। রুহান চোখে মুখে হতাশার চিহ্ন ফুটিয়ে বলল, হয় নি?

না।

ক্রিস্টাল রিডারটা চালু করলেই বলতে পারতাম।

ক্রিস্টাল রিডার ছাড়াই বলতে হবে। এটাই নিয়ম।

ও।

বয়স্ক মানুষটি গোমড়া মুখে বলল, ঠিক আছে তোমাকে আবার কয়েকটি সংখ্যা বলি, তুমি তার পরেরটা বলবে।

ঠিক আছে। বল।

মানুষটা একটা কার্ড দেখে বলল, এক দুই দুই চার তিন আট চার ষোল।

রুহান সংখ্যাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করে। সবসময় ক্রিস্টাল রিডার ব্যবহার করে কাজ করে এসেছে, কিছু একটা মনে রাখতে হলে ক্রিস্টাল রিডার সেটা মনে রেখেছে। যখন প্রয়োজন তাকে পড়ে শুনিয়েছে কিন্তু নিজের কানে শুনে নিজে মনে রাখা সম্পূর্ণ অন্য একটা ব্যাপার। রুহান সংখ্যাগুলো মাথার মাঝে সাজিয়ে নিয়ে ভেতরের মিলটুকু খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় কোনো মিল নেই কিন্তু একটু চিন্তা করতেই হঠাৎ করে পুরোটুকু স্পষ্ট হয়ে যায় এর মাঝে দুটো ধারা লুকানো, একটি এক দুই তিন চার অন্যটি দুই চার আট ষোল, তাই এর উত্তর হচ্ছে পাঁচ। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

বয়স্ক মানুষটি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, কত?

রুহান নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, জানি না।

জানি না বললে হবে না। একটা উত্তর দিতে হবে।

ঠিক আছে। রুহান সরলভাবে বলল, বত্রিশ।

বয়স্ক মানুষটা বলল, হয় নি।

তাহলে কী চব্বিশ?

না। এবারেও হয় নি?

রুহান বলল, আমি দুঃখিত।

বয়স্ক মানুষটা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলে একটা ক্রিস্টাল রিডারে কিছু একটা রেকর্ড করিয়ে নিয়ে রুহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, পাশের ঘরে যাও।

আমি কী পাস করেছি?

না, তুমি পাস করো নি। প্রথমে ভেবেছিলাম পাস করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত করতে পার নি।

কম বয়সী মানুষটা বলল, সেটা নিয়ে মন খারাপ করো না। তারপর নোংরা হলুদ দাঁত বের করে হেসে বলল, তোমার কপাল ভালো যে পাস কর নাই। এই পরীক্ষায় পাস করলে কপালে দুঃখ আছে।

মানুষ দুজন দুলে দুলে হাসতে থাকে এবং সেটা দেখে রুহান কেমন যেন। শিউরে ওঠে। সে খুব বাচা বেঁচে গেছে, আর একটু হলেই এরা তার মাথায়। ইলেকট্রড বসিয়ে দিত।

রুহান পাশের ঘরের দিকে রওনা দেয়, ঘরটি বেশ দূরে এবং সেখানে যাবার জন্যে তাকে একটা সরু করিডোর ধরে হেঁটে যেতে হলো। যেতে যেতে সে গুলির শব্দ শুনতে পায়। থেমে থেমে এবং মাঝে মাঝে একটানা সে কোথায়। গাছে না জানলে এটাকে একটা যুদ্ধক্ষেত্র বলে ধরে নিত।

করিডোরের শেষে যে ঘরটিতে সে হাজির হলো সেটাকে দেখে একটা যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ড সেন্টার বলে মনে হতে পারে। রুহানের মতো আরো কয়েকজন সেখানে এর মাঝে হাজির হয়েছে, তাদের সবাইকে এক ধরনের সামরিক পোশাক পরানো হয়েছে। রুহানকেও সেটা পরতে হলো এবং তারপর তাদেরকে একটা ছোট দরজা দিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো।

বন্ধ ঘর থেকে বের হতে পেরে রুহান এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করে। উপরে নীল আকাশ মাঝে মাঝে শরতের মেঘ। বড় বড় পাথরে ঢাকা পাহাড়ী অঞ্চল তার মাঝে নানা ধরনের গাছ-গাছালি, জায়গাটা একটা সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মতো। রুহান অন্য সবার সাথে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে। অপেক্ষা করতে করতে যখন অধৈর্য হয়ে পড়ছিল ঠিক তখন কঠোর চেহারার একজন মাষ তাদের সামনে এসে দাঁড়াল, মাথার টুপিটা পিছনে সরিয়ে শুকনো খসখসে গলায় বলল, আমার নাম গ্রুজান। এই জায়গাটাকে সবাই আদর করে ডাকে গ্রুজানের নরক। তোমাদের সবাইকে গ্রুজানের নরকে আমন্ত্রণ।

রুহান গ্রুজান নামের এই মানুষটাকে ভালো করে লক্ষ্য করল। রোদে পোড়া তামাটে চেহারা, নীল চোখগুলো অপ্রকৃতস্থ মানুষের মতো। সেখানে এক ধরনের অমানবিক নিষ্ঠুরতা উঁকি দিচ্ছে, হঠাৎ চোখ পড়লে বুক কেঁপে ওঠে।

গ্রুজান সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল, তোমাদের এখানে কেন আনা হয়েছে জান?

কেউ কোনো কথা বলল না, একজন অনিশ্চিতের মতো মাথা নেড়ে বলল, না।

না জানাটাই ভালো ছিল, কিন্তু এখন তোমাদের জানতে হবে। এই এলাকাটা যেরকম গ্রুজানের নরক, এর বাইরে আরেকটা বড় নরক আছে। সেটার নাম পৃথিবী। পৃথিবী নামের এই নরকে এখন মারামারি কাটাকাটি চলছে। পৃথিবীর মানুষ প্রথম ভেবেছিল মারামারি কাটাকাটি বুঝি খুব খারাপ জিনিস–কিন্তু এখন দেখেছে এটা মোটেও খারাপ না, এটা অন্যরকম একটা জীবন। যারা সেটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তার এখন মহানন্দে আছে।

রুহান এক ধরনের অবিশ্বাস নিয়ে জান নামের মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে। জান নিঃশব্দে তাদের সবার সামনে দিয়ে একটু হেঁটে আবার আগের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে বলল, পৃথিবীতে যখন মারামারি কাটাকাটি শুরু হয় তখন একটা জিনিসের খুব অভাব হয়। সেটা কী বলতে পারবে?

রুহানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কমবয়সী একটা ছেলে নিচু গলায় বলল, শুভ বুদ্ধি।

কী বললে? শুভ বুদ্ধি? জান কয়েক মুহূর্ত ছেলেটির দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ করে বিকট গলায় হাসতে শুরু করে, কিছুতেই হাসি থামাতে পারে না। শেষ পর্যন্ত অনেকটা জোর করে হাসি থামিয়ে চোখ মুছে বলল, না ছেলে, শুভ বুদ্ধি না। শুভ ন্যায় সত্য এই সব কথাগুলো বড় বড় কথা, কিন্তু আসলে এগুলো হচ্ছে অর্থহীন কথা। পৃথিবীতে শুভ ন্যায় সত্য বলে কিছু নেই। যার জোর বেশি সে যেটা বলবে সেটাই হচ্ছে সত্য। সেটাই ন্যায়। সেটাই শুভ। বুঝেছ?

কেউ কোনো কথা বলল না। জান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, পৃথিবীতে মারামারি কাটাকাটি শুরু হবার পর যে জিনিসটার অভাব হয়েছে সেটা হচ্ছে বডি পার্টস। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। যুদ্ধে যারা মারা যায় তারা তো মরেই গেল। কিন্তু যারা বেঁচে থাকে তাদের কারো দরকার হৃৎপিণ্ড। কারো দরকার। কিডনি। কারো ফুসফুস। কারো হাত, কারো পা। কারো চোখ। কার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে দাম। জান চোখ নাচিয়ে বলল, তোমাদের শরীরে আছে সেই সব অদৃশ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। আমরা তোমাদের ধরে এনেছি সেগুলো কেটেকুটে বিক্রি করার জন্যে। তোমরা সবাই হচ্ছ আমাদের মূল্যবান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাপ্লাই। বুঝেছ?

রুহান এবং তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কয়েকজন এক ধরনের ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সত্যিই কী তাদের কেটেকুটে মেরে ফেলার জন্যে ধরে এনেছে?

গ্রুজান চোখে মুখে এক ধরনের পরিতৃপ্তির ভাব নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকে দেখেই বোঝা যায় সে সবার আতঙ্কটুকু উপভোগ করছে। মুখে লোল টানার মতো এক ধরনের শব্দ করে বলল, তবে আমরা একটা শিল্প প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে কাঁচামাল এনে সেটাকে প্রক্রিয়া করে মূল্যবান জিনিস বানাই। তোমরা হচ্ছ কাঁচামাল, তোমাদের প্রক্রিয়া করে আরো মূল্যবান করা হচ্ছে আমাদের উদ্দেশ্য। সেটা কীভাবে করা যায় জান?

কেউ কোনো কথা বলল না, জানও সেটা নিয়ে মাথা ঘামাল না। বলল, তোমাদের মধ্যে যাদের মগজ ভালো তাদের মাথায় একটা ইলেট্রড ঢুকিয়ে খুব ভালো দামে বিক্রি করা যায়। তোমাদের মধ্যে যাদের মগজ ভালো এর মাঝে তাদের আলাদা করা হয়েছে–তোমরা তার মাঝে নেই। তোমরা হচ্ছ গাধা টাইপের। বুঝেছ? তোমাদের রাখা হয়েছে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করার জন্যে। তবে–

গ্রুজান খানিকটা নাটকীয় ভাব করে হঠাৎ থেমে গিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, তোমাদের জানে বেঁচে যাবার এখনো খুব ছোট একটা সম্ভাবনা আছে। খুবই ছোট। সেটা কী জানতে চাও?

এবারেও কেউ কোনো কথা বলল না।

আমরা বাজার যাচাই করে দেখেছি, তোমাদের কেটেকুটে বিক্রি করে আমরা যে পরিমাণ ইউনিট পাই, তার থেকে অল্প কিছু বেশি ইউনিট পাওয়া যায় যদি তোমাদের একজনকে সৈনিক হিসেবে বিক্রি করা যায়। তবে সমস্যাটা কী জান?

কয়েকজন দুর্বলভাবে মাথা নেড়ে জানাল যে তারা সমস্যাটা জানে না। জান মুখে এক ধরনের হাসি টেনে এনে বলল, সমস্যাটা হচ্ছে সবাইকে। সৈনিক বানানো যায় না। শুধু তারাই সৈনিক হতে পারে, যাদের বুকে আছে সাহস এবং যাদের রিফ্লেক্স খুব ভালো। যারা শক্তিশালী এবং যারা কষ্ট সহ্য করতে পারে।

গ্রুজান নিঃশব্দে তাদের সামনে দিয়ে একটু হেঁটে এসে বলল, তোমাদের কেটেকুটে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করার আগে তাই আমরা তোমাদের সৈনিক হবার একটা সুযোগ দিই। সুযোগটা হচ্ছে এরকম-ঐ যে দূরে দেয়ালটা দেখছ সেই দেয়ালের আড়ালে তোমরা দাঁড়াবে। যখন আমি তোমাদের সংকেত দেব তখন সেখান থেকে বের হয়ে এই গাছগাছালী, পাথর, খাল, মাঠ পার হয়ে অন্য পাশের দেওয়ালের আড়ালে ছুটে যাবে। তোমার হাতে থাকবে একটা অস্ত্র, তুমি চাইলে সেটা ব্যবহার করতে পার। আমি এখান থেকে তোমাদের গুলি করে মেরে ফেলার চেষ্টা করব। বুঝেছ?

রুহান বিস্ফারিত চোখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা সত্যি বলছে নাকি ঠাট্টা করছে সে ঠিক বুঝতে পারে না। একজন ভাঙ্গা গলায় বলল, আ-আমরা তোমার সাথে যুদ্ধ করব?

হ্যাঁ। বলতে পার সেটা এক ধরনের যুদ্ধ। তোমরা আমাকে গুলি করবে, আমি তোমাদের গুলি করব।

কিন্তু আমি কখনো কোনো অস্ত্র হাত দিয়ে ধরি নি।

যদি সেটা সত্যি হয় বুঝতে হবে তোমার কপাল খারাপ। তবে বেশি হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আজকালকার অস্ত্র খুব ভালো, খুব তাড়াতাড়ি ব্যবহার করা শেখা যায়।

রুহানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কমবয়সী ছেলেটা হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ল, ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, আমি পারব না। আমি পারব না, আমাকে ছেড়ে দাও, প্লীজ।

গ্রুজান হা হা করে হেসে বলল, অবশ্যই আমি তোমাকে ছেড়ে দেব। সামনের এই খাল, পাথর, গাছগাছালির মধ্যে আমি তোমাকে ছেড়ে দেব, শুধু মনে রেখ এইখানে আমি অস্ত্র নিয়ে তোমার দিকে তাক করে থাকব! তোমাকে আমি পাখির মতো গুলি করে মারব। ছিচকাদুনে মানুষ সৈনিক হবার উপযুক্ত নয়।

রুহান নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, এখনো পুরো ব্যাপারটি তার বিশ্বাস হচ্ছে। তার ভয় পাবার কথা কিন্তু সে অবাক হয়ে আবিষ্কার করল তার ভয় করছে। ভেতরে বিচিত্র একধরনের অনুভূতি, ভাবলেশহীন পাথরের মতো শীতল একধরনের অনুভূতি কিন্তু সেই অনুভূতিটি ভয়ের নয়, অন্য কিছুর।

(চলবে)