The_Mummy

পর্ব- ২

লেখকঃ Nazmul Hosen





অফিস থেকে বের হতে আজ একটু বেশি দেড়ি হয়ে গেছে। বাড়ি পৌঁছে দেখি রাত ১১.৪৫ বেজে গেছে। অফিসে আজ দুপুরে কি না কি খেয়েছিলাম মনে নেই। খুদায় পেঠ ছুছু করছে, যার কারণে কোন রকম ৫ মিনিটে ফ্রেস হয়ে খাবার টেবিলে গেলাম। ধ্যাত আর পারলাম না মাকে নিয়ে। আমার জন্য খাবার নিয়ে বসে থাকতে থাকতে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরেছে। এর কোন মানে হয়? কত দিন বলেছি আমি আসতে দেড়ি করলে খেয়ে শুয়ে পরিও। আর আমার খাবারটা টেবিলে রেখে দিও আমি এসে খেয়ে নিব। কিন্তু কিছুতেই মা আমার কথা গুলো শুনে না। 

-মা উঠ, উঠ মা।

মা- এইত বাবা উঠছি। আজ এত দেড়ি হল কেন? [ ঘুম জড়ানো কন্ঠে উত্তর দিল। ]

-হ্যা মা আজ একটু দেড়ি হয়ে গেল, অফিসে প্রচুর কাজের চাপ ছিল তাই।

মা- ঠিক আছে, আমি খাবার থালায় দিচ্ছি তুই খেতে শুরু কর।

ঢং ঢং ঢং শব্দ আসছে ভিতরের ঘরের ঘড়িটা থেকে। তার মানে রাত ১২ টা বেজে গেছে। খাবার মুখে দিতে যাব ঠিক সেই মূহুর্তে আমার ফোনটা বেজে উঠল। আরে ডা. জন এখন এত রাতে কেন আবার কল দিচ্ছেন? কল রিসিব করে হ্যাল বলতে যাব তার আগেই ডা. জন বলতে লাগলেন....

ডা. জন- মমির কফিন থেকে প্রচুর আলো বের হচ্ছে। আর ভিতর থেকে এক ভয়ানক আওয়াজ ভেঁসে আসেছে বাহিরে। কি করব কিছু বুঝতে পারছি না। [ ডা. জনের কথা শুনে মনে হল তিনি প্রচুর ভয় পেয়ে আছেন। ]

-আপনাকে কিছু করতে হবে না। আপনি দ্রুত পাশের রুমে চলে যান, আমি এখনি আসছি। 

ডা. জন- ঠিক আছে মি. নীল, আপনি একটু তাড়াতাড়ি আসুন।

মা- কার ফোন ছিল? আর এত রাতে কোথায় যাওয়ার কথা বলছিস?

-মা ডা. জন ফোন করেছিল। জরুরি একটা কাজের জন্য আমাকে এখনি যেতে হবে। আমি না গেলে কাজটা সম্পন্ন হবে না। 

মা- যা ইচ্ছা কাজ হোক, এতরাতে কোথাও যেতে দিচ্ছিনা তোকে।

-মা প্লিজ একটু বুঝার চেষ্টা কর।

মাকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে বের হলাম ডা. জনের গবেষনাগারের উদ্দেশ্যে। পুরো রাস্তা খালি থাকার কারণে মাত্র ২০ মিনিটে পৌছে গেলাম ডা. জনের গবেষনাগারে। 

এখন ইলেট্রিসিটিতো নেই তবে ডা. জনের গবেষনগারের চারপাশ এমন নীল আলোয় আলোকিত হল কি করে? কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বুঝতে পারলাম- কোন একটা রুম থেকে প্রচুর নীল আলোর প্রতিফলন ঘটছে। যার কারণে পুরো গবেষনাগার নীল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে।আর এক মুহূর্ত দেড়ি না করে, ডা. জনের রুমে প্রবেশ করলাম। কিন্তু অনেক খুঁজাখুঁজির পরেও ডা. জনকে তার রুমের কোথাও খুঁজে পেলাম না। ডা. জনের জন্য চিন্তা হচ্ছে, ডা. জনের আবার কিছু হয়ে গেল নাতো? প্রত্যেকটা রুম খুঁজার পরেও ডা. জনকে খুঁজে পেলাম না। তবে মমি রাখা রুমটা এখন দেখা হয়নি। মমি রাখা রুমে প্রবেশ করে আমি আঁতকে উঠলাম। এ কি হচ্ছে? ৩য় কফিন থেকে প্রচুর পরিমানে নীল আলো বের হচ্ছে। আলোর কারণে চারপাশের কোন কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমি কিছু টা এগিয়ে গেলাম, প্রখর আলোয় আমার চোখ দুটো ব্যথা করছে। 

অনেকক্ষণ পর মমির কফিন থেকে আলো বের হওয়া বন্ধ হল। এবার রুমের সব কিছু ঠিক ভাবে দেখা যাচ্ছে। খেয়াল করে দেখলাম ডা. জন কফিন থেকে বের করা বইটা হাতে নিয়ে কফিনের থেকে কিছুটা দূরে অজ্ঞান অবস্থায় পরে আছেন। আমার গাড়ি থেকে পানির বোতল নিয়ে এসে ডা. জনের নাকে-মুখে ছিঁটিয়ে দিলাম। কিন্তু ডা. জনের জ্ঞান ফিরে আসল না। ডা. জনের শরীরে হাত দিয়ে দেখি হাত পা একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। যেভাবে হোক ডা. জনের শরীরের তাপ ফিরিয়ে আনতে হবে। নইলে ডা. জনের কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। ডা. জনের হাত পায়ে আমার হাত দিয়ে ঘর্ষণ করতে লাগলাম। শরীর কিছুটা গরম হওয়ার পর ডা. জনের জ্ঞান ফিরে আসল। এখন ডা. জনের চোখে মুখে ভয়ের চাপ স্পষ্ট ফুটে আছে। ভয়ে ভয়ে ডা. সংকর বলতে লাগলেন.......

ডা. জন- ভয়ঙ্কর! মমিটা খুব ভয়ঙ্কর। 

-এখন সবকিছু আগের মত হয়ে গেছে। আর মমিটাকে এই রুমে তালা বদ্ধ করে দিচ্ছি। তারপর আপনাকে আপনার বাড়িতে পৌছে দিয়ে, আমি আমার বাড়িতে যাব। আর একটা কথা কাল সকালে আবার চলে আসবেন না গবেষনাগারে। এই কয়দিন আপনি পুরোপুরি বিশ্রাম নিবেন।

ডা. জন- ঠিক আছে মি. নীল। 

-

মমির রুমটা তালা বদ্ধ করে ডা. জনকে নিয়ে উনার বাড়িতে পৌছালাম। ডা. জনকে উনার স্ত্রীর কাছে দিয়ে আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ডা. জনকে নিয়ে আসার সময় বেশ অসস্থি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কেউ আমাদের অনুসরণ করছে। কিন্তু অনেক খুঁজার পরেও আশেপাশে কোন যানবাহন বা মানুষ খুঁজে পেলাম না। হয়ত মনের ভুল ছিল। কিছুক্ষণ ড্রাইব করার পর বাড়িতে পৌছালাম। ততক্ষণে রাত ৩.৩০ মিনিট বেজে গেছে। এখন বিদ্যুত আসারা নাম গন্ধ নেই। ফোনের প্লাস জ্বালিয়ে কোন ভাবে নিজের রুমে প্রবেশ করলাম। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

-

-

২ দিন পর......

সকাল বেলা ব্রেকফাস্ট করে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি। হঠাৎ করে টেলিফোনটা বেজে উঠল... কিরিং.......... কিরিং.............. কিরিং............

অপর পাশের ব্যক্তির কন্ঠ শুনে বুঝতে আর বাকি রইল না, ডা. জন টেলিফোন করেছেন। 

-হ্যা ডা. জন আপনার শরীরের কি অবস্থা?

ডা. জন- আমি ভাল আছি। কিন্তু মি. নীল সর্বনাশ হয়ে গেছে। 

-কেন? কি হয়েছে ডা. জন? [ কিছুটা বিষ্মিত হয়ে ]

ডা. জন- মমিটা ডাকাতি হয়ে গেছে। আমি আজ সকালে গবেষনাগারে এসে দেখি গবেষনাগারের লক ভাঙ্গা। পরে যখন মমির রুমে প্রবেশ করি, তখন দেখি মমি উদাও। 

-কি বলছেন আপনি? যদি মমিটা কোন ভাবে ডাকাতরা খুলে পেলে, তবে ডাকাত দলের জীবন সংশয় হতে পারে।

ডা. জন- হতে বাকি নেই মি. নীল।

-মানে?

ডা. জন- আপনি হয়ত এখন টেলিভিশনের সামনে বসেননি। টেলিভিশন খুলে আপনি ব্রেকিং নিউজটা দেখুন একবার। 

-

আর এক মুহূর্ত দেড়ি না করে আমি টেলিভিশনটা খুললাম। এটা কি করে সম্ভব? প্রত্যেকটা টিভি চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে........... 

এক রাতে ১৭ জন ডাকাতের রহস্যময় মৃত্যু। পুলিশ জানায় ১৭ জন ডাকাতের লাশের পাশে মূল্যবান এক প্রকার ধাতুর তৈরি একটি কফিন পাওয়া গেছে। ডাকাত দল কোন এক স্থান থেকে কফিন ডাকাতি করে। এবং কফিনটা খুলার সময় অজ্ঞাত কারণে তাদের প্রান হারায়। ধারণা করা হচ্ছে এই কফিনে কোন এক রাজার মমি ছিল। কিন্তু অনেক খুঁজাখুঁজির পরেও, কফিন ছাড়া, অন্য কোন কিছু আশেপাশের এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

-

নিউজটা দেখে আমার মাথা গুরে গেল। আমাদের সেদিনের ভয়ানক সন্ধেহটা তবে সত্যি ছিল। আমরা সেদিন যদি কফিনটা খুলতাম, তবে ডা. জন এবং আমার অবস্থা ডাকাতদের মত হত। মনের মধ্যে হাজার প্রশ্ন জাগছে- রেগুইন রুতেনের মমি এখন কোথায় আছে? মমি কি করে নিজে থেকে চলতে পারে? একটা মৃত মানুষের মমি কিভাবে এত গুলো ডাকাতকে মেরে পেলতে পারে? নাকি এই মমির পিছনে রয়েছে হাজার অজানা রহস্য? 

-

আজ অফিসে সকাল ৯.০০ টার আগে পৌছানোর কথা ছিল আমার। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় ১০ টা বেজে গেছে। এতক্ষণে অফিসে বিষয়টা নিয়ে হয়ত হৈইছৈই পরে গেছে। না আর দেড়ি করা উচিৎ হবে না, এখনি বের হতে হবে অফিসের উদ্দেশ্যে।

-

যা ভেবেছিলাম তাই। অফিসে পৌছে দেখি সবার মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু ডাকাত দলের মৃত্যু এবং মমি। মীরা আমার দিকে কিছুটা এগিয়ে এসে বলল.........

মিস. মীরা- মি. নীল বেশ কিছুদিন যাবত মনে হচ্ছে আপনি কোন একটা বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত। তাছাড়া আপনি এই কয়দিন সময় মত অফিসে আসেননি। যদি আপনার কোন সমস্যা থাকে, তবে আমার কাছে বলতে পারেন। 

-আসলে আপনার কাছে বিষয়টা লুকানো আর ঠিক হবে না। আপনি আমার কেবিনে আসুন আমি সব কিছু খুলে বলছি।

মিস. মীরাকে শুরু থেকে সব কিছু খুলে বলতে শুরু করলাম। সব কিছু শুনার পর মিস. মীরা আমার উপর কিছুটা রেগে গেলেন। 

মিস. মীরা- আপনি কি ভাবেন নিজেকে? আপনি একজন মহান ব্যাক্তি, বাকি সবাই খুব খারাপ তাই না? আপনি যদি আমাকে বিষয়টা বলতেন, তবে কি আমি এই বিষয়টা অফিসে জানিয়ে দিতাম? আপনি যদি এমন কিছু ভেবে থাকেন তবে আপনার ভাবনাটা সম্পূর্ণ ভুল। শুনে রাখুন আমিও আপনার মত একজন মানুষ, আমার মধ্যেও পজিটিভ চিন্তা ভাবনা রয়েছে। 

-দুঃখিত মিস. মীরা। আসলে মমি এবং কফিনটা খুব ভয়ঙ্কর ছিল। যার কারণে আমি আপনাকে কিছু জানাইনি। 

মিস. মীরা- আপনার কথা এবং ডাকাতদের মৃত্যুর খবর শুনে আমার মনে হচ্ছে- মমিটা কোন সাধারণ মমি নয়। মমিটা গতরাতে এতগুলো ডাকাত কে মেরেছে। হয়ত দুদিন পর সাধারণ মানুষদের মারতে শুরু করবে। যত দ্রুত সম্ভব মমিটাকে আমাদের থামাতে হবে। 

-হ্যা ঠিক বলেছেন। কিন্তু এই মমির গতিবিধি আমাদের জানা সম্ভব নয়। সে যদি নিজে থেকে আমাদের সামনে না আসে, তবে আমরা তাকে কোন ভাবে খুঁজে পাব না।

মিস. মীরা- তা হয়ত ঠিক। কিন্তু কোন উপায় নিশ্চয়ই আছে মমিটা খুঁজে বের করার। আমাদের শুধু উপায়টা একটু কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হবে। 

আর হ্যা, আপনাকে এখন যেতে হবে আমার সাথে।

-কোথায়?

মিস. মীরা- মমির কফিন পরিদর্শন করার জন্য। আপনি আসার কিছুক্ষণ আগে উপর মহল থেকে চিঠি আসে কফিনটা নিয়ে আসার জন্য।

-ঠিক আছে চলুন।

গতকাল অফিসের গাড়িটাতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। যার কারণে বাহন হিসাবে আমার গাড়িটাকে বেঁচে নিলেন মিস. মীরা।

চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। মিস. মীরা আমার পাশের সীটে বসে আছেন। কার মুখে কোন কথা নেই। হঠাৎ করে মীরার দিকে আমার নজর গেল। বাহিরের দিকে তাকিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্ উপভোগ করছেন মীরা। মীরার চুল গুলো বারবার প্রচন্ড বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মীরা চুল গুলো ঠিক রাখার বৃথা চেষ্টা করছেন। কি অপরূপ লাগছে এখন মেয়েটাকে। অথচ অফিসে এই মেয়েটি হয়ে উঠে রাগি বদমেজাজি। 

হঠাৎ করে মীরার ধাক্কা খেয়ে হুশে ফিরলাম।

মিস. মীরা- কি দেখছেন আমার দিকে? তাছাড়া এভাবে অন্য মনস্ক হয়ে গাড়ি চালালে দূর্ঘটনা হতে পারে।

-এইত প্রাকৃতিক সৌন্দর্ দেখছিলাম। আর দুর্ঘটনা হতে দিন। [ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। ]

মিস. মীরা- দেখুন আমার এখন বিয়েটিয়ে কিছু হয়নি। এখনি পরপারে যাওয়ার ইচ্ছা আমার একদম নেই। যদি সখ থাকে তবে আপনি যেতে পারেন।

-না না আমি কেন যাব? আসলে আমি বলতে চেয়েছিলাম দুর্ঘটনা হবে না। কিন্তু...........

মিস. মীরা- হয়েছে হয়েছে আর কিন্তুর মানে বলতে হবে না। এবার আপনি ঠিক ভাবে গাড়ি চালিয়ে আমাকে উদ্ধার করুন। 

কি মেয়েরে বাবা? জীবনে এমন রাক্ষুসে মেয়ে আমি আর কখন দেখিনি। আর কোনদিন দেখব বলেও মনে হয়না। মীরাকে আর কিছু না বলে আপন মনে গাড়ি ড্রাইব করতে শুরু করলাম। 

-

চলবে...