রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার



৩য় পর্ব 

.

৬. মাসুদ রানা সাহেব তার ঘরে বসে বসে ভাবছেন এই কেসটার শুরু কিভাবে করবেন তিনি। জটিল ধাঁধার একটি কেস এটি। রহস্যের পর রহস্যের চাঁদর দিয়ে ঘেরা এই কেসটা! এখন তার কী করা উচিত! তিনি সারাদিন কী কী করবেন এর একটা লিস্ট করে নিলেন। এরপর একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেলেন শহরের ১৬ নাম্বার খুনের ভিকটিম ডাক্তার রিমন সাহেবের বাড়িতে। মাসুদ সাহেব আগে থেকেই জানতে পেরেছিলেন যে এই খুনটার একজন প্রতক্ষদর্শী রয়েছেন এই বাড়িতে। সে রিমন সাহেবেরই বাড়ির কাজের ছেলে, আসিফ! কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত, তিনি রিমন সাহেবের বাড়িতে গিয়ে ছেলেটাকে দেখতে পেলো না! প্রতিবেশিদের কাছে গিয়ে জানতে পারলেন, আসিফ নাকি এখন শহরের একটা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। কথাটা শুনে মাসুদ সাহেব বেশ চমকে গেলেন! এরপর প্রতিবেশিরাই খুলে বললেন পুরো ঘটনা! রিমন সাহেবের খুনের পর আসিফ বেশ ভয় পেয়ে যায়। সে নিজের চোখে হয়তো খুনটা হতে দেখেছিলো! খুনের পর প্রতিবেশিদের রিমন সাহেবের বাড়িতে ডাকার পরেই আসিফ একেবারে চুপচাপ হয়ে যায়। এরপরে বেশ কিছুক্ষণ তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এরপরে সে যখন আবার এই বাড়িতে ফিরে আসে তখন সে পাগলের মত ব্যবহার করতে থাকে! একবার বলে রক্তচোষা আবার বলে সাদা বাদুড়! পুলিশ তার কাছে এই খুন সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেও সে কিছু বলতে পারে না। সে শুধু ভীরভীর করে বলতে থাকে রক্তচোষা আর বাদুড়! এরপর পুলিশ আসিফকে নিয়ে একটা মানসিক হাসপাতালে যায়! মাসুদ সাহেবের কাছে এবার যেনো ঘটনাটা কিছুটা পরিষ্কার হলো। এরপর তিনি তাদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আসিফের উদ্দেশ্যে মানসিক

হাসপাতালের দিকে রওনা দেন! রিমন সাহেবের বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাসুদ সাহেবের চোখ হঠাৎ গিয়ে পড়ে রাস্তার পাশের একটা সিসি ক্যামেরার উপর। হয়তো এই ক্যামেরাতে সেই দিন রাতের ফুটেজ ধরা পড়তে পারে! এর মাধ্যমে হয়তো দেখা সম্ভব যে খুনের রাতে রিমন সাহেবের বাড়িতে আর কে কে প্রবেশ করেছিলো!

.

এরপরেই রিমন সাহেব আবার মানসিক হাসপাতালের দিকে আসিফের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছে মাসুদ সাহেব বুঝতে পারেন, প্রতিবেশিদের বলা কথাগুলোই ঠিক! আসিফ পুরোপুরী পাগল হয়ে গেছে! সে 'রক্তচোষা" আর "বাদুড়" ছাড়া আর কোন শব্দই উচ্চারণ করছে না। আসিফের কাছে আসাটা পুরোই ব্যার্থ হলো মাসুদ সাহেবের। অনেক প্রশ্ন করেও তার কাছ থেকে বিশেষ কোন তথ্য জানতে পারলেন না মাসুদ সাহেব! এরপর যেই তিনি আসিফের সামনে থেকে উঠতে যাবেন তখনি তার চোখ পড়লো আসিফের ঘাড়ের উপর। তার ঘাড়ের উপরে দুটো ছোট চিকন ছিদ্র লক্ষ করা যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে কোন প্রাণি তার সুচালো দাত দিয়ে আসিফের ঘাড়ে কামড়েছে। এছাড়াও আসিফের চেহারার মধ্যে একটা ফেকাসে সাদা ভাব রয়েছে। দেখে যেনো মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে সে রক্তশুন্যতায় ভুগছে!

.

হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই মাসুদ সাহেব গেলেন এই খুনের কেস নিয়ে কাজ করা সর্বশেষ গোয়েন্দা অফিসার রফিকুল ইসলামের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারলেন রফিকুল ইসলাম সাহেব গতকাল মারা গিয়েছেন। এরপর রফিকুল ইসলাম সাহেবের মেয়ে শম্মীর সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন মাসুদ সাহেব। শম্মী তার বাবা সম্পর্কে যেই যেই কথা বলছিলো এগুলো গোয়েন্দা অফিসার ইকবাল খানের বলা কথার সাথে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছিলো।

শম্মী বলছিলো যে, একটা অদ্ভুত কেস নেওয়ার পরেই রফিকুল ইসলাম সাহেব মানসিক ভাবে অসুস্হ হয়ে পড়েন। এরপর সেই অসুস্হতা রুপ নেয় শারীরিক রোগে। তার বাবার চেহারা ধীরে ধীরে ফেকাসে এবং রক্তশুন্য হয়ে যায় এবং এরপরেই গতকাল তার বাবা মারা যান। গতকালই তার দাফনের কাজ শেষ করা হয়। এছাড়াও মাসুদ সাহেব বেশ কিছু বিষয় নিয়ে শম্মীর সাথে কথা বলেন। কিন্তু এই রহস্যটা নিয়ে আর কোন নতুন সুত্র পায় না সে। এরপর মাসুদ সাহেব শম্মীকে তার মোবাইল নাম্বার দিয়ে বলেন, তার বাবার এই রকম অদ্ভুত মৃত্যু বা কেস সংক্রান্ত যে কোন নতুন তথ্য তার মনে পড়লেই যাতে সে সাথে সাথে কল করে মাসুদ সাহেবকে জানায়! শম্মীকে বিদায় দিয়ে মাসুদ সাহেব যেই বসা থেকে উঠতে যাবেন হঠাৎ তার মাথায় একটা প্রশ্ন আসলো। সে শম্মীর কাছে জানতে চাইলো:

-আচ্ছা শম্মী, তোমার বাবার ঘাড়ের দিকে কী তুমি অদ্ভুত কিছু দেখেছিলে? যেমন কোন ছিদ্র বা দাগ?

.

শম্মী মাসুদ সাহেবের কথাটা শুনে একটু চমকে উঠলো। এরপর কিছুটা স্বাভাবিক হয়েই উত্তর দিলো:

- "হ্যাঁ। দুটো চিকন লাল দাগ ছিলো তার ঘাড়ে। বেশ অদ্ভুত দাগদুটো! দেখে মনে হচ্ছিলো কোন প্রাণী সেখানে কামরেছে! বাবাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে সে কোন উত্তরই দেয় না!

.

এতটুকু কথা শোনার পরেই মাসুদ সাহেব শম্মীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। মাসুদ সাহেবের মাথায় যেনো এই রহস্যের বেশ কিছু জটিল সুত্র এসে খেলা করতে লাগলো। এরপর মাসুদ সাহেব এই রহস্যে খুন হওয়া বাকি ভিকটিমদের সবার বাড়িতেই গেলেন! তাদের সাথেও খুন সংক্রান্ত নানান ধরণের কথা বললেন। তবে সবার খুন হওয়ার ধরণ একই থাকায় নতুন কোন তথ্যই পেলো না মাসুদ সাহেব। তিনি সবার কাছেই নিজের মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে আসেন, যাতে করে এই খুন সম্পর্কে যেকোন নতুন তথ্যই পরবর্তীতে ফোন করে তারা তাকে বলতে পারে। বাকি যে ৪ জন গোয়েন্দা অফিসার রক্তশুন্যতায় মারা গেছে তাদের বাড়িতেও যায় মাসুদ রানা সাহেব। এরপর অন্যান্য রক্তশুন্যতায় মারা যাওয়া কয়েকজনের বাড়িতেও যায় সে। অতপর একটা ঘটনা তার কাছে বেশ পরিষ্কার হয়ে যায়। সবগুলো মৃত্যুর মধ্যে নিশ্চই কোন মিল রয়েছে! কারণ সেই ১৬ জন ভিকটিমের মৃত্যু, ৫ জন গোয়েন্দার মৃত্যু , ১০ জন ফরেনসিক ডাক্তারের মৃত্যু এবং শহরের প্রায় ৪০০ জনের উপরের মানুষের মৃত্যুর মধ্যে বেশ কয়েকটা জিনিসের মিল রয়েছে! যেমন প্রত্যেকের মৃত্যুর সাথে রক্তের কোন সম্পর্ক রয়েছে, মৃত্যুর পুর্বে তাদের চেহারা ফেকাসে হয়ে যায় এবং ঘাড়ে দুটো ছিদ্র দাগ দেখা যায়! যদিও ১৬ জনের মৃত্যুর রহস্যটা একটু ভিন্ন। এই খুনের রহস্যের পেছনে ছুটলেই হয়তো খুনি পর্যন্ত পৌছানো সম্ভব!

.

এরপর মাসুদ রানা সাহেব আবার মৃত রিমন সাহেবের বাড়িতে গেলেন। রিমন সাহেবের বাড়ির সামনের রাস্তার পাশের সেই সিসি কেমেরাতে ধারণ করা খুনের রাতের ফুটেজ জোগাড় করে কম্পিউটারের মনিটরে পুরোটা চেক করেন তিনি। সেদিন সন্ধ্যাঁর পর থেকে কোন মানুষই তার বাড়িতে প্রবেশ করে নি! কাজের ছেলে আসিফও হয়তো আগে থেকেই বাড়িতে ছিলো এবং সন্ধ্যার পর আর বের হয় নি! এরপর দেখাগেল, বেশ রাতে রিমন সাহেব তার বাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন। মাসুদ সাহেব অনেকটা জুম করে ভালোমতই দেখতে পেলেন যে গাড়িতে শুধু রিমন সাহেব একাই ছিলেন। তার সাথে কেউই ছিলো না! গাড়ি থেকেও রিমন সাহেব একাই নামলেন। তবে তার ভাব-ভঙ্গি দেখতে বেশ ভিন্ন মনে হচ্ছিলো। তাকে দেখে যেনো মনে হচ্ছিলো সে কাউকে সাথে করে নিয়ে বাড়িতে ঢুকছে। যদিও তার সাথে কাউকেই দেখা গেলো না ক্যামেরায়! এরপর মাসুদ সাহেব আবার তার বাড়িতে ফিরে আসলেন।

.

রাত প্রায় ১২টা বাজে। মাসুদ সাহেব তার ঘরে একা একা বসে আছেন। ভাবছিলেন সারাদিনের তদন্ত নিয়েই। এবং পরের দিন কী কী কাজ করতে হবে! এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মাসুদ সাহেবের মোবাইলে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলো। মাসুদ সাহেব কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠের উত্তেজিত আওয়াজ তার কানে ভেসে আসলো:

-মাসুদ সাহেব, আমাকে বাঁচান! আমি অনেক বিপদে পড়েছি!

-হ্যালো! কে আপনি? (কিছুটা আৎকে বললেন মাসুদ সাহেব)

-আমি আরিহা। আজ দুপূরে আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমার স্বামী হাসিব। গত কয়েকদিন আগে সে খুন হয়েছিলো। আপনি এই ব্যাপারে আজ এসেছিলেন।

-হ্যাঁ। চিনতে পেরেছি! কিন্তু আপনার কী বিপদ হয়েছে?

-আমার স্বামী হাসিব আবার ফিরে এসেছে। সে আমাকে নিয়ে আবার কবরে যেতে চায়! সে আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে!

-কী?! কী বলছেন এসব যত্তসব? আপনার স্বামী মারা গেছেন। তার পক্ষে আর এই পৃথিবীতে ফিরে আসা সম্ভব না।

- আমি নিজের চোখে দেখেছি! সে আমাকে মেরে ফেলবে!

-আপনি শান্ত হন আরিহা! আপনি আপনার স্বামীকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। তাই হঠাৎ তার মৃত্যু আপনার মস্তিস্ক মেনে নিতে চাইছে না! আপনি হেলুসিনেসনে রয়েছেন আরিহা! আপনার বাড়ির বাহিরে কেউ নেই! শুধু শুধু ভয় পাবেন না। ঘরের দরজা আটকে কিছুক্ষণ চুপচাপ চোখ বন্ধ করে রাখুন। বিশ্বাস করার চেষ্টা করুন এগুলো যা আপনি দেখছেন সব হেলুসিনেসন! আপনার কিছুই হবে না। কাল একবার আমি আপনার সাথে দেখা করতে আসবো!

-কিন্তু . . . .

-কোন কিন্তু নয় আরিহা! আমি যা বলছি তাই করার চেষ্টা করুন। কলটা রাখুন। চোখ বন্ধ করে অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করুন। শুভরাত্রি।

.

.

এতটুকু কথা বলেই মাসুদ সাহেব কলটা কেটে

দিলেন। মাসুদ সাহেব মেয়েটাকে চিন্তে পেরেছিলো! আজ দিনের বেলাতেই মেয়েটার সাথে কথা বলে মাসুদ সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন যে মেয়েটা প্রচুর ডিপ্রেশনে ভুগছে। মেয়েটা হঠাৎ তার স্বামীর মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না। হাসিব সাহেব তার নিজের বাড়িতেই যখন খুন হন তখন মেয়েটি তার বাবার বাড়িতে ছিলো। এখন মেয়েটা সেই খুন হওয়া ঘরেই বসে রয়েছে! তাই হয়তো মেয়েটা নানান রকমের উল্টাপাল্টা চিন্তা করছে এবং হেলুসিনেসনের স্বীকার হচ্ছে!

এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা!

.

মাসুদ সাহেব মোটামোটি নিশ্চিতই ছিলেন যে মেয়েটা হেলুসিনেসনে রয়েছে। মেয়েটার কোন ক্ষতিই হবে না! মৃতদের আবার পৃথিবীতে ফিরে আসা এটা প্রকৃতির নিয়ম নয়।বেশ নিশ্চিন্ত মনেই মাসুদ সাহেব ঘুমিয়ে পড়লেন!

.

পরেরদিন সকালে আরেকটা কল এসে ঘুম ভাঙে মাসুদ সাহেবের! মাসুদ সাহেব মোবাইলে তাকাতেই দেখলো গোয়েন্দা অফিসার ইকবাল খান তাকে কল দিয়েছেন। মাসুদ রানা সাহেব বেশ চমকে উঠলেন। এত সকাল সকাল ইকবাল সাহেব তাকে কল দিয়েছেন কেন?! কোন নতুন সমস্যা!! এরপর মাসুদ সাহেব কলটা ধরতেই ওপাশ থেকে ইকবাল সাহেব যা বললেন তা শুনার জন্য মাসুদ সাহেব মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না! কথাটা শুনে মাসুদ সাহেব পুরোই আৎকে উঠলেন! ইকবাল সাহেব বললেন :

-সর্বনাশ করেছে মাসুদ সাহেব! শহরের ১৭ তম খুনটাও হয়ে গেল!

আজ সকালে মৃত হাসিব সাহেবের বাড়ির উঠান থেকে তার স্ত্রী আরিহা বেগমের রক্তশুন্য লাশ পাওয়া গেছে!

.

কথাটা শুনে মাসুদ রানা সাহেব বেশ চমকে উঠলেন, "তাহলে কী মৃতরা আবার ফিরে আসছে?" ...........................

. . . . . . . . চলবে . . . . . . . .