রক্ত 

.

(৩য় পর্ব) 

.



গেঞ্জিতে লেগে থাকা রক্তের নমুনা অনুযায়ী, মনে হচ্ছে কেউ রক্তমাখা দশ আঙ্গুলের চাপ গেঞ্জিতে বসিয়ে দিয়েছে। সেদিন আনিকার শাড়িতে রক্ত লেগেছিল। আর আজ আমার গেঞ্জিতে। বুঝতে পারছি না এই ঘটনাটার পিছনের রহস্য। 

আনিকা এখনও ভয় পেয়ে আছে। আমি গেঞ্জি খুলে ফেলেছি। ভয় আমার নিজেরই হচ্ছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে ভয় পাবারই কথা।

- আফরান এই রক্ত আসছে কোথা থেকে? 

- কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

রক্তমাখা গেঞ্জি আর শাড়ি দুটোই আলমারির ভেতর রেখে দিয়েছি। ততক্ষণে কলিংবেলের আওয়াজ শুনা গেল। এত সকালে আবার কে এল?

দরজা খোলেই দেখি আবুল সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। 

খুব অস্থির, আর ভয় পেয়ে আছেন মনে হচ্ছে।

- আঙ্কেল কি হয়েছে, আপনাকে এরকম লাগছে কেন?

- আফরান আশফাক? 

- আশফাক কি?

আবুল সাহেব কিছু বলতে পারছেন না। ভয়ে উনার অবস্থা একদম নাজেহাল হয়ে আছে। মুখ দিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। আনিকা উনার এরকম অবস্থা দেখে বলে উঠল..

- আশফাক কবর থেকে উঠে গেছে, না কি?

আনিকার কথা শুনে আমার শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। বলে কি এসব, একজন মৃত মানুষ যাকে কালকে কবর দেয়া হয়েছে সে কিভাবে বেঁচে কবর থেকে উঠে আসবে। আমি বললাম...

- আনিকা এসব কি বলছ? যাকে কবর দেয়া হয়েছে সে কিভাবে উঠবে? 

- তাইতো। 

তখনি আবুল সাহেব বলে উঠলেন।

- আরে এসব না, লাশ...!

লাশ মানে। তাহলে কি আশফাকের লাশ কবর থেকে উপরে। আবুল সাহেব এতটাই ভয় পেয়ে আছেন যে, ভালমতো কোনো কথাই বলতে পারছেন না। যার জন্য কিছু বুঝতে পারছি না। আবুল সাহেব বললেন...

- আসো?

আসো বলেই আবুল সাহেব হাটতে শুরু করেছেন। আমি জুতো পায়ে পড়তে গিয়ে আরো অবাক হলাম। জুতোর মধ্যে রক্ত লাগানো। গেঞ্জির মাঝে রক্ত, আর এখন জুতোর মধ্যে রক্ত। ভয়ে আমার অবস্থা শেষ। কিন্তু এখন বিষয়টা বুঝার দরকার। আমি জুতো ছাড়াই বের হয়েছি। 

আমি আনিকা দুজনেই উনার পিছন পিছন হাটছি। নিচে নামতেই প্রফেসর হেলাল স্যারের দেখা মিলল। এখন আমরা তিনজনই আবুল সাহেবের পিছনে হাটছি।

- আফরান কি হয়েছে (প্রফেসর)

- কিছুই বুঝতে পারছি না। আবুল সাহেব ভয়ে কিছুই বলতে পারছেন না। শুধু লাশ বলেছেন। 

- কিসের লাশ? 

- জানিনা। 

- উনার ছেলের লাশ কি কবর থেকে.. উঠল না কি!

- স্যার, এটা কিভাবে সম্ভব। 

প্রফেসর সাহেব আর কিছুই বললেন না। হাটতে লাগলেন। আশফাকের কবরটা বাসা থেকে কাছেই। দুই তিন মিনিটের রাস্তা। তাই ওখানে যেতে বেশি সময় লাগল না। 

আমরা চারজন আশফাকের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আবুল সাহেব হাত ইশারা করে যে জিনিসটা দেখালেন, সেটা দেখার জন্য আমরা মুটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আনিকা এটা দেখেই মাথা ঘুরে পরে যাচ্ছিল। আমি ওকে ধরে নিলাম। প্রফেসর হেলালও ভয় পেয়ে গেছেন।

আশফাকের কবরের উপর আরেকটা লাশ পড়ে আছে।

বুঝা যাচ্ছে না, এটা কার লাশ? আশফাক, না অন্য কারো লাশ। ততক্ষণে পুলিশের গাড়ি চলে এসেছে। 

ইন্সপেক্টর নাজমুল লাশ দেখে নিজেই ভয় পেয়ে গেছেন। কারো কবরের উপর আরেকটা লাশ দেখলে যে কেউই ভয় পাবে। সে অনুযায়ী ইন্সপেক্টরের ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। মনে হচ্ছে উনার ধারণা, এটা আশফাকের লাশ। 

...

কনস্টেবল দুজন লাশটা সেখান থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। আমাদের সবার ধারণাই ভুল, লাশটা আশফাকের না, অন্য কারো লাশ এটা। তবে ঠিক আশফাকের মত অবস্থা। মনে হচ্ছে একে আশফাকের মতই মারা হচ্ছে। সমস্ত শরীরটা রক্তে লাল। তারপর সেই নখের আঘাতের চিহ্ন। 

আবুল সাহেব মুখটা দেখেই আশ্চর্য হয়েছেন। মনে হচ্ছে উনার পরিচত কেউ। আমি উনার দিকে তাকিয়ে বললাম..

- আঙ্কেল আপনি চিনতে পেরেছেন লাশটা?

- হ্যা, এটা আশফাকের বন্ধু জামাল। আমাদের বাসার ঠিক পাশেই ওর বাসা। ওরা একসাথে থাকতো বেশি সময়। বুঝতে পারছি না এর মৃত্যুটা কেন হল!

আবুল সাহেবের কথা শুনে আমার মনে হল, দুটো খুনই একই খুনির কারসাজি। তাও এই একই রকম ভাবে মারাও হয়েছে। আর ওর কবরের পাশে অন্য লাশ। তার মাঝে দুজনেই বন্ধু। ধারণাটা মনে হচ্ছে ঠিক। এখন সেভেন স্টার গুলা সম্পর্কে জানা দরকার। তাহলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, খুনি একজন কি না!

ইন্সপেক্টর নাজমুলের দিকে তাকিয়ে বললাম,, স্যার লাশের বুকটা কি দেখা যাবে?

- আফরান, আমি জানি কি দেখতে চাচ্ছ। আমি নিজেই এটা ভাবছিলাম। আসো দেখি?

একজন কনস্টেবল এসে লাশের পড়নে থাকা শার্টটা খুলল। হ্যা, বুকের পাশেই আশফাকের মত কিছু একটা আঁকা। মনে হচ্ছে স্টার হবে। ইন্সপেক্টর সাহেব একটা টিসু দিয়ে বুকের রক্ত গুলা একটু সরালেন। হ্যা, ★ স্টার আঁকা। তবে সাতটা নয়, ছয়টা স্টার।

এই একটা কম স্টার দিয়ে খুনি কি বুঝাতে চাচ্ছে। যে, সে প্রতিটা খুনের পর একটা স্টার কমাবে। না, সে আরো পাঁচটা খুন করবে। স্টার যেভাবে কমছে মনে হচ্ছে খুনি আরো পাঁচটা খুন করবে। স্টার এঁকে এটা প্রমাণ করছে যে, হাতে আরো পাঁচজন আছে। আর লাশটা আশফাকের কবরের উপর রেখেছে, তারমানে একই কারণে দুজনকে খুন করা হয়েছে। তাহলে রহস্যটা আসলে কি? আর কিসের জন্য এই খুন?

আনিকা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। ইন্সপেক্টর সাহেব লাশ নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হয়েছেন। আমরা বাসার দিকে যাচ্ছি। আবুল সাহেব কে খুব নার্ভাস লাগছে। হয়ত ভয়টা একটু বেশিই পেয়েছেন। 

আনিকা আমার কাঁধে মাথা রেখে হাটছে। মেয়েটা খুব ভয় পেয়েছে। তার মধ্যে আজ আমার গেঞ্জিতে রক্ত, জুতোয় রক্ত। ভয় তো পাবার কথা।

জুতো, আর গেঞ্জির রক্তের কথা মনে হতেই একটা জিনিস আমার মাথায় চলে আসল। আশফাকের মৃত্যুর সময় আনিকার শাড়িতে রক্ত। আর এই জামালের খুনের সময় আমার গেঞ্জি, জুতোয় রক্ত। এটা তাহলে কেন হচ্ছে? এই রক্তের সাথে খুন গুলাকে কেন হচ্ছে, আর আমি কেন এইগুলা একত্র করছি? কি কারণ থাকতে পারে। তাহলে কি বাকি খুন গুলাও এইরকম ভাবে একি সিস্টেমে হবে? 

...

এই রহস্যের মধ্যে পরে অফিসের কথা প্রায় ভুলেই গেছি। আজ শনিবার, ছুটির দিন, তাই সমস্যা নেই।

আনিকা ঘুমিয়ে পড়েছে। আজকের ঘটনাটায় ভয় পেয়েছে বেশিই। এরমধ্যে আমার গেঞ্জির রক্ত দেখে আরো ভয় পেয়েছে।

আমি আনিকার পাশে গিয়ে বসলাম। চোখের মধ্যে শুধু আশফাক, জামালের লাশের ছবি ভেসে উঠছিল। 

ঠিক বুঝতে পারছি না এই রহস্য নিয়ে।

পশ্চিমের দেয়ালে একটা ছবি রয়েছে আনিকা আর আমার। বিছানা থেকে ছবিটা সরাসরি দেখা যায়। আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ চোখ পড়ল পাশের একটা ছবির উপর। যেটা দেখা মাত্রই আমার শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। অবিকল আশফাক, আর জামালের বুকের মধ্যে থাকা কয়েকটা লাল ★স্টারের ছবি। গুণে দেখলাম সিক্স স্টার। আশফাকের খুনের পর সেভেন স্টার দেখেছি, আর এখন জামালের খুনের পর সিক্স স্টার দেখছি। 

মনে হচ্ছে সিক্স স্টার কেউ এঁকে ফ্রেমের ভেতর রেখেছে। কিন্তু আমার রুমে কে কিভাবে এসব করবে। হেলুসিনেশনের প্রভাবে হতে পারে। 

আনিকার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ দুটো ভাল করে 

মুছে নিলাম। তারপর আস্তে আস্তে পশ্চিমের দেয়ালের দিকে তাকালাম। না, আমার আর আনিকার ছবির পাশে অন্য কোনো ছবি নেই। কিন্তু বুঝতে পারছি না, এই হেলুসিনেশনের প্রভাব আমার উপর এত বেশি কেন পরছে। আর কেন বা আমাদের কাপড়েই এই রক্ত আসছে, আর কোথা থেকে আসছে? কোনো ভূত আত্মার কাজ কি না কে জানে? 

অবশ্য এসব আত্মায় আমি বিশ্বাসী না। 

...

মস্তিষ্কের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারছে। এই খুনের রহস্য, স্টারের রহস্য, কাপড়ে রক্ত, এসব রহস্যের কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছি না। ইন্সপেক্টর নাজমুলের সাথে একটু কথা বলা দরকার। যদি কিছু একটা জানা যায়। কিন্তু কিভাবে? 

আনিকা কে এভাবে একা রেখে যাওয়াটা ঠিক হবেনা। মেয়েটা এমনিতেই অনেক ভয় পেয়ে আছে। এখন একা রেখে যাওয়াটা ঠিক নয়। আমার এসব চিন্তাভাবনার মধ্যেই কলিংবেলের আওয়াজ শুনা গেল। 

বিছানা থেকে উঠে দরজা খুললাম। প্রফেসর হেলাল সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। 

- আফরান?

- জ্বি স্যার? 

- মেয়েটা কেমন আছে? 

- ভাল স্যার, ঘুমোচ্ছে। 

- অনেক ভয় পেয়েছে? 

- হ্যা, স্যার। আসুন ভিতরে আসুন।

প্রফেসর হেলাল আর আমি দুজনেই ড্রয়িংরুমে বসলাম। ঠিক বুঝতে পারছি না এই কাপড়ে রক্ত পাওয়ার বিষয়টা স্যারের সাথে শেয়ার করব কি না? 

না করে তো শান্তিও পাচ্ছিনা। ভয়টা তো শুধু বাড়ছে, কমছে না। স্যারের দিকে তাকাতেই দেখি উনি বেশ কৌতূহল হয়ে তাকিয়ে আছেন। মনে হচ্ছে স্যার নিজেই ভয় পেয়ে আছেন।

.....

চলবে..........