রক্ত
.
৪র্থ পর্ব
.
- আফরান, কিছু বলবে?
আমি প্রফেসর হেলাল স্যারের দিকে তাকালাম। হ্যা, বলতে তো চাই। কিন্তু এটা শুনার পর উনি কিভাবে নিবেন সেটাই বুঝতে পারছিনা। যদি মনে করেন, খুন দুটো আমরা দুজনে করেছি, তখন?
- কি ভাবছ আফরান?
- আমি একটা জিনিস দেখাতে চাই স্যার, বুঝতে পারছি না আপনি আমার কথা গুলা কিভাবে নিবেন?
- হ্যা, বল?
আমি গিয়ে আলমারি খুললাম। আনিকা শাড়ি, আর আমার গেঞ্জিটা দেখানো দরকার। না হলে উনি বিশ্বাস করবেন বলে, আমার মনে হয়না।
আমি আলমারি খুলে তন্নতন্ন করে খুঁজে ও শাড়ি আর গেঞ্জির কোনো দেখা পেলাম না। হঠাৎ করে এই শাড়ি, আর গেঞ্জি গেল কোথায়? আমিতো আলমারিতেই রেখেছি।
আলমারির সব কাপড় বের করলাম। আমার এরকম কর্মকাণ্ড দেখে প্রফেসর স্যার অবাক হয়েছেন। আর অবাক হবারই কথা। এখন আমি নিজেই অবাক হয়ে আছি, সেইসাথে ভয় ও পেয়েছি। আমার কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে। বুঝতে পারছি না এই ঘটনাটা কেন ঘটছে।
জুতোর কথা মনে হতেই আমি মেইন দরজার দিকে গেলাম। জুতো দরজার বাইরে রয়েছে।
দরজা খোলে আমি অবাক, একটু আগেও জুতো জোড়া সেখানে ছিল। কিন্তু এখন নেই। এটা কিভাবে সম্ভব? এই শাড়ি, গেঞ্জি, জুতো হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল কিভাবে? না কি কেউ উধাও করল?
- আফরান কি হয়েছে?
প্রফেসর হেলাল আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু আমার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। মস্তিষ্ক এখন পুরোপুরি আউট কন্ট্রোল হয়ে যাচ্ছে। না, কোনো কিছুই বুঝতে পারছি না। কেন এসব হচ্ছে?
- আফরান?
- হ্যা, স্যার!
- কি হল?
- স্যার, আপনাকে যে জিনিসটা দেখাতে চাচ্ছিলাম সেটাই খুঁজে পাচ্ছিনা।
- কি?
- শাড়িতে রক্ত, গেঞ্জিতে রক্ত, জুতোয় রক্ত।
- মানে?
- মানে স্যার, এই দুই খুনের দিন সকালে স্যার রক্ত পেয়েছি। প্রথম দিন আনিকার শাড়িতে। আর আজ আমার গেঞ্জি আর জুতোয়। কোথা থেকে এই রক্ত আসছে, কিছু বুঝতে পারছি না।
- কি বলছে এসব?
- হ্যা, স্যার। কিন্তু এখন সেই শাড়ি, গেঞ্জি, জুতো কিছুই খুঁজে পাচ্ছিনা।
- কি?
- হ্যা, স্যার। আলমারিতে রেখেছিলাম, কিন্তু এখন নেই। আরেকটা জিনিস স্যার, আপনি কি আশফাক আর জামালের দেহে ওই স্টার চিহ্নটা দেখেছেন?
- হ্যা।
- দুইদিন ধরে আমি সেই স্টার গুলা দেখছি। মনে হয় আমার সামনে! কিন্তু পরে তাকালে আর পাইনা?
- হেলুসিনেশন।
- হ্যা, স্যার।
প্রফেসর হেলাল রক্তের কথা শুনে কিছুটা ঘাবড়ে গেছেন। কিন্তু এসব খুঁজে না পাওয়ার জন্য আমি নিজে ভয়ে আছি। আনিকা যে অন্য কোথাও রাখবে তাও না।
মেয়েটা আমার সাথেই ছিল সারাক্ষণ। তাহলে?
..
সমস্ত দিনটা শুধু চিন্তা, আর ভয়ের মধ্যে কেটেছে। রক্তমাখা শাড়ি, গেঞ্জি, জুতো গুলা আসলে গেল কোথায়? আনিকা নিজেও অনেকটা ভয়ের মধ্যে রয়েছে। ভয় শুধু বেড়েই চলেছে, কমছে না।
আবুল সাহেবের সাথে একবার দেখা করা দরকার। আমার মনে হচ্ছে ভদ্রলোক কিছু একটা গোপন করছেন। একটু কথা বলা দরকার।
সন্ধ্যার দিকে আবুল সাহেবের বাসায় যাওয়ার জন্য বের হলাম। আনিকা রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে পরেছে।
দরজা খুলে বের হতেই দেখি আমার জুতো দরজার সামনে রাখা। তাও খুব পরিষ্কার করে। ততক্ষণে কেউ একজন মনে হল সিঁড়ি বেয়ে খুব দ্রুত নিচে চলে গেল, কিছু বুঝে উঠার আগেই। রুমের ভেতর ঢুকলাম আবার। জুতো যখন এখানে আছে, তাহলে নিশ্চিত শাড়ি, আর গেঞ্জিও আলমারিতে আছে।
হ্যা, আলমারিতে শাড়ি গেঞ্জি আছে। বাট তাতে রক্তের কোনো দাগ নেই। এই ঘটনাটা ভয়ের পরিমাণটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বুঝতে পারছি না, কে এই কাপড় নিল? আর কিভাবেই নিল? এখন দিলই বা কিভাবে? মনে হচ্ছে খুনি তার এই রহস্যটা সবার সামনে নিয়ে আসতে ছাইছে না। না নিয়ে আসার কি কারণ থাকতে পারে?
মনে কিছু সংশয়, কিছু রহস্য নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে আবুল সাহেবের বাসায় গেলাম।
আবুল সাহেব, ইন্সপেক্টর নাজমুল, প্রফেসর হেলাল। তিনজনই একত্রে আছেন। আমি ভিতরে গিয়েই ইন্সপেক্টর নাজমুলকে জিজ্ঞাসা করলাম...
- স্যার কিছু জানতে পেরেছেন?
- এখন পর্যন্ত না। তবে জামালের লাশ থেকে কিছু একটা পেয়েছি।
- কি?
- জামালের শরীরে কিছু নখের অংশ পাওয়া গেছে।
- কিসের নখ?
- মনে হচ্ছে কোনো জন্তুজানোয়ারের নখ। টেস্ট করা হচ্ছে। তবে আফরান এই দুটো খুনের সিস্টেম একই।
- হ্যা, স্যার। মনে হচ্ছে খুনিও এক। আর ওই স্টারের ব্যাপারটা কি দেখেছেন?
- ওই বুকের মধ্যে যেটা?
- হ্যা, স্যার। আশফাকের বুকের মধ্যে সেভেন স্টার, আর জামালের বুকের মাঝে সিক্স স্টার। আমার তো মনে হয় এই স্টারের মধ্যে কোনো রহস্য আছে।
- হুম।
- আর রহস্য এটাই যে আরো পাঁচটা মার্ডার হবে। এখানে সেভেন স্টার মানে সাতটা মার্ডারের কথা বলা হয়েছে।
- আফরান আমি বুঝতে পারছি ব্যাপারটা। বাট এই দুটো খুনের কোনো প্রমাণ নেই। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে এগুলা কোনো মানুষের কাজ নয়।
- তাহলে?
- আত্মা বা ভূতের কাজ।
আবুল সাহেব কিছু বলছেন না, শুধু শুনে যাচ্ছেন। প্রফেসর হেলালও। আত্মা বা ভূতের কথা শুনে শরীরের লোম গুলা খাড়া হয়ে গেল। এরমধ্যেই বিদ্যুৎ চলে গেল। বিদ্যুৎ যাওয়া মানে ভয়ের মধ্যে ভয় পাওয়া। ইন্সপেক্টর, প্রফেসর, আবুল সাহেব, আমি চারজনেই খুব আতংকিত হয়ে উঠলাম। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ নিয়ে ভয়ের মাত্রাটা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাতে যাব, ওমনি দেখলাম আবুল সাহেবের স্ত্রী, মানে আন্টি মোমবাতি হাতে আমাদের দিকে আসছেন।
উনার মুখটা দেখে আমি আরো বেশি ভয় পেয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে আন্টির মুখ হঠাৎ করেই কালো কুৎসিত হয়ে গেল। তার মাঝে মুখে লেগে আছে বিদ্রুপ টাইপের হাসি। আমি ইন্সপেক্টর সাহেবের দিকে তাকালাম ব্যাপারটা দেখানোর জন্য। কিন্তু উনি মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। হেলাল স্যারের দিকে তাকিয়ে দেখি সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনিও মোবাইলে মনযোগী। তারমানে এই বিদ্রূপমাখা হাসি, কিংবা মুখটা আমি ছাড়া কেউ দেখেনি।
ততক্ষণে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। আন্টি মোমবাতি হাতে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। না, ঠিকই আছে। তাহলে আমি যা দেখলাম তা কি ছিল? হেলুসিনেশন!
না, হেলুসিনেশনে তো শুধু স্টার গুলা দেখি। তাহলে এই বিদ্রূপ, কুৎসিত মুখটা কেন দেখলাম?
না, আন্টিই এসবের মধ্যে জড়িত?
দূর আমি এসব কি ভাবছি! আর না ভেবে তো থাকতেও পারছিনা। মাথা একদম কাজ করছে না। আর এসব আমিই কেন দেখছি, সেটাই বুঝতে পারছি না।
আন্টি মোমবাতি নিভিয়ে চলে গেলেন। আমি কিছুটা শান্তি পেলাম। কিন্তু না, ততক্ষণে আন্টি চায়ের ট্রে নিয়ে আমাদের সামনে আসলেন।
এইরকম একটা দৃশ্য দেখার পর, উনার হাতের চা খাব কি না ঠিক বুঝতে পারছি না। কিন্তু এই আরেক সমস্যা, চা দেখলে আমার আবার মাথা ঠিক থাকেনা।
চায়ের কাপ হাত মুখের সামনে ধরতেই চা পুরো রক্তের মত লাল হয়ে গেল। চা গুলা সাথে সাথে রক্তে পরিণত হয়ে গেল। কিছু বুঝে উঠার আগেই চায়ের কাপটা ফ্লুরে ফেলে দিলাম। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
ফ্লুরে ফেলা চায়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যি এটা চা না রক্ত দেখা দরকার। না, এটা চা। কিন্তু আমি কেন রক্ত দেখলাম? না, এটাও হেলুসিনেশনের প্রভাব।
মনে হচ্ছে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনার প্রভাব এটা।
...
আবুল সাহেবের ওখান থেকে চলে এসেছি। বুঝতে পারছি না এই রহস্য সম্পর্কে। যেটা শুধু আমার সাথেই ঘটছে। ড্রয়িংরুমে বসে এসব চিন্তা করতেছি। তখনই আনিকা চায়ের কাপ নিয়ে আসল। আনিকা কে আজ খুব হাসি খুশি মনে হচ্ছে।
- তোমার চা?
- শরীর ঠিক আছে?
- হ্যা। আচ্ছা ওই আশফাকের কবরে যে লাশ পাওয়া গেলনা!
- হ্যা।
- কাউকে কি ধরতে পারল পুলিশ?
- এখনও পর্যন্ত না।
- ওহ। আমি যাই, রান্না করা বাকি আছে?
- আচ্ছা।
আনিকা রান্না ঘরে চলে গেল। আমি চায়ের কাপ নিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। আবুল সাহেবের বাসায় খাওয়া হয়নি, বুঝতে পারছি না সত্যি চায়ের কাপে রক্ত দেখেছি না সব হেলুসিনেশন!
এসব চিন্তাভাবনার মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে গেল। আজকে লোডশেডিং বেশিই হচ্ছে মনে হয়। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে দেখি চার্জার লাইট জ্বালানো। মনে হয় আনিকা জ্বালিয়েছে। আমি অন্ধকারে চা খাচ্ছি।
সামনের দেয়ালের দিকে চোখ পড়তেই আমি অনেকটা ভয় পেয়ে গেলাম। যেটা দেখছি, সেটা দেখে ভয় পাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কপালে ঘামে জমে আছে। আমার চোখ গুলা বড় হয়ে আছে।
অন্ধকার রুমের মধ্যে আমার ঠিক সামনের দেয়ালটায় সেই সাতটা স্টার। তাও সবকটি স্টার লাল হয়ে আছে।
আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। না, যা দেখছি সব হেলুসিনেশনের প্রভাব ভেবে।
.
চলবে............
