রক্ত 

.

(২য় পর্ব) 

.



টেবিলের মধ্যে দুজনেই বসেছি ডিনারের জন্য। 

আমি আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকাকে কিছুটা অন্যমনস্ক লাগছে। হয়ত ওই খুনের বিষয় নিয়েই চিন্তা করছে।

- আনিকা কি হয়েছে? 

- না, কিছু না। 

- তাহলে খাচ্ছ না কেন?

আমি কথাটা বলেই টেবিলের দিকে তাকালাম। আনিকার প্লেটের দিকে তাকাতেই অনেকটা ভয় পেয়ে গেলাম। ওর প্লেটে কোনো ভাত, তরকারী নেই। শুধু আছে লাল রঙের কয়েকটা ★ স্টার। অবিকল আশফাকের শরীরে যেভাবে আঁকা ছিল সেইভাবে। মনে হচ্ছে রক্ত দিয়ে মাখানো।

ব্যাপারটা সত্যি কি না দেখা দরকার। চোখে ভুল দেখতে ও পারি। গ্লাসের পানিটা দিয়ে চোখ দুটো ভাল করে ধুয়ে নিলাম। তারপর আনিকার প্লেটের দিকে তাকালাম। না, ঠিকি আছে। মেয়েটা ভাত, তরকারী খাচ্ছে। 

মনে হচ্ছে আশফাকের দেহের চিহ্নের দৃশ্যটা আমার চোখে লেগে আছে। সেরজন্য হয়ত হেলুসিনেশনের প্রভাবে এটা হচ্ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, আমার এইরকম ঘটনা করছি দেখে আনিকা কিচ্ছু বলছে না। সে নিরবে ভাত খেয়ে যাচ্ছে। আমার দিকে তাকানোর ও কোনো আগ্রহ নেই। আনিকা তো এমন ছিলনা। খেতে বসলেই আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। আমার খাওয়া দেখতে। আমার খাওয়া শেষ হলেই সে খেতে শুরু করত।

আশফাকের এই খুনটা আমাকে খুব প্রভাবিত করে ফেলেছে। এইদিকে আনিকার এইরকম পরিবর্তন, কিছুই বুঝতে পারছি না।

খাওয়া শেষ করে আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। আনিকা এখনও চেয়ারে বসে আছে। তবে খাচ্ছে না। কিছু একটা নিয়ে মনে হয় চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে। হয়ত বা আশফাকের খুনের রহস্যটা নিয়ে।

আমি উঠে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখলাম।

- আনিকা? 

- (সে অনেকটা বিব্রতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে তার চিন্তায় বিঘ্ন ঘটানোটার জন্য। ) 

- কি হয়েছে, খাচ্ছ না, আবার বসে আছ! 

- হ্যা, উঠছি।

বিছানায় গিয়ে বসেছি। আনিকার এইরকম পরিবর্তন আমাকে অনেক ভাবাচ্ছে। তার উপর এই আশফাকের মৃত্যুটাও।

আজ রাতে ঘুম আসবে বলে আমার মনে হয়না। বিছানায় গড়াগড়ি করছি, কিন্তু না চোখে নিদ্রা নেই। ওই সেভেন স্টার গুলা আমার নিদ্রা কেড়ে নিয়েছে।

আনিকা বিছানায় বসেই খাতা কলম নিয়ে কি যেন লিখছে। হঠাৎ করে রাতে খাতায় কি লিখে। আগে কখনও লিখতেও দেখিনি। শোয়া থেকে উঠে বসেছি। আনিকার খাতার দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম। অবাক বললে ভুল হবে, অনেক ভয় পেলাম। কেননা সে ওই স্টার গুলা আঁকতেছে। যেটা আশফাকের শরীরে আমি দেখেছিলাম। মনে হচ্ছে হেলুসিনেশনের প্রভাব। 

দ্বিতীয় বার তাকাতেই দেখলাম, সে কিছু একটা লিখছে। তাহলে কি স্টার গুলা হেলুসিনেশনের জন্য দেখছি। এই সেভেন স্টার গুলা আমার ভেতর খুব ভয় নিয়েই ঢুকে গেছে। না, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না এই বিষয়টা। 

এসব চিন্তাভাবনার মধ্যেই কখন ঘুমিয়ে পরেছি খেয়াল নেই। 

....

ভোরের দিকে ঘুম ভাঙ্গল। আজকাল ঘুমের স্থায়ী বেশি হচ্ছে না। তার উপর আজ ছুটির দিন। একটু বেশিই ঘুমানো দরকার। কিন্তু, ঘুম ভাঙ্গল সেই ভোরের দিকে। 

আজ ঘুম ভাঙ্গতেই আমি উঠে আনিকার দিকে তাকালাম। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর মুখ আমি দেখছি।

কালকের রক্তের কথা মনে হতেই চারিদিকে তাকালাম।কোথাও কোনো রক্ত কি না দেখা দরকার। না, কোথাও কোনো রক্তের দেখা মিলল না।

দরজা খোলে বাইরে বের হতেই আবুল সাহেবের সাথে দেখা। উনি উনার ছেলে আশফাকের শেষকৃত্য এর কাজ গুলা সম্পূর্ণ করছেন। যেখানে উনার ছেলেই উনার শেষকৃত্য সম্পূর্ণ করার কথা, সেখানে উনাকে এসব করতে হচ্ছে। জীবনটা বড়ই অদ্ভুত , নির্মম।

- আফরান? 

- জ্বি আঙ্কেল? 

- একটু সাহায্য কর।

- অবশ্যই আঙ্কেল।

ছেলেকে হারানোর শোকে আবুল সাহেবের অবস্থা পুরাই খারাপ। আনিকা কে ঘুম থেকে উঠিয়ে আমি গোসল করলাম। ততক্ষণে আনিকা নাস্তা তৈরি করে ফেলেছে। 

নাস্তা করেই বের হলাম আশফাকের শেষকৃত্য জন্য।

আশফাকের শেষকৃত্য শেষ করে প্রায় ১২টা হয়ে গেল। 

এদিকে আজ শুক্রবার। নামাযে যেতে হবে।

আশফাক কে কবর দিয়ে বাসায় আসার পরই ইন্সপেক্টর নাজমুল সাহেবের দেখা মিলল। উনার হাতে রিপোর্টের কাগজ। মনে হয় পোস্টমর্টেম রিপোর্ট।

ইন্সপেক্টর নাজমুল আবুল সাহেবের কাছে এসেই বললেন।

- আপনার ছেলে কি নেশা করে? 

- কেন বলুন তো? 

- ওর শরীরে এলকোহল পাওয়া গেছে। 

- আর কিছু জানা গেল ইন্সপেক্টর? 

- পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী প্রথমে আশফাক কে গলা টিপে হত্যা করা হয়। পরে এর শরীরে ধারালো কিছু দিয়ে খুব জঘন্য ভাবে আঘাত করা হয়। তবে গলার মধ্যে কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাইনি।

প্রফেসর হেলাল বলে উঠলেন.." ছুড়ি দিয়ে কি?

ইন্সপেক্টর : না, তবে মনে হচ্ছে লম্বা নখ দিয়ে এইরকম আঘাত করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ঈগল পাখির লম্বা নখ বলতে পারি।

ইন্সপেক্টর নাজমুলের কথাটা ঠিক মাথায় ঢুকল না। খুনটা তো কোনো মানুষ করেছে। তাহলে এই ঈগল পাখির নখের কথা কেন আসছে। আর নখ দিয়ে কি সত্যি এতটা ভয়াবহ আঘাত করা সম্ভব।

আর এই সেভেন স্টারের ব্যাপারটা কি? সেভেন স্টারের কথা মনে হতেই আমি ইন্সপেক্টর নাজমুলের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম।

- স্যার, ওই সেভেন স্টারের ব্যাপারটা তাহলে? 

- ওটা আশফাক কে মারার পর কেউ খুব সখ করে নিজের নখ দিয়ে ওর বুকের উপর এঁকেছে। যেটা এই পোস্টমর্টেম রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা আছে।

কথাটা বলেই ইন্সপেক্টর নাজমুল পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আমার হাতে দিয়ে দিলেন। আমি কাগজ গুলা দেখলাম। হ্যা, স্পষ্টই লেখা আছে, এই ব্যাপার গুলা। যা ইন্সপেক্টর একটু আগে বললেন। কিন্তু এই নখের ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝলাম না। মানুষের নখ দিয়ে কি কারো শরীরে এত জঘন্য ভাবে আঘাত করা সম্ভব। আমি ঠিক জানি না। তবে নখ তো মেয়েরা লম্বা রাখে।

তবে কি আশফাকের খুনি কোনো মহিলা। বুঝতে পারছি না।

- ইন্সপেক্টর? 

- হ্যা বল আফরান! 

- নখ লম্বা তো মেয়েরা রাখে, তবে কি...

ইন্সপেক্টর আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন।

- আফরান তুমি যেটা ভাবছ, সেটা আমিও ভেবেছি। একজন ডক্টরের সাথে কথাও বলেছি। তিনি বলেছেন একজন সাধারণ মানুষের শরীরের নখ দিয়ে কখনও এইরকম আঘাত করা সম্ভব না। 

- তাহলে, কি কোনো জন্তুর? 

- সেরকমি। আমার মনে হয় কোনো জন্তুজানোয়ারের। কিন্তু একটা জন্তু কিভাবে কারো বাসায় এসে কাউকে মেরে ফেলে, আর কেউ বুঝতেই পারল না। 

- হ্যা, তাও ঠিক। 

- খুব বড় একটা রহস্য আছে। আমি সবরকমের চেষ্টা করছি খুনিকে ধরার। 

- ওকে স্যার। 

- আজ আসি আফরান!

- জ্বি।

ইন্সপেক্টর চলে গেলেন। আবুল সাহেব, প্রফেসর হেলাল চলে গেছেন। আমি নিজের রুমের দিকে চলে গেলাম। এদিকে নামাযে যেতে হবে। কলিংবেল চাপ দিতেই আনিকা এসে দরজা খোলে দিল। আনিকা কে দেখেই ওর হাতের দিকে আমার চোখ পরে গেল। কেন গেল আমি নিজেই জানি না। তবে হয়ত ওর নখ দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু কেন, আমি একে সন্দেহ করছি, সেটা আমি নিজেই জানিনা। আনিকার হাতের নখ দিয়ে তো আর এইরকম আঘাত করা সম্ভব না। সেটা তো ইন্সপেক্টর আমাকে বলেছেন। তারপরও কেন তাকাচ্ছি। 

...

সন্ধ্যার দিকে আনিকা একটু অন্যরকম ভাবে আচরণ শুরু করে দিল। কালকের মত নিশ্চুপ হয়ে এক জায়গায় বসে থাকা, কম কথা বলা। কিছু বুঝতে পারছি না, কেন এমন করছে।

ঘুমানোর সময় জিজ্ঞাসা করলাম।

- আনিকা কোনো সমস্যা। 

- না।

- তাহলে এরকম লাগছে কেন?

- ওই একটু মাথা ব্যথা করছে। 

- ওহহ। আশফাকের খুনের বিষয় জানো? 

- না। 

- কেউ ওকে গলা টিপে মেরেছে। তারপর নখ দিয়ে সমস্ত শরীরে আঘাত করেছে। তারপর সেভেন স্টার এঁকেছে। 

কথা গুলা বলেই আনিকার দিকে তাকালাম। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। মস্তিষ্কের ভেতর কিছু রহস্য নিয়েই এই রাতটাও কেটে গেল। 

..

প্রায় সকাল ৭টার দিকে ঘুম ভাঙ্গল। অফিস নেই, কিন্তু তবুও ঘুম আসছে না। শেষমেশ আনিকা কে ঘুম থেকে জাগালাম। মেয়েটা ঘুম ঘুম চোখে আমার দিকে তাকাল। তারপর একটা চিৎকার মারল। চিৎকার কেন করল, কিছুই বুঝলাম না।

- কি হয়েছে আনিকা? 

- তোমার গেঞ্জি?

গেঞ্জির দিকে তাকিয়ে আমি নিজেই শেষ। সাদা গেঞ্জিতে কেউ দশ আঙ্গুলের চাপ বসিয়ে দিয়েছে তাও লাল। মনে হচ্ছে কেউ রক্তমাখা হাত দিয়ে তার দশ আঙ্গুলের চিহ্ন গেঞ্জিতে বসিয়ে দিয়েছে। আনিকা ভয়ে কাছুমাছু হয়ে আছে। আমি নিজেই ভয়ে অস্থির হয়ে আছি। বুঝতে পারছি না এই রহস্যটা। কেন এমন হচ্ছে।আর কোথা থেকেই বা এই রক্ত আসছে? কেউ ফাজলামি করে করবে, এটা ও তো না। তাহলে?

.

চলবে........