রক্ত
.
(৫ম পর্ব)
.
চোখ খোলে দেখি দেয়ালটা পুরোই অন্ধকার আছে। না, কোনো লাল রক্তের স্টার নেই। বুঝতে পারছি না এটা হেলুসিনেশন না সত্যি দেখছি। আর সত্যি দেখলে পরে আর দেখছি না কেন?
..
বিছানায় বসে বসে এইসব চিন্তা করতেছি। ব্যাপারটা আনিকার সাথে বলা দরকার! আমি আনিকার দিকে তাকালাম, সে শুয়ে আছে।
- আনিকা?
- কি?
- কয়েকদিন ধরে আমি অদ্ভুত কিছু জিনিস দেখছি!
- মানে?
আমার কাছে মনে হওয়া হেলুসিনেশন গুলা আনিকার সাথে শেয়ার করলাম। আনিকা আমার এসব কথা শুনে নিজেই কেমন ভয় পেয়ে গেল। মেয়েটা আমার থেকেও অনেক বেশি ভীতু।
আমার এসব শুনে আনিকা বলল " একজন সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার দেখাও!
আমার এ চিন্তাভাবনা সেরকমি। আমার নিজের ভিতরই জিনিসটা খুব আতংকিত হয়ে আছে। সেইসাথে এই মার্ডার, রক্তের রহস্য, সবকিছু মিলিয়ে মস্তিষ্কটা পুরো ভয় নিয়ে আছে।
রাত প্রায় দুটোর দিকে ঘুম আসল। এই সময়টুকু মাথায় শুধু এই বিষয়টাই ছিল। যদি ব্যাপারটা হেলুসিনেশনই হয় তাহলে কেন শুধু আমি দেখছি, ব্যাপারটা কেন আর কেউ দেখছে না। মার্ডার নিয়ে যে শুধু আমি চিন্তিত তাও না। তাহলে?
অন্যদিনের মত এবারও খুব ভোরেই ঘুমটা ভাঙ্গল।
চোখ খুলেই আমি যেটা আগে দেখলাম, সেটা হল রক্ত।
না, আজ আমার বা আনিকার কাপড়ে রক্তের কোনো দেখা পাইলাম না। সিস্টেম অনুযায়ী কি আর কোনো মার্ডার হবেনা। আমার চিন্তাভাবনার মধ্যেই একটা চিৎকার শুনা গেল। চিৎকার শুনে আনিকাও উঠে গেছে।
- কি হয়েছে?
- জানিনা। কেউ চিৎকার করল মনে হয়!
- কে?
- দেখে আসি?
আমার সাথে সাথে আনিকাও উঠে আসছে। দরজা খুলে দেখতেই দেখলাম প্রফেসর স্যারও সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। উনার পিছনে দুইদিন আগে আসা ভাড়াটিয়া টিপু নামের ছেলেটাও এসেছে।
- স্যার, চিৎকারটা কে করল?
- আবুল সাহেবের রুম থেকে আসছে মনে হয়।
- চলুন তাহলে গিয়ে দেখি?
সিঁড়ি দিয়ে উঠছি আর ভাবছি কি এমন হল যে আবুল সাহেবের রুম থেকে এত জোরে চিৎকার এলো!
...
আবুল সাহেবের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি দরজা খোলা।
ভেতর ঢোকেই দেখি আঙ্কেল আর আন্টি দুজনেই ড্রয়িংরুমে খুব ভয়ে বসে আছেন। এরা ভয় কেন পেল এটাই বুঝলাম না।
- আঙ্কেল কি হয়েছে?
আঙ্কেল শুধু হাত ইশারা করে রান্নাঘরের দিকে দেখালেন। মনে হচ্ছে ভয়ে উনি কথা পর্যন্ত বলতে পারছেন না। কিন্তু রান্নাঘরে কি এমন আছে, যে আঙ্কেল আন্টি এত ভয় পেয়ে আছেন। না, কি কোনো লাশ! লাশের কথা মনে হতেই আমার সমস্ত শরীরটা শিউরে উঠল।
আমি আনিকা, স্যার তিনজনই রান্নাঘরের দিকে গেলাম। না, কোনো লাশ নেই। কিন্তু যেটা আছে, সেটা দেখে ভয় পাবারই কথা। একটা জগ রক্তে ভরপুর।
যেটা দেখে আনিকা ভয় পেয়েছে। স্যারও পেয়েছেন।
আমি নিজেও ভয় পেয়েছি। কিন্তু কাল রাতে আন্টির ওইরকম ব্যবহার, আর চা রক্তে পরিণত হওয়া আর এখন এই এক জগ রক্ত। সবকিছু মিলিয়ে আমার মাথাটা পুরো শেষ। বুঝতে পারছি না, এটা কি সত্যি আন্টির কাজ? কিন্তু কিভাবে কি?
আমরা তিনজনই রক্তের জগটা নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসলাম। আঙ্কেল আন্টি জগ দেখে আরো ভয় পেয়ে গেলেন। আমি আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে বললাম..
- আঙ্কেল এই রক্ত আসল কোথা থেকে?
- আমি জানিনা আফরান। সকালে উঠেই দেখি এই রক্তে ভরপুর জগ। আমি তো রাতেও এই জগ থেকে পানি খেয়ে ঘুমিয়েছি। কিন্তু এখন যা দেখছি তা বিশ্বাস করার মতো না।
- তাহলে এটা আসল কোথা থেকে?
- আমি ইন্সপেক্টর কে কল দিয়েছি, উনি বলেছেন আসছেন এখানে!
আমি আন্টির দিকে তাকালাম। উনি এদিকে তাকাচ্ছেন না। ভয়ে না, অন্যকিছুর জন্য সেটা বুঝতে পারলাম না।
..
ইন্সপেক্টর এলেন প্রায় ১৫ মিনিট পর। ইন্সপেক্টর নাজমুল এসব দেখে নিজেই ভয় পেয়ে গেছেন।
- আবুল সাহেব এসব কি, কিভাবে হল?
- জানিনা ইন্সপেক্টর। সকালে উঠেই দেখি এই ঘটনা।
আমি ইন্সপেক্টর সাহেব কে বললাম।
- স্যার, এই রক্তের গ্রুপ টেস্ট তো করতেই পারি। কি গ্রুপ সেটা অন্তত দেখা যাবে।
- হ্যা, আফরান। ওই আরেকটা কথা বলার ছিল!
- কি?
- জামালের গলায় কারো হাতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে।
- কার?
- ফিঙ্গারপ্রিন্টটা কার সেটা এখনও বলা যায়নি। তোমাদের সবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট লাগবে, কারো সাথে মিলে কি না দেখার জন্য।
- মানে কি? আপনি কি আমাদের সন্দেহ করছেন?
- আইনের চোখে সবাই সমান। সো, আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতেই হবে।
- বুঝলাম। কিন্তু স্যার, এই মার্ডার হওয়ার বিষয়টা কি আপনি একটু ভেবে দেখেছেন?
- কি, আফরান?
- আশফাকের খুনের পর তার বন্ধু জামালকে ও খুন করা হল। মনে হচ্ছে না, এরপর তাদের কোনো বন্ধু খুন হবে। সেই স্টার অনুযায়ী তো আরো পাঁচটা খুন হওয়ার কথা। তাই বলছিলাম আশফাকের ফ্রেন্ডদের বের করে পুলিশ প্রোটেকশন দিলে কেমন হয়? খুনি যেই হউক, সে তো স্টার দিয়ে এটাই বুঝাতে চাচ্ছে যে খুন সর্বমোট সাতটাই হবে।
- এটা ঠিক বলেছ আফরান। কিন্তু ওদের ফ্রেন্ড কে কে জানব কিভাবে?
- আঙ্কেল কে জিজ্ঞাসা করুন, কিছু জানেন কি না? আর স্যার মনে হচ্ছে এরা কোনো বড় ধরণের অপরাধ করছে। আর যার সেই ক্ষতি করেছে, সেই মনে হয় প্রতিশোধ নিচ্ছে।
আঙ্কেল আমার আর ইন্সপেক্টর স্যারের কথা শুনেই বলতেছেন।
- আমার জানামতে ওরা চারজন ফ্রেন্ড আছে, যারা একসাথে সবসময় থাকত।
- কে কে?(ইন্সপেক্টর)
- আশফাক, জামাল, চঞ্চল, সামাদ!
- চঞ্চল, আর সামাদের ঠিকানা দিন।
আবুল সাহেব ঠিকানা একটা কাগজে লিখে দিলেন।
জামালের গলায় পাওয়া ফিঙ্গারপ্রিন্টটা কার সেটা নিয়ে সবাই চিন্তিত রয়েছে। সেই সাথে ভয়ও কাজ করছে। আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যেই ইন্সপেক্টর নাজমুলের মোবাইলে কল আসল।
উনি কথা বলতে গিয়েই মনে হল অনেক অবাক এবং ভয় দুটোই পেয়েছেন। কেননা কল ধরেই একটা চিৎকার মেরে বলেছেন কি?
তারপর থেকেই উনার কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে। মনে হচ্ছে বড় কোনো দুঃসংবাদ শুনেছেন। কল শেষ হতেই
ইন্সপেক্টর খুব ভয়ার্থ দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকালেন।
আমি উনার তাকানো দেখে বললাম.
- স্যার, কি সমস্যা?
- আবারও।
- আবারও কি?
- আশফাকের কবরের পাশে আরেকটা লাশ!
- কি?(সবাই একসাথে)
আন্টি ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। আনিকা ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। কিন্তু আমার চিন্তা ঠিক অন্য কিছু। আঙ্কেল আশফাক কে নিয়ে চারজনের নাম দিয়েছেন। আর স্টার হল সাতটা। যদি স্টার অনুযায়ী খুন হয় তাহলে সাতটা খুন হবে। কিন্তু এদিকে আশফাকের ফ্রেন্ড তিনজন। তাহলে বাকি তিনজন কে কে? না কি স্টার গুলা এমনিতেই দেয়া?
....
আশফাকের কবরের পাশে যে লাশ পাওয়া গেছে, আবুল সাহেবের মত অনুসারে সেটা চঞ্চলের। হ্যা, অন্য দুটো খুনের মতই একে ও খুন করা হয়েছে।
এর ও বুকের মধ্যে স্টার আঁকা আছে। তবে ছয়টা না, পাঁচটা। প্রতিটা খুনের পর একটা করে স্টার কমছে। তাহলে এটা সত্যি যে, খুন সাতটাই হবে।
আশফাকের ফ্রেন্ড বাকি রইল সামাদ। যে করে হউক একে বাঁচানো দরকার। সেইসাথে আরো তিনজন কে সেটা জানা দরকার।
কনস্টেবল দুজন লাশটা উঠিয়ে এম্বুলেন্স করে নিয়ে গেছে, ইন্সপেক্টর যাননি।
আমি ইন্সপেক্টর স্যারের সামনে গেলাম।
- স্যার, বাকি রইল সামাদ।
- হ্যা।
- আপনি দ্রুত কিছু একটা করুন।
- অবশ্যই আফরান।
ইন্সপেক্টর সামাদ কে পুলিশ প্রোটেকশন দেয়ার জন্য চলে গেলেন। এদিকে প্রফেসর স্যার, আমি, আবুল সাহেব, টিপু বাসায় চলে আসলাম। কেউই কিছু বলতে পারছেন না। তবে আবুল সাহেব কে দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা গোপন করছেন। কিন্তু বলছেন না। বুঝতে পারছি না কেন তিনি কিছু গোপন করছেন।
টিপু নামের নতুন ভাড়াটিয়া যে ছেলেটা এসেছে, সে একটু অন্যরকম। ওর সাথে দুইটা বন্ধুও থাকে।
বুঝতে পারছি না এরা কি এই রহস্যের পিছনে আছে। জামালের গলায় পাওয়া ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েই হয়ত বুঝা যাবে কে আসলে এই মাস্টারপ্ল্যানার। কে এই রহস্যের পিছনে জড়িত।
বার বার হওয়া একি টাইপের রহস্যময় খুন সবাইকে কেমন ভয় পাইয়ে দিয়েছে। সেইসাথে এই রক্ত। কোথা থেকেই বা আসছে এই রক্ত। গেঞ্জিতে, শাড়িতে, আর এই জগের মধ্যে।
...
জামালের গলায় পাওয়া হাতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট এর জন্য সবাই এসে নিজেদের ফিঙ্গারের চাপ দিয়ে গেছে। ইন্সপেক্টর সাহেব নিজে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আবুল সাহেবের বাসায় পাওয়া রক্তের টেস্ট ও করাচ্ছেন।
আমি আঙুলের চাপ দিয়ে স্যার কে এসে বললাম..
- স্যার, সামাদ?
- হ্যা, ওকে পুলিশ প্রোটেকশন দেয়া হয়েছে। আর আশফাকের কবরের পাশে আরো দুজন কনস্টেবল গোয়েন্দার মত আছে। কি হয়, না হয় সব জানার জন্য।
- ধন্যবাদ স্যার।
- আর ওই জামালের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট চলে এসেছে। ওই একইভাবে সবকটি মার্ডার। আশ্চর্যের বিষয়, সবগুলা মার্ডার এত সূক্ষ্ম ভাবে যে কোনো পরিবর্তন নেই।
আসলেই তো, সবগুলা মার্ডার ঠিক একইভাবে করাটা অসম্ভব। তবে এখন কিছুটা শান্তি মিলছে, যাক সামাদ ছেলেটা তাহলে বাঁচল।
এত বেড়াজালে পরে অফিস যে আছে সেটা ভুলেই গেছিলাম। আজ অফিস ছিল, কিন্তু যেতে পারিনি।
কাল গিয়ে না হয়, কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে নিব। এইরকম পরিস্থিতিতে অফিস করা সম্ভব না। মাথা একদম কাজ করছে না।
..
রাত প্রায় তিনটে বাজে।
ঘুমের মধ্যে খুব জোরে চিৎকার শুনে লাফ দিয়ে উঠলাম। চারিদিকে অন্ধকার। এতরাতে কে এমন বিদ্রূপ ভাবে চিৎকার করল। সেটা বুঝতে পারছি না।
বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাতেই দেখি আনিকা আমার পাশে ঘুমিয়ে আছে।
আমি উঠে গিয়ে লাইট জ্বালালাম। সিঁড়ি দিয়ে কেউ দৌড়ে উঠার শব্দ পেয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। এতরাতে কে সিঁড়ি বেয়ে উঠবে। কোনো ভূত, টূত নয়ত। পরিস্থিতি যেরকম, তাতে এটা মনে হবার কথা। আমি ভয়ে ভয়ে
দরজা খুললাম। দেখি টিপু আর প্রফেসর স্যার সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন।
- স্যার কে চিৎকার করল?
- আবুল সাহেব।
- কেন?
- জানিনা। চল গিয়ে দেখি।
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দেখি ড্রয়িংরুমে আবুল সাহেব পড়ে আছেন। কিন্তু তার শরীরে কিছু আছড়ে দেয়ার দাগ আছে। যেখান দিয়ে কিছুটা রক্ত বের হচ্ছে। আন্টি কান্নাকাটি করছেন।
- আন্টি কিভাবে কি হল?
- আমি জানিনা বাবা। হঠাৎ চিৎকার শুনে ঘুম ভাঙ্গল, দেখি এই অবস্থা।
মনে হয় ভয়ে আবুল সাহেব অজ্ঞান হয়ে গেছেন। একটুর জন্য রক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু এটা বুঝতে পারছি না, যদি আঙ্কেলের ছেলে বা তার ফ্রেন্ড কিছু করে থাকে, সেখানে উনার হাত কিভাবে এলো? যার জন্য আঙ্কেল কে মারার চেষ্টা করা হল?
.
চলবে.........
