রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার






৭ম পর্ব 

.

১৫. 


পরেরদিন: সকাল ৯টা বাজে। পিজন আর ডাক্তার জন চেম্বারে বসে আছেন। ডাক্তার জন এখনো ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। গতরাতে দেখা সেই ভয়ংকর দৃশ্যটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারছে না তিনি। এখনো সে দৃশ্যটার কথা মনে পড়তেই তিনি ভয়ে শিহরে উঠছে! জন এবং পিজন দুজনেই চুপচাপ অনেক্ষণ সামনাসামনি বসে থাকে। এরপর নীরবতা ভেঙে পিজনই ডাক্তার জনকে প্রশ্ন করে:

-ডাক্তার জন, আপনি কী এখনো ঘটনাটা বিশ্বাস করছেন না? আপনি কী এখনো ভাবছেন গতরাতে গোরস্হানের দেখা পুরো ঘটনাটা হেলুসিনেশন?

-না, পিজন। আমি বিশ্বাস করছি ঘটনাটা। কিন্তু ভাবছি, এইগুলো কী হচ্ছে? মৃতরা আবার ফিরে আসছে কিভাবে? তারা আবার কী চায় পৃথিবীর কাছ থেকে? আর সেই আলখেল্লা পড়া লোকটাই বা কে? এছাড়া তোমার সেই বাদুড়গুলোর দিকে রসুন ছুড়ে মারার ঘটনাটাও বুঝলাম না!

-ডাক্তার জন, আপনি কী গত কয়েক সপ্তাহের পত্রিকা গুলো পড়েছেন?টিভিতে গত কয়েকদিনে কোন খবর দেখেছেন?

-এইগুলো আমার রোজকার অভ্যাস ছিলো। কিন্তু একজন সাইক্রিয়াট্রিস্ট হয়েও আমি নিজেই এখন অনেক মানসিক চাপে ভুগছি। গত কয়েকদিন ধরে আমার সাথে এতোই অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে চলেছে যে, এইগুলো আমি কখনো কল্পনাও করতে করিনি। তাই বর্তমানে এসব থেকে দূরেই রয়েছি। কিন্তু কেন?

- টিভিতে এক পরিসংখ্যানে দেখলাম গত এক মাসে হঠাৎ রক্তশুন্যতায় ভুগে মৃতের সংখ্যা প্রায় কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। পত্রিকায়ও ঠিক একই রকম পরিসংখ্যানই উপস্হাপন করা হয়েছে! আর প্রত্যেকটা মানুষের মৃত্যুর ধরণ একই। সবারই মৃত্যুর পুর্বে ঘাড়ে দুটো চিকন ছিদ্র দেখা যায়। এরপর তাদের চেহারা ধীরে ধীরে ফেকাসে সাদা হয়ে যায়! আর তাদের শরীরের রক্তও সব শুকিয়ে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা রক্তশুন্যতায় ভুগে মারা যায় !

রক্তশুন্যতার এই মহামারীকে সবাই একটা বড় রোগ হিসাবে নিচ্ছে। যদিও তারা জানেন না যে এটা কোন রোগ নয়। জানবে কী করে? তারাতো আর আমাদের মতো গোরস্হানের এই অদ্ভুত ঘটনাগুলো দেখে নি। তারাতো জানে না যে মৃতরা আবার ফিরে আসছে। তারাই এই রক্তশূন্যতা রোগের নামে এই খূনগুলো করছে। এই শহরের প্রায় সব গোরস্থানের লাশরাই এইভাবে ধীরে ধীরে জীবিত হয়ে রাতে আবার শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। তারা নিজেরাই ভ্যাম্পায়ার হয়ে গেছে। তারাই একটা থেকে দুইটা, দুইটা থেকে চারটা, চারটা থেকে আটটা, এইভাবে ক্রমস ভ্যাম্পায়ারদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেই চলেছে! এখন রক্তশুন্যতা এই শহরের একটা সবচেয়ে বড় মহামারী!

পুরো শহর এখন ভ্যাম্পায়ারের শহরে পরিণত হবে।

-ওহ মাই গড! আমিতো এসম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তুমি এতসব জানলে কী করে?

এতটা বিশ্বাসের সাথে এই ঘটনার বাখ্যাই বা দিচ্ছ কিভাবে? পুরো ঘটনাটা পরিষ্কার করে বলো?

-আসলে শহরের এই ভ্যাম্পায়ারদের আক্রমনের ঘটনা কোন হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া ঘটনা না। এটা অনেক আগেরই ঘোষিত একটা ঘটনা। আমি ছোটবেলা থেকেই প্রতি রবিবার করে আমাদের এলাকার পাশের একটা গির্জায় যেতাম! সেখানে ফাদার পিচ হারকেল প্রতি রবিবার সকলের উদ্দেশ্যে শান্তি বাণি দিতেন। আমি তার একজন বড় ভক্ত ছিলাম। তার প্রতিটা কোথাই আমি মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। তিনিও আমায় খুব পছন্দ করতেন। আমরা সেই সময় থেকেই প্রতি রবিবারই দুজনে মিলে নানান বিষয় নিয়ে গল্প করতাম। দেখতে দেখতে আমি বড় হয়ে যায়। আমাদের সম্পর্ক আরো ভালো হতে থাকে। প্রায় প্রতি রবিবারই আমাদের দেখা হতো। ঘটনাটা গত কয়েক মাস আগের। তিনি এক রবিবারে গির্জার সকলের উদ্দেশ্যে তার বক্তিতায় একটা অদ্ভুত রকমের কথা বলেন। তিনি বলেন, " পৃথিবী থেকে ঈশ্বরের ভক্তরা কমে যাচ্ছে। শয়তানের ভক্তের বেড়েই চলেছে! তারা শয়তানকে এই শহরের দিকে আহ্বান করছে! শয়তান আসছে এই শহরে। রক্তশুন্য করবে শহরটাকে। ধ্বংস করবে এই শহরটাকে। ইশ্বরের কাছে সাহায্য চেয়ে আমাদেরই বাঁচাতে হবে এই শহরকে! " আমি সেদিন তার কথার কোন অর্থই বুঝতে পারিনি। এরপর তার বক্তব্য শেষে আমি একা তার সাথে দেখা করতে যাই আর তার কাছে এই কথাগুলোর অর্থ বুঝতে চাই! তিনি আমায় বলেন, "শহরে কেউ একজন রয়েছে, যে শয়তানের পুজো করছে। সে অসীম ক্ষমতা আর অমরত্বের লোভে শয়তানকে এই শহরে আহ্বান করছে! শয়তান একবার এই শহরে আসলে এই শহরটাকে আনডেডের শহরে পরিণত করে ফেলবে। এই শহরের সবাইই অস্বাভাবিক ভাবে মারা যাবে। আর মৃত্যুর পরেও তারা শান্তি পাবে না। আবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসবে তারা! আনডেড বা ভ্যাম্পায়ার হয়ে। রক্ত খেয়ে ধ্বংস করবে এই শহরটাকে।" এরপর আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে, এই সমস্যার কোন সমাধান আছে কিনা? সে বলেছিলো, "সবার আগে সেই শয়তান পুজারীকে খুঁজে বের করতে হবে, যে শয়তানকে এই শহরে আহ্বান করছে! শয়তান এই শহরে আসার আগেই সেই লোকটাকে ধ্বংস করতে হবে। নাহলে, যদি একবার শয়তান এই শহরে কোনভাবে এসে পড়ে তাহলে বড় সর্বনাশ হবে! ভ্যাম্পায়ার ধ্বংসের একমাত্র হাতিয়ার হলো কাঠের কীলক। এছাড়া তারা রসুন এবং গাছের কাটা দেখে বেশি ভয় পায়। এই কাঠের কীলক যদি একবার ভ্যাম্পায়ারের হৃদপিন্ড বরাবর ঢুকিয়ে দেয়া যায় তাহলে ভ্যাম্পায়ারটা সাথে সাথেই ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অনেক বড় বিপদ হতে পারে। একটা ভ্যাম্পায়ারকে একাই একটা কাঠের কীটন বা রসুন দ্বারা ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু হাজারটা ভ্যাম্পায়ারকে একা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এরা আত্মা নয় যে, একটাকে ধ্বংস করলে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে! এখানে আত্মার মুক্তি বলে কোন বেপার নেই। এরা অভিশপ্ত শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়াবে প্রতিরাতে। তাই প্রতিটা ভ্যাম্পায়ারকেই আলাদা আলাদা ভাবে ধ্বংস করতে হবে। অবশ্য এদের ধ্বংস করার একটা সহজ উপায় রয়েছে। দিনের বেলায় ভ্যাম্পায়ারদের কোন ক্ষমতা বা শক্তিই থাকে না। এরা তখন যার যার কবরে ঘুমিয়ে থাকে। তাদেরকে তাই দিনের আলোতেই ধ্বংস করা সহজ। অবশ্য বুদ্ধি থাকলে রাতেও কোন সমস্যা নেই। রসুনটা অনেক কাজে দেয়। তবে রসুনের শক্তিকেও হার মানায় তাদের হিপ্নোটাইস করার ক্ষমতা। এরা বাদুড় এবং কুয়াশার রূপে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে পারে। এদের শহরে আসতে না দেওয়াই ভালো।" ঠিক এতটুকু কথাই সেদিন আমায় বলেন ফাদার। ফাদার সেদিন হঠাৎ আমায় এত অদ্ভুত রকমের কথা কেনো বলেছিলেন সেটা আমি সেদিন কিছুতেই বুঝতে পারি নি! তার বলা কথাগুলোরও সঠিক মানেও সেদিন খুঁজে পাইনি আমি! আমি তখনো এসব অতিপ্রাকৃতিক বিষয়ে বিশ্বাস করতাম না। তবে ফাদারের বলা কথাগুলো হেলাতেও ফেলে দিলাম না। এরপরের রবিবার যখন আমি গির্জায় যাই ফাদারের সাথে দেখা করতে, সেদিন গির্জায় গিয়ে আমি যা শুনলাম তা শুনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। গির্জার লোকেরা সেদিন আমায় বলেছিলো, ফাদার নাকি কিছুদিন আগে রক্তশুন্যতায় ভুগে মারা গিয়েছেন! কথাটা শুনে আমি পুরোই আৎকে উঠে ছিলাম। আমি তাদের কথা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারি নি। আমি সেদিন কল্পনাও করতে পারিনি যে ফাদার হঠাৎ এইভাবে মারা যেতে পারেন! আমি সেদিন খুব কেঁদেছিলাম। কিন্তু তখনো রক্তশুন্যতা কোন মহামারী রোগ ছিলো না এই শহরে! এটা একটা সাধারণ রোগ ছিলো তখন! তাই সবাই ফাদারের মৃত্যুটাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলো। আমিও ফাদারের মৃত্যুর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছুই বুঝতে পারিনি সেদিন। আমিও স্বাভাবিক ভাবেই নেই বিষয়টা। এরপর দীর্ঘদিন সব কিছু স্বাভাবিক ভাবেই চলছিলো। আমিও প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কে ফাদারের বলা সেই কথাগুলো। কিন্তু কিছুদিন আগে আমি খবরের কাগজে শহরের এই অস্বাভাবিক ভাবে মানুষের মৃত্যুর এই খবরটা দেখতে পাই। একসাথে এতগুলো মানুষের রক্তশুন্যতায় ভুগে মারা যাওয়াটা বেশ রহস্যজনক ছিলো আমার কাছে। ফাদারের মৃত্যুর সাথে এই মৃত্যু গুলোর কোথায় যেনো একটা মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম আমি। এখানে সবার মৃত্যুর পুর্বেই তাদের ঘাড়ের পাশে দুটো ছিদ্র দেখা যায়। আমি যেনো বূঝতে পারছিলাম যে ফাদারের বলা ভবিষ্যৎ বাণিই এখন বাস্তব হচ্ছে! মৃতরা আবার ফিরে আসছে। তবে এটা শুধূ আমার সন্দেহ ছিল। সন্দেহটা বিশ্বাসে পরিণত হলো, যখন দেখলাম আমার বাড়ির পাশের গোরস্হানের মৃতরাও আবার বাদুড়ের রূপে ফিরে আসছে। 

-কিন্তু তাহলে তুমি আমার কাছে গতকাল এসেছিলে কেন?

-আসলে তাও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না যে, আমার দেখা দৃশ্যগুলো বাস্তব নাকি আমার হেলুসিনেশন। তাই আমি এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপনার কাছে আসি। আর আপনিও গতকাল আমার সাথে থেকে একই ঘটনা দেখলেন। তার মানে আমি এখন নিশ্চিত যে এরা আমার কল্পনা না। এরা বাস্তব। মৃতরা আবার ফিরে আসছে!

-তার মানে গতকাল তোমার সম্পর্কে আমায় যে যে তথ্য দিলে সবই মিথ্যা ছিলো?! তুমি আমার কাছ থেকে এই সব কথা লুকিয়ে গেছো?

-হ্যাঁ, ডাক্তার জন। কারণ আমি জানতাম যে গতকাল যদি আপনাকে এসব কথা আমি বলতাম তাহলে আপনি এগুলোর কোন কথাই বিশ্বাস করতেন না। হেসে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু এখন নিজের চোখে পুরো ঘটনাটা দেখে এসব বিশ্বাস করতে আপনি বাধ্য!

-হুম। ঠিক বলেছো। কিন্তু একটা বিষয়ে আমি পরিষ্কার না। ফাদারতো আগে থেকেই জানতে পেরেছিলেন ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব সম্পর্কে। তিনিতো তাহলে এ সম্পর্কে বেশ সচেতনই ছিলেন! তাহলে সে কী করে ভ্যাম্পায়ারদের শিকার হলো?

রক্তশূন্যতায় মারা গেলো? তাও আবার কয়েক মাস আগে?

-এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত কিছু জানি না। জানার কথাও নয়। তবে ফাদার বলতেন ভ্যাম্পায়ারদের হিপনোটাইস করার ক্ষমতা থাকে তুখর! তারাই হয়তো ফাদারকে হিপনোটাইস করে তাদের শিকারে পরিণত করেছে।

-না, হয়তো না। ফাদার হয়তো সেই শয়তানের পুজারীর কাছে আগেই পৌছাতে পেরেছিলেন। সেই হয়তো তাকে রক্তশুন্যতার নামে খুন করেছে! কিন্তু সে কে?

-যাই হোক। শহরের জন্য বর্তমানে আরো বড় বিপদ হতে চলেছে! আমাদের এই ভ্যাম্পায়ারদের দ্রুত ধ্বংস করতেই হবে।

আমি জানি কাঠের কীলক কোথায় রয়েছে!

-তবে এই হাজারটা ভ্যাম্পায়ারদের আমাদের দুজনের পক্ষে ধ্বংস করা সম্ভব হবে না! এর জন্য পুরো শহরকেই আমাদের সচেতন করতে হবে। আমি গোয়েন্দা অফিসার ইকবাল খানকে চিনি। তিনিই হয়তো এ বিষয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারেন

.

.

১৬. ডাক্তার জন আর পিজন, গোয়েন্দা অফিসার ইকবাল খানের অফিসে তার টেবিলের সামনে বসে আছেন। ইকবাল খান ভ্রু-কুচকে বেশ রেগেই তাকিয়ে আছেন ডাক্তার জন আর পিজনের দিকে। তারা এতক্ষণ ধরে ভ্যাম্পায়ারের পুরো ঘটনাটা খুলে বলেছিলো ইকবাল খানকে। ইকবাল খান বেশ রেগেই ডাক্তার জনকে বললো:

-একটা বাচ্চা ছেলের ভ্যাম্পায়ারের গল্প শুনে তুমি আমার কাছে এসেছো? একটা বাজে গল্প শুনিয়ে শুধু শুধু আমার সময় নষ্ট করলে তুমি! এই রক্তশুন্যতা শুধু একটা মহামারী রোগ মাত্র! ভ্যাম্পায়ার বলে কোন কিছুই এই পৃথিবীতে নেই! আর তুমি একজন ডাক্তার হয়ে এই ধরণের কথা কী করে বলো? লজ্জা করে না তোমার?

.

এরপর ডাক্তার জন যেই এর উত্তর দিতে যাবেন ঠিক সেই সময়েই অফিসের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লেন মাসুদ রানা আর শম্মী। হঠাৎ তাদের ঢুকতে দেখে বেশ চমকে গেলেন ইকবাল খান, ডাক্তার জন আর পিজন! মাসুদ রানা কিছুটা উচু স্বরেই ইকবাল খানকে উদ্দেশ্য করে বললেন:

-ইকবাল খান, এদের কথা হেসে বা রেগে উড়িয়ে দেওয়ার মতো কোন কথা না! এরা এতক্ষণ আপনাকে যা যা বলছিলো, আমরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সব কথাই শুনছিলাম। এদের কথার মধ্যে কোন ভুল নেই।ভ্যাম্পায়াররা রয়েছে। মৃতরা আবার ফিরে আসছে পৃথিবীতে। বাদুড়ের রুপ নিয়ে রক্ত খেয়ে বেড়াচ্ছে সারা রাত ঝুরে। সৃষ্টি করছে রক্তশুন্যতা নামক ভয়ংকর রোগ। এরাই একের পর এক সাধারণ মানুষের রক্ত খেয়ে তাদের খুন করছে! এই ভ্যাম্পায়ারদেরকে আমাদের ধ্বংস করতেই হবে। শহরের সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দিতে হবে এই ভ্যাম্পায়ারদের খবর। তাদের জানিয়ে দিতে হবে এই ভ্যাম্পায়ারদের দুর্বলতাগুলো। আর ভ্যাম্পায়ারদের ধ্বংস করার উপায়টাও তাদের জানাতে হবে। শহরের সবাই এক জোট হয়ে কাজ করলেই আমরা এই পর্যন্ত যারা যারা ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হয়েছে তাদের সবাইকে একসাথে ধ্বংস করতে পারবো! আমাদের প্রথমে দিনের আলোতেই রক্তশুন্যতায় মারা যাওয়া প্রত্যেকটা কবর খুড়ে এদের বুকে কাঠের কীলক ঢুকিয়ে মুখে রসুন গুজে আবার কবর দিতে হবে। আমার বিশ্বাস তারা যদি সত্যি সত্যি ভ্যাম্পায়ার হয়ে থাকে, তাহলে তাদের লাশ এখনো পঁচেনি!

তারা প্রতি রাতে জেগে উঠে! 

.

.

মাসুদ রানার কথাগুলো শুনে সবাই বেশ উৎসাহ পেলো। শুধু ঘুমড়া মুখ করে বসে রইলো ইকবাল খান। সে যেনো এখনো ভ্যাম্পায়ারের কথাটা হজম করতে পারছে না! তার যেনো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে ভ্যাম্পায়াররাই এসব করছে! তার কাছে যেনো তাদের বলা সব ঘটনাই অবাস্তব আর অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে! কিন্তু সে এটা ভাবছে না কেন যে, এত হাজার মানুষের এক সাথে রক্তশুন্যতায় ভুগে মারা যাওয়াটাও কোন স্বাভাবিক বা বাস্তব বিষয় নয়? এরপর তারা ৫ জন মিলে অফিসে বসেই এই ভ্যাম্পায়ারের বিষয় নিয়ে নানান কথা বলছিলেন। এই কেসটা নিয়ে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা একে অপরের সাথে ভাগ করছিলো। যাতে করে পরবর্তী পদক্ষেপ গুলো তারা একত্রে সুন্দর করে নিতে পারে। মাসুদ রানা, শম্মী, ডাক্তার জন আর পিজনের চিন্তা বা বিশ্বাস অনেকটা একই রকমেরই। তারা সবাইই এখন বিশ্বাস করেন যে, ভ্যাম্পায়ারেরা রয়েছে। মৃত্যুর পর ভ্যাম্পায়ার হয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসা সম্ভব মানুষের পক্ষে। তারা রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে এবং আরো ভ্যাম্পায়ার তৈরি করতে থাকে। ব্যাতিক্রম শুধু ইকবাল খান। তিনি যেনো তাদের কথা শুনে বেশ বিরক্ত হচ্ছেন। তারা কয়েকবার ইকবাল খানকে বললো যে, এই ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কে সঠিক খবরগুলো মিডিয়ার সাহায্যে সকলের কাছে পৌছে দিতে। কিন্তু ইকবাল খান তাদের কাছে এই ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব সম্পর্কে উপযুক্ত প্রমাণ চাইলেন! তিনি সবার সাথে কিছুতেই একমত হলেন না! এরপর আর কোন উপায় না দেখে তারা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে আজ রাতে পিজনদের বাড়ির পাশের সেই গোরস্হানের পাশে তারা সবাই মিলে একত্রে লুকিয়ে থাকবে। এরপর এই অদ্ভুত আর ভয়ংকর দৃশ্যটা ইকবাল খান নিজের চোখে দেখার পরেই বিশ্বাস করবেন! এই কথা শোনার পরেও ইকবাল খান দ্বি-মত পোষণ করেন! পরে অনেকটা বাধ্য হয়েই রাতে তাদের সাথে গোরস্হানে যেতে রাজি হন তিনি।

.

.

১৭. রাত প্রায় ১০টা বাজে। ডাক্তার জন আর্ট, পিজন, শম্মী, মাসুদ রানা, ইকবাল খান সবাইই একত্রে গোরস্হানের পাশে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। শম্মী ভ্যাম্পায়ারের হাত থেকে বাঁচার জন্য ৫টা রসুনের মালা আগে থেকেই তৈরি করে নিয়ে এসেছিলো। সে জানে যে, এই মালা যতক্ষণ তাদের কাছে থাকবে কোন ভ্যাম্পায়ারই তাদের ততক্ষণ কোন ক্ষতি করতে পারবে না! কিন্তু ইকবাল খান এখনো বেশ খিটখিটে মেজাজে রয়েছেন! তিনি রসুনের মালাটা ছুয়েও দেখলেন না। তার যেনো বিশ্বাস রয়েছে, ভ্যাম্পায়ার আসবে না। কবর থেকেও কিছু উঠবে না!

.

এরপর তারা দুটো দলে ভাগ হয়ে গোরস্হানের দু'দিকে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। গোরস্হানের একটা দিকে মাসুদ রানা আর ডাক্তার জন আর্ট রয়েছেন। অপরদিকে ইকবাল খান, শম্মী আর পিজন রয়েছেন। শম্মী আর পিজনের কাছে রসুনের মালা থাকলেও ইকবাল খানের শরীরে এসব কিছুই নেই। সবাই তাই তাকে নিয়ে একটু বেশিই চিন্তিত!

.

তারা সেখানে লুকিয়ে থাকে প্রায় কয়েক ঘন্টা। রাত ১২টা পেরিয়ে ১টা, ১টা পেরিয়ে ২টা বেজে যায়। তাও গোরস্হানে অস্বাভাবিক কিছুই দেখতে পায় না তারা। মাসুদ রানা আর ডাক্তার জন যেনো বেশ হতাশ হয়েই পড়েন। তাও তারা এক ধ্যানে গোরস্হানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অস্বাভাবিক কিছু একটা দেখার নেশা যেনো তাদের চোখে কাজ করছিলো। 

.

এরপর হঠাৎই যেনো ইকবাল খানের বিকট চিৎকারের শব্দে ধ্যান ভেঙে যায় মাসুদ রানা আর ডাক্তার জনের।

তারা হঠাৎ ইকবাল খানের এই চিৎকারের শব্দে আৎকে উঠেন। এরপর দ্রুত গোরস্থানের ওপাশে তাদের কাছে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা যা দেখলেন তা দেখার জন্য তারা মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না! তারা যা দেখলেন তাতে ভয়ে তাদের শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে গেলো! তারা দেখলেন যে ইকবাল খান গোরস্থানের মাটিতে অচেতন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। তার পাশেই পিজন মুর্তির মত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে! পিজনকে জড়িয়ে ধরে কেউ একজন তার ঘাড় কামরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে পিজনের শরীরের সব রক্ত সে চুষে চুষে খাচ্ছে। সে আর কেউ নয়! শম্মী নিজেই পিজনের রক্ত চুষে চুষে খাচ্ছে! শম্মীর রক্ত খাওয়া শেষে পিজনের নিষ্প্রাণ দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কী ভয়ংকর দেখতে লাগছিলো শম্মীর চেহারা। পুরো সাদা ফেকাসে তারা মুখ। ঠোটের দুই দিক থেকে বেরিয়ে এসেছে দুটো ভয়ংকর চিকন দাঁত! চোখদুটো রক্তের মতো লাল! শম্মীকে এই অবস্হায় দেখে মাসুদ রানা আর ডাক্তার জনের শরীর আর মস্তিস্ক যেনো অবশ হয়ে আসছিলো। তারা কিছুই বলতে বা করতে পারছিলো না। তারাতো নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না। শম্মী চিৎকার করে বিকট কণ্ঠে হাসতে থাকে! এরপর হঠাৎ চারিপাশ থেকে সাদা কুয়াশার চাদর এসে শম্মীকে পুরো ঢেকে দিলো আর শম্মী সাথে সাথে একটা সাদা বাদুড় হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেলো। মাসুদ রানা আর ডাক্তার জন অবাক দৃষ্টিতে, নির্বাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। তাদের থেকে কিছুটা দুরেই পড়ে রইলো দুটো রসুনের মালা। একটা পিজনের, আরেকটা শম্মীর! . . . .

. . . . . চলবে . . . . . .