রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার
৮ম এবং শেষ পর্ব
.
১৮. হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন ইকবাল খান। আর তারপাশে দাঁড়িয়ে আছেন মাসুদ রানা আর ডাক্তার জন। আসলে গতরাতে গোরস্থানের পাশে তখন ইকবাল খান ভয়ে অজ্ঞান হয়েই মাটিতে পড়েছিলো। তার তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। শুধু মাথায় একটু আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু মাসুদ রানা আর ডাক্তার জন কিছুতেই গত রাতের ঘটা ঘটনাটা মেনে নিতে পারছেন না। শম্মী কী করে ভ্যাম্পায়ার হলো এটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না তারা। শম্মী আর পিজন দুজনের কাছেইতো রসুনের মালা ছিলো। তাও তাদের সাথে এমনটা কেন হলো? এর কোন ব্যাখ্যাও নেই তাদের কাছে! এরপর যখন ইকবাল খানের জ্ঞান ফিরলো তখন সে শম্মী সম্পর্কে যা বললেনবতা শুনে মাসুদ রানা আর ডাক্তার জন বেশ অবাক হন! ইকবাল খান তাদের বললেন, "গতকাল রাতে যখন আমি, পিজন আর শম্মী এক সাথে গোরস্থানের এক পাশে লুকিয়ে ছিলাম। আমি তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে, ভ্যাম্পায়ার বলে এই পৃথিবীতে কোন কিছু রয়েছে! তাই তোমাদের চাপে পড়ে বেশ হতাশ হয়েই তখন গোরস্হানের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এরপর হঠাৎ পিজনের গোংরানোর শব্দে আমার ধ্যান ভেঙে যায়। এরপর পেছনে তাকিয়ে আমি যা দেখলাম, তা দেখার জন্য আমি তখন মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। দেখলাম, শম্মী ভয়ংকর দৃষ্টিতে পিজনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে! তার চোখ দুটো রক্ত লাল, তার ঠোট ফেটে দুটো ধারালো চিকন দাত বেরিয়ে এসেছে। তখনো তাদের দুজনের শরীরেই রসুনের মালা ছিলো। এরপর শম্মী তার নিজের গলার রসুনের মালাটা আর পিজনের গলার রসুনের মালাটাও একটানে খুলে তাদের থেকে কিছুটা দুরে ছুড়ে ফেলে দেয়। এরপর শম্মী তার ভয়ানক দাতের কামড়টা বসিয়ে দেয় পিজনের ঘাড়ে। দৃশ্যটা থেকে আমি তখন ভয়ে আৎকে উঠে জোরে একটা চিৎকার করলাম। আর তখন সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি! এরপর আমি যখন চোখ খুললাম তখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম এই হাসপাতালের বেডে। তোমাদের সাথে। গত রাতের ঘটনাটা আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।"
.
ডাক্তার জন আর মাসুদ রানা দুজনেই তার কথাগুলো অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েই শুনছিলো। ইকবাল খানের বলা কথাগুলো যেনো তাদের বিশ্বাসই হচ্ছিলো না। এটা কী করে সম্ভব? শম্মী আর পিজন দুজনেইতো বলেছিলো যে,
ভ্যাম্পায়াররা নাকি রসুন দেখে ভয় পায়। রসুনের স্পর্শ তারা সহ্য করতে পারে না! তাহলে ভ্যাম্পায়ার হয়েও শম্মী রসুনের মালা কী করে পড়েছিলো? তাহলে কী তাদের সবার ধারণাই ভুল ছিলো? রসুন ভ্যাম্পায়ারদের দুর্বলতা নয়? বেচারা পিজন। শুধু শুধু এই ঘটনার মাঝখানে এসে , ফেসে মারা গেলো! আর শম্মীওতো এখন তাহলে ভ্যাম্পায়ার। তাদের দলে লোকের সংখ্যা আর কমলো! এখন পিজনকে ভালোভাবে কবর দিলেই হলো। এটা লক্ষ রাখতে হবে যে পিজনও আবার যাতে ভ্যাম্পায়ার হয়ে এই পৃথিবীতে ফিরে না আসে। পরক্ষণেই একজন নার্স এসে তাদের বললো, ইকবাল খানের এখন বিশ্রাম নেওয়ার সময়। এরপর ডাক্তার জন আর মাসুদ রানা দুজনেই ইকবাল খানকে হাসপাতালে একা রেখে পিজনের কাছে চলে গেলো। পিজনের লাশটা তারা সকালেই তার বাবা-মায়ের কাছে পৌছে দিয়েছিলো!
এছাড়াও এই কেসটা নিয়ে আরো গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে।
.
.
১৯. রাত প্রায় ১১টা বাজে। ডাক্তার জন একা একা নতুন একটা গোরস্হানের পাশে আজও লুকিয়ে রয়েছেন। তাকে যেনো এই রহস্যের উদঘাঁটন করতেই হবে। সে দেখতে চায় সেই আলখেল্লা পরা লোকটা কে? যেই লোকটাকে সে সেদিন পিজনদের বাড়ির জানালা থেকে দেখেছিলো! পিটার এবং পিজন দুজনেও এই লোকটাকেই দেখেছিলো। যদিও কেউই স্পষ্ট ভাবে লোকটার চেহারা দেখে নি। লোকটার সাথে শম্মীর ইবা কী সম্পর্ক রয়েছে? লোকটা ভ্যাম্পায়ার, শম্মী ওতো ভ্যাম্পায়ার। এই রহস্য টাও তাকে জানতে হবে।
.
শম্মী যে আগে থেকেই কোন ভ্যাম্পায়ার ছিলো না, এ বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত ডাক্তার জন। তাহলে হঠাৎ শম্মী ভ্যাম্পায়ার হলো কী করে? এটাই এখন বড় একটা রহস্য।
.
রাত প্রায় ১২টা বাজতেই হঠাৎ গোরস্থানের চারিদিক থেকে প্রচন্ড বাতাস আসতে শুরু করে। এরপরে বাতাসের সাথে সাথেই গোরস্হানের সামনে এসে হাজির হয় একজন লম্বা, চিকন আলখেল্লা পরা লোক। লোকটাকে দূর থেকে দেখেই ডাক্তার জনের পুরো শরীর ভয়ে শিহরে উঠলো। তবে পরক্ষনেই ডাক্তার জনের মনে বেশ সাহস জন্মায়। সে ভাবতে থাকে, যে করেই হোক এখন যেনো তাকে এই আলখেল্লা পরা লোকটার চেহারা দেখতেই হবে! এর জন্য তার মৃত্যু হলেও কোন দুঃখ বা ভয় নেই! এরপর যেই আলখেল্লা পড়া লোকটা গোরস্হানবাসীদের কিছু বলতে যাবেন, ঠিক তখনি ডাক্তার জন ধীরো পায়ে হেটে লোকটার পেছনে এসে দাড়ালেন! ডাক্তার জনকে হঠাৎ পেছনে আসতে দেখে আলখেল্লা পরা লোকটা কিছুটা বিস্মীত হলেন। এরপর লোকটা পেছনে ঘুরে ডাক্তার জনের দিকে ফিরে তাকালেন। কী ভয়ংকর তার চেহারা!! দেখেই শরীরের সব কটি লোম দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়! তবে অন্ধকারে লোকটার মুখটা স্পষ্ট নয়। তবে তার ঠোটের দুপাশের চিকন দাত আর তিক্ষ্ণ লালরঙা চোখদুটো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। চোখদুটোর ভেতর একটা অন্যরকম মায়া রয়েছে। যদিও ডাক্তার জন বেশ ভয় পাচ্ছিলো। তাও সে লোকটার চোখ থেকে তার চোখ আর ফেরাতে পারছিলো না। ডাক্তার জন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লোকটার চোখের দিকে। এরপর লোকটা আলখেল্লা উড়াতে উড়াতে ধীরো পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলো ডাক্তার জনের দিকে। ডাক্তার জনের হৃদ-কম্পন যেনো আরো বেড়েই চলেছে! লোকটা ধীরে ধীরে ডাক্তার জনের যত কাছে আসছিলো, ডাক্তার জন তত স্পষ্ট ভাবে লোকটার মুখ দেখতে পারছিলো। এরপর লোকটা যখন পুরোপুরি তার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো, তখন ডাক্তার জন পুরোই আৎকে উঠলেন। এটা সে কী দেখছে? এই লোকটা কী করে ভ্যাম্পায়ার হতে পারেন? ইনি কী করে শয়তানের উপাসক হতে পারেন?! জন ভাবে , এই লোকটার কিছুতেই ভ্যাম্পায়ার হওয়া উচিত না! এরপর যেই লোকটাকে কিছু বলতে যাবে সে ঠিক তখনি তার মুখ দিয়ে আর কোন কথা বের হলো না। তার চোখ সহ পুরো মস্তিস্ক হারিয়ে গেলো গভীর
নেশায়। সে নিজের অজান্তেই পা দিয়ে ফেলেছিলো লোকটার ফাদে। নিজের অজান্তেই লোকটা তাকে হিপনোটাইস করে ফেলে। এরপর ডাক্তার জনের মাথা ঘুরাতে শুরু করে। তার মনে হতে থাকে যে, সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছে!
.
.
২০. এরপর ডাক্তার জন যখন চোখ খুললো, তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করলো হাত-পা বাধাঁ অবস্হায় একটা চেয়ারে। চারিপাশে বেশ অন্ধকার। বোঝা যাচ্ছে এখনো সকাল হয়নি ! তাকে কেউ এখানে বেধেঁ রেখেছে। তার সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন আলখেল্লা পরা সেই লোকটি! সেই লোকটি আর কেউ নয়। গোয়েন্দা অফিসার ইকবাল খান! ডাক্তার জন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে, যেই লোকটা ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব নিয়ে তাদের সামনে তর্ক করতো সেই লোকটাই একজন বড় ভ্যাম্পায়ার! সেই শয়তানের উপাসক। ডাক্তার জন তখন স্পষ্ট বুঝতে পারেন, শম্মী সম্পর্কে সকালে হাসপাতালে ইকবাল খান যা যা বলছিলেন তা সবই মিথ্যা। আসলে শম্মী আর পিজনকেও ইকবাল খানই তার ফাদে ফেলে ভ্যাম্পায়ারে পরিণত করেন। কিন্তু রসুন থাকা সত্তেও কিভাবে?
.
এরপর ইকবাল খান একটা ভয়ংকর হাসি দিয়ে ডাক্তার জনের কাছে এসে তাকে বলতে থাকেন:
-কী ব্যাপার বন্ধু? আমায় দেখে চমকে গেলে নাকি? তোমারতো অনেক সাহস দেখছি! গতকাল তোমার বন্ধু শম্মী আর পিজনকে খুন করার পরেও তুমি আবার এসেছো গোরস্হানে?
আমিতো ভেবেছিলাম যে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে তুমি! কিন্তু তুমিতো উল্টো মরতেই চলে এলে এখানে। তাও আবার একা! আমিতো তোমাকে গোরস্হানেই মেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু এখানে কেন নিয়ে এসেছি জানো? কারণ আমি ভাবলাম, তুমি এই কেসটা নিয়ে এত কষ্ট করলে! আর পুরো রহস্যটা তোমাকে না জানিয়ে খুন করি কি করে বলো? তুমিতো একটু পরে ভ্যাম্পায়ার হয়ে আমাদের দলেই যোগ দিবে। এরপর সেই বোকা মাসুদ রানাকে খুন করতে পারলেই আমার আর কোন বিপদ থাকবে না! হাহাহা। পুরো শহরকে রাজত্ব করবো আমি। আমি আর তুমি এখন শহরের একটা পুরাতন রাজবাড়িতে রয়েছি! তাই ভুলেও ভেবো না যে এখানে তোমাকে কেউ বাঁচাতে আসবে।
-কিন্তু আপনি একজন গোয়েন্দা অফিসার হয়ে এসব কেনো করছেন? আপনার কী এই শহরের প্রতি কোন দায়িত্বই নেই? (ডাক্তার জন)
-রাখো তোমার গোয়েন্দা অফিসার! আমি শয়তানের পুত্র। আমি সর্বশক্তিমান হবো। আমি অমর আর অবিনশ্বর হবো। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ হবো। আমি ভ্যাম্পায়ারদের রাজা। এই পুরো শহরকে আমি ভ্যাম্পায়ারের শহর করবো। সবাই আমার হুকুম মেনে চলবে। এরপর পুরো দেশকে আমি ভ্যাম্পায়ারের দেশ করে দিবো। এরপর পুরো পৃথিবীকে। আমি রাজত্ব করবো এই পুরো পৃথিবীটাতে। কেউ আমায় আটকাতে পারবে না। আমি এখনি তোমায়ও ভ্যাম্পায়ার বানাবো। এরপর তুমিও আমার দাস হয়ে যাবে। আমি যা বলবো তাই শুনবে তখন। তবে ভ্যাম্পায়ার হওয়ার আগে তুমি আমার জীবনের পুরো গল্প টা শুনে নাও।
যদিও ভ্যাম্পায়ার হওয়ার পর তুমি এসব ভুলেই যাবে। তাও মৃত্যুর আগে তোমার পুরো রহস্যটা সম্পর্কে জানা উচিত। হাহাহা।
.
সবসময় থেকেই আমি চাইতাম এই পৃথিবীর শেষ্ঠত্ব অর্জন করতে। পুরো পৃথিবীর রাজা হতে চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা এতে আমায় সাহায্য করছিলেন না! তাই আমি তখন আশ্রয় নেই শয়তানের। দীর্ঘ কয়েক বছর আগে থেকেই আমি শয়তানের উপাসনা করা শুরু করি। নানান ভাবে শয়তানকে তুষ্ট করার চেষ্টা করি। শয়তানকে এই শহরে আহ্বান করি। শয়তান আমার এই শহরে আসতে রাজি হয়। এই শহরকে ধ্বংস করতে আমার থেকে তিনি জন্মদেন ভ্যাম্পায়ারকে । আমি ভেবেছিলাম আমার এই শয়তানকে আহ্বান করার কথা কেউ জানতে পারবে না। কিন্তু ফাদার পিচ হারকেল কোনভাবে জানতে পেরেছিলেন যে আমিই সেই শয়তানের পূজারী। শয়তানকে আমিই এই শহরে আহ্বান করছি। তিনি আমাকে আটকাতে আমার কাছে পৌছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এটা জানতেন না যে, আমি কোন সাধারণ ভ্যাম্পায়ার নই । আমি শয়তানের পুত্র। যে কাউকে বশ (হিপনোটাইস) করার ক্ষমতা আমার তীক্ষ্ণ। তাই সেদিন ফাদারের চোখে চোখ রেখে আমি তাকে বশ করলাম। এরপর তার ঘাড়ে কামড়ে ধরে তাকে ভ্যাম্পায়ার করে আমার দলে নিয়ে আসলাম। সবাই জানে যে, ফাদার রক্তশুন্যতায় সেদিন মারা গিয়েছিল। কিন্তু তারাতো জানে না যে, ফাদারতো এখন আমার দলে। সে নিজেও একজন ভ্যাম্পায়ার। এরপর একটা থেকে দুইটা, দুইটা থেকে চারটা ভ্যাম্পায়ার তৈরি হতে থাকে। শহরে একের পর এক মানূষ ফাদারের মতো মারা যেতে থাকে রক্তশুন্যতায়। সব সমস্যার মূলে তখন থেকেই ছিলাম আমি। কিন্তু তখন কেউই আমায় ধরতে পারেনি। ভ্যাম্পায়াররা তখন মুলত দুই দলে বিভক্ত ছিলো। এক দল সাধারণ মানুষ রক্তশুন্যতায় মারা গিয়ে ভ্যাম্পায়ার হয়। তাদের কে কবরও দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের শরীর তখনো মুক্তি পায় না। তারা মাঝরাতে আমার আহ্বানে কবর থেকে উঠে শিকার করতে বের হয়ে যায়। রক্তচুষে বৃদ্ধি করে আমার দলের আরো নতুন অতিথীদের সংখ্যা। তবে আরেকদল সাধারণ মানুষও ভ্যাম্পায়ারদের শিকার হওয়ার পরে মারা যায়। কিন্তু তাদের লাশ আর কেউ খুঁজে পায় না। এরা জীবিত লাশে পরিণত হয়। সারাদিন এরা প্রকৃতিতে মিশে থাকে। কিন্তু রাত হলেই এরা এদের আসল রুপে ফিরে আসে। একের পর এক সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়েই তাদের রক্তচুষে খেয়ে তাদের খুন করে। এরাও আমার দলেই। আমার কথামতো চলে। কিন্তু এরা রক্তের নেশায় যখন পাগল হয়ে যায় তখন আর কাউকে তোয়াক্কা করে না। এমনকি আমাকেও না। তাই সবার সামনেই রাতে তারা খুন করে বেড়ায় এবং লাশগুলোকে ঘরে ফেলে যায়। এদের জন্যই এই রক্তচুষে খুন করার বিষয়টা সবার সামনে আসে। অবশ্য এরা যাদের খুন করে তারাও মৃত্যুর পর ভ্যাম্পায়ার হয়ে আমার দলেই চলে আসে। তারাও আবার নিজেদের পরিবার সহ অন্যান্য মানুষদের খুন করে ভ্যাম্পায়ার করতে ব্যস্ত থাকে। ভ্যাম্পায়ারদের দ্বারা খুন হওয়া লাশগুলোর যারা ময়ণা তদন্ত করে সেই লাশগুলোই রাতে জীবিত লাশে রুপ নিয়ে সেই ডাক্তারগুলোর রক্ত চুষে খেয়ে তাদেরো মেরে ভ্যাম্পায়ার করে ফেলে। কিন্তু তাদের লাশের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। তাই আমিই কাউকে কিছু না জানিয়ে তাদের লাশগুলোকে লুকিয়ে কবর দিয়ে দেই। যাতে কেউ এদের খুন নিয়ে আবার ঘাটাঘাটি করা না শুরু করে এবং এদের নিখোজের গুজবও চারিদিকি ছড়িয়ে দেই! এরপরেও যাতে আমাকে কেউ সন্দেহ না করে, তাই একের পর এক গোয়েন্দাদের এই কেসের দায়িত্ব দেই। আর এটাও পরীক্ষা করে নেই যে আমি নিরাপদ কিনা। তারা গবেষণা করতে করতে যেই আমার কাছে পর্যন্ত পৌছে যায়, ঠিক তখনি আমি এদেরও কাছেও আনডেড ভ্যাম্পায়ার বাদুড় পাঠিয়ে রক্তশুন্যতার সৃষ্টি করি এবং তারা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এক পর্যায়ে মারা যায়। এরপর আমি মাসুদ রানাকেও ঠিক একই ভাবে এই কেসটার দায়িত্ব দেই। কিন্তু সে এখনো আমার কাছে পর্যন্ত পৌছাতে পারে নি। তাই তাকে এখনো মারিনি। তবে এখন মনে হচ্ছে তাকে মেরে ফেলাটাই ভালো। তবে চিন্তা করো না। খুব শীঘ্রই তাকেও আমি ভ্যাম্পায়ার করে দিবো। আর তোমার ঐ পিটারও এসেছিলো এই কেস সম্পর্কে আমার সাথে কথা বলতে। বাচ্চা একটা ছেলের এতকথা জানা উচিত হয়নি ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কে। তাই আমি তার কাছেও বাদুড় পাঠিয়ে তাকে রক্তশুন্যতার নামে মেরে ফেলি। আর গতকাল আমার কাছে আসলে তুমি আর পিজন। আমি ভেবেছিলাম তখনি তোমাদের মেরে ফেলবো। ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কে এত তথ্য জানা ভালো না। কিন্তু তখনি হুট করে কোথা থেকে অফিসে চলে আসলো মাসুদ আর শম্মী! তখন বেঁচে গেলে তোমরা। তারাই উল্টা-পাল্টা করে দিলো আমার প্লান। এরপর তোমরা সবাই মিলে আমায় চেপে ধরলে এই ভ্যাম্পায়ারের খবরটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে। এটা কিছুতেই করা যেতো না। তাই আমি তোমাদের সাথে গোরস্হানে যেতে বাধ্য হই। কিন্তু তোমরা ভালোমতই ভ্যাম্পায়ারের দুর্বলতাটা জানতে। তাই সাথে করেই রসুন নিয়ে এসেছিলে। এই রসুনই আমার মনে অনেক অস্বস্তি সৃষ্টি করছিলো। তাই আমি রসুন দেখে ভয়ে ভয়ে ছিলাম। এরপর আমি, শম্মী আর পিজন গোরস্হানের অন্য একটা দিকে গেলাম তোমাদেরকে একদিকে রেখে। তোমরা অপেক্ষা করছিলে ভ্যাম্পায়ারের জন্য। কিন্তু তোমরা জানতে না যে ভ্যাম্পায়ারের রাজা তোমাদের সাথেই রয়েছে! কিন্তু আমি তখনো পিজন আর শম্মীর হাতের রসুন দেখে ভয় পাচ্ছিলাম। এই জিনিসটাতো আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল! তাই না? কিন্তু আমার ক্ষমতা আছে এর চেয়ে বেশি। আমি চাইলে যে কাউকেই খুব সহজে হিপনোটাইস করতে পারি। মানুষকে বশ করা আমার বাম হাতের খেল। আমি তখনো রসুনের ভয়ে আৎকে ছিলাম। এরপর হঠাৎ শম্মীর গলার রসুনের মালাটা এসে আমার হাতে লাগে। সাথে সাথেই আমার হাতের সেই জায়গাটুকু পুড়ে যায়! শম্মী আর পিজন এটা দেখে আৎকে উঠে আমার দিকে তাকায়। তারা ধরে ফেলে যে , আমি একজন ভ্যাম্পায়ার। আমি বুঝতে পারি যে এদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত হবে না। কিন্তু তাদের শরীরের সেই রসুনের মালার কারণে আমি তাদের কিছুই করতে পারছিলাম না। এরপর আমার তিক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে আমি শম্মীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকে হিপনোটাইস করে ফেলি মুহূর্তেই। তার নিজস্ব চিন্তাশক্তি ধ্বংস করে ফেলি। তখন শম্মী আমার দাসী হয়ে যায়। এরপর আমি শম্মীকে আদেশ করি তার এবং পিজনের গলার রসুনের মালা যেনো সে খুলে দুরে ছুড়ে মারে। সে তাই করলো। নিজের এবং পিজনের গলার রসুনের মালা খুলে ছূড়ে ফেলে দিলো। বেচারা পিজন। বোকার মত করে শুধু আমার দিকে চেয়ে রইলো। এরপর আমি পিজনকেও হিপনোটাইস করলাম। তখনো তুমি আর মাসুদ রানা বোকার মত গোরস্হানের দিকে তাকিয়ে রইলে। আমাদের বিন্দুমাত্রও লক্ষ করলে না। অবশ্য সেখান থেকে আমাদের দেখাও যেতো না! এরপর আমি আমার ভয়ংকর রুপে ফিরে আসি। সুচালো দাত বসিয়ে দেই শম্মীর ঘাড়ে। পুরো রক্ত চুষে তাকে বানিয়ে ফেলি জীবিত লাশ। ভয়ংকর ভেম্পায়ার। যার লাশ দিনের আলোতে থাকবে প্রকৃতির সাথে মিশে আর রাতের আধারে রুপ ধারণ করবে ভ্যাম্পায়ারের। এরপর শম্মী তখনি মারা গিয়ে ভ্যাম্পায়ারের রুপ ধারণ করে। আর আমার আদেশমতে পিজনকে কামড়ে ধরে! ঠিক তখনি তোমাদের বোকা বানাতে আমি চিৎকার করি আর ইচ্ছে করেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি সেখানে। আর তোমাদের তাই দেখাই, যা আমি তোমাদের দেখাতে চেয়েছিলাম। তখন অবশ্য বুদ্ধি করে তোমাদেরও মেরে ফেলা উচিত ছিলো! যাক এসব কথা ! মৃত্যুর পুর্বে এসব রহস্য যেনে এখন তুমি শান্তিতে মরতে পারবে। কিন্তু তুমি মরেও মরবে না। তুমি ভ্যাম্পায়ার হয়ে আমার দলেই কাজ করবে। এখনকার কোন কথাই আর তোমার মনে থাকবে না। আমি তোমায়ও শম্মীর মতো জীবিত লাশ করে দিবে। দিনের বেলা তুমি থাকবে প্রকৃতির সাথে মিশে আর রাতে হবে
ভ্যাম্পায়ার! তাহলে বন্ধু? তুমি কী আমার দলে আসার জন্য প্রস্তুত? হাহাহাহা। একটু পরেই তুমিও ভ্যাম্পায়ার হয়ে যাবে।
.
.
এতটুকু কথাই বললো ইকবাল খান ডাক্তার জনকে। যদিও ডাক্তার জনের মুখ খোলা ছিলো তাও নির্বাক শ্রোতার মত করেই এতক্ষণ ইকবাল খানের বলা সব কথা শুনছিলেন তিনি! এইবার তার কাছে সব রহস্য পরিষ্কার। তার মনে আর কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু মৃত্যু ধীরে ধীরে যেনো তার দিকে এগিয়ে আসছে। ইকবাল খান তার চিকন ধারালো দাঁত বের করে আবার তার ভয়ংকর রুপ ধারণ করে ধীরে ধীরে ডাক্তার জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ডাক্তার জন তার আজ রাতের শিকার।
.
ইকবাল খান যখন ডাক্তার জনের অনেক কাছে চলে গেছেন ঠিক তখনি কারো হেঁটে আসার শব্দ পেয়ে আৎকে উঠেন ইকবাল খান। পেছনে তাকিয়ে দেখেন মাসুদ রানা একটা কাঠের কীলক হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার চোখে মুখে রাগ আর ক্ষোভের ছাপ। এতক্ষণ ইকবাল খান যা যা বলছিলো সবই লুকিয়ে শুনেছে সে! ইকবাল খান ভাবতেও পারেননি , সে আর ডাক্তার জন ছাড়া এতরাতে এখানে আর কেউ আসতে পারে! ইকবাল খান মাসুদ রানাকে দেখে পুরো আৎকে কিছুটা দুরে সড়ে যায়। তার হাতে সেই কাঠের কীলকটা দেখে ইকবাল খান আরো বেশি চমকে উঠেন! এরপর ইকবাল খান মাসুদ রানাকে নানান উল্টাপাল্টা বিষয়ে কথা বলতে থাকেন।
তাকে তার চোখের নজরে চোখ মেলাতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। ইকবাল খান মাসুদ রানাকে হিপনোটাইস করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মাসুদ রানা ইকবাল খানের চোখের দিকে একবারো তাকালেন না। সে এখন এ বিষয়ে বেশ সতর্ক। মাসুদ রানার চোখ শুধু রয়েছে ইকবাল খানের হৃদপিন্ড বরাবর। এরপর মাসুদ রানা আর কিছু না ভেবেই দ্রুত ছুটে কাঠের কীলকটা দ্রুত ইকবাল খানের হৃদপিন্ড বরাবর ঢুকিয়ে দিলেন। সে পালাতে চাইছিলো কিন্তু পালাতে পারলো না। সে অনেক চেষ্টা করেও বাদুড়ের রুপ নিতে পারলো না। এরপর বিকট একটা চিৎকার করলো সে। সাথে সাথেই সে ধ্বংস হয়ে গেল। মিলিয়ে গেল তার আত্মা অজানার দেশে। শেষ পর্যন্ত ভ্যাম্পায়ারের রাজাকেতো ধ্বংস করা গেছে! বাকিদেরও এমন ভাবেই ধ্বংস করা যাবে। এরপর মাসুদ রানা ডাক্তার জনকে চেয়ারের বাধঁন থেকে মুক্ত করতে করতে বলতে লাগলেন:
-দারুন বুদ্ধি ছিলো এটা আপনার, ডাক্তার জন। অবশেষে আমরা আসল খুনিকে খুঁজে পেলাম আর ধ্বংসও করতে পারলাম। ভাগ্যিস আপনি আবার গোরস্হানে আসার প্লানটা করেছিলেন। নাহলেতো আমরা এই পর্যন্ত পৌছাতেই পারতাম না। আমি ভাবতেও পারিনি যে ইকবাল খান এমন কিছু করতে পারেন। তবে খারাপ লাগছে শম্মী, পিজন,পিটার, ফাদার সহ শহরের সব মৃতদের জন্য।
-তা ঠিক, মাসুদ রানা সাহেব। তবে আমাদের এখন সবচেয়ে জরুরী কাজটা করতে হবে। শহরের সকলের কাছে এই কাঠের কীলক আর রসুনের বিষয়টা ছড়িয়ে দিতে হবে। দ্রুত দিনের বেলায় শহরে গত কয়েকমাসে মৃত সকল মানুষের কবরের ভেতর রসূন গুজে দিতে হবে। আর প্রত্যেকটা বাড়িতেও রসুন রাখতে হবে। প্রয়োজনে সকলের কাছে রসুনের টুকরো থাকবে। রাতে কেউ একা বের হবে না কীলক ছাড়া। শহরের সবাইকে প্রতিরাতে কীলক হাতে ছুটতে হবে রাস্তায় রাস্তায়। খুঁজে খুঁজে সব আনডেডদের খুন করতে হবে।
.
.
২১. শহরের প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে এখন রসুনের মালা আর কাটা ঝুলে। প্রত্যেকটা বাড়িতেই প্রায় কাঠের কীলক রয়েছে। নতুন হাজার হাজার কবর আবার খুড়ে সেখানে লাশের সাথে রসুনের টুকরো দিয়ে আবার তাদের কবর দেওয়া হচ্ছে। যারা নতূন মারা যাচ্ছে, তাদের কবরেও রসুন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শহরের অনেকেই রাতের অন্ধঁকারে হেটে হেটে এখনো আনডেডদের খুঁজে বেড়ায়। পেলেই তাদের চোখের দিকে না তাকিয়ে হৃদপিন্ড বরাবর কাঠের কীলক ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাথে সাথেই ধ্বংস হচ্ছে তারা। কিন্তু এখন এই শহরে লোকজন নেই বললেই চলে। অর্ধেকের মত মানুষই ভ্যাম্পায়ারের শিকারে মারা গেছেন। বাকি অর্ধেকের মধ্য থেকেও বেশির ভাগ ভয়ে এ শহর ছেড়ে চলে গেছে।
বাকি যাদের যাওয়ার মতো কোন জায়গা নেই তারাই এখন এ শহরে পড়ে রয়েছেন।
.
ডাক্তার জন বেশ সাহসি। এখনো প্রায় প্রতি রাতেই তিনি রসুন আর কাঠের কীলক হাতে আনডেডদের খুঁজে বেড়ায়। এখনো পর্যন্ত সে ধ্বংস করেছে অনেকগুলো আনডেডকে। কিন্তু হঠাৎ একরাতে একটা আনডেডকে ধ্বংস করতে গিয়ে তার চোখের নেশায় আটকে যান ডাক্তার জন। পরেরদিন একটা গোরস্হানের পাশে রক্তশুন্য শরীর পাওয়া যায় ডাক্তার জনের।
.
মাসুদ রানারও বর্তমানে দিনগুলো খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। গতকাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা নিজে দেখেই বেশ আৎকে উঠেন মাসুদ রানা। চেহারা অনেকটা সাদা আর ফেকাসে হয়ে যাচ্ছে। ঘাড়ের পাশেও দুটো চিকন ছিদ্র দেখা যাচ্ছে তার। তার চেহারা দেখে যেনো, যে কেউই বলবে যে এই লোকটা রক্তশুন্যতায় ভুগছেন। বেশ কিছু বাদুড় কিছুদিন ধরেই দিনে-রাতে তার ঘরের আশেপাশে ঘুড়ে বেড়ায়। কারণটা হয়তো এক সপ্তাহ ধরে তার ঘরে কোন রসুন বা কাঠের কীলক নেই তাই!
এগুলো তার কাছে এখন আর ভালো লাগে না। জীবনটাইতো অপ্রিয়।
.
.
* * * * * সমাপ্ত * * * * * *
