রক্ত
.
(৮ম/ শেষ পর্ব)
.
রক্তেমাখা মুখটা হঠাৎ করেই উচ্চস্বরে হাসি দিয়ে উঠল।আমি ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম। হ্যা, এটা আনিকাই। কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আনিকা, আর এই চেহারা ঠিক আমার মস্তিষ্কে ঢুকছিল না। তাহলে কি আনিকাই সেই আত্মা। না আনিকার ভেতর রাহেনা নামের মেয়েটার আত্মা এসে ভড় করেছে। আমি কি তাহলে একটা আত্মার সাথে সংসার করছি।
আনিকার এই রূপটা দেখে আমি ভয় পেয়ে গেছি। ভয়টা আরো বেশি হতে লাগল, যখন আনিকা শূন্য হাটতে লাগল। এখন কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমি ভয়ে ভয়ে আনিকার দিকে তাকিয়ে বললাম
- কে তুমি?
- আমি রাহেনা, আনিকার বোন।
আনিকার বোন আছে, সেটা আমি জানিনা। আনিকা তো কখনও বলেনি।
ততক্ষণে আনিকার হাত দুটো কেমন জন্তুজানোয়ারের মত হতে লাগল। হাতের নখ গুলা খুব বড় হয়ে গেল। বুঝতে পারছি এটা ওর ভেতরে থাকা আত্মার কাজ। যে এই খুন গুলা করেছে। তার সাথে হওয়া অবিচারের বিচার করছে!
আমার চিন্তাভাবনার মধ্যেই আনিকার ভেতরে থাকা আত্মাটা বলে উঠল... আমার কাজ শেষ।
তাহলে কি বাকিদের ও মেরে ফেলেছে এই আত্মা। নিজের প্রতিশোধ কি সম্পূর্ণ করে ফেলেছে। আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম..
- আনিকা তো কখনও বলেনি তার কোনো বোন আছে বলে?
- আমাকে মেরে ফেলার একমাস পর, মা একে রাস্তায় পেয়েছিলেন। মেয়েটা ওর স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। সেই থেকেই ও মায়ের কাছে। আর আমার কথা হয়ত মা আনিকা কে বলেননি কখনও।
আমি কথা বলছি একটা আত্মার সাথে। এটা ভাবতেই শরীরটা কেমন শিউরে উঠল। কিন্তু এখন ভয় পেলে হবেনা। আনিকা তো ওর বশে আছে। কিন্তু আমার চিন্তা অন্যকিছু। আনিকার এইরকম অবস্থায় এত বড় একটা বিপদ। যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে মেয়েটা বাঁচবেই না।
কি ভয়ংকর একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই রহস্য গুলা যে জানতেই হবে। আমি খুব ভয় নিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম..
- সব ঘটনা, রক্ত, খুন, এই গুলা কি আপনি করেছেন?
- হ্যা। প্রতিশোধ নিয়েছি। ওই রক্ত দিয়ে বুঝাতে চেয়েছি যে খুন গুলা আমিই করেছি, এটা কোনো আত্মার কাজ।
- আর ওই ডক্টর রাহেনা নামে কি ওইখানে আপনিই গিয়ে ছিলেন?
- হ্যা, আমিই ছিলাম। তুমি যা যা দেখেছ সব সত্যি ছিল। কিন্তু তুমি মনে করেছিলে সব তোমার হেলুসিনেশনের প্রভাব।
আমার ভয়ের মাত্রাটা কিছুটা হলে কমেছে। কিন্তু, তারপর ও একটু অন্যরকম লাগছে।
ততক্ষণে যে জিনিসটা মস্তিষ্কে এলো সেটা হল সেভেন স্টার। এই সেভেন স্টার সম্পর্কে জানা দরকার। আমি ফিরিত প্রশ্ন করলাম..
- আর এই সেভেন স্টার মানে?
- এক একটা স্টার, এক একজন অপরাধীর জন্য। কেননা ওরা নিজেরাই আমার শরীরে এসব এঁকেছিল। তাই আমি সমানে সমান কষ্ট দিতে চেয়েছিলাম।
- তাহলে কি অপরাধী সাতজন?
- হ্যা।
- কিন্তু আপনাকে রেপ করেছে তো পাঁচজন।
- না, ছয়জন ছিল। ওই ইন্সপেক্টরটাও ওদের সাথে ছিল। ওই আশফাকের বাবা ও জড়িত ছিল। ছেলের কুকর্ম লোকাচ্ছিল। তাই ওকে ও মারতে চেয়ে ছিলাম?
- আবুল সাহেব তো বেঁচে আছেন?
- হুম, উনি সবকিছু জানতেন না। তাই জানে মেরে ফেলিনি! শুধু একটু ভয় দেখিয়ে ছিলাম।
একটু আগে আমি যে সেভেন স্টার দেখে ছিলাম, সেখানে ছয়টা স্টার রক্তে লাল ছিল। তাহলে এই ছয়টা হল আশফাক, জামাল, চঞ্চল, সামাদ, তামিম আর ইন্সপেক্টর ইফতেখার হাসান। আর সাদা স্টারটা ছিল আবুল সাহেবের। যে এখনো জীবিত আছে।
আমি খুব মিনতি করে আনিকার ভেতরে থাকা আত্মা কে বললাম...
- আপনি আনিকার শরীর থেকে বের হয়ে যান। মেয়েটা অসুস্থ আছে এটা জানেন। আপনার যদি প্রতিশোধ নিতে হয় তাহলে আমার শরীরে এসে প্রবেশ করুন?
- আমি জানি আনিকা প্রেগন্যান্ট। আমার প্রতিশোধ ও শেষ হয়েছে। এখন আমাকে যেতে হবে?
মস্তিষ্কে যে চিন্তাটা এসেছে, সেটা হল আত্মা কি বন্দী করা যায়না। যদি অন্য কোথাও গিয়ে আরো খুন করে, মানুষের ভয় দেখায় তো, কি হবে?
- তুমি কি চিন্তা করছ আমি জানি।
আনিকার ভেতরে থাকা আত্মার কথায় একটু ভয়ই পেলাম। আমার ভেতরের কথাও সে জানে। হয়ত আত্মা বলে সম্ভব। আমি বললাম..
- কি?
- তুমি ভাবছ এই আত্মা এখন অন্য জায়গায় গিয়ে এসব খুন, ভয় দেখাবে?
- হ্যা।
- শুন, আত্মারা শুদ্ধ হয়ে থাকে। আর আত্মাদের বন্দী করা যায়না। আত্মারা চিরন্তন। আত্মারা অমর হয়ে থাকে।
..
রাত তিনটে বাজে।
আমি এখনো জেগে আছি। চোখে ঘুম নেই। এই দুইটা ঘন্টা আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে ছিল। আনিকা ঘুমিয়ে আছে। আত্মার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। তাই সে চলে গেছে আনিকার শরীর থেকে।
শুধু বলে গেছে এই কথা গুলা যাতে কাউকে না বলি। পরে দোষটা আমাদের দুজনের উপরই আসতে পারে। সত্যি তো, এটা শুনার পর সবার টার্গেট হব আমি আর আনিকা।
আত্মার কথা অনুযায়ী তার কাজ সম্পূর্ণ করেছে। তারমানে সামাদ, আর তামিম কে ও মেরে ফেলেছে।
ভোরের দিকে আমি শোয়া থেকে উঠলাম। ইন্সপেক্টর নাজমুল কে একটা কল করার দরকার। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ইন্সপেক্টর স্যার কে কল দিলাম। প্রথম রিং হতেই উনি কল ধরলেন। মনে হচ্ছে উনি নিজেও ঘুমাতে পারছেন না।
- হ্যালো স্যার?
- হ্যা আফরান বল?
- স্যার সামাদ আর তামিম কি ঠিক আছে?
- আফরান, আমি এখন আশফাকের কবরের পাশে আছি। তুমি চলে এসো।
- স্যার, আপনি এই ভোরে ওইখানে?
- তুমি চলে এসো।
কলটা কেটেই আমি বেড়িয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছে সামাদ আর তামিম দুজনেই শেষ। তাহলে আত্মার কাজও সম্পূর্ণ।
..
আশফাকের কবরের পাশে ইন্সপেক্টর আর দুজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছেন। হ্যা, যেটা ভেবে ছিলাম সেটাই। সামাদ আর একটা অপরিচিত লাশ আছে। যতটুক শিউর ওই অপরিচিতটাই তামিমের লাশ। কেননা তামিম কে কেউই দেখেননি!
ইন্সপেক্টর নাজমুলের কাছে যেতেই উনি আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন।
- স্যার এটা কি?
- পড়ে দেখ, আসামী চিরকুট দিয়ে গেছে?
আমি কাগজের ভাজ খোলে পড়তে শুরু করলাম। কাগজে লেখা আছে।
" অযথা সময় নষ্ট করবেন না। আত্মার সাথে তো আর মামলামোকদ্দমা করা সম্ভব না। আমি আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার করেছি। যেটা আপনাদের করার কথা ছিল"।
- আফরান, এই মামলার ফাইলটা এখানেই সমাপ্তি।
- হ্যা। কিন্তু স্যার সামাদ তো আপনাদের হেফাজতে ছিল, তাহলে?
- হ্যা, ছিল। আমাদের কনস্টেবল গুলা ওকে পুরো সিকিউরিটি দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও থাকে, বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
- কেন?
- রাত এগারোটার দিকে হঠাৎ ও অজ্ঞান হয়ে যায়। হাসপাতালে নিয়ে আসার সময়ই এম্বুলেন্স থেকে উধাও হয়ে যায়। যেটা দেখে কনস্টেবল দুইটা ভয় পেয়ে গেছিল। তারপর ভোরবেলা কেউ এসে চিরকুট দিয়ে যায় আমার বুকের উপর। যেটা দেখে আমি তাড়াতাড়ি এখানে আসি! এসেই দেখি এই অবস্থা।
সামাদ আর তামিমের বুকেও সেই স্টার আঁকা আছে। শরীরে সেই আঘাতের চিহ্ন।
কাল রাতের ঘটনাটা কাউকে বলা হয়নি। হয়ত বা কেউ বিশ্বাস করবে না। আর পরে আমাকেই অবিশ্বাস করবে।
এম্বুলেন্স করে এই দুইটা লাশ ইন্সপেক্টর সাহেব নিয়ে গেছেন। আমি বাসায় চলে এসেছি। চোখের সামনে শুধু কালকের রাতের ঘটনাটা ভেসে আসছে।
.
প্রফেসর, আঙ্কেল, আন্টি, টিপু সবাই শুধু ছয়টা খুনই দেখেছেন। কিন্তু খুনের সেই মাস্টারপ্ল্যানিং কে দেখতে পারেননি।
.
আনিকা ঘুম থেকে উঠেছে। আজ থেকে তার নতুন এক অধ্যায় শুরু হচ্ছে। ভাবছি আজ আরেকবার চেকাপ করাতে নিয়ে যাব। কালকে রাতের ঘটনাটার পর কোনো প্রব্লেম হল কি না দেখা দরকার।
সমাপ্ত
