রক্ত
.
(৬ষ্ঠ পর্ব)
.
রাতটা আর ঘুমানো হয়নি। আঙ্কেলের এইরকম অবস্থা দেখে ভয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে।
ইন্সপেক্টর সাহেব কনস্টেবল কে দিয়ে একজন ডাক্তার নিয়ে এসেছেন। এতরাতে ডাক্তার মিলবে, সেটা অসম্ভব ছিল। কিন্তু পুলিশ হওয়ায় মিলেছে।
ডাক্তার আঙ্কেল কে দেখে কিছু ঔষধ দিয়েছেন, আর ঘুমের ঔষধ দিয়ে গেছেন।
- উনার একটু রেস্ট দরকার। আমি ঘুমের ঔষধ দিয়েছি,,এখন উনি ঘুমাবেন। (ডাক্তার)
ডাক্তার চলে গেলেন। আবুল সাহেবের সাথে হওয়া ঘটনাটা ঠিক বুঝতে পারছি না। তার কারণটা কি হতে পারে?
আনিকা রুমে একা আছে। মেয়েটা ভয় পেতে পারে। আবুল সাহেবের রুম সবাই আছে। শুধু আমিই রুমে চলে আসলাম আনিকা একা রয়েছে বলে।
রুমে ঢোকার পর যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ল, সেটা হল, উত্তরের বারান্দায় একটা মানুষের ছায়া।
বাতাসে তার চুল গুলা উড়ছে। আমি নূপুররের ঝনঝন শব্দ শুনতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে কোনো মেয়ে। কিন্তু আনিকা তো এতরাতে জেগে থাকার কথা না। তাহলে কে সে? না কি কোনো ভূত।
আমি ঘামতে শুরু করেছি, ভয়ে হাত পা কাঁপছে। শরীরটা শিউরে উঠছে। লাইটের সুইচে টিপা দিয়েছি, কিন্তু লাইট জ্বলছে না। বুঝতে পারছি না এসব কি হচ্ছে? উত্তরের বারান্দায় যাওয়ার সাথে সাথে ছায়াটা হারিয়ে গেল। বুঝতে পারছি না এসব কি হচ্ছে।
আমি ভাল করে রুমটা দেখলাম, না কোথাও কিছু নেই।আনিকা নিজের জায়গায় ঘুমিয়ে আছে।
...
ভোরের দিকে আবুল সাহেবের ঘুম ভাঙ্গল। উনার ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে ইন্সপেক্টর নাজমুল আমাকে কল দিলেন যাওয়ার জন্য। কল কেটে আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকা কে আজ খুব সুন্দর লাগছে।
সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলায় উঠলাম। আবুল সাহেবের রুমে ইন্সপেক্টর, প্রফেসর, টিপু তিনজনই আছেন।
আবুল সাহেবের দিকে তাকালাম। উনার চোখে ভয়েরচিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কালকের ঘটনায় আঙ্কেল একটু বেশিই ভয় পেয়েছেন। আর পাবার কথা। আমি উনার দিকে তাকিয়েই বললাম।
- আঙ্কেল এখন কেমন লাগছে?
- কিছুটা ভাল। আফরান আমি কিছু বলতে চাই?
- হ্যা, বলেন?
- আমার জীবনে আমি আমার ছেলের একটা অপরাধ গোপন করেছিলাম। মনে হচ্ছে ওই অপরাধের সাজা ভোগ করছি!
- কিসের অপরাধ?
আবুল সাহেবের কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে আছে। এইরকম ভয়ংকর খুন হচ্ছে, আর তিনি এখন এসব বলছেন। আবুল সাহেব বলতে শুরু করেছেন!
- প্রায় একবছর আগে, আশফাক আর তার বন্ধুরা মিলে একটা মেয়ে কে র্যাপ করেছিল। এসব শুনার পর আমার খুব ঘৃণা হচ্ছিল, এই ছেলের জন্য। মেয়েটা আর তার পরিবার থানায় মামলাও করেছিল। কিন্তু কি করব ছেলে আমার, তাই আমি টাকা খাইয়ে সেই মামলা ধামাচাপা দিয়েছিলাম। মনে হচ্ছে সেই মেয়েটাই এই প্রতিশোধ নিচ্ছে।
আবুল সাহেবের কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে আছে। ইন্সপেক্টর নিজেও কোনো কথা বলছেন না। এইরকম একটা নির্মম অপরাধ একটা মেয়ের সাথে করেও তারা খুব ভাল দিন কাটাচ্ছিল। আমি অবশ্য কিছুটা বুঝতে পেরেছিলাম যে, আবুল সাহেব কিছু লোকাচ্ছেন। তবে এত বড় একটা অপরাধ লোকাবেন সেটা বুঝিনি।
কিন্তু এটা বুঝতে পারছিলাম না, যে মেয়েটা যদি সত্যি এসব করে থাকে, এত সূক্ষ্ম ভাবে খুন গুলা করল কিভাবে? আর ওই জন্তুর নখের আছড়টা তাহলে কিভাবে করল? এটা তো একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
ইন্সপেক্টর নাজমুল আবুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন..
- মেয়েটা কে আপনি দেখেছেন? ওর নাম কি?
- না। আমি মেয়েটা কে দেখিনি। আর ওর নামও জানিনা।
- ওরা কোন থানায় মামলা করেছিল, আমাদের থানায়?
- হ্যা।
- ওহ। হতেই পারে। আমি এখানে এসেছি ৮মাসের মত। মনে হয় আমার আগের ইন্সপেক্টর ছিলেন।
- হ্যা, তখন ইফতেখার হাসান নামের একজন ছিলেন।
- ইফতেখার হাসান?
- হ্যা।
- চিনতে পেরেছি।
ইন্সপেক্টর নাজমুল কথা বলার সময়ই উনার মোবাইলটা বেজে উঠল। উনি কল ধরেই আবারও বলে একটা চিৎকার মেরে উঠে দাঁড়ালেন।
বুঝতে আর বাকি রইল না, যে আরো একটা লাশ পাওয়া গেছে। মনে হয় সামাদের।
...
এবার যার লাশ পাওয়া গেছে, সে সামাদ নয়। অন্য কেউ? সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে প্রতিশোধের সমস্ত রাগ এর উপর ফেলে দিয়েছে। যার জন্য এত নির্মম খুন।
আশফাকের কবরের উপরে পাওয়ায় মনে হচ্ছে এদের সাথে উনিও জড়িত! কিন্তু কিভাবে?
রহস্যটা দেখি আরো জঠিল হচ্ছে।
ইন্সপেক্টর নাজমুল লাশের মুখটা দেখেই ও মাই গড বলে উঠলেন। মনে হচ্ছে খুন হওয়া ব্যক্তি উনার পরিচিত।
ইন্সপেক্টর স্যারের কাছে গিয়ে বললাম
- স্যার আপনি চিনেন উনাকে?
- হ্যা। আরে এই তো সেই যে আমার আগে এই থানার ইন্সপেক্টর ছিল। ইন্সপেক্টর ইফতেখার হাসান।
- কি বলছেন?
- হ্যা, আমি সত্যি বলছি।
- তাহলে কি এই সেই ইন্সপেক্টর যে আবুল সাহেবের কাছ থেকে টাকা খেয়ে সেই মেয়ের মামলা ধামাচাপা দিয়েছে?
- হ্যা।
কিছুটা হলেও এই খুনের রহস্যটা বুঝা যাচ্ছে।
ইন্সপেক্টর নাজমুল কে ইশারা দিলাম বুক দেখার জন্য। উনি দেখলেন। হ্যা, এর বুকের মধ্যে স্টার আঁকা। তবে চারটা নয়, তিনটে। নিয়ম অনুসারে চারটা হওয়ার কথা, কিন্তু ইন্সপেক্টর ইফতেখার হাসানের শরীরে তিনটে স্টার রয়েছে। তাহলে এটার মানে কি? না কি চার নাম্বার খুনটা অন্য কোথাও হয়েছে! হয়ত বা সামাদ কে কোথাও মেরে ফেলে গিয়েছে।
- আফরান?
ইন্সপেক্টর নাজমুলের কথায় চিন্তার অবসান ঘটল।
- হ্যা, বলুন?
- স্টার তিনটে।
- হ্যা, এটাই বুঝতে পারছি না। চারটে স্টার হওয়ার কথা।
- আমার মনে হয় আবুল সাহেব সেই চার স্টার ওয়ালা ব্যক্তি। যে মারা যাননি?
- হ্যা, এটা অবশ্য ঠিক বলেছেন। তবে আমার তো সামাদের জন্য চিন্তা হচ্ছে। হতে পারে চার নাম্বার খুনটা ওর হয়েছে। আর লাশটা অন্য কোথাও ফেলে রাখা হয়েছে।
- এটা ঠিক বলেছ। দাড়াও, কনস্টেবল যে দুজন সামাদের কাছে আছে তাদের কল দেই?
ইন্সপেক্টর কনস্টেবল দুজন কে কল দিলেন। না, সামাদ ঠিক আছে। তাহলে কি আবুল সাহেবই ছিলেন সেই চার স্টারের ব্যক্তি। ইন্সপেক্টর বললেন..
- এখন সেই মেয়েটা কে খুঁজে বের করা দরকার।
- হ্যা, স্যার। তাইলেই যে দুইটা মার্ডার বাকি আছে, সেগুলা আর হবেনা।
- হ্যা, কিন্তু বুঝতে পারছি না এখানে তো কনস্টেবল দুজন দিয়েছিলাম, তারা এখানে ছিল। তাহলে কে কিভাবে লাশটা এখানে এসে ফেলে দিল আর এরা টেরই পেলনা।
কনস্টেবল দুজন কে দেখলাম ভয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। এরা কিছু জানে বলে আমার মনে হয়না। ইন্সপেক্টর নাজমুলের মোবাইলটা তখনি বেজে উঠল।
ফোনে কথা বলা শেষ করে ইন্সপেক্টর আমার দিকে তাকালেন।
- আফরান ডাক্তারের কল?
- হ্যা কি বললেন?
- চঞ্চলের রক্ত আর জগে পাওয়া রক্তের গ্রুপ একি।
- তারমানে জগের রক্তটাই চঞ্চলের রক্ত।
- হ্যা।
- খুন যেই করুক, সে অন্যদের খুব ভয় দেখিয়ে খুন গুলা করছে।
- হ্যা, আফরান।
- আমাদের খুব তাড়াতাড়ি ওই মেয়েটা সম্পর্কে জানতে হবে।
- হ্যা, আফরান। মামলা যেহেতু করেছে তাহলে ফাইল অবশ্যই থানায় পাওয়া যাবে।
ইন্সপেক্টর জিপগাড়ি করে থানায় চলে গেলেন। একটা এম্বুলেন্স করে ইন্সপেক্টর ইফতেখার হাসানের লাশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল।
আমরা সবাই বাসায় চলে আসলাম।
....
ড্রয়িংরুমে বসে আছি। আনিকা ঘুম থেকে উঠে আমাকে খুঁজে পায়নি। কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিল। আসতেই কেমন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল..
- কোথায় গিয়েছিলে আমাকে একা রেখে?
- আরেকটা লাশ, আশফাকের কবরে।
- কি বলছ?
- হ্যা।
- কার লাশ?
- এই থানার আগের ইন্সপেক্টর ইফতেখার হাসানের।
- কি?
- হ্যা, মাথা কাজ করছে না। এরমধ্যে আজকে আবুল সাহেবের উপরের ও আক্রমণ হয়েছিল।
- বল কি?
- হ্যা, উনিই বললেন উনার ছেলে আর ছেলের বন্ধুরা মিলে না কি একটা মেয়েকে র্যাপ করেছিল। যার প্রতিশোধ এখন তারা পাচ্ছে?
- এদের এইরকমভাবেই প্রতিশোধ নিবে সেটাই ভাল।
- এসব বাদ দেও। আরেকটা কথা?
- কি?
- রাতে আমাদের রুমে একটা ছায়া দেখেছি?
- ছায়া?
- হ্যা, কোনো মেয়ের।
- কি বলছ এসব আবোলতাবোল?
- সত্যি বলছি। আমি ভালভাবে দেখতে পারিনি।
- এসব তোমার হেলুসিনেশন।
- হয়ত বা। আমাকে এক কাপ চা দিবে?
- হ্যা, দিচ্ছি।
আনিকা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আমি বসে বসে চিন্তা করতে লাগলাম, কে সেই মেয়ে? যাকে এতটা নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে! আর কার বা সেই ছায়া, যা আমি রাতে দেখেছি।
আনিকা চা নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসেই মাথা ঘুরে পড়ে গেল। চায়ের কাপটা হাত থেকে পরে চুরমার হয়েছে।
আমি দৌড়ে গিয়ে ওকে তুললাম। আনিকার এইরকম একটা অবস্থা দেখে ভয়ে বেশি পেয়েছি। ওর কপালের কিছু জায়গা কেটে রক্ত বের হচ্ছে।
আমি বিছানায় নিয়ে শোয়ালাম। একজন ডাক্তার দরকার। তাড়াহুড়ো করে দরজা দিয়ে বের হলাম। তখনি ধাক্কা লাগল টিপুর সাথে।
- ভাইয়া কি হয়েছে?
- একজন ডাক্তার দরকার। আনিকা মাথা ঘুরে পড়ে গেছে।
- ঠিক আছে, আমি নিয়ে আসছি। আপনি ভাবীর কাছে থাকুন!
টিপু আমাকে বলেই সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে চলে গেল। আমি রুমে এসে আনিকার পাশে বসলাম। ভয়ে আমার হাত পা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে এটা ভেবে যে, হঠাৎ করে আনিকার কি হল?
...
ঠিক দশমিনিট পর টিপু ডাক্তার নিয়ে আসল। ডাক্তার আনিকা কে চেকাপ করছেন। এখন আনিকা চোখ খোলে তাকাচ্ছে। আমার ভয়ের মাত্রাটা কিছুটা কমেছে।
চেকাপের পর ডাক্তার আমার দিকে খুব সিরিয়াস হয়ে তাকালেন। যার অর্থটা আমি বুঝলাম না।
- ডাক্তার কেমন দেখলেন?
- আপনার স্ত্রী....
বাকিটা আর বলতে পারলেন না, ডাক্তারের কাশি উঠে গেল। আমার ভয়ের মাত্রা কমা থেকে এখন বেড়ে উঠছে। বুকের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছি। ডাক্তার কাশি থামিয়ে বললেন..
- আরে মশাই আপনি বাবা হতে চলেছেন!
- কি?
- হ্যা।
দিলাম জোরে চিৎকার। এইরকম একটা সংবাদ শুনার পর আর কি মুখ বন্ধ করে থাকা যায়।
আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকা লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না, মাথা নিচু করে আছে।
.
চলবে...............
