রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার






১ম পর্ব


-আচ্ছা শম্মী! মানুষের রক্ত খেতে কেমন লাগে?

মানুষের রক্তের স্বাদটা কেমন?

-বাবা, মানুষের রক্তের স্বাদ আবার কেমন হবে ? মানুষের রক্তের স্বাদ কিছুটা নোনতা হয়। সকল প্রাণীর মতই!

-এটা তুমি কী করে জানলে? তার মানে কী তুমিও মানুষের রক্ত খাও?

-এসব কী বলছো আবল-তাবল কথা বাবা?! আমি মানুষের রক্ত খেতে যাবো কেন? মানুষের রক্তের স্বাদ যে নোনতা এটাতো সবাই ই জানে। এছাড়া আমাদের আঙুল যখন কেটে যায় তখনিতো আমরা আঙুল মুখে নিলে এর স্বাদ উপলব্ধী করতে পারি। এর জন্য মানুষের রক্ত খাওয়ার কী দরকার?

-না! তোমার কথাটা যদিও ঠিক। তাও আমার কেনো জানি মনে হয় তুমি মানুষের রক্ত খেতে পছন্দ কর।

তুমি রক্তচোষা মানুষ!!

-অনেক রাত হয়েছে বাবা! তুমি এখন ঘুমাও। আবার কাল সকালে কথা হবে!

.

কথা হচ্ছিলো একজন গোয়েন্দা অফিসার রফিকুল ইসলাম এবং তার মেয়ে শম্মীর মধ্যে। গত এক সপ্তাহ আগেও রফিকুল ইসলাম গোয়েন্দা বিভাগের একজন সিনিয়র অফিসার ছিলেন। কিন্তু শেষে একটা অদ্ভুত জটিল কেস নিয়ে কাজ করার মাঝখানেই তিনি একটা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। কোন ডাক্তারই তার এই মানসিক রোগের কারণ বুঝতে পারেনি। রফিকুল ইসলাম অসুস্হ্য হওয়ার পর থেকেই নানান ধরণের অদ্ভুত কথা-বার্তা বলতে থাকেন। যেমনটা এখন তার মেয়ে শম্মীর সাথে বলছেন। এছাড়াও কাউকে দেখলেই তিনি অদ্ভুত ভাবে তাকে রক্ত পিপাসু ভেবে সন্দেহ করেন। কিন্তু তার মেয়ে শম্মী এখনো জানে না যে, রফিকুল ইসলামের আসল সমস্যাটা কোথায়?

কোন কেসটা লড়তে গিয়ে তার এই মানসিক সমস্যাটা সৃষ্টি হয়েছে?! শম্মী লক্ষ্য করে তার বাবা রফিকুল ইসলামের চেহারার মধ্যেও বর্তমানে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন সূর্য ডোবার পর পরেই হঠাৎ তার গায়ের রং ফেকাসে সাদা হয়ে যায়! শরীর দেখে যে কেউই বলবে যে সে রক্তশূন্যতায় ভুগছে! কিন্তু দিনের আলো ফুটতেই আবার সে স্বাভাবিক চেহারায় ফিরে আসে। তার চেহারায় অস্বাভাবিক আর কিছুই লক্ষ করা যায় না তখন। কিন্তু সূর্য ডোবার সাথে সাথেই আবার সে অদ্ভুত রূপ ধারণ করে এবং অতিরিক্ত অদ্ভুত কথা-বার্তা বলতে থাকেন! যদিও ঘটনাটা বেশ অদ্ভুত তাও শম্মী এই বিষয়টা নিয়ে কারো সাথেই আলোচনা করে না। 

সে ভাবে এটা শুনলে সবাই তাকে এবং তার বাবাকে পাগল ভাববে! এছাড়াও বেশ কয়েকদিন ধরেই শম্মী লক্ষ্য করছে যে, তার বাড়ির আশেপাশে বেশ কিছু অদ্ভুত রকমের বাদুড়ের উপদ্রব দেখা যাচ্ছে। 

বাদুড় গুলোর গায়ের রং সাদা, বিশাল দুটো পাখনা, চোখ এবং ঠোঁট রক্ত লাল! 

.

২.

" শহরে গত ৩ মাসে এই নিয়ে ১৫ জন মানুষের রক্ত শুণ্য লাশ পাওয়া গেছে! তাদের প্রত্যেককে তাদের নিজ নিজ বাড়িতেই খুন করা হয়। তবে এই সবগুলো খুনের ধরণ বেশ ভিন্ন এবং ভয়ংকর। ১৫টা লাশের শরীরেই কোন রক্ত পাওয়া যায়নি। মনে হচ্ছিলো কোন প্রাণি চুষে তাদের শরীরের সব রক্ত খেয়ে ফেলেছে এবং তাঁদের ঘাড়ের পাশে দুটো করে চিকন দাঁতের দ্বারা সৃষ্ট ছিদ্র দেখা যাচ্ছে। হাস্যকর শোনালেও অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে এই খুনগুলো কোন রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারের। কিন্তু আসলেই কী এদের কোন অস্তিত্ব রয়েছে? এ বিষয়ে পুরো নির্বাক পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্হা। তারা এখনো পর্যন্ত কিছুই করতে পারছে না। তাদের মতে এই খুনগুলো কোন সাইকো কিলারের। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই কেসের দায়িত্ব যে যে গোয়েন্দা অফিসারের কাছে দেওয়া হচ্ছে, তারা এই কেসটা নিয়ে কয়েক দিন কাজ করার পরেই পুরোপুরি মানসিক ভাবে অসুস্হ্য হয়ে পড়ছেন। তবে সেই সকল গোয়েন্দা অফিসারের কারো নামই প্রকাশ করেনি পুলিশ বিভাগ। অন্যদিকে লাশগুলোর ময়ণা তদন্তের রিপোর্টও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। যে ডাক্তার এই লাশগুলোর ময়ণা তদন্ত করেন। পরেরদিন থেকে তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রথম ১০টা খুনের পর প্রথম ১০ জন ফরেনসিক ডাক্তারই

এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন। তাই এরপর থেকে আর কোন খুনের ময়ণা তদন্ত করা হয় না। তবে এই খুন চলবে আর কতদিন? এই অদ্ভুত খুনগুলোর রহস্য কি ভেদ হবে কোনদিন? নাকি একের পর এক জীবন হারাবে আরো অনেক নিষ্পাপ প্রাণ"

.

.

উপরের কথাগুলো একজন সংবাদ উপস্হাপিকা পড়ছিলেন আর একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ মাসুদ রানা টিভির সামনে বসে বসে খবরটা শুনছিলেন। এতগুলো খুনের কথা শুনেও মাসুদ রানার কোন ভ্রূক্ষেপ বা কৌতূহলতা নেই। শুধু একটু মৃদু হেসে বললো, "কেসটা বেশ ইন্টারেস্টিং। ভ্যাম্পায়ার কী আসলেই হয়?

"

৩.

ডাক্তার রিমন সাহেব তার হাসপাতালের কাজ শেষ করে তার ব্যাক্তিগত গাড়িটা নিয়ে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। রাস্তা দিয়ে কিছুটা দুর যাওয়ার পরেই রিমন সাহেব গাড়ি থেকে দেখতে পেলেন একটা ১০-১২ বছর বয়সের বাচ্চা মেয়ে একটা মার্কেটের সামনে বসে বসে কাঁদছে! রিমন সাহেব বেশ অবাক হলেন! রাত তখন প্রায় ১টা। এতরাতে একটা বাচ্চা মেয়ে মার্কেটের সামনে বসে বসে কাঁদছে কেনো? মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে একটা ভদ্র পরিবারের মেয়ে। মেয়েটার পরণে ছিল একটা সাদা রঙের ফ্রক, বয়সের তুলনায় চেহারায় অতিরিক্ত মাত্রায় সৌন্দর্য্য লক্ষ্য করা যায়! রিমন সাহেব ভাবলেন,মেয়েটা কি হারিয়ে গেছে? রাস্তাটাও বেশ নির্জন আশেপাশে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটা কোন খারাপ মানুষের হাতে পড়লে অনেক বড় বিপদ হতে পারে!

.

এরপর রিমন সাহেব মেয়েটার কাছে গিয়ে জানতে চাইলো যে মেয়েটা এতরাতে এখানে কী করছে? তার বাড়ি কোথায়? তার বাবা-মা কোথায়? কিন্তু মেয়েটা এই প্রশ্নের কোন জবাব দিলো না। শুধু চুপচাপ বসে বসে কাঁদতে লাগলো। এরপর রিমন সাহেব আর কোন উপায় না দেখে, মেয়েটাকে বললেন:

-আচ্ছা, আর কেঁদো না। আজ রাতে চলো আমার বাড়িতে। রাতে ঐখানে থাকবে। তারপর সকাল হলে আমি তোমার বাবা-মাকে খুঁজে তোমাকে তাদের কাছে পৌছে দিয়ে আসবো।

.

এরপর মেয়েটা কান্না বন্ধ করে চুপচাপ রিমন সাহবের সাথে তার গাড়িতে গিয়ে বসলো । রিমন সাহেব সেই মেয়েটিকে নিয়ে আবার নিজের বাড়ির দিকে রওনা হলেন। গাড়ি চালাতে চালাতে রিমন সাহেব বেশ কয়েকবার মেয়েটির মুখের দিকে তাঁকালেন। মেয়েটা চুপ করেই বসে ছিলো। মুখে কোন শব্দই নেই। তবে মেয়েটার মুখে অদ্ভুত একটা সৌন্দর্যের মায়া রয়েছে, যা যে কাউকেই তার দিকে আকার্ষণ করবে। যদিও মেয়েটা অনেক ছোট। রিমন সাহেবের বাড়িতে রিমন সাহেব এবং তার বাড়ির কাজের ছেলে আসিফ দুজনেই থাকে। রিমন সাহেব মেয়েটাকে নিয়ে ঘরের দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করলেন। কাজের ছেলেটা তখনো ঘুমাচ্ছিলো। তাই রিমন সাহেব আর তাকে জাগালেন না। এরপর রিমন সাহেব মেয়েটিকে তার ঘরের বিছানাতেই ঘুমাতে বললেন। কিন্তু মেয়েটা ঘুমালোনা। চুপচাপ বিছানায় বসে রইলো। রিমন সাহেব ভাবলেন হয়তো মেয়েটার ক্ষুধা লেগেছে। তাই ঘুমাচ্ছে না। এরপর রিমন সাহেব নিজে রান্না ঘরে গিয়ে মেয়েটার জন্য একটা ডিম ভাজতে লাগলেন। ডিম ভাজার পর ডিমটা নিয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসলেন । কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই মেয়েটা ঘরে নেই। রিমন সাহেব বেশ অবাক হয়ে পুরো বাড়িতে মেয়েটাকে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও তিনি মেয়েটার চিহ্নও খুঁজে পেলো না। বাড়ির গেটেও তালা দেওয়া তাই মেয়েটার ঘরের বাহিরেও যাওয়ার কথা না! মেয়েটার নাম ওতো জানা হলো না। রিমন ঘটনার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারলেন না। ভাবছিলেন মেয়েটা হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেল?! 

.

এরপর রিমন সাহেব অনেকটা হতাশ হয়েই নিজের বিছানায় গিয়ে বসলেন।

এরপর হঠাৎ তার মনে হলো তার ঘরের সিলিং এ বাদুড়ের মতো করে কোন একটা মানুষ ঝুলে রয়েছে! রিমন সাহেব বেশ ভয় পেয়ে গেলেন! এরপর অনেকটা আৎকেই উপরের দিকে তাকালেন। তিনি দেখলেন সেই বাচ্চা মেয়েটিই অনেকটা বাদুঁড় আকৃতি নিয়ে সিলিং এ ঝুলে রয়েছে। কী ভয়ংকর তার চেহারা! কী ভয়ংকর তার দৃষ্টি! তার চোখ এবং ঠোঁটগুলো অসম্ভব রকমের লাল হয়ে রয়েছে। তার সুন্দর ঠোঁট ছিদ্র হয়ে দুটো ভয়ংকর সুচালো দাঁত বের হয়ে রয়েছে। কিন্তু মেয়েটা এমন হলো কিভাবে? মেয়েটা কে?! রিমন সাহেব আর কিছু বুঝে উঠার আগেই মেয়েটা সিলিং থেকে সোজা লাফিয়ে রিমন সাহেবের শরীরের উপর পড়লো। এরপর মেয়েটা রিমন সাহেবের শরীরটাকে চেপে ধরে তার সেই ভয়ংকর দুটো অ দাঁত দিয়ে রিমন সাহেবের ঘাঁড়ে কামর বসিয়ে দিলেন। রিমন সাহেব বুঝতে পারলেন যে মেয়েটা তার রক্ত পান করছে। তিনি চিৎকার দিতে চাইলেন। কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনরকম শব্দ বের হচ্ছিলো না। তার পুরো শরীর ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যেতে লাগলো। এরপর রিমন সাহেব কিছুটা শক্তি নিয়ে তার ঘরের টেবিলে একটা ধাক্কা দিলেন। সাথে সাথেই টেবিলে রাখা কাঁচের জগটা মেঝেতে পড়ে গেলো আর জোরে একটা শব্দ হলো। হঠাৎ করেই জগ পড়ার শব্দে কাজের ছেলে আসিফের ঘুমটা ভেঙে গেলো। সে দ্রুত ছুটে রিমন সাহেবের ঘরে ঢুকলেন । দেখলেন,রিমন সাহেবের রক্তাক্ত দেহ মেঝেতে পড়ে রয়েছে। আসিফকে ঘরে ঢুকতে দেখেই একটা সাদা রঙের ভয়ংকর চেহারায় বাদূঁড় জানালা দিয়ে বের হয়ে গেল।

.

আসিফ, রিমন সাহেবের এই ভয়ংকর রক্তাক্ত শরীর দেখে ভয়ে আৎকে উঠে। সে ভয়ে চিৎকার করতে থাকে। সাথে সাথেই রিমন সাহেবের প্রতিবেশিরা তার বাড়িতে ছুটে আসে। তারাও রিমন সাহেবের এই রক্তাক্ত শরীর দেখে ভয় পেয়ে যায়। এরপর পুলিশ,গোয়েন্দা, মিডিয়া এসেও ভীর জমায় সেই বাড়িতে। সবার মুখে আবার আলোচিত হতে থাকে, "এই নিয়ে খুনি শহরের ১৬তম খুনটাও করে ফেললো।"....................................…........................................

.

. . . . . . . চলবে . . . . . . . .