জীবন নামক গল্পটা by Nova
---আব্বু প্লিজ তুমি আম্মুকে আর মেরো না।আম্মুর অনেক কষ্ট হচ্ছে।
একটা ছোট বাচ্চা ছেলে কাঁদতে কাঁদতে তার বাবার কাছে অনুরোধ করলো।কিন্তু তার বাবা তার কথা না শুনেই একের পর এক আঘাত করছে তার মায়ের শরীরে।
পুরনো স্মৃতিগুলো কল্পনায় ভাসতেই আৎকে উঠলো আয়াজ।ভোরের লাল টকটকে সূর্যটা যখন আকাশে তার আবির রঙ দিয়ে চারিদিকে আলো ছড়াতে ব্যস্ত, তখন আয়াজ নামের ছেলেটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট হাতে লাল সূর্যের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে।সে সম্ভবত কিছু একটা মনোযোগ সহকারে ভাবছে।হ্যাঁ,সে তার ভয়ানক অতীতের কথা ভাবছে।
আজ খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে আয়াজ। অন্যদিন গুলোতে দুপুর ১২টার আগে সে তার চোখ জোড়া মেলে না।সে ভাবছে সূর্যটা প্রতিদিনই একই স্থানে উদিত হয় একই জায়গায় ডুবে যায়। কিন্তু প্রতিদিন সকালে সূর্যোটা একটি অন্যরকম নতুনত্বের প্রতিক তার সাথে বয়ে আনে।কিন্তু আয়াজের জীবনটা তারই বিপরীত।
আয়াজের জন্ম আমেরিকাতে। তার বাবা-মা এর মাঝে কখনো মিল ছিল না। ঝগড়া বিবাদ সব সময় লেগেই থাকতো।এসব পারিবারিক কলহ সে খুব ছোট থেকেই দেখেছে।এই বিষয় গুলো তার মস্তিস্কে মানসিক ভাবে প্রভাব ফেলেছে। একটা সময় এই পারিবারিক কলহের কারনেই তার বাবার হাতে খুন হয় তার মা।যেইটা ছোট আয়াজের মস্তিষ্ককে আরো বেশি প্রভাবিত করেছে।তারপর তার বাবাকে জেলে নেওয়া হলো। আর সে ছোট বেলায় তার দাদার সাথে বাংলাদেশে চলে আসে। কিন্তু ছোট আয়াজ এই ঘটনার কারনে দিন দিন রুক্ষ, রাগি, বদ মেজাজি এবং বেপোরোয়া স্বভাবের হয়ে পরে। এইভাবেই সে বড় হতে থাকে।একটা সময় তার দাদার হাত তার কাধ থেকে সরে যায়। সেও চলে যায় না ফিরে আসা রাজ্যে।আয়াজ পুরো একা হয়ে যায়।
এখন আয়াজ ১৫ বছরের একজন কিশোর। তার রাগ বদ মেজাজ ও আগের থেকে বেড়ে গিয়েছে। তার দাদার পর তার দায়িত্ব নেয় তার ছোট চাচা মোজাম্মেল খান। আয়াজ তার কাছে থাকতো লাগলো, যেটা তার চাচির সহ্য হতো না।চাচা তার চাচীর ভয়ে আয়াজের থেকে দূরে থাকতো।যার কারণে তাকে স্নেহ করার মত কেউ বাকি রইলো না। চাচির কটুক্তি ভরা কথা,লাঞ্চনা, অকথ্য ভাষায় গালি শুনে তার জীবন থেকে আরো ৩ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো।সে ১৮ বছরে উপনিত হলো। এখন আর তার চাচির কথা সহ্য হয় না।তার চাচীর কথা শুনতে শুনতে আয়াজ এখন বিরক্ত।চাচা বেচারা তাকে বের হয়ে যেতে বলতেও পারেনা। শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আয়াজের দিকে।তার চাচার চোখ দুটো হয়তো বলতে চায় বাবা তুই আর থাকিস না এখানে।তার দাদা মারা যাওয়ার আগে তার বাড়িটা আয়াজের নামে লিখে যায়। সে তার চাচার বাড়ি থেকে বের হয়ে সেই বাড়িতে একাই উঠলো। এখন সে কলেজের ছাত্র। একা থাকার কারনে মানসিক ভাবে প্রচুর ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পরে। যার কারনে একটা সময় সে নেশাগ্রস্থ হয়ে গেলো।সারাদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর নেশায় কাটাতে লাগলো তার জীবন। এভাবেই দিন চলতে লাগলো।আয়াজ এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। একটা সময় সে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো। এখন সে আগের থেকে অনেক বেশি রাগি, বদ মেজাজি। নেশা আর ছেলদের সাথে মারামারি তার যেন নিত্য দিনের কাজ হয়ে গেলো।
কিন্তু তারপর যেনো আয়াজের জীবনটা অন্য দিকে মোড় নিলো।ভার্সিটির প্রথম বর্ষেই তার হিসাব বিজ্ঞান ম্যাডাম অরনির সাথে খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। কারন তারা দুজনই মানুষিক ভাবে বিষন্ন ছিল। অরনির বিয়ে হওয়ার পর তার বাচ্চা না হওয়ার কারনে তার স্বামি তাকে রেখে চলে যায়।তাই সেও বিষন্ন ছিল আর আয়াজের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠে। তারা দুজন তাদের বিষন্নতার গল্পগুলো একে অপরের সাথে ভাগভাগি করে নিতো। ক্লাশ শেষে অনেকটা সময় তারা একসাথে কোন পার্কে বা রেস্টুরেন্টে পার করে দিতো। একটা সময় তাদের সম্পর্ক এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়ালো যে, তারা একে অপরকে ছাড়া যেন এক মূহুর্ত থাকতে পারত না। আয়াজও আস্তে আস্তে নিজেকে শুধরে নিতে থাকলো।ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটা প্রেমের রুপ নিল।
অরনিকে পেয়ে আয়াজ খুব ভাল সময় পার করছিল। তাকে সে মন থেকে চাইতো।তারা অবসর পেলেই যখন মন চায় ঘুরে বেরাত। আরনি আয়াজের বাইকে বসে অনেক অনেক জায়গায় ঘুরে বেরাতো।তাদের সম্পর্কটা হাঁটি হাঁটি পা পা করে প্রায় এক বছরে পা রাখলো। অরনি ও আয়াজ দুজনেই ঠিক করলো তারা বিয়ে করবে। তাই অরনি তার প্রাক্তন স্বামিকে ডিভর্স নোটিস পাঠিয়ে দিলো। কিন্তু আয়াজের কপালে এই পর্বেও সুখ স্থায়ী হলো না।
অরনির স্বামির সাথে অরনির প্রেমের বিয়ে ছিল। হঠাৎ অরনির স্বামি তার কাছে ফিরে আসতে চাইলো। তার স্বামি একদিন আয়াজের কাছে কল করে কাঁদো কাঁদো গলায় অরনিকে চাইলো।যেটা আয়াজের জন্য অনেক বেশি কষ্টের ছিলো।একদিন সময় করে আয়াজ অরনিকে একটা সুন্দর পার্কে ডেকে আনলো। এবং তাকে প্রশ্ন করলো, "অরনি তুমি কি তোমার স্বামির কাছে ফিরে যেতে চাও?" অরনি খুব ক্ষীণ গলায় বললো,"না আয়াজ আমি তোমার কাছে থাকতে চাই, তোমার হতে চাই।" কিন্তু আয়াজ বুঝতে পারলো অরনির চোখ দুটো অন্য কথা বলছে।আয়াজ কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালো আর বললো, "অরনি চলো আজকে দুজনে বাইকে করে অনেক ঘুরবো আর তোমার ফেভারিট দই ফুচকা খাওয়াবো।"
তারা সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেক ঘুরলো। আয়াজ জানতো আজকেই হয়তো তাদের শেষ ঘোরা। কারণ সে অরনির চোখের কথা বুঝতে পেরেছিল।আকাশের সূর্যটা যখন দিগন্তের দিকে ডুবে যাচ্ছিল তখন অরনিও আয়াজের থেকে বিদায় নিয়ে সামনে দিকে হাঁটছিল।তখন আয়াজ পেছন থেকে ছল ছল নয়নে অরনির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।কিছু সময়ের মধ্যে সূর্যটাও ডুবে গেল আর সাথে নিয়ে গেলো অরনির সাথে কাটানো সমস্ত মূহুর্ত গুলো।
আয়াজ এই স্মৃতি গুলো ভাবছে আর সিগারেটের ধোয়া ওরাচ্ছে। ধোঁয়া গুলো বাতাসের সাথে গুলিয়ে হাওয়ার সাথে মিলিয়ে যাচ্ছিল। এই ধোঁয়ার সাথে যদি স্মৃতিগুলো উড়ে যেতো তাহলে কেমন হতো? কিন্তু স্মৃতি উড়ে যাওয়া কখনও সম্ভব নয়।আচমকা আঙুলে আগুনের পরশ লাগতেই আয়াজের ধ্যান ভাঙলো।তাকিয়ে দেখে সিগারেটটি শেষ।সে সিগারেটের শেষ অংশটা দেয়ালের সাথে পিসে আগুন নিভিয়ে তার রুমে চলে গেল। অসমাপ্ত অপরিপূর্ন রয়ে গেল তার জীবন নামক গল্পটা।পরবর্তীতে কি হবে তা তার জানা নেই। তবে দোয়া করি ভালো কিছুই যেনো হয়।
~~~~~~~~~~~~(সমাপ্ত)~~~~~~~~~~~~
#জীবন_নামক_গল্পটা
#Writer_NOVA
#বাস্তব_জীবন_থেকে_নেওয়া
