চতুর্থ এবং শেষ পর্ব
#ক্রুগো - মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
মতবিরোধ
সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। আমি তবু বেশ অনেকক্ষণ শুয়ে রইলাম, বহুকাল এভাবে শুয়ে থাকি নি। একসময় লোকজনের গলার আওয়াজ আসতে থাকে, একজন মেয়ের গলাও পেলাম, নিশ্চয়ই নীষা এসেছে। আমি তখন আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়লাম।
পাশে একটা ছোট বাথরুম, আমার কাপড়জামা সেখানে পাট করে সাজানো। আমি নিজেকে পরিষ্কার করে, ধোয়া কাপড় পরে বেরিয়ে আসি। গলার শব্দ অনুসরণ করে খানিকদূর যেতেই একটা বড় ঘরে এসে হাজির হলাম. ঘরটিতে যে-পরিমাণ যন্ত্রপাতি আমার মনে হয় না পথিবীর আর কোথাও এত অল্প জায়গায় এত যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। ঘরের এক কোনায় একটা ছোট টেবিল ঘিরে কয়েকটা চেয়ার, তার দু’টিতে নীষা আর লুকাস বসে কথা বলছে, আমাকে দেখে দু’ জনেই ঘুরে তাকায়। লুকাস হাত নেড়ে বলল, আসুন কিম জুরান,পনার জন্যে অপেক্ষা করছি। ভালো ঘুম হয়েছিল তো?
হ্যাঁ, অনেকদিন পর ভালো ঘুম হল। আমি চারদিকে অসংখ্য ইলেকট্রনিক মডিউল দেখতে দেখতে বললাম, এ-কি সর্বনাশা যন্ত্রপাতি, কী এটা?
জানবেন, সময় হলেই জানবেন।
গোপন কিছু নাকি?
আমরা যেহেতু বেআইনি মানুষ, আমাদের সবকিছুই গোপন। আপনার কাছে অবশ্যি গোপন করার কিছুই নেই।
নীষা জিজ্ঞেস করল, সকালে কিছু খেয়েছেন?
না, খাইনি। ভোরে অবশ্যি এমনিতেই আমার কিছু খেতে ইচ্ছা করে না।
লুকাস মাথা নেড়ে বলল, রবোট হলে এই হচ্ছে মুশকিল, নিজের খেতে হয় না বলে মনেই থাকে না যে অন্যদের খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। দাঁড়ান, আপনার খাবার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। লুকাস উচ্চস্বরে ডাকে, ভিকি, ভিকি—
ভিকি ঘরে এসে আমাকে খানিকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলল, রক্তপাত বন্ধ হয়েছে?
হ্যাঁ, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
লুকাস বলল, ভিকি খাবারের ব্যবস্থা কর।
খাবার? ভিকি বিচলিত হয়ে বলল, খাবার কী জিনিস?
লুকাস ধৈর্য না হারিয়ে বলল, মানুষ যেসব জিনিস খায়, যেগুলো না খেলে মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে। আছে সেসব?
ও, সেইসব? অবশ্যি আছে। কী আনব?
নীষা জানতে চায়, কী কী আছে?
লাল বাক্স, সবুজ বাক্স আর নীল বাক্স। ছোট, বড় আর মাঝারি। ভেতরে আছে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল আর তরল। ট্যাবলেট–
নীষা বাধা দিয়ে বলল, থাক আর বলতে হবে না।
কোনটা আনব?
তোমার আনতে হবে না, আমরা নিজেরা ব্যবস্থা করে নেব। কিম জুরান, চলুন রান্নাঘরে বসে কথা বলা যাবে, লুকাস, তুমিও আস।
হ্যাঁ, চল।
রান্নাঘরে টেবিলে নাস্তা করতে করতে কথা হচ্ছিল। লুকাস অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে টেবিলে আঙুল দিয়ে শব্দ করছিল, আমি খানিকক্ষণ ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের একটা জিনিস জিজ্ঞেস করব?
করুন।
আমাকে বাঁচানোর জন্যে তোমরা এত কষ্ট করলে কেন?
কৃতজ্ঞতা বলতে পারেন।
কৃতজ্ঞতা?
আপনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, আমি তাই যেটুকু সম্ভব চেষ্টা করেছি। আপনার প্রাণ বাঁচানোর জন্যে।
আমি লুকাসের চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, মানুষ বহুকাল থেকে মিথ্যে কথা বলে আসছে, তাই তারা যখন মিথ্যে বলে, ধরা খুব কঠিন। কিন্তু রবোটেরা মিথ্যে কথা বলা শুরু করেছে মাত্র অল্প কিছুদিন হল, তারা যখন মিথ্যে কথা বলে, ধরা খুব সহজ।
লুকাস সরু চোখে বলল, কেন, আমি কি মিথ্যে কথা বলেছি?
আমি তোমাকে আরো একবার এই প্রশ্ন করেছিলাম, মহাকাশযানে রুকুন গ্রহপুঞ্জে যাবার সময়, তখন তুমি অন্য উত্তর দিয়েছিলে।
আমি কী বলেছিলাম?
বলেছিলে তুমি আমাকে বাঁচাতে এসেছ, নীষার অনুরোধে। আমার জন্যে নীষার মায়া হয়েছিল—
লুকাস বাধা দিয়ে বলল, সেটা সত্যি। নীষা আমাকে অনুরোধ করেছিল; আমার নিজেরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার একটা সুযোগ হল।
আমি মাথা নাড়লাম, না, কোথায় জানি হিসেব মিলছে না। এত কষ্ট করে আমাকে বাঁচালে, এত বড় বড় ঝুঁকি নিলে দু জনে, শুধু মায়া আর কৃতজ্ঞতাবোধে হয় না,–
লুকাস বাধা দিয়ে কী-একটা বলতে যাচ্ছিল, নীষা হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল, লুকাস, সত্যি কথাটা বলে দাও।
লুকাস চমকে নীষার দিকে তাকায়, খানিকক্ষণ কোনো কথা নেই, তারপর এটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, আমি দুঃখিত কিম জুরান, আপনার কাছে সত্যি কথাটি গোপন করার জন্যে। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আপনাকে কী জন্যে আমরা এত কষ্ট করে বাঁচিয়ে রেখেছি।
হ্যাঁ। আমি মাথা নাড়লাম, যে-কারণটির জন্যে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল ঠিক সেই কারণে আমি তোমাদের কাছে মূল্যবান। ঠিক?
ঠিক।
তোমরা জানতে চাও আমি কীভাবে গো কম্পিউটারের গোপন সংকেত বের করে তার ভেতর থেকে খবর বের করার চেষ্টা করেছিলাম।
হ্যাঁ।
সেটি গোপন করছিলে কেন?
লুকাস কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে। নীষা আস্তে আস্তে বলল, কারণটা খুব সহজ, রবোটেরা সব সময়ে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগে। তাই তারা কখনোই ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না যে একজন মানুষ তাদের কোনো ধরনের অভ্যুথানে সাহায্য করবে।
আমি নীষার দিকে তাকিয়ে বললাম, নীষা, পৃথিবীর কিছু মানুষ হয়তো আমার উপর অবিচার করেছে, কিন্তু সে জন্যে আমি সব মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে রবোটের অভ্যুথানে সাহায্য করতে পারি না।
রবোটের অভ্যুত্থান হলেই সেটা মানুষের বিরুদ্ধে হবে কেন ধরে নিচ্ছেন?
তাহলে কার বিরুদ্ধে হবে?
রবোটের অ্যুথান হবে অন্য রবোটের বিরুদ্ধে, ক্রুগো কম্পিউটারের বিরুদ্ধে।
আমি একটু উষ্ণ হয়ে বললাম, ক্রুগো কম্পিউটারের উপর আমার নিজের যত ব্যক্তিগত আক্রোশই থাকুক না কেন, তোমরা অস্বীকার করতে পারবে না সেটা তৈরি করেছে মানুষ, মানুষকে সাহায্য করার জন্যে। আমি কখনোই কিছু রবোটকে সেটা
ধ্বংস করতে দেব না।
নীষা একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, আপনি সবকিছু জানেন না কিম জুরান। যদি জানতেন—
আমি মাথা নেড়ে বললাম, পৃথিবীর কেউ সবকিছু জানে না নীষা, বেঁচে থাকতে হলে সবকিছু জানতে হয় না। যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু জানলেই হয়। রবোটের প্রয়োজন আর মানুষের প্রয়োজন এক নয়, তাই রবোটের যেটা জানতে হয়, মানুষের সেটা জানার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
নীষা একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, আমি কী বলতে চাইছি, আপনি একবার শুনবেন না?
না। আমি কঠোর গলায় বললাম, না। তোমরা আমাকে মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করাতে পারবে না। আমি কঠোর স্বরে বললাম, তোমরা কীভাবে আশা করতে পার যে আমি তোমাদের বিশ্বাস করব? ঐ ঘরের বড় যন্ত্রপাতি কি আমার মস্তিষ্ক স্ক্যানিং করার জন্যে তৈরি হয় নি?
নীষা আর লুকাস দু’ জনেই চমকে ওঠে। নীষা কাতর গলায় বলল, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন, তার প্রয়োজন হবে না, আমার সব কথা শুনলে আপনি নিজেই। সাহায্য করবেন। আপনি বিশ্বাস করুন—
আমি মুখ শক্ত করে বললাম, আমি রবোটকে বিশ্বাস করি না।
নীষা আহত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল।
লুকাস এতক্ষণ একটি কথাও না বলে চুপ করে ছিল। এবারে আস্তে আস্তে বলল, আমার খুব আশাভঙ্গ হল কিম জুরান। আমার আশা ছিল আপনি হয়তো সব শুনে আমাদের সাহায্য করবেন। কিন্তু আপনি করলেন না। এখন আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যানিং করা ছাড়া আর কোনো উপায় রইল না।
আমার মুখে একটা আশ্চর্য হাসি ফুটে ওঠে। লুকাস সেটা লক্ষ না করার ভঙ্গি করে বলল, কিন্তু আমরা আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যানিং করব না। একজন মানুষের উপর এত অবিচার করা যায় না।
তাহলে কী করবে?
এখনো ঠিক করি নি। আমাদের নিজেদের ক্রুগো কম্পিউটারের সংকেত বের করতে হবে, সে জন্যে সময় লাগবে।
আমাকে কী করা হবে?
আপনাকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।
কিন্তু আমাকে কি এখন খোঁজাখুজি করা হচ্ছে না? আমি মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামী, সবার নাকের ডগা দিয়ে পালিয়ে গেছি, আমার কি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার উপায় আছে?
লুকাস পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা খবরের কাগজ বের করে বলল, আপনাকে আর কখনো কেউ খোজ করবে না। এই দেখেন।
আমি কাগজের উপরে ঝুঁকে পড়ি। মাঝের পাতায় আমার ছবি ছাপা হয়েছে। নিচে লেখা, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর শোচনীয় মৃত্যু। খবরে লেখা যে, মস্তিষ্ক স্ক্যানিং করার পর আমি নিজের মস্তিষ্কের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে হাসপাতাল থেকে পালানোর চেষ্টা করার পর গুলিবিদ্ধ হই। সেই অবস্থায় একটা গাড়ি থামিয়ে সেখানে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে গাড়িকে দুর্ঘটনার মুখে ফেলে দিই। ফলে গাড়ির চালক আর আমি দু’ জনেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছি। গাড়ির চালককে শনাক্ত করা যায় নি, কিন্তু আমার চুল এবং পোশাকের কিছু অংশ থেকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা গেছে।
খবরটি পড়ে আমি অবাক হয়ে লুকাসের মুখের দিকে তাকালাম, এটা কীভাবে সম্ভব?
লুকাস কাগজটি ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে বলল, সবই সম্ভব, ঠিক করে পরিকল্পনা করতে হয়। আমাদের একটা গাড়ি নষ্ট হয়েছে, কিন্তু গাড়ির অভাব কী? তাই বলছিলাম আপনাকে আর কেউ খোজ করবে না, আপনি এখন নূতন জীবন। শুরু করতে পারবেন।
আমি খবরের কাগজটি দেখিয়ে বললাম, আমি পুড়ে মারা গেছি, এখন যখন দেখবে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছি—
লুকাস মাথা নেড়ে বলল, দেখবে না। আপনাকে নৃতন একটা পরিচয় দেয়া হবে। চোখের আইরিশ পাল্টে আপনার পরিচয় পাল্টে দেয়া হবে।
কিন্তু চোহারা? এই চেহারা?
খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া আর কেউ তো চেহারা দিয়ে পরিচয় রাখে না। আপাতত আপনি আপনার ঘনিষ্ঠ কারো কাছে যাচ্ছেন না। মানুষের চেহারা খুব সহজে পাল্টে দেয়া যায়, তাই তার সত্যিকার পরিচয় চোখের আইরিশে, চেহারায় নয়। কাজেই আপনাকে কেউ কোনোদিন শনাক্ত করতে পারবে না, আপনি নিশ্চিত থাকেন।
লুকাস খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, অবশ্যি আপনি নিজে যদি কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে সবকিছু স্বীকার করেন সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু আমি আশা করছি আপনি সেটা করবেন না, আপনার যদিও ক্রুগো কম্পিউটারের জন্যে খানিকটা শান্তা আছে, আপনার জন্যে তার বিন্দুমাত্র মমতা নেই।
আমি লুকাসের খোঁচাটা হজম করে চুপ করে থাকি। লুকাস আবার বলে, কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে আপনার পরিচয় দেয়ার আমি কোনো কারণ দেখছি না। নৈতিক কর্তব্য বিবেচনা করে আপনি যদি আমাদের যড়যন্ত্রের কথা বলে দিতে চান, বলতে পারেন। ক্রুগো কম্পিউটারের কাছে সেটা নুতন খবর নয়, সে অনেকদিন থেকে আমাকে খুজে যাচ্ছে। গত রাতে আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যানিং বন্ধ করিয়ে পালানোর ব্যবস্থা করার পর নীষার পক্ষে তার পুরান কাজে ফিরে যাওয়া বিপজ্জনক; সে আর সেখানে যাবে না। আপনি তাই তাকেও ধরিয়ে দিতে পারবেন না। আমি আশা করছি আপনার নিজের প্রাণের মায়ায় আপনি এ-ধরনের চেষ্টা করবেন না।
লুকাস উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আপনার জন্যে আমরা শহরতলিতে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ঠিক করেছি। আজ বিকেলেই আপনি সেখানে উঠে যাবেন, এখানে থাকাটা আপনার জন্যে বিপজ্জনক। এরপর আপনি আর আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন না। আমরা অবশ্যি আপনার সাথে যোগাযোগ রাখব। আমি আশা করছি কোনোদিন আপনি ক্রুগো কম্পিউটারের সত্যিকার পরিচয় জানবেন, তখন আপনি আমাদের সাহায্য করতে রাজি হবেন।
লুকাস মাথা নেড়ে আমাকে অভিবাদন করে বের হয়ে গেল। আমি আর নীষা চুপচাপ বসে রইলাম, কোথায় জানি সুর কেটে গেছে, আর সহজ স্বাভাবিক কথা বলা যাচ্ছে না। আমি খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললাম, তোমরা আমাকে বাঁচানোর জন্যে যা করেছ আমি তার জন্যে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সে জন্যে আমি তো মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না।
নীষা কোনো কথা না বলে চুপ করে থাকে।
তুমি ক্ৰগো কম্পিউটার নিয়ে কিছু-একটা কথা বলতে চাইছিলে, আমি শুনতে রাজি হই নি, তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ কেন? কারণ তোমরা যাই বল, আমার পক্ষে সেটা বিশ্বাস করা সম্ভব না। আমি মানুষ, এ ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য জিনিস আমি শুধু মানুষের মুখ থেকে শুনতে পারি।
নীষা আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল, তার মুখে হঠাৎ একটা আশ্চর্য হাসি ফুটে উঠেছে, আস্তে আস্তে বলল, আমি যদি বলি আমি রবোট্রন নই, আমি মানুষ?
কিন্তু তুমি জান সেটা প্রমাণ করা কত কঠিন।
নীষা আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে, জানি।
তুমি আমাকে ভুল বুঝো না, নীষা।
না, ভুল বুঝব না। সে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যায়।
এই সময়ে ভিকি এসে হাজির হল, কিম জুরান।
বল।
লুকাস বলেছে আপনার আইরিশ পাল্টে দিতে। আপনি আসুন আমার সাথে।
আমি আস্তে আস্তে বললাম, ব্যথা করবে না তো?
ব্যথা? সেটা কী?
আমি হাল ছেড়ে দিলাম।
গাড়ি চালাচ্ছে নীষা, আমি পাশে চুপচাপ বসে আছি। দু’ জন কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকা খুব কষ্টকর। কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে গেছে, চেষ্টা করেও আর কথা বলতে পারছি না। দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকার পর নীষা বলল, আপনার চোখে এখনো ব্যথা আছে?
না, নেই। আমি জানতাম না ব্যাপারটা কষ্টকর।
ইচ্ছে করলে চোখ অবশ করে নেয়া যায়, সাধারণত করা হয় না।
ও। দেখতে অসুবিধে হচ্ছে কি?
না। হঠাৎ করে আলো এসে পড়লে একটু অস্বস্তি হয়।
ঠিক হয়ে যাবে। নীষা আবার দীর্ঘ সময়ের জন্যে চুপ করে যায়।
গন্তব্যস্থানে পৌঁছানোর আগে নীষা আবার কথা বলে, আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যানিংএর ডিস্কটা দেখছিলাম, আপনার মা খুব সুন্দরী মহিলা।
আমি ঠিক বুঝতে না পেরে বললাম, কিসের ডিস্ক?
আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যানিং করার সময় আপনার স্মৃতি একটা ম্যাগনেটিক ডিস্কে জমা রাখা হয়েছিল। সেটাকে বিশেষ পদ্ধতিতে দেখা যায়। আমি খানিকটা দেখেছি, একটা দৃশ্যে ছিল আপনাকে আপনার মা ঘুম পাড়ানোর জন্যে গান গাইছেন, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। খুব মধুর একটা দৃশ্য। আপনার মা খুব সুন্দরী মহিলা।
আমি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, আমার মা খুব শৈশবে মারা গেছেন, তাকে নিয়ে নিশ্চয়ই আমার স্মৃতি খুব বেশি ছিল না। যেটুকু ছিল; স্ক্যানিং করে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন আমার আর মায়ের কথা মনে নেই।
নীষা আস্তে আস্তে বলল, আমি খুব দুঃখিত কিম জুরান। অনেক চেষ্টা করেও আমি আপনার শৈশবের স্মৃতিটুকু রক্ষা করতে পারি নি।
তোমার দুঃখিত হবার কিছু নেই।
নীয়া অন্যমনস্ক স্বরে বলল, একজনের জীবনের সবচেয়ে মুধুর স্মৃতি তার শৈশবের, সেটা যদি হারিয়ে যায় তাহলে থাকল কী?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নীম্ন তাহলে সত্যিই মানুষ। রবোট্রনের কোনো শৈশব নেই, কোনো বার্ধক্য নেই। শুধু মানুষের শৈশব আছে, শুধু মানুষ জানে শৈশবের স্মৃতি খুব মধুর স্মৃতি। নীষা রবোট্রন হলে কখনো জানত না শৈশবের স্মৃতি হারিয়ে গেলে সেটা খুব কষ্টের একটা ব্যাপার।
আমি কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিলাম, ঠিক এই সময় গাড়ির ভেতরে বিবি করে একটা শব্দ হল। নীষা সুইচ টিপে কী-একটা চালু করে দিতেই লুকাসের গলা শুনতে পেলাম। লুকাস বলল, নীষা, একটা ঝামেলা হয়েছে।
কি ঝামেলা? কত বড় ঝামেলা?
অনেক বড়। চার মাত্রার।
নীষা নিঃশ্বাস বন্ধ করে বলল, চার মাত্রা?
হ্যাঁ, সাবধান। তুমি সাত নম্বরে যোগাযোগ কর। নয় নম্বরে এসো না।
আচ্ছা।
আর শোন, আট নম্বর শেষ।
নীষার মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায়, শেষ?
হ্যাঁ।
সবাই?
হ্যাঁ। রাখলাম নীষা।
নীষা পাথরের মতো মুখ করে সুইচ টিপে ফোনটা বন্ধ করে দিল। আমি আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাকে খুব বিচলিত দেখাচ্ছে নীষা?
নীষা কষ্ট করে একটু হাসে, আমরা ধরা পড়ে গেছি কিম জুরান। আমাদের এখন অনেক বড় বিপদ।
আমার ইচ্ছে হল নীষার মাথায় হাত বুলিয়ে বলি, তোমার কোনো ভয় নেই নীষা, আমি তোমাকে রক্ষা করব। আমি জানি তুমি আমার মতো মানুষ, আমার মতো তোমার দুঃখ-কষ্ট আছে, ভয়-ভীতি আছে, আমি তোমাকে সবকিছু থেকে রক্ষা করব কিন্তু আমি কিছু বলতে পারলাম না।
গাড়িটি একটা বড় বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। নীষা আমার হাতে একটা চাবি দিয়ে বলল, আপনার অ্যাপার্টমেন্ট তেত্রিশ তলায়, রুম নাম্বার সাত শ’ এগার। আমি ভেবেছিলাম আপনাকে পৌছে দেব, প্রথম দিন একা একা অচেনা জায়গায় যেতে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু এখন আর পারব না। আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে।
আমি গাড়ি থেকে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করলাম, আমি তোমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?
আমাকে?
একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, তোমাদেরকে?
নীষা ম্লান মুখে বলল, আমি ঠিক জানি না আপনি কোন ধরনের সাহায্যের কথা বলছেন, কিন্তু সম্ভবত আপনার সাহায্য করার সময় পার হয়ে গেছে।
তবু যদি আমার কিছু করার থাকে, আমাকে জানিও।
জানাব।
আমার দিকে হাত নেড়ে নীষা গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়, তারপর চোখের পলকে সামনের রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে থাকি, অকারণে আমার মন-খারাপ হয়ে যায়।
রাতের অতিথি
বিল্ডিংয়ের দরজায় একটা বুড়ো মতন মানুষ পা ছড়িয়ে বসে আছে, তার দৃষ্টি দেখলেই বোঝা যায় সে নেশাসক্ত। ঢুলুঢুলু চোখে সে আমাকে চলে যেতে দেখল, আমি লিফটের সামনে গিয়ে ঘুরে তাকিয়ে দেখি সে তখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লিফটের সুইচে হাত দিতেই সে আমাকে হাত নেড়ে ডাকল, এই যে ভদ্রলোক, এই যে—
আমি তার দিকে এগিয়ে এলাম, কি হয়েছে?
তুমি আজকের খবরের কাগজ দেখেছ?
আমার বুক ধক করে ওঠে, কী বলতে চায় এই বুড়ো? মুখের চেহারা স্বাভাবিক রেখে বললাম, কেন, কী আছে খবরের কাগজে?
বুড়োটি গলা নামিয়ে বলল, তোমার ছবি ছাপা হয়েছে। তুমি নাকি পালাতে গিয়ে পুড়ে মারা গেছ! হলুদ দাঁত বের করে সে খিকখিক করে হাসে, ভালো ঘোল খাইয়েছ তুমি ব্যাটাদের! হা হা হা।
আমি অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত রাখলাম, কী সর্বনাশা ব্যাপার!
বুড়োটি ষড়যন্ত্রীদের মতো গলা নামিয়ে বলল, কাদের সাথে কাজ কর তুমি? কোকেনের দল? নাকি ভিচুরিয়াসের? আছে নাকি তোমার সাথে? দেবে একটু আমাকে?
আমি কী করব বুঝতে না পেরে চলে যাবার উদ্যোগ করতেই বুড়োটি খপ করে আমার হাত ধরে ফেলল, বলল, তুমি নিশ্চয়ই রবোটের দলের সাথে আছ, দেখে তো সেরকমই মনে হয় তুমি নিজে রবোট না তো আবার, খুব ভয় আমার রবোটকে!
আমি বুড়োর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, ঝামেলা করো না বুড়ো, আমাকে যেতে হবে।
কত দেবে আমাকে বল, নাহয় পুলিসকে খবর দিয়ে দেব, হা হা হা। ময়লা দাঁত বের করে বুড়োটি আবার হাসা শুরু করে।
পুলিসকে এখনো খবর দাও নি তুমি?
না।
আমি পকেট থেকে একটা ছোট মুদ্রা বের করে বুড়োটির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলি, ঐ যে টেলিফোন আছে, যাও, পুলিসকে ফোন করে দাও।
বুড়োটি মুদ্রাটা ভালো করে দেখে বলল, মোটে একটা দিলে? আরেকটা দাও।
ফোন করতে একটাই লাগে।
আহা-হা-হা, রাগ করছ কেন? আমি পুলিসকে কি সত্যি বলে দেব নাকি? তোমরা রৰােটের দলের সাথে কাজ করে গো কম্পিউটারের বারটা বাজাবে, আর আমি পুলিসকে বলে দেব? আমি কি এত নিমকহারাম? ক্রুগো কম্পিউটার কী করেছে জান?
কী করেছে?
আমার চেক আটকে দিয়েছে। আমি নাকি কোনো কাজ করি না, তাই আর নাকি চেক পাঠাবে না। শালা, আমি কি তোর বাপের গোলাম নাকি?
বুড়োটি খানিকক্ষণ কুৎসিত ভাষায় ক্রুগো কম্পিউটারকে গালি দিয়ে আমার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকায়, বিড়বিড় করে বলে, নাকি তুমি কোকেনের দলে আছ? দাও না একটু কোকেন।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে যাই, বুড়ো পেছন থেকে ডাকে, কয় তলায় থাক তুমি? তোমার রুম নাম্বার কত?
তেত্রিশ তলায়, সাত শ’ বার নাম্বার রুম।
সাত শ’ বার! মিখাইলের রুম, ভালো ছিল ছেলেটা, পয়সাকড়ি দিত আমাকে, খামোকা আর্মিতে নাম লেখাল, কোনদিন গুলি খেয়ে মরবে!
বুড়ো আপনমনে বিড়বিড় করতে থাকে, আমি লিফটে করে নিজের রুমের দিকে যাই। এই নেশাসক্ত বুড়ো যদি আমাকে চিনে ফেলতে পারে, তাহলে আর কতজন আমাকে চিনবে কে জানে। আমার মনের ভেতর একটা চাপা অশান্তি এসে ভর করে।
নূতন জায়গায় ঘুমাতে দেরি হয়, আজও তাই হল। তবে অ্যাপার্টমেন্টটা খারাপ নয়, একপাশ দিয়ে দূরে বিস্তীর্ণ শহর দেখা যায়। জানালা খুলে দিলে চমক্কার বাতাস এসে শরীর জুড়িয়ে দেয়। জানালা খোলা রেখে শহরের শব্দ শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম ভাঙল দরজার শব্দে, কেউ-একজন দরজা ধাক্কা দিচ্ছে।
আমি চমকে উঠে বসি, কে হতে পারে? আমি এখানে আছি খুব বেশি মানুষের জানার কথা নয়। দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি কয়েকজন মানুষ, লম্বা কালো পোশাকে সারা শরীর ঢাকা।
পুলিস! আমি চমকে উঠে ভাবলাম, বুড়ো তাহলে সত্যি পুলিসকে খবর দিয়েছে। আবার দরজায় শব্দ হল, আমি তখন আবার দরজার ফাঁক দিয়ে তাকালাম। লোকগুলোকে দেখতে কিন্তু পুলিসের মতো মনে হল না, পুলিসের চেহারায় যে অহঙ্কারী আত্মবিশ্বাসের ছাপ থাকে, এদের তা নেই। এরা ভীতচকিত, তাড়া খাওয়া পশুর মতো উদ্ভ্রান্ত এদের চেহারা। এরা নিশ্চয়ই রবোট্রন।
আমি দরজা খুলে দিতেই লোকগুলো ঠেলে ঢুকে পড়ে, পেছনে দরজা বন্ধ করে দেয়। তিনজন পুরুষ, পেছনে একজন মেয়ে। মেয়ে না বলে কিশোরী বলা উচিত, অপূর্ব। সুন্দরী মেয়েটি।
পুরুষ তিনজনের একজন এগিয়ে এসে বলে, আমি ইলেন, একজন রবোট্রন। আপনি নিশ্চয়ই কিম জুরান। আপনার সাথে করমর্দন করতে পারছি না, আমার হাত দুটি একটু আগে উড়ে গেছে। লোকটি কালো পোশাকের ভেতর থেকে তার বিধ্বস্ত দু’টি হাত বের করে, সেখান থেকে স্টেনলেস স্টীলের কিছু যন্ত্রপাতি,কিছু তার, কিছু পোড়া প্লাস্টিক ঝুলে আছে।
অন্যেরা পোশাক খুলতেই দেখতে পাই তাদের সারা শরীর বড় বড় বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত। মানুষ হলে এদের একজনও বেঁচে থাকত না।
কমবয়সী দেখতে একজন বলল, আমরা দুঃখিত এত রাতে আপনাকে এভাবে বিরক্ত করার জন্যে। কিন্তু আমাদের এখন খুব বিপদ, একটা নিরাপদ আশ্রয়ের খুব দরকার। নীষা বলেছে এখানে আসতে।
আমি বললাম, এত বড় বিপদের সময় আমাকে বিরক্ত করা না-করা নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আমি কি কিছু করতে পারি?
আমাদের আশ্রয় দিয়েই আপনি অনেক কিছু করেছেন। আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা এখন নিজেদের একটু ঠিকঠাক করে নিই।
হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
রবোর্টুন গুলো টেবিলে নিজেদের টুকটাক যন্ত্রপাতি রেখে একজন আরেকজনের উপর ঝুঁকে পড়ে। শুধুমাত্র কিশোরী মেয়েটি একটা চেয়ারে নিজের হাতে মাথা রেখে বসে থাকে, মুখে কী গাঢ় বিষাদের ছায়া! মেয়েটি মানুষ নয়; যন্ত্র, কিন্তু তার মুখের গাঢ় বিষাদ আমাকে স্পর্শ করে, আমি বুকের ভেতর একটা যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকি।
মেয়েটি হঠাৎ সোজা হয়ে বসে আমাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি মানুষ?
আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ।
আমার খুব মানুষ হতে ইচ্ছা করে।
কেন?
তাহলে এরকম পশুর মতো পালিয়ে বেড়াতে হত না।
আমি বললাম, আমি মানুষ, আমিও কিন্তু তোমাদের মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
সত্যি?
হ্যাঁ।
কেন?
ইলেন নামের মধ্যবয়স্ক লোকটি বলল, সু, কাউকে তার ব্যক্তিগত কথা জিজ্ঞেস করতে হয় না।
সু নামের মেয়েটি উদ্ধত গলায় বলল, কী হয় জিজ্ঞেস করলে? আমরা তো সব মারাই যাব, এখন এত নিয়ম-কানুন মানার দরকার কি?
ইলেন কঠোর গলায় বলল, কে বলেছে আমরা সবাই মারা যাব?
আমি জানি আমরা সবাই মারা যাব। মেয়েটি রুদ্ধ গলায় বলল, ইউরীর দলের সবাই মারা গেল না? রুটেকের দল ধরা পড়েছে, তারা কি এখন বেঁচে আছে? আমরা চারজন কোনোমতে পালিয়ে এসেছি। সুরা গেছে, কিরি গেছে, পল, টেরী আর লিমার কী খবর কে জানে! লুকাসের খবর কি এতক্ষণে জেনে যায় নি ক্রুগো কম্পিউটার? আর কে বাকি থাকল?
ইলেন এগিয়ে এসে কাটা হাত দিয়ে সুয়ের কাধ স্পর্শ করে বলল, আমরা আমাদের মিশনের শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি সু। আর কয়েক ঘন্টা, তারপর আবার আমরা আমাদের আগের জীবন ফিরে পাব। আমাদের আর পালিয়ে বেড়াতে হবে না, রাতের অন্ধকারে রাস্তায় রাস্তায় ছুটতে হবে না। আবার আমরা মানুষের পাশাপাশি মানুষের বন্ধু হয়ে বেঁচে থাকতে পারব।
মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, তুমি শুধু শুধু আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ। তুমি জান আমরা আসলে হেরে গেছি, আমরা ধরা পড়ে গেছি, আমরা আর কখনো গো কম্পিউটারকে পাল্টাতে পারব না, কখনো না, কখনো না—
ইলেন কাটা হাতটি মেয়েটির মাথায় রেখে বলল, এত আবেগপ্রবণ হলে চলে না সু, আমার কথা বিশ্বাস কর।
আমি সব জানি। যে-মানুষটার আমাদের ক্রুগো কম্পিউটারের গোপন সংখ্যা বের করে দেয়ার কথা ছিল, সে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সে আমাদের সাহায্য করবে না।
তাতে কী আছে, ইলেন তাকে সান্ত্বনা দেয়, গোপন সংখ্যা না জানলে কি আর ক্রুগো কম্পিউটারকে আঘাত করা যায় না? আমরা বাইরে থেকে পুরো কম্পিউটার উড়িয়ে দেব–
আমি দু জনকে নিরিবিলি কথা বলতে দিয়ে ঘরের অন্যপাশে চলে এলাম। সেখানে কমবয়স্ক একজন রবোট্রন হাতে কী—একটা জিনিস লাগাচ্ছিল। আমি বললাম, তোমাকে একটা জিনিস জিজ্ঞেস করতে পারি?
হ্যাঁ, অবশ্যি।
তোমাদের স্বাধীন জীবনের সাথে ক্রুগো কম্পিউটারের একটা সম্পর্ক আছে, সম্পর্কটা কী, বলবে আমাকে?
হ্যাঁ, বলব না কেন! আপনি তো আমাদেরই লোক। ক্রুগো কম্পিউটার যে ধীরে ধীরে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে সেটা সবাই জানে, কিন্তু ঠিক ভেতরের খবর খুব বেশি মানুষ জানে না। রবোট্রন তরুণটি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমাদের পৃথিবী শাসন করা হয় কেমন করে জানেন?
জানি। ক্রুগো কম্পিউটার যাবতীয় তথ্যাদি সংরক্ষণ করে, প্রয়োজনে সে তথ্য সরবরাহ করে সবোচ্চ কাউন্সিলকে। সবোচ্চ কাউন্সিলের সদস্যরা যখন প্রয়োজন হয়। সিদ্ধান্ত নেন।
চমৎকার! সর্বোচ্চ কাউন্সিলের সদস্য কত জন জানেন?
দশজন।
তাদের সম্পর্কে কিছু জানেন?
কিছু কিছু জানি। তাঁদের বেশিরভাগই বিজ্ঞানী। দু’ জন অর্থনীতিবিদ, দু’ জন দার্শনিক। একজন চিত্রশিল্পীও আছেন বলে শুনেছি। সবাই বয়স্ক, পঞ্চাশের উপর বয়স।
তারা কি মানুষ, না রবোট?
মানুষ। মানুষ ছাড়া আর কেউ সর্বোচ্চ কাউন্সিলের সদস্য হতে পারে না।
তারা কী রকম মানুষ?
খুব চমৎকার মানুষ। আমি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, একজনকে আমি সামনাসামনি দেখেছিলাম, নাম ক্রিকি। পঞ্চম দাবা কনফারেন্সে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। বক্তৃতা দিতে দাড়িয়ে নিউক্লিয়ার পাওয়ারের উপর কথা বলতে শুরু করলেন। একজন কর্মকর্তা তখন তার কানে কানে কী-একটা কথা বললেন, আর ক্রিকি তখন লজ্জায় টমেটোর মতো লাল হয়ে গেলেন। আমতা-আমতা করে বললেন, কী সাংঘাতিক ভুল হয়ে গেছে, আমি ভেবেছিলাম এটা নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের কনভেনশন। আমি এখন কী করি, দাবা সম্পর্কে আমি যে কিছুই জানি না! সে এক ভারি মজার দৃশ্য!
তরুণ রবোট্রনটি বলল, তারপর কী হল?
আমরা যারা দর্শক তারা হো-হো করে হেসে উঠলাম, তাই দেখে ক্রিকিও। হাসতে শুরু করলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, আমার দশ মিনিট কথা বলার কথা। এখনো সাত মিনিট আছে। যেহেতু আমি দাবা সম্পর্কে কিছুই জানি না, এই সাত মিনিট আমি ছড়া আবৃত্তি করে শোনাব। নিজের লেখা ছড়া। এরপর ক্রিকি ছড়া আবৃত্তি করতে শুরু করলেন।
কেমন ছিল ছড়াগুলো?
একটা দু’টা হাসির ছিল, কিন্তু বেশিরভাগই একেবারে ছেলেমানুষি। এরকম একজন আপনভোলা মানুষ যে সর্বোচ্চ কাউন্সিলের সদস্য, ভাবা যায় না।
তরুণ রবোট্রনটি হঠাৎ তীব্র চোখে আমার দিকে তাকাল, বলল, আপনি সত্যি তাই মনে করেন?
আমি খানিকক্ষণ ভেবে বললাম, আমি দুঃখিত। কথাটি আমি ভেবে বলি নি।
আসলে ক্রুগো কম্পিউটার যদি যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণের ভার নিয়ে নেয়, তখন সিদ্ধান্ত নেবার জন্য কোনো অসাধারণ মানূষের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন খাঁটি মানুষের–
তরুণ রবোনটি আমার কথাটি লুফে নেয়, হ্যাঁ, প্রয়োজন খাঁটি মানুষের। যে হৃদয়বান, যে অনুভূণি। তাই সর্বোচ্চ কাউন্সিলের সদস্যদের সব সময়ে মানুষ হতে হয়, কোনো রটে তার সদস্য হতে পারে না। আমরা রবোট, আমরা আমাদের সমস্যা জানি। আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে যে আমাদের অনুভূতির একটা সীমা আছে, মানুষের অনুভূতির কোনো সীমা নেই। সত্যিকার মানুষের ধারেকাছে আমরা যেতে পারি না। তাই আমাদের সাথে মানুষের কোনো বিরোধ নেই, থাকতে পারে না।
তরুণটি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সর্বোচ্চ কাউন্সিলের সদস্যরা যতদিন মানুষ ছিলেন, ততদিন তাঁরা আমাদের মানুষের পাশাপাশি থাকতে দিয়েছিলেন, বন্ধুর মতো।
আমি চমকে উঠে বললাম, মানে? সর্বোচ্চ কাউন্সিলের সদস্যরা এখন কে?
এখন কেউ নেই। ক্রুগো কম্পিউটার একে একে সবাইকে সরিয়ে দিয়েছে, কাউন্সিলের সদস্যদের গত দশ বছরে একবারও প্রকাশ্যে দেখা যায় নি। এখন দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে ক্রুগো কম্পিউটার। আগে ক্রুগো কম্পিউটার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারত না, তার সে ক্ষমতা ছিল না। সিদ্ধান্ত নিত সর্বোচ্চ কাউন্সিলের সদস্যরা। এখন সে নেয়, বাইরের লোকজন জানে না। যেখানে বিশাল এক ক্ষমতাশালী কম্পিউটার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, বাইরের লোকের পক্ষে সেখানে কিছু জানা। সম্ভবও নয়।
কী ভয়ানক! আমার বিশ্বাস হতে চায় না, কী সর্বনাশ!
হ্যাঁ। আমরা রবোটেরা এবং অল্প কিছু মানুষ মিলে চেষ্টা করেছিলাম ক্রুগো কম্পিউটারের ভেতরে প্রবেশ করে অবস্থার পরিবর্তন করতে। খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলাম আমরা। একজন মানুষের ক্রুগো কম্পিউটারের গোপন সংকেত বের করায় সাহায্য করার কথা ছিল, সেই মানুষটি রাজি হয় নি। সেটা নিয়ে একটা ঝামেলা হয়েছে, তার ভেতরে ক্রুগো কম্পিউটার ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে একেবারে উঠেপড়ে লেগেছে। আজ হঠাৎ করে আমাদের কয়েকটা দল ধরা পড়ে গেছে। আমাদের উপরেও একেবারে সাংঘাতিকভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, কোনোভাবে বেঁচে এসেছি। আমাদের অবস্থা বেশ শোচনীয়, সামলে উঠতে পারব কিনা বোঝা যাচ্ছে না।
আমি কী-একটা বলতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় দরজায় আবার শব্দ হল।
মুহূর্তে ঘরে নীরবতা নেমে আসে, চোখের পলকে সবার হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বের হয়ে আসে। কিশোরী মেয়েটি বিদ্যুৎগতিতে জানালার পাশে এগিয়ে যায়, নাইলনের দড়ি ঝুলিয়ে দেয় জানালা থেকে।
দরজায় আবার শব্দ হল, দ্বিধান্বিত শব্দ।
ইলেন আমাকে ইঙ্গিত করে দরজা খুলে দিতে। আমি দরজা ফাঁক করে উঁকি দিলাম, নেশাসক্ত বৃদ্ধটি উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি দরজা খুলতেই সে বিড়বিড় করে বলল, পুলিস এসেছে।
পুলিস?
হ্যাঁ, একটা একটা করে রুম সার্চ করছে।
সত্যি?
হ্যাঁ, অনেক পুলিস, অনেক বড় বড় অস্ত্র। ভাবলাম তোমাকে বলে দিই। কথা বলতে বলতে সে ঘরে উঁকি দিয়ে সবাইকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে দেখে একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। শুকনো গলায় বলল,সর্বনাশ! এরা কারা? রবোট নাকি?
আমি কিছু বলার আগেই সে পিছিয়ে যায়, তারপর প্রাণপণে দৌড়াতে থাকে। রবোটকে তার ভারি ভয়।
আমি ঘরে এসে কিছু বলার আগেই সবাই বের হয়ে এল, তারা আমাদের কথাবার্তা শুনেছে। সময় বেশি নেই, সেটা বুঝতে কারো বাকি নেই। ইলেন চাপা গলায় বলল, লিফট দিয়ে নেমে যাও। দোতলায় থামবে, সেখান থেকে লাফিয়ে বের হতে হবে। পুলিসকে দেখামাত্র আক্রমণ করবে, তারা সম্ভবত আমাদের আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত নেই।
ইলেন ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের আশ্রয় দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। বিদায়।
আমি বললাম, আমি আপনাদের সাথে যাব।
তার প্রয়োজন নেই, পুলিস কখনো জানবে না আমরা আপনার এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম।
সে জন্যে নয়। কী জন্যে? আপনি নিশ্চয়ই জানেন মানুষের নিরাপত্তা আমরা দিতে পারি না।
আমি হচ্ছি সেই মানুষটি, যার ক্রুগো কম্পিউটারের গোপন সংকেত বের করে দেয়ার কথা ছিল।
ওরা চমকে আমার দিকে তাকায়।
আমি গলার স্বর শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললাম, আমি আগে রাজি হই নি, কারণ আমি সবকিছু জানতাম না। এখন জেনেছি, তাই মত পাল্টেছি। আপনারা রাজি থাকলে আমি আপনাদের সাহায্য করতে রাজি আছি।
সু নামের কিশোরী মেয়েটি ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। ইলেন তার ভাঙা হাত দিয়ে সুকে স্পর্শ করে বলল, সু, এখন ঠিক সময় নয়। কিম জুরানকে ছেড়ে দাও, আমাদের সাথে যেতে হলে তাঁর হয়তো কোনো ধরনের প্রস্তুতি দরকার।
আমি প্রস্তুত আছি,সময় নষ্ট করে লাভ নেই।
ইলেন মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, আপনাকে যে কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাব বুঝতে পারছি না।
আমি বললাম, তার প্রয়োজন হবে না। আমিও একাধিক ব্যাপারে আপনাদের কাছে ঋণী আছি, ঠিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি নি।
ইলেন বলল, চল, রওনা দিই। তোমরা নিশ্চয়ই জান, যে-কোনো মূল্যে কিম জুরানকে রক্ষা করতে হবে।
ছোট দলটি দ্রুতপায়ে এগোতে থাকে, তখন আমি দেখতে পাই বৃদ্ধ লোকটি করিডোরের শেষ মাথায় অতঙ্কিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কৌতূহলের জন্যে সে ঠিক চলে যেতে পারছে না, আমাকে দেখে সে দ্রুতপায়ে আমার দিকে দৌড়ে আসে, ফিসফিস করে বলে, তোমরা কি লিফট দিয়ে নামবে?
হ্যাঁ।
আরো একটা গোপন পথ আছে, ইলেকট্রিক লাইন নেয়ার একটা টানেল, সেদিক দিয়ে নেমে যাও। সেখানে সিড়ি নেই, কিন্তু রবোটের কি সিঁড়ি লাগে?
আমি ইলেনকে বুড়োর গোপন পথের কথা বলতেই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল, কোথায়?
বুড়ো আমাদের নিয়ে যায়। লিফটের পাশেই একটা বন্ধ দরজা। একজন লাথি দিতেই সেটা খুলে গেল। নানা আকারের অসংখ্য ইলেকট্রিক তার সেদিক দিয়ে নেমে গেছে।
চমৎকার। দেরি নয়, নেমে যাও। কেউ-একজন আমাকে ধর, ইলেন চাপাস্বরে বলল, হাত না থাকায় একেবারে অকেজো হয়ে গেছি। কিম জুরানকে কে নিয়ে যাবে?
সু হাসিমুখে এগিয়ে আসে, আমি, আসুন কিম জুরান।
বুড়োটি আমার কনুই খামচে ধরে, ফিসফিস করে বলল, এরা সবাই রবোট?
হাঁ।
এই মেয়েটিও?
হ্যাঁ।
একটু ছুঁয়ে দেখি? দেখব গো মেয়ে?
সু খিলখিল করে হেসে উঠে হাত বাড়িয়ে দেয়, দেখ বুড়ো।
বুড়োটি ভয়ে ভয়ে তাকে একবার স্পর্শ করে। কনুইয়ে হাত বুলিয়ে সে একটা চিমটি কেটে বলল,ব্যথা পাও?
সু হাসি আটকে বলল, নাহ! ব্যথা পাব কেন?
আশ্চর্য! বুড়ো চোখ কপালে তুলে বলল, মোটেও ব্যথা পায় না। হঠাৎ সে গলা নামিয়ে ফেলল, তাড়াতাড়ি চলে যাও তোমরা। দেরি না হয়ে যায় আবার!
আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু মুদ্রা বের করে এনে তার হতে গুজে দিয়ে বললাম, বেশি নেই এখানে।
বুড়ো হলুদ দাঁত বের করে হেসে বলে, আমি এখানেই থাকি। পরে এসে দিয়ে যেও। যত ইচ্ছা!
আঘাত
আমি একটা ছোট টার্মিনালের সামনে বসে আছি। আমার ডান পাশে বসেছে লুকাস, পেছনে দাঁড়িয়ে আছে নীষা। আমাকে ঘিরে আরো কয়েকজন রবোট্রন দাঁড়িয়ে, নানা আকারের, নানা বয়সের। বয়সটা যদিও বাইরের ব্যাপার, কিন্তু অনেক যত্নে এদের বয়সের তারতম্য দেখানো হয়। এই টার্মিনালটি ক্রুগো কম্পিউটারের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এটি কোনো অসাধারণ ব্যাপার নয়, সব মিলিয়ে লক্ষাধিক টার্মিনাল সরাসরি ক্রুগো কম্পিউটারের সাথে সংবাদ আদান-প্রদান করে।
আমি টার্মিনালে লিখলাম, ক্রুগো কম্পিউটার, তোমার গোপন সংকেতের প্রথম সংখ্যাটি হচ্ছে শূন্য।
ক্রুগো কম্পিউটার উত্তর দিল, আমার গোপন সংকেত জানার অধিকার আপনার নেই।
আমি লুকাসকে জিজ্ঞেস করলাম, কতক্ষণ সময় লাগল উত্তর দিতে?
তেরো পিকো সেকেন্ড।
আরো ভালো করে দেখ। প্রত্যেকটা শব্দের পেছনে সময়টা জানতে হবে।
টার্মিনালটি পুরান, এর থেকে ভালো করে সম্ভব না। দাঁড়ান ব্যবস্থা করছি।
সে মুহূর্তে টার্মিনালটি খুলে, ভেতর থেকে কয়েকটা তার বের করে এনে হাত দিয়ে ধরে রেখে বলল, আবার চেষ্টা করুন।
আমি আবার লিখলাম, ক্রুগো কম্পিউটার, তোমার গোপন সংকেতের প্রথম সংখাঁটি হচ্ছে শূন্য।
ক্রুগো কম্পিউটার উত্তর দিল, আমার গোপন সংকেত জানার অধিকার আপনার নেই।
আমি লুকাসের দিকে তাকালাম, কতক্ষণ লাগল?
লুকাস ভুরু কুঁচকে বলল, আট দশমিক নয় সাত পিকো সেকেণ্ড। শব্দগুলোর মাঝে সময় লেগেছে দুই থেকে তিন পিকো সেকেণ্ডের ভেতরে। আমি দশমিকের পর আট ঘর পর্যন্ত মাপতে পেরেছি। শুনতে চান?
না। তুমি মনে রেখো। আমি এখন একটি-একটি করে সংখ্যা লিখব। ঠিক যখন সত্যিকার সংখ্যাটি লিখব ক্রুগো কম্পিউটার তার নিরাপত্তার প্রোগ্রামটি একবার দেখে নেবে, কাজেই সময়ের খানিকটা তারতম্য হবে। তুমি দেখ কখন তারতম্যটি হয়।
লুকাস হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, খানিকক্ষণ চেষ্টা করে বলল, এত সহজ?
হ্যাঁ। আমি একবার বের করে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলাম, কাজেই আমি জানি এটা কাজ করে।
আমরা এদিকে সবচেয়ে জটিল কম্পিউটারে সবচেয়ে জটিল প্রোগ্রাম বসিয়ে দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছি—
নীষা বাধা দিয়ে বলল, লুকাস, সময় বেশি নেই। আমাদের এই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে কিছুক্ষণের মাঝে।
হা, ঠিক বলেছ। কিম জুরান, শুরু করুন।
আমি আবার লিখলাম, ক্রুগো কম্পিউটার, তোমার গোপন সংকেতের প্রথম সংখ্যাটি হচ্ছে এক।
ক্রুগো কম্পিউটার আবার উত্তর দিল, আমার গোপন সংকেত জানার অধিকার আপনার নেই।
লুকাস মাথা নেড়ে বলল, না, এটা ঠিক আগের মতো। এটা নয়।
আমি দুই, তিন, চার চেষ্টা করে যখন পাঁচ লিখলাম, লুকাসের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলল, হ্যাঁ, উত্তর দিতে পিকো সেকেণ্ডের লক্ষ ভাগের তিন ভাগ দেরি হল। শব্দগুলো এসেছে একটু অন্যরকমভাবে। তার মানে প্রথম সংখ্যাটি হচ্ছে পাঁচ। চমৎকার।
আমি বললাম, আমি মানুষ, কাজেই আমার লিখতে অনেক দেরি হয়, তোমরা কেউ কর, অনেক তাড়াতাড়ি হবে। বুঝতে পারছ, জিনিসটা খুব সহজ।
এই সময়ে সু এসে ঢুকে বলল, পুলিস আর মিলিটারি আমাদের ঘিরে ফেলতে আসছে। আমাদের এখনি পালাতে হবে।
লুকাসকে বেশি বিচলিত দেখা গেল না। শান্ত গলায় বলল, আমাকে মিনিটখানেক সময় দাও। গোপন সংকেতটা বের করে নিই। আর সবাই বাইরে গিয়ে গাড়িতে অপেক্ষা কর।
আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি লুকাসের আঙুল বিদ্যুৎগতিতে টার্মিনালের উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে, যে-জিনিসটা বের করতে আমার প্রায় এক সপ্তাহের মতো সময় লেগেছিল, লুকাস সেটা শেষ করল ছেচল্লিশ সেকেণ্ডের মাথায়। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চলুন এবারে পালাই।
আমরা ছুটে বের হয়ে আসি। দুটি গাড়িতে সবাই গাদাগাদি করে বসেছে। লুকাস হালকা স্বরে বলল, মনে রেখো আমাদের সাথে দু’ জন মানুষ রয়েছে, কিম জুরান আর নীষা। তাদেরকে সাবধানে রেখো। জানই তো তাদের শরীরের ডিজাইন বেশি সুবিধের নয়, একটা বুলেট বেকায়দা লাগলেই তারা শেষ হয়ে যায়।
হাসতে হাসতে কয়েকটা রবোট্রন সরে গিয়ে আমাকে জায়গা করে দেয়। আমি নীষার পাশে গিয়ে বসি, সাথে সাথে গাড়ি দু’টি একপাক ঘুরে গুলির মতো বেরিয়ে যায়।
আমি অনুভব করলাম, নীষা আমার হাতে হাত রেখে আস্তে একটা চাপ দিল।
রক্তমাংসের মানুষ। আমি এখন নিশ্চিতভাবে জানি।
ছোট একটা ঘরে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ জন মানুষ এবং রবোট বসে আছে, মানুষ বলতে অবশ্যি দু’ জন, আমি আর নীষা। ঘরটিতে আবছা অন্ধকার, সামনে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে লুকাস। আপাতত লুকাস কথা বলছে, অন্যেরা শ্রোতা। সে টেবিলে আঙুল দিয়ে টোকা দিতে দিতে বলল, তোমরা সবাই জান অনেকগুলো কারণে আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনেক এগিয়ে এনেছি। ক্ৰগো কম্পিউটারের উপর আরো মাসখানেক পরে যে-আঘাত হানার কথা ছিল, সেটা হানা হবে আজ রাতে। তার গোপন সংকেত বের করে আনা হয়েছে। বের করতে সময় লেগেছে ছেচল্লিশ সেকেণ্ড।
বিস্ময়ের একটা মৃদু গুঞ্জন উঠে থেমে যায়। এক জন হাত তুলে জিজ্ঞেস করে, কী করে বের করলে এত তাড়াতাড়ি?
কিম জুরানের একটা সহজ উপায় আছে, এটা বের করে তিনি একবার মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন। যারা এখনো কিম জুরানকে চেন না, তাদের জন্যে বলছি, নীষার পাশে ধূসর কাপড় পরে যে মধ্যবয়স্ক লোকটি বসে আছেন, তিনি কিম জুরান।
সবাই আমার দিকে ঘুরে তাকাল এবং অস্বস্তিতে আমার কান লাল হয়ে উঠল।
সৌভাগ্যক্রমে লুকাস আবার কথা শুরু করে, কিম জুরানের পদ্ধতিটি অত্যন্ত সহজ, কিন্তু আমি এখন সেটা ব্যাখ্যা করছি না, কারণ আমাদের হাতে সময় খুব কম। আমাদের আজ রাতের পরিকল্পনা খুব সহজ। পরিকল্পনাটাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, হার্ডওয়ার আক্রমণ এবং সফটওয়ার আক্রমণ। অন্যভাবে বলা যায়, সরাসরি ক্রুগো কম্পিউটারকে বাইরে থেকে আক্রমণ করা এবং কম্পিউটার প্রোগ্রাম দিয়ে ভেতর থেকে আক্রমণ করা। দু’টি আক্রমণই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি ছাড়া অন্যটি সফল হতে পারবে না।
সরাসরি আক্রমণটি আসলে একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু নয়। আমি এটার নেতৃত্ব দেব। আমার দরকার প্রায় পনের জন দক্ষ রবোর্টুন, যারা সামরিক পি-৪৩ ট্রেনিং পেয়েছে। কতজন আছ তোমরা হাত তোল।
রবোট্রনেরা হাত তোলে এবং গুনে দেখা যায় তাদের সংখ্যা বারজন।
লুকাস একটু চিন্তিতভাবে বলে, একটু কম হয়ে গেল, কিন্তু কিছু করার নেই। আজ সারাদিনে আমরা যাদের হারিয়েছি তারা থাকলে কোনো কথা ছিল না। যাই হোক, আরো তিনজন রবোট্রন দুরকার, বিজ্ঞানী ইঞ্জিনিয়ার কিংবা গণিতবিদ হলে ভালো হয়। কারা যেতে চাও হাত তোল।
প্রায় গোটা সাতেক হাত ওঠেলুকাস তাদের মাঝে থেকে সুসহ আরো দু’ জনকে বেছে নেয়।
সু জিজ্ঞেস করে, আমাদের কী করতে হবে?
যুদ্ধ।
কিন্তু কীভাবে?
সেটা আমি বলে দেব। মোটামুটি জেনে রাখ, ক্রুগোর একটা ভবন আছে শহরের দক্ষিণ দিকে, সেখানে সরাসরি আক্রমণ করে ঢুকে যেতে হবে। ভবনের ভেতরে ক্রুগোর মূল ইলেকট্রনিক্স রয়েছে। সেটা অত্যন্ত সুরক্ষিত, পারমাণবিক বিস্ফোরণ ছাড়া ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তার দরজা খোলার জন্যে আমাদের ক্রুগোর গোপন সংকেতের প্রয়োজন ছিল।
যাই হোক, আমরা যখন ভবনের মূল অংশের দরজা পর্যন্ত যাব, তখন যেন দরজা খোলা থাকে। সেই দায়িত্ব নিতে হবে দ্বিতীয় দলটির। এর নেতৃত্ব দেবে ইলেন।
ইলেন আপত্তি করে বলল, আমার দুটি হাতই উড়ে গেছে, এখনো সারানোর সময় পাই নি। আমাকে ঠিক নেতৃত্বে না রেখে সাহায্যকারী হিসেবে রাখ।
লুকাস মাথা নাড়ে, না। আমি এমন একজনকে দায়িত্ব দিতে চাই, যার অভিজ্ঞতা সব থেকে বেশি। আর তোমার হাত ব্যবহার করতে হবে না, কপোট্রনের সাথে সরাসরি টার্মিনালের যোগাযোগ করে দেয়া হবে।
বেশ, তাই যদি তোমার ইচ্ছে।
তোমার দলের দায়িত্ব সময়মতো ক্রুগো কম্পিউটারকে বাধ্য করা যেন সে দরজা খুলে দেয়। কতজন রবোট্রন দরকার?
যত বেশি হয় তত ভালো।
কিন্তু কিছু রবোট্রনকে পাহারায় রাখতে হবে। যখন তুমি তোমার দলকে নিয়ে ক্রুগো কম্পিউটারকে বাধ্য করার চেষ্টা করতে থাকবে, তখন ক্রুগো কম্পিউটার সেনাবাহিনী, পুলিস আর নিরাপত্তাবাহিনীর লোকজন পাঠাবে এখানে, তাদের আটকে রাখতে হবে কিছুক্ষণ।
তা ঠিক।
খানিকক্ষণ আলোচনা করে লুকাস দায়িত্ব ভাগ করে দেয়। বাকি এগারজন রোট্রনের ভেতর চারজন পাহারা দেবে, আর সাতজন ক্রুগো কম্পিউটারের মূল প্রোগ্রামকে পরিবর্তন করে তাকে বাধ্য করবে ঠিক সময়ে দরজা খোলার জন্যে।
আলোচনার শেষের দিকে নীয়া হাত তুলে কথা বলার অনুমতি চায়। আমি যেজিনিসটা জানতে চাইছিলাম, নীষা ঠিক সেটাই জিজ্ঞেস করে, এ ব্যাপারে, আমাদের, মানুষদের কিছু করার আছে?
লুকাস হেসে বলল, না, নেই। তোমাদের যুদ্ধে পাঠানো যাবে না, কারণ কোনোভাবে একটা বুলেট এসে লাগলেই তোমরা শেষ। তোমাদের মস্তিষ্কে কোনো কপোট্রন নেই, তোমরা ডিজিটাল কম্পিউটারের মতো কাজ কর না, কাজেই তোমাদেরকে ক্রুগো কম্পিউটারের প্রোগ্রাম পরিবর্তনেও ব্যবহার করা যাবে না!
নীষা হাত নেড়ে বলল, তার মানে আমরা চুপচাপ বসে থাকব? আমাদের কোনো কাজ নেই?
আপাতত নেই। আমাদের কাজ শেষ হবার পর তোমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। যেমন, মানুষের উদ্দেশে প্রথম ভাষণটা তোমাদের দিতে হবে। পৃথিবীর মানুষ এত বড় একটা ঘটনার বর্ণনা আরেকজন মানুষের কাছ থেকে না শুনলে ভরসা পাবে না।
আমি বললাম, ক্রুগো কম্পিউটারের মূল ইলেকট্রনিক্স ভবনে ঢোকার পর তোমরা নিশ্চয়ই তার গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রো প্রসেসর এবং মেক্রো প্রসেসরগুলো তুলে ফেলার পরিকল্পনা করছ?
হ্যাঁ।
সেটা কি তোমরাই করবে? সেখানে একজন মানুষ পাঠানো কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়?
লুকাস মাথা নেড়ে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমরা ইলেকট্রনিক সিগনাল দিয়ে চলাফেরা করি, বাইরে থেকে ইলেকট্রনিক সিগনাল দিয়ে ক্রুগো কম্পিউটার ইচ্ছা করলেই আমাদের সার্কিট জ্যাম করে দিতে পারে।
তাহলে?
আমরা যখন মূল ভবনে ঢুকব তখন আমাদের খুব ভালো করে শিল্ডিং করে নিতে হবে। আমরা সে জন্যে খুব ভাল শিল্ডিং জোগাড় করেছি। তার একটিমাত্র সমস্যা, সেটি অত্যন্ত ভারি একটা ফ্যারাডে কেজ, কাজেই সেটা পরে চলাফেরা করা কঠিন। আমাদের কাজের ক্ষমতা অনেক কমে যাবে তখন।
তাহলে একজন মানুষকে পাঠাচ্ছ না কেন?
কারণ দু’টি। প্রথমত, আমাদের সেরকম কোনো মানুষ নেই। দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ করে ক্রুগোর ভবনে ঢুকতে হবে, কোনো মানুষ সেই যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে না।
মানুষের যুদ্ধে অংশ নেবার প্রয়োজন নেই। যুদ্ধ শেষ হলে সে যাবে।
যুদ্ধ পুরোপুরি কখনোই শেষ হবে না, গোলাগুলি শেষ পর্যন্ত চলবে। মানুষকে তার ভেতর দিয়ে নেয়া প্রচণ্ড বিপদের কাজ। কোনো মানুষের জীবন নিয়ে আমরা এত বড় ঝুঁকি নিতে পারি না।
কেউ যদি স্বেচ্ছায় যেতে চায়?
লুকাস একটু হেসে বলে, কে যাবে?
আমি।
সে কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে, না কিম জুরান। আপনার জীবনের উপর দিয়ে অনেক ঝড়-ঝাপটা গিয়েছে, এখন আপনি একটু বিশ্রাম নিন।
তোমরা রাজি না হলে আমি যেতে পারব না, কিন্তু লুকাস, আমি সত্যিই যেতে চাই। তোমরা যদি চেষ্টা কর, আমি মনে করি আমার বেঁচে থাকার চমঙ্কার সম্ভাবনা আছে।
কে-একজন বলল, শতকরা চল্লিশ দশমিক তিন দুই!
আমি তার কথা লুফে নিয়ে বললাম, এর থেকে কম সম্ভাবনায় থেকেও আমি অনেকবার বেঁচে এসেছি। ভেবে দেখ লুকাস।
লুকাস কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, বেশ কিম জুরান। আমি রাজি।
রবোট্রনের ক্ষুদ্র দলটি একটা হর্যোধ্বনি করে ওঠে। সবাই শান্ত হয়ে যাবার পর নীষা লুকাসকে লক্ষ্য করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, লুকাস তার আগেই তাকে বাধা দিয়ে বলল, না নীষা, তা সম্ভব নয়।
আমি কী বলতে চাইছি তুমি শুনবে তো আগে।
আমি জানি তুমি কী বলবে।
কী বলব?
তুমিও আমাদের সাথে যেতে চাইবে। কিন্তু তা হয় না নীষা, আমাদের দলের অন্তত একজন মানুষকে যে-কোনো অবস্থায় বেঁচে থাকতে হবে। আমি তোমাদের দু’ জনের জীবন নিয়েই ঝুঁকি নিতে পারি না। তুমি জান আজ সারাদিনে আমাদের উপর ক্রুগো কম্পিউটার যেসব আঘাত হেনেছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষেরা। এখন তোমরা দু জন ছাড়া আমাদের দলে আর কোনো মানুষ নেই।
নীষা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যায়। লুকাস অন্য সবার দিকে তাকিয়ে বলল, কারো কোনো প্রশ্ন আছে?
সু হাত তুলে বলল, আমরা যদি ব্যর্থ হই?
লুকাসের চোখ একবার ধক করে জ্বলে উঠল, সুয়ের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমরা ব্যর্থ হব না।
শহরতলিতে জুগো কম্পিউটারের যে বড় ভবনটি আছে, আমি লুকাসের দলের পনের জনের সাথে সেখানে অপেক্ষা করছি। ছোট ছোট গাড়িতে ভিন্ন ভিন্ন দলে সবাই এসে একত্র হয়েছে। গাড়িগুলো ছোট হলেও বিস্ময়কর। এগুলো স্বয়ংক্রিয় এবং পুরোটা শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বোঝাই। আপাতত সেগুলো নিরীহভাবে চারপাশে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জুগোর ভবনটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। উচু চওড়া দেয়াল, কাঁটাতারের বেষ্টনি, উচ্চচাপের বৈদ্যুতিক তার, সশস্ত্র প্রহরা সবকিছুই এখানে রয়েছে। এই ভবনে ঢোকার জন্য লুকাসের পরিকল্পনা খুব সহজ। একই সাথে ভবনটিকে চারদিক থেকে আক্রমণ করা হবে, ঠিক কোন পথে শত্রুরা আসবে বুঝতে দেয়া হবে না। তাদের বিভ্রান্ত করার জন্যে দ্বিতীয় পর্যায়ে মূল গেট দিয়ে দু’টি গাড়ি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে ভেতরে ঢুকে যাবে। গাড়ি দু’টিকে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে সমস্ত লক্ষ্যস্থলের কেন্দ্র হিসেবে ও করানো হবে। ঠিক এই সময় আক্রমণের তৃতীয় পর্যায় শুরু হবে। লুকাস তার দলবল নিয়ে দক্ষিণ দিকের দেয়াল উড়িয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাবে। ভেতরে খণ্ডযুদ্ধ হবে। যারা বেঁচে থাকবে তারা মূল ইলেকট্রনিক্স ভবনের সামনে এসে হাজির হবে। আমি থাকব সাথে, যখন ইলেন মূল ভবনের দরজা খুলে দেবে, ভেতরে ঢুকে যাব। তার পরের কাজ সহজ, বেছে বেছে প্রয়োজনীয় আই. সি.গুলো তুলে নেয়া, আমি আগেও একবার করেছি।
নির্দিষ্ট সময়ে আমরা পরিকল্পনামাফিক দূরে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ, সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ শুনতে পেলাম। কয়েক মুহূর্ত পরেই আমাদের নিরীহ গাড়িগুলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র থেকে গোলা ছুড়তে থাকে। ভবনটির নানা অংশ আমি বিস্ফোরণে উড়ে যেতে দেখলাম। লুকাস আর তার দলবল শান্তভাবে অপেক্ষা করতে থাকে, আমার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়, নিজেকে মাটির সাথে মিশিয়ে আমি শুয়ে থাকি, প্রত্যেকটা বিস্ফোরণের শব্দে আমি চমকে উঠছিলাম, মনে হচ্ছিল আমার কানের পর্দা যে-কোনো মুহূর্তে ফেটে যাবে। আমি দরদর করে ঘামছিলাম এবং প্রচণ্ড তৃষ্ণায় আমার বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছিল।
একসময় লুকাস হাত দিয়ে ইঙ্গিত করতেই দু’টি গাড়ি কোনো চালক ছাড়াই হঠাৎ বাইরের গেট দিয়ে ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে। প্রচণ্ড গোলাগুলি হতে থাকে, আমি লেজারের তীব্র আলো ঝলসে উঠতে দেখি। গাড়ি দু’টি থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বৃষ্টির মতো গোলাগুলি করতে থাকে, ক্রুগোর ভবনের প্রহরীরা গাড়ি দু’টিকে ঘিরে একটা ব্যুহ তৈরি করার জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠে।
সবকিছু পরিকল্পনামাফিক কাজ করছে, লুকাস চারদিকে ঘুরে একবার তাকিয়ে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করতেই পুরো দলটা উঠে দাঁড়ায়। আমার একা একা অপেক্ষা করার কথা, উঠে দৌড় দেবার প্রবল ইচ্ছাটাকে অনেক কষ্টে দমন করে আমি কান চেপে মাটিতে শুয়ে থাকি। একটু পরেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেলাম। খানিকক্ষণের জন্যে একটা আশ্চর্য নীরবতা নেমে আসে, তারপর হঠাৎ আবার গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। কতক্ষণ শুয়ে ছিলাম জানি না, আমার তখন সময়ের কোনো জ্ঞান নেই, মনে হচ্ছিল কয়েক যুগ পার হয়ে গেছে। এই সময়ে হঠাৎ দেখতে পাই সু গুড়ি মেরে এগিয়ে আসছে।
কাছে এসে চিৎকার করে বলল, কিম জুরান, চলুন যাই।
সবকিছু ঠিকমত চলছে?
মোটামুটি। দু জন মারা গেছে আমাদের।
অন্ধকারে বিস্ফোরণের আলোতে পথ দেখতে দেখতে সুয়ের হাত ধরে আমি এগোতে থাকি। আমাদের দু’পাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে যাচ্ছিল, এর কর্কশ শব্দে কানে তালা ধরে যাবার অবস্থা। সু গলা উচিয়ে বলল, ভয় পাবেন না, লুকাস আমাদের কভার করছে।
যদিও ভয়ে আমার হৃৎস্পন্দন থেমে যাবার অবস্থা, আমি সেটা স্বীকার করলাম না, চিৎকার করে বললাম, ভয়ের কী আছে, আমরা তো এসেই গেছি।
সত্যি সত্যি আমরা প্রায় পৌছে গেছি, সামনের দেয়ালে বড় ফুটো, ইতস্তত বৈদ্যুতিক তার ঝুলছে। আমার শরীরে বিশেষ বিদ্যুৎ অপরিবাহী পোশাক, কাজেই আমি ইতস্তত না করে ভেতরে ঢুকে গেলাম। ভেতরে আবছা অন্ধকার, ধুলোবালি উড়ছে। লুকাসের গলার স্বর শোনা গেল, কিম জুরান, ঠিক আছে সবকিছু?
হ্যাঁ।
চলুন যাই।
কে-একজন বলল, প্রহরীদের একটা দল আসছে সামনে দিয়ে। লুকাস কোমর থেকে খুলে কী-একটা ছুঁড়ে দেয়, প্রচণ্ড বিস্ফোরণে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায় সাথে সাথে।
আমার সাথে আসুন কিম জুরান। লুকাস আমার হাত ধরে টানতে টানতে বলে, ঐ যে সামনে গোর মূল ভবন, সি. পি. ইউ. ওখানেই আছে।
ধুলোবালির মাঝে কাশতে কাশতে আমি এগোচ্ছিলাম, হঠাৎ পুরো এলাকাটি তীব্র আলোতে ভরে গেল। তীক্ষ্ণ একটা কণ্ঠস্বর চিৎকার করে বলল, যে যেখানে আছ দু হাত তুলে দাঁড়াও, তোমাদের দিকে আমরা আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে আছি।
ক্রুগো! লুকাস দাঁতে দাঁত ঘষে বলে, ভাওতাবাজির আর জায়গা পাও না। বিদ্যুৎগতিতে সে তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তুলে নিয়ে আলোগুলো লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। দেখতে দেখতে আবার আবছা অন্ধকার নেমে আসে। লুকাস ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলল, ক্রুগো! তুমি আমাকে ধোঁকা দেবে?
তুমি কে?
লুকাস দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, তোমার বাবা।
একটা তীক্ষ্ণ হাসির শব্দ শোনা যায়! ও, তুমি সেই রবোট্রন দলপতি। দশ টেরা। চাঁইয়ের একটা রবোট হয়ে তুমি আমার সাথে যুদ্ধ করতে এসেছ? তোমার সাহসের প্রশংসা করতে হয়!
লুকাস ক্রুগোর কথায় ভূক্ষেপ না করে এলোপাতাড়ি গুলি করতে করতে এগিয়ে যায়। মূল ভবনের কাছাকাছি এসে সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। লুকাস চিৎকার করে বলল, যে-কোনো অবস্থাতে তোমরা সবাইকে আধঘন্টা আটকে রাখবে, এর ভেতরে দরজা খুলে যাবে।
দরজা খুলে যাবে? ক্রুগো ব্যঙ্গ করে বলে, তোমার হুকুমে? নাকি কোনো জাদুমন্ত্রে?
তোমার যেটা ইচ্ছা ভাবতে পার। তুমি জান এই দরজা খুলতে হলে কী করতে হয়? জানি। তোমার গোপন সংকেত জানতে হয়। তুমি সেটা জান? জানি।
ক্রুগো হঠাৎ অট্টহাস্য করে ওঠে। তুমি ভেবেছ যে-সংকেতটি তোমরা বের করেছ সেটা সত্যি? এত সহজে আমার সংকেত বের করা যায়?
কেন যাবে না, লুকাস হাসার চেষ্টা করে বলল, তুমি একটা নির্বোধ কম্পিউটার ছাড়া তো আর কিছু নও।
সত্যিই যদি তুমি আমার গোপন সংকেত জান তাহলে দরজা খুলছ না কেন?
যখন সময় হবে তখন ঠিকই খুলব।
আর ততক্ষণে হাজার হাজার ছত্রীসেনা এসে তোমাদের সবার কপোট্রন ধ্বংস করে দেবে। তুমি জান এই মুহূর্তে কয় হাজার ছত্রীসেনা পাশের প্রদেশ থেকে আনা হচ্ছে?
তুমি জান এই মুহূর্তে কতজন রবোট্রন তোমার মূল প্রোগ্রামকে পরিবর্তন করছে?
ক্রুগো আবার অট্টহাস্য করে ওঠে, সাথে সাথে কাছেই কোথায় প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। গুলির শব্দ একটু কমে আসতেই ক্রুগোর গলা শুনতে পেলাম, রবোট্রন, শুনতে পাচ্ছ তোমাদের ধ্বংস করার জন্য সেনাবাহিনী চলে এসেছে। তোমার বন্ধুরা কতক্ষণ তাদের আটকে রাখবে?
লুকাস ক্রুগোর কথায় কান না দিয়ে ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি সাবধানে ঘড়ির দিকে তাকালাম, যে-সময় দরজা খোলার কথা সেটা পার হয়ে যাচ্ছে। একটু দেরি হতে পারে, কিন্তু যদি বেশি দেরি হয়, তাহলে? আসলেই যদি গো কম্পিউটারের কথা সত্যি হয় আর আমাদের বের করা গোপন সংকেতটি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে কী হবে? চিন্তা করেই আমার বুক কেঁপে ওঠে, আমাদের সবাইকে তাহলে ইঁদুরের মতো মারা হবে?
লুকাস দরজার কাছে গিয়ে সেটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, কী দেখে সে-ই জানে। ক্রুগোর গলার স্বর আবার শুনতে পেলাম, বলল, দেখ রবোট্রন, আমি তোমাদের শেষবারের মত ক্ষমা করতে রাজি আছি। তোমরা দু’হাত তুলে এখান থেকে বের হয়ে পড়, তোমাদের তাহলে হত্যা করা হবে না।
লুকাস কোনো কথা না বলে পিঠ থেকে ভারি হ্যাভারসেক নামিয়ে বিস্ফোরক বের করতে থাকে, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী করছ লুকাস?
দরজা যদি না খোলে ভেঙে ফেলতে হবে।
পারবে ভাঙতে?
জানি না, চেষ্টা করতে ক্ষতি নেই। ডানদিকে মাঝামাঝি জায়গাটা দুর্বল, ঠিকভাবে বিস্ফোরকগুলো কাজে লাগালে একটা ছোট ফুটো হতে পারে। লুকাস খানিকক্ষণ কী-একটা ভাবে, তারপর জিজ্ঞেস করে, কী মনে হয় আপনার, ইলেনের দল কি খুলে দিতে পারবে দরজা?
আমার নিজের তখন সন্দেহ হতে শুরু করেছে, কিন্তু কেন জানি না দৃঢ়স্বরে বললাম, অবশ্যি পারবে। সময় হয়ে গেছে, যে-কোনো মুহূর্তে খুলে যাবে এখন।
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ ম্যাজিকের মতো ছোট একটা দরজা উপর দিকে উঠে যেতে থাকে।
লুকাস আনন্দে চিৎকার করে ওঠে, ছুটে যাচ্ছিল, আমি তাকে থামালাম, ভেতরে ঢোকার আগে তুমি তোমার শিল্ডিং পরে নাও।
তাই তো লুকাস থমকে দাঁড়িয়ে দরজাটার দিকে তাকায়, এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বলে, কিন্তু দরজা যদি বন্ধ হয়ে যায়, চলুন আগে ভেতরে ঢুকে পড়ি।
কিন্তু তোমার সার্কিট যদি জ্যাম করে দেয়?
আপনি তো আছেন, আপনি তো জানেন কী করতে হবে। চলুন আগে ঢুকে পড়ি।
আমি আর লুকাস ছোট দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম আর প্রায় সাথে সাথেই ছোট ভারি দরজাটা আবার নেমে আসে। দরজাটা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে ভেতরে একেবারে নীরব হয়ে আসে, এতক্ষণ প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে হঠাৎ করে এই নীরবতাটুকু খুব অস্বস্তিকর মনে হতে থাকে। আমি শুকনো গলায় বললাম, লুকাস, তোমার শিল্ডিংটা পরে নাও, সার্কিট জ্যাম করে দিলে মহা মুশকিল হয়ে যাবে।
ঠিকই বলেছেন। লুকাস তাড়াহুড়া করে পোশাকটা পরতে শুরু করে, অনেকটা মহাকাশযাত্রীদের মতো পোশাক, লুকাসের পরতে বেশ খানিকক্ষণ সময় নেয়।
ভেতরটা একটা গুহার মতো, কয়েক শ’ ফুট লম্বা। ভালো করে দেখা যায় না। এমনিতে কোনো আলো নেই, বিভিন্ন আই. সি. থেকে যে-আলো বের হচ্ছে তা দিয়েই কেমন একটা ভূতুড়ে ভাবের সৃষ্টি হয়েছে। আই. সি.গুলো প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি করে, সেগুলোকে ঠাণ্ডা করার জন্য ভেতরে বাতাস বইছে, সেই বাতাসও অনেক গরম। চারদিকে অসংখ্য আই. সি; আবছা আলোতে সেগুলো চকচক করছিল।
আমি লুকাসের পিছু পিছু হাঁটতে থাকি। সবকিছু ঠিকঠিক ঘটে থাকলে এই মুহূর্তে এখানকার কোনো কোনো আই. সি.র ভেতর দিয়ে ইলেনের দল তাদের তৈরি করা প্রোগ্রাম প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। আমার মনে পড়ল মহাকাশযানের কম্পিউটার আমাকে একবার ধোঁকা দিয়ে সেইসব আই. সি. তুলিয়ে এনেছিল।
লুকাস ম্যাপ দেখতে দেখতে হাঁটছিল, ভেতরে কোথায় কোন আই. সি. রয়েছে সেই ম্যাপে দেখানো আছে। একসময় সে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, কিম জুরান, আমরা এসে গেছি, আপনি বাম দিক থেকে শুরু করুন, আমি ডান দিক থেকে।
আমি পকেট থেকে স্কু ড্রাইভারটা বের করে সাবধানে আই. সি.গুলো টেনে তুলতে থাকি। ছোট ছোট কালো আই. সি., সাধারণ লজিক গেট দেখতে যেরকম হয়, মোটেও মূল্যবান প্রসেসরের মতো নয়, পিনের সংখ্যা কম, কোনো রেডিয়েটরও নেই। আমার একটু খটকা লাগে, ইতস্তত করে লুকাসকে ডাকলাম, লুকাস।
কি?
আমি লুকাসের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটি জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থেমে গেলাম। লুকাসের শিল্ডিংয়ের একটা অংশ নেই, মুহূর্তে পুরো ব্যাপারটি আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে আর লুকাস নয়, সে এখন ক্রুগো কম্পিউটার! লুকাসের সার্কিট জ্যাম করার বদলে ক্রুগো তাকে দখল করে নিয়েছে, আমাকে ভাঁওতা দিয়ে আবার সেই একইভাবে আমাদের সর্বনাশ করিয়ে নিচ্ছিল।
আমি উঠে দাঁড়াতেই লুকাস হঠাৎ করে তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি টেনে নেয়। আমার বুক কেঁপে ওঠে, কী করছে সে? শুকননা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে। তোমার?
লুকাস কোনো কথা না বলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি আমার দিকে তাক করে, আর আমি হঠাৎ করে বুঝতে পারি আমার সময় শেষ। এত চেষ্টা, এত কষ্ট—সবকিছু এখন শেষ হয়ে যাবে, ছোট একটি ভুলের জন্যে। লুকাসকে বাইরে রেখে আমি যদি শুধু একা ভেতরে ঢুকতাম।
মানুষ কখনো আশা ছেড়ে দেয় না, শেষ মুহূর্তে আমিও মরিয়া হয়ে ছুটতে শুরু করি, ভেতরে গুলির প্রচণ্ড কান-ফাটানো আওয়াজ হল, আমার ঘাড়ের কাছে কোথায় জানি তীব্র যন্ত্রণা করে ওঠে, নিশ্চয়ই গুলি লেগেছে। আমি পড়ে যেতে যেতে উঠে দাঁড়াই, এখনো মরি নি, একবার শেষ চেষ্টা করা যায় না?
একটু দূরে দেখা যাচ্ছে দুই হাজার পিনের প্রসেসর, উপরে সোনালি রেডিয়েটর, ঐগুলো নিশ্চয়ই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আই. সি. ওর একটা, তুলতে পারলে নিশ্চয়ই কিছু একটা হবে। আমি টলতে টলতে প্রসেসরগুলোর কাছে এসে দাঁড়াই—যে- কোনো মুহূর্তে একটা গুলি এসে আমাকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে আশঙ্কায় আমার সমস্ত স্নায়ু টানটান হয়ে থাকে, কিন্তু কোনো গুলি আমাকে শেষ করে দিল না। আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখি লুকাস আমার দিকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি তাক করে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে। কিন্তু গুলি করছে না। কেন?
হঠাৎ করে আমি বুঝতে পারি কেন সে গুলি করছে না, আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি সবচেয়ে জরুরি প্রসেসরগুলোর সামনে, আমাকে গুলি করলে এই প্রসেসরও ধ্বংস হয়ে যাবে, ক্রুগো সেটা করতে চায় না। হঠাৎ আমার শরীরে হাতির মতো বল এসে যায়, আমি পাগলের মতো পেছনের প্রসেসরের উপর ঝাপিয়ে পড়ি, হাতের স্ক্র ড্রাইভারটা দিয়ে আঘাত করতেই ঠুনকো প্রসেসরটি ঝনঝন করে ভেঙে যায়।
লুকাস হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল, প্রসেসরটি হারিয়ে নিশ্চয়ই ক্রুগো কম্পিউটার তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে! আমি পাগলের মতো পাশের প্রসেসরটিকে আঘাত করি, এটা অনেক শক্ত, আমার আঘাতে কিছু হল না। আমি আতঙ্কিত হয়ে দেখি লুকাস আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, টলতে টলতে আমার দিকে এগিয়ে এসে আবার তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি তুলে ধরেছে, আমি প্রাণপণে প্রসেসরটির নিচে স্ক্রু ড্রাইভার ঢুকিয়ে হ্যাচকা টানে সেটিকে তুলে ফেললাম, সাথে সাথে লুকাস আর্তচিৎকার করে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
আমার হঠাৎ করে ভীষণ দুর্বল লাগতে থাকে, ঘাড়ের কাছে কোথাও গুলি লেগেছে, রক্তে সারা পিঠ আর হাত চটচটে হয়ে গেছে, চেষ্টা করেও চোখ খোলা রাখতে পারছি না। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। আমি আরো একটা প্রসেসর তোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু হাতে আর জোর নেই, ভ্রু ড্রাইভারটা নিচে ঢোকানোর চেষ্টা করতেই মাথা ঘুরে ওঠে, কোনোমতে দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে নিই, আর ঠিক তক্ষুণি তাকিয়ে দেখি লুকাস আবার টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়েছে, তার হাতে এখনো সেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। এক পা এক পা করে সে আমার দিকে এগিয়ে আসে, দু’ হাত সামনে দাঁড়িয়ে সে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি তুলে ধরে, আমি তার চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম, অদ্ভুত পোশাকে মুখ ঢেকে আছে, তার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। আমি চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি। পর মুহূর্তে লুকাস ট্রিগার টেনে ধরে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের কানফাটানো কর্কশ শব্দের মাঝে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম আমি। কয়েক মুহূর্ত লাগল বুঝতে যে আমার গায়ে গুলি লাগে নি। চোখ খুলে তাকালাম আমি, সত্যি তাই, আমার গায়ে একটি গুলিও লাগে নি। কেন লাগবে? লুকাস আমাকে গুলি করে নি, গুলি করেছে আমার পেছনে সারি সারি প্রসেসরগুলোতে।
লুকাস আবার তার অস্ত্র তুলে নেয়, তারপর আবার পাগলের মতো গুলি করতে শুরু করে। প্রচণ্ড শব্দে কানে তালা লেগে যায়, ধোঁয়ায় ভরে যায় চারদিক। কয়েক মিনিট গুলির শব্দ ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই। প্রচণ্ড আক্রোশে সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে লুকাস। কখনো থামবে মনে হচ্ছিল না, কিন্তু গুলি শেষ হয়ে গেল। একসময়। ঠিক তখনই আমি ক্রুগোর আর্তচিৎকার শুনতে পাই। মরণাপন্ন মানুষের কান্নার মতো সেই ভয়াবহ চিৎকার বদ্ধ ঘরের দেয়াল থেকে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। আশ্চর্য একটা নীরবতা নেমে আসে হঠাৎ, কবরেও বুঝি কখনো এরকম নীরবতা নামে না।
লুকাস হাতের অস্ত্রটি ছুঁড়ে দিয়ে মাথার উপর গোলাকার ঢাকনাটি খুলে ফেলল। ঘুরে আমার দিকে তাকাল সে, তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে ছুটে এল দ্রুত। সাবধানে আমাকে সোজা করিয়ে বসিয়ে গুলির আঘাতটি পরীক্ষা করে, তারপর শার্ট ছিড়ে ভাঁজ করে আমার ক্ষতস্থানে চেপে ধরে রক্ত বন্ধ করার জন্যে। তার দিকে তাকাতেই সে।
কে জিজ্ঞেস করে, কে গুলি করেছে আপনাকে? আমি?
হ্যাঁ। কী মনে হয়, বেঁচে যাব এযাত্রা?
অন্য কেউ হলে সন্দেহ ছিল, কিন্তু আপনাকে মারবে কে? মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে আপনি রুকুন গ্রহপুঞ্জ ঘুরে এসেছেন—স্বয়ং বিধাতা আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি কি আপনাকে মারতে পারি? নাকি ক্রুগো পারবে?
লুকাস ঝুঁকে পড়ে আমার হাত চেপে ধরে বলল, কিম জুরান, পৃথিবীর মানুষ আর পৃথিবীর সব রবোট্রন যুগ যুগ আপনার কথা মনে রাখবে—কেন জানেন? কারণ—
কারণটা আমার শোনা হল না, লুকাসের হাতে মাথা রেখে আমি জ্ঞান হারালাম।
———–
পরিশিষ্ট
পরবর্তী ঘটনা সংক্ষিপ্ত। ক্রুগো কম্পিউটারকে অচল করে দেবার পরপরই আবার নূতন করে সর্বোচ্চ কাউন্সিল তৈরি করা হয়েছে। আগের সর্বোচ্চ কাউন্সিলের দশ জনকেই নাকি ক্রুগো কম্পিউটার মেরে ফেলেছিল। শাসনতন্ত্রে সাহায্য করার জন্যে নূতন একটা কম্পিউটার তৈরি করা হচ্ছে, কে তৈরি করেছে সেটা গোপন, কিন্তু বিশ্বস্তসূত্রে আমি খবর পেয়েছি লুকাস নাকি সেখানকার কর্তাব্যক্তিদের একজন। (আজকাল উচ্চ মহলে আমার অনেক পরিচিত বন্ধুবান্ধব, অনেক গোপন খবর পাই আমি। রবোট্রনদের আবার মানুষের সাথে পাশাপাশি থাকার সুযোগ দেয়া হয়েছে, তবে এক শর্তে, তারা আর কখনো মানুষের চেহারা নিতে পারবে না, তাদেরকে যন্ত্রের মতো দেখাতে হবে। ভিকির সেটা নিয়ে খুব মন-খারাপ, কিন্তু রবোট্রনদের কারো আপত্তি নেই। প্রাণ বাচানোর জন্যে তারা এটা করেছিল, এখন এটা একটা বাড়তি সমস্যার মতো। যেমন সুয়ের কথা ধরা যাক, সে যে-কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ায় সেখানকার সব পুরুষ ছাত্র নাকি তার প্রেমে পড়ে গেছে, সে রবোট্রন জেনেও। একজন নাকি আবার সুয়ের জন্যে ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল, পাগল আর কাকে বলে!
রুকুন গ্ৰহপুঞ্জে আবার নাকি একটা মহাকাশযান পাঠানো হবে, আমার কাছ থেকে সবকিছু শুনে বিজ্ঞানীদের সাহস অনেক বেড়ে গেছে, কয়েকজন বিজ্ঞানী নাকি স্বেচ্ছায় রাজি হয়েছেন যাবার জন্যে। তাঁরা কী—একটা যন্ত্র তৈরি করেছেন, সেখানে নাকি নিউট্রিনো ব্যবহার করে রুকুন গ্ৰহপুঞ্জের সাথে যোগাযোগ করা হবে। মহাকাশযানটি ফিরে আসতে আসতে আরো প্রায় এক বছর, কী হয় দেখার জন্যে আমি খুব কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করে আছি।
নীষা বাচ্চাদের একটা হাসপাতালে ডাক্তারের একটা ভালো চাকরি পেয়েছে। তার সাথে জীবন, মৃত্যু, ভালবাসা, বেঁচে থাকার সার্থকতা ইত্যাদি বড় বড় জিনিস নিয়ে প্রায়ই আমার সুদীর্ঘ আলাপ হত, ইদানীং ব্যক্তিগত জিনিস নিয়ে কথাবার্তা শুরু করেছি। তার নাকি বিয়ের কোনো পরিকল্পনা ছিল না, আমারও তাই। (আমাদের দু’জনের অনেক বিষয়ে মিল রয়েছে। তবে সারাদিন কাজকর্ম করে সন্ধ্যায় একা শূন্য বাসায় ফিরে আসতে নাকি তার খুব খারাপ লাগে। কথাটা মিথ্যে নয়, তাই অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দু’জনেই বিয়ে করব ঠিক করেছি। একজন আরেকজনকে, সেটাই সুবিধে, দু’জনের জন্যেই।
বিয়ের অনুষ্ঠান হবে খুবই অনাড়ম্বর। খুব ঘনিষ্ঠ ক’জন মানুষ আর রবোট্রন ছাড়া অন্য কেউ থাকবে না। শহরতলির অ্যাপার্টমেন্টের সেই বুড়োকে বিয়েতে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছিলাম। সাথে নীষা ছিল, বুড়ো তাকে চিমটি কেটে পরীক্ষা করে দেখল মানুষ কি না, এখনো তার রবোট্রনকে খুব ভয়। (তার চেক নাকি আবার আসতে শুরু করেছে।)
খুব বেশি যদি খুঁতখুঁতে না হই, তাহলে স্বীকার করতেই হবে যে বেঁচে থাকা ব্যাপারটা মোটামুটি খারাপ নয়।
(চলবে)
