তৃতীয় পর্ব

#ক্রুগো - মোহাম্মদ জাফর ইকবাল



নীষা

আমি চোখ খুলে তাকালাম। ধবধবে সাদা একটা ঘরে আমি শুয়ে আছি। এটা কি স্বপ্ন? আমি চোখ বন্ধ করে আবার খুলি, না, এটা স্বপ্ন না, সত্যি আমি সাদা একটা ঘরে শুয়ে আছি, আমার শরীর চাদর দিয়ে ঢাকা। ঘরে কোনো শব্দ নেই, খুব কান পেতে থাকলে মৃদু একটা গুঞ্জন শোনা যায়, আমার ডান দিক থেকে আসছে শব্দটা। কিসের শব্দ এটা? মাথা ঘুরিয়ে দেখতে চাইলাম আমি, সাথে সাথে কোথায় জানি অসহ্য যন্ত্রণা করে ওঠে। ছোট্ট একটা আর্তনাদ করে আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, চোখের সামনে হলদে আলো খেলা করতে থাকে, দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণাটাকে কমে আসতে দিয়ে আবার সাবধানে চোখ খুলি আমি। আমার উপর ঝুঁকে তাকিয়ে আছে একটি মেয়ে, কী সুন্দর মেয়েটি! আমাকে তাকাতে দেখে মেয়েটি মিষ্টি করে হাসে আর হঠাৎ আমি তাকে চিনতে পারি–নীষা।

হ্যাঁ, আমি নীষা। পৃথিবীতে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছি কিম জুরান!

আমি পৃথিবীতে। কী হয়েছিল আমার?

আপনি মহাকাশযানে করে ফিরে এসেছেন, ক্যাপসুলের ভেতরে আপনার তাপমাত্রা ছিল শূন্যের নিচে দুই শত বাহাত্তর দশমিক আট ডিগ্রী।

সত্যি?

হ্যাঁ।

কেমন করে হল?

জানি না। মেয়েটি মিষ্টি করে হাসে, কেউ জানে না। মহাকাশযানের যে কম্পিউটার ছিল সেটির মেমোরি পুরোটা কীভাবে জানি উধাও হয়ে গেছে। কেউএকজন যেন ঝেড়ে-পুছে নিয়ে গেছে।

লুকাস! আমার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, নিশ্চয়ই লুকাস!

মেয়েটি এবারে আমার উপরে আরো ঝুঁকে আসে, আমি তার শরীরের মিষ্টি গন্ধ পাই। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে বলল, আপনাকে কয়েকটা জিনিস বলে দিই, আর কখনো সুযোগ পাব না। আপনার জ্ঞান ফিরে আসছিল বলে আমি প্রাজমো কিটোগ্রাফটা চালু করেছি, এটা চালু থাকলে এই ঘরের শব্দ বাইরে যেতে পারে না, আমরা তাই নিরিবিলি কথা বলতে পারব। বেশিক্ষণ নয়, তাই এখনই বলে দিচ্ছি, খুব জরুরি কয়েকটা কথা।

কি?

এক নম্বর বিষয় হচ্ছে, আপনার নিজের নিরাপত্তা। আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, তার শাস্তি হিসেবে আপনি রুকুন গ্রহপুঞ্জ থেকে ঘুরে এসেছেন, আইনত এখন আপনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য। তাই আপনি মুক্তি পাবেন। কী অবস্থায় পাবেন সেটি হচ্ছে কথা। বেশিকিছু আশা করবেন না আগেই বলে রাখছি। নীষা একটু হাসার ভঙ্গি করল।

কর্তৃপক্ষের কাছে আপনি যা ইচ্ছা বলতে পারেন, কিছুই আসে যায় না। কারণ, আপনাকে কী করা হবে সেটি আপনি ফিরে আসামাত্রই ঠিক করা হয়ে গেছে।

কী করা হবে?

সময় হলেই জানবেন। নীষা আমার প্রশ্নটি এড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, আপনি কর্তৃপক্ষের কাছে যা ইচ্ছে বলতে পারেন, শুধুমাত্র দু’টি ব্যাপার ছাড়া। এক, মহাকাশযানে আপনার সাথে লুকাসের যোগাযোগ হয়েছিল। দুই, আমি লুকাসকে অনুরোধ করেছিলাম আপনাকে রক্ষা করতে। এটি জরুরি, আমার নিজের নিরাপত্তার জন্য।

আমাকে দিয়ে জোর করে কিছু বলানোর চেষ্টা করবে না?

আপাতত নয়। প্রথমে আপনাকে নিয়ে আবার একটা বিচারের প্রহসন হবে।

আবার?

হ্যাঁ। কিম জুরান, আমাদের নিরিবিলি কথা বলার সময় পার হয়ে যাচ্ছে, মনে রাখবেন আমি কী বললাম।

রাখব। একটু থেমে বললাম, নীষা।

কি?

তুমি আমাকে বাঁচালে কেন?

যে যান্ত্রিক গুঞ্জনটা এতক্ষণ আমাদের কথাবার্তাকে আড়াল করে রেখেছিল, সেটা হঠাৎ থেমে যায়। নীষা তাই কথা না বলে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে। আমার বুকের ভেতর নড়েচড়ে যায় হঠাৎ, একজন মানবী, কী আশ্চর্য একটা অভিজ্ঞতা।

নীষা চোখের সামনে থেকে সরে যায়, আমি তার গলার স্বর শুনতে পাই, কাকে যেন বলল, কিম জুরানের জ্ঞান ফিরে এসেছে।

সাথে সাথে কার যেন উত্তেজিত গলার স্বর শুনতে পেলাম, এসেছে?

হ্যাঁ।

কখন?

এইমাত্র।

আমি আসছি।

আসতে পারেন, কিন্তু এখন তার সাথে কথা বলতে পারবেন না।

কেন?

নীষা অসহিষ্ণু স্বরে বলল, এই মানুষটি এক বছরের মতো সময় একটা ছোট ক্যাপসুলে ঘুমিয়ে ছিলেন। যখন তাকে উদ্ধার করা হয়েছে তখন তাঁর তাপমাত্রা অ্যাবসলিউট শূন্যের কাছাকাছি, কতদিন থেকে কেউ জানে না। তাঁকে পুরোপুরি পরীক্ষা না করে আমি কারো সাথে কথা বলতে দেব না।

লোকটি বলল, তুমি নিশ্চয়ই জান, কিম জুরান মৃত্যুদণ্ডের আসামী?

আসামী ছিলেন। তাঁকে যে-শাস্তি দেয়া হয়েছিল তিনি সেটা ভোগ করে এসেছেন, এখন তিনি আর কোনোকিছুর আসামী নন।

সেটা বিচারকের সিদ্ধান্ত, তাঁরা ঠিক করবেন। আমি বিচারক নই, আমি জানি না।

আমিও বিচারক নই, কিন্তু আমি জানি।

লোকটি একটু থেমে বলল, তুমি দেখছি কিম জুরানের প্রাণ বাঁচাতে খুব ব্যস্ত!

হ্যাঁ, আমি ডাক্তার। আমি সারাজীবন মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করে এসেছি, আপনার কাছে খুব অস্বাভাবিক লাগতে পারে, কিন্তু এটাই আমার কাজ।

নীষা সুইচ টিপে কী-একটা বন্ধ করে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, আপনাকে একটা ইনজেকশান দিয়ে দিচ্ছি, আপনি একটু ঘুমান। হাতে সিরিঞ্জ নিয়ে নীষা ঝুঁকে পড়ে আমার দিকে তাকায়, তারপর হঠাৎ আলতোভাবে আমার কপালে ঠোট স্পর্শ করে। আহা, কতকাল পরে আমাকে একজন রক্তমাংসের মানুষ স্পর্শ করল।

আমার হঠাৎ একটা আশ্চর্য জিনিস মনে হল, নীষা কি মানুষ, নাকি একটা রবোট্রন?

আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না, হাতে সুচের স্পর্শ পেয়ে গাঢ় ঘুমে ঢলে পড়লাম মুহূর্তে।

আমি একটা হুইল চেয়ারে বসে আছি। চেষ্টা করলে আমি আস্তে আস্তে হাঁটতে পারি, কিন্তু তবুও এখন বেশিরভাগ সময়েই হুইল চেয়ারে চলাফেরা করছি। ধীরে ধীরে আমার হাতে-পায়ে বল ফিরে আসছে, দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আশ্চর্য শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। আমার পাশে বসে আছে নীষা, আশেপাশে আরো অনেক লোকজন, তাই আমার প্রতি তার আচার-আচরণ হিসেব করা। আমার ডাক্তার হিসেবে নীষা এই কমিশনে আসতে পেরেছে, স্বাভাবিক অবস্থায় তার এখানে থাকার কথা নয়। বড় ঘরের অন্য পাশে কালো টেবিলে চারজন লোক বসে আছে, অত্যন্ত উচ্চপদস্থ লোক এরা, দেখেই বোঝা যায়। অসুখী মানুষের মতো রাগী রাগী চেহারা। চুপচাপ বসে আছে, নিজেদের ভেতরেও কথা বলছে না। ডান পাশে একটা কালো টেবিলে বসে আছে বিজ্ঞানীরা, এদের দেখেও বোঝা যায় এরা বিজ্ঞানী। সবাই উশখুশ করছে, একজন আরেকজনের সাথে কথা বলছে, কাগজে কিছু লিখছে, চাপা স্বরে হাসছে। বসে থেকে থেকে আমি অধৈর্য হয়ে পাশে বসে থাকা নীষাকে বললাম, আর কতক্ষণ?

এই তো শুরু হল বলে।

অপেক্ষা করছি কী জন্যে?

ক্রুগো কম্পিউটারের জন্যে। প্রোগ্রাম লোড করছে। কোনটা লোড করে কে জানে, ম্যাগমা ফোর না করলেই হয়।

কেন, ম্যাগমা ফোর হলে কী হবে?

হবে না কিছুই, ম্যাগমা ফোর একটু কাঠখোট্টা ধরনের, রসবোধ কম।

আমি নীষার দিকে ঘুরে তাকালাম, এই পরিবেশেও সে একটি রসবোধসম্পন্ন কম্পিউটার প্রোগ্রাম আশা করছে!

আমি কি-একটা কথা বলতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তক্ষুণি ক্রুগো কম্পিউটারের গলার স্বর শোনা গেল। একঘেয়ে গলার স্বরে এই কমিশনের নিয়ম-কানুন, উপস্থিত সদস্যদের পরিচয় ইত্যাদি শেষ করে আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করে।

আপনি কি অস্বীকার করতে পারেন যে আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল?

না, আমি মাথা নেড়ে বললাম, দেয়া যেতে পারে কি না সেটা নিয়ে তর্ক করতে পারি, কিন্তু দেয়া হয়েছিল কী না জিজ্ঞেস করলে অস্বীকার করতে পারব না।

ক্রুগো কম্পিউটার এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, আপনাকে অনুরোধ করা হচ্ছে যে, আপনাকে ঠিক যা জিজ্ঞেস করা হবে তার উত্তর দেবেন। এই কমিশন অবান্তর আলোচনায় উৎসাহী নয়।

তোমার তাই ধারণা? যারা হাজির আছে জিজ্ঞেস করে দেখ তোমার কচকচি শুনতে কারো মাথাব্যথা আছে কী না।

ক্রুগো কম্পিউটার আমাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে বলল, আপনাকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে রুকুন গ্রহপূঞ্জে পাঠাননা হয়েছিল, সেখানে থেকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে এলেন কেমন করে?

তুমি না এত বড় কম্পিউটার, সারা পৃথিবীতে এত নামডাক, তুমিই বল। মহাকাশযানের কম্পিউটারকে জিজ্ঞেস করে দেখ, তার সব জানার কথা।

আপনাকে যা জিজ্ঞেস করা হয়েছে তার উত্তর দিন। আপনি সুস্থ অবস্থায় কীভাবে ফিরে এলেন?

আমি উচ্চস্বরে একবার হাসার মতো শব্দ করে বললাম, বলতে লজ্জা হচ্ছে নাকি যে তোমার এত সাধের কম্পিউটার পুরোপুরি ধসে গিয়েছিল? মহাকাশযানের কম্পিউটারের পুরো মেমোরি কিভাবে লোপাট হয়েছিল, কমিশনকে বোঝাও দেখি!

বিজ্ঞানীদের ভেতর খানিকটা উত্তেজনা দেখা গেল, কিন্তু গো কম্পিউটার প্রশ্ন করা শেষ করার আগে তাদের কথা বলার অধিকার নেই।

মহাকাশযানের কম্পিউটারের মেমমারি কীভাবে মুছে গিয়েছে আপনি কি জানেন?

আমাকে ঘুম পাড়িয়ে পাঠানো হয়েছিল, তুমি কি আশা কর আমি স্বপ্নে সব খবরাখবর পাব?

চারজন উচ্চপদস্থ লোকের একজনের কাছে একটা হাতুড়ি আছে খেয়াল করি নি, সে সেটা দিয়ে টেবিলে দু বার শব্দ করে রাগী গলায় বলল, আপনি যদি সহযোগিতা করেন এই কমিশন বন্ধ করে দেয়া হবে, সেটি আপনার ভবিষ্যতের জন্য আশাপ্রদ নাও হতে পারে।

আমাকে ভয় দেখাচ্ছে। নীষা আমাকে বলেছে আমি যা খুশি বলতে পারি, আমাকে কী করা হবে সেটা আগেই ঠিক করে রাখা হয়েছে, কাজেই আমার ভয় পাবার নূতন কিছু নেই। কিন্তু কমিশন বন্ধ করে দেয়া হোক সেটা আমার ইচ্ছে নয়, বিজ্ঞানীদের সাথে আমি একটু কথা বলতে চাই।

বললাম, বেশ, সহযোগিতা করব, কিন্তু অবান্তর প্রশ্ন করে লাভ নেই, উত্তর পাবেন না।

ক্রুগো কম্পিউটার এবারে সম্পূর্ণ অন্য জিনিস জিজ্ঞেস করতে শুরু করে, আপনার এত আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে এসেছে?

আমি থতমত খেয়ে বললাম, কিসের আত্মবিশ্বাস? আপনি জানেন আপনার আর কোনো ভয় নেই, সেটি কোথা থেকে এসেছে?

আমি আড়চোখে নীষার দিকে তাকালাম, সেও চোখ সুরু করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন আমি কী উত্তর দিই সেটি তার জানার খুবই প্রয়োজন।

আমি মুখ শক্ত করে বললাম, আমাকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি হিসেবে রুকুন গ্ৰহপুঞ্জে পাঠানো হয়েছিল, আমি সেখান থেকে ফিরে এসেছি, আমার শাস্তি ভোগ করেছি, এখন আমাকে তোমাদের মুক্তি দিতেই হবে। আমি এখন আর আসামী নই, আমি স্বাধীন মানুষ।

রুকুন গ্রহ থেকে আপনি সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছেন, এর আগে কেউ আসে নি। কাজেই যতক্ষণ আমরা জানতে না পারছি কীভাবে আপনি সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসেছেন, ততক্ষণ আপনাকে পৃথিবীর নিরাপত্তার খাতিরে অন্তরীণ করে রাখার প্রয়োজনীয়তা আছে।

আমি অনুভব করতে পারি ধীরে ধীরে আমার ভেতরে ক্রোধের জন্ম হচ্ছে। অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করে বললাম, কম্পিউটারকে যেদিন মিথ্যা কথা বলা শেখানো হয়েছে, সেদিনই এই পৃথিবীকে খরচের খাতায় লেখা হয়ে গেছে।

আপনি কী বলতে চাইছেন?

আমি বলতে চাইছি তুমি একটা মিথ্যাবাদী ভণ্ড প্রতারক।

আপনি কেন আমাকে মিথ্যাবাদী ভণ্ড এবং প্রতারক বলে দাবি করছেন?

কারণ আমাকে অন্তরীণ করে রাখার একটামাত্র কারণ, আমি যেন বাইরের পৃথিবীকে বলতে না পারি আমাকে কীভাবে প্রতারণা করে একটা মহাকাশযানে পাঠানো হয়েছিল–

হঠাৎ নীষা আমার হাত চেপে ধরে, আমি থামতেই সে ঘুরে অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, কিম জুরানের রক্তচাপ হঠাৎ করে বেড়ে গিয়েছে, তাঁর বর্তমান অবস্থায় এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমি আপাতত এই কমিশন বন্ধ করে দেয়ার অনুরোধ করছি।

ক্রুগো কম্পিউটার শান্ত গলায় বলল, কমিশন সমাপ্ত হয়েছে। আমার আর কিছু প্রশ্ন করার নেই, আমার যা জানার ছিল তা জেনে নিয়েছি।

একজন বিজ্ঞানী হাত তুলে বলল, আমাদের কিছু জিনিস জিজ্ঞেস করার ছিল।

নীষা মাথা নেড়ে বলল, আজ আর সম্ভব নয়।

হাতুড়ি হাতে উচ্চপদস্থ কর্মচারীটি বলল, তাহলে এখন কি কমিশনের সিদ্ধান্ত জানতে পারি?

হ্যাঁ। ক্রুগো কম্পিউটার একঘেয়ে গলায় বলল, কিম জুরানকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি হিসেবে রুকুন গ্ৰহপুঞ্জে পাঠানো হয়েছিল, তিনি সেই শাস্তি ভোগ করে এসেছেন, কাজেই তাঁকে মুক্তি দেয়া হল।

আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পরলাম না, আনন্দে চিৎকার করতে গিয়ে থেমে নীষার দিকে তাকালাম। নীষা গম্ভীর মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তার মুখে হাসি নেই। জিজ্ঞেস করলাম, কী হল?

পুরোটা শুনুন আগে।

ক্রুগো কম্পিউটার আবার শুরু করে, কিম জুরান এই কমিশনে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি এই মহাকাশ অভিযানের অনেক তথ্য জানেন, যা আমাদের সাথে আলোচনা করতে অনিচ্ছুক। তাঁর অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাসের প্রধান কারণ সম্ভবত কোনো-এক ষড়যন্ত্রী দলের সাথে যোগাযোগ। আপাতত সেই ষড়যন্ত্ৰী দলকে আমি রবোট্রনের কোনো-এক দল হিসেবে সন্দেহ করছি। এইসব কারণে আমাদের কিম জুরানের পুরো স্মৃতিটুকু জানা প্রয়োজন। আমি তাঁর মস্তিষ্ক স্ক্যানিং করে পুরো স্মৃতিটুকু সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম।

স্ক্যানিং? আমার মাথা ঘুরে ওঠে, কী বলছে ক্রুগো কম্পিউটার। মস্তিষ্ক স্ক্যানিং করবে মানে?

কিম জুরানের মস্তিস্ক স্ক্যানিং করার উদ্দেশ্য দু’টি। এক, তাঁর স্মৃতি থেকে আমরা যাবতীয় গোপন জিনিস জানতে পারব। বিজ্ঞানীরা রুকুন গ্রহপুঞ্জ সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাবেন। দুই, তাঁর নিজের স্মৃতি পুরোপুরি অপসারণ করা হবে বলে তাঁর জীবনের দুঃখজনক ইতিহাসকে পুরোপুরি ভুলে গিয়ে নূতন জীবন শুরু করতে পারবেন।

আমি অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করে রেখেছিলাম, আর পারলাম না, একেবারে বোমার মতো ফেটে পড়লাম, এর চেয়ে আমাকে মেরে ফেল না কেন? আমার পুরো স্মৃতি যদি ধ্বংস করে দাও, তাহলে আমার আর এই চেয়ারটার মাঝে পার্থক্য কী? আমাকে মুক্তি দিয়ে তাহলে কি লাভ? আমি কি শুধু হাত-পা আর শরীর?

আপনি অযথা উত্তেজিত হচ্ছেন কিম জুরান, ক্রুগো কম্পিউটার শান্ত স্বরে বলল, আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না। সমাজের ভালমন্দের প্রতি আমাদের একটা দায়িত্ব আছে।

আমি রাগে আত্মহারা হয়ে বললাম, চুপ কর বেটা বদমাইশ। জোচ্চোর কোথাকার–

নীষা আমার উপর ঝুঁকে পড়ে, আমি আমার হাতে সিরিঞ্জের একটা খোঁচা অনুভব করলাম, সাথে সাথে হঠাৎ চোখের উপর অন্ধকার নেমে আসে। জ্ঞান হারানোর পূর্বমুহূর্তে নীষার চোখের দিকে তাকালাম, শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ দুটিতে আতঙ্ক নয়, কৌতুক।

দ্বিতীয় জীবন

জ্ঞান হবার পর আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটা উচু আসনের উপর। আমি শুয়ে আছি এবং আমাকে ঘিরে অনেক ক’জন সাদা পোশাকের ডাক্তার ব্যস্ত হয়ে ঘোরাফেরা করছে। আমি নীষাকেও একপাশে দেখলাম, জটিল একটা যন্ত্রের সামনে গম্ভীর মুখে বসে আছে, আমার চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তের জন্যে তার মুখে একটু হাসি ফুটে ওঠে। আমি মাথা ঘুরিয়ে অন্য পাশে তাকানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম আমার মাথায় অসংখ্য মনিটর লাগানো। কয়েকটা সম্ভবত কপালের চামড়া ফুটো করে ঢোকানো হয়েছে, বেশ জ্বালা করছে সেগুলো।

আমি দীর্ঘ সময় চুপচাপ শুয়ে রইলাম, কেউ আমার সাথে কোনো কথা বলছে, আমি নিজেও কোনো কথা বলার চেষ্টা করলাম না। আমি এরকম অবস্থায় চুপচাপ শুয়ে থাকার পাত্র নই, কিন্তু কোনো-একটা কারণে আমি এখন কোনোকিছুতেই উৎসাহ পাচ্ছিলাম না। সম্ভবত আমাকে কোনো ওষুধ দিয়ে এরকম নির্জীব করে রাখা হয়েছে। আমি শুয়ে শুয়ে মস্তিষ্ক স্ক্যানিং-এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। ব্যাপারটি সহজ নয়, ঠিক কীভাবে করা হয় আমার জানা নেই। মস্তিষ্কের নিউরোন সেল থেকে স্মৃতিকে সরিয়ে ম্যাগনেটিক ডিস্কে ডিজিটাল সিগনাল হিসেবে জমা করা হয়। পদ্ধতিটা সুচারুভাবে করার জন্যে যে পদ্ধতিটা ব্যবহার করা হয় সেটি মস্তিষ্কের স্মৃতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। কিছুক্ষণের মাঝেই আমার সমস্ত স্মৃতি ধ্বংস হয়ে যাবে চিন্তা করে যতটুকু দুঃখ পাওয়া উচিত, কোনো কারণে আমার ঠিক সেরকম দুঃখ হচ্ছিল না। সেটি ওষুধের প্রভাবে, না, নীষার উপর আমার প্রবল বিশ্বাসের জন্য আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।

মস্তিষ্ক স্ক্যানিং-এর ব্যাপারটা শুরু হওয়ার আগে আমি বুঝতে পারি, হঠাৎ করে কথা শোনা যেতে লাগল। আশ্চর্য ব্যাপার যে কথাগুলো কোনো শব্দ থেকে আসছিল না, সরাসরি আমার মস্তিষ্কে উচ্চারিত হচ্ছিল। অনেকটা চিন্তা করার মতো, কিন্তু অনুভূতিটা চিন্তা করার মতো মৃদু নয়, অনেক প্রবল।

হঠাৎ করে কেউ-একজন যান্ত্রিক স্বরে আমাকে উদ্দেশ করে কথা বলে ওঠে। কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তবু আমাকে কিছু-একটা বলা হচ্ছে; অনুভূতিটা আশ্চর্য, আমার অকারণেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে! আমাকে বলা হল, কিম জুরান, আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যানিং শুরু হচ্ছে। পদ্ধতিটা যন্ত্রণাবিহীন কিন্তু একটু সময়সাপেক্ষ। পুরোপুরি শেষ হতে প্রায় দুই ঘন্টা সময় নেবে। মস্তিষ্ক স্ক্যানিং শেষ হওয়ার পর আপনি একজন নুতন মানুষে পরিণত হবেন। আপনাকে একটি নতুন পরিচয় দেয়া হবে, আপনার মধ্যে একটি নতুন ব্যক্তিত্বের জন্ম হবে। এখন চোখ বন্ধ করে আপনি আপনার সমস্ত অনুভূতি শিথিল করে শুয়ে থাকুন। ধন্যবাদ।

আমি অসহায়ভাবে শরীর শিথিল করে শুয়ে থাকি। কতক্ষণ কেটেছে জানি না, হঠাৎ আমি চমকে উঠি, আমার শৈশবের একটা স্মৃতি ভেসে আসছে, আমার মা, যাঁর চেহারা আমি ভুলে গিয়েছিলাম, তাঁকে আমি দেখতে পাই। তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন, আমি তাঁর কোলে। বাইরে ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি হচ্ছে, আমার মা আশ্চর্য একটা বিষণ্ণ সুরে গান গাইছেন আমাকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে। হঠাৎ করে আমার মা, বৃষ্টির শব্দ, গানের সুর—সবকিছু মিলিয়ে গেল, কিছুক্ষণ আমার স্মৃতিতে কিছু নেই। খানিকক্ষণ পর সেখানে নূতন একটা দৃশ্য ফুটে ওঠে। আমি দেখতে পেলাম সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে আমি ছোট ছোট পা ফেলে ছুটে যাচ্ছি। আমার হাতে একটা লাল রুমাল, আমি চিৎকার করে বলছি, লাল ঘোড়া ঠকাঠক, লাল ঘোড়া ঠকাঠক, লাল ঘোড়া ঠকাঠক—দেখতে দেখতে এই পুরো দৃশ্যটাও অদৃশ্য হয়ে গেল।

কতক্ষণ এভাবে কেটেছে জানি না, এক মিনিটও হতে পারে, আবার এক ঘন্টাও হতে পারে। আমি আচ্ছন্নের মতো শুয়ে শুয়ে আমার শৈশবের ভুলে যাওয়া দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে এক ধরনের ব্যথা অনুভব করতে থাকি। দৃশ্যগুলো একবার মিলিয়ে যাবার পর আর কিছুতেই সেগুলো মনে করতে পারছিলাম না, আমার মস্তিষ্ক থেকে সরে গিয়ে সেগুলো কোন–একটি ম্যাগনেটিক ডিস্কে স্থান নিয়েছে। ব্যাপারটি চিন্তা করে আমার কেমন জানি দুঃখবোধ জেগে ওঠে। ঠিক তখনই একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল, আমার মস্তিষ্কের ভেতর নীযা কথা বলে উঠল। কোনো শব্দ হল না, কিন্তু আমি শুনতে পেলাম নীষা বলল, কিম জুরান, আপনি যেভাবে শুয়ে আছেন ঠিক সেভাবে শুয়ে থাকুন, মুখের মাংসপেশী পর্যন্ত নাড়াবেন না, কেউ যেন বুঝতে না পারে আপনি আমার কথা শুনছেন। আপনার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে, সেটাকে স্বাভাবিক করতে হবে, এ ছাড়া ডাক্তারদের সন্দেহ হতে পারে।

আমি প্রাণপণ চেষ্টা করে নিজের উত্তেজনাকে দমিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে থাকি। নীষা খানিকক্ষণ সময় দিয়ে আবার কথা বলতে শুরু করে, বুঝতেই পারছেন আমি আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যানিং বন্ধ করে দিয়েছি, কাজটি খুব গোপনে করতে হয়েছে। ভয়ংকর বিপজ্জনক কাজ এটি, ধরা পড়লে আমার এবং আপনার দু’জনেরই আবার রুকুন গ্ৰহপুঞ্জে যেতে হতে পারে! যাই হোক আমি দুঃখিত, ঠিক সময়মতো বন্ধ করতে পারলাম না, নিরাপত্তার যেসব নৃতন ব্যবস্থা করা হয়েছে সেগুলোর জন্য একটু দেরি হল। আপনার শৈশবের কিছু স্মৃতি হারিয়েছেন আপনি, আমি সেজন্যে দুঃখিত। এখন আপনাকে অভিনয় করতে হবে। প্রথম অংশটুকু সোজা, পরবর্তী এক ঘন্টা চুপচাপ শুয়ে থাকবেন চোখ বন্ধ করে। এর পরের অংশটুকু কঠিন, আপনাকে দেখাতে হবে যে আপনার কোনো স্মৃতি নেই। জিনিসটা সহজ নয়, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এরকম অবস্থায় একেকজন মানুষ একেক রকমভাবে ব্যবহার করে। কাজেই আপনার নিজের ইচ্ছেমতো কোনো-একটা কিছু করার স্বাধীনতা আছে। চেষ্টা করবেন একটা উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি দিয়ে তাকাতে, অল্পতেই চমকে উঠবেন এবং খুব সহজে ভয় পেয়ে যাবেন। কোনো অবস্থাতেই দু’টি জিনিস করবেন না, একটি হচ্ছে কথা বলা, আরেকটি হচ্ছে কারো কথা শুনে বুঝতে পারা! একটিমাত্র জিনিস আপনি উপভোগ করতে পারেন, সেটা হচ্ছে সংগীত।

নীষা হঠাৎ গলা নামিয়ে বলল, আমি এখন আর কথা বলতে পারব না, এখন সবকিছু আপনার উপর নির্ভর করছে।

হঠাৎ করে সবকিছু নীরব হয়ে যায়। আমি চুপচাপ শুয়ে থাকি। চোখ বন্ধ করে এক ঘন্টা শুয়ে থাকা সহজ ব্যাপার নয়, আমার মনে হল প্রায় এক যুগ থেকে শুয়ে আছি! একসময় এদিকে-সেদিকে কয়েকটা বাতি জ্বলে ওঠে। এতক্ষণ যে মৃদু গুঞ্জন হচ্ছিল সেটা থেমে যায় এবং কয়েকজন ডাক্তার নিঃশব্দে আমাকে ঘিরে দাঁড়ায়। আমি চোখ খুলে তাকাতেই ডাক্তারেরা সহৃদয়ভাবে হাসার চেষ্টা করল। আমি ভয় পেয়ে যাবার একটা ভঙ্গি করলাম। নিশ্চয়ই অতি অভিনয় হয়ে গিয়েছিল, কারণ ডাক্তারেরা ছিটকে পেছনে সরে এসে খানিকক্ষণ ফিসফিস করে নিজেদের ভেতর কথা বলে বাতিগুলো নিভিয়ে একটা কোমল সংগীত বাজানোর ব্যবস্থা করে চলে গেল।

আমি একা একা আবছা অন্ধকারে শুয়ে থাকি। গোপন কোনো জায়গা থেকে আমাকে লক্ষ করা হচ্ছে কী না আমি জানি না, তাই আমি অস্বাভাবিক কিছু করার সাহস পেলাম না, এক ভঙ্গিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইলাম। কতক্ষণ শুয়ে ছিলাম জানি না, একসময় হঠাৎ নীষার গলার আওয়াজ পেলাম, কিম জুরান।

আমি ঘুরে তাকাই, নীষা কখন নিঃশব্দে আমার মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে একটা সাদা পোশাক, আমার হাতে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, এটা পরে নিন।

আমি পোশাকের ভাঁজ খুলতে খুলতে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, এখন কী হবে?

আপনার দুই মিনিট সময় আছে এখান থেকে পালাবার।

দুই মিনিট? আমি থতমত খেয়ে বললাম, কীভাবে পালাব আমি? কিছুই তো চিনি না।

বলছি, মন দিয়ে শুনুন। প্রথমে সোজা হেঁটে যাবেন করিডোর ধরে, শান্তভাবে, কোনোরকম উত্তেজনা দেখাবেন না। কারো সাথে দেখা হলে কিংবা কেউ কোনো কথা বলতে চাইলে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করবেন। করিভোরের শেষ মাথায় দরজাটা খোলামাত্র জরুরি বিপদ সংকেত জানিয়ে সব ক’টা দরজা নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাবার কথা। আমি ব্যবস্থা করেছি যেন কয়েকটা খোলা থাকে, কোনো জটিল কিছু নয়, দরজার ফাঁকে ফাঁকে একটা করে দিয়াশলাইয়ের কাঠি রেখে এসেছি। যাই হোক, ঠিক ঠিক। দরজাগুলো দিয়ে বিল্ডিংয়ের বাইরে এসে বাম দিকে দৌড়াবেন। হাঁটা নয়, দৌড়। আমি জানি আপনার যে অবস্থা তাতে দৌড়ানো খুব সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু তবু বলছি দৌড়াবেন। যদি এক সেকেন্ড সময়ও বাঁচাতে পারেন আপনার পালানোর সম্ভাবনা দশ গুণ বেড়ে যাবে। আর সবচেয়ে যেটা ভয়ের কথা সেটা হচ্ছে, যদি দেরি হয়ে যায় তাহলে কন্ট্রোল টাওয়ারে গার্ডেরা পৌছে যাবে, সেখান থেকে গুলি করার চেষ্টা করতে পারে। যাই হোক, দেয়াল ঘেঁষে থাকবেন, শেষ মাথায় একটা গাড়ি থাকবে, হেড লাইট নিভিয়ে, কিন্তু দরজা খোলা রেখে, লাফিয়ে উঠে পড়বেন গাড়িতে, তাহলেই আপনার দায়িত্ব শেষ।

আমি সাদা পোশাকটার বোতাম লাগাতে লাগাতে বললাম, দরজাগুলো কোথায় বলে দাও।

শুনুন মন দিয়ে, একটা ভুল দরজা খোলার চেষ্টা করলে অন্তত দশ সেকেন্ড সময় নষ্ট, কাজেই সাবধান।

কিছুক্ষণের মাঝেই নীষা আমাকে রওনা করিয়ে দিল। পরবর্তী দুই মিনিট সময়কে আমি আমার জীবনের দীর্ঘতম সময় বলে বিবেচনা করব। কর্কশ অ্যালার্মের শব্দের মাঝে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ঠিক ঠিক দরজাগুলো খুলে খুলে যাওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়, বিশেষ করে আমি যখন উত্তেজনার মাঝে কিছুতেই মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারি না। শেষ অংশটুকু, যেখানে আমার দেয়ালের পাশ দিয়ে দৌঁড়ে যাবার কথা, সেখানে আমি কিছুতেই দৌড়াতে পারছিলাম না। পায়ের মাংসপেশীর তখনো দৌড়ানোর মতো ক্ষমতা হয় নি। এই সময়ে বারকয়েক হাততালির মতো শব্দ শোনা গেল, পরে বুঝেছিলাম সেগুলো শক্তিশালী রাইফেলের গুলি।

দেয়ালের শেষ মাথায় সত্যি সত্যি একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, হেড লাইট নেভানো কিন্তু দরজা খোলা, ইঞ্জিন ধকধক করে শব্দ করছে। আমি লাফিয়ে ওঠামাত্র দরজা বন্ধ হয়ে গেল এবং মুহূর্তে সেটি ঘুরে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে যেতে শুরু করে।

ড্রাইভার-সীটে যে বসে আছে তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, কমবয়স্ক একজন। তরুণ, স্টিয়ারিংয়ের উপর ঝুঁকে পড়ে রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, আপনার নূতন জীবন শুরু হল কিম জুরান।

লুকাস!

লুকাস হাসিমুখে আমার দিকে ঘুরে বলল, বাম হাতে গুলি লেগেছে, শক্ত করে চেপে ধরে রাখুন।

গুলি? কার? বলে আমি তাকিয়ে দেখি সত্যি আমার বাম হাত চুইয়ে রক্ত পড়ছে, তাড়াতাড়ি ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে ভয়ার্ত গলায় বললাম, সর্বনাশ! কখন গুলি লাগল?

মাঝামাঝি যখন ছিলেন। কিছু হয় নি, ভয় পাবেন না। উত্তেজনার মাঝে টের পান নি, চামড়া ছড়ে গেছে একটু, আমি দেখেছি। লুকাস আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, আপনার কোনো ভয় নেই। যে-মানুষ রুকুন গহপুঞ্জে গিয়ে ঠিক ঠিক ফিরে আসতে পারে, তাকে স্বয়ং বিধাতা নিজের হাতে রক্ষা করবে।

বাঁচিয়েছিলে তো তুমি। আমি একটা রুমাল দিয়ে হাত বাঁধতে বাঁধতে বললাম, ধন্যবাদ দেবার সুযোগ হয় নি।

আমি বাঁচিয়েছিলাম! কী আশ্চর্য!

কেন? এতে আশ্চর্যের কী আছে!

আমি জানি না, তাই অবাক লাগছে!

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি জান না মানে?

আমার স্মৃতির একটা অংশ পাঠানো হয়েছিল, সে কখনো ফিরে আসে নি।

রে আসে নি?

না, মহাকাশযানের মূল কম্পিউটারকে ধ্বংস করার সময় নিজেও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আপনাকে একদিন বলতে হবে কী হয়েছিল।

আমি কী-একটা বলতে যাচ্ছিলাম, লুকাস হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিয়ে, একটা চৌকা মতন বাক্সে নিচু স্বরে কার সাথে জানি কী-একটা কথা বলে, তারপর একটা সুইচ টিপে দিতেই প্রচণ্ড একটা বিস্ফোরণের আওয়াজ পেলাম। খুব কাছেই আগুনের একটা গোলা সশব্দে উপরে উঠে ফেটে যায়, তার মাঝে দিয়ে লুকাস গাড়িটাকে বের করে এনে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, হা, কী জানি বলছিলেন?

আমি শুকনো গলায় বললাম, কিসের বিস্ফোরণ ওটা?

একটা গাড়ি ধ্বংস হয়ে গেল।

কার গাড়ি?

লুকাস মুখ টিপে হাসতে হাসতে বলল, এখন বলব না, কাল ভোরে খবরের কাগজে দেখবেন।

আমি কিছু না বুঝে খানিকক্ষণ লুকাসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। লুকাস সহজ স্বরে বলল, বেল্ট দিয়ে শক্ত করে বাঁধা আছেন তো?

আছি।

বেশ! একটু সতর্ক থাকবেন কথা বলতে বলতে লুকাস হঠাৎ মাঝপথে গাড়িটা ঘুরিয়ে নেয়, আমি প্রায় ছিটকে উড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, তার মাঝে হঠাৎ দেখি গাড়িটা মাথা উপরে তুলে মাটি থেকে দশ-বার ফুট উপর দিয়ে উড়তে শুরু করেছে।

বাই ভার্বাল! আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, বাই ভার্বাল গাড়ি বেআইনি না?

আমরা নিজেরাই তো বেআইনি, লুকাস গাড়িটাকে উড়িয়ে নিতে নিতে বলল, আমাদের গাড়ি বেআইনি না হলে কি মানায়?

আমি নিচে তাকিয়ে দেখি গাড়িটা রাস্তা ছেড়ে মাঠ-ঘাট-বন-বাদাড় পার হয়ে কিছুক্ষণের মাঝেই আবার লোকালয়ে ফিরে আসে। নির্জন একটা রাস্তাতে গাড়িটা আবার নিচে নামিয়ে লুকাস যেন একজন ভদ্রলোকের মতো গাড়ি চালিয়ে একটা পুরান বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়াল।

গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে লুকাস বলল, আপনি একটু দাঁড়ান, অনেক কিছু ঘটেছে আজ, গাড়ির লগটা দেখে আসি, সবকিছু ঠিকঠিক করে হয়েছে কী না। পেছনে পুলিস লেগে থাকলে বিপদ হতে পারে। গাড়ির কম্পিউটারে কী-একটা দেখে সে ভারি খুশি হয়ে উঠে বলল, চমৎকার। একেবারে পেশাদারের কাজ!

বিল্ডিংটা বাইরে থেকে পুরান মনে হলেও ভেতরে একেবারে অন্যরকম। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আমাদের দিকে একজন এগিয়ে আসে। দেখেই বোঝা যায় সে একজন রবোট্রন। শুধু যে কপালের উপর কয়েকটা স্কু রয়েছে তাই নয়, কানের নিচে থেকে কয়েকটা তারও বের হয়ে আছে। লুকাসকে মানুষের মতো দেখানোর জন্যে যেটুক পরিশ্রম করা হয়েছে, এর জন্যে তা করা হয় নি। লুকাস এই রবোটটির দিকে তাকিয়ে কী-একটা বলল, শুনে রবোটটি মাথা নেড়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসে।

লুকাস আমাকে বলল, আপনি ভিকির সাথে যান। ও আপনার দেখাশোনা করবে।

তুমি?

আমি একটু কন্ট্রোলরুমে যাই। নীষার কোনো সাহায্য লাগবে কি না দেখি।

নীষা? ওর কি কোনো বিপদ হতে পারে?

হতে তো পারেই, যেসব কাজকর্ম করে, বিপদ হওয়া আর বিচিত্র কি! কিন্তু হবে না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন।

আমি যেতে যেতে আবার ঘুরে দাঁড়ালাম, নীষা কি রবোট্রন?

লুকাস আমার চোখের দিকে তাকাল, আমি মহাকাশযানে ওকে এই প্রশ্নটি করেছিলাম, ও জানে না। ওর দৃষ্টির সামনে আমি কেন জানি লজ্জা পেয়ে যাই। লুকাস সেটা গ্রাহ্য না করে বলল, নীষা রবোর্টুন হলে আপনার মন-খারাপ হয়ে যাবে?

মন-খারাপ হবে কেন?

হবে হবে, আমি জানি হবে। লুকাস চোখ নাচিয়ে বলল, আমি বলব না, দেখি আপনি বের করতে পারেন কিনা।

আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললাম, আগেও সে একই উত্তর দিয়েছিল।

ভিকি নামের রবোটটি আমাকে পেছন থেকে ঠেলে দিয়ে কাঠ কাঠ স্বরে বলল, চলুন, আপনার রক্তপাত বন্ধ করা দরকার।

লুকাস ভিকিকে একটা ধমক দিয়ে বলল, তোমাকে কতবার বলেছি কনুইয়ের কাছে শর্ট সার্কিটটা সেরে ফেল, যখনই দেয়ালের কাছে আসছ কেমন স্পার্ক বের হচ্ছে দেখেছ?

ভিকি সরল মুখে বলল, কী আছে, মাত্র তো আঠার হাজার ভোল্ট।

আঠার হাজার ভোল্ট তোমার কাছে মাত্র হতে পারে, কিন্তু কিম জুরানের জন্যে মাত্র নয়। ইনি একজন মানুষ, তোমার মতন রবোট নয়। তোমার থেকে একটা স্পার্ক খেলে কিম জুরানকে আর দেখতে হবে না!

ও, আচ্ছা। ভিকিকে খুব বেশি বিচলিত মনে হল না, আমাকে আবার পেছন থেকে ঠেলে দিয়ে বলল, চলুন, আপনার রক্তপাত বন্ধ করা দরকার।

আমি তার সাথে পাশের একটা ঘরে হাজির হলাম। সাদা একটা বিছানায় আমাকে শুইয়ে দিয়ে সে আমার উপর ঝুঁকে পড়ে। তার বিপজ্জনক কনুই থেকে যতদূর সম্ভব নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে আমি আলাপ জমানোর চেষ্টা করি, অনেকদিন থেকে আছ বুঝি?

তা বলতে পারেন, আপনাদের হিসেবে তো অনেক দিনই।

কত দিন?

এক শ’ তিরিশ বছর। কপোট্রনের এনালাইজিং ইউনিটটা অবশ্যি নতুন, গত বছর ঢোকানো হয়েছে। কিন্তু পুরান জিনিস গছিয়ে দিয়েছে।

কানের কাছে ঐ তারগুলো কিসের?

ভিকি বিরক্ত হয়ে বলল, আর বলবেন না, লুকাসের কাণ্ড। মাঝে মাঝে দাবা খেলার জন্য আমার ভেতরে গ্রান্ড মাস্টারের মেমোরি লোড করে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে করতে নাকি দেরি হয়, তাই এই তারগুলো বের করে রেখেছে, সোজা প্লগ ইন করে দেয়।

ও, আচ্ছা। আমি একটু সমবেদনা প্রকাশ না করে পারলাম না, একটু ঢেকেঢুকে রাখলেই পার।

আর ঢেকেঢুকে কী হবে? কতদিন থেকে বলছি আমার বাইরের চেহারাটা ঠিক করে দাও, দিচ্ছি দিচ্ছি করে কত দেরি করল দেখেছেন? লুকাসের মতো আলসে মানুষ আছে নাকি?

ব্যস্ত মানুষ, আমি লুকাসের পক্ষ টেনে কথা বলার চেষ্টা করি, কত কিছু করতে হয়।

ভিকি বাম হাতটা যত্ন করে ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতে বলল, আপনাকে বেশ শ্রদ্ধা-ভক্তি করে বলে মনে হল, বলে দেখবেন তো আমার চেহারাটা ঠিক করে দিতে।

বলব।

হ্যাঁ, বলবেন। কতদিন ঘরের বাইরে যেতে পারি না এই চেহারার জন্যে। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ভিকি বলল, লুকাস ছেলেটা আসলে খারাপ নয়, তবে ভারি ফাঁকিবাজ।

আমি একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি নীষাকে চেন?

হ্যাঁ, চিনি।

ও কি মানুষ, নাকি রবোট্রন?

ভিকির চেহারাতে অনুভূতির কোনো ছাপ পড়ে না, তাই ঠিক বুঝতে পারলাম না ও কী ভাবছে। খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, জানি না। দেখে মনে হয় মানুষ। কিন্তু নূতন রবোটন গুলোর সাথে মানুষের কোনো পার্থক্য বোঝা যায় না। নীষা কথাও বলে চমৎকার, রবোট্রনের মতো, মানুষের ন্যাকামোর কোনো চিহ্ন নেই। আপনি কিছু মনে করলেন না তো?

আমি কথাটা হজম করে বললাম, মানুষ হলেই ন্যাকামো করে?

করবে না? ওদের মস্তিস্কেই কিছু-একটা গণ্ডগোল আছে।

আমিও করেছি?

করলেন না? জিজ্ঞেস করলেন নীষা মানুষ, না রবোট্রন! এটা ন্যাকামো হল না? একজন রবোট কখনো এসব প্রশ্ন করবে না। ভিকি খানিকক্ষণ চিন্তা করে মাথা নেড়ে বলল, আমার কী মনে হয় জানেন?

কী?

নীষার জন্যে আপনার প্রেম হচ্ছে।

আমার কানের গোড়া পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল। একটু কেশে বললাম, তোমার তাই মনে হয়?

হুঁ। আমি অবশ্যি এসব বুঝি না, আমাদের সময় ওসব ছিল না। আজকাল নাকি রবোটে প্রেম-ভালবাসা এসব দেয়া হচ্ছে। শুধু শুধু সময় নষ্ট।

ভিকির মুখে অনুভূতির ছাপ পড়ে না, তা না হলে এখন নিশ্চয়ই তার ভুরু বিরক্তিতে কুঁচকে উঠত।

আপনি এখন ঘুমান, আপনার বিশ্রাম দরকার।

ভিকি আমার চারপাশে কম্বল গুজে দিয়ে, বাতি নিভিয়ে বলল, কিছু দরকার হলে বলবেন, আমি আশেপাশেই আছি।

আমি সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লাম, গভীর নিরুদ্বেগ ঘুম, বহুকাল এভাবে ঘুমাই নি। মাঝে কয়েক মুহূর্তের জন্যে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, খানিকক্ষণ সময় লাগল বোঝার জন্যে কোথায় আছি। যখন মনে পড়ল আর আমার মৃত্যুদণ্ডের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে না, গভীর শান্তিতে আমি পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

(চলবে)