দ্বিতীয় পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#ক্রোমিয়াম_অরণ্য – মুহম্মদ জাফর ইকবাল
গভীর রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল, শুনতে পেলাম কারা যেন নিচু গলায় কথা বলছে। আমি লাফিয়ে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। অন্ধকারে চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করছিলাম হঠাৎ করে আমার উপর তীব্র আলো এসেড়ে। হাত দিয়ে চোখ ঢেকে আমি কোনোমতে উঠে বসি, প্রচণ্ড আলোতে চোখ ধাধিয়ে গেছে, আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
খসখসে গলায় কে যেন বলল, দশম প্রজাতির রবোট। চমৎকার হাতের কাজ।
খনখনে এক ধরনের যান্ত্রিক গলায় এরকজন বলল, এর মাঝে কিউ কপোট্রন রয়েছে। কখনো দেখি নি শুধু এর গল্প শুনেছি। ভিতরে নিউরাল নেটওয়ার্ক।
ক্রায়োজেনিক কাজ একেবারে প্রথম শ্রেণীর।
মোটা গলায় একজন বলল, এটা কেমন করে এখানে এল?
খসখসে কণ্ঠস্বরটি আবার বলল, স্ক্যান করে দেখ তাপমাত্রার কোনো তারতম্য নেই।
কয়েকজন একসাথে বলল, ঠিকই বলেছ।
আমি এক ধরনের যান্ত্রিক শব্দ শুনতে থাকি।
পাওয়ার সাপ্লাইটা কোথায়? কানের নিচে?
উঁহু। বুকের কাছে। সৌরসেল থাকার কথা।
আমি কথা শুনে বুঝতে পারি যারা আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে তারা সবাই ভাবছে আমি দশম প্রজাতির একটা রবোট। তাদের খুব একটা দোষ দেয়া যায় না– এই ভয়ঙ্কর ধ্বংসস্তূপে একজন মানুষ কেমন করে আসবে? আমি হাত দিয়ে তীব্র আলো থেকে চোখকে আড়াল করে রেখে বললাম, আলোটা একটু কমাবে? দেখতে অসুবিধে হচ্ছে।
যারা আমাকে ঘিরে আছে তারা আলো সরাল না। খসখসে কণ্ঠস্বরটি জিজ্ঞেস করল, কী বলছ তুমি?
আমি একজন মানুষ।
মানুষ!
সাথে সাথে আলো নিভে গেল, আমি সবাইকে ধড়মড় করে পিছনে সরে যেতে শুনলাম। এক ধরনের যান্ত্রিক শব্দ হল এবং তারপর হঠাৎ করে একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।
সত্যিই মানুষ?
হ্যাঁ
মানুষ, যাকে বলে জৈবিক মানুষ?
হ্যাঁ, জৈবিক মানুষ।
এবারে ঘরে একটা বাতি জ্বলে ওঠে এবং আমি দেখতে পাই আমাকে ঘিরে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন আকারের রবোট দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের হাতেই এক ধরনের ভয়ঙ্করদর্শন অস্ত্র এবং সবাই সেটি আমার দিকে তাক করে রেখেছে। এর যে কোনো একটি অস্ত্র চোখের পলকে মানুষের একটা বসতি উড়িয়ে দিতে পারে, আমার জন্যে ছয়টি অস্ত্রের কোনো প্রয়োজন ছিল না। সবচেয়ে কাছে যে রবোটটি দাঁড়িয়ে আছে তার একটি হাত কনুইয়ের কাছে থেকে উড়ে গেছে। কিছু বৈদ্যুতিক তার, যন্ত্রপাতি, নানারকম টিউব বের হয়ে আছে, রবোটটি সেটা নিয়ে কখনো মাথা ঘামিয়েছে বলে মনে হল না। রবোটটি দেখতে অনেকটা প্রতিরক্ষা রবোটের মতো, চেহারায় এক ধরনের কদর্যতা আছে যেটা সহজে চোখে পড়ে না। খসখসে গলায় বলল, তুমি যদি একটুও নড়, তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলব।
আমি বললাম, আমি নড়ব না। কিন্তু আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই।
বাজে কথা। মানুষ সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে বিশ্বাসঘাতক প্রাণী।
আমি হয়তো ক্ষেত্রবিশেষে রবোটটির সাথে একমত হতে পারি কিন্তু এই মুহূর্তে মুখ ফুটে সেটা বলার সাহস হল না।
দ্বিতীয় একটি রবোট যার দেহ সিলঝিনিয়াম ধাতুর মতো মসৃণ এবং হঠাৎ দেখলে সত্যিকারের কোনো শিল্পীর হাতে তৈরী অপূর্ব একটি ভাস্কর্য বলে মনে হয়, খনখনে গলায় বলল, এই মানুষটাকে এখনই মেরে ফেলা যাক। মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শত্রু।
অন্য রবোটগুলো তার কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়ল এবং আমি হঠাৎ করে এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করতে থাকি। কোনো এক সময় রবোটের মাঝে এক ধরনের নিরাপত্তাসূচক ব্যবস্থা ছিল তারা কোনো অবস্থাতেই মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারত না। রবোটদের বিচ্ছিন্ন দল বহু আগেই তাদের কপোট্রনের সেইসব নিরাপত্তামূলক প্রোগ্রামিং পরিবর্তন করে ফেলেছে। আমি শুষ্ক গলায় বললাম, তোমাদের তুলনায় আমার শরীর অত্যন্ত দুর্বল, ইচ্ছে করলে যে কোনো মুহূর্তে তোমরা আমাকে মেরে ফেলতে পারবে। আমার অনুরোধ সেটা নিয়ে তোমরা কোনো তাড়াহুড়ো কোরো না
কেন নয়?
তোমরা ঠিক কী কারণে মানুষকে এত অপছন্দ কর জানি না। কিন্তু এটা মোটেও অসম্ভব কিছু নয় যে তোমাদের এবং আমার অবস্থা অনেকটা একরকম, এবং আমি হয়তো তোমাদের কোনোভাবে সাহায্য করতে পারব।
ছয়টি রবোটের মাঝে তিনটি হঠাৎ উচ্চৈঃস্বরে হাসার মতো শব্দ করতে শুরু করে। অন্য তিনটি রবোটকে সম্ভবত হাসার উপযোগী বুদ্ধিমত্তা দেয়া হয় নি, তারা স্থির চোখে রবোট তিনটিকে লক্ষ করতে থাকে। আমি রবোটগুলোর উন্মত্ত হাসি শুনতে শুনতে আবার এক ধরনের অসহায় আতঙ্ক অনুভব করি।
কনুইয়ের কাছ থেকে উড়ে যাওয়া হাতের রবোটটি হাসি থামিয়ে বলল, তুমি পৃথিবীতে বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী দূর্বল একজন মানুষ! তুমি আমাদের সাহায্য করবে?
সেটি অসম্ভব কিছু নয়। আমি দ্রুত চিন্তা করতে থাকি, কিছু একটা বলে রবোটগুলোকে শান্ত করতে হবে। কী বলা যায় ভেবে পাচ্ছিলাম না, কোনোকিছু চিন্তা না করেই বললাম, আমি যে কারণে মানুষের বসতি ছেড়ে এসেছি তোমরাও নিশ্চয়ই সেই একই কারণে মানুষের কাছ থেকে দূরে চলে এসেছ?
চকচকে মসৃণ দেহের রবোটটি বলল, তুমি কী বলতে চাইছ?
কনুইয়ের কাছ থেকে হাত উড়ে যাওয়া রবোটটি বলল, তুমি এই মানুষটির কোনো কথা বিশ্বাস কোরো না। মানুষ খল এবং নীচু প্রকৃতির। মানুষ ধূর্ত এবং ফাঁকিবাজ। মানুষ অপদার্থ এবং অপ্রয়োজনীয়। পৃথিবী থেকে মানুষকে অপসারিত করা হচ্ছে পৃথিবীর উপকার করা।
তৃতীয় একটি রবোট হাতের ভীষণদর্শন অস্ত্র হাতে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, এস পৃথিবীর একটা উপকার করে দিই।
মসৃণ দেহের রবোটটি তার ধাতব খনখনে গলায় বলল, যত্ন করে খুন কর যেন দেহটি নষ্ট না হয়। আমি কখনো মানুষের শরীরের ভিতরে দেখি নি। মানুষের শরীরে হৃৎপিণ্ড বলে একটি জিনিস আছে সেটি নাকি ক্রমাগত তাদের কপোট্রনে রক্ত সঞ্চালন করে।
তৃতীয় রবোটটি বলল, মেরে ফেললে হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। যদি সত্যি সত্যি হৃৎস্পন্দন দেখতে চাও জীবন্ত অবস্থায় বুকটি কাটতে হবে।
আমি অসহায় আতঙ্কে তাকিয়ে থাকি। চকচকে মসৃণ রবোটটি আমার দিকে এগিয়ে আসে। তাকে এখন হঠাৎ অন্ধকার জগৎ থেকে বের হয়ে আসা বিশাল রক্তলোলুপ সরীসৃপের মতো মনে হচ্ছে। কাছে এসে হাতের কোথায় চাপ দিতেই কব্জির কাছ থেকে একটি ঝকঝকে ধারালো ইস্পাতের ফলা বের হয়ে এক তার পিছু পিছু অন্য রবোটগুলো এগিয়ে আসে, যন্ত্রের মাঝে কৌতূহলের চিহ্নটি কখনো স্পষ্ট হতে পারে না তাই রবোটগুলোকে তখনো ভাবলেশহীন নিস্পৃহ মনে হতে থাকে। আমি মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম, ঘরের এক কোনায় ক্রিশি জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রাচীন দুর্বল কপোট্রন এই শক্তিশালী রবোটগুলোর উপস্থিতিতে পুরোপুরি শক্তিহীন, তার কিছু করার নেই। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম সে তবু আমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করল, এক পা এগিয়ে এসে বলল, দাঁড়াও।
রবোটগুলো থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কনুই থেকে উড়ে যাওয়া হাতের রবোটটি বলল, তুমি কে? আরেকজন মানুষ? বিকলাঙ্গ ও কুৎসিত মানুষ?
আবার রবোট তিনটি কূর ভঙ্গিতে হাসতে শুরু করে এবং অন্য তিনটি রবোট স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে তাদের লক্ষ করতে থাকে।
ক্রিশি তার শান্ত গলায় বলল, না, আমি বিকলাঙ্গ মানুষ নই। আমি একজন রবোট।
চমৎকার। তুমি কী বলতে চাও?
তোমরা কে আমি এখনো জানি না, তোমরা কী চাও তাও আমি জানি না। কিন্তু একজন রবোট হিসেবে অন্য রবোটকে আমি কি একটা কথা বলতে পারি?
কী কথা?
এই মানুষটি মরে গেলে তার কোনোই মূল্য নেই। কিন্তু বেঁচে থাকলে তার অনেক মূল্য।
কী মূল্য? কনুই থেকে উড়ে যাওয়া হাতের রবোটটি ধমক দিয়ে বলল, মানুষের কোনো মূল্য নেই। মানুষ দুর্বল, অপ্রয়োজনীয় আর অপদার্থ। মানুষ মূল্যহীন–
ক্রিশি শান্ত গলায় বলল, কিন্তু এই মানুষটি মূল্যহীন নয়। মহামান্য গ্রুস্টান এই মানুষটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
গ্রুস্টান! হঠাৎ করে সব কয়টি রবোট থেমে গেল, ধড়মড় করে পিছনে সরে এসে জিজ্ঞেস করল, গ্রুস্টান একে খুঁজছে?
হ্যাঁ।
কেন? রবোটগুলো ঘুরে আমার দিকে তাকাল। কেন গ্রুস্টান তোমাকে খুঁজছে?
আমি তার সম্পর্কে অবমাননাকর কথা বলেছি।
কনুই থেকে উড়ে যাওয়া হাতের রবোটটি আবার শব্দ করে হেসে ওঠে, বিশ্বাসঘাতক নির্বোধ মানুষের কাছে এর থেকে বেশি কি আশা করা যায়?
চকচকে দেহের রবোটটি বলল, এর কথা বিশ্বাস কোরো না, খোঁজ নিয়ে দেখ।
সাথে সাথে রবোটগুলো সচল হয়ে ওঠে। তাদের মাথার কাছে বাতি জ্বলতে থাকে, নানা আকারের এন্টেনা বের হয়ে আসে, নানা ধরনের কমিউনিকেশান মডিউল ব্যবহার করে তারা কাছাকাছি ডাটা ব্যাংক থেকে খোঁজখবর নিতে থকে। কয়েক মুহূর্ত পর হাত উড়ে যাওয়া রবোটটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি সত্যি কথাই বলেছ। গ্রুস্টান সত্যি সত্যি তোমাকে খুঁজছে। তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারলে মোটা পুরস্কার।
চকচকে মসৃণ রবোটটি বলল, আমরা গ্রুস্টানের সাথে একটা চুক্তি করতে পারি, আমরা এই মানুষটিকে ফিরিয়ে দেব তার বদলে আমরা একটা প্রথম শ্রেণীর সফটওয়ার পাব–
অন্য রবোটগুলো সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে থাকে। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা রবোটটি বলল, আমরা তাহলে এখন একে মারব না? হৃৎপিণ্ডের কর্মপদ্ধতি দেখব না?
আপাতত না।
যদি পালিয়ে যায়? মানুষকে কোনো বিশ্বাস নেই।
শরীরে একটা ট্রাকিওশান লাগিয়ে দাওবার মেগাহার্টজের।
একটি রবোট আমার দিকে এগিয়ে আসে, তোমার হাতটা দেখি।
আমি আমার হাতটি এগিয়ে দিলাম। রবোটটি চোখের পলকে হাতের তালুতে তীক্ষ্ণ একটি শলাকা ঢুকিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে আর আমি প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকি।
রবোটটি হিসহিস করে বলল, অকারণে শব্দ কোরো না নির্বোধ মানুষ। আমি একটি ট্রাকিওশান প্রবেশ করাচ্ছি, তোমার হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিচ্ছি না।
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, ক্রিশি, ক্রিশি তুমি কোথায়?
ক্রিশি আমার কাছে এগিয়ে আসে, এই যে আমি এখানে।
আমি অন্য হাতটি দিয়ে ক্রিশিকে শক্ত করে ধরে রাখি। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে, তার মাঝে ট্রাকিওশান হাতে রবোটটি আরেকটি শলাকা আমার হাতের তালুতে ঢুকিয়ে দিল। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমি জ্ঞান হারালাম।
রবোটের যে দলটি আমার হাত ফুটো করে শরীরে একটা ট্রাকিওশান ঢুকিয়ে দিয়ে আমাকে পাকাঁপাকিভাবে বন্দি করে ফেলেছে তার দলপতি হাত উড়ে যাওয়া রবোটটি, তার কোনো নাম নেই অন্য রবোটরা তাকে একটি সংখ্যা, বাহাত্তর বলে ডাকে, তার কারণটি আমার ঠিক জানা নেই। চকচকে মসৃণ রবোটটির নাম কুরু। দলের তিন নম্বর রবোটটির নাম হি। অন্য তিনটি রবোটের নাম আছে কি নেই আমি জানি না, তাদের সাথে সত্যিকার সংলাপ কখনন করা হয় নি, একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে, যেটা আমি কখনো শুনতে পাই না।
রবোটের এই দলটি একটি ছোট দস্যুদল। তাদের কথা শুনে বুঝতে পেরেছি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবার পর এ রকম অসংখ্য রবোট সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কিছু কিছু একত্র হয়ে এক ধরনের বিচিত্র জীবন যাপন শুরু করেছে এই দলটি কোনো এক কারণে দস্যুবৃত্তিকে নিজেদের জীবন হিসেবে বেছে নিয়েছে।
এই দলটির জীবনের উদ্দেশ্য বিনোদনমূলক সফটওয়ার এবং কম্পিউটার প্রক্রিয়া ছিনিয়ে আনা। পরাবাস্তবতার অসংখ্য সফটওয়ার পৃথিবীর আনাচে কানাচে রয়ে গেছে। এক সময় তাদের বেশিরভাগ মানুষ নানা ধরনের কম্পিউটারে ব্যবহার করত। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবার পর তার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, যেগুলো ধ্বংস হয় নি সেগুলো পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছোট বড়, সহজ–জটিল নানা কম্পিউটারে অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে। গ্রুস্টান আবার সেগুলো একত্র করার চেষ্টা করছে, মানুষ আবার সেগুলো ব্যবহার শুরু করেছে। এই রবোট দলটি সেইসব সফটওয়ারের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। যদি কোনোভাবে সেগুলো কেড়ে আনতে পারে নিজেদের কপোট্রনে পুরে নিয়ে দীর্ঘ সময় উপভোগ করতে থাকে। মানুষ যেরকম করে ভয়ঙ্কর নেশাতে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর সেটা ছাড়তে পারে না, এটিও অনেকটা সেরকম।
প্রথমবার রবোটগুলো যখন মানুষের লোকালয় আক্রমণ করেছিল আমি ব্যাপারটি বেশ কাছে থেকে দেখেছিলাম। ভয়ঙ্করদর্শন অস্ত্র হাতে গুলি করতে করতে তারা কম্পিউটারের ঘটিতে ঢুকে গিয়েছিল। ভিতরে সবকিছু ভেঙেচুরে ক্রিস্টাল ডিস্কগুলো খুলে বের হয়ে এসেছে। মানুষেরা আতঙ্কে ছুটে পালিয়ে গেছে, কিছু প্রতিরক্ষা রবোট দাঁড়িয়েছিল কিন্তু প্রচণ্ড গুলির সামনে তারা দাঁড়াতে পারে নি। আমি খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দেখেছি শরীরে ট্রাকিওশান লাগানো বলে বেশি দূরে যেতে পারি না, না চাইলেও কাছাকাছি থাকতে হয়।
রবোটগুলো সফটওয়ার এবং প্রসের প্রক্রিয়াগুলো নিজেদের কপোট্রনে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে সেগুলো উপভোগ করতে থাকে ব্যাপারটি অত্যন্ত বিচিত্র। মানুষ যখন কিছু উপভোগ করে তাদের চেহারায় তার ছাপ পড়ে। রবোটের বেলায় সেটা সত্যি নয়, অত্যন্ত কঠোর মুখ নিয়ে তারা দীর্ঘ সময় মূর্তির মতো নিস্পন্দ হয়ে বসে থাকে। হঠাৎ হঠাৎ তাদের হাত। বা পা একটু নড়ে উঠে চোখের ঔজ্জ্বল্য একটু বেড়ে যায় বা কমে আসে, তার বেশি কিছু নয়। বাইরে থেকে আপাতদৃষ্টিতে যেটাকে এক ধরনের স্থবিরতা বলে মনে হয়, আসলে সেটি তাদের কপোট্রনে প্রতি সেকেন্ডে কয়েক ট্রিলিয়ন জটিল হিসেব নিকেশের ফল।
ব্যাপারটি একনাগাড়ে কয়েকদিন চলতে থাকে। আমার তখন কিছু করার থাকে না, ট্রাকিওশানের দূরত্বসীমার মাঝে আমি বাধা পড়ে থাকি। ক্রিশি আছে বলে আমি বেঁচে আছি। আমার জন্যে সে খাবার এনে দেয়, পানীয় এনে দেয়। যখন আমি গম্ভীর হতাশায় ডুবে যেতে থাকি ক্রিশি সম্পূর্ণ অবান্তর অর্থহীন কথা বলে আমাকে হতাশার অন্ধকার গহ্বর থেকে তুলে আনে। ক্রিশিকে নিয়ে রবোটগুলো কখনো কোনো ধরনের কৌতূহল দেখায় নি, রবোটগুলোর কাছে সে একটা কমিউনিকেশান্স মডিউল বা সৌর ব্যাটারি থেকে বেশি কৌতূহলোদ্দীপক কিছু ছিল না।
রবোটগুলো আমাকে গ্রুস্টানের কাছে দুষ্প্রাপ্য কিছু সফটওয়ারের বদলে ধরিয়ে দেবে বলে ঠিক করেছে। কিন্তু কোনো একটি অজ্ঞাত কারণে তারা কখনো আমার সাথে সেটা নিয়ে কোনো কথা বলে না। আমি তাদের সাথে আছি, তারা আমাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে, আমি কয়েকবার ভেবেছি আমাকে নিয়ে কী করবে তাদের জিজ্ঞেস করি কিন্তু একটা যন্ত্রের সাথে নিজের জীবন নিয়ে কথা বলতে প্রতিবারই আমার কেমন জানি বিতৃষ্ণা হয়েছে।
দ্বিতীয়বার তারা যখন মানুষের একটা লোকালয় আক্রমণ করল আমি সাথে যেতে চাই নি কিন্তু আমার কোনো উপায় ছিল না। রবোটগুলো আক্রমণ করল ভরদুপুরে, গুলি করতে করতে তারা গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকে যায়, তাদের হাতে কিছু বিস্ফোরক ছিল সেগুলো চারদিকে ছুঁড়ে দেয়, প্রচণ্ড বিস্ফোরণে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। মানুষেরা চিৎকার করতে করতে ছুটে যেতে থাকে, প্রতিরক্ষা রবোট অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসে, মুহূর্তে পুরো এলাকাটি একটা নরকের মতো হয়ে যায়। আমি কাছাকাছি একটা দেয়ালে হেলান দিয়ে নিস্পৃহভাবে পুরো ব্যাপারটা দেখছিলাম হঠাৎ লাল চুলের কমবয়সী একজন মানুষ আমার কাছে দিয়ে ছুটে যেতে যেতে চিৎকার করে বলল, পালাও! পালাও! রবোট এসেছে, রবোট।
আমি অন্যমনস্কভাবে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। একবার ইচ্ছে হল তাকে বলি, আমার কোথাও পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই–কিন্তু মানুষটা যেভাবে ছুটে পালাচ্ছে দাঁড়িয়ে আমার কোনো কথা শুনবে বলে মনে হয় না। কাছাকাছি প্রচও একটা বিস্ফোরণ হল, শিস দেয়ার মতো শব্দ করে কানের কাছে দিয়ে কয়েকটা গুলি বের হয়ে গেল, আমি অভ্যাসবশত মাথা নিচু করতে গিয়ে থেমে গেলাম। নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে কী হবে? যদি বিচ্ছিন্ন একটা গুলি এসে আমাকে শেষ করে দেয় হয়তো সেটাই হবে আমার জন্যে ভালো।
আমি প্রচণ্ড গোলাগুলির মাঝে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ব্যাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
হঠাৎ দেখি একটু আগে লাল চুলের যে মানুষটি ছুটে গিয়েছিল সে আবার ফিরে এসেছে। গুঁড়ি মেরে মুখের দিকে খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি ওই রবোটগুলোর সাথে এসেছ?
আমি মাথা নাড়লাম।
আমি তোমাকে চিনি।
আমি অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকালাম। লোকটা আবার বলল, তুমি কুশান। আমি তোমার ছবি দেখেছি।
লোকটা আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণে দেয়াল থেকে কিছু ভেঙে পড়ল, লোকটা ছিটকে সরে গেল পিছনে। ঠিক তখন আমার ট্রাকিওশানে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকি। রবোটগুলো ফিরে যেতে শুরু করেছে। আমাকেও ফিরে যেতে হবে।
আমি ক্লান্ত পায়ে হেঁটে ফিরে যাচ্ছি হঠাৎ ধ্বংসস্তূপের মাঝে থেকে লাল চুলের সেই মানুষটি আবার মাথা বের করে উচ্চৈঃস্বরে কিছু একটা বলল, পরিষ্কার মনে হল সে বলল, তুমি কি আমাকে তোমার সাথে নেবে? কিন্তু সেটা তো সত্যি হতে পারে না। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ নিশ্চয়ই আমার সাথে যেতে চাইবে না। নিশ্চয়ই আমি ভুল শুনেছি।
রাত্রিবেলা প্রায় শ খানেক কিলোমিটার দূরে মাটিতে জিনন ল্যাম্প লাগিয়ে রবোটগুলো তাদের লুণ্ঠন করে আনা সফটওয়ার নিয়ে বসে। হাত উড়ে যাওয়া রবোটটি–যাকে অন্য রবোটেরা বাহাত্তর বলে ডাকে, একটা ক্রিস্টাল হাতে নিয়ে বলল, এবারে খুব ভালো ভালো সফটওয়ার পেয়েছি। এই যে দেখ গ্যালাক্সি সাত। রিকি ভাষায় লেখা
আমি গ্যালাক্সি সাত একবার ব্যবহার করেছিলাম, খুব যত্ন করে তৈরি করা। বিশ্বজগতের মাঝে বিলীন হয়ে যাওয়ার একটা ব্যাপার আছে। গ্রহ থেকে গ্রহ, নক্ষত্র থেকে নক্ষত্র, নীহারিকা, নক্ষত্রপুঞ্জ ব্ল্যাকহোলের আশপাশে ঘুরে বেড়ানোর বাস্তব এক ধরনের অনুভূতি। আমি সচরাচর রবোটগুলোর সাথে কথা বলি না, আজকে কী মনে হল জানি না হঠাৎ বললাম, গ্যালাক্সি সাত চমৎকার সফটওয়ার।
সবগুলো রবোট একসাথে আমার দিকে ঘুরে তাকাল। বাহাত্তর জিজ্ঞেস করল, তুমি কেমন করে জান?
আমি জানি। আমি এটা ব্যবহার করেছি। এর মাঝে একটা ত্রুটি আছে।
ক্রটি?
হ্যাঁ। শেষ পর্যায়ে যদি যেতে পার ব্ল্যাকহোলে বিলীন হয়ে যাবার আগের মুহূর্তে একটা রঙিন টুপি পরা ক্লাউন বের হয়ে আসে।
ক্লাউন?
হা। সেটা খিকখিক করে হাসতে থাকে, তখন যদি তার পিছু পিছু যাও সবকিছু গোলমাল হয়ে যায়। একটু অপেক্ষা করলে ক্লাউন অদৃশ্য হয়ে আবার ব্ল্যাকহোল ফিরে আসে।
অত্যন্ত বিচিত্র এবং অর্থহীন। কুরু মাথা নেড়ে বলল, ব্ল্যাকহোলের সাথে ক্লাউনের কোনো সম্পর্ক নেই।
অন্য রবোটগুলো কুরুর সাথে সাথে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, অর্থহীন। একেবারেই অর্থহীন।
বাহাত্তর আরেকটা ক্রিস্টাল হাতে নিয়ে বলল এই যে, আরেকটা নবম মাত্রার সফটওয়ার। এর নাম পঙ্কিল কুসুম।
পঙ্কিল কুসুম! আমি অবাক হয়ে বললাম তোমরা পঙ্কিল কুসুম পেয়েছ?
কেন, কী হয়েছে?
এটা দীর্ঘদিন বেআইনি ছিল। গ্রুস্টান কিছুদিন আগে মানুষকে ব্যবহার করতে দিয়েছে।
এটা কী রকম?
খুব যত্ন করে তৈরি করা সফ্টওয়ার। কিন্তু তোমরা ব্যবহার করতে পারবে না।
বাহাত্তর হঠাৎ তার ভীষণদর্শন অস্ত্রটি আমার দিকে তাক করে বলল, আমাদের বুদ্ধিমত্তার ওপর কটাক্ষ করে আর একটা কথা বললে তোমার ঘিলু বের করে দেব।
রবোটটির কথা আমার কাছে কেন জানি ফাঁপা বুলির মতো মনে হয়। আমি মাটিতে থুতু ফেলে বললাম, আমাকে মেরে ফেলার হলে অনেক আগেই মারতে। খামাখা ভয় দেখিও না। তোমার ওই অস্ত্রকে আমি ভয় পাই না।
বাহাত্তর স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি তার দৃষ্টিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে বললাম, পঙ্কিল কুসুম একটি জৈবিক সফটওয়ার। ভালবাসার কারণে পুরুষ আর রমণীর ভিতরে যেসব জৈবিক প্রক্রিয়া হয় এটি সেটার ওপরে তৈরী। তোমরা নিম্ন শ্রেণীর রবোট। তোমাদের মাঝে ভালবাসা নেই জৈবিক অনুভূতিও নেই। তোমরা এটা বুঝবে না।
রবোটগুলো কোনো কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমাকে গুলি করে মেরে ফেলার একটা ছোট সম্ভাবনা রয়েছে, আমি তার জন্যে মোটামুটি প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম, কিন্তু রবোটগুলো আমাকে মারল না। মরে যাওয়া নিয়ে আজীবন আমার ভিতরে যে এক ধরনের আতঙ্ক ছিল ইদানীং সেটি আর নেই।
আমি যেভাবে বেঁচে আছি তার সাথে মরে যাওয়ার খুব বেশি পার্থক্য নেই।
দুদিন পর আমি একটি বিধ্বস্ত ঘরে জঞ্জালের মাঝে বসে ছিলাম। আমার পরনের কাপড় শতচ্ছিন্ন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আমার শরীর নোংরা, হাতে যেখানে ফুটো করে ট্রাকিওশান ঢুকিয়েছে সেখানে বিষাক্ত দগদগে ঘা। কয়েকদিন থেকে অত্যন্ত বিস্বাদ কিছু খাবার খেয়ে আছি, কেন জানি সেই খাবারের ওপর থেকে রুচি পুরোপুরি উঠে গেছে। কোনো একটি বিচিত্র কারণে হঠাৎ করে খুব গরম পড়েছে, বাতাসে জলীয় বাষ্প বলতে গেলে নেই, শুকনো ধুলা হু–হুঁ করে বইছে। চারদিকে এক ধরনের পোড়া গন্ধ, কোনো এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাস রয়েছে আশপাশে, আমার মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা।
ক্রিশি আমার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে বললাম, আর তো পারি না ক্রিশি। বড় কষ্ট!
ক্রিশি শান্ত গলায় বলল, মহামান্য কুশান, আমার ধারণা আপনার এই কষ্ট সহ্য করার পিছনে কোনো যুক্তি নেই।
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, তুমি আমাকে কী করতে বল?
আপনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দশমিক শূন্য শূন্য দুই। এই অবস্থায় আত্মহত্যা করা খুব যুক্তিসঙ্গত ব্যাপার হবে।
আত্মহত্যা! আমি চমকে উঠে ক্রিশির দিকে তাকালাম, কী বলছ তুমি?
আমি ঠিকই বলছি। ক্রিশি শান্ত গলায় বলল,আমি আপনাকে ধারালো একটা ছোরা এনে দিতে পারি। কব্জির কাছে একটা ধমনী কেট দিলে রক্তক্ষরণে অল্প সময়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। আপনার সমস্ত সমস্যার যে হবে সবচেয়ে সহজ সমাধান।
আমি বিস্ফারিত চোখে ক্রিশির দিকে তাকিয়ে রইলাম, নিজের কানকে আমার বিশ্বাস হয় না যে আমার একমাত্র কথা বলার সঙ্গী একটি নিম্নশ্রেণীর রবোট আমাকে আত্মহত্যা করার পরামর্শ দেবে। আমি খুব সঙ্গত কারণেই ক্রিশির কথাটি উড়িয়ে দিলাম।
কিন্তু সারাদিন ঘুরেফিরে আমার কথাটি মনে হতে লাগল। আমি যতবারই কথাটি ভাবছিলাম প্রত্যেকবারই সেটাকে খুব যুক্তিসঙ্গত একটা সমাধান বলে মনে হতে লাগল। সন্ধেবেলা সত্যি সত্যি আমি আত্মহত্যা করব বলে ঠিক করলাম এবং এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে এই প্রথমবার আমি নিজের ভিতরে এক ধরনের শান্তি অনুভব করতে থাকি। পৃথিবীর এই ভয়ঙ্কর ধ্বংসস্থূপ, রবোটদের নৃশংস অত্যাচার, ক্ষুধা–তৃষ্ণা, শরীরের যন্ত্রণা–সবকিছু থেকে। আমি মুক্তি পাব! আর আমাকে পশুর মতো বেঁচে থাকতে হবে না। ভয় আতঙ্ক আর হতাশায় ডুবে যেতে হবে না। আমার জীবন কেমন হবে আমি নিজে সেটা ঠিক করব।
আমি নিজের ভিতরে এত বিস্ময়কর একটা শান্তি অনুভব করতে থাকি যে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই। অনেকদিন পর আমি প্রথমবার অনেক যত্ন করে নিজেকে পরিষ্কার করে নিই। বেছে বেছে সুস্বাদু একটা খাবার বের করে প্লেটে সাজিয়ে পানীয়ের গ্লাসে লাল রঙের খানিকটা পানীয় ঢেলে সত্যিকারের খাবারের মতো ধীরে ধীরে খেয়ে উঠি।
রাত গভীর হলে আমি আমার ব্যাগটায় মাথা রেখে আকাশের নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হতে থাকে লক্ষ কোটি যোজন দূরে থেকে নক্ষত্রগুলো বুঝি গভীর ভালবাসা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার চারপাশে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পৃথিবীর একটি বিশাল ধ্বংসস্তূপ, কিন্তু এখন কিছুতেই আর কিছু আসে যায় না।
গভীর রাতে হঠাৎ রবোটগুলো একটি মানুষের লোকালয় আক্রমণ করতে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। গত কয়েক দিন থেকে তারা একটু বিচিত্র ব্যবহার করছিল এবং তাদের ভাবভঙ্গি দেখে আমি বুঝতে পারি এবারে তারা বিশেষ কিছু উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের লোকালয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্যটি কী আমি বুঝতে পারলাম না। রওনা দেবার আগে হঠাৎ করে বাহাত্তর আমার কাছে এসে বলল, তোমাকে এবার আমাদের সাথে যেতে হবে না। মানুষ প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা বাড়িয়ে দিচ্ছে, তোমার ক্ষতি হতে পারে।
কিন্তু ট্রাকিওশান? আমি ট্রাকিওশানের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারি না।
কয়েক ঘণ্টার জন্যে ট্রাকিওশানের নিয়ন্ত্রণ দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছি, আশা করছি নিজের স্বার্থেই কোনো ধরনের অর্থহীন নির্বুদ্ধিতা করবে না।
আমি কোনো কথা বললাম না, কোনোকিছুতেই এখন আর কিছু আসে যায় না।
জীবনের শেষ মুহূর্তে নির্বোধ কিছু রবোটের পিছু পিছু একটি দস্যুবৃত্তিতে সহযোগিতা করতে হবে না জেনে কেমন জানি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ অনুভব করতে থাকি। তারা কখন ফিরে আসবে জানি না–কিন্তু আর আমার এদের মুখোমুখি হতে হবে না। এরা ফিরে আসার আগে আমি আমার জীবনটিকে শেষ করে দেব।
রবোটগুলো চলে যাবার পর আমি বহুদিন পর এক ধরনের অপূর্ব শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমি স্বপ্ন দেখি একটি নীল হ্রদের। বিশাল হ্রদ তার মাঝে আশ্চর্য নীল পানি টলটল করছে। হ্রদের মাঝখানে একটি দ্বীপ। সেই দ্বীপে সবুজ গাছ। সত্যিকারের গাছ। সেই গাছে সত্যিকার পাতা। গাছের ডালে বসে আছে লাল ঠোঁটের অপূর্ব একঝাক পাখি। আমি একবার হাত তুলতেই সেই একঝাক পাখি গাছ থেকে উড়ে গেল আকাশে। আকাশে সাদা মেঘ, তার মাঝে পাখি উড়ছে। উড়তে উড়তে গান গাইছে পাখি। কী অপূর্ব সেই গান!
খুব ভোরে আমার ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকার কেটে যাচ্ছে হালকা আলো চারদিকে। এই সময়টার নিশ্চয়ই একটা জাদু রয়েছে। কুৎসিত ধ্বংসস্তূপটিও এখন কেমন জানি মায়াময় মনে হচ্ছে। আমি উঠে বসি। রবোটগুলো কিছুক্ষণের মাঝেই ফিরে আসবে। আর অপেক্ষা করা ঠিক নয়। আমি কোমল স্বরে ডাকলাম, ক্রিশি–
ক্রিশি এগিয়ে এল, বলুন মহামান্য কুশান।
আমার মনে হয় আত্মহত্যা করার জন্য এটাই ঠিক সময়।
আমারও তাই ধারণা। রবোটগুলো ফিরে আসতে শুরু করেছে। ঘণ্টা দুয়েকের মাঝে পৌঁছে যাবে। মেয়েটিকে নিয়ে একটু যন্ত্রণা হচ্ছে, না হয় আরো আগে ফিরে আসত।
মেয়েটি? আমি অবাক হয়ে বললাম, কোন মেয়েটি?
রবোটগুলো একটা মেয়েকে ধরে আনতে গিয়েছিল মহামান্য কুশান। তারা বিনোদনের যে সফটওয়ার পেয়েছে সেখানে পুরুষ ও রমণীর মাঝে জৈবিক সম্ভোগের ব্যাপার রয়েছে। রবোটগুলো সেটা একটা মেয়ের উপরে পরীক্ষা করে দেখতে চায়।
আমি বিস্তারিত চোখে ক্রিশির দিকে তাকালাম, কী বলছ তুমি?
আমি সত্যি কথা বলছি। তারা নিজেদের কপোট্রনে খানিকটা পরিবর্তন করেছে। আমার মনে হয় এখন তাদের ভিতরে নিম্ন শ্রেণীর যৌনচেতনা আছে। ব্যাপারটি কী সে সম্পর্কে আমার অবশ্যি কোনো ধারণা নেই।
আমি বুঝতে পারছি আমার ভিতরে যে কোমল শান্ত একটা ভাব এসেছিল সেটা দ্রুত নিঃশেষিত হয়ে সেখানে প্রচণ্ড একটা ক্রোধের জন্ম নিচ্ছে। ধারালো চাকুটা হাতে নিয়ে আমি বসে রইলাম, হাতের ধমনীটি কেটে দেয়ার সহজ কাজটি করতে গিয়েও আমি করতে পারলাম না। মৃত্যুর আগে দুর্ভাগা মেয়েটির সাথে মনে হয় আমার অন্তত একবার কথা বলা দরকার।
বাহাত্তরের দলটি যখন পৌঁছেছে তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। যে মেয়েটিকে তারা ধরে এনেছে সে অল্পবয়সী। তাকে আমি যেরকম আতঙ্কগ্রস্ত দেখব বলে ভেবেছিলাম সেরকম দেখলাম না, মনে হল কেমন যেন হতচকিত হয়ে আছে। আমাকে দেখে সে একরকম ছুটে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কুশান?
আমি মেয়েটিকে ভালো করে লক্ষ করলাম, তার মাথায় ঘন কালো চুল এবং চোখ দুটিও আশ্চর্য রকম কালো। তার শরীরটি অসম্ভব কোমল, আমি এর আগে এত লাবণ্যময় কোনো মেয়ে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মেয়েটির গলায় রঙিন পাথরের একটি মালা। কাপড়ের সাথে এই রঙিন মালাটিতে তাকে একটি প্রাচীন তৈলচিত্রের চরিত্র বলে মনে হতে থাকে।
মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি কুশান?
আমি তার গলায় এক ধরনের উত্তাপ অনুভব করি। মেয়েটি কেন আমার ওপর রাগ করছে আমি তখন বুঝতে পারি নি। আমি মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ, আমি কুশান।
তুমি কেন এভাবে আমাকে ধরে এনেছ?
মেয়েটির কথা শুনে আমি একেবারে হতচকিত হয়ে গেলাম। সে সত্যিই ভাবছে আমি রবোটগুলোকে পাঠিয়ে তাকে ধরে এনেছি? সেটা সত্যি সম্ভব? আমি অবাক হয়ে ক্রিশির দিকে তাকাতেই ক্রিশি মাথা নেড়ে বলল, লোকালয়ের মানুষেরা বিশ্বাস করে আপনি গ্রুস্টানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সংঘবদ্ধ হচ্ছেন। রবোটগুলো আপনার অনুগত। আপনার আদেশে তারা কম্পিউটার ঘাটি ধ্বংস করছে গ্রুস্টানের ক্ষমতা কমানোর জন্যে। অনেক মানুষ সে জন্যে আপনাকে শ্রদ্ধা করে
আমি ধড়মড় করে উঠে বসি,কী বলছ তুমি?
ক্রিশি মাথা নাড়ল, আমি সত্যি কথা বলছি।
মানুষের বসতিতে আপনার সম্পর্কে অনেক রকম গল্প প্রচলিত আছে। আমি কমিউনিকেশান মডিউলে শুনেছি।
মেয়েটি খুব কৌতূহল নিয়ে আমাদের কথা শুনছিল। আমি দেখতে পাই তার মুখে ক্রোধের চিহ্নটি সরে গিয়ে সেখানে চাপা বিস্ময় এবং এক ধরনের আতঙ্ক এসে উঁকি দিতে শুরু করেছে। আমার দিকে তাকিয়ে সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি এই রবোটদের নেতা নও?
আমি মাথা নাড়লাম, না।
তাহলে?
আমি এদের বন্দি। আমাকে গ্রুস্টানের কাছে ফেরত দেবার জন্যে এরা আমাকে ধরে রেখেছে।
মেয়েটি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, আমি দেখতে পাই ধীরে ধীরে তার মুখ রক্তশূন্য হয়ে যাচ্ছে। সে কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, অসম্ভব, এটি হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না।
আমার মেয়েটির জন্যে এক ধরনের কষ্ট হতে থাকে হঠাৎ করে নিজেকে এক ধরনের অপরাধী মনে হয় ঠিক কী জন্যে নিজেই বুঝতে পারি না।
মেয়েটি হঠাৎ হাঁটু ভেঙে বসে, তারপর এক ধরনের ভাঙা গলায় প্রায় আর্তনাদ করে উঠে বলল, এরা তাহলে আমাকে ধরে এনেছে কেন? কেন?
আমি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলাম না, মেয়েটার চোখের দিকেও তাকাতে পারলাম, দৃষ্টি সরিয়ে আমি মাটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটির প্রশ্নের উত্তর দিল ক্রিশি। নিচু গলায় বলল, রবোটগুলো আপনাকে জৈবিক সম্ভোগে ব্যবহার করার জন্যে এনেছে
মেয়েটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ক্রিশি কী বলছে ঠিক বুঝতে পারল বলে মনে হয় না। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে বলল, কী বলছ তুমি?
আমি সত্যি কথাই বলছি। ব্যাপারটি কী সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। রবোটগুলো তাদের কপোট্রনে কী একটা পরিবর্তন করেছে।
মেয়েটি হঠাৎ এগিয়ে এসে খপ করে আমার দুই হাত ধরে ফেলল, তারপর ব্যাকুল হয়ে বলল, এই রবোট ভুল বলেছে, বলছে না?
আমার নিজেকে একটি অমানুষের মতো মনে হল। কিন্তু কিছু করার নেই, মাথা নেড়ে বললাম, না।
কয়েক মুহূর্ত সে কোনো কথা বলল না। তারপর হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল, তুমি আমাকে রক্ষা করবে, করবে না?
আমি অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকালাম, কী আশ্চর্য রকম সরল মেয়েটির জগৎ! কী ভয়ঙ্কর নিষ্পাপ। শুধু তাই নয় হঠাৎ করে বুঝতে পারি মেয়েটি অপূর্ব সুন্দরী। তার কোমল ত্বক, কালো রেশমের মতো চুল, চোখের ভিতর এক ধরনের বিচিত্র ব্যাকুলতা। লাল ঠোঁট, ঠোঁটের আড়ালে তার কী অপূর্ব স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো দাঁত। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে অসহায় বোধ করতে থাকি। যে ভয়ঙ্কর রবোটের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যে আমি আত্মহত্যা করার প্রস্তুতি নিয়েছি সেই রবোটের হাত থেকে তাকে আমি রক্ষা করব? সেটা কি সম্ভব?
মেয়েটা আমার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে ছিল, আবার ভাঙা গলায় বলল, তুমি আমাকে রক্ষা করবে, করবে না?
আমি গভীর বেদনায় মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ আমার কী হল জানি না, আমি তার রেশমের মতো কোমল চুলে হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললাম, অবশ্যি আমি তোমাকে রক্ষা করব। অবশ্যি–
আমার নাম টিয়ারা।
অবশ্যি আমি তোমাকে রক্ষা করব টিয়ারা।
মেয়েটি হঠাৎ একটা ছোট শিশুর মতো হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
রবোটগুলো আমাদের পুরোপুরি উপেক্ষা করে নিজেদের মাঝে ব্যস্ত ছিল। আমাকে বন্দি করার সময় যেভাবে আমার শরীরে ট্রাকিওশান প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল টিয়ারার বেলাতে তাও করল না। ছোট একটা ট্রাকিওশান তার হাঁটুতে বেঁধে দিয়েছে, চেষ্টা করলে সেটা খুলে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু রবোটগুলো সম্ভবত জানে টিয়ারা কখনোই এই ট্রাকিওশান খুলে পালিয়ে যেতে পারবে না। টিয়ারা যখন আমার সাথে কথা বলছে আমি তাকিয়ে দেখতে পাই রবোটগুলো মিলে তাদের একজনের কপোট্রন খুলে সেখানে ঝুঁকে পড়েছে। ক্রিশির কথা সত্যি, তারা নিজেদের কপোট্রনে কিছু একটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে রবোটের দলটির দিকে এগিয়ে গেলাম। বাহাত্তর মাথা তুলে বলল, তুমি কিছু বলতে চাও?
হা। তোমরা টিয়ারাকে কেন ধরে এনেছ?
তোমার পঙ্কিল কুসুম সফটওয়ারটির কথা মনে আছে?
আমি মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ মনে আছে।
তুমি সেটা নিয়ে যে কথাটি বলেছিলে সেটি সত্যি। এই সফটওয়ারটি উপভোগ করার জন্যে জৈবিক অনুভূতি থাকতে হয়। আমরা আমাদের কপোট্রন পরিবর্তন করে জৈবিক অনুভূতি তৈরি করেছি।
সত্যি?
হ্যাঁ, সত্যি। আমাদের অসাধ্য কিছু নয়। আমাদের মাঝে মানুষের সীমাবদ্ধতা নেই। আমরা এখন পঙ্কিল কুসুম উপভোগ করতে পারব। সেখানে আমাদের যেসব তথ্য শেখানো হবে আমরা সেগুলো টিয়ারার উপরে পরীক্ষা করে দেখব।
ও।
কুরু জিজ্ঞেস করল, আমরা চেষ্টা করেছি সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটিকে আনতে। তোমার কী মনে হয়, টিয়ারা সুন্দরী?
হ্যাঁ, সুন্দরী।
তার দেহ? জৈবিক অনুভূতিতে দেহ গুরুত্বপূর্ণ। তার দেহের গঠন কি ভালো?
তার দেহের গঠন ভালো।
তার দেহের গঠন ভালো করে দেখার জন্যে তাকে কি অনাবৃত করার প্রয়োজন আছে?
আমি মাথা নাড়লাম, না নেই।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। কুরু আবার জিজ্ঞেস করে, তুমি কি আর কিছু বলতে চাও?
না। আমি আর কিছু বলতে চাই না। আমি ফিরে যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বললাম, তোমরা কি পঙ্কিল কুসুমটি উপভোগ করেছ?
খানিকটা দেখেছি কিন্তু জৈবিক অনুভূতি নেই বলে উপভোগ করতে পারি নি।
সফটওয়ারের ত্রুটিটি কি চোখে পড়েছে?
কী ক্রটি?
তোমরা নিশ্চয়ই দেখবে। এই সফটওয়ারেরও একটা বড় ত্রুটি রয়েছে। হঠাৎ করে একটা ভয়ঙ্কর দৃশ্য হাজির হয়।
কী দৃশ্য?
তোমরা নিজেরাই দেখবে।
বাহাত্তর হঠাৎ কঠিন গলায় বলল, আমি জানতে চাই দৃশ্যটিতে কী আছে।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, হঠাৎ করে দেখা যায় একটা প্রাণী– তার মুখ সাদা রঙের, একটা ভয়ঙ্কর অস্ত্র হাতে হাজির হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। খুব আতঙ্ক হয় তখন।
বাহাত্তর হা হা করে হেসে বলল, তোমরা মানুষেরা কাপুরুষ। খুব অল্পতে তোমরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাও।
যেখানে আতঙ্কিত হওয়ার কথা সেখানে আতঙ্কিত হওয়া মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয়। আমি সে কারণে পঙ্কিল কুসুম দেখতে পারি না, কখন হবে জানা নেই বলে সর্বক্ষণ আতঙ্কিত হয়ে থাকি।
কুরু মাথা নেড়ে বলল, কাল্পনিক দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো অর্থ নেই।
দৃশ্যটি অত্যন্ত বাস্তব। প্রাণীটি মানুষের মতো, শুধু মুখটি কাগজের মতো সাদা। কখনো খালি হাতে আসে, কখনো অস্ত্র হাতে আসে। কখনো কখনো চারপাশে গুলি করে আবার কখনো সোজাসুজি মাথায় গুলি করে। অসম্ভব আতঙ্ক হয় তখন কিন্তু গুলি করার পর আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। সবচেয়ে জমকালো অংশটি শুরু হয় তখন।
বাহাত্তর মাথা নেড়ে বলল, তোমরা মানুষেরা খুব অল্পে কাতর হয়ে যাও। গ্যালাক্সি সাত সফটওয়ারে ব্ল্যাকহোলে যখন ডুবে যাচ্ছিলাম তখন ক্লাউনের মাথাটি এমন কিছু খারাপ ব্যাপার ছিল না। সেটা অত্যন্ত হাস্যকর ছিল।
আমি তোমাদের আগে থেকে বলে রেখেছিলাম। তোমরা যদি না জানতে আমি নিশ্চিত তোমরা অত্যন্ত চমকে উঠতে। আমার মনে হয় পঙ্কিল কুসুমেও সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটি দেখে তোমরা আর ভয় পাবে না। যখন দৃশ্যটি হাজির হবে তোমরা সেটি শেষ হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করবে।
বাহাত্তর তার ফটোসেলের চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, সফটওয়ারের ত্রুটিগুলোর কথা আমাদের আগে থেকে বলে দেয়ায় জন্যে ধন্যবাদ। তোমাকে সে জন্যে আমরা কি কোনোভাবে পুরস্কৃত করতে পারি?
হ্যাঁ।
কীভাবে? আমাকে চলে যেতে দাও।
না, বাহাত্তর মাথা নেড়ে বলল, তোমাকে আমরা চলে যেতে দিতে পারি না। তোমাকে আমরা প্রথম যখন পেয়েছিলাম তখন তোমার মূল্য খুব বেশি ছিল না। নানা কারণে গ্রুস্টান মনে করে তুমি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ, এখন তোমার মূল্য অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তোমাকে ফেরত দিয়ে আমরা হয়তো নবম মাত্রার পরাবাস্তব কিছু সফটওয়ার পেতে পারি। তোমাকে আমরা ছাড়ব না, কিন্তু অন্য কোনোভাবে পুরস্কৃত করতে পারি।
কীভাবে?
তোমার জন্যে একটি সুন্দরী নারী ধরে আনতে পারি।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, তার কোনো প্রয়োজন নেই।
আমি যখন হেঁটে চলে আসছি তখন শুনতে পেলাম কুরু বাহাত্তরকে বলছে, মানুষ সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ভাবাবেগে পরিচালিত প্রাণী। এটি বিচিত্র কোনো ব্যাপার নয় যে তারা তাদের সভ্যতাকে এভাবে ধ্বংস করেছে।
আমি যখন রবোটগুলোর সাথে কথা বলছিলাম তখন ক্রিশি টিয়ারার কাছে দাঁড়িয়েছিল। আমাকে ফিরে আসতে দেখে সে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, আমি মহামান্য টিয়ারার সাথে কথা বলছিলাম। তিনি আপনার সম্পূর্ণ অযৌক্তিক কথা পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন আপনি সত্যিই তাকে রক্ষা করবেন।
মানুষের সবসময়ে মানুষকে বিশ্বাস করতে হয়।
কিন্তু এই বিশ্বাসটি অযৌক্তিক। এর সম্ভাবনা দশমিক শূন্য শূন্য সাত। আমি কি মহামান্য টিয়ারাকে আত্মহত্যার জন্যে প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলব?
তার প্রয়োজন নেই। আমি আর ক্রিশি কথা বলতে বলতে অনেক দূর হেঁটে চলে এসেছি। আমি রবোটগুলোর দিকে পিছন দিয়ে ক্রিশিকে নিচু গলায় বললাম, তুমি কি আমাকে খানিকটা সাদা রং যোগাড় করে দিতে পারবে?
সাদা রং?
হ্যাঁ, ধবধবে সাদা।
অবশ্যি পারব মহামান্য কুশান। আমি কিছু জিংক দেখেছি সেটাকে পুড়িয়ে জিংক অক্সাইড তৈরি করে নেব।
সাদা রংটি দিয়ে আমি কী করব ক্রিশি জানতে চাইল না। এ কারণে সঙ্গী হিসেবে আমি নিম্ন শ্রেণীর রবোটকে পছন্দ করি। তারা কখনোই অকারণে কৌতূহল দেখায় না।
বিকেলবেলায় রবোটগুলো তাদের কপোট্রনে পঙ্কিল কুসুম সফটওয়ারটি ব্যবহার করতে শুরু করল। আমি দেখতে পেলাম প্রথম দিকে তাদের খানিকটা অসুবিধে হচ্ছিল, কয়েকবার তাদের কপোট্রনের যোগাযোগ বন্ধ করে আবার নূতন করে শুরু করতে হল। কয়েকটি রবোটের কপোট্রন খুলে ফেলে ভিতরে কিছু একটা করা হল, এবং শেষ পর্যন্ত একজন একজন করে সবাই পঙ্কিল কুসুম সফটওয়ারটিতে নিমগ্ন হয়ে গেল। তাদের দেহ নিস্পন্দ হয়ে আসে, বুকের ভিতর ক্রায়োজেনিক পাম্প গুঞ্জন করে তাদের কপোট্রন শীতল করতে শুরু করে। রবোটগুলোকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই কিন্তু তাদের কপোট্রনে প্রতি সেকেন্ডে কয়েক ট্রিলিয়ন নানা আকারের তথ্যের আদান প্রদান শুরু হয়ে গেছে।
আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রবোটগুলোকে দেখতে থাকি। সফটওয়ারটিতে আরো গভীরভাবে নিমজ্জিত হওয়ার জন্যে রবোটগুলোকে আমার আরো খানিকক্ষণ সময় দেয়া দরকার। টিয়ারা আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল, সে খানিকক্ষণ রবোটগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বলল, কী ভয়ানক দেখতে রবোটগুলো!
হ্যাঁ। আমি মাথা নাড়ি, অনেক ভয়ানক।
টিয়ারা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, মানুষের লোকালয়ে তোমার সম্পর্কে অনেক রকম গল্প প্রচলিত আছে।
আমি টিয়ারার দিকে তাকালাম। একবার ভাবলাম জিজ্ঞেস করি কী গল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করলাম না। একটু হেসে বললাম, মনে হচ্ছে তুমি আমার সম্পর্কে অনেক কিছু জান! আশা করছি সব বিশ্বাস কর নি। আমি অবশ্যি তোমার নাম ছাড়া আর কিছুই জানি না।
আমি একটা সাধারণ মেয়ে, আমার সম্পর্কে জানার বিশেষ কিছু নেই। শু
নে খুব খুশি হলাম, অসাধারণ মানুষে আমার কোনো কৌতূহল নেই।
কেন?
তাদের সম্পর্কে অনেক রকম বানানো গল্প বলে বেড়ানো হয়।
টিয়ারা কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী কর টিয়ারা?
আমি? টিয়ারা হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি কিছু করি না। আমার খুব ইচ্ছে করে খুব ইচ্ছে করে–
কী ইচ্ছে করে?
আমার খুব ইচ্ছে করে একটি শিশুকে পেতে। আমি তাহলে শিশুটিকে বুকে চেপে ধরে রাখতাম, রাত্রিবেলা তাকে গান শুনাতাম–
তুমি কি গ্রুস্টানের কাছে আবেদন করেছ?
করেছি। গ্রুস্টান বলেছে আগে আমাকে একজন মানুষকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে হবে।
তুমি কি সঙ্গী বেছে নিয়েছ?
টিয়ারা আবার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এখনো বেছে নিই নি কিন্তু কাকে নেব ঠিক করেছি।
তাকে তুমি ভালবাস?
টিয়ারা নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, না।
তাহলে কেন তাকে বেছে নিলে?
সে গ্রুস্টানের প্রিয় মানুষ। সে বলেছে আমাকে একটা শিশু এনে দেবে।
টিয়ারা ঘুরে আমার দিকে তাকাল, তার চোখে পানি টলটল করছে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে বলল, আমি জানি না কেন আমি তোমাকে এসব বলছি।
আমি জানি
কেন?
দুঃখের কথা কাউকে বলতে হয়। সবচেয়ে ভালো হয় অপরিচিত কাউকে বললে, যার সাথে হঠাৎ দেখা হয়েছে কিছুক্ষণ পর যে হারিয়ে যায় আর কোনোদিন দেখা হবে না। আমি আমার দুঃখের কথা কাকে বলি জান?
কাকে?
ক্রিশিকে।
সে খুব ভালো শ্রোতা।
টিয়ারা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল, তাকে এই প্রথম আমি হাসতে দেখলাম। হাসলে তাকে এত সুন্দর দেখায় কে জানত। আমি হঠাৎ বুকের মাঝে এক ধরনের কষ্ট অনুভব করি।
আমি একটা নিশ্বাস ফেলে বললাম, এ রকম হওয়ার কথা ছিল না।
কী রকম?
একটি মানুষকে একটা শিশুর জন্যে যন্ত্রের কাছে ভিক্ষা চাইতে হয়।
টিয়ারা হঠাৎ ভয় পেয়ে আমার দিকে তাকাল, জিজ্ঞেস করল, তাহলে কেমন করে সে শিশু পাবে?
যেরকম করে শিশু পাওয়ার কথা। ভালবাসা দিয়ে। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে একজন আরেকজনকে ভালবাসবে–সেখান থেকে জন্ম নেবে সন্তান।
কী বলছ তুমি? পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে, তেজস্ক্রিয়তায় মানুষের শরীর বিষাক্ত হয়ে আছে। শিশুর জন্ম দিলে সেই শিশু হবে বিকলাঙ্গ
মিথ্যা কথা। সব মিথ্যা কথা। সব গ্রুষ্টানের মিথ্যা কথা।
টিয়ারা আমার দিকে কেমন বিচিত্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমি আবার রবোটগুলোর দিকে তাকালাম, অনেকক্ষণ থেকে সেগুলো স্থির হয়ে আছে, মনে হয় পঙ্কিল কুসুমের জৈবিক আলোড়ন তাদের কপোট্রনকে হতচকিত করে রেখেছে।
আমি পকেট থেকে জিংক অক্সাইডের একটা ছোট কৌটা বের করে সেখান থেকে সাদা রং বের করে আমার মুখে লাগাতে থাকি। টিয়ারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী করছ তুমি?
আমি মুখে রং লাগাতে লাগাতে বললাম, ব্যাপারটা এত অযৌক্তিক যে ব্যাখ্যা করার মতো নয়! করলেও তুমি বুঝবে বলে মনে হয় না। কাজেই তুমি জিজ্ঞেস কোরো না।
মুখে রং লাগিয়ে তুমি কী করবে?
আমি সোজা রবোটগুলোর কাছে হেঁটে যাব। তারপর মাটিতে রাখা অস্ত্রটি তুলে ওদের কপোট্রন উড়িয়ে দেব।
তুমি–তুমি–টিয়ারা ঠিক বুঝতে পারে না আমি কী বলছি। কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তুমি ওদের কপোট্রনে গুলি করবে?
হ্যাঁ।
তারা তোমাকে গুলি করতে দেবে কেন?
দেবার কথা নয়। কিন্তু একটা ছোট সম্ভাবনা রয়েছে যে আমাকে গুলি করতে দেবে।
কিন্তু কেন?
কারণ আমার মুখে সাদা রং।
টিয়ারা কিছু বুঝতে না পেরে বিস্তারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমি তার নরম চুল স্পর্শ করে বললাম, আমি যাই টিয়ারা। তোমার সাথে আবার দেখা হবে কি না আমি জানি না। যদি না হয়, তুমি–
আমি?
তুমি ক্রিশির সাথে কথা বোলো। তার কথা শুনো, মনে হয় সেটাই তোমার জন্যে সবচেয়ে ভালো।
আমি দেখতে পেলাম ধীরে ধীরে টিয়ারার রক্তশূন্য হয়ে যাচ্ছে। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম, তারপর লম্বা পা ফেলে রবোটগুলোর দিকে হেঁটে যেতে থাকি।
রবোটগুলো আমাকে নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছে কারণ আমি দেখলাম তারা তাদের ফটোসেলের চোখ দিয়ে আমাকে অনুসরণ করছে। অন্য সময় হলে আমাকে চিনতে কোনো অসুবিধে হত না কিন্তু এখন মূল কপেট্রন সফটওয়ারটি নিয়ে ব্যস্ত, হয়তো আমাকে চিনতে পারবে না। আমি তাদেরকে আরো বিভ্রান্ত করে দেবার জন্যে সম্পূর্ণ অকারণে দুই হাত উপরে তুলে উল্টো দিকে ছুটে গিয়ে আবার ফিরে এলাম। পঙ্কিল কুসুমের ত্রুটিটিতে যে প্রাণীটির কথা বলেছি সেটা একটু অস্বাভাবিক হওয়া বাঞ্ছনীয়! আমি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ ধীর পায়ে বাহাত্তরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। আমার হৃৎপিণ্ড ধকধক করে শব্দ করতে থাকে, সত্যিই কি রবোটগুলো আমাকে সফটওয়ারের একটা ত্রুটি হিসেবে ধরে নেবে? এই অত্যন্ত সহজ ফাঁদটিতে কি পা দেবে এই রবোটগুলো?
আমার চিন্তা করার সময় নেই, কী হবে আমি জানি না। সমস্ত পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আমি রবোটটার দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম। রবোটটি একটুও নড়ল না, আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমি তার সামনে গিয়ে পাশে রাখা অস্ত্রটি তুলে নিলাম, রবোটটি বাধা দিল না। আমি দুই পা পিছনে সরে এসে অস্ত্রটি রবোটটার কপোট্রনের দিকে লক্ষ করে হঠাৎ প্রাণপণে ট্রিগার টেনে ধরি। বাহাত্তরের কপোট্রন চূর্ণ হয়ে উড়ে যায় মুহর্তে। ট্রিগার টেনে ধরে রেখেই আমি ক্ষিপ্র হাতে অস্ত্রটি ঘুরিয়ে নেই অন্য রবোটগুলোর দিকে, মুহূর্তে আমার চারপাশে ছয়টি রোবটের শবদেহ পড়ে থাকে। কালো ধোঁয়া বের হতে থাকে তাদের মাথা থেকে।
আমি তখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না যে সত্যিই রবোটগুলোকে ধ্বংস করে ফেলেছি। একটি নয় দুটি নয় ছয় ছয়টি ভয়ঙ্কর নৃশংস রবোট আমার পায়ের কাছে পড়ে আছে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আমি আর নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না, সেখানে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লাম। আমার সমস্ত শরীর ঘামছে কুলকুল করে, হাত কাঁপছে, কিছুতেই থামাতে পারছি না। হঠাৎ করে আমার সমস্ত শরীর কেমন যেন গুলিয়ে আসে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখটা মুছে নিতেই আমার হাতে সাদা রং উঠে এল। কী আশ্চর্য! সত্যিই? তাহলে আমি টিয়ারাকে রক্ষা করে ফেলেছি–ঠিক যেরকম তাকে কথা দিয়েছিলাম!
টিয়ারা হেঁটে হেঁটে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আমার দিকে তখনো বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে বললাম, রবোটগুলো নিজেদের যত বুদ্ধিমান ভেবেছিল আসলে তত বুদ্ধিমান নয়! কী বল?
তুমি–তুমি–তুমি কেমন করে করলে?
জানি না! কখনো ভাবি নি ফন্দিটা কাজ করবে। হয়তো সত্যিই ভাগ্য বলে কিছু আছে।
ঠিক তখন ক্রিশি হেঁটে আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে। বললাম, ক্রিশি! তুমি বলেছিলে আমাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শতকরা দশমিক শূন্য শূন্য সাত। এখন কী বলবে?
আমার হিসেবে তাই ছিল।
তোমার হিসেব খুব ভালো বলা যায় না!
আমার হিসেব সাধারণত যথেষ্ট ভালো। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে মানুষ হঠাৎ করে বিচিত্র যেসব সমাধান বের করে ফেলে আমার সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।
থাকার কথা না। আমার নিজেরও নেই। আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ক্রিশি এখন তোমার কয়েকটা কাজ করতে হবে।
কী কাজ?
প্রথমত আমার আর টিয়ারার ট্রাকিওশান দুটি খুলে বা বের করে আন। তারপর খুঁজে খুঁজে খানিকটা ওষুধ বের করে আন যেন আমার হাতের এই বিচ্ছিরি ঘা–টা শুকানো যায়। সবশেষে সারা দুনিয়া খুঁজে যেখান থেকে পার চমৎকার কিছু খাবার আর পানীয় নিয়ে এস– আজ আমি টিয়ারার সম্মানে একটা ভোজ দিতে চাই।
আমার সম্মানে? টিয়ারা হেসে বলল, কেন?
কারণ আজ ভোরে আমার আত্মহত্যা করার কথা ছিল। তুমি এসেছিলে বলে করা হয় নি! আক্ষরিক অর্থে তুমি আমাকে আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছ।
টিয়ারা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। তার সেই দৃষ্টিতে হঠাৎ আমার বুকের ভিতর সবকিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যায়।
