দ্বিতীয় পর্ব

সায়েন্স ফিকশন সমগ্র

#ইরাকাস - মুহম্মদ জাফর ইকবাল



ডক্টর সেলিম বিস্ফারিত চোখে কেবিনেটে উপুড় করে রাখা শিশুটির দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট বাচ্চাটি তার মাথাটি উঁচু করার চেষ্টা করছে, ঘাড় এখনো শক্ত হয়নি তাই মাথাটা অল্প অল্প দুলছে। একটা হাতে নিজেকে ভর দিয়ে রেখেছে, অন্য হাতটা নিজের মুখে। ছোট মুখে তার হাতটা ঢোকানো সম্ভব নয়, বাচ্চাটি সেটা জানে না, সে প্রাণপণে সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে। তার বড় বড় চোখ, সে সামনে তাকিয়ে আছে কিন্তু আলাদা করে কিছু একটা দেখছে বলে মনে হয় না।

ডক্টর সেলিম অবশ্যি ছোট শিশুটির এসব কিছুই দেখছিল না, সে হতবাক হয়ে বাচ্চাটির পিঠের দিকে তাকিয়ে ছিল, সেখানে ছোট ছোট দুটি পাখা এবং পাখাগুলো মাঝে মাঝে নড়ছে। ডক্টর সেলিম সাবধানে একটা পাখাকে স্পর্শ করতেই পাখাটা একটা ছোট ঝাঁপটা দিল এবং ডক্টর সেলিম সাথে সাথে তার হাত সরিয়ে নিল। সে ঝুঁকে পড়ে পিঠের ঠিক যেখান থেকে পাখাটা বের হয়ে এসেছে সে জায়গাটুকু লক্ষ করল, তারপর সোজা হয়ে। দাঁড়িয়ে জহুরের দিকে তাকিয়ে বলল, এটা কার বাচ্চা? কোথা থেকে এসেছে?

বাচ্চার দায়িত্ব কার, সেটা যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে বলা যায় দায়িত্ব আমার।

বাচ্চাটার পাখা কোথা থেকে এসেছে?

জহুর জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, সেইটা অনেক বড় ইতিহাস।

ইতিহাসটা কী? বাচ্চাটা কার? বাবা-মা কে?

বাবা নাই। টেস্টটিউব বেবি না কী বলে সেইটা—আপনারা ভালো বুঝবেন। আর মা–

মা?

মা মারা গেছে। বাচ্চাটা জন্ম দেয়ার পরই মারা গেছে। মারা যাওয়ার সময় আমার হাত ধরে আমাকে বাচ্চাটা দিয়ে গেছে। বলেছে দেখে শুনে রাখতে। বলেছে—

শিশুটির মা মৃত্যুর ঠিক আগে জহুরকে কী বলে গেছে ডক্টর সেলিম সেটা শুনতে কোনো আগ্রহ দেখাল না, জিজ্ঞেস করল, এই বাচ্চাটাকে দেখে ডাক্তাররা কী বলেছে?

জহুর বলল, কোনো ডাক্তার বাচ্চাটারে দেখে নাই। আপনি প্রথম।

ডক্টর সেলিম কেমন যেন চমকে উঠল, বলল, আমি প্রথম? এর আগে কেউ দেখে নাই?

না।

বাচ্চাটার যখন জন্ম হয়—

কেউ ছিল না। শুধু আমি।

শুধু আপনি? কেন?

জহুর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সেটা অনেক লম্বা ইতিহাস।

ডক্টর সেলিমের লম্বা ইতিহাস শোনার ধৈর্য নেই, জিজ্ঞেস করল, আমার আগে কোনো ডাক্তার এই বাচ্চাকে দেখে নাই?

শুধু ডাক্তার না, কোনো মানুষও দেখে নাই।

ডক্টর সেলিমের চোখ দুটি চকচক করে ওঠে, কোনো মানুষ দেখে নাই?

নাহ। জহুর ইতস্তত করে বলল, বুঝতেই পারছেন। এই বাচ্চাটাকে কেউ দেখলেই হইচই শুরু করে দেবে।

ডক্টর সেলিম মাথা নাড়ল, বলল, সেটা আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনি আর কাউকে না দেখিয়ে যে আমার কাছে এনেছেন সেটা ঠিকই করেছেন।

জহুর বলল, জি। আমি চাই না এটা জানাজানি হোক। যাই হোক আমি আপনার কাছে একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে এসেছি।

কী উদ্দেশ্য।

জহুর বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি এর ডানা দুটি কেটে দিবেন।

ডক্টর সেলিম একটু চমকে উঠল, কেটে দিব?

জি স্যার। এর পাখা দুটি কেটে দিলে তাকে নিয়ে কেউ কোনো কথা বলবে না। তা না হলে এর জীবনটা অসহ্য হয়ে উঠবে।

ডক্টর সেলিম সাবধানে বাচ্চাটার পাখাটা স্পর্শ করে জুহুৱের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন। পাখা নিয়ে বড় হলে এর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।

এই অপারেশন করতে কত লাগবে আমাকে বলবেন? আমি খুব গরিব মানুষ, অনেক কষ্টে কিছু টাকার ব্যবস্থা করেছি।

ডক্টর সেলিম বলল, আরে! কী বলছেন আপনি। এই বাচ্চাটাকে ঠিক করে দেয়ার টাকা নিয়ে আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন?

জহুর ডক্টর সেলিমের মুখের দিকে তাকালো, হঠাৎ করে সে বুঝতে পারল এই মানুষটি আসলে তার সাথে মিথ্যা কথা বলছে। বাচ্চাটার অপারেশন করা থেকে অন্য কিছুতে তার আগ্রহ বেশি। সাথে সাথে তার মুখ কঠিন হয়ে যায়। সে শীতল গলায় বলল, ডাক্তার সাহেব।

বলেন।

আপনি আমাকে বলেন কত খরচ হবে। আমি তারপর অন্য কোনো ডাক্তারের কাছে যাব।

ডক্টর সেলিম ভুরু কুঁচকে বলল, কেন? অন্য কোনো ডাক্তারের কাছে কেন?

একটা বাচ্চার পিঠে পাখা থাকাটা স্বাভাবিক ব্যাপার না, সেটা কয়েকজনকে দেখিয়ে ঠিক করা ভালো।

ডক্টর সেলিম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন দরজায় শব্দ হলো, মেয়ের গলায় কেউ একজন বলল, স্যার।

ডক্টর সেলিম অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে একটা টাওয়েল দিয়ে বাচ্চাটার ঘাড় পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে বলল, কে? নাসরীন?

জি স্যার। ডক্টর সেলিম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে কম বয়সী একটা মেয়ে ডক্টর সেলিমের চেম্বারে ঢুকে গেল। তার শরীরে ডাক্তারের সবুজ রঙের অ্যাপ্রন, গলায় স্টেথিস্কোপ। চোখে চশমা, চেহারায় কেমন জানি এক ধরনের সজীবতা রয়েছে।

ডক্টর সেলিম বলল, কী ব্যাপার?।

নাসরীন নামের ডাক্তার মেয়েটা বলল, চার নম্বর কেবিনের বাচ্চাটা। আমার মনে হয় সার্জারি না করাটাই ঠিক হবে যেহেতু ফিফটি ফিফটি চান্স, ফেমিলির ওপর বার্ডেন না দেয়াই ভালো।

ডক্টর সেলিম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, সেই মুহূর্তে নাসরীন হঠাৎ করে ক্যাবিনেটে শুইয়ে রাখা বাচ্চাটাকে দেখে এবং সাথে সাথে তার মুখে মধুর এক ধরনের হাসি ছড়িয়ে পড়ে। সে কাছে এগিয়ে বলে, ও মা! কী সুন্দর বাচ্চাটা! একেবারে পরীর মতো চেহারা!

ডক্টর সেলিম হাত দিয়ে নাসরীনকে থামিয়ে দিয়ে বলল, কাছে যেয়ো না।

নাসরীন অবাক হয়ে বলল, কেন স্যার?

ডক্টর সেলিম আমতা আমতা করে বলল, এটা স্পেশাল কেস। এটার জন্যে বিশেষ একটা ব্যবস্থা দরকার।

নাসরীন জহুরের দিকে তাকালো, জিজ্ঞেস করল, স্পেশাল কেস? কী হয়েছে?

জহুর মেয়েটির মুখের দিকে তাকায় এবং হঠাৎ করে কেমন যেন আশ্বস্ত অনুভব করে। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, আপা। আপনিও দেখেন।

ডক্টর সেলিম জহুরকে থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু জহুর তাকে ঠেলে সরিয়ে কাছে গিয়ে বাচ্চাটার উপর থেকে টাওয়েলটা সরিয়ে নেয়।

নাসরীন বাচ্চাটাকে দেখে বিস্ময়ে একটা চিৎকার করে ওঠে। অনেকক্ষণ সে দুই হাতে নিজের মুখ ঢেকে রাখে, তারপর কাছে গিয়ে প্রথমে তাকে আলতোভাবে স্পর্শ করে, তারপর সাবধানে তাকে কোলে তুলে নেয়। বাচ্চাটি নাসরীনকে দেখে তার দাঁতহীন মুখে একটা হাসি দিয়ে হাত বাড়িয়ে তার চশমাটা ধরার চেষ্টা করল।

কয়েক মুহূর্ত নাসরীন কোনো কথা বলতে পারল না, তারপর একটু চেষ্টা করে বলল, একেবারে পাখির পালকের মতো হালকা!

জহুর মাথা নাড়ল, কি আপা। একেবারে হালকা, কিন্তু বাচ্চাটা অনেক শক্ত।

এটা কার বাচ্চা?

জহুর বলল, সেটা অনেক লম্বা ইতিহাস।

নাসরীনের ইতিহাসটা শোনার কৌতূহলের অভাব নেই, জিজ্ঞেস করল, কী ইতিহাস শুনি। বলেন।

ডক্টর সেলিম এই বারে বাধা দিল, বলল, নাসরীন, তুমি বাচ্চাটাকে ক্যাবিনেটে রেখে দাও। আর খবরদার এর কথা কাউকে বলবে না। কাউকে না। নেভার।

নাসরীন সাবধানে বাচ্চাটাকে ক্যাবিনেটে রেখে বলল, ঠিক আছে স্যার বলব না। কিন্তু স্যার এটা কেমন করে সম্ভব?

সেটা আমি এখনো জানি না, কিন্তু দেখতেই পাচ্ছ এটা সম্ভব।

জহুর নাসরীনের দিকে তাকিয়ে বলল, আপা। আপনিও তো ডাক্তার। তাই না?

হ্যাঁ। আমিও ডাক্তার তবে খুবই ছোট ডাক্তার। মাত্র পাস করেছি। সে ডক্টর সেলিমকে দেখিয়ে বলল, স্যার আমাদের মাঝে সবচেয়ে বড় ডাক্তার। ডাক্তারদেরও ডাক্তার।

জহুর কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে বড় ডাক্তারের চেয়ে এই ছোট ডাক্তারের মাঝে এক ধরনের ভরসা খুঁজে পেল। সে নিচু গলায় বলল, আপা। এই বাচ্চাটার ডানা দুটি আমি অপারেশন করে কাটতে চাই–

নাসরীন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনি আমাদের কাছে এনেছেন, যেটা তার জন্যে ভালো হয় সেটাই করা হবে।

জহুর সাথে সাথে কেমন করে জানি বুঝতে পারল এই মেয়েটি যে কথাগুলো বলছে সেটা সে সত্যি সত্যি বিশ্বাস করেই বলছে। সে এবারে ঘুরে নাসরীনের দিকে তাকালো, বলল, আপা আমি অনেক চিন্তা করে দেখেছি। এই ছেলেটার জন্যে এই পাখা দুইটা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো গতি নাই। যদি তার পাখা থাকে সে হবে একটা চিড়িয়া। যেই তাকে দেখবে সেই তাকে ধরে সার্কাসে বিক্রি করে দেবার চেষ্টা করবে।

নাসরীন মাথা নাড়ল, বলল, ঠিকই বলেছেন। কিন্তু এ রকম একটা বাচ্চা এত আশ্চর্য যে সায়েন্টিফিক কমিউনিটি যখন জানবে তখন একেবারে পাগল হয়ে যাবে!

পাগল হয়ে যাবে?

হ্যাঁ।

পাগল হয়ে কী করবে?

দেখতে চাইবে। বুঝতে চাইবে।

কেমন করে দেখাতে চাইবে?

নাসরীন বলল, সেটা আমি ঠিক জানি না। বৈজ্ঞানিকদের সবকিছু নিয়ে কৌতূহল থাকে।

জহুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আপা, বৈজ্ঞানিকরা যেন এই বাচ্চার খোঁজ না পায়।

কেন?

বাচ্চার মা আমার হাত ধরে দায়িত্বটা দিয়ে গেছে। মারা যাবার ঠিক আগে আমাকে বলেছে—

জহুর একটু আগেই ঘটনাটা ডক্টর সেলিমকে বলার চেষ্টা করেছিল সে শুনতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি, নাসরীন খুব আগ্রহ নিয়ে শুনল এবং শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, শুনে আমার খুবই খারাপ লাগছে, বেচারি এত কম বয়সে এত বড় কষ্টের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। আহারে!

জহুর বলল, আমি চাই না বাচ্চাটাও কষ্টের ভেতর দিয়ে যাক। সেই জন্যে বড় হবার আগেই তার পাখা দুটি কেটে ফেলতে চাই।

নাসরীন একবার ডক্টর সেলিমের দিকে তাকালো তারপর ইতস্তত করে বলল, আপনার কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু আমরা তো এত ছোট বাচ্চার ওপর হঠাৎ করে এ রকম একটা অপারেশন করে ফেলতে পারি না। কিছু করার আগে এর এনাটমিটা বুঝতে হবে। মানুষের শরীরে কোথায় কী আমরা জানি কোন গুরুত্বপূর্ণ আর্টারি কোন দিক দিয়ে গিয়েছে সেটা। আমাদের শিখানো হয়। কিন্তু এই বাচ্চাটা তো অন্য রকম, কোনো রকম স্টাডি না করে চট করে পাখা দুটি তো কেটে ফেলতে পারি না।

জহুর মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে। সেটা আমি বুঝতে পারছি। আপনি তাহলে একটু দেখেন, দেখে বলেন—

ডক্টর সেলিম এবারে আলোচনায় যোগ দেয়ার চেষ্টা করল, বলল, আমিও তো আপনাকে সেটাই বলছিলাম। আমরা একটু স্টাডি করে দেখি।

জহুর ডক্টর সেলিমের দৃষ্টি এড়িয়ে নাসরীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কতক্ষণ লাগবে বলতে?

নাসরীন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ডক্টর সেলিম বাধা দিয়ে বলল, এক সপ্তাহ তো মিনিমাম।

উঁহু। জহুর মাথা নাড়ল, এই বাচ্চাকে এক সপ্তাহ হাসপাতালে রাখার ক্ষমতা আমার নাই–

সেটা নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। এইটা আমাদের নিজস্ব হাসপাতাল, আমরা কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেব। আপনি বাচ্চাটাকে রেখে যান, এক সপ্তাহ পরে আসেন।

জহুর ডক্টর সেলিমের দিকে তাকিয়ে তার কথাটি শুনল, কিন্তু উত্তর দিল নাসরীনের দিকে তাকিয়ে, বলল, আপা! এই বাচ্চাটার তো মা নাই, আমি বুকে ধরে মানুষ করেছি। আমি তো তারে এক সপ্তাহের জন্যে রেখে যেতে পারব না।

নাসরীন বলল, ছোট বাচ্চাদের বেলায় আমরা মাদের সাথে থাকতে দেই। এই বাচ্চাটার জন্যে আমরা নিশ্চয়ই আপনাকে থাকতে দেব।

ডক্টর সেলিম বাধা দিয়ে বলল, না-না-না সেটা এখনই বলা যাবে। আমাদের স্টাডি করতে সময় নেবে, সব সময় আপনি থাকতে পারবেন না। এটা খুবই আনয়ুজুয়াল কেস।

জহুর এবার এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাটিকে কাপড়ে জড়িয়ে কোলে তুলে নিতে থাকে, ডক্টর সেলিম অবাক হয়ে বলল, কী করছেন? আপনি কী করছেন?

আমি এই বাচ্চাকে এক সেকেন্ডের জন্যেও চোখের আড়াল করব না। আমি বাচ্চাটাকে নিয়ে যাচ্ছি। অন্য কোথাও যাব।

ডক্টর সেলিম বলল, দাঁড়ান। দাঁড়ান আগেই এত ব্যস্ত হবেন না। দেখি অমির কী করা যায়।

জহুর নাসরীনের দিকে তাকিয়ে বলল, আপা। আপনি যদি বলেন তাহলে আমি থাকব, তা না হলে আমি আমার এই বাচ্চাকে নিয়ে চলে যাব।

নাসরীন একটু অবাক হয়ে একবার ডক্টর সেলিমের দিকে আরেকবার জহুরের দিকে তাকালো, তারপর ইতস্তত করে বলল, আমি খুব জুনিয়র ডাক্তার। এই স্যারের আন্ডারে কাজ করি, কাজ শিখি। আমার কথার কোনো গুরুত্ব নাই, আপনাকে এই স্যারের কথা বিশ্বাস করতে হবে।

জহুর মাথা নাড়ল, বলল, আমি খুব গরিব মানুষ, সাধারণ মানুষ। কে কী করে আমি জানি না। আমি মানুষের মুখের কথায় বিশ্বাস করে সিদ্ধান্ত নেই। আপা, আপনি আমাকে যদি বলেন আমি থাকব, তা না হলে আমি চলে যাব।

ডক্টর সেলিম জহুরকে বলল, ঠিক আছে ঠিক আছে-আপনি পাঁচ মিনিট এই ঘরে বসেন। আমি নাসরীনের সাথে দুই মিনিট কথা বলে আসছি।

ডক্টর সেলিম নাসরীনকে একরকম জোর করে পাশের ঘরে নিয়ে গেল, তার চোখে-মুখে উত্তেজনা, বড় বড় করে নিঃশ্বাস পড়ছে, নাসরীনের হাত ধরে চাপা গলায় বলল, নাসরীন।

জি স্যার।

তুমি নিশ্চয়ই ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছ।

জি স্যার।

এই বাচ্চাটা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাইজ। একে আমাদের দরকার। যে কোনো মূল্যে।

নাসরীন ভুরু কুঁচকে বলল, যে কোনো মূল্যে?

হ্যাঁ। কোনো একটা কারণে এই মানুষটা আমাকে বিশ্বাস করছে না কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস করছে। বুঝেছ?

জি স্যার।

কাজেই তুমি তাকে বোঝাও। শান্ত কর, যেন বাচ্চাটাকে নিয়ে না যায়। আমার দুই ঘণ্টা সময় দরকার।

দুই ঘণ্টা!

হ্যাঁ।

নাসরীন ইতস্তত করে বলল, কিন্তু স্যার—

ডক্টর সেলিম অধৈর্য গলায় বলল, এর মাঝে কোনো কিন্তু নাই। তুমি যাও, মানুষটার সাথে কথা বল, তাকে আশ্বস্ত কর। আমি এর মাঝে ব্যবস্থা করছি।

কী ব্যবস্থা? সেটা তোমার জানার দরকার নেই। তুমি যাও।

নাসরীন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ডক্টর সেলিম তাকে সেই সুযোগ দিল না। একরকম ধাক্কা দিয়ে তার চেম্বারে পাঠিয়ে দিল।

চেম্বারের মাঝামাঝি জহুর বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তার মুখ পাথরের মতো কঠিন। নাসরীনকে ঘরে ঢুকতে দেখে বলল, আপা।

জি।

আমি কি বাচ্চাটাকে নিয়ে থাকব নাকি চলে যাব?

নাসরীন ইতস্তত করে বলল, এই বাচ্চাটাকে নিয়ে দশ জায়গায় যাওয়া হয়তো ঠিক হবে না। যত কম মানুষ এই বাচ্চাটার কথা জানে তত ভালো। আপনি যখন এখানে এসেছেন মনে হয় আপাতত এখানেই থাকেন। এটা একটা খুব সম্রান্ত হাসপাতাল, বড় বড় মানুষেরা থাকে। তারা মিলে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে পারবেন।

জহুর নাসরীনের চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ঠিক আছে আপা। আমি আপনার কথায় বিশ্বাস করে থাকলাম।

ঠিক কী কারণে জানা নেই, নাসরীন নিজের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি বোধ করতে থাকে। তার মনে হতে থাকে কোনো একটা ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে, যেটা সঠিক নয়—সেটা কী হতে পারে সে ঠিক বুঝতে পারছিল না।

ঘণ্টা দুয়েক পরে নাসরীন অবশ্যি ব্যাপারটা বুঝতে পারল। একটা পুলিশের গাড়ি হাসপাতালের পাশে এসে দাঁড়াল এবং গুরুত্ত্বপূর্ণ চেহারার কয়েকজন মানুষ ডক্টর সেলিমের সাথে এসে দেখা করল। তারা অফিসে কিছুক্ষণ নিচু গলায় কথা বলল, তারপর সবাই মিলে ডক্টর সেলিমের চেম্বারে হাজির হলো। বাচ্চাটি অনেকক্ষণ নিজে নিজে খেলা করে এখন উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে গেছে—ঘুমানোর ভঙ্গিটা একটু বিচিত্র, পেছন দিকটা উঁচু দুই পা গুটিশুটি হয়ে আছে। মুখে বিচিত্র একটা হাসি, পিঠের পাখা দুটি মাঝে মাঝে নড়ছে। ডক্টর সেলিম বাচ্চাটিকে এক নজর দেখে জহুরের দিকে তাকালো, বলল, আমরা আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি।

জহুর মানুষগুলোর দিকে তাকালো, নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়েই সে ব্যাপারটা বুঝে যায়। সে ক্লান্ত গলায় বলল, কী কথা।

ডক্টর সেলিম মুখটা অনাবশ্যকভাবে কঠিন করে বলল, এই বাচ্চাটাকে আপনাকে আমাদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যেতে হবে।

কেন?

এটি আপনার বাচ্চা না। এই বাচ্চার উপরে আপনার কোনো আইনগত অধিকার নেই। শুধু তাই না—আপনি বাচ্চাটির পাখা কেটে ফেলতে গেছেন, সেটা অমানবিক। আপনি এই বাচ্চাটির প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করতে চাইছেন।

জহুর শীতল চোখে কিছুক্ষণ ডক্টর সেলিমের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, এই বাচ্চাটির মা আমাকে এই বাচ্চাটা দিয়ে গেছে। দিয়ে বলেছে দেখে-শুনে রাখতে

ডক্টর সেলিম এবারে হাসার মতো এক ধরনের শব্দ করল, বলল, আপনি কয়েকবার এই কথাটা বলেছেন। আমার মনে হয় এটার তদন্ত হওয়া দরকার। এর মায়ের মৃত্যু কেমন করে হয়েছে? সেটা কি স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল? তাকে কি খুন করা হয়েছিল? ডেথ সার্টিফিকেট কোথায়? তাকে কোথায় কবর দেয়া হয়েছে? এসব প্রশ্নের কোনো শেষ নেই। এর যে কোনো একটি প্রশ্ন করা হলেই আপনি কিন্তু বড় ঝামেলায় পড়ে যাবেন।

জহুর শীতল গলায় বলল, আপনি প্রশ্ন করেন। দেখি আমি ঝামেলায় পড়ি কি না।

ডক্টর সেলিম জহুরের দৃষ্টি থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, সেই প্রশ্ন তো আমি করব না। করবে পুলিশ—

কোথায় পুলিশ?

গুরুত্ত্বপূর্ণ চেহারার একজন মানুষ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ডক্টর সেলিম তাকে সুযোগ না দিয়ে বলল, আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। আমি চেষ্টা করছি আপনাকে যেন পুলিশের সাথে ঝামেলায় পড়তে না হয়। এই বাচ্চাটা আপনার কেউ নয়। ঘটনাক্রমে বাচ্চাটা আপনার হাতে এসে পড়েছে-আপনার পক্ষে এর দায়িত্ব নেয়া সম্ভব নয়। প্রফেশনালদের এর দায়িত্ব নিতে হবে। আপনি প্রফেশনাল নন, এই বাচ্চাটির কখন কী প্রয়োজন হবে আপনি জানেন না। আমরা জানি। শুধু আমরাই পারি এর দায়িত্ব নিতে।

জহুর কোনো কথা না বলে শীতল চোখে ডক্টর সেলিমের দিকে তাকিয়ে রইল। ডক্টর সেলিম আবার তার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। অকারণেই কেশে একটু গলা পরিষ্কার করে বলে, বাচ্চাটার কোনো সমস্যা আছে কি না কেউ জানে না। একে ভালো করে পরীক্ষা করা দরকার। যদি শরীরে জটিল সমস্যা থাকে তাহলে চিকিৎসা করা দরকার। আপনি এত বড় দায়িত্ব কেমন করে নেবেন? আমরা আপনাকে সাহায্য করতে চাই, এই বাচ্চাটার দায়িত্ব আমরা নিতে চাই।

জহুর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনারা কি বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবেন?

ডক্টর সেলিম চমকে উঠল, থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল, মেরে ফেলব? মেরে ফেলব কেন?

এই বাচ্চাটার পাখা কেন আছে সেটা বোঝার জন্যে তাকে কেটে কুটে দেখতে হবে না? কেটে কুটে দেখার জন্যে তাকে আগে মেরে ফেলতে হবে না?

ডক্টর সেলিম থতমত খেয়ে বলল, এটা আপনি কেন বলছেন? আমি আপনার এ রকম একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য না।

জহুর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে।

আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমরা চাই আপনি কোনো রকম ঝামেলা না করে চলে যান। বাচ্চাটার ব্যাপারটা আমরা দেখব।

জহুর উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকের মুখের দিকে একবার করে তাকালো, নাসরীনের মুখের দিকে সে কয়েক সেকেন্ড বেশি তাকিয়ে রইল, নাসরীন চোখ নামিয়ে নিচু গলায় বলল, আমি দুঃখিত। কিন্তু আসলে মানে আসলে— সে বাক্যটা শেষ না করে থেমে যায়।

জহুর ক্যাবিনেটে পেছনটা উঁচু করে শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চাটার কাছে যায়, মাথা নিচু করে বাচ্চাটার দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল, তারপর মাথা ঘুরিয়ে বলল, আমি অনেক কষ্ট করে বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে তুলেছি। আসলে বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে না তুললেই ভালো হতো। তার মায়ের পাশে তাকে কবর দিতে পারতাম। আপনাদের মতো শকুনেরা তাহলে তার শরীরটাকে খুবলে খুবলে খেতে পারত না।।

বড় বড় শক্তিশালী দুজন মানুষ কোথা থেকে এসে তখন জহুরের দুই হাত ধরে তাকে টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে থাকে। জহুর যেতে চাচ্ছিল কিন্তু মানুষ দুজন তাকে জোর করে টেনে নিতে থাকে। দরজার কাছে জহুর একবার দাঁড়িয়ে গেল, পেছনে ঘুরে তাকিয়ে বলল, খোদা আপনাদের মাফ করবে কি না জানি না, আমি কোনোদিন আপনাদের মাফ করব না।

জহুরকে বের করে নিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ডক্টর সেলিম চুপ করে বসে রইল, তারপর একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে সবার দিকে ঘুরে তাকালো, মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, সবাইকে থ্যাংকস। কোনো ঝামেলা ছাড়াই ব্যাপারটা শেষ হয়েছে। যে রকম গোয়াড় ধরনের মানুষ আমি ভেবেছিলাম কী না কী করে।

গুরুত্বপূর্ণ চেহারার একজন মানুষ বলল, কিছু করতে পারত না, আমি সঙ্গে অনেক আর্মড গার্ড এনেছি।

আমি জানি। আপনাদের সাহায্য ছাড়া আমি একা এটা করতে পারতাম কি না জানি না। যাই হোক আপনারা একটা ঐতিহাসিক ঘটনার অংশ হয়ে থাকলেন। এই বাচ্চাটার অস্তিত্ব পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক কমিউনিটিতে একটা ঝড় তুলবে। একটা নূতন দিগন্ত তৈরি হবে। আপনারা দোয়া করবেন আমরা যেন তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারি।

উপস্থিত যারা ছিল তাদের কেউ কোনো কথা বলল না, শুধু গম্ভীরভাবে কলের পুতুলের মতো মাথা নাড়ল।

ছোট বাচ্চাটা চিৎকার করে কাঁদছে কিন্তু কাউকেই সেটা নিয়ে বিচলিত হতে দেখা গেল না। বাচ্চাটার সারা শরীরে নানা ধরনের মনিটর লাগিয়ে তাকে উপুড় করে শুইয়ে রাখা হয়েছে, নানারকম যন্ত্রপাতিতে তার শরীরের সব ধরনের জৈবিক কাজকর্মের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। কয়েকটা ভিডিও ক্যামেরা তার দিকে তাক করে রাখা হয়েছে। এর মাঝে তাকে নানা দিক থেকে এক্সরে করা হয়েছে, আরো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার জন্যে প্রস্তুতি চলছে।

বাচ্চার কান্নাকাটি ধীরে ধীরে নাসরীনের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে। সে টেকনিশিয়ানকে বলল, বাচ্চাটার মনে হয় খিদে লেগেছে।

কার?

এই বাচ্চাটার।

টেকনিশিয়ানের মুখে একটা বিচিত্র হাসি ফুটে ওঠে, বলে বাচ্চা? কোথায় বাচ্চা?

নাসরীন অবাক হয়ে বলল, এই যে।

টেকনিশিয়ান হা হা করে হেসে বলল, এইটা? এইটা তো মানুষের বাচ্চা না। এইটা শয়তানের বাচ্চা। মানুষের বাচ্চার কখনো পাখা থাকে?

নাসরীন অবাক হয়ে টেকনিশিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকল, কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। ইতস্তত করে বলল, শয়তানের বাচ্চা হলেও তো বাচ্চা। একটা বাচ্চার খিদে লাগে।

হ্যাঁ খিদে তো লাগেই। কিন্তু শয়তানের বাচ্চা কী খায় তা তো জানি না। কী খেতে দেব? রক্ত? টেকনিশিয়ানটি হা হা করে হাসতে লাগল যেন খুব একটা মজার কথা বলেছে।

নাসরীন নিঃশ্বাস বন্ধ করে ঘর থেকে বের হয়ে ডক্টর সেলিমের চেম্বারের দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখে ডক্টর সেলিম টেলিফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। কথাগুলো বলছে ইংরেজিতে কাজেই মনে হয় অন্য পাশে দেশের বাইরের কোনো মানুষ।

নাসরীন শুনল ডক্টর সেলিম বলছে, তুমি ভিডিও ফুটেজটা দেখেছ? কী মনে হয়?

অন্য পাশ থেকে কী বলেছে নাসরীন শুনতে পেল না কিন্তু ডক্টর সেলিমের হা হা হাসি শুনে বুঝতে পারল কথাটি নিশ্চয়ই খুব মজার। ডক্টর সেলিম বলল, তাহলে তুমি আমার এই শয়তানের বাচ্চার একটা টুকরো চাও?… কোন টুকরা…?… উঁহু। তুমি সবকিছুর এক টুকরা পাবে না। যে কোনো একটা জায়গার একটা টুকরো। হয় ফুসফুসের একটা টুকরো, তা না হয় হৃৎপিণ্ডের, না হয় মস্তিষ্কের, না হয় লিভার কিংবা রক্তের স্যাম্পলবল তুমি কী চাও?

নাসরীনের মনে হলো হড়হড় করে সে বমি করে দেবে, কোনোমতে মুখ ঢেকে সে নিঃশব্দে বের হয়ে আসে। লাউঞ্জুের একটা চেয়ারে সে কিছুক্ষণ নিজের মাথা চেপে বসে থাকে। যে মানুষটি এই বাচ্চাটাকে নিয়ে এসেছিল সে তাহলে ঠিকই অনুমান করেছে যে বাচ্চাটিকে এরা মেরে ফেলবে। এ রকম ফুটফুটে বাচ্চাকে কেমন করে মানুষ মেরে ফেলতে পারে? কেমন করে তাকে শয়তানের বাচ্চা বলতে পারে?

নাসরীন হঠাৎ করে বুঝতে পারে তার হাতগুলো থরথর করে কাঁপছে। মানুষটি এই বাচ্চাটিকে নিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল, নাসরীনের কথা বিশ্বাস করে রেখে গেছে। নাসরীন যদি না বলত তাহলে মানুষটা এই বাচ্চাটাকে নিয়ে যেত, বাচ্চাটা বেঁচে যেত। তার কথা বিশ্বাস করে মানুষটা বাচ্চাটাকে নিয়ে থেকে গিয়েছিল। এই ছোট শিশুটাকে হত্যা করার জন্যে যদি একটা মানুষ দায়ী হয়ে থাকে তাহলে সেটা হচ্ছে সে নিজে। নাসরীন তার হাতের দিকে তাকায়, তার মনে হতে থাকে তার হাতে বুঝি ছোপ ছোপ রক্ত।

নাসরীন হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, তার মুখ শক্ত হয়ে যায়। সে একজন। ডাক্তার, মানুষকে বাঁচানোর জন্যে সে শপথ নিয়েছে, মানুষকে হত্যা করার জন্যে নয়। যেভাবে হোক তার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হবে। নাসরীন লাউঞ্জ থেকে বের হয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে আবার আইসি, ইউনিটের দিকে উঁকি দিল, একটু আগেই বাচ্চাটা চিৎকার করে কাঁদছিল এখন নেতিয়ে ঘুমিয়ে আছে। নাসরীন জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? বাচ্চাটা ঘুমুচ্ছে কেন?

ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছি। চিৎকার করে কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়েছিল। ফুসফুসে কী জোর বাবারে বাবা।

ইনজেকশন? কীসের ইনজেকশন?

ঘুম। কিছুক্ষণ ঘুমাক শয়তানের বাচ্চা। আমরা একটু খেয়ে আসি।

মানুষগুলো বের হওয়ার সাথে সাথে নাসরীনের হঠাৎ মনে হলো বাচ্চাটাকে বাঁচানোর সে একটা সুযোগ পেয়েছে। দৈব সুযোগ। শুধু সেই পারবে বাচ্চাটাকে এখান থেকে বের করতে। সে বিছানার কাছে ছুটে গেল, বাচ্চাটার শরীরে লাগানো নানা ধরনের মনিটরগুলো খোলার আগে সে অ্যালার্মগুলো বিকল করে দিল। বাচ্চাটা পাখির পালকের মতো হালকা, একটা বালিশের ওয়ার খুলে তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে সে তার ঘাড়ে ঝুলিয়ে নিয়ে উপরে তার অ্যাপ্রনটা পরে নেয়। কেউ যদি সন্দেহ করে তাকে সার্চ করে শুধু তাহলেই বাচ্চাটাকে পাবে। নাসরীন আই.সি.ইউ থেকে বের হয়ে করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে। লিফটের কাছে এসে বোতাম টিপে সে অপেক্ষা করেনাসরীনের মনে হয় লিফটটা আসতে বুঝি কয়েক যুগ সময় লেগে যাচ্ছে। ছোট বাচ্চাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। হঠাৎ করে উঠে চিৎকার করে কঁাদা শুরু করার সম্ভাবনা নেই, তবু তার বুক ধ্বক ধ্বক করতে থাকে।

লিফট আসার পর ভেতর থেকে কয়েকজন বের হয়ে এলো, নাসরীন তখন সাবধানে লিফটের এক কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। ভেতরে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়েছিল, ভাগ্যিস তাদের মাঝে পরিচিত কেউ নেই।

লিফটটা বিভিন্ন তলায় থামতে থামতে নিচে এসে দাঁড়াল। নাসরীন নিঃশব্দে নেমে আসে, গেটে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। নাসরীন তাদের পাশ কাটিয়ে রাস্তায় বের হয়ে এলো। বাচ্চাটাকে বের করে এখন। কোলে নিতে হবে, তারপর একটা রিক্সা কিংবা স্কুটারে করে যেতে হবে—কোথায় যেতে হবে সে এখনো জানে না।

ঠিক তখন নাসরীনের চোখ পড়ল হাসপাতালের গেটের কাছে গুটিগুটি মেরে বসে থাকা মানুষটির দিকে। জাত্র সেখানে চুপচাপ বসে আছে, কেন বসে আছে কে জানে। নাসরীন একটু এগিয়ে গেল, বলল, আপনি?

জহুর মাথা নাড়ল। ফিসফিস করে বলল, মেরে ফেলেছে?

নাসরীন মাথা নাড়ল, না।

জহুর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মেয়েটা আমাকে বাচ্চাটার দায়িত্ব। দিয়েছিল। আমি পারলাম না। আমার নিজের ভুলের জন্যে।

কী ভুল?

আপনাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম—ভেবেছিলাম—

নাসরীন একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, আমি আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছি। আমি বাচ্চাটাকে নিয়ে এসেছি।

জহুরের একটু সময় লাগল কথাটা বুঝতে। যখন বুঝতে পারল তখন। সে উঠে দাঁড়াল, খুব ধীরে ধীরে তার মুখে একটু হাসি ফুটে ওঠে, সে হাসতে অভ্যস্ত নয়, তার মুখে হাসিটাকে অত্যন্ত বেমানান মনে হয়। জহুর হাত বাড়িয়ে বলল, কোথায়?

নাসরীন হাতের পাশ থেকে ঝোলানো বালিশের ওয়ারে রাখা ছোট বাচ্চাটাকে বের করে দিল, বলল, ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। এখন উঠবে না—আপনি যত দূর সম্ভব নিয়ে যান, দেরি করবেন না।

না দেরি করব না। জহুর বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে নাসরীনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকে কী বলবে সে বুঝতে পারছে না, অনুভূতির নরম কোমল কথাগুলো সে বলতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সেটাই সে বলল, আমি আসলে কী বলব বুঝতে পারছি না।

নাসরীন বলল, কিছু বলতে হবে না। আপনি যান। যত তাড়াতাড়ি পারেন যান।

আপনার হয়তো ঝামেলা হবে–

হলে হবে। আপনি যান।

যাচ্ছি।

নাসরীন দেখল, জহুর বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে মানুষের ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ডক্টর সেলিমকে কেমন যেন উদভ্রান্তের মতো দেখায়, সে কাঁপা গলায় বলল, তুমি কী করেছ?

আমি বাচ্চাটাকে সেই মানুষটার কাছে দিয়ে দিয়েছি।

মনে হলো ডক্টর সেলিম কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না, কয়েকবার তার ঠোঁট নড়ল, কোনো শব্দ বের হলো না। একটু চেষ্টা করে বলল, বাচ্চাটাকে দিয়ে দিয়েছ?

হ্যাঁ।

কেন?

আপনারা যেন বাচ্চাটাকে খুন করে না ফেলেন সে জন্যে।

তুমি জান তুমি কী করেছ? তুমি জান?

নাসরীন মাথা নাড়ল, বলল, জানি। মানুষটা আমার কথা বিশ্বাস করে বাচ্চাটাকে রেখে গিয়েছিল, আমি তার বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছি।

ডক্টর সেলিম হঠাৎ উন্মাদের মতো চিৎকার করে নাসরীনের দিকে এগিয়ে এলো, বলল, আমি তোমাকে খুন করে ফেলব। খুন করে ফেলব।

নাসরীন কষ্ট করে একটু হাসল, বলল, করতে চাইলে করেন স্যার। কিন্তু সেই বাচ্চাটাকে খুন করতে পারবেন না।

বাচ্চা? কিসের বাচ্চা? ওইটা কি মানুষের বাচ্চা ছিল?

জি স্যার। মানুষের বাচ্চা ছিল।

না। এটা ছিল পাখির বাচ্চা-পাখি! মানুষের বাচ্চাকে খুন করা যায় —কিন্তু পাখির বাচ্চাকে দরকার হলে কেটে কুটে দেখা যায়। বুঝেছ?

না স্যার বুঝিনি!

শুনে রাখো মেয়ে। ঐ পাখির বাচ্চাটাকে আমি খুঁজে বের করব। করবই করব। আর তোমাকে–

আমাকে স্যার?

আমি দেখব তুমি কীভাবে তোমার ক্যারিয়ার তৈরি কর। এই দেশের মাটিতে তোমাকে আমি থাকতে দিব না।

নাসরীন তার দুই হাত সামনে মেলে ধরে বলল, দেখেন স্যার।

কী দেখব?

আমার হাত! পরিষ্কার। একটু আগে মনে হচ্ছিল এখানে ছোপ ছোপ রক্ত! এখন আর নাই। আমার ক্যারিয়ারের দরকার নাই স্যার, আমি মানুষের বাসায় বাসন ধুয়ে জীবন কাটিয়ে দেব। কিন্তু রাত্রে যখন ঘুমাতে যাব দেখব আমার হাত ধবধবে পরিষ্কার। সেখান এক ফোঁটা রক্ত নাই।

ডক্টর সেলিম চিকার করে বলল, বেরিয়ে যাও। বেরিয়ে যাও তুমি আমার সামনে থেকে। এই হাসপাতালে আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না।

নাসরীন বলল, আপনি আমার মুখ দেখবেন না স্যার। আর কোনো দিন দেখবেন না। তুরি মানে বুঝতে পারছেন তো?

কী মানে?

আপনার মুখটাও আমার আর কোনো দিন দেখতে হবে না!

হাতে একটা কুপি বাতি নিয়ে আনোয়ারা ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল, ঘরের ভেতরে কে? জহুর নাকি?

জহুর বলল, হ্যাঁ। আনোয়ারা বুবু? তুমি?

হ্যাঁ, জহুর। তুমি হঠাৎ করে কোথা থেকে এসেছ? সন্ধ্যেবেলা দেখি তোমার ঘরে আলো, ভাবলাম কে আবার ঘরে বাতি দেয়। তোমাকে দেখব ভাবি নাই।

আমিও ভাবি নাই। বস আনোয়ারা বুবু। বসার কিছু নাই, মাটিতেই বস।

জহুর বহুদিন পর নিজের ভিটেতে ফিরে এসেছে। ফিরে এসে সন্ধ্যেবেলা ঘরে আলো জ্বালিয়েছে। আলো দেখে তার পাশের বাড়ির আনোয়ারা দেখতে এসেছে। আনোয়ারার সাথে জহুরের কোনো রক্তের সম্পর্ক নাই কিন্তু তার নিজের বোনের মতো।

আনোয়ারা কুপি বাতিটা মাটিতে রেখে দাওয়ায় হেলান দিয়ে বসে। আবছা অন্ধকারে সে জহুরকে একটু দেখার চেষ্টা করে। বিড়বিড় করে বলে, বাপ দাদার ভিটার মাঝে শেয়াল কুকুর দৌড়ায়, ব্যাপারটা ঠিক না জহুর। তোমার ভাবসাব দেখে মনে হয় দুনিয়ায় যেন কারো বউ মরে না। ঝি মরে না।

জহুর কোনো উত্তর দিল না। আনোয়ারা বিড়বিড় করে বলল, এখন একটা বিয়ে করে সংসারী হও। ছেলেমেয়ে থাকলে তারা মৃত্যুর পরে দোয়া করে। গোর আজাব মাফ হয়।

জহুর নিচু গলায় হাসার মতো একটা শব্দ করে বলল, আনোয়ারা বুবু তোমার শরীরটা কেমন?

আনোয়ারা একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ করে বলল, আমার আবার শরীর। এক পা কবরে এক পা মাটিতে। আজরাইল সবার দিকে নজর দেয়, আমার দিকে নজর দেয় না।

জহুর মাথা নাড়ল, বলল, না আনোয়ারা বুবু। আজরাইল এখন তোমার দিকে নজর দিলে হবে না। তোমার আরো কয় বৎসর বাঁচা লাগবে।

কেন? আমার বাঁচা লাগবে কেন?

জহুর উঠে দাঁড়াল, ঘরের কোনায় মাচার ওপর শুইয়ে রাখা শিশুটাকে সাবধানে তুলে এনে আনোয়ারার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এই বাচ্চাটাকে তোমার মানুষ করে দিতে হবে।

আনোয়ারা বিস্ফারিত চোখে জহুরের দিকে তাকিয়ে থাকে, বলে, এইটা কার বাচ্চা?

সেইটা অনেক লম্বা ইতিহাস আনোয়ারা বুবু।

এত ছোট বাচ্চা তুমি কোথায় পেয়েছ? বাবা কী করে? মা কী করে?

বাবা নাই, মা নাই। বাচ্চার মাকে আমি নিজের হাতে কবর দিয়েছি।

আনোয়ার বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বলল, এই বাচ্চা দেখি পরীর মতোন সুন্দর। ছেলে না মেয়ে?

ছেলে।

তুমি পুরুষ মানুষ এত ছোট বাচ্চা নিয়ে আসছ কেন? এতিমখানায় রেখে আসলে না কেন? কত বড়লোকের পরিরার বাচ্চা নেয়—

জহুর বলল, সেইটা অনেক বড় ইতিহাস। তুমি বাচ্চাটাকে কোলে নাও তাহলে বুঝতে পারবে।

তাহলে কী বুঝতে পারব?

আগে একবার কোলে নাও তো।

আনোয়ারা হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েই বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠে, ইয়া মাবুদ! বাচ্চার কোনো ওজন নাই!

জহুর মাথা নাড়ে, নাই আনোয়ারী বুবু। এর কোনো ওজন নাই।

কেন? ওজন নাই কেন? আনোয়ারা বিস্ময় এবং আতঙ্ক নিয়ে শিশুটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

তুমি বাচ্চাটার কাপড় খুলো, খুলে দেখো। পিঠের দিকে দেখে।

আনোয়ারা সাবধানে পেঁচানো কাপড়টা খুলে বাচ্চাটার পিঠের দিকে তাকিয়ে অতিঙ্কে চিৎকার করে ওঠে, ইয়া মাবুদ! এ তো জিনের বাচ্চা

জহুর হাসার চেষ্টা করল, বলল, না আনোয়ারা বুবু। এইটা জিনের বাচ্চা না—

আনোয়ারা বাচ্চাটাকে দুই হাতে ধরে আতঙ্কে কাঁপতে থাকে, জিনের বাচ্চা! ইয়া মাবুদ! জিনের বাচ্চা!

জুহুর হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটিকে নিজে কোলে নিয়ে বলল, না আনোয়ারা বুবু, এইটা জিনের বাচ্চা না। এইটা মানুষেরই বাচ্চা। আমার সামনে এই বাচ্চার জন্ম হয়েছে। বাচ্চার মাকে আমি নিজের হাতে কবর দিয়েছি।

আনোয়ারা তখনো থরথর করে কাঁপছে। জহুর হাসার চেষ্টা করে বলল, ভয়ের কিছু নাই বুবু। এইটা মানুষের বাচ্চা। বাচ্চাটার পাখা আছে সেইটাই হচ্ছে বিপদ। শহরের ডাক্তার এই মাসুম বাচ্চাটাকে নিয়ে মেরে ফেলতে চায়। কেটে কুটে দেখতে চায়। অনেক কষ্টে উদ্ধার করে এনেছি আনোয়ারা বুবু।

আনোয়ারা তখনো কোনো কথা বলল না, বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল। জহুর বলল, আনোয়ারা বুবু, জন্মের আগে থেকেই এই বাচ্চাটা বিপদে। যেই দেখে সেই তারে কেটে কুটে ফেলতে চায়। এর মা আমার হাত ধরে বলেছে একে বাঁচিয়ে রাখতে। সেই জন্যে চেষ্টা করছি!

আনোয়ারা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এইটা আসলেই মানুষের বাচ্চা?

হ্যাঁ। শহরের মানুষজনের হাত থেকে অনেক কষ্ট করে বাঁচিয়ে এনেছি। এই চরে মানুষজন কম, এইখানে একে বড় করতে হবে। আনোয়ার বুবু তুমি বাচ্চাটাকে একটু বড় করে দাও।

আনোয়ারা আবার ভয়ে ভয়ে বাচ্চাটার দিকে তাকালো। বাচ্চাটা তখন হঠাৎ ফিক করে হেসে দেয়, দাঁতহীন মাঢ়ির সেই হাসি দেখে খুব ধীরে ধীরে আনোয়ারার মুখেও হাসি ফুটে ওঠে। ফিসফিস করে বলল, বাচ্চাটার হাসি কত সুন্দর।

জহুর বলল, শুধু হাসি না আনোয়ারা বুবু, এই বাচ্চার সবকিছু সুন্দর। শুধু একটা জিনিস সুন্দর না। সেটা হচ্ছে কপাল।

আনোয়ারা আবার হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটিকে কোলে নেয়, নিজের গালের সাথে তার গাল স্পর্শ করে বলল, এই বাচ্চাটার কোনো নাম আছে?

জহুর নাথা নাড়ল, বলল, আমি তাকে বুলবুলি ডাকি। বুলবুলি পাখির মতোন শরীর সেই জন্যে নাম বুলবুল!

বুলবুল?

হ্যাঁ।

আনোয়ারা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। বুলবুল নামটা সুন্দর। তোমার কী মনে হয় জহুর? এই বাচ্চা কি একদিন আকাশে উড়বে?

জানি না আনোয়ারা বুবু। আমি কিছুই জানি না।

আনোয়ারা বিস্ময়াভিভূত হয়ে বুলবুল নামের পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর বাচ্চাটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

দ্বিতীয় পর্ব

আনোয়ারা বলল, সোজা হয়ে দাঁড়া দুষ্ট ছেলে। নড়বি না।

বুলবুল সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। সে তার দুই হাত তুলে দুই দিকে ছড়িয়ে রেখেছে, আনোয়ারা পুরানো কাপড় দিয়ে তার শরীরটাকে পেঁচিয়ে দিচ্ছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আনোয়ারা পুরানো কাপড় দিয়ে তার শরীরটা পেঁচিয়ে দেয়। বুলবুলের পিঠে পাখাগুলো বড় হয়ে। উঠছে, সেটা যেন কেউ বুঝতে না পারে সে জন্যে কাপড় দিয়ে সেটা তার শরীরের সাথে পেঁচিয়ে রাখা হয়। কাপড় দিয়ে পাখাগুলো শরীরের সাথে পেঁচানোর পরও পিঠের দিকে খানিকটা উঁচু হয়ে থাকে দেখে মনে হয় একটা কুঁজ ঠেলে উঠেছে। আনোয়ারা বুলবুলকে একটা শার্ট পরিয়ে দিয়ে বলে, মনে আছে তো সবকিছু?

আছে খালা। বুলবুল অধৈর্য হয়ে বলল, মনে থাকবে না কেন?

আনোয়ারা বলল, আমি জানি তোর মনে আছে। তারপরেও তোকে মনে করিয়ে দিই। কারো সাথে ঝগড়া করবি না, মারামারি করবি না। পানিতে নামবি না। গা থেকে শার্ট খুলবি না।

হ্যাঁ খালা, মনে আছে। ঝগড়া করবি না, মারামারি করবি না, পানিতে নামবি না, শার্ট খুলবি না!

আনোয়ারা বলল, তোর যে পাখা আছে সেইটা কেউ জানে না। জানলে বিপদ হবে।

বুলবুলকে হঠাৎ একটু বিভ্রান্ত দেখায়। সেই ছোটবেলা থেকে বুলবুল জানে সে অন্য রকম। তার পাখা আছে—কিন্তু সেটা কাউকে বলা যাবে না। সেটা লুকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু কেন সেটা কাউকে বলা যাবে না, কেন সেটা লুকিয়ে রাখতে হবে সে জানে না। কখনো কাউকে জিজ্ঞেস করেনি। আজকে জিজ্ঞেস করল, কেন খালা? আমার পিঠে পাখা আছে, সেটা কেন কাউকে বলা যাবে না?

আনোয়ারা কী উত্তর দেবে বুঝতে পারে না। ইতস্তত করে বলল, তুই কি আর কোনো মানুষের পিঠে পাখা দেখেছিস?

না। দেখি নাই।

তাহলে? যারাই দেখবে তোর পাখা আছে তারা অবাক হবে তোকে নিয়ে টানাটানি করবে।

কেন টানাটানি করবে।

এইটা মানুষের নিয়ম। যেটা অন্য রকম সেইটা নিয়ে মানুষ টানাটানি করে।

বুলবুল বলল, ও। ব্যাপারটা সে পরিষ্কার বুঝতে পারল না কিন্তু সেটা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাইল না। বলল, খালা। আমার খুব রাগ লাগে যখন সবাই আমাকে কুঁজা ডাকে।

ডাকুক। আনোয়ারা বুলবুলির থুতনি ধরে আদর করে বলল, আসলে কি তুই কুঁজা?

না।

তাহলে ডাকলে ডাকুক। তুই তাদের সাথে তর্ক করবি না।

বুলবুল কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। আনোয়ারা আবার মনে করিয়ে দিল, মনে থাকবে তো?

থাকবে।

বুলবুলের অনেক কিছুই মনে রাখতে হয়। সে অন্য রকম সেটা সে কখনো ভুলতে পারে না। যতই দিন যাচ্ছে তার পাখাগুলো ততই বড় হয়ে উঠছে, কাপড় দিয়ে যখন পেঁচিয়ে রাখা হয় তখন তার কষ্ট হয়। কিন্তু সে অন্য রকম, তাই কষ্ট হলেও তাকে সেই কষ্ট সহ্য করতে হয়। মাঝে মাঝে বুলবুল ভাবে, সবাই এক রকম, সে অন্য রকম কেন? এই প্রশ্নটাও সে কাউকে করতে পারে না।

সকাল বেলা নাশতা করে বুলবুল তার বই-খাতা আর স্লেট নিয়ে স্কুলে রওনা হলো। এই চরে মানুষজন খুব বেশি না, কাজেই এখানে কোনো স্কুল নাই। কিছুদিন আগে শহর থেকে কিছু লোকজন এসে সবাইকে ডেকে লেখাপড়া নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলে একটা স্কুল তৈরি করে দিয়ে গেছে। সেটা অবশ্যি সত্যিকারের স্কুল না, এই স্কুলে চেয়ার টেবিল বেঞ্চ নাই, একটা মাটির ঘরে হোগলা পেতে সব বাচ্চারা বসে। মালবিকা নামে নাদুসনুদুস একটা মহিলা তাদের পড়তে শেখায়, যোগ-বিয়োগ করতে শেখায়। বাচ্চারা এই স্কুলে যেতে চায় না কিন্তু বুলবুল খুব আগ্রহ নিয়ে যায়। লেখাপড়া জিনিসটা কী সে খুব ভালো করে জানে না কিন্তু সেটা শিখতে তার খুব আগ্রহ।

বুলবুল তার বই-খাতা আর স্লেট নিয়ে স্কুলে রওনা হলো। মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলে অনেক তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় কিন্তু বুলবুল সব সময় নদীর তীর দিয়ে হেঁটে যায়। একা একা হাঁটার সময় সে নিজের মনে কথা বলে, ভারী ভালো লাগে তখন।

নদীর ধারে কমবয়সী কিছু ছেলেমেয়ে নদীর ঘোলা পানিতে ঝাপাঝাপি করছিল, বুলবুলকে দেখে তারা চেঁচামেচি শুরু করল, দু-একজন গলা ফাটিয়ে ডাকল, বুলবুল! এই বুলবুল!

বুলবুল নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বলল, কী?

আয়, পানিতে আয়।

বুলবুল মাথা নাড়ল, বলল, নাহ্।

কেন না?

স্কুলে যাই!

তুই স্কুলে গিয়ে কী করবি? জজ ব্যারিস্টার হবি?

বুলবুল কোনো কথা বলল না। পানিতে দাপাদাপি করতে করতে একজন বলল, কুঁজা জজ। কুঁজা ব্যারিস্টার। কুঁজা বুলবুল!

তখন সবগুলো বাচ্চা হি হি করে হাসতে হাসতে পানিতে দাপাদাপি করতে থাকে।

বুলবুল কিছুক্ষণ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর আবার হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পায় বাচ্চাগুলো তাকে নিয়ে টিটকারি করছে। কুঁজা কুঁজা বলে চিল্কার করছে। বুলবুল বিড়বিড় করে নিজেকে বলল, আমি কুঁজা না! আমি একদিন আমার এই পাখা দিয়ে আকাশে উড়ে যাব—কেউ তখন আমাকে খুঁজে পাবে না।

স্কুলে গিয়ে দেখে তখনো সবাই আসেনি। স্কুলের সামনে খোলা জায়গাটাতে সবাই হা-ড়ু-ড়ু খেলছে। একজন বুলবুলকে ডাকল, এই কুঁজা বুলবুল! আয় হা-ড়ু-ড়ু খেলবি।

বুলবুল রাজি হলো না। তার শরীর পাখির পালকের মতো হালকা, সে কাউকে ধরে রাখতে পারে না। কাউকে জাপটে ধরলে তাকেসহ টেনে নিয়ে যায়। তা ছাড়া খালা তাকে বলেছে সে যেন কখনো কারো সাথে ধাক্কাধাক্কি করে। তার যে রকম পাখা আছে সেটা কাউকে জানতে দেয়া যাবে না, ঠিক সে রকম তার শরীর যে পাখির পালকের মতো হালকা সেইটাও কাউকে জানতে দেয়া যাবে না।

বুলবুল স্কুলের সামনে পা ছড়িয়ে বসে খেলা দেখতে লাগল, তখন লিপি তার ছোট ভাইটাকে কোলে নিয়ে হাজির হলো। বুলবুলের মতো লিপিরও খুব লেখাপড়া করার ইচ্ছা। তার ছোট ভাইকে দেখেশুনে রাখতে হয়, তারপরেও সে স্কুলে চলে আসে। লিপি বুলবুলের পাশে পা ছড়িয়ে বসে ছোট ভাইটাকে ছেড়ে দিল। ছোট ভাইটা ধুলোর মাঝে হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে ছোট ছোট পিঁপড়া খুঁজে বের করতে থাকে।

লিপি জিজ্ঞেস করল, বুলবুল, তুই অঙ্কগুলো করেছিস?

বুলবুল মাথা নাড়ল। স্কুলের সবাই তাকে কখনো না কখনো কুঁজা বুলবুল ডেকেছে—লিপি ছাড়া। লিপি তাকে কখনো কুঁজা বুলবুল ডাকেনি। সে জন্যে বুলবুল লিপিকে একটু পছন্দই করে।

লিপি বলল, আমাকে অঙ্কগুলো দেখাবি?

বুলবুল তার খাতা বের করে লিপিকে দেখাল। লিপি সেগুলো দেখে দেখে নিজের অঙ্কগুলো মিলিয়ে নেয়।

কিছুক্ষণের মাঝেই তাদের স্কুলের মালবিকা আপা এসে ঘরের তালা খুলে দিল। বুলবুল আর লিপি ভেতরে ঢুকে স্কুলঘরের জানালাটা খুলে দেয়। হোগলাপাতার মাদুরটা বিছিয়ে তাকের ওপর রাখা বইগুলো নামিয়ে আনতে খাকে। ততক্ষণে মাঠে খেলতে থাকা ছেলেগুলোও ক্লাসের ভেতরে এসে যার যার জায়গায় বসে গেছে। রোদে ছোটাছুটি করার কারণে একেকজন দরদর করে ঘামছে!

মালবিকা আপা ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে বলল, সবাই এখন শান্ত হয়ে বস। আমরা আমাদের ক্লাস শুরু করি।

বাচ্চাগুলো শান্ত হওয়ার খুব একটা লক্ষণ দেখাল না। আপা খালি জায়গাগুলো দেখিয়ে বলল, জলিল, মাহতাব আর কামরুল কই?

একজন বলল, কামরুল বাবার সাথে মাঠে কাম করে।

আরেকজন বলল, জলিলের জ্বর।

বুলবুলের ভাসা ভাসাভাবে মনে পড়ল সে মাহতাবকে নদীর পানিতে দাপাদাপি করতে দেখেছে, কিন্তু সেটা নিয়ে সে নালিশ করল না।

আপা জিজ্ঞেস করল, জলি আর আমিনা?

লিপি বলল, মনে হয় তারা লেখাপড়া করতে চায় না।

আপা একটা নিঃশ্বাস ফেলে সবাইকে বই খুলতে বলল। বাচ্চাগুলো। বই খুলতে থাকে, প্রথমে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার উপকারিতা নিয়ে একটা গল্প। তারপর লালপরী নীলপরী নিয়ে একটা কবিতা। কবিতার প্রথম চার লাইন মুখস্থ করতে দিয়ে আপা সবার অঙ্ক খাতাগুলো দেখতে শুরু করে দিল।

বুলবুল কবিতা মুখস্থ করতে করতে লালপরী নীলপরীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ফুটফুটে দুটি মেয়ে আকাশে উড়ছে, তাদের পেছনে প্রজাপতির পাখার মতো পাখা।

অঙ্ক খাতাগুলো বাচ্চাদের ফিরিয়ে দিয়ে আপা তাদের পড়া ধরতে শুরু করল। নখ কেন কাটতে হয়, খাবার আগে কেন হাত ধুতে হয়—এসব শেষ। করে সবাইকে লালপরী নীলপরী কবিতার প্রথম চার লাইন জিজ্ঞেস করতে লাগল। সবারই মোটামুটি মুখস্থ হয়েছে তারপরেও একটা-দুইটা শব্দ তাদের বলে দিতে হলো। শুধু বুলবুলকে কিছু বলে দিতে হলো না, সে এক নিঃশ্বাসে পুরো চার লাইন কবিতা মুখস্থ বলে গেল।

আপা খুশি হয়ে বলল, ভেরি গুড বুলবুল।

দুষ্টু একটা মেয়ে ফিসফিস করে বলল, কুঁজা মিয়া গুডি গুড।

বুলবুল কথাটা শুনেও না শোনার ভান করে, লিপি তখন হাত তুলে জিজ্ঞেস করল, আপা।

বল লিপি।

পরী কি আসলেই আছে?

আপা উত্তর দেয়ার আগেই সব ছেলেমেয়ে চিৎকার করে বলল, আছে! আছে!

আপা হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কেমন করে জান পরী আছে?

একজন বলল, তার মা একদিন জোছনা রাতে বের হয়েছিল, তখন দেখেছে একটা গাছের ওপর থেকে পরী উড়ে উড়ে নেমে এসেছে। আরেকজন সেই গল্পটা সমর্থন করে বলল, পূর্ণিমার রাতে একটা বড় দিঘিতে সব পরী গোসল করতে আসে। কাপড়গুলো দিঘির ঘাটে খুলে রেখে তারা ন্যাংটা হয়ে দিঘিতে গোসল করে। এই সময় দুষ্ট কয়েকটা ছেলে একজন আরেকজনের দিকে অর্থপূর্ণ ভঙ্গিতে তাকিয়ে হি হি করে হাসতে থাকে। মালবিকা আপা দেখেও না দেখার ভান করল।

লিপি জিজ্ঞেস করল, পরীরা শুধু জোছনা রাতে আসে কেন?

এর কোনো সদুত্তর ছিল না, একজন বলল, আসলে পরীদের যখন খিদে লাগে তখন তারা জোছনার আলো খায়।।

বুলবুল এইবারে একটু আপত্তি করল। বলল, জোছনা আবার কেমন করে খায়?

যে বলেছে পরীরা জোছনার আলো খেয়ে বেঁচে থাকে সে গলা উঁচিয়ে বলল, তার নানি নিজের চোখে দেখেছে যে একদিন জোছনা রাতে অনেকগুলো পরী উঠানে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কপকপ করে জোছনা খাচ্ছে। এ রকম অকাট্য প্রমাণ দেয়ার পর সেটা অবিশ্বাস করবে কেমন করে?। সবাই তখন মাথা নেড়ে সেটা মেনে নিল।

আরেকজন বলল, পরীদের চামড়া হয় খুব নরম, সূর্যের আলো লাগলে চামড়া পুড়ে যায় তাই তারা কখনো দিনের বেলা বের হয় না।

বুলবুল তখন মুখ শক্ত করে বলল, তাহলে দিনের বেলা পরীরা কোথায় থাকে?

পরীদের দেশে।

সেইটা কোথায়?

আকাশের উপরে। অনেক দূরে।

লিপি তখন হাত তুলে আবার জিজ্ঞেস করল, আপা।

বল।

ছেলে পরী কি আছে?

কেউ কিছু বলার আগেই বুলবুল বলল, আছে।

বুলবুলের কাছে বসে থাকা একজন মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ আছে। ছেলে পরীদের বলে জিন। আগুন দিয়ে তৈরি, পায়ের পাতা থাকে উল্টা দিকে। সামনের দিকে হাঁটলে তারা পেছনের দিকে চলে যায়।

বুলবুল বলল, মোটেই না। ছেলে পরী ঠিক মেয়ে পরীর মতো। পিঠে পাখা থাকে। আর

আর কী।

খুব হালকা।

কয়েকজন মাথা নেড়ে আপত্তি করল, বলল, মেয়ে পরীরা হয় খুব সুন্দর কিন্তু ছেলে পরীরা হয় ভয়ঙ্কর। রাক্ষসের মতো চেহারা আর তারা আগুন দিয়ে তৈরি। মুখে পচা মাংসের গন্ধ।

কে কখন কাকে জিনে ধরতে দেখেছে সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়, তখন মালবিকা হাত তুলে তাদের থামাল। বলল, আসলে এগুলো হচ্ছে কল্পনা। পরী থাকুক আর নাই থাকুক তাতে কিছু আসে-যায় না। কল্পনা করলেই আছে। কল্পনায় সব কিছু থাকে

বুলবুল ভুরু কুঁচকে বলল, আসলে পরী নাই?

না, বুলবুল। এগুলো সব কল্পনা। মেয়ে পরী ছেলে পরী কিছুই নাই।

কিছুই নাই?

না।

বুলবুল মুখ শক্ত করে বলল, আছে।

আছে? হ্যাঁ আছে।

মালবিকা বুলবুলের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে তুমি যদি বল আছে, তাহলে আছে। মালবিকা এবারে গণিতের বইটা তুলে বলল, পরীর গল্প শেষ হয়েছে, এখন চল সবাই মিলে আমরা নামতা শিখি। তিন-এর নামতা। আমার সাথে সাথে বল, তিন এক্কে তিন!

সবাই সুর করে বলল, তিন এক্কে তিন।

তিন দু গুণে হয়।

তিন দু গুণে ছয়।

স্কুলের শেষে বাচ্চাগুলো বাসার দিকে রওনা দেয়। লিপির ছোট ভাইটার খিদে লেগে গিয়েছে, তাই সে ঘ্যানঘ্যান করে কাঁদতে শুরু করেছে। লিপি বাচ্চাটাকে কোল বদল করতে করতে তাড়াতাড়ি করে হাঁটার চেষ্টা করে। দুরন্ত ছেলেগুলো নদীর তীরে এসে ছুটতে ছুটতে কাপড় খুলতে খুলতে নদীর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বুলবুল তাদের দিকে এক ধরনের হিংসা নিয়ে তাকিয়ে থেকে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। লিপি জিজ্ঞেস করল, তুই যাবি না?

নাহ! তারপর হঠাৎ একেবারে অপ্রাসঙ্গিকভাবে জিজ্ঞেস করল, লিপি তুই কি কোনো দিন পরী দেখেছিস?

না। তুই দেখেছিস?

আমি? বুলবুল ইতস্তত করে বলল, আমি—মানে ইয়ে–? হঠাৎ করে থেমে গিয়ে লিপির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুই পরী দেখতে চাস?

পরী? লিপির মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন পড়ে, আমি?

হ্যাঁ।

না বাবা রাত্রি বেলা আমার ভয় করে।

দিনের বেলা?

লিপি অবাক হয়ে বলল, দিনের বেলা? দিনের বেলা পরী দেখা যায়?

যায়। বুলবুল গম্ভীর হয়ে বলল, দেখা যায়।

লিপি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, দেখব।

তুই যদি কাউকে না বলিস তাহলে তোকে দেখাব।

লিপি বুলবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই দেখাবি? তারপর সে ফিক করে হেসে দিল।

বুলবুল কঠিন মুখ করে লিপির দিকে তাকালো, লিপি সেটা ভালো করে লক্ষ করল না। কোলে ছোট ভাইটা ঘ্যানঘ্যান করে কাঁদছে, তাকে নিয়ে সে বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে।

বিকেল বেলা বাড়ি ফিরে বুলবুল দেখল জহুর উঠানে একটা জলচৌকিতে বসে শরীরে তেল মাখছে। বুলবুল আনন্দে চিৎকার করে জহুরের কোলে আঁপিয়ে পড়ে, গলা জড়িয়ে ধরে বলল, বাবা! তুমি এসেছ।

হ্যাঁ। এসেছি। এত দেরি করেছ কেন?

কে বলেছে দেরি করেছি! মোটেই দেরি করি নাই। বলে গিয়েছিলাম দুই সপ্তাহের জন্যে যাব! ঠিক দুই সপ্তাহ পরে এসেছি।

দুই সপ্তাহ মানে জান? সাত দু গুণে চৌদ্দ দিন।

হ্যাঁ। বজরা নৌকা করে সুন্দরবনে ধানের চালানটা নিতে কত দিন লাগে তুই জানিস?

বুলবুল জানে না এবং তার জানার খুব আগ্রহও নেই। সে জহুরের গলা জড়িয়ে ধরে রেখে বলল, তুমি না থাকলে আমার ভালো লাগে না বাবা।

এই তো আছি আমি। জহুর বুলবুলের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল, তুই তোর খালাকে জ্বালাসনি তো?

না, বাবা।

ঠিকমতো থেকেছিস?

হ্যাঁ।

লেখাপড়া করেছিস?

হ্যাঁ।

সময়মতো বাড়ি এসেছিস?

হ্যাঁ।

বুলবুল একটু থেমে বলল, কিন্তু বাবা–

কী?

আমার আর ভালো লাগে না।

কী ভালো লাগে না?

সব ছেলেমেয়ে আমাকে কেন কুঁজা ভাকে? আমি কি কুঁজা?

জহুর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বুলবুলকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, তুই কেন কুঁজা হবি?

তাহলে?

তোর পাখাগুলোকে যে ঢেকে রাখতে হয়। ঢেকে না রাখলে যে তোর বিপদ হয়ে যাবে!

কেন বিপদ হবে?

জহুর আবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সেটা তুই এখন বুঝবি না। আরেকটু বড় হয়ে নে, তখন তোকে বলব।

বুলবুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বাবা।

কী?

আমার পাখাগুলো বেঁধে রাখলে এখন ব্যথা করে।

করারই তো কথা—আমাদের হাত-পা বেঁধে রাখলে ব্যথা করত না?

অনেক বড় হয়েছে পাখাগুলো। আমার কী মনে হয় জান?

কী?

আমি যদি ইচ্ছা করি, তাহলে—

তাহলে কী বাবা?

তাহলে আমি এখন উড়তে পারব।

জহুর মাথা ঘুরিয়ে বুলবুলের দিকে তাকালো। বলল, সত্যি?

হ্যাঁ বাবা সত্যি।

ঠিক আছে, আজকে রাতে তাহলে দেখব।

বুলবুল চকচকে চোখে বলল, ঠিক আছে বাবা।

রাতের খাওয়ার পর সবাই ঘুমিয়ে গেলে জহুর বুলবুলের হাত ধরে বের হলো। তখন রাত খুব বেশি হয়নি কিন্তু এই চর এলাকার মানুষ খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে, সন্ধ্যের পরই মনে হয় বুঝি নিশুতি রাত!

গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কুকুরগুলো প্রথম একটু ডাকাডাকি করে। যখন মানুষগুলোকে চিনতে পারে তখন আবার শান্ত হয়ে লেজ নেড়ে নেড়ে পেছন পেছন হেঁটে খানিকদূর এগিয়ে দিয়ে আসে।

গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে জহুর বুলবুলকে নিয়ে নদীর ঘাটে এসে তার নৌকাটাতে বসে। লগি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নৌকাটাকে পানিতে ঠেলে দিয়ে সে বৈঠাটা হাতে নেয়। বুলবুল নৌকার মাঝখানে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে, আস্তে আস্তে বলল, অনেক অন্ধকার বাবা!।

জহুর বলল, এক্ষুনি চাঁদ উঠবে, তখন দেখিস আলো হয়ে যাবে।

জহুরের কথা সত্যি প্রমাণ করার জন্যেই কি না কে জানে নদীর তীরে বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে ঠিক তখন একটা বড় চাঁদ ভেসে উঠল। চাঁদের নরম আলোতে চারদিকে একটা কোমল ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে ঝিঁঝি ডাকতে থাকে, একটা রাতজাগা পাখি কর্কশ গলায় ডাকতে ডাকতে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।

বুলবুল একটু এগিয়ে জহুরের কাছাকাছি এসে বসে জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি বাবা।

নতুন যে চরটা উঠেছে সেখানে।

সেখানে কেন বাবা?

সেখানে তো কোনো মানুষ নাই সেই জন্যে। তা ছাড়া চরটা তো ধুধু ফাঁকা, তোর জন্যে মনে হয় সুবিধা হবে।

বুলবুল একটু এগিয়ে জহুরের শরীরে হেলান দিয়ে বসে থাকে, বৈঠার নিয়মিত শব্দটার মাঝে মনে হয় একটা জাদুর মতো আছে, ধীরে ধীরে তার চোখে ঘুম নেমে আসছিল, তখন জহুর তাকে ডেকে তুলল, বলল, ওঠ বাবা। আমরা এসে গেছি।

বুলবুল জহুরের হাত ধরে চরে নেমে এল। এতক্ষণে চাদটা অনেক উপরে উঠেছে, বিস্তৃত চরটাতে জোছনায় নীলাভ একটা আলো ছড়িয়ে পড়েছে। বুলবুল তার শরীর থেকে চাদরটা খুলে জহুরের হাতে দিয়ে তার পাখা দুটো একবার খুলে নেয়, আরেকবার বন্ধ করে নেয়। তারপর বড় করে খুলে নিয়ে একবার ঝাঁপটানি দেয়।

জহুর জিজ্ঞেস করল, তুই কি আসলেই উড়তে পারবি?

মনে হয় পারব বাবা।

জোর করে চেষ্টা করিস না। যদি এখন না পারিস তাহলে থাক।

বুলবুল কোনো কথা না বলে তার পাখা দুটো দুই পাশে ছড়িয়ে দেয়, তারপর মাথা নিচু করে সে ছুটতে শুরু করে, দেখে মনে হয় সে বুঝি হুঁমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে কিন্তু সে পড়ে না। তার বড় বড় পাখা খুব ধীরে ধীরে ওপর থেকে নিচে নেমে আসতে থাকে এবং দেখতে দেখতে সে মাটি থেকে একটু উপরে উঠে যায়। বুলবুলের শরীরটা ধীরে ধীরে মাটির সাথে সমান্তরাল হয়ে যায়, পাখার ঝাঁপটানিটা দ্রুততর হয়ে ওঠে এবং বুলবুল দেখতে দেখতে উপরে উঠে যায়।

জহুর সবিস্ময়ে বুলবুলের দিকে তাকিয়ে থাকে, অতিকায় একটা পাখির মতো বুলবুল বাতাসে ভেসে উঠছে। জহুর বুলবুলের পেছনে পেছনে ছুটতে ছুটতে বলে, বেশি উপরে উঠিস না বাবা! বেশি উপরে উঠিস না!

জহুরের কথার জন্যেই হোক কিংবা অভ্যাস নেই বলেই হয়তো বুলবুল আবার নিচে নেমে আসতে থাকে।

মাটির কাছাকাছি এসে বুলবুল তাল সামলাতে পারল না, হুঁমড়ি খেয়ে দুই পাখা ছড়িয়ে বালুর মাঝে পড়ে গেল। জহুর ছুটতে ছুটতে বুলবুলের কাছে গিয়ে তাকে ধরে ওঠানোর চেষ্টা করে বলল, বাবা, ঠিক আছিস তুই?

বুলবুল মাথা নাড়ল, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, হ্যাঁ বাবা আমি ঠিক আছি।

কী সুন্দর তুই উড়েছিস দেখলি?

হ্যাঁ বাবা। আমি আসলেই উড়তে পারি। দেখেছ?

হ্যাঁ দেখেছি। বুলবুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি আবার একটু উড়ি বাবা?

জোছনার আলোতে বুলবুলের মুখের দিকে তাকিয়ে জহুর বলল, উড়বি? উড়।

বুলবুল তখন আবার তার দুটি পাখা দুই পাশে ছড়িয়ে দেয়, তারপর দুটি হাত বুকের কাছে নিয়ে আসে, মাথাটা একটু সামনে ঝুঁকিয়ে সে সামনের দিকে ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে তার বিশাল পাখা দুটি ধীরে ধীরে ঝাঁপটাতে থাকে, দেখতে দেখতে বুলবুল উপরে উঠে যেতে থাকে। প্রথমবার বেশি উপরে ওঠেনি কিন্তু এবারে সে উপরে উঠতেই থাকে, জোছনার আলোতে বুলবুল তার পাখা দুটি বিস্তৃত করে অতিকায় একটা পাখির মতো। আকাশে উঠে যেতে থাকে। জহুর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে, ঠিক কী কারণ জানা নেই সে বুকের ভেতর একটা গভীর ব্যথা অনুভব করে।

বুলবুল অনেক উপরে উঠে একটু ঘুরে যায়, তারপর ডানা দুটি মেলে আকাশে ভাসতে থাকে। মনে হয় পৃথিবীর সাথে তার বুঝি আর কোনো যোগাযোগ নেই, মাটি থেকে অনেক উপরে আকাশের কাছাকাছি মেঘের জগতে বুঝি সে তার নতুন আবাসস্থল খুঁজে পেয়েছে। জহুরের মনে হয় বুকে ধরে বড় করা তার এই খুঁজে পাওয়া সন্তানটি বুঝি আর কোনো দিন মাটির পৃথিবীতে ফিরে আসবে না।

আকাশ থেকে বুলবুল যখন মাটিতে নেমে এল তখন চাঁদটা পশ্চিমে অনেকখানি হেলে পড়েছে। বুলবুল তার পাখা দুটো ভঁজ করে গুটিয়ে নিয়ে জহুরের দিকে এগিয়ে এল। জহুর তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, বুলবুলের সারা শরীর কুয়াশায় ভিজে গেছে। চাদর দিয়ে মাথাটা মুছিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোর কষ্ট হয়েছে বাবা?

না বাবা, বেশি কষ্ট হয় নাই। উপরে ওঠার সময় একটু পরিশ্রম হয়, কিন্তু ভেসে থাকার সময় একটুও কষ্ট হয় না?

তোর পাখাগুলো ব্যথা করছে?

হ্যাঁ বাবা, পাখাগুলো একটু ব্যথা করছে।

কাল ভোরে আরো অনেক ব্যথা করবে দেখিস।

কেন বাবা?

কখনো কোনো দিন ব্যবহার করিসনি, হঠাৎ একবারে এতক্ষণ উড়ে বেড়ালে ব্যথা করবে না?

করলে করবে।

উড়তে কেমন লাগে বাবা?

খুব অদ্ভুত। তুমি জানো উপরে উঠে গেলে মনে হয় সবকিছু সমান হয়ে গেছে!

জহুর নিঃশব্দে বুলবুলের দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু না বুঝেই এই ছোট শিশুটি কত বড় একটা কথা বলে ফেলেছে! জহুর বুলবুলের হাত ধরে বলল, আয় বাড়ি যাই।

চল বাবা।

নৌকায় উঠে লগি দিয়ে নৌকাটাকে নদীর মাঝে ঠেলে দিয়ে জহুর কলল, বুলবুল।

হ্যাঁ বাবা।

তোকে একটা জিনিস বলি।

বল।

যদি তোর কখনো লুকিয়ে থাকতে হয় তাহলে তুই এসে এই চরের মাঝে লুকিয়ে থাকবি। ঠিক আছে?

বুলবুল অবাক হয়ে বলল, লুকিয়ে থাকতে হবে? লুকিয়ে থাকতে হবে কেন?

আমি বলছি না তোর লুকিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু যদি কখনো দরকার হয় তাহলে এই চরে এসে লুকিয়ে থাকবি। আমি পরে এসে তোকে খুঁজে বের করব। ঠিক আছে?

বুলবুল মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে। তারপর সে তার বাবার কোলে মাথা রেখে নৌকার গলুইয়ে শুয়ে পড়ে। চাদটাকে দেখে মনে হচ্ছে কেউ বুঝি এক পাশে খানিকটা ভেঙে দিয়েছে! কেমন করে চাঁদটা এভাবে ভেঙে যায় সেই কথাটি তার মাথার মাঝে ঘুরপাক খেতে থাকে, বাবাকে জিজ্ঞেস করলে হয়। কিন্তু হঠাৎ করে তার সারা শরীর ক্লান্তিতে অবশ হয়ে যায়। তারা চোখ ভেঙে ঘুম নেমে আসে, কিছু বোঝার আগেই বুলবুল গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল।

ভোরবেলা আনোয়ারা এসে দেখে জহুর উঠানের মাঝখানে জলচৌকিতে চুপচাপ বসে আছে। আনোয়ারাকে দেখে বলল, আস আনোয়ারা বুবু। বস।

আনোয়ারা বলল, বুলবুল আজকে স্কুলে গেল না?

না। জহুর মাথা নাড়ে, ঘুমাচ্ছে।

এখনো ঘুমাচ্ছে?

হ্যাঁ। কাল রাতে ঘুমাতে অনেক দেরি হয়েছে তো।

কেন? দেরি হয়েছে কেন?

নদীর মাঝখানে যে নতুন চরটা উঠেছে সেখানে গিয়েছিলাম।

আনোয়ারা চোখ কপালে তুলে বলল, এত রাত্রে? চরে?

জহুর মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ।

কেন?

বুলবুল আকাশে উড়তে চাইছিল তাই নিয়ে গিয়েছিলাম।

উড়তে? আকাশে উড়তে?

হ্যাঁ। উড়েছে?

হ্যাঁ। কী সুন্দর আকাশে উড়ে গেল। বুবু তুমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না।

সত্যি?

হ্যাঁ বুবু। সত্যি।

কী আশ্চর্য!

জহুর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? বুলবুলের তো জন্ম হয়েছে আকাশে উড়ার জন্যে! সে আকাশে উড়বে না?

তাই বলে একজন মানুষ পাখির মতো আকাশে উড়বে?

বুলবুল কি পুরোপুরি মানুষ?

মানুষ না?

না। পুরোপুরি মানুষ না। মানুষের পাখা থাকে না। মানুষের শরীর এত হালকা হয় না! মানুষ আকাশে উড়ে না। বুলবুল হচ্ছে এক সাথে মানুষ আর পাখি। আমি চেষ্টা করেছিলাম সে যখন ছোট ছিল তার পাখা দুটো কেটে ফেলতে পারি নাই। এখন তো আর পারা যাবে না।

আনোয়ারা চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল। জহুর বলল, আনোয়ারা বুবু, আমি তোমার সাথে একটু পরামর্শ করি।

আনোয়ারা বলল, আমার সাথে?

হ্যাঁ। বুলবুল গত রাত্রে আকাশে উড়েছে। এইটা ছিল তার প্রথম উড়া। সে আরো উড়বে। একশবার উড়বে, হাজারবার উড়বে। সে যত সময় মার্টিতে থাকে তার চাইতে বেশি সময় সে আকাশে থাকবে। তার মানে কী জান?

কী?

আগে হোক, পরে হোক তাকে কেউ না কেউ দেখবে। তখন কী হবে?

হ্যাঁ। কী হবে?

তখন তাকে ধরার চেষ্টা করবে। যদি ধরতে পারে তাহলে নিয়ে যাবে। কাটাকুটি করবে, তা না হলে কোথাও বেচে দেবে। খাঁচার মাঝে ভরে রাখবে, মানুষ টিকেট কিনে দেখবে।

আনোয়ারা শুকনো মুখে মাথা নাড়ল, বলল, সর্বনাশ!

হ্যাঁ আনোয়ারা বুবু, ব্যাপারটা চিন্তা করে আমি কাল রাতে ঘুমাতে পারি নাই।

তাহলে কী করবে?

আমি জানি না। খালি চেষ্টা করতে হবে ব্যাপারটা যেন কারো চোখে পড়ে। কেউ যেন জানতে না পারে।

বুলবুল যখন ঘুম থেকে উঠেছে তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। সে আরো ঘুমাত কিন্তু তার ঘুম ভেঙে গেল প্রচণ্ড ব্যথায়। দুই পাখা, পিঠ আর ঘাড়ে অসব ব্যথা। জহুর তাকে তার কোলে উপুড় করে শুইয়ে রসুনে ভেজানো গরম সরিষার তেল দিয়ে সারা শরীরে ডলে দিতে লাগল।

শরীরের ব্যথা নিয়ে সারাটি দিন বুলবুল আহা উঁহু করলেও সন্ধ্যেবেলা সে জহুরের হাত ধরে লাজুক মুখে বলল, বাবা!

কী?

আমার আবার আকাশে উড়ার ইচ্ছে করছে!

জহুর চোখ কপালে তুলে বলল, আকাশে উড়ার ইচ্ছে করছে?

হ্যাঁ বাবা।

তোর না সারা শরীরে ব্যথা!

বুলবুল তার পাখাগুলো একটু ছড়িয়ে আবার গুটিয়ে নিয়ে বলল, ব্যথা কমে গেছে বাবা!

জহুর কিছুক্ষণ বুলবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে!

রাত যখন গভীর হয়ে এলো জহুর আবার বুলবুলকে নৌকা করে নিয়ে গেল জনমানবহীন সেই চরে। বুলবুল আবার পাখা ঝাঁপটিয়ে আকাশে উড়ে গেল—আগের দিন থেকেও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসে!

এভাবেই শুরু হলো। প্রতিরাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে গেছে তখন জহুর বুলবুলকে নৌকা করে নিয়ে গেছে চরে। পুবের আকাশ ফর্সা না হওয়া পর্যন্ত বুলবুল আকাশে উড়েছে!

দুই সপ্তাহ পর জহুরের আবার ডাক পড়ল গম বোঝাই বড় একটা নৌকার মাঝি হয়ে সুন্দরবনের গহিনে যাবার জন্যে। জায়গাটা বিপজ্জনক, সবাই যেতে চায় না, তাই কেউ যখন যায় তাকে ভালো মজুরি দেয়া হয়। দুই সপ্তাহ পরিশ্রম করলে চার সপ্তাহ শুয়ে-বসে কাটিয়ে দেয়া যায়।

জহুর যখন বিদায় নিয়ে রওনা দিয়েছে তখন বুলবুল তার পেছনে পেছনে এসেছে। নদীর ঘাটে বুলবুল জহুরের হাত ধরে বলল, বাবা।

বল।

এখন আমাকে চরে কে নিয়ে যাবে?

তোকে নেয়ার এখন কেউ নেই। আমি না আসা পর্যন্ত তোর আকাশে উড়াউড়ি বন্ধ।

কিন্তু বাবা—

কোনো কিন্তু নেই।

আমার যদি খুব উড়ার ইচ্ছে করে?

ইচ্ছে করলেই হবে না। আমি না আসা পর্যন্ত উড়তে পারবি না।

বুলবুল অনিচ্ছার ভঙ্গি করে বলল, ঠিক আছে।

(চলবে)