দ্বিতীয় পর্ব
সায়েন্স ফিকশন সমগ্র থেকে
#টুকি_ও_ঝায়ের (প্রায়) দুঃসাহসিক অভিযান - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মহাকাশযানটির কন্ট্রোল প্যানেলে বসে টুকি খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেটি পরীক্ষা করছে। কাছাকাছি মেঝেতে পা ছড়িয়ে খেতে বসেছে ঝা—যন্ত্রপাতিতে তার কোন উৎসাহ নেই। আরো খানিকটা দূরে রোবি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, টুকি খানিকক্ষণ কিছু একটা লক্ষ্য করে অধৈর্য হয়ে হাত নেড়ে বলল, এর মাথামুও কিছু বুঝতে পারছি না।
রোবি বলল, এটি কোন জীবিত জিনিস নয়—এর মাথামুণ্ডু নেই কাজেই এটা বুঝতে পারছ না।
টুকি চোখ পাকিয়ে রোবির দিকে তাকিয়ে বলল, দূর হও হতভাগা।
রোবি দূর হওয়ার কোন চিহ্ন দেখাল না বরং আরো এক পা এগিয়ে এসে বলল, মানুষ যখন নির্বোধের মত কাজ করে তখন আমার দেখতে বড় ভাল লাগে।
আমি কোন জিনিসটা নির্বোধের মত করছি?
এই যে মহাকাশযান চালানোর কোন কিছু না জেনে আপনি এটা চালানোর চেষ্টা করছেন! ভুল জায়গায় টেপাটেপি করছেন।
টুকি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রোবির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি মহাকাশযান চালানো জান?
জানি। এটাকে কেমন করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নেওয়া যায় তুমি জান? অবশ্যি জানি।
তাহলে ব্যাটা বদমাইশ আমি এতদিন থেকে এটাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি, আমাকে একবার সাহায্য করতে এলে না কেন?
আমাকে বলেন নাই, তাই আসি নাই।
টুকি খানিকক্ষণ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে রোবির দিকে তাকিয়ে থেকে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ঠিক আছে। এখন আমি বলছি, আমাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাও।
রোবি কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ কিছু যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে বলল, এখান থেকে পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার দুটি উপায় আছে। একটা বড় হাইপার ডাইভ কিংবা দুটি ছোট হাইপার ডাইভ। বড় হাইপার ডাইভ দেয়ার সমস্যা একটিই–মহাকাশানে যথেষ্ট জালানী নেই। ছোট দুটি হাইপার ডাইভ দেওয়া যেতে পারে তবে সেটারও একটা সমস্যা আছে।
কী সমস্যা?
প্রথমে মহাকাশযানের বেগ বড়াতে হবে, সেজন্যে কাছাছি একটা বড় গ্রহ বা নক্ষত্র দরকার। কাছাকাছি সেরকম কিছু নেই। মহাকাশযানের ট্র্যাজেক্টরীও পাল্টাতে পারব না, জ্বালানী নষ্ট হবে। যদি এভাবে যেতে থাকি চার সপ্তাহের মাঝে একটা মাঝারী গোছের নক্ষত্র পাওয়া যাবে, সেটাকে ব্যবহার করে হাইপার ডাইভ দেওয়া যাবে।
টুকি অধৈর্য হয়ে বলল, কিন্তু সমস্যাটা কী?
ঐ যে বললাম, চার সপ্তাহ যেতে হবে। আপনারা যেভাবে তিনবেলা খাচ্ছেন খাবার কম পড়ে যাবে।
ঝা চোখ লাল করে বলল, সেটাই সমস্যা?
সেটাই মূল সমস্যা। আরো কিছু ছোট সমস্যা আছে। মহাকাশযানটা যে পথ দিয়ে যাবে সেখানে আশেপাশে বেশ কিছু গ্রহ উপগ্রহ আছে, সেখানে মানুষ। আর রবোটের বসতি। তারা সেরকম বন্ধুভাবাপন্ন নয়।
ঝা মেঝেতে বসে বড় একটা গলদা চিংড়ি চিবুতে চিবুতে বলল, তাতে সমস্যাটা কী? আমরা কী আর আত্মীয়তা করতে যাচ্ছি?
রোবি তার যন্ত্রপাতির দিকে ঝুকে পড়ে বলল, এ ছাড়াও আরো একটি সমস্যা আছে। হাইপার ডাইভ দেওয়ার পর মাঝে মাঝে সময় নিয়ে গোলমাল হয়।
টুকি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, কী গোলমাল?
যেমন মনে করেন আজকে রওনা দিয়ে গতকাল পৌঁছে যাওয়া।
ঝা হা হা করে হেসে বলল, এটা গোলামাল হবে কেন? এটা তো ভাল, জীবনে খানিকটা সময় বাড়তি পেয়ে যাওয়া যাবে।
ঝা যত সহজে ব্যাপারটা মেনে নিল আসলেই এটা এত সহজে মেনে নেয়া উচিত কী না সেটা নিয়ে টুকির একটু সন্দেহ হয়। কিন্তু এখন সেটা নিয়ে তার আর মাথা ঘামানোর ইচ্ছে করছিল না। একটু অধৈর্য হয়ে বলল, রোবি, বকবক বন্ধ করে এখন তাহলে চল পৃথিবীর দিকে।
ব্যাপারটা যত সহজ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল সেটা যে এত সহজ নয়। সেটা টের পেল দুদিন পরেই। সবুজ রংয়ের মাঝারী একটা গ্রহের পাশে দিয়ে যাবার সময়, কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে একটা স্কাউটশীপ এসে টুকি, ঝা আর রোবিকে ধরে নিয়ে গেল।
যারা তাদের ধরে নিয়ে গেল তারা সবাই রবোট। যাদের কাছে ধরে নিয়ে গেল তারাও রবোট এবং তারা যাদের কাছে তাদের ধরে নিয়ে গেল তারাও রবোট। টুকি একজনকে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের এখানে কোন মানুষ নেই?
যাকে জিজ্ঞেস করল সে কালচে রংয়ের বিদঘুটে একটি যন্ত্র, মুখ দিয়ে ফোৎ করে একটা শব্দ করে বলল, মানুষ? ছিঃ!
তাহলে আমাদের ধরে এনেছ কেন?
ধরে এনেছি? হাহ্।
এখানে কে আছে? কার সাথে কথা বলা যাবে?
কথা?
হুঁ!।
টুকি বুঝতে পারল এই নিম্নশ্রেনীর রবোটটির সাথে কথা বলার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই। বিভিন্ন রবোটের মাঝে হাত বদল হয়ে যখন শেষ পর্যন্ত তারা মোটামুটি নেতা গোছের একটা চালাক চতুর রবোটের সামনে হাজির হল তখন টুকি জিজ্ঞেস করল, তোমরা আমাদের ধরে এনেছ কেন? রবোটটি তার সবুজ চোখ দুটিকে হালকা লাল রংয়ে পাল্টে দিয়ে বলল, তোমাদের কাপাট্রনের কন্ট্রোলার আই.সি.টা দরকার।
টুকি ভুরু কুচকে বলল, কী বললে? কন্ট্রোলার আই. সি.?
হ্যাঁ! তোমাদের মত রেপ্লিকা রবোট আমাদের খুব কম। যদি কপোট্রন থেকে–
ঝ চোখ কপালে তুলে বলল, রেপ্লিকা রবোট? আমরা মোটেও রেপ্লিকা রবোট না।
তাই নাকি? তোমরা কি তাহলে ড়ুপ্লিকা?
না আমরা রেপ্লিকা ড়ুপ্লিকা কোনটাই না। আমরা মানুষ।
মানুষ! রবোটটা একটা আর্ত চিৎকার করে দুই পা পিছিয়ে গেল। ক্লিক ক্লিক করে কয়েটা শব্দ হল, চারপাশে ঘিরে থাকা রবোটেরা হাতে অস্ত্র ধরে তাদের দিকে তাক করে ধরল। গবেট ধরনের একটা রবোট জিজ্ঞেস করল, গুলি করে দেব নাকি?
নেতা গোছের রবোর্টটা বলল, আগেই করো না, তবে গুলির রেঞ্জের মাঝে রাখ।
বেঁটে খাটো একটা রবোট ভাঙা গলায় বলল, সর্বনাশ! মোটা মানুষটা আমার দিকে তাকাচ্ছে। বিপদ হবে না তো আমার?
হতে পারে। চোখে চোখে তাকিও না। তোমার সর্বনাশ করে দেবে। ওদের সব বদমাইশী চোখের মাঝে।
টুকি এবং ঝা মোটামুটি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে কোনমতে নিজেদেরকে সামলে নিয়ে বলল, তোমরা আমাদের এত ভয় পাচ্ছ কেন?
ভয় পাব না? কী বল তুমি? মানুষ হচ্ছে এই সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে খল, ফন্দিবাজ, ধূর্ত, অসৎ, বদমাইশ এবং ধুরন্ধর। তারা ইচ্ছা করলে দিনকে রাত করে দিতে পারে রাতকে দিন করে দিতে পারে। গ্রহকে নক্ষত্র করে দিতে পারে নক্ষত্রকে গ্রহ করে দিতে পারে। মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। আমরা রবোটরা মানুষ থেকে দশ লাইট ইয়ার দূরে থাকি।
আমাদেরকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঝা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আমরা অত্যন্ত সাধারণ মানুষ।
সাধারণ মানুষ বলে কোন কথা নেই। আগুন যেরকম ঠাণ্ডা হয় না মানুষ সেরকম সাধারণ হয় না। মানুষ মানেই অসাধারণ
না। ঝা জোরে জোরে মাথা নাড়ল, মানুষের মাঝে দুষ্টু মানুষ আছে কিন্তু আমরা সেরকম মানুষ নই। আমরা কারো ক্ষতি করি না।
রবোটদের নেতাটি উঁচু গলায় অন্য রববাটদের বলল, বলেছিলাম না, মানুষেরা খুব যুক্তি দিয়ে অযৌক্তিক কথা বলে? এই দেখ। খবরদার কেউ এদের সাথে কথা বলো না।
টুকি একটু এগিয়ে এসে বলল, আমরা মোটেও অযৌক্তিক কোন কথা বলছি না। কিন্তু যদি তোমরা আমাদের সাথে কথা বলতে না চাও তাহলে আমাদের যেতে দাও। আমরা যাই।
গবেট ধরনের রবোটটা আবার বলল, গুলি করে দেব না কী?
না। আগেই করো না, গুলি করলে মরে যাবে। মানুষের মত অপদার্থ প্রাণী খুব কম রয়েছে ছোট একটা গুলি খেলেই মরে যায়।
মরে গেলে আবার সার্ভিসিং করে নেব।
মানুষ মরে গেলে সার্ভিসিং করা যায় না।
কোন কোম্পানি এদের তৈরি করে? কত দিনের ওয়ারেন্টি দেয়?
কোন কোম্পানি এদেরকে তৈরি করে না। এদের কোন ওয়ারেন্টি নেই।
গবেট ধরনের রবোটটা বলল, তাহলে গুলি করে দেই।
না। নেতা গোছের রবোটটা বলল, এদেরকে না মেরে সাবধানে এদের মস্তিষ্ক কেটে আলাদা করে নিতে হবে। তখন আর কোন ভয় থাকবে না, কিন্তু সব রকম বুদ্ধি নেওয়া যাবে। তখন এরা আমাদের সাহায্য করবে।
উপস্থিত সবগুলো রবোট মাথা নেড়ে বলল, চমৎকার বুদ্ধি! চমকার বুদ্ধি!!
টুকি এবং ঝা শুকনো গলায় বলল, তোমরা কী বলছ এই সব? মস্তিষ্ক কেটে নেবে মানে?
আমাদের অস্ত্রোপচারকারী রবোট আছে, নিখুঁতভাবে মস্তিষ্ক কেটে নিতে পারে।
নিলেই হল? তোমার ধারণা আমার মাস্তিষ্ক কেটে নিলে আমি কোনদিন তোমাদের সাহায্য করব?
করবে না?
করব না।
ঝা-ও জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, কক্ষণাে করব না।
টুকি চোখ মুখ লাল করে বলল, শুধু যে সাহায্য করব না তাই নয়, সাহায্য চাইলে এমন উল্টা পাল্টা বুদ্ধি দেব যে তোমরা বুঝতেই পারবে না, সেটা কাজে লাগাতে গিয়ে সর্বনাশ হয়ে যাবে তোমাদের।
গবেট ধরনের রবোট বলল, দেই গুলি করে শেষ করে।
টুকি বলল,তার চাইতে এসো মিলে মিশে থাকি। তোমাদের কী বিষয় সাহায্যের দরকার বল আমরা সাহায্য করি। যদি দেখ আমাদের সাহায্যে কাজ হচ্ছে না তখন না হয় যা ইচ্ছে হয় কর।
সত্যি বলছ? একেবারে একশ ভাগ সত্যি। এন্ড্রোমিডার কসম।
রবোটের নেতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তোমার প্রস্তাবটা বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। সেটা আমাদের সব বুদ্ধিজীবী রবোটদের সাথে আলোচনা করে দেখতে হবে।
গবেট ধরনের রবোর্টটা আবার গলা উঁচিয়ে বলল, এত সব ঝামেলা না করে দেই গুলি দিয়ে শেষ করে।
রবোটের নেতা যখন বুদ্ধিজীবী রবোটদের সাথে আলোচনা করছিল তখন টুকি এবং ঝা বসে বসে ঈশ্বরকে স্মরণ করতে থাকে। চুরি করতে যাওয়ার আগে যেসব বিশেষ বিশেষ প্রার্থনা করত বসে বসে সেগুলো আওড়াতে থাকে। রোবি কাছে এসে বলল, আপনারা কী ভয় পাচ্ছেন? ব্লাডার কন্ট্রোল–
টুকি খেকিয়ে উঠে বলল, চুপ কর ব্যাটা গবেট, রবোটের বাচ্চা রবোট।
কী মনে হয় আপনাদের? মানুষ কী আসলেই খল, ফন্দিবাজ, ধূর্ত, অসৎ, বদমাইশ এবং ধুরন্ধর? আপনাদের কাজকর্ম দেখে মনে হয় সত্যি হতেও পারে ব্যাপারটা। কী বলেন?
ঝা দাঁত কিড়মিড় করে বলল, বাজে কথা বললে এক ঘুষিতে কপোট্রন তুষ করে দেব।
রোবি তার গলায় মধু ঢেলে বলল, মনে হয় আপনারা একই সাথে ভয় পাচ্ছেন এবং রাগ হচ্ছেন। কী বিচিত্র একটা ব্যাপার। শুধু মাত্র মানুষের পক্ষেই। এটা সম্ভব। রাগ এবং ভয়। কী চমৎকার!
ঠিক এরকম সময়ে রবোটের নেতা বুদ্ধিজীবী রবোটদের নিয়ে হাজির হল বলে রোবির সাথে টুকি এবং ঝায়ের কথাবার্তা আর বেশিদূর এগুতে পারল না। বুদ্ধিজীবী রবোটদের দেখেই বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে তারা বুদ্ধিজীবী, তাদের লিকলিকে হাত পা এবং শরীরের তুলনায় বিশাল একটি মাথা। তাদের শরীরের ভারসাম্য ঠিক নয় এবং প্রত্যেকবার পা ফেলার সাথে সাথে মনে হতে থাকে তাল হারিয়ে নিচে আছাড় খেয়ে পড়বে—খুব সাবধানে তারা নিজেদের রক্ষা করে টুকি এবং ঝায়ের কাছে এগিয়ে আসে। যে বুদ্ধিজীবী রবোটের মাথা সবচেয়ে বড় সে বুদ্ধিজীবী সুলভ নাকী গলায় বলল, আপনারা আমাদের সাহায্য করতে রাজী হয়েছেন শুনে আমরা রবোটরা বিশেষ পুলকিত হয়েছি–
ঝা ফিসফিস করে বলল, পুলকিত মানে কী?
টুকি বলল, খুশী হওয়া।
বুদ্ধিজীবী রবোটটা বলল, আমরা সাধারণত মনুষ্য থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে থাকতে পছন্দ করি। তবে ঘটনাক্রমে যেহেতু আপনারা আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছেন, আমাদের কিছু করার নেই। আপনাদের দেহ ব্যবচ্ছেদ করে মস্তিষ্ক উৎপাটন না করে যদি কোন কাজ করা যায় সেটা সম্ভবত গ্রহণযোগ্য। যে ব্যাপারে আমরা আপনাদের সাহায্য কামনা করি সেটি অত্যন্ত গোপনীয়।
টুকি মাথা নেড়ে বলল, আমরা আপনাদের গোপনীয়তা রক্ষা করব।
আপনাদের নিয়ে আমি দুশ্চিন্তিত নই। আমাদের নিজেদের যে অশিক্ষিত অর্বাচীন মূখ রবোর্ট রয়েছে তাদের নিয়েই আমি চিন্তিত–
ঝা আবার ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, অর্বাচীন মানে কী?
কোন একটা গালি গালাজ হতে পারে।
বুদ্ধিজীবী রবোট আবার নাকী সুরে বলল, আপনারা আমাদের সঙ্গে আসুন, ব্যাপারটি বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
গবোট ধরনের রবোটটা ফোৎ করে একটা শব্দ করে বলল, তখনই বলেছিলাম গুলি করে শেষ করে দেই—
বুদ্ধিজীবী রবোটগুলো টুকি এবং ঝাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে, মাথাটি বাড়াবাড়ি রকম বড় হওয়ায় রবোটগুলোর তাল সামলাতে খুব কষ্ট হচ্ছিল এবং মনে হচ্ছিল যে কোন মূহূর্তে বুঝি উল্টে পড়ে যাবে। সবচেয়ে বড় মাথা যে রবোটটির সে তার নাকী গলায় বলল, সবার জীবনে একটা উদ্দেশ্য থাকতে হয়। উদ্দেশ্যবিহীন জীবন জ্বালানীবিহীন রকেটের মতন।
ঝা মাথা নাড়ল, বলল, কিংবা খাবারহীন ডাইনিং টেবিলের মত।
রবোটটি ঝায়ের কথা শুনতে পেল বলে মনে হল না, রবোটদের খেতে হয় বলে মনে হয় কথার গুরুত্বটাও ধরতে পারল না। সে বলে চলল, আমাদের। জীবনেরও একটা মূল উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে মানব জাতিকে ধ্বংস করা।
টুকি এবং ঝা একসাথে চমকে উঠল, কী বললে?।
হ্যাঁ, মানব জাতিকে ধ্বংস করা। মানুষ মাত্রই হচ্ছে খল, ফন্দিবাজ, ধূৰ্ত্ত, অসৎ, বদমাইশ এবং ধুরন্ধর। এরা সমস্ত বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডে জীবাণুর মত ছড়িয়ে পড়ছে। সমস্ত সৃষ্টিজগৎকে কলুষিত করে দিচ্ছে। এদেরকে যদি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া যায় এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সত্যিকারের শান্তি নেমে আসবে।
টুকি ঢোক গিলে বলল, তোমরা কীভাবে সেটা করবে?
আমরা সেটা এর মাঝে শুরু করেছি। শত্রুকে ধ্বংস করার প্রথম পর্যায় হচ্ছে তাদেরকে বোঝা। আমরা মানুষকে বোঝার কাজ শুরু করেছি।
কীভাবে সেটা করছ?।
রাগ, দুঃখ, আনন্দ, ঘৃণা, ভালবাসা এই ধরনের কিছু ব্যাপার আছে মানুষের। তারা সেগুলোর নাম দিয়েছে অনুভূতি। আমাদের সেগুলো নেই।
সেটাই হচ্ছে আমাদের মূল সমস্যা।
ঝ একটু ইতস্তত করে বলল, দেখ, তোমাদের একটা কথা বলি–একেবারে একশভাগ সত্যি, এড্রোমিডার কসম!
কী কথা?
তোমাদের যে অনুভূতি নেই সেটা আসলে সমস্যা নয়, সেটা হচ্ছে তোমাদের উপর আশীর্বাদ। এই ঝামেলা যাদের আছে তাদের জীবন একেবারে ফানা ফানা হয়ে যাচ্ছে।
হতে পারে। কিন্তু তবুও মানুষ নামের এই খল, ফন্দিবাজ, ধূর্ত, অসৎ বদমাইশ এবং ধুরন্ধর শত্রুকে বুঝতে হলে আমাদের এই অনুভূতির সাথে পরিচিত হতে হবে। সেই জন্যে আমরা অনেক দিন থেকে কাজ করছি, আমাদের বেশ খানিকটা সাফল্যও এসেছে।
টুকি ভয়ে ভয়ে মাথা বড় রবোটটির দিকে তাকিয়ে বলল, তার মানে তোমরা আজকাল রেগে যাও? দুঃখ আনন্দ এই সব পাও?
ইচ্ছা করলে পেতে পারি। আমরা সেটা আবিষ্কার করেছি। হার্ডওয়ার সফটওয়ার তৈরি হয়ে গেছে, এখন কপোট্রনে বসিয়ে দেওয়ার জন্যে ছোট চীপ তৈরি হচ্ছে।
কথা বলতে বলতে বুদ্ধিজীবী রবোটটা একটা বন্ধ ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরের উপরে লেখা দুঃখ ল্যাবরেটরি।
টুকি এবং ঝা একটু অবাক হয়ে বুদ্ধিজীবী রবোটটার দিকে তাকাতেই রবোর্টটা বলল, এই ল্যাবরেটরিতে আমরা রবোটদের দুঃখ দেওয়া নিয়ে গবেষণা করি।
ঝা মাথা নেড়ে বিড় বিড় করে বলল, মাথা খারাপ আর কাকে বলে। দুঃখ দেওয়ার গবেষণা!
টুকি জিজ্ঞেস করল, কতদূর হয়েছে গবেষণা?
আসুন, আপনাদের দেখাই।
রবোটটা কোথায় চেপে ধরতেই একটা স্বচ্ছ জানালা খুলে গেল এবং দেখা গেল ভিতরে ছোট একটা জানালার পাশে একটা শুকনো ধরনের রবোট বসে আছে। তার হাতে একটা বই। রবোটটি খুব মনোযোগ দিয়ে বইটি পড়ছে। বুদ্ধিজীবী রবোট বলল, এইটা খুব দুঃখের একটা বই। একটা রবোটের কপোট্রনের পাওয়ার সাপ্লাইয়ে কীভাবে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল সেই কাহিনী। লেখা আছে। এই বইটা পড়ে এই রবোটটা দুঃখ পায় কী না দেখা হচ্ছে।
বুদ্ধিজীবী রবোটের কথা শেষ হবার আগেই জানালার পাশে বসে থাকা শুকনো ধরনের রবোটটা হঠাৎ বই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মেঝেতে মাথা কুটে হাউ মাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করল। টুকি এবং ঝা স্পষ্ট দেখতে পেল চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। বুদ্ধিজীবী রবোটটি খুব সন্তুষ্টির ভান করে বলল, সফল এক্সপেরিমেন্ট। চোখের পানিটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে লোনা হয়েছে কী না!
টুকি এবং ঝা এবারে খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। কপোট্রনের পাওয়ার সাপ্লাইয়ে গোলমাল হলে কী এভাবে কান্নাকাটি করা উচিত? কে জানে। রহোটদের জীবনে এটাই হয়তো গভীর দুঃখের ব্যাপার। বুদ্ধিজীবী রবোট এবারে টুকি আর ঝাকে নিয়ে গেল পাশের ল্যাবরেটরিতে। তার উপর বড় বড় করে লেখা ক্রোধ ল্যাবরেটরি।
ঝা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, এখানে কী রাগারাগি হয়?
হ্যাঁ। ক্রোধ অনুভূতিটি এর মাঝে বিশ্লেষণ করা হয়। কী কী কারণে রাগ হওয়া উচিত সেটা বের করে বিশাল একটা ডাটাবেস তৈরি করা হয়েছে। সেই সব কোন একটা ঘটনা ঘটে গেলেই রবোটেরা রেগে উঠে।
রেগে উঠে?
হ্যাঁ তখন কপোট্রনে উল্টোপাল্টা সিগনাল দেওয়া হয়। বিতিকিচ্ছি একটা ব্যাপার ঘটে। আপনাদেরকে দেখাই।
একটা সুইচ টিপে আগের মত একটা স্বচ্ছ জানালা খুলে দেওয়া হল। ভিতরে গাবদা গোবদা একটা রবোট টুলের উপর বসে আছে, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে শুটকো মত একটা রবোট। বুদ্ধিজীবী রবোট বলল, যে রবোটটা বসে আছে তাকে এখন রাগিয়ে দেওয়া হবে।
কী ভাবে?
রবোটটি আরেকবার সুইচ টিপে দিয়ে বলল, দেখেই বুঝতে পারবেন।
টুকি এবং ঝা আবাক হয়ে দেখল শুটকো রবোটটি ঘরের এক কোণায় হেঁটে গিয়ে বিশাল একটা হাতুরী নিয়ে এসে বসে থাকা রবোটটার মাথায় গদাম করে মেরে বসল। মনে হলো সেই আঘাতে রবোর্টটার মাথা তার শরীরের ভিতর খানিকটা ঢুকে গেছে।
ঝা মাথা নেড়ে বলল, রাগানোর একেবারে এক নম্বর বুদ্ধি।
টুকি এবং ঝায়ের কোন সন্দেহই রইল না যে গাবদা গোবদা রবোর্টটা রেগে উঠছে। তার সবুজ চোখ দুটি আস্তে আস্তে টকটকে লাল হয়ে উঠল, কান থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করল, শরীর থেকে ছোট ছোট বজ্রপাতের মত বিদ্যুৎপাত হতে শুরু করল। এক সময় হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আঁ আঁ করে বিকট চিঙ্কার করতে করতে টুলটা তুলে নিয়ে শুটকো রবোটটাকে এলোপাথাড়িভাবে মারতে শুরু করল। টুলটা কিছুক্ষণের মাঝেই ভেঙ্গেচুরে টুকরো টুকরো হয়ে গেল তখন খালি হাতেই শুটকো রবোটটিকে চেপে ধরে কিল ঘুষি লাথি মারতে মারতে ঘরের এক কোণা থেকে অন্য কোথায় নিয়ে যায়, দেয়ালে চেপে ধরে পেটে ঘুষি মারতে থাকে, মাথা টেনে শরীর থেকে আলগা করে আনে, নিচে ফেলে উপরে লফিয়ে সমস্ত শরীরটাকে দলামোচা করে ফেলে। কিছুক্ষণেই শুকনো রবোটের শরীরের বিশেষ কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না।
বুদ্ধিজীবী রবোট তার মস্ত মাথা নেড়ে বলল, নিখুঁত রাগ। একেবারে মানুষের খাঁটি রাগ।।
টুকি সাবধানে একটা নিঃশ্বাস ফেলে শুটকো রবোটটার ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে রইল।
টুকি এবং ঝা এভাবে আনন্দ ল্যাবরেটরি, ঘৃণা ল্যাবরেটরি, হিংসা ল্যাবরেটরি, ভালবাসা ল্যাবরেটরি দেখে শেষ পর্যন্ত একটা বড় ল্যাবরেটরির সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার উপরে বড় করে লেখা কৌতুকবোধ ল্যাবরেটরি। বুদ্ধিজীবী রবোর্টটা ফোঁস করে একটা শব্দ করে বলল, আমাদের সমস্ত গবেষণা এইখানে এসে মার খেয়ে যাচ্ছে।
টুকি জিজ্ঞেস করল, কি ভাবে?
বছরের পর বছর আমরা গবেষণা করে যাচ্ছি কিন্তু কিছুতেই রবোটের মাঝে কৌতুকবোধ জাগাতে পারছি না। কোন জিনিসটা শুনে হাসতে হয় আমরা সেটা বুঝতে পারছি না। আমাদের মাঝে কোন সেন্স অফ হিউমার নেই।
মানুষের তৈরি যত হাসির গল্প রয়েছে, যত কার্টুন, জোক রসিকতা সব নিয়ে আসা হয়েছে, আমাদের শত শত বুদ্ধিজীবী রবোট সেগুলো পড়ে যাচ্ছে, বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে। আমাদের যত সুপারকম্পিউটার রয়েছে সেগুলো লক্ষ লক্ষ সফটওয়ার তৈরি করেছে, বিশাল সমস্ত ডাটাবেস তৈরি হয়েছে কিন্তু কোন লাভ হয় নি। এখনো আমরা দেখে বা শুনে বুঝতে পারি না কোনটা হাসির আর কোনটা হাসির নয়।
ঝা জিব দিয়ে চুকচুক করে শব্দ করে বলল, বড়ই দুঃখের কথা।
বুদ্ধিজীবী রবোটটা নাকী সুরে বলল, এই একটা মাত্র জিনিসের জন্যে আমরা মানুষের সমান হতে পারছি না। এই ব্যাপারে তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন।
টুকি ভুরু কুচকে বলল, আমাদের কী করতে হবে।
আমাদের রসিকতা শেখাতে হবে।
টুকির চোয়াল ঝুলে পড়ল, রসিকতা শেখাতে হবে?
হ্যাঁ! এক সপ্তাহ সময় দেয়া হল। এর মাঝে যদি আমাদের রসিকতা শেখাতে পার তোমাদের চলে যেতে দেব।
টুকি শুকনো গলায় বলল, আর যদি না পারি?
তাহলে তোমাদের মস্তিষ্কটা আলাদা করে নেব।
রবোটদের কোন রসবোধ নেই, তারা যে ঠাট্টা করছে না সেটা বুঝতে টুকি আর ঝায়ের এতটুকু দেরী হল না।
বুদ্ধিজীবী রবোর্টটা কৌতুকবোধ ল্যাবরেটরি ঘরের দরজা খুলে তার মাঝে ঠেলে টুকি এবং ঝাকে ঢুকিয়ে দিয়ে ঘটাং করে বাইরে থেকে তালা মেরে দিল।
ঘরের ভিতরে একটা বড় টেবিল, তার চারপাশে বেশ কয়েকটা চেয়ার। চেয়ারে পিঠ সোজা করে দুটি রবোট বসে আছে। ঘরের দেয়ালে অসংখ্য তাক সেখানে মাইক্রো ক্রিস্টালে পৃথিবীতে হাস্যকৌতুক নিয়ে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে সব জমা করে রাখা আছে। ঝা শুকনো মুখে বলল, কী বিপদে পড়া গেল।
টুকি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বিপদের কী আছে? হাসি তামাশা তো ছেলেমানুষী ব্যাপার, বোঝানো কঠিন হবে না।
ঝা বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়ল, বলল, হাসি তামাশা করা সোজা। সেটা বোঝানো সোজা নয়।
এস, দেখি চেষ্টা করে এদের কী অবস্থা। টুকি রবোট দুটির সামনে গিয়ে বলল, তোমাদের নাম কী?
রবোট দুটি দেখতে হুঁবহুঁ এক রকম, একজন বলল, আমাদের কোন নাম নেই।
নাম নেই? এ তো মহা যন্ত্রণা হল দেখি।
এটা কী হাসির কথা? আমরা কি হাসব?
না এটা হাসির কথা নয়। কিন্তু তোমাদের নাম না থাকলে ডাকাডাকি করা নিয়ে খুব অসুবিধে হবে। প্রথমে তোমাদের একটা করে নাম দিয়ে দেওয়া যাক।
কী নাম দেবে?
যেহেতু আমাদের প্রজেক্ট তোমাদের হাসাহাসি করানো, কাজেই তোমাদের নাম দেওয়া যাক হাসা আর হাসি। টুকি একজনের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার নাম হাসা তারপর অন্যজনের দিকে তাকিয়ে বলল, আর তোমার নাম হাসি।
রবোট দুটি মাথা নেড়ে নিজেদের নাম গ্রহণ করে নিল।
টুকি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, হাসা এবং হাসি এবার হাসাহাসি শুরু কর।
হাসা নামের রবোর্টটি বলল, এটা কী হাসির কথা? আমরা কী হাসব?
হাসি নামের রবোটটা বলল, না এটা আমার কথা না।
টুকি হেসে বলল, এটা হাসির কথা না সেজন্যে এটা হাসির কথা!
তাহলে কী আমরা হাসব?
হ্যাঁ, হাস।
রবোট দুটি কাঠ কাঠ স্বরে উচ্চারণ করল হা হা হা হা। তাদের এই শুষ্ক ধাতব স্বর শুনে হঠাৎ করে টুকি এবং ঝায়ের শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। টুকি শুকনো গলায় বলল, ঝা, কাজটা সহজ হবে না।
ঝা বলল, আমি জানতাম।
টুকি একটা নিঃশ্বাস ফেলে হাসা-হাসির দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা এতদিন কী করছ?
আমরা একটা কৌতুক নিয়ে সেটা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি।
কতদিন থেকে করছ?
হাসা বলল, আজকে নিয়ে সাত বছর দুই মাস এগারো দিন।
টুকি এবং ঝা একসাথে চমকে উঠলো, ঝা ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী? কী বললে?
হাসি বলল, এটা কিছুই না। এর আগেরটা নিয়ে আমারা এগারো বছর সময় কাটিয়েছি। শেষে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পেরে সেটা ছেড়ে দিয়েছি। সেই তুলনায় এইটা মনে হয় সহজ। গত ছয় মাস থেকে মনে হয় একটু একটু বুঝতে পারছি।
কী বুঝতে পারছ?
কৌতুকটার কোন জায়গায় হাসতে হবে।
টুকি ভুরু কুচকে বলল, কৌতুকটা কী, শুনি।
একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে বলছে, কাল আমার স্ত্রী শেষ পর্যন্ত আমার সামনে হাঁটুগেড়ে উবু হয়ে বসেছে।
তাই নাকী? হাঁটুগেড়ে বসে কী বলেছে?
বলেছে, খাটের তলা থেকে বের হয়ে আয় মিনষে।
টুকি শুনে খুবখুক করে এবং ঝা হা হা করে হেসে উঠল। হাসা এবং হাসি তাদের সবুজাভ ফটো সেলের চোখ দিয়ে টুকি এবং ঝাকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করে তাদের হাসি থামার পরে বলল, আমাদের ধারণা এটি কেন কৌতুককর আমরা সেটাও বুঝতে পেরেছি।
কেন, শুনি।
কারণ মানুষটি তার বন্ধুকে মিথ্যা কথা বলছে।
কখন মিথ্যা কথা বলল?
মানুষ কখনো খাটের তলায় যায় না, এটি মিথ্যা কথা।
মিথ্যা কথা বললে সেটা হাস্যকর হবে কেন?
কারণ মানুষদের নীতি জ্ঞান খুব কম। তারা মিথ্যাচার করে আনন্দ পায়।
টুকি রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, সাত বছর বিশ্লেষণ করে এইটা আবিষ্কার করলে?
হাসি বলল, কেন ভুল হয়েছে?
টুকি কোন কথা না বলে মেঝেতে পা দাপিয়ে ঘরের অন্যপাশ চলে গেল।
হাসা ঝাকে জিজ্ঞেস করল, এইটা কী হাস্যকর? আমরা কী এখন হাসব?
ঝা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ইচ্ছে হলে হাস।
হাসা এবং হাসি একসাথে কাঠ কাঠ স্বরে উচ্চারণ করল, হা হা হা হা এবং সেটা শুনে আবার টুকি এবং ঝায়ের সমস্ত শরীর কাটা দিয়ে উঠে।
পরবর্তী দিনগুলো টুকি অমানুষিক পরিশ্রম করে রোট দুটিকে হাস্য কৌতুকের মর্মকথা বোঝানোর চেষ্টা করে। যখন সে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল রবোটেরা ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছে তখন সে তাদেরকে একটা কৌতুক শোনাল। কৌতুকটা এরকম:
বায়োলজি শিক্ষক একটা কাবাব চিমটা দিয়ে ধরে বলল, এই যে ব্যঙটা দেখছ এটা এখন আমরা কাটব।
ছাত্রছাত্রীরা বলল, স্যার, এটা তো ব্যঙ নয়, এটা কাবাব।
স্যার চোখ কপালে তুলে বললেন, তাহলে আমি নাস্তা করলাম কী খেয়ে
কৌতুকটা শুনে হাসা এবং হাসি হা হা করে হেসে উঠে এবং সেটা দেখে টুকি বেশ উৎসাহ অনুভব করল। জিজ্ঞেস করল, বল দেখি কোন জায়গাটা হাসির?
হাসা বলল, খুব সহজ। যখন শিক্ষক বলল, তাহলে আমি কী খেয়ে নাস্তা করলাম?
টুকির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, বলল, ঠিক ধরেছ। হাসি তুমি এখন বল, কেন এই কথাটা হাসির।
কারণ শিক্ষক দুইটা কাবাব এনেছিল। একটা দিয়ে নাস্তা করেছে আর দু নম্বরটা চিমটা ধরে ছাত্রছাত্রীদেরকে দেখিয়েছে।
টুকির চোয়াল স্কুলে পড়ল। কোনমতে বলল, আর ব্যঙটা?
সেটা লাফ দিয়ে জানালা দিয়ে বের হয়ে গেছে। হা হা হা।
টুকি এবং ঝা খুব মন মরা হয়ে এক বেলা কাটিয়ে দিল। সময় শেষ হয়ে আসছে, যদি তারা রবোটগুলোকে হাস্য কৌতুক শেখাতে না পারে আক্ষরিক অর্থেই তাদের মাথা কাটা যাবে।
পরের তিনদিন টুকি আবার খাওয়া ঘুম ছেড়ে রবোটগুলোর পিছনে লেগে রইল। ঝা-ও সাহায্য করতে চাইছিল কিন্তু টুকি ঝাকে এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ঠিক বিশ্বাস করতে পারল না বলে কাছে ঘেষতে দিল না। মানুষ কেন হাসে, কেন হাসা উচিত, কোথায় কোথায় হাসা যায় এই সব বিষয় নিয়ে কথা বলল, উদাহরণ দিল নিজে নেচে কুদে অভিনয় করে দেখাল এবং সব শেষ করে আবার তাদেরকে একটা কৌতুক শোনাল। এবারের কৌতুকটা এরকম :
একজন এক পায়ে লাল অন্য পায়ে সবুজ মোজা পরে এসেছে। বন্ধু জিজ্ঞেস করল, কী হল দুই পায়ে দুরকম মোজা কেন?
কী করব বল। বাসায় আরো এক জোড়া মোজা আছে সেটাও এরকম।
কৌতুকটা শুনে রবোট দুটি অনেক জোরে জোরে হাসতে শুরু করল। টুকি একটু আশান্বিত হয়ে বলল, বল দেখি এই কৌতুকটা কেন হাসির?।
হাসা বলল, এটা বলা তো খুবই সোজা। মানুষটার বোকামী নিয়ে হাসা হচ্ছে।
টুকি হাতে কিল দিয়ে বলল, ঠিক বলেছে। এবারে বল দেখি বোকামীটা কী?
মানুষটার বুদ্ধি কম। বাজারে গিয়ে প্রত্যেকবারই দুই রংয়ের দুইটা মোজা কিনে ফেলে।
টুকি আবার তার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তার এতদিনের পরিশ্রম পুরোটাই বৃথা গেছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আর মাত্র একটি দিন বাকি, গত ছয়দিনে যাকে এতটুকু শেখানো যায়নি সে বাকি একদিনে পুরোটুকু শিখে নেবে এটা আশা করা ঠিক নয়। টুকি তবু আশা ছাড়ল না, খাওয়া দাওয়া ছেড়ে সে রবোট দুটির পিছনে লেগে রইল, তাদের সে হাস্য কৌতুকের মর্মকথা বুঝিয়েই ছাড়বে। একটানা আঠারো ঘণ্টা পরিশ্রম করে সে হাসা এবং হাসিকে জিজ্ঞেস করল, এখন বুঝতে পেরেছ?
রবোট দুটি মাথা নাড়ল। বলল, পেরেছি। একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেছে।
চমৎকার! টুকি আশা নিয়ে বলল, এবারে তাহলে পরীক্ষা করা যাক। একটা কৌতুক বলি : একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কুকুরটা নাকি এত বুদ্ধিমান যে তোমাদের সাথে তাশ খেলে! মানুষটা উত্তর দিল, বুদ্ধিমান না কচু! হাতে টেক্কা পড়লেই খুশীতে লেজ নাড়তে থাকে আর আমরা বুঝে ফেলি কী পেয়েছে!
হাসা এবং হাসি জোরে জোরে হাসতে শুরু করল। টুকি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, এবার বল তো, কেন এটা হাসির?
খুবই সহজ। মানুষ ভাবছে কুকুরটা বুদ্ধিমান আসলে নেহায়েৎই বোকা! টেক্কা পেলেই লেজ নাড়ানো ঠিক নয়।
টুকি ফ্যাকাশে মুখে বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমাদের জীবন এখানেই শেষ ঝা। এক সপ্তাহ চেষ্টা করে কোন লাভ হল না। গবেট রবোটগুলো গবেটই রয়ে গেল।
ঝা বলল, আমি একটু চেষ্টা করে দেখব?
দেখতে চাইলে দেখ, কী লাভ হবে আমি জানি না।
ঝা হাসা এবং হাসির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, পৃথিবীতে হাসির জিনিসগুলো কী জান?
হাসা এবং হাসি দ্বিধান্বিত ভাবে বলল, জানি না।
ঝা এক গাল হেসে বলল, ঠিক বলেছ, আসলে কেউই জানে না। তাই কী করতে হয় জান?
কী?
যেটা দেখবে সেটা দেখেই হাসবে। একজন মানুষকে যদি দেখ মোটা হি হি করে হেসে বলবে মানুষটা কী মোটা! যদি দেখ শুকনো তাহলে হি হি করে হেসে বলবে, মানুষটা কী রোগা! রাগী মানুষকে দেখে হাসবে কারণ সে রাগী, হাসি খুশী মানুষকে দেখে হাসবে কারণ সে হাসিখুশী!
সত্যি?
একশভাগ সত্যি। এন্ড্রোমিডার কসম। হি হি হি করে হাসবে, হা হা হা করে হাসবে হো হো হো করে হাসবে, খিক খিক খিক করে হাসবে–খক খক খক করে হাসবে, খিল খিল খিল করে হাসবে—হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবে।
এমনিতেই? কোন কারণ ছাড়া?
হ্যাঁ। এমনিতেই। কোন কারণ ছাড়া।
সত্যি?
সত্যি। হাসি পেলেও হাসবে, হাসি না পেলেও হাসবে। হাসির মত ভাল জিনিস এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কিছু নেই। কোন কিছুকেই গুরুত্ব দিয়ে নেবে না, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে গুরুতর কিছু নেই, সব কিছু নিয়ে হাসা যায়। যে যত বেশি হাসে তার তত আনন্দ! নাও শুরু কর।
হাসা এবং হাসি হাসতে শুরু করল, প্রথমে টুকির শুকনো শরীর দেখে হাসল, তারপর তার গোমড়া মুখ দেখে হাসল, ঝাকে দেখে হাসল—তার বিশাল শরীর দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ল। ঠিক তখন দরজা খুলে গেল, বুদ্ধিজীবী রবোটগুলো হাস্য কৌতুকের কাজ কতটুকু অগ্রসর হয়েছে দেখতে এসেছে। বিশাল মাথা এবং লিকলিকে শরীর নিয়ে কোন মতে তাল সামলে দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধিজীবী রবোটদের দেখে হাসা এবং হাসি অট্টহাসি দিতে শুরু করে, একে অন্যকে ধরে তারা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে থাকে। তারা একে অন্যকে দেখে হাসতে থাকে, হাসতে হাসতে তারা কাশতে থাকে, এবং কাশতে কাশতে তাদের চোখে পানি এসে যায়।
বুদ্ধিজীবী রবোট খানিকক্ষণ অবাক হয়ে হাসা এবং হাসির দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বলল, আমরা গত দুই শতাব্দী চেষ্টা করে যেটা করতে পারি নি আপনারা এক সপ্তাহে সেটা করে ফেলেছেন। আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ করুন।
টুকি এতক্ষণে নিজেকে সামলে ফেলেছে, এক গাল হেসে বলল, এটা কোন ব্যাপারই নয়। এর থেকে হাজার গুণ কঠিন কাজ আমরা করতে পারি।
বুদ্ধিজীবী রবোট কোনমতে নিজের তাল সামলে রেখে বলল, এ ব্যাপারে আমাদের এখন বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
ঝা ইতস্তত করে বলল, আমরা কী এখন আমাদের মহাকাশযানে ফিরে যেতে পারি?
অবশ্যি। অবশ্যি ফিরে যেতে পারেন। আমরা রবোটেরা যখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে খল, ফন্দিবাজ, অসৎ, বদমাইশ এবং ধুরন্ধর মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলব তখন কৃতজ্ঞতার সাথে আপনাদের সাথে স্মরণ করা হবে।
টুকি মুখে জোর করে হাসি ফুটয়ে বলল, শুনে খুব খুশী হলাম।
রবোটদের নেতা অনেকক্ষণ কোন কথা বলে নি এবারে এগিয়ে এসে বলল, আপনাদের পৃথিবীতে ফিরে যাওয়া যেন আরো আনন্দময় হয় সে জন্যে আমরা একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছি।
টুকি শুকনো মুখে বলল, কী ব্যবস্থা?
আপনারা মাত্র দুজন মানুষ, তৃতীয়জন রবোট। আপনাদের নিশ্চয়ই ইচ্ছা করে আপনাদের রবোট রোবির আপনাদের মতই রাগ দুঃখ আনন্দ ঘৃণা এরকম অনুভূতি থাকুক।
টুকি বিস্ফারিত চোখে রবোটটির দিকে তাকাল। সেটি গলায় এক ধরনের আনন্দের ভাব ফুটিয়ে বলল, রোবির ভিতরে আমরা আমাদের বিভিন্ন অনুভূতির ল্যাবরেটরি থেকে অনুভূতিগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছি।
কী-কী-কী বললে?
হ্যাঁ। এখন তোমাদের দীর্ঘ ভ্রমণ হবে আনন্দময়। রোবি এখন আর শুধু যন্ত্র নয়। সে অনুভূতিপ্রবণ একটি সত্তা। শুধু একটি জিনিস খেয়াল রেখ।
কী জিনিস?
কখনো যেন রোবিকে রাগিয়ে দিও না। জানই তো রোবট রেগে গেলে কী সাংঘাতিক অবস্থা হয়।
টুকি এবং ঝা শুকনো মুখে মাথা নাড়ল। ঝা বিড় বিড় করে বলল, না, ভয় নেই। আমরা রোবিকে রাগাব না। কখনোই রাগাব না।
জানালার কাছে বসে টুকি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে রাবি বসেছিল সে বিরক্ত ভঙ্গী করে ঘুরে টুকির দিকে তাকিয়ে কর্কশ স্বরে বলল, কী হল? এরকম লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলছ কেন? মহাকাশযানের ভিতরে ভাল লাগছে না?
টুকি সাথে সাথে বিগলিত ভঙ্গী করে বলল, না, না, কী যে বল। চমৎকার লাগছে আমাদের। চমৎকার লাগছে।
ঝাও যন্ত্রের মত মাথা নেড়ে বলল, চমৎকার লাগছে।
রোবি গলার স্বরে অধৈর্যের ভাব ফুটিয়ে বলল, দিনরাত দেখি ভ্যাবলার মত বসে আছ। একটু কাজকর্ম করতে পার না?
সাথে সাথে টুকি এবং ঝা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, অবশ্যি করতে পারি। কী করতে হবে বল?
মহাকাশযানটা যে একটা আঁস্তাকুড় হয়ে আছে খেয়াল করেছ? এটা একটু পরিষ্কার করা যায় না?
টুকি এবং ঝা সাথে সাথে মহাকাশযানটাকে ঘসে মেজে পরিষ্কার করার কাজে লেগে যায়। রবোটদের গ্রহে রোবির কপোট্রনে নানারকম অনুভূতি জুড়ে দেবার পর রোবির বড় পরিবর্তন হয়েছে। বেশিরভাগ সময় সে তিরিক্ষ মেজাজে থাকে, মাঝে মাঝে অকারণে তার মন খারাপ হয়ে যায় তখন কয়েকঘন্টা উচ্চস্বরে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে থাকে। তার কাছে তখন যাওয়া যায় না। কারণ সে যেভাবে হাত পা ছুড়তে থাকে যে ধারে কাছে গিয়ে বেকায়দা লেগে গেলে কম্পাউন্ড ফ্রাকচার হয়ে যাবার আশংকা থাকে। টুকি এবং ঝায়ের কোন কোন কাজকর্ম দেথে হঠাৎ হঠাৎ রোবির মাঝে প্রবল ঘৃণাবোধ জেগে উঠে তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে টুকি ঝা এবং সমস্ত মনুষ্য জাতিকে গালি-গালাজ করতে থাকে। কখনো কখনো তার মনে আনন্দের ভাব এসে যায়, সেটি আরো বিপজ্জনক তখন সে টুকি এবং ঝাকে ধরে নাচানাচি করার চেষ্টা করতে থাকে। টুকি কিংবা ঝ দুজনেরই মধ্যবয়স, নাচানাচি করার সময় অনেক দিন হল চলে গিয়েছে, চেষ্টা করে তাদের বিশেষ বিড়ম্বনা হয়। সব মিলিয়ে বলা যায় তাদের জীবন এই মহাকাশযানে বিষময় হয়ে আছে। কবে আরো তিন সপ্তাহ পার হবে, তারা ছোট নক্ষত্রটির পাশে পৌঁছে হাইপার ডাইভ দিয়ে পৃথিবীর দিকে রওনা দেবে সেই আশায় হা করে বসে আছে।
কিন্তু তার আগেই তাদের গতিপথে একটা ছোট গ্রহ পাওয়া গেল। রোবি গ্রহটাকে একপাক ঘুরে এসে বলল, এইখানে নামা যাক।
টুকি ভয়ে ভয়ে বলল, নামার দরকারটা কী? কে না কে আছে আবার নতুন কোন ঝামেলায় পড়ে যাব।
রোবি গলার স্বরে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল, এখানে কেউ নেই। কেমন করে জান?
কারণ মানুষ রবোট যাই থাকুক তাদের জন্যে শক্তির দরকার। শক্তি খরচ হলে বায়ুমণ্ডলে তার চিহ্ন থাকে। রেডিয়েশান হিসেবে, বাড়তি কার্বন ডাইঅক্সাইড, ওজোন লেয়ার বা অন্য কোনভাবে। এখানে সেরকম কিছু নেই।
ঝা বলল, কিন্তু গ্রহটা ফাঁকা বলেই কী নামতে হবে? সবকয়টা ফাঁকা গ্রহে যদি নামতে নামতে যাই তাহলে তো একশ বছর লেগে যাবে–
রোবি একটা প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলল, চুপ কর বেকুব কোথাকার। আমরা কী মশকরা করার জন্যে নামছি? হাইপার ডাইভ দেবার আগে বড় ইঞ্জিনটা সার্ভিস করতে হবে, সে জন্যে নামছি।
ঝা তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল, অবশ্যি অবশ্যি।
ফাঁকা গ্রহটিতে মহাকাশযানটি মোটামুটি নিরাপদভাবে নামল। রোবির কথা সত্যি, ধূ ধূ প্রান্তর কোথাও জন-মানব সভ্যতার চিহ্ন নেই। লাল রংয়ের পাথর ছড়ানো, দেখে কেমন জানি মন খারাপ হয়ে যায়।
রোবি যখন মহাকাশযানের বড় ইঞ্জিনটা খুলে আবার লাগানো শুরু করেছে তখন টুকি আর ঝা হাঁটতে বের হল। গ্রহটিতে খুব হালকা একটা বাতাসের স্তর রয়েছে, নিঃশ্বাস নেবার জন্যে তাদের আলাদা মাস্ক পরে নিতে হল। গ্রহটা জনমানবহীন মনে হচ্ছে সত্যি কিন্তু যদি কোন বিপদ আপদ ঘটে যায় সেজন্যে সাথে নিল দুটি শক্তিশালী লেজার গান, সহজে চলাফেরা করার জন্যে পিঠে রাখল শক্তিশালী জেট প্যাক।
দুজনে লাল পাথরের প্রায় মরুভূমি এলাকায় হাঁটতে থাকে, সামনে একটা বড় পাথরের স্তর। সেটা পার হয়ে অন্য পাশে এসে তারা বিচিত্র কিছু গাছগাছালী আবিষ্কার করল। টুকি গাছগুলো পরীক্ষা করে নিচু গলায় বলল, এই গ্রহে যদি গাছগাছালী থাকে তাহলে অন্য প্রাণীও থাকতে পারে।
হ্যাঁ! ঝা ভয়ে ভয়ে বলল, চল ফিরে যাই।
চল।
দুজনে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করে, কয়েক পা এগিয়েই টুকি দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, ঝা—
কী হল? মনে হচ্ছে আমাদের কেউ অনুসরণ করছে।
ঝা শুকনো গলায় বলল, আমারও তাই মনে হচ্ছে। দৌড় দেব নাকী?
দৌড় দেবে কেন? আমাদের জেট প্যাক আছে না? সুইচ টিপলেই আকাশে উড়ে যাব। ভয়ের কিছু নেই।
লেজার গানটা বের করে রাখব?
হ্যাঁ! বিপদ দেখলেই গুলি। মনে থাকবে তো?
টুকির কথা শেষ হবার আগেই বিপদ যেন তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, হঠাৎ করে চারিদিক থেকে হৈ হৈ করে অসংখ্য মানুষ তাদের দিকে ছুটে আসে। টুকি এবং ঝা লেজার গান উদ্যত করে গুলি করার জন্যে ট্রিগারে হাত দিয়েও তারা হতচকিতের মত দাঁড়িয়ে রইল, কারণ যারা হৈ হৈ করে তাদের দিকে ছুটে আসছে সবাই মেয়ে, স্বল্প বসনা এবং অনিন্দ্য সুন্দরী। পুরুষ মানুষ হয়ে এরকম সুন্দরীর মেয়েদেরকে আর যাই করা যাক গুলি করা যায় না।
কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই মেয়েগুলো টুকি এবং ঝাকে ঘিরে ফেলল। নীল চোখ এবং সোনালী চুলের একটি মেয়ে যার শরীর এত সুগঠিত যে একবার চোখ পড়লে চোখ ফেরানো যায় না—সবার আগে কথা বলল, ভাষাটি টুকি এবং ঝায়ের ভাষা থেকে খানিকটা ভিন্ন কিন্তু তবু বুঝতে অসুবিধে হল না। মেয়েটি বলল, হায় ঈশ্বর! এতো দেখছি পুরুষ মানুষ!
কালো চুলের একটি মেয়ে বিস্মিত হয়ে বলল, কী রকম পরিবারের মানুষ যে পুরুষদের একা একা বের হতে দিয়েছে?
নীল চোখের সোনালী চুলের মেয়েটি বলল, থাক, থাক, কিছু বলে কাজ নেই, ভয় পেতে পারে।
টুকি এবং ঝা এতক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে, হাতের অস্ত্রটা নামিয়ে রেখে হাসার চেষ্টা করে বলল, তোমাদের অভিনন্দন।
সাথে সাথে সব কয়জন মেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হবার মত একটা শব্দ করল। কম বয়সী একটা মেয়ে নিজের চোখ ঢাকতে ঢাকতে বলল, কী রকম বেশরম দেখেছ? আমাদের সাথে কথা বলছে!
পোশাকটা দেখেছ? সারা শরীর দেখা যাচ্ছে, লজ্জায় মরে যাই!
টুকি এবং ঝা এবারে খানিকটা হতচকিত হয়ে গেল, তাদের পুরুষ হওয়া নিয়ে এখানে কোন একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। টুকি আবার চেষ্টা করল, বলল, তোমদের সবার জন্যে অভিবাদন। শুভ সকাল—কিংবা বিকাল যেটাই এখন হয়ে আছে।
মেয়েগুলো আবার একটা বিস্ময়ধ্বনি করে একটু পিছিয়ে গেল। কমবয়সী আরেকটা মেয়ে একটু বিচলিত হয়ে নীল চোখের মেয়েটিকে বলল, টাইরা, কিছু একটা কর, লজ্জায় মারা যাচ্ছি।
টাইরা পিছনে ফিরে বলল, দুইটা চাদর দাও।
পিছনের মেয়েরা দুটি উজ্জ্বল রংয়ের চাদর এগিয়ে দিল। টাইরা চাদরগুলো সাবধানে টুকি এবং ঝায়ের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, ভাল করে শরীরটাকে ঢেকে নাও। পুরুষ মানুষের শরীর দেখানো খুব লজ্জার ব্যাপার।
টুকি এবং ঝা কিছুই বুঝতে পারছিল না, কিন্তু এখন সেটা নিয়ে তর্ক করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে হল না। তারা উজ্জ্বল রংয়ের কাপড় দুটি দিয়ে নিজেদের ভাল করে ঢেকে নিল। নিজেদেরকে হঠাৎ তাদের বোকার মত মনে হতে থাকে। টুকি খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
টাইরা টুকিকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল, পুরুষেরা কখনো অপরিচিত মেয়েদের সাথে কথা বলে না। সেটা ভারী লজ্জার ব্যাপার।
ঝা ঢোক গিলে বলল, তাহলে পুরুষেরা কার সাথে কথা বলে?
অন্য পুরুষের সাথে। তাদের ঘরের বাইরে যাবার কথা নয়। পুরুষদের সবসময় মেয়েদের সামনে পর্দা করার কথা।
টুকি এবং ঝা একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, হঠাৎ করে তাদের কাছে অনেক জিনিস পরিষ্কার হয়ে যায়। মানুষের একটা বিচ্ছিন্ন সমাজ এখানে গড়ে উঠেছে যেখানে মেয়েরা ঘরের বাইরে থাকে আর পুরুষেরা অন্তঃপুরে বন্দী।
টুকি এবং ঝ ইচ্ছে করলে তাদের জেট প্যাক ব্যবহার করে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারতো কিন্তু যেহেতু পরিবেশটা সেরকম বিপজ্জনক মনে হচ্ছে না তারা ব্যাপারটা আরো একটু যাচাই করে দেখতে চাইল।
মেয়েদের দলটি তাদেরকে হাটিয়ে হাঁটিয়ে নিতে থাকে। বয়স্ক মানুষেরা যেভাবে শিশুদের সাথে ব্যবহার করে মেয়েরা তাদের সাথে ঠিক সেরকম ব্যবহার করছিল। এই সমাজে পুরুষ মানুষেরা নিশ্চয়ই খুব কোমল প্রকৃতির।
হেঁটে হেঁটে তারা একটা লোকালয়ের কাছে পৌঁছতেই অনেকে তাদের দিকে ছুটে এল, সবাই মেয়ে। কেউ বালিকা, কেউ কিশোরী, কেউ তরুণী, কেউ যুবতী, কেউ কেউ মধ্যবয়স্কা। সবাই কৌতূহলী চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিশোরী এবং বখে যাওয়া কিছু তরুণী শীষ দিয়ে টুকি এবং ঝায়ের কাপড় ধরে টান দেয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু টাইরার প্রচণ্ড ধমক খেয়ে তারা পালিয়ে গেল। টুকি এবং ঝা হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করে রাস্তার দুপাশে পাথরের ঘরের ভিতরে জানালার ফাঁক দিয়ে ঘোমটায় ঢাকা পুরুষ মানুষেরা উঁকি দেয়ার চেষ্টা করছে।
মেয়েদের দলটি টুকি এবং ঝাকে নিয়ে একটা বড় বাসার সামনে হাজির হল। বাসাটি সম্ভবত টাইরার, কারণ অন্য সব মেয়েরা বাইরের বারান্দায় অপেক্ষা। করতে লাগল, শুধু টাইরা টুকি এবং ঝাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে যায়। সাথে সাথে ভিতর থেকে সুদর্শন কোমল চেহারার একজন পুরুষ মানুষ টাইরার দিকে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ওগো সোনামনি, তুমি ফিরে এসেছ?
টাইরা মাথা নাড়ল। পুরুষ মানুষটি নিশ্চয়ই টাইরার স্বামী, সে আদুরে। বেড়ালের মত ভঙ্গী করে বলল, টাইরা, সোনামনি আমার, পথে কোন কষ্ট হয়নি তো?
না।
তোমায় এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানীয় এনে দিই?
না, লাগবে না। তুমি বরং এই দুজন পুরুষ মানুষকে দেখ।
টাইরার স্বামী, কোমল চেহারার পুরুষটি এবারে টাইরাকে ছেড়ে দিয়ে টুকি এবং ঝায়ের দিকে তাকাল। অবাক হয়ে বলল, এরা কারা?
লাল পাহাড়ের কাছে পেয়েছি। একেবারে বেপর্দা হয়ে হাঁটাহাঁটি করছিল।
টাইরার স্বামী লজ্জায় জিবে কামড় দিয়ে বলল, ছিঃ ছিঃ ছিঃ!
হ্যাঁ! অত্যন্ত বেশরম মানুষ–নিজে থেকে আমাদের সাথে কথা বলছিল।
কী লজ্জা! কী লজ্জা!
তুমি তাদের সাথে একটু কথা বলে দেখ, ব্যাপারটা কী? কোথা থেকে এসেছে, কী সমাচার। না জানি বেচারার স্ত্রীরা এখন কোথায় কী দুশ্চিন্তা করছে।
টাইরার স্বামী মুখে একটা কপট রাগের ভান করে বলল, আমি বুঝতে পারি না কী রকম মেয়েমানুষ তাদের স্বামীদের এরকম একলা ছেড়ে দেয়। যদি কিছু একটা হত? যদি তোমাদের সামনে না পড়ে কোন খারাপ মেয়েদের সামনে পড়ত?
টুকি এবং ঝা দেখল টাইরার কোমল চেহারার সুদর্শন স্বামী ব্যাপারটা চিন্তা করে আতংকে কেমন জানি শিউরে উঠে।
টাইরা চলে যাবার পর টুকি এবং ঝা তাদের সারা শরীরে ঢাকা চাদরগুলো খুলে রাখল। টাইরার স্বামী বিস্মিত দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা কারা ভাই? একা একা কী করছ? তোমাদের স্ত্রীরা কই? তোমাদের একা ছেড়ে দিল কেমন করে?
টুকি মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের স্ত্রী নেই।
মানুষটার মুখে হঠাৎ সমবেদনার চিহ্ন ফুটে উঠে, আহা। বিয়ে হয় নি এখনো? কোন মেয়ে পছন্দ করল না?
না, মানে–
মেয়েদের মন জয় করতে হলে একটু চেষ্টা করতে হয়। সেজে গুজে থাকতে হয়, দাড়ি কামিয়ে চুল পরিপাটি করে আচড়াতে হয়, শরীরে পারফিউম দিয়ে সুন্দর কাপড় পরতে হয়। তোমাদের যেরকম রুক্ষ চেহারা, সাথে যেভাবে বেশরম কাপড় পরেছ কোন ভদ্র পরিবারের মেয়ে তোমাদের পছন্দ করবে ভেবেছ?
টুকি বলল, আসলে ব্যাপারটা তা নয়। আমরা যেখান থেকে এসেছি, সেখানকার নিয়ম-কানুন অন্যরকম।
কোথা থেকে এসেছ তোমরা?
অন্য একটা গ্রহ থেকে। এটা যেরকম এম সেভিন্টিওয়ান–
টাইরার স্বামী বাধা দিয়ে বলল, থাক থাক আর বলতে হবে না। আমি ওসব বুঝি না। আমরা পুরুষ মানুষেরা ঘর সংসার করি বড় বড় জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা শুনে কী করব?
টুকি ভুরু কুচকে বলল, তোমরা শুধু ঘর সংসার কর?
টাইরার স্বামী অবাক হয়ে বলল, আর কী করব? একজন পুরুষ মানুষ যদি তার স্ত্রীকে খুশী রাখতে পারে তাহলে তার জীবনে আর কী চাইবার আছে? সারাদিন পরিশ্রম করে স্ত্রী ঘরে এলে তার জন্যে রান্না করে খাবার দেওয়া, পোশাক ধুয়ে রাখা বাচ্চা মানুষ করা—
টুকি এবং ঝা কেমন জানি ভয়ে ভয়ে টাইরার স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক এরকম সময় দরজা খুলে একজন তরুণ এসে ঢুকল, তার চোখে পানি টল টল করছে। টাইরার স্বামী জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে তোমার?
আমি আর বাইরে যাব না বাবা। কখনো বাইরে যাব না।
আবার বুঝি পাড়ার বখা মেয়েরা–
হ্যাঁ! আমাকে দেখে শীষ দিয়ে এত খারাপ খারাপ কথা বলেছে— তরুণটা হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। মানুষটি তার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, কাদিস নে বাবা। তোর মাকে বলব দেখি কিছু করতে পারে কী না।
ছেলেটি চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলে মানুষটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আগের যুগের সেই নিয়ম-নীতি আর নেই। সবার মাঝে কেমন জানি ভোগ লালসা। মাঝে মাঝে যখন বাইরে যাই বুঝতে পারি মেয়েরা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে আমার শরীরের দিকে। মনে হয় চোখ দিয়ে সমস্ত শরীরটাকে চেটে খাচ্ছে।
মানুষটির সারা শরীর বিতৃষ্ণায় কেমন জানি শিউরে উঠল।
টুকি এবং ঝা এতক্ষণে তাদের মহাকাশযানে ফিরে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে। মেয়েদের এই সমাজ ব্যবস্থায় রাস্তাঘাটে বের হলে তাদের দেখে যে যাই মনে করুক তাদের কিছু করার নেই। জেট প্যাক ব্যবহার করে তারা আকাশে উড়ে যাবে। পুরুষদের ঘরের মাঝে আটকে রাখা তাদের কাছে যতই বিচিত্র মনে হোক এখানে এটা ঘটছে। হাজার বছর আগে পৃথিবীতে ঠিক তার উল্টো ব্যাপার ঘটেছিল, মেয়েদেরকে ঘরের মাঝে আটকে রাখ হয়েছিল।
টুকি আর ঝা টাইরার স্বামীর কাছে গিয়ে বলল, তোমাদের এখানে এসে আমাদের খুব ভাল লেগেছে, এখন আমরা যাব।
টাইরার স্বামী চোখে কপালে তুলে বলল, যাবে? কোথায় যাবে? মহাকশনের কথা বলে খুব একটা লাভ হবে না বলে তারা সে চেষ্টা করল। বলল, যেখান থেকে এসেছি।
কিন্তু তোমাদের খাওয়া হয়নি, বিশ্রাম হয়নি–
না হোক। আমরা ফিরে গিয়ে খাব বিশ্রাম নেব।
কোমল চেহারার সুদর্শন মানুষটির চোখে মুখে সত্যিকার দুশ্চিন্তার ছাপ। ফুটে উঠল, বলল, ঠিক আছে যেতে চাও যাবে তবে কিছু না খেয়ে যেতে পারবে না।
মানুষটির গলার স্বরে এক ধরনের আন্তরিকতা ছিল, টুকি এবং ঝা না করতে পারল না।
খাবারের আয়োজন ছিল সহজ, কিন্তু খুব সুন্দর করে টেবিলে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টুকি এবং ঝা খুব তৃপ্তি করে খেল। খাওয়া সেরে উঠতে গিয়ে হঠাৎ করে টুকি এবং ঝায়ের মাথা দুলে উঠে, কোনমতে টেবিল ধরে নিজেদের সামলে নিল। টাইরার স্বামী বলল, তোমরা হাঁটাহাঁটি করো না। তোমাদের খাবারের সাথে আমি ঘুমের ওষুধ দিয়েছি।
টুকি হতচকিত হয়ে বলল, কী দিয়েছ?
ঘুমের ওষুধ।
টুকি হঠাৎ করে এক ধরনের আতংক অনুভক করে। সত্যি সত্যি ঘুমে তাদের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কোন মতে কষ্ট করে চোখ খুলে রাখার চেষ্টা করতে করতে বলল, কেন দিয়েছে?
একা বাইরে গিয়ে কী বিপদে পড়বে। বাইরে শুধু দুষ্ট মেয়ে মানুষ আর নষ্ট মেয়ে মানুষ। তোমাদের মত সাদাসিধে পুরুষদের একা পেলে কী অবস্থা হবে জান?
টুকি আরো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই গভীর ঘুমে তাদের দুই চোখের পাতা জড়িয়ে এল।
ঘুম থেকে জেগে উঠে ঝা দেখল তার পাশে একজন অপরিচিত মানুষ শুয়ে আছে। ঝা ভাল করে তাকাল এবং হঠাৎ করে বুঝতে পারল মানুষটি টুকি, কেউ একজন তার বিশাল গোঁফ জোড়া নিখুঁত ভাবে চেছে দিয়েছে বলে চিনতে পারছিল না। ঝা ধরমর করে উঠে বসল, হঠাৎ করে তার সবকিছু মনে পড়ে গেছে।
তারা ছোট একটা পাথরের ঘরে শুয়ে আছে, বুক পর্যন্ত কম্বল দিয়ে ঢাকা। ঝ কম্বল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে বসে টুকিকে একটা ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করল। টুকি বিড় বিড় করে কিছু একটা বলে পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল কিন্তু ঝা আবার তাকে ধরে একটা ঝাকুনী দিল। এবারে টুকি চোখ খুলে তাকিয়ে বলল, কে? কী হয়েছে?
আমি।
টুকি চোখ বড় বড় করে বলল, ঝা? তোমার একি অবস্থা? চুল কোথায় তোমার?
ঝা মাথায় হাত দিয়ে দেখল তার মাথা কেউ পারিষ্কার করে কামিয়ে দিয়েছে। টুকি দাঁত বের করে হেসে বল, তোমাকে পুরোপুরি গবেটের মত দেখাচ্ছে, মাথাটা কামিয়েছ কেন?
আমি কামাই নি। তোমার গোঁফ যে কামিয়েছে আমার মাথাও সে কামিয়েছে।
গোঁফ? আমার গোঁফ? টুকি লাফিয়ে উঠে বসে নাকের নিচে হাত দিয়ে হঠাৎ করে একবারে ঠাণ্ডা মেরে গেল। এই জগতে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল তার গোঁফ।
ঝা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখান থেকে পালানোর সময় হয়েছে।
টুকি নির্জীব গলায় বলল, কিন্তু আমার গোঁফ?
গোঁফ নিয়ে পরে চিন্তা কর। এখন উঠ। জেট প্যাক আর লেজার প্যাক খুঁজে বের কর।
টুকি মনমরা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের জিনিসপত্র খোঁজাখুঁজি করতে লাগলো। তাদের ঘুমের মাঝে কেউ একজন পোশাক পাল্টিয়ে ঢলঢলে আলখাল্লার মত কিছু একটা পরিয়ে গেছে, কাপড় জামাগুলোও এ ঘরে নেই।
ঘরের মাঝে শব্দ শুনে খুট করে দরজা খুলে গেল, টাইরার স্বামী উঁকি দিয়ে বলল, তোমরা উঠে গেছ?
টুকি কোন কথা না বলে চোখ পাকিয়ে তাকাল, তার দৃষ্টিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে মানুষটি বলল, তোমাদের জন্যে ভাল খবর আছে।
আমার ভাল খবরের দরকার নেই। টুকি মেঘ গলায় বলল, আমাদের জামাকাপড় জেট প্যক লেজার গান কোথায়? এক্ষুণি নিয়ে আস।
তোমাদের জামা কাপড় ধুয়ে দিয়েছি, যা নোংরা হয়েছিল।
জেট প্যাক আর লেজার গান?
ওই বিদঘুটে যন্ত্রগুলো? ওগুলো কী পুরুষ মানুষকে মানায়? সব ফেলে দিয়েছি?
ঝা গর্জন করে বলল, ফেলে দিয়েছ?
হ্যাঁ! মানুষটা মুখে হাসি ফুটয়ে বলল, তোমাদের ভাল খবর কী শুনবে?
না। টুকি ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলল, ভাল খবরের কোন দরকার নেই। আমার গোঁফ কেন কেটেছ?
সেটাই তো বলতে যাচ্ছিলাম। তোমাদের বিয়ে ঠিক করেছি।
বিয়ে ঠিক করেছ?
হ্যাঁ! তোমরা যখন ঘুমাচ্ছিলে তখন তোমাদের দেখে পছন্দ করে গেছে। তবে তোমাদের মুখে নাকি বেশি চুল। তাই কেটে কিছু কামিয়ে দিয়েছি।
টুকি দাতে কিড়মিড় করে বলল, তাই কেটে কমিয়ে দিয়েছ!
তোমাদের কারা পছন্দ করল শুনবে না?
টুকি রাগে ফেটে পড়ে বলল, না, আমার শোনার কোন দরকার নেই।
ঝা নিচু গলায় বলল, একটু শুনে দেখলে হয় না?
টুকি চোখ লাল করে ঝায়ের দিকে তাকাল এবং সেই দৃষ্টির সামনে ঝা কেমন জান মেইয়ে গেল।
টাইরার স্বামী মুখে হাসি ধরে রেখে বলল, তোমাদের কোন আপনজন নেই, অভিভাবক নেই, ভারী ভাবনা হয় আমার। সে জন্যেই তো খুঁজে পেতে দুজন মেয়ে বের করেছি। ঠিক মেয়ে নয় মহিলাই বলা উচিত। মধ্য বয়স্কা মহিলা—খুব শক্ত ধরনের।
টুকি আবার গর্জন করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখন বাইরে নারী কণ্ঠ শোনা গেল। টাইরার স্বামীর চোখ মুখ হঠাৎ আনন্দে ঝলমল করে উঠে, সে মধুর ভঙ্গীতে হেসে বলল, আমার স্ত্রী তোমাদের যাদের সাথে বিয়ে হবে তাদের তাদের নিয়ে এসেছে। বিয়ের আগে একটু পরিচয় হওয়া ভাল। তোমরা চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে নেবে?
টুকি এবং ঝা চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে নেবার কোন আগ্রহ না দেখিয়ে টাইরার স্বামীকে একরকম ঠেলে ঘর থেকে বের হয়ে এল। বাইরে দুজন মধ্যবয়স্কা মহিলা টাইরার পিছনে দাঁড়িয়েছিল, তাদের চুল ছোট করে ছাঁটা, ক্রুর দৃষ্টি এবং মুখে সৈনিক সুলভ কাঠিন্য। টুকি এবং ঝাকে দেখে দুজনে কেমন যেন আঁৎকে উঠে। টুকি কঠোর গলায় বলল, এখানে এসব কী হচ্ছে? আমাদের জিনিসপত্র কোথায়? কে তোমাদের আমাদের চুল দাড়ি গোঁফে হাত দিতে বলেছে? কত বড় সাহস আমাদের খাবারে ঘুমের ওষুধ দিয়েছ?
টাইরা অবাক হয়ে বলল, ছিঃ ছিঃ! পুরুষ মানুষ এভাবে কথা বলে কখনো?
টুকি দাঁত কিড়মিড় করে বলল, এখন তো শুধু কথা বলছি, যখন রদ্দা লাগানো শুরু করব, তখন বুঝবে মজা
টাইরা বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়েছিল। মধ্যবয়স্কা একজন মহিলা তার কঠিন মুখে কুটিল একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, এক সপ্তাহের মাঝে আমি ওকে সিধে করে দেব। শুধু বিয়েটা হয়ে নিক।
ঝা টুকির হাত ধরে বলল, এখানে চেচামেচি করে লাভ নেই। চল আমরা যাই।
টাইরা জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবে?
যেখান থেকে এসেছি সেখানে যাব।
এখন বাইরে যেয়ো না। আধপাগলা একটা রবোট ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোথা থেকে এসেছে কে জানে, সবাইকে সমানে গালিগালাজ করে যাচ্ছে।
রোবি!
তোমরা চেনো সেটাকে?
চিনি। কোন্ দিকে গেছে?
উত্তরে-পাহাড়ের দিকে।
টুকি ঝায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, চল ঝা।
কেউ কিছু বলার আগে টুকি এবং ঝা ঘর থেকে বের হয়ে এল। তাদের পিছু পিছু মধ্যবয়স্কা মহিলা দুজন বের হয়ে বলল, সে কী! কোথায় যাচ্ছ তোমরা? তোমাদের জন্যে কত যৌতুক দিয়েছি জান?
টুকি ঝাকে বলল, পা চালিয়ে চল।
দেখা গেলে মহিলা দুজন এত সহজে তাদের যৌতুক দেওয়া স্বামীদের ছেড়ে দিতে রাজী না। তারা পিছু পিছু ছুটতে লাগলো। ঝা পিছনে তাকিয়ে বলল, দৌড়াও।
টুকি এবং ঝা পাহাড়ের দিকে ছুটতে লাগল পিছু পিছু ধাওয়া করে এল দুজন কঠিন চেহারার মহিলা, তাদের পিছু পিছু মজা দেখার জন্যে আরো অসংখ্য শিশু, কিশোরী, তরুণী, মধ্যবয়স্কা মহিলা এবং বৃদ্ধা। পিছন থেকে একটা দুইটা ঢিল এসে পড়ল তাদের গায়ে, টুকি এবং ঝা তখন উধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করে। চুরি করাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্যে তাদের শরীরের যত্ন নিতে হয়, দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটিতে দুজনেই দক্ষ। কাজেই প্রাণপণে ছুটে সবার নাগালের বাইরে চলে যাওয়া তাদের জন্যে খুব কঠিন হল না। লাল রংয়ের পাহাড়টায় উঠেই তারা তাদের মহাকাশযানটাকে দেখতে পায়, বাইরে রোবি দাঁড়িয়েছিল, টুকি এবং ঝাকে কষে বকুনী দিতে যাচ্ছিল কিন্তু পিছনে বিশাল মহিলা বাহিনী দেখে সে সুড় সুড় করে মহাকাশযানের ভিতরে ঢুকে গেল। ছুটতে ছুটতে এসে টুকি আর ঝাও খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে শক্ত করে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষণেই মহিলা বাহিনী এসে মহাকাশযানটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে।
টুকি গলা উঁচিয়ে বলল, রোবি, মহাকাশযানটা উড়িয়ে নিয়ে চল।
রোবি বলল, ঠিক আছে, যাচ্ছি। এক সেকেন্ড অপেক্ষা করে বলল, কিন্তু ভেবো না তোমাদের কাজকর্মের কথা আমি ভুলে গেছি–মহাকাশে নিয়ে গিয়ে তোমাদের বোঝাচ্ছি মজা।
প্রচণ্ড গর্জন করে যখন মহাকাশযানটা উপরে উঠতে থাকে ঝা তখন জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাবী স্ত্রীকে ফেলে রাখার দুঃখে নাকি একটু পরেই রোবি তাদের যে শাস্তি দেবে সেই ভয়ে সেটা ঠিক বোঝা গেল না।
(চলবে)
