১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল গ্রেফতার হন ক্ষুদিরাম বসু। মজফফরপুর সেশন আদালতে ক্ষুদিরামের বিচার কাজ শুরু হলো ০৮ জুন ১৯০৮। কিন্তু সারা পশ্চিম বাংলা থেকে কোন আইনজীবী মামলায় আসামী পক্ষের হয়ে কোন আইনজীবী আদালতে দাঁড়াতে সাহস পাননি। তখন পূর্ব বঙ্গ থেকে রংপুর বারের উকিল বাবু সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, বাবু কুলকমল সেন ও বাবু নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী ক্ষুদিরামের পক্ষে মামলায় সহযোগীতায় এগিয়ে আসেন। বিচার শুরুর কয়েকদিন আগেই তাঁরা মজফফরপুর চলে যান। ইতোমধ্যে বিচারক করন্ডারফের অনুরোধে কালিদাস বসু নামে স্থানীয় এক আইনজীবী এগিয়ে আসেন আসামী পক্ষের হয়ে। ৮-১৩ জুন চললো দায়রা বিচার। বিচারের শুরুতেই ক্ষুদিরাম স্বীকারোক্তি প্রদান করেন। কিন্তু দায়রা জজ এই স্বীকারোক্তিকে এড়িয়ে আদালতের প্রচলিত নিয়মেই বিচার করা হবে মর্মে ঘোষণা দিলেন। রংপুর থেকে যাওয়া তিন আইনজীবী বাবু সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, বাবু কুলকমল সেন ও বাবু নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী দুই দিন সরকারী সাক্ষীদের জেরা করেন। কিন্তু ক্ষুদিরাম তখন প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিজেকে ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করেছিলেন। রংপুর থেকে যাওয়া আইনজীবীদের তিনি সহযোগীতা করেননি। সেসময় তাঁর সাথে রংপুর থেকে যাওয়া উকিলদের মধ্যে একটি সংলাপ .........
উকিল : তুমি কি কাউকে দেখতে চাও?
ক্ষুদিরাম : হ্যাঁ, আমি একবার মেদিনীপুর দেখতে চাই, আমার দিদি আর তাঁর ছেলেপুলেদের।
উকিল : তোমার মনে কি কোন কষ্ট আছে ?
ক্ষুদিরাম : না, একেবারেই নয়।
উকিল : আত্মীয় স্বজনকে কোন কথা জানাতে চাও কি? অথবা কেউ তোমার সাহায্য করুণ এমন ইচ্ছা হয় কি?
ক্ষুদিরাম : না, আমার কোন ইচ্ছাই তাঁদের জানাবার নেই। তাঁরা যদি ইচ্ছা করেন আসতে পারেন।
উকিল : জেলে তোমার সাথে কি রকম ব্যবহার করা হয়?
ক্ষুদিরাম : মোটামুটি ভালোই।
উকিল : তোমার কি ভয় করছে?
ক্ষুদিরাম : (স্মিতহাস্যে) ভয় করবে কেন?
উকিল : তুমি কি জানো আমরা রংপুর থেকে তোমারকে সাহায্য করতে এসেছি? কিন্তু তুমি তো আমাদের আসার আগেই দোষ স্বীকার করেছো।
ক্ষুদিরাম : (স্মিতহাস্যে) কেন করবো না?
এই সংলাপ প্রমাণ করে ক্ষুদিরাম নিজের প্রাণ রক্ষায় খুবই নিঃস্পৃহ ছিলেন।
মামলার উকিলরা সওয়াল জবাবকালে যুক্তি দেখিয়েছিলেন এই ঘটনার সময় ক্ষুদিরামের গায়ে একটা ভারী কুর্তা, কোর্ট, দুইটি পিস্তল এবং বেশ কিছু কার্তুজ ছিল তাই ঐ পরিমাণ ওজন নিয়ে তাঁর পক্ষে এতো ক্ষিপ্রতার সাথে বোমা ছুঁড়ে মারা সম্ভব নাও হতে পারে। তাছাড়া দীনেশ (প্রফুল্ল চাকীর ডাক নাম) ক্ষুদিরামের থেকে বলিষ্ঠ গড়নের এবং বোমা বানানো জানতো সে। তাই বোমাটি প্রফুল্ল চাকীর পক্ষেই ছোঁড়ার সম্ভাবনা বেশী। প্রফুল্লের আত্মহত্যাও এই দিকেই ইঙ্গিত করে। কেননা সে জানতো সে দোষী। আর দোষী বলেই ধরা পড়লে সাথে সাথে আত্মহত্যা করে সে। সুতরাং পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করলে ক্ষুদিরামের পক্ষে সন্দেহের অবকাশ (Benefit of doubt) থেকেই যায়। কিন্তু সব কিছু বৃথা যায়। বৃথা যায় রংপুর থেকে মামলায় লড়তে যাওয়া আইনজীবীদের তৎপরতা। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর ৪টায় মজফফরপুর জেলের ভিতরে ক্ষুদিরামের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই কিশোর হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছেন জীবনের জয়গান। রচিত হয় ইতিহাস।
অত্যন্ত প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেও মজফফরপুরে গিয়ে এই কিশোরের পক্ষে আইনী লড়াই করেছিলেন রংপুর বারের তিন সাহসী আইনজীবী বাবু সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, বাবু কুলকমল সেন ও বাবু নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী। এই ঐতিহাসিক ঘটনা নিঃসন্দেহে রংপুরের গর্বের বিষয়। সেই রংপুরে জন্ম গ্রহণ করার জন্য আমি নিজেও গর্ব বোধ করি।
১১ আগস্ট অগ্নিযুগের বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যুদিবস। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট মাত্র ১৯ বছর বয়সেই রাজনৈতিক কারণে উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তাঁর ফাঁসী হয়। আজকেই এই দিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লিখেছেন : Riyadh Anwar Shubho
